Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

গণতন্ত্রের জন্য একমাত্র বাঙালি গণহত্যার শিকার হয়েছে : ইমতিয়াজ আহমেদ

বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক। তিনি ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল থেকে এসএসসি, ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে দি অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে এমএ এবং পরে কানাডার কার্লেটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি করেছেন। যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বুদ্ধিজীবী হত্যা ও স্বাধীনতা ছাড়াও সমকালীন বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোকাম্মেল হোসেন

যুগান্তর : বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রভাব কতটা ব্যাপক বলে মনে করেন?

ইমতিয়াজ আহমেদ : বড় আকারে দুটো বিষয়; একটা তো কোনো সন্দেহ নেই- যাদের মারা হয়েছে, তাদের শূন্যস্থান পূরণ করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। যেসব শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে, তাদের অনেকেই সিনিয়র প্রফেসর ছিলেন। আরেকজন প্রফেসর জি সি দেব অথবা মুনীর চৌধুরী তৈরি করা খুবই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ব্যক্তি হিসেবে তারা কী ছিলেন সেটা বাদ দিলেও তাদের যে অভিজ্ঞতা, সেটাই তো বিশ-ত্রিশ বছরের; এ ধরনের অভিজ্ঞ মানুষদের হারানো মানে নিঃসন্দেহে জাতির পিছিয়ে পড়া। আরেকটা বিষয়- এ ধরনের জেনোসাইড মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভীতি ও আতঙ্ক তৈরি করে, ফলে তারা সৃষ্টি করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, সৃজনশীল কাজে তাদের উৎসাহ কমে যায়। এতে যেটা ঘটে তা হল, তরুণ প্রজন্মের অনেকেই মনে করতে থাকে- দেশে থাকলে হয়তো নতুন ধরনের বিপদের সম্মুখীন হতে হবে; তার চেয়ে বরং বিদেশে চলে যাই। এই যে বাইরে চলে যাওয়ার প্রবণতা, এটাকে ইংরেজিতে ‘ব্রেন ড্রেন’ বলা হয়। এটাও বড় আকারে হয়েছে। বলা চলে, দুদিক থেকেই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। একটা হল সিনিয়রদের রিপ্লেসমেন্টের বিরাট অভাব। দ্বিতীয় হল, তরুণ প্রজন্ম ভীতিকর অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে দেশ থেকে চলে গেছে। এই দুটো বিষয় তৃতীয় একটা সমস্যার জন্ম দিয়েছে এবং এটা খুবই উল্লেখযোগ্য। এক ধরনের মিডিওকারের খপ্পরে পড়ে যাচ্ছি আমরা। পড়ে গেছিও অনেকটা। একটা মিডিওক্রিটির মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পড়ে গেছে। ফলে দেখছি, এখানে জ্ঞানচর্চার বড় অভাব। বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে চিন্তাভাবনারও বড় অভাব। আমরা যেটাকে ইন্টেলেকচ্যুয়াল ফোর্স বলি- যারা একটা স্বাধীন ফোর্স হিসেবে কাজ করবে, সৃষ্টির মধ্যে থাকবে, এক ধরনের নতুন ইমাজিনেশনের মধ্যে থাকবে- সেটা আর থাকল না। বড় ক্ষতি হয়ে গেছে।

যুগান্তর : জাতির মেধাবী সন্তানরা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার না হলে আজকে বাংলাদেশের যে চিত্র আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা নিশ্চয়ই ভিন্ন হতো?

ই. আ. : ভিন্ন যে হতো, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। যুদ্ধের সময় সাধারণত যেমনটা হয়, অনেকেই মাঝখানে পড়ে মারা যায়। বুদ্ধিজীবী নিধনের ক্ষেত্রে তো এমনটি ঘটেনি।

যুগান্তর : টার্গেট কিলিং?

ই. আ. : হ্যাঁ। এটা হচ্ছে তালিকা করে বেছে বেছে হত্যা করা। টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা যখন ঘটে- এর মানে হল, হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ব্যক্তিরা তাদের মেধা, চিন্তা-চেতনা, জ্ঞানবুদ্ধি ও দক্ষতা ইত্যাদি কারণে হত্যাকারীদের অ্যাটেনশন পেয়েছিল।

যুগান্তর : তারা বেঁচে থাকলে স্বাধীন বাংলাদেশ অন্যরকম হতো।

ই. আ. : তা তো বটেই। তারা হয়তো অন্যভাবে সাজাতে পারতেন বাংলাদেশকে। মিডিওকারদের দাপটও কমে যেত। তাদের মেধা, জ্ঞান, কর্মদক্ষতা ও সৃজনশীলতা প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারতেন। বড় আকারে অবদান রাখতে পারতেন। সেটা তো তারা পারলেন না।

যুগান্তর : পাকিস্তান অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এদেশীয় দোসরদের মাধ্যমে বুদ্ধিজীবী নিধন সম্পন্ন করেছে। এ অপরাধে দেশের বেশ ক’জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। একই অপরাধের জন্য পাকিস্তানকে বিচারের কাঠগঠায় দাঁড় করাতে বাধা কোথায়?

ই. আ. : দুঃখজনক হল, আমরা আজ পর্যন্ত একাত্তরের বিষয়টা জাতিসংঘকে দিয়ে রিকগনাইজ্ডই করাতে পারলাম না! এটা নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। বিচারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় হল, ডকুমেন্টেশনগুলো ঠিক করা। এভিডেন্সগুলো ঠিক করা। কিছু অবশ্য আছে; আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এভিডেন্সগুলো নতুন করে ঠিক করা দরকার। সেই জায়গায় ঘাটতি থাকলে চলবে না। এসব ক্ষেত্রে হৈচৈ করে কিছু করা যায় না। আর্মেনিয়ান জেনোসাইডের স্বীকৃতি পেতেও একশ’ বছর লেগেছে। যেভাবে তারা ডকুমেন্টেশন করেছে, যেভাবে তারা গবেষণা করেছে, আমরা যদি সেটা মিডিওকার দিয়ে করাতে চাই, তাহলে হবে না। এমনভাবে গবেষণা করা দরকার...

যুগান্তর : নির্মোহভাবে?

ই. আ. : হ্যাঁ, যেটা দেখে সবাই বলবে, দিস ইজ রিয়েল। ওই জায়গায় না গিয়ে আমি যদি কেবল হৈচৈ করি, তাহলে হবে না। এ ব্যাপারে রাষ্ট্র বড় ধরনের সাহায্য করতে পারে। পাকিস্তানের অনেক মানুষ কিন্তু মনে করে, তাদের সামরিক বাহিনী বাংলাদেশে যে জেনোসাইড করেছে, তার একটা সমাধান প্রয়োজন। তাদের ভাবনায় এটাও আছে- চারপাশে বিচরণকারীদের অনেকেই বাংলাদেশে গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এটা তাদের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয় এজন্য যে, গণহত্যায় যুক্তরা ওখানেও অনেক কিছু করে ফেলতে পারে। এ অবস্থায় আমি যদি জেনোসাইডকে আরও স্পেসিফিক করে আন-ল’ফুল কিলিং হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তাহলে পাকিস্তানকে ধরা সহজ হবে। তবে এজন্য আমাদের গবেষণার মান বাড়াতে হবে।

যুগান্তর : মুক্তিযুদ্ধকে অনেকেই জনযুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করেন। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

ই. আ. : সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ যারা করেছে, যারা অস্ত্র হাতে নিয়েছে, তারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এখানে মনে হয় কিছুটা পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। একটা হল, একাত্তরে আমি নবম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় আগরতলায় গিয়েছিলাম। আমি কখনই সেখানে যেতে পারতাম না, যদি মাঝি আমাকে সাহায্য না করত। লঞ্চের সারেং সাহায্য না করত। যে কৃষকের বাড়িতে আমরা ছিলাম, সে আমাদের ভাত খাইয়েছে। এখন মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে আমি একটা সার্টিফিকেট নিয়ে নিলাম, অথচ যে কৃষক আমাকে খাওয়ালো, যে সারেং বা মাঝি নদী পার করে দিল- সে মুক্তিযোদ্ধা হল না; এ ব্যাপারে মনে হয় চিন্তাভাবনা করা দরকার। আমি মনে করি, তারাও মুক্তিযোদ্ধা। তারা তো আমাকে ধরিয়েও দিতে পারত। আমার মনে আছে, হোমনাতে পাকিস্তান আর্মি আসার পর ওই সারেংই বলে দিচ্ছিল আমাদের- কোথায় উঠতে হবে, কিভাবে কথা বলতে হবে ইত্যাদি। এর মানে সেও মুক্তিযোদ্ধা। আমার মনে হয়, যারা সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা- এ ব্যাপারে তাদের সোচ্চার হওয়া উচিত এবং বলা উচিত, সাধারণ মানুষ আমাকে সাহায্য করেছে বলেই আমি মুক্তিযোদ্ধা হতে পেরেছি।

যুগান্তর : আপনি বলতে চাচ্ছেন, সাধারণ মানুষ যে ভিত তৈরি করেছে, তার ওপর দাঁড়িয়েই মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে?

