Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ উন্নয়ন—অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান

মঙ্গলবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০১৭

মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় গণতন্ত্রের চেয়ে কর্তৃত্বপরায়ণতার ইতিহাস দীর্ঘ। ইতিহাসখ্যাত জননন্দিত শাসকদের বেশিরভাগই ছিলেন জনহিতৈষী কর্তৃত্ববাদী, তাছাড়া গণতন্ত্র প্রকৃতি বা ঈশ্বরের আইন এমন কথাও ধর্মগ্রন্থ থেকে জানা যায় না। উদার বা গণতান্ত্রিক সমাজেরও বিকল্প ভাবনা আছে। বিকল্পগুলো অসম্ভব বা অবাস্তব এমনটিও বলা যাবে না। হয়ত ভাবনাগুলো এখনো সঠিক পথ খুঁজে পাচ্ছে না বা পরীক্ষণ দ্বারা প্রমাণিত হয়নি। গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন। কোনটি আগে? কোনিট পরে? নাকি দুটিই এক সঙ্গে সমানতালে চলবে? এ নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। তবে গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন উভয়ের পক্ষেই যথেষ্ট বক্তব্য রয়েছে। এক সময় মনে করা হতো, গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই একটি দেশের সত্যিকারের উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে এমন ধারণা হোঁচট খেয়েছে। যদি চীনের অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। চীনের ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য আগের যেসব মডেল এবং তত্ত্ব ছিল, সেগুলোকেই কেবল উন্নয়নের নেপথ্যের শক্তি হিসেবে স্বীকার কিংবা সমর্থন করা যায় না। শুধু গণতন্ত্রেই উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব এ ধারণা চীন ভেঙে দিয়েছে। কেননা উদার গণতান্ত্রিক আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মাথাপিছু আয় এবং জীবন যাত্রার মান দ্বিগুণ হতে ৩০ বছর পর্যন্ত সময় লেগেছে। কিন্তু গণতন্ত্রহীন সমাজতান্ত্রিক দেশ চীনে প্রতি ১০ বছরে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণে উপনীত হয়েছে। এমনকি আমাদের নিকটবর্তী দুইটি দেশ মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে একই চিত্র দেখা যায়। দেশ দুুটিতে যে পরিমাণ উন্নয়ন কিন্তু সেই পরিমাণ গণতন্ত্র নেই। অর্থাত্ যেটাকে আমরা পশ্চিমা উদার গণতন্ত্র বলে থাকি যেটা সেখানে নেই। যদিও শাশ্বতভাবে মনে করা হতো, গণতন্ত্রের মধ্য দিয়েই উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু চীন, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা তা সমর্থন করে না। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ইমেরিটাস প্রণব কুমার বর্ধন যেমনটি বলেছেন, ‘ডেমোক্রেসি এন্ড ডেভেলপমেন্ট: এ কমপ্লেক্স রিলেশনশিপ’ বইয়ে। তাঁর মতে, “গণতন্ত্র অনেকসময় জনপ্রিয় দাবির প্রতি সংবেদনশীল—, যা আসলে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।”

