Slideshows

http://bostonbanglanews.com/index.php/images/stories/2015/April/05/04/images/stories/2015/April/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/605744Finding_Immigrant____SaKiL___0.jpg

কুইন্স ফ্যামিলি কোর্টে অভিবাসী

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ দ্যা ইন্টারফেইস সেন্টার অব নিউইয়র্ক ও আইনী সহায়তা সংগঠন নিউইয়র্ক এর উদ্যোগে গত ২৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ৯ See details

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

নেই সেই ধূমকেতু = জুলি রহমান

শনিবার, ২৭ মে ২০১৭

কুড়ি টাকায় যার সংসার
নিত্য হয়ে যেতো অসাঢ়
তেল আর ন্যূনে পান্তা
বলছে দেশ তুমিই সবজান্তা---

প্রমিলা গুনে প্রমাদ
বুকে প্রেম প্রসাদ
অকাতরে করে দান
বুলবুলেরও আত্নদান---

হারিয়ে সন্তান চিকিৎসা বিহীন
জীবনের সুখ হয় লীন
বুকে তাঁর অগ্নিবীনা কন্ঠে সুর
মুখে তাঁর বিষ;জাতীয় মধুর---

Picture

জেলের তালা ভাঙরে তোরা
শ্লোগানে মুখর দিশাহারা
অনশনে কাটে দিন
বিরোজার মুখ মলিন---

রবী লিখেন চিঠি খোলা
খেয়ে নে নূরু এতো কেনো উতলা?
দেশটা সবার শোনরে পাগলা
তোকে পেলে দেশ মুখ উজালা---

আরো তো ছিলো পন্চ কবি
অসম্প্রাদীকতায় ফোটেনি ছবি।
বলেন বন্ধু শিয়াম রসটুকু শুষে
মারবে দেশ তোকে হেমের বিষে--

শুনেনি কবি কারো কথা
নিজের পরাণে স্বপ্ন গাঁথা
বের করলেন ধূমকেতু
ধর্মের যাতাকলে না হয়ে থিতু---

বিরহের গান বাজে নার্গিস বনে
পিশে মারে সমাজ তাঁকেই আনমনে
কাফের মোনাফেক কতো শতো বয়ানে
থাকেন কবি তবুও গভীর ধ্যানে--

কী পেয়েছেন কবি দেশ ভালোবেসে?
মূক বধির কালা জীবন অবশেষে!
আসবে কী এমন যুগের তাপস?
নিধনে হত্যা যজ্ঞ ধূমকেতু সাজস?


বইমেলা ও একজন বিশ্বজিত - জুলি রহমান

বৃহস্পতিবার, ২৫ মে ২০১৭

এই মার্কিন মুল্লুকে বইমেলা এক প্রাণের উৎসব।মেল বন্ধন।স্বদেশ এবং বিদেশের সংগে।অসংখ্য অগনিত লেখকের বই নিয়ে রমরমাট পি এস সিক্সটি নাইনের গতর।নতুন বইয়ের মৌ মৌ গন্ধে মাতাল নিচ তলার অবয়ব। পূর্ণতা পেয়েছে ছাব্বিশ বছরেরবইমেলাটি। এ শেকড়হীন প্রবাস নয়।বরং শেকড় বাকড়ের দরারদরিতে আমরা মুখর এখন বাঙালী।আসছে বই। আসছেন মাওলা ব্রাদার্স থেকে শুরু করে দূরাগত লেখক প্রকাশক গন।আমার বাঙলার নাট্য গুনিজন।শিল্পী কবি লেখক প্রকাশকের মিলন মেলা।প্রবাস নিবাস একই ফুলে মালাগাঁথা।

এই মালাটি যিনি গেঁথেছিলেন আজ থেকে ছাব্বিশ বছর আগে তাঁর নামটি সবার পূর্বেই আসা উচিত। তিনি আমাদের বিশ্বজিত।আমি গত তিন দিনের পর্যবেক্ষণে যে অমানবিক পরিশ্রম তাকে করতে দেখলাম এ সবই কী পয়সার বিনিময়ে হয়? কিংবা এ ঋণ পরিশোধ যোগ্য? এই যে এতো লেখক কবির মিলন মেলা ;তারপর কেউ একটু আসন চ্যূত হলেই কতো কথার উদ্ধৃতি। হায়রে মানুষ!উপরে উঠার মই পাবার জন্য নিজের বিবেক বুদ্ধি বিবেচনা কে কী ভাবে বিক্রি করে।
যদি ঘরে ঘরে এমন শ্রমিক বিশ্বজিত তৈরী হতো তবে আমার দুখি বাংলার তরুন ছেলেরা সোনার ছেলে পরিনত হতো।এতো খুন হত্যা রাহাজানি ধর্ষণ পরশ্রী কাতরতা হিংসা বিদ্বেষের সূত্রপাত হতো না।প্রতিটি ভালো কাজের পেছনে কিছু মন্দ লোকের নিঠুর কালো হাত আজীবন থাকে। আর এ টি থাকে বলেই ভালো কাজটি আরো ভালো হয়ে উঠে। তাই আজ বিশ্বজিতের বই মেলার বিগত হলো ছাব্বিশ বছর। সকলকে সংগে নিয়ে দৃঢ়তার সংগেই এগিয়ে যাবে বই মেলা।



আকবর হায়দার কিরণ ভাই বলেছিলেন কেমন লাগছে বই মেলা এই প্রবাসে।প্রবাস কোথায়? আর তো কোনো প্রবাস নিবাস নেই। বই মেলাই তা আমাদেরকে বুঝিয়ে দিলো।নতুন বইয়ের মৌ মৌ গন্ধ যখন বাতাসে মিশে হরেক রঙে রন্জিত হয়ে পা জামা পান্জাবী শাড়ি ছাপিয়ে মেদুর হয় তখন মাটি  মা প্রকৃতি দূরে থাকে না।সভ্য সংস্কৃতি আমাদের অবয়বে লালন করে। এখন শুধু আমাদের সুন্দর সাবলীল চর্চার প্রয়োজন।দরকার সহনুভূতি সহনশীলতা।নতুনদের জায়গা করে দেয়া।পুরনোদের শ্রদ্ধার আসনটিকে মর্যাদাশীল করা।এই পারস্পারিক সৌহার্দ প্রীতিই আমাদের সজীব রাখবে।কাউকে নিরাশ করে হতাশ করে নয়।আশাহতের দীর্ঘ শ্বাসের আঁচড় যেনো না লাগে বই মেলার গতরে। এই সুন্দর গঠন মূলক কর্মটি যেনো উত্তরোত্তর বৃ্দ্ধিপ্রাপ্ত হয় হৃষ্টপুষ্ট ভাবে। সেই দিকটাতেও লক্ষ রাখতে হবে আয়োজকদের।আজ এখানে যে বইয়ের সমাগম তাতে বাংলা একাডেমী কী খুব বেশী দূরে?আমাদের বাচ্চারা দু ভাষী হলেও তাঁরা সংস্কৃতি অংগন টাকে ধরে রাখছে। এতো কঠিন জীবন ব্যব্সথায় ও তাঁরা বাঙলাটাকে বুকের পাঁজরে কোথায় কোন সিন্দুকের কোনায় যেনো লুকিয়ে রেখেছে। সময়ের দাবীতে তাঁরা পৌরানিক চাবির গোছা দিয়ে সেই তালা খুলে যেনো নিজেদেরকে দাঁড় করাচ্ছে।বিপা , বাফা ,শতদল, সুরছন্দ, উদিচী আরো বহু সংগঠন আছে যারা কাজ করে যাচ্ছেন।তাই বলছি বাংলা একাডেমীকে আমরা আর মিস করবোনা। এখানে কিছু ভালো প্রকাশনা তৈরী হলেই ষোলোকলা পূর্ণ।

এবার বই মেলার প্রথম দিনের আড্ডাটি বাংলার প্রান্তরকে ছাড়িয়ে গ্যাছে।চন্চলা বাতাস।উদলা আকাশ। এলোমেলো চুল।বিক্ষিপ্ত শাড়ির আঁচল কথার যাদু। আসন বিহীন কবিতার পঙতি বাতাসে ছড়িয়ে দেয়া।বন্ধুদের সংগে মন খুলে কথার খই ফোটানো।চিপ্স চা কফি ।বহুদিনের অদেখা আদল।পুরনো বন্ধুদের কাছে পাওয়া। এসবই বই মেলাতে সবাই পেয়েছে। আর এর মূলে যে বিশ্বজিত তাকে আপনারা একটা স্যালুট দিবেন ই দিবেন।

হাসান ফেরদৌস,নিনি ওয়াহেদ, সাজেদীন ভাই,রেখা আহমেদ ,মনজুর আহমদ,কৌশিক ভাই মোহাম্মদ উল্লাহ, প্রফেসর আপা হুসনেয়ারা ফজলুর রহমান বেলাল বেগ এ কয়টি মুখ দর্শণ না করলে কোথাও কিছু নেই যেনো। এরা বট বৃক্ষের মতো ছায়া দানকারী। আমরা সেই ছায়া তলে পরম নিশ্চিন্তে চলছি ফিরছি। আমি আমরা বাস করছি এমন একটা শহরে যেখানে বাস করছেন মোত্তালিব বিশ্বাস তাজুল ইমামের মতো মানুষেরা। আমরা তো কোনো দিক দিয়েই অপূর্ণ নই। যেই শহরে গীতিকার নাদিম আহমদের বাস! আমরা ধনে ধান্যে পরিপূর্ণ।তাদের দীর্ঘায়ু কামনা করছি।এদের মুখনিসৃতকথা গুলো কে মনে রেখে প্রজন্ম অগ্রসর মুখী হচ্ছে তাঁরই প্রমান শ্যামন্তী ওয়াহেদ।মুমু আনসারী।
ক্ষুদে বন্ধু কাব্যসহ আরো অনেকেই। হয়তো অজ্ঞাত আরো কতো মেধা আছে যা চাপা পড়ে আছে।তাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর এদেরকে আমরা দেখি বিভিন্ন সংগঠনে তন্মধ্যে
বইমেলাটাই উন্মুক্ত প্রাঙ্গন। আর এই উঠোনটি যিনি নিজ হাতে গড়েছেন তিনি সেই বিশ্বজিত।যার রয়েছে বই বাড়ি।মুক্তধারা ফাউন্ডেশন।বইয়ের দাম বেশী? নিশ্চয়ই একটা শাড়ি কিংবা মূল্যবান স্যূট-কোটের চেয়ে বেশী নয়?বেলোয়ারী যেমন বাহ্যিক শোভা বর্ধনের সহায়ক।বই তেমন মনন বৃদ্ধি বোদ্ধাংকের গড় নির্ণয়ের সহায়ক। বই কিনুন।আশাবাদী আমরা
বই মেলাতে ছড়া বই গুলোর কাটতি দেখে। বিলুপ্ত নয় বংশধর।ওরা তৈরী হচ্ছে !হবে। অভিভাবকদের সন্তান প্রীতিতে মুগ্ধ। তাঁরা প্রিয় বইটি তুলে দিচ্ছেন সন্তানের হাতে।সাধুবাদ বাঙলার পিতামাতাকে।সার্থক কবিকূল ছড়াকার বইমেলা এবং আমাদের বিশ্বজিত।


নিথর চোখে জোছনা = রুহুল আমীন রাজু

বৃহস্পতিবার, ২৫ মে ২০১৭

মতিপাগলের দু'হাতের কব্জি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিরা কেটে দিয়েছিল। তাকে হত্যা'ই করা হতো। কিন্তু গ্রামের এক রাজাকারের সুপারিশে তা না করে কব্জি কাটা হয়। সুপারিশের কারণ ছিলো, গুলি করলে তো খেলা শেষ। নির্মম খেলা দেখার জন্যই ছিল সেই সুপারিশ।
দেশ স্বাধীন হয়। মতি পাগলের ঘর আলো করে আসে প্রথম কন্যা সন্তান। নাম রাখা হয় হাসি। দ্বিতীয় কন্যার নাম খুশি। সর্বশেষ ছেলের নাম আনন্দ। পঙ্গুত্বের কারনে অভাব-অনটন তার নিত্যদিনের সাথী হলেও সুখ ছিলো সংসারে। এ জন্যই তার সন্তানদের নাম রাখা হয় হাসি, খুশি, আনন্দ। হাসির বিয়ে হয়েছে। খুশী জন্মান্ধ বলে ওর বিয়েটা হচ্ছে না। তাই বলে পরিবারের কেউই তাকে বোঝা মনে করে না। মতিপাগল খুশিকে লক্ষী খুশি বলে ডাকে। মতি পাগল মাঝে মধ্যে বাড়ী এলে অন্ধ খুশি পরম মমতায় তার সেবাযত্ম করে থাকে। তখন মনেই হয় না, খুশি অন্ধ।
    আনন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তার এই ঢাবিতে পড়ার বিষয়টি নিয়ে গ্রামে বিস্ময়ের শেষ নেই। একটা পাগলের ছেলে কিনা পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে!!! মতি মিয়া পাগল হয় ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর। তার যেটুকু জমি ছিল, তাতে সংসার ও পড়ালেখার খরচ যোগানো কঠিন হয়ে পড়ে। ষাটোর্ধ মতি মিয়া পঙ্গু জীবন নিয়ে কর্ম করার মতো কোনো অবস্থা ছিল না। ছেলের পড়ালেখা বন্ধ হোক-এটাও মেনে নিতে পারেনি। এমনি একা দুর্বিষহ সময়ে মতি মিয়ার মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। আর এলোমেলো পাগল জীবনের পরই আর্থিক ভারসাম্য কিছুটা ফিরে আসে তার। যা নিয়ে তার পরিবারে ও গ্রামে রহস্যের শেষ নেই।
    এ বছর অনার্স ফাইনাল পরীক্ষায় অর্থনীতিতে তাক লাগানো ফলাফল অর্জন করায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আনন্দকে দশ হাজার টাকা পুরুস্কৃত করেছে। টাকা গুলো পেয়ে সে কিছুটা সমস্যায় পড়ে যায়। টাকা দিয়ে সে কোনটা রেখে কোনটা করবে ভেবে পায় না। মায়ের পেটের পাথর বের করতে অপারেশনে প্রয়োজন ৫০ হাজার টাকা। অন্ধ বোনটার চোখে কর্নিয়া সংযোজন করতে লাগবে ৬০ হাজার টাকা। বড় বোনের স্বামীকে যৌতুকের দাবী মেটাতে প্রয়োজন হিরো হোন্ডা হান্ড্রেট সিসি মটর সাইকেল। এই টাকা দিয়ে কিছুই করা সম্ভব নয়। হঠাৎ আনন্দের মনে পড়ে যায় কাঁটার কথা। বুকটা হু হু করে উঠে তার। এই কাঁটার কথার আঁচরে একদিন রক্ত ঝরার কারনে আনন্দ আজ সেরা ছাত্র। কাঁটা এখন কোথায়...? কেমন আছে ও...? তার সন্ধান যদি পাওয়া যেত ,তাহলে না হয় টাকাগুলো দিয়ে তাকে ভাল কিছু একটা প্রেজেন্ট করা যেত।

Picture
অবশেষে টাকাগুলো আনন্দ তার পাগল বাবাকে দিয়ে দেয়। টাকা পেয়ে মতি পাগল তার বাড়ীর পাশে আড়িয়ালখাঁ নদীর তীরে নিজের জন্য অগ্রীম পাকা একটি কবর বানায়। কবর বানানোর পর কিছু টাকা রয়ে গেছে। অবশিষ্ট টাকা দিয়ে সে এক খাঁচা রুটি কিনে আনলো। গ্রামের সব কুকুর জড়ো করে তাদের রুটি খাওয়ানোর আয়োজন করলো। নিমন্ত্রনে সাড়া দিয়ে অনেকগুলি কুকুরের সমাগম ঘটেছে। এই দৃশ্য দেখার জন্য লোকজনও জটলা বেধেছে।
কুকুরগুলি গোগ্রাসে রুটি খাচ্ছে আর ফ্যালফ্যাল চোখে মতি পাগলকে দেখছে। এর মধ্যে একটা বয়স্ক লোমপড়া ন্যাড়া কুকুর বার বার তাকাচ্ছে মতিপাগলের দিকে। মনে হচ্ছে এই ন্যাড়া ক্ষুধার্ত কুকুরটি তাকে বলেছে, ধন্যবাদ মতি পাগলা--ধন্যবাদ। কুকুরটি ও-ও-ও শব্দ করছে কিছুক্ষন পর পর। হয়তো কুকুরটির ও-ও-ও শব্দের অর্থ ধন্যবাদ। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটেএলো স্থানীয় সাংবাদিকগন। মতিপাগলকে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলো, লোহাজুরী গ্রামেতো ভিক্ষুকের অভাব নাই, তাদেরকে না খাওয়াইয়া কুকুরকে রুটি খাওয়াচ্ছো কেন? আর এতো টাকা পাইলা কই? মতিপাগল মৃদু হেসে উত্তর দিলো, আমি পাগল মানুষ আমি যদি মাইনষেরে লুডি খাওয়াই তাইলে যে চেরম্যান মেম্বাররার দূর্নাম অইব। হের লাইগগা কুত্তাডিরে খাওয়াইতাছি। আর ট্যাহা----ট্যাহা দিছে আমার ছেরা আনন্দ। জবর ভালা পাশ দিছে আমার ছেরা। হেই পাশের পুরুস্কারের হগল ট্যাহা আমারে দিছে।
সাংবাদিকদের দ্বিতীয় প্রশ্ন-শুনেছি সেই টাকা দিয়ে তুমি তোমার অগ্রীম কবরও বানিয়েছে?
হ, হ সাম্বাদিক সাব, ঘটনা সত্য। আইয়ূ্যন আমার কবরটা ইকটু দেইখখ্যা যাইন।
সাংবাদিকরা মতি পাগলের সাথে যেতে লাগলো। ন্যাড়া কুকুরটিও পিছু নিয়েছে। মতি পাগলের বাড়ীর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আড়িয়ালখাঁ নদী। বর্তমানে পানি শূন্যতার কারনের খাঁ এর উপর থেকে চন্দ্রবিন্দু উঠে গিয়ে খা খা করছে নদীটিতে। এই নদীর তীরে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে কবর বানানো হয়েছে। কৃষ্ণচূড়া ফুলের সাথে মিল রেখে কবরে লাল রং করা হয়েছে।
সাংবাদিকরা মতি পাগলকে তার কবরের পাশে দাঁড় করিয়ে ছবি তুললো। পরেরদিন সব পত্রিকায় তা প্রকাশ হয়। তার পরে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলেও প্রকাশ হয় সচিত্র প্রতিবেদন। বেশ পরিচিত হয়ে উঠে মতি পাগল। পাশাপাশি পাগল হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়ে যায় সকলের। ক'দিন আগে তার পাগলামীকে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখতো। এখন আর কারো সন্দেহ নেই। দোকানের সামনে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই দু'টাকা দিয়ে দিচ্ছে সবাই। ভাংতি না থাকলে পাঁচ টাকা এমনকি দশ টাকাও দিচ্ছে।
হঠাৎ আয় রোজগার বেড়ে গেল তার। এবার একটি স্কুল নির্মাণের কাজে হাত দেবে মতি পাগল। অভাব-অনটনের কারনে স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের জন্য স্কুল। শুধু নিজের সন্তানকেই মানুষ করলে হবে না, গ্রামের সবাইকে মানুষ করতে হবে। মনে মনে স্কুলের নাম নির্ধারণ করে ফেলে সে। "মতি পাগলের স্কুল"। স্কুলের হেড মাস্টার করা হবে আনন্দকে।
এমন দেশপ্রেম যার বুকে, সে পাগল হয় কি করে? আসলে মতি পাগল 'পাগল' নয়। সে পাগলের চমৎকার অভিনয় করে যাচ্ছে। পঙ্গুত্বের কারনে কর্ম অক্ষমতা, সংসারে অভাব, ছেলের উচ্চ শিক্ষায় অনিশ্চয়তা এই পরিস্থিতিতে অগত্যা নিরুপায় হয়েই সে পাগলের অভিনয় করতে বাধ্য হয়। কি কঠিন এক মিথ্যা অভিনয়। নিধারুন কষ্ট-তবুও নিজেকে সুখী ভাবে সে। কিন্তু সুখ যে বড় ক্ষনস্থায়ী। মতি পাগলের সুখের দিন বোধ হয় শেষ। মানিকখালী রেলষ্টেশনে এই মাত্র পত্রিকা এসে পৌছলো। আজকের প্রধান শিরোনাম দেখে হতভম্ব আর বাকরুদ্ধ হয়ে যায় মতি পাগল। বাবা হয়ে নিজ কন্যার ধর্ষণের খবর সে কিভাবে পড়ে তার শ্রোতাদের শুনাবে...? যন্ত্রনায় তার বুক ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। রেল গাড়ীর হুইসেলের চেয়েও আরো বিকট শব্দে চিৎকার করতে ইচ্ছে হচ্ছে। তার পাশে বসা শ্রোতারা অপেক্ষায় আছে দেশের খবরাখবর জানতে। বাদাম বিক্রেতা যুবকটি বললো, কই মতি পাগলা পত্রিকা পড়া শুরু করতাছো না কেরে? লালকালি দিয়া বড় বড় কইরা কি লিখছে? নীচে দ্যাহি ছুন্দুরী একটা ছেড়ীর ফডুও। আরে পাগলা তাড়াতাড়ি পড়া শুরু কর। গাড়ি আইয়া পড়লে আর খবর টবর জানুন জাইতনা।
মতিপাগল উঠে দাঁড়ালো। পত্রিকাটি লাথি মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো, বাংলাদেশ অহনো স্বাধীন অইছে না। এটকা শিশু জন্ম নিতে লাগে দশ মাস। এর আগে জন্ম নিলে শিশুর চোখ ফুডে না। বালা কইরা কথা কইতে পারে না। আর এই দেশটা জন্ম নিছে মাত্র নয় মাসে-এইডা অইছে না। দেশ অহনো আন্ধা...দেশের চোখ ফুডছে না। দেশ আন্ধা.....। রেল লাইনের মধ্য দিয়ে দৌড়াতে লাগলো সে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। চাল, ডাল তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আনন্দের অন্ধ বোন ধর্ষনের বিচারের দাবিও যুক্ত হয়েছে এই আন্দোলনে। কিছুক্ষনের মধ্যেই ছাত্ররা মিছিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাযর্ালয় ঘেরাও করবে।
হাজার হাজার শিক্ষার্থী নেমে গেছে রাজপথে।
"চালের দাম বাড়লো কেন? প্রধানমন্ত্রী জবাব চাই"
"তেলের দাম বাড়লো কেন? প্রধানমন্ত্রী জবাব চাই"
"অন্ধ যুবতী ধর্ষণ কারীর, বিচার চাই, বিচার চাই"
   আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে রাজপথে মিছিল এগিয়ে চলছে। প্রেসক্লাব পেরিয়ে মৎস্য ভবনের কাছে পেঁৗছতেই মিছিলে বাধা দিলো পুলিশ। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা পুলিশ বেষ্টনীর মাঝেই শুরু করলো আরো জোরে শ্লোগান।
অন্ধ যুবতী ধর্ষণকারীর-বিচার চাই, বিচার চাই...............
   শুরু হয়ে গেল পুলিশী এ্যাকশন। বেদম লাঠিপেটা, টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট, অত:পর গুলি.....।
থমকে যায় মিছিল। ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে ছাত্ররা। দিকবিদিক ছুটতে থাকে সবাই। ব্যস্ততম রাজধানীর মহাসড়ক মূর্হুেতই জনশূন্য হয়ে যায়। পীচঢালা কালো রাস্তার পাশে এক যুবকের নিথর দেহ পড়ে রয়েছে। ঘন্টাখানেক পর একদল ছাত্র রাস্তায় পড়ে থাকা লাশটি নিয়ে মিছিল শুরু করলো -
আনন্দের বুকে গুলি কেন?
প্রধানমন্ত্রী জবাব চাই.....
পুলিশ এসময় জলকামান নিয়ে চড়াও হলে ছাত্ররা লাশটি ফেলে পালিয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর আরেকটি ছাত্র সংগঠন লাশটি তুলে নিয়ে মিছিল ধরলো-
আনন্দ লাশ কেন? বিরোধীনেত্রী জবাব চাই...।
পুলিশ লাশটি তাদের হেফাজতে নিলো। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিঙ্ মিডিয়ার সাংবাদিকরা ঘিরে ধরলো লাশটি। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশের এডিসির কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন -
পুলিশ ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি করলো কেন?
আনন্দ কার গুলিতে প্রাণ হারালো?
লাশ নিয়ে দু'টি ছাত্র সংগঠনের পৃথক পৃথক মিছিল করার রহস্য কি?
আনন্দ আসলে কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য?
পুলিশের এডিসি পাশ কাটিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। এসময় একটি ফোন আসে তার মোবাইলে। সঙ্গে সঙ্গে বোবা হয়ে গেলেন তিনি। লাশ ময়না তদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর নির্দেশ দিলেন পুলিশ কর্তা।
    লাশের ময়না তদন্ত করতে এসে পাথরের মূর্তিরূপ ধারণ করলো কর্তব্যরত ডাক্তার। একি? এতো সেই আনন্দ। মফস্বল কলেজ জীবনের বন্ধু। ডাক্তার কাঁটা আনন্দকে চিনতে এতোটুকু ভুল করেনি। তার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে। বুকে শুরু হয়েছে সুনামী। তীব্র যন্ত্রণায় বুক ফেটে যেতে চায়ছে। একজন ডাক্তার হিসাবে সে এ মূহুর্তে কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। তার এ অবস্থা দেখে প্রফেসর ডা: এম.এ মান্নান জানতে চাইলেন, এনি প্রবলেম?
কাঁটা কোন উত্তর দিতে পারলো না। দু'হাতে মুখ চেপে ধরে অবুঝ শিশুর মতো কেঁদে উঠলো।
৫ বছর আগের কথা। বাবার চাকুরির সুবাদে কটিয়াদী ডিগ্রী কলেজে লেখাপড়া করার সময় কাঁটার পরিচয় হয় আনন্দের সাথে। আনন্দ অত্যন্ত শান্ত ও নিরীহ টাইপের ছিল। কাঁটা ছিল ক্লাসের যেমন সেরা ছাত্রী দেখতেও ছিল সেরা। পোষাক পড়তো একটু সেন্সর বিহীন। তাই কলেজের সবার চোখ থাকতো কাঁটার দিকে। ব্যতিক্রম ছিল আনন্দ। সে কখনো আগ্রহ করে তাকাতো না কাঁটার দিকে। বিষয়টি নিয়ে সহপাঠিদের নানান হাস্যরসের খোরাক ছিল সে। কাঁটাও লক্ষ্য করছিল বিষয়টি।
একদিন কলেজ যাওয়ার পথে হঠাৎ বৃষ্টি এসে পথরোধ করে দেয় কাঁটা ও আনন্দের। রাস্তার পাশের এক বাড়ীর বারান্দায় ওরা দু'জন দাঁড়িয়ে। কাঁটা আনন্দকে কাছে ডাকে। অস্কার বিজয়ী সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক বাড়ী সমর্্পকে জানতে চায়। আনন্দ যেটুকু জানে তা বলে, উনার বাড়ীটি এইতো ৬/৭ কি: মি: দূরে মসূয়া গ্রামে। জমিদার বাড়ীটি একটি কংকাল ভবন হিসাবে কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আছে শান বাঁধানো ঘাট। শুনেছি খুব শীঘ্রই এটিকে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।
কাঁটা বললো ও তাই। একদিন যাবো ওখানে। আচ্ছা আনন্দ আমাকে তোমার দেখতে ভাল লাগে না?
: হঠাৎ একথা?
: না, এমনি জানতে চাইলাম। তুমি আমাকে হিংসা কর, তাই না?
: কেন, হিংসা করবো কেন?
: এই যে আমার দিকে সবাই তাকায়, আর তুমি তাকাও না যে?
: কে বলেছে? সুন্দরকে কে না দেখে।
: আমার তো তা মনে হয় না।
: তুমি যখন হাসো তখন তোমার গালে টোল পড়ে। আমার কাছে তা অদ্ভুত সুন্দর লাগে। একটু ইতস্ত করে সে বলল, আমার ইচ্ছে হয় ওখানে ছুঁয়ে দেখতে।
কাঁটা অবাক হয় আনন্দের কথায়। গোবেচারা মনে হলেও সে অনেক গভীর জলের মাছ। অহংকার বোধ থেকে নাকি অন্য কোনো কারনে কাঁটা বললো, ওখানে ছুঁতে হলে এ জাতীয় লেখাপড়ায় হবে না। আনন্দ সেই থেকে কাঁটার এ কথায় আঁচড়ে পরিণত হয় অন্য মানুষে। যার প্রমাণ ঐ বছরই আই.এ পরীক্ষায় সেরা হয় আনন্দ। দ্বিতীয় হয় কাঁটা। যা খাল কেটে কুমির আনার মতো অবস্থা। এতে এতোটুকু কষ্ট পায়নি কাঁটা। তার কথায় বদলে যায় একটি মানুষ। বরং সে নিজেকে একটু গুরুত্বপূর্ণই মনে করেছিল। এভাবেই মনের অজান্তে ওরা একে অপরের প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ে।
কাঁটার বাবা হঠাৎ বদলী হয়ে যায়। চলে যাওয়ার সময় ঠিকানা দেওয়ার সময় হয়নি। সেই থেকে অজ্ঞাত আর অজানা রয়ে যায় কাঁটা। দীর্ঘদিন পর আবার তাদের দেখা হলো। কাঁটার দেয়া শর্ত পূরণ সত্ত্বেও আনন্দের আর তা ছুঁয়ে দেখা হলো না। অদ্ভুত সেই সুন্দর অদ্ভুত'ই রয়ে গেল।
সন্ধায় কড়া পুলিশ প্রহরায় এ্যাম্বুলেন্সে করে আনন্দের লাশ তার গ্রামের বাড়ীতে আনা হয়েছে। গ্রামের সব মানুষের গর্ব ছিল আনন্দ। মাঠে-ঘাটে চায়ের স্টলে রূপ কথার গল্প ছিল সে। একটা পাগলের ঘরে জন্ম নিয়েছে আকাশের চাঁদ। মতিপাগলের বাড়ীতে নারীপুরুষ শিশুর ঢল নেমেছে। সবার চোখে জল। গগন বিদারী চিৎকার আর জলে একাকার আনন্দের মা-বোন। শুধু জল নেই মতি পাগলের চোখে। তার চোখ দু'টি লেলিহান শিখার মতো। লাশবাহী খাটিয়ার পাশে বৃক্ষ মানবের মতো ঠাঁয় বসে আছে মতি পাগল। কোন কথা নেই, আর চোখেতো জল নেই'ই।
কটিয়াদী মডেল থানার ওসি স্থানীয় চেয়ারম্যানকে দ্রুত কবর খুঁড়া ও জানাযার ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ জানালেন। চেয়ারম্যান সরকারী গোরস্থানে চৌকিদারকে কবর খুঁড়ার কথা বললে মতি পাগল হুংকার দিয়ে উঠলো। না,কারো জায়গায় আমার আনন্দের কবর দিওনের লাইগগা দিতাম না!
চেয়ারম্যান বললেন, তাহলে কোন জায়গায়? বলো মতি পাগল? মতি পাগল মাথার ইশারায় দেখালো কবরের স্থান। মাথা নাড়াতে গিয়ে তার মনে হলো, মাথায় কয়েকটন ওজনের কোন বস্তু। প্রচন্ড ভারের চাপে থর থর করে কাঁপছে মাথাটা। পিতার কাছে সন্তানের লাশ বহন করা পৃথিবীর বড় ট্রাজেডি।
মতিপাগলের অগ্রীম কবরের পাশে মাটি খুঁড়তে গেলে সে ধরাজ গলায় বললো, চেয়ারম্যান নতুন কইরা আর কবর করুনের দরকার নাই। আমার কবরে আনন্দরে শোয়াও।
বিস্ময়ভরা কন্ঠে চেয়ারম্যান বললো, কি বলতাছো এইসব...?
যা কইছি তাই কর চেয়ারম্যান, বলেই হা-হা-হা করে হেসে উঠলো মতি পাগল। হাসির তোড়ে পড়নের পরিহিত চটের বস্তা বার বার নীচে পড়ে যাচ্ছে। কাঁপা কাঁপা হাতে লজ্জা নিবারনের চেষ্টা চালাচ্ছে সে।
হাজার হাজার মানুষ জানাযায় দাঁড়ালো। স্থানীয় মসজিদের ইমাম নামাজের তাহরিমা বাধলেন- আল্লাহু আকবার... আল্লাহু আকবার...
রাত তখন দশটা। আজ ভরা পূর্ণিমা। চাঁদের আলোয় মানিকখালী রেলষ্টেশনটি অন্যরকম রূপ ধারণ করেছে। কি অপূর্ব লাগছে ছোট্ট এই ষ্টেশনটি। জোছনা ভরা এমন রাতে ষ্টেশনের ডান পাশের খোলা জায়গায় মতি পাগল মরে রয়েছে। তার নগ্ন লাশের চারদিকে উৎসুক মানুষের ভিড়। একটু দূরে বসে আসে একটা ন্যাড়া কুকুর।
   মানুষগুলো এখনও লাশটি দাফনের কোনো ব্যবস্থা না করে নগ্নদেহ দেখছে। মতিপাগলের চোখ দু'টি খোলা। যেনো মনে হচ্ছে, সে জোছনা রাত উপভোগ করছে…..