ই. আ. : হ্যাঁ। মাও সেতুংয়ের একটা বিখ্যাত উক্তি আছে- গেরিলা হল পানির মধ্যে মাছ যেমন, তদ্রূপ। পানি ছাড়া মাছ থাকতে পারে না। মাও সেতুংয়ের মতে, জনগণের মাঝেই থাকে গেরিলা। গেরিলা জনগণের বাইরে নয়। কাজেই সাধারণ মানুষের অবদানেরও মূল্যায়ন হওয়া উচিত। তাদের ছাড়া তো একাত্তর সম্ভবই ছিল না। কৃষক হয়তো কিছু বলবে না, কিংবা ওই সারেং বা মাঝি হয়তো চুপ করেই থাকবে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, তাদের মধ্যে বড় একটা চিন্তা আসবে- এত কিছু করলাম, কিন্তু কিছুই তো পেলাম না। আমি মনে করি, যারা সরাসরি যুদ্ধ করেছে, এ ব্যাপারে তাদের এগিয়ে আসা উচিত এবং বলা দরকার- দেখো, আমরা কিন্তু সফল হতে পারতাম না, যদি রিকশাচালক আমাকে নিয়ে না যেত। মাঝি যদি আমাকে পার না করত। কৃষক যদি আশ্রয় না দিত, খাবার না দিত। এই যে বিষয়গুলো, আমার মনে হয় এগুলো আলোচনায় আসা দরকার। কারণ আমরা তো আসলেই একটা গণযুদ্ধের মধ্যে ছিলাম।

যুগান্তর : ক্ষমতার পালাবদলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বারবার বিকৃত হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে কি?

ই. আ. : যে কোনো দেশেই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সুগ্রন্থিত হতে একটু সময় লাগে। কারণ এর পেছনে অনেক ধরনের রাজনীতি থাকে। এজন্য এ কাজ সঠিক ও সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজন একেবারে প্রফেশনাল ইতিহাসবিদ। আমাদের এখানে যেমন আর সি মজুমদার ছিলেন, যদুনাথ সরকার ছিলেন। আমি মাঝে মাঝে ভাবি- আর সি মজুমদার, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন; চিন্তাই করা যায় না, একজন ভিসি ওই পরিমাণ বই লিখবেন। তবে আমি যথেষ্ট আশাবাদী- এ কাজের জন্য যে মানসিকতা ও সৃজনশীলতা প্রয়োজন, সেটা একসময় আসবেই। এজন্য হয়তো আমাদের আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে।

যুগান্তর : প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। এ সমস্যা কিভাবে নিরসন করা যেতে পারে?

ই. আ. : এর সমাধান খুব সহজেই করা যেতে পারে। আমাদের যখন আদমশুমারি হয়, সেখানে কতগুলো প্রশ্ন সন্নিবেশ করে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। আগেও বলেছি, ইতিহাসকে সুগ্রন্থিত একটা কাঠামোর মধ্যে আসতে আসতে যে কোনো দেশেই চল্লিশ-পঞ্চাশ-একশ’ বছর লেগে যায়। তারপর আস্তে আস্তে একটা অবজেক্টিভ পর্যায়ে পৌঁছা সম্ভব হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিখুঁত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব রয়েছে। এক্ষেত্রে গবেষকদেরও একটা বড় ভূমিকা আছে।

যুগান্তর : প্রশাসনিক এবং দলীয়ভাবে তালিকা করার বিষয়টি কতটা যুক্তিযুক্ত? দলীয় কাঠামোর বাইরে গিয়ে চিন্তা করা উচিত নয় কি?

ই. আ. : হ্যাঁ। এক ধরনের দলীয়করণ তো হয়েই গেছে। যে দলই ক্ষমতায় আসে, তারা তাদের মতো করে তালিকা সাজায়। এক্ষেত্রে আমার মনে হয়- যারা সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা, তাদেরই বলা উচিত, এনাফ! অনেক হয়েছে, এই রাজনীতির মধ্যে আমরা নেই। এতে সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধারাও কিন্তু বিব্রত হচ্ছেন।

যুগান্তর : আসল, না ভেজাল- এ প্রশ্ন চোখে নিয়ে মানুষ সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে, এটা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অবমাননাকর নয় কি?

