Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

আমাদের সুন্দরবন একটিই, কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরো বিকল্প আছে - হাজী আনোয়ার হোসেন লিটন

সোমবার, ১৮ জুলাই ২০১৬

‘ভারত হেভি ইলেকট্রিক লিমিটেড—ভেল’ এবং রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম-অংশীদার ‘ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার কোম্পানির (এনটিপিসি)’ বাংলাদেশের বুকে সর্বনাশের পথটি খুলছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম-অংশীদার ‘ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার কোম্পানির (এনটিপিসি)’ কে ভারতের আদালত ভারতে এমন ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রকল্প করতে দেয়নি , নিষিদ্ধ করেছে । কিন্তু সেই নিষিদ্ধ প্রকল্প বাংলাদেশের সুন্দরবনে হচ্ছে।

কয়লাভিত্তিক প্রকল্প বন্ধ করেছে ভারত। রামপালের এই প্রকল্প ভারতে নিষিদ্ধ কেন ?

২০০৭ সালে ভারতের রাজীব গান্ধী ন্যশনাল পার্ক থেকে ২০ কিমি দূরে ১০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার পরিকল্পনা করে, কিন্তু জনগনের বিরোধিতার কারনে ২০০৮ সালে এই প্রকল্প বাতিল করতে বাধ্য হয় ভারত সরকার।

" দ্য হিন্দু, ৮ অক্টোবর ২০১০ সালের খবরের শিরোনাম ছিল - ভারতের এনটিপিসি তার নিজ দেশ ভারতের মধ্যপ্রদেশে ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়ে সরাসরি এবং তদন্তের বিশ্লেষণে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল (NTPC's coal-based project in MP turned down অর্থাৎ " এনটিপিসি'র কয়লা ভিত্তিক প্রকল্প বাতিল।

কৃষি ও পরিবেশগত সমস্যা হবে, সে কারণেই ভারত সরকার এনটিপিসির প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। ২০০৭ সালে রাজীব গান্ধী ন্যশনাল পার্ক থেকে ২০ কিমি দূরে ১০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার পরিকল্পনা করে, কিন্তু জনগনের বিরোধিতার কারনে ২০০৮ সালে এই প্রকল্প বাতিল করতে বাধ্য হয় ভারত সরকার। এরপর ও বাংলাদেশের কেন এই প্রকল্প বাংলাদেশের জনগণকে বুঝে না ?

১২ জুলাই ২০১৬, রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নামে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ চুক্তি সই হয়।

গত মঙ্গলবার রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নামে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ চুক্তি সই হয়। চুক্তিতে সই করেন বিআইএফপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক উজ্জ্বল কান্তি ভট্টাচার্য ও নির্মাণ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভারত হেভি ইলেকট্রিক লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক প্রেমলাল যাদব।

বাংলাদেশেরও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে

এই এলাকায় জীববৈচিত্রে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। মানুষ , প্রাণীদের শ্বাস রোগ , ক্যান্সার হয়। ঠিকমতো বৃষ্টি হয় না, ফসল হয় না। বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিকে কেন্দ্র করে বিশাল এলাকা নিয়ে স্থায়ী ধোঁয়ার আস্তরণ তৈরি হয়। ৫০০ মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বার্ষিক ৩৭ লক্ষ টন কার্বন নির্গত হয় যা ১৬ কোটি গাছ কেটে ফেলার সমান।

বার্ষিক ৩৭ লক্ষ টন কার্বন নির্গত হলে বাংলাদেশের কি হবে কেউ কি চিন্তা করবেন না ?

আমরা দলীয় রাজনৈতিক হীন মানসিকতার জন্য এই চুক্তির বিরোধীতা করছি না। দেশ রক্ষার জন্য এই চুক্তির বিরোধীতা করছি , করে যাবো। ভাড়াটে বিজ্ঞানী - সুশীল বুদ্ধিজীবীদের বেতন বড় নাকি দেশের ধ্বংস কামনা বড় ?

