Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

ইতিহাসকে নিজের পক্ষে বয়ান করার একটা প্রবণতা আমাদের দেশে প্রবল, যা প্রকৃত ইতিহাস চর্চাকে ব্যাহত করে --- বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখিকা ফাতেমা মিয়া

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৮

সমাজে গড়পরতা মানুষের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা নিজ পরিবারের পাশাপাশি নিজের সমাজ, দেশ তথা পৃথিবী নিয়ে চিন্তা করেন। তেমনি একজন অসাধারণ মানুষ ফাতেমা মিয়া। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখিকা ফাতেমা মিয়া ইংরেজি ভাষায় লিখেছেন ইতিহাসভিত্তিক বই  Unspoken। ১৯৭১ এ বাংলাদেশে চলমান গণহত্যা, মার্কিন যুক্তরাস্ট্র, আরব বিশ্বসহ মুসলিম দেশগুলোর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এবং এর পূর্বাপর নানা প্রাসঙ্গিক বিষয়কে উপজীব্য করে বইটি লেখা। ২০১৪ সালের শেষ দিকে বইটি প্রকাশের পর বইটি নিয়ে ফাতেমা মিয়া'র এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেন বর্তমানে লন্ডনে নির্বাসিত বাংলাদেশী মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী শাহ আলম ফারুক। দীর্ঘ তিন বছর পর স্পেন ভিত্তিক একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে এ বছরের মার্চে সংক্ষিপ্ত আকারে সাক্ষাৎকারটি প্রথম ছাপা হয়। বোস্টন বাংলা নিউজ ডটকম  পাঠকদের জন্য বিজয়ের ৪৬ তম বার্ষিকী উপলক্ষে সাক্ষাৎকারটি বর্ধিত কলবরে প্রকাশিত হলো ।

alt

• শাহ আলম ফারুক : আপনি আরো বই লিখেছেন বিশেষ করে Ache in my heart, Friendship Offer  Rejection এর মত আলোচিত ফিকশন, যে গুলো আন্তর্জাতিকভাবে পাঠক সমাদৃত হয়েছে । তা ফিকশন থেকে হঠাৎ করে ইতিহাসের মত বিষয়ে Unspoken বইটি লেখার চিন্তাটা কেমন করে আসলো ?

•• ফাতেমা মিয়া : ২০১১ এ পাকিস্তানীরা আমাকে ভাল করে ধাক্কা দিয়েছে । তারা কোন এককারণে হঠাৎ করে দেখাতে চাইতেছিল, তারা বাংগালীদের ধর্ম নাই বলে মন্তব্য শুরু করে দিয়েছে। বাংগালির কালচার নিয়ে ব্যংগ করা শুরু করছিল। বাংগালির বাচ্চারা পর্যন্ত ইতিহাস জানে না। তখন আমি আমার বাচ্চাদের ইতিহাস জানাই। সাথে সাথে আমাদের কিছু ইমেল সার্কুলেশন গ্রুপ ছিল, সেগুলোতে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ ও বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে লিখতে শুরু করলাম। এক পর্যায়ে চিন্তা করলাম এ সব নিয়ে একটা বই করা যায়। আর সে সূত্র ধরেই আমার এই বই।

• শাহ আলম ফারুক: তা বই লেখার প্রস্তুতি টা কেমন ছিল -
•• ফাতেমা মিয়া : আমার কাছে অনেক ইনফরমেশন ছিল। আমি আমার ২২ বছর আগের সংগ্রহ করা ইনফরমেশনগুলো নতুন করে খোঁজা শুরু করলাম। এছাড়া অন্য অনেকের কাছে তথ্য সহযোগিতা চাইলাম। কিন্তু কেউ দেয় না। কেউ কেউ অনেক কন্ডিশন দিল। কেউ কেউ তাদের সাথে নিয়ে কাজ করতে বললো। আমি রাজী হলাম না। মানুষ অনেক বেশি পলিটিক্যাল। তাদের অনেকের মতামতের সাথে আমি একমত ছিলাম না। ইন্ডিয়ার দু একজনের সাথে যোগাযোগ হলো। তারা অনেক ডকুমেন্ট দিল। এতে তাদের ভার্সনটা পেলাম ! কিন্তু নানা কারণে সেগুলো ঠিক সেভাবে ব্যবহার করতে পারি নি। সে যাক প্রথমত: আমার আব্বা থেকে পাওয়া জ্ঞান দিয়ে শুরু। ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থেকে বাংলাদেশ। ৭১ এর ঘটনাবলীর বিষয়ে আমার বড় আপার চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা এবং বোধের বিষয় লেখায় রাখার ইচ্ছে হলো । বাংগালি জাতির গুণ, বেদনা, আশা ও সম্ভাবনার কথা লিখার তাড়না ছিল মনে। ৭১ নিয়ে কিছু রেফারেন্সের দরকার ছিল। শাহ আলম ফারুক (সাক্ষাৎকার গ্রহীতা) শেষের দিকে কিছু বাংলা বই দিলেন, সে বইগুলো থেকে কিছু তথ্য নিলাম। আমার আব্বা চাচাদের ভূমিকা নিয়ে অনেক লেখার আছে, লেখার ছিল। শেষ পর্যন্ত যদিও উনাদের সম্পর্কে যদিও ঠিক সেভাবে লেখা হয়ে উঠেনি।
• শাহ আলম ফারুক : আপনি দেশ থেকে অনেক দূরে আছেন। আপনি কি মনে করেন যদি দেশে থাকতেন তাহলে অনেক বেশি তথ্য পেতেন, বইটি লিখতে আরো সুবিধা পেতেন ?

