Slideshows

http://bostonbanglanews.com/index.php/modules/mod_gk_news_highlighter/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/605744Finding_Immigrant____SaKiL___0.jpg

কুইন্স ফ্যামিলি কোর্টে অভিবাসী

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ দ্যা ইন্টারফেইস সেন্টার অব নিউইয়র্ক ও আইনী সহায়তা সংগঠন নিউইয়র্ক এর উদ্যোগে গত ২৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ৯ See details

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব হারিয়ে যাওয়ার পথে.....আবু জাফর মাহমুদ

মঙ্গলবার, ২৩ জানুয়ারী ২০১৮

আমেরিকা শ্রেষ্ঠত্ব হারানোর পথে ডুবছে।এই ডুবন্ত বেলায় আমরা আমেরিকান নাগরিকরা নিশ্চয়ই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অযোগ্যতাকেই দায়ী করছি।তার প্রশাসনের অক্ষমতাকেই চিহ্নিত করছি আমেরিকার স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থতার জন্যে।রোগে আক্রান্ত বাঘ নিজেকে নিরাপদ সীমায় রক্ষা করার পথ নেয়,প্রতিপক্ষের সাথে সংঘাত এড়িয়ে চলে।শ্রেষ্ঠত্ব থেকে  পড়ন্ত আমেরিকার অস্থির নেতা ইরান এবং উত্তর কোরিয়ার সাথে যুদ্ধ বাঁধানোর উম্মাদনার ঢোল পেটাচ্ছেন দেখে বিশ্লেষকরা বলছেন,তিনি বুঝতেই পারছেন না তিনি কি করছেন।

বিশ্লেষণের টেবিলে কেউ কেউ বলছেন,বিপদটা আরো ভয়াবহ এজন্যে যে, তিনি বুঝতেই পারছেননা যে, নিজে বুঝেননা। তার বুঝার ভান্ডটা খালি।মিডিয়ায় সংবাদ এসেছে,মার্কিন প্রেসিডেণ্টকে মানসিক ডাক্তারের মন্তব্য প্রকাশ করে বিশ্ববাসীকে জানাতে হয়েছে,তিনি মানসিক বিকারগ্রস্থ নন বা পাগল নন,তিনি সুস্থ।

আমেরিকার প্রায় অর্ধেক নাগরিক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে মনে করেন। পাশাপাশি বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্ব পালন করার মতো অবস্থায় নেই ট্রাম্প। ল্যাঙ্গার রিসার্চ এসোসিয়েটস পরিচালিত নতুন এক জনমত জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

জরিপে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল- প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মানসিকভাবে সুস্থ কিনা। জরিপে অংশ নেয়া লোকজনের শতকরা ৪৮ ভাগ ইতিবাচক বলেছেন আর ৪৭ ভাগ বলেছেন ‘না’। তবে শতকরা ৫৮ ভাগ মানুষ ট্রাম্পের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন নি; মাত্র ৩৬ ভাগ সন্তুষ্ট।

প্রেসিডেন্ট সম্পর্কিত এই খবরের পাশাপাশি আসলো প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নীতিনির্ধারণী বক্তৃতা।মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস স্বীকার করেছেন, জল, স্থল, আকাশ ও মহাকাশে আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব হারিয়ে যাওয়ার পথে নেমেছে। তিনি ১৯শে জানুয়ারী শুক্রবার জন হপকিন্স ইনস্টিটিউটে আমেরিকার নয়া প্রতিরক্ষা কৌশল ঘোষণা করতে গিয়ে এ স্বীকারোক্তি দেন।  

ম্যাটিস বলেন, আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এমন সময় হারিয়ে যেতে বসেছে যখন চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর পক্ষ থেকে নানামুখী হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে ওয়াশিংটন।আমেরিকার নয়া প্রতিরক্ষা কৌশলে দেশটির জন্য সন্ত্রাসবাদের পরিবর্তে চীন ও রাশিয়াকে ‘মূল হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, তার দেশের নয়া প্রতিরক্ষা কৌশলে সন্ত্রাসবাদের পরিবর্তে বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হবে যুদ্ধের জন্য আমেরিকাকে প্রস্তুত করা।মার্কিন সামরিক বাহিনীকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে জিম ম্যাটিস বলেন, উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে যেকোনো ধরনের পারমাণবিক হামলার ভয়াবহ জবাব দেয়া হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নয়া প্রতিরক্ষা কৌশল ঘোষণা করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এই কৌশলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শুক্রবার দেশটির নয়া জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলের দলিল প্রকাশ করে। ১১ পৃষ্ঠার ওই দলিলে দাবি করা হয়েছে, ইরান এখনো সন্ত্রাসবাদের সমর্থন দিচ্ছে  এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।

মার্কিন নয়া প্রতিরক্ষা কৌশলের অন্য অংশে বলা হয়েছে, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকার পাশাপাশি প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।এ ছাড়া, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সমৃদ্ধি ঘটিয়ে আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়ার চেষ্টা করছে।নয়া মার্কিন প্রতিরক্ষা কৌশলে আরো দাবি করা হয়েছে, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলোর লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করবে আমেরিকা।

মার্কিন সরকার এমন সময় ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য দায়ী করল যখন ইয়েমেনে চলমান সৌদি আগ্রাসন ও মানবতা বিরোধী অপরাধে আমেরিকায় তৈরি নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া, শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার পেছনে আমেরিকার হাত রয়েছে।পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ - বিরোধী যুদ্ধের ব্যাপারে হোয়াইট হাউজের দ্বৈত নীতির কারণে সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আমেরিকা পরাজিত হয়েছে।তৎপর বেশ কিছু উগ্র জঙ্গি গোষ্ঠীর পক্ষ নেয়ায় আমেরিকা চিহ্নিত হয়ে গেছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানের দায়িত্বশীল ও সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে ইরাক ও সিরিয়া থেকে উগ্র জঙ্গি গোষ্ঠী দায়েশর মূলোৎপাটন সম্ভব হয়েছে। প্রকৃত সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধে ইরানের এই সাফল্যকে গোপন করার জন্যে  মার্কিন প্রতিরক্ষা কৌশলে ইরানকে সন্ত্রাসবাদের সমর্থক দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমেরিকার এ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিশ্বের সচেতন মহল ইরানকে সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী যুদ্ধের অগ্রপথিক হিসেবেই বিবেচনা করছে।

আমেরিকা-ইজরাইলের বর্তমান মিত্র ভারতের শব্দ অপেক্ষা দ্রুতগামী বা সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বিপরীতে প্রতিরক্ষা সক্ষমতার উন্নয়ন ঘটাবে বলে ঘোষণা করেছে পাকিস্তান।ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির হাতামি এবং পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদন বিষয়কমন্ত্রী রানা তানভির তেহরানে একটি সহযোগিতা চুক্তিতে সই করেছেন।রানা তানভিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির হাতামি বলেছেন, অভিন্ন সীমান্ত ছাড়াও দু'দেশের মধ্যে গভীর ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, এ অঞ্চলে ইরানের পররাষ্ট্র নীতিতে পাকিস্তানের বিশেষ স্থান রয়েছে।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে সহযোগিতা বিস্তার দু'দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এই সহযোগিতা যতবেশি বাড়বে ততবেশি এ অঞ্চলের দেশগুলো প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হবে। দ্বিতীয়ত, পাক-ইরান সামরিক সহযোগিতা যৌথ প্রতিরক্ষা নীতি বা কৌশল জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।ইরান পাইলটবিহীন বিমান বা ড্রোন উৎপাদন, বিমান প্রতিরক্ষা শিল্প এবং বাণিজ্যিকভাবে অস্ত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ও দক্ষতা অর্জন করেছে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানও ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারে। কিছুদিন আগে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদন বিষয়কমন্ত্রী রানা তানভিরের উদ্ধৃতি দিয়ে দেশটির একটি দৈনিক জানিয়েছিল, পাকিস্তান বর্তমানে ৪০টি দেশে অস্ত্র রপ্তানি করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সহযোগিতা বিস্তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে।পাকিস্তান মনে করে মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা এ অঞ্চলে ইরানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যা কিনা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় খুবই জরুরি।

ইরানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তি সইয়ের পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদন বিষয়কমন্ত্রী রানা তানভির বলেছেন, পাকিস্তান ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বিস্তারে ব্যাপক আগ্রহী। পাকিস্তানের সামরিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ জেনারেল তালাআত মাসুদ বলেছেন, ইরান ও পাকিস্তান একে অপরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা অভিন্ন সীমান্তে সন্ত্রাসীদেরকে অবাধ চলাচলের কোনো সুযোগ দেবে না।তাই দু'দেশের সেনাবাহিনী যতবেশি সহযোগিতা ও যোগাযোগ গড়ে তুলবে ততবেশি সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার হবে।

ইরানের সামরিক বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাকেরি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির উৎস হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রক্ষার ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, এ ক্ষেত্রে ইরানের বিরাট দায়িত্ব রয়েছে।তিনি বলেন, এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বিস্তারের জন্য যাতায়াত পথের নিরাপত্তা খুবই জরুরি।

 লন্ডনের মেয়র সাদিক খান ইসলাম সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানা বাগাড়ম্বর বা উস্কানিমূলক বক্তব্যকে তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশ বা আইএসআইএল-এর কূটকৌশলগুলোর সঙ্গে তুলনা করেছেন।এর অর্থ পাশ্চাত্যে হামলা চালানোর জন্য দায়েশও একই ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখে বলে লন্ডনের মেয়র সতর্ক করে দিয়েছেন।   

এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সাদিক খান বলেছেন, ট্রাম্পের ভাষা ও কথিত আইসিস বা দায়েশের ভাষার মধ্যে খুবই মিল রয়েছে।তিনি বলেছেন, দায়েশ চায় ইসলাম সম্পর্কে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী হামলা বেড়ে যাক; তারা গর্বিত মুসলমান ও পশ্চিমাদের ওপর কঠোর আঘাত হানতে চায়।

ব্রিটেনের উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠী 'ব্রিটেন ফার্স্ট'-এর উপপ্রধান জায়দা ফ্রানসেন সম্প্রতি টুইটারে যেসব ইসলাম-বিদ্বেষী পোস্ট প্রচার করেছেন তার সমর্থনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও টুইটারে বক্তব্য রাখায় সাদিক খান এই মন্তব্য করেছেন।লন্ডনের মেয়র বলেন, ট্রাম্পের এইসব রিটুইট বিভক্তি ও ঘৃণার বাণীকে জোরালো করছে; আর তাই তাকে নিন্দা জানানো উচিত।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ব্রিটেনে রাষ্ট্রীয় সফরের অনুমতি দেয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করে সাদিক খান আরও বলেছেন, 'ট্রাম্পের অনেক বিশ্বাসের সঙ্গেই আমরা একমত নই।'
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ট্রাম্পকে রাষ্ট্রীয় সফরে ব্রিটেনে আসার আমন্ত্রণ জানালেও 'ব্রিটেন ফার্স্ট'-এর উপপ্রধান জায়দা ফ্রানসেনের ইসলাম-বিদ্বেষী পোস্টের প্রতি তার সমর্থনের কারণে ওই আমন্ত্রণ ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে।মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে লন্ডনের প্রথম মুসলিম মেয়রের বাক-যুদ্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার-অভিযানের সময়ই শুরু হয়েছিল। সে সময় ট্রাম্প সব মুসলমানকে অজ্ঞ হিসেবে অভিহিত করে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সাদিক খান ট্রাম্পের ওই মন্তব্য ও প্রস্তাবের নিন্দা জানিয়েছিলেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব হারানোর জন্যে নিজেদের নীতির ব্যার্থতার দিকে নাগিয়ে অর্থ বরাদ্ধা করার প্রস্তাব করেছেন।আমেরিকার অর্ধেক লোক প্রেসিডেন্ট এবং সামরিকবাহিনীর সর্বাধিনায়ক সম্পর্কে যে হতাশা ষ্পষ্ঠ করেছেন তার প্রেক্ষাপটে আমেরিকাকে শ্রেষ্ঠত্ব হারানোর ঘটনা নয়, বরং প্রস্তুত থাকতে হবে যাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের দশায় এসে গেলে যেনো সুনাগরিক চেতনায় জাতীয় ঐক্যের হাল আমরা ধরতে পারি এবং দৃঢ় চেতনায় আমেরিকার পতাকা উর্ধে তুলে রাখতেপারি।আমরা ভালবাসি আমেরিকাকে।  

(লেখক আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক)।


ভিনদেশে সন্তানের প্রেম-বিয়ে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা

মঙ্গলবার, ২৩ জানুয়ারী ২০১৮

রিমি রুম্মান : নিউইয়র্ক (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে :ফোনে কথা হচ্ছিল আমার এক বন্ধুর সাথে। তাঁর ছেলেটি এ দেশে বেড়ে উঠেছে। সবে পড়াশোনা শেষ করেছে আইন বিষয়ে। চাকরিতে যুক্ত হয়েছে নতুন। ‘সেদিনের এতটুকুন শিশু দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল। দুদিন বাদে বিয়ে হবে কোনো এক রাজকন্যার সাথে। লাল টুকটুকে শাড়ি পরে বাড়িতে নতুন বউ আসবে, এমনটিই কল্পনা করি মনের অজান্তে। কিন্তু বিদেশে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্মকে নিয়ে এমনটি আশা করতে নেই’— ফোনের অন্য প্রান্ত হতে আমার বন্ধুর ভাষ্য। সে বলে যাচ্ছিল, ‘ওঁরা এ দেশে বেড়ে উঠেছে। নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ থাকতে পারে। বাবা-মা হিসেবে নিজেদের ভাবনা চাপিয়ে দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। আমি আঁতকে উঠি। স্কুল-কলেজে আমাদের সন্তানদের সহপাঠী, বন্ধু হিসেবে যারা আছে, তাঁরা প্রায় সকলেই শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, হিস্প্যনিক কিংবা অন্য ভিন্ন কোনো জাতি।’ 