Picture

ক্ষতিকর সালফার ও নাইট্রোজেন গ্যাস:
ইআইএ রিপোর্ট অনুসারে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড(SO2)  ও  ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড(NO2) নির্গত হবে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই এই বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস সুন্দরবনের বাতাসে SO2  ও NO2 এর ঘনত্ব বর্তমান ঘনত্বের তুলনায় কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়ে গোটা সুন্দরবন ধ্বংস করবে। কিন্তু রিপোর্টে এর মাত্রা পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৭ নির্ধারিত সীমার মধ্যে দেখানোর জন্য ইআইএ রিপোর্টে একটা জালিয়াতি আশ্রয় নেয়া হয়েছে- পরিবেশগত ‘স্পর্শকাতর’ এলাকার মানদন্ডের বদলে সুন্দরবনের জন্য ‘আবাসিক ও গ্রাম’ এলাকার মানদন্ড বেছে নেয়া হয়েছে!
ইআইএ রিপোর্ট অনুসারে:
“The concentration of SO2 in the ambient air near Sundarbans region is found 8 to 10 μg/m3
(field monitoring data, see Table 6.5). Hence, it is found that the resultant concentration (24
hr average after emission contribution and only during November to February) from the
power plant) of SO2 in the ambient air may be maximum 53.4 μg/m3 (see Table 8.3c) which
is much below the MOEF’s standard (ECR 1997), 80 μg/m3 for residential and rural area.
Therefore, the concentration of emitted SO2 is very insignificant to have any impact on Air
quality of Sundarbans.”(ইআ্‌ইএ, পৃষ্ঠা ২৭৮)
 
অর্থাৎ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত SO2 এর কারণে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়ে সুন্দরবনের বাতাসে SO2 এর ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৮ মাইক্রোগ্রাম থেকে বেড়ে ৫৩.৪ মাইক্রোগ্রাম হবে যা পরিবেশ আইন ১৯৯৭ (ECR 1997) অনুযায়ী আবাসিক ও গ্রাম্য (residential and rural) এলাকার জন্য নির্ধারিত মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৮০  মাইক্রোগ্রাম এর থেকে অনেক কম।
একই ভাবে সুন্দরবন এলাকার NO2 এর ঘনত্ব ১৬ মাইক্রোগ্রাম  তিনগুণ বেড়ে থেকে ৫১.২ মাইক্রোগ্রাম হলেও তা নিরাপদ মাত্রার মধ্যেই থাকবে বলে দাবী করা হয়েছে।
 
কিন্তু প্রশ্ন হলো সুন্দরবন কি আবাসিক বা গ্রাম এলাকা, নাকি পরিবেশ গত ভাবে স্পর্শকাতর একটি এলাকা?তাহলে  সুন্দরবন এর মতো পরিবেশগত স্পর্শকাতর একটি এলাকার মানদন্ড হিসেবে আবাসিক ও গ্রাম এলাকার জন্য নির্ধারত মানদন্ড বেছে নেয়া হলো কেন? পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৭ ঘাটতেই কারণটা বোঝা গেল। এই আইন অনুসারে পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকার বাতাসে SO2  ও NO2 এর ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৩০ মাইক্রোগ্রাম(৩০ μg/m3) এর চেয়ে বেশি থাকা যাবে না। যেহেতু পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকার জন্য নির্ধারিত মানদন্ডের(৩০ μg/m3)  সাথে তুলনা করলে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প কোনভাবেই জায়েজ করা যাবে না সেজন্য পরিকল্পিত ভাবেই পুরো রিপোর্ট জুড়ে সুন্দরবনের বাতাসে বিষাক্ত গ্যাসের ঘনত্বের  মানদন্ড হিসেবে আবাসিক ও গ্রাম এলাকার জন্য নির্ধারিত মানদন্ডকে ব্যাবহার করা হয়েছে!
 
 কার্বন ডাই অক্সাইড এর প্রভাব:
 প্রস্তাবিত কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যাবহারে ঢাক ঢোল পেটানো হচ্ছে যদিও ইআইএ রিপোর্ট অনুসারে এই প্রযুক্তি ব্যাবহারের ফলে সাধারণ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশ কার্বন ডাই অক্সাইড কর্ম নির্গত হবে।  এবং ৮০% লোড ফ্যাক্টর ধরে প্রতিবছর কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমণের পরিমাণ হবে ৭৯ লক্ষ টন সুন্দরবনের পরিবেশের উপর যার সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে একটা কথাও বলা হয় নি ইআইএ রিপোর্টে! কেবল আশ্বস্ত করা হয়েছে বাংলাদেশের সার্বিক কার্বন নির্গমণের পরিমাণ এর ফলে নাকি খুব বেশি বাড়বে না!(পৃষ্ঠা ২৮৪)
 