ই. আ. : অবশ্যই। এজন্য মুক্তিযোদ্ধাদেরই বলা উচিত- আমি অস্ত্র হাতে নিয়েছি সত্য, কিন্তু যে আমাকে পথ চলতে সাহায্য করেছে, আমার যাত্রা নির্বিঘœ করেছে, সেও মুক্তিযোদ্ধা। তাহলে আর তালিকার সমস্যাটা থাকে না। সমস্যা হল, আমরা তো শুধু একটা তালিকায় থেমে নেই। আবার নতুন করে তালিকা চাচ্ছি। সরকার ও মুক্তিযোদ্ধারা মিলে যদি এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয়, তাহলে আজকে যে বিতর্ক- আমি মনে করি, সেটা থাকবে না।

যুগান্তর : ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ায় আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাজ অনেকটাই কমে গেছে। এখন তারা কী নিয়ে অগ্রসর হতে পারে?

ই. আ. : এটা ঠিক, বড় আকারের বিচার আর খুব একটা নেই বললেই চলে। আমি মনে করি, বাংলাদেশে এ ধরনের বিচারের প্রয়োজন ছিল। কারণ এর সঙ্গে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন জড়িত। এখন করণীয় হচ্ছে বিচারের দলিলপত্রগুলো ভালোভাবে জনগণের মধ্যে উপস্থাপন করা। আমাদের একটা বড় সমস্যা হল, মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ ভাগ পড়ালেখা জানে না। যারা পড়ালেখা জানেন, তাদের পক্ষেও আদালতের ভাষা বোঝা কঠিন। কী কারণে বিচারে কারও ফাঁসি হল, কারও যাবজ্জীবন হল, আবার কাউকে খালাস দেয়া হল- এসব বিষয় দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছে স্পষ্ট হওয়া দরকার।

যুগান্তর : মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এক্ষেত্রে আমরা কতটুকু এগিয়েছি?

ই. আ. : পৃথিবীতে অনেক জেনোসাইড হয়েছে। কম্বোডিয়ায় পলপট জেনোসাইড, হুতু-তুতসির জেনোসাইড, ইহুদি জেনোসাইড ইত্যাদি। কিন্তু একমাত্র বাংলাদেশেই জেনোসাইড হয়েছে গণতন্ত্রের জন্য। সাধারণত মনে করা হয়- একটা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক অবস্থাগুলো একসঙ্গে এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশের বেলায় কতগুলো এগিয়ে গেছে। কতগুলো পিছিয়ে গেছে। এক সময় বাংলাদেশের রাজনীতি অনেক এগিয়েছিল। রাজনীতি এগিয়েছিল বলেই এদেশের মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল- বাংলাদেশ আলাদা দেশ হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ- এটাও রাজনীতির বিষয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর দেখা গেছে, রাজনীতির মধ্যে এমন কতগুলো সমস্যা তৈরি হয়েছে যার সমাধান হচ্ছে না। মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানের চেয়েও এগিয়ে আছে। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও কয়েকটি বিষয়ে আমরা এগিয়ে গেছি। কিন্তু রাজনীতি- যেটা এগিয়েছিল, বিশেষ করে গণতন্ত্র-গণতন্ত্রায়ন, এ জায়গাটায় আমরা পিছিয়ে গেছি। এদিকে দৃষ্টি দেয়া দরকার। গণতন্ত্র মানেই নির্বাচন- এমন একটা ভাবনা আমাদের কাজ করে। গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়। নির্বাচন তো হিটলারও করেছিল, মুসোলিনিও করেছে। নরেন্দ্র মোদিও নির্বাচন করেই জিতেছেন। কিন্তু চিন্তার জগতে গণতন্ত্রায়ন, সিভিল সোসাইটির গণতন্ত্রায়ন, রাজনৈতিক দলের মধ্যে গণতন্ত্রায়ন- এসব ক্ষেত্রে আমরা একটা জায়গায় আটকে আছি। এখানে পরিবর্তন প্রয়োজন।

যুগান্তর : আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি একসময় ফিকে হয়ে যাবে?