•• ফাতেমা মিয়া : আমি মনে করি না। বাংলাদেশ থেকে লেখা যেত না। বাংলাদেশে তুমি আওয়ামী লীগ হতে হবে, বিএনপি হতে হবে নইলে এরশাদ পার্টি হইতে হবে ! মুজিবর রহমান বংগবন্ধু হইতে হইবে, জাতির পিতা হইতে হইবে। না হলে উনার বিরোধী হইতে হইবে, তোমার জিয়াউর রহমানকে পছন্দ হইতে হইবে। মুসলিম হলে তুমি ফানাটিক বা নাস্তিক হতে হবে। লাকুম দি নুকুম - যার ধর্ম তার কাছে। অথচ আমাদের ওখানে দেখা যায়-মুসলিম হলে অন্য ধর্মকে ঘৃণা করতে হবে, আমি মানি না। বাংলাদেশে থাকলে নিজের মত করে লিখতে পারতাম না। ইতিহাসকে নিজের মত করে বোঝা নিজের পক্ষে বয়ান করার একটা প্রবণতা আমাদের দেশে প্রবল। যা প্রকৃত ইতিহাস চর্চাকে ব্যাহত করে।

• শাহ আলম ফারুক : বাংলাদেশের গণহত্যা, বাংলাদেশের জন্ম প্রক্রিয়া নিয়ে মূলত: আলোচনা করেছেন। এই বইতে ১৩ টি অধ্যায় আছে। এই অধ্যায়ের পরিকল্পনা কেমন করে হয়েছে ?
•• ফাতেমা মিয়া : বিভিন্ন বিষয় আলাদা করে এটার ব্যাকগ্রাউন্ড, থিম আর কনকুলেশন করে বইটি লিখতে চেয়েছি। বাংগালির ঐতিহ্য, মর্যাদা স্ট্যাটাস যে অনেক উপরে ছিল, এ ব্যাপারগুলো মাথায় রেখে। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয় পূর্ববতী ২০০/৩০০ বছরের ব্রিটিশ ভারতের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী। একাত্তরের গণহত্যা এবং সমকালীন বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী জাতি গোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া - গণহত্যার সময় পাকিস্তানী শাসকগোস্ঠীর প্রতি বিশেষত: আমেরিকার সমর্থন, আরব ও মুসলিমবিশ্বের নীরবতা। এ সব বিষয়ে অধ্যায়ভিত্তিক আলোকপাত করেছি।

• শাহ আলম ফারুক : বইটি লেখার পেছনে অন্য কোন অনুপ্রেরণা কি ছিল ?
•• ফাতেমা মিয়া : ইতিহাস মানুষের জানা উচিৎ। এত বড় একটা গণহত্যা, এটা নিয়ে সবার কথা বলা উচিত। ২০১১ এ স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তির সময় অনেক কথা হলো আমাদের কমিউনিটিতে। যা নিয়ে স্থানীয় পাকিস্তানীদের অনেকে অসন্তুষ্ট ছিল। তখন আরো বেশি করে মনে হলো কিছু ঐতিহাসিক সত্য সবার জানা উচিত। অনেক জিনিস এটার মধ্যে কাজ করেছে।
• শাহ আলম ফারুক : আমরা জানতে পেরেছি(২০১৭), Unspoken এর ড্রাফট পান্ডুলিপি দেখে বাংলাদেশের খ্যাতনামা প্রকাশক বইটি বড় আকারে ছাপাবার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ ব্যাপারটা নিয়ে লেখিকা'র চিন্তা ভাবনা কি?

•• ফাতিমা মিয়া : সময় সুযোগ বুঝে অবশ্যই বইটি বড় আকারে ঢাকা ভিত্তিক প্রকাশক ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড
( ইউপিএল) কে দেবার ইচ্ছে আছে।

• শাহ আলম ফারুক : গত তিন বছরে বইটি ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাঠকের কাছে গেছে। পঠিত হয়েছে। তা বইটির বিষয়ে ২০১৭ এর শেষ দিকে এসে পাঠক-সমালোচকদের মতামতকে কিভাবে মূল্যায়ণ করবেন?