পশুর নদী থেকে পানি প্রত্যাহার:
ইআইএ রিপোর্ট অনুসারে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যাবহারের জন্য পশুর নদী থেকে প্রতি ঘন্টায় ৯১৫০ ঘনমিটার করে পানি প্রত্যাহার করা হবে।  কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে শীতলিকরণ সহ বিভিন্ন কাজে ব্যাবহারের পর অবশিষ্ট পানি পরিশোধন করে ঘন্টায় ৫১৫০ ঘনমিটার হারে আবার নদীতে ফেরত দেয়া হবে। ফলে নদী থেকে প্রতি ঘন্টায় কার্যকর পানি প্রত্যাহারের পরিমাণ হবে ৪০০০ ঘনমিটার। ইআইএ  রিপোর্টে এভাবে পশুর নদী থেকে ঘন্টায় ৪০০০ মিটার পানি প্রত্যাহারের ফলে পানির লবণাক্ততা, নদীর পলি প্রবাহ, প্লাবন , জোয়ার ভাটা, মাছ সহ নদীর উদ্ভিদ ও প্রাণী জগৎ ইত্যাদির উপর কেমন প্রভাব পড়বে তার কোন বিশ্লেষণ করা হয়নি এই যুক্তিতে যে ৪০০০ ঘনমিটার পানি পশুর নদীর শুকনো মৌসুমের মোট পানি প্রবাহের ১ শতাংশেরও কম। দুর্ভাবনার বিষয় হলো, প্রত্যাহার করা পানির পরিমাণ ১ শতাংশেরও কম দেখানোর জন্য পানি প্রবাহের যে তথ্য ব্যাবহার করা হয়েছে তা সাম্প্রতিক সময়ের নয়, ৮ বছর আগে, ২০০৫ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ণ বোর্ড কর্তৃক সংগ্রহীত। (পৃষ্ঠা ২৮৫) অথচ এই ইআইএ রিপোর্টেই স্বীকার করা হয়েছে, নদীর উজানে শিল্প, কৃষি, গৃহস্থালি সহ বিভিন্ন উন্নয়ণ কর্মকান্ড ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে নদী থেকে দিনে দিনে পানি প্রত্যাহারের পরিমাণ বাড়ছে যার ফলে শুকনো মৌসুমে দিন দিন পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে যা পশুর নদীর জন্যও একটি চিন্তার বিষয়।(পৃষ্ঠা ২৫০)।  বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের সময় লাগবে সাড়ে ৪ বছর এবং অপারেশনে থাকবে অন্তত ২৫ বছর। তাহলে এই দীর্ঘ সময় কাল জুড়ে পশুর নদীর পানি প্রবাহ ইআইএ রিপোর্ট অনুসারেই ২০০৫ সালের অনুরুপ থাকার কথা না। ফলে ঐ সময়ে পশুর নদী থেকে ঘন্টায় ৪ হাজার মিটার পানি প্রত্যাহার করলে তা পশুর নদীর পানি প্রবাহের উপর কি কি প্রভাব ফেলবে তার গভীর পর্যালোচনা ছাড়া  স্রেফ নদীর হাইড্রোলজিক্যাল বৈশিষ্টের কোন পরিবর্তন নাও হতে পারে(may not be changed) জাতীয় কথাবার্তা বলে পার পাওয়ার কোন সুযোগ নেই।

সুন্দরবন চাই?

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে লেখার প্রয়োজন আছে কি ?

আমরা বিরোধীতা করি অসম চুক্তির।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প চলাকালীন সমস্যাবলি: ইআইএ প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৩২০ মেগাওয়াটের এই প্রকল্পের জন্য বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পোড়ানো হবে। আমরা জানি অ্যাভোগ্রেডোর প্রকল্প অনুযায়ী ১ টন কয়লা পুড়লে ২ দশমিক ৮৬ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়। সেই হিসাবে এই প্রকল্প ৮০ শতাংশ লোড ফ্যাক্টরে উৎপাদন করলেও বছরে ১ কোটি ৮ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হওয়ার হথা। যদিও প্রতিবেদনে সুপার ক্রিটিক্যাল পদ্ধতি ব্যবহার করায় উদ্যোক্তাদের হিসাব মতেই ৭৯ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন করে বাকি কার্বন ফ্লাই অ্যাশে যোগ হবে বলে ধারণা দেয়া হয়েছে। যদি উদ্যোক্তাদের হিসাবই সঠিক বলে ধরে নেয়া হয়, তারপরও প্রশ্ন হচ্ছে, ৭৯ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড কী কম ক্ষতিকর! যত উঁচু চিমনিই ব্যবহার করা হোক না কেন বাতাসের চেয়ে ভারী এই গ্যাস তো এই দেশেই ফিরে আসবে, ফিরে আসবে সুন্দরবনের বুকে।

এছাড়াও বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইড (বছরে ৫১ হাজার ৮৩০ টন) ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড (বছরে ৩১ হাজার ২৫ টন) নির্গত হবে। বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস সুন্দরবনের বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব বর্তমান ঘনত্বের তুলনায় কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়ে গোটা সুন্দরবন ধ্বংস করবে। অথচ ইআইএ প্রতিবেদনে এই মাত্রা ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৭’-এর নির্ধারিত সীমার মধ্যে দেখানোর জন্য জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সুন্দরবনের জন্য পরিবেশগত ‘স্পর্শকাতর’ এলাকার মানদণ্ড ব্যবহার করার কথা থাকলেও প্রতিবেদনে সুন্দরবনের জন্য ‘আবাসিক ও গ্রাম’ এলাকার মানদণ্ড দেখানো হয়েছে!