‘আমার সন্তান ভিনদেশি কাউকে জীবন সাথি হিসেবে বেছে নেবে এমনটি মেনে নিতে পারি না কোনোভাবেই। বরং যারপরনাই অবাক ও বিরক্ত হই।’— প্রচণ্ড রকমের রক্ষণশীল বন্ধুটি বলে। সে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘তোমার ছেলেরা এখনো অনেক ছোট, ওঁরা বড় হতে হতে তোমার মানসিকতার পরিবর্তন হবে। এ পরিবর্তন সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই মেনে নেওয়ার, মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতার পরিবর্তন। ওঁদের ভালো লাগার, ভালোবাসার ওপর আমাদের কারওরই হাত নেই। বরং ওঁদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু চাপিয়ে দেওয়াটা হবে ভুল।’
ফোন রেখে চুপটি করে বসে থাকি ক্ষণিক অজানা শঙ্কায়। বলে কি! ভাবা যায়, আমার ছেলেরা ভিনদেশি কন্যাকে বিয়ে করে ভিন্ন কালচারে তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মকে গড়ে তুলবে? মাথার ওপরে সিলিং ফ্যান ঘুরছে। যেন আমার পুরো পৃথিবীটাই দুলছে। আমি যে আমার ভাষা, আমার ধর্ম, আমার সংস্কৃতির বাইরে কিছু ভাবতেই পারি না।
একদিন ছেলের স্কুলের কোনো এক অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফিরছি। গাড়িতে আমরা তিনটি মাত্র প্রাণী। আমরা— বাবা, মা আর ছেলে। যেহেতু ছেলেটি হাইস্কুলে পড়ছে, এখন তো আর সারাক্ষণ সাথে সাথে লেগে থাকা হয়ে ওঠে না। কার সাথে মিশছে, কারা তার বন্ধু, এসব অনেকটাই অজানা থেকে যাচ্ছে। তাই সুযোগ বুঝে ছেলেকে বললাম, ‘বাবা, তোমার বন্ধুরা মানুষ হিসেবে কেমন?’ সে বলল, ‘খুবই ভালো, এবং তাঁরা সকলেই আমার ভালো বন্ধুও বটে ।’ আমি আবারও বলি, ‘ওঁরা সারা জীবন তোমার ভালো বন্ধু হয়েই থাকুক। কিন্তু তুমি যখন জীবনসঙ্গী হিসেবে কাউকে ভাববে, দুটি বিষয় মনে রাখবে। আমরা বাংলাদেশি এবং আমরা মুসলমান। তোমার ভাষা আর তোমার ধর্মের বাইরের কাউকে নিয়ে একটা গোটা জীবন কাটিয়ে দেওয়াটা সহজ এবং সঠিক হবে না।’ সে চুপচাপ কথাগুলো শুনছিল। এবার ওঁর বাবাও সায় দিয়ে বলে, ‘আব্বু, তুমি বড় হচ্ছ, বিধায় বিষয়টি তোমায় জানিয়ে রাখছি। আশা করি তুমি আমাদের কষ্ট দেবে না।’ সে মাথা নেড়ে আমাদের সাথে সহমত পোষণ করে যদিও, কিন্তু আমরা জানি না, বড় হতে হতে আমাদের এই পারিবারিক, সাংস্কৃতিক আর ধর্মীয় মূল্যবোধের আবেগী কথাগুলো কতটুকু মনে রাখবে সে।

Picture
গত বসন্তে জরুরি কাজে ম্যানহাটন যাচ্ছিলাম আমি আর আমার প্রতিবেশী এক দাদা। সাত নম্বর ট্রেনে বসে আমরা গল্প করছিলাম নানান বিষয়ে। পথিমধ্যে কুইন্স বোরো প্লাজা স্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠেন এক রমণী। সাথে ৪/৫ বছরের এক কন্যা। রমণী দেখতে বাঙালি হলেও শিশুটি কৃষ্ণাঙ্গ। দাদা এগিয়ে গেলেন, কথা বললেন। বহু বছর আগে তরুণ বয়সে দাদা আর রমণীর বাবা একই বাড়িতে রুমমেট হিসেবে ছিলেন অনেকগুলো দিন। অর্থাৎ নারীটি দাদার বন্ধু কন্যা। দীর্ঘদিন বাদে দেখা হওয়ায় তাঁরা নিজেদের, পরিবারের খোঁজ খবর নিচ্ছিলেন। রমণীর কণ্ঠে ক্ষোভ, অভিমান আর হতাশা। সে বলে যাচ্ছিল, ‘আংকেল, আমি না ছোট ছিলাম, না বুঝে ভুল করেছি, কিন্তু আমার বাবা মা কি পারতেন না আমাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে সঠিক পথে ফেরাতে? অভিভাবক হিসেবে তাঁরা যা করেছে, তা কি সঠিক ছিল?’ এমনতর প্রশ্নের মাঝে জল টলমল চোখে শিশুটির হাত ধরে সে নেমে যায় নির্দিষ্ট স্টেশনে। গল্পের বাকি অংশ শুনলাম দাদার কাছে।
সে এক হৃদয়বিদারক কাহিনি।
রমণীটি যখন টিনএজ, তখন স্কুলের এক কৃষ্ণাঙ্গ সহপাঠীর প্রেমে পড়ে। পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়, রাত করে বাড়ি ফিরতে শুরু করে। ধার্মিক বাবা-মা বিষয়টি টের পায়। কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। মেয়েটির সাথে রূঢ় আচরণ করে, কথা বলা বন্ধ করে দেয়, মারধর করে। মেয়েটি ৯১১ কল করে পুলিশে অভিযোগ করে। নিজ কন্যাকে মারধরের অপরাধে পুলিশ বাবাকে গ্রেপ্তার করে। মামলা হয়। বর্ণনাতীত পেরেশানি শেষে বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত বাবা বাড়িঘর বিক্রি করে বিদেশের সাজানো সংসার গুটিয়ে দুঃখে, কষ্টে, ক্ষোভে, অপমানে দেশে ফিরে যায়। সাথে স্ত্রী আর একমাত্র পুত্র। দেশে গিয়ে অল্প বয়সী ছেলেটিকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দেয়। সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে এ দেশে থেকে যায় মেয়েটি। বছর না ঘুরতেই লিভ টুগেদারের পাঠ চুকিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ বয়ফ্রেন্ড মেয়েটিকে ছেড়ে যায়। সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুকন্যা নিয়ে মেয়েটি অথই সাগরে হাবুডুবু খায়। কিন্তু ডুবে যেতে যেতে মানুষ একচিলতে খড়কুটো ধরেও ভেসে থাকতে চায়, বেঁচে থাকতে চায়। মেয়েটিও তার ব্যতিক্রম নয়। 

সে আবার স্বপ্ন দেখে। এবারও আরেকজন কৃষ্ণাঙ্গের হাত ধরে ভবিষ্যৎ স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যায় নতুন করে ঘর বাঁধবে বলে। কিন্তু হায়, আরেকটি কন্যাসন্তান জন্মানোর মাসখানেক বাদে নতুন বয়ফ্রেন্ডও মেয়েটিকে ছেড়ে যায়। এদিকে আত্মীয়, চেনা মানুষজনের মাধ্যমে জানতে পারে দেশে তাঁর ছোট ভাইটি অর্থাৎ অতিরিক্ত ধর্মপ্রবণ বাবার একমাত্র মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলেটি জঙ্গি সংগঠনের সাথে জড়িয়ে যায়, এবং গুলিতে আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। সত্যিকারের এই গল্পটি শুনতে শুনতে আমরা গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনে এসে নামি। ভেতরটা কেমন যেন ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে অচেনা একটি পরিবারের জন্য। দেশ ছেড়ে এই বিদেশ বিভুঁইয়ে আসবার সময় আমাদের দু’চোখ ভরা স্বপ্ন থাকে, বুক ভরা আশা থাকে, সুন্দর একটি জীবনের হাতছানি থাকে। আমাদের সব স্বপ্ন আর আশাই কি পূরণ হয়! হাতছানি দেওয়া জীবনটি কি সব সময়ই সুন্দর পরিসমাপ্তির দিয়ে এগোয়?
এবার বলি কাছ থেকে দেখা একটি পরিবারের কথা।
ছেলেকে নিয়ে মসজিদে যাওয়ার পথে একজন মধ্যবয়সী নারীকে দেখতাম বাড়ির সামনে বাগান পরিচর্যা করেন। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে ফায়ার হাইড্রেন্ট এর ঢাকনা খুলে সেখান থেকে প্রবল বেগে নির্গত পানি নিয়ে খেলা করছিল, একে অপরকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল কিছু স্প্যানিশ ছেলে মেয়ে। একজন চেঁচিয়ে রূঢ় ভাষায় বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে মধ্যবয়সী নারীর সাথে। একটু মনোযোগ দিতেই বুঝলাম, মেয়েটি সেই নারীর কন্যা। আমি ভীষণ অবাক হলাম। কেননা, মেয়েটির সংক্ষিপ্ত পোশাক, আচরণ, এবং মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার, কোনোভাবেই বাঙালি সংস্কৃতির সাথে মেলাতে পারছিলাম না। এটি বছর দুই আগের কথা। পরের বছর ও পথ দিয়ে ফিরবার সময় সেই নারীকে তাঁর বাড়ির সামনের মাটি খুঁড়তে, পরিষ্কার করতে দেখে কুশল বিনিময় করি। কন্যাদের কথা জিজ্ঞেস করি। বললেন, ওরা এখানে থাকে না। বড় মেয়েটির বয়স আঠারো। সে স্প্যানিশ বয়ফ্রেন্ডের হাত ধরে চলে গেছে এই বলে যে, ‘এ বাড়িতে তাঁর কোনো প্রাইভেসি নেই।’
ছোট মেয়েটি তেরো বছর। সে-ও কখনো বাড়ি ফিরে, কখনো ফিরে না! আমি আঁতকে উঠি! এর আগে দুবার এ বাড়িতে এসেছি, গল্প করেছি। বৈকালিক চা পান করেছি। নামাজের ওয়াক্তে মেয়েদের বাবাকে বাড়ির পাশের মসজিদে যেতে দেখেছি। পর্দানশিন মা, পরহেজগার বাবা। এমন পরিবারে এমন বেপরোয়া কন্যা! বললেন, মেয়েদের সঠিক পথে আনবার জন্য তিনি তিল তিল করে গড়া ক্যারিয়ার, চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনেছেন। কিন্তু হায়, এ যে বড় দেরি হয়ে গিয়েছে। সন্তানদের বেড়ে ওঠার সময়ে তাঁদের পাশে না থেকে বাবা-মা ডলারের পিছু ছুটেছেন দিনরাত। এখন তাঁরা বিপথে যাওয়ার পর টনক নড়েছে। তাই চাকরি ছেড়েছেন। কিন্তু যে সময় একবার চলে যায়, তা তো আর ফিরে আসবার নয়! কন্যাদের সঠিকভাবে মানুষ করে উপযুক্ত পাত্রের হাতে তুলে দেওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায় পরিবারটির।
প্রবাসে বেড়ে ওঠা আমাদের এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের বিয়ে, পরিবার, দেশীয় ঐতিহ্য নিয়ে অনেক নিরাশার মাঝে আবার বেশ কিছু আশার গল্পও আছে। যা শুনলে ভালো লাগায় ছেয়ে থাকে মন। তখন মনে হয়, সময় এবং পরিবেশ বিবেচনায় আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন আনাও জরুরি। নিউইয়র্কের বাইরে ফ্লোরিডায় বসবাস করছেন আমার এক কাজিন। তাঁর সন্তানেরা এ দেশে জন্মেছে। বিদেশ বিভুঁইয়ের বাড়িতে বেড়ে উঠেছে দেশীয় সংস্কৃতিময় পরিবেশে। কন্যার বিয়ের দাওয়াত দিতে ফোন করেছিলেন সেই কাজিন। ফোনের অন্যপ্রান্তে কি স্বতঃস্ফূর্ত আর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর। জানালেন, পাত্র শ্বেতাঙ্গ পরিবারের। উচ্চ শিক্ষিত বাবা-মায়ের উচ্চ শিক্ষিত, ভদ্র, মার্জিত সন্তান। পরিবারটি তাঁদের সকল সদস্যের মতামতকে সম্মান করে, শ্রদ্ধা করে। সত্যিকারের পারিবারিক আবহে জীবনযাপন করে। ভিনদেশি পরিবার মানেই অনেক ক্ষেত্রে আমরা ভাবি, ব্রোকেন ফ্যামিলি কিংবা পারিবারিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী নয়, এমন। কিন্তু না, এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সবক্ষেত্রে, সবখানে ভালো এবং মন্দ পাশাপাশি অবস্থান করে।
মা রুমা দিলরুবা আলম (বাঁমে), বাবা শাহ আলম দুলাল ও স্বামী চার্লসের (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) সঙ্গে রুবি আলমমা রুমা দিলরুবা আলম (বাঁমে), বাবা শাহ আলম দুলাল ও স্বামী চার্লসের (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) সঙ্গে রুবি আলমআমার কাজিনের মেয়েটির গায়েহলুদ হলো দেশীয় স্টাইলে। শ্বেতাঙ্গ পাত্র, এবং পাত্রপক্ষের সকল পুরুষেরা পাঞ্জাবি আর নারীরা শাড়ি পরে হলুদের আসরে এল। দু’পক্ষের সম্মতিতে জমজমাট এক আয়োজন ছিল সেটি। বিয়ের বেশ ক’বছর পেরিয়ে গিয়েছে, সে দম্পতি সন্তানাদিসহ সুখে শান্তিতে বসবাস করছে। মাঝে মধ্যে ফেসবুকে আমার কাজিন এবং তাঁর বেয়াই, বেয়াইন সহ পারিবারিক আনন্দমুখর সময়ের ছবি দেখি। কি অদ্ভুত সুন্দরভাবেই না একটি বাংলাদেশি আর একটি আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ পরিবার পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সুখী একটি জীবন যাপন করছে, সহাবস্থান করছে।
এ বছর গ্রীষ্মে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ফেয়ার মেরিনায় আমাদের সাহিত্য জগতের এক বড়ভাইয়ের কন্যার বিয়েতে উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল অনেকেরই। শিক্ষিত বাবা-মায়ের শিক্ষিত সন্তান সেই পাত্র। বাবা-মা আর তাঁদের তিন ছেলে নিয়ে যারপরনাই অমায়িক পাত্রের পরিবার। ভিনদেশি পরিবার বলে আমাদের যে শঙ্কা, তা কেটে গিয়েছে অনেকাংশেই পরিবারটিকে দেখে। সে বিয়েতে আমরা সকলেই বেশ আনন্দে মেতেছিলাম। দু’দেশের মিলিত আবহে নদীতীরে চমৎকার একটি অনুষ্ঠান ছিল সেটি। সেই দম্পতি ভালো আছে, সুখে আছে।
এই বিদেশ বিভুঁইয়ে বেড়ে ওঠা আমাদের সন্তানেরা শুধু বেড়ে ওঠার সময়টুকুতে যদি বাবা-মায়ের কাছ হতে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ আর সঠিক শিক্ষাটুকু পায় পরিবার সম্পর্কে, ভালো মানুষ হয়ে ওঠা সম্পর্কে, তবে জীবনের যে কোনো পর্যায়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে, জীবন সঙ্গী নির্বাচন করতে তাঁরা ভুল করবে না বলে আমার বিশ্বাস। তাঁদের ভুল সময়ের ভুলগুলো ঠান্ডা মাথায় শুধরে দিতে হবে, অহেতুক রাগারাগি না করে। সন্তানদের সুন্দর সুখী যাপিত জীবন দেখলে, যে স্বপ্ন নিয়ে, আশা নিয়ে একটি নিরাপদ সুন্দর জীবন গড়ার উদ্দেশ্যে একদিন এক ভূখণ্ড ছেড়ে অন্য ভূখণ্ডে আবাস গেড়েছি, সে স্বপ্ন তবেই না পূর্ণতা পাবে।


