Slideshows

http://bostonbanglanews.com/index.php/images/images/modules/mod_gk_news_highlighter/scripts/images/images/banners/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/605744Finding_Immigrant____SaKiL___0.jpg

কুইন্স ফ্যামিলি কোর্টে অভিবাসী

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ দ্যা ইন্টারফেইস সেন্টার অব নিউইয়র্ক ও আইনী সহায়তা সংগঠন নিউইয়র্ক এর উদ্যোগে গত ২৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ৯ See details

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

"বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু-ইতিহাসের কালো অধ্যায়" সিকদার গিয়াসউদ্দিন

শনিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৭

বাঙালী জাতির ইতিহাসে স্মরণকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙালী হিসাবে শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহন করেননি।বঙ্গবন্ধু হিসাবেও পরিচিত হননি।এটি অর্জনের পেছনে দীর্ঘ সাধনা আর ত্যাগের যে চরম পরাকাষ্টা-সে বিষয়ে আমাদের জানার আগ্রহ কম বললেই চলে।একজন বঙ্গবন্ধুকে তৈরী করতে আরো অনেকের ত্যাগের বিষয়টিও উপেক্ষিত বলে বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞদের বলতে শুনা যায়।তবে একথা সবাই একবাক্যে স্বীকার করে যে বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু নাম দূ'টিকে আলাদা করা যাবেনা।পরস্পর সমার্থক।বাংলাদেশের নাম নিলেই যে নামটি চলে আসবে তিনি আর কেউ নন-মুজিবর।এক নামে বঙ্গবন্ধু নামে যিনি বাঙালীর হৃদয়ের মনিকোটায় জায়গা করে নিয়েছেন।
তিন দিক থেকে ভারত আর একদিকে মায়ানমার(বার্মা) ঘেরা আমাদের দেশ বাংলাদেশ।প্রাচীনকালে বাংলা নামে কোন জনপদের নাম ছিলো বলে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়না।বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের তথ্য থেকে-
"পুন্ড্রভদ্র,সূমাহা,রাঢ়,গৌড়,ভদ্রমনা,বঙ্গ,চন্দ্রদ্বীপ,সমতট,হরিকেল,বরেন্দ্র,কর্ণসূবর্ণ,লাখনূটি,সূবর্ণবিথী,নব্যকূশিকা নামে নৃপতি শাসিত ছোট ছোট স্বাধীন জনপদ ছিলো প্রায় দূ'হাজার বছর আগে।"গুপ্তযুগের আগে রাজা ধননান্দের অধীনে এসব অঞ্চল শাসিত হতো।এছাড়াও মৌর্য্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত এসব এলাকা শুঙ্গ আর কুশানরা শাসন করতো।গুপ্তযুগের পর রাজা শশাঙ্ক অনেকটা সার্বভৌম রাজা ছিলেন বলে জানা যায়।অত:পর মাৎসান্যায় যুগের কথা ঐতিহাসিকদের লেখায় দেখা যায়।এরপর বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী পাল বংশের রাজত্বের পর হিন্দু ধর্মের ক্ষত্রিয় যোদ্ধার জাত সেনবংশের যুগ।
চতুর্দশ শতকে সুলতান শামশুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বর্তমানের বাংলাদেশ,ভারতের পশ্চিম বঙ্গ,বিহার,উড়িষ্যা,আসাম,মেঘালয় ও ত্রিপুরা ইত্যাদি পৃথক পৃথক অঞ্চলগুলোকে একত্রিত করে নামকরণ করেন 'বাঙ্গেলা'।প্রথমবারের মতো ঢাকাকে রাজধানী হিসাবে বেছে নেয়া হয়।ষোড়শ শতকে আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে শ্রী চৈতন্য দেবের জাতপাতমুক্ত সমাজ ও ইসলামের উঁচুনিচু ভেদাভেদহীন ধ্যানধারনাকে কেন্দ্র করে এক নতুন সমাজের জন্ম হলে বাংলাভাষা রাজকীয় মর্যাদা লাভ করে।
১৫২৬ সালে মোগল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন ভারত উপমহাদেশে।১৫৭৮ সালে পর্তুগীজ ও ১৬১২ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ব্যবসার নামে বাংলার মাটিতে ঘাঁটি স্থাপন করে।সম্রাট আকবরের আমলে কৃষিকাজের সাথে সঙ্গতি রেখে বাংলা মাস গননার বিষয়টি তাৎপর্য্যপূর্ণ।সুবে বাংলা নামে এই অঞ্চলকে মোগলরা শাসন করেছিলো।উনবিংশ শতাব্দীতে ফকির লালনশাহের আবির্ভাবও গুরুত্বপূর্ণ।১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজউদ্দৌলাহর পরাজয় এবং ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন শুরু।১৮৫৭ সালে শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের নেতৃত্বে সিপাহী বিপ্লব ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতার লক্ষ্যে গুনগত পরিবর্তনের এক উল্লেখযোগ্য দিক।১৮৫৮ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বিলোপ করে সরাসরি বৃটিশরাজ বাংলার ক্ষমতা গ্রহন করে।১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গঠন করা হয়।১৯০৫ সালে বঙ্গবঙ্গের ঘোষনা।১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম।১৯১১ সালে বঙ্গবঙ্গ রদ করা হয়।ক্ষুদিরাম,সূর্যসেন তিতুমীর হাজী শরীয়তউল্লাহর আত্মদান ঐতিহাসিক।এককথায় স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে ওয়াহাবী,ফারায়েজী,তেভাগা,সন্ন্যাস বিদ্রোহ,সন্ত্রাসবাদী,অসহযোগ আন্দোলন পরবর্তিতে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কাব্য ও সাহিত্যে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ও বিদ্রোহী কবি নজরুলের আবির্ভাব ঘটে।ভারতীয় উপমহাদেশে একদিকে মহাত্মা গান্ধী,মওলানা আবুল কালাম আজাদ,জওয়াহেরলাল নেহেরু,সরদার প্যাটেল,সরোজিনী নাইডু,মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ,লিয়াকত আলী খান,সীমান্তগান্ধী খ্যাত আব্দুল গাফ্ফার খান,অন্যদিকে দেশবন্ধু চিত্তরন্জন দাস,শ্যামাপ্রসাদ মূখার্জী,শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক,হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী,নেতাজী সুভাষ বোস,মওলানা ভাসানীর মতো কালজয়ী নেতাদের আবির্ভাব ও উত্থান বৃটিশ শাসন থেকে মুক্তির লক্ষ্যে নবযুগের সূচনা লক্ষনীয়।স্বাধীনতার লক্ষ্যে মহাত্মা গান্ধী পরিচালিত নন ভায়োলেন্ট অসহযোগ আন্দোলন অন্যদিকে নেতাজী সূভাষ বোস পরিচালিত 'আজাদ হিন্দ ফৌজ'য়ের সশস্ত্র আন্দোলন খূবই তাৎপর্য্যপূর্ণ।এমন একটি মোক্ষম সময়ে অখ্যাত টুঙ্গীপাড়ার সন্তান শেখ মুজিবুর রহমানের ছাত্রনেতা হিসাবে কলকাতায় অবস্থান বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দীর অন্যতম রাজনৈতিক শিষ্য হিসাবে মহাত্মা গান্ধীকে কাছে থেকে দেখার সূযোগ পান এবং নেতাজী সূভাষ বোসের সশস্ত্র আন্দোলনের বিষয়ে কাছে থেকে দেখতে পান।যা পরবর্তিতে অসহযোগ ও সশস্ত্র আন্দোলনের সমন্বয় সাধনে বিভিন্ন গ্রুপের সাথে প্রকাশ্যে বা গোপনে কাজ করার অনুপ্রেরনা যুগিয়েছিলো।বিশেষ করে শেখ মুজিবকে জানতে হলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সহ শেরে বাংলা ফজলুল হক ও মওলানা ভাসানীকে জানতেই হবে।


১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট পাকিস্তান ও ১৫'ই আগষ্ট ভারত বৃটিশ শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে।স্বাধীনতা অর্জন করে।শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান ও মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন।আওয়ামী মুসলিম লীগে মওলানা ভাসানী সভাপতি ও শেখ মুজিবুর রহমানের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহন।মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে কেবলমাত্র ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নামকরন রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট।কাগমারী সম্মেলনে আওয়ামী লীগে ভাঙন।মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সভাপতি ও শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক।পরবর্তিতে সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ও সাধারন সম্পাদক শামশুল হক।তৎপরবর্তিতে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমদ সাধারন সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহন ও স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে কৌশলে ধারাবাহিক কার্যক্রমের দিকে দলকে পরিচালনার প্রচেষ্টা।বিশেষ করে ছাত্রলীগের সাথে বিশেষ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগের শক্তির সাথে ভারসাম্য বিধান করে আওয়ামী লীগকে পরিচালনার বিষয়টি বিজ্ঞ মহলে আলোচিত সমালোচিত।কারন ছাত্রলীগ স্বাধীনতার পূর্বে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন ছিলোনা।ছাত্রলীগের নেতারা কেবলমাত্র বেগম মুজিব ও শেখ মুজিবের সাথে সংযোগ রক্ষা করতেন।ছাত্রলীগের সাথে চট্টগ্রামের এম এ আজিজের গভীর সম্পর্কের জনশ্রুতি আছে।
পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে জিন্নাহর বিরোধিতা,বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রমিক কর্মচারীদের আন্দোলনকে ঘিরে বহি:স্কার,ভাষা আন্দোলনের সময় শেখ মুজিবের কারাবরণ প্রনিধানযোগ্য।তারপরতো কারাজীবনের সে এক দীর্ঘ কাহিনী।যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে দেশব্যাপী বিচরন ও মন্ত্রিত্ব গ্রহন। দলের প্রয়োজনে মন্ত্রিত্ব বর্জন উল্লেখ করার মতো।সেনানায়ক ইস্কান্দর মির্জা ও তারপর আইয়ূব খানের ক্ষমতা গ্রহনের পরপর শেখ মুজিবকে ঘন ঘন কারাগারে গমন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে বসে।তখন আওয়ামী লীগ অফিসে বসার লোকও পাওয়া যেতোনা।এমনি এক দূ:সহ অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সারাদেশের ছাত্রলীগের মধ্য দিয়েই শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের দূ:সময়ের দিনগুলো অতিবাহিত হতে থাকে।১৯৬২'সালে শিক্ষা আন্দোলন শুরু হলে তখনও ছাত্র ইউনিয়ন সারাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয় সংগঠন হিসাবে পরিচিত।এমনি এক সময়ে ছাত্রলীগের কনভেনশনে সিরাজুল আলম খান সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পরপরই ছাত্রলীগকে  স্বাধীনতার লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিলে ধারাবাহিকভাবে জনপ্রিয়তায় ছাত্র ইউনিয়নের চাইতেও এগিয়ে যেতে থাকে।১৯৬২'সালেই সিরাজুল আলম খান,আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরিফ আহমেদ স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে গোপন সংগঠন নিউক্লিয়াস গঠন করার কথা এখন সর্বজনবিদিত।স্বাধীনতা অব্যবহিত পূর্বে সারাদেশে সাতহাজার নিউক্লিয়াসের সদস্যের কথা বিভিন্ন লেখায় দেখা যায়।১৯৬৫ সালে শেখ ফজলুল হক মনি ছাত্র রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহন করলে ছাত্রলীগে সিরাজুল আলম খানের একক নেতৃত্ব প্রতিষ্টিত হয়।ইতিমধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান জেলে অবস্থান করলে প্রায়সময় সিরাজুল আলম  খানকে আওয়ামী লীগ অফিসে বসে থাকার বিষয়টি অনেককে বলতে দেখা যায়।১৯৬৬ সালে জেল থেকে মুক্তির পর গোলটেবিল বৈঠককে কেন্দ্র করে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে শেখ মুজিবুর রহমান ছয়দফা ঘোষনা করেন।পাকিস্তানের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে।ঢাকায় ফিরে এলে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের অনেকের বিরোধিতা মূখে সিরাজুল আলম খান ও ছাত্রলীগ শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে শক্ত অবস্থান গ্রহন করে।কনভেনশন মুসলীম লীগের ফজলুল কাদের চৌধূরী আর আওয়ামী লীগের একাংশের শক্ত বিরোধীতা স্বত্তেও চট্টগ্রামের এম এ আজিজের ও ছাত্রলীগের সদস্যদের শক্ত অবস্থানকে কেন্দ্র করে স্বয়ং মুজিবর কর্তৃক চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে ৬ দফা ঘোষিত হলে লক্ষ জনতা করতালি ও মুহুর্মুহু শ্লোগানের মাধ্যমে তা অনুমোদন করে।আইয়ূবশাহীর ষডযন্ত্র ভয়াবহ আকার ধারন করে।ইতিমধ্যেই ছাত্রলীগের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে।ছাত্রইউনিয়ন চীন ও রাশিয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে তাদের জনপ্রিয়তায় বিরাট ধ্বস নামে।৬ দফার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ১১ দফা ঘোষিত হলে ছাত্র ইউনিয়ন ১১ দফাকে সমর্থন করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে অংশগ্রহন করতে বাধ্য হওয়া ব্যতিত তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের আর কোন পথ খোলা ছিলোনা।ততদিনে ছাত্রলীগের সভাপতি তোফায়েল আহমেদ ও সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন আ স ম আবদুর রব।ছাত্রলীগ কেবলমাত্র ছাত্রছাত্রী ছাড়াও শ্রমিক ও সাধারণ জনমানসে স্থায়ী আসন তৈরী করে নেয়।বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষডযন্ত্র মামলায় গ্রেফতার করা হলে ছাত্রলীগ ও ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে আন্দোলন দাবানলের মতো সারাদেশ ছডিয়ে পড়ে।তোফায়েল আহমদ তখন ডাকসূ ভিপি।এই সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে বিভিন্ন বক্তারা সিংহশার্দুল বা বঙ্গশার্দুল বলে অভিহিত করতো।এমতাবস্থায় ১৯৬৮ সালে ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের সম্পাদক রেজাউল হক চৌধূরী মুশতাক প্রতিধ্বনি নামে চারপাতার প্রচারপত্রে সারথী ছদ্মনামে বঙ্গবন্ধু শব্দটি উল্লেখ করেন।তা সিরাজুল আলম খান ও শেখ ফজলুল হক মনির ভীষন মনপুত হয়।তবে আইয়ূবশাহীর বর্বরতা থেকে ঢাকা কলেজের নেতৃত্ব যাতে মুক্ত থাকতে পারে তাই সাময়িকভাবে এটি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়।অবশ্য উপযুক্ত সময়ে তা কাজে লাগানোর কথা জানিয়ে দেয়া হয়।আগরতলা ষডযন্ত্র মামলা থেকে মুক্তির পর ততদিনে সারাদেশে শেখ মুজিবুর রহমান একক নেতা হিসাবে জনমনে অধিষ্টিত হয়।জেল থেকে মুক্তির পর ১৯৬৯ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারী রেসকোর্স ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা সভায় ছাত্র ইউনিয়নের উভয় গ্রুপের বিরোধিতা স্বত্ত্বেও সিরাজুল আলম খান ও অন্যান্যদের সিদ্বান্তক্রমে ডাকসূ ভিপি ও ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতা হিসাবে তোফায়েল আহমদ "বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান"বলে  ঘোষনা করলে লক্ষ জনতা মুহুর্মুহু করতালি ও শ্লোগান সহকারে তা অনুমোদন করে।এভাবেই বাঙালী জাতি তাঁর সর্বশ্রেষ্ট সন্তানকেই বঙ্গবন্ধু অভিধায় অভিষিক্ত করেছিলো।যা চলছে ও চলবে।
বঙ্গবন্ধু অভিধায় অভিষিক্ত হওয়ার পরপরই বঙ্গবন্ধুর অনুরূধে সিরাজুল আলম খান,শেখ ফজলুল হক মনি,আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে নিউক্লিয়াস পরবর্তি বি এল এফ পূণর্গঠিত হয়।কাজী আরিফকে বি এল এফ গোয়েন্দা প্রধান হিসাবে গোপনে নিয়োগের বিষয় এখন আলোচিত হতে দেখা যায়।আইয়ূবশাহীর পতন হলে ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসক হিসাবে নির্বাচন দিলে ততদিনে ছাত্রলীগের চার নেতাকে চার খলিফা হিসাবে সারাদেশের জনগনকে বলতে দেখা গেছে।ক্রমশ:'চার খলিফা' শব্দটিও বাঙালী জনমানসে স্থায়ী আসন লাভ করে।ছাত্রলীগের এই চার খলিফা খ্যাত ডাকসূ ভি পি আ স ম আবদুর রব,ডাকসূ সাধারন সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস মাখন,ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী,ছাত্রলীগ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ উল্কার বেগে সারাদেশ চষে বেড়ায়।তখনকার দিনে ছাত্রদের কথা সাধারণ জনগন দৈববানীর মতো মেনে নিতো।বঙ্গবন্ধুর বাঙালী জাতির একক নেতা ও আওয়ামী লীগকে একক জনপ্রিয় সংগঠনে পরিনত করার পেছনে ১৯৭১' পূর্ববর্তি জেনারেশনকে ছাত্রলীগের চার খলিফার কর্মকান্ডের কথা বলতে দেখা যায়।নির্বাচনে অবশেষে পাকিস্তানের সকল গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট মিথ্যা প্রমানিত করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে।
ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে তালবাহানা চলতে থাকে।একপর্যায়ে ইয়াহিয়া খান পার্লামেন্ট স্থগিত ঘোষনা করলে সারাদেশ আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে উঠে।ছাত্রজনতার প্রবল চাপে বি এল এফ নেতাদের পরামর্শক্রমে ১৯৭১'সালের ১'লা মার্চ চার খলিফার নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ঘোষিত হয়।২'রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ডাকসূ ভিপি ও সংগ্রাম পরিষদের নেতা আ স ম আবদুর রব ছাত্র জনতার মুহুর্মুহু করতালি ও শ্লোগানের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন।৩'রা মার্চ পল্টন ময়দানে অনির্ধারিতভাবে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক শাজাহান সিরাজ।সর্বসম্মতিক্রমে বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার স্থপতি ঘোষনা,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তোলিত পতাকাকে স্বাধীন বাংলার জাতীয় পতাকা,কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের "আমার সোনার বাংলা-আমি তোমায় ভালবাসি"গানটি জাতীয় সংগীত হিসাবে ঘোষনা সহ আরও বিস্তারিত কর্মপন্থা ঘোষিত হয়।জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত নির্ধারনের ক্ষেত্রে নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্তের বিষয়টি বিভিন্ন লেখাতে দেখা যায়।৭'ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান তথা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক পরবর্তি জনসভার ঘোষনা দেয়া  হয়।৩'রা মার্চের পরপরই বি এল এফের চার নেতা,চার খলিফা ও বংগমাতা বেগম মুজিবের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড গঠনের কথা জানা যায়। সাতই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বাঙালী জাতির স্মরণকালের ঐতিহাসিক ভাষন দান কালে তিনি বলেন-"এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।"এর পর আর বাকী থাকে কি?২৩'শে মার্চ পল্টন ময়দানে পাকিস্তান দিবসের পরিবর্তে প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়।সারাদেশে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দেয়া হয়।পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দেয়া হয়।এলো ২৫'শে মার্চ।মধ্যরাতে বর্বর পাকবাহিনী স্মরনকালের বৃহত্তম গনহত্যা শুরু করে।বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়।স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দ্রুততম সময়ের ব্যবধানে মুক্তিযুদ্ধ তথা জনযুদ্ধে রূপান্তরের প্রক্রিয়া অবাক বিস্ময়ে সারা দুনিয়া তাকিয়ে রইলো।জনযুদ্ধ চলাকালীন বর্বর পাকিস্তানের সামরিক শাসক কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর বিচার ও ফাঁসীর বিষয়টি বিশ্বব্যাপী আলোচিত।নয়মাসের ব্যবধানে মুক্তি ও মিত্রবাহিনী সমন্বয়ে দেশ স্বাধীন হলো।১৯৭২'সালের ১০'ই জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন বিজয়ীর বেশে।এসেই স্বাধীন দেশের শাসনভার গ্রহন করলেন।চক্রান্তকারীদের কৌশলে যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদকে দূরে সরিয়ে খন্দকার মোশতাককে সবসময় ৩২'নম্বর ধানমন্ডীর বাসায় বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিলো।জনশ্রুতি আছে যে,৩২'নম্বরের বাড়ীতে খোন্দকার মোশতাকের প্রবেশের পর থেকেই মহিয়সী বেগম মুজিবকে কেউ হাসতে দেখেনি।অন্যদিকে সিরাজুল আলম খান কর্তৃক বিপ্লবী জাতীয় সরকার গঠন ও অন্যান্য দাবীকে উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগ দলীয় সরকার গঠিত হলে সদ্য যুদ্ধফেরত অধিকাংশ তরুন তুর্কীরা বিদ্রোহী মনোভাব পোষন করতে থাকে।তাছাড়াও স্বাধীনতাপূর্ব বিরোধীতার জের ধরে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ যথাক্রমে পল্টন ও রেসকোর্স ময়দানে অবশ্য বঙ্গবন্ধুর সম্মতি নিয়ে ছাত্রলীগের কনভেনশনের আয়োজন করে।তবে পরবর্তিতে বঙ্গবন্ধু কেবলমাত্র রেসকোর্সের সভায় যোগ দিলে ছাত্রলীগের পল্টনের অংশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।পরে সিরাজুল আলম খানের নির্দেশনায় স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল হিসাবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল তথা জাসদ আত্মপ্রকাশ করে।১৯৭৪'সালে দেশীয় ও বিদেশী চক্রান্তে দূর্ভিক্ষ দেখা দিলে কিংবা নানা অরাজক অবস্থা ঘরের ভেতরে ও বাইরে দেখা গেলে বিশেষ বিবেচনায় চতুর্থ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে ন্যাপ মোজাফফর ও কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়ে বাকশালের আত্মপ্রকাশ ঘটে।১৯৭৫'সাল।ততদিনে নদীর জল অনেক গড়ালেও বঙ্গবন্ধু অনেক গোয়েন্দা রিপোর্ট কে পাত্তা দেননি এই ভেবে যে-"কোন বাঙালী অন্তত:তাকে হত্যার চিন্তাও করতে পারেনা।"অবশেষে এলো সেই শোকাবহ দিন।পনেরোই আগষ্ট।বাঙালী জাতির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু সহ স্বপরিবারে ইতিহাসের বর্বরতম পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের দিনটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শোকের দিন হিসাবে বাঙালী জাতি ও বাংলাদেশ স্মরণ করবেই।বিশ্বাসঘাতক খূনী মোশতাক চক্রকে জাতি কখনো ক্ষমা করবেনা।বঙ্গবন্ধুর রক্তের উপর দিয়ে আওয়ামী লীগের মোশতাক গং ক্ষমতার মসনদ দখলের বিষয়টি ছাড়াও জিয়া চক্রের সংশ্লিষ্টতা বিশিষ্ট সাংবাদিক অ্যান্তনী ম্যাসকারেনহাস কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর খূনী ফারুক রহমানের সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।ইতিহাসের এই কালো অধ্যায়কে বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতি কখনো ভূলবেনা।অবশ্য বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু তৎপরবর্বর্তি প্রতিবাদ জানানো ও মোশতাক-জিয়া চক্রের সাথে ক্ষমতার সহযোগীদের নিয়ে গবেষনা এখনো চলছে।তাছাড়াও বিশিষ্ট মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ডা: মাহফুজুর রহমানে লেখায় প্রশ্ন- "বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথমে প্রতিবাদ জানানো উচিত ছিলতো আওয়ামী লীগের। এবং তাদের ক্ষমতার পার্টনার মোজাফফর ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির।আর জানানো উচিত ছিলো বঙ্গবন্ধু যাদের বাকশালে নিয়েছিলেন সেই মে.জে.শফিউল্লাহ,মে.জে.জিয়ার।সবচাইতে অবাক করা ব্যাপার হলো তখন দেশের উপ রাষ্ট্রপতি ছিলেন সম্ভবত:সৈয়দ নজরুল ইসলাম।প্রেসিডেন্টের মৃত্যু হলে তারই প্রেসিডন্ট হওয়ার কথা এবং একই সাথে সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হওয়ার কথা।প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মনচুর আলী।এই দুইজন ব্যক্তিত্ব কেন দ্রুততার সাথে এগিয়ে এলেননা----।"অনেককে বলতে শুনা যায়-আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় থাকে তখন আওয়ামী লীগের বাইরের শত্রুর দরকার হয়না।তোষামোদকারী,মোসাহেব আর অতি ভক্তিসম্পন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্টের লোকজন চতুর্দিকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্টে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে যে-ত্যাগী কর্মীরা লজ্জায় লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়।শোকাবহ আগষ্টকে শক্তিতে পরিনত করতে হলে বঙ্গবন্ধুর মতো নির্লোভ,নির্মোহ ও উদার হতে হবে।অর্থ ও ক্ষমতার মোহ কিংবা দাম্ভিকতা অথবা অশিষ্ট আচরনের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।বর্তমানের ও আগামী প্রজন্মের সন্তানেরা যাতে আমাদের দায়ী করতে না পারে সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে।ইতিহাসের এই কালো অধ্যায় থেকে শিক্ষা গ্রহনের শেষ নেই।নিরন্তর গবেষনার বিকল্প নেই।মূখে বললেও ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহনের নজির আজকাল নেই বললে চলে।আমাদের স্মরণ রাখতে হবে-সত্য প্রকাশিত ও মিথ্যা একদিন ভূলূন্টিত হবেই।মৃত্যুন্জয়ী বঙ্গবন্ধুর দেশ বাংলাদেশ।এভারেষ্টশৃঙ্গকে সমুন্নত রাখতে হলে হিমালয়ের চতুর্পার্শ্বের পর্বতরাজিকে সুশোভিত করে তুলতে হবে।শহর,বন্দর ও গ্রামের নদী ও পাহাডগুলোকেও সাজিয়ে তুলতে হবেই।বাংলাদেশের আগামী দিনগুলো সাম্য,সামাজিক ন্যায়বিচার,দূর্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মানে সর্বোপরি গনতান্ত্রিক আচরনের সমৃদ্ধির মধ্য দিয়ে এগুলেই কেবল তখন বঙ্গবন্ধুর আত্মার শান্তি নিশ্চিত হবে।
তথ্যসূত্র:
অসমাপ্ত আত্মজীবনী:শেখ মুজিবুর রহমান
একুশ শতকে বাংলাদেশ-সিরাজুল আলম খান।
Education in Ancient India-Hartmut Sgharfe
বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্ব-নীহাররঞ্জন রায়।
মোস্তফা জব্বার,জাগো নিউজ24.কম
মহিউদ্দিন আহমদের জাসদের উত্থান পতন
বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ফেসবুক ষ্ট্যাটাস।
১৫'ই আগষ্ট,লাস ভেগাস
নেভাদা,যুক্তরাষ্ট্র।