প্রশ্ন হচ্ছে, সুন্দরবন কি আবাসিক বা গ্রাম এলাকা, নাকি পরিবেশগতভাবে স্পর্শকাতর একটি সংরক্ষিত বন? তাহলে সুন্দরবনের মতো পরিবেশগত স্পর্শকাতর একটি এলাকার জন্য মানদণ্ড হিসেবে আবাসিক ও গ্রাম এলাকার জন্য নির্ধারত মানদণ্ড বেছে নেয়া হলো কেন? এর কারণ ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৭’ অনুযায়ী পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকার বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৩০ মাইক্রোগ্রামের বেশি হতে পারবে না। অথচ ইআইএ প্রতিবেদন অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি সময়ে ৫৪ মাইক্রোগ্রাম হবে। এই অগ্রহণযোগ্য মাত্রাকে বৈধতা দেয়ার জন্যই ইআইএ প্রতিবেদনে সুন্দরবনকে ‘আবাসিক ও গ্রাম’ এলাকা দেখিয়ে তার জন্য নির্ধারিত মাত্রা ৮০ মাইক্রোগ্রামের চেয়ে কম ঘনত্ব দেখানো হয়েছে।

ইআইএ প্রতিবেদন অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘোরানো ও শীতলীকরণসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য পশুর নদী থেকে ঘণ্টায় ৯১৫০ ঘনমিটার করে পানি প্রত্যাহার করা হবে এবং ব্যবহারের পর অবশিষ্ট পানি পরিশোধন করে ঘণ্টায় ৫১৫০ ঘনমিটার হারে আবার নদীতে ফেরত দেয়া হবে। ফলে নদী থেকে প্রতি ঘণ্টায় কার্যকর পানি প্রত্যাহারের পরিমাণ হবে ৪০০০ ঘনমিটার। এই পানি প্রত্যাহারের কারণে নদীর নিম্নপ্রবাহে সুন্দরবন এলাকায় পানির লবণাক্ততা, নদীর পলি প্রবাহ, প্লাবন, জোয়ার-ভাটা, মাছসহ নদীর উদ্ভিদ ও প্রাণী জগৎ ও বাস্তুব্যবস্থার ওপর কেমন প্রভাব পড়বে তার কোনো বিশ্লেষণ করা হয়নি। এর পেছনে তাদের যুক্তি হচ্ছে, ৪০০০ ঘনমিটার পানি পশুর নদীর শুকনো মওসুমের মোট পানি প্রবাহের ১ শতাংশেরও কম। এখানে যে ফাঁকিটা দেয়া হয়েছে সেটি হচ্ছে, পানি প্রবাহের ডাটা ২০০৫ সালের। এর মধ্যে উজানে ভারতীয় এলাকায় বাঁধের কারণে পশুর নদীর উৎস নদীতে যেমন পানির সরবরাহ কমেছে, তেমনি বেড়েছে শিল্প ও গৃহস্থালি কাজে পানির ব্যবহার। প্রকল্প চলাকালীন পরবর্তী ২৫-৩০ বছরে যে এই চাহিদা আরো বাড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, ইআইএ প্রতিবেদনে পানি পরিশোধনের কথা বলা হলেও ‘শূন্য নির্গমন’-এর (জিরো ডিসচার্জ) বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পানি নির্গমন হলে তাতে বিভিন্ন মাত্রায় দূষণকারী উপাদান থাকে। যে কারণে পৃথিবীর সব দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে ‘শূন্য নির্গমন’ নীতি অবলম্বন করা হয়। এমনকি এনটিপিসি রামপালে ‘শূন্য নির্গমন’ নীতি অনুসরণ না করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে, সেই এনটিপিসিই যখন ভারতের ছত্তিশগড়ে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করার প্রস্তাব দিয়েছিল, তখন ‘শূন্য নির্গমন’ নীতি অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতার বিষয়টি ভারতের ইআইএ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। সর্বোপরি এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত ঘণ্টায় ৫১৫০ ঘনমিটার পানি পশুর নদীর জলজ পরিবেশের তাপমাত্রা, পানি নির্গমনের গতি, পানিতে দ্রবীভূত নানান উপাদান বিভিন্ন মাত্রায় পরিবর্তন করবে, যা সংশ্লিষ্ট পুরো সুন্দরবন এলাকার পরিবেশের জন্য ধ্বংসকারী প্রভাব সৃষ্টি করবে।

alt


আমাদের সুন্দরবন একটিই, কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরো বিকল্প আছে। কিন্তু গায়ের জোরে চুক্তি করে সুন্দর বন কে হত্যা করা হচ্ছে না , হত্যা করা হচ্ছে সবুজ বাংলাদেশকে।