আমেরিকায় অভিবাসন এবং সরকার বন্ধের রাজনীতি

মঙ্গলবার, ২৩ জানুয়ারী ২০১৮

অনুপম দেবাশীষ রায় :নিউইয়র্ক (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে :স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে ঝুলছিল সাইনবোর্ড—সরকার বন্ধ! সারা পৃথিবীর ক্লান্ত, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে আমেরিকায় স্বাগত জানানোর প্রতীকে এভাবে সরকার-বন্ধের খবর ঝুলে থাকাটিতে কিছুটা কাব্যিক মাহাত্ম্য রয়েছে। কেননা আমেরিকার কেন্দ্রীয় সরকার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে মূল বিতর্কটি ঠিক এই আমেরিকার উন্মুক্ততা অথবা অভিবাসন নিয়ে। সেই উন্মুক্ততার বিতর্কে কংগ্রেসের দুই দল সহমতে পৌঁছাতে না পারার কারণেই ২০১৩ সালের পর আবারও আমেরিকার সরকারি দপ্তরগুলোতে তালা পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের খসড়া বাজেট এবং আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা অনুযায়ী রিপাবলিকানরা সিনেটে যে বাজেট প্রস্তাব করেছে, তাতে পাস হওয়ার মতো যথেষ্ট ভোট পড়েনি শেষ দিনেও। অর্থাৎ সরকার কেমন করে করের ডলার খরচ করবে, তা জানা নেই কারও। সে কারণে সরকারের দপ্তরগুলো এখন হয় গত বছরের ডলারে চলবে অথবা আপাতত বন্ধ থাকবে।

এই অচলাবস্থার মূল উৎস হলো রাজনীতিবিদদের স্বার্থবাদী গোঁয়ার্তুমি। আর সেই গোঁয়ার্তুমির উৎস হলো ডিফার্ড অ্যাকশন অন চাইল্ডহুড অ্যারাইভাল বা ডাকা। ডেমোক্র্যাটরা কোনো মূল্যেই ৭০ হাজার কাগজবিহীন অভিবাসী সন্তানের প্রতি সরকারের দেওয়া সুরক্ষা সরিয়ে নিতে রাজি নয়। আগামী মার্চ মাসেই ডাকার মেয়াদ ফুরাবে। সঙ্গে সঙ্গেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অকূল পাথারে পড়বে কাগজবিহীন অভিবাসীদের সন্তানেরা। এরা কিনা ওবামা সরকারের আশ্বাসের ওপর ভর করে নিজেদের বৈধতার কাগজপত্র না থাকার কথা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সরকারের ক্ষমতা এক দলের থেকে আরেক দলের কাছে যাওয়ায় এবং তাদের পরিচয় প্রকাশের সুযোগ নিয়ে আমেরিকা থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার উপক্রম করছে ট্রাম্পপন্থী রিপাবলিকানরা। গাছে তুলে মই সরিয়ে নেওয়ার এই বুদ্ধিতে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই অনেকের মত নেই। তাদের অনেকেই এ বিষয়ে দর-কষাকষি করতে প্রস্তুত ছিল, তবে প্রথমে তারা সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাবটি নিকেশ করে নিতে চাইছিল। কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের তর সইল না। সবাইকে জোর করে আলোচনায় বসতে বাধ্য করার জন্য আর সেই আলোচনায় একটি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতেই ডেমোক্র্যাটরা এবার এই খরচের হিসাবে এসে গোঁয়ার্তুমিটা করছে। আটকে গেছে স্পেন্ডিং বিল, বন্ধ হয়ে পড়েছে ফেডারেল সরকার। এখন যদি ডাকার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হয়, তাহলে বন্ধ থাকবে আমেরিকার ফেডারেল সরকার।

আমেরিকায় অভিবাসন এবং সরকার বন্ধের রাজনীতি

রিপাবলিকানদের আরও গোঁয়ার্তুমি রয়েছে ট্রাম্পের বিখ্যাত সীমানাপ্রাচীরের ফান্ডিং নিয়ে আর চেইন মাইগ্রেশন বা একজন নাগরিকের হাত ধরে তার আত্মীয়স্বজনের অভিবাসনের বিরোধিতা নিয়ে। সীমানা টপকানো আর আত্মীয়ের হাত ধরে আসা অভিবাসীদের রিপাবলিকানদের শত্রু হিসেবেও দেখছে অনেকে। যেহেতু রিপাবলিকানরা কেবল সীমানা বুজিয়ে দেওয়া আর কাগজহীন অভিবাসীদের বের করে দেওয়া নিয়ে কথা বলে, সেহেতু অভিবাসীদের সন্তানেরা সাধারণত রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটদের বেশি ভোট দেয়। কাগজহীন অভিবাসীদের আমেরিকার মাটিতে জায়গা করে দেওয়ার প্রক্রিয়াটিকে রিপাবলিকানরা তাদের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার অভিসন্ধি হিসেবে দেখে। তা ছাড়া অনেক উগ্রপন্থী রিপাবলিকানের অভিযোগ হলো, চেইন ইমিগ্রেশন অথবা কাগজবিহীন অভিবাসনে আসা মানুষ হিংস্র ও জঙ্গিবাদী। অনেকে মনে করে যে অভিবাসীরা আমেরিকানদের কাছ থেকে চাকরি কেড়ে নিচ্ছে। অথচ কেটো ইনস্টিটিউটের গবেষণা থেকে দেখা যায় যে অভিবাসীরা আমেরিকানদের তুলনায় অনেক কম অপরাধপ্রবণ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা এমন সব চাকরিই করে, যেগুলো আমেরিকানরা সাধারণত করতে চায় না।

তা সত্ত্বেও রিপাবলিকানদের মতো ডেমোক্র্যাটরাও আমেরিকার সীমানার উন্মুক্ততার বিরোধী। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সরকারই ইতিহাসে সর্বোচ্চ কাগজবিহীন অভিবাসীদের আমেরিকা থেকে তাড়িয়েছিল আর বিল ক্লিনটন কাগজবিহীন অভিবাসী তাড়িয়েছিলেন জর্জ বুশের চেয়েও বেশি। রিপাবলিকান আর ডেমোক্র্যাট—দুই দলের অধীনেই অভিবাসনের আইন হয়েছে কঠোর থেকে কঠোরতর। এই রক্ষণশীল হুজুগের কারণেই একসময় আইনসম্মত উপায়ে আমেরিকায় প্রবেশ করার চেয়ে বেআইনিভাবে প্রবেশ করাই বেশি যুক্তিসংগত হয়ে দাঁড়ায়। কেননা, আইনি উপায়ে আমেরিকায় প্রবেশ করতে এবং তারপর কাজ কররার অনুমতি ইত্যাদি খুঁজে নিতে যে পরিমাণ ঝক্কি পোহাতে হয়, তার চেয়ে সীমানা টপকে এ দেশে প্রবেশ করাটাই অনেক বেশি সহজতর। তাই মেক্সিকো এবং তদসংলগ্ন (অনেক ক্ষেত্রে মার্কিনি হস্তক্ষেপের কারণে) অর্থনৈতিকভাবে বিপদগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলো থেকে অনেক সময়ই অনন্যোপায় মানুষ সীমানা টপকে আমেরিকায় চলে আসে সুযোগের সন্ধানে। একসময় সুযোগসন্ধানী ডেমোক্র্যাটরা ভোটব্যাংকের লোভে তাদের নাগরিক বানিয়ে তুলতে আর নাগরিক নিরাপত্তা এবং অপরাপর সরকারি সুযোগ-সুবিধা তাদের হাতে তুলে দিতে উঠে-পড়ে লাগে। আর তাদের দেখে রেগে ওঠে কিছু রক্ষণশীল মানুষ মনে করে যে সারা জীবন ধরে তাদের দেওয়া করের সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে কিছু ভিনদেশী বর্গি! এর সঙ্গে আরও কিছু বর্ণবাদী আদর্শ মিলিয়ে বৈধ-অবৈধনির্বিশেষে সব অভিবাসীকে নিয়ে রে-রে করে ওঠে কিছু উগ্রপন্থী আর তাদের ভোট পাওয়ার লোভে আবারও দুই দল মিলে কঠিনতর করে দেয় আইনসংগতভাবে অভিবাসী হওয়া। বিপদে পড়ে যায় বাংলাদেশের মতো দেশের মানুষের আমেরিকায় টিকে থাকা অথবা নতুন করে আমেরিকান ভিসা পাওয়া।

তবে এই অভিবাসীদের ওপর ভিত্তি করেই কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকে আমেরিকার অর্থনীতি। পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা অনুযায়ী, কাগজবিহীন অভিবাসীদের তাড়িয়ে দিলে কৃষি খাতসহ আমেরিকার অর্থনীতির অনেকগুলো খাত ধসে পড়বে। এইআই বলছে, অভিবাসীদের অর্থনীতিতে অবদান জন্মগত আমেরিকানদের চেয়ে অনেক বেশি। কাজেই গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বৈধ অভিবাসনের প্রক্রিয়াকে সহজীকরণের পক্ষে কথা বলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। বরং উল্টো পথে হাঁটার কথা বলছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর চ্যালাচামুন্ডারা। তাঁরা মেক্সিকো আর আমেরিকার মাঝে দেয়াল তুলে দেবেন, যার পয়সা দেবে নাকি মেক্সিকো। এখন আবার কংগ্রেসে বাজেট করে আমেরিকান করদাতাদের পয়সা দিয়েই দেয়াল বানানোর বুদ্ধি আঁটছেন। সেই পয়সা দিতে গিয়ে আমেরিকার বিশাল বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ আরও বাড়ানোর কোনো ইচ্ছা নেই বলেই র‍্যান্ড পলসহ আরও কিছু রিপাবলিকান সিনেটরও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সঙ্গে ভোট দিয়েছেন ট্রাম্পপন্থীদের বাজেটের বিপক্ষে এবং শেষ মুহূর্তে ফেডেরাল সরকার বন্ধের গ্যাড়াকলে পড়েছে গোটা আমেরিকা।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি অবশ্য খুলে যাবে সোমবার, পয়সা দেবে নিউইয়র্ক স্টেট। স্টেটগুলোর পয়সায় এখনো চলছে আঞ্চলিক পুলিশ, দমকল আর অপরাপর জরুরি সেবা। পুরোনো বাজেটে টিকে রয়েছে এফবিআই, টিএসএ আর কোস্টগার্ডের মতন ফেডেরাল দপ্তরগুলোও। তবে বিপদে রয়েছে শিশুদের স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্প (চিপ), মিলিটারি ডেথ বেনিফিট ফান্ড ও আমেরিকান রিপাবলিকান পার্টি। যদিও ডেমোক্র্যাটদের দোষ কিছুমাত্র কম নয়, তবু সরকার বন্ধের ফলে দায় এসে পড়বে রিপাবলিকানদের ওপরই। ভোটের হিসাবে ষাটটি ভোটের কমে সিনেটে কোনো বিল পাস করা যায় না এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও রিপাবলিকানদের হাতে রয়েছে কেবল একান্নটি ভোট। কিন্তু আমেরিকার জনতা সহজ হিসেবে দেখছে যে হাউসে (নিম্নকক্ষে), সিনেটে (উচ্চকক্ষে) আর প্রেসিডেন্সিতেও রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও তারা সরকার খোলা রাখতে আর তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী বাজেট পাস করতে পারেনি।

অর্থাৎ এই মুহূর্তে যদি আমেরিকার দোর বুজে দেওয়ার এই পাগলা নেশা থেকে ট্রাম্প ও তাঁর সহচরীরা বের হতে না পারেন, তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবেন তাঁরা নিজেরাই। আমেরিকার উন্মুক্ততা নিয়ে আপসে আসা আজ রিপাবলিকানদের ক্ষমতায় টিকে থাকার একমাত্র চাবিকাঠি। যত তাড়াতাড়ি তারা এটি বুঝে উঠতে পারবে, ততটাই সবার জন্য মঙ্গল।

