Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

আরব আমিরাতের জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন

বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৮

বাপ্ নিউজ : আরব আমিরাত থেকে :কেবল আনন্দ আর আনন্দ। উল্লাস আর উচ্ছ্বাস। নেই কোনো বেদনার কালো ছায়া। নেচে গেয়ে বাংলার চিরায়ত সাজে নববর্ষকে বরণ করছেন সবাই। সবারই প্রত্যাশা, নতুন বছরটি হবে ভালো, আরও ভালো। অনুভূতিটা সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির প্রবাসী বাঙালির। এই এখানে গত শুক্রবার (২০ এপ্রিল) বরণ করে নেওয়া হচ্ছে বৈশাখকে। বাংলাদেশ দূতাবাসের আয়োজনে বাংলাদেশ স্কুল অডিটোরিয়ামে সেদিন এসেছিলেন তারা প্রাণের সাজে। তারা শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। মিলছেন একজন আরেকজনের সঙ্গে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী এ মানুষ বিলিয়ে দিচ্ছেন নিজেকে।

Picture
দিনের প্রথমভাগেই স্কুলে জড়ো হতে থাকেন মানুষ। তারা মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেন। লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে অডিটোরিয়াম, নিমতলা, শহীদ মিনার চত্বর। সবুজ মাঠের পাশ দিয়ে উঠে আসা রাস্তাটি ছিল নরনারী ও শিশু-কিশোরদের কলকাকলিতে মুখর।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনামঞ্চ থেকে সমবেত কণ্ঠে সংগীত পরিবেশিত হচ্ছিল তখন। নজরুল ইসলাম সার্থকভাবে বাংলার প্রকৃতিকে বর্ণনা করেন। পল্লি জননীর রূপকে দেখে মুগ্ধ এই মাটি বাতাসে লালিত তার সন্তান। একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী-জননী। জীবনানন্দ এ জন্যই কখনো ছাড়তে চাননি প্রিয় মাতৃভূমিকে। বারবার ফিরে আসতে চেয়েছেন বাংলার নদী, মাঠ, খেত ভালোবেসে। রবীন্দ্রনাথ দেশমাতার জন্য ঢেলে দিয়েছেন প্রাণের অর্ঘ্য।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযোজিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান তখন দর্শক সারিতে বসা। কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। বাঙালির সংস্কৃতি তাঁর ভালোবাসা। তাঁর আছে দেশ মানুষের ওপর অবিচ্ছেদ্য টান। তিনি বলেন, বহু ব্যঞ্জন প্রস্তুত করে নারীর আপ্যায়ন এই গুণটিকে আরও বেশি ঋদ্ধ করে। তার ঐতিহ্য অসাম্প্রদায়িকতা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা মঙ্গল শোভাযাত্রায় সেটি স্পষ্ট। তিনি বলেন, এমন আয়োজনের মধ্য দিয়ে এসব চিত্রই আমরা বিদেশিদের সামনে হাজির করতে চাই।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনাকায়মনোবাক্যে আমাদের প্রার্থনা, নতুন বছরটিতে আমাদের জীবন ভরে উঠবে সুখ শান্তি ও আনন্দে। সে কারণেই প্রত্যাশার অভিব্যক্তি নিয়ে সংগীত। ‘এসো এসো হে বৈশাখ’। গাইলেন শিল্পীরা। উচ্চারিত হলো, অগ্নি স্নানে পবিত্র হওয়ার কামনা। আয়োজনে ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালানোর আহ্বান ছিল। রাতের অন্ধকারে যে আলোই কাম্য।