ভারত শুধু সুন্দরবন না যেকোনও বনাঞ্চলের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে পারে না। অথচ বাংলাদেশে এসে সুন্দরবনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে।

জীবিকার জন্য সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল প্রায় কয়েক লাখ মানুষ।ছোট-বড় বহু শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট নদী-খাল দিয়ে বিভক্ত দ্বীপমণ্ডলীর সমষ্টি এই বন ধ্বংস হবে , সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে।

সরকারের পরিবেশ সমীক্ষা অনুযায়ী রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে প্রতিদিন ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইড, ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড নির্গত হবে। বছরে ৯ লাখ টন অত্যন্ত ক্ষতিকর বিষাক্ত ছাই বাতাসে মিশবে। পরিবেশ জন্যে ভয়ঙ্কর ক্ষতির কারণ বিষাক্ত কার্বন-সালফার-নাইট্রোজেন, ধোঁয়া-ছাই মিশ্রিত বিষাক্ত ধোয়া।

সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে কয়লা পরিবহনের জন্য জাহাজ চলবে। শব্দ ও আলোক দূষণ হবে। এই বিষাক্ত জিনিসগুলো যাবে কোথায়?

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইড (বছরে ৫১ হাজার ৮৩০ টন) এবং ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ( প্রতি বছরে ৩১ হাজার ২৫ টন) নির্গত হবে। এই বিশাল পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব তখনকার চেয়ে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেবে। ফলে ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে সুন্দরবনের প্রাণ ও পরিবেশ।এর কুফল সাগর এলাকার মানুষ থেকে শুরু করে সারা বাংলাদেশের জনগণকে ভুগতে হবে।
প্রকৃতিকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া উচিত। সুন্দরবন হলো এ দেশের মানুষের জন্য আল্লাহর আশীর্বাদ। সুনামী আর আইলার কথা মনে আছে? ২০০৭ সালের ১৮ নভেম্বর প্রলয়ংঙ্করী সুনামী আর ২০০৯ সালের ২৫ মে ভয়াবহ আইলা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হেনেছিল। সেই সুনামী আর আইলায় বঙ্গোপসাগরের আশপাশের কয়েকটি জেলায় শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ফসলের ব্যাপক ক্ষতি ও হাজার হাজার গবাদি পশু-পাখি সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। ধ্বংস হয়েছে শত শত কোটি টাকার সম্পদ। বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকটি জেলা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা জেলার লাখ লাখ মানুষ ওই ধ্বংসলীলা থেকে বেছে গেছে শুধু সুন্দরবনের কারণে। সুন্দরবন ঢাল হিসেবে ওইসব জেলার লাখ লাখ মানুষের নিরাপত্তা দিয়েছে। সেই সুন্দরবনকে ধ্বংস করার ভারতীয় চক্রান্তের ফাঁদে পা দেয়ায় সুলতানা কামালসহ দেশের বিবেকবান মানুষের বিবেক কাঁদছে। সুন্দরবন রক্ষায় রামপালে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। কয়েক দফায় ঢাকা থেকে রামপাল লংমার্চ, রোড মার্চ হয়েছে। সারাদেশে প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানববন্ধন করে উন্নয়নের নামে সুন্দরবন ধ্বংসের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ৫ বছরের শিশু থেকে শুরু করে শত বছরের বৃদ্ধ পর্যন্ত ওইসব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। সরকারের তল্পীবাহক হিসেবে পরিচিত বুদ্ধিজীবীদের বড় একটা অংশ এ দাবি সমর্থন করছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা! ২০১৪ সালে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবে সুন্দরবনের শ্যালা নদীর কয়েক কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে জ্বালানি তেল। নদীর জোয়ার-ভাটার টানে তেলের বিস্তার ঘটে কয়েক কিলোমিটার। সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীর মৃগমারী এলাকায় তলা ফেটে একটি তেলবাহী ট্যাংকার ডুবে যাওয়ায় এই বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। ট্যাংকার ডুবির পর তেল বিস্তীর্ণ এলাকা ছড়িয়ে পড়ায় পরিবেশ প্রকৃতির বিপর্যয় ঘটে। অসংখ্য পশুপাখি, মাছ কুমির প্রাণ হারায়। সে তেল তোলার জন্য কয়েক দিন শত শত মানুষ কাজ করে। এ খবর সংগ্রহে দেশি ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সাড়া পড়ে যায়। ওই জাহাজ ডুবিতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যসহ পানিতে থাকা প্রাণীর অপূরণীয় ক্ষতি হয়। গত দুই বছরে সুন্দরবনের আশপাশের নদ-নদীতে তেল নিয়ে ট্যাঙ্কার এবং কার্গো জাহাজ ডুবেছে অন্তত ৫ বার। এতে ধ্বংস হয়েছে ইরাবতি ডলফিনসহ নদীর বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এবং বনের জীববৈচিত্র্য। রামপালে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করলে ভারত থেকে কয়লা আনা-নেয়া করা হবে ওই নদী পথেই। তখন বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকানো যাবে কি? দেশে যখন ‘রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হলে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে’ তোলপাড় শুরু; পরিবেশবিদ, মানবাধিকার কর্মী, ভূগোলবিদরা রাস্তায় নামেন। তখন বিদেশি বিশেষজ্ঞরাও সুন্দরবন সফর করে এ নিয়ে ‘পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর’ সার্টিফিকেট দেন; তখন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর আমন্ত্রণে তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের প্রতিনিধিরা গত বছরের ১৯ নভেম্বর রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প ও তৎসংলগ্ন সুন্দরবন এলাকা পরিদর্শন করেন। এই প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ছিলেন স্বনামধন্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, হাসান আজিজুল হক, সুলতানা কামাল, সৈয়দ আবুল মকসুদ, রাশেদা কে চৌধুরী, ড. ইফতেখারুজ্জামান, বদরুল ইমাম, অধ্যাপক এম এম আকাশ, শফিক উজ জামান, এম শামসুল আলম, খুশী কবির, আবদুল মতিন, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, অধ্যাপক মলয় ভৌমিক প্রমুখ। ঘুরে এসে তারা একটি প্রতিবেদন তুলে ধরেন। তাদের প্রতিবেদনে বলা হ মানুষের আগ্রাসনে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। নির্মাণাধীন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সেই আগ্রাসনে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে এবং সুন্দরবনের জন্য হুমকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রামপালে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হলে কারখানার নির্গত কার্বন ও ছাইভস্মে আশপাশের বায়ু ও পানি দূষণ করবে।