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ভিন্ন। এখানে গণতন্ত্র বলতে বোঝানো হয় নির্বাচন এবং কতগুলো রাজনৈতিক কর্মসূচিকে। কর্মসূচিগুলো হলো— হরতাল, ধর্মঘট, অবরোধ, বিক্ষোভ, মিছিল ও সমাবেশ ইত্যাদি। আমরা এগুলোকেই গণতন্ত্রের উত্কৃষ্ট উপাদান বা রূপ হিসেবে বেছে নিয়েছি। আমি মনে করি, গণতন্ত্র আমাদের অবশ্যই লাগবে। কারণ গণতন্ত্রের বিকল্প গণতন্ত্রই। কিন্তু গণতন্ত্রকে খুঁজতে হবে ভিন্ন ফর্মে। অমর্ত্য সেন যেমনটি বলেছেন, তাঁর ‘দি আরগুমেনটিভ ইন্ডিয়ান্স’ বইয়ে। তাঁর মতে “উন্নয়ন মানে মুক্তি। সে অনুযায়ী গণতন্ত্র মানেই উন্নয়ন। উন্নয়ন বিষয়টির সঙ্গে রাজনৈতিক ও মানবিক মুক্তি, সামাজিক সুযোগ, স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা ও সুরক্ষার নিশ্চয়তার বিষয়গুলো যুক্ত।” তবে রাজনীতি কম হওয়াটাই বরং ভালো। কারণ বাংলাদেশে তথাকথিত রাজনৈতিক যুদ্ধংদেহী কর্মসূচিগুলোকেই রাজনীতি বলা হয়। কিন্তু সত্যিকার অর্থে যুদ্ধংদেহী এবং আক্রমণাত্মক কর্মসূচির মধ্যে কোনো রাজনীতি নেই। কাজেই যুদ্ধংদেহী এবং আক্রমণাত্মক কর্মসূচিনির্ভর রাজনীতি যত কমবে, ততবেশি উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, মানুষের কথা বলার অধিকার, মানবাধিকার, অর্থাত্ মৌলিক অধিকার বিঘ্নিত করতে হবে। অমর্ত্য সেন যেমনটি বলেছেন, গণতন্ত্রহীন কর্তৃত্ববাদী চীন, মালয়েশিয়া বা সিংগাপুরের তুলনায় আমাদের দেশের জনগণ ঐতিহ্যগতভাবে উদার গণতন্ত্রে বেশি আগ্রহী এবং মুক্ত আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের মধ্যেই সমাধানের পথ খুঁজতে অভ্যস্ত। যার কারণেই হয়ত টেলিভিশনের টকশোগুলো এত জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু রাজনীতির নামে আমাদের দেশে যেসব নেতিবাচক চর্চা হয়, তা কাম্য নয়। যেমনটি আমরা দেখেছি ২০১৪-১৫ সালে নির্বাচনের আগে ও পরে পেট্রোল বোমায় মানুষ পোড়ানো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট ধ্বংস, পশু, গাছপালা নিধনসহ নানা সহিংস কর্মকাণ্ড। আমরা যদি এই সহিংস রাজনীতি পরিহার করতে পারি, তাহলে উন্নয়নের সঙ্গে এ রাজনীতিকে একসঙ্গে যুক্ত করতে পারব।                                                                       


স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই আমাদের দেশে দীর্ঘ সময় সামরিক শাসন ছিল। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত আমাদের গণতন্ত্র কোনো না কোনোভাবে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি ছিল। আর এটা করা হয়েছিল ‘হ্যাঁ’ ‘না’ ভোট, তথাকথিত নির্বাচন কিংবা সংসদ চালাবার নামেই। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ক্যান্টনমেন্টেই থাকতেন। এমনকি বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ‘উত্তরপাড়াতেই’ ছিলেন। কাজেই আমাদের তথাকথিত গণতান্ত্রিক চর্চায় ক্যান্টনমেন্টের একটা প্রভাব ছিল। যদিও আমাদের পূর্বের নির্বাচন এবং সামনের নির্বাচনকে ঘিরে আলোচনা এবং সমালোচনার অনেক বিষয় রয়েছে। তারপরও আমরা কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই অগ্রসর হচ্ছি, কোনো সামরিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নয়। ১৯৭২-৭৩ সাল থেকে শুরু করে প্রায় ৩৪ বছর লেগেছে আমাদের মাথাপিছু আয় ৫২৩ ডলারে নিয়ে আসতে। কিন্তু ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল অর্থাত্ মাত্র ১০ বছরে আমাদের মাথাপিছু আয় ১৬শ ডলার ছাড়িয়েছে। মানুষের আয় বেড়ে যাওয়া গণতন্ত্রকে টেকসই করে, যেমনটি বলেছেন নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যাডাম পশেভোরেস্কি তাঁর ‘ডেমোক্র্যাসি এন্ড ডেভেলপমেন্ট: পলিটিক্যাল ইন্সটিটিউশন এন্ড ওয়েলবিয়িং ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড ১৯৫০-১৯৯০’ বইয়ে।