বঙ্গবন্ধু পরিষদের ইফতেখার হোসেন বাবুল। তিনি অনুষ্ঠান উপভোগ করছিলেন। কবি, গায়ক বা শিল্পীরা নতুন কিছু উপহার দিয়ে যাচ্ছেন। বললেন, মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের হাতিয়ার হয়ে উঠুক তাদের এ প্রয়াস।মঙ্গল শোভাযাত্রাবাবার কোলে মেয়ে কিংবা মায়ের হাত ধরে ছোট ছেলেটি এসেছে আজ নববর্ষ উদ্‌যাপনে। সে দেখছে মঞ্চে ছোটদের নাচ। তাদের চলাচল চোখ-মুখের প্রকাশ স্বপ্নরাজ্যে নিয়ে যায় তাকে। নিজেকে ভাবে তাদেরই একজন। দেখে সাজানো দই, মিষ্টি, পিঠে পায়েস। এক সময় খায়ও। দৃশ্যটি আকর্ষণ করে সবাইকে।
বাংলাদেশ সমিতির সভাপতি প্রকৌশলী মোয়াজ্জেম হোসেন। তারও আনন্দ ছোটদের নিয়ে। আবেগের দিন আজ। বলেন, প্রবাসে বাংলা নববর্ষ হয়ে উঠুক ছোটদের জন্য বাংলা শিক্ষারও এক উদ্যোগ।
আধ্যাত্মিকতার মর্মবাণী প্রচার পায় গানে। দেখেছি রূপ সাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা। পূর্ণদাস বাউল কী সৃষ্টিই না করেছেন! এতে বিরহ আছে, আছে আকুতি। মানুষ মন্দ বললে কী হবে! শিল্পীর গান হয়ে ওঠে বাউল মনের অভিব্যক্তি। পাশাপাশি ছিল ‘ধানের খেতে রৌদ্র ছায়ার লুকোচুরি খেলা’ গানের সঙ্গে নৃত্য। সমবেত নৃত্য ছিল ‘মাঠের সবুজ থেকে সূর্যের লাল’ গানের সঙ্গে। ওরা নাচে প্রাণ খুলে। নৃত্যে তাক লাগিয়ে দেয় রাবেয়া নুর ও তার দল। আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা তারই কোরিওগ্রাফির ফসল।
জনতা ব্যাংকের স্টলঅধ্যক্ষ মীর আনিসুল হাসান সবাইকে স্বাগত জানান। স্কুলে এবারই প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। তিনি বলেন, এ আমাদের অভাবনীয় অনুভূতি! শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণ না বলে পারেন না। বলেন, মুখস্থ নয়, নতুন বইয়ের গন্ধ নিতে নিতে শিশুরা জ্ঞানের ভুবনে প্রবেশ করে। তার মন্তব্য, এমনই নান্দনিক বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা।
বৈশাখ ডালপালা মেলে রঙে রসে রূপে বৈচিত্র্যে ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামে নগরে, দেশ থেকে দেশান্তরে। ধর্ম-বর্ণ শ্রেণি পেশা নির্বিশেষে পরিণত হয়েছে বাঙালির প্রাণের উৎসবে। ছোট এক শিল্পী গান করবে এই আহ্বান জানিয়ে সঞ্চালক এমনটিই বলছিলেন। নদীর মাঝি বলে, এসো নবীন! অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দূতাবাসের প্রথম সচিব রিয়াজুল হক।