২০০৮ সালে জাতিসংঘের একটি রিপোর্টে দেখা যায় - ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিলে ইউক্রেনের চেরনোবিলে অবস্থিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিস্ফোরণ ও পরবর্তী অগ্নিকান্ডে বিপুল পরিমাণে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বাতাসে মিশে পশ্চিম সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ইউরোপের বিরাট অংশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে।

ভয়াবহ বিপর্যয় ঠেকাতে প্রায় ১৮ বিলিয়ন সোভিয়েত কারেন্সি ব্যয় হয়। তখনকার সোভিয়েত সরকারের মান বজায় রাখতে কত ব্যাক্তি নিহত হয়েছিলেন তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব আজ পর্যন্ত প্রকাশ হয়নি।

১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিলে ইউক্রেনের চেরনোবিলে অবস্থিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিস্ফোরণ সহ বিপর্যয়ের ফলে এখনো ক্যান্সার ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মতো তেজস্ক্রিয়তার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবে আক্রান্ত মানুষকে এখনো সনাক্ত হচ্ছেন এমনকি এখনো বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নিচ্ছে।

বাংলাদেশের বুকে প্রতিবছর প্রাকৃতিক বন্যা , ঝড় তুফান হয়। সিডরের আক্রমণের কথা কি বাংলাদেশ ভুলে গেলো ?