ই. আ. : আমরা যে চেতনার কথা বলি, সেটা কিন্তু এখনও বড় আকারে মানুষের মনে রয়ে গেছে। এটা হল, বাংলাদেশের ভালো চাওয়া। এখানে বিতর্কটা হল, আমি কিভাবে বাংলাদেশের ভালো চাচ্ছি? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে তো এমন হওয়া উচিত নয়- ওই ব্যক্তিদেরই স্মরণ করতে হবে! ইতিমধ্যে তাদের অনেকেই হয়তো অন্য রাজনীতির মধ্যে চলে গেছেন বা বিচ্যুত হয়েছেন। আমি বাংলাদেশে বড় ধরনের উন্নয়ন চাচ্ছি, যেখানে জনগণের ক্ষমতায়ন হবে- এ চেতনা যদি তরুণ প্রজন্মের মন-মননে থাকে, তাহলে তারা এটাকে ধরে রাখতে পারবে। বাংলাদেশে এখনও শতভাগ মানুষ শিক্ষিত নয়। আমাদের চেতনার মধ্যে বড় একটা বিষয় থাকা উচিত জনসংখ্যার শতভাগ শিক্ষিত করা। যদি শতভাগ শিক্ষিত করতে পারি, তাহলে একাত্তরের বড় একটা চেতনা পূরণ হবে। আর যদি তা না করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রাজনীতিকরণের মধ্যে আবদ্ধ থাকি, তাহলে বেশিদূর অগ্রসর হওয়া যাবে না।

যুগান্তর : পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রশ্ন উঠেছে। বিচার করা যাবে কি?

ই. আ. : যে চুক্তি হয়েছে, তাতে এটা একেবারেই সম্ভব নয়। কেবল পাকিস্তানিদের মধ্যে জনমত তৈরি করেই এটা করা সম্ভব। পাকিস্তানের জনগণ যখন দেখবে এরা আসলেই যুদ্ধাপরাধী, তারা বেসামরিক মানুষ মেরেছে, নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে, তখন পাকিস্তানের আইনস্বীকৃত অপরাধ হিসেবেই এসব অপরাধের বিচার হবে। একটা ভুল হয়েছে, ১৯৫ জনের ট্রায়ালটা করা উচিত ছিল। তাহলে আমাদের হাতে প্রমাণ থাকত। অবশ্য তখন একটা কমপালশন ছিল, পাকিস্তানের স্বীকৃতির একটা ব্যাপার ছিল, বাংলাদেশীদের দেশে ফিরিয়ে আনার একটা ব্যাপার ছিল। তারপরও আমরা যদি প্রমাণ রেখে দিতে পারতাম, পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্ম দেখত যে, এরা আসলেই যুদ্ধাপরাধী।

যুগান্তর : আপনি সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। এ সম্পর্কে বলুন।

ই. আ. : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু ’৭১ সালে গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে- কর্তৃপক্ষ মনে করল এ নিয়ে গবেষণা ও চর্চা হওয়া দরকার। সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ এভাবেই গড়ে উঠেছে। এটা ফ্যাকাল্টি অব স্যোশাল সায়েন্সের অধীনস্থ একটি ডিপ্লোমা কোর্স।

যুগান্তর : সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে পারবে?

ই. আ. : এটা গবেষণার বিষয়। আমরা এ লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছি।

যুগান্তর : আপনার কি মনে হয়নি, স্বাধীনতা লাভের পরপরই এ ধরনের একটি সেন্টার গড়ে তোলা উচিত ছিল আমাদের?

ই. আ. : আমি একটু অবাক হয়েছি- এটা কেন তখন কেউ চিন্তা করেনি? আমরাও বলতে গেলে অনেক পরে চিন্তা করেছি।

যুগান্তর : সঙ্গে সঙ্গে করা হলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিতর্কের সুযোগ অনেক কমে যেত!

ই. আ. : হ্যাঁ। সঙ্গে সঙ্গে করা গেলে আজকে যেসব ডকুমেন্ট নিয়ে সমস্যা হচ্ছে, সেটা হতো না। সেগুলো উদ্ধার করতে গিয়ে এখন অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে।

যুগান্তর : সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ে নয় ফোঁড়।

ই. আ. : একজাক্টলি। তবে আমি মনে করি, শুরু তো করা গেছে। লেট ইজ বেটার দ্যান নাথিং।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

ই. আ. : ধন্যবাদ।