Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

অমিতের চলে যাওয়ার গল্প!

শনিবার, ১১ মার্চ ২০১৭

সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার দরকার অনুভব করছি, অমিতের গল্পটা আমি বলতে চাই। পৃথিবীর বুক থেকে জলজ্যান্ত সদা হাস্যমাণ একটা ছেলে চলে গেলো, এইটা কিছুতেই কেনো জানি মানতে পারছি না। তাই লম্বা কিছু বলার আছে অমিতের চলে যাওয়া নিয়ে, কিছু জিনিশ আমাদের জানা দরকার, আমাদের কিছু একটা করা দরকার।

যারা আমিত কে চিনেন না তাদের জন্য। অমিত খুবই ব্রিলিয়ান্ট, শার্প একটা ছেলে, খেলাধুলা , পড়াশোনা সব কিছুতেই কাপিয়ে বেরানো একটা ছেলে। ২০০৮ এ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পাস করে বের হবার সাথে সাথেই চাকরি হয়ে যায় ইউনিলিভার বাংলাদেশে। নিজের যোগ্যতায় ক্রমাগত প্রমোশন পেয়ে ২০১৪ তে ইউনিলিভার এর টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেসন এর ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নেয় অমিত। কর্পোরেট এ সাবলীল ক্যারিয়ার থাকলেও অমিতের বরাবরই ইচ্ছা ছিলো নিজের স্বপ্নের বিষয় নিয়ে পড়ার। বন্ধুদেরকে প্রায়ই বলতো , তোরা immigration নিয়ে করছিস চাকরি, আর আমি দেশে চাকরি করে টাকা জমাচ্ছি যাতে তোদের ওইখানে যেয়ে পরতে পারি। mechanical , robotics , artificial intelligence ওকে খুব টানতও । ২০১৬ তে চাকরি বাকরি ছেড়ে দিয়ে বউ মৌরি, আর ১ বছরে মাত্র পা দেয়া অনীশ কে নিয়ে আমিত চলে আসে টরন্টোতে immigration নিয়ে। আমাদের মতো অন্যান্য immigrant দের মত , যারা আসার পরপরেই চাকরি যুদ্ধে নেমে পরি তাদের মত ছিলোনা অমিত। দেখা হলেই বলতো , চাকরি বাকরি তো অনেক করলাম ভাই, আমি এখন পরতে চাই। ২০১৬ তে অমিত পেয়ে গেলো তার স্বপ্নের সাবজেক্ট mehcatronics , রায়ারসন ইউনিভার্সিটি তে। ভালোই চলছিলো সব, পড়াশোনা, বন্ধুদের সাথে খেলা, রাতের বেলা হুট হাট করে বন্ধুদের বাসায় হামলে পড়া, অনীশকে নিয়ে খেলা।

অমিত খেলতে ভালবাসে, অমিত দৌড়াতে পছন্দ করে, মাঝে মাঝেই ট্র্যাক স্যুট পড়ে ৭-৮ কিলো দৌড়িয়ে বন্ধুদের বাসায় চলে যায়। ধমক দিয়ে বন্ধুদের আসতে বলে “ এম্নে বসে বসে থাকলে শরিরে মেদ জমে কবে যে হার্ট অ্যাটাক করবি, চল বেটা দৌড় দিয়ে আসি। “ বন্ধুরা বের হয়, কিন্তু অমিতের সাথে পেড়ে উঠে না। এই সেইদিনও ব্যাডমিন্টনের ডাবলসে অমিতের সাথে খেলছিলাম। খেলা শুরুর আগেই অমিত আমাকে বলল “ ভাই আমি ব্যাডমিন্টন ভালো খেলি না, কিন্তু দৌড়াইতে পারি, আপনি চাপ মারবেন আর আমি দউরাবো সারা কোর্ট, অপনেন্ট দেখবেন ভয় পেয়ে গেসে” ।

কয়েকদিন ধরেই অমিতের বুকে একটু ব্যাথা হয়। ২৭ তারিখ ব্যথাটা এতই বাড়ে যে অমিত ইস্ট ইয়র্ক জেনারেল হাসপাতালের ইমেরজেন্সি তে যায়। যারা এখানে ইমেরজেন্সিতে গিয়েছেন তারা জানেন ব্যাপারটা কি পরিমান পেইনফুল। যাই হোক ট্র্যায়াযে আমিতের বিবরণ শুনল অপারেটর , ঠিক হার্ট এর পাশেই ব্যাথা। প্রেশার মেপে দেখা গেলো ১১০-১৫০। কাজেই ভয়ের কিছু ব্যাপার আসে জেনে অমিতকে আগে আগেই ভিতরে পাঠানো হলো। কিন্তু এইটাতো মাত্র একটি স্টেপ। যথারীতি অমিতকে ঘণ্টার মতো বসতে হোল ডিউটি ডাক্তার কে দেখানোর জন্য। ডিউটি ডাক্তার করতে দিল ইসিজি। আবারো সেই ঘণ্টা খানেকের জন্য বসে থাকা। অবশেষে রিপোর্ট আসার পর ডাক্তার বলে “ ok, you have high blood pressure and there are some irregularities in your heart, but I am not that much worry about that”
অমিত বলল “ but I have chest pain’
ডাক্তারের উত্তর,
the chest pain might be from cold, take some rest and if the pain is too much take some advil, you will be fine, and if you like you can follow up with your family doctor”
অমিতের যেহেতু এর আগে তেমন কিছু ছিলো না কাজেই তার কোন ফ্যামিলি ডাক্তারও ছিলো না। ডিউটি ডাক্তারকে এটা বলার পর , ডাক্তার বলল “ ok then you have to come to emergency” . এই বলে ছেড়ে দিলো অমিতকে।
কার না ভালো লাগে হসপিটালে থাকতে, অমিত চলে আসে বাসায়।