১৫ই আগষ্ট অভিবাদন স্বাধীনতা।আবু জাফর মাহমুদ

শনিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৭

ভারতের স্বাধীনতা দিবসে ভারতীয়দের জানাই অভিনন্দন।বৃটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তির লড়াই এবং সংগ্রামে অংশগ্রহনকারী সকলের প্রতি জানাই সম্মান।নিজেদের দেশ ও জাতির জন্যে যুদ্ধে ও সংগ্রামে জীবন বলিদানকারীদের মৃত্যু হয়েছে বলা যায়না।এই মহান অবদানের জন্যে জগৎস্রষ্টার কাছে তারা নিশ্চয়ই শ্রেষ্ট মানবদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। সর্বাধিনায়ক সুভাষ বোস এবং স্বাধীনতার অন্যান্য সকল বীরদের জানাই আভিবাদন।
 দীর্ঘকাল যাবত আন্দোলন সংগ্রাম বিদ্রোহে জীবন উৎসর্গ ও আধুনিক ভারতে রূপান্তরের শিক্ষা ভারতের স্বাধীনতার বিজয় আনে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরিবেশে বৃটিশ শাসকদের পরাজয় নিশ্চিত হবার পরিস্থিতি দেখা দিলে সফলভাবে সাময়িক পিছু হটার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিলো যুদ্ধের কৌশলে।ফলে ভারত পাকিস্তান ভাগ করে দুই রাষ্ট্রকে স্বাধীনতা দিয়ে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ চালু করা হয়েছিলো।ভারতবর্ষের অভ্যন্তরে স্বাধীনতাপন্থী শক্তিগুলোর উপর্যুপরি সামর্থ্যায়ন দেখানো সম্ভব হয়েছিলো বলেই শাসক বৃটেনকে এই সিদ্ধান্তে যাওয়া সম্ভব করেছিলো।
বিশাল ভারতবর্ষের এই রাজনৈতিক আন্দোলনে কেবল হিন্দুরাই নেতৃত্ব করেছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে এবং ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তরের লক্ষ্যে খোলাখুলি ঘোষণা করছেন বর্তমান ভারতীয় শাসকরা। এদের এই দাবি যে সমগ্র ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা তা বই ঘাটলেই জানা যায়।তর্কের দরকার হয়না।অধিকন্তু বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দুর্গের নাম আর এস এস বা রাষ্ট্রীয় সেবা সংঘ।এই সংঘ যে মূলতঃ ভারতের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি এবং ঐতিহ্যগতভাবে ভারত বিরোধী শক্তি তা ভারতের রাজনীতিবিদরাই প্রকাশ্যে অতীতের রেকর্ড হাতে নিয়েই বলছেন।ভয়াল সংঘাতময় বিশ্ব পরিস্থিতিতে ভারতে যে রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রপরিচালনার ম্যন্ডেট হাতিয়ে নিয়েছে তাদের ভেতরের চিত্র প্রকাশ্যে আসায় পরিস্থিতি সচেতন হওয়া সহজ হয়ে উঠেছে।   
বৃটিশ শাসন থেকে মুক্তির আন্দোলন সংগ্রামের রাজনীতি এবং গেরিলা আক্রমণ ধারায় কখনো সাম্প্রদায়িকতা দেখা যায়নি।মুসলমান রাজনীতিবিদ এবং স্বাধীনতাযোদ্ধাদের মধ্যে হাজার হাজারতো আছেই সর্বোচ্চ সম্মানিত ও সর্বদলের কাছে সমাদৃত টপ ১০ মুসলমান রাজনৈতিক নেতা এবং স্বাধীনতা যোদ্ধাদের নাম এখানে উল্লেখ করা যায়,যাদের নেতৃত্ব এবং অবদানের গুণগতমান কখনো বর্তমান ভারত সরকারের প্রচারণার সাথে মিলেনা।একটা উদাহরণ দেই;  
মুজাফফর আহমেদ(৫ই আগষ্ট ১৮৮৯-১৮ই আগষ্ট ১৯৭৩) কম্যুনিষ্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সবার কাছে  তিনি এতই গ্রহন যোগ্য ছিলেন যে তার নামেই কলকাতায় কম্যুনিষ্ট পার্টির প্রধান কার্যালয় করা হয়।তিনি ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম সারির অন্যতম নেতা এবং স্বাধীনতা যোদ্ধা।স্বাধীনতাযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক সুভাস বোসের সাথে সৈনিক সংগ্রহ এবং জনগণকে স্বাধীনতা যুদ্ধে উদ্ধুদ্ধ করার নেতৃত্ব করার কথা ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।তিনি ভারতীয় সমাজে সকল ধর্ম জাত বংশের মানুষের কাছে কাকাবাবু বলেই সম্মানিত।ভারতীয় স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রথম ১০জন(টপ টেন)রাজনৈতিক নেতা ও যোদ্ধাদের মধ্যে তার নাম উল্লেখিত।বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের সন্দ্বীপে মুছাপুর ইউনিয়নে তিনি জন্মগ্রহন করেন।১৯১৮ সনে তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির যুগ্ম সম্পাদক হন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সহ নবযুগ সাহিত্য ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন।পরবর্তীতে ১৯২২ সনে ধুমকেতু প্রকাশে তিনি সরাসরি অবদান রাখতেন।    
কাকাবাবুকে সম্পাদক করে ১৯২২সনে ভারত সাম্যতন্ত্র সমিতি গঠন হয়েছিলো।কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলার অভিযোগে সহকর্মী শ্রীপদ অমৃত ডাঙে, নলিনী গুপ্ত, শওকত ওসমানীসহ ৪বছর জেল বন্দী ছিলেন।১৯২৫সনে তিনি কারামুক্ত হন অসুস্থতার কারণে।ঐ বছরই তিনি কাজী নজরুল ইসলাম,হেমন্ত কুমার সরকার এবং অন্যান্যদের নিয়ে অবিভক্ত বাংলায় লেবার স্বরাজ পার্টি গড়েন। ১৯২৯ সনের ২০ মার্চ বৃটিশ ঔপনিবেশিক সরকার ৩১জন শ্রমিক নেতাকে গ্রেফতার করে মিরাট নিয়ে যায় বিচারের লক্ষ্যে।কাকাবাবু ছিলেন প্রধান আসামী।
 সবাইকে সাজা দেয়া হয়েছিলো।প্রধান আসামী হিসেবে তার সাজার মেয়াদ ছিলো সবার চেয়ে বেশী।তিনি ১৯৩৬সনে মুক্তি পান।১৯৪৮সনের ২৫মার্চ কম্যুনিষ্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া ব্যান্ড করা হয় এবং কাকাবাবুকে জেলে বন্দী করা হয়।১৯৫১সনে তাকে ছাড়া হয়।১৯৬২সন ও ১৯৬৫সনে বৃটিশ দালাল সরকার কর্তৃক পুনরায় তিনি গ্রেফতার হন।তারপর আরো কয়েকবার বৃটিশ-পন্থী  কংগ্রেস সরকার তাকে গ্রেফতার করে তার তৎপরতা থামিয়ে দিতে।১৯৭৩সনে ৮৪বছর বয়সে কলকাতায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কলকাতার রিপন ষ্ট্রীট মুজাফফর আহমদ সড়ক নামকরণ করা হয়েছে।
লেখক নিজেই বাংলাদেশের স্বাধীনতাযোদ্ধা।ভারতীয়দের কাকাবাবুর জন্মস্থান সন্দ্বীপের গাছুয়া ইউনিয়নে জন্মেছি।স্বাধীনতার আন্দোলন করার পথ ধরে বেড়ে উঠেছি।কম্যুনিষ্ট রাজনীতি ও বিপ্লবের রাজনীতি্র সমসাময়িক গতিপ্রকৃতি ও সাম্রাজ্যবাদী পক্ষের রাজনীতির বিশ্লেষণ করছি বছরের পর বছর।ভারতের রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি আমার আগ্রহের অন্যতম হয়ে উঠেছে প্রাকৃতিক নিয়মেই।     
 
ভারতে কংগ্রেস শাসনে দেখেছি যতো, তার চেয়ে হাজারগুণ বেশী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রভাবে ভারতে বিজেপির সরকার চলছে।সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদী হিন্দুত্ব থাবা মেলে ভারতীয় স্বাধীনতার মূল্যবোধ চিবিয়ে চিবিয়ে ছোবড়া করে ফেলছে। মুসলমানদেরকে নির্মূল করা এবং ভারত ছাড়া করার তৎপরতা চলছে ভারতে।এই বিজেপি সরকারই সীমান্তে রাখছে যুদ্ধ এবং দেশের ভেতরে বাঙালির উপর,মুসলমান খৃষ্টান ও পাহাড়ি আদিবাসীদের উপর চালাচ্ছে ইতিহাসের জঘন্য নিপীড়ন।এই সময় নিজেদের মহাঅপরাধ গোপন করে যেই কাগুজে সাধুবাদী স্বাধীনতার নিয়ম জারি করতে নোটিশ করলেন কেন্দ্রীয় সরকার, প্রতিরোধের পদক্ষেপ নিলো পশ্চিম বাংলা সরকার।                
 সতর্ক হওয়া দরকার এজন্যে যে,ভারতের স্বাধীনতা দিবস (১৫ আগস্ট) পালনের নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে সংঘাত দেখা দিয়েছে।


মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাপরাধীঃ সংখ্যায় কারা বেশী? - সিরাজী এম আর মোস্তাক

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট ২০১৭

বাংলাদেশে প্রায় ২লাখ তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে। তারা মোটা অংকের ভাতা পাচ্ছে। তাদের সন্তান-সন্ততিরা দেশের সকল চাকরিতে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে শতকরা ৩০ভাগ কোটাসুবিধা পাচ্ছে। বাংলাদেশের ১৬কোটি জনতা ও লাখো শিক্ষিত বেকার এর চরম মূল্য দিচ্ছে। সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের পরও এসংখ্যা দুই লাখ দশ হাজার পেরোয়নি। যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ২লাখই চুড়ান্ত ও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত, সুতরাং বাকী জনতা যুদ্ধাপরাধী কিনা তা প্রশ্নবিদ্ধ। এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধে প্রাণদানকারী ৩০লাখ শহীদের বিষয়টি আরো গুরুত্বপুর্ণ। শহীদগণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত নন। তাদের বংশ ও পরিবারের অস্তিত্ব বাংলাদেশে নেই। অর্থাৎ শহীদগণ মুক্তিযোদ্ধা নাকি যুদ্ধাপরাধী, তা স্পষ্ট নয়। বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানও মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত নন। তিনি যুদ্ধাপরাধীও নন। আশ্চর্য্যরে বিষয় হল, ভারতের লালবই থেকে ৬৬হাজার মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হলেও যুদ্ধকালে ভারতে অবস্থানকারী জাতীয় চার নেতাসহ মুজিবনগর সরকারের বহু নেতা মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত নন। যেমন, খন্দকার মোশতাকের মতো প্রখ্যাত নেতা খুনী ও য্দ্ধুাপরাধী। অন্যদিকে বাংলাদেশে অবস্থিত আন্তর্জতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২তে ইতিমধ্যে কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর চুড়ান্ত সাজা হয়েছে। আরো বহু যুদ্ধাপরাধীর বিচার চলছে। উক্ত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে কোনো পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়নি। বরং বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আরো কতো যুদ্ধাপরাধী রয়েছে, তার অন্ত নেই। এ বিচার পৃথিবীর সর্বোচ্চ আদালত তথা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে, ত্ইা এটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ও সর্বজনগ্রাহ্য। এখন বিশ্বব্যাপী পরিব্যাপ্ত যে, বাংলাদেশে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ও তাদের প্রজন্ম রয়েছে। তবে তাদের প্রকৃত সংখ্যা স্পষ্ট নয়।


বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান নিজেই করে গেছেন, মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাপরাধীর সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের সমাধান। আমরা তাঁর মহান আদর্শ ও চেতনা বর্জন করে শুধু শোকেই মুহ্যমান। তাঁর সময়ে দেশে ছিলনা মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা-শহীদ-যুদ্ধাপরাধী ব্যবধান। স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিতর্কের স্থান। দেশে ছিলনা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা দাবি করার সাহসী প্রাণ। সন্তান-সন্ততির জন্য মুক্তিযোদ্ধাকোটা তো একেবারেই বেমানান। কতিপয় কুচক্রীর প্রভাবে বঙ্গবন্ধু কথিত দালালদের বিচার শুরু করলেও ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বরেই তা বাতিল করেন। শুধু বাতিল নয়, বিচারের সামান্য কাগজও বিনষ্ট করেন। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী তৎকালিন আইন মন্ত্রী ড. কামাল হোসেন এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ। এরপর বঙ্গবন্ধু সুস্পষ্টভাবে দেশের সাড়ে সাত কোটি নাগরিককে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেন। মাত্র ৬৭৬ যোদ্ধাকে বিশেষ খেতাব দেন। সাতজন শহীদকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দেন। এভাবে যোদ্ধা ও শহীদের অনুপাত শিখান। শহীদগণ মুক্তিযোদ্ধা তালিকার বাইরে নন। ৩০লাখ বীর শহীদ ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বীর বাঙ্গালির চেয়ে অধিক মর্যাদাবান। এ মহান আদর্শের ফলে, বঙ্গবন্ধুর সময়ে শহীদ-গাজী নির্বিশেষে দেশের সবাই ছিলেন সমান। তারা যুদ্ধাপরাধী বা অমুক্তিযোদ্ধা নন, আত্মত্যাগী ও বীরের জাতি হিসেবে মহীয়ান।
এখন সব উল্টো। পাকিস্তানিদের পরিবর্তে বাংলাদেশিরাই বিশ্ব আদালতে যুদ্ধাপরাধী স্বীকৃত। মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে যুদ্ধাপরাধীর বিষয় বেশি প্রচারিত। যেহেতু বিশ্ববাসী আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুগত, তাদের কাছে ১৯৭১ এর ইতিহাস সেকেলে ও অতীতরূপে বিবেচিত। ফলে এখন বিশ্বে পাকিস্তানিদের পরিবর্তে বাংলাদেশীরাই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে লান্থিত ও নিগৃহিত। যুদ্ধাপরাধী ইস্যু এখন কতিপয় বা সংখ্যাগত নয়, এ লান্থণা পুরো জাতিগত।
অতএব, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে মেকি স্মৃতিচারণ ও লোকদেখানো শোকপালন বাদ দিয়ে আমাদেরকে তাঁর মহান আদর্শ ও চেতনা বাস্তবায়ন করতে হবে। বঙ্গবন্ধুসহ ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বীর বাঙ্গালিকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ-গাজী পার্থক্য দূর করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বর্তমান তালিকাভুক্ত ২লাখ মুক্তিযোদ্ধাগণ বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চারনেতা ও ৩০লাখ শহীদের চেয়ে কখনোই বড় মানের নয়। যেখানে বঙ্গবন্ধু ও লাখো শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নন, সেখানে ২লাখ তালিকা মোটেও সঠিক নয়। তাই বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ৬৭৬ যোদ্ধা ব্যতিত সকল তালিকা বাতিল করতে হবে। এতে দেশবাসী লাখো বীরযোদ্ধা ও শহীদের পরিবারভুক্ত হবে। বঙ্গবন্ধুর সময়ের মতো ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠিত হবে। দেশে যুদ্ধাপরাধীর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যাবেনা। বাংলাদেশিরা মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম, আর পাকিস্তানিরা যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত হবে।
শিক্ষানবিশ আইনজীবী, ঢাকা।


১৫ আগস্ট ॥ বাঙালিত্বকে পাকিস্তানীকরণের চেষ্টা--অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট ২০১৭

শোকের মাস আগস্ট। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার বাংলাদেশের স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মার প্রতি জাতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। সেদিনের শাহাদাতবরণকারী সকলের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা নিছক কোন সাধারণ হত্যাকা- ছিল না। এদিন কেবল জাতির পিতাকে হত্যা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করাই মূল উদ্দেশ্য ছিল না। সেদিন তিনটি হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছিল। এক. বঙ্গবন্ধু, দুই. বাংলাদেশ এবং তিন. বাঙালিত্ব। আমরা অনেক সময় দাবি করি, এ অঞ্চলের মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিল। আমাদের এ ভূ-খ- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু ইতিহাস ঠিক তেমনটি বলে না। এক সময় আমরা হয়তো অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলাম। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের শেষের দিকে এসে সেই চেতনার বিলুপ্তি ঘটে। কেননা সাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতেই ভারত উপমহাদেশ ভাগ হয়ে যায়। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে হিন্দু এবং মুসলমান নামে দুটি ভিন্ন জাতির জন্য দুটি কৃত্রিম রাষ্ট্র তৈরি করা হয়। অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক চেতনার বদ্ধমূল ধারণা থেকেই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির জন্ম। আর অন্য সাম্প্রদায়িক অনুষঙ্গের উপস্থিতির কথা বাদই থাক। দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি পুরোটাই সাম্প্রদায়িকতায় ভরপুর ছিল। তারা ইসলামের নামে বিভিন্ন নির্যাতন ও শোষণে লিপ্ত ছিল। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা কুক্ষিগত করে মানুষকে নিপীড়ন করার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আর একটি রাষ্ট্র ভারত। মোটকথা ইসলামের অপব্যবহার আর ভারতের বিরোধিতা করাই ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ। শোষণ আর নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে আমাদের এ অঞ্চলের মানুষ জাতির পিতার নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুরু থেকেই অনুমান করেছিলেন, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে বাঙালিত্ব চেতনা বিকশিত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। তখন থেকেই শুরু হয় আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মালিক হই। কিন্তু দেখা গেল, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে কেবল রাষ্ট্রনায়ক অথবা স্বাধীনতার স্থপতিকে হত্যা করা হলো তা নয়, ইতিহাসের কলঙ্কময় এ হত্যাকা-ের মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশকে ফের পূর্ব পাকিস্তানে রূপান্তর করা হয়। সব ধরনের মৌলবাদী চিন্তা-চেতনার অনুষঙ্গ ফিরে আসে। বাংলাদেশকে আবার পূর্ব পাকিস্তান বানিয়ে উল্টোপথে যাত্রা শুরু হয়। এতে করে আমরা আবার আমাদের বাঙালিত্বকে হারিয়ে ফেলি। বাঙালিত্ব এবং বাঙালিত্বের অনুষঙ্গের ওপর শুরু হয় একের পর এক আক্রমণ। অর্থাৎ বাঙালিত্বের বিপরীতে ধর্মীয় মৌলবাদী চেতনার বিকাশের সব ধরনের আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা অকল্পনীয় ছিল। বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় কখনও আসেনি যে, বাঙালীরা ষড়যন্ত্র করে তাকে হত্যা করতে পারে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বিষয়ে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য তার কাছে ঠিক মতো পৌঁছে ছিল কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অনিশ্চিত এ কারণেই যে, মিলিটারি ব্যুরোক্রেসিসহ যারা গোয়েন্দা সংস্থায় থাকেন, তারা তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এক ধরনের বাধার সৃষ্টি করেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধে ১০০ জনের কম বাঙালী সেনাবাহিনীর অফিসার পদে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেছিল এক হাজার জনের মতো অফিসার। আমি বলব না যে, যারা পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেছিলেন তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিলেন। পাকিস্তানে যারা অবস্থান করছিলেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রশিক্ষণ ছিল অন্য রকমের। যুদ্ধের সময় তারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং ৯ মাসের যুদ্ধের নৃশংসতা দেখেননি। স্বাধীন দেশের শুরুতেই সামরিক এবং আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে, সামরিক বাহিনীর কয়েকজন বাঙালী অফিসার, সম্ভবত সাতজন, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেছিল, যারা বাংলাদেশের বিপক্ষে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। যেসব পাকিস্তানী সামরিক অফিসার আত্মসমর্পণ করেছিল, তাদের মধ্যে ওই সাত বাঙালী সামরিক অফিসার ছিল। চাকরি চলে যাওয়ায় না খেয়ে মরতে বসেছে বলে জেনারেল ওসমানী তাদের বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে জানানো হয়, তারা পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করে আত্মসমর্পণ করেছে। তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এদের আর্মিতে নিয়েছিল কে? এরা তো পুলিশ হওয়ারও উপযুক্ত না।’ বঙ্গবন্ধুর অনুকম্পায় তাদের পুলিশে রূপান্তর করা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে এরাই ডিআইজি পর্যন্ত হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রামে শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার সময় ২৭ জন আওয়ামী লীগ কর্মী জীবন দিয়েছিল, ওই হত্যাকা-ের অর্ডার দিয়েছিল ওই ঘরানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা। আমাদের মনে রাখতে হবে ১৯৭০ সালে যখন প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন হয় তখনও সুস্পষ্টভাবে স্বাধীনতার কথা আসেনি। কেবল ছয় দফা উত্থাপিত হয়। কারণ, বঙ্গবন্ধু মনে করতেন ছয় দফা বাস্তবায়িত হলেই আমরা স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাব। সেই ১৯৭০-এর নির্বাচনেও প্রায় ২৪ শতাংশ মানুষ ছয় দফার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। স্বাধীনতা তো দূরের কথা, ছয় দফার বিরুদ্ধেই ছিল ২৪ শতাংশ মানুষ। এ লোকগুলো কোথায় গেল? এ লোকগুলোর পরাজয়ের গ্লানি এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয় পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র, সামরিক এবং বেসামরিক ষড়যন্ত্রকারী চক্র। ফলে বঙ্গবন্ধুর প্রশাসন এবং সরকারকে অকার্যকর করা, জনপ্রিয়তা হ্রাস করাসহ সব জায়গা থেকে সব ধরনের ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল। আজকে আমেরিকা আমাদের উন্নয়ন সহযোগী এবং চীন আমাদের অন্যতম বন্ধু রাষ্ট্র। মনে রাখতে হবে, আমাদের স্বাধীনতার শেষ মুহূর্তে এসে যখন জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটাভুটি হয়, তখন সোভিয়েত বলয়ের মাত্র কয়েকটি রাষ্ট্র আমাদের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। জাতিসংঘের অনেক রাষ্ট্র, যাদের আমরা ইসলামী রাষ্ট্র এবং বৃহৎ শক্তি বলি তারা কিন্তু আমাদের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল। কাজেই সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টি কেবল পাকিস্তানের পরাজয়ই ছিল না, ওই সকল বৃহৎ শক্তিরও পরাজয় ছিল। ১৯৭৫ সালে সারাবিশ্বে ভিন্ন অবস্থা বিরাজ করে। সামরিক শক্তি হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন, পুঁজিবাদের দেশ আমেরিকা এবং কমিউনিজম দেশ চীন এ বিষয়গুলো এক একটি ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্ব নেতা যেমনÑ ফিদেল কাস্ট্রো, মার্শাল টিটো, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়গুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। অর্থাৎ সব ঘটনার সম্মিলিত ফলাফলই ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা। এর মধ্য দিয়ে পরাজিত শক্তি এবং তাদের দোসরদের আক্রোশ মিটে। আজকে আমরা যাদের বন্ধু রাষ্ট্র বা উন্নয়ন সহযোগী বলি তাদেরও কিন্তু আক্রোশ ছিল। হেনরি কিসিঞ্জারের বক্তব্যগুলো এবং পরবর্তীকালে তাদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেবল পাকিস্তানই যে পরাজিত শক্তি তা নয়, অন্যরাও পরাজয় মেনে নিতে পারেনি। তারা শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রকে সমর্থন করেছিল এবং যুদ্ধে অংশীদারিত্ব ছিল। এর সঙ্গে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবির রাজাকারদের ষড়যন্ত্র তো ছিলই।

র্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা কি আজীবন মুক্তিযোদ্ধা থাকেন? রাজাকার সারাজীবনের জন্য রাজাকার কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা আজীবনের জন্য মুক্তিযোদ্ধা নাও হতে পারেন। ড. হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ‘১৯৭১ সালেও আমি এত রাজাকার দেখিনি। যা এখন দেখি।’ অর্থাৎ রাজাকারদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, তারা আজীবন যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ না করে এবং একপর্যায়ে বলেই ফেলেন মুক্তিযুদ্ধ করাটাই ভুল ছিল। তাহলে তিনি আর মুক্তিযোদ্ধা থাকেন কি করে? এর মানে হচ্ছে, ভুল কাজ করে আপনি আজীবন চলতে পারেন না। আজকাল অনেকে বলেন, জঙ্গী, শিবির, মৌলবাদী সংগঠনের যুদ্ধাংদেহী গ্রুপ এদের অনেকেরই জন্ম সাম্প্রতিককালে। এমন অনেক সংগঠনের জন্ম আবার ’৭৫-এর পরে। তাহলে এদের আমরা কেন রাজাকার বলব? মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজাকার চেতনাগত বিষয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালিত্বকে স্বীকার করে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, তারা যদি এখন তা অস্বীকার করেন তাহলে তারা আর মুক্তিযোদ্ধা থাকতে পারেন না। যার নেতৃত্বে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করলাম, আবার তারই হত্যাকারীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে কথা বলি, আবার অব্যাহতভাবে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করি তাহলে এর চেয়ে হটকারী এবং অপমানজনক আর কিছু হতে পারে না। তবে বঙ্গবন্ধু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন, তাদের রাজনীতি করা নিষিদ্ধ করে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানÑ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ে যার ভূমিকা এখন স্পষ্ট, ক্ষমতায় এসে আবার স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিতে বৈধতা দেয়। তথাকথিত ইসলামিক দলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে। চাপাতি-নির্ভর ইসলামিক জঙ্গী সংগঠন, ’৭১ এর স্বাধীনতাবিরোধীদের আলাদা করে দেখার কোন সুযোগ নেই। এদের মাঝে এক ধরনের যোগসূত্র রয়েছে। এরা ওই ছয় দফার বিরোধী ২৪ শতাংশের অংশ। ঠিক এরাই রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং পহেলা বৈশাখের বিরোধিতা করেছিল। এমনকি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেরও বিরোধিতা করেছিল। ১৯৪৮ সালের ৮ আগস্ট পাকিস্তান শাসনতন্ত্র পরিষদের মিটিংয়ে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় কেবল কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছাড়া পূর্ব বাংলার প্রতিনিধিরা উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার পক্ষে মত দিয়েছিল। কাজেই চাপাতি মতবাদের উৎপত্তি বর্তমানের আদলে দেখলে হবে না। তাদের উৎপত্তি ভাষা আন্দোলন থেকেই। যা কিছু আমাদের জন্য ভাল এবং মঙ্গলজনক, তার সবকিছুর বিরোধিতা করতে করতে তারা এত দূর এসেছে। বিষয়গুলো চিন্তা করলে রাজাকারদের সংখ্যা বাড়া নিয়ে আশ্চর্য হওয়ার কোন কারণ নেই। অব্যাহতভাবে এদের দমন করার জন্য আইনী ও পুলিশী ব্যবস্থা যেমন থাকবে, তেমনি দরকার এক ধরনের সামাজিক আন্দোলন। তাদের উৎপত্তি ইতিহাস বলে তাদের বিরুদ্ধে সবাইকে দাঁড় করাতে হবে। কেবল র‌্যাব-পুলিশ দিয়ে এ অপশক্তি দূর করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু অনেক দূরদর্শী নেতা ছিলেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী আমলের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল ধর্মীয় মৌলবাদ সৃষ্টির উর্বরভূমি। আর পাকিস্তান আমলে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ছিল ভারত বিরোধিতা এবং ইসলামের নামে শাসন ও শোষণের সকল উপকরণ। বঙ্গবন্ধু প্রথমেই একটি বিজ্ঞানমনস্ক জাতি তৈরিতে মনোযোগ দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের ধর্মীয় উন্মাদনা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরুতেই তিনি কুদরত-ই-খোদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। যাতে আমরা একটি বিজ্ঞানমনস্ক জাতিতে রূপান্তরিত হই। এখন আমরা অনেক কথাই বলি, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকনির্দেশনা কিন্তু বঙ্গবন্ধুই দিয়ে গেছেন। কুদরত-ই-খোদা শিক্ষা কমিশনে শিক্ষাকে একমুখীকরণসহ অনেক বিষয়ই ছিল। মানবিকতাকে বিকশিত করার সামাজিক শিক্ষা যদি আমরা সন্তানদের দিতে না পারি, তাহলে কোনভাবেই জঙ্গীবাদের ভয়াবহতা মোকাবেলা করতে পারব না।