অনুপম দেবাশীষ রায় : গবেষণা সহযোগী, কেটো ইনস্টিটিউট, ওয়াশিংটন ডিসি।


আমেরিকা পাকিস্তান হারালো।আবু জাফর মাহমুদ

রবিবার, ২১ জানুয়ারী ২০১৮

দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকার প্রথম মিত্র পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে গেলে আফগানিস্তানে আটকা পড়ে যেতে পারে মার্কিণ সেনাশক্তি।যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যেতেপারে। তালেবান শক্তিশালী হবে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হবে রাশিয়া,চীন,ইরান ও তুরস্ক সহ লেবানন প্যালেষ্টাইন এবং অন্য অনেকে। আমেরিকা আবারো ভেবে দেখা উচিৎ পাকিস্তানকে হাতছাড়া না করার ভকোন পথ আছে কিনা।
করাচী বন্দর ও পাকিস্তান –আফগানিস্তান সীমান্ত পথ ব্যবহারের আফগানিস্তানে যাতায়তের পথ রুদ্ধ হয়ে গেলে যে পরিস্থিতি টোইরী হবে সেদিকে নজর দেয়া দরকার।জেনারেল মোশারফের নেতৃত্বাধীন প[আকিস্তান সরকার এবং শসস্ত্র বাহিনীর সহযোগীতা ছাড়া আফগানিস্তানে অসম্ভব যাত্রা ছিলো বুশ প্রশাসনের। তালেবান স্তৃষ্টি করে আফগানিস্তান থেকে রাশিয়াকে বিতাড়নে পাকিস্তান আমেরিকাকে যে সহায়তা দিয়েছে,তাকে কৃতজ্ঞতায় ও স্বীকারোক্তিতে রাখছেনা ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।উলটে গেলো মিত্রতার মানচিত্র।তারই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান নিজেদের টিকে থাকার পথ শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে বাধ্য হলো।
আমেরিকার ওপর সামরিক নির্ভরশীলতা কমিয়ে পাকিস্তান তার প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম চীন, তুরস্ক, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার কাছ থেকে সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।পাকিস্তান বিমান বাহিনী বর্তমানে চীন ও পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এফ-১৭ জঙ্গিবিমান ব্যবহার করছে। এ ছাড়া, এই বিমানের চতুর্থ ও পঞ্চম প্রজন্মের জঙ্গিবিমান নির্মাণের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইসলামাবাদ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পর এবার উগ্র জঙ্গিদের আশ্রয় দেয়ার জন্য পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করলেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র প্রধান মাইক পম্পেও।তিনি ৮ই জানুয়ারী   সোমবার মার্কিন নিউজ চ্যানেল সিএনএন’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, গত কয়েক বছর ধরে তালেবান ও হক্কানি গোষ্ঠীকে নিজ ভূমিতে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। এই দুই গোষ্ঠী আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছে।
সিআইএ’র পরিচালক বলেন, “পাকিস্তানের প্রতি আমাদের বার্তা পরিষ্কার। বর্তমান অবস্থা চলতে দেয়া যায় না এবং ইসলামাবাদকে অবশ্যই উগ্র গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেয়া বন্ধ করতে হবে। সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধে পাকিস্তান আমাদেরকে কতটুকু সহায়তা করে তার ওপর দেশটিকে সামরিক সাহায্য দেয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে।”
সি আই এ’র পরিচালকের একথাগুলো প্রকাশ্যে বলার আগেই পাকিস্তান তাদের অবস্থান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে।তারা আমেরিকার কাছ থেকে সামরিক ও আর্থিক সহযোগীতার জন্যে আর অপেক্ষা করবেনা। দর কষাকষিও করবেনা। তাছাড়া আফগানিস্তানে আমেরিকাকে সেনা অবস্থান চালু রেখে নিজেদের ক্ষয় ক্ষতির দিকে সতর্ক থাকা জরুরী।তিনি কি প্রেসিডেণ্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি বিনা শর্তে সমর্থন দেখানোর জন্যে এই মন্তব্য করেছেন নাকি তার পর্যবেক্ষনের সারক্তহা বলেছেন তাও দেখার বিষয় আছে।  
 এমতাবস্থায় আমেরিকার বর্তমান প্রশাসন পাকিস্তানকে শত্রু শিবিরে ঠেলে দিয়েছে ভাবতে এখনো অনেক বিশ্লেষক রাজী হননি।তাদের মতে এই কঠিন সিদ্ধান্ত আমেরিকাকে সামান্যও লাভবান করবেনা। এদিকে আত্নরক্ষার প্রশ্নে পাকিস্তানের দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা যেকোন পরিস্থিতির মোকাবেলায় পাকিস্তানকে প্রবল মনোবল বাড়িয়েছে বলা যায়।কারো মুখাপেক্ষি থাকার চেয়ে সারাক্ষণ বিজয়ী থাকার সামরিক চেতনা যে কোন জাতিকে সম্মানিত করে।
যে পাকিস্তানকে তার পুর্বাঞ্চলে যুদ্ধে পরাজিত হতে দেখেছিএকাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে। সেই পাকিস্তান আমেরিকার চাপ মোকাবেলা করে পালটা শক্তি দেখানোর ঔদ্ধত্য দেখাতে সক্ষম হয়েছে দেখে অবাক হয়েছেন অনেকেই। সেইক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আমেরিকা যেভাবে থাপ্পর দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার যেনো তা অনুভব করার চিন্তাশক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন। রাষ্ট্র যদি সাগরে ডুবেও যায়,ওদিকে যেনো সরকার এবং রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং আঁতেল সমাজের কিছুই যায় আসেনা। রাষ্ট্রটা যেনো তাদের কারোরই নয়। বাংলাদেশ হয় আমেরিকার সাথে নেগোসিয়েট করুক নতুবা বিকল্প ব্যবস্থা করুক।
 সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ১ জানুয়ারি ২০১৮ সালে নিজের প্রথম টুইটার বার্তায় আফগান সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেয়ার জন্য পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করেন। সেইসঙ্গে তিনি ইসলামাবাদকে ২০০ কোটি ডলারের সামরিক অনুদান বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দেন।  
পাকিস্তানের বিশ্বস্ত সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যম সোমবার জানিয়েছে, পাকিস্তান নৌবাহিনীর বেশিরভাগ সামরিক সরঞ্জাম আমেরিকায় তৈরি। কিন্তু দেশটি তার নয়া সামরিক সরঞ্জাম বিশেষ করে গানবোট ও সাবমেরিন চীনের কাছ থেকে সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে। সেইসঙ্গে চীন ও তুরস্কের কাছ থেকে হেলিকপ্টার গানশিপ কেনার কথা বিবেচনা করছে ইসলামাবাদ।
এ ছাড়া, দক্ষিণ আফ্রিকার কাছ থেকে রণতরী কেনার কথাও ভাবছে পাকিস্তান। পাশাপাশি চীনের কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার বিষয়েও বেইজিং-এর সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে ইসলামাবাদ।সূত্রটি জানিয়েছে, পাকিস্তান বেশ কয়েকমাস আগে থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য সেনা ক্যাডেটদের আমেরিকায় পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে।
 
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খাজা মোহাম্মাদ আসিফ বলেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক অব্যাহত থাকলে পাকিস্তান ক্ষতিগ্রস্ত হবে।তিনি ৭ই জানুয়ারি রোববার মার্কিন দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন। তিনি জানান, মার্কিন সরকার বিগত বছরগুলোতে পাকিস্তানকে ধোঁকা দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করার চেষ্টা করেছে।এর আগে খাজা মোহাম্মাদ আসিফ শুক্রবার বলেছিলেন, আমেরিকা কঠিন সময়ে পাকিস্তানকে একা ফেলে রাখার পরও ইসলামাবাদ ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
এদিকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, তার দেশের বিরুদ্ধে মার্কিণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিত্যা অভিযোগের প্রতিবাদে ইওস্লামাবাদ ওয়াশিংটনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা আপাততঃস্থগিত রেখেছে।তিনি দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আফগানিস্থানে তাদের রেকরড সৃষ্টিকারী ব্যার্থতা ঢাকতেই ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে একের পর এক ভিত্তিহীন ও বানানো মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করে চলেছেন। নয়া বছরের প্রথম দিনে সূচনা করেছেন বছরের প্রথম মিথ্যা দিয়ে।বলেছেন পাকিস্তান সন্ত্রাসীদেরকে অস্ত্র ও আশ্রয় দিচ্ছে।এই অযুহাতে পাকিস্তানকে দেয়া সহযোগীতা বন্ধের হুমকি দিয়েছেন তিনি।তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন,আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান আমেরিকার সম্পর্কের বিষয় খতিয়ে দেখতে গেলে দশ বছর আগে থেকে বর্তমানে আসতে হবে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ২০০১সালে আফগানিস্তানে মার্কিণ সামরিক হামলায় অংশ নিতে পাকিস্তানকে চাপ দেন ও বাধ্য করেন।এরপর ২০০৬সাল থেকে আফগানিস্তানের ব্যাপারে আমেরিকার সঙ্গে সহযোগীতার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ তোলে মার্কিণ প্রশাসন।
বুশের পর মার্কিণ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দুই মেয়াদে নানা ইস্যুতে দু’দেশের মধ্যকার মত বিরোধ অব্যাহত থাকে এবং পাকিস্তানের উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় মার্কিণ হামলার কারণে দু”দেশের মতবিরোধ বেড়ে তুঙ্গে ওঠে।একথাগুলো কেউ অস্বীকার করিনা।বিশেষ করে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সামরিক ও আর্থিক সহায়তার বিষয়টিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগীতার পরিবেশ বদলে যায়। ট্রাম্প চেষ্টা করছেন পাকিস্তানকে তার আকাঙ্ক্ষা কার্যকরে বাধ্য করতে।আসল ঘটনা হচ্ছে, আমেরিকা নিজেই আফগানিস্তানে চোরাবালিতে নাক মুখ ডুবিয়ে বিপদে আছে।এই বাস্তবতার দায় পাকিস্তানের উপর চাপানোর চেষ্টার সুযোগ চাইছেন তারা।
আমেরিকার বুঝা দরকার বর্তমান অবস্থা থেকে বের হতে অথবা আফগানযুদ্ধে বিজয়ী হতে পাকিস্তানের কথা শোনেই তারা পারতে পারেন।এছাড়া আমেরিকার কোন বিকল্প নেই।এই বাস্তবতা ন্যাটর জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নটিও প্রাধান্যে চলে এসছে।পাকিস্তানের কর্মকর্তারা আফগানিস্তানের যুদ্ধের ভেতরের জটিল অবস্থাকে যেভাবে বুঝেন বাকিদের তা সম্ভব হয়নি এখনো।তালেবানরা যে অবস্থাতেই থাকুক পাকিস্তান আক্রমণের অবস্থা তাদের নেই।তাই তাদের উপর পাকিস্তানের প্রভাবই যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারনে খুবই   গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতায় কিছুই গোপন নেই।আমেরিকা পাকিস্তানের উপর বাড়াবাড়ি করলে তালেবানদের সহযোগীতা দিয়ে পরিস্থিতি পাকিস্তানের সম্পূর্ণ নিয়ে আসা পাকিস্তানের জন্যে খুবই সহজ।ওয়াশিংটনকে প্রতিরোধ করে আফগানিস্তানে তার হাত কেটে নিশ্চিহ্ন করা সামান্যও কঠিন নয়।
সূতরাং বর্তমান নীতি অব্যাহত থাকলে অর্থাৎ ট্রাম্প যদি তার বিভ্রান্তিকর পথ ত্যাগ না করে পাকিস্তানকে তার স্বাধীন নীতিতে ফরে আসতে হবে অর্থাৎ পাকিস্তানকে আমেরিকা ঘেঁষা নীতি পরিবর্তন করতে হবে।যা ইরান,রাশিয়া চীন তুরস্ক এবন অন্যান্য অনেকেই পরম খুশীতে স্বাগতঃ জানাবে।
পাকিস্তান সরকার সামরিক বাহিনী ও বিরোধীদলগুলো বুঝতে শুরু করেছে আমেরিকার সাথে এতোদিনের সম্পর্কের জন্যে তাদের অনুশোচনার দিন এসেছে।মার্কিণ শক্তি তাদের নিজের অবস্থানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চোখ বন্ধ করে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ভবিষ্যৎ দিনের গথা না ভেবে প্রেসিডেন্ট তার জীবনের কিছু আয় রোজগারের কথা ভাবছেন।এতে যা হবার তাই হবে।আশা করা যাচ্ছে সি আই এ’র দক্ষ এবং দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞগণ হাওয়াইট হাউসকে সঠিক গাইড দেবেন এবং আমেরিকার স্বার্থ রক্ষায় বাস্তবতার দিকে নজ্র দেবেন।
(লেখক আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক এবং দেশকন্ঠ সাপ্তাহিকের সম্পাদকমন্ডলীর চেয়ারম্যান)। 


কক্সবাজার: যে কথা এখনও কেউ বলেনি , লেখেনি,ক’জনাইবা জানে? = সিকদার গিয়াসউদ্দিন

রবিবার, ২১ জানুয়ারী ২০১৮

বিজয়ের পরপরই সকলে বার্মা কিংবা ভারত অথবা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসতে থাকে।অনেকেই দেশমাতৃকার জন্য ইতিমধ্যেই না ফেরার দেশে চলে গেছেন কিংবা হারিয়ে গেছেন।এঁদের মধ্যে শিশু,কিশোর,যুবা,বৃদ্ধ কেউই বাকী ছিলোনা।২২’শে ডিসেম্বর রোজ বুধবার ১৯৭১’সালের এইদিনে ইতিমধ্যেই ফিরে আসা কক্সবাজারের বিজয়ী জনতার পক্ষে সর্বদলীয় কক্সবাজার সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবন্দসহ বিভিন্ন এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সর্বসম্মতিক্রমে দক্ষিন মিটাছড়ি জুনিয়র হাইস্কুলে(বর্তমানে পূর্ণ হাইস্কুল)র ময়দানে কক্সবাজারের প্রথম মহাবিজয়ের অনুষ্টানের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। অনুষ্টানে যে দূ’টি জায়গায় বিজয় সভা অনুষ্টানের ব্যবস্থা সম্পন্ন করার জন্য আলোচনা চলে-সে দূ’টি স্থান হচ্ছে প্রথমত: তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান শান্তি কমিটির অন্যতম প্রধান মৌলভী ফরিদ আহমদের মাছূয়াখালী’র বাড়ীর সামনে অথবা কক্সবাজার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান কনভেনশন মুসলীম লীগের জাফর আলম চৌধূরী’র বাড়ীর সামনে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে অবশেষে রামু থানার রাজারকুল ইউনিয়নের(পরে দক্ষিন মিঠাছড়ী ইউনিয়ন)কূখ্যাত জাফর আলম চৌধূরী(প্রকাশ জাফর মিয়া)র বাড়ীর পাশের জুনিয়র হাইস্কুল(এখন হাইস্কুল) মাঠে কক্সবাজারের প্রথম বিজয়সভা’র অনুষ্ঠানের জন্য ১৯৭১’সালের ২৭’শে ডিসেম্বর রোজ সোমবার দিন ধার্য্য করা হয়।সবকিছু বিবেচনা পূর্ব্বক রামু,উখিয়া ও টেকনাফ থেকে বিজয়ী তথাকথিত পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ওসমান সরওয়ার আলম চৌধূরীকে ও বঙ্গবন্ধুর অতি ঘনিষ্ট কক্সবাজার থানার খরুলিয়ার জমাদার ফজল করিমকে(পরবর্তিতে কক্সবাজার সেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রধান)শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিরাপদে সভা অনুষ্ঠানের জন্য দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।

জমাদার ফজল করিম ও ওসমান সরওয়ার আলম চৌধূরী রামুর মুক্তিযুদ্ধ ফেরত তরুন তুর্কিরা সহ স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের নিয়ে আলোচনাক্রমে রাজারকুলের বিজয়সভাকে সাফল্যমন্ডিত করার জন্য বিভিন্ন উদ্দ্যোগ গ্রহন করেন।তম্মধ্যে যুদ্ধফেরৎ মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে কূখ্যাত জাফর মিয়া’র ঘর যাতে কেউ জ্বালিয়ে বা ভেঙ্গে দিতে না পারে তজ্জন্য জাফর মিয়ার বড় শত্রু মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক খ্যাতনামা জমিদার ঈশান পালের বড় ছেলে পরিমল পাল ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা জহরলাল পাল এবং বিশিষ্ট  আনসার কমান্ডার ও মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হক সিকদারকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।নিয়তির করুন পরিহাস এই যে,কূখ্যাত জাফর মিয়ার নির্দ্দেশে বিশিষ্ট জমিদার ঈশান পালের ও রামু থানা অস্ত্রাগার দখলের অন্যতম আসামী আনসার কমান্ডার আবদুল হক সিকদারের বাড়ী জ্বালিয়ে পুড়িয়ে বা ভেঙ্গে দিয়ে ছারখার কিংবা লন্ডভন্ড অথবা লুঠতরাজ করা হয়-সেই কূখ্যাত অত্যাচারী জাফর মিয়ার ঘর ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন-যাঁরা অত্যাচার,অবিচার ও সমূহ নির্যাতন সহ্য করেছিলেন এবং মহান জনযুদ্ধের সাথী ছিলেন।এইসব জনযোদ্ধারাই সেদিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কিভাবে ধারণ করতে হয়-তা শিখিয়েছিলেন।আইনকে যাতে কেউ হাতে তুলে না নেন-স্বাধীন দেশের মানুষকে নব্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত স্বাধীন জনগোষ্টিকে তা জানাতে এঁদের মহানুভবতার দৃষ্টান্ত তুলে ধরার বিষয়ে ওসমান সরওয়ার আলম চৌধূরীর তখনকার রাতদিন পরিশ্রমের বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য বটে।অবশ্য ১৬’ই ডিসেম্বরের পরপরই জাফর মিয়া ও কক্সবাজারের সাকাচৌ হিসাবে পরিচিত কূখ্যাত দিদার মিয়া সহ জাফর মিয়ার সবছেলেরাই তখন পালিয়ে বেড়াচ্ছিলো।

Picture

অবশেষে এলো কক্সবাজারের ইতিহাসের জাগ্রত বিজয়ী মহাজনতার মহাসমাবেশের সেই কাঙ্খিত দিনটি।কক্সবাজার মহুকুমা’র বিভিন্ন থানা ও গ্রাম থেকে যথাক্রমে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া থেকে লন্চযোগে,টেকনাফ থেকে চকরিয়া পর্য্যন্ত সকল থানা থেকে ট্রাক বাস যোগে,রামু ও উখিয়া থেকে মিছিলের পর মিছিল।হাজারো জনতার বিজয় মিছিল বিশেষ করে অনেকগুলো লাটি মিছিল ছিলো দেখার মতো।জমাদার ফজল করিম ও রামু থানার তখনকার বিশিষ্ট ছাত্রযুবনেতা রামু থানার মেরোংলোয়ার ওবায়দুল হকের নেতৃত্বে (পরবর্তিতে জাসদ নেতা ও রামু ফতেখাঁরকুলের চেয়ারম্যান)কাউয়ারকোপের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ইপিআরের নূর মোহাম্মদ(মুক্তিযুদ্ধের সময় মেঝর খ্যাত যদিও মেঝর ছিলেননা তবুও স্থানীয় লোকজন সে নামে ডাকতো),মনির ঝিলের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা নূরুল হক(পরবর্তিতে কাউয়ারকোপের চেয়ারম্যান ও রামু মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান)রামু চৌমুহনীর ছাত্র ইউনিয়নের নেতা দীপক বড়ুয়া(পরে অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ রামু কলেজ),শেখর বড়ুয়া ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আবু আহমদ,ছাত্রলীগের সূমথ বড়ুয়া,মাহবুব(পরে জাসদ ও বি এন পি নেতা,জোয়ারিয়ানালার চেয়ারম্যান)মেরোংলোয়ার গোলাম কবির সহ স্থানীয় আনসার বাহিনী,সেচ্ছাসেবকসহ অনেকেই মহাসমাবেশের শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য চতুর্দিকে বুহ্য রচনা করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে ব্যস্ত ছিলো।বিরাট মাঠে তিল ধরনের জায়গা ছিলোনা।ইতিমধ্যেই কক্সবাজারের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা  যথাক্রমে কক্সবাজার মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি উখিয়ার দিদারুল আলম চৌধূরী,কক্সবাজার মহকুমা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক কক্সবাজারের বিপ্লবী কন্ঠস্বর খ্যাত ছুরত আলম(পরবর্তিতে জাসদ নেতা),কক্সবাজার কলেজের নির্বাচিত ভিপি গর্জনিয়ার তৈয়বউল্লাহ(পরবর্তিতে জাসদ নেতা)অনুষ্টানে উপস্থিত হলে চতুর্দিকে গগনবিদারী মুহুর্মুহু শ্লোগানে চতুর্দিক মূখরিত হয়ে উঠে।অত:পর কক্সবাজার মহকুমা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা এসে পৌঁছূলে পূরো ময়দান শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠে।মাঠের বেশ দূরে চতুর্দিকের গাছগাছালীর উপরে অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরও সাধারণ মানুষের সাথে শ্লোগান দিতে দেখা গিয়েছিলো।অবশেষে ছাত্রলীগের ছূরত আলম  মাইকের স্পীকার হাতে নিয়ে জনগনকে শান্ত হতে বললে চতুর্দিকে পিনপতন নীরবতা।কারো মূখে কোন কথা নেই।সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে সভাপতির আসন গ্রহন করেন কক্সবাজার মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি জোয়ারিয়ানালার আবছার কামাল চৌধূরী।অনুষ্টানের প্রধান অতিথি ছিলেন কক্সবাজার মহকুমার ১৯৭০’সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে ভূমিধ্বস বিজয়ী টেকনাফের উকিল নূর আহমদ। তিনি পাকিস্তানের বিখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান সাবেক ডাকসূ ভি পি পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রধান মৌলভী ফরিদ আহমদকে বিপুল ভোটে পরাজিত করেন।(পরবর্তিতে তিনি জাসদের অন্যতম নেতা ছিলেন) আসন গ্রহন করার পর যথাক্রমে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে বিজয়ী রামুর ওসমান সরওয়ার আলম চৌধূরী(পরবর্তিতে অধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট সমাজ সেবক হিসাবে স্বীকৃতি অর্জন), চকরিয়ার জহিরুল ইসলাম চৌধূরী(পরবর্তিতে গনফোরামে যোগ দেন ও অন্যতম কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন), পূর্ব পাকিস্তান মোজাফ্ফর ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য অধ্যাপক মোশতাক আহমেদ(পরবর্তিতে অধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের স্বীকৃতি অর্জন),মহেশখালীর উকিল মওদুদ আহমদ(পরবর্তিতে জাসদ নেতা)এবং তিন ছাত্রনেতা আসন গ্রহন করেন।

সভার শুরুতে পবিত্র কোরান তেলাওয়াত,পবিত্র গীতা ও পবিত্র ত্রিপিটক থেকে পড়ে শুনানোর পর পরই প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ওসমান সরওয়ার আলম চৌধূরী আসন থেকে উঠে ঘোষনা দেন আজকের অনুষ্টান উদ্ভোধন করবে আপনাদের এলাকা’র
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হক সিকদারের পুত্র রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র বিপ্লবের অগ্নিঝরা দিনগুলোর অগ্নিস্বাক্ষী,স্বাধীনতা আন্দোলনের বলী,হারিয়ে যাওয়া লক্ষ শিশু কিশোরদের প্রতিনিধি,বোন শিরীণকে হারিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা আপনাদের আমাদের সকলের সন্তান এস  এম গিয়াসউদ্দিন।অবশ্য আগের দিন রাতে ওসমান সরওয়ার আলম চৌধূরী,পরিমল পাল,গিয়াসউদ্দিনের মা মরিয়ম বেগম চার পাঁচ ঘন্টা প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।পরবর্তিতে জানা যায় যে-জাফর মিয়া সহ মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী সকল মহলকে বিজয় সভার গুরুত্ব ও এক ধরনের ঈঙ্গিত প্রদান আর পরবর্তি প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ করার লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত আগেই নেয়া হয়েছিলো।যা ছিলো দস্তুরমতো বিরাট চমক।

দেখতে ছোটখাট ছেলেটিকে টুলের উপর দাঁড় করিয়ে দেয়া হলে সারারাত ধরে শিখিয়ে দেয়ার বক্তব্যের সেদিনের সারসংক্ষেপ ও ম্যাসেজ ছিলো-“স্বাধীন বাংলাদেশ হিন্দু,বৌদ্ধ,খৃষ্টান ও মুসলমান একথায় সকলের।ধর্ম নিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতির কবর ইতিমধ্যেই রচিত হয়ে গেছে।ধর্ম নিয়ে আবার কেউ রাজনীতি করতে চাইলে তার ভয়াবহ পরিনামের কথা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে সাবধান করে দেয়ার বিষয়টি ছিলো বিজয়সভা’য় ছেলেটিকে দিয়ে বলানোর আসল কারন।নিয়তির কি করুণ পরিহাস-স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মই এখন রাজনীতির বর্ম হয়ে ইতিমধ্যেই ক্যান্সারের মতো তা ছড়িয়ে গেছে।অথচ সেই ছেলেটি তার কয়েক যুগ পরেও তা ভূলেনি।সাম্য,সামাজিক ন্যায় বিচার ও গনতান্ত্রিক আচরনের বিকাশ আর মানুষের মুক্তির সংগ্রাম এখন আরো বেশী দরকার বলে সে মনে করে।
অত:পর সেদিন পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন-রামু থানা আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য ও রাজারকুল আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলম সিকদার(পরবর্তিতে রাজার কুলের চেয়ারম্যান)।বক্তব্য প্রদান করেন যথাক্রমে ছাত্রনেতা তৈয়বউল্লাহ সিকদার,দিদারুল আলম চৌধূরী,ছূরত আলম।পরে উকিল মওদুদ আহমদ,জহিরুল ইসলাম চৌধূরী,অধ্যাপক মোস্তাক আহমেদ,ওসমান সরওয়ার আলম চৌধূরী,উকিল নূর আহমদ।পিনপতন নীরবতার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু ফিরে না আসা পর্য্যন্ত মুজিবনগর সরকারের অধীনে কিভাবে দেশ পরিচালিত হবে,জনগনের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে বিশ্লেষনধর্মী বক্তব্য প্রদান করেন সকলেই।অত:পর সভার সভাপতি আবছার কামাল চৌধূরী উপস্থিত জনগনকে দশ বারোটি নির্দেশাবলী পড়ে শুনান।আইন যেনো কেউ হাতে তুলে না নেন-সে বিষয়ে জনগনকে সতর্ক থাকতে বলেন।পরবর্তি নির্বাচন না হওয়া পর্য্যন্ত প্রতিটি ইউনিয়নে পন্চায়েত গঠনের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়।মাগরিবের বেশ কিছুক্ষন পর সভাপতি অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষনা করার পর পরই মশাল মিছিল সহকারে বিজয়ী বীর জনতার বিজয় মিছিল স্ব স্ব গন্তব্যে প্রস্থান করেন।উল্লেখ্য-সেদিনের মহাসমাবেশের শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষায় বিজয়ীর বেশে বেরিয়ে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের কড়া প্রহরা সকলের আশীর্বাদ ও সুনাম কুড়িয়েছিলো।কক্সবাজারের ইতিহাসে এতো দূ:খ বেদনার মাঝেও বিজয়ের খূশীর আমেজ,কোলাকুলি ও মত বিনিময়ের এমন আন্তরিক দৃশ্য আর কখনও দেখা যায়নি।এরকম ঐক্যমত্যের,আন্তরিকতার স্পর্শের শীতের হিমেল হাওয়ার মধ্য দিয়ে জনতার সমাগমও আর হয়নি।সম্ভাবনার কথা বাদই দিলাম।

১৫’ই জানুয়ারী,লাসভেগাস।
নেভাদা,যুক্তরাষ্ট্র।


মতামত : বাংলাদেশের সামনে কঠিন চ্যলেঞ্জ = আবু সাঈদ রতন

রবিবার, ২১ জানুয়ারী ২০১৮

২০১৮ সাল বাংলাদেশের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবেই পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। এই টার্নিং পয়েন্টহলো রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নতুনমাত্রা নিয়ে বছরটি পার করবে এতে কারো সন্দেহ নেই। অভ্যন্তরীন রাজনীতি একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে।
এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে যে অবস্থানে দাঁড়িয়েছে তা চলমান রাখাই হবে সরকারের বড় চ্যলেঞ্জ। অর্থনৈতিকক্ষেত্রে বড় চ্যলেঞ্জের কারণহলো আগামী মার্চ মাসেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেতে যাচ্ছে। এই খবরটি একদিকে যেমন আনন্দের, তেমনি টেনশানের বিষয়ও। কেননা  উন্নয়শীল দেশের কিছু নিয়ম-কানুন আছে যা মেনে চলতেগেলে অর্থনৈতিক অবকাঠামো সূদৃঢ় হতে হয়। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্থা (ইকোসক) উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দিয়ে থাকে। কেননা বাংলাদেশ তাদের সব শর্তই ইতোমধ্যে পূরণ করেছে। যেমন উন্নয়নশীল দেশ হতে হলে মাথাপিছু আয় হতে হবে ১২৩০ ডলার, যা বাংলাদেশের আছে ১৬১০ ডলার। মানবসম্পদ সূচক হতে হবে ৬৬, যা বাংলাদেশের আছে ৭২.৮.। অর্থনৈতিক ভঙ্গুর সূচকের স্কোর হতে হবে ২৫ বা তার কম। বাংলাদেশের আছে ২৫।
বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে থেকেই স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা পেয়ে আসছিল। এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নাম লেখানোর ফলে যে আশংকা দেখা দিয়েছে তা হলো, স্বল্পোন্নত দেশের বাজার ও কম সুদের বহি: ্র্ঋণ সুবিধা হারাবে।
ট্রাম্প প্রশাষণ ইতিমধ্যেই ৪০ শতাংশ সাহায্য বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে।


অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব দেশ এ মর্যাদা পেয়েছে তারা সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের কাজগুলো করেছে। এই কাজগুলো যদি বাংলাদেশ দ্রুততার সংগে করতে না পারে তবে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে যাবে। পৃথিবীর অনেক উন্নয়নশীল দেশ আছে যারা উন্নয়নশীল হওয়ার পরেও আর এগুতে পারেনি। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা ধরে রাখার জন্য ৩ বছর সময় পাবে। এর মধ্যে সবগুলো শর্ত ধরে রাখতে হবে। আর সবশর্ত পূরণ করতে পারলে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যেম আয়ের দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সম্ভাবনা আছে। উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার ফলে ঋণ সাহায্যে কমে যাবে। তবে অন্যদিকে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হবে। এখন সবকিছু নির্ভর করছে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর। কারণ দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরী এবং মানষিকভাবে প্রস্তুতি সরকারের আছে এবং চেস্টাও আছে। পদ্মাসেতু নিজস্ব অর্থায়নে করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস অনেকে বেড়েগেছে। বিগত ৪ বছর দেশে কোন রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিলনা বললেই চলে। তাই বাংলাদেশে যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে এবং সামাজিক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে তার গতি ধরে রাখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের মতেও উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন করা ও সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি যে বৈষম্যের সৃস্টি হচ্ছে তা উন্নয়নের কাজ  আরও দ্রুত করতে হবে। এখানেই বাংলাদেশের মুল চ্যলেঞ্জ। কেননা রাজনৈতিক অস্থিরতা দক্ষিণ এশিয়ার একটি কমন ফ্যাক্টর। বাংলাদেশে নির্বাচনকে সামনে রেখেতো আছেই এবং তা কতদূর পর্যন্ত গড়ায় তা দেখার বিষয়। সরকার ইতোমধ্যেই বিরোধীদলকে অনেকটা দূর্বল করে ফেলেছে।
২০১৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে চ্যালেঞ্জ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তা ২০১৮ সালে এসে চুড়ান্তরূপ নিয়েছে। সরকারি দল এক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কেননা ২০১৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এবং জামায়াত মিলে নির্বাচন প্রতিরোধের ডাক দিলেও কার্যত তা বাস্তবায়ন হয়নি। আর তা বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে তাদের জ্বালাও পোড়াও নেতিবাচক রাজনীতিরচিত্র সরকার অর্থাৎ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট বেশ সফলভাবেই জনগণের কাছে উপস্থাপন করতে পেরেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে জামায়াতের প্রায় শীর্ষ স্থানীয় নেতার ফাঁসি হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে বিএনপি জামায়াতের অনেককর্মীই এখন মামলা মোকাদ্দমা নিয়ে ব্যস্ত। এমন কি বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া মামলার হাজিরা দিতে দিতেই বছরটি পার করে দিতে পারেন এমনটি আভাষ পাওয়া যাচ্ছে। সরকার চাচ্ছে বিএনপিকে মামলা মোকাদ্দমার চাপে রেখে দায়সারাভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহন করাতে। বিএনপি’র অবস্থান এক্ষেত্রে কি হবে তা পরিস্কার নয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করতে পারলেও অর্থনৈতিক অস্থিরতা এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। রোহিঙ্গা সংকটে অর্থনৈতিক কাঠামো দূর্বল করেছে। প্রাইভেট ব্যাংকগুলো চলছে ফ্রি স্টাইলে। বড় বড় ব্যাংকের স্লথগতি উন্নয়নের কাজকে ব্যহত করছে। একনেকের বৈঠকে প্রকল্প পাশ হলেও সময়মত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ঋণদাতা ও সাহায্যেকারি দেশগুলো অর্থ ফেরত নিয়ে যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই।  মুক্তবাজার অর্থনীতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে যে দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি জ্ঞান ও বিশ্ব অর্থনীতির ধারণা বাংলাদেশের ঘাটতি আছে বলেই মনে হয়, মানে পর্যাপ্ত নয়। আমদানী, রপ্তানীর ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে আরো কার্যকর ভূমিকা নেয়া প্রয়োজন। নতুন নতুন বাজার সৃস্টিকরে সে রপ্তানীর উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে পণ্যের মাননিয়ন্ত্রণ যেন আন্তর্জাতিক মানের হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, বাংলাদেশ আমাদের সকলের। নিজ নিজ দলের নেতা নেত্রীদের সেই নেতৃত্বদানের স্বক্ষমতা অর্জন করে এবং দক্ষ প্রশাসন, আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলেই আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাবো। তাই সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশ কি পারবে সেই চ্যলেঞ্জ মোকাবেলা করতে?

-লেখক, সম্পাদক ইউএস বাংলা নিউজ, নিউইর্য়ক


ইতিহাসকে নিজের পক্ষে বয়ান করার একটা প্রবণতা আমাদের দেশে প্রবল, যা প্রকৃত ইতিহাস চর্চাকে ব্যাহত করে --- বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখিকা ফাতেমা মিয়া

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৮

সমাজে গড়পরতা মানুষের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা নিজ পরিবারের পাশাপাশি নিজের সমাজ, দেশ তথা পৃথিবী নিয়ে চিন্তা করেন। তেমনি একজন অসাধারণ মানুষ ফাতেমা মিয়া। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখিকা ফাতেমা মিয়া ইংরেজি ভাষায় লিখেছেন ইতিহাসভিত্তিক বই  Unspoken। ১৯৭১ এ বাংলাদেশে চলমান গণহত্যা, মার্কিন যুক্তরাস্ট্র, আরব বিশ্বসহ মুসলিম দেশগুলোর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এবং এর পূর্বাপর নানা প্রাসঙ্গিক বিষয়কে উপজীব্য করে বইটি লেখা। ২০১৪ সালের শেষ দিকে বইটি প্রকাশের পর বইটি নিয়ে ফাতেমা মিয়া'র এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেন বর্তমানে লন্ডনে নির্বাসিত বাংলাদেশী মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী শাহ আলম ফারুক। দীর্ঘ তিন বছর পর স্পেন ভিত্তিক একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে এ বছরের মার্চে সংক্ষিপ্ত আকারে সাক্ষাৎকারটি প্রথম ছাপা হয়। বোস্টন বাংলা নিউজ ডটকম  পাঠকদের জন্য বিজয়ের ৪৬ তম বার্ষিকী উপলক্ষে সাক্ষাৎকারটি বর্ধিত কলবরে প্রকাশিত হলো ।

alt

• শাহ আলম ফারুক : আপনি আরো বই লিখেছেন বিশেষ করে Ache in my heart, Friendship Offer  Rejection এর মত আলোচিত ফিকশন, যে গুলো আন্তর্জাতিকভাবে পাঠক সমাদৃত হয়েছে । তা ফিকশন থেকে হঠাৎ করে ইতিহাসের মত বিষয়ে Unspoken বইটি লেখার চিন্তাটা কেমন করে আসলো ?

•• ফাতেমা মিয়া : ২০১১ এ পাকিস্তানীরা আমাকে ভাল করে ধাক্কা দিয়েছে । তারা কোন এককারণে হঠাৎ করে দেখাতে চাইতেছিল, তারা বাংগালীদের ধর্ম নাই বলে মন্তব্য শুরু করে দিয়েছে। বাংগালির কালচার নিয়ে ব্যংগ করা শুরু করছিল। বাংগালির বাচ্চারা পর্যন্ত ইতিহাস জানে না। তখন আমি আমার বাচ্চাদের ইতিহাস জানাই। সাথে সাথে আমাদের কিছু ইমেল সার্কুলেশন গ্রুপ ছিল, সেগুলোতে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ ও বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে লিখতে শুরু করলাম। এক পর্যায়ে চিন্তা করলাম এ সব নিয়ে একটা বই করা যায়। আর সে সূত্র ধরেই আমার এই বই।

• শাহ আলম ফারুক: তা বই লেখার প্রস্তুতি টা কেমন ছিল -
•• ফাতেমা মিয়া : আমার কাছে অনেক ইনফরমেশন ছিল। আমি আমার ২২ বছর আগের সংগ্রহ করা ইনফরমেশনগুলো নতুন করে খোঁজা শুরু করলাম। এছাড়া অন্য অনেকের কাছে তথ্য সহযোগিতা চাইলাম। কিন্তু কেউ দেয় না। কেউ কেউ অনেক কন্ডিশন দিল। কেউ কেউ তাদের সাথে নিয়ে কাজ করতে বললো। আমি রাজী হলাম না। মানুষ অনেক বেশি পলিটিক্যাল। তাদের অনেকের মতামতের সাথে আমি একমত ছিলাম না। ইন্ডিয়ার দু একজনের সাথে যোগাযোগ হলো। তারা অনেক ডকুমেন্ট দিল। এতে তাদের ভার্সনটা পেলাম ! কিন্তু নানা কারণে সেগুলো ঠিক সেভাবে ব্যবহার করতে পারি নি। সে যাক প্রথমত: আমার আব্বা থেকে পাওয়া জ্ঞান দিয়ে শুরু। ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থেকে বাংলাদেশ। ৭১ এর ঘটনাবলীর বিষয়ে আমার বড় আপার চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা এবং বোধের বিষয় লেখায় রাখার ইচ্ছে হলো । বাংগালি জাতির গুণ, বেদনা, আশা ও সম্ভাবনার কথা লিখার তাড়না ছিল মনে। ৭১ নিয়ে কিছু রেফারেন্সের দরকার ছিল। শাহ আলম ফারুক (সাক্ষাৎকার গ্রহীতা) শেষের দিকে কিছু বাংলা বই দিলেন, সে বইগুলো থেকে কিছু তথ্য নিলাম। আমার আব্বা চাচাদের ভূমিকা নিয়ে অনেক লেখার আছে, লেখার ছিল। শেষ পর্যন্ত যদিও উনাদের সম্পর্কে যদিও ঠিক সেভাবে লেখা হয়ে উঠেনি।
• শাহ আলম ফারুক : আপনি দেশ থেকে অনেক দূরে আছেন। আপনি কি মনে করেন যদি দেশে থাকতেন তাহলে অনেক বেশি তথ্য পেতেন, বইটি লিখতে আরো সুবিধা পেতেন ?

•• ফাতেমা মিয়া : আমি মনে করি না। বাংলাদেশ থেকে লেখা যেত না। বাংলাদেশে তুমি আওয়ামী লীগ হতে হবে, বিএনপি হতে হবে নইলে এরশাদ পার্টি হইতে হবে ! মুজিবর রহমান বংগবন্ধু হইতে হইবে, জাতির পিতা হইতে হইবে। না হলে উনার বিরোধী হইতে হইবে, তোমার জিয়াউর রহমানকে পছন্দ হইতে হইবে। মুসলিম হলে তুমি ফানাটিক বা নাস্তিক হতে হবে। লাকুম দি নুকুম - যার ধর্ম তার কাছে। অথচ আমাদের ওখানে দেখা যায়-মুসলিম হলে অন্য ধর্মকে ঘৃণা করতে হবে, আমি মানি না। বাংলাদেশে থাকলে নিজের মত করে লিখতে পারতাম না। ইতিহাসকে নিজের মত করে বোঝা নিজের পক্ষে বয়ান করার একটা প্রবণতা আমাদের দেশে প্রবল। যা প্রকৃত ইতিহাস চর্চাকে ব্যাহত করে।

• শাহ আলম ফারুক : বাংলাদেশের গণহত্যা, বাংলাদেশের জন্ম প্রক্রিয়া নিয়ে মূলত: আলোচনা করেছেন। এই বইতে ১৩ টি অধ্যায় আছে। এই অধ্যায়ের পরিকল্পনা কেমন করে হয়েছে ?
•• ফাতেমা মিয়া : বিভিন্ন বিষয় আলাদা করে এটার ব্যাকগ্রাউন্ড, থিম আর কনকুলেশন করে বইটি লিখতে চেয়েছি। বাংগালির ঐতিহ্য, মর্যাদা স্ট্যাটাস যে অনেক উপরে ছিল, এ ব্যাপারগুলো মাথায় রেখে। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয় পূর্ববতী ২০০/৩০০ বছরের ব্রিটিশ ভারতের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী। একাত্তরের গণহত্যা এবং সমকালীন বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী জাতি গোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া - গণহত্যার সময় পাকিস্তানী শাসকগোস্ঠীর প্রতি বিশেষত: আমেরিকার সমর্থন, আরব ও মুসলিমবিশ্বের নীরবতা। এ সব বিষয়ে অধ্যায়ভিত্তিক আলোকপাত করেছি।

• শাহ আলম ফারুক : বইটি লেখার পেছনে অন্য কোন অনুপ্রেরণা কি ছিল ?
•• ফাতেমা মিয়া : ইতিহাস মানুষের জানা উচিৎ। এত বড় একটা গণহত্যা, এটা নিয়ে সবার কথা বলা উচিত। ২০১১ এ স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তির সময় অনেক কথা হলো আমাদের কমিউনিটিতে। যা নিয়ে স্থানীয় পাকিস্তানীদের অনেকে অসন্তুষ্ট ছিল। তখন আরো বেশি করে মনে হলো কিছু ঐতিহাসিক সত্য সবার জানা উচিত। অনেক জিনিস এটার মধ্যে কাজ করেছে।
• শাহ আলম ফারুক : আমরা জানতে পেরেছি(২০১৭), Unspoken এর ড্রাফট পান্ডুলিপি দেখে বাংলাদেশের খ্যাতনামা প্রকাশক বইটি বড় আকারে ছাপাবার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ ব্যাপারটা নিয়ে লেখিকা'র চিন্তা ভাবনা কি?

•• ফাতিমা মিয়া : সময় সুযোগ বুঝে অবশ্যই বইটি বড় আকারে ঢাকা ভিত্তিক প্রকাশক ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড
( ইউপিএল) কে দেবার ইচ্ছে আছে।

• শাহ আলম ফারুক : গত তিন বছরে বইটি ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাঠকের কাছে গেছে। পঠিত হয়েছে। তা বইটির বিষয়ে ২০১৭ এর শেষ দিকে এসে পাঠক-সমালোচকদের মতামতকে কিভাবে মূল্যায়ণ করবেন?

•• ফাতেমা মিয়া : সচেতন পাঠকের মতামত আমাকে মুগ্ধ করেছে। এতে লেখক হিসেবে দায়বদ্ধতার বিষয়টি আরো বেড়ে গেছে বলে মনে করি।

• শাহ আলম ফারুক : বইটি লেখা, প্রকাশনা, বিপনন ও প্রসারের ব্যাপারে স্বজন-বন্ধু-পরিচিতদের সহযোগিতা কেমন ছিল? এ ক্ষেত্রে বিশেষ কোন স্মৃতি কি আপনার মনে পড়ে ?

•• ফাতেমা মিয়া : সবচেয়ে মজার ঘটনাটি ঘটেছে কলকাতা এয়ারপোর্টে। ঢাকা থেকে কলকাতায় যাবার সময় আমাদের পরিচিত এক জনের কাছে কিছু বই দেয়া হয়েছিল। সেখানে বিক্রি ও সৌজন্য হিসেবে কিছু মানুষকে দেবার জন্য। বইয়ের কাভারে আল কায়েদা শব্দ দেখেই এয়ারপোর্টে বই গুলো জব্দ করা হয়।
দেখুন ভাল কাছে সাধারণভাবে সহযোগিতা সে ভাবে পাওয়া যায় না। তবে এক বন্ধুর সহযোগিতা প্রচেস্টার কথা বলতেই হয়। এখানে তার নাম বলে তাকে ছোট করতে চাই না।

alt
• শাহ আলম ফারুক : গত ক বছর ইউ কে'র কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রীর জন্য আপনার নাম প্রস্তাব ও সংক্ষিপ্ত তালিকায় বিবেচিত হয়েছে। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন? এমন বিরল সম্মানে ভূষিত হলে আপনার অনুভূতি কেমন হবে?

•• ফাতেমা মিয়া : হ্যাঁ জেনেছি কটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাব ও সংক্ষিপ্ত তালিকায় বিবেচিত হয়েছে। এটা অবশ্যই লেখক হিসেবে অনেক আনন্দের। গর্বের ও বিষয়। আমার স্বজনদের কেউ কেউ খুবই উৎসাহী, এমন সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রী পেলে অবশ্যই তা অনেক বড় স্বীকৃতি ।
• শাহ আলম ফারুক :
লেখালেখি এখন কেমন চলছে?

•• ফাতেমা মিয়া : চলছে কম বেশি । তবে খুব বেশি না। অবশ্য বাংলা মিরর নামের লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকাতে নিয়মিত লিখছি।

• শাহ আলম ফারুক : পাঠকদের সবশেষে কি বলবেন

•• ফাতেমা মিয়া : সবাই অনেক বেশি সবাই পড়ুক। কিছু সত্য সবার জানা উচিৎ, বিশেষত: নিজ দেশ জাতির বিষয়ে। এটা নিয়ে ভবিষ্যতে আরো কাজ করার ইচ্ছে। সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়েও লেখার ইচ্ছে আছে।

 
উল্লেখ্য, Unspoken বইটিতে পাক সেনাবাহিনীর নৃশংস গণহত্যা এবং পাকিস্তানী এলিট ও রাজনৈতিকদের আচরণের সাথে ধর্মের নামে সাম্প্রতিককালে আফ্রিকা ও আরবে যে উগ্রপন্থী কর্মকান্ড চলছে, সে বিষয়ে যোগসুত্র ও সামন্জস্যের ব্যাপারে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ আছে। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী ও তাদের দোসরদের চলমান গণহত্যায় আমেরিকার প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সহায়তা, মুসলিম বিশ্বের নীরবতার বিষয়ও তথ্য ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ৭১ সালের গণহত্যার ভয়াবহতা, সমাজ জীবনে এর প্রভাব, যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ের নানাদিক প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতায় আনস্পোকেন বইটিতে উঠে এসেছে। ৭১এর গণহত্যাকে কেন্দ্র করে লেখা বইটিতে পূর্ববতী দুই শ বছরের ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ রাজত্ব, সমাজ, রাজনীতি-সংস্কৃতির বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। বইটি বর্তমানে আমেরিকার ম্যানহাটান, বেলজিয়ামের এনথ্রুপ, ঢাকার আজিজ সুপার মার্কেট, প্যারিস, টরেন্টো, কলকাতার কলেজ স্ট্রিট ও ইউ কে তে পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া অনলাইনে আমাজান, Ebay তে পাওয়া যাচ্ছে।
লেখিকা ফাতেমা মিয়ার জন্ম সিলেটের ওসমানীনগর থানার খাদিমপুরে। শৈশবে তিনি পারিবারিকসূত্রে ব্রিটেনে আসেন।তিনি সপরিবারে দীর্ঘ দিন ধরে ওয়েস্ট মিডল্যান্ডের অভিজাত এলাকা সলিহলে বসবাস করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই পুত্র সন্তানের গর্বিত জননী।
সাক্ষাৎকার গ্রহণে : শাহ আলম ফারুক
এই ইমেইল ঠিকানা স্পামবট থেকে রক্ষা করা হচ্ছে।এটি দেখতে হলে আপনাকে JavaScript সক্রিয় করতে হবে।


লন্ডনে সেদিন বঙ্গবন্ধু যা বলেছিলেন

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৮

জুলকার নাইন: পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন পৌঁছানোর পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি হোটেল ক্যারিজেসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম সংবাদ সম্মেলন করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিনের সেই সংবাদ সম্মেলনে শুধু ব্রিটিশ নয়, বিশ্বের বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। হোটেল লবিতে জনাকীর্ণ এই সংবাদ সম্মেলনে ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের জন্য আমাদের লড়াইয়ের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। পাকিস্তানের কারাগারের কনডেম সেলে আমি যখন ফাঁসির জন্য অপেক্ষা করছিলাম তখন বাংলাদেশের জনগণ আমাকে তাদের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছে। আমি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্বাধীনতাকামী সব রাষ্ট্র যারা আমাদের সমর্থন দিয়েছে তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বিশেষত ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড ও অন্যান্য পূর্ব ইউরোপিয়ান রাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্বাধীনতাকামী জনগণ যারা আমাদের সমর্থন জানিয়েছেন তাদের সকলকে আমি ধন্যবাদ জানাই। আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগোষ্ঠীকেও তাদের সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানাতে চাই। এখন আমি সকল রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানাই বাংলাদেশকে অতিসত্বর স্বীকৃতি দিতে এবং জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তিতে সমর্থন জানাতে। ’

আধা ঘণ্টার কিছু কম সময়ের এই সংবাদ সম্মেলনের আগমুহূর্তে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চুরুটে আগুন ধরিয়ে নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর ২ মিনিটের লিখিত বক্তব্য শেষ করে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বিশ্বের আর কোনো দেশের মানুষকে বাংলাদেশিদের মতো স্বাধীনতার জন্য এতটা মূল্য দিতে হয়নি।

আমিও একটি মুহূর্তের জন্য তাদের এই দুর্দশার কথা ভুলতে পারিনি। তাই আমি দেশ ও দেশের বাইরে থাকা প্রত্যেক বাংলাদেশিকে ধন্যবাদ জানাই। অভিনন্দন জানাই মুক্তিবাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে। যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করা লাখ লাখ মানুষের শোকাহত পরিবারের প্রতি জানাচ্ছি সমবেদনা ও বিদেহী আত্মার মাগফিরত কামনা করছি। ’

Picture

এক ব্রিটিশ সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশে কী বীভৎসতা চালানো হয়েছে তা শুনলে আপনারা আশ্চর্য হবেন। লাখ লাখ মানুষকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, মাইলের পর মাইল যেভাবে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, বেঁচে থাকলে হিটলারও হয়তো লজ্জা পেতেন। ’ পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী থাকার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এটা আমার জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়, আমি গত ১০-১৫ বছর ধরেই এর মধ্যে রয়েছি। আর একটা বিষয় মনে রাখবেন, যে নিজেই মরতে চায়, তাকে কেউ মারতে পারে না। ’ অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি ৩৫ বছর ধরে রাজনীতি করছি, আমি জানতাম, আমি যদি কারাগারেও যাই বা বেঁচে নাও থাকি বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনবেই। ’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমাকে যে কারাগারের যে সেলে রাখা হয়েছিল সেখানে সূর্যের আলো বা বাতাস কিছুই ঢুকত না, কোনো রেডিও বা খবরের কাগজও দেওয়া হতো না। বিশ্বের কোনো কিছুর সঙ্গেই আমার যোগাযোগ ছিল না। অবশ্য জুলফিকার আলী ভুট্টো আমার কাছে এসেছিল। তার মাধ্যমেই প্রথম জানতে পারি বাংলাদেশের সরকার গঠনের কথা, আমাকে প্রেসিডেন্ট করার কথা। ’ সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি সহায়তার জন্য সারা বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানাই। কারণ সুজলা সুফলা বাংলাদেশে শুধু লাখ লাখ মানুষই মারা যায়নি, হাজার হাজার কিলোমিটার রাস্তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, রেলপথ ধ্বংস করা হয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, অর্থনীতিকে পুরো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আমি আবেদন জানাই দরিদ্র মানুষকে বাঁচানোর জন্য। ’ প্রশ্নকারী ব্রিটিশ সাংবাদিককে উদেশ করে তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ যে কতটা সম্পদশালী ছিল তা আপনারা জানেন। কিন্তু এক শ-দেড় শ বছরের বিদেশি শাসনে থেকে অনেক কিছুই হারিয়েছে বাংলাদেশ। আমি মনে করি ব্রিটিশ সরকারেরও এখন দায়িত্ব বাংলাদেশকে সহায়তা করা। কারণ বাংলাদেশের সম্পদ আহরণ করেই আজকের ব্রিটেনে অনেক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। সেই ঋণ আজ পরিশোধের সময় এসেছে। শুধু ব্রিটেন নয়, আমি সারা বিশ্বের প্রতি লাখ লাখ মানুষকে ক্ষুধার জ্বালা থেকে বাঁচানোর আহ্বান জানাই। ’

এর আগে, সেদিন সকালেই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পান। একটি পাকিস্তানি সামরিক বিমানে খুব গোপনে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেদিন সকাল ৭টায় বিবিসির ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে প্রচারিত খবরে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিমানযোগে লন্ডনে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানটি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। ’ প্লেনটি বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর নেমে বঙ্গবন্ধু ভিআইপি লাউঞ্জে এলে তাকে ব্রিটিশ বৈদেশিক দফতরের উপস্থিত কিছু কর্মকর্তা স্বাগত জানান। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে ব্রিটিশ ফরেন অফিসের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা স্যার ইয়ার মাদারল্যান্ড উপস্থিত হয়ে জানান ব্রিটিশ সরকার বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদা দিয়েছে। সকাল ৮টার মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে ব্রিটিশ সরকারের সম্মানিত অতিথি হিসেবে লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হোটেল ক্যারিজেস নিয়ে যাওয়া হয়। অল্প সময়ের মধ্যে ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা (পরে প্রধানমন্ত্রী) হ্যারল্ড উইলসন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যান হোটেলে। বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডনে পৌঁছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ ছিলেন লন্ডনের বাইরে। বঙ্গবন্ধুর পৌঁছানোর কথা শুনে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী হিথ ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ছুটে আসেন। প্রধানমন্ত্রী হিথ তাকে নজিরবিহীন সম্মান দেখান। ওইদিন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথ নিজে তার কার্যালয়ের বাইরে এসে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইলেন, যতক্ষণ শেখ মুজিব গাড়ি থেকে বেরিয়ে না আসেন। অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতির কথা জেনে হাজার হাজার বাঙালি হোটেল ক্যারিজেসকে ঘিরে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে। দুপুরে এই হোটেলেই জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরদিন ৯ জানুয়ারি লন্ডন সময় সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে ঢাকায় ফেরার জন্য বঙ্গবন্ধু ওঠেন ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবহরের কমেট জেটে। বাংলাদেশে ফেরার পথে বিমানটি দুই ঘণ্টার যাত্রাবিরতি করে দিল্লিতে। ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নয়াদিল্লিতে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান। পরে ঢাকায় ফেরার পরের গণসংবর্ধনার কথা আজ ইতিহাসে লিপিবদ্ধ।


ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড = বঙ্গবন্ধুকে সম্মান করে ব্রিটেন সম্মানিত

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৮

বাপ্ নিউজ : ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২। লন্ডনে কনকনে ঠাণ্ডা। তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে। এমন হাড়কাঁপানো শীতে ব্রিটেনের জন্য তথা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের জন্য এক মুহূর্তের উষ্ণতা নিয়ে দেশটির হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করে পাকিস্তান এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট। এর ঠিক ঘণ্টাখানেক আগে ব্রিটেন জানতে পারে এই বিমানে করেই নামছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আর এভাবেই এক মহানায়কের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে যায় ব্রিটেনের নাম। বঙ্গবন্ধু মনেপ্রাণে চাইছিলেন তিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে সরাসরি বাংলাদেশেই ফিরবেন।

পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহমদ ইরান-তুরস্ক রুট ধরে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এ রুটটি পছন্দ হয় না বঙ্গবন্ধুর। তিনি কেবল ঢাকায় ফিরতে চান এবং তা সরাসরি। আজিজ আহমদ জানালেন, এটি সম্ভব নয়। কারণ ভারতের আকাশসীমা তারা ব্যবহার করতে পারবেন না। আজিজ আহমদ বলেন, ‘আমরা চাইছি পাকিস্তান এয়ারলাইনসে আপনাকে ফেরত পাঠাতে। যেহেতু আমরা ভারত হয়ে যেতে পারব না তাই অন্য একটি দেশে আপনাকে যেতে হবে।’ শেষ পর্যন্ত অন্য দেশ হিসেবে ব্রিটেনকে বেছে নেওয়া হয়। এরপর ৮ জানুয়ারি, রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা বজায় রেখে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডন পৌঁছে দেয় পাকিস্তান। হিথরোয় বিমান অবতরণের মাত্র এক ঘণ্টা আগে ব্রিটেন জানতে পারে, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অল্প সময়ের মধ্যেই লন্ডন এসে পৌঁছছেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই বিমানে ছিলেন সহযাত্রী ড. কামাল হোসেন। দ্রুতগতিতে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। এদিন বিবিসির ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে ভোরের খবরে জানিয়ে দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর লন্ডন আগমনের খবর। তারা জানায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী প্লেন হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। তাকে বরণ করে নিতে ৮ জানুয়ারি ভোরে লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে আলাদা প্রাণচাঞ্চল্য জাগে। এরই মধ্যে ব্রিটেন সিদ্ধান্ত নেয়, তারা বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করবে, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বরণ করবে। বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নেন ফরেন অফিসের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা স্যার ইয়ান সাদারল্যান্ড। তিনি জানান, বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ব্রিটেনের ক্ল্যারিজেস হোটেলে নিয়ে যাওয়া হবে। সবচেয়ে দামি অতিথিশালা ক্ল্যারিজেস হোটেলের নাম শুনে বঙ্গবন্ধু কিছুটা নাখোশ হন। তিনি বলেন, ‘আমার দেশের মানুষ যেন স্বস্তিতে এসে দেখতে পারে এমন কোনো হোটেল হলে ভালো হয়।’ ফরেন অফিসের কর্মকর্তা বলেন, ‘স্যার! একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে, রাষ্ট্রীয় সম্মান হিসেবে আমরা আপনাকে ক্ল্যারিজেস হোটেলে নিচ্ছি।’ হোটেলে পৌঁছার কিছু সময়ের পর লেবার পার্টির তৎকালীন লিডার (পরে প্রধানমন্ত্রী) হ্যারল্ড উইলসন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। হ্যারল্ড উইলসন হচ্ছেন প্রথম কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সম্বোধন করেন। বঙ্গবন্ধুর দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে তার প্রথম উচ্চারিত বাক্য ছিল, ‘গুডমর্নিং মিস্টার প্রেসিডেন্ট’। দুপুরেই ক্ল্যারিজেস হোটেলে আয়োজন করা হয় এক সংবাদ সম্মেলনের। এটিই ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুর প্রথম প্রেস কনফারেন্স। এতে আবেগঘন ভাষায় প্রবল আত্মবিশ্বাসী স্বরে তিনি বললেন, ‘আমি কনডেম সেলে ফাঁসির অপেক্ষায় ছিলাম, বাঁচব কি মরব কিছুই জানতাম না, তবে জানতাম বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই।’ হোটেলের ভিতরে বক্তব্য দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু, বাইরে তখন হাজারো বাঙালির ভিড়। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত অভিজাত মেফেয়ার এলাকা। দলে দলে আসছে মানুষ। কীভাবে তারা খবর পেল, কে দিল খবর? কেউ কাউকে খবর দেয়নি, খবর উড়ে যায় কানে কানে, বাতাসের বেগে, এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। প্রচণ্ড শীত, মেঘ-বৃষ্টি সব উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয় তাদের প্রিয় বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্য। যিনি তাদের দিয়েছেন একটি পতাকা, একটি মানচিত্র। বাইরে ভিড়ের খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু হোটেলের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ান। সমবেত জনতার উদ্দেশে হাসিমুখে হাত নাড়েন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে স্লোগান ওঠে, ‘জয় বাংলা’। বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পেয়ে বহু প্রবাসী বাঙালির চোখে জল এসেছিল সেদিন। বিকাল ৫টার দিকে বঙ্গবন্ধু গেলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে। তাকে বরণ করে নিলেন কনজারভেটিভ পার্টির লিডার, প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ। দুই রাষ্ট্রনায়কের মধ্যে বৈঠক হলো আন্তরিক পরিবেশে। বৈঠকের একপর্যায়ে এডওয়ার্ড হিথ জিজ্ঞাস করলেন, ‘আপনাকে আর কী সহযোগিতা করতে পারি, বলুন।’ তত্ক্ষণাৎ বঙ্গবন্ধু উত্তর দিলেন, ‘আপনার প্লেনটা চাই, ওটা দিতে পারবেন, আমি খুব দ্রুত দেশে ফিরতে চাইছি।’ এডওয়ার্ড হিথ ব্যবস্থা নিলেন সঙ্গে সঙ্গে। বৈঠক চলার সময়ই নিশ্চিত হয়ে গেল ব্রিটিশ রাজকীয় কমেট জেট বিমানে করে ৯ জানুয়ারি সকাল ৭টায় বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেবেন জাতির জনক। বৈঠক শেষে ঘটে একটা অভাবনীয় ঘটনা। বিদায় নিয়ে যখন বঙ্গবন্ধু তার গাড়িতে উঠবেন তখন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ নিজে এগিয়ে এসে তাঁর জন্য গাড়ির দরজা খুলে দিলেন। দরজা ধরে তিনি ততক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ভিতরে গিয়ে না বসলেন। আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য, আর কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এমন সম্মান দেখাননি কখনো, কস্মিনকালেও। ঘটনা নিয়ে তখন প্রধানমন্ত্রী হিথের সমালোচনা করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু এক বাক্যে সেই সমালোচনাকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন হিথ। বলেছিলেন, ‘আমি যাকে সম্মান করেছি, তিনি হচ্ছেন একটি জাতির মুক্তিদাতা মহান বীর। তাঁকে এই সম্মান প্রদর্শন করতে পেরে বরং আমরাই সম্মানিত হয়েছি।’ সকাল হলেই বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পথ ধরবেন। তাকে স্বাগত জানাবে বলে অপেক্ষার প্রহর গুনছে ৭ কোটি মানুষ।

Picture

বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে গাইলেন, আমার সোনার বাংলা : ৯ জানুয়ারি, ১৯৭২। ভোর ৬টা। লন্ডন হিথরো বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে পৌঁছালেন বঙ্গবন্ধু। তাঁকে স্বাগত জানালেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিভাগের কর্মকর্তা ইয়ান সাদারল্যান্ড ও লন্ডনে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার আপা বি পন্থ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ করিয়ে দেন আপা বি পন্থ। ৩০ মিনিট ধরে চলে ইন্দিরা-মুজিব টেলিফোন আলাপচারিতা। ঘণ্টাখানেক পরে ইন্দিরা গান্ধী আবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন।

ইন্দিরা গান্ধীর সম্মতিতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশে যাত্রাপথে সহযাত্রী হলেন ব্রিটেনস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের তৎকালীন রাজনৈতিক কর্মকর্তা শশাঙ্ক ব্যানার্জি। সঙ্গে ছিলেন সে সময়ের ভারতীয় হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি ভেদ মারওয়া। আরও ছিলেন স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী হামিদা হোসেন।

বিমানে তাঁরা পাশাপাশি আসনে বসলেন। সামনের টেবিলে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় সুগন্ধময় এরিনমোর তামাক, আর সেই বিখ্যাত পাইপ। উত্ফুল্ল মুজিবের তখন দেশে ফেরার তর সইছে না।

আপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ।’ তিনি ধন্যবাদ জানালেন দীর্ঘদিন তাঁকে সহযোগিতার জন্য। বললেন, ‘ব্যানার্জি! এবার একটি বিশেষ সহযোগিতা চাই।’ শশাঙ্ক বললেন, ‘আয়ত্তের মধ্যে হলে অবশ্যই চেষ্টা করব।’ ধীর লয়ে মুজিব বললেন, ‘দিল্লিতে ইন্দিরার সঙ্গে বৈঠকের আগেই তাঁর কাছে একটি খবর পৌঁছানো দরকার। বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় মিত্রবাহিনী সদস্যদের ৩১ মার্চ, ১৯৭২ সালের মধ্যে ভারতে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি চূড়ান্ত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর এ বিষয়ে কথা হয়েছে। ভারতীয় মিত্রবাহিনী চলে গেলে বাংলাদেশ ব্রিটিশ সরকারের স্বীকৃতি পেতে আর কোনো বাধা থাকবে না।’

মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি নিয়ে বিমানটি আবার উড়তে শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধু জানালা দিয়ে শ্বেতশুভ্র সাদা মেঘের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর দাঁড়িয়ে গাইতে লাগলেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’। তাঁর চোখ ভরে উঠেছে জলে। তিনি বললেন, ‘ব্যানার্জি! আপনিও ধরুন। রিহার্সেল দিয়ে নিই।’ তাঁরা দুজনে মিলে গানটা গাইলেন। বঙ্গবন্ধু চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করে বললেন, ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আরও কঠোর সংগ্রাম অপেক্ষা করে আছে। বুকে শুধু একটাই বল, আমার দেশের আপামর মানুষ।’

শশাঙ্ককে অবাক করে দিয়ে বঙ্গবন্ধু হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘এ গানটি হবে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। কেমন হবে বলেন তো?’ শশাঙ্ক জবাব দিলেন, ‘ইতিহাসে তাহলে প্রথমবারের মতো দুটি দেশের জাতীয় সংগীতের লেখক হবেন একই ব্যক্তি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’

শশাঙ্ক ব্যানার্জি বললেন, ‘দিল্লি অবতরণের তখন আর সময় বেশি বাকি নেই। পাইলট আমাদের দুটি ছবি তুলে দিলেন। শেখ মুজিবের সঙ্গে তোলা সেই ঐতিহাসিক ছবিটি এখনো খুব যত্ন করে তুলে রেখেছি।’

দিল্লিতে শেখ মুজিবকে স্বাগত জানালেন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিংসহ আরও অনেকে। রাষ্ট্রপতি ভবনে বঙ্গবন্ধুর জন্য কলকাতা থেকে আনা গুড়ের সন্দেশ, সমুচা, শিঙ্গাড়া আর দার্জিলিং চা তাঁকে তৃপ্তি দিয়েছিল। মুজিব-ইন্দিরা বৈঠকে তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টি নিয়ে কথা হয়।

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। দুপুরে বিমান থেকে ঢাকায় নামলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জনস্রোত আর মানুষের স্লোগানে মুখরিত চারপাশ। সোচ্চার ধ্বনি উঠছে, ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘জয় মুক্তিযুদ্ধ’। বিমানবন্দর থেকে পল্টন ময়দান এক বিপুল জনসমুদ্র। শশাঙ্ক বলেন, ‘সে এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত, চারদিকে মুক্তি আর মহানেতাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। আজও চোখে লেগে আছে মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটি।’

তথ্যসূত্র : ‘বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তেরো ঘণ্টা’, লেখক : উজ্জ্বল দাশ, ‘বিলেতে বাংলার রাজনীতি’, লেখক : ফারুক আহমদ ও ‘বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’, লেখক : সাঈম চৌধুরী।


সর্বজনীন উৎসবে সাম্প্রদায়িক চর্চা!

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৮

Picture

গত বড়দিনে কি মনে করে ক্রিশমাস ডে লিখে গুগলে সার্চ করলাম। উইকিপিডিয়ায় ঢুকে বড়দিন সম্পর্কে পড়ছিলাম। বড়দিন উদযাপন করার পদ্ধতিতে গীর্জায় উপাসনার বিষয়টা দেখে একটু খটকা লাগল মনে। চিন্তাটাও যেন সামান্য থমকে গেল। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে আবোলতাবোল ভেবে শারদীয়া দুর্গাপূজা উদযাপনের পদ্ধতি সার্চ করে উইকিপিডিয়ায় ঢুকলাম। দেখি, মহাসপ্তমীতে সপ্তমিবিহিত পূজা। মহাষ্টমীতে মহাষ্টমীবিহিত পূজা। মহানবমীতে কুমারী পূজা, অর্ধরাত্রবিহিত পূজা ও মহাপূজা। বিজয়াদশমীতে বিসর্জনাঙ্গ পূজা। নাহ আর ভাবতে পারি না। চিন্তটা খুব দ্রুত  ঘুরে এলো মুসলমানদের ঈদে। হুম,এখানেও তো দুঈদে বিশেষ নিয়মে নামাজ আছে।

প্রতিটা ধর্মীয় উৎসবেই আরাধনা আছে যা একেক ধর্মে একেক নামে পরিচিত। চিন্তাটা ক্লান্ত হয়ে যায় আমার! ঈদ, পূজা, বড়দিন যে উৎসবগুলোকে সর্বজনীন বলে ভাবতে শুরু করেছি, প্রচার করছি সেখানে সাম্প্রদায়িক চর্চা? যে উৎসবগুলোতে সাম্প্রদায়িক চর্চা হয় সেগুলো সর্বজনীন হয় কীভাবে? কীভাবে এ উৎসবগুলোকে আমাদের দেশের বিদ্বান বুদ্ধিজীবী এবং বিদগ্ধ রাজনীতিবিদরা সর্বজনীন বলে মহা সমারোহে প্রচার করেন! অধিকন্তু আরো গভীরে বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, প্রতিটা ধর্মীয় উৎসব এই ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক বিজ্ঞাপন! মাথাটা ভো ভো করছে। আর ভাবতে পারছি না। এই ধর্মীয় উৎসবগুলো কোনভাবেই আমাদের বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, ভাষা দিবসের মতো সর্বজনীন হতে পারে না। ধর্মীয় উৎসব গুলো ওই ধর্মের অনুসারীদেরকেই উৎসর্গ করা। অন্যকারো জন্য না। বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।

ইলিয়াস আলমগীর: লেখক: কবি ও কলামিস্ট, কুবি,কুষ্টিয়া


শিক্ষিত স্বাবলম্বী নারীরাই ডিভোর্সের শীর্ষে

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৮

ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগের চেয়ে কর্মক্ষেত্রে নারীদের কাজ করার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় নারীরা সামাজিকতা ও লোকলজ্জার চেয়ে নিজের আত্মসম্মানকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। আর তাই সংসারে অশান্তি নিয়ে থাকার পরিবর্তে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তই বেশি নিচ্ছেন।

জানা গেছে, ঢাকায় গত এক দশকে বিবাহ বিচ্ছেদের হার আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এক্ষেত্রে বিচ্ছেদের বেশি আবেদন করছেন শিক্ষিত ও সাবলম্বী নারীরা। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দুই এলাকাতেই নারীরা বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য পুরুষের চেয়ে বেশি আবেদন করছেন।

জরিপের তথ্যে, বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করছেন ৭০ দশমিক ৮৫ ভাগ নারী আর পুরুষের হার মাত্র ২৯ দশমিক ১৫ ভাগ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৬ সালে যেখানে বাংলাদেশে প্রতি হাজারে বিচ্ছেদের হার ছিল দশমিক ৬ জন। বর্তমানে এই হার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে এক দশমিক এক জন। বিচ্ছেদের আবেদনকারীদের মধ্যে যারা উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন তারা হাজারে এক দশমিক ৭ জন বিচ্ছেদের আবেদন করেন। আর অশিক্ষিতদের মধ্যে এই হার হাজারে শূন্য দশমিক ৫।

রাজধানীর গত পাঁচ বছরের বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত শালিসি পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পাঁচ বছরে রাজধানীতে তালাকের মোট আবেদনের ৬৬ দশমিক ১৬ শতাংশ স্ত্রী এবং ৩৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ স্বামীর পক্ষ থেকে করা হয়েছে।

Picture

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্যে, চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত তালাকের নোটিস পাওয়া গেছে ১৯৮টি। এর মধ্যে নারীরা দিয়েছেন ১৪২টি নোটিস।

উত্তর সিটি করপোরেশনও তাদের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানায়, নারীদের তালাক দেওয়ার হার পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি। পেশাগত উন্নয়ন, আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা আগের চেয়ে বেশি সচেতন। নারীরা লোকলজ্জার ভয়ে এখন আর আপস করছেন না। বরং অশান্তি এড়াতে বিচ্ছেদের আবেদন করছেন।  

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আইন বিভাগের কর্মকর্তা এস এম মাসুদুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সামাজিক জটিলতার জন্য সমাজে বিচ্ছেদের ঘটনা এক দশকে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে সন্তানের মঙ্গল ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ রোধে বিচ্ছেদে যাওয়ার মধ্যে নেতিবাচক কিছু নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকায় একজন নারী এখন তার পরিবারকেও আর্থিক সহায়তা করতে পারছে। পারিবারিক বন্ধনের চেয়ে অনেক নারী নিজের পেশা জীবনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। আর মনস্তাত্ত্ব্বিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ফলে নারী নিজেই এখন বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।