তার গবেষণায় দেখা যায় “গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় মানুষের আয় বেড়ে গেলে এবং একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছে গেলে সেদেশে আর কখনো গণতান্ত্রিক শাসনের পতন হয় না।” বর্তমানে আমাদের জাতীয় সংসদ কতটা কার্যকর? তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এর আগের সংসদ কতটা কার্যকর ছিল? কিংবা তারও আগের সংসদ, যেটা তথাকথিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল, সে সংসদ কেমন ছিল? আমরা বলি সংসদে বিরোধী দল থাকতে হবে, গণতন্ত্রে কথা বলার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু নবম জাতীয় সংসদে বিএনপি বিরোধী দল হিসেবে ৭৪ শতাংশ অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেনি। ৪১৮ দিনের মধ্যে মাত্র ১০দিন বিরোধী দলীয় নেত্রী সংসদে উপস্থিত ছিলেন। অষ্টম সংসদে বিরোধী দলের অনুপস্থিতির হার ছিল ৬০%। তাহলে মানে দাঁড়াচ্ছে, গণতন্ত্র হচ্ছে কেবল ভোট, নির্বাচন ও ক্ষমতা। দৈনন্দিন চর্চা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সবার অংশগ্রহণ নয়। গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বড় অনুষঙ্গ হচ্ছে বিতর্ক। অর্থাত্ যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিতর্কের মাধ্যমে সবার মতামত এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। সেখানেও সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংজ্ঞায় সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গণতন্ত্র নয়। এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃত ৭ মার্চের ভাষণে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘ন্যায্য কথা যদি একজনও বলে তবে তিনি যেই হোক না কেন, সংখ্যায় বেশি হলেও আমরা সেটা মেনে নিবো।’ প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র মানে সেটাই। বেশিসংখ্যক লোক বললো বলেই সেটা গণতন্ত্র এমন সংজ্ঞা অন্য দেশে থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের এখানে প্রযোজ্য নয়। বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ৭ মার্চের ভাষণে জাতির জনক গণতন্ত্র বলতে যা বুঝিয়েছেন, সেটা হলো ন্যায্য কথার গণতন্ত্র। মানুষ এবং সমাজ ব্যবস্থা এগিয়ে যাবেই, এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু সময় লাগবে। পৃথিবী নামক গ্রহটি প্রায় চারশ’ কোটি বছরের পুরোনো। প্রায় ৪০ কোটি বছর আগ পর্যন্ত ডাইনোসরের অস্তিত্ব ছিল। ফুল, ফল, বৃক্ষ ৩০ কোটি বছর আগে থেকেই ছিল। কিন্তু মানুষ বলতে আমরা যাদেরকে বুঝি তাদের বয়স দুই লাখ বছর এবং বস্ত্রপরা মানুষের বয়স ৩৫ হাজার বছরের বেশি না। কাজেই সভ্যতার বিকাশে সময় লেগেছে। ইউরোপ এবং আমেরিকার দেশগুলোতে উদার গণতন্ত্র বলতে আমরা যা বুঝি, তা শত শত বছরের পরম্পরার মধ্য দিয়ে এসেছে। আমাদের মতো অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণতন্ত্র একটি নাজুক ফর্মে রয়েছে। অর্থাত্ নাজুক ফুলের মতো। অর্থাত্ গণতন্ত্র একটু আঘাত পেলেই ঝলসে যায়। আমেরিকান চিন্তাবিদ রবার্ট কেগান তাঁর “ইজ ডেমোক্রেসি ডিক্লাইন?” বইয়ে উল্লেখ করেছেন, গণতন্ত্রের মধ্যে বিভিন্ন আগাছা জন্মায়। কাজেই গণতন্ত্রের যত্ন করতে হয়। আর এই যত্ন বলতে তিনি বুঝিয়েছেন গণতন্ত্রের সাথে অর্থনৈতিক সামঞ্জস্য। অর্থাত্ গণতন্ত্রের নেপথ্যে অবশ্যই অর্থনৈতিক সমর্থন থাকবে। সেখানে যদি অর্থনৈতিক বৈষম্য ব্যাপক একটি পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। বর্তমানে পৃথিবীতে ১% লোকের হাতে ৫০% লোকের সম্পদ কুক্ষিগত। দুই বছর আগেও শতকরা ৪৮% লোকের সম্পদ ছিল ১% লোকের কাছে। ইকুইলিটি ট্রাস্ট এক গবেষণায় বলেছে— যুক্তরাজ্যের ১০০ ধনী ব্যক্তি সেদেশের মোট জনসংখ্যার ৩০%-এর সমপরিমাণ সম্পদের মালিক। অক্সফার্মের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৯ সালে ৮০% মানুষ মোট বৈশ্বিক সম্পদের মাত্র ৫.৫%-এর মালিক ছিল। বর্তমানে বিশ্বের ৬২ জনের কাছে ৩৬০ কোটি জনের সমপরিমাণ সম্পদ আছে। এটা দুই বছর পূর্বে ছিল ৮০ জনের কাছে। কাজেই মানুষের সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে। আমরা যেটাকে পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র কিংবা ভোটাভুটির গণতন্ত্র বলছি, অর্থাত্ মিডিয়ায় অবাধ কথা বলার গণতন্ত্র, সবকিছুই হুমকির সম্মুখীন হবে যদি  আয় বৈষম্য ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। কাজেই পেটে ক্ষুধা থাকলে সুন্দর সুন্দর গণতন্ত্রের কথা আর বের হবে না।