অপশক্তির সঙ্গে অর্থনীতি জড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক শক্তি এ গোষ্ঠীর চালিকাশক্তি হিসেবে ইন্ধন জোগায়। রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধী বা যুদ্ধাপরাধী যাই বলি না কেন, তাদের দখলে রাষ্ট্রের অর্থনীতির বিরাট এক অংশ চলে গেছে। কাজেই অর্থনীতি এবং সামাজিক ক্ষেত্রে আমাদের আরও জোর দিতে হবে। প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের রাজাকার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
আমাদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে ধাবিত হতে হবে, যা বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে শুরু করেছিলেন। পাকিস্তান এবং তাদের দোসররা কেবল ১৫ আগস্ট ঘটিয়ে চলে গেছে তাই নয়। ১৫ আগস্টের পর গণতন্ত্রকে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী করে গিয়েছিল। ক্যান্টনমেন্টেই আমাদের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী থাকতেন, এমনকি বেসামরিক তথাকথিত গণতন্ত্রের লেবাসেও। ক্যান্টনমেন্ট ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর ঠিকানাই ছিল ক্যান্টনমেন্ট। ফলে পাকিস্তান ক্যান্টনমেন্টভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে এ দেশের রাজনীতিতে ১৫ আগস্টের মতো ঘটনা বারবার ঘটানোর চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকবে কিনা? সম্পর্ক আমরা কোন পর্যায়ে রাখব? এসব বিষয়ে যথেষ্ট চিন্তা সাপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাকিস্তানীরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। সংসদে প্রস্তাব পাস করেছে। তাদের সঙ্গে আমাদের সামান্য কিছু বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। কিছু ব্যবসায়ী ব্যবসা করছে। আবার সার্ক ও ওআইসিসহ কিছু আন্তর্জাতিক ফোরামে তাদের সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। তবে পাকিস্তানী দূতাবাস এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকা- নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখতেই হবে। কারণ পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ক্ষমতার পালাবদল তথা জুডিসিয়াল ক্যু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সেই ভারত বিরোধিতা এবং ক্যান্টনমেন্টের শক্তির ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। তারা এ ষড়যন্ত্র কেবল পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না, বাংলাদেশেও রফতানি করার চেষ্টা করবে।
লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
শোকের মাস আগস্ট। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার বাংলাদেশের স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মার প্রতি জাতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। সেদিনের শাহাদাতবরণকারী সকলের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা নিছক কোন সাধারণ হত্যাকা- ছিল না। এদিন কেবল জাতির পিতাকে হত্যা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করাই মূল উদ্দেশ্য ছিল না। সেদিন তিনটি হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছিল। এক. বঙ্গবন্ধু, দুই. বাংলাদেশ এবং তিন. বাঙালিত্ব। আমরা অনেক সময় দাবি করি, এ অঞ্চলের মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিল। আমাদের এ ভূ-খ- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু ইতিহাস ঠিক তেমনটি বলে না। এক সময় আমরা হয়তো অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলাম। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের শেষের দিকে এসে সেই চেতনার বিলুপ্তি ঘটে। কেননা সাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতেই ভারত উপমহাদেশ ভাগ হয়ে যায়। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে হিন্দু এবং মুসলমান নামে দুটি ভিন্ন জাতির জন্য দুটি কৃত্রিম রাষ্ট্র তৈরি করা হয়। অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক চেতনার বদ্ধমূল ধারণা থেকেই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির জন্ম। আর অন্য সাম্প্রদায়িক অনুষঙ্গের উপস্থিতির কথা বাদই থাক। দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি পুরোটাই সাম্প্রদায়িকতায় ভরপুর ছিল। তারা ইসলামের নামে বিভিন্ন নির্যাতন ও শোষণে লিপ্ত ছিল। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা কুক্ষিগত করে মানুষকে নিপীড়ন করার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আর একটি রাষ্ট্র ভারত। মোটকথা ইসলামের অপব্যবহার আর ভারতের বিরোধিতা করাই ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ। শোষণ আর নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে আমাদের এ অঞ্চলের মানুষ জাতির পিতার নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুরু থেকেই অনুমান করেছিলেন, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে বাঙালিত্ব চেতনা বিকশিত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। তখন থেকেই শুরু হয় আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মালিক হই। কিন্তু দেখা গেল, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে কেবল রাষ্ট্রনায়ক অথবা স্বাধীনতার স্থপতিকে হত্যা করা হলো তা নয়, ইতিহাসের কলঙ্কময় এ হত্যাকা-ের মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশকে ফের পূর্ব পাকিস্তানে রূপান্তর করা হয়। সব ধরনের মৌলবাদী চিন্তা-চেতনার অনুষঙ্গ ফিরে আসে। বাংলাদেশকে আবার পূর্ব পাকিস্তান বানিয়ে উল্টোপথে যাত্রা শুরু হয়। এতে করে আমরা আবার আমাদের বাঙালিত্বকে হারিয়ে ফেলি। বাঙালিত্ব এবং বাঙালিত্বের অনুষঙ্গের ওপর শুরু হয় একের পর এক আক্রমণ। অর্থাৎ বাঙালিত্বের বিপরীতে ধর্মীয় মৌলবাদী চেতনার বিকাশের সব ধরনের আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা অকল্পনীয় ছিল। বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় কখনও আসেনি যে, বাঙালীরা ষড়যন্ত্র করে তাকে হত্যা করতে পারে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বিষয়ে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য তার কাছে ঠিক মতো পৌঁছে ছিল কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অনিশ্চিত এ কারণেই যে, মিলিটারি ব্যুরোক্রেসিসহ যারা গোয়েন্দা সংস্থায় থাকেন, তারা তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এক ধরনের বাধার সৃষ্টি করেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধে ১০০ জনের কম বাঙালী সেনাবাহিনীর অফিসার পদে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেছিল এক হাজার জনের মতো অফিসার। আমি বলব না যে, যারা পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেছিলেন তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিলেন। পাকিস্তানে যারা অবস্থান করছিলেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রশিক্ষণ ছিল অন্য রকমের। যুদ্ধের সময় তারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং ৯ মাসের যুদ্ধের নৃশংসতা দেখেননি। স্বাধীন দেশের শুরুতেই সামরিক এবং আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে, সামরিক বাহিনীর কয়েকজন বাঙালী অফিসার, সম্ভবত সাতজন, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেছিল, যারা বাংলাদেশের বিপক্ষে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। যেসব পাকিস্তানী সামরিক অফিসার আত্মসমর্পণ করেছিল, তাদের মধ্যে ওই সাত বাঙালী সামরিক অফিসার ছিল। চাকরি চলে যাওয়ায় না খেয়ে মরতে বসেছে বলে জেনারেল ওসমানী তাদের বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে জানানো হয়, তারা পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করে আত্মসমর্পণ করেছে। তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এদের আর্মিতে নিয়েছিল কে? এরা তো পুলিশ হওয়ারও উপযুক্ত না।’ বঙ্গবন্ধুর অনুকম্পায় তাদের পুলিশে রূপান্তর করা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে এরাই ডিআইজি পর্যন্ত হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রামে শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার সময় ২৭ জন আওয়ামী লীগ কর্মী জীবন দিয়েছিল, ওই হত্যাকা-ের অর্ডার দিয়েছিল ওই ঘরানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা। আমাদের মনে রাখতে হবে ১৯৭০ সালে যখন প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন হয় তখনও সুস্পষ্টভাবে স্বাধীনতার কথা আসেনি। কেবল ছয় দফা উত্থাপিত হয়। কারণ, বঙ্গবন্ধু মনে করতেন ছয় দফা বাস্তবায়িত হলেই আমরা স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাব। সেই ১৯৭০-এর নির্বাচনেও প্রায় ২৪ শতাংশ মানুষ ছয় দফার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। স্বাধীনতা তো দূরের কথা, ছয় দফার বিরুদ্ধেই ছিল ২৪ শতাংশ মানুষ। এ লোকগুলো কোথায় গেল? এ লোকগুলোর পরাজয়ের গ্লানি এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয় পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র, সামরিক এবং বেসামরিক ষড়যন্ত্রকারী চক্র। ফলে বঙ্গবন্ধুর প্রশাসন এবং সরকারকে অকার্যকর করা, জনপ্রিয়তা হ্রাস করাসহ সব জায়গা থেকে সব ধরনের ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল। আজকে আমেরিকা আমাদের উন্নয়ন সহযোগী এবং চীন আমাদের অন্যতম বন্ধু রাষ্ট্র। মনে রাখতে হবে, আমাদের স্বাধীনতার শেষ মুহূর্তে এসে যখন জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটাভুটি হয়, তখন সোভিয়েত বলয়ের মাত্র কয়েকটি রাষ্ট্র আমাদের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। জাতিসংঘের অনেক রাষ্ট্র, যাদের আমরা ইসলামী রাষ্ট্র এবং বৃহৎ শক্তি বলি তারা কিন্তু আমাদের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল। কাজেই সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টি কেবল পাকিস্তানের পরাজয়ই ছিল না, ওই সকল বৃহৎ শক্তিরও পরাজয় ছিল। ১৯৭৫ সালে সারাবিশ্বে ভিন্ন অবস্থা বিরাজ করে। সামরিক শক্তি হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন, পুঁজিবাদের দেশ আমেরিকা এবং কমিউনিজম দেশ চীন এ বিষয়গুলো এক একটি ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্ব নেতা যেমনÑ ফিদেল কাস্ট্রো, মার্শাল টিটো, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়গুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। অর্থাৎ সব ঘটনার সম্মিলিত ফলাফলই ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা। এর মধ্য দিয়ে পরাজিত শক্তি এবং তাদের দোসরদের আক্রোশ মিটে। আজকে আমরা যাদের বন্ধু রাষ্ট্র বা উন্নয়ন সহযোগী বলি তাদেরও কিন্তু আক্রোশ ছিল। হেনরি কিসিঞ্জারের বক্তব্যগুলো এবং পরবর্তীকালে তাদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেবল পাকিস্তানই যে পরাজিত শক্তি তা নয়, অন্যরাও পরাজয় মেনে নিতে পারেনি। তারা শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রকে সমর্থন করেছিল এবং যুদ্ধে অংশীদারিত্ব ছিল। এর সঙ্গে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবির রাজাকারদের ষড়যন্ত্র তো ছিলই।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা কি আজীবন মুক্তিযোদ্ধা থাকেন? রাজাকার সারাজীবনের জন্য রাজাকার কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা আজীবনের জন্য মুক্তিযোদ্ধা নাও হতে পারেন। ড. হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ‘১৯৭১ সালেও আমি এত রাজাকার দেখিনি। যা এখন দেখি।’ অর্থাৎ রাজাকারদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, তারা আজীবন যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ না করে এবং একপর্যায়ে বলেই ফেলেন মুক্তিযুদ্ধ করাটাই ভুল ছিল। তাহলে তিনি আর মুক্তিযোদ্ধা থাকেন কি করে? এর মানে হচ্ছে, ভুল কাজ করে আপনি আজীবন চলতে পারেন না। আজকাল অনেকে বলেন, জঙ্গী, শিবির, মৌলবাদী সংগঠনের যুদ্ধাংদেহী গ্রুপ এদের অনেকেরই জন্ম সাম্প্রতিককালে। এমন অনেক সংগঠনের জন্ম আবার ’৭৫-এর পরে। তাহলে এদের আমরা কেন রাজাকার বলব? মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজাকার চেতনাগত বিষয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালিত্বকে স্বীকার করে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, তারা যদি এখন তা অস্বীকার করেন তাহলে তারা আর মুক্তিযোদ্ধা থাকতে পারেন না। যার নেতৃত্বে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করলাম, আবার তারই হত্যাকারীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে কথা বলি, আবার অব্যাহতভাবে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করি তাহলে এর চেয়ে হটকারী এবং অপমানজনক আর কিছু হতে পারে না। তবে বঙ্গবন্ধু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন, তাদের রাজনীতি করা নিষিদ্ধ করে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানÑ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ে যার ভূমিকা এখন স্পষ্ট, ক্ষমতায় এসে আবার স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিতে বৈধতা দেয়। তথাকথিত ইসলামিক দলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে। চাপাতি-নির্ভর ইসলামিক জঙ্গী সংগঠন, ’৭১ এর স্বাধীনতাবিরোধীদের আলাদা করে দেখার কোন সুযোগ নেই। এদের মাঝে এক ধরনের যোগসূত্র রয়েছে। এরা ওই ছয় দফার বিরোধী ২৪ শতাংশের অংশ। ঠিক এরাই রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং পহেলা বৈশাখের বিরোধিতা করেছিল। এমনকি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেরও বিরোধিতা করেছিল। ১৯৪৮ সালের ৮ আগস্ট পাকিস্তান শাসনতন্ত্র পরিষদের মিটিংয়ে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় কেবল কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছাড়া পূর্ব বাংলার প্রতিনিধিরা উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার পক্ষে মত দিয়েছিল। কাজেই চাপাতি মতবাদের উৎপত্তি বর্তমানের আদলে দেখলে হবে না। তাদের উৎপত্তি ভাষা আন্দোলন থেকেই। যা কিছু আমাদের জন্য ভাল এবং মঙ্গলজনক, তার সবকিছুর বিরোধিতা করতে করতে তারা এত দূর এসেছে। বিষয়গুলো চিন্তা করলে রাজাকারদের সংখ্যা বাড়া নিয়ে আশ্চর্য হওয়ার কোন কারণ নেই। অব্যাহতভাবে এদের দমন করার জন্য আইনী ও পুলিশী ব্যবস্থা যেমন থাকবে, তেমনি দরকার এক ধরনের সামাজিক আন্দোলন। তাদের উৎপত্তি ইতিহাস বলে তাদের বিরুদ্ধে সবাইকে দাঁড় করাতে হবে। কেবল র‌্যাব-পুলিশ দিয়ে এ অপশক্তি দূর করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু অনেক দূরদর্শী নেতা ছিলেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী আমলের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল ধর্মীয় মৌলবাদ সৃষ্টির উর্বরভূমি। আর পাকিস্তান আমলে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ছিল ভারত বিরোধিতা এবং ইসলামের নামে শাসন ও শোষণের সকল উপকরণ। বঙ্গবন্ধু প্রথমেই একটি বিজ্ঞানমনস্ক জাতি তৈরিতে মনোযোগ দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের ধর্মীয় উন্মাদনা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরুতেই তিনি কুদরত-ই-খোদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। যাতে আমরা একটি বিজ্ঞানমনস্ক জাতিতে রূপান্তরিত হই। এখন আমরা অনেক কথাই বলি, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকনির্দেশনা কিন্তু বঙ্গবন্ধুই দিয়ে গেছেন। কুদরত-ই-খোদা শিক্ষা কমিশনে শিক্ষাকে একমুখীকরণসহ অনেক বিষয়ই ছিল। মানবিকতাকে বিকশিত করার সামাজিক শিক্ষা যদি আমরা সন্তানদের দিতে না পারি, তাহলে কোনভাবেই জঙ্গীবাদের ভয়াবহতা মোকাবেলা করতে পারব না।
অপশক্তির সঙ্গে অর্থনীতি জড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক শক্তি এ গোষ্ঠীর চালিকাশক্তি হিসেবে ইন্ধন জোগায়। রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধী বা যুদ্ধাপরাধী যাই বলি না কেন, তাদের দখলে রাষ্ট্রের অর্থনীতির বিরাট এক অংশ চলে গেছে। কাজেই অর্থনীতি এবং সামাজিক ক্ষেত্রে আমাদের আরও জোর দিতে হবে। প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের রাজাকার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
আমাদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে ধাবিত হতে হবে, যা বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে শুরু করেছিলেন। পাকিস্তান এবং তাদের দোসররা কেবল ১৫ আগস্ট ঘটিয়ে চলে গেছে তাই নয়। ১৫ আগস্টের পর গণতন্ত্রকে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী করে গিয়েছিল। ক্যান্টনমেন্টেই আমাদের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী থাকতেন, এমনকি বেসামরিক তথাকথিত গণতন্ত্রের লেবাসেও। ক্যান্টনমেন্ট ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর ঠিকানাই ছিল ক্যান্টনমেন্ট। ফলে পাকিস্তান ক্যান্টনমেন্টভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে এ দেশের রাজনীতিতে ১৫ আগস্টের মতো ঘটনা বারবার ঘটানোর চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকবে কিনা? সম্পর্ক আমরা কোন পর্যায়ে রাখব? এসব বিষয়ে যথেষ্ট চিন্তা সাপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাকিস্তানীরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। সংসদে প্রস্তাব পাস করেছে। তাদের সঙ্গে আমাদের সামান্য কিছু বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। কিছু ব্যবসায়ী ব্যবসা করছে। আবার সার্ক ও ওআইসিসহ কিছু আন্তর্জাতিক ফোরামে তাদের সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। তবে পাকিস্তানী দূতাবাস এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকা- নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখতেই হবে। কারণ পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ক্ষমতার পালাবদল তথা জুডিসিয়াল ক্যু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সেই ভারত বিরোধিতা এবং ক্যান্টনমেন্টের শক্তির ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। তারা এ ষড়যন্ত্র কেবল পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না, বাংলাদেশেও রফতানি করার চেষ্টা করবে।


শেখ কামাল হোক প্রজন্মের প্রেরণার শিক্ষক

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট ২০১৭

altমুক্তিযুদ্ধের অবিসংবিদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবনের প্রতিটি পরতে এবং বাংলাদেশ প্রাপ্তিতে তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্যের যে অসামান্য অবদান এবং ত্যাগ রয়েছে, তা আমরা ভুলে যাচ্ছি একটু একটু করে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই মাপের নেতা এবং জাদুকর, যার দেখানো পথে লাখো লাখো বাঙালী যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল।শুধু তাই নয় জাতির পিতার বড় দুই ছেলে, শেখ কামাল ও শেখ জামালও সেই যুদ্ধের অগ্রসেনানী ছিলেন। তাদের বিরত্বের কথা এবং তাদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা খুব কমই আলোচনা দেখতে পাই। ইতিহাস বিকৃতিকারীরা সুকৌশলে যুব সমাজের যারা আইকন হতে পারতেন, তাদের কথা আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে যুগের পর যুগ ধরে, নানা অপকৌশল খাটিয়ে।আমাদের তরুণরা বিদেশি তরুণদের বীরত্বের কথা জানে কিন্তু নিজের দেশের রত্নদের বীরত্বের কথা জানা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। বঙ্গবন্ধুর পরিবার নিয়ে মিথ্যাচারের যে বেসাতি প্রচলিত আছে, তার মধ্যে অন্যতম একটি যে, তাঁর পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি, এবং তারা ভারতে পালিয়ে ছিলেন ইত্যাদি।

আজ ৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের জন্মদিন। এই দিনটিকে অগ্রগণ্য করে জেনে নেওয়া যাক বাংলার ঝরে যাওয়া এক অসামান্য নক্ষত্র শেখ কামালের কিছু জীবনগাঁথা। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ সহ সার্বিক ক্ষেত্রে তিনি যে অসামান্য অবদান রেখে গিয়েছেন, তার কিছু ঐতিহাসিক সংক্ষিপ্ত ধারাবর্ণনা।

শেখ কামাল ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বড় বোন শেখ হাসিনার পরেই বাবা মার কোল আলোকিত করে এসেছিলেন তিনি এই ধরার বুকে! পড়াশোনায় দারুন মনোযোগী ও মেধাবী শেখ কামাল শাহীন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছিলেন। এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ণরত অবস্থায়ই মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আত্মগোপণ করতে সক্ষম হলেও বঙ্গবন্ধুর পরিবারের বাকি সদস্যরা গ্রেফতার হয়েছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে।

পাকিস্তান সরকারের তৎকালীন গণপরিষদ নেতা ইলিয়াস চৌধুরী এবং তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা শহিদুল ইসলামের সাথে মে মাসের প্রথম দিকে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি থানা হয়ে মুকসুদপুর দিয়ে যশোর সীমান্ত পার হয়ে ভারতে গমন করেন। ভারতের বেলুনিয়া থেকে সেনাবাহিনীর প্রথম যে ব্যাচটি কমিশন্ড লাভ করেছিল, তার একজন সফল অগ্রসেনানী হিসেবে শেখ কামাল কৃতকার্য হয়েছিলেন। সেই অর্থে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর প্রথম ব্যাচের পাসকৃত ক্যাডেটদের মধ্যে অন্যতম একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেনাসদস্য ছাড়াও তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রধানসেনা অধিনায়ক এজিএম ওসমানীর এডিসি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেছিলেন এবং পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নে ফিরে এসেছিলেন এবং অত্যন্ত সফলতার সাথে  সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছিলেন।

বহুমুখী প্রতিভার সমন্বয় ঘটা একজন ব্যক্তিত্ব বলতে যা বুঝানো হয়, শেখ কামাল ছিলেন সেধরনের একজন মানুষ, যিনি তার উজ্জল ও প্রদীপ্ত মেধার আলোয় উদ্ভাসিত ছিলেন। যুদ্ধফেরত একজন শেখ কামাল যে শুধু পড়াশুনায় তুখড় ছিলেন তা নয়; একই সাথে তিনি অসাধারণ সেতার বাজিয়ে ছিলেন। ছায়ানট বিদ্যায়তনে সেতারের তামিল নিয়েছিলেন সফলতার সাথে। সবকিছু ছাড়িয়ে তিনি সর্বোচ্চ মনযোগী ছিলেন খেলাধুলায়। তার সমসাময়িককালে তার মতো এত বড় এবং উচ্চতার ক্রিয়াসংগঠক বাংলাদেশের ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি জন্ম নেয়নি। ঐতিহ্যবাহী আবাহনী ফুটবল ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বাংলাদেশের ফুটবলের যে মানোন্নয়ন তিনি করে গিয়েছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ায় সম্মানজনক জায়গা দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছে। সেই অর্থে স্বাধীন বাংলাদেশের ফুটবল এবং আবহানী ক্লাবকে আলাদা করে ভাবার কোনও যৌক্তিক কারণ নেই। ক্রীড়ামোদী শেখ কামাল আজো বেঁচে আছেন আবাহনী ক্রীড়া চক্রের প্রতিটা ধুলিকণার সাথে এবং সেই সাথে বাংলাদেশের প্রতিটি ক্রীড়াপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে। শুধুমাত্র ফুটবলেই তার কর্মযজ্ঞ সীমাবদ্ধ ছিল না। একাধারে ক্রিকেট, হকি, ভলিবল সহ প্রায় সব খেলায়ই তার দারুন ঝোঁক আর আগ্রহ ছিল।

স্কুলজীবন থেকেই নিয়মিত ক্রিকেট খেলায় অংশ নিয়ে যথেষ্ঠ সুনাম কুড়িয়েছিলেন তিনি। প্রথম বিভাগে জাতীয় ক্রিকেট টুর্নামেন্টে খেলেছেন আজাদ বয়েজ ক্লাবের পক্ষ হয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত অবস্থায় ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি তিনি নিয়মিত খেলাধুলায় আত্মনিয়োগ করেছেন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বাস্কেটবল দলের অধিনায়ক হিসেবে যে অসামান্য নৈপুণ্য তিনি দেখিয়েছিলেন,  সেই তথ্য হয়তো সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের অনেক ছাত্রই আজ জানে না।

খেলাধুলার পাশাপাশি তিনি সংস্কৃতি চর্চায়ও ছিলেন পুরোধা। তার নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী’ ছিল তখনকার সময়ে বাঙালি সমাজের অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও সুস্থ্য সংস্কৃতিচর্চার সুতিকাগার। তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যে স্পন্দন তিনি রেখে গিয়েছিলেন, তা হতে পারত আধুনিক তরুণ সমাজের প্রেরণার উৎস। মঞ্চ নাটকেও তিনি তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছিলেন। ‘নাট্যচক্র’ নামে নাট্যগোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক ছিলেন তিনি। নাট্যচক্রের হয়ে দেশে-বিদেশে মঞ্চ নাটকে তিনি নিজের উদ্ভাসিত প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে গিয়েছিলেন। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হয়েও সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপণ করেছেন। একজন তুখোড় ছাত্রনেতা ও ক্ষমতাধর রাজনীতির খুব কাছের মানুষ হয়েও তিনি কোনোদিন প্রধানমন্ত্রী বাবার প্রভাব খাটাননি। রাজনৈতিক শিষ্টাচার চর্চায় তিনি থেকেছেন আরো দশটা সাধারণ কর্মীর মতোই।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময় তখন, ছাত্রলীগ তার অন্যতম গৌরবময় সময় অতিবাহিত করছে যা ছিল সবচেয়ে দাপুটে সংগঠন তখন বাংলাদেশের। তৎকালীন সময়ের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা চাইতেন শেখ কামাল ছাত্রলীগের সর্বাগ্রে থাকুক এবং নেতৃত্ব দিক। কিন্তু তাতে রাজী হননি তিনি। তিনি পছন্দ করতেন নিজে পেছনে থেকে সবাইকে সামনে এগিয়ে দিতে। তার উৎসাহ ও পরামর্শে তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের যে উৎসাহ ছিল, তা স্মরণকালের স্বর্ণাক্ষরেই লেখা থাকবে। কর্মীদের মনোবল বাড়াতে এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে শুধু নামমাত্র কেন্দ্রীয় কমিটির পদে থেকেছেন; তবে দলের শীর্ষপদ নিতে সব সময়ই নারাজি ছিলেন। তিনি জাতীয় ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্ত থেকে তার রাজনীতির সঙ্গবদ্ধতা চালিয়ে গিয়েছিলেন।

শেখ কামাল ছিলেন একজন আড্ডাপ্রিয় মানুষ। ক্যাম্পাসের সব আড্ডার মধ্যমণি হিসেবে তিনি ছিলেন সবার প্রিয় একজন মানুষ।

খ্যাতিমান তারকা ডলি জহুর তার এক স্মৃতিচারণে শেখ কামালের তার নাট্যচক্রের নিয়ে আসার কথা উল্লেখ করেন এবং তার মতো বিনয়ী এবং বহুমুখী প্রতিভার একজন মানুষকে নিয়ে যে নানান রকম মিথ্যাচার করা হয়েছে সেই বিষয়ে আক্ষেপ করেন!

বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের আজ ৬৮ তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হওয়ার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। ২৬ বছর বয়সেই তিনি বাংলাদেশের ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গন যেভাবে সংগঠিত করেছিলেন সেটা শুধুমাত্র বাংলাদেশে নয় পৃথিবীতেই খুব বিরল। তবে পরিতাপের বিষয় যে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের প্রত্যেকেরই বাংলাদেশ গঠনের পেছনে যে ঘাম, পরিশ্রম, ভালোবাসা, ত্যাগ রয়েছে সেটা আমরা খুব কম মানুষই জানি। আগস্ট যায়, আগস্ট আসে কিন্তু গুগল সার্চ ইঞ্জিনে শুধুমাত্র শেখ কামালকে নিয়ে অপপ্রচার আর মিথ্যাচারই থেকে যায়। তরুণ প্রজন্মের জন্য যে মানুষটি আইকন হতে পারতো, হতে পারতো আলোকবর্তিকা তার সবটাই আজ স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের মিথ্যাচারে নিভু নিভু। এখন সময় এসেছে এইসব মিথ্যাচারের সমুচিত জবাব দেওয়ার এবং তার পরিবারের প্রতিটি সদস্যের বীরত্বগাথা প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার। আজ এই দিনে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি শেখ কামাল আপনাকে। ভালো থাকুন ওপারে; আমাদের ক্ষমা করবেন আমরা আপনার রক্তের দাগের মাধ্যমে যে কলঙ্ক লেপন হয়েছে বাংলায় তা পুরোপুরি মুছতে পারিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সাথে চিরতরে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার আলোকে। তার জীবদ্দশায় যে কীর্তি তিনি রেখে গিয়েছিলেন, সঠিক ইতিহাসের পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মের সামনে তা উন্মোচিত হলে শেখ কামাল আজো হয়ে উঠবেন তরুণ সমাজের ‘প্রতীকী নেতা’, যাকে অণুসরন করে উন্নয়নের অগ্রগতিতে এগিয়ে যাবে তরুণ সমাজ। বাংলাদেশ সরকার তথা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে এই ক্ষণজন্মা নেতার জীবন উন্মোচিত করা হোক প্রজণ্মের প্রেরণার শিক্ষক হিসেবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তরে বেঁচে থাকুন শেখ কামাল আমাদের নেতা হিসেবে!

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা


ভারতের সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে ধোলাই।আবু জাফর মাহমুদ।

শুক্রবার, ১১ আগস্ট ২০১৭

ভারতের সংসদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পররাষ্ট্র নীতির তীব্র সমালোচনা করল প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। ৩জুলাই বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায়  কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা আনন্দ শর্মা ভারতের প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কথা উত্থাপন করেন।আনন্দ শর্মা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্রেডিট নেয়া প্রসঙ্গে বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমেরিকায় যাওয়ার পর বলেন, ভারতের ক্ষমতার সামনে বিশ্ব মাথা নত করেছে। বিশ্ব ভারতের ক্ষমতাকে মেনে নিয়েছে, তাকে স্বীকার করে নিয়েছে।আনন্দ শর্মা বলেন, ‘ ভারতের শক্তিকে তো বিশ্ব মেনে নিয়েছে কিন্তু পাকিস্তান মানছে না। সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের পর অনেক ঘটনা ঘটেছে যা বন্ধ হচ্ছে না। ১৯৭১ সালে সেনাবাহিনী বড় জয় পেয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী   নরেন্দ্র মোদীর মতো এ ধরণের কোনো বিবৃতি দেননি।’
তিনি বলেন,‘পাকিস্তান ইস্যুতে সরকারের নীতি স্পষ্ট নয়। প্রথমে আলোচনার কথা বলা হল কিন্তু একবারেই তা শেষ করে দেয়া হলো। এমন কী হয়েছিল যে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আফগানিস্তান সফর থেকে ফেরার সময় লাহোরে চলে যেতে হয়েছিল? প্রধানমন্ত্রী যখন পাকিস্তানের মাটিতে পা রাখেন, তখন তিনি সালামি বা গার্ড অব অনার পাননি বরং উপহারস্বরূপ সন্ত্রাসী হামলা পেয়েছেন।’ তিনি বলেন, ৬৫ বার বিদেশ সফর করে কী ফল পাওয়া গেছে,সংসদে প্রধানমন্ত্রীর তা জানানো উচিত।
আনন্দ শর্মা বলেন, ‘ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার দাবি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ভারতকে এধরণের দাবি করা উচিত নয়।  আমরা পাকিস্তানকে একঘরে করে দিয়েছি বলে প্রাচার করা হচ্ছে। এ ধরণের কথাই বা কেন বলা হচ্ছে? একটি দায়িত্বশীল দেশ এধরণের বিবৃতি দেয় না। পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে কী ভালো সম্পর্ক নেই? পাকিস্তান কী বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সেনাবাহিনীর মহড়া  চালায় নি?’আনন্দ শর্মা বলেন, ‘প্রতিবেশি নেপালের সঙ্গে আমদের সম্পর্ক বেশ জটিল। সেখানকার সমস্যা বোঝা প্রয়োজন। আমাদের এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়। নেপালের সঙ্গে আমাদের পদক্ষেপ বড়ভাইয়ের মতো হওয়া উচিত নয়।’
শ্রীলংকার সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার তাদের ঠিকভাবে হ্যান্ডেল করতে পারছে না। আনন্দ শর্মা বলেন, চীন পাকিস্তানে বন্দর তৈরি করছে, মালদ্বীপ হাতের বাইরে চলে গেছে। আমরা তাদের সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারছি না।আনন্দ শর্মা বলেন, ‘দোকালাম ইস্যুতে চীনের অবস্থান খুব আক্রমণাত্মক ও তাদের বিবৃতি খুব উদ্বেগের। চীনা প্রেসিডেন্ট দু’বার ওই ইস্যুতে বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু ভারতের জবাব কী?’ প্রধানমন্ত্রী ওই ইস্যুতে চুপ থাকতে পারেন না বলেও আনন্দ শর্মা মন্তব্য করেন।
চীনা দাঁতে দাঁত ঘষছে।   
সীমান্ত থেকে সেনা প্রত্যাহার না করলে মারাত্মক পরিণতি বরণ করতে হবে বলে ভারতকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে চীন। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৩ অগাষ্ট বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, সীমান্তে ভারতীয় সেনা সমাবেশ অবশ্যই শান্তির জন্য নয়। যদি তারা শান্তি চায় তাহলে শিগগিরি এসব সেনা সরিয়ে নিত হবে।চীনের ডেপুটি চিফ অব মিশন লিউ জিনসং বলেছেন, “তৃতীয় পক্ষ ভুটানের নিরাপত্তার অজুহাত তুলে ভারতীয় সেনাদের সীমানা রেখা পার হওয়া বেআইনি।”
এর আগে, গত মাসে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ভারতকে কোনো রকম মোহাচ্ছন্ন না হওয়ার জন্য হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র উ কিয়ান ২৪ জুলাই এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভারতকে উদ্দেশ করে বলেন, নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করবেন না এবং কোনো অলীক স্বপ্নের পেছনে ছুটবেন না। চীনা গণমাধ্যমও সতর্ক করে বলেছে, বাড়াবড়ি করলে ভারতকে ১৯৬২ সালের চেয়ে খারাপ পরাজয়ের মুখ দেখতে হবে।
বিতর্কিত সীমান্তে অবৈধভাবে চীনের সেনা প্রবেশের বিষয়ে অজুহাত তৈরির জন্য ভারতকে অভিযুক্ত করেছে চীন। দেশটি বলেছে, ভারতের এ মিথ্যা অজুহাতের পরও বেইজিং অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “ভারতের সেনারা এখনো চীনের ভূখণ্ডে রয়েছে। চীন ধৈর্য ধরলেও এসব সেনাকে দ্রুত সরিয়ে নেয়ার দাবি করে আসছে। কিন্তু ভারত তার ভুল সংশোধন করার জন্য সত্যিকার অর্থে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয় নি বরং সেনা মোতায়েন রাখার পক্ষে নানা ধরনের মিথ্যা অজুহাত তৈরি করছে।”
চীনা বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ভারতের এসব তৎপরতার মাধ্যমে শুধুমাত্র চীনের সীমানা লঙ্ঘনই হচ্ছে না বরং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক স্বাভাবিক আইন-শঙ্খলাও লঙ্ঘিত হচ্ছে।গত জুন মাসে  ভারত, চীন ও ভুটান সীমান্তের দোকালাম মালভূমিতে চীনের সেনারা একটি রাস্তা তৈরি করতে গেলে বাধা দেয় ভারত। ওই ঘটনার পর থেকে সেখানে দু দেশের মধ্যে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। দু পক্ষই পরস্পরকে যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে। 


The Road and A Student

শুক্রবার, ১১ আগস্ট ২০১৭

Literature #
I would not be
A teacher.
I would remain as a student
Of Literature.
No lecture.
No torture.
I am not a teacher
I am a student
Of Literature.
#notU

2.
পথ #
মাটির দিকে চোখ
হেটে যাচ্ছিলাম দুরে
কুড়িয়ে নিলাম একটা দুটা
সবকটা পাথেয়
হেটে যাবো দুরে
মেপল বার্চ আর ওক গাছের
ছায়ায় শক্ত রাজপথে ধুলা আর পাথরের
কার্পেটে মোড়ানো সোনালী স্বপ্নের কাধে
ভর করে দুরে আরো দুরে
পথের দিকে চোখ রেখে
শেষ হলো পথ |


জন্মদিন স্মৃতিতে ভাস্বর কামাল ভাই

শনিবার, ০৫ আগস্ট ২০১৭

কামাল ভাই। আমাদের কামাল ভাই। সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রাণবন্ত কামাল ভাই। একদিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, আবার অন্যদিকে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে ভরপুর কামাল ভাই। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, ইতিহাসের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ত যে দেহে প্রবাহিত, সেই দেহ-প্রাণও যে হিমালয়সদৃশ ও প্রাণবন্ত হবে, তা কামাল ভাইকে দেখে, তার সঙ্গে মিশে উপলব্ধি করেছি সব সময়। আজ তার জন্মদিনে অতীত রোমান্থনে কিছু টুকরো স্মৃতি ভেসে উঠছে মানসপটে। ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে সেগুলো লিখব তরুণ প্রজন্মের জন্য, এই ভেবে কলম ধরতে গিয়ে দেখছি কলম চলছে না, হাত যেন অবশ হয়ে আসছে। অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে খাতার ওপর। এই অশ্রুই বলে দিচ্ছে হৃদয়ের কোন মণিকোঠায় তিনি আছেন, তাকে কতটা ভালোবাসতাম, কতটা শ্রদ্ধা করতাম। মূলত তিনি ছিলেন আমাদের সিনিয়র বড় ভাই, বন্ধু, আবার পথপ্রদর্শক অভিভাবকও।
বাহাত্তর সালে কামাল ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। আমি তখন ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। রাজেন্দ্র কলেজের মাঠে ছাত্রলীগের একটি স্কুল শাখার সম্মেলনে তাকে আমরা অতিথি করে নিয়ে আসি। তাকে ঢাকা থেকে নিয়ে আসার পথে সেদিনই বুঝেছিলাম তিনি কত মহৎপ্রাণ। তাকে নিয়ে আমরা আরিচা ঘাটে যখন পৌঁছাই, তখন ঘাটে কোনো ফেরি ছিল না। বাধ্য হয়ে আমাদের এক বন্ধু, তৎকালীন ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার রুমী বঙ্গবন্ধু তনয় শেখ কামালের কথা বলে একটি বিশেষ ফেরির ব্যবস্থা করেন। শেখ কামাল আমাদের ডেকে বলেছিলেন, ‘তোরা কি আমার বাবা ও আমার নাম ভাঙিয়েছিস?’ আমরা মাথা নেড়ে সময় স্বল্পতার দোহাই দিয়েছিলাম। তিনি আমাদের ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘কখনও নাম ভাঙিয়ে বিশেষ সুবিধা নেয়া ঠিক নয়। দেশের সব মানুষেরই সমান সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার আছে। তোরা এই কথাটি কখনও ভুলে যাসনে।’ সেদিনের সেই কথাটি আজও আমার হৃদয়ে সুর হয়ে বাজে। সেদিনের সেই কথা, সেই সুরই জানিয়ে দেয় বঙ্গবন্ধুর সন্তান তারই আদর্শকে কীভাবে বুকে ধারণ করেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। তিনি আমাকে সব সময় সাহস জুগিয়েছেন। আমি সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। কামাল ভাইও এই বিভাগের ছাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন আমার এক বছরের সিনিয়র। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। প্রথম পাঁচজনের একজন ছিলেন তিনি। সমাজবিজ্ঞান বিভাগে আমরা নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতাম। আর সেসব অনুষ্ঠানের মূল নেতৃত্বে থাকতেন তিনি। তার নেতৃত্বেই আমরা সব অনুষ্ঠান অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারতাম। তিনি আমাদের কাজগুলো কেবল তদারকিই করতেন না, অনেক সময় নিজেও কাজে যুক্ত হতেন। তিনি খুব ভালো গিটার বাজাতে পারতেন। তার বাজনা শুনে আমরা মুগ্ধ হতাম। কাজের গতি বেড়ে যেত, ক্লান্তি দূর হয়ে যেত। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তার প্রবল আগ্রহ থাকলেও তিনি কখনও তারুণ্যের উচ্ছলতায় নিষিদ্ধ জগতে পা বাড়াননি, যদিও সেই বয়সে সেটা অস্বাভাবিক ছিল না। সামাজিক মূল্যবোধ ও চেতনা তার অন্তরে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল।
কামাল ভাই ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক। ছাত্রলীগকে তিনি সংগঠিত করেছিলেন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সব সময় নানা দিকনির্দেশনা দিতেন। আবাহনী ক্রীড়াচক্র তারই হাতে গড়া সংগঠন। তিনি ভালো ফুটবল, ক্রিকেট খেলতেন। স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী, নাট্যচক্র তারই হাতে গড়া সংগঠন। চুয়াত্তর সালে উদ্যাপিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সপ্তাহে একক অভিনয়, গান, খেলাধুলাসহ অনেকগুলো ইভেন্টে কামাল ভাই বিজয়ী হয়েছিলেন। সর্বত্রই যেন ছিল তার বিচরণ। তার সেই বিচরণের সঙ্গী হয়েছিলাম আমরা কয়েকজনও। কামাল ভাই আমার সিনিয়র হলেও মিশতেন ঠিক অতি আপনজনের মতো। সুুখে-দুঃখে আপন ভাইয়ের মতো কাঁধে হাত রেখে ভরসা দিতেন, স্বপ্ন দেখাতেন। আমিও বুনে যেতাম সেই স্বপ্নের জাল। ছোট-বড় সবার সঙ্গে ছিল তার বন্ধুত্ব। চাল-চলন ছিল একেবারে সাদাসিধা। তাকে দেখে কখনও মনে হতো না, তিনি প্রধানমন্ত্রীর ছেলে। এমনকি অনেক সময় তার পকেটে কোনো টাকাও থাকত না। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কেউ যখনই কোনো বিপদে পড়ত, কামাল ভাইয়ের কাছে ছুটে আসত। তিনি কখনই কাউকে নিরাশ করতেন না। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সবার কথা শুনতেন। সর্বোচ্চ সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। তিনি অন্যায় একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র একটি দোকান থেকে দিনের পর দিন বাকি খেলেও টাকা পরিশোধ করত না। কামাল ভাই সে কথা জানতে পেরে ওই ছাত্রমস্তানটিকে ডেকে এনে আমাদের সামনে এমন ধমক দিয়েছিলেন, ওই মস্তান সেদিনই সব বাকি পরিশোধ করে দিয়েছিল। কামাল ভাইয়ের এমন চারিত্রিক সদগুণ আমাকে ভীষণ নাড়া দিত। আমি অভিভূত হতাম। নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবতাম, এমন একজন মানুষের ছায়াতলে থাকার সুযোগ পাওয়ায়।
আমরা ছাত্রলীগের পনেরো সদস্যের একটি দল বিশ্ব যুব সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য বার্লিনে গিয়েছিলাম। সেই দলের নেতা ছিলেন কামাল ভাই। সেই উৎসবের মূল থিম ছিল ‘সামাজ্যবাদবিরোধী সংহতি, শান্তি ও বন্ধুত্ব’। পুরো বিমান ভ্রমণে কামাল ভাই জারিগান গেয়ে আমাদের মাতিয়ে রেখেছিলেন। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি আমাদের ছুতেই পারেনি। বার্লিন শহরের একদিনের কথা বলতে গেলে এখনও আমার চোখে জল চলে আসে। একদিন একটি শপিং সেন্টারে আমরা ঢুকেছিলাম। একটি সুন্দর প্যান্ট পিসের দিকে আমার চোখ পড়েছিল। আমি সেটি নিয়ে অনেকক্ষণ নাড়াচাড়া করলাম। কিন্তু তা কেনার মতো অর্থ ছিল না। আফসোস নিয়ে সেটা রেখে দিলাম। আমাদেরই এক বড় ভাই সেই প্যান্ট পিস আমার হাত থেকে টেনে নিয়ে সেটা কিনে নিয়েছিলেন। পুরো ব্যাপারটিই যে কামাল ভাই লক্ষ্য করছিলেন, তা জানতাম না। পরদিন সকালে আমাকে তিনি বললেন, ‘তুই প্যান্ট পিসটি কিনলি না কেন?’ আমি চুপচাপ ছিলাম। তিনি সবকিছু বুঝতে পারলেন এবং পকেটে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে ওইরকম একটি প্যান্ট পিস কিনতে বললেন। আজ এত বছর পরও এ দৃশ্য এখনও আমার চোখে ভাসে। একজন কর্মীর প্রতি তার হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা ভালোবাসার সেই নমুনার কথা ভাবলেই এখনও অশ্রু সংবরণ করতে পারি না।
কামাল ভাই ছিলেন মাটির মানুষ। তার কাছে সাহায্য চেয়ে কেউ কোনোদিন নিরাশ হননি। অথচ মানবিক সব গুণাবলিসম্পন্ন সেই কামাল ভাইয়ের বিরুদ্ধেই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ফেঁদেছিল একের পর এক সাজানো মিথ্যে বানোয়াট গল্প। তিনি নাকি বাংলাদেশ ব্যাংক লুট করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন। আসলে প্রকৃত ঘটনা ছিল ভিন্ন। ১৯৭৪ সালের ৩ জুন ছিল সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির হরতাল। এর আগের রাতে কামাল ভাই আবাহনী ক্রীড়া চক্রের মাঠে আড্ডা দিচ্ছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে। হঠাৎ ফকিরেরপুলের দু’জন খেলোয়াড়ের মাধ্যমে তিনি জানতে পারলেন, সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির ক্যাডাররা মতিঝিলের ব্যাংক লুট করবে। সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার পুলিশ সুপার বীর বিক্রম মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলমকে খবর দেন তিনি। এরপর দুষ্কৃতকারীদের ধরার জন্য নিজেই সঙ্গে থাকা বন্ধুদের নিয়ে মাইক্রোবাসে মতিঝিল এলাকায় ছুটে যান। ওদিকে তার মাধ্যমে খবর পেয়েই ঢাকার পুলিশ সুপার বীর বিক্রম মাহবুবের পুলিশ বাহিনী জিপ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। দুর্ভাগ্যক্রমে মতিঝিলের কাছাকাছি শেখ কামালের মাইক্রোবাস এবং পুলিশের জিপ মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে। অন্ধকারে কেউ কাউকে চিনতে না পারায় এবং পুলিশের জিপ থেকে কোনো সতর্ক সংকেত না দিয়েই অতর্কিতে গুলি চালানোয় মাইক্রোর প্রায় সবাই আহত হন। পায়ে গুলি লেগে গুরুতর আহত হন কামাল। ভুল বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কামাল ভাইকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে এবং পরে পিজি হাসপাতালে নিয়ে যায়। এ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পরের দিন দৈনিক মর্নিং নিউজে প্রকাশিত হয়েছিল।
কামাল ভাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল উনিশ’শ পঁচাত্তর সালের চৌদ্দই আগস্ট রাতে। কামাল ভাই কলা ভবনে আমাদের কাছে এসেছিলেন। জাতির পিতা আসবেন বলে আমরা এক মাস ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তিনি আমাদের অনুপ্রাণিত করতে জারিগান গাইলেন, অনেক হাস্যকৌতুক করলেন। রাত সাড়ে এগারোটার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির এক নিরাপত্তাকর্মী এসে জানাল, বঙ্গবন্ধু ডেকেছেন। তিনি আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে বললেন এবং ভোর পৌনে পাঁচটার মধ্যে আসবেন বলে কথা দিয়ে চলে গেলেন। পরে শুনেছি, তিনি আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রথমে বকশীবাজারে শ্বশুরবাড়িতে যান এবং সেখান থেকে সুলতানা কামালকে নিয়ে ধানমণ্ডির উদ্দেশে রওনা হন। আর এরপরই আসে পনেরো আগস্টের ভয়াল রাত। ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বরের সেই বাড়ির তিনিই ছিলেন প্রথম শহীদ। তিনি বলেছিলেন, ভোর পৌনে পাঁচটার মধ্যে ফিরে আসবেন, অথচ নিয়তির কী নির্র্মম পরিহাস- তিনি আমাদের মাঝে আর ফিরে আসতে পারেননি; নরাধমরা তাকে আসতে দেয়নি। আমাদের মাঝ তিনি থেকে হারিয়ে গেলেন। সত্যিই কি হারিয়ে গেলেন? না, কামাল ভাই হারিয়ে যেতে পারেন না। তিনি আছেন আমাদের অস্তিত্বের ভেতর। সদা জাগ্রত বিবেক হয়ে এখনও আমাদের স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছেন আমাদের আদর্শিক নেতা, আমাদের পথনির্দেশক শ্রদ্ধাভাজন কামাল ভাই।
বাহালুল মজনুন চুন্নূ : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ


বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

শনিবার, ০৫ আগস্ট ২০১৭

বাংলাদেশের কথা বলতে গিয়ে অনিবার্যভাবে এসে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। জনগণের স্বার্থের সঙ্গে, দেশের স্বার্থের সঙ্গে নিজের স্বার্থকে তিনি একাত্ম করতে পেরেছিলেন অবলীলায়া।

আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয়, দেশের স্বার্থের কাছে, জনগণের স্বার্থের কাছে তিনি নিজের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন।

এ কারণেই বোধ করি কবি-মনীষী অন্নদাশঙ্কর রায় বাংলাদেশের আর এক নাম রেখেছেন mujibland. এক অর্থে বঙ্গবন্ধুই একটা পর্বের, বাংলাদেশের ইতিহাস। তার জীবন ও কর্মের ক্রমিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি বিশেষ সময়খণ্ডের কথা আমরা জানতে পারি।

শোষক ও শোষিতের সংগ্রামে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে বঙ্গবন্ধু পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির শৃঙ্খল থেক তিনি বাঙালি জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করতে চেয়েছেন, চেয়েছেন দেশকে স্বাধীন করতে।

এ মুক্তির সংগ্রামে তিনি নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভেবে জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, কিশোর বয়স থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছেন প্রতিবাদ, সর্বদা বলেছেন সত্য ও ন্যায়ের কথা এবং হয়ে উঠেছেন স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক। সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে তিনি কখনও দূরে সরে যাননি, ভীতি ও অত্যাচারের মুখেও সর্বদা তিনি সত্য ও ন্যায়ের কথা বলেছেন, শোষিত মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন।

শোষিত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর এ নির্ভীক অবস্থানের কারণে তিনি কেবল বাংলাদেশেই নয়, শোষিত-নির্যাতিত বিশ্বমানব সমাজেও অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।

প্রসঙ্গত স্মরণ করতে পারি, ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত আলজিয়ার্সের জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণের কথা, যেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন- ‘বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত- শোষক ও শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন- এসব স্থানে শোষিত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়, বিশ্বের শোষিত-নির্যাতিত মানুষ বঙ্গবন্ধুকে গ্রহণ করে নেয় নিজেদের নেতা হিসেবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন গণতন্ত্রের অতন্দ্র সৈনিক। তার কর্ম ও সাধনা, চিন্তা ও ধ্যানে সর্বদা ক্রিয়াশীল থেকে বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ। কৈশোর থেকেই তিনি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে ছিলেন সোচ্চার।

বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আটান্নর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা-আন্দোলন, ছিষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের মহান গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ- প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি পালন করেন নেতৃত্বের ভূমিকা।

বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান শক্তি-উৎস ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে তিনি ছিলেন সর্বদা বজ কণ্ঠ। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের তার ভাষণ ছিল গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে স্বাধিকারের পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে এক ঐতিহাসিক দলিল। একটি ভাষণ একটি জাতিকে জাগ্রত করেছে, সবাইকে মিলিয়েছে একবিন্দুতে- এমন ঘটনা বিশ্ব ইতিহাস বিরল।

বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর নাম চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এ কথাই যেন ব্যক্ত হয়েছে অন্নদাশঙ্কর রায়ের এই শব্দগুচ্ছে- ‘যতদিন রবে পদ্মা-যমুনা গৌরী-মেঘনা বহমান/তত দিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’

বাংলাদেশের মাটিতে বিদেশি কোনো শক্তির শাসন তিনি মেনে নেননি। এজন্য তাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, কারাগারে কাটাতে হয়েছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। দেশের প্রতি, দেশের মাটির প্রতি তার ভালোবাসা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে তিনি স্বাধীনতার যে ঘোষণা দেন, সেখানেও দেশের মাটির কথা তিনি চরম বিপদের মুখেও উচ্চারণ করেন নির্ভীকচিত্তে।

দেশকে ভালোবাসতেন বলে বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছেন মিলিত বাঙালির। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছিল তার মজ্জাগত, মানবিক চেতনায় তিনি সর্বদা ছিলেন উচ্চকিত। তিনি ছিলেন বাঙালির ঐতিহ্যিক সংস্কৃতির ধারক।

মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে তার কাছে সর্বদা প্রাধান্য পেয়েছে মানবপরিচয়। এ কারণে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে তিনি ঐতিহ্যিক সংস্কৃতির ধারক বাঙালির জন্য অসম্মানের বলে মনে করতেন।

বাংলাদেশ ও বাঙালি সত্তাকে তিনি কী বিপুলভাবে ভালোবাসতেন, তা বোঝা যায় ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে তিনি যে ভাষণ দেন, তা থেকে। ওই ভাষণে তিনি বলেছিলেন- পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের মুখের ওপর তিনি বলেছেন : ‘আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবরও খোঁড়া হয়েছিল।... আমি ঠিক করেছিলাম, আমি তাদের কাছে নতি স্বীকার করব না। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা, জয় বাংলা।’

এ বক্তব্য থেকেই অনুধাবন করা যায়, দেশের জন্য, বাঙালির জন্য, বাংলা ভাষার জন্য বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম ভালোবাসা। ১০ জানুয়ারির ভাষণে কেবল দেশপ্রেম নয়, বঙ্গবন্ধুর উদার মানবতাবোধ এবং সদর্থক বিবেচনারও পরিচয় ব্যক্ত হয়েছিল। সেদিনের ভাষণে সুস্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছিল এই উদার মানবচেতনা, এই মহৎ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা-

আমার পশ্চিম পাকিস্তানের ভায়েরা, আপনাদের প্রতি আমার কোনো বিদ্বেষ নেই। আমি চাই আপনারা সুখে থাকুন। আপনাদের সেনাবাহিনী আমাদের অসংখ্য লোককে হত্যা করেছে, আমাদের অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করেছে, আমাদের গ্রামগুলো বিধ্বস্ত করেছে, তবুও আপনাদের প্রতি আমার কোনো আক্রোশ নেই। আপনারা স্বাধীন থাকুন, আমরাও স্বাধীন থাকি। বিশ্বের অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের যে ধরনের বন্ধুত্ব হতে পারে আপনাদের সঙ্গেও শুধু সেই বন্ধুত্বই হতে পারে। কিন্তু যারা অন্যায়ভাবে আমাদের মানুষদের মেরেছে, তাদের অবশ্যই বিচার হবে।

-শেষের বাক্যটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু সচেতনভাবে এখানে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলেছেন। যুদ্ধাপরাধের এই বিচার প্রক্রিয়ার ঐতিহাসিক এক ডিসকোর্সের সামনে আজ বাংলাদেশ। এ প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর সেদিনের বক্তব্য আরও তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে।

হেমিলনের বংশীবাদকের মতো বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতিকে একসূত্রে গ্রথিত করেছেন। তিনি হলেন রাজনীতির কবি- Poet of politics। রাজনীতিকে তিনি সৃষ্টিশীল চেতনা দিয়ে নিজের হাতে আকার দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু আজীবন স্বপ্ন দেখেছেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের। বঙ্গবন্ধুর সে স্বপ্ন এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

তাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে হলে, শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হলে, প্রকৃত দেশপ্রেম নিয়ে সচেতনতার সঙ্গে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। সেটিই হবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের শ্রেষ্ঠ উপায়। শ্রুতিলিখন- এমরান হোসেন


আমেরিকার মহামানবের সাগরতীরে বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস = সোনা কান্তি বড়ুয়া

শুক্রবার, ০৪ আগস্ট ২০১৭

নির্ভেজাল সত্যবচন।  ‘বৌদ্ধ সংস্কৃতি’ নামের জোড়কলম শব্দটা বাংলাদেশে বসে যে ভাবে চোখের সামনে ভাসে, সেই অক্ষদ্রাঘিমা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বসে তার আদলটা বোঝা অত সহজ কর্ম নয়। কিন্তু মনে হচ্ছে দিন কয়েকের জন্যে খাস আমেরিকাতেই যেন বাংলাদেশের বৌদ্ধগণ একটি ধর্ম দ্বীপে উঠে এসেছেন, সকাল বিকাল বুদ্ধ ধর্ম সংঙ্ঘ বন্দনায়।   চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করছি, বাংলাদেশ থেকে বহুদূরে থাকা প্রবাসী বৌদ্ধগণ আপ্রাণে তাঁদের শিকড়ের বৌদ্ধ সংস্কৃতি টা ছুঁয়ে থাকার চেষ্ঠা করে চলেছেন।  বোষ্টন, আমেরিকা। মানবতার জয়গানে বিগত ১৯ এবং ২০ জুলাই ২০১৩ বোষ্টন বাংলাদেশ বুড্ডিষ্ট এসোসিয়াশনের উদ্যোগে স্থানীয় সুমনোরম ম্যাকলিন মিডল স্কুল হলে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশী বৌদ্ধদের সহযোগীতায় উত্তর আমেরিকা বৌদ্ধ সৌভ্রাতৃত্ব সন্মেলন ২০১৩ মহাসমারোহে সমাপ্ত হয়েছে। বহু দূর প্রবাসে বৌদ্ধ সংস্কৃতির শিকড় ছুঁয়ে থাকার থাকার প্রয়াসে বৌদ্ধ জাতির এই মহান সন্মেলনে আমেরিকা এবং কানাডার বিভিন্ন শহর থেকে বিপুল বৌদ্ধ জনতার সমাগমে আকাশ বাতাসের কোলাহল বিদীর্ণ করে “বুদ্ধং সরনং গচ্ছামি” ধ্বনিত হয়।  সবাই মুখে ্একই কথা, কথাটা আসলে ওটাই! ঘরের বাইরে ঘর। সীমানা ছাড়ানো ঘর। এই গন্ডি ভাঙার ছবিটা বারবারই এই সম্মেলন ২০১৩ উপলক্ষে স্পষ্ঠ হয়ে উঠছে। সম্প্রতি ৭ জুলাই ২০১৩ সালে বুদ্ধগয়ায় বোমা বিস্ফোরণে উক্ত বৌদ্ধসম্মেলন “মহাবোধি মন্দিরে সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনাকে তীব্র ধিক্কার জানিয়েছেন।”
প্রসঙ্গত: ডিসকভারি অব বৌদ্ধধর্ম in  Grand Canyon of Arizona.  আমেরিকায় before European civilization Chinese বৌদ্ধ প্রসঙ্গ “In the vast Grand Canyon of Arizona, USA, there is an Egyptian-style tomb full of Buddhist art showing that Asians migrated to America and brought the Dharma and advanced technology to Native Americans in the distant past. It is similar to the Valley of Kings in Luxor, Egypt. While this will be too fantastic for most readers to believe, the trail of evidence begins with an article published on the front page of the Arizona Gazette on April 5, 1909. It claims that just such a rock-cut cavern temple full of Buddhist, Vedic, and Egyptian art and architecture, hieroglyphs, and mummies -- an almost incomprehensible wealth of archaeological treasures -- was discovered (Jamyang 190/blog, Better than feathers).”     Buddhist cave temples found in Grand Canyon dated March 27, 2014 (Wisdom Quarterly in U.S.A).      Dhr. Seven and Ashley Wells (eds.), Wisdom Quarterly, Jack Andrews, "Was the carved 'installation' in the Grand Canyon an ancient Buddhist temple?" (Lost Civilizations / in Spanish)
 
The Arizona Gazette headlines of April 5, 1909 document the reality of these unbelievably astounding finds, some of the greatest US archeological discoveries ever. Why were they covered up?
এই প্রসঙ্গে ইহা ও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে  ১৯৬৪ সালে আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় অনেক আমেরিকান সৈন্য উক্ত যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে মুক্তি পেতে থাইল্যান্ডে এসে বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়েছেন। অবশেষে আমেরিকা ভিয়েনামের কাছে পরাজিত হলেন এবং ১৯৭৯ সালে হাজার হাজার ভিয়েতনামী, লাওস এবং কম্বোডিয়ার বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং জনতা শরণার্থী হয়ে আমেরিকা ও কানাডায় জীবন যাপন করতে আসেন। বর্তমানে উত্তর আমেরিকায় থেরবাদ, মহাযান, বজ্রযান এবং তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম বিরাজমান।

বোষ্টনের পর নিউইয়র্কে পা ফেলার পর থেকে ঝলক দর্শনে দেখা গেল, তা থেকেই মনে হয়েছে, এ বারের সম্মেলনে একাধিক স্থানীয় আমেরিকা এবং কানাডার প্রবাসী বাংলাদেশী বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানের প্রযোজনা আন্তরিক সাড়া জাগিয়েছে।  In 1978  আমেরিকার বিদর্শন সোসাইটি আমাদের চট্টগ্রামের বিদর্শন শিক্ষক মুনিন্দ্র বড়ুয়া এবং বিদর্শন সাধিকা দীপা মা (ননী বালা বড়ুয়া) কে কোলকাতা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় নিমন্ত্রন করেছিলেন। আমেরিকায় বৌদ্ধধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে উভয়ের নাম সশ্রদ্ধায় লিপিবদ্ধ থাকবে।  নিউইয়র্কে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ শান্তি প্রতিষ্ঠানের সম্মেলন এবং উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশী বৌদ্ধ সম্মেলনদ্বয়ের শুভ উদ্বোধন হ’ল ২০১৫ সালের ৮ ও ৯ আগষ্ঠ।
 