প্রশ্নফাঁস ও কোটার যন্ত্রণা, কেউ বোঝেনা = সিরাজী এম আর মোস্তাক

সোমবার, ২২ মে ২০১৭

১৯ মে, ২০১৭ তারিখে লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী চাকুরীর পরীক্ষা দিতে ঢাকায় এসেছিল। সকালে পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ওঠে। আর সরাসরি প্রশ্ন ফাঁসের কারণে বিকেলের পরীক্ষার ঠিক আগ-মুহুর্তে পরীক্ষা বাতিল করা হয়। বলা হয়, পরবর্তীতে পরীক্ষার তারিখ জানানো হবে।
সরকারি হিসেবে, বাংলাদেশে প্রায় ছাব্বিশ লাখ উচ্চ শিক্ষিত বেকার রয়েছে। তারা নিয়োগ পরীক্ষাগুলোতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। পাঁচ-দশটি খালি পদের বিপরীতে লাখ লাখ আবেদন করছে। আমাদের দেশে নিয়োগ পরীক্ষাগুলো অধিকাংশই ঢাকাতে অনুষ্ঠিত হয়। তাই প্রায় সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে হাজার হাজার বেকার ঢাকায় আসতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকা তথা পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, সাতক্ষীরা, কক্সবাজার প্রভূতি অঞ্চল থেকে ঢাকায় যাতায়াতে কমপক্ষে দুই হাজার টাকার বেশি লাগে। একটি দরিদ্র পরিবারে একজন বেকারের পক্ষে এ দুই হাজার টাকা যোগাড় করা যে কতোটা কষ্টকর, তা শুধু ভুক্তভোগীরাই উপলব্ধি করতে পারে। এ কষ্টের টাকায় বেকাররা সারারাত গাড়ীতে আসে এবং পরীক্ষা দিয়ে আবার সারারাত গাড়ীতে বাড়ি ফেরে। অতি কষ্টের টাকায় বাড়ী ফেরার আগ পর্যন্ত তারা শুধু পাউরুটি-কলা বা বাড়ী থেকে আনা খাবার খেয়ে কোনোমতে দিন-রাত কাটিয়ে দেয়। এত কষ্টে ঢাকায় এসে যখন শোনে, প্রশ্ন ফাঁসের কারণে পরীক্ষা বাতিল। পরবর্তীতে তারিখ জানানো হবে। তখন তাদের কেমন লাগে? শাসকেরা কখনো কি এ বিষয়টি ভাবে? এ বেকাররা বিলবোর্ডে যখন দেখে, দেশ উন্নয়নের জোঁয়ারে ভেসে যাচ্ছে অথচ তাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই, তখন কেমন লাগে?
এমনিতেই মুক্তিযোদ্ধা কোটার কারণে বেকাররা চরম ক্ষুব্ধ, তার ওপর প্রশ্ন ফাঁসের যন্ত্রণা- যেন মরার ওপর খাড়ার ঘা। সরকার মুক্তিযোদ্ধা কোটার প্রতি এতোটা গুরুত্ব দিয়েছে যে, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা শতগুণ বেড়েছে। সরকার বিগত চল্লিশ বছরের মুক্তিযোদ্ধা কোটা-ঘাটতি পূরণ করেছে। যেমন ধরুন, কোনো প্রতিষ্ঠানে ১৯৭৫ সাল থেকে এযাবত ৫০০ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাতে শতকরা ত্রিশভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটা হিসেবে ১৫০ জন নিয়োগের কথা। বিভিন্ন সরকারের গাফলতি বা বিশেষ কারণে হয়তো ১০০ জন নিয়োগ পেয়েছে। অর্থাৎ ৫০টি কোটাপদ ঘাটতি হয়েছে। একইভাবে, বর্তমানে উক্ত প্রতিষ্ঠানে ৭০টি পদ খালি হয়েছে। এর ত্রিশভাগ কোটায় ২১টি এবং আগের ঘাটতিপদ ৫০টি মিলে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটাতেই হয়েছে। এভাবে বিসিএস, ব্যাংক-বীমা, সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রেও শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধা কোটা পরিপালন হয়েছে। এতে যা হবার তাই হয়েছে। একসাথে বিশাল সংখ্যক খালি পদে শুধুমাত্র দুই লাখ তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা এককভাবে নিয়োগ পেয়েছে। আর কোটা বহির্ভূত ছাব্বিশ লাখ বেকার যথেষ্ট যোগ্যতা সত্ত্বেও বঞ্চিত হয়েছে। এ বঞ্চিতদের কষ্ট দেখার বা বোঝার কেউ নেই।
বাংলাদেশে ষোল কোটি নাগরিকের মধ্যে মাত্র দুই লাখ পরিবার কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পায়, তা কারো বোধগম্য নয়। যে দেশে ত্রিশ লাখ শহীদ প্রাণ হারায়, সেদেশে মাত্র দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা কিভাবে তালিকাভুক্ত হয়? তাহলে কি মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ বিসর্জনকারী ত্রিশ লাখ বীর সেনারা মুক্তিযোদ্ধা নয়? পৃথিবীর কোথাও শহীদেরা যোদ্ধা তালিকার বাইরে নয়। যোদ্ধা ও শহীদের সংখ্যাগত এতো ব্যবধান কোথাও নেই। শুধু বাংলাদেশেই ত্রিশ লাখ শহীদদের বঞ্চিত করে মাত্র দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধাকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তালিকাভুক্তদেরকে ভাতা ও কোটা সুবিধার নামে বাজেট-বরাদ্দ দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলসহ জাতীয় ও ঐতিহাসিক প্রতারণা করা হয়েছে। মেধাবী যুবসমাজকে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তারা বেকারত্বের যন্ত্রণা ভোগ করছে। প্রশ্ন ফাঁসের যন্ত্রণা এখন অসহনীয় মাত্রা যোগ করেছে। দেশের শিক্ষিত বেকারদের প্রতি প্রশ্ন ফাঁস ও মুক্তিযোদ্ধা কোটার এ যন্ত্রণা শাসক গোষ্ঠির জন্য বুমেরাং হতে পারে।
তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ দায়িত্বশীল মহলের কাছে আরজি, প্রশ্ন ফাঁসের যন্ত্রণা আর সহ্য হয়না। মুক্তিযোদ্ধা কোটাবৈষম্য ও বঞ্চণা, আর মানতে পারছিনা। দয়া করে বেকার যুবসমাজের যন্ত্রণা একটু দেখুন।  প্রশ্ন ফাঁসকারী পাপিষ্ঠদেরকে দেশদ্রোহী ও মানবতা বিরোধী অপরাধী ঘোষণা করুন। তাদেরকে শক্ত হাতে দমন করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করুন। প্রশ্ন ফাঁস ও কোটা বৈষম্যের শিকার যুবসমাজের দিকে সুনজর দিন।
শিক্ষানবিশ আইনজীবী, ঢাকা।


সৌদি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইয়েমেনিযোদ্ধাদের বিক্ষোভ

সোমবার, ২২ মে ২০১৭

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা দিয়েছেন সৌদি রাজা সালমান বিন আব্দুলআজিজ। রাজা নিজেই এই সোনার মেডেলটি মেহমানের গলায় পরিয়ে দেন। ‘মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য’ ট্রাম্পকে এই সম্মাননা দেয়া হয় বলে রিয়াদ দাবি করেছে।
তবে বিশ্বব্যাপী বিশ্বাস করা হচ্ছে,সৌদি রাজপরিবারের রাজতন্ত্র রক্ষা এবং আমেরিকার  কোম্পানিদের      স্বার্থে সৌদি  রাজ পরিবারের  আত্নসমর্পণ গ্রহণের মাধ্যমে সৌদি রাজপরিবারকে ধন্য করায় এই সম্মাননা দেয়া হয়ে আসছে।একই সাথে ট্রাম্ফ-সালমান জুটির মাধ্যমে মুসলমানদের সর্বোচ্চ পবিত্রতা ক্ষুণ্ণের প্রতিবাদে ইয়েমেন জুড়ে হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী বিক্ষোভ প্রতিবাদ। ইয়েমেনে গণহত্যায় রাজা সালমানকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিতে পৌঁছে যাওয়া লোভী ও লুটেরা সরকার প্রধানদেরকে তারা নিন্দা জানিয়েছে।   
 ৫মে শনিবার রিয়াদের আল ইয়ামায়াহ প্রাসাদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘অর্ডার অব আব্দুল আজিজ আলে-সৌদ মেডেল’ দেয়া হয়। তাকে স্বর্ণের মেডেলটি পরিয়ে দেন ৮১ বছর বয়সি রাজা সালমান।আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুলআজিজ আল সৌদের নামে চালু করা পদকটি সৌদি আরবের সেবা করার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিদেশি নাগরিকদের দেয়া হয়। এর আগে যেসব বিদেশি ব্যক্তিত্ব এই পদক পেয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জর্জ ডাব্লিউ বুশ, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে বর্তমানে সৌদি আরবে রয়েছেন ট্রাম্প। এরইমধ্যে  রিয়াদের কাছে ১১,০০০ কোটি ডলারের সমরাস্ত্র বিক্রির চুক্তি সই করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।মার্কিণ-ইজরাইল প্রভাবাধীন সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিস্তৃতির লক্ষ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিলন ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রস্তুতিরূপে অনেক বিশ্লেষক বিবেচনা করছেন। এতে আপাততঃ যুদ্ধের চেয়েও শত্রুতার চাপ সৃষ্টির হুমকি দেখা যাচ্ছে।
সৌদি আরবে এই মহড়ার কালে ইয়েমেনের জনগণের ওপর সৌদি আরবের বর্বরোচিত আগ্রাসনের প্রতি মার্কিন সমর্থনের প্রতিবাদে সানায় হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। একইদিন ইয়েমেনের রাজধানী সানায় অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা তাদের দেশে সৌদি আরবের ধ্বংসাত্মক তৎপরতায় মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতার তীব্র নিন্দা জানান।বিক্ষোভকারীরা ট্রাম্পের সফরের আগে ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রিয়াদকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের প্রশংসা করেন।
ইয়েমেনের জনপ্রিয় হুথি আনসারুল্লাহ যোদ্ধাদের দমন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মানসুর হাদিকে আবার ক্ষমতায় বসানোর লক্ষ্যে সৌদি আরব ২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে ইয়েমেনে পাশবিক বিমান হামলা শুরু করে। এ হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১২,০০০ মানুষ নিহত ও অপর হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে।
একজন বিক্ষোভকারী বলেন, “আমরা এখানে মার্কিন সন্ত্রাসবাদকে 'না' বলতে সমবেত হয়েছি। সেইসঙ্গে আমরা সৌদি সরকারকেও বলতে চাই, তারা গত আড়াই বছরের আগ্রাসনে কোনো কিছু অর্জন করতে পারেনি। রিয়াদ শুধু ইয়েমেনের নিরীহ জনগণকে হত্যা এবং এদেশের অবকাঠামো ধ্বংস করতে পেরেছে।”আরেকজন বিক্ষোভকারী বলেন, আমেরিকা ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের পৃষ্ঠপোষকতা সত্ত্বেও সৌদি আরবকে ইয়েমেনের হাতে অপমানজনক পরাজয় বরণ করতে হবে।
একই সময়ের আরেকটি চিত্র হচ্ছে,ইরাণী নির্বাচনে পুনঃনির্বাচিত হওয়ায় প্রেসিডেন্ট রূহানীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুটিন এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার।বিক্ষোভকারীরা ট্রাম্পের সফরের আগে ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রিয়াদকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের প্রশংসা করেন।
ইয়েমেনের জনপ্রিয় হুথি আনসারুল্লাহ যোদ্ধাদের দমন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মানসুর হাদিকে আবার ক্ষমতায় বসানোর লক্ষ্যে সৌদি আরব ২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে ইয়েমেনে পাশবিক বিমান হামলা শুরু করে। এ হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১২,০০০ মানুষ নিহত ও অপর হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে। ইয়েমেনকে বিভক্ত করার প্রকাশ্য পরিকল্পনাও উপস্থাপন করা হয়েছে।   
 এদিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতা অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন।আজ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এক বার্তায় বলেছেন, প্রেসিডেন্ট রুহানির শাসনামলে ইরান নতুন করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অর্জন লাভে সমর্থ হয়েছে। চীনা প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তার দেশ ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো উন্নয়নের জন্য প্রেসিডেন্ট রুহানির সঙ্গে কাজ করতে তিনি আগ্রহী।
নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ায় হাসান রুহানিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে। তিনি আশা করেছেন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও উন্নতিতে তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুমিও কিশিদাও একই রকমের অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন। কুয়েতের আমির শেখ সাবাহ আল-আহমাদ আল-জাবের আস-সাবাহ, যুবরাজ শেখ নওয়াফ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ জাবের মুবারক অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন।
এছাড়া, আর্মেনিয়ার প্রেসিডেন্ট সের্জ সার্গসিয়ান, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাকরন, ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন, কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড, হিজবুল্লাহ মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, এবং আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভসহ বহু নেতা ইরানের প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এর আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লামির পুতিন ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদসহ অনেকে হাসান রুহানিকে অভিনন্দন জানান। অভিনন্দন আরো আসছে।   
যাই হোক,মধ্যপ্রাচ্যে মুসলমান অধুষিত সম্পদশালী দেশগুলোর সম্পদ নিজেদের মালিকানা নিয়ে আসার লক্ষ্যে যে যুদ্ধ চালু আছে তা আরো ব্যাপক করার পাশাপাশি তাতে বাণিজ্য বৃদ্ধির তৎপরতাও অব্যাহত দেখা যাচ্ছে।চীন-জাপান রাশিয়া যে ধারায় সম্পর্ক চালু রেখেছে,আমেরিকার প্রধান পরাশক্তির চিন্তার নিরীখে অস্ত্রবিক্রয় এবং দাস করে রাখার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় অগ্রসর অভিযান এখনো সফল রয়েছে।


‘উপজেলা’ ও ‘গ্রাম সরকার’ সম্পর্কিত মিথগুলো বুঝতে হবে; স্থানীয় সরকারের প্রকার, স্তরসংখ্যা ও গন্তব্য ঠিক করতে হবে; ১৯৯৭ সনে উপস্থাপিত ‘গণস্বপ্ন ২০২০’ ও ‘গণস্বপ্ন ২০৫০’ বুঝতে হবে--হাকিকুল ইসলাম খোকন

