Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

রাসুলের (সা.) শ্রমজীবন ও শ্রমনীতি

সোমবার, ০১ মে ২০১৭

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা এবং রাসূল (সা.) মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ একজন আদর্শ অনুসৃত ব্যক্তিত্ব। কর্মমুখর এই পৃথিবীতে কর্মহীন মানুষের কোনো গুরুত্ব নেই। কর্মমুখরতা এবং কর্মমুখিতা ইসলামে পছন্দনীয় একটি বিষয় এবং ইসলামের রাসূল মুহাম্মদও (সা.) ছিলেন একজন কর্মমুখী ও কর্মমুখিতাপ্রিয় মানুষ। তার জন্ম থেকে মৃত্যু এবং প্রতিটি দিনের সকাল থেকে রাত্র পর্যন্ত তিনি মানবতার কথা বলেছেন এবং মানুষের পাশে থেকেছেন। একজন মানুষ হিসেবে একদিকে তিনি ছিলেন জীবনের আদর্শ অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব এবং অপরদিকে তিনি ছিলেন ইসলাম প্রদত্ত সব নীতি-আদর্শের বাস্তব নমুনা বা উদাহরণ।

স্বহস্তে উপার্জনের প্রসংশা করা, কর্মমুখর জীবন যাপনকে গুরুত্ব দেওয়া, শ্রমিকদের মূল্যায়নসহ মানব সভ্যতার স্বাভাবিকতাকে অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য শ্রমনীতি ও শ্রমজীবনের প্রতি রাসূল (সা.) সুদৃষ্টি দিয়েছেন এবং শ্রমনীতি বাস্তবায়ন ও শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।  

হজরত মুহাম্মদ (সা.)- যাঁকে সৃষ্টি করা না হলে বিশ্ব জগতের কিছুই সৃষ্টি করা হতো না। মহিমান্বিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই রাসূল (সা.) নিজের কাজ নিজে করতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন এবং তিনি নিজে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। মজুরি হিসেবে খেজুর গ্রহণ করার চুক্তিতে পানি উত্তোলনের কাজ করেছেন আল্লাহর নবি। কোনো ধরনের কায়িক বা শারীরিক শ্রমকে তিনি নিজে খাটো করে দেখেননি এবং কাউকে খাটো করে দেখতেও নিষেধ করেছেন। এই মর্মে তিনি বলেছেন, ‘কোনো ধরনের কায়িক বা শারীরিক শ্রমকে তাচ্ছিল্য করো না তোমরা। শ্রম আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।’ (আল-হাদিস)

এছাড়া নিজের কাজ নিজে করার ব্যাপারে সর্বদা সাহাবাদের উৎসাহিত করতেন তিনি। এই মর্মে রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো ইরশাদ করেন, ‘স্বহস্তের উপার্জন অপেক্ষা উত্তম আহার্য বা জীবিকা আর নেই। আর আল্লাহর নবি হজরত দাঊদও (আ.) স্বহস্তে জীবিকা নির্বাহ করতেন।’ (বুখারি, মিশকাত হা/২৭৫৯)

একদিন রাসূল (সা.) তাঁর ফোসকা পড়া হাত দেখিয়ে সাহাবাদের বলেছেন- ‘দেখ! এটি এমন একটি হাত, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল উভয়েই পছন্দ করেন। তিনি (সা.) আরও বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি নিজে উপার্জন করে ভক্ষণ করে আল্লাহ তার প্রতি সুপ্রসন্ন থাকেন। নিজের পরিশ্রমলব্ধ জীবিকাই সর্বোত্তম রিজিক।’ রাসূলকে (সা.) জিজ্ঞেস করা হলো- ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! কোন ধরনের উপার্জন বা জীবিকা শ্রেষ্ঠতর? তিনি জবাবে বললেন- নিজের শ্রমলব্ধ উপার্জন।’(আল হাদিস)

বহু মহামানব, অসংখ্য-অগণিত ব্যক্তিত্বের আগমনে ধন্য এই পৃথিবী। একমাত্র রাসুল-ই (সা.) সেই মহান ব্যক্তিত্ব, যিনি শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার আদায় নিশ্চিত করার পাশাপাশি যাবতীয় পাওনা যথাযথভাবে পরিশোধের ব্যবস্থা করে কালজয়ী অনুপম আদর্শের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