১৮৭৯ সালে লন্ডন টাইম পত্রিকার সম্পাদক বিখ্যাত ’লাইট অব এশিয়া ’ শীর্ষক গৌতমবুদ্ধের জীবনী ইংরেজি ভাষায় কবিতা রচনা করে জগৎ জুড়ে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। বিভিন্নদেশের বৌদ্ধ বিহারে ইসলামি জঙ্গীদের তান্ডব দাহন হলে ও ইউরোপ এবং আমেরিকায় বাংলাদেশের প্রাচীন পালরাজত্ব ও বঙ্গরতœ অতীশ দীপঙ্কেরের বৌদ্ধধমের্র বিপুল বিজয়। বৌদ্ধধর্ম প্রচার ও প্রসারের জন্যে ১৮৯৪ সালে আমেরিকান বৌদ্ধ লেখক পল সারাস ’দি গসপেল অব বুড্ডিজম’ রচনা করেছিলেন । অনাগরিক ধর্মপাল সহ চীন, শ্রীলঙ্কা এবং জাপানী বৌদ্ধদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আমেরিকা এবং কানাডায় অনেক মন্দির স্থাপিত হয়েছিল।
জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানব সভ্যতায় বৌদ্ধধর্মের ধ্যান পদ্ধতির দুর্লভ অবদান নিয়ে টাইম ম্যাগাজিন চলমান আমেরিকান সমাজে বৌদ্ধদর্শনের মূল্যায়ণ করেছেন।   ১৮৭৫ সালে আমেরিকার বৌদ্ধ আন্দোলনের অগ্রদূত মহাত্মা কর্নেল হেনরি ষ্টিল অলকট থিউসোফিক্যাল সোসাইটির মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় (সিংহল) গিয়ে মুখোমুখি বৌদ্ধধর্মের পক্ষ নিয়ে খ্রীষ্ঠান পন্ডিতদের সাথে তর্ক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিান বিশ্ববৌদ্ধ ফেলোশিপের পতাকা এবং আন্তর্জাতিক বৌদ্ধধর্মের রতœমালা (ক্যাতেসিজম) সম্পাদনা করেছিলেন। তাঁরই অনুপ্রেরনায় শ্রীলঙ্কার অনাগারিক ধর্মপাল তাঁর পুরানো ডেভিড নাম ত্যাগ করে ধর্মপাল নামে পরিচিতি হয়েছিলেন।
বৌদ্ধধর্মের জয়গান গেয়ে আমেরিকার বিশ্ববিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন নিজেকে ধন্য মনে করেছেন। অহিংসার বিশ্বমৈত্রীর সাধনায় আমেরিকাস ফ্যাসসিনেশান উইথ বুড্ডিজম এবং মহামান্য দালাইলামর নিকট আমেরিকান স্ত্রী ও পুরুষ দলে দলে বৌদ্ধধর্ম গ্রহন করেছেন (টাইম, ১৩ অক্টোবর ১৯৯৭ সাল)।
বিভিন্ন কারনে তিব্বত থেকে ১৯৫৬ সালে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের প্রতিনিধি মহামান্য দালায় লামা ভারতে এলেন। ১৯৮৯ সালে আমেরিকায় আমন্ত্রিত হয়ে এলেন এবং বৌদ্ধধর্ম, ধ্যান এবং অহিংসা পরম ধর্ম সম্বন্ধে বিবিধ ভাষন আমেরিকার সাধারন জনতা সহ হলিউডের নায়ক নায়িকাগণকে গভীরভাবে আকর্ষন করেছেন।
বাঙালি জাতির প্রথম গ্রন্থ চর্য়াপদের বিষয়বস্তু ছিল বৌদ্ধধর্ম এবং বিশ্বমানবতাবাদী সর্বকালের বৌদ্ধ দর্শন। একুশে ভাষা আন্দোলনের আলোকে বাংলা ভাষা এবং একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্যে ”কত প্রান হল বলিদান / লেখা আছে অশ্রুজলে।” ঢাকার আমেরিকা দূতাবাস আমার লেখা ইংরেজি বই ”সত্যের সন্ধানে (IN QUEST OF TRUTH)  শীর্ষক বৌদ্ধ উপন্যাস পাঠে সন্তুষ্ঠ হয়ে বিগত ১২ মে ১৯৮৯ সালে (আমাকে) আমেরিকা ভ্রমনের সরকারি নিমন্ত্রন পত্র আমার ঠিকানায় প্রেরন করেছিলেন। ১৯৮৭ সালে চীন ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন বৌদ্ধ গ্রন্থ প্রকাশনী সমিতি আমার লেখা ইংরেজি বই ”আনবিক যুগে বৌদ্ধ চিন্তা ও ধ্যান প্রসঙ্গ (Buddhist thought & Meditation in the Nuclear Age”) ) শীর্ষক বৌদ্ধ গ্রন্থের ত্রিশ হাজার কপি আমেরিকার লাইব্রেরি অব কংগ্রেস সহ বিশ্বজুড়ে পরিবেশন করেছেন।
গত বছর কানাডার বৌদ্ধ পত্রিকা সুমেরু (ও অতীশ দীপঙ্কর ফেসবুকে) সংবাদছিল:
ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী মহামান্য জর্জ অসবোর্ন রাজনীতির রাজসিংহাসন ত্যাগ করে বেীদ্ধ
ভিক্ষু হয়েছেন এবং নেপালের গভীর জঙ্গলে ধ্যান প্রশিক্ষণ বৌদ্ধ মন্দিরে গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকেন। কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশের বৌদ্ধগণ উক্ত সংবাদ পাঠে পুলকিত এবং আনন্দ বোধ করছেন যে, বাংলাদেশের পাহাড়পুরের মতো কানাডায় ১,৭০০ একরের বৃহত্তম বৌদ্ধ বিহার নির্মিত হচ্ছে অহিংসা পরম ধর্ম মানব সমাজে প্রচারের জন্যে।  
১৮৯৬ সালে বৌদ্ধ পন্ডিত হেনরি ওয়ারেন ক্লার্ক ”বুড্ডিজম ইন ট্রানশ্লেশন” শীর্ষক মূল্যবান গ্রন্থ লেখা এবং হার্ভাট অরিয়েন্টাল সিরিস সম্পাদনা করে অমর হয়েছেন। আমেরিকায় বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্যে ১৮৯৭ সালে লেখক পল সারাস জাপানী জেন (ধ্যান) বৌদ্ধধর্মের মহাপন্ডিত মহামহোপাধ্যায় ডি টি সুজুকিকে আমেরিকায় আসার নিমন্ত্রন করলেন। ডি টি সুজুকির বৌদ্ধ ধ্যানের বক্তৃতামালা আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় সমুহ এবং বুদ্ধিজীবি জগতে গভীর আলোড়ন সৃষ্ঠি করেছিলেন।
রক্তাক্ত কলিঙ্গ যুদ্ধের পর সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মকে নিরপেক্ষ শান্তির সনদ করে জগত জুড়ে প্রচার করেন, “অহিংসা পরম ধর্ম।” জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বৌদ্ধধ্যান প্রনালী (মেডিটেশন) আজ মানব চিত্তের একমাত্র ঔষধ। যুদ্ধের মাধ্যমে মানব জাতির সমস্যার সমাধান নেই কিন্তু অহিংসার বিশ্বমানবতাই একমাত্র সমাধান। হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খৃষ্ঠান সহ সর্ব ধর্মের মানুষ একত্রে মানুষের ভাই বোন আত্মীয় স্বজন। কোন মানুষ অন্য মানুষের শত্রু নয়। সকল ধর্মের উপদেশে বিরাজমান, “মানুষ মানুষের ভাইবোন।” বিশ্বকবির ভাষায়:
“অহমিকা বন্দীশালা হতে। ভগবান তুমি!
নির্দ্দয় এ লোকালয়, এ ক্ষেত্র তব জন্মভূমি।
ভরসা হারালো যারা, যাহাদের ভেঙেছে বিশ্বাস
তোমারি করুনা বিত্তে ভরুক তাদের সর্বনাশ
আপনারে ভুলে তারা ভুলুক দুর্গতি। আর যারা
ক্ষীণের নির্ভও ধ্বংস করে, রচে দুর্ভাগ্যের কারা;
দুর্বলের মুক্তি রুধি, বোসো তাহাদেরি দুর্গদ্বারে,
তপের আসন পাতি, প্রমাদ বিহ্বল অহঙ্কারে।
পড়–ক সত্যের দৃষ্ঠি; তাদের নিঃসীম অসম¥ান,
তব পুণ্য আলোকেতে লভুক নিঃশেষ অবসান।”(২৯ জুলাই ১৯৩৩ সাল)।

বৈদিক ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করে খৃষ্ঠ পূর্ব ৫,০০০ বছর পূর্বে বৈদিক রাজা ইন্দ্র কাশ্যপবুদ্ধের বৌদ্ধধর্ম (স্বপন বিশ্বাসের লেখা মহেঞ্জোদারো হরপ্পায় বৌদ্ধধর্ম) ধ্বংস করে ভারতে বৈদিক সভ্যতা স্থাপন করেন। উদাহরন স্বরুপ গৌতমবুদ্ধের ধ্যানভূমি বুদ্ধগয়া কে হিন্দুরাজনীতি আজ দখল করে আছে । হিন্দুরাজনীতি গায়ের জোড়ে বুদ্ধের নাম জগন্নাথ ও তিরুপতি রেখে পুরীর জগন্নাথ (উড়িষ্যা) মন্দির এবং তিরুপতি মন্দির (অন্ধ্রপ্রদেশ) সহ হাজার হাজার বৌদ্ধমন্দির সমূহ দখলে নিয়েছে (সম্পাদকীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা আগষ্ট ২২, ১৯৯৩) ।
বিশ্ব সভ্যতা এবং বাংলা ভাষার জনক গৌতমবুদ্ধ বাংলাদেশে পুন্ড্রবর্ধনে (বগুড়ার মহাস্থানগড়) প্রাচীন বাংলাদেশের জনতাকে দিনের পর দিন দান শীল সমাধি এবং প্রজ্ঞা শিক্ষা দিয়ে বিশ্বশান্তি স্থাপন করেছিলেন।

বিশ্ব ইতিহাস বিজয়ী বাংলা ভাষার জনক এবং বিশ্বসভ্যতার সর্বপ্রথম পথ প্রদর্শক গৌতমবুদ্ধকে সশ্রদ্ধ বন্দনা এবং বুদ্ধপূজার মাধ্যমে বিগত ১৯ এবং ২০ জুলাই ২০১৩ বোষ্টন বাংলাদেশ বুড্ডিষ্ট এসোসিয়াশনের উদ্যোগে স্থানীয় সুমনোরম ম্যাকলিন মিডল স্কুল হলে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশী বৌদ্ধদের সহযোগীতায় উত্তর আমেরিকা বৌদ্ধ সৌভ্রাতৃত্ব সন্মেলন ২০১৩; মহাসমারোহের সফলতার সময় আমরা উক্ত শুভ সংবাদের জন্যে অপেক্ষা করেছিলাম।
চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করছি, বাংলাদেশ থেকে বহুদূরে থাকা প্রবাসী বৌদ্ধগণ আপ্রাণে তাঁদের শিকড়ের বৌদ্ধ সংস্কৃতি টা ছুঁয়ে থাকার চেষ্ঠা করে চলেছেন। টরন্টো থেকে বোষ্ঠনে পা ফেলার পর থেকে ঝলক দর্শনে দেখা গেল, তা থেকেই মনে হয়েছে, এ বারের সম্মেলনে একাধিক স্থানীয় আমেরিকা এবং কানাডার প্রবাসী বাংলাদেশী বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানের প্রযোজনা আন্তরিকসাড়া জাগিয়েছে। প্রথম উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশী বৌদ্ধ সুভ্রাতৃত্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো ২০১৩ সালের ১৯ ও ২০ জুলাই।
(2)    উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশী বুড্ডিষ্টস' ফেডারেশনের আত্মপ্রকাশ  
২৬শে আগষ্ট ২০১৭ইং বোষ্টনে বৌদ্ধ সম্মেলন

গত ১৬ই জুলাই ২০১৭ইং, উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশী বৌদ্ধদের ব্যাপক উৎসাহ, প্রচেষ্টা, সহযোগিতা এবং সমর্থন নিয়ে নিউ ইয়র্কের জেএফকে হিলটন হোটেলে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে "নর্থ আমেরিকা বাংলাদেশী বুড্ডিষ্ট ফেডারেশন"-এর আত্ম প্রকাশ অনুষ্ঠিত হয়। বিগত প্রায় দুইমাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার প্রবাসী বাংলাদেশী বৌদ্ধ ভিক্ষু সহ সর্বস্তরের বৌদ্ধ নেতৃবৃন্দ এবং জনসাধারণের সাথে ব্যাপক ভিত্তিক আলাপ-আলোচনা, মত বিনিময় সভা, ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে লেখালেখি ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে সমর্থন ও সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে নিরংকুশ জন সমর্থন নিয়ে "নর্থ আমেরিকা বাংলাদেশী বুড্ডিষ্ট ফেডারেশন" তাঁর যাত্রার শুভ সূচনা করলো।

আগামী ২৬শে আগষ্ট ২০১৭ইং বোষ্টনে উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশী বৌদ্ধ সম্মেলন অনুষ্ঠানে সকলের উপস্থিতিতে ফেডারেশনের পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব এবং দিক নির্দেশনা ঘোষণা করা হবে।
গত ৯ই জুলাই বোস্টনে অনুষ্ঠিত উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দের যৌথ সাধারণ সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে নিউ ইয়র্ক মৈত্রী ফাউন্ডেশনের সভাপতি সমীরণ বড়ুয়া "নর্থ আমেরিকা বাংলাদেশী বুড্ডিষ্ট ফেডারেশন"এর আহবায়ক হিসাবে দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। তিনি ২০১৫ সালে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত উত্তর আমেরিকা বৌদ্ধ সম্মেলনের আহবায়ক ছিলেন। বোষ্টন বাংলাদেশ বুড্ডিষ্ট এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি সুহাস বড়ুয়া সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক এবং একই সংগঠনের প্রাক্তন সভাপতি শিমুল বড়ুয়া যুগ্ন আহবায়ক মনোনীত হন।

আমেরিকা এবং কানাডার বিভিন্ন অঙ্গ রাজ্য এবং প্ৰদেশে বসবাসরত বাংলাদেশী বৌদ্ধ, তাঁদের বিভিন্ন সংগঠন এবং বিবিধ বৌদ্ধ সমাজ, বৈশিষ্ট্য মন্ডিত/বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি বৃন্দ এবং প্রতিষ্ঠান সমূহের সমন্বয়ে এবং প্রতিনিধিত্বে পরিচালিত হবে বৌদ্ধদের বৃহত্তর এই ছাতা সংগঠন "নর্থ আমেরিকা বাংলাদেশী বুড্ডিষ্ট ফেডারেশন"। বাংলাদেশী বৌদ্ধদের ইতিহাস, কৃষ্টি, সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মদের কাছে পরিচিত করে তুলতে এবং ধর্মীয় রীতি-নীতি, সংষ্কৃতি, প্রচলিত প্রথা চর্চা ও সংরক্ষণে দেশে এবং প্রবাসে নানাবিধ উদ্যেগ গ্রহণ করবে এবং সহায়ক ভূমিকা রাখবে এই বৃহৎতম সংগঠন। আমেরিকা ও কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশী বৌদ্ধ এবং তাঁদের প্রজন্মদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি বৃদ্ধি করতে এবং ধর্মীয় ও উত্তরাধিকার পরিচয় সংরক্ষণে জোরালো ভূমিকা রাখবে এই ফেডারেশন ।সেবা ও সহযোগিতার সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে কাজ করবে এই সংগঠন।

বাংলাদেশী এবং প্রবাসী বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবন জীবিকা এবং পেশাগত সকল কাজে উচ্চতম নৈতিক মান বজায় রাখতে উত্সাহ এবং সহযোগিতা মূলক প্রকল্প গ্রহনের চেষ্টা চালাবে এই ফেডারেশন। আমরা নতুন প্রজন্মকে জানিয়ে দিতে চাই বাংলাদেশের বৌদ্ধদের অতীতের সেই গৌরব উজ্জ্বল দিন গুলির কথা, যাঁরা চর্যাপদ আর দোহা থেকে শুরু করে শিল্প, সাহিত্য, সংগীত এবং স্থাপত্যের পাশাপাশি ধর্ম নিরপেক্ষতা ও নাগরিক সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছিল এই বাংলায়। মহামতি বুদ্ধের শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে জাতি, ধর্ম, রং -গোত্র, উঁচু -নীচু সম্প্রদায়িক শ্ৰেণী ভেদের বিরুদ্ধে সাম্যবাদ আর মানবতাবাদের জাগরণ সৃষ্টি করেছিল এই বৌদ্ধ জাতি।

বাংলাদেশে বিগত এবং সাম্প্রতিক বছর গুলোতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক ঘটনা গুলি বিশেষ করে রামু, কক্সবাজার এবং পার্বত্য জেলা সমূহের অমানবিক ঘটনাগুলিবাংলাদেশের বৌদ্ধদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। বৌদ্ধরা একদিকে যেমন কর্মবাদী এবং জ্ঞানীর পূজারী ও সেবক অপর দিকে অজ্ঞানী বা অজ্ঞতার প্রতি ঘৃণা ও সঙ্গ ত্যাগ পরায়ন। ১১৫০ ইং সালের পর থেকেই বাংলাদেশ নামক এই ভুখন্ডে বৌদ্ধরা মূলত তরবারির আঘাতে শিরচ্ছেদ ভয়ে এবং নির্যাতনের শিকার হয়েই ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হতে থাকে এবং কালের পরিণতিতে সংখ্যা গুরু বৌদ্ধ জাতি নিজ দেশে সংখ্যা লঘু থেকে আজ বিলুপ্ত জাতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। সকল মানব ও  প্রাণীর প্রতি মৈত্রী পরায়ন এবং ধর্ম নিরপেক্ষ এই বৌদ্ধ জাতি শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারনে নিজ দেশ থেকে উচ্ছেদ হবে কিংবা বিলুপ্ত হবে তা সভ্য মানব সমাজ কখনও মেনে নিতে পারে না।

হাজার বছরের শ্বাশত বাংলা, এই বাংলাদেশই হচ্ছে বাংলাদেশী বৌদ্ধদের হাজার বছরের আদি এবং একমাত্র দেশ। বাংলাদেশী বৌদ্ধরা বাংলাদেশ ছাড়া অন্য্ কোন দ্বিতীয় দেশকে কখনো নিজের মাতৃভূমির মত আপন ভাবতে পারেনি। বাংলাদেশকে ছেড়ে যে যেখানেই থাকুক না কেন, নিজের মাতৃভাষা, ধর্ম, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি থেকে কখনোনিজেকে সরিয়ে সাথে বিশেষ কোন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্ঠা কিংবা সুযোগের প্রহর গুণন করেনি, অহিংসা ও ভালোবাসা দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে আপন দেশ ও জাতিকে। ফেডারেশনের সুবিশাল ছায়ায় নর্থ আমেরিকার বাংলাদেশী প্রবাসী বৌদ্ধরা সম্মিলিত ভাবে একে অপরের সহায়ক শক্তি হয়ে জ্ঞান প্রধান, মেধা সম্পন্ন ও মানবিক বৈশিষ্ট্য মন্ডিত, কর্মবীর বৌদ্ধ জাতির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখাবে। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় নানাবিধ প্রকল্প গ্রহণ সহ বাংলাদেশ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, সংস্থা সমূহের সাথে সম্পর্ক ও সহযোগিতার মাধ্যমে কল্যাণময় পরিবেশ গঠনে ও শান্তিময় বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় একযোগে কাজ করে যাবে।

২৬শে আগষ্ট, ২০১৭ ইং বোষ্টনে নর্থ আমেরিকা বাংলাদেশী বৌদ্ধ সম্মেলনে আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা, দেশ ত্যাগ নয়, দেশের কল্যাণময় পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সকলকেআবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আমরা আমাদের গৌরব গাঁথা ইতিহাসকে সামনে রেখে আবারও নতুন গৌরব গাঁথা রচনা করবো। হাজার বছরের মাতৃভূমিকে ত্যাগ করে নয়, হৃদয়ে ধারণ করে, বাংলাদেশের সকল ধর্মের মানুষকে মৈত্রী, ভালবাসা আর সংলাপে মুগধ করে রচনা করবো শান্তির মমতাময় পরিবেশ। বোষ্টন সম্মেলনে আপনাদের সরব উপস্থিতিতে জেগে উঠবে আমাদের অতীত গৌরব, রচিত হবে প্রত্যাশার নতুন দিগন্ত।
সম্মেলন স্থানঃ McGlynn Middle School 3002 Mystic Valley Pkwy, Medford, MA 02155.
সময়ঃ বেলা ১১টা থেকে রাত ১০:৩০মিঃ

সকলের সুস্বাস্থ্য কামনা করছি এবং সম্মেলনে যোগদানের বিনীত আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।  "জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।"   
(Reported  by  সুহাস বড়ুয়া, আহবায়কঃ নর্থ আমেরিকা বাংলাদেশী বুড্ডিষ্টস' কনফারেন্স ২০১৭, বোষ্টন, ম্যাসাচুসেটস, যুক্তরাষ্ট্র। ).   
 
বিশ্ববৌদ্ধ পুরস্কার প্রাপ্ত প্রখ্যাত মানবতাবাদী লেখক এবং জাতিসংঘে সাবেক বৌদ্ধ প্রতিনিধি এস. বড়ুয়া, প্রবাসী রাজনৈতিক ভাষ্যকার, ও কলামিষ্ট টরন্টো, কানাডা।
Dear Editor, Please attach the photo with this essay.