 দ্রুত শিল্পায়ন ও অগ্রগতির এই যুগে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু সে কারণে পরিবেশ ধ্বংস করে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে যদি বিকল্প কোনো উপায় থাকে, তাহলে আমাদের সেটাই প্রথমে চেষ্টা করা উচিত। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে আমাদের সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো প্রায় সবই তাপ-বিদ্যুৎকেন্দ্র। অর্থাৎ সেখানে মূল্যবান গ্যাস পুড়িয়ে পানিকে বাষ্পে রূপান্তর করে সেই বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এসব কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি গ্যাস খরচ ১ দশমিক ৭০ টাকা থেকে ৩ দশমিক ২৮ টাকা পর্যন্ত; সার্বিক উৎপাদন খরচ আরো বেশি। ফলে এই কেন্দ্রগুলো লোকসান দিয়ে বিদ্যুৎ বিক্রি করে। অন্যদিকে বেসরকারি পর্যায়ে ৪ মেগাওয়াটের জেনারেটর বিশিষ্ট ছোট ছোট গ্যাস জেনারেটর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ইউনিট প্রতি গ্যাস খরচ মাত্র শূন্য দশমিক ৭ টাকা এবং সার্বিক উৎপাদন খরচ প্রায় ১ দশমিক ৭৫ টাকা। এরা পিডিবির কাছে ৩ দশমিক ২৬ টাকা প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করেও মুনাফা করছে।

আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বড় বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, এগুলো চালু থাকলে যত লোকসান হয়, বন্ধ থাকলে তার চেয়ে কম লোকসান হয়। এ অবস্থায় গ্যাসে পরিচালিত বড় বড় তাপ-বিদ্যুৎকেন্দ্রের বদলে অনেক ছোট ছোট গ্যাস জেনারেটর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করলে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাস দিয়েই দেশের চাহিদা মেটানোর মতো বিদ্যুৎ আরো কম খরচে ও বিনা লোকসানে দেয়া সম্ভব হবে। তাছাড়া এই ছোট ছোট (মাত্র ৪ মেগাওয়াট) জেনারেটরগুলোর একটি ইউনিট নষ্ট হলেও তার রক্ষণাবেক্ষণ যেমন সহজ, তেমনি এর ফলে পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রভাব হয় খুবই নগণ্য।

জাপানে ২০১১ সালের ১১ মার্চ তারিখে ভূমিকম্প স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প ও এর ফলে সৃষ্ট সুনামির (সামুদ্রিক জ্বলোচ্ছ্বাস) কারণে জাপানের ফুকুশিমায় অবস্থিত দুটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটিতে শীতলীকরণ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ফলে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। এ দুর্ঘটনায় তাৎক্ষনিকভাবে হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও তেজস্ক্রিয়তার আক্রমন থেকে জাপানি জনগণকে রক্ষা করতে জাপান সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশেপাশে ৮০ কিলোমিটার এলাকা থেকে সকল নাগরিককে সরিয়ে নেয় এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ঐ সময় বন্ধ করে দেয়, ২০১৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ ছিল।যেখানে জাপান পারেনি , সেই অবস্থায় বাংলাদেশ ? একটি রানা প্লাজার বিপর্যয় থেকে জনগণকে রক্ষা করতে জনগণ নিজ যুদ্ধেই নিজেকে নামতে হয়। কিন্তু পারমাণবিক চুল্লি ?

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফায়েত্তি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৩০ হাজার টন সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত হতো তার ফলাফল হলো যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের হাইওয়ে ২১ এর ৪৮ কিমি এলাকা জুড়ে গাছ ধ্বংস হয়েছে।

যারা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশের ক্ষতি করবে না , বলছেনঃ তাদের যুক্তি জাতির জন্য মঙ্গলজনক ?

তারা বলছেন - রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের ক্ষতি হবে না, বাতাস সুন্দরবনের দিকে যাবে না।

আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল’ প্রযুক্তি ব্যবহার করব, কোনও দূষণ হবে না, সুন্দরবনের ক্ষতি হবে ন।

সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে কয়লা পরিবহনের জন্য জাহাজ চলবে। ঐ সব জাহাজ মোড়ানো থাকবে।

বর্তমান আওয়ামীলীগের সরকারের একজন উপদেষ্টা ( জ্বালানি ) বলেছেন - প্রয়োজনে বাংলাদেশে কৃত্তিম সুন্দরবন করা যাবে !!!!!

জাহাজে আনা কয়লা এমনভাবে ঢেকে আনা হবে, যা সুন্দরবনের ভেতরে নদীতে পড়বে না। বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে করে।

আরো কত এই সেই যুক্তি।

যা সম্পূর্ণ ‘অসত্য’ এবং বাস্তবতা বিবর্জিত কথা।

রামপালের চুক্তিতে লোকানোর জন্য অতি সরল ব্যাখ্যা জাতিকে জানানো হয়নি।

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২০১ কোটি ডলার।এর মধ্যে সন্নিবেশিত ব্যয় ও যোগ হতে পারে। মোট ব্যয় ডলার হিসাবে ৭০ শতাংশ ব্যাংক ঋণ নেয়া হবে,(৭০ ভাগ ঋণের সুদ টানা এবং সকল ঋণ পরিশোধ করার দায়িত্ব বাংলাদেশের)। ১৫ শতাংশ অর্থ দেবে পিডিবি এবং বাকি ১৫ শতাংশ দেবে ভারতের এনটিপিসি।