বুধবার, ১৭ মে ২০১৭

আগে স্থানীয় সরকারের প্রকার, স্তরসংখ্যা ও শেষ গন্তব্য কেন ঠিক করতে হবে তা জানতে হলে, বুঝতে হলে বিদ্যমান স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও এর অতীত সম্পর্কে ভাল ধারণা থাকতে হবে; পাশাপাশি অতীতে স্থানীয় সরকারকে নিয়ে অবৈধ শাসকদের অসৎ উদ্দেশ্যমূলক কর্মকান্ড, তার ধারাবাহিকতা, কুফলগুলো ও মিথগুলো কিভাবে জনগণ, সরকার, রাজনৈতিক দল, সুশীলসমাজ ও এনজিওগুলিকে প্রভাবিত করে চলেছে তাও ভালভাবে জানতে হবে, বুঝতে হবে। এই লেখাটি অবয়বে ছোট্ট রাখতে কেবল বাংলাদেশ আমলের দুইজন অবৈধ শাসক এর অপকর্মের স্মারক হিসেবে “উপজেলা” ও “গ্রাম সরকার” সংক্রান্ত মিথগুলো ও এগুলোর কুপ্রভাব কীভাবে গোটা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে সাংঘাতিকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে, করছে তা জানার, বুঝার প্রয়াস নেয়া যেতে পারে। এই প্রয়াসের মধ্য দিয়ে আগে স্থানীয় সরকারের প্রকার, স্তরসংখ্যা ও গন্তব্য কেন ঠিক করতে হবে তা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যাবে বলে আশা করা যায়। সেসঙ্গে এই নিবন্ধে সামগ্রিকভাবে স্থানীয় সরকার বিষয়ক অনেক দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গক্রমে উপস্থাপিত ও আলোচিত হয়েছে। তাতে ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল নাগাদ পরিবর্তনশীল বিষয়গুলি (জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষিত) বিবেচনায় নিয়ে প্রণীত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১, স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২, নরনারীর গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়ন বিষয়ক বৈশ্বিক ফর্মুলা এমপো, এমপো আলোকে বাংলাদেশ প্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রণীত ১১ দফা ও সমাধানমূলক অন্যান্য উপায়গুলো জানতে, বুঝতে সহজতর হবে। স্তরবিন্যাসকরণ ১ ও ২, এমপো ও ১১ দফা এই নিবন্ধের শেষে সংযুক্ত করা রয়েছে; এগুলোতে শুরুতে পাঠকপাঠিকা একটু চোখ বুলিয়ে নিলে এই নিবন্ধটি বোঝতে বিশেষভাবে উপকৃত হবেন; এবং ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারিতে ঢাকায় উপস্থাপিত ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’টি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা, এর সুদূরপ্রসারী উপকারীতা ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে সহায়ক হবে। স্থানীয় সরকারের প্রকার ও শেষ গন্তব্য সঠিকভাবে বুঝা ও ঠিক হওয়া কেন জরুরি তা যেমন স্পষ্টভাবে বুঝা যাবে;  আবার তা বুঝা ও ঠিক হওয়ার সঙ্গে কেন সঠিকভাবে স্থানীয় সরকারের স্তরগত কাঠামো নির্ধারিত হবার বিষয়টি যুক্ত রয়েছে তাও স্পষ্ট হবে; ১৯৯৬ সালে প্রণীত এবং ১৯৯৭ সালে ১৩ জানুয়ারীতে উপস্থাপিত এই রূপরেখায় নির্দিষ্ট সময় বিবেচনায় ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল নাগাদ স্থানীয় সরকারের গন্তব্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, স্থানীয় সরকারের প্রকারভেদকরণ ও স্তরবিন্যাসকরণ কি অবস্থায় গিয়ে পৌঁছাবে, বাংলাদেশ সার্বিকভাবে কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র, গণতন্ত্রায়ন, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, যোগাযোগ ও সমাজ কোন স্তরীয় হবে, এখনকার বাস্তবতায় এসবের দৃশ্যমান অবস্থা কতটুকু বোধগম্য হচ্ছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে, সুস্পষ্টভাবে জানা যাবে, বোঝা যাবে; যদিও ১৯৯৭ সালে অনেকেই এসব উপস্থাপিত আইডিয়া, ভিশন, মিশন, গোল ও উদ্দেশ্যকে কেবলই কাল্পনিক অবাস্তব বলে মনে করতো। এই নিবন্ধে একসময়ের কৃষিজ সমাজ, কৃষিপ্রধান দেশ তথা গ্রামীণ দেশ থেকে বর্তমানকার গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ তথা গ্রামীণ-নগরীয় দেশ এবং গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ থেকে পরিপূর্ণ নগরীয় সমাজ তথা পরিপূর্ণ নগরীয় দেশ তথা পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ মুখী পরিবর্তনসমূহ ও সময়ের সাথে সাথে রূপান্তর প্রক্রিয়াটির চলমান অবস্থা বোঝা যাবে, জানা যাবে; তা জানা, বোঝা ও নির্দিষ্ট সময় ভিত্তিক ভবিষ্যৎ অনুমানে ঘোষিত ফোরকাস্টের সঙ্গে স্থানীয় সরকারের জন্য প্রস্তাবিত প্রকারভেদকরণ ও স্তরবিন্যাসকরণ বিষয়দ্বয় ভালভাবে বোঝা ও জানার সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে কেন জড়িত রয়েছে তা পরিষ্কার হবে। স্থানীয় সরকারের একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ গ্রহণ ও তা একইসঙ্গে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জোর না দিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে একেক সময় একেকটি ইউনিট (যেমন কখনও গ্রাম, কখনও ওয়ার্ড, কখনও উপজেলা, কখনও জেলা) নিয়ে প্রবল টানাটানি ও হইচই করা হয়েছে, হচ্ছে; দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এই বিষয়টি বৈধ-অবৈধ সব শাসকদের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়; তারই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক কালে অসফল অর্থমন্ত্রি মুহিত সাহেবও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় কেবল জেলা ও জেলা বাজেট নিয়ে অনুরূপ হইচই, টানাটানি করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছেন, যেটি মন্ত্রিসভা ও জাতীয় সংসদ বাকহীন থেকে অনুমোদন দিয়ে চলেছে; এখানে সেই বিষয়টি ও দুইজন অবৈধ শাসকের অপকর্মমূলক, অপরাধমূলক বিষয় (এরশাদের উপজেলা ও জিয়ার গ্রাম সরকার) আলোচনায় সমালোচনায় এনে তা গভীরভাবে জানার, বোঝার প্রয়াস নেয়া হল।
অবৈধ শাসক এরশাদ প্রবর্তিত উপজেলা হচ্ছে মূলত একটা মিথ, একটা মিথ্যা নোশান এবং এটি বেশ দায়দায়িত্বহীন, স্বশাসনহীন একটি মধ্যবর্তী প্রশাসনিক ইউনিট। উপজেলা নামকরণটিও সার্থক ও যথার্থ নয়; দেশের আইনকানুন ও বইপুস্তকে বর্ণিত এর সংজ্ঞাটিও বাস্তবতার নিরিখে সঠিক নয়। অথচ গোটা জাতি এই মিথ, এই দায়দায়িত্বহীন ইউনিট, এই স্বশাসনহীন মধ্যবর্তী ইউনিট, এই অসার্থক নামকরণ আর ভুল সংজ্ঞার বেড়াজালেই ঘুরপাক খেয়ে চলেছে। এই বিষয়গুলো বিশেষভাবে তলিয়ে দেখলে তা বুঝতে কারও অসুবিধা হবার কথা নয়; কিন্তু তা বুঝতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রীপরিষদ, নিকার, একনেক, পরিকল্পনা কমিশন ও জাতীয় সংসদ’র বেশ অসুবিধা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। অনুরূপভাবে আরেক অবৈধ শাসক জিয়া প্রবর্তিত ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ এবং পরবর্তীতে একে ঘিরেই ‘পল্লী পরিষদ,’ ‘গ্রাম সভা,’ ‘গ্রাম পরিষদ,’ ‘গ্রাম সরকার’ ও ‘ওয়ার্ড সভা’ নিয়ে গোটাদেশ মিথ্যা নোশানের বেড়াজালে ঘুরপাক খেয়েছে, খাচ্ছে; ইউনিয়নের মধ্যে অবস্থিত প্রতিটি গ্রাম কেন্দ্রীক কিংবা প্রতিটি ওয়ার্ড কেন্দ্রীক এসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট নিয়ে এক সময় প্রচুর মাতামাতি, লাফালাফি হয়েছে, এখনও মাঝেমধ্যে হয়; সবাই ভালভাবে জানে যে, তাতে কাজের কাজ কিছু-ই হয়নি, হবার নয়া। দেশের এই দু’জন অবৈধ শাসক (প্রেসিডেন্ট জিয়া ও প্রেসিডেন্ট এরশাদ) এর সাংঘাতিক অপকর্ম আর হিমালয়সম দুর্নীতির স্মারক হিসেবে এই গ্রাম সরকার ও উপজেলাকে নিয়ে গোটা জাতির প্রচুর মাতামাতি ও লাফালাফিটা ইতিহাসের পাতায় জাতিগতভাবে ও সমষ্টিগতভাবে ভুল করার, ভুলের মধ্যে ডুবে থাকার এক মহা জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে থাকবে। এবং এর মাধ্যমে জনগণও যে সমষ্টিগতভাবে ভুল করতে পারে, ভুলের মধ্যে ডুবে থাকতে পারে তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল; তাতে, জনগণ ভুল করেনা, জনগণ ভুল করতে পারেনা-এই ধরনের আপ্ত বাক্য যাঁরা কথায় কথায় বলে থাকেন, তাঁদেরও বোধদয় হবে বলে আশা করা যায়।
‘উপজেলা’ কেন একটা মিথ, কেন একটা মিথ্যা নোশান, কেন মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে এটি বেশ দায়দায়িত্বহীন থাকছে তার কারণগুলি ভালভাবে জানা ও বোঝাই জরুরি নয়, পাশাপাশি, এই মিথ্যা নোশানের বেড়াজাল থেকে গোটাদেশ যেন বের হয়ে আসতে পারে তার জন্য সঠিক করণীয় ঠিক ও তা বাস্তবায়ন করাও খুবই জরুরি কর্তব্য। মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনিক ইউনিটগুলির মধ্যে উপজেলা হচ্ছে অন্যতম মধ্যবর্তী ইউনিট। এর উপরে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট যেমন জেলা ও বিভাগ, এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট যেমন ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড, এবং কোনো কোনো জেলায় এর পাশে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট সিটি কর্পোরেশন; এই অবস্থাটা হচ্ছে একটি চরম হ-য-ব-র-ল অবস্থা। এসব স্থানীয় ইউনিটগুলোর মধ্যে উপজেলায় অর্পিত ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিলে সেসব অর্পণ উপযুক্ত ও যথাযথ বলে মনে হয়না; স্থানীয় ইউনিটগুলির, স্থানীয় সরকারগুলোর এমনতরো এলোমেলো, গোজামিল অবস্থা কারও কাছেই কোনোভাবেই কাম্য নয়; তাই আমরা সবসময় বলি যে, এই এলোমেলো গোজামিল অবস্থার নিরসনকল্পে স্থানীয় সরকারের একটি সঠিক ও সমন্বিত স্তরবিন্যাস তথা স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো আগে গ্রহণ করতে হবে; সেই গৃহীত প্রশাসনিক কাঠামোয় সর্বাদিক গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট (জেলা সরকার কিংবা বিভাগীয় সরকার) ও সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয়কে (একদিকে গ্রামীণ এলাকায় ‘ইউনিয়ন সরকার’ ও  অপরদিকে নগরীয় এলাকায় ‘নগর সরকার’) কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে হবে; তা না করে স্থানীয় ইউনিটগুলি ও স্তরগুলির এলোমেলো অবস্থা বজায় রেখে, স্থানীয় ইউনিটগুলির অসঠিক প্রকারভেদকরণ বজায় রেখে, স্থানীয় ইউনিটগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ইউনিট ও সর্বনি¤œ ইউনিটদ্বয় ঠিক না করে এবং তাতে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে কেবল একটি মধ্যবর্তী ইউনিট তথা ছাগলের তৃতীয় বাচ্চা তুল্য উপজেলাকে নিয়ে গোটাদেশ অতি উৎসাহ, অতি মনোযোগ, অতি তৎপরতা দেখিয়ে আসছে; ফলে এই উপজেলার জন্মলগ্ন থেকে প্রতিটি নির্বাচনে প্রতিটি উপজেলায় সংশ্লি¬ষ্ট পদপ্রার্থীদের সহিংস কর্মকান্ড অতি মাত্রায় চলে আসছে। পাশাপাশি, হীন রাজনৈতিক স্বাথর্, ব্যক্তি বিশেষের প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্নীতি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, নিকার ও একনেক’র অদূরদর্শি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে উপজেলার সংখ্যা কমে আসার পরিবর্তে এর সংখ্যা বেড়েই চলেছে, এবং আরও নতুন নতুন উপজেলা গঠনের প্রক্রিয়া, প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে; তাতে প্রশাসনিক সিস্টেম কস্ট বাড়ছে; উন্নয়ন ও সেবামূলক ব্যয়ে ঘাটতি থাকছে। অথচ বাংলাদেশে উপজেলার সংখ্যা বাড়ানোর অপ্রয়োজনীয়তা নিয়ে সিডিএলজি, বাপসনিউজ ও এমপো বাস্তবায়ন ফোরাম ছাড়া অন্য কারও বক্তব্য শোনা যায় না; এ এক আশ্চর্য ব্যাপার নয় কি? সাধারণত মনে করা হয়, নতুন নতুন বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন গঠন করাটাই হচ্ছে “উন্নয়ন”! এই ভ্রান্তি আর মিথ কবে শেষ হবে? আয়তনে ছোট্ট একটা দেশে আর কত বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন গঠন করতে হবে?
সে যাই হোক, বাস্তব ঘটনাগুলো হল, উপজেলায় তেমন কোনো কাজকর্ম নেই, দায়দায়িত্ব নেই, এতে পরিপূর্ণ স্থানীয় সরকার কাঠামো নেই, স্বশাসন নেই, এর নিজস্ব আয়ের তেমন কোনও উৎস নেই, নিজস্ব রাজস্ব আয়ের উৎস সৃষ্টির সুযোগও তেমন একটা নেই, এটির নিজস্ব রাজস্ব আয় সৃষ্টির কিছু সুযোগ তৈরী করতে গেলে  ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের রাজস্ব আয়ের বেশ কিছু উৎস কর্তন করতে হবে, আর তা করতে গেলে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সঙ্গে বিরোধ অনিবার্য হয়ে পড়বে; উপজেলায় জনগণকে সেবামূলক সার্ভিস দেয়ার মত তেমন কোনো সুযোগ নেই বললে চলে, কিংবা এর মাধ্যমে যেসব সেবামূলক সার্ভিস দেয়ার কথা বলা হয় তা দেয়ার কোনও প্রয়োজনই নেই, কারণ সেসব সার্ভিস অনায়াসে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে দেয়া সম্ভব; অন্যসব স্থানীয় ইউনিটগুলি যেমন ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, জেলা, বিভাগ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এর সম্পর্ক কেমন হবে, কিভাবে কতটুকু থাকবে তা সুনির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট করা নেই; বিশেষত ইউনিয়ন ও পৌরসভার সঙ্গে উপজেলার এক ধরনের সাপে নেউলে সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে, এই সাপে নেউলে সম্পর্ক যে কোনো সময় সংঘাতরূপে প্রকাশ্যে আসতে পারে, যা কোনো অবস্থাতেই কারোরই কাম্য নয়।
এই ধরনের একটা নাজুক দৃশ্যমান অবস্থার মধ্যে অন্য ধরনের আরেকটা দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় তা হল, উপজেলার প্রতিনিধিগণের জন্য গাড়ী, ড্রাইবার, বাসা, বিশাল দাপ্তরিক ভবন, পিয়ন, সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে লোভনীয় পদবী, বেতন-ভাতা, সামাজিক মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, বিদেশ ভ্রমণ, অপক্ষমতা ও নানাবিধ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সুযোগসুবিধার দৃশ্য; এসব লোভনীয় বিলাসবহুল সুযোগসুবিধা থাকায় পদপ্রার্থী হবার জন্য, পদাধিকারী হবার জন্য এক ধরনের প্রচন্ড মোহ, লোভ তৈরী হয়; পাশাপাশি, উপজেলা নির্বাচনে যারা চেয়ারপারসন ও ভাইস-চেয়ারপারসন পদপ্রার্থী হয়, হতে চায়, তাদের লক্ষ্য কিন্তু উপজেলায় দায়িত্ব পালন করা নয়, উপজেলা কেন্দ্রীক উন্নয়নমূলক, সেবামূলক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে চিন্তাভাবনা করাও নয়, তাদের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারী সুযোগসুবিধা ও পদবী কাজে লাগিয়ে জাতীয় সংসদ এর সদস্য হবার পথে উপজেলাকে মই হিসেবে ব্যবহার করা, এবং অন্যসব উপায় অবলম্বনে কেবল নিজস্ব ভাগ্য উন্নয়নে প্রচেষ্টা চালানো; আর কাজকর্ম, দায়দায়িত্ব ছাড়া কেবলই ‘বাবুগিরি,’ ‘নেতাগিরি’ করার, কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে সদায় তৎপর থাকার, নিজেকে একজন বিকল্প ‘এমপি’ ভাবার যে সুযোগসুবিধা রয়েছে তা কার না ভাল লাগে; ফলে এই উপজেলা নির্বাচনে দলীয় ও নির্দলীয় প্রার্থীগণের বেশী বেশী আগ্রহ ও বেশী বেশী সহিংস আচরণ দেখা যায়।
এতে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, এই উপজেলার জন্মগত অসৎ উদ্দেশ্য ও জঘন্য কলংক এখনো বহাল রয়েছে; জেনারেল এরশাদ অবৈধ উপায়ে ক্ষমতায় এসে অবৈধ ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত ও পাকাপোক্ত করতে এবং স্থানীয় মধ্যবর্তী পর্যায়ে নিজস্ব অনুগত দলীয় মোড়ল তৈরী করতে উপজেলা সৃষ্টি করেন, এবং তিনি বিশেষ ব্যবস্থায় সমস্ত আইনকানুন লংঘন করে রাষ্ট্রীয় অর্থ ও ক্ষমতা বিলিয়ে দিয়ে উপজেলার প্রতি প্রবল মোহ ও একটি অনুগত মোড়লগোষ্ঠী তৈরী করতে সক্ষম হন। আর এই অনুগত মোড়লগোষ্ঠীই পরবর্তীতে জাতীয় পার্টির স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী মধ্যবর্তী খুঁটি হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়; একটু খোঁজ নিলে দেখা যাবে এঁরাই এখনকার জাতীয় পার্টির স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে মূল খুঁটি হিসেবে কাজ করছে। রাষ্ট্রীয় অর্থে ও সরকারী ক্ষমতাবলে নিজস্ব দলীয় খুঁটি, মোড়ল তৈরী করাটা হচ্ছে মহা অপরাধ, মহা দুর্নীতি; এই মহা অপরাধ, এই মহা দুর্নীতির কথা মনে রাখা, আমলে নেয়া উচিত নয় কি? অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় এসব অপরাধ, এসব দুর্নীতি যেন কিছু-ই না। এসব বিষয়ে দেশের অন্য সব রাজনৈতিক দলও নীরব; তাই তো দেখা যায়, অবৈধ শাসক এরশাদ, তাঁর দল জাতীয় পার্টি, তাঁর শাসনিক মিত্র জেএসডি, কিছুসংখ্যক অবুঝ ব্যক্তি ও চরম চাটুকারকে এখনও ‘উপজেলা’ তথা ‘উপজ্বালা’ নিয়ে গর্ব করতে, উদাহরণ দিতে শোনা যায়! এবং কথায় কথায় বলতে শোনা যায়, জেনারেল এরশাদ ও তাঁর দল না কি এই ‘উপজেলা’র জন্যই চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে! প্রশ্ন হল, যেখানে কোনও একদিন জনাব আবু তালেব প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ অথবা স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ অনুযায়ী “উপজেলা” নামটিই থাকবেনা, যখন উপজেলা সম্পর্কীয় মিথগুলি জনমনে খোলাসা হতে থাকবে, এবং যখন মানুষ চাটুকারীয় গর্বমূলক তাৎপর্যহীন কথামালায় একদম কর্ণপাত করবে না; তখন সেখানে অবৈধ শাসক এরশাদ ও তাঁর দল চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে কীভাবে? অনুরূপভাবে, জনাব আবু তালেব প্রস্তাবিত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয় অনুযায়ী নগরায়িত প্রবাহে উপনিবেশিক শাসক বৃটিশ প্রবর্তিত ও আয়ুবীয় গন্ধযুক্ত “ইউনিয়ন” নামটিও থাকবেনা, এবং তাতে এই নামটিকে ঘিরে আবর্তিত বৃটিশ উত্তরাধিকার ও আয়ুবীয় গন্ধও মুছে যাবে। আরও বলা প্রয়োজন যে, এই রূপরেখা অনুযায়ী “বিভাগ” স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হলে মধ্যবর্তী ইউনিট হিসাবে “জেলা” নামটিও এক পর্যায়ে মুছে যাবে, আর জেলাকে স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট করা হলে বিভাগকে একইসঙ্গে মুছে দিতে হবে। তা হলে স্বাধীন দেশে স্বাধীন ভাবনায় নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী সাজানো সর্বস্তরীয় অর্থাৎ তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত অথবা কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত একটি গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামো পাওয়া যাবে। এটি ভালভাবে অনুধাবন করতে এই নিবন্ধের শেষে সংযুক্ত প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ ও স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ মনোযোগ দিয়ে ভালভাবে অনুধাবন করার জন্য, বুঝার জন্য পাঠকপাঠিকাকে বিনীত অনুরোধ করছি।
সে যাই হোক, এই ধরনের একটি শাসনিক অবস্থার মধ্যেই আরও অনেকে ক্ষমতা, সুবিধা ও অর্থ লোভের পাশাপাশি বুঝে, না বুঝে উপজেলার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যান। বেশ কিছু এনজিও দাতা সংস্থার টাকায় দেশীয় শাসকের চাহিদায় আয়োজিত সভা-সমাবেশে এই উপজেলাকে নিয়ে বেশ মাতামাতি, লাফালাফি করে; আবার কিছু কিছু এনজিও কর্মকর্তার মধ্যে নিজস্ব ব্যক্তিগত স্বার্থে এনজিও কমসূচী, অর্থ, জনবল ইত্যাদি কাজে লাগিয়ে নিজস্ব উপজেলায় চেয়ারপার্সন, ভাইস-চেয়ারপার্সন হবার খায়েশ ও লোভ প্রচন্ডভাবে ক্রিয়াশীল থাকায় উপজেলা কেন্দ্রিক অতি তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায়। এদের সঙ্গে যুক্ত হয় জাতীয়ভাবে পরিচিত কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তি, যাঁরা প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বোঝে না, মওকা বুঝে কথায় কথায় গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে অথচ গণতন্ত্রায়ন বোঝে না, গণতন্ত্রায়ন শব্দটি উচ্চারণ করতে চায়না, গণতন্ত্রায়ন কর্মসূচী সম্পর্কে ধারণা নেই; বিশেষত এঁরা সুবিধাবাদী অবস্থান থেকে সুবিধাজনক শব্দ “সং¯কার” শব্দটি নিয়ে সব ধরনের শাসনিক আমলে পাগলপ্রায় থাকে, থেকে কেবল সুযোগসুবিধা হাতিয়ে নেয়; এঁরা মূলত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ, প্রকারভেদকরণ, সার্থক নামকরণ, সঠিক সংজ্ঞায়িতকরণ, অর্থায়ন, দায়িত্ব বণ্টন, পারস্পরিক সম্পর্ককরণ, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, নির্বাহিক ও বিধানিক পরিষদের পার্থক্য সম্পর্কে জানেনা বুঝেনা, বুঝতে চায়ওনা; এঁরাই স্থানীয় সরকার আর কেন্দ্রীয় সরকারের কাঠামোতে নারীর শতভাগ (১০০%) প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিগতভাবে (যা অবশ্যই চমক, দয়া, করুণা বা বাহাবা কেন্দ্রিক নয়) নিশ্চিত করতে এমপো ও ১১ দফার প্রয়োগ চায়না, ইত্যাদি ইত্যাদি; অথচ তাঁরা নিজেদেরকে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে সবসময় পরিচয় দিয়ে থাকে এবং এনজিও আয়োজিত সভা, সেমিনার, মানববন্ধন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার টকশোতে কখনও অতিথি বক্তা, কখনও অযাচিত বক্তা হয়ে বিশেষত উপজেলা কেন্দ্রিক অসার কথামালা জোর গলায় ব্যক্ত করেন। এঁদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মিডিয়ার বেশকিছু সাংবাদিক, সম্পাদক, উপস্থাপক কর্মকর্তা, যাঁরা আর্থিক সুযোগসুবিধার বিনিময়ে উপজেলা বিষয়ক সংবাদ প্রকাশে প্রচারে সহযোগিতা দিয়ে থাকেন; এই সম্পর্কিত বিভিন্ন সভায় সঞ্চালক হয়ে সভা সঞ্চালনায় বিশেষ কৃতিত্ব নিয়ে থাকেন; এবং এঁদেরই কেউ কেউ মাঝেমধ্যে স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত অসার প্রতিবেদন প্রচার প্রকাশের মাধ্যমে ‘স্থানীয় সরকার বিষয়ক সাংবাদিক/প্রতিবেদক’ এর পরিচয় দাঁড় করিয়ে বিশেষ সুবিধা-সুনাম আদায়ে সচেষ্ট থাকেন। এ কি হল স্থানীয় সরকার বিষয়ক সাংবাদিকতা? এই প্রশ্ন থাকল।
পাশাপাশি, খুবই দুঃখজনক হলেও শতভাগ সত্যি যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠায় ও তার ক্রমাগত উন্নয়নে আকাংখা, পরিকল্পনা, কর্মসূচী ও প্রস্তুতি রয়েছে এমনতরো একটি রাজনৈতিক দলও খুঁজে পাওয়া যায় না, যায়নি; অথচ রাজনৈতিক দলগুলি গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন প্রসঙ্গে সবসময় লিপ সার্ভিস দিয়ে থাকে; এই লিপ সার্ভিস আর অন্তর্গত বিশ্বাস কখনো এক ছিলনা, এখনো নেই বলে প্রতীয়মান হয়; অপ্রিয় হলেও সত্য কথা হল, বাংলাদেশে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনই হয়নি, হচ্ছেনা; বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে মিশ্রিত লক্ষ্য প্রসূত রাস্তার, মাঠের আন্দোলন হয়েছে, হয়; আপাত দৃষ্টিতে ওইসব আন্দোলনে সফলতা দেখা গেলেও সেই সফলতা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও তার উন্নয়নে কাজে লাগেনি; কারণ সমাজ, দল ও দেশের সার্বিক অর্থে গণতন্ত্রায়ন সম্পন্ন করার শিক্ষাগত ও মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ প্রক্রিয়া এসব আন্দোলনে, সংগ্রামে একেবারেই ছিলোনা বললে অত্যুক্তি হবেনা। সে যাই হোক, বড় দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে সময়ে সময়ে বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনে বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্য সাধন করতে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিগণকে, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হতে আগ্রহী দলীয় ব্যক্তিবর্গকে ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ব্যবহার করতে দেখা যায়; এবং জাতীয় নির্বাচনে দলীয় ইশতেহারে গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকার উন্নয়ন প্রসঙ্গ বেশ জোরালোভাবে উপস্থাপিত করা হয়। তা করতে গিয়ে এসব দলের কিছু সুচতুর নকলবাজ ব্যক্তি প্রতিটি জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনের পূর্বলগ্নে দলীয় ইশতেহার প্রণয়ন কালে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্র বিষয়ে নকল করার মহড়ায় নেমে থাকে। এসব নকলবাজ ব্যক্তিরা অন্য কারো আইডিয়া, স্লোগান, গবেষণা কর্ম, প্রণীত বিষয়, প্রস্তাবিত বিষয় ও কর্মসূচী জাতীয় স্বার্থে অনুসরণের জন্য, গ্রহণের জন্য নিয়মনীতি মেনে দলীয় ইশতেহারে কিংবা দলীয় কর্মসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করেন না, করতে চান না; তাঁরা দেশের ব্যক্তি বিশেষের নিজস্ব স্ট্যাডি, গবেষণা, কর্মসূচী, শ্লোগান, ক্যাম্পেইন, অবদানকে অস্বীকার করার, চুরি করার বাতিকগ্রস্ততা থেকে কেবল নগ্নভাবে চুরিতে, নকলেই সিদ্ধহস্ত; এঁরা মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক চোর এবং জনগণের অর্থ ও সম্পদ চোর তো বটেই। অথচ এঁরা স্ব স্ব দলের কাছে সম্মানীয় বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, নির্বাচনী ইশতেহার প্রণেতা, দলীয় কর্মসূচী প্রণেতা, ইত্যাদি ইত্যাদি! এ এক মহা আজব কারবার নয় কি! তাই তো দেখা যায়, এসব দলের উপজেলা সম্পর্কীয় ইশতেহারগত অংগীকার শুধু কথার ফুলঝুরি আর অন্তঃসার শূন্য কথামালায় ভরপুর; কারণ স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে উপজেলার অবস্থান, গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, ক্ষমতা, দায়দায়িত্ব, স্বশাসন, অর্থায়ন, কাঠামো ইত্যাদি সম্পর্কে এসব দলের জেনে বুঝে কোনও সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট অবস্থান, কর্মসূচী নেই; এ হচ্ছে একজন অবৈধ শাসকের চরম অপকর্মের কুফলে প্রভাবিত হয়ে উত্তরাধিকার বহনে রাজনৈতিক দলগুলোর অশুভ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকা ছাড়া অন্য কিছু নয়; এ যেন এক চরম হ-য-ব-র-ল অবস্থার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর দিকহারা হয়ে ছোটাছুটিতে লিপ্ত থাকা। পাশাপাশি দেখা যায় যে, জনগণেরও একটা বিরাট অংশ উপজেলা নির্বাচন কালীন সময়ে নগদে পাওয়া আদর আপ্যায়ন আর কদরেই তুষ্ট থাকে। নির্বাচনে ও তার পরে কি হল তা তাঁদের নজরদারি ও তদারকির বিষয় হিসেবে থাকে না। ভোটারগণ মূলত জানেওনা উপজেলায় কি কি দায়িত্ব সম্পন্ন করানোর জন্য উপজেলা চেয়ারপারসন-ভাইস চেয়ারপারসনদ্বয় নির্বাচিত করেছে, করছে; ঠিক যেমন পদপ্রার্থীগণ ভালভাবে জানেনা কি কি দায়িত্ব পালন করার জন্য নির্বাচিত হতে চায়, হয়েছে। অতএব, সার্বিক অর্থেই বলা যায়, উপজেলা হচ্ছে একটা মিথ, একটা অলীক স্বপ্ন, একটা মিথ্যা নোশান, একটা দায়দায়িত্বহীন, স্বশাসনহীন মধ্যবর্তী ইউনিট। গোটাদেশ এই মিথ্যার বেড়াজালে ঘুরপাক খাওয়াটা, সরব থাকাটা হচ্ছে এক মহা আশ্চর্যজনক ব্যাপার!
    অনুরূপভাবে, গোটা জাতি আরেকটা মিথ, আরেকটা মিথ্যা নোশানের বেড়াজালে ঘুরপাক খেয়ে আসছে; সেই মিথ আর মিথ্যা নোশানটা হল, অবৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রবর্তিত তথাকথিত ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’। এই মিথ তথা অপকর্মের কুফলে প্রভাবিত হয়ে এবং একে ঘিরেই পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসক দ্বারা সৃষ্ট পল্ল¬¬ী পরিষদ, গ্রাম সভা, গ্রাম পরিষদ, গ্রাম সরকার ও ওয়ার্ড সভা নামের অপ্রয়োজনীয় ইউনিটগুলি নিয়ে গোটা জাতি মিথ্যার বেড়াজালে জড়িয়ে থাকে; ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিটি গ্রাম কিংবা প্রতিটি ওয়ার্ডে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অবৈধ ও বৈধ শাসকগণ দ্বারা এসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠিত হয় কিংবা গঠন করার অপচেষ্টা চলে; এসব ইউনিট কেন অপ্রয়োজনীয়, কেন মিথ, কেন মিথ্যা নোশান, কেন অপচয়মূলক আর অসৎ উদ্দেশ্যমূলক তার স্বরূপ বুঝাটাও খুবই জরুরী। এর স্বরূপ বুঝার মাধ্যমে এও বুঝা যাবে যে, কেন স্থানীয় সরকারের স্তরসংখ্যা, প্রকার ও শেষ গন্তব্য আগে ঠিক করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
মূলত, ইউনিয়ন-ই হওয়া উচিত গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের মৌলিক গ্রামীণ প্রশাসনিক ইউনিট; সাধারণত ১০ থেকে ১৫টি গ্রাম নিয়ে একেকটি ইউনিয়ন গঠিত হয়ে থাকে; এই ইউনিয়নের মধ্যে অবস্থিত হাট-বাজার-ঘাট-গঞ্জগুলিও কোনো না কোনও গ্রামের মধ্যেই অবস্থিত। সেজন্য দেশের মানুষের কাছে ইউনিয়ন মানে গ্রাম আর গ্রাম মানেই ইউনিয়ন; গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী নগরীয় স্থানীয় সরকারের নগরীয় প্রশাসনিক ইউনিট (পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড) এর সংখ্যা ও আয়তন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে ইউনিয়নের মোট সংখ্যা ও আয়তন আস্তে আস্তে কমে আসার কথা; কিন্তু আমরা দেখছি বিপরীত চিত্র; নগরীয় প্রশাসসিক ইউনিট ও মোট আয়তন দিনে দিনে সম্প্রসারিত হচ্ছে, বিপরীতে গ্রামীণ প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে ইউনিয়নের সংখ্যা কমছে না; বরং প্রশাসনিক দুর্নীতি আর অশুভ রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ইউনিয়নের সংখ্যাও বেড়েই চলেছে, এবং আরও নতুন নতুন ইউনিয়ন গঠনের প্রচেষ্টা চালু রয়েছে। তাতে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক সিস্টেম কস্ট অনেক অনেক গুণ বেড়ে গেছে, এবং তা আরও বাড়তে থাকবে; অথচ ইউনিয়নের সংখ্যা যথাসম্ভব কমিয়ে এনে গ্রামীণ প্রশাসনিক সিস্টেম কস্ট যথাসম্ভব সীমিত রেখে তাতে উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক ব্যয় বাড়ানো খুবই জরুরি প্রয়োজন বলে প্রতীয়মান হয়। গ্রামীণ এলাকায় “একটি ইউনিয়ন, একটি সমন্বিত উন্নয়ন” ভিশন কর্মপরিকল্পনা ‘ইউনিয়ন সরকার’র মাধ্যমে বাস্তবায়িত করতে জনাব আবু তালেব ১৯৯৭ সালের শুরুতে ‘গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন সরকারের রূপরেখা’য় বিশেষ আহবান রেখেছিলেন, কিন্তু তৎকালীন সরকার, বিরোধীদল ও অন্যান্য দলগুলো ওই বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বলে মনে হয়নি। বিলম্বে বুঝলে, বিলম্বে শুরু, বিলম্বে থাকা, বিলম্বে ফলাফল; তা তো হবেই। তাই তো কথায় বলা হয় যে, সময়ের এক ফোড় আর অসময়ের দশ ফোড়- এ যেন বাংলাদেশের নিয়তি।