১৯৭৫ সালের ১৫ -ই আগস্ট পরবর্তী পরিবর্তিত সময়ে যেমন ছিল আমাদের শৈশব,কৈশর আর তারুণ্য : ফাহরা দীবা দীপ্তি

শুক্রবার, ০৪ আগস্ট ২০১৭

১৫-ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট, নির্মম হত্যাকান্ডে শহীদ জাতির পিতা বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ তাঁর পরিবারের সকল শহীদদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
ছোটবেলার স্মরণীয়, করুণ,ভয়ংকর, ভালোলাগা বা বিপর্যস্ত যে ঘটনাই মনে করতে চাই না কেন প্রথমেই চলে আসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। তখন আমি ৮ বছরের শিশু। সেদিন খুব সকালে টেলিফোনের রিং এর শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। আসলে ঘুম ভেঙেছিল অনেক আগেই কিন্তু আম্মার ভয়ে ঘাপটি মেরে বিছানায় পড়ে ছিলাম! কারন এ দিনটি ছিল ছোট খালা'র(সাহানা খালাম্মা) বিয়ে। আগের দিন খালার গায়ে হলুদ হল, আমরা পিচ্চি বাহিনীরা অতি উৎসাহে ধানমন্ডির বিভিন্ন বাড়ি থেকে ফুল চুরি করে, কুকুরের ধাওয়া খেয়ে নানু আর আম্মা'র বকুনি খেয়েছি। সেই বকুনিও ভুলে গিয়েছি কারন আজ খালাম্মা'র বিয়ে, নতুন জামা পড়বো,কতো মানুষ আসবে, এই উত্তেজনায়!
তখন মোবাইলের যুগ ছিল না।ল্যান্ড ফোনটা ছিল আব্বার ঘরে। রিং হওয়ার পর আব্বা বলছেন,"জিল্লুর ভাই(শ্রদ্ধেয় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান) কি বলছেন আপনি,এটা কি বললেন,কিভাবে সম্ভব!" দরোজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম আব্বার হাত থেকে ফোনের রিসিভারটা মাটিতে ঝুলছে, আব্বা হাউমাউ করে কাঁদছেন আম্মাকে জড়িয়ে ধরে, আম্মাও কাঁদছেন। আব্বা বার বার বলছেন, "আমাদের সব শেষ হয়ে গেলো, আমাদের আর কেউ রইল না!বাচ্চাদের দেখে রেখ,জানিনা তোমাদের সাথে আবার কবে দেখা হবে! " দেখলাম আম্মা আব্বা'র ছোট কালো ব্যাগটাতে কিছু কাপড় গুছিয়ে দিচ্ছেন। ছোট্ট আমি ভাবলাম, আব্বা আমাদের রেখে এতো সকালে আগে আগে নানুর বাড়িতে যাচ্ছেন সাহানা খালার বিয়েতে। দৌড়ে গিয়ে বললাম, আমিও যাবো আপনার সাথে। তখনো আব্বা'র চোখ দিয়ে জল পড়ছে!আব্বা বললেন,"আব্বা,দোয়া করো তোমার আব্বাকে যেনো আবার দেখতে পাও। জাতীর পিতাকে ওরা শেষ করে দিয়েছে,আমাদেরকেও ওরা বাঁচতে দিবে না!(আব্বা, জনাব মোঃ মুজাফফর আলী তখন জাতীয় সংসদের তৃতীয় বারের মতো সংসদ সদস্য) তোমার আম্মার সব কথা শুনবে, ছোট ভাইবোনদের খেয়াল করবে।" ৮ বছরের একটি শিশুর কিছুই বোঝার কথা না, আমিও বুঝলাম না কি হয়েছে! আব্বা চলে যাওয়ার পর দেখলাম আম্মা নানুকে ফোনে বলছেন," দীপ্তি'র আব্বা'র বন্ধু জিল্লুর রহমান ভাই(শ্রদ্ধেয় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান) এই মাত্র ফোনে বললেন বংগবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের সবাই, কেউ নাকি বেঁচে নাই, তাঁদেরকে মেরে ফেলা হয়েছে,ওরা নাকি বংগবন্ধু'র কাছের সবাইকে মেরে ফেলবে!" আম্মা কথা শেষ করতে পারছিলেন না, অনবরত কাঁদছিলেন।বাড়ির কাজের বুয়াদেরকেও কাঁদতে দেখলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম না এতো সকালে কেনো বাড়ির সবার কান্নাকাটি। আম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম কেনো সবাই কাঁদছে! আম্মা বললেন, "গত ঈদে তোমার আব্বার সাথে বংগভবনে গিয়েছিলে মনে আছে?বংগবন্ধুকে সালাম করেছিলে মনে আছে? তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে চুল এলোমেলো করে দিয়েছিলেন! মনে পড়ে?"বললাম, সবই মনে আছে, তো কি হয়েছে? আম্মা বললেন, সেই বংগবন্ধুকে তাঁর পরিবার সহ মেরে ফেলা হয়েছে!" আমি বললাম তিনিতো প্রেসিডেন্ট, কেনো, কারা তাঁকে মেরে ফেললো! আম্মা কোন উত্তর দিলেন না! একটি শিশুকে কি বলবেন তিনি! কাঁদতে কাঁদতে একটা ব্যাগে আমাদের কাপড় চোপড় গুছিয়ে আমাদেরকে নিয়ে নানুর বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন।


নানুর বিশাল বাড়িটা প্যান্ডেল টানানো,আজ খালার বিয়েতে সবাই আসবে, পোলাও রোস্ট আরও কত কি রান্না হয়েছে, গাড়ি থেকে নেমেই ঘ্রাণ পেলাম। কিন্তু কই, কোন আনন্দ নেই! নানু খালা মামারা সবাই চিন্তিত! একেক জায়গা থেকে একেক রকম খবর আসছিল বংগবন্ধু'র পরিবার সম্মন্ধে,বেঁচে থাকা না থাকা নিয়ে। আম্মা,নানা নানু আমাদের ছোটদের ডেকে বললেন, 'তোমরা হইচই কোরো না, আল্লাহ্‌কে ডাকো, অনেক বড় বিপদে আছি আমরা, ঘরের বাইরে বের হয়ো না কারফিউ চলছে, তোমার খালার বিয়েটা কিভাবে হবে আল্লাহ্‌ই জানেন, কারফিউয়ের জন্য বরযাত্রীরা মিরপুর থেকে আসতে পারছে না..... এমন আরো কতো কথা।একবার বিয়ে ভেঙে গেলে তার আবার বিয়ে হতে কষ্ট হয়, তাই যেভাবেই হোক খালু যেনো দুই একজনকে নিয়ে হলেও আসেন তেমন অনুরোধ করা হল।পুরা ঢাকা শহরে কারফিউর জন্য কেউ আসতে পারে নি, তিন শত মানুষের খাবার নষ্ট হওয়ার অবস্থা। আমার মনে আছে বিয়ে বাড়ির সব খাবার তখন ডেকচিতে করে প্রতিবেশী ও আশ পাশের গরীব দুঃখীদের মাঝে বিলি করা হয়েছিল। মিরপুর থেকে খালু আর তার বড় ভাই জিগাতলায় নানুর বাড়ি পৌচেছিলেন অনেক রাতে, পায়ে হেটে, বুড়িগংগা নদী হয়ে।দুপুরের বিয়ে হয়েছিল অনেক রাতে। বরযাত্রী ছিল মাত্র দুই জন, খালুর বড় ভাই আর ছোট বোন।
সেই সময় এটুকু বুঝেছিলাম বিড়াট কষ্টকর কিছু একটা হয়েছে, যার জন্য আমরা আজ নানুর বাড়ি তো কাল খালার বাড়ি, পরশু পরিচিত কারো বাড়ি। নিজেদের বাড়ির কথা মনে পড়তো, আমরা কাঁদতাম, থাকতে চাইতাম না অন্যের বাসায়। নিজের খেলনা, নিজেদের মতো করে থাকা খুব অনুভব করতাম। এতো কিছুর মাঝেও আম্মা আমাদের লেখা পড়া সব কিছুই চালিয়েছেন। দেখা গেলো ঐ সময়টায় দুই দিন নিজেদের বাসায় তো তিনদিন অন্যদের বাসায় থেকেছি।বাসায় এলে বাসার গার্ডরা আম্মাকে বলতো,'বেগম সাহেব আর্মির কিছু লোক আপনাদের খোঁজ করেছেন, আপনারা কোথায় আছেন জানতে চেয়েছে।'আব্বাকে মাঝে মধ্যে রাতে দেখতাম, আবার দেখতাম সকালে নেই।এভাবেই চলছিল আমাদের দিনগুলো।
এরই মধ্যে এক মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলো আব্বার গলার আওয়াজ শুনে। আব্বা বারান্দা থেকে কাদেরকে জেনো বলছেন,"ভাই, আপনারা এসেছেন আমার বাড়িতে, আপনারা আমার মেহমান, বাসায় এসে এক কাপ চা অন্তত খেতে হবে,আমার বাসা থেকে না খেয়ে কোন মেহমান যায় নি, আমি অবশ্যই আপনাদের সাথে যাবো,যেখানে যেতে বলেন।" এর পর ড্রইং রুমে অনেক মানুষের কথা শুনলাম, ভাবলাম কে এসেছে উঁকি দিয়ে একটু দেখি,দেখলাম ঘর ভরা আর্মি অফিসার,আব্বা তাদেরকে কি যেনো বোঝাচ্ছেন। আর বার বার আম্মার নাম ধরে বলছেন," চায়না, তারাতারি ভাইদের নাস্তা দাও, শেমাই রান্না কর।" আমি ছুটে গিয়ে দেখলাম আম্মা অনবরত কাঁদছেন আর শেমাই রান্না করছেন।আম্মা আমাকে দেখেই এক ধমকে বললেন, 'কি ব্যাপার এতো রাতে ঘুম থেকে উঠেছো কেন, তোমার আব্বা দেখলে বকা দিবেন, ঘুমাতে যাও।'ভয়ে আমি আমার রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। খুব সকালে আব্বা আমাদের ভাইবোনদের জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন, বললেন,'আব্বা,গত রাতই তোমাদের সাথে আমার শেষ রাত হত।খন্দকার মোস্তাক আহমেদ ওদের পাঠিয়েছিল আমাকে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলতে।ওদের মধ্যে একজন অফিসার কুমিল্লার, তিনি জানিয়েছেন যে,খন্দকার মোস্তাক তাদের অর্ডার দিয়েছে আমাকে নিয়ে গুম করে ফেলতে, আমার বাড়ীর একতলা নাকি অস্ত্রে বোঝাই, আমি নাকি মোস্তাক সরকারকে উৎখাত করার চেস্টায় দলীয় লোকদের আমার বাসায় জড়ো করেছি। এবং তাদের নির্দেশ ছিল, আমি পালানোর চেষ্টা করলে যেন সাথে সাথে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। বাড়ীর চতুর্দিক আর্মিরা ঘিরে রেখেছিল, আমার পারমিশনের আগেই তারা পুরা বাড়ী সার্চ করেছে, কিছুই পায় নাই। তারা আমার বিরুদ্ধে কিছুই দারা করাতে না পেরে আমাকে নিতে পারে নাই কিন্তু ওরা আবার আসবে, আমাকে না নিয়ে যাবে না, আর এই নেয়া হবে চিরজীবনের জন্য নেয়া।তোমরা তোমার আম্মার কথা মেনে চলবে, আমি তোমাদের খোঁজ খবর রাখবো।'এর পর আব্বা কোথায় চলে গেলেন জানি না,আম্মার কাছে শুনি তিনি ভালো আছেন। আব্বাকে নতুন করে ফিরে পাই ১৯৮৪ সালে, আমার এস এস সির বছর, ভয়ংকর অসুস্থ, ডায়াবেটিস, হাইপ্রেশারের রুগী হিসাবে!আওয়ামীলীগের বেশীর ভাগ নেতা কর্মীদের তখন এভাবেই দিন গিয়েছে। আমরা তবু সৌভাগ্যবান আব্বাকে ফিরে পেয়েছিলাম, কিন্তু অনেক নেতা, কর্মী গুম হয়েছিলেন যাদের হদিশ আজো মেলেনি!
এতোগুলো বছরে বয়স বাড়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম ১৫ ই আগস্টের নির্মমতা আর বাস্তবতা! বংগবন্ধু নামটা যেনো হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো! টিভি, রেডিও, খবরের কাগজ কোথাও তাঁর নাম নেই। ইনডেমনিটি এ্যাক্ট করে বংগবন্ধু'র আত্মসিকৃত হত্যাকারীদের পূনর্বাসিত করেছিলেন খুনি মোস্তাকের দোস্ত জিয়াউর রহমান, আমাদের শিশুমন থেকে বংগবন্ধুকে ভুলিয়ে দেবার জন্য জিয়াউর রহমান অনেক কিছুই করেছিলেন! তিনি প্রথমেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তৈরী করলেন শিশু পার্ক, বংগবন্ধু যেখানে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন! শিশুদের মগজ ধোলাইয়ের জন্য তিন 'নতুন কুঁড়ি'নামে শিশুদের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান চালু করেন, এবং পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি স্বসরিরে হাজির হতেন, তাদের সাথে হাসিমুখে সময় কাটাতেন! শিশুরা জাতীর ভবিষ্যৎ। তাই তিনি সুকৌশলে শিশুদের মগজ ধোলাইয়ের জন্য শিশু বিনোদনের ব্যবস্থা করেছিলেন! তিনি এতে খুব ভালো ভাবেই সফলতা লাভ করেছিলেন! কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুন সমাজের মধ্যে তিনি অস্ত্র আর টাকার নেশা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। তৈরী করেছিলেন অভি-নিরু-বাবলু -সজলদের মতো মাস্তান বাহিনী!বানের জলের মতো টাকা তিনি ব্যায় করেছেন ছাত্রদের ছাত্রত্ব নষ্ট করার কাজে!


কলেজে ভর্তীর পর নতুন সব বন্ধু। কিন্তু এ কি! বেশীর ভাগই ছাত্রদলের সমর্থক, শুধু তাই না, তারা বংগবন্ধু ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সন্মন্ধে মনগড়া কিছু কাহিনী তোতা পাখির মতো ভাঙা ঢোলের মতো বাজায়।ছাত্রলীগের মেয়েও হাতে গোনা যায়, এমন অবস্থা!মেয়েরা ছাত্রলীগ করতে ভয় পায়, কারণ ছাত্রদলের মেয়েরা তাদের হেনস্থা তো করেই মেয়েদের হলের রুম পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেয়। আর বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শেখ হাসিনার কোন পোষ্টার তো কোন ওয়ালে লাগানোই যেতো না। রাতে লাগালে সকালে নেই।এরকম চিত্র ছিল পুরা বাংলাদেশে।আর কারফিউ চলতো মাসের পর মাস জুড়ে!
তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের যে কি ভয়ংকর অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তা কয়েকটা লাইনে লিখে শেষ করা যাবে না!ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের নামে বিভিন্ন মামলা আর হুলিয়া দিয়ে, ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের অত্যাচার,আজ একজনের সাথে কথা বললাম, তো কাল শুনি তিনি লাশ হয়ে গিয়েছেন।গুম, খুন এগুলো ছিল ছাত্রদলের প্রতিদিনের কাহিনী! বংগবন্ধু'র ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ তখন আমাদের প্রজন্ম দেখেনি, শোনেনি। আমরা যারা রাজনৈতিক পরিবারের সদ্স্য,যারা রাজনৈতিক দলের সদস্য, তারা ছাড়া সাধারণ মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য, বি এন পি জামায়াত জোট সরকার টিভি, রেডিওতে তা দেখানো বন্ধ রেখেছিল। ইনডেমনিটী অর্ডিন্যান্স, এই কালো আইনটা করে জিয়াউর রহমান বংগবন্ধু'র খুনিদের বিচারের সব পথ বন্ধ করে রেখেছিলেন।আমরা সেই সব বীর নেতা কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞ, ঋণী যারা নিজের জীবনের পরোয়া না করে বংগবন্ধু'র খুনিদের বিচার চেয়ে নির্মম অত্যাচার শয়েছেন,জীবন দিয়েছেন। তাঁরা পথ দেখিয়েছেন, আমরা তাঁদের পথে হেটেছি। আমাদের কোন চাওয়া পাওয়া ছিল না।আমরা শুধু চেয়েছি আমাদের আপা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা আর বংগবন্ধু'র খুনিদের বিচার। আমরা স্বপ্ন দেখতাম একদিন আমাদের আপা প্রধানমন্ত্রী হবেন, খুনিদের বিচার করবেন। তবে সেই দিনটা কবে, কতো বছর পর তা আমাদের জানা ছিল না। আমরা হতাশ হইনি, আমরা যেকোন সমস্যা হলে বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের উপদেশ নিতাম। মাননীয় সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আমাদের প্রিয় কাদের ভাই তখন 'বাংলার বানী' অফিসে বসতেন। আমরা যেকোন সমস্যায় পড়লে তাঁর কাছে ছুটে গিয়েছি, তিনি অসীম মমতায় আমাদের রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছেন। আমাদের সময় ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের মধ্যে স্নেহ, শ্রদ্ধা আর ভালবাসার বন্ধন ছিল। এখনো আমরা তাঁদের শ্রদ্ধা করি। যেদিন ইনডেমনিটি এ্যাক্ট বাতিল হল আমাদের আপার হাত দিয়ে আমার মনে হয়েছে, দেশ নতুন করে স্বাধীন হয়েছে।
আজ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ তৃতীয় বারের মতো ক্ষমতায়। অতিথী পাখির ভিড়ে, দলের অনেক ত্যাগী নেতা কর্মীই নীরবে চোখের জল ফেলেন। দলীয় বিভিন্ন প্রোগ্রামে তাঁরা কিছু পেতে নয় শুধুই প্রাণপ্রিয় আপাকে এক নজর দেখতে যান। কিন্তু তাতেও দেখা যায়, এখনকার ছাত্রলীগ নামধারী কিছু নেতা তাঁদের ন্যুনতম সন্মানটুকুও দিতে চায় না। দেখা গেলো, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আর তাঁর সামনে তাঁর সন্তানসম ছাত্রলীগ নেতা চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে! একটি চেয়ারও তো তাঁর দিকে এগিয়ে দেয়া যায়! একজনকে সন্মান দিলে নিজেও যে সন্মানিত হওয়া যায়, এটা বোধহয় এরা জানে না! এখনকার কিছু ছেলেমেয়ে বলে, 'আরে মিয়া রাখেন, রাজপথ আমরা ধইরা রাখছি, আপনেরে চিনি না, আপনে কে?'
আমার কথা একটাই, রাজপথ এখন ধরে রাখার কিছুই নাই। দলের সুসময়ের মানুষ তোমরা। কিন্তু দলের দুঃসময়ে, ১৯৭০,১৯৮০,১৯৯০ দশকে যখন এক একজন কর্মী,নেতা তার যৌবনের মূল্যবান সময়টুকু নির্দিধায় ব্যায় করেছেন দলের জন্য দেশের জন্য, তাঁদের জন্য আর কিছু না হোক একটু সন্মানতো আমরা দেখাতে পারি! কারণ তাঁরা আমাদের ভিত্তি। ভিত্তিটা শক্ত ছিল বলেই আজ আমাদের পথটা এতো সহজ!
আজ,আমরা টিভিতে বংগবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ দেখতে পাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেখি,কতো পোষ্টার,কতো ছবি, কতো সমর্থক! ভালো লাগে এই ভেবে, এই দিনের অপেক্ষায়ই তো আমরা ছিলাম!
এখন একটাই চাওয়া আমাদের আপা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্থতা আর তাঁর দীর্ঘ জীবন। আল্লাহ্‌ আমাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করুন।
জয় বাংলা, জয় বংগবন্ধু।