Picture

বাসায় আসার পর অমিতের একটু জ্বর আসে পরের দিন। কিন্তু আবার চলেও যায়। তাও অমিত আর তার বউ মিলে ঠিক করে ইমেরজেন্সিতে আবার যাবে। কিন্তু আমিতের একটা পরিক্ষা বৃহস্পতিবার দিন। পরিক্ষার আগের দিন কে চায় ৪-৫ ঘন্টা সুধু শুধু ইমেরজেন্সিতে বসে থাকতে? কাজেই অমিত আর মৌরি মিলে ঠিক করে পরিক্ষা দিয়েই আবার ইমেরজেন্সিতে যাবে। আর ডাক্তারতো ভালো জানে, আগের বারের কথা শুনে তো মনে হইনি কিছু সিরিয়াস।
১লা মার্চ , বুধবার আর অন্যান্য দিনের মতোই অমিত বাসাতেই ছিলো, পড়াশোনা নিয়ে ব্যাস্ত। সন্ধ্যার পর নিজের ২০তালার এপার্টমেন্ট থেকে ৫তালার এক ছোট ভাই অর্ণবের এপার্টমেন্টে আসে অমিত গল্প করার জন্য।
ওরা দুজন বারান্দায় গল্প করছিল। হঠাত করেই অর্ণবের মনে হয় অমিত রেলিং এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে টলোমলো পায়ে , মনে হচ্ছে হয়তো পড়েই যাবে, যেয়ে ধরতে ধরতেই অমিত পড়ে যায় মাটিতে। মুখ থেকে ফ্যানা উঠা শুরু করে। অর্ণব সাথে সাথেই কল করে ৯১১ এ। বুঝতে পারে নিঃশ্বাস ছোট হয়ে আসছে অমিতের। ৯১১ এ অপেরাটর ক্রমাগতও বলে যায় অর্ণব কে কিভাবে সিপিআর দিতে হবে। অর্ণবও যথাসাধ্য চেষ্টা চালায়, কিন্তু অর্ণব বুঝতে পারে নিঃসাড় হয়ে আসছে অমিত। ১৫মিনিটের মধ্যে চলে আসে প্যারামেডিক এর টিম। চেষ্টা চালায় সব দিয়ে। এরপর হাসপাতালে নিয়ে যায় অমিতকে। তখন বাজে রাত ১১টা। সব টেস্ট করে ডাক্তার বলে “ he is not with us anymore” . আমরা বড় ভাই , ছোট ভাই , বন্ধুরা ততক্ষনে হাসপাতালে , কি হচ্ছে কিছুই বুঝছিনা। মৌরি কাঁদছে না, পাঁথরের মত শুন্য দৃষ্টিতে বসে আছে, দেড় বছরের অনীশ ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে, অনীশের চোখে প্রচণ্ড ভয়। কোনও এক অজানা কারনে এত ছোট বাচ্চাও টের পায় বড় কিছু একটা হয়েছে। আমরা কেউ কারো চোখে তাকানোর মতো সাহস পাচ্ছি না। ডাক্তার এর কথা শুনে অনিকের সবচেয়ে কাছের বন্ধু নাহিন বলল “ভাই, আমি নামাজে দারালাম” , প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে নাহিন হয়তো এইটাই দোয়া করসে “ আল্লাহ এই খবর যাতে সত্যি না হয়” । বাতাস যে কি পরিমান ভারি হতে পারে সেইদিন আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। নিঃশ্বাস নিতে গেলে গলা বুক সব জরিয়ে আসছে। বাতাসে কিছু কি মেশানো ছিলো? অনীশ ঘুমাচ্ছে না, পালা করে করে lullaby শোনানো হচ্ছে। এক ফাকে অনীশকে নিলাম , কানের কাছে আস্তে আস্তে বললাম “ ঘুমাও বাবা, কিছু হইনি, “ অনীশ আমার দিকে শুন্য দৃষ্টিতে তাকালো তারপর কাধে মাথা রাখল। সব কিছু এমন ভেঙ্গে চুরে যাচ্ছে কেন? সব এতো এলোমেলো লাগছে কেন? অমিতের খালা থেমে থেমে আহাজারি করছে, “ ওর আম্মাকে আমি কি বলবো?” । মৌরি উদ্ভ্রান্ত কিন্তু নিশ্ছুপ। এর মাঝে পুলিশ, করনেস, ডাক্তাররা এসে এসে মৌরিকে কি কি করতে হবে তার বর্ণনা দিচ্ছে। মৌরি শুন্য দৃষ্টিতে শুনছে। এতক্ষন চেষ্টা করার পর অনীশ অনিকের কোলে ঘুমাচ্ছে, দিপু তার জানা মতে যত দোয়া ছিলো সব আউরে যাচ্ছে। দোয়েলকে অমিতের খালা বিরবিরিয়ে বলছে “ বাবা সব শেষ হয়ে গেলো” । হ্যাঁ এইভাবেই কিছু বুঝার আগে চলে গেলো অমিত।