সে যাই হোক, গ্রামীণ এলাকায় প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে ইউনিয়ন কেন্দ্রীক সার্বিক উন্নয়ন মানেই ১০-১৫টি গ্রামের উন্নয়ন, গ্রামীণ মানুষের উন্নয়ন; অথচ, প্রকৃত ঘটনা হল, এই ইউনিয়ন ভিত্তিক গণতন্ত্রায়ন ও তার  সার্বিক উন্নয়ন সাধনে আজ অবধি কোনো বিশেষ উদ্যোগ, বিশেষ আয়োজন গৃহীত ও দৃশ্যমান হয়নি, হচ্ছেনা। বরং এই ইউনিয়নকে পাশ কাটিয়ে এর নীচে যেমন গ্রাম সরকার ও এর ওপরে যেমন উপজেলা নামক অপ্রয়োজনীয় ইউনিটগুলো গঠনের নামে নানান সময়ে নানান রকমের অপতৎপরতা চালানো হয়েছে, হচ্ছে; ওই সব অপতৎপরতার সঙ্গে দেশের অনেক নামকরা, নামী দামী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জড়িত। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অবৈধ উপায়ে ক্ষমতায় এসে ও থেকে, রাষ্ট্রীয় অর্থে ও সরকারী ক্ষমতায় নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন ও গ্রামীণ তৃণমূলে অনুগত, চাটুকার দলীয় কর্মী-সমর্থক তৈরীর লক্ষ্যে ইউনিয়নের মধ্যে ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ গঠন করার উদ্যোগ নেন; এবং এই ইউনিট কেন্দ্রীক বেশী বেশী দলীয় কর্মী-সমর্থক তৈরী করার লক্ষ্যে নতুন নতুন গ্রাম সৃষ্টিতে প্রবল উৎসাহ যোগায়; তাতে গ্রামের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে ৬৮ হাজার থেকে ৮৭ হাজারের বেশী সংখ্যক গ্রামে উন্নীত হয়ে যায়; কারণ যত বেশী বেশী গ্রাম, তত বেশী বেশী গ্রাম সরকার, আর তত বেশী বেশী অনুগত, চাটুকার, টাউট, সুবিধাবাদী, নীতিহীন, আদর্শহীন দলীয় সদস্য; এতে দীর্ঘকালের প্রতিটি গ্রামভিত্তিক দৃঢ় সামাজিক বন্ধন ও একতা ভেঙ্গে তছনছ, চুরমার হয়ে যায়; জাতীয় অর্থ, শ্রম ও সময়ের বিপুল অপচয় ঘটে; ইউনিয়ন পরিষদ হয়ে পড়ে চরম উপেক্ষিত, এবং গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক গ্রামীণ ইউনিটের পরিবর্তে ইউনিয়ন হয়ে পড়ে গুরুত্বহীন এক মধ্যবর্তী ইউনিট। বহুল পরিচিত প্রচারিত শ্লোগান “৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে, বাংলাদেশ বাঁচবে” শ্লোগানটি হয়ে পড়ে প্রকৃত তথ্যভিত্তিক ঘটনায় অসঙ্গতিপূর্ণ; বিদ্যমান বাস্তবতায় এই শ্লোগানে গ্রামের সংখ্যাগত ভুল তো রয়েছেই; পাশাপাশি প্রশ্ন এসে যায় এই শ্লোগানে নগর, নগরীয় এলাকা আর নগরীয় মানুষ কোথায়? তা তো এই কবিতে কবিতায় অনুপস্থিত রয়েছে; কবিকে কবিতা লেখায়ও যে তথ্যগতভাবে আপডেট থাকতে হবে তা ভুললে চলবে কী? প্রকৃত ঘটনা হল, বাংলাদেশ এখন একটি গ্রামীণ-নগরীয় দেশ; তাই গ্রাম আর নগরকে নিয়েই বাংলাদেশকে বাঁচতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে; তাই কবিতায়, গানে, শ্লোগানে, বই-পুস্তকে, ভাবনায়, পরিকল্পনায়, কর্মপ্রচেষ্টায় গ্রাম আর নগর একসঙ্গে থাকতে হবে; এটি একসঙ্গে ততদিন পর্যন্ত বজায় রাখতে হবে, যতদিন পর্যন্ত গ্রাম বজায় থাকবে, এবং নতুন নতুন নগরীয় এলাকাও সৃষ্টি হতে থাকবে । সে যাই হোক, অবৈধ শাসক জিয়া কর্তৃক রাষ্ট্রীয় অর্থে, দাপটে কেবল-ই ব্যক্তিগত ও নতুন রাজনৈতিক দলীয় কর্মী-সমর্থক তৈরীর স্বার্থে পরিচালিত এই সরকারী উদ্যোগ ছিলো এক মহা দুর্নীতি, এক মহা অপরাধ; এ হল অবৈধ শাসকের অবৈধ ক্ষমতায় সৃষ্ট এক মারাত্বক বিষফোঁড়া, যার যন্ত্রণায় গোটা জাতি এখনো খেসারত দিয়ে চলেছে। অবৈধ শাসক জিয়ার এই মহা অপরাধ, এই মহা দুর্নীতি আর এই সাংঘাতিক বিষফোঁড়ার বিষয় হালকাভাবে নেয়া একদম উচিত নয়। এই মহা অপরাধ, এই মহা দুর্নীতির কথা অবৈধ ক্ষমতাবলে সৃষ্ট সংশ্লিষ্ট দলটি (বিএনপি) স্বার্থগত কারণেই হালকাভাবে নিয়ে থাকে এবং তা চাপিয়ে রাখতে চায়, লুকিয়ে রাখতে চায়; কারণ একটু অতীতে গেলে, একটু অতীত স্মরণ করতে চেষ্টা করলেই মনে পড়ে যাবে যে, জিয়াউর রহমান তখনকার গ্রাম সরকারের মাধ্যমেই তৃণমূলে সুবিধাবাদী, নীতিহীন, আদর্শহীন, টাউট ও বাটপার জাতীয় লোকদের নিয়ে বিএনপি’র সমর্থক ও কর্মী গোষ্ঠী তৈরী করে ছিলেন; পরবর্তী কালে এঁরাই গ্রামে বিএনপি’র শক্ত খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়; তৃণমূলের মত জাতীয় পর্যায়েও অনুরূপ চরিত্রের লোকজন নিয়েই জিয়াউর রহমান বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তৈরী করেছিলেন; তখন একটি কথা বেশ চালু ছিল তা হল, ‘দিনে বায়তুল মোকাররম, রাতে বঙ্গভবন’; ওই সময়ে পল্টন ময়দানে সভা সমাবেশ করা বন্ধ রেখে বায়তুল মোকাররমে পার্শ্ব রাস্তায় সভা সমাবেশ করতে বাধ্য করা হয়।  মূলত, ওই সময় থেকেই বাংলাদেশে অবৈধ ক্ষমতাবলে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী বেচাকেনা শুরু হয়, সেজন্য ওই বাক্যটি মানুষ মুখে মুখে দেশময় বলে বেড়াত। অবৈধ শাসক জিয়ার এসব অপকর্ম স্বার্থগত, জন্মগত কারণেই বিএনপিকে ভুলে থাকতে হয়, চাপিয়ে যেতে হয়। কিন্তু অন্যসব রাজনৈতিক দল ও  গোটা জাতি কেন তা ভুলতে বসেছে? তা কি ভুলে যাওয়া উচিত? এই প্রশ্ন থাকল সকল মানুষের প্রতি। একই ধারায় পরবর্তীতে বিএনপি ক্ষমতায় এসে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বাধীন স্থানীয় সরকার বিষয়ক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রি ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের নেতৃত্বে একবার ‘গ্রাম সভা’ গঠন করার অপচেষ্টা চালায় এবং আরেকবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূঁঞার নেতৃত্বে প্যাডসর্বস্ব ‘গ্রাম সরকার’ গঠন করতে গিয়ে দেশের প্রচুর অর্থ, শ্রম ও সময় নষ্ট করা হয়, এবং এই প্যাডসর্বস্ব গ্রাম সরকারের জন্য রাষ্ট্রীয় শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে করাপশনকে গ্রামীণ তৃণমূলে বিস্তৃত করা হয়। উভয় বার ক্ষমতায় থাকা কালে বিএনপির যেসব নেতা স্থানীয় সরকার বিষয়ক দায়িত্বে পরামর্শে ছিলেন, তাদের দ্বারা স্থানীয় সরকারের কেবল ক্ষতিই সাধিত হয়েছে; তারাসহ এই দলের গোটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার স্থাপন ও তার উন্নয়নমুখী কোনো চিন্তাভাবনা করেছে কিংবা করতে চেয়েছে এমনতরো নজির একদম খুঁজে পাওয়া যায়না, যদিও ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ বিএনপির নীতিনির্ধারকগণের কাছেও বার বার তুলে ধরা হয়েছিল; তা তারা সবাই এক কান দিয়ে শুনেছে, আরেক কান দিয়ে তা বের করে দিয়েছে; তারা দেশ, দল ও সমাজের সার্বিক গণতন্ত্রায়ণ ও গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত হিসেবে স্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আমলে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা কখনও উপলব্ধি করেনি, করতে চায়নি, আর এখনও এই দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এসব বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে বলে, করতে চায় বলে একদম প্রতীয়মান হয়না; আর এই দলের জন্মগত কলংকিত চরিত্র একটুও পরিবর্তনমুখী হয়েছে বা হতে চেয়েছে বলে কোনও নজির কি দলে কিংবা রাষ্ট্রে রয়েছে? তারপরও কি বিএনপি’র স্থানীয় সরকার, গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক অবস্থান, আকাংখা বুঝতে আর কিছু বাকি থাকে? সেসঙ্গে অবৈধ শাসক জিয়ার ওই অপকর্মের প্রভাব কিভাবে অন্যসব রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রভাবিত করেছে তাও গভীরভাবে জানার, বুঝার প্রয়োজন রয়েছে। এই প্রসঙ্গে ধরা যাক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর কথা; এই দল ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে গ্রামীণ তৃণমূলে দলীয় ভিত্তি আরও মজবুত করার এক অলীক স্বপ্নে তাড়িত হয়ে এ্যাডভোকেট রহমত আলীর নেতৃত্বাধীন স্থানীয় সরকার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান (পরে তিনি মাননীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন) এর নেতৃত্বে জাতীয় সংসদে তেমন কোনো আলাপ আলোচনা ছাড়াই অত্যন্ত তাড়াহুড়ার সহিত স্বল্প সময়ে ইউনিয়নের মধ্যে প্রতি ওয়ার্ড কেন্দ্রিক ‘গ্রাম পরিষদ’ গঠন করার বিল পাস করা হয় ও তা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক স্বাক্ষরিত হয়ে আইনে পরিণত হয়, এবং তাঁরই নেতৃত্বে তা বাস্তবায়নের জন্য অপচেষ্টা চলে; বিন্তু সেই অপচেষ্টা কেবল জনাব আবু তালেব এর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবল বাধার মুখে বন্ধ হয়ে যায়; প্রসঙ্গক্রমেই বলা প্রয়োজন যে, এডভোকেট রহমত আলী কমিশনের ওয়ার্ড ভিত্তিক তথাকথিত ‘গ্রাম পরিষদ’ গঠনের সুপারিশটি ও অন্যসব সুপারিশগুলো একদম অপরিপক্ক, ভঙ্গুর, খন্ডিত আর গোজামিলে ভরপুর; এক কথায় বলা যায় যে, রহমত আলী কমিশনের গোটা প্রতিবেদনটি সার্বিক বিবেচনায় বাস্তবায়নের অযোগ্য একটি প্রতিবেদন। তা সত্ত্বেও, বাস্তব অবস্থা দেখে মনে হয়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকগণ এ্যাডভোকেট রহমত আলী কমিশনের ওই গারবেজ তুল্য প্রতিবেদনটি নিয়ে এখনও সন্তুষ্ট কিংবা দ্বিধাগ্রস্ত রয়েছেন; পাশাপাশি আওয়ামী লীগের প্রায় সকল কেন্দ্রীয় নেতাগণ ও রহমত আলী কমিশনের সকল সদস্যগণ ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ সম্পর্কে বার বার অবগত হয়েছেন, এবং এর সবিস্তার ব্যাখ্যা শুনেছেন, জেনেছেন; তার পরও এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে, উপলব্ধিতে নিতে, বাস্তবায়নে যেতে এতবেশী সময় লাগার কারণ একদমই বোধগম্য নয়। সে যাই হোক, এখন তো বিএনপিকে ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার,’ ‘গ্রামসভা’ ও ‘গ্রাম সরকার’ নিয়ে কথা বলতে দেখা যায় না, শোনা যায় না। জাতীয় পার্টিকে ‘পল্ল¬ী পরিষদ’ নিয়ে কথা বলতে শোনা যায় না, দেখা যায় না; অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, অবৈধ শাসক এরশাদকে “পল্লী” শব্দ কেন্দ্রীক, “পল্লী পরিষদ” কেন্দ্রীক ও “পল্লীনিবাস” কেন্দ্রীক ‘পল্লীবন্ধু’ বানানোর খায়েশও এই দলের ফুরিয়ে গেছে বলে মনে হয়! আর আওয়ামী লীগকে ইউনিয়নে ওয়ার্ড ভিত্তিক তথাকথিত ‘গ্রাম পরিষদ’ গঠন নিয়ে কোনও বক্তব্য দিতে, টুঁ শব্দ করতে দেখা যায় না, শোনা যায় না। তবে প্রতি গ্রামে কিংবা ইউনিয়নের প্রতি ওয়ার্ডে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে যেসব ব্যক্তি নানাবিধ ফায়দা লুঠেছে, অপ্রয়োজনীয় বই-টই লিখে প্রচুর টাকাপয়সা কামিয়েছে, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ পরিচিতি মিডিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছে, দাতা গোষ্ঠীর টাকায় সভা-সেমিনার করেছে, নতুন নতুন এনজিও যেমন ‘স্থানীয় সরকার সহায়ক কমিটি’ গঠন করেছে, তারা এখনো মাঝেমধ্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠনের পক্ষে আড়ালে-আবড়ালে, চুপিসারে সাফাই গাইতে দেখা যায়। এসব অপকর্মকান্ডের বিরুদ্ধে, ইউনিয়নের মধ্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠনের বিরুদ্ধে সিডিএলজি’র লাগাতার ক্যাম্পেইন ও তীব্র প্রতিবাদ এর কারণে এক দিকে ওইসব ব্যক্তির জোরগলা বেশ ক্ষীণ ও দুর্বল হয়েছে; অপর দিকে ওইসব রাজনৈতিক দল বুঝতে পেরেছে যে, ইউনিয়নের মধ্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠন করার নামে আবার লাফালাফি, মাতামাতি করলে হালে আর পানি পাওয়া যাবে না; তাই তারাও চুপসে গেছে বা চুপসে যেতে বাধ্য হয়েছে বলে বোঝা যায়। শেষ তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গঠিত একটি স্থানীয় সরকার বিষয়ক কমিটিও ইউনিয়নের মধ্যে প্রতি ওয়ার্ডে ‘ওয়ার্ড সভা’ ও নগরীয় ওয়ার্ডে ‘ওয়ার্ড কমিটি’ গঠনের সুপারিশ করে; এই কমিটির জন্য অন্যসব খরচ ছাড়া শুধু ওই তথাকথিত সুপারিশ প্রকাশের জন্য ঢাকায় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত এক সভার জন্য ব্যয় করা হয়েছে প্রায় সোয়াশ কোটি টাকা, এর মাধ্যমে জাতীয় অর্থের অপচয় কারে কয়, তা ওই কমিটি ও স্থানীয় সরকার বিভাগ ভালভাবে দেখিয়েছে! ওই কমিটির প্রধান ড. শওকত আলী পুরস্কার স্বরূপ শেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাও হয়েছেন; তথাকথিত ওয়ার্ড সভা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠনের সুপারিশসহ ওই কমিটির অন্য সুপারিশগুলিও বড্ড সেকেলে, খন্ডিত ও বাস্তবায়নের একদম অযোগ্য; প্রথম দিকে মিডিয়াসহ অনেকেই না জেনে, না বুঝে ওই কমিটির প্রতিবেদনটির প্রতি সমর্থন জানায়, আবার জেনেবুঝেই কেবল স্বার্থগত কারণে তার পক্ষে শেষ তত্বাবধায়ক সরকারের গর্ভে সৃষ্ট ‘গভার্নেন্স কোয়ালিশন’ নামের একটি এনজিও গ্রুপ দাতা সংস্থার টাকায়, শেষ তত্বাবধায়ক সরকারের সেবাদাস হিসেবে সভা-সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে বেশ হইচই করে থাকে, ‘হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশ’ নামের আরেকটি এনজিও’র বাংলাদেশস্থ কর্ণদার (ড. বদিউল আলম মজুমদার) এর বিশেষ ব্যক্তিগত স্বার্থে ওই এনজিওটিও অনুরূপ কাজে লিপ্ত থাকে, আর এই হাঙ্গার প্রজেক্টএরই পকেট সংগঠন ‘সুজন’ও ওই প্রতিবেদন নিয়ে মাঠ গরম করার অপচেষ্টা চালায়, ‘ডেমক্রেসিওয়ার্চ’ নামের আরেকটি সুবিধাভোগী এনজিও ওই প্রতিবেদনের পক্ষে প্রচার প্রচারণায় সচেষ্ট থাকে, এবং এই এনজিও ইউনিয়ন পরিষদের তথাকথিত ‘স্থায়ী কমিটি শক্তিশালীকরণ’র নামে দাতা সংস্থার লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতে লোক দেখানো সভা সেমিনারও আয়োজন করত; অথচ ওই এনজিও বিধানিক পরিষদীয় বা সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কি, তা-ই বুঝত না, বুঝে না; মিসেস তালেয়া রেহমান কর্তৃক পরিচালত এই এনজিওটি গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার চায়, বুঝে তার কোনও লক্ষণ এর কর্মকান্ডে কখনও প্রতিফলিত হয়নি, হয়না; শুধু স্বার্থগত হয়ে খান ফাউন্ডেশন নামক এনজিওটিও অনুরূপ কর্মে জড়িত থাকে। ওই অসার প্রতিবেদনটির পক্ষে বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রও নিজস্ব স্বার্থগত কারণে প্রবল প্রচার প্রচারণায় যুক্ত হয়ে পড়ে; ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ নামক এনজিওটি অনুরূপ কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকে, যদিও এই এনজিওতেও স্থানীয় সরকার বুঝে, জানে এমন কোনো কর্মকর্তা দেখা যায়নি; তখন এই এনজিও’র এক বিশেষ সুবিধাভোগী কর্মকর্তা স্থানীয় সরকার বিষয়ক গার্বেজ তুল্য একাধিক নিবন্ধ ইংরেজী দৈনিক ডেইলি স্টারে প্রকাশ করায় এবং ইউরোপের একটি দেশ থেকে একটি স্কলারশিপ নিয়ে চলে যায়। অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ‘সিপিডি’ও ওই অসার প্রতিবেদনের পক্ষে জোর অবস্থান নেয়, যদিও এই প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার, গণতন্ত্রায়ন বুঝে, জানে এমন কোনও গবেষক, কর্মকর্তা আছে বলে আমাদের অন্তত জানা নেই; কিন্তু সিডিএলজির বুদ্ধিবৃত্তিক তীব্র আন্দোলনের ফলে ওই প্রতিবেদনের সুপারিশগুলির অসারতা, দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা খোলাসা হতে থাকায় তার প্রতি অনেকের সমর্থন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে, এবং ওই কমিটির সদস্যদের উচ্চকণ্ঠ আস্তে আস্তে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতম হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়; ওই কমিটির সুপারিশগুলি (মূলত একেও নকলবাজদের নকল বলাই শ্রেয়) এবং ওইগুলির ভিত্তিতে প্রণীত আইনকানুন বিধিবিধান যত দ্রুত সম্ভব বাতিল হয়ে যাওয়া উচিত। এই শেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদ্যোগেই তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি স্থানীয় সরকার কমিশনও গঠিত হয়; এ কমিটির সদস্যরা কেবল বেতন, ভাতা, অফিস, গাড়ী, বাড়ি, পদমর্যাদা ও নানা রকমের সুযোগসুবিধা আদায়ে ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে; এঁদের একজনেরও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার, বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও এর অভ্যন্তরীণ স্ট্যাটাসগত ও গুণগত পরিবর্তন সম্পর্কে তত্ত্বগত ও বাস্তব ধারণা ছিলোনা; এঁদেরই একজন হচ্ছেন ড. তোফায়েল আহমেদ; তিনি এখনও বিলুপ্ত কমিশনের পদবী ব্যবহার করে মিডিয়াসহ অন্যসব জায়গায় নানা রকমের সুযোগসুবিধা নিয়ে থাকেন, এবং তিনি তার অসার গার্বেজ তুল্য বক্তব্য কথায় লেখায় সবসময় তুলে ধরেন। তাজ্জব ব্যাপার হল, এই তিনি, যিনি আর্থ-সামাজিক স্তরীয় অবস্থা বুঝে স্থানীয় সরকারের প্রকার ঠিকভাবে করতে পারেন না, সর্বনি¤œ ইউনিট কতটি তা বুঝতে পারেন না, সর্বোচ্চ ইউনিট বিভাগ না জেলা তা ঠিক করার ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ করার প্রয়োজনীয়তা বুঝেন না, নির্বাহিক ও বিধানিক পরিষদের পার্থক্য বুঝেন না, সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ ও তার গুরুত্ব বুঝেন না, সার্থক নামকরণ ও যথার্থ সংজ্ঞায়িতকরণের গুরুত্ব অনুধাবন করেন না, ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন না, নারীর গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়নে ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি তথা এমপোতে বিশ্বাস করেন না, গ্রামীণ তথা কৃষিপ্রধান থেকে গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশের রূপান্তরিত উপস্থিতি এখনও টের-ই পাননা, বিদ্যমান গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ থেকে একটি পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এ উন্নীত হবার চলমান প্রক্রিয়া উপলব্ধিতে নিতে চাননা, স্থানীয় সরকারের স্তরীয় গন্তব্য ২০২০ সালে, ২০৫০ সালে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা জানেন না, বোঝেন না, বোঝতে চাননা, ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ মিডিয়া কর্মিরা তাঁকে এবং ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ড. আকবর আলি খান, ড. শওকত আলী সহ আরও কয়েক জনকে স্থানীয় সরকার “বিশেষজ্ঞ” হিসেবে প্রচার প্রকাশ করেই চলেছে; এতে তাঁরাও খুবই পুলকিত বোধ করেন! প্রশ্ন হল, এসব ব্যক্তিসহ আরও কিছু ব্যক্তি (কারা তা বুঝে নিলে খুশী হব) ও কিছু এনজিও সম্পর্কে মিডিয়া কর্মিরা কবে সচেতন হবে? কবে শেষ হবে স্থানীয় সরকার নিয়ে সব ধরনের অপতৎপরতা, অপপ্রচার? আর কবে শেষ হবে অসার, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রচার প্রকাশের লাগাতার মহড়া? আমরা চাই, মিডিয়া কর্মিরা স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ে শিক্ষিত হোক, আপডেটেড থাকুক, জেনে-বুঝে লিখুক, প্রতিবেদন প্রকাশ করুক; তাতে মিডিয়া কর্মিরা নিজে উপকৃত হবেন এবং তাতে দেশময় জনগণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপকৃত হয়ে থাকবেন।
প্রকৃতপক্ষে, স্থানীয় সরকার বিষয়ক যত রকমের মিথ, ভুল আর অপতৎপরতা রয়েছে, তার বিরুদ্ধে সর্বাত্বক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে সূচিত হয় ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী থেকে। ওই দিন ঢাকায় “গণতন্ত্র সংহতি সংসদ” আয়োজিত জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘স্থানীয় সরকার: গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে কীনোট বক্তা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ উপস্থাপিত করেন স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক গবেষক আবু তালেব, এবং সেই ১৩ জানুয়ারী ১৯৯৭ সাল থেকেই তাঁর উদ্যোগে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার, ২০২০ সালের মধ্যে একটি উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তথা “গণস্বপ্ন ২০২০” ও  ২০৫০ সালের মধ্যে একটি নগরীয় বাংলাদেশ তথা “গণস্বপ্ন ২০৫০” প্রতিষ্ঠার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন সূচিত হয়; বলা উচিত হবে যে, প্রকৃত অর্থে সেই থেকে বাংলাদেশে স্বপ্ন (ভিশন) ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে সচেতনতা আন্দোলন সূচিত হয়, এবং তারও আগে জনাব তালেব নিউ ইয়র্ক থেকে ২০২০ ও ২০৫০ সালদ্বয়কে সামনে রেখে বাংলদেশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণীত ও বাস্তবায়িত হোক সেই আন্দোলন পরিচালিত করেন-এই আন্দোলন একই সংগে নিউ ইয়র্ক ও ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়ে আসছে। আর এই আন্দোলনই স্থানীয় সরকার সম্পর্কে যত রকমের মিথ, মিথ্যা নোশান, আনফাউন্ডেড নোশান, অপচেষ্টা, অপতৎপরতা রয়েছে তা আস্তে আস্তে দূরীভূত করে আসছে; শুরুতে অনেকেই এই আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য বুঝতে পারেননি; ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিটি গ্রাম কিংবা ওয়ার্ড ভিত্তিক স্থানীয় সরকারের ইউনিট স্থাপনের কোনো প্রয়োজন নেই, জনাব আবু তালেবের এই দৃঢ় বক্তব্যের, অবস্থানের সারবত্তাও অনেকে একেবারেই বুঝতে পারেননি, এবং অনেকেই তাঁর এই দৃঢ় বক্তব্যকে, অবস্থানকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি বলে তাঁকে অনেকেই ভুল বুঝেছেন, ক্ষুরধার সমালোচনা করেছেন; অনেকেই ২০২০ ও ২০৫০ নিয়ে উপহাস করেছেন; জনাব তালেব দেশে থাকেন না, বিদেশে থেকে তিনি কি বাংলাদেশ ভালভাবে বুঝবেন? বাংলাদেশ চলে এডহক ভিত্তিক ভাবনায়, ভিশন ভিত্তিক বাংলাদেশের কথা তথা ২০২০ ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক স্বপ্নময় কথা কেবলই পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছু নয়; এমন সব কথা পিছনে তো বলতই, মাঝেমধ্যে সামনাসামনি বলে তাঁকে নিরাশ করার চেষ্টা করা হত; কিন্তু তিনি ওসব কথা সহজভাবে নিয়ে হেসে উড়িয়ে দিতেন। অনুরূপ কঠোর সমালোচনায় পড়তে হয়েছিল “গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা” নামকরণে “গণতান্ত্রিক” শব্দটি লাগানোর জন্যও। তাতে কিন্তু তিনি একটুও দমে যাননি; তিনি তাঁর সুদৃঢ় বক্তব্য নিরলসভাবে গোটা জাতিকে সাধ্যমত লাগাতার জানিয়ে বুঝিয়ে চলেছেন। এটা তো ঠিক যে, সমষ্টিগত কিংবা জাতিগত ভুল ভাঙ্গানো সহজ কাজ নয় এবং এও ঠিক যে, যে কোনো সত্য বিষয় সহজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়না, যায়নি। এসব বিষয় মাথায় রেখেই সিডিএলজি লাগাতার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার স্থাপন, কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক না হওয়া পর্যšত সিডিএলজি’র এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন, সংগ্রাম অবশ্যই চলতে থাকবে। ফলে, আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, স্বনির্ভর গ্রাম সরকার, পল্ল¬ী পরিষদ, গ্রাম সভা, গ্রাম পরিষদ, গ্রাম সরকার ও ওয়ার্ড সভার মত উপজেলাও একটা মিথ ও অপ্রয়োজনীয় ইউনিট হিসেবে একদিন না একদিন অবশ্যই প্রমাণিত হবে; এবং তথাকথিত ‘গ্রাম সরকার’র মত উপজেলার প্রতিও দেশবাসী ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের প্রবল মোহ ভঙ্গ হবে; আর সেজন্য, ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী থেকে পরিচালিত দেশের সার্বিক গণতন্ত্রায়নের ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার বিরতিহীন বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও তার অপরিসীম গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে, এই ১৩ জানুয়ারীকেই “স্থানীয় সরকার দিবস” হিসেবে ঘোষণা ও পালন করার জন্য সিডিএলজি, এমপো বাস্তবায়ন ফোরাম ও বাপসনিউজ জোর দাবী জানিয়ে আসছে। আমরা আশা করি সরকার তা বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে তার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
প্রাসঙ্গিকভাবে দুইটি বিষয় পাঠক-পাঠিকা সমাজের অবগতির জন্য স্পষ্ট করা দরকার বলে মনে হয়; তার একটি হল, “সিটি কর্পোরেশন” শব্দবন্ধটি নিয়ে; অনেকে ভুলবশত “সিটি” শব্দটির বাংলা “মহানগর” বলে থাকেন, লিখে থাকেন যেমন ঢাকা মহানগর, চট্রগ্রাম মহানগর, রাজশাহী মহানগর ইত্যাদি; গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দলগুলো, স্থানীয় প্রতিনিধিগণ, আইনপ্রণেতাগণ ও নীতিপ্রণেতাগণও তাই বলে-কয়ে চলেছেন। মূলত “নগর” শব্দটির ইংরেজী অনুবাদ হবে “সিটি” কিংবা “সিটি” শব্দটির  বাংলা অনুবাদ হবে “নগর”; “মহানগর” হল কীভাবে? তা তো মাথায় আসেনা। এবং সবাই জানে যে, “কর্পোরেশন” শব্দটি সাধারণত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ব্যবহার হয়ে থাকে, এবং এই “কর্পোরেশন” শব্দটি বললে বা শুনলে মানুষের মানসপটে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কথাই ভেসে ওঠে, এবং মুনাফা, লাভালাভ কেন্দ্রিক কর্মকান্ডের কথা চলে আসে; প্রশ্ন হল, স্থানীয় সরকার কি মুনাফামুখী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান? তা তো নয়; তাইলে “কর্পোরেশন” শব্দটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নাম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে কেন? এ কি “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি” তুল্য নাম? এই দুইটি বিষয় বিবেচনায় এনে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় জনাব আবু তালেব কেবল “নগর” আর “নগর সরকার” শব্দবন্ধদ্বয় ব্যবহার করেছেন। তাই তো আমরা সবসময় বলে আসছি যে, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা অনুযায়ী কল্যাণমূলক, সেবামূলক ও উন্নয়নমূলক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে ভুল নামকরণ “মহানগর” নামটি থেকে আর মুনাফার গন্ধ যুক্ত নামকরণ “কর্পোরেশন” নামটি থেকে অবিলম্বে মুক্ত করতে হবে; আমরা আশা করি এই ধরনের বড় ভুল আর গোজামিল থেকে সরকারসহ সবাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দায় স্বীকার করেই বের হয়ে আসবেন। অপরটি হল, সরকারসহ অনেকেই ভুল ধারণা বশত শুধু সিটি কর্পোরেশনগুলোকে আরবান ইউনিট মনে করে থাকে; এই ভুল ধারণাটি ভাঙ্গতে ও প্রকৃত বিষয় তুলে ধরতে এই প্রতিবেদনে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ অনুযায়ী নগর, নগরীয় ইউনিট ও নগরীয় এলাকা বলতে সিটি কর্পোরেশনগুলোর পাশাপাশি দেশের সকল পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকেও বুঝানো হয়েছে। প্র্রকৃত অর্থে, নগর ও নগরায়ন বোঝেনা, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বোঝেনা এমন সব ব্যক্তি ও সরকারী কর্মকর্তাগণ (বিশেষত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, একনেক, নিকার, মন্ত্রিপরিষদ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, সংসদ, বিচার ও রাষ্ট্রপতির সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনের সচিবালয়ের কর্মকর্তাগণ) এর কারণে নগরীয় এলাকায় অবস্থিত স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিটগুলোকে বিভিন্ন নীতি, আইন ও বিধিতে বিভিন্ন নাম দিয়ে একটা বিভ্রান্তিকর অবস্থায় রাখা হয়েছে; একই আইনে গ্রামীণ এলাকার স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট “ইউনিয়ন” নামকরণের মত একই আইনে নগরীয় এলাকার স্থানীয় ইউনিটগুলিও শুধু “নগর” নামে পরিচিত হতে পারতো, হতে পারে, এবং ইউনিয়ন ও নগরে যথাক্রমে ইউনিয়ন সরকার ও নগর সরকার গঠিত হতে পারত, হতে পারে। ইউনিয়নগুলির মধ্যে আয়তন, জন সংখ্যা, রাজস্ব আয়-ব্যয় ও গুরুত্বে যেমন পার্থক্য রয়েছে, ঠিক তেমনি নগরগুলোর মধ্যেও আয়তন, জনসংখ্যা, রাজস্ব আয়-ব্যয় ও গুরুত্বে পার্থক্য রয়েছে; যদি গ্রামীণ এলাকায় “ইউনিয়ন” নামকরণে অসুবিধা না থাকে, নগরীয় এলাকায় এক ধরনের নাম “নগর” হতে অসুবিধা কোথায়? সেই বিষয়টি একেবারেই বোধগম্য নয়। আবার, ইউনিয়নের জন্য ‘ইউনিয়ন সরকার’ গঠন করার বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে ইউনিয়নের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ‘ওয়ার্ড সভা’ গঠনের আইন রয়েছে, এবং নগরগুলির জন্য ‘নগর সরকার’ গঠন করার বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে প্রতিটি নগরীয় ওয়ার্ডে অপ্রয়োজনীয় ‘ওয়ার্ড কমিটি’ গঠন করার আইনও রয়েছে; এও এক ধরনের পাগলামি ছাড়া অন্য কিছু নয়। সে যাই হোক, বাংলাদেশ এখন আর শুধু গ্রামীণ দেশ নয়, কেবল কৃষিজ সমাজ নয়; বিদ্যমান বাস্তবতায় এখনকার বাংলাদেশ হচ্ছে গ্রামীণ-নগরীয় দেশ, গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ, অর্থাৎ একটি মিশ্র সমাজ; গ্রামীণ বাংলাদেশ আর গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এক বিষয় নয়; এই দু’টোর সম্ভাবনা, সমস্যা, উন্নয়ন পরিকল্পনা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক ধরনের নয়; কৃষিজ সমাজ আর গ্রামীণ-নগরীয় সমাজের ধ্যান-ধারণা ও জীবনাচরণ এক নয়; তাই এই দু’টোর প্রশাসনিক কাঠামো ও তার কার্যাবলীও এক ধরনের হওয়া উচিত নয়; দুঃখজনক বিষয় হল, অন্যান্য পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনার মত ৭ম পঞ্চ বার্ষিক (২০১৬-২০২০) পরিকল্পনার চূড়ান্ত খসড়ায়ও তার ইঙ্গিত, স্বীকৃতি ও প্রস্তুতিমূলক বিষয় একদম নেই বললে চলে। রাজনৈতিক দলসহ মিডিয়াও এই বিষয়টি বুঝতে পারছেনা বলে প্রতীয়মান হয়। জনাব আবু তালেব বাংলাদেশের স্ট্যাটাসগত ও গুণগত এই বিরাট পরিবর্তনের কথা সর্বপ্রথম ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী ঢাকায় আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে তুলে ধরেন; সেই থেকে অনেক সময় পার হয়েছে; নতুন কোনও কিছু বুঝে ওঠতে সময় লাগতেই পারে; কিন্তু এত বেশী সময় লাগাটা একদম মেনে নেয়া যায়না। এই বিষয়টি যত দ্রুত সম্ভব মিডিয়া, নীতিপ্রণেতাগণ, আইনপ্রণেতাগণ ও গোটা সমাজকে বুঝতে হবে, এবং সরকার কর্তৃক বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রামীণ-নগরীয় দেশ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে; গ্রামীণ সমাজ তথা কৃষিজ সমাজ থেকে গ্রামীণ-নগরীয় সমাজের ধ্যান-ধারণায় ও জীবনাচরণে অভিযোজন প্রক্রিয়া সচেতনভাবে সম্পন্ন করতে হবে, তার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রণীত, গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে হবে, এবং তারই ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো, ক্ষমতা ও কার্যাবলী ঠিকঠাক করতে হবে। এই তো গেল একটা দিক; অন্য দিক হল দ্রুত নগরায়নের ফলে বিদ্যমান গ্রামীণ-নগরীয় দেশ থেকে বাংলাদেশ একটি পরিপূর্ণ নগরীয় দেশ হবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে; একটি গ্রামীণ দেশ, কৃষজ সমাজ থেকে একটি পরিপূর্ণ নগরীয় দেশ, নগরীয় সমাজ হবার পথে গ্রামীণ-নগরীয় দেশ, গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ হচ্ছে একটা মধ্যবর্তী পর্যায়; তবে এর স্থায়িত্ব কালও কম সময় নয়; তা মাথায় রেখেই পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এর সমস্যা ও তার সম্ভাব্য সমাধানসূত্র বাস্তবায়নের জন্য সামগ্রিকভাবে মানসিক ও শিক্ষাগত প্রস্তুতিও এখন থেকে নিতে হবে। এক হিসাব অনুযায়ী দ্রুত নগরায়নের ফলে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ৫০% এলাকা হয়ে যাবে নগরীয় এলাকা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১০০% এলাকা হয়ে যাবে নগরীয় এলাকা; অন্যভাবে বলা যায়, গ্রামীণ ইউনিটগুলি যেমন ইউনিয়নগুলি বিলুপ্ত হয়ে যাবে; তাতে কি হবে? তাতে গোটাদেশ নগরীয় ইউনিটে বিভক্ত হয়ে পড়বে। ফলে আজকের যে গ্রাম কিংবা আগের যে সনাতন গ্রাম তা মূলত জাদুঘরে ও বই-পুস্তকে ঠাঁই পাবে; বাস্তবে সেই গ্রামের চিহ্ন কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা। এই বিষয়টি আরেকভাবে অনুধাবন করা যেতে পারে, বর্তমানে প্রায় ৩৫% জনগোষ্ঠী নগরীয় এলাকায় বসবাস করে, ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০% জনগোষ্ঠী নগরীয় এলাকায় বসবাস করবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১০০% জনগোষ্ঠী নগরবাসী হয়ে যাবে। চলমান এই নগরায়ন প্রক্রিয়ায় একদিকে গ্রামীণ কৃষি পেশাতে কর্মসংস্থান বিপুলভাবে কমছে, কমতে থাকবে, এবং অন্যদিকে অন্যসব নতুন নতুন অকৃষি পেশাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, হতে থাকবে। তার আলামত প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে, বুঝা যাচ্ছে। সুতরাং, দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায় যে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ মানে পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ; তাই গ্রামীণ বাংলাদেশ থেকে বিদ্যমান গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশও চিরকাল গ্রামীণ-নগরীয় দেশ থাকবেনা; এটি একটি মধ্যবর্তী পর্যায়; এই মধ্যবর্তী পর্যায় থেকে দ্রুত নগরায়নের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ, নগরীয় সমাজ, নগরীয় সভ্যতা; বাংলাদেশ খুব দ্রুত তালে সেদিকেই এগিয়ে চলেছে। এই বিষয়টি বিশ্বাসে রেখে, তারই ভিত্তিতে একটি পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগরীয় বাংলাদেশ, নগরীয় প্রশাসনিক ইউনিট ও তার জন্য গতিশীল ‘নগর সরকারের রূপরেখা’ ও তা স্থাপন সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট সুস্পষ্ট প্রস্তাব সর্বপ্রথম ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারীতে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’য় উপস্থাপিত করা হয়েছে; এটি একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বিধায় তখন অনেকেই তা বুঝে উঠতে পারেনি, দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও এখনও অনেকে তা বুঝে উঠতে পারছেনা বলে প্রতীয়মান হয়; বিশেষত দুঃখজনক বিষয় হল, ১৯৯৭ সাল থেকে সিডিএলজি’র এই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যাম্পেইন চলমান ও দৃশ্যমান থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, কৃষি মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ, একনেক, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রীপরিষদ ও জাতীয় সংসদ তা পুরোপুরি বুঝতে অপারগ কিংবা বুঝতে চায়না বলে প্রতীয়মান হয়; এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাগণের সেকেলে চিন্তাভাবনা ও কর্মকা- জাতিকে অনেক অনেক পেছনে ফেলে রেখেছে; বাংলদেশকে পিছনে ফেলে রাখার সেই অদূরদর্শি ধারা পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক প্রণীত ৭ম পঞ্চ বার্ষিক (২০১৬-২০২০) পরিকল্পনার চূড়ান্ত খসড়ায় ছিলো এবং তা চূড়ান্ত পরিকল্পনায়ও রয়েছে; আর যারা নগরীয় ইউনিটে মেয়র ও কাউন্সিলর হয়েছে কিংবা হতে চায় তারাও “পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত” নগর, নগরায়ন, নগরবাদ, নগরীয় কৃষি, নগরীয় সভ্যতা, নগরীয় কালচার, নগরীয় জীবনধারা ও নগর সরকারের রূপরেখা নিয়ে তেমন একটা চিন্তাভাবনা করে বলে প্রতীয়মান হয়না; সেই ১৯৯৭ সালে জনাব আবু তালেব “পরিকল্পিত” শব্দটির আগে “পরিবেশবান্ধব” শব্দটি জুড়িয়ে দিয়ে আগে “পরিবেশ” বিষয়টি সকলের সামনে নিয়ে আসেন-যার গুরুত্ব ও তাৎপর্য এখনও অনেকে বুঝেন না বলে বুঝা যায়; তবে “পরিবেশবান্ধব” শব্দটি আস্তে আস্তে হলেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে; বুঝে হোক আর না বুঝে হোক লেখালেখিতে শব্দটি প্রায়োগিক গুরুত্ব পাচ্ছে। শুরুতে অনেকেই এই শব্দটির ব্যবহার বাঁকা চোখে দেখতেন, এ নিয়ে জনাব আবু তালেব কর্তৃক বাড়াবাড়ি বলে আলোচনা-সমালোচনা করতেন এবং এই শব্দ আর স্থানীয় সরকারের রূপরেখা-এ দু’য়ে সম্পর্ক কোথায় তা নিয়েও প্রশ্ন করতেন। এতো সত্য যে, ২০২০ ও ২০৫০ সালদ্বয়কে সামনে রেখে প্রতিটি নগর ভিত্তিক পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সেবামূলক সার্ভিস পরিচালিত করার লক্ষ্যে নগরীয় প্রশাসনিক ইউনিটগুলো সাজানো ও তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা ও কর্মসূচী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই, তা স্পষ্টভাবে বুঝা যায়; এ এক মহা হতাশাজনক চিত্র; এর অবসান হওয়া খুবই জরুরি বৈকি। সেক্ষেত্রে আশার আলো হল, এটি নিয়ে সিডিএলজি, বাপসনিউজ, এমপো বাস্তবায়ন ফোরামসহ আরও অনেকে লাগাতার ক্যাম্পেইন চালিয়ে আসছে; ফলে একদিন না একদিন এই হতাশাজনক চিত্র একটি আলোকিত চিত্রে পরিণত হবে, হতে বাধ্য।

