Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

“স্বাধীনতা যুদ্ধে দুই মহান নেতার নেতৃত্ব “ = প্রদীপ মালাকার

রবিবার, ১৫ এপ্রিল ২০১৮

নিউইয়র্ক থেকে : দুই নেতার একজন হলেন বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অপর জন হলেন ৭১-এ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী ও ঐ সময়ের বাঙালীর বিপদের অকৃত্রিম বন্ধু শ্রীমতিন্দিরা গান্ধী।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান জন্মের পর থেকেই পাকিস্তানী সামরিক, বেসামরিক শাসক গোষ্ঠীর আচরণ ও বৈষম্যের কারণে খুবই ক্ষুব্ধ ছিলেন। প্রতিবাদ করতে গিয়ে বহুবার জেল খেটেছেন। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র আন্দোলন ও ৬৯’র গণঅভ্যুত্থানে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার নেতৃত্ব দিয়ে বাঙালী জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। একবার বঙ্গবন্ধু কারারুদ্ধ হলেন খুব সম্ভবত ৬৬’র শেষ দিকে এবং কারাগারে কমিউনিস্ট পার্টি প্রধান মনি সিং এর সাথে দেখা হয়। বঙ্গবন্ধু মনিবাবুর সাথে আলাপচারিতায় পূর্ব পাকিস্তানকে কিভাবে স্বাধীন করা যায় সেই বিষয়ে মত বিনিময় করেন। এ বিষয়ে কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন জেনারেল সেক্রেটারী মরহুম ফরহাদ সাহেব তার রচিত বইয়ে উক্ত তথ্যটি উল্লেখ করে যান। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটি শুধুই একটি নিছক মামলা ছিল না। এ মামলাটি মিথ্যা হলেও শাসক গোষ্ঠীর কাছে বঙ্গবন্ধু ছিলেন পাকিস্তানের সংহতির প্রতি হুমকি স্বরূপ। ইতিপূর্বে ১৯৬৫ইং সনের ৬ই সেপ্টেম্বরের পাক ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণভাবে শত্রুর দয়ায় অরক্ষিত থাকে। তখন থেকেই বঙ্গবন্ধু নিজেদের পায়ে দাড়ানোর কথা সক্রিয় ভাবতে থাকেন। তারপর ১৯৭০ এ উপকূল অঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ গোর্কির কারণে দশলক্ষ মানুষের সলিল সমাধিতে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর অবহেলা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য বঙ্গবন্ধুকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার প্রশ্নে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেন। বঙ্গবন্ধু ধাপে ধাপে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে ৭০-এ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে পাকিস্তানের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। সামরিক জান্তা বাঙালীদের হাতে ক্ষমতা চলে যাচ্ছে দেখে সেইদিন থেকেই ষড়যন্ত্র শুরু করে দেয়। এবার দেখা যাক ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, আমি যদি তোমাদের আদেশ দিতে নাও পারি, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলো। অর্থাৎ তিনি জানতেন শত্রু আক্রমণ করবে। সেইক্ষেত্রে তিনি আটক বা নিহতও হতে পারেন। পাশাপাশি তিনি আরও বলেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বাঙালী যখন রক্ত দিতে শিখেছে দরকার পড়ে আরও রক্ত দিবে; ইনশাল্লাহ্ বাঙালীকে মুক্ত করে ছাড়বোই। এখানেও রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি প্রতিরোধের ইঙ্গিত দিয়ে যান। বঙ্গবন্ধু আরও মনে করতেন বাঙালীর মুক্তির সনদ ৬ দফা সামরিক জান্তা কখনও মেনে নিবে না। পশ্চিমারা মনে করতো ৬ দফা দাবী মানার অর্থই হবে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত শাসনের নামে বিনা বাধায় পাকিস্তানের সংহতি বিপন্ন হওয়া। তার উপর ৭ই মার্চের জনসভা থেকে বঙ্গবন্ধুর ৪ দফা শর্ত ঘোষণা ছিল গোদের উপর বিষফোড়া। কাজেই বঙ্গবন্ধু