এখন আসল কথায় আসি, ওইদিন ওইখানে থাকা সবার মানি একি প্রশ্ন । এই নিয়তির জন্নই কি আমরা মা , বাবা ভাই বোন সব ছেড়ে এই দেশে আসছি? এইভাবেই কি মেনে নিতে হবে জিবনের শেষ অংশটুকু ? প্রতিবার দেশে গেলেই ত বা মা বলে “ হয়েছে তো অনেক, চলে আয় না” । দাত মুখ চেপে তাও আবার আমরা রওনা দেই এই দেশে কামলা দিতে। আমিত তো খারাপ ছিলো না, আমরা কেউই ত খারাপ ছিলাম না দেশে। এই দেশে শুনলাম চিকিৎসা ব্যাবস্থা কতো ভালো। অথচ তারপরেও মেনে নিতে হবে এইধরনের মৃত্যুকে?

ঘটনার পর আমরা বার বার শুনেছি মৌরির কাছে, কি হয়েছিলো আগের দিন। যতবারই শুনি ততবারই মনে হয় “ না বড় কিছু একটা সমস্যা আছে’ । আমরা অভিবাসী দেখে কি আমাদের বেপারগুলো গুরুত্তসহকারে নেয়া হয় না? একজন রোগীর কিভাবে জানবে তার অবস্থা গুরুতর যদি না ডাক্তার শুধু প্রসেদিউর ফলো করে বলে , চিন্তার কিছু নেই?কেন সেইদিন ছেড়ে দেয়া হলো অমিতকে যদি ধারনাই করা হয় কিছু সমস্যা আছে। এই দেশের চিকিৎসাও ত ফ্রী না, আমরা কারি কারি ট্যাক্স দিয়েই তো সেবা নিচ্ছি। তারপরেও কেনো এতো অবহেলা।

এতো বড় লিখা লিখার মুল উদ্দেশ্য হলো একটা জনমত তৈরি করা। যথাযথ করতিপক্ষকে জানানো “ there is something wrong, you guys can’t just treat us like that, we deserve better than this” হয় ওদের পুরো সিস্টেম এই ভুল আছে , নাহলে আমাদের জন্য ইচ্ছাকৃত ভাবে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না।

এই মুহূর্তে আমরা ঠিক করেছি আমরা এই বিষয় নিয়ে আগাবো। আপনাদের মতামত শুনবো। আমাদের কি লিগাল একশনে যাওয়া উচিৎ হবে? সেই ক্ষেত্রে কে আমাদের সাহায্য করতে পারবে? আমাদের কি করা উচিৎ? একটা জনমত করে করতিপক্ষএর কাছে আমরা চিঠি দিতে চাই। আমি নিশ্চিত এই গ্রুপের অনেকেরেই চিকিৎসা ব্যাবস্থা নিয়ে খারাপ খারাপ অভিজ্ঞতা আছে , আমরা সেইটাও শুনতে চাই। কানাডা সরকারকে বুঝাতে চাই, “ there is a voice of Bengali, and they have to treat us well”
আজকে যে ঘটনা অমিতের জীবনে হয়েছে তা আমাদের জীবনে যে কোন মুহূর্তে হতে পারে। কিন্তু এই দেশতো থেমে থাকে না, জীবিকার সন্ধানে আমরা সব ভুলে যাই। অমিত মারা যাওয়ার পরের দিন ঠিকি সবার অফিস এ জেতে হয়েছে। অফিসে সারাদিন আগের রাতের সৃতি গুলো তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। ঘোর ভাঙল আমার বন্ধু আবেদিনের ফোন পেয়ে “ কিরে অফিসে? ‘ “ হ্যাঁ রে কি করবো, কিছুতেই তো কাজ করতে পারছি না” ।। “ সেইটাই , চিন্তা করিস না তুই মারা গেলেও পরের দিন আমারও অফিস করতে হবে। “ কাজ করি , ট্যাক্স দেই ।। এইতো জীবন।

এতো বড় মেসেজের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ। আপনাদের পরামর্শ আমাদের একান্ত কাম্য।


Add comment


Security code
Refresh