alt
সে যাই হোক, সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের প্রয়োজন হচ্ছে একটি দুই স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার পদ্ধতি; আর কেন্দ্রীয় সরকারসহ বাংলাদেশের প্রয়োজন হচ্ছে একটি তিন স্তরবিশিষ্ট সরকার পদ্ধতি। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে একটি দুই স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার কাঠামো স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করার দিকে যেতে হবে; দুইয়ের চেয়ে বেশী স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার কাঠামো থাকলে তাতে মধ্যবর্তী ইউনিট থাকবে, এখন যেমন উপজেলা রয়েছে; এই অপ্রয়োজনীয়, দায়দায়িত্বহীন, স্বশাসনহীন মধ্যবর্তী ইউনিটের অস্তিত্ব বজায় রাখাটা হচ্ছে, হবে কেবলই অপচয়মূলক ও অসৎউদ্দেশ্যমূলক; এই মধ্যবর্তী ইউনিট নিয়ে ইতোমধ্যে অনেক সময় ও অর্থ নষ্ট করা হয়েছে; আশাকরি, আর কাল বিলম্ব না ঘটিয়ে এই বিষয়টি নীতিপ্রণেতা ও আইনপ্রণেতাগণ যত দ্রুত সম্ভব বুঝার চেষ্টা করবেন এবং তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। ভুল ধারণা বশত বাংলাদেশকে এখনও একটি গ্রামীণ দেশ (রুরাল কান্ট্রি) মনে করা হয়; কিন্তু বাংলাদেশ এখন আর শুধু গ্রামীণ দেশ নেই; এই ভুল ধারণার পরিবর্তে বিদ্যমান বাস্তবতায় বাংলাদেশকে একটি গ্রামীণ-নগরীয় (রুরাল-আরবান) দেশ হিসেবে ধরে নিয়ে এবং ২০২০ ও ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ ও বিশ্বময় পরিবর্তনশীল বিষয়গুলি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৯৬ সালে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ণ বিষয়ক গবেষক আবু তালেব স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ ও স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ প্রণয়ন করেন, এবং তিনি তা ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী ঢাকায় জতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক জাতীয় সেমিনারের মাধ্যমে জনগণ ও বাংলাদেশ সরকারের বিবেচনার্থে উপস্থাপিত করেন; এটি গ্রামীণ বাংলাদেশ এর পরিবর্তে গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য গণতান্ত্রিক স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রথম উদ্যোগ, প্রথম প্রচেষ্টা; দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সেবামূলক কর্মকা- ধাপে ধাপে (কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত) ধারাবাহিকতায় স্থিতিশীল গতিশীল প্রক্রিয়ায় পরিচালিত করার জন্য স্থানীয় সরকারের একটি স্তরবিন্যাসকরণ দেশের সূচনা লগ্ন থেকে ঠিক করার প্রয়োজন থাকলেও আজ অবধি এই কাজটি সচেতনভাবে সঠিকভাবে করার কোনো উদ্যোগ গৃহীত হয়নি, হচ্ছেনা; তা অবশ্যই দুঃখজনক ঘটনা; সে যাই হোক, তিনি উক্ত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয়ে মধ্যবর্তী ইউনিটগুলি, যেমন উপজেলা, ও অন্যান্য গ্রামীণ ইউনিটগুলি, যেমন ইউনিয়ন, কীভাবে আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাবে তা রেখাচিত্রের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন; এবং, ওই প্রস্তাবিত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয়ে গোটা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কীভাবে একটি দুই স্তরবিশিষ্ট কাঠামো হয়ে ওঠবে তাও গ্রাফে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন; তাতে তিনি সরকারের আকার আয়তন আস্তে আস্তে ছোট করার ব্যবস্থা করেছেন, ফলে কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সিস্টেম কস্ট কমে গিয়ে উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। উভয় কাঠামোতে ২০৫০ সালে কিংবা তার আগেই একটি পরিপূর্ণ ‘নগরীয় (আরবান) বাংলাদেশ’ গঠনের স্বপ্ন ও তার বাস্তবরূপ তুলে ধরা হয়েছে। বিদ্যমান ‘গ্রামীণ-নগরীয় (রুরাল-আরবান) বাংলাদেশ’ কি প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আস্তে আস্তে পরিপূর্ণ ‘নগরীয় (আরবান) বাংলাদেশ’ হয়ে ওঠবে এবং পরিপূর্ণ ‘নগরীয় বাংলাদেশ’ এ কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে স্থানীয় সরকার তথা শুধু নগরীয় স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ কি রূপ নিবে, নিতে পারে, তা ওই স্তরীয় কাঠামোগত রেখাচিত্রে সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ও বোধগম্য করা হয়েছে; এ এক মহা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কাজ; এ এক মহা বিস্ময়কর ব্যাপার, বিষয়। যে কেউ এই কাজের গভীরতা ও তাৎপর্য বুঝতে পারলে শ্রদ্ধায় ভালবাসায় নত হয়ে যাবারই কথা; আমাদের প্রবল বিশ্বাস হচ্ছে, জনাব আবু তালেব ২০৫০ সালের মধ্যে “নগরীয় বাংলাদেশ” এর স্বপ্নদ্রষ্টা ও ক্যাম্পেইনার হিসেবে, আগে পরিবেশ এই বিষয়টি মাথায় রেখে “পরিকল্পিত” শব্দটির আগে “পরিবেশবান্ধব” শব্দটি লাগিয়ে “পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগর ও নগরায়ন” শব্দবন্ধের ইনকুবেটার ও ক্যম্পেইনার হিসেবে, ২০২০ সালের মধ্যে একটি ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ নির্মাণের স্বপ্নদ্রষ্টা ও তার বাস্তবায়নমূলক পরিকল্পনার প্রণেতা ও ক্যাম্পেইনার হিসেবে, দেশের অন্য সকল ক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০২০ ও ২০৫০ সাল কেন্দ্রিক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া মান্য করানোর প্রবক্তা ও ক্যাম্পেইনার হিসেবে, নারীর ৫০% প্রতিনিধিত্বের প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ ধারণার পরিবর্তে নারীপুরুষের জন্য এমপো তথা একশো একশো (১০০-১০০) প্রতিনিধিত্ব ফর্মুলা ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রণীত ১১ দফার ইনকুবেটার ও ক্যাম্পেইনার হিসেবে, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’র প্রণেতা হিসেবে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের রূপরেখার প্রণেতা হিসেবে, গণতান্ত্রিক আইনসভার রূপরেখার প্রণেতা হিসেবে, গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক অনেকগুলি শ্লোগানের রচয়িতা হিসাবে, কেবল কৃষি ভিত্তিক ধারণায় ‘গ্রামীণ বাংলাদেশ’ নামে চিরায়ত পরিচিতি পাল্টে দিয়ে কৃষি-অকৃষি পেশাভিত্তিক মিশ্র ধারণায় একটি “গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ” নামীয় পরিচিতি তুলে ধরার জন্য, আবার ২০৫০ সালের মধ্যে “গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ” থেকে একটি পরিপূর্ণ “নগরীয় বাংলাদেশ’ নির্মাণে স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এখানে আরও জানিয়ে রাখা উচিত হবে যে, তার এই প্রশাসনিক স্তরীয় কাঠামোগত রূপরেখা হচ্ছে ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রথম প্রস্তাবিত পরিকল্পনা, প্রথম দৃষ্টান্ত; যেটি দেশের অন্যসব ক্ষেত্রের জন্য ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সবাইকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে আসছে, এবং সকলকে তাতে অনুপ্রাণিত করতে লাগাতার ক্যাম্পেইন চলে আসছে। প্রসঙ্গত বলা দরকার যে, তিনি এই রূপরেখায় ২০২০ সালের মধ্যে একটি ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ (যেটি ‘গণস্বপ্ন ২০২০’ নামে বহুল পরিচিত) নির্মাণ করার যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন ও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার পরিকল্পনা হাজির করেছেন তা অনেকে পরিপূর্ণভাবে না বুঝে কিংবা বুঝে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ‘ ও ‘উন্নত বাংলাদেশ’ এর মধ্যেকার বিশাল তফাতকে গুলিয়ে ফেলে বক্তব্য হাজির করার অপচেষ্টা করছেন বলে প্রতীয়মান হয়; ঠিক যেমন অনেকে না বুঝে এক সময় ‘জাতীয় সরকার/কেন্দ্রীয় সরকার’ আর ‘জাতীয় একতা সরকার’ বিষয়দ্বয়ের মধ্যেকার তফাত গুলিয়ে ফেলতেন; ওই তফাতের বিষয়টি গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় সর্বপ্রথম সুস্পষ্টভাবে হাজির করার পর তা গুলিয়ে ফেলার বিষয়টি প্রায় বন্ধ হয়েছে বলে মনে হয়। এখন একইভাবে ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ আর ‘উন্নত বাংলাদেশ’ এর মধ্যেকার ফারাক গুলিয়ে ফেলার বিষয়টি বন্ধ হলে ভাল হয়; কারণ ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ হচ্ছে টু ইন ওয়ান আর ‘উন্নত বাংলাদেশ’ হচ্ছে ওয়ান ইন ওয়ান; এটি যাঁদের উদ্দেশ্যে বলা হল, আশা করি, তাঁরা তা বুঝবেন এবং নিজেদেরকে সংশোধন করবেন। সে যাই হোক, এই আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ আরও অনেকে ২০২০ সালের কথা বলছে, ২০২১ সালের কথা বলছে, ২০৩০ সালের কথা বলছে, ২০৪০ সালের কথা বলছে, ২০৪১ সালের কথা বলছে, ২০৫০ সালের কথাও একটু আধটু উচ্চারণ করছে, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা বলছে এবং সর্বোপরি এডহক ভিত্তিক পরিচালিত কর্মকান্ডের পরিবর্তে স্বপ্ন (ভিশন) ভিত্তিক কর্মকান্ড পরিচালনার কথা বলছে; এক্ষেত্রে মনে করিয়ে দেয়া প্রয়োজন  যে, তার উৎস, অনুপ্রেরণা, পথপ্রদর্শক, পথিকৃৎ হচ্ছে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা, ওই রূপরেখায় উপস্থাপিত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয় অর্থাৎ জনাব আবু তালেব, যার লাগাতার ক্যাম্পেইন তিনি নিউ ইয়র্ক থেকে সূচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সফলভাবে চালিয়ে আসছেন; তিনি নিজে একটা লম্বা সময় বাংলাদেশে থেকে ২০০৮ সালে ও ২০০৯ সালে এই ক্যাম্পেইন পরিচালিত করেছেন। তবে জনাব আবু তালেব এর আহবান ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৯৭ সাল থেকে যদি ২০২০ ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক দেশের সকল ক্ষেত্রে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন, গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হত, যদি ‘গণস্বপ্ন ২০২০’ ভিত্তিক ২৫টি ক্ষেত্রে ২৫টি গণতস্ত্রায়ন কর্মসূচী নিয়ে ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ নির্মাণ প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন শুরু হত, যদি ‘গ্রামীণ বাংলাদেশ’ এর পরিবর্তে ‘গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ’ এর ধারণা সবাই বুঝত ও গ্রহণ করত, যদি ‘গণস্বপ্ন ২০৫০’ ভিত্তিক পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত ‘নগরীয় (আরবান) বাংলাদেশ’ মুখী নির্মাণ প্রক্রিয়া প্রচেষ্টা সচেতনভাবে শুরু হত, যদি ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি তথা ‘এমপো’ ও ১১ দফা অনুযায়ী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে শুরু হত, যদি ২০২০ ও ২০৫০ সন ভিত্তিক প্রণীত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ অথবা স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ অনুযায়ী স্থানীয় সরকার কাঠামো বাস্তবায়ন শুরু হত, তাহলে আজ বাংলাদেশ আরো অনেক অনেক দূর সকল ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকতে পারতো; কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল তথা ইউনিয়ন ও নগর পর্যন্ত ধাপে ধাপে ক্ষমতাশীল দায়িত্বশীল দায়বদ্ধ গতিশীল সরকার কাঠামো দাঁড়িয়ে যেতে পারতো; সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে উঠতে পারতো। তবে বিলম্বে হলেও ভিশন ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা বোঝা ও কোনও কোনও বিষয়ে ভিশন ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপিত হওয়াটা অবশ্যই প্রশংসনীয়; কোনও কিছু অনুসরণে ও গ্রহণে যেসব রীতিনীতি মান্য করতে হয় তা বিবেচনায় নিলে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা, নকলবাজী দলীয় ঘোষণাপত্রে পিডিপি ২০৫০ নিয়ে করেছে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০২০, ২০২১ ও ২০৪১ নিয়ে করছে, সম্প্রতি একই বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা, নকলবাজী বিএনপিও ২০৩০ নিয়ে করছে, আরও অনেকে বিভিন্নভাবে করছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; এই দলগুলি জনাব আবু তালেবের প্রতি কৃতজ্ঞতা, ধন্যবাদ জানাতে পারত; তা তো কোনও দলই করেনি; অথচ নকল আর অনুসরণ নিয়ে বাহাস হচ্ছে, বাহবা নিতে কসরত চলছে; কোন দল নকলে প্রথম হল আর কোন দল নকলে দ্বিতীয়, তৃতীয় হল, তা নিয়ে। এসব নিয়ে মিডিয়াও তালি বাজাচ্ছে, ঢোল পেটাচ্ছে, অথচ সত্য কথা বলছেনা; তাসত্ত্বেও, আমরা বলব, ভিশন ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপিত করাকে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাই, স্বাগত জানিয়ে যাব; কারণ আমরা চাই সবাই ভিশন ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করুক, এডহক ভিত্তিক কর্মকান্ড বর্জন করুক। প্রসঙ্গত আরও বলব যে, ভিশন, মিশন, গোল ও অবজেকটিভ এই শব্দগুলোর অর্থ, তাৎপর্য ও নির্দিষ্ট রূপ রয়েছে, তা যেন কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে বজায় রাখা হয়, মান্য করা হয়; যেনতেন উপায় অবলম্বনে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপিত হওয়া কাম্য নয়, অথচ হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। সে যাই হোক, বরাবরের মত এখনো জাতীয় নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমাদের সবিনয় অনুরোধ হল, ২০২০ ও ২০৫০ সন ভিত্তিক প্রণীত প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ ও স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ আরও ভালভাবে জানুন এবং তা আরও গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করুন। আমরা তো সবসময় বলে আসছি যে, আগে স্থানীয় সরকারের একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ গ্রহণ করতে হবে, এবং সে অনুযায়ী গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় সরকার হিসেবে সর্বোচ্চ ইউনিট (বিভাগীয় সরকার অথবা জেলা সরকার) ও সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয় (একদিকে গ্রামীণ স্থানীয় সরকার হিসেবে “ইউনিয়ন সরকার” ও অন্যদিকে নগরীয় স্থানীয় সরকার হিসেবে “নগর সরকার”) কার্যকর করতে হবে। স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট বিভাগ, না জেলা তা আজ অবধি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত করা হয়নি; ক্ষমতা ও দায়িত্ব বিভিন্ন স্তরে যথাযথভাবে বণ্টনের স্বার্থে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি কেন ঠিক করা হয়নি সে প্রশ্ন রেখেই বলব সর্বোচ্চ ইউনিট কোন্টি তা অবশ্যই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঠিক করতে হবে। বর্তমানে বিভাগ হচ্ছে কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোয় মাঠ পর্যায়ে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ইউনিট; এই বিভাগ স্থানীয় সর্বোচ্চ ইউনিট থাকলে উপজেলার পাশাপাশি জেলাও থাকছে মধ্যবর্তী ইউনিট; ফলে জেলার ক্ষমতা ও দায়িত্ব মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে নির্ধারিত করতে হবে; মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে জেলায় গঠিত স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা কতটুকু থাকবে তা বুঝতে হবে; এ প্রসঙ্গে দৃঢ়তায় বলা যায় যে, বর্তমান কাঠামোয় মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে জেলার গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা উপজেলার মতই হবে, হতে বাধ্য, এবং তাতে জনগণ হতাশ হবে, জেলায় স্থানীয় সরকারের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হবে, এবং এটি নিয়ে নীতিনির্ধারকগণকে মুখ লুকিয়ে থাকতে হবে। সেজন্য মনে করিয়ে দেয়া দরকার যে, বহু স্তরীয় স্থানীয় সরকার কাঠামোয় মধ্যবর্তী ইউনিট থাকলে তা সাধারণত বেশ গুরুত্বহীন ভূমিকায় থাকে, এবং কর্মকান্ড, তৎপরতা বেশ সীমিত পর্যায়ে থাকে। এই বিষয়টি অনেকেই বুঝতে পারছেন না বলে প্রতীয়মান হয়; এই অনেকেরাই “বিভাগ” বিষয়েও অন্ধ-বোবা সাজেন; অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে? যেহেতু সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে বিভাগ আছে, তাই বিভাগ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত অবশ্যই নিতে হবে; তা হলো, হয় বিভাগ বিলুপ্ত করতে হবে, নয় বিভাগে স্থানীয় সরকার স্থাপন করতে হবে। সে যাই হোক, বিদ্যমান ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে জেলা সম্পর্কিত বিষয়টি উদাহরণ দিয়েই দেখা যাক; পার্বত্য ৩ জেলা ছাড়া বাকি ৬১টি জেলায় ৬১ জন নিযুক্ত ‘নিধিরাম’ জেলা পরিষদ প্রশাসক ছিলো, যাদের সঙ্গে দায়দায়িত্ব পালনের কোনো সম্পর্ক ছিলনা, যাদের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক ছিলনা, যাদের উপস্থিতি, কর্মতৎপরতা একদম টেরযোগ্য ছিলনা; এর বড় কারণ হচ্ছে উপজেলার মত জেলাও বিদ্যমান ব্যবস্থায় গুরুত্বহীন, কামকাজহীন মধ্যবর্তী ইউনিট; এতে ক্ষমতা ও দায়িত্ব তথা কর্মকান্ড দৃশ্যমান নয়। কিন্তু এই ৬১ জন প্রশাসকের জন্য আরাম আয়েস ও সুযোগসুবিধার কোনো কমতি ছিলনা; এটি ছিল স্থানীয় সরকারের নামে সংকীর্ণ স্বার্থে সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার ও উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রয়োগ; ঠিক যেমন স্থানীয় সরকারের নামে কেবল ব্যক্তিগত ও দলগত স্বার্থে অবৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট জিয়া ও অবৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট এরশাদ যথাক্রমে গ্রাম সরকার ও উপজেলাকে নিয়ে করেছেন। তাতে তখনকার সময় ও পরিস্থিতিতে উভয় অবৈধ প্রেসিডেন্টদ্বয় ব্যক্তিগতভাবে ও দলগতভাবে লাভবান হয়েছেন; কিছু সুবিধাবাদী ক্ষমতালোভী নীতিহীন টাউট লোককে নতুন দল দু’টির জন্য হাতিয়ার হিসেবে পেয়েছেন, এবং ওইসব সুবিধাবাদী মানুষগুলোই ওই দু’টো দলের বর্তমানকার আসল কান্ডারি হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ৬১টি জেলায় ৬১ জন প্রশাসক দ্বারা এই সরকার ও এই দল (আওয়ামী লীগ)  লাভবান হবার কথা নয়; কারণ এই দু’টো কাজের সময় ও পরিস্থিতি একদম এক রকম নয়। তবে দলীয় ৬১ জন ব্যক্তিকে সরকারী টাকায় পোষা জাতীয় স্বার্থ হতে পারেনা; তা বর্তমান সরকার ও আওয়ামী লীগ বুঝে থাকলে তো অবশ্যই ভাল; পাশাপাশি, প্রাসঙ্গিকভাবে জেলা সংক্রান্ত আরেকটি বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলা উচিত হবে, তা হল সার্বিক বিবেচনায় একজন অসফল অর্থমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত জনাব মুহিত কর্তৃক উপস্থাপিত জাতীয় বাজেটে বার বার কেন্দ্রীয় সরকারের তথাকথিত ‘জেলা বাজেট’ প্রসঙ্গ উত্থাপন; জেলা বাজেট হবার কথা জেলা সরকারের, কেন্দ্রীয় সরকারের নয়; প্রশ্ন হল, জেলা সরকার কোথায়? স্বাভাবিকভাবে মনে এই প্রশ্নও এসে যায় যে, কেন্দ্রীয় সরকার কি তাইলে বিভাগীয় বাজেট, উপজেলা বাজেট, নগরীয় বাজেট, ইউনিয়ন বাজেটও করবে? জেলা বাজেট বিষয়টি জাতীয় বাজেট বক্তৃতায়, দলিলে বার বার আসাটা শুধু অর্থমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রণালয় নয়, মন্ত্রিপরিষদ ও জাতীয় সংসদের অপরিপক্কতারই পরিচয় বহর করে; সিপিডিসহ কয়েকটি এনজিও এবং কিছু ব্যক্তি স্বার্থগত কারণে এই বাজে বিষয়টিকে সমর্থন দিয়ে থাকে; প্রকৃত অর্থে স্থানীয় সরকার না বুঝলে, ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন সম্পর্কিত বিষয় জানা না থাকলে এমনটি-ই হয়! হবার কথা! জনাব আবু তালেব ১৯৯৬ সালে সর্বপ্রথম ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ প্রণয়ন করেন এবং সেসঙ্গে একটি শ্লোগানও প্রণয়ন করেছিলেন; শ্লোগানটি হল, ‘জেলায় জেলায় গণতন্ত্রায়ন, জেলার জনগণের ক্ষমতায়ন’; জনাব মুহিত জনাব আবু তালেবের সঙ্গে এক ফোনালাপে ‘জেলা সরকার’ নামকরণ ও ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ বিষয়ক প্রস্তাবনার প্রতি প্রবল আপত্তি জানিয়ে ছিলেন; অথচ এই মুহিত সাহেব পরবর্তীতে ‘জেলায় জেলায় গণতন্ত্রায়ন’ শ্লোগানের আদলে ‘জেলায় জেলায় সরকার’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন; তাতে তিনি জনাব আবু তালেব ও তাঁর জেলা সরকারের রূপরেখা প্রসঙ্গ একটুও উল্লেখ করেননি; এই হল জনাব মুহিত কর্তৃক বুদ্ধিবৃত্তিক চুরির, ডাকাতির, অসততার একটি নজির মাত্র। আমরা দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলতে চাই যে, কোনো না কোনো একদিন অর্থমন্ত্রীর এই তথাকথিত ‘জেলা বাজেট’ বিষয় হারিয়ে যাবে; এই ভুলের জন্য অর্থমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও জাতীয় সংসদকে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে; সিপিডি’রও তোষামোদী মুখোশ উন্মোচিত হবে; আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, জনাব আবু তালেব কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘জেলা সরকার’ ও ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ একদিন না একদিন বাস্তব প্রয়োজনে সামনে চলে আসবে; তাতে শয়তানিপনা না থাকলে জাতি বিশেষভাবে উপকৃত হবে; তবে, সিডিএলজির সমালোচনার মুখে কেন্দ্রীয় বাজেট ২০১৬-১৭ তে তথাকথিত ‘জেলা বাজেট’ বিষয় উবে গেলেও এই বাজেটে জেলা নিয়ে অন্য শয়তানিপনা প্রকাশ পেয়েছে; জনাব মুহিতের সেই শয়তানিপনা কি মন্ত্রীগণ ও সাংসদগণ বুঝতে পেরেছেন? তা তো বাজেট আলোচনায়-সমালোচনায় একদম বোঝা যায়নি। অনুরূপ আরেকটি চুরি-ডাকাতি কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার ঘটনা ‘বিভাগীয় সরকার’ ও বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা’ নিয়ে ঘটিয়েছেন ‘কবিতা চোর’, ‘বৌ চোর’ ও ক্ষমতা দখলদার হিসেবে খ্যাত জেনারেল এরশাদ, তাঁর দল জাতীয় পার্টি ও তাঁর রাজনৈতিক ও শাসনিক সহযোগী জেএসডি; ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী ঢাকায় এক জাতীয় সেমিনারে জনাব আবু তালেব গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় বিভাগ এর বিলুপ্তি কিংবা বিভাগের গণতন্ত্রায়ন এই নীতিগত অবস্থান তুলে ধরেন, এবং বিভাগ থাকলে বিভাগগুলির গণতন্ত্রায়নের লক্ষ্যে ‘বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা’ উপস্থাপিত করেন; তখন রাষ্ট্রপতি এরশাদ কারাগারে ছিলেন এবং তাঁর দল ও তাঁর শাসনিক মিত্র জেএসডির বিভাগ নিয়ে কিংবা বিভাগীয় সরকার নিয়ে কোনো ধরনের বক্তব্য, কর্মসূচি ছিলনা; জনাব আবু তালেব এর প্রস্তাব অনুযায়ী বিভাগের বিলুপ্তি কিংবা বিভাগীয় সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যখন বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছিল, ঠিক তখনই, এরশাদ সাহেব কারাগার থেকে বের হবার কয়েক বছর পর বিভাগকে ‘প্রদেশ’ নামকরণ ও তাতে বিভাগীয় সরকারের রূপরেখার আদলে অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ‘প্রাদেশিক সরকার’ করার দাবী করেন; এর কিছুদিন পর এরশাদের অনুসরণে জনাব আ.স.