প্রচন্ডভাবে বিশ্বাস করতেন পাকিস্তানীরা এ সকল দাবী মেনে নিবে না। বঙ্গবন্ধুর এ সকল দাবীর ব্যাপারে ছিলেন অনমনীয়। কাজেই পাকিস্তানীরা যে শক্তি প্রয়োগ করবে সে ব্যাপারে তিনি আগেভাগেই সতর্ক ছিলেন। সেই জন্য ৭ই মার্চের পরে ও আগে ঢাকা ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন হলে বিশেষ করে ইকবাল হল, জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল, মোহসীন হলে বাঁশের কিংবা ডামী রাইফেলের মাধ্যমে ট্রেনিং চলতো। প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়, মার্চ মাস এলেই টিভি চ্যানেলগুলোতে ঐ সময়ের মহড়া দেখানো হয়। এই জন্যই সামরিক জান্তার শ্যোন দৃষ্টি ও ক্ষোভ ছিল এ সকল হলগুলির উপর এবং সার্চ লাইট অপারেশনে প্রথমেই এই হলগুলোতে আক্রমণ চালানো হয়। জেঃ ইয়াহিয়া লোক দেখানো মিটিং এর নামে তার দলবল ও ভুট্টোকে নিয়ে ঢাকায় আসেন বঙ্গবন্ধুর সাথে মিটিং করার জন্য এবং পাশাপাশি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও সৈন্য সমাবেশ করতে থাকেন।

২৩শে মার্চ বঙ্গবন্ধু আলোচনার অগ্রগতি না দেখে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে বলেন, শত্রু শক্তি প্রয়োগ করবে নিশ্চিত। আক্রমণ করার সাথে সাথে তিনি যেন অন্যান্য সহকর্মীদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে গিয়ে বিপ্লবী সরকার গঠন করেন। সবশেষে যখন চুড়ান্তভাবে আলোচনা ভেঙ্গে যায় এবং বঙ্গবন্ধুর কাছে খবর পৌছে ইয়াহিয়া ২৫শে মার্চ ক্যান্টনমেন্টে সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে মিটিং করছেন তৎক্ষণাৎ বঙ্গবন্ধু তার সহকর্মী সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দিন আহমেদ, কামরুজ্জামান, মনসুর আলীসহ অন্যান্য নেতাদের সাথে মিটিং করে তাদের নির্দেশ দেন তারা যেন নিরাপদ স্থানে চলে গিয়ে বিপ্লবী সরকার গঠন করেন। এ প্রসঙ্গে বিরোধী বিএনপি নেতাদের আরেকটি প্রশ্নের আলোচনা না করলে বঙ্গবন্ধুর ক্যারিশমা ও কুশলী নেতৃত্ব সম্বন্ধে ধারণা করা যাবে না। বিরোধী প্রতিপক্ষ নেতারা প্রায়ই বলে থাকেন, পাক বাহিনীর হামলা শুরু হলে বঙ্গবন্ধু কেন জাতিকে অরক্ষিত রেখে এবং সকল নেতাদের ছেড়ে পাক বাহিনীর কাছে ধরা দেন। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি দৈনিক জনকন্ঠে প্রকাশিত বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও কলামিস্ট অধ্যাপক মুনতাসির মামুনের লেখা ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ মুজিবনগর সরকার ছিল ধারাবাহিকতার ফসল’ শিরোনামে লেখা থেকে জানা যায় শাহরিয়ার কবিরের নেওয়া এক সাক্ষাতকারে সংসদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুতার জানিয়েছেন ১৯৬৯ সালে লন্ডনে ভারতীয় কতৃপক্ষের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলোচনা হয়। বঙ্গবন্ধুর অভিপ্রায়ে ১৯৬৪ সালে বিএলএফ বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের অনুকাঠামো গঠিত হয়। তিনি আরো বলেন, ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারীতে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভারতের সাহায্যের বিষয়টি চুড়ান্ত করার জন্য যে আলোচনা করেছিলেন সেখানে বিএলএফ নেতাদের সম্ভাব্য গেরিলা প্রশিক্ষণের বিষয়টি বিশেষভাবে স্থান পেয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ১৮ই জানুয়ারী পুরো বিষয়টি তাজউদ্দিনকে জানিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, চিত্তরঞ্জন বাবু শাহরিয়ারকে আরও জানিয়েছিলেন ২৫শে মার্চের আগে বঙ্গবন্ধু তাকে কলকাতা পাঠিয়েছিলেন দুইটি বাড়ী ভাড়া করার জন্য। যাতে সময় এলে আওয়ামী নেতৃবৃন্দ জড়ো হয়ে সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। সম্প্রতি ভারতে তৎকালীন ১৯৭১ সনের বিএসএফ প্রধান রুস্তমজীর আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে যেসব তথ্য বিধৃত হয়েছে তার সঙ্গে চিত্তরঞ্জনের সাক্ষাতকারের মিল ও ধারাবাহিকতা আছে। ২৫শে মার্চের আগে ইন্দিরা গান্ধী রুস্তমজীকে প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন। বিএসএফ-এর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান গোলক মজুমদার রুস্তমজীর নির্দেশে ২৬শে মার্চের পরে তাজউদ্দিন আহমদকে খুঁজে বের করেন এবং দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠকের ব্যবস্থা করেন। কাজেই বঙ্গবন্ধু জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার পাশাপাশি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাহায্য, সহযোগিতা ও গেরিলা যুদ্ধের ব্যবস্থাও করে যান। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চ সহকর্মীদের প্রচন্ড চাপের মুখে দেশবাসীকে ছেড়ে যেতে রাজী হননি। তিনি বলেছিলেন, আমি জাতির এই দুর্যোগময় সময়ে চলে গেলে জাতি ভুল বুঝবে এবং  হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে না পেয়ে অনন্যোপায় হয়ে আরও বেশি হত্যা চালাবে। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু যদি দেশের মুক্তাঞ্চলে আশ্রয় নিয়ে নেতৃত্ব দিতেন; তাহলে নিজ দলে যেখানে বিশ্বাসঘাতক, কনফেডারেশনের সমর্থক ও সুবিধাবাদী খন্দকার মোশতাকের মত নেতারা রয়েছেন, সেখানে বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা বা স্বাধীনতা সংগ্রাম বিঘিœত হওয়ার সম্ভাবনাই ছিল বেশি। আর ভারতে আশ্রয় না নিয়ে তিনি বিচক্ষণতার কাজটিই করেছেন। প্রথম প্রথম ভারত সরকারের কাছে বঙ্গবন্ধুর গুরুত্ব থাকলেও পরবর্তীতে আর সেটা থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। ভারতের মাটিতে অবস্থান করে নিজ মত প্রকাশের স্বাধীনতাও থাকবে না। ২৫শে মার্র্চ রাতে মিটিং শেষে সহকর্মীদের বিদায়ের ঘন্টা দুয়েক পর আসেন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ ও ফজলুল হক মনি। বঙ্গবন্ধু তোফায়েলের হাতে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে তাদের বলেন দেশের বাহিরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার জন্য। তোফায়েল ও মনি পায়ে ছুঁয়ে সালাম করে চলে যাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু পিলখানার ইপিআর-এর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেন। এবং সেই সাথে নিজ পরিনাম জানা সত্ত্বেও  নিজ বাসভবনে অবস্থান করেন।  এখানেই রাজনীতির সুদক্ষ দাবা খেলোয়াড়ের মত বঙ্গবন্ধুর দুর্লভ নেতৃত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। ছাত্রজীবনে ইংরেজী প্রবন্ধে পড়েছিলাম থ্রি কোশ্চেনস্ অর্থাৎ তিনটি প্রশ্ন। এই তিনটি প্রশ্ন বঙ্গবন্ধুর জীবনে সফল প্রয়োগ দেখা যায়। তিনটি প্রশ্ন হলো, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত, সঠিক সময়ে সঠিক শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করা বা সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করা। অর্থাৎ ৭ই মার্চের ভাষণে নির্দিষ্ট সময়ে জনগণকে জানানো, সঠিক সময়ে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সঠিক সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম সংগঠিত করা।