গণতন্ত্র অবশ্যই মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং মানবাধিকারের নিশ্চয়তা বাড়ায়। আমরা রাস্তায় বৃদ্ধ লোকের রিকশায় উঠব কিনা। তখন মনে হবে এতো বুড়ো লোকের রিকশায় আমি উঠবো কী করে? তার কষ্ট হবে। তার কষ্টের কথা চিন্তা করে রিকশায় না উঠলে তিনি দুপুরে খেতে পারবেন না। কাজেই বৃদ্ধের রিকশায় উঠব কী উঠব না, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ওই বৃদ্ধ দুপুরে খেতে পারবে কী পারবে না। গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন বলতে বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন নিয়ামক রয়েছে। তবে গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন একসাথে করার জন্য দরকার উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। কেবল উন্নয়ন করলেই হবে না। কারণ সিরিয়া, ইরাক এবং মিশরে উন্নয়ন হয়েছিল। কিন্তু ডলারের ভিত্তিতে উচ্চ ও মধ্য আয়ের দেশগুলো টিকেনি। না  টেকার কারণ হচ্ছে গণতন্ত্রহীনতা। সেখানে মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা ছিল না। সৌদি আরব এখন মাথাপিছু আয়ের হিসাবে অনেক ধনী। অর্থবিত্ত, প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ। সৌদি বাদশা যেখানে যাচ্ছেন, সেখানে বিমানে করে স্বর্ণের সিঁড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আমি মনে করি, সৌদি আরবের সে অর্থনীতিও টিকবে না। কারণ সৌদি আরবে যে শাসন ব্যবস্থা বিদ্যমান, তাতে আগামী ২০/৩০ বছরের মধ্যে তাদের  অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

নগরের সকলের ভোটে ক্ষমতা পালাবদলের যে ব্যবস্থা গ্রিক থেকে এসেছে, সেটাই তো গণতন্ত্র। আমরা দীর্ঘ সময় ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিলাম। কাজেই আমাদের এখানে গণতন্ত্রের কাঠামোও সেই ধাঁচের। বিশেষ করে ব্রিটিশ কাঠামোর। ভারতের সাথেও আমাদের গণতন্ত্রের মিল রয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই আসল গণতন্ত্র। সমাজে অন্যের ভালো মতামত গ্রহণ করার মন-মানসিকতা তৈরি না করা পর্যন্ত গণতন্ত্র সফল হবে না। এটা করতে না পারলে পাঁচ বছর পরপর সরকার পরিবর্তন হবে কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। অর্থাত্ সরকারের পরিবর্তন হবে। আর ধর্ম আমাদের এখানে একটি বড় ফ্যাক্টর। ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগ প্রথম ঘোষণাপত্র দেয়। সেখানে বলা ছিল, রাষ্ট্র হচ্ছে ইহজাগতিক, ধর্ম হচ্ছে পরজাগতিক। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা স্থান পেয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রথম ঘোষণাপত্রেই ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল। বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় ধর্ম হয়ে যায় প্রধান ইস্যু। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ধর্মকে ব্যবহার করার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। রংপুর সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হিন্দুদের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। এসব ঘটনার নেপথ্যে রাজনৈতিক স্বার্থ নিহিত আছে। এদেশের প্রায় সব নির্বাচনের সময়ই আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রধান হাতিয়ার হয় ধর্ম। এছাড়া তাদের আর কোনো পথ নেই। একাদশ সংসদ নির্বাচনেও এর কোনো ব্যতিক্রম হবে না। গণতন্ত্রের চর্চা আর ধর্মের অপচর্চা একসাথে চললে কোনোদিনই গণতন্ত্র টেকসই হবে না।