ম. আবদুর রব, জনাব সিরাজুল আলম খান ও জেএসডি অনুরূপ বক্তব্য, দাবী উপস্থাপিত করেন, অথচ উভয় দল কোথাও কখনও জনাব আবু তালেব কিংবা গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখার কথা বলেননি, বলেননা; একে এক কথায় বলা যায় চরম রাজনৈতিক অসততা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চুরি কিংবা ডাকাতি। এইসঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবে আরও একটি বিষয় তুলে ধরা দরকার তা হল, ১৯৯৭ সালে ১৩ জানুয়ারীতে এই রূপরেখায় পার্বত্য চট্রগ্রাম সমস্যার রজনৈতিক সমাধানের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ‘পার্বত্য বিভাগ’ নামে একটি নতুন বিভাগ গঠন করার প্রস্তাব করা হয়, এবং তাতে দেশের অন্যান্য বিভাগের মত, যেমন বরিশাল বিভাগে ‘বরিশাল বিভাগীয় সরকার’, পার্বত্য বিভাগে ‘পার্বত্য বিভাগীয় সরকার’ প্রতিষ্ঠার আহবান জানানো হয়, কারণ পার্বত্য চট্রগ্রামের বিষয়টিও অনেকাংশে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ক, স্থানীয় শাসনিক বিষয়ক একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ১৯৯৭ সালেই শেষ মাসে তথা ডিসেম্বরই সম্পাদিত পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে ‘আঞ্চলিক পরিষদ’ গঠন মূলত ‘বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা’র আদলে কিছুটা বিকৃত রূপে করা হয়; কিন্তু এই চুক্তি প্রণয়নে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার জন্য ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’, বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা তথা জনাব আবু তালেব এর অবদানের কথা, প্রস্তাবের কথা কোথাও বলা হয়নি, হয়না; অথচ, জনাব আবু তালেব তাঁর প্রণীত গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখার কপি নিজ হাতে নিউ ইয়র্কে সরকার কর্তৃক গঠিত পার্বত্য চট্র্রগ্রাম বিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক জনাব আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহকে প্রদান করেছেন এবং তাঁর প্রস্তাবিত পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক সমাধানমূলক প্রস্তাবনা বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন; সেই সময় এই প্রতিবেদকসহ যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও দপ্তর সম্পাদক যথাক্রমে জনাব আব্দুস ছালাম ও আতাউর রহমান শামীম উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে এই দলেরই বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদগুলির মধ্যে একজন সাংগঠনিক সম্পাদক এই পার্বত্য এলাকার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়; তার মাধ্যমে ‘পার্বত্য বিভাগ’ গঠনের নীতিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেছে, কবুল করেছে, অথচ এই বিষয়টিও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোথাও স্বীকার করেননি, করেননা; এও একটি চরম বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা নয় কি? অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও; ৮ জন বুদ্ধিবৃত্তিক ডাকাতের ডাকাতির ফসল হচ্ছে বর্তমানকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর; এই অপকর্ম সম্পর্কে দেশের কয়েকশত বিশিষ্ট ব্যক্তি জানেন; তিনি সরকারীভাবে মুক্তিসংগ্রামের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে সোহরাওয়ার্দি উদ্যান কেন্দ্রিক আরও একটি যুগান্তকারী প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন; দেখা যাক এ নিয়ে কি ঘটে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কি ঘটান! এসব কারণে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা যে একটা বড় ধরনের অপরাধ, বড় ধরনের রোগ তা বাংলাদেশে মানুষকে বুঝানোর জন্য, জানানোর জন্য এবং তা বন্ধ করানোর জন্য একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবল আন্দোলন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বলে প্রতীয়মান হয়; প্রাসঙ্গিকভাবে আরো উল্লেখ করা সমীচীন হবে যে, জনাব আবু তালেব প্রতিটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে অন্যান্য বিষয়ক সম্পাদক পদ যেমন রয়েছে, ঠিক তেমন ‘স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক’ পদ সৃষ্টি করতে আহবান জানিয়ে আসছেন; যাতে স্থানীয় সরকার বিষয়টি দলীয় কমিটিতে, দলীয় ভাবনায়, দলীয় কাজে বিশেষ গুরুত্ববহ হয়; প্রায় সব রাজনৈতিক দলেই শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, ক্রীড়া, সমাজকল্যাণ, সাংগঠনিক, দপ্তর, প্রচার, প্রকাশনা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ত্রাণ, শ্রম, জনশক্তি, বন, সমবায়, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক, মহিলা ইত্যাদি বিষয়ক সম্পাদকীয় পদ রয়েছে, অথচ স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদকীয় পদ নেই; কেন? এতে এটা কি বোঝা যায়না, রাাজনৈতিক দলীয় কাঠামোতে স্থানীয় সরকার ও তার ভাবনাচিন্তা চরমভাবে গুরুত্বহীন রয়েছে। স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক পদ সৃষ্টিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও আজ অবধি সাড়া দেয়নি; আমরা আশা করেছিলাম, জনাব আবু তালেবের আহ্বান অনুয়ায়ী, এই বছর ২০১৬ সালে ঢাকায় ২২ ও ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলনে ৬ হাজার ৭০ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ‘স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক’ এর পদ সৃষ্টি করবেন, সেজন্য ড. আব্দুর রাজ্জাক নেতৃত্বাধীন গঠনতন্ত্র উপকমিটি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, তার জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনাব আবু তালেব এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে উদার হবেন, এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার দায় থেকে নিজ দলকে মুক্ত রাখতে প্রয়াস নেবেন; কিন্তু ৬ হাজার ৭০ সদস্যবিশিষ্ট একটি মহাঢাউস কাউন্সিলে কয়েকজন চাটুকারের অপ্রাসঙ্গিক চাটুকারিতা ছাড়া দলীয় ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র নিয়ে আালোচনায়-সমালোচনায় অংশ নেয়া কি সম্ভব ছিল? গঠনতন্ত্র উপকমিটি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটি কি স্থানীয় সরকার উন্নয়ন বিষয়ে আপডেট ও আন্তরিক ছিল? আমরা হ্যাঁ সূচক লক্ষণ তো একটুও দেখিনা। সে যাই হোক, জেলা স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হলে বিভাগ অবশ্যই বিলুপ্ত হতে হবে; সেক্ষেত্রে উপজেলা শুধু মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে থাকবে, এবং তা আস্তে আস্তে কিংবা দ্রুততার সঙ্গে বিলুপ্ত হতে থাকবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট ও সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয় নির্ধারিত না হলে স্থানীয় সরকারের প্রতিটি ধাপে ক্ষমতা ও দায়িত্ব যথাযথভাবে ঠিকঠাক হবে-ই বা কেমন করে? সর্বোচ্চ ইউনিট এবং সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয়ে ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রদান করার পর মধ্যবর্তী ইউনিট যেমন উপজেলায় ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেয়ার মত কিছু থাকলেই তো তা দেয়া যাবে। স্থানীয় সরকারের এসব জটিল ও কঠিন বিষয়গুলির একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বিত সমাধান ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’য় রয়েছে। এতে সর্বপ্রথম বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা, জেলা সরকারের রূপরেখা, উপজেলা সরকারের রূপরেখা, ইউনিয়ন সরকারের রূপরেখা ও নগর সরকারের রূপরেখা একসঙ্গে উপস্থাপিত করা হয়েছে; যাতে একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ (প্রশাসনিক কাঠামো) গৃহীত হলে তার প্রতিটি টায়ার এ প্রয়োজন মত সুনির্দিষ্ট সরকার কাঠামো বসানোর কাজটি সহজে করা সম্ভব হয়। এই রূপরেখায় ইউনিয়ন ও নগর এর মধ্যে অন্য কোনো ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তা, প্রচেষ্টা একদম সমর্থন করা হয়নি, তার পরিবর্তে সর্বনি¤œ ইউনিট হিসেবে সমস্ত মনোযোগ, কর্মপ্রচেষ্টা এক দিকে গ্রামীণ এলাকায় ইউনিয়ন কেন্দ্রীক ও অপর দিকে নগরীয় এলাকায় নগর কেন্দ্রিক করার সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে; এবং এর মাধ্যমে শুধু গ্রামীণ এলাকা কেন্দ্রীক স্থানীয় সরকারের সর্বনি¤œ ইউনিট বিষয়ক দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা ধরিয়ে দিয়ে গ্রাম ও নগর কেন্দ্রীক একই স্তরে সর্বনি¤œ ইউনিটদ্বয় (ইউনিয়ন ও নগর এবং ইউনিয়ন সরকার ও নগর সরকার ) কেন্দ্রীক ধারণা উপস্থাপিত করা হয়। সাম্প্রতিককালে সরকার জেলায় ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ না নিয়ে অত্যন্ত তড়িগড়ি করে একটি ভঙ্গুর জেলা পরিষদ অধ্যাদেশ জারী করল এবং তা অল্প কয়েকদিনের মাথায় মন্ত্রিপরিষদ সংশোধনও করল; তাতে স্থানীয় সরকার বিষয়ে ভাল মানসিক, শিক্ষাগত ও আইনগত প্রস্তুতি যে এই মন্ত্রিসভার ছিলনা তা ভালভাবে ফুটে উঠে; এবং জেলা পর্যায়ে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার তেমন কোনো প্রস্তুতি যে আওয়ামী লীগেরও নেই তা জোর দিয়েই বলা যায়; দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলিরও একই অবস্থা। আরও দুঃখজনক ঘটনা হল এই যে, এই সংক্রান্ত আইনও কোনো ধরনের আলোচনা-সমালোচনা ছাড়া স্বল্প সময়ে জাতীয় সংসদে পাস হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হল যে সংসদ সদস্যগণেরও স্থানীয় সরকার বিষয়ে কোনো আইনগত, গবেষণামূলক ও শিক্ষামূলক প্রস্তুতি নেই; এতে আরও প্রমাণিত হল যে, শুধু হাত তোলা আর নামানোর মধ্য দিয়ে জাতীয় সাংসদগণ নিজ নিজ বিধানিক দায়িত্ব পালন করছেন! জাতীয় সংসদে পাসকৃত এই আইনটি অসম্পূর্ণ, ভঙ্গুর, সেকেলে ও গারবেজতুল্য; তাছাড়া, এই আইনটি হচ্ছে প্রত্যাখাত আয়ুবীয় মৌলিক গণতন্ত্র বাংলাদেশে র্চ্চা করতে নগ্ন প্রয়াস। এই ধরনের একটি কঠিন অথচ চরম খারাপ পরিস্থিতিতে আমরা জোর দাবী করেছিলাম যে, জনাব আবু তালেব প্রণীত জেলা সরকারের রূপরেখাটি গভীরভাবে বিবেচনায় নিয়ে পার্বত্য তিন জেলাসহ সকল জেলায় একরূপ জেলা সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হোক; জেলা স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট না মধ্যবর্তী ইউনিট তা ঠিক করা হোক; জেলা মধ্যবর্তী ইউনিট হলে এতে গ্রামীণ স্থানীয় সরকার হিসেবে জেলা সরকার প্রতিষ্ঠা করা হোক, আর জেলা সর্বোচ্চ ইউনিট হলে এতে গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় সরকার হিসেবে জেলা সরকার স্থাপন করা হোক; তাতে ক্ষমতার পৃথকীকরণ করা হোক; এতে নারীর ১০০% প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এমপো’র প্রয়োগ করা হোক; জেলা সরকারের বিধানিক পরিষদ হিসেবে “জেলা সংসদ” গঠন করা হোক; প্রতি জেলায় জেলা সাংসদ কতজন থাকবে তা সংশ্লিষ্ট জেলায় কত জনসংখ্যা রয়েছে তা বিবেচনায় নিয়ে জেলা নির্বাচনী ওয়ার্ড/এলাকা গঠন করা হোক; প্রতিটি জেলা নির্বাচনী ওয়ার্ডে/এলাকায় এমপো অনুযায়ী ১জন মহিলা জেলা সাংসদ ও ১জন পুরুষ জেলা সাংসদ প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত করা হোক; জেলা সরকারের প্রধান হিসেবে জেলা চেয়ারপারসন ও দুই জন ভাইস-চেয়ারপারসন (১ জন নারী ও ১ জন পুরুষ) এর পদ সৃষ্টি করা হোক এবং ওসব পদ প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত করা হোক; (প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখা উচিত হবে যে, এমপো অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে প্রণীত ১১ দফায় ৯ম দফা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক প্রণীত খসড়া জেলা পরিষদ অধ্যাদেশে ১জন মহিলা ভাইস-চেয়ারপারসন ও ১জন পুরুষ ভাইস চেয়ারপারসন নির্বাচিত করতে একটি বিধান ছিল, তা কেন সংসদে পাসকৃত জেলা পরিষদ আইনে যুক্ত হলো না? এই প্রশ্ন থাকল)। জেলা ন্যায়পালের পদ সৃষ্টি করা হোক; জেলার সঙ্গে সিটি কর্পোরেশন ও অন্যান্য স্থানীয় ইউনিটের সম্পর্ক (যেমন পদমর্যাদা, কর্মপরিধি, ক্ষমতা, বেতন-ভাতা ইত্যাদি) কিরূপ হবে, তা ঠিক করা হোক; জেলা নির্বাচনী বোর্ড গঠিত হোক; তথাকথিত আয়ুবীয় কায়দায় চালুকৃত নির্বাচনী পদ্ধতি বাতিল করা হোক, ইত্যাদি ইত্যাদি; এক কথায় বলব যে, জনাব আবু তালেব প্রণীত, প্রস্তাবিত গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় উপস্থাপিত জেলা সরকারের রূপরেখাটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হোক, এবং “জেলায় জেলায় গণতন্ত্রায়ন, জেলার জনগণের ক্ষমতায়ন” এই শ্লোগানে প্রতিটি জেলাকে মুখরিত করা হোক, আন্দোলিত করা হোক। কিন্তু তা করা হয়নি; পরিবর্তে একটা অসম্পূর্ণ, অদূরদর্শী আইন দ্বারা জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছে। এই ২১ সদস্য বিশিষ্ট ‘জেলা পরিষদ’ কতটুকু কার্যকরী হয় তা দেখতে জাতিকে কিছু সময় অপেক্ষায় থাকতে হবে, তবে আমরা আগেরমত এখনও বলতে চাই যে, এটি উপজেলা পরিষদেরই মত আশাহীন, কাজকামহীন, তাৎপর্যহীন, গুরুত্বহীন, শক্তিহীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবাইকে হতাশ করবে; নব গঠিত এই ২১ সদস্য বিশিষ্ট জেলা পরিষদ কেবল নিজ নিজ স্বার্থগত সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়ে দেবে।
     এই গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় গ্রামীণ বাংলাদেশ তথা শুধু কৃষি ভিত্তিক সমাজ, দেশ এর চিরায়ত ধারণার পরিবর্তে বিদ্যমান বাস্তবতার নিরিখে গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ তথা কৃষি ও অকৃষি পেশা ভিত্তিক সমাজ, দেশ এর ধারণা তুলে ধরা হয়েছে, যার মাধ্যমে এই প্রথম বাংলাদেশের স্ট্যাটাসগত ও গুণগত পরিবর্তন জনিত নতুন পরিচিতি উপস্থাপিত করা হয় এবং তা আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারীভাবে গ্রহণ করার দাবী জানানো হয়, তবে এই বিষয়টি তখন ও এখন অনেকেই বিশেষত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, একনেক, অর্থ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ, জাতীয় সংসদ, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলগুলো বুঝতে পারছেনা বলে প্রতীয়মান হয়; প্রসঙ্গত এই বিষয়ে আরও জানানো উচিত হবে যে, গ্রামীণ বাংলাদেশ আর গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এক বিষয় নয়, এক রূপ নয়, এক অবস্থা নয়; এ দু’টোর সমস্যা, সমাধান প্রক্রিয়া, গুরুত্ব ও তাৎপর্য এক রকম নয়; তাই, এই দু’টোর প্রশাসনিক কাঠামো, ক্ষমতা ও দায়িত্বও একরূপ হতে পারেনা; এই দু’টোতে মানুষের মনোগত, ভাবনাগত পার্থক্য থাকে, থাকবে। তাই এখন থেকে, গ্রামীণ বাংলাদেশ ভিত্তিক নয়, গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ ভিত্তিক সকল উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণীত, গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে হবে; এটি যত দ্রুত সম্ভব দেশের নীতিপ্রণেতাগণ, আইনপ্রণেতাগণ, বিধি-প্রবিধি প্রণেতাগণ ও মিডিয়াকে বুঝতে হবে এবং তার স্বীকৃতি ও পরিচিতি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান দিতে হবে যে, বাংলাদেশ এখন হচ্ছে একটি গ্রামীণ-নগরীয় দেশ; বাংলাদেশ একদা গ্রামীণ তথা কৃষিজ দেশ ছিলো, এখন আর তা নেই, এবং একে অবশ্যই একটি গুণগত পরিবর্তন হিসেবে নিতে হবে; সেইসাথে এও মনে রাখতে হবে যে, এই স্ট্যাটাসগত ও গুণগত পরিবর্তন কয়েক দশক স্থায়ী থাকবে; তা রাতারাতি উবে যাবেনা; আবার এও মনে রাখতে হবে যে, এই সময়টাতেই একটি পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য গোটা জাতিকে মানসিক ও শিক্ষাগত প্রস্তুতি যথাসম্ভব সম্পন্ন করতে হবে, এবং এই সময়ের মধ্যেই একটি নগরীয় বাংলাদেশের মানে, গুরুত্ব ও তাৎপর্য যথাসম্ভব অনুধাবন করতে সচেষ্ট থাকতে হবে। সেসঙ্গে যাঁরা অকৃষি পেশায় যুক্ত রয়েছেন, সন্তানগণকে অকৃষি পেশায় নিযুক্ত করছেন, নগরীয় সুযোগ-সুবিধা বেশ উপভোগ করছেন, অথচ অন্যদেরকে কেবল কৃষি পেশায় রাখতে, গ্রামীণ সমাজ হিসেবে রাখতে ওকালতি করছেন, কান্নাকাটি করছেন, কুমতলব আঁটছেন, গলাবাজি, লেখাবাজি করছেন, তাঁদেরকে অবশ্যই চোখে চোখে রাখতে হবে, নজরদারিতে রাখতে হবে; এটি যেন আমরা ভুলে না যাই।
গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের এই রূপরেখায় কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারের জন্য প্রস্তাবিত সংসদগুলো গঠনের ক্ষেত্রে এমপো ও ১১ দফা’র প্রয়োগ করা হয়েছে; এমপো ও ১১ দফা এই নিবন্ধের শেষে সংযুক্ত করা হয়েছে, তা বিশেষভাবে দেখুন ও জানুন; এমপো তথা নারীপুরুষের জন্য একশো একশো প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি অনুযায়ী, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউনিয়ন সংসদ ও নগর সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ১ জন নারী সদস্য ও ১ জন পুরুষ সদস্য প্রতিনিধিত্ব করবে, জেলা সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলা সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা/ওয়ার্ড হতে একজন নারী সাংসদ ও একজন পুরুষ সাংসদ জেলা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবে এবং জাতীয় সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা থেকে ১ জন নারী সাংসদ ও ১ জন পুরুষ সাংসদ প্রতিনিধিত্ব করবেন; যদি তা হয়, তার মাধ্যমে বিধানিক সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে নারীর জন্য অবমাননাকর “সংরক্ষিত আসন” শব্দবন্ধটি আর থাকবে না এবং তা এক কলংকিত অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে। প্রসঙ্গক্রমে মনে রাখতে বলব যে, এমপো শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা দুনিয়ার প্রতিটি দেশের প্রতিটি ধাপের/স্তরীয় সরকারের প্রতিটি বিধানিক সংসদ/পরিষদ গঠন করার জন্য বাস্তবায়নযোগ্য এক নতুন গণপ্রতিনিধিত্ব ফর্মুলা হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়েছে; এর মাধ্যমে নারীর জন্য অবমাননাকর সংরক্ষিত পদ্ধতি, ৩৩% পদ্ধতি, ৫০% পদ্ধতি, প্রতি তিন ওয়ার্ডে একজন সংরক্ষিত নারী সদস্য পদ্ধতি, সংরক্ষিত ঘূর্ণায়নমান নারী সদস্য পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাগুলো, দুর্বলতাগুলো সংশোধিত হয়ে যাবে; নারী ও পুরুষ উভয় একই সাধারণ পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন; নারী যে পদ্ধিতে নির্বাচিত হবেন সেই একই পদ্ধতিতে পুরুষও নির্বাচিত হবেন বলে নারীর জন্য প্রয়োগকৃত “সংরক্ষিত” শব্দটি ইতিহাসে স্থান পাবে; চমক সৃষ্টি করতে দু’একজন নারীকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় বসিয়ে দিয়ে বাহবামূলক কাজের পরিবর্তে নারীর জন্য পদ্ধতিগত ক্ষমতায়নের ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। তার জন্য বিশ্বজুড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যাম্পেইন চলছে; এই এমপো তথা একশো একশো প্রতিনিধিত্ব ফর্মুলার সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব ও তাৎপর্য হচ্ছে এক বিস্ময়কর ব্যাপার। নারী ও পুরুষ উভয়ের যে কেহ এই ফর্মুলার সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বুঝতে পারলে, অনুধাবন করতে পারলে নিজ থেকে নিজ নিজ শক্তিতে বলিয়ান হয়ে আন্দোলন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে; তাই দেশের প্রতিটি মানুষের প্রতি আমাদের বিশেষ অনুরোধ হল, একশো একশো প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি তথা এমপো গভীরভাবে জানার বুঝার চেষ্টা করুন; নিজেকে একুশ শতকের এই মহান আন্দোলনের সঙ্গে, সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করুন; তাতে আপনার ও গোটা মানব জাতির জন্য যারপর নাই এক মঙ্গলময় পরিবেশ বয়ে আনবে। (প্রিয় রিডার এই বিষয়টি আরও ভালভাবে জানতে চাইলে, বুঝতে চাইলে এই নিবন্ধের শেষে সংযুক্ত এমপো ও ১১ দফা বিশেষ মনোযোগ দিয়ে দেখুন, পড়–ন ও বিবেচনা করুন।)
সে যাই হোক, সুচতুর দলীয় ও নির্দলীয় নকলবাজগণ এই গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখার কিছু কিছু জনপ্রিয়, পছন্দনীয় বিষয় বারবার কাটাছেঁড়া ও বিকৃত করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে, এবং এর কিছু কিছু বিষয় নকলবাজরা নিজেদের নামে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে; কিন্তু নকলবাজগণ, বুদ্ধিবৃত্তিক চোর-ডাকাতগণ এই রূপরেখার সমন্বিত রূপের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব একটুও খাটো করতে সক্ষম হননি, হবেনও না; বরং এই রূপরেখার কালজয়ী উপযোগিতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাই, সরকারের প্রতি আমাদের বিনীত অনুরোধ হল, যদি গ্রামীণ বাংলাদেশ এর পরিবর্তে বিদ্যমান বাস্তবতায় গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত হিসেবে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চান, যদি গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য তিন প্রকারের স্থানীয় সরকার তথা গ্রামীণ স্থানীয় সরকার, নগরীয় স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় সরকার স্থাপিত হোক চান, যদি স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা ও দায়িত্ব ধাপে ধাপে পাশাপাশি অর্পিত ও পালিত হোক চান, যদি স্থানীয় সরকারের একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ (প্রশাসনিক কাঠামো) প্রতিষ্ঠিত ও কার্যকরী হোক চান, যদি দ্বিস্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা স্থায়ী রূপ নিক চান, যদি স্থানীয় সরকারের প্রতিটি ধাপে নারীর শতভাগ (১০০%) প্রতিনিধিত্ব তথা এমপোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে চান, যদি স্থানীয় সরকারের প্রত্যেক ধাপে ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি কার্যকর হোক চান, যদি স্থানীয় সরকারে বিধানিক পরিষদ (যেমন ইউনিয়ন সংসদ, নগর সংসদ) স্থাপিত হোক চান, যদি প্রতিটি স্থানীয় ইউনিটে ন্যায়পাল এর পদ চালু হোক চান, যদি ২০২০ সালের মধ্যে ২৫টি ক্ষেত্রে ২৫টি গণতন্ত্রায়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ তথা “গণস্বপ্ন ২০২০” বাস্তবায়িত হোক চান, যদি কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরীয় গণতন্ত্রায়ন দ্বারা জনগণের সর্বস্তরীয় ক্ষমতায়ন হোক চান, যদি ২০৫০ সাল কিংবা তার আগে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত “নগরীয় বাংলাদেশ” তথা “গণস্বপ্ন ২০৫০” বাস্তবায়িত হোক চান, যদি পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ অথবা স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ বাস্তবরূপ নিক চান, যদি খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে “নগরীয় কৃষি” ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক চান, যদি “নগর মানে কৃষি নয়” এর পরিবর্তে “কৃষিকে নিয়েই নগর” বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হোক চান, যদি দক্ষ সরকার গড়তে সরকারের আকার আয়তন আস্তে আস্তে ছোট হোক চান, তাইলে আর কালবিলম্ব না করে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’র প্রতিটি বিষয় স্থাপন ও কার্যকর করার প্রকৃত উদ্যোগ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করুন; প্রসঙ্গত এও বলব যে, তা যেন নকলবাজী না হয়, তা যেন বুদ্ধিবৃত্তিক চুরি, ডাকাতি না হয়, তা যেন জনাব আবু তালেব এর অবদান অস্বীকার করার অভিপ্রায়, প্রয়াস না হয়। যিঁনি স্বপ্ন দেখেন, যিঁনি স্বপ্ন দেখান, যিঁনি স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপায় বাতলান, যিঁনি স্বপ্ন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করেন, যিঁনি স্বপ্নের বিষয়ে মানুষকে অনুপ্রাণিত করেন, সর্বোপরি যিঁনি স্বপ্ন বিষয়ে লাগাতার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন পরিচালিত করেন, তাঁকে অস্বীকারের সামান্যতম প্রয়াসও মহা অপরাধ, মহা অন্যায়, মহা কলংক হয়ে থাকবে; ঠিক যেমন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ৮ (আট) জন অসৎ লোক তা করেছে এবং তার জন্য এদেরকে মহা অপরাধের দায়ে মহা কলংক বহে বেড়াতে হচ্ছে, হবে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় এই মহা কলংকজনক বিষয়টি সম্পর্কে জনাব সৈয়দ হাসান ইমাম, জনাব নাসির উদ্দিন ইউসুফ, জনাব ড. মুনতাসির মামুন, জনাব ডা. মুশতাক হোসেন, জনাব শাহরিয়ার কবির সহ দেশ ও বিদেশের কয়েক শত বিশিষ্ট ব্যক্তি বিশেষভাবে অবগত রয়েছেন, সেসব ব্যক্তিরকথা লিখতে গেলে অনেক অনেক পৃষ্ঠা কাগজ লাগবে বইকি; নিউ ইয়র্ক থেকে পরিচালিত মুক্তিসংগ্রাম বিষয়ক গবেষণা ও স্মৃতি সংরক্ষণ করতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরসহ ৫টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ও ক্যাম্পেইন বিষয়ে প্রয়াত কবি সুফিয়া কামাল, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, ভাষা সৈনিক এডভোকেট গাজীউল হক, অধ্যাপক কবির চৌধুরী, কবি শামসুর রাহমান, সাহিত্যিক শওকত ওসমান, কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদসহ আরও অনেকে ভালভাবে জানতেন। তথাপি এই ৮ জন লোক তাদের অসৎ কর্ম থেকে শুদ্ধতায় যায়নি, যাচ্ছেনা; এঁরা যেন দুই কান কাটা মানুষের মত রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলার আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে; সে ধারা বজায় রেখে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে চরম বানোয়াট কাহিনী সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোতে (১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬ সংখ্যায়) দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বিবৃত করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে দেয়া বক্তব্যও চরম মিথ্যাচার; কারণ, ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় নির্বাচনী ইস্তেহারটিতে সরকারী উদ্যোগে “মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর” প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে স্পষ্ট ঘোষণা ছিল; সেই সালেই প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ করেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরটি কোথায় প্রতিষ্ঠিত হবে তা স্পষ্টভাবে জাতিকে জানিয়ে ছিলেন; কেন তা বাস্তবায়িত হয়নি সেই প্রশ্ন থাকলেও এ কথা দৃঢ়তায় বলা যায় যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নূরগংয়ীও অপকর্ম ভালভাবেই জানতেন। সেসব কারণেই, স্বভাবতই প্রশ্ন এসে যায় যে, মহান মুক্তিসংগ্রামের স্মৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনে নির্মিত প্রতিষ্ঠান গড়ার স্মৃতি নিয়ে, মানুষের আবেগ জড়িত বিষয় নিয়ে যাঁরা মিথ্যাচার করে বেড়ায়, কল্পিত কাহিনী শোনায় তাঁদের হাতে মুক্তিসংগ্রামের স্মৃতি সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন কতটুকু নিরাপদে আছে, থাকবে? তা নিয়ে ভাবা উচিত নয় কি? “মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর” শব্দবন্ধটি যাঁর কাছ থেকে জানা যায়, সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে “মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর” প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে যাঁর কাছ থেকে জানা যায়, তাঁকে ও তাঁর ক্যাম্পেইনকে, উদ্যোগকে, প্রচেষ্টাকে অস্বীকার করে চরম মিথ্যাচার করার জন্য মন্ত্রী হিসেবে, সাংসদ হিসেবে নূরের এখনই পদত্যাগ করা উচিত, আর সংস্কৃতিবিষয়ক একজন কর্মী হিসেবে তাঁর লজ্জিত হওয়া উচিত। যাইহোক, তাই তো বলি, অনুরূপ ঘটনা যেন স্থানীয় সরকার স্থাপনের ক্ষেত্রে না ঘটে, সেটি সরকারসহ সবাই মনে রাখবেন বলে আশা করি। আরও মনে রাখা দরকার যে, জনাব আবু তালেব তদবির চালিয়ে নবেল প্রাইজ নেয়ার লোক নয়, প্রতিবাদ আর দাবিতে স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পুরস্কার আদায় করার লোকও নয়; তিনি নিজস্ব মিডিয়ায় কিংবা তোয়াজী কায়দায় অন্য মিডিয়ায় আতœ-প্রচারণায় বিশ্বাসী মানুষও নন।
পুনশ্চ: প্রতিবেদনটি পাঠকপাঠিকা সমাজের ভালভাবে বোঝার সুবিধার্থে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক গবেষক এবং সিডিএলজি’র নির্বাহী পরিচালক জনাব আবু তালেব প্রণীত ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ থেকে প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১, স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ এবং মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো) ও তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রণীত ১১ দফার কপি নিচে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাতে, আমরা আশা করি, পাঠকপাঠিকাগণ, গবেষকগণ, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিগণ, নীতিপ্রণেতাগণ, আইনপ্রণেতাগণ, বিধিপ্রণেতাগণ, মন্ত্রীগণ, সরকারী কর্মকর্তাগণ, সাংবাদিকগণ, আইনজীবীগণ, প্রকৌশলীগণ, কৃষিবিদগণ ও দেশের সকল পর্যায়ের সকল জায়গার নীতিনির্ধারকগণ বিশেষভাবে উপকৃত হবেন। এসব বিষয়ে যে কোনো ধরনের প্রশ্ন থাকলে, তথ্যমূলক প্রশ্ন থাকলে, কোনো কিছু অস্পষ্ট বলে মনে হলে তার জন্য সঠিক উত্তর যোগাতে আমরা যথাসাধ্য সচেষ্ট থাকব বলে অঙ্গীকার থাকল। পাঠক-পাঠিকার বোঝার সুবিধার্থে আরও একটি বিষয় বলতে চাই তা হল, জনাব আবু তালেব এর গবেষণামূলক প্রস্তাবনাগুলোর উপস্থাপন পদ্ধতি হচ্ছে একজন দক্ষ চিত্রকরের মত; দক্ষ চিত্রকরের চিত্র দেখে তাঁর বিষয়, তাৎপর্য ও গভীরতা যেমন বুঝে নিতে হয়, ঠিক তেমনি তাঁর উপস্থাপিত রেখাচিত্র দেখে ও স্বল্প কথা পড়ে এর বিষয়গত সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য ও গভীরতা পাঠক-পাঠিকাকে গভীর মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হবে, অনুধাবন করতে হবে। তবে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রায় দুই দশক সময় লেগে যাচ্ছে দেখে খুবই দুঃখ লাগে বইকি? তাই অনুরোধ করব, গুরুত্ব দিয়ে সময়মত ভালভাবে নিজে বুঝুন এবং অন্যকে বুঝতে অনুপ্রাণিত করুন।

alt

মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো) একশো একশো প্রতিনিধিত্ব; একশো একশো ক্যাম্পেইন


alt
 বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এমপো অনুযায়ী প্রণীত ১১ দফা
(১) জাতীয় সংসদের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা হতে একজন মহিলা জাতীয় সংসদ সদস্য ও একজন পুরুষ জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে হবে; (২) জাতীয় সংসদে একজন মহিলা ডেপুটি স্পীকার ও একজন পুরুষ ডেপুটি স্পীকার নির্বাচিত করতে হবে; (৩) ইউনিয়নের প্রতি ওয়ার্ডে একজন মহিলা মেম্বার ও একজন পুরুষ মেম্বার নির্বাচিত করতে হবে; (৪) ইউনিয়নে একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন ও একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারপার্সন নির্বাচিত করতে হবে; (৫) পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের প্রতি ওয়ার্ডে একজন মহিলা কাউন্সিলর ও একজন পুরুষ কাউন্সিলর নির্বাচিত করতে হবে; (৬) পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনে একজন মহিলা ডেপুটি মেয়র ও একজন পুরুষ ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত করতে হবে; (৭) এমপো অনুযায়ী একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন ও একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হয়েছে; তা কার্যকর করতে ক্ষমতা ও দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে; (৮) উপজেলা সংসদ, জেলা সংসদ ও বিভাগীয় সংসদ এর প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা হতে একজন মহিলা সদস্য ও একজন পুরুষ সদস্য নির্বাচিত করতে হবে; (৯) জেলা ও বিভাগে একজন মহিলা ভাইস-চেয়ারপার্সন ও একজন পুরুষ ভাইস-চেয়ারপার্সন নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে; (১০) জাতীয় সভা গঠনের ক্ষেত্রে (যদি কখনও গঠিত হয়) প্রতিটি জেলাকে একেকটি নির্বাচনী এলাকা ধরে নিয়ে প্রত্যেক জেলা হতে একজন মহিলা জাতীয় সভাসদ ও একজন পুরুষ জাতীয় সভাসদ প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত করতে হবে (জাতীয় আইনসভার উচ্চকক্ষের নাম ও কাঠামো ‘গণতন্ত্রিক আইনসভার রূপরেখা’ অনুযায়ী করা হয়েছে); (১১) এমপো’র আলোকে অন্যান্য ক্ষেত্রেও ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্বে নরনারীর ক্ষমতায়ন যথাসম্ভব সুনিশ্চিত করতে হবে। (১১তম দফা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়দ্বয়ে একজন মহিলা উপ-উপাচার্য ও একজন পুরুষ উপ-উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছেন; এই পদ্ধতি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর করা উচিত হবে। এমপো অনুযায়ী উপজেলায় একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হয়েছেন। উপজেলায় ও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদ্ধতিগতভাবে ক্ষমতায়িত নারী নেতৃত্ব সৃষ্টি ও বিকাশে দৃশ্যমান সুফল আস্তে আস্তে  ফুটে ওঠতে থাকবে। ৯ম দফা অনুযায়ী  ওই সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত খসড়া জেলা পরিষদ অধ্যাদেশে একজন নারী ভাইস-চেয়ারপার্সস ও একজন পুরুষ ভাইস-চেয়ারপার্সন নির্বাচিত করার বিধান ছিল; পদ্ধতিগতভাবে নারী নেতৃত্ব সৃষ্টি ও বিকাশে এটি গ্রহণ করার পরিবর্তে বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ ও জাতীয় সংসদ তা বাদ দিয়ে একটি ভঙ্গুর জেলা পরিষদ আইন করেছে, তা অবশ্যই একটি অদূরদর্শি কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকবে। ২য় দফা অনুযায়ী জাতীয় সংসদে সরকার একজন মহিলা ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করতে পারতেন। তাতে না গিয়ে কেবল চমক সৃষ্টি করতে, কেবল বাহবা পেতে একজন অনভিজ্ঞ ব্যক্তিকে স্পিকার করেছেন, এবং তাতে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি বিধানিক প্রধান পদে দায়িত্ব পালনে বঞ্চিত হয়েছেন। আমরা নারীর ক্ষমতায়নের নামে চমক, করুণা আর দয়া চাইনা, চাই এমপো অনুযায়ী, ১১ দফা অনুযায়ী নারীর পদ্ধতিগত গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন হোক; তাতে অভিজ্ঞতায় ঘাটতি দিয়ে নির্বাহিক, বিধানিক ও বিচারিক কাজে দেশের কোনও ক্ষতি সাধিত হবে না, ক্ষতি সাধনে সম্ভাবনা থাকবে না; তাই আমরা সবাইকে এমপো ও ১১ দফা গভীরভাবে অনুধাবনে সচেষ্ট হতে অনুরোধ করব; এবং নারী মানুষের ক্ষমতায়ন পদ্ধতি বিষয়ক স্থানীয়, জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি, কর্মসূচী বুঝতে, জানতে বলব। তা করা হলে এমপোর সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে আরও সহজ হবে বলে প্রতীয়মান হয়। প্রসঙ্গক্রমে একটি বিষয় জানিয়ে রাখতে চাই যে, বাংলাদেশে যদি কেবল স্থানীয় সরকার পরিষদসমূহেও এমপো বাস্তবায়ন করা হয়, তা হলে বাংলাদেশ একটি নোবেল প্রাইজ পেয়ে যাবে বলে প্রতীয়মান হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি এই সম্ভাবনা ও সুযোগ গ্রহণে উদ্যোগী হবে?)
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক,সিনিয়র সাংবাদিক,রাজনীতিক,সদস্য ও মুখপাএ সিঊিএলজি যুক্তরাষ্ট্র,এডিটর বাপসনিঊজ এবং সভাপতি আমেরিকান প্রেসক্লাব অব বাংলাদেশ অরিজিন।ফোন:৯১৭-৮৩৭-৪৭০০


ভারতের উত্তর প্রদেশ বিধানসভায় গভর্নরের ভাষণ ভন্ডুল।আবু জাফর মাহমুদ

বুধবার, ১৭ মে ২০১৭

প্রচন্ড  উত্তাল রাজনৈতিক  ঝড়ের উদ্যাম দাপটে উত্তরপ্রদেশ বিধান সভার প্রথম অধিবেশন তচনছ হয়ে গেছে।ভারতের বিজেপিশাসিত উত্তর প্রদেশ বিধানসভার প্রথম অধিবেশনে বিরোধী দলের এমপিরা  তুমুল গোলযোগ সৃষ্টি করেছেন।ধর্মীয় বিদ্বেষপন্থি ও অরাজক দল বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করে বিধানসভা অচল করা হয়ে গেলো। প্রেসিডেন্টের বক্তৃতার শুরুতেই বিরোধীদলীয় এমপিরা তান্ডব চালু করে বিধানসভা থামিয়ে দেয়। প্রদেশব্যাপী বিজেপির সন্ত্রাস রুখতে কোমর সোজা করে  প্রতিবাদ  জানালো বিরোধীরা।সংকেত দিলো তারা  হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসকে কোন ছাড় দেবেনা।

 গত ১৫ই মে ২০১৭ (সোমবার) গভর্নর রাম নাইক বিধানমণ্ডলের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দিতে ওঠামাত্রই বিরোধী সমাজবাদী পার্টি, কংগ্রেস এবং বহুজন সমাজ পার্টির বিধায়করা ব্যাপক হট্টগোল শুরু করে তাকে আটকে দেন। বিরোধী সদস্যরা এ সময় ওয়েলে নেমে পোস্টার এবং ব্যানার হাতে নিয়ে স্লোগান দিয়ে চিৎকার করাসহ বাঁশি বাজিয়ে তীব্র গোলযোগ সৃষ্টি করেন। ব্যাপক বিশৃঙ্খলার মধ্যে বিধানসভার অধিবেশন পরদিন  মঙ্গলবার বেলা ১১ টা পর্যন্ত মুলতুবি করে দেয়া হয়।

