Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

আজিজুল মালীক চৌধুরী: একজন সফল মানুষের প্রতিকৃতি-------সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী

মঙ্গলবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০১৭

১২ মার্চ, ২০১৫ বুধবার সকালে সেলফোন বেজে ওঠে। রিসিভ করতেই এ পাশ থেকে “করুণ কণ্ঠ ভেসে এলো। আমি হেলাল। আপনার মালীক ভাই আর নেই।” কথাটা শোনার সাথে সাথেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। মালীক ভাই আমার প্রিয় মানুষ। পরম আপনজন। সেই ১৯৭৫ সালের কথা। আমি তখন সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। লেখালেখি শুরু করেছি। পাশাপাশি সংকলন ‘জীবন মিছিল’ প্রকাশ করছি। সংগঠন করার নেশাও পেয়েছে। ‘ধোপাদিঘির পার শাপলা কুঁড়ির আসর’ গঠন করেছি। সংগঠনের একটি অনুষ্ঠানে সিলেট জেলা শাপলা কুঁড়ির আসরের কর্মকর্তাবৃন্দ এলেন। সেই সময় জেলা শাপলা কুঁড়ির আসরের অন্যদের সাথে এলেন আজিজুল মালীক চৌধুরী এডভোকেট। সেই থেকে পরিচয়। পরবর্তীতে ঘনিষ্ঠতা। এক সময় শাপলা কুঁড়ির জাতীয় কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। আমি চাঁদের হাটের সাথে জড়িয়ে পড়ি। ১৯৮০ সালে চাঁদের হাট সিলেট শাখা পুনগর্ঠণ করে কার্যক্রম চালিয়ে আসতে থাকি। এক সময় আজিজুল মালীক চৌধুরীকে সভাপতি হিসেবে নিয়ে আসি। তিনি সভাপতি এবং আমি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে চাঁদের হাট সিলেট শাখার কার্যক্রম চলতে থাকে। মালীক ভাই একজন সজ্জন, বিনীয় ও স্পষ্টভাষী লোক। তিনি সব সময় নিয়ম মেনে চলতেন। নিয়মের বাইরে কোনো কিছু পছন্দ করতেন না। ঘড়ির সময় দেখে তিনি চলাফেরা করতেন। সময়কে মূল্য দিতেন।
মালীক ভাইয়ের সাথে সংগঠন করতে গিয়ে কোনো দিন কোনো রকম ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়নি। তিনি আমাকে খুব ¯েœহ করতেন। পরামর্শ দিতেন। অত্যন্ত চমৎকার দিক নির্দেশনা দিতেন। সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিতেন সবকিছু। গুছিয়ে কথা বলতেন। পরবর্তীতে নিউইয়র্ক চলে যাই। মাঝে মাঝে দেশের টানে, মায়ের টানে চলে আসি দেশে। দেশে এলেই মালীক ভাই এর সাথে দেখা হতো ৩নং বার হলের সেই ছোট রুমটিতে। পাশে বসাতেন আদর করে। মালীক ভাইর সান্নিধ্য পেতাম।
দেশে যে কয়দিন থাকার সুযোগ পেতাম মালীক ভাইয়ের পাশে গিয়ে বসতাম। ২০১৫ সালে সামাজিক সংগঠন ‘স্বদেশ ফোরাম সিলেট’ কমিটি গঠন করি। মালীক ভাইকে সভাপতি করার প্রস্তাব করলে তিনি প্রথম দিকে রাজি না হলেও আমার পীড়াপীড়ি ও ব্যক্তিগত অনুরোধ তিনি ফিরিয়ে দেননি। পরবর্তীতে মালীক ভাই সভাপতি পদে সম্মতি দেন। তাঁকেই সভাপতি করে ‘স্বদেশ ফোরাম সিলেট’ গঠিত হয়।
আজিজুল মালীক চৌধুরী একজন দক্ষ সংগঠক ছিলেন। সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল তাঁর প্রবল। তিনি ছিলেন সিলেটের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনের একজন উজ্জ্বল প্রিয় মুখ। প্রতিদিন তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছুটে বেড়াতেন বিভিন্ন সামাজিক, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। পাশাপাশি বিয়ে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও মৃত্যু সংবাদে সবার আগে ছুটে যেতেন এই প্রিয় সফল মানুষটি।