চলো বাংলাদেশ নামের এক চমক ছিল অনুষ্ঠানে। ফুটবল নিয়ে আসে এক শিশু। সাইকেল চালিয়ে যায় আরেক কিশোর। ব্যাট বল নিয়ে ক্রিকেট খেলায় ব্যস্ত ছেলেরা। আনন্দময় শৈশব। লাল সবুজের পতাকা হাতে চলে তারা। শেষে দেখায় উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ। ফারলুনা হক পরিচালনা করেছেন। পরিচালক আগেই অণু পর্বটি দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন আমাকে। হাসি ভরা মুখে বলেছিলেন, অধমের নৈবেদ্য। অন্যদের মতো সেটি আমিও দেখি। মুগ্ধ হই।
বৈশাখী অনুষ্ঠানে আগত কয়েকজনমননের সঙ্গে সবার পোশাকেই ছিল উৎসব আমেজ। নারীরা লাল সাদা নীল কিংবা বাসন্তীসহ নানা রঙের শাড়ি পরে এসেছেন। টায়রা পরেছেন অনেকে। এমন দলে লাকি হালদার উল্কা, নাজনীন এজাজ, মৈত্রেয়ী বড়ুয়া ও সাইফুন্নাহার জলি। তারা ছোটাছুটি করেছেন। আয়োজনে শীর্ষস্থানীয় একজনতো বলেই ফেললেন, চলছে মিছিলের ললনারা! মিছিলের তরুণীরা এদিন ছবি তুলেছেন প্রাণভরে।
জনতা ব্যাংকের স্টলে তাসনুভা ইসলাম। কত্থক কন্যা এক। রসমঞ্জুরীর শিক্ষার্থী। পরিচয় করিয়ে দিল তার ছায়ানট ও মেডিকেল সায়েন্সের শিক্ষার্থী পুষ্পাকে। কয়েক দিন হলো তার এখানে আসা। সেখানে বসা তখন তার আর এক বোন ও মা। ছিলেন শরীফুন্নাহার জনি। অনন্য সময় কাটছে তাদের।
মহিলা সমিতির বৈশালীতে সবাই উন্মুখ তাদের ভালো লাগা প্রকাশ করতে। নতুন আশা, নতুন উদ্দীপনা নিয়ে শুরু করছি নতুন বছর। বললেন এলি হাসান। আঞ্জুমান আরা শিল্পী বলেন, ছোট এক বাংলাদেশ পেয়ে গেছি। হোসনে আরা ভূঁইয়া দিনটিকে অপেক্ষার প্রহর বললেন।
আনোয়ারা আক্তার ও নাসরিন মুস্তাফিজ দূতাবাসের রূপসী বাংলা স্টলে আপ্যায়নে ব্যস্ত। প্রাণের বৈশাখ উদ্‌যাপন করতে পেরে আমাদের আনন্দের সীমা নেই, তারা দুজন বললেন প্রায় সমস্বরে। বঙ্গবন্ধু পরিষদের ইষ্টিকুটুম স্টলের সামনে দেখলাম ইমরাদ হোসেন ইমু ও আবু তাহেরকে। বন্ধুর আলাপ হয়। ‘আহার বিহার’ ব্যস্ত শুভার্থীদের সামলাতে। রুবাইয়া নিশাত ও সোমা রায় এগিয়ে এলেন। নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় হয়।
নিমতলায় আসি। সেখানে স্টল নিয়ে বসেছে আহালিয়া এক্সচেঞ্জ, ট্রান্সফাস্ট, প্রাণ ড্রিংক, ইনডেক্স এক্সচেঞ্জ আর আল হারামাইন পারফিউম। তারা জনসংযোগ শক্তিশালী করার জন্য চেষ্টা নেয়। বাইরে স্কুল মাঠে তাঁবু খাটানো হয়েছে। যারা ভিড় ঠেলে ভেতরে যেতে চাননি, এখানে টিভির পর্দায় মঞ্চের অনুষ্ঠান দেখেছেন। নাবিলা, ফাহিমা ও মার্জিয়া। তারা সতীর্থ। এক সময় এখানে পড়াশোনা করেছেন। এখন পেশা জগতে। এই এখানে রাস্তায় সেলফি তোলার আনন্দ তাদের। আমার ক্লিক এড়ায় না।
দর্শকদের একাংশবাইরে উন্নয়ন মেলা নিয়ে বিশাল এক বোর্ড। রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান অবশ্য এ সম্পর্কেও বলছিলেন। উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ এখন স্যাটেলাইট, পারমাণবিক শক্তিতেও অগ্রগামী। আমি উল্লেখ করি, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কথা। তিনি বলেন, গৌরবের এই সমাচারও ভিন দেশিদের সামনে তুলে ধরতে চাই।