 বিরোধীদলীয় সদস্যরা  গভর্নরের উদ্দেশ্যে কাগজপত্র দলা পাকিয়ে বল তৈরি করে ছুঁড়তে থাকেন। এ সময় গভর্নরের নিরাপত্তারক্ষীরা রক্ষণাত্মক ভঙ্গিমায় নথিপত্র রাখার ফাইল দিয়ে ওই বলকে বারবার প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। মুহূর্তের মধ্যে বিধানসভা কার্যত টেনিস কোর্টে পরিণত হয়ে যায়।বিধানসভার স্পিকার হৃদয় নারায়ণ দীক্ষিত গভর্নরের গোটা ভাষণ শোনার ইতিমধ্যে আবেদন জানালেও বিরোধী সদস্যরা তাতে কর্ণপাত করেননি। বরঞ্চ তারা তেড়ে গিয়ে ভাষণ থামিয়ে দেয়।  

 বিধানসভায় গোলযোগের সময় রাজ্যের নয়া মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সপা প্রধান অখিলেশ যাদব উপস্থিত ছিলেন। বিধানসভার কাজকর্ম  টেলিভিশনের মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। গভর্নর রাম নাইক হতাশ হন পরিস্থিতির উত্তাপে। অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, গোটা উত্তর প্রদেশ বিষয়টি দেখছে। বিধানসভায় বিধায়কদের এ রকম আচরণ ঠিক নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন,যোগী আদিত্য সহ উগ্রবাদীদের জোরজবরদস্তিতে সমাজের রাজনৈতিক আগুণ এতোটাই উত্তপ্ত হয়েছে যে,উত্তর প্রদেশের প্রাদেশিক সংসদে সব বিরোধীদল মিলে প্রতিরোধ জোটের আগুণের কুন্ডুলি থেকে আগ্নেয়গিরির লাভার বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছে।

বিরোধী সদস্যরা রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে শ্লোগান দিয়ে ব্যাপক গোলযোগ সৃষ্টি করেন। উত্তর প্রদেশ সরকারের মন্ত্রী সিদ্ধার্থ নাথ সিং বলেন, গোটা ঘটনায় সমাজবাদী দলের নেতা ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব নিশ্চুপ হয়ে ছিলেন। বিরোধীরা বাঁশি বাজিয়ে গভর্নরের উদ্দেশে নথিপত্র ছুঁড়েছেন, এতেই তাদের মানসিকতা স্পষ্ট হয়েছে।

 অখিলেশ যাদবের চুপ থাকা নিয়ে স্থানীয় পত্রপত্রিকা সংবাদ করেছে। বলেছে যাদব পরিবারের আভ্যন্তরীণ সম্পর্কের জের ধরেই চাচা শিবপালের সাথে তিনি যোগ দেননি।শিবপাল অবশ্য একথাও বলেছেন,অখিলেশ ২/৩মাস সমাজবাদী পার্টিতে হস্তক্ষেপ না করলে ভাই মুলায়াম সিং যাদবের নেতৃত্বে ধর্মনিরপেক্ষ জোট গঠন হবে। শিবপাল অখিলেশের পরিবর্তে উত্তরপ্রদেশ সমাজবাদী পার্টির প্রধান হয়েছেন।তার আগে শিবপালকে অখিলেশ মন্ত্রীপরিষদ থেকে বরখাস্ত করেছিলেন।

বাপে-পুতে সমাজবাদী পার্টির কর্তৃত্ব নিয়ে ইতিমধ্যে টানাটানি নির্বাচন কমিশনে গড়ায়।গত নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টির সাইকেল মার্কা কে পাবে তা নিয়ে প্রচন্ড প্রতিযোগীতা ছিলো লক্ষ্যণীয়।অখিলেশের নেতৃত্বে সমাজবাদী পার্টি বিগত নির্বাচনে ভয়ানক সর্বনাশা ডুব খেয়েছে বিজেপির কাছে।তাতেই মন্দিরের পুরোহিত উগ্রবাদী সন্ত্রাসী রাজনীতিক সুযোগ কাজে লাগায়।এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোটের সমাজবাদী পার্টি ৪৭সিট +কংগ্রেস ৭সিট পায়। ওদিকে বিরোধী দল বেজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ ৪০৩ সিটের মধ্যে দখল করে নেয় ৩২৫সিট। তাই বিজেপি জোটই একচেটিয়া ক্ষমতাধর এখন উত্তর প্রদেশে।    

 যোগী আদিত্যনাথ সরকার রাজ্যে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে রাজ্যে একনাগাড়ে অপরাধ এবং সহিংস ঘটনা বেড়ে চলেছে। কিন্তু বিজেপি নির্বাচনি প্রচারের সময় অপরাধমুক্ত রাজ্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যোগী সরকারের কাছে মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সাহারানপুরে সহিংসতার পাশাপাশি গত ৫০ দিনে বেশ কয়েকবার এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যেখানে বিজেপি বিধায়ক এবং এমপিই আইনশৃঙ্খলার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এছাড়া আগ্রাতে কিছু হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের জন্য আইনশৃঙ্খলা সমস্যার মুখে পড়েছে।রাষ্ট্রীয় লোকদলের রাজ্য সভাপতি রশিদ মাসুদ বলেন, যোগী সরকারের আমলে মাফিয়ারাজ কায়েম হয়েছে। বিজেপি বিধায়ক এবং সংসদ সদস্যরাই এখন আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

ভারতের কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার সমস্ত ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে মন্তব্য করে অবিলম্বে লোকসভা ভেঙে দিয়ে পুনরায় সাধারণ নির্বাচন দেয়ার দাবি জানিয়েছেন সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও আরজেডি প্রধান লালু প্রসাদ যাদব। রোববার গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ওই মন্তব্য করেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি কার্যত চ্যালেঞ্জ জানিয়ে লালু প্রসাদ বলেন, ‘লোকসভা ভেঙে দিয়ে কিছু রাজ্যে অনুষ্ঠেয় বিধানসভা নির্বাচনের সঙ্গে নতুনভাবে সাধারণ নির্বাচন দিন। কারণ, তার সরকার ২০১৪ সালে দেয়া সাধারণ নির্বাচনের আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বিজেপি’র হাতে দেশ সুরক্ষিত নয়। কারণ, ওই দল যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকার জন্য সমাজকে বিভক্ত করতে এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টি করছে। বিজেপি দেশে প্রকৃত যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো শেষ করে দিতে চাচ্ছে। ওই দল সমস্ত আঞ্চলিক দলকে শেষ করার জন্য সব ধরণের চেষ্টা চালাচ্ছে যা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।’


লিখতে চাই একটি কবিতা - জুলি রহমান

সোমবার, ১৫ মে ২০১৭

সন্তানেরা এমন কেনো হলো?
জঠর কেনো কলংকিত হয়?
জন্মেই তো আসে বাবা মায়ের পরিচয়
লিখতে গেলেই লজ্জা করে আমিও যে মা---

আজকে যারা জখম করে
ধর্ষণেও মাতে সেওতো দুদ্ধজাত!
মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে শুনেনি ওঁরা
ঘুম পাড়ানিয়া গান?

স্বয়ং আদল দেখেনি কী
গভীর নজরে?
ভাই হয়ে বোনকে লেহন করে!
ভাইয়ের মাথা দুভাগ করে
কঠিন খড়গে!


alt

বলবো কী যে করবো কী যে
লিখার কালি ও নাই
চোখের ন্যূনে সাগর হলো
কারে বলে যাই?

সাত বছরের অবোধ শিশুটি
দোষ কী তাঁর মেয়ে হয়ে জন্ম নেবার?
দশ বছরের যেই মেয়ে
বুডো হাবডা তাঁরে ধরে!

ফিরে যায় কী মানুষ ফের
জাহেলী যুগে? অথচ এখন
যুগ ডিজিটালের
ঘরে ঘরে শিক্ষার প্রদীপ জ্বলে---

আজকে সবার মা দিবস
থাকি আমি ঘরে
চাই লিখতে মনের মতো
একটি কবিতা হয় না লেখা
গুছিয়ে সকল জীবন কেনো অসাঢ?

ওদের কাঁদন আমার বেদন
সকল সুখের মাঝে
মা বলে তাই করতে দাবী
বুকের ভেতর কান্নার রোল বাজে!---


গোশত খাওয়া বন্ধ করা বন্ধ,এলাহাবাদ হাইকোর্টের আদেশে।আবু জাফর মাহমুদ

সোমবার, ১৫ মে ২০১৭




আইন ও নৈতিকতার রেডকার্ড খেয়েছে ভারতের কট্টর উগ্রপন্থি রাজনীতির উচ্ছৃঙ্খল দৈত্য।এই দৈত্যের দানবীয় বিষাক্ততায় বিরান হয়েছে মানবিক ঐতিহ্য,সামাজিক সৌহার্দ্য এবং উপমহাদেশীয় সহমর্মিতার আকর্ষণীয় মূল্যবোধ।সরকার পরিচালনার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে নিয়ে একের পর এক ভয়াল নিষ্ঠুরতায় ধর্মীয় নীতি নৈতিকতাকে মনুষ্যজীবন থেকে নির্মূল করে চলেছে পাশবিক তান্ডবে।

 মহাত্না গান্ধীজীর হত্যাকারী গোষ্ঠীর  রাজনৈতিক দল বিজেপি  ও আরএসএস বাহিনী ভারতবর্ষকে ইজরাইলী নেতা নেতানিয়াহুর দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপান্তর করার পথে দাপটের সাথে ঠেলে চলেছে।কঠিন দুর্গম যাত্রা এই ভয়াবহ নির্মম পথের। গুজরাট থেকে শুরু করে বাংলাদেশ সীমান্তের আসাম পর্যন্ত  আদিম বর্বরতা উস্কে দিয়ে বাংলাদেশের  সিলেটকে সরাসরি প্রভাবিত করার পর্যায়ে অনেকখানি এগিয়েছে  তারা।দিনাজপুর হয়ে যশোহর খুলনা পর্যন্ত।ফেণী থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার ও টেকনাব পর্যন্ত সর্বত্রই ছাপ দেখা যাচ্ছে ঐ উদ্যত নখের।ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে ছদ্মবেশে তারা তৎপর। পশ্চিমবঙ্গে  তাদেরকে প্রচন্ড বাধা দিয়ে চলেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতাদের বাঙালিরা।

 ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও আছে বাধা।সহজেই ভারত নিজের চরিত্র বদলাচ্ছেনা।তাই যেখানে পারছে, প্রত্যাখ্যান করছে দৈত্যের হিংস্রতাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সাপের গর্তে রাজত্বের প্রতিযোগীতায় নেমেছে  বেজি। উদ্যত ফণার উপর মাথা তুলে আঘাতের পর আঘাত হানছে। উত্তর প্রদেশে উত্থান হওয়া দৈত্য শাবককে রেডকার্ড মেরেছে উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ হাইকোর্টই।           

ভারতের বিজেপিশাসিত উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ হাইকোর্টে তিরস্কৃত হয়েছেন যোগী আদিত্যনাথ সরকার। শুক্রবার ১২মে হাইকোর্ট বলেছে, আপনারা কারো গোশত খাওয়া বন্ধ করতে পারেন না। আদালত আরো বলেছে, রাজ্যে যদি বৈধ কসাইখানা না থাকে তাহলে বৈধ কসাইখানা তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব। কসাইখানা তৈরি করার দায়িত্ব সরকারের নয় বলে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে যে সাফাই দেয়া হয়েছিল আদালত তা খারিজ করে দেয়। হাইকোর্ট অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ করে আগামী ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে কসাইখানার লাইসেন্স দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আগামী ১৭ জুলাই ওই মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।   

হাইকোর্ট নয়া লাইসেন্স ইস্যু এবং পুরোনো লাইসেন্স নবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কসাইখানা বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে। এছাড়া আদালত সমস্ত গোশত ব্যবসায়ীকে নিজ নিজ জেলা কর্মকর্তার কার্যালয় ও জেলা পঞ্চায়েত কার্যালয়ে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে বলেছে। কতজনকে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে এবং কতজনের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে তা রাজ্য সরকারের আইনজীবীকে আগামী ১৭ জুলাই জানানোর নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

গোশত ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আদালতে জানানো আবেদনে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলা হয়, তাদের লাইসেন্সের মেয়াদ গত ৩১ মার্চ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু নবায়নের আবেদন জানানো সত্ত্বেও সরকার তা নবায়ন করেনি। তারা লাইসেন্স নবায়ন করার দাবি জানান।

উত্তর প্রদেশে বিজেপি’র ফায়ারব্র্যান্ড নেতা যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে সেখানে অবৈধ কসাইখানা বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়। এরফলে কসাইখানার উপরে নির্ভরশীল বহু মানুষ রুটি-রুজি হারিয়ে গভীর সংকটে পড়েন। হাইকোর্টের ওই রায়ের ফলে তারা কিছুটা স্বস্তি পেলেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

এক পরিসংখ্যানে প্রকাশ, উত্তর প্রদেশে গোশত ব্যবসায়ে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ৩ কোটি ৫৬ হাজার লোক যুক্ত রয়েছেন। এদের মধ্যে বড় অংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। কসাইখানা বন্ধে সংশ্লিষ্টরা বেকার হয়ে পড়েছেন। বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি অবৈধ কসাইখানা বন্ধ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যোগী আদিত্যনাথ সেখানে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে কসাইখানা বন্ধ হওয়া শুরু হয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে যেকোনো কসাইখানা বন্ধ করে দেয়ার অভিযোগ ওঠে। এমনকি মহিষের গোশতের দোকানেও হামলা চালায় বিজেপি-আরএসএস বাহিনী।

 বিজেপি-আরএসএস বাহিনী পরিচালিত উত্তর প্রদেশে সরকার গঠনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী,বিজেপি প্রেসিডেন্ট অমিতশাহ,বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক বিজেপি প্রেসিডেণ্ট রাজনাথ সিংদের বিদ্বেষ-রাজনীতির যে ঢোল পেটানো চালু হয়েছে ভারতজুড়ে,তার সামনে আইন ও নৈতিকতার রেডকার্ড দেখানোয় জনমনে দখিনা হাওয়া লাগতে শুরু করেছে। হিন্দু মন্দিরের পুরোহিত এই বিজেপি নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উস্কানোর অভিযোগে দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে তার “হেইট স্পিচ” বা ঘৃণা ছড়ানোর বক্তৃতার জন্যে কৈফিয়ত চাওয়া হয়েছ অপর এক মামলায়।গোরাখপুর কম্যুনাল রায়টসে জড়িত ঘটনায় আরো ৪জন রাজনীতিকের সাথে তাকেও নোটিশ দেয়ার তথ্য আছে সংবাদ মাধ্যমে।

 একথাটাই আমি লিখে চলেছি,বলে চলেছি দীর্ঘকাল ধরে।আমরা যা বিশ্বাস করি।যে কথা মমতা মুখার্জি ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বললেন ভারতের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দখলদারদেরকে ঘিরে।তিনি বলেন,“আগামী দিনে বাংলাই ভারতবর্ষকে পথ দেখাবে”।আরো বলেছেন, ‘ধর্মকে নিয়ে যারা কলঙ্কের রাজনীতি করছে, গুণ্ডাগিরি করছে, তারা আমাদের ধর্মের কেউ নয়।মানুষের মধ্যেই দেবতা আছেন। ভারতের মাটি সহনশীলতার। বাংলার মাটি নবজাগরণের মাটি। আগামী দিনে বাংলাই ভারতবর্ষকে পথ দেখাবে।’বিজেপিকে টার্গেট করে তিনি বলেন, ‘অন্যান্য রাজ্যগুলো ভয়ে চুপ থাকতে পারে কিন্তু বাংলা কখনো চুপ থাকবে না। যত কঠিন পরিস্থিতিই আপনারা তৈরি করুন, আমরা তা গ্রাহ্য করি না।’

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন,‘ধর্ম মানে রাজনীতির নামে কুকর্ম করা নয়, মানুষ মারার কসাইখানা নয়।’   ‘গোটা দেশে ধর্মের নামে যে অসহিষ্ণুতা চলছে তা একমাত্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বাংলা।  

১২মে পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতার রাসমণি রোডে বুদ্ধ পূর্ণিমার অনুষ্ঠানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওই মন্তব্য করেন। বুদ্ধদেবের সহিষ্ণুতার স্মরণ করতে গিয়ে তিনি নাম না করে হিন্দুত্ববাদী বিজেপিকে টার্গেট করে তাদের বিরুদ্ধে ধর্মের নামে সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগে সোচ্চার হন।মমতা বলেন, বুদ্ধদেব সবাইকে নিয়ে চলতে বলেছিলেন। অথচ ওরা বিভেদ তৈরি  করতে চায়।


মুক্তিযোদ্ধা তালিকা কমপক্ষে চল্লিশ লাখ = সিরাজী এম আর মোস্তাক

রবিবার, ১৪ মে ২০১৭

সম্প্রতি মুক্তিযুুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে দেশের সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে, মাঠ পর্যায় থেকে যাচাই-বাছাই করা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ২০ মের মধ্যে জামুকা-তে না পৌছলে আগামী অর্থবছর থেকে সম্মানী ভাতা বা উৎসব ভাতা দেয়া হবেনা। (দৈনিক প্রথম আলো, ১১ মে ২০১৭, পৃষ্ঠা-৫)। বর্তমানে এ তালিকা নিয়ে চরম জগাখিচুরী চলছে। কর্মকর্তাগণ হিমশিম খাচ্ছেন। এর সহজ ও সুস্পষ্ট সমাধান দিয়ে গেছেন, বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর আদর্শ না মানাতেই যত্তোসব সমস্যা। আসুন, আমরা বঙ্গবন্ধুর মহান আদর্শ অনুসরণ করি এবং মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে সৃষ্ট সমস্যা দূর করি।
বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্র্চে পাকিস্তানীদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, “তোমরা সাড়ে সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।” একইভাবে ১০ জানুয়ারী, ১৯৭২ তারিখে দেশে ফিরে সমগ্র জাতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং ঘোষণা করেন, “আজ আমার জাতি স্বাধীন হয়েছে। আমার স্বপ্ন-সাধ পূর্ণ হয়েছে। তোমরাই দেশ স্বাধীন করেছো। তোমরাই ত্রিশ লাখ প্রাণ দিয়েছো এবং দুই লাখ সম্ভ্রম হারিয়েছো। তোমাদেরকে স্যালুট। তোমরাই মুক্তিযোদ্ধা।” বিস্তারিত বক্তব্য অনলাইনে শুনতে ক্লিক করুন-(যঃঃঢ়ং://িি.িুড়ঁঃঁনব.পড়স/ধিঃপয?া=ঊীখ৫ণাঞঈীঈ)ি অথবা (যঃঃঢ়ং://িি.িুড়ঁঃঁনব.পড়স/ধিঃপয?া=ঈঢকষখঔই৯ঙ৮ঊ)।
আমরা জাতির জনকের এ ঘোষণা ভূলে গেছি। মাত্র দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে পড়ে আছি। বঙ্গবন্ধুর সময়ে দেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজন ছিলনা। কারো জন্য মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বা কোটা সুবিধা ছিলনা। বঙ্গবন্ধু মাত্র ৬৭৬ জন যোদ্ধাকে বিশেষ খেতাব দিয়েছেন। মাত্র সাতজন শহীদকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দিয়েছেন। এছাড়া শহীদ-গাজী নির্বিশেষে দেশের সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি নিজেও একজন বন্দী মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়েছেন। এটাই জাতির জনকের মুক্তিযোদ্ধা নীতি।


আজ আমরা বঙ্গবন্ধুর নীতিচ্যুত হয়েছি। ফলে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে সমস্যা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযোদ্ধা-নীতি অনুসারে বর্তমানে এ তালিকা কোনোভাবেই চল্লিশ লাখের কম নয়। তাহলো, বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোন অবশ্যই সর্বস্তরের মুক্তিযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধুর মতো প্রায় পাঁচ লাখ যুদ্ধবন্দীও মুক্তিযোদ্ধা। বিভিন্ন সময়ে গেজেটভুক্ত ও তালিকাভুক্ত প্রায় দুই লাখ ব্যক্তিও মুক্তিযোদ্ধা। আর কমপক্ষে এক লাখ ভারতীয় সম্মুখ যোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্তির যোগ্য। তাদের প্রচেষ্টা ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা অসম্ভব ছিল। এ চল্লিশ লাখ ছাড়াও যুদ্ধকালে দেশে অবস্থানকারী কোটি কোটি বাঙ্গালি সহযোগী যোদ্ধা হিসেবে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের স্বীকৃতি না দিলেও অন্তত উক্ত চল্লিশ লাখ মুক্তিযোদ্ধার কাউকে বাদ দেয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের ষোল কোটি নাগরিককে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে এ চল্লিশ লাখ তালিকা অত্যাবশ্যক।
পৃথিবীর কোথাও শহীদ, বন্দী, আহত, পঙ্গু এবং গোয়েন্দা হিসেবে ছদ্মবেশধারী সহযোগীদেরকে যোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ দেয়ার নজির নেই। তেমনি শহীদ ও যোদ্ধার অনুপাত ত্রিশ লাখ ও দুই লাখ, এতো ব্যবধান নেই। ত্রিশ লাখ শহীদের তুলনায় মাত্র দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা কোনোভাবেই মানায় না।
সুতরাং মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে সৃষ্ট জখাখিচুরী কাটাতে বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযোদ্ধা-নীতিই একমাত্র ভিত্তি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে কারা এ নীতি অনুসরণ করে, তা দেখার বিষয়। যারা বঙ্গবন্ধুকে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক স্বীকার করেনা, তারা উক্ত চল্লিশ লাখ তালিকা মানবেনা। মূলত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে বড় মুক্তিযোদ্ধা কে আাছে? তাই যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে, তারা অবশ্যই স্বাধীনতার স্থপতি বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তিযোদ্ধা-নীতি অনুসরণ করবে। তারা চল্লিশ লাখ তালিকা ভিত্তি ধরে দেশের আপামর জনতাকে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদের সন্তান স্বীকৃতি দেবে।  
শিক্ষানবিশ আইনজীবী, ঢাকা।


কারও সঙ্গে শুতে ইচ্ছে করলে শুয়েছি’: তসলিমা নাসরিন

রবিবার, ১৪ মে ২০১৭

প্রতিদিন মারছে। মেয়েরা নিজেদের মারবে কেন? মেয়েরা যখন আত্মহত্যা করে, নিজের অজান্তে তারা তখন পুরুষ হয়ে যায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আকতার জাহান কিছুদিন আগে আত্মহত্যা করেছেন। শুনেছি আকতার জাহানের পারিবারিক জীবন সুখময় ছিল না।

স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়েছিল। শিশু সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতেন আকতার জাহান। স্বামী ওদিকে দ্বিতীয় বিয়ে করে নিয়েছেন।
এবং আকতারের চরিত্র খারাপ ছিল এ কথাও বলে বেরিয়েছেন চারদিকে। আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে গিয়ে অশান্তি দুশ্চিন্তা একাকীত্ব অস্বচ্ছলতা ইত্যাদির উল্লেখ করছে অনেকে।
আমার মনে পড়ছে তিরিশ বছর আগের কথা। তিরিশ বছর আগে আমি ডিভোর্স দিয়েছিলাম একটি লোককে যাকে নোটারি পাবলিকের কাগজে সই করে বিয়ে করেছিলাম।

আইনের চোখে নোটারির বিয়ে হয়তো বিয়ে নয়। কিন্তু সেইসময় বিয়ে করেছি বলে মানুষকে যে জানিয়েছিলাম, সেটাই বিয়ে ঘটিয়ে দিয়েছিল।
যখন দেখলাম লোকটি বহুগামি, তাকে নির্দ্বিধায় ত্যাগ করলাম। তিরিশ বছর আগে একা বাসা ভাড়া নিয়েছি, একা থেকেছি, লোকে মন্দ কথা বলেছে, লোকের মন্দ কথায় বিরক্ত হয়েছি, কিন্তু ভেঙে পড়িনি।

কদিন পর পরই পত্র পত্রিকায় আমাকে নিয়ে নানা মিথ্যে কথা লেখা হতো, মেয়েদের নিয়ে যেসব কথা লিখলে লোকে তাদের ঘৃণা করে, সেসব কথা।
অসভ্য সমাজে মেয়ে হয়ে জন্মালে যা হয়। ব্যস্ত ছিলাম হাসপাতালের রোগিদের চিকিৎসা আর নিজের লেখাপড়া নিয়ে। বদ আর বদমাশেরা যা কিছুই বলুক, পরোয়া করিনি।
শুধু ধার্মিক আর মৌলবাদী নয়, আহমদ ছফা আর হুমায়ুন আজাদের মতো নামকরা নাস্তিকরাও হিংসে করতো।

Picture

প্রথম গদ্যের বই এর জন্যই আনন্দ পুরস্কার পেয়ে গেছি, এ নিয়ে কত ক্ষুদ্র কুৎসিত মনের লেখক যে জ্বলেছে পুড়েছে!

লক্ষ লক্ষ মৌলবাদী জোট বেঁধেছে, দেশ জুড়ে মিছিল মিটিং করে আমার ফাঁসি চেয়েছে, মাথার মূল্য ধার্য করেছে।
পরোয়া করিনি। আমার যা করতে ইচ্ছে করে করেছি।
যখন ধর্মের নিন্দে করতে ইচ্ছে করেছে, নিন্দে করেছি, কারও সঙ্গে শুতে ইচ্ছে করলে শুয়েছি, শুতে না ইচ্ছে করলে জগৎ উল্টে গেলেও শুইনি।
মেয়েরা কেন যে ভুলে যায় তারা একটা অসভ্য অশিক্ষিত নারীবিদ্বেষী সমাজে বাস করছে। ভালো মেয়েদের, বুদ্ধিমতী মেয়েদের, মেরুদণ্ড সোজা করে চলা মেয়েদের এই নষ্ট সমাজ নানাভাবে নানা কায়দায় অপমান করে, অপদস্থ করে, গালি দেয়, চরিত্র নিয়ে কুকথা বলে।
যে মেয়েদের এসব করা হয় না, যে মেয়েদের ‘ভালো মেয়ে’ বলা হয়, তারা আসলে মাথামোটা, গবেট, নির্বেোধ, মানসম্মানের ছিটোফোঁটা নেই এমন মেয়ে।
যে মেয়েরা বাধা পায়, গালি খায়, তারাই সত্যিকার হীরে। তারা বিচলিত হলে চলবে কেন! আত্মহত্যা করলে চলবে কেন! নারীবিদ্বেষী সমাজটাকে তুমুল অবজ্ঞা করা শিখতে হবে।
কাউকে পরোয়া না করে নিন্দুকের মুখে থুতু দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করা শিখতে হবে। তিরিশ বছর আগে আমি যা পেরেছি, তা কেন পারবে না এখনকার মেয়েরা?
আমারও অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা ছিল, অশান্তি, দুশ্চিন্তা, একাকীত্ব ছিল, কিন্তু তাই বলে দমে যাইনি। এসব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি বলেই যে কোনও পরিস্থিতিতে পথ চলতে পারি। আমি তো সাধারণ একটি মেয়ে।
যে কোনও মেয়ে চাইলেই পারবে আমি যা পেরেছি। কোনও মেয়ের আত্মহত্যার খবর আর শুনতে চাই না। পুরুষেরা তো মেয়েদের ধর্ষণ করে করে, নির্যাতন করে করে মেরেই ফেলছে।
প্রতিদিন মারছে। মেয়েরা নিজেদের মারবে কেন? মেয়েরা যখন আত্মহত্যা করে, নিজের অজান্তে তারা তখন পুরুষ হয়ে যায়।
পুরুষ যেমন করে মেয়েদের ঘৃণা করে, তেমন করে মেয়েরা নিজেদের ঘৃণা করে, পুরুষ যেভাবে মেয়েদের হত্যা করে, সেভাবে মেয়েরাও নিজেদের হত্যা করে।
তসলিমা নাসরিন