শ্রমিক ও শ্রমকেন্দ্রিক সমস্যা বর্তমান সবচেয়ে আলোচিত সমস্যা। এই সমস্যার সমাধানে ১৪০০ বছর আগে রাসুল (সা.) শ্রমনীতি ঘোষণা করেছেন। বিদায় হজের ভাষণে তিনি অতুলনীয় এক শ্রমনীতি ঘোষণা দিয়েছেন। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যাবে- এটাই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রমনীতি। রাসূল (সা.) সেদিন দীপ্ত কণ্ঠে বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের অধীনদের সম্পর্কে সতর্ক হও। তারা তোমাদের ভাই। তোমরা নিজেরা যা খাও, তা তাদের খাওয়াবে। তোমরা নিজেরা যা পরিধান করো, তা তাদের পরিধান করাবে। তাদের ওপর সাধ্যাতিরিক্ত শ্রমের বোঝা চাপিয়ে দিও না। যদি কোনো কারণে চাপিয়ে দিতে হয়, তবে তুমিও তাতে অংশীদার হও।’ (আল হাদিস)

এছাড়া তিনি আরো বলেছেন, ‘তোমার অধীনস্থদের তোমার আপন ছেলেসন্তানের মতো মনে করো এবং তোমরা যা খাও, যা পরিধান করো, তাদেরও তা খেতে ও পরিধান করতে দাও।’ (আল-হাদিস)

শ্রমের অবমূল্যায়ন বর্তমান সময়কার একটি ভয়াবহ সমস্যা। মানুষ শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন করতে চায় না। শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য প্রাপ্য না দেওয়া এবং শ্রমের অবমূল্যায়নের ভয়াবহতার বর্ণনা দিতে গিয়ে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন কিছু লোক আমার মমতাময়ী আশ্রয় থেকে বঞ্চিত থাকবে।’ সাহাবা আজমাইনরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘সেই হতভাগা কারা?’ রাসূল (সা.) বললেন, ‘নির্ধারিত পারিশ্রমিক দেওয়ার চুক্তিতে শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে কাজ শেষে যারা পূর্ণ পারিশ্রমিক প্রদান করে না।’ (আল-হাদিস)

এই মর্মে রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো ইরশাদ করেন, মহান আল্লাহ বলেন, ক্বিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হবে। তাদের মধ্যে একজন হলো- যে ব্যক্তি শ্রমিকের কাছ থেকে পূর্ণ শ্রম গ্রহণ করে অথচ তার পূর্ণ মজুরি প্রদান করে না। (বুখারি, মিশকাত হা/২৯৮৪)

শ্রমিকদের ভালোবাসা কিংবা কেবল তাদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারেই নয়, শ্রমিকদের কাজ নির্ধারণ ও পারিশ্রমিক প্রদানের নীতিও বাতলে দিয়েছেন রাসূল (সা.)। তিনি (সা.) বলেছেন, ‘শক্তি-সামর্থ্যের অতিরিক্ত কোনো কাজ শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দিয়ো না। শক্তি-সামর্থ্যের অতিরিক্ত কোনো কাজ দিলে সে ক্ষেত্রে সাহায্য করো তাদের।’ (আল-হাদিস) তিনি আরো বলেছেন, ‘শ্রমিকদের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই, তাদের মজুরি প্রদান করো।’ (ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/২৯৮৭)

রাসূল (সা.) একদিকে যেমন মালিকদের শ্রম ও শ্রমিকদের মূল্যায়নের কথা বলেছেন, অপরদিকে শ্রমিকদের উদ্দেশ্যেও বিভিন্ন উপদেশ ও নীতিমালা প্রদান করেছেন। তিনি (সা.) বলেছেন, আল্লাহ ঐ শ্রমিককে ভালবাসেন যে সুন্দরভাবে কার্য সমাধা করে। (জামে তিরমিযি হা/১৮৯১)

কোন কোন শ্রমিক মালিকের কাজে ফাঁকি দিয়ে নিয়মিত হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে বেতন উত্তোলন করে থাকে, যা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। রাসূল (সা.) এমন শ্রমিকদের সর্তক করে বলেছেন, ‘এজন্য তাকে ক্বিয়ামতের মাঠে অবশ্যই বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।’ আবার রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যদি শ্রমিক তার উপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করে, তাহলে তার জন্য দ্বিগুণ পুরস্কারের কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তিন শ্রেণীর লোকের দ্বিগুণ সওয়াব প্রদান করা হবে। তাদের মধ্যে এক শ্রেণী হলো -ঐ শ্রমিক যে নিজের মালিকের হক সঠিকভাবে আদায় করে এবং আল্লাহর হকও সঠিকভাবে আদায় করে। (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা/১১)

