Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদসংকুল শান্তি মিশন—-আনসার উদিদন খান পাঠান

বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৮

সরকারের প্রায় অস্তিত্বহীন উত্তর মালির মরু জনপদের সাধারণ মানুষের জীবন এখন প্রায় নরকতুল্য। এখানে ওখানে প্রায়ই আইইডি/স্থল মাইনের আঘাতে উড়ে যাচ্ছে ব্যক্তিগত কিংবা যাত্রীবাহী যান। লুটতরাজ, অপহরণ, হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, গবাদিপশু ছিনিয়ে নেয়া, ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ এখন প্রায় নিত্য ঘটনা। সরকার আর আন্তর্জাতিক সম্মিলিত প্রচেষ্টাও এ অবস্থা ঠেকাতে পারছে না। উত্তর মালির আয়তন তার পূর্বতন উপনিবেশ প্রভু ফ্রান্সের সমান। এই বিস্তীর্ণ এলাকায় সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী কাজ করছে কেবল কয়েকটি শহর এলাকায়। বাকি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে অস্ত্রধারী নানান সংগঠন। তার মধ্যে বেশ কিছু সশস্ত্র সংগঠন সরকার সমর্থক। এই বিপুলসংখ্যক অস্ত্রধারীদের দৃশ্যত কোনো বৈধ আয় নেই। লুটতরাজ, জোরপূর্বক চাঁদা আদায়, অপহরণ, মাদক ও মানবপাচারের অবৈধ অর্জন দিয়েই চলে তাদের বেতনভাতা। সরকারি সেনা ও পুলিশের বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর হয়রানি আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ।

Picture
মরুভূমি ছিঁড়ে বয়ে যাওয়া একমাত্র নদী নাইজারই দেশটির জলের উত্স এবং এর তীরেই মূল জনপদগুলো। আধা ট্রাইবাল, আধা মুসলিম এই জনগোষ্ঠী  তোয়ারেগ নামে পরিচিত। মূল পেশা কৃষি আর পশুপালন। শত বছরের শান্ত জনপদের পুরো পরিস্থিতি পাল্টে দেয় আরব বসন্তের ঢেউ। ২০১১ সালে লিবিয়ার নেতা মোয়াম্মের গাদ্দাফির পতনের পর তার বিপুল সংখ্যক ভাড়াটিয়া সৈনিক অস্ত্রের সম্ভার চুরি করে ফিরে আসে উত্তর মালির পূর্বপুরুষের ভিটেয়। এই কপর্দকশূন্য, অবহেলিত বেকার কিন্তু প্রশিক্ষিত সশস্ত্র লোকজনের উপরই চোখ পড়ে উত্তর আফ্রিকার ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আলকায়দা ইন দি ইসলামিক মাগরেব (একিউআইএম)-এর। সংগঠনটি সীমান্তের দেশ আলজিরিয়া, মৌরিতানিয়া, নাইজার আর বুরকিনা ফাসো থেকে তাদের কর্মতত্পরতাকে প্রসারিত করে এ অঞ্চলে। অত্যন্ত দুর্বল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, দারিদ্র্য, পশ্চাত্পদতা ও অনিশ্চয়তায় জর্জরিত জনপদটি জেহাদিদের সর্বগ্রাসী থাবা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। শুরু হয় পরস্পরবিরোধী গ্রুপগুলোর মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত ও নৈরাজ্য। এই অবস্থায় পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স হস্তক্ষেপ করে। ১৯৬০ সালে তাদের ছেড়ে যাওয়া উপনিবেশে আবার ফিরে আসে তারা। ফ্রান্স, আফ্রিকান ইউনিয়নসহ বিশ্বনেতৃত্বের চাপে সেনা সরকার বাধ্য হয় দ্রুত সাধারণ নির্বাচন দিতে এবং ২০১৩ সালে জনগণের ভোটে প্রতিষ্ঠিত হয় বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম বোবাকার কেইতার নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার। বিবদমান পক্ষদ্বয় যখন পারস্পরিক হানাহানিতে লিপ্ত তখনই সরকারি বাহিনী ফরাসি সৈন্যদের সহায়তায় বিদ্রোহীদের হটিয়ে পুনর্দখল করে নেয় উত্তর মালি। উত্তর জনপদ আবারও লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে। ঘরে ঘরে বিস্তৃত হয় অস্ত্রের দাপট। লোকবল, অর্থবল আর সামর্থ্যের অভাবে অধিকাংশ এলাকাতে সরকার প্রকৃত অর্থে আর পুনঃস্থাপিত হয়নি। বিচ্ছিন্ন অস্ত্রধারীরা সে সুযোগই নিচ্ছে। ২০১৩ সালেই এগিয়ে আসে জাতিসংঘ। প্রতিষ্ঠিত হয় বিশাল কলেবরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন। ৫৪টি দেশের ১১ হাজার ৮৬১ সেনা এবং ১৭শ পুলিশ যুক্ত আছে এই মিশনে। বর্তমানে এই মিশনে ১৩৭০ জন সেনা ও বিমান বাহিনীর সদস্য এবং ২৮০ পুলিশ সদস্য নিয়ে কর্মীর সংখ্যায় দ্বিতীয় বৃহত্তম অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী ছাড়াও দেশটিতে রয়েছে মালিয়ান সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের সীমিত তত্পরতা। তার সঙ্গে সমপ্রতি যোগ হয়েছে জি-ফাইভ এর ৫ হাজার সুসজ্জিত ও প্রশিক্ষিত সৈন্য। জি-ফাইভ ধর্মীয় সন্ত্রাস আর সংঘাত সংক্ষুব্ধ এই অঞ্চলের পাঁচ দেশ মালি, নাইজার, বুরকিনা ফাসো, চাদ ও মৌরিতানিয়ার সম্মিলিত সামরিক টাস্কফোর্স। মূলত ফ্রান্সের আনুকূল্যে এবং সক্রিয় সহায়তায় গড়ে উঠেছে তার এই পুরনো উপনিবেশদের সম্মিলিত প্রয়াসটি। দেশগুলো প্রায় সবই অত্যন্ত দরিদ্র। প্রতি পাঁচ জনের একজন নিত্য অভুক্ত থাকে সাহেল অঞ্চলে। কার্যকরভাবে এই সামরিক অভিযান পরিচালনার মতো অর্থ তাদের নেই। এগিয়ে এসেছে ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি ধনাঢ্য দেশ।
সরকার, ফ্রান্সের দুর্ধর্ষ বারখান, জি-৫ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর ক্রমাগত তত্পরতা সত্ত্বেও সংঘাত বেড়েই চলেছে। শান্তিরক্ষীরা তাদের অন্যতম টার্গেট হলেও বাদ যাচ্ছে না সাধারণ মানুষসহ কোনো পক্ষই। আক্রান্ত না হলে শান্তিরক্ষীরা অস্ত্র ব্যবহার করে না এই বিশ্বাসে তারা সহজ টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। এমন কোনো সপ্তাহ নেই যে, এইভাবে লোকজন নিহত হচ্ছে না। তিম্বকতু রিজিয়নাল ইউএন বেইজ গত বছরের শেষে একমাসে প্রায় চারবার রকেট আক্রমণের শিকার হয়েছে।বর্তমান প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ায় আগামী ২৯ জুলাই দেশটিতে সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচন নিয়ে উত্তরের মানুষের তেমন আগ্রহ নেই। তারা নিজেদের জানমালের নিরাপত্তা এবং খাদ্যের সংস্থান নিয়েই চিন্তিত। অধিকাংশ সরকারি অফিস খালি পড়ে আছে। পুলিশ সেনাবাহিনী বা সরকারি কর্মী নেই। নিরাপত্তার জন্য তারা বড় শহরে আশ্রয় নিয়ে আছে। শহরের বাইরে প্রশাসনের কোনো অস্তিত্বই নেই। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের টহল সাধারণ মানুষের মনে একটু হলেও আশা জাগায়। ভীতি দূর করে খানিকটা। সাধারণ নিগৃহীত মানুষ জাতিসংঘের এই উপস্থিতিকে স্বাগত জানায় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ আরো তত্পর হোক এটা তাদের দাবি। শান্তিরক্ষীদের শক্তিপ্রয়োগের ক্ষেত্রে রক্ষণাত্মক ভূমিকার বদলে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় যাওয়া উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মোতায়েনের আগে ও পরে এই মিশনের জন্য আলাদা ও উপযোগী প্রশিক্ষণ এবং মিশন উপযোগী যান ও অস্ত্র  সংগ্রহ করার কথা বলা হচ্ছে।
উত্তর মালির মরু অঞ্চলে রক্তক্ষয় বন্ধের আশু স্পষ্ট কোনো  লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সকল পক্ষই যার যার  সামরিক শক্তি দিয়ে একে অন্যকে পরাস্ত করতে চাইছে। ক্রমাগত আক্রমণের পরেও জেহাদিদের পিছু হটার পরিবর্তে আরো তত্পর  হতে দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে। এই অঞ্চলের উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তার বোধ তৈরি করা, বিবদমান পক্ষগুলোকে সমঝোতায় নিয়ে আসা, সশস্ত্র ব্যক্তিদের নিরস্ত্রীকরণের পর সমাজের মূলস্রোতে নিয়ে আসা এবং মালিয়ান সরকারের সামর্থ্য বৃদ্ধি খুবই প্রয়োজন। শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগুলো জরুরি পূর্বশর্ত। মালি সরকার ও আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় এখন পর্যন্ত কেবল সামরিক বল প্রয়োগেই সকল প্রয়াস সীমাবদ্ধ রেখেছে।

আনসার উদিদন খান পাঠান(পুলিশ সুপার ও কমান্ডিং অফিসার, বাংলাদেশ ফর্মড পুলিশ ইউনিট-২, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন, মালি)