লালনের শিক্ষা, মানুষই সেরা মানুষই প্রধান। মানুষকে স্নেহ, মমতায়, প্রেমপ্রীতিতে ধরে রাখতে পারলেই পূর্ণতা আসে। মানুষকে ভালোবাসার মধ্য দিয়েই একজন তার সার্থকতা পান। সেই গান সেই বন্দনা। আর এক শিল্পী গেয়ে শোনান ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী।’
মহিলা সমিতির সভাপতি জাকিয়া হাসনাত ইমরান। তার তৃপ্তি, এত মানুষের ভিড় দেখে। তিনি জানতে চাইলেন, কিছু খেয়েছি কিনা! বাঙালি কন্যা বলে না কথা। একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পপি রহমান তারই পাশে বসা। তারা আমন্ত্রণ জানালেন সমিতির বৈশাখ উদ্‌যাপনে। আমরা আনন্দ চিত্তে বলি, আসব। আমরা বলছি এই জন্য যে আমার সহধর্মিণী ছিলেন সঙ্গে।
ড. অধ্যাপক মেহরাজ জাহান এসেছেন আরেক অধ্যাপক ওই ডিউকে নিয়ে। যায়েদ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ওই নারী। দুজনই বললেন, অনন্য একটি সময় কাটল।
অধ্যাপক আবু তাহের, দুই প্রাধ্যক্ষ কাজী আবদুর রহিম ও মোকলেসুর রহমান শাহিন মঞ্চের পেছনে কাজ করছেন। তারা নেপথ্যে ছোটদের প্রস্তুত করে দিচ্ছেন। ভালোটি উপহার দিচ্ছেন দর্শকের জন্য। আমি প্রাণের কথা বলি তাদের সঙ্গে।
কুশলাদি বিনিময় হয় গণমাধ্যমের জাহাঙ্গীর কবির বাপ্পির সঙ্গে। আমরা দাঁড়িয়ে। বেলায়েত হোসেন হিরোও অংশ নেন সে চলমান আড্ডায়। মঞ্চে গান গেয়েছেন পুন্না শবনম। মুক্তিযোদ্ধার কন্যা। ঈদ আয়োজনে তার গানের খবর ছাপা হয়। তিনি আমার মাধ্যমে প্রথম আলোকে ধন্যবাদ জানিয়ে যান। আজকের জন্য অভিনন্দন জানাই তাকে। পাশে বসা ছিলেন কারিশমা এনাম। তার ও সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় হয়।
জনতা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী আমিরুল হাসান। তারও ভালো লাগার প্রকাশ। একই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক আবদুর রাজ্জাক প্রার্থনা করেন, জ্বালা যন্ত্রণা পেছনে ফেলে আসুক আলোকময় প্রভাত। দূতাবাসের কাউন্সিলর ও চ্যান্সারি প্রধান শহীদুজ্জামান ফারুকী বসা তার আম্মাজানকে নিয়ে। আম্মাজান মেরিল্যান্ড স্কুলে পড়েন। আমার ক্যামেরা জ্বলে ওঠে।
কাউন্সেলর ও দূতাবাসের মিনিস্টার ইকবাল হাসান সে সময় খুবই ব্যস্ত। শ্রম বিষয়ক কাউন্সেলর আরমান উল্লা চৌধুরী প্রায় কাছেই। তিনি বলেন, সংস্কৃতিকে বুকে ধারণ করে ভালোবাসি দেশকে। কাউন্সেলর ড. মোকসেদ আলী তখন মঞ্চে।
মানুষ আর মানুষ। সবাই আজ দেশ, দেশের মানুষের মঙ্গল কামনায় বিশুদ্ধ একটি সময় পার করেন। তাদের ভেতরে মা, মায়েরই বন্দনা। যা দেখে তারই মধ্যে খুঁজে পায় মাকে। যে নারী ছোটে ভিড়ের এক দিক থেকে অন্যদিকে, তার ও মধ্যে মায়েরই অস্তিত্ব। বাঙালির মন গেয়ে ওঠে, একি অপরূপ রূপে মা!


Add comment


Security code
Refresh