Picture

রাসুলুল্লাহর (সা.) মৃত্যুশয্যার অসিয়তেও ছিল শ্রমিকের অধিকারের কথা
 

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্মান ও মর্যাদা হলো নবুয়ত। নবুয়তের ওপর পৃথিবীতে আর কোনো মর্যাদা নেই। শ্রমজীবী হওয়া সত্ত্বেও নবীগণ নবুয়তের মহামর্যাদার আসনে আসীন হতে পেরেছিলেন। শ্রমিক হওয়া নবীজি (সা.)-কে বিশ্বনবী হতে বাধাগ্রস্ত করেনি। রাসুলে কারিম (সা.) বলেন, আল্লাহ যত নবীই প্রেরণ করেছেন, সবাই মেষ চরিয়েছেন। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনিও? নবীজি (সা.) বললেন, হ্যাঁ, আমিও। আমি নির্ধারিত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মক্কাবাসীর মেষ চরাতাম। (মুসনাদে আহমাদ) তিনি বিশ্বনেতা হয়েও নিজেকে শ্রমিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে শ্রমিকগোষ্ঠীকে ধন্য করেছেন।

পৃথিবীজুড়ে গড়ে ওঠা তিলোত্তমা নগরীগুলোর রূপ-লাবণ্যে শ্রমিকের কৃতিত্বই অগ্রগণ্য। কল-কারখানা থেকে নিয়ে সুবিশাল ইমারত, ফসলের মাঠ পর্যন্ত সব কিছুতেই রয়েছে শ্রমিকের হাতের স্পর্শ। কিন্তু শত আক্ষেপ! সভ্যতার কারিগর এ শ্রেণিটি সর্বদা উপেক্ষিত, অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিতই থেকেছে। উদয়াস্ত শ্রম অব্যাহত রেখে তিল তিল করে যে শ্রমিক মালিকের অর্থযন্ত্রটি সচল রাখে, সেই মালিকের অবিচারেই দুর্বিষহ হয়ে ওঠে তার জীবন। শ্রমিক কষ্ট করে সুবিশাল অট্টালিকা তৈরি করলেও তাতে নেই তার সামান্য ঠাঁই। তাকে থাকতে হয় গাছতলায়। শ্রমিকদের ওপর হাজার বছর ধরে চলা লাঞ্ছনার অধ্যায়ের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটেছে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাত ধরে। মানবতার পরম বন্ধু হযরত মুহাম্মদ (সা.) শ্রমিক নির্যাতনের সাইক্লোন থামিয়ে দিয়েছেন কঠোর হস্তে। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণেও বাদ পড়েনি শ্রমিক। এমনকি মৃত্যুশয্যায়ও তিনি ভেবেছেন শ্রমিকদের নিয়ে। হযরত উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুশয্যায় যে অসিয়ত করে যান তা ছিল, সাবধান থাকবে নামাজ ও তোমাদের অধীনস্থদের বিষয়ে। (ইবনে মাজাহ : ১/৫১৯)

শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যথাযথ মজুরিপ্রাপ্তি। মালিকগোষ্ঠী বরাবরই বিভিন্ন অজুহাতে শ্রমিকদের টাকা মেরে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখে। ইসলামের ঘোষণা হলো, যারা শ্রমিকের পাওনা দিতে টালবাহানা করবে, হাশরের ময়দানে আল্লাহ নিজেই তাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আমি কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণির মানুষের প্রতিপক্ষ। আর আমি যার প্রতিপক্ষ, তাকে পরাজিত করবই। তন্মধ্যে এক শ্রেণি হলো, যে কোনো শ্রমিক নিয়োগ করে, অতঃপর তার থেকে পুরো কাজ আদায় করে নেয় কিন্তু তার পারিশ্রমিক প্রদান করে না। (বুখারি : ২/৭৭৬)

সভ্যতার এ সময়েও পত্রিকার পাতা খুলতেই শ্রমিক নির্যাতনের খবর ভেসে ওঠে। কল-কারখানার শ্রমিক তো বটেই, গৃহের শ্রমিকও বাদ যাচ্ছে না নির্যাতন থেকে। ঠুনকো অভিযোগে শ্রমিককে মারধর করার অধিকার কিছুতেই দেয়নি ইসলাম।  হাদীসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এক লোক এসে জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসুলুল্লাহ! শ্রমিককে কতবার ক্ষমা করব? নবীজি চুপ থাকলেন। লোকটি আবারও জিজ্ঞেস করলে নবীজি (সা.) চুপ থাকলেন। লোকটি তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলে নবীজি (সা.) বললেন, প্রতিদিন ৭০ বার হলেও তার অপরাধ ক্ষমা করবে। (আবু দাউদ : ২/৭৬৩)