অপরদিকে আরেক নেতা ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের সাথে অপর নেতা ইন্দিরাগান্ধীর নেতৃত্বের কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যদিও দুই দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন থাকলেও ৭১এ মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের সাথে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বের কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর বিশাল নেতৃত্বের কিছু খন্ডিত অংশ এখানে আলোচনা করা যাক।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতের সেনা প্রধান জেনারেল মানেকশর নেতৃত্বে অপর দুই বিমান ও নৌবাহিনী প্রধানকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ইন্দিরাগান্ধীর সাথে দেখা করতে যান। সময়টা সম্ভবত আগস্টের মাঝামাঝি। তখন বাংলাদেশে প্রবল বন্যার প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ইন্দিরা গান্ধী জেনারেল মানেকশকে দেখেই কুশলাদি বিনিময়ের পর জিজ্ঞেস করেন, মুক্তিবাহিনীর খবর কি? জবাবে জেঃ মানেকশ জানায়, মুক্তিবাহিনী কোনরকমে পাকবাহিনীর সাথে লড়ে টিকে আছে। আমরা আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি শুধু আপনার আদেশের জন্য। বাংলাদেশে এখন প্রবল বন্যা চলছে। পাক বাহিনীর অধিকাংশ জোয়ান সাঁতার জানে না। মুক্তি বাহিনী জনগণ পক্ষে আছে, আপনি আদেশ দিলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নিতে পারব। ইন্দিরাগান্ধী একথা শুনে তির্যকভাবে তাকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলেন, আমরা কেন পাকিস্তান আক্রমণ করতে যাব? আক্রমণ করলে এতদিন যাবৎ পাকিস্তান যে ভারতের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে আসছিল তা মুসলিম বিশ্ব, পশ্চিমা বিশ্ব, জাতিসংঘ তথা বিশ্ববাসীকে বুঝতে সক্ষম হবে। পাকিস্তান বলবে, এই দেখো, আমরা যে এতদিন বলছি ভারত আগ্রাসী, সা¤্রাজ্যবাদ এবং অনুপ্রবেশকারী পাঠিয়ে পাকিস্তানের অখন্ডতা নষ্ট করছে, এই আক্রমণই তার প্রমাণ। আমরা তা করবো না। আপনি সামরিক নেতা, সামরিক ক্ষেত্রে আপনি যথেষ্ট অভিজ্ঞ। রাজনীতির দাবা খেলা তথা আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলা আপনারা বুঝবেন না। সময় হলে অবশ্য অবশ্যই পাকিস্তান তার স্বার্থে ভারত আক্রমণ করবে। কাজেই ভারত পাকিস্তান আক্রমণ করবে না। মনে রাখুন, আমি যদি আপনাদের আদেশ দিতে নাও পারি আপনারা শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন। হামলা হওয়ার সাথে সাথে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। এ আমার আগাম আদেশ। তার কয়েক মাস পর অর্থাৎ অক্টোবরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মেরুকরণ ঘটে। দীর্ঘদিন বুর্জোয়া আমেরিকার সাথে কমিউনিস্ট চীনের যে হিম শীতল সম্পর্ক ছিল পাকিস্তানের জোর দূতিয়ালির কারণে হেনরি কিসিঞ্জারের চীন সফরের মাধ্যমে তা উষ্ণ সম্পর্কে পরিণত হয়। এই ঘটনায় ইন্দিরাগান্ধী খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লে গান্ধীজির বিচক্ষণ ও গুণধর বাঙালী রাজনৈতিক উপদেষ্টা ডি.পি. ধরের পরামর্শে অপর সুপার পাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ২০ বৎসরের মৈত্রী চুক্তি করেন। এই চুক্তির প্রথম ও প্রধান শর্ত ছিল, দুই দেশের যে কোন একটি দেশ তৃতীয় পক্ষ দ্বারা আক্রান্ত হলে একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে যাবে। এই চুক্তির ফলে উপমহাদেশসহ আন্তর্জাতিক রাজনীতির চেহারা পাল্টে যায়। চুক্তি হওয়ার কয়েকদিন পরে পুনরায় গান্ধিজী তিন বাহিনীর প্রধানদের তার অফিসে ডেকে পাঠান। আবারও মিসেস গান্ধিজী জেনারেল মানেকশকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থা জানতে চাইলে, মানেকশ বলেন, ভাল নয় একটি আধুনিক সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর সাথে ১৭দিনের ট্রেনিং আর পুরাতন অস্ত্র দিয়ে কতদিন টিকে থাকা যায়, গান্ধিজী নির্দেশ দিলেন এখন থেকে কালবিলম্ব না করে মুক্তিবাহিনীকে আগের চেয়ে দ্বিগুণ অত্যাধুনিক সব ধরণের অস্ত্র, রসদ ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক সাহায্য পাঠাবার দ্রুত ব্যবস্থা করুন। মুক্তি বাহিনীর দামাল ছেলেরা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র পেয়ে নতুন উদ্যোমে পাক বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়লে রণাঙ্গনের চেহারা পাল্টে যায়। নভেম্বরে দেখা যায় রণাঙ্গণে পাকিদের বিভিন্ন চৌকিতে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা হামলার পাশাপাশি সম্মুখযুদ্ধও দেখা যায়। আধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার, পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিবাহিনীর চাপ বেড়ে যাওয়া ও তাদের হাতে ভারতীয় অস্ত্রের ব্যবহার দেখে পাক বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে। অবশেষে মুরুব্বী যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শে জেনারেল ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ৩রা ডিসেম্বর ভারতের অমৃতসর, জয়পুর, জম্মুকাশ্মীরসহ বিভিন্ন শহরে বিমান, আক্রমণ করলে তৎক্ষণাৎ ভারতীয় বাহিনীর পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তখন ৩রা ডিসেম্বর কলিকাতায় প্যারেড গ্রাউন্ডের জনসভায় থাকাবস্থায় আক্রমণের খবর পেয়েই তাৎক্ষণিকভাবে হেলিকপ্টারে চড়ে রাজধানীতে যাওয়ার পথেই আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা দেন। পূর্ব রণাঙ্গনে ১৩ দিনের যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করে একটি নূতন স্বাধীন দেশ ও জাতির জন্ম লাভে সাহায্য করে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

উপরিল্লিখিত ঘটনার মধ্য দিয়েই দুই নেতার দুর্লভ নেতৃত্ব ও দুরদর্শিতার সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। আলাদাভাবে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক নিয়ে লেখার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আমার উপরিল্লিখিত ক্ষুদ্র লেখাটির বিবরণীতে বঙ্গবন্ধু ধাপে ধাপে জাতিকে প্রস্তুত করা, নেতৃত্ব ও মাহেন্দ্রক্ষণে স্বাধীনতার ঘোষণার কথা উল্লেখ আছে। তারপরেও দুই একটা কথা না বললে হয় না। দেশের সর্বোচ্চ আদালতেই প্রমাণিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু আটক হওয়ার পূর্বে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। এরপরও এ বিষয়ে বিতর্ক করা সংবিধান ও আদালত অবমাননার শামিল।

যারা জেনে শুনে নিজেরা ইতিহাস বানাতে চায় বা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় ইতিহাসের নিজস্ব গতিধারায় একদিন এসকল জ্ঞানপাপী শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতারা এমনভাবে ছিটকে পড়বেন যে একদিন তাদের ছাত্র, ভক্তরা তাদের খোঁজও নিবে না। যে সকল ছাত্র/ভক্তদের মিথ্যা ইতিহাস পড়ানো হচ্ছে. মগজ ধোলাই করা হচ্ছে, একদিন তারাই সত্য জানার পর এসকল শিক্ষক, রাজনীতিককে ঘৃণা করবে। বেশি দূরের ইতিহাস নয়, পলাশী যুদ্ধের অন্যতম খলনায়ক রবার্ট ক্লাইভ দেশে ফিরে গেলে নবাব সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে অন্ধকোপের মিথ্যা প্রচারণার কারণে দেশের মানুষ তাকে শাস্তি দেয় ও ঘৃণা করে। এরকম অসংখ্য উদাহরণ আছে। আজ যারা বিশেষ মহল বা গোষ্ঠীকে খুশী বা মনোরঞ্জনের জন্য জাতির গর্ভভরা মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করতে চায় ইতিহাস তাদের শাস্তি দিবে এটাই ইতিহাসের অমোঘ বিধান।