আরো ভয়াবহ দিকটি ও জাতিকে বলা হচ্ছে না -

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রকল্পের জন্য পুরো ব্যবহারের জন্য জমি, অবকাঠামোগত বিনা মাশুলে বিভিন্ন কিছু, সব সরবরাহ করবে বাংলাদেশ।

লাভ-লোকসানের হিসাব করলে দেখা যায়, রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পেতে বাংলাদেশকে বড়সড় মাশুল গুনতে হবে। নির্মাণ সম্পন্ন হলে প্রকল্পটির প্রায় ৮৫ ভাগ মালিকানা থাকবে ভারতের হাতে । এ প্রকল্পের জন্য ভারতের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে (বড়পুকুরিয়ার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দামে) কয়লা কিনতে হবে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে বেশি খরচ হবে। তাছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে এমন চুক্তি হলো, যাতে কোনোধরনের কর ছাড়াই অন্যপক্ষ লাভ নিতে পারবে। মোটকথা অর্থনৈতিক দিক থেকে এ প্রকল্প আমাদের জন্য মোটেই লাভজনক হবে না।

অথচ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির মালিকানা ভারতের হাতে। অবাক হচ্ছেন ? না সহজ হিসাব। মাত্র ১৫ শতাংশ বিনিয়োগ করে ভারত হর্তাকর্তা , এককালীন মালিকানা। তাছাড়া এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনতে হবে বাংলাদেশের পিডিবিকে। সার্বিক খরচের পর যে নীট লাভ হবে, তার অর্ধেক নিয়ে নেবে ভারত অর্থাৎ লাভ ৫০% ভারত , ৫০ % বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী কয়লা আমদানির দায়িত্ব বাংলাদেশের এবং ক্ষয়ক্ষতির দায় বহন করতে হবে বাংলাদেশেরই। এরপর কি বলবেন ?

পরিবহনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় কিছু দিন পূর্বে এক লাখ ব্যারেল তেল পড়েও তো সুন্দরবনের ক্ষতি হলো। জনগণ তুলে নিলো , মাছ , পাখি , বন ধ্বংস হলো। যদিও তখন আপওয়ামীলীগের নেতার শ্যালক জড়িত থাকায় কেউ আর কিছু বলেন নাই। সামান্য কি তাদের দেশ প্রেম আছে ?

সংবাদ সম্মেলন করে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেছেন, সুন্দরবনের সর্বনাশ করে ভারতের স্বার্থে রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ যত এগোবে, বাংলাদেশের মানুষের ভারতের প্রতি ক্ষোভ-ঘৃণা তত বাড়বে। বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের জনগণকে সুন্দরবন রক্ষায় এই প্রকল্প বাতিলে মাঠে নামতে হবে। প্রকল্পের নির্মাণ কাজ ভারতের স্বার্থে হচ্ছে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ, এমনকি আওয়ামী লীগের অধিকাংশ সমর্থক এই প্রকল্পের পক্ষে নয়। সরকার দাবি করছে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। আন্দোলনকারীসহ দেশের কোটি কোটি মানুষ বলছে ভারতের স্বার্থেই সুন্দরবনকে ধ্বংস করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। প্রশ্ন হলো কার বক্তব্য সঠিক? পরিবেশ দূষণের কারণে ভারত এই ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প বাতিল করেছে সেখানে কেন আমরা সুন্দরবনের পাশে রামপালে এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছি? এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের জনগণে ও পরিবেশের জন্য আশীর্বাদ হবে না সর্বনাশ ডেকে আনবে সে প্রশ্নই এখন সর্বত্র।


আমরা কি দেশের উন্নয়ন চাই , জাতির উন্নতি চাই। কিন্তু ভয়ঙ্কর বিপদের চুক্তি করে এমন উন্নতি কি যুক্তি সঙ্গত ? উন্নয়নের নামে ভয়ঙ্কর ক্ষতির কারণ বিষাক্ত কার্বন-সালফার-নাইট্রোজেন, ধোঁয়া-ছাই মিশ্রিত বিষাক্ত ধোয়া ? বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ সমীক্ষা অনুযায়ী রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে প্রতিদিন ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইড, ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড নির্গত হবে। বছরে ৯ লাখ টন অত্যন্ত ক্ষতিকর বিষাক্ত ছাই বাতাসে মিশবে।


Add comment


Security code
Refresh