•• ফাতেমা মিয়া : সচেতন পাঠকের মতামত আমাকে মুগ্ধ করেছে। এতে লেখক হিসেবে দায়বদ্ধতার বিষয়টি আরো বেড়ে গেছে বলে মনে করি।

• শাহ আলম ফারুক : বইটি লেখা, প্রকাশনা, বিপনন ও প্রসারের ব্যাপারে স্বজন-বন্ধু-পরিচিতদের সহযোগিতা কেমন ছিল? এ ক্ষেত্রে বিশেষ কোন স্মৃতি কি আপনার মনে পড়ে ?

•• ফাতেমা মিয়া : সবচেয়ে মজার ঘটনাটি ঘটেছে কলকাতা এয়ারপোর্টে। ঢাকা থেকে কলকাতায় যাবার সময় আমাদের পরিচিত এক জনের কাছে কিছু বই দেয়া হয়েছিল। সেখানে বিক্রি ও সৌজন্য হিসেবে কিছু মানুষকে দেবার জন্য। বইয়ের কাভারে আল কায়েদা শব্দ দেখেই এয়ারপোর্টে বই গুলো জব্দ করা হয়।
দেখুন ভাল কাছে সাধারণভাবে সহযোগিতা সে ভাবে পাওয়া যায় না। তবে এক বন্ধুর সহযোগিতা প্রচেস্টার কথা বলতেই হয়। এখানে তার নাম বলে তাকে ছোট করতে চাই না।

alt
• শাহ আলম ফারুক : গত ক বছর ইউ কে'র কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রীর জন্য আপনার নাম প্রস্তাব ও সংক্ষিপ্ত তালিকায় বিবেচিত হয়েছে। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন? এমন বিরল সম্মানে ভূষিত হলে আপনার অনুভূতি কেমন হবে?

•• ফাতেমা মিয়া : হ্যাঁ জেনেছি কটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাব ও সংক্ষিপ্ত তালিকায় বিবেচিত হয়েছে। এটা অবশ্যই লেখক হিসেবে অনেক আনন্দের। গর্বের ও বিষয়। আমার স্বজনদের কেউ কেউ খুবই উৎসাহী, এমন সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রী পেলে অবশ্যই তা অনেক বড় স্বীকৃতি ।
• শাহ আলম ফারুক :
লেখালেখি এখন কেমন চলছে?

•• ফাতেমা মিয়া : চলছে কম বেশি । তবে খুব বেশি না। অবশ্য বাংলা মিরর নামের লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকাতে নিয়মিত লিখছি।

• শাহ আলম ফারুক : পাঠকদের সবশেষে কি বলবেন

•• ফাতেমা মিয়া : সবাই অনেক বেশি সবাই পড়ুক। কিছু সত্য সবার জানা উচিৎ, বিশেষত: নিজ দেশ জাতির বিষয়ে। এটা নিয়ে ভবিষ্যতে আরো কাজ করার ইচ্ছে। সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়েও লেখার ইচ্ছে আছে।

 
উল্লেখ্য, Unspoken বইটিতে পাক সেনাবাহিনীর নৃশংস গণহত্যা এবং পাকিস্তানী এলিট ও রাজনৈতিকদের আচরণের সাথে ধর্মের নামে সাম্প্রতিককালে আফ্রিকা ও আরবে যে উগ্রপন্থী কর্মকান্ড চলছে, সে বিষয়ে যোগসুত্র ও সামন্জস্যের ব্যাপারে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ আছে। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী ও তাদের দোসরদের চলমান গণহত্যায় আমেরিকার প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সহায়তা, মুসলিম বিশ্বের নীরবতার বিষয়ও তথ্য ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ৭১ সালের গণহত্যার ভয়াবহতা, সমাজ জীবনে এর প্রভাব, যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ের নানাদিক প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতায় আনস্পোকেন বইটিতে উঠে এসেছে। ৭১এর গণহত্যাকে কেন্দ্র করে লেখা বইটিতে পূর্ববতী দুই শ বছরের ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ রাজত্ব, সমাজ, রাজনীতি-সংস্কৃতির বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। বইটি বর্তমানে আমেরিকার ম্যানহাটান, বেলজিয়ামের এনথ্রুপ, ঢাকার আজিজ সুপার মার্কেট, প্যারিস, টরেন্টো, কলকাতার কলেজ স্ট্রিট ও ইউ কে তে পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া অনলাইনে আমাজান, Ebay তে পাওয়া যাচ্ছে।
লেখিকা ফাতেমা মিয়ার জন্ম সিলেটের ওসমানীনগর থানার খাদিমপুরে। শৈশবে তিনি পারিবারিকসূত্রে ব্রিটেনে আসেন।তিনি সপরিবারে দীর্ঘ দিন ধরে ওয়েস্ট মিডল্যান্ডের অভিজাত এলাকা সলিহলে বসবাস করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই পুত্র সন্তানের গর্বিত জননী।
সাক্ষাৎকার গ্রহণে : শাহ আলম ফারুক
এই ইমেইল ঠিকানা স্পামবট থেকে রক্ষা করা হচ্ছে।এটি দেখতে হলে আপনাকে JavaScript সক্রিয় করতে হবে।