সিলেটের ক্রীড়া অঙ্গণেও তিনি ছিলেন সুপরিচিত। সিলেট স্টেডিয়ামে তাঁর ছিলো নিয়মিত যাতায়াত। তিনি সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাথেও জড়িত ছিলেন ওতোপ্রোত ভাবে। একসময় তিনি ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
তিনি ছিলেন নিরহংকার, সৎচরিত্রের আদর্শ মানুষ। সদালপি ও হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন সবসময়। তিনি সিলেট জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতিও ছিলেন। জেলা বারের আইনজীবিদের সাথে ছিলো তাঁর আত্মার সম্পর্ক। ব্যক্তিগত লোভ-লালসার উর্ধ্বে ছিলেন তিনি। জীবনে বিত্তের পেছনে ছুটেননি, ছুটেছেন চিত্তের পেছনে। বিত্তশালী আজিজুল মালীক হননি ঠিকই কিন্তু জীবনে হয়েছেন একজন সফল সমাজসেবক।
সেলফোনে মালীক ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ জানান যিনি, তিনি হলেন মালীক ভাইয়ের আদরের একমাত্র জামাতা। নিউইয়র্কে বাঙালি কমিউনিটির সুপরিচিত নাম। ময়নুল হক চৌধুরী হেলাল। একজন সমাজসেবী ও সংগঠক। জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তাঁর ফোন পেয়ে সাথে সাথে আমার ছোট ভাই আবদালকে সংবাদ জানাতে ফোন দিলে জানতে পারি সে মালীক ভাইয়ের বাসায়। এরপর ফোন দিলাম সিলেট সাহিত্য পরিষদের সভাপতি কবি পুলিন রায়কে। তিনিও মালীক ভাইয়ের বাসায়। ২০১৫ সালে তিন মাস দেশে অবস্থানকালে মালীক ভাইয়ের সাথে অনেক অনুষ্ঠানে একসাথে ছিলাম। সেইসব মধুর স্মৃতি বার বার মনকে শিহোরিত করে। বিশেষ করে ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে বঙ্গবীর ওসমানীর কবর জিয়ারতের স্মৃতিটা বার বার চোখে ভাসছে। ওইদিন রাতে ‘স্বদেশ ফোরাম সিলেট’ আয়োজিত বঙ্গবীর ওসমানীর মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণসভায় সভাপতিও ছিলেন তিনি। আমাদের সাথে তাঁর শেষ অনুষ্ঠান ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে সিলেট সাহিত্য পরিষদ ও স্বদেশ ফোরাম সিলেট এর আয়োজনে মা কমিউনিটি সেন্টারে। নিউইয়র্কে যাবার দুদিন আগে সিলেট জেলা বারের ৩নং হল রুমে দেখা করে বিদায় নিয়ে তাঁর দোয়া চেয়ে আসি। তিনি একটি ডায়েরি এবং ২০১৫ সালের একটি টেবিল ক্যালেন্ডার উপহার দেন।
এমন অনেক অনেক স্মৃতির কথা মনে পড়ে, তাঁকে ঘিরে। লিখতে গিয়ে এলোমেলো হয়ে যায়। ভাবনারাজ্যে ভাবনাগুলো কেমন খন্ড খন্ড চিত্র হয়ে ভেসে ওঠে। মনটা ডুকরে কেঁদে ওঠে। কেমন শূণ্যতা অনুভূত হয় চারপাশে। মালীক ভাইয়ের স্মৃতিগুলো ভুলবার নয়। ভুলবার নয় আকাশের মতো উদার মনের মানুষটাকে। তিনি ছিলেন আমার সাংগঠনিক জীবনে চলার পথের অভিভাবক। এমন একজন অভিভাবককে হারিয়ে অপূরণীয় ক্ষতি হলো আমার-আমাদের সকলের।
উল্লেখ্য, এডভোকেট আজিজুল মালীক চৌধুরী ১৯৪৫ সালের ১৬ জানুয়ারি দক্ষিণ সুরমার সিলাম ইউনিয়নের চরমোহাম্মদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মদন মোহন কলেজ সিলেটের প্রাক্তন অধ্যক্ষ মরহুম আব্দুল মালীক চৌধুরী এবং মাতা মরহুমা আছিয়া খাতুন চৌধুরী। তিনি ১৯৬০ সালে লালাবাজার হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৩ সালে মদন মোহন কলেজ থেকে আইএ, ১৯৬৫ সালে এম সি কলেজ থেকে বি.এ এবং ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএল বি পাশ করেন। তিনি ১৯৬৮ সালের ৪ ডিসেম্বর সিলেট জেলা বারে যোগদান করেন। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি