Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

স্মৃতির পাতা থেকে আমার দেখা - ভয়াল একুশ আগষ্ট

সোমবার, ২১ আগস্ট ২০১৭

কলন্কময় গ্রেনেড হামলায় আমাদের প্রিয় নেত্রী বেগম আইভি রহমান সহ চব্বিশ জন নেতা কর্মীকে হারিয়েছি ।তৎকালীন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি -জামাত সরকারের মুলপরিকল্পনা ছিল এই গ্রেনেড হামলা করে  বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে  হত্যা করা । এই বিভৎস ঘটনাকালীন আমি  পূর্ব হতে ট্রাক মন্চের কাছে অবস্থান করে অন্যান্য নেতৃবৃন্দ সহ জননেত্রী শেখ হাসিনার ভাষনের সমাপ্তি মহুর্তে এই জঘন্য গ্রেনেড হামলা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে মহান আল্লাহর রহমতে আমি গ্রেনেডের আঘাত হতে রক্ষা পেয়েছিলাম । রক্তাক্ত নিহত-আহতদের মাঝে আহাজারি-আমাদের প্রানপ্রিয় নেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যাকে ট্রাক মন্চ থেকে গাড়ীতে উঠানো মহুর্ত পর্যন্ত যে কয়েকজনের মধ্যে আমিও একজন ছিলাম । শুধু গ্রেনেড হামলা নয়, খুনি চক্র হত্যার চেষ্টায় বঙ্গবন্ধু কন্যাকে লক্ষ করে গাড়ীতে গুলি ছুড়ে ছিল । পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর  টিয়ার সেল, কাদনে গ্যাসে/ আঘাতে  নেতাকর্মীদের ছুটাছুটিতে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর ঘটনাস্থলে নিহত আহতদের মধ্যে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান রক্তাক্ত  অবস্থায় অন্যান্যের সাথে নেয়া হাসপাতালে পৌঁছা মহুর্তে জ্ঞান ফিরে নূতন জীবন অনুভব করেছি । ঞ্জান পেয়ে উপস্থিত কয়েকজনের মধ্যে এনামুল হক আবুল ভাই ( বর্তমানে পন্টন থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি) আমাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে এসেছিলেন । পরদিন 16 আগষ্ট ধানমন্ডি সুধাসদন থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর অন্যতম সদস্য শ্রদ্ধেয়া সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সঙ্গে ঢাকা বিভিন্ন হাসপাতালে গ্রেনেড হামলায় আহতদের দেখতে গিয়েছিলাম ।


অপর দিকে গ্রেনেডের আঘাতে প্রায় মৃত অবস্থায় নারী নেত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক বেগম আইভি রহমান কে  শেষে ক্যান্টনম্যান্টে সিএমএইচ এ  রাখা হয়েছিল। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও আইভি রহমানের ছেলে মেয়ে সহ আমাদের কাউকে হাসপাতালে প্রিয় আইভি রহমানকে দেখতে দেয়নি । বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সিএমএইচএ আইভি রহমান কে দেখার নামে নাটক করার সময়ে হাসপাতালে উপস্থিত আইভি রহমানের ছেলে মেয়ে সহ আমাদের কে হাসপাতালের একটি কক্ষে আটক করে রাখা হয়েছিল । তারপর 24 আগষ্ট বেগম আইভি রহমানকে মৃত ঘোষণা করা হয় ।
এই জঘন্য স্মরণীয় ঘটনা বলে শেষ করা যাবে না ।


এ তুফান ভারি দিতে হবে পাড়ি নিতে হবে তরী পার........... শেখ আখতার উল ইসলাম

সোমবার, ২১ আগস্ট ২০১৭

সম্প্রতি  সংবিধানের ষোঢ়ষ সংশোধনী বাতিল করে মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট এর মাননীয় প্রধান বিচার পতি সহ আপীল বিভাগের মাননীয় বিচারপতিদের রায় ও মতামত নিয়ে দেশের রাজনীতিতে আজ তুফান বয়ে চলেছে। বিচার বিভাগ তথা জাতীয় জীবনে এ রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা নিয়ে আজ এগিয়ে এসেছে। দেশ ও জাতির প্রতিটি ক্রান্তি লগ্নে জাতির বিবেক আইনজীবী সহ বিচার বিভাগ এগিয়ে এসেছে জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছে। দেশের মানুষের মাঝে  বর্তমানে  যে হতাশা আর বেদনা বিরাজ করছে তার প্রতিফলন ঘটিয়ে দীর্ঘ এই রায় দেশ ও জাতিকে আগামী দিনের পথ নির্দেশনা দিবে। চরম হতাশায় নিমজ্জিত দেশ ও জাতিকে এক নতুন আশার আলো দেখাবে। অহেতুক বিতর্ক না করে তাদের এ মূল্যবান মতামত ও পর্যবেক্ষন কাজে লাগিয়ে রাজনীতিবিদ আর নীতি নির্ধারকেরা তাদের কর্মসূচি প্রণয়ন করে দেশ ও জাতিকে  এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। বিশেষ প্রযোজনে তাদের রায় ও মতামতের কোন অংশের পরিবর্তন-পরিমার্জন করতে চাইলে রিভিউ আবেদন করে তা সংশোধন  করা যেতে পারে। কিন্তু এই রায় নিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার কোন ভাবেই কাম্য নয়।দল বাজী আর দল কানা কিছু লোক ব্যাক্তি ও গোষ্টি সার্থে যে ভাবে অযাচিত-অহেতুক মন্তব্য করে চলেছেন তা জাতির জন্য কোন শুভ ফল বয়ে আনবেনা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ দিন ধরে ক্ষমতায় যাওয়ার ও ক্ষমতায় ঠিকে থাকার জন্য নিরন্তর এক প্রতিযোগিতা চলছে। হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও, পোড়াও, ভাংচুর, লাঠি, গুলি , টিয়ারগ্যাস আর ক্ষমতার দ্বন্ধে ধ্বংশের দ্বার প্রান্তে আজ বাংলাদেশ। প্রায় প্রতিদিনই একটা না একটা অঘঠন ঘঠেই চলছে। মসনদের অন্ধ মোহ, লোভ লালসা আর প্রতিহিংসার আগুনে আজ জ্বলছে বাংলাদেশ। পুড়ছে সম্পদ,  মরছে মানুষ । এক অন্ধকার সুড়ঙ্গ পথে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। দেশের সাধারন নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ক্ষমতার দ্বন্ধ ততই বাড়ছে। ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় ঠিকে থাকার জন্য আর ক্ষমতাহীনরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে। গণতন্ত্রের নামে তারা চালু করেছে, এক অদ্ভূৎ- উদ্ভট পরিবারতন্ত্র। মধ্যযুগীয় রাজা-রাণীর আচরনে তারা  হয়ে পড়েছে অভ্যস্থ। নিজেদের দুর্নীতিবাজ- দুর্বল উত্তরাধিকারকে মসনদে বসানোর স্বপ্নে তারা আজ বিভোর। পূর্বসূরির গুণকীর্তন করে মসনদ দখল রাখার এক অদ্ভূৎ পায়তারায় তারা লিপ্ত হয়ে আছে। মাঝে মাঝে অলিক স্বপ্নের ফুল ঝুরি ছড়িয়ে দিয়ে মানুষকে তারা বিভ্রান্ত করছে। তাদের চার পাশ ঘিরে রয়েছে মৌ-লোভী, চামচা, চাটুকার , মোসাহেব। আর এ ভাবেই চামচা -চাটুকার পরিবেষ্টিত হয়ে এক পুতুল  ও এক পুতুলের মা দেশটাকে নিয়ে পুতুল খেলা খেলছে। বাংলাদেশে আজ রাজনীতির নামে চলছে দল বাজী আর অপরাজনীতি, চলছে শোষনের গণতন্ত্র আর ক্রীতদাসের আর্থনীতি।
 বাংলাদেশ যার জন্ম হয়েছিল এক সাগর রক্তের বিনিময়ে। ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে। এক দীর্ঘ সংগ্রাম আর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের মাধ্যমে। যে যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিল রাম, রহিম, জন, পল। যে যুদ্ধে ইজ্জত দিয়েছিল গীতা, সীতা, সখিনা, জরিনা। বাংলাদেশের এমন কোন গ্রাম নেই যে গ্রামে শহীদ মিনার নেই, নেই শহীদের কবর কিংবা বীরঙ্গনার আর্তনাদ। বাংলাদেশের এমন কোন এলাকা নেই, যেখানে পাক হানাদার বাহিনীর ধ্বংশ যজ্ঞের চিহৃ নেই। সৌভাগ্য এ দেশের মানুষের যে লাওস, কম্বোডিয়া কিংবা ভিয়েৎনামের মত সুদীর্ঘ কোন যুদ্ধ তাদের করতে হয়নি। ভাগ্যবান বাঙ্গালী জাতি সে যুদ্ধে পেয়েছিল এক অসাধারন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সূদৃঢ় এক জাতীয় ঐক্য আর মহান আল্লাহর আশির্বাদ। যার ফলে আধুনিক মারনাস্ত্রে সু-সজ্জিত  পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ট শক্তিশালী একটি সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ খালি হাতে মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে পরাজিত করে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্টা লাভ করেছিল স্বাধীন- সার্বভৌম- অসাম্প্রদায়িক একটি দেশ, বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের জন্মের পিছনে যেমন রয়েছে এক রক্তাক্ত করুণ ইতিহাস, তেমনি রয়েছে এক সুদীর্ঘ আন্দোলন -সংগ্রামের সফল ইতিহাস। যে আন্দোলন- সংগ্রামের মুল লক্ষ্য ও উদ্দ্যেশ্য ছিল শোষন- বঞ্চনাহীন এক সূখি- সমৃদ্ধ সোনার বাংলা প্রতিষ্টার স্বপ্ন । যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিল জাতির বীর শহীদেরা , যে স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির জনক আর স্বাধীনতার ঘোষক। তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রতিটি বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে সূখ, শান্তি আর সমৃদ্ধি বিরাজ করবে। মানুষে মানুষে কোন ভেদা ভেদ থাকবেনা। থাকবেনা হিংসা, বিদ্ধেষ, মারা মারি, কাটা কাটি। থাকবেনা অভাব- অনটন। তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন শোষন-বঞ্চনাহীন এক সূখি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। তারা উভয়েই ছিলেন পরস্পরের সম্পূরক, পরস্পরের পরিপূরক।  তাদের জীবৎদ্বশায় তারা কখনও কল্পনা ও করেননি যে তাদের করুণ পরিনতির পর তাদের দুর্বল উত্তরাধিকার এক দিন মসনদে আরোহন করে এ ভাবে তাদের স্বপ্নের সমাধি রচনা করবে। মহান স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে উঠা ঐক্য বদ্ধ জাতি সত্বাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়ে পরস্পর বিপরিত দুটি ধারায় জাতিকে বিভাজিত করে তারা মূখো মূখি দাড় করিয়ে দিবে। ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিমযে অর্জিত রাষ্ট্রিয় মৌল নীতিমালা বিসর্জন দিয়ে তারা
 ব্যার্থ রাষ্ট্রের পথে দেশটাকে  নিয়ে যাবে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অর্জিত রাষ্ট্রিয় মৌল নীতিমালা- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদ বিসর্জন দিয়ে তারা বাংলাদেশে শোষনের গণতন্ত্র ও ক্রীতদাসের অর্থনীতি চালু করবে।            
বাংলাদেশ এমন একটি দেশ গণতন্ত্রের জন্য, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য, শোষন-বঞ্চনাহীন সমাজব্যবস্থার জন্য যে দেশের মানুষের রয়েছে এক দীর্ঘ লড়াই আর সংগ্রামের অতিত ইতিহাস। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলে ও সত্য যে সদ্য স্বাধীন দেশে পাওয়া না পাওয়ার হিসাব মিলাতে গিয়ে  স্বাধীনতার বীর যোদ্ধারা একে অন্যের মূখো মূখি দাড়িয়ে পড়েন। শুরু হয় আত্মহননের পালা, নৈস্বর্গে ভাঙ্গন। একাত্তরের রণাঙ্গনের সাথীরা একে অন্যের শত্রু হয়ে উঠেন। পিছন থেকে মদদ যোগায় স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি। সদ্য স্বাধীন , বিধ্বস্থ, ধ্বংশ স্তুপের মাঝে যখন জাতি রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টা চলছে তখন আতুড় ঘরে তাকে ধ্বংশ করার প্রচেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠে স্বাধীনতার পরাজিত রাজাকার আর তাদের দোসরেরা। দ্বিতীয় বিপ্লবের সূচনা লগ্নে, পচাত্তরের পনরই আগষ্ট তারা আঘাত হানে স্বাধীনতার সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ঘাঠিতে। নিষ্টুর-নির্মম ভাবে স্বপরিবারে তারা হত্যাকরে বাঙ্গালী জাতি রাষ্ট্রের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ৩ রা নভেম্বর জেলের অভ্যন্তরে নিষ্টুর-নির্মমভাবে হত্যাকরে বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতীয় চার নেতাকে। চক্রান্ত আর ষঢ়যন্ত্রের নীল নকশায় অত:পর তারা মুক্তিযুদ্ধাদের নিধন প্রক্রিয়া শুরু করে। অভ্যূত্থান আর পাল্টা অভ্যূত্থানের মাধ্যমে তারা বীর মুক্তিযুদ্ধা কর্ণেল খালেদ মোশাররফ, হুদা, হায়দারকে নির্মম ভাবে হত্যাকরে। ফাসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের বীর সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল তাহেরকে। শিখন্ডি বানিয়ে পাদপ্রদীপে নিয়ে আসে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াকে। ১৯৮১ সালের ৩০ শে মে চট্রগ্রাম সার্কিট হাউসে নিষ্টুর-নির্মম ভাবে তারা জিয়াকে ও খুন করে। চক্রান্ত আর ষঢ়যন্ত্রের নীল নকশায় জিয়া হত্যার আসামী করে ফাসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে স্বাধীনতা যুদ্ধের ১২ জন বীর সেনানীকে। ঢাকা থেকে ঘাতক পাঠিয়ে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী মেজর মন্জুরকে। ক্ষমতার মসনদে অরোহন করে পাকিস্তান ফেরত সামরিক স্বৈরশাসক হুসেইন মোহাম্দ এরশাদ। নব্বইয়ের গণঅভ্যূহথানে এরশাদের পতনের পর সর্বশেষ তারা বেচে নেয় স্বাধীনতার দুই বীরের দুর্বল-দেউলিয়া উত্তরাধিকারকে।  
বাংলাদেশের সামনে আজ  এক বিরাট নতুন চ্যালেঞ্জ। সন্ত্রাস-দুনর্িিত-কালোটাকা-অস্ত্র আর মাদকের কাছে জিম্মী আজ গোটা দেশ বাসী। খুন-ধর্ষন-ঘুম-চুরি-ছিনতাই-রাহাজানী- বিচারবহির্ভূত হত্যা কান্ড আর জঙ্গীবাদের থাবায় জাতির অস্তিত্ব আজ সঙ্কটাপন্ন।পরস্পর বিপরিত দুই ধারায় বিভাজিত রাজনীতি আজ চরম দুর্বিত্তায়নের কবলে নিপতিত। রাজনীতির নামে দেশে চরম অরাজকতা বিস্তার লাভ করেছে। দেশ ও জাতির চরম এ ক্রান্তি লগ্নে জাতির বিবেক- সংবিধানের রক্ষক মাননীয় বিচারপতি বৃন্দের প্রদত্ত দিক নির্দেশনা সে চ্যালেঞ্জ মোকবিলায় সহায়ক রূপে কাজ করতে পারে। সে জন্য জনগণের ম্যান্ডেট আর অদালতের নির্দেশ  এর প্রতি সম্মান দেখিয়ে সকলকে নিয়ে পারস্পরিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করতে হবে।প্রয়োজনে পঞদশ সংশোধনীতে রেখে দেওয়া রাষ্ট্র ধর্ম বাতিল করে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে ফিরে যেতে হবে। স্বাধীনতা যুদ্ধে অর্জিত রাষ্ট্রিয় চার মৌলনীতি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদ পূণ:প্রবর্তন করতে হবে। মধ্যযুগীয় ক্রীতদাসের ন্যায় দরিদ্রের রক্তে ভেজা শ্রম বিক্রি করে গড়ে উঠা অর্থনিিতর পরিবর্তে উন্নয়নের অর্থনীতি চালূ করতে হবে। শ্রমিকের হাড় ভাঙ্গা খাটুনি আর রক্তে ভেজা অর্থ কেড়ে খাওয়া মধ্য সত্বভোগীদের হাত থেকে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে হবে। শোষন-বঞ্চনাহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্টার জন্য অংশিদারিত্ব মুলক গণতন্ত্র কায়েম করতে হবে। মসনদের অন্ধ মোহ আর লোভ লালসার কারনে বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোন ধরনের ব্যার্থতা কিংবা আপোষকামিতা হবে আত্মহননের সামিল। আমাদের ভূলে , আমাদের হঠকারিতায় যদি এবার ও পদস্কলন ঘঠে , তবে তলিয়ে যাবে সমাজ, সভ্যতা ও দেশ।
শেখ আখতার উল ইসলাম
সভাপতি- বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি
কক্ষ নং ১৪১, সুপ্রীমকোর্ট বার ভবন,ঢাকা।


বণ্যার ধাক্কায় ভেসে যায় শিশু,বুড়ো মা বাবা। আবু জাফর মাহমুদ

সোমবার, ২১ আগস্ট ২০১৭

উজানের দেশ ভারত থেকে নেমে আসা ঢল এবং মৌসুমী ভারি বৃষ্টিপাত।প্রবল বৃষ্টিপাতের সময় বেছে নিয়ে সকল বাঁধ খুলে দিলেই সৃষ্টি হলো ভয়ানক বণ্যা।এবণ্যায় বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে অর্ধকোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।আরো বণ্যা আসছে। নদী ও পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার ৯২ ভাগ পানিই ভারত থেকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীর উজানের। বাকি ৮ ভাগ পানি স্থানীয় বৃষ্টিপাত থেকে আসে। এক সপ্তাহে মৃত্যু হয়েছে অন্ততঃ ৭৭ জনের।বণ্যার তোড়ে স্রোতের ধাক্কায় মায়ের হাত থেকে শিশু সন্তান কেড়ে নেবার ঘটনা ঘটেছে।।বৃদ্ধ মা বাবাকে স্রোতের শক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে ধরে রাখতে পারেননি অনেকে।মানুষ হতবিহবল হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।প্রিয়জনদের ধরে রেখেও আটকে রাখা আর গেলোনা বন্যার দাপটে।একটা ছবিতে দেখা গেলো এক বৃদ্ধ মাথায় আসবাব পত্র নিয়ে নিজ বাড়ী থেকে নিরাপদে থাকার জন্যে হাঁটছে পানির মধ্য দিয়ে খোঁজ নেই তার বৌ-ঝি নাতি-নাতনিদের। এযেনো কোরআনে বাইবেলে তওরাত যবুরে বর্ণিত রোজ কেয়ামতের দিনের আলামতের মতো।যখন সব প্রাণের ধবনিতে একটাই কথা;ইয়া নফসি,ইয়া নফসি।এরকম এক ভয়াল নিরুপায় পরিস্থিতি বাংলাদেশে বণ্যায়।  
 মানুষের অমানবিক নিষ্ঠুর লুটেরা রাজনীতির সৃষ্ট এই দুর্যোগ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলেই পরিচিত।ভারত নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশে সরকারেরও এই বিষয়ে মুখ খুলে শব্দ করার লক্ষণ নেই। ভারত সরকারের প্রয়োজনে,ভারত সরকারের আশ্রয়ে গড়া এবং টিকে থাকা বাংলাদেশের কোন সরকারই বাংলাদেশীদেরকে দেয়া শাস্তির চাপের প্রতিবাদ করতে পারবেনা।এমনকি বিষয়টি উত্থাপন করারও সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশে পানিসম্পদ মন্ত্রী সব সময় ভারতের  পছন্দের হয়ে আসছে দেশের প্রথম সরকারের সময় ছাড়া। বাংলাদেশকে পানিতে তলিয়ে কোঠি কোঠি বাংলাদেশীদেরকে দুর্বিসহ মানবেতর অবস্থায় ঠেলে দেয়ার দায়িত্ব পালন করে চলেছে এসকল নেতৃত্ব।এক অস্বাভাবিক হায়েনা যেনো বাংলাদেশের এই ক্ষমতাবান সভ্যতায় দৌড়ঝাঁপ করছে।তোষণ ও বিনিময়ে নিজের ব্যক্তিগত ফায়দা আদায় হয়ে গেছে রাজনীতির লক্ষ্যবস্তু।কেউ করছেন দেশের স্বার্থের বিনিময়ে অপরাধের ক্ষমতা ভোগ অন্যেরা দিয়ে চলেছেন নীরব সমর্থন। ১৬কোটি মানুষই আজ এই বলদর্পীদের কাছে জিম্মী হয়ে আছে। কথা হচ্ছে, এখন জরুরী পদক্ষেপ নিতে হবে মানুষ ও প্রকৃতি বাঁচানোর।এই দায়িত্ব কাদের? নেতৃত্বই কি এই সংকট থেকে উদ্ধারের প্রধান কর্মী নয়?  
 দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর জানিয়েছে, ৮/১৮/১৭ শুক্রবার পর্যন্ত দেশের ২৭ জেলার ১৩৩ উপজেলা ও ৪৩টি পৌরসভা এ বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় ১১ লাখ ৪১ হাজার পরিবারের ৫০ লাখ ১৮ হাজার ৭০৬ জন বানভাসি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে তথ্য পাঠিয়েছেন মাঠ কর্মকর্তারা। চলতি মৌসুমের দ্বিতীয় দফার এ বন্যায় এ পর্যন্ত ছয় লাখ ১৮ হাজার ৭০৯ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. রিয়াজ আহমেদ বলেছেন, “চলমান বন্যা বিস্তার ও স্থায়ীত্বে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের দুটি বড় বন্যার মতো ভয়াবহ না হলেও এবারের বন্যায় মৃতের সংখ্যা ওই দুই বছরের হিসাব ছাড়িয়ে গেছে।দেশে বড় বন্যাগুলোর মধ্যে ১৯৯৮ সালে প্রায় ৬৮ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। আর ১৯৮৮ সালে বন্যা কবলিত হয়েছিল প্রায় ৬৪ শতাংশ এলাকা। সে সময় অনেক এলাকায় বন্যা দুই মাসের বেশি সময় স্থায়ী হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ পায়।
ইতিমধ্যে বিভিন্ন নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করায় দেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও পদ্মায় পানি বাড়ায় অবনতি হচ্ছে দেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি জেলার পরিস্থিতির।এদিকে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ কমছে না। বন্যায় সড়ক এবং রেল লাইন তলিয়ে যাবার কারণে, বিভিন্ন এলাকাও যোগাযোগও বন্ধ রয়েছে। বাড়িঘর পানিতে ডুবে বা ভেঙে যাবার কারণে গৃহহীন হয়ে বন্যাকবলিত লাখো মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধ, সড়ক বা কোনো আশ্রয় কেন্দ্রে। অনেকেই খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিভিন্ন এলাকায় গবাদিপশুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। পানিতে তলিয়ে যাবার কারণে স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।  কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে পানিবাহিত নানা রোগবালাই।বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে,  ব্রহ্মপুত্র-যমুনার বিভিন্ন পয়েন্টে আগামী ৭২ ঘণ্টায় পানি কমা অব্যাহত থাকলেও গঙ্গা-পদ্মার পানি আগামী ৪৮ ঘণ্টায় বাড়বে।
 
নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, রাঙামাটি, নীলফামারী, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, খাগড়াছড়ি, দিনাজপুর, জামালপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজবাড়ী নওগাঁ, জয়পুরহাট, যশোর, মৌলভীবাজার, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ ও মাদারীপুর জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ এখন বন্যা কবলিত।অন্যদিকে, আগস্টের শেষভাগে ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় তৃতীয় দফা বন্যার আশংকা তৈরি হয়েছে। সেক্ষেত্রে দুই দফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের কারণে দুর্ভোগ বহুগুণে বেড়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
 এ বছর জুলাই মাসের দ্বিতীয়ার্ধে মৌসুমের প্রথম বন্যায় অন্তত ১৩ জেলার অনেক উপজেলা প্লাবিত হয়। অগাস্টে চলমান বন্যায় ২৭ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে।এর মধ্যে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে ফের বন্যার আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।
পদ্মার পানি বাড়ার কারণে মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুরের বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হচ্ছে। আগস্টের ২৪-২৫ তারিখ থেকে উজানে ফের বৃষ্টি বাড়তে পারে। বাংলাদেশেও বৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে ঈদের আগে থেকে বা সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ থেকে আবার বন্যা দেখা দিতে পারে। তাতে দুর্ভোগ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট  কর্তৃপক্ষ।এদিকে, ভয়াবহ বন্যায় বিধবস্ত দিনাজপুরের দূর্গত এলাকা পরিদর্শন এবং বানভাসি মানুষকে ত্রাণ বিতরণের জন্য আগামীকাল সকালে দিনাজপুরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সকাল ১১টায় দিনাজপুর জেলা স্কুল আশ্রয় কেন্দ্র এবং বেলা ১২টায় বিরল উপজেলার ফরক্কাবাদ ইউনিয়নের আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন ও বন্যার্তদের


"বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু-ইতিহাসের কালো অধ্যায়" সিকদার গিয়াসউদ্দিন

শনিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৭

বাঙালী জাতির ইতিহাসে স্মরণকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙালী হিসাবে শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহন করেননি।বঙ্গবন্ধু হিসাবেও পরিচিত হননি।এটি অর্জনের পেছনে দীর্ঘ সাধনা আর ত্যাগের যে চরম পরাকাষ্টা-সে বিষয়ে আমাদের জানার আগ্রহ কম বললেই চলে।একজন বঙ্গবন্ধুকে তৈরী করতে আরো অনেকের ত্যাগের বিষয়টিও উপেক্ষিত বলে বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞদের বলতে শুনা যায়।তবে একথা সবাই একবাক্যে স্বীকার করে যে বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু নাম দূ'টিকে আলাদা করা যাবেনা।পরস্পর সমার্থক।বাংলাদেশের নাম নিলেই যে নামটি চলে আসবে তিনি আর কেউ নন-মুজিবর।এক নামে বঙ্গবন্ধু নামে যিনি বাঙালীর হৃদয়ের মনিকোটায় জায়গা করে নিয়েছেন।
তিন দিক থেকে ভারত আর একদিকে মায়ানমার(বার্মা) ঘেরা আমাদের দেশ বাংলাদেশ।প্রাচীনকালে বাংলা নামে কোন জনপদের নাম ছিলো বলে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়না।বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের তথ্য থেকে-
"পুন্ড্রভদ্র,সূমাহা,রাঢ়,গৌড়,ভদ্রমনা,বঙ্গ,চন্দ্রদ্বীপ,সমতট,হরিকেল,বরেন্দ্র,কর্ণসূবর্ণ,লাখনূটি,সূবর্ণবিথী,নব্যকূশিকা নামে নৃপতি শাসিত ছোট ছোট স্বাধীন জনপদ ছিলো প্রায় দূ'হাজার বছর আগে।"গুপ্তযুগের আগে রাজা ধননান্দের অধীনে এসব অঞ্চল শাসিত হতো।এছাড়াও মৌর্য্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত এসব এলাকা শুঙ্গ আর কুশানরা শাসন করতো।গুপ্তযুগের পর রাজা শশাঙ্ক অনেকটা সার্বভৌম রাজা ছিলেন বলে জানা যায়।অত:পর মাৎসান্যায় যুগের কথা ঐতিহাসিকদের লেখায় দেখা যায়।এরপর বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী পাল বংশের রাজত্বের পর হিন্দু ধর্মের ক্ষত্রিয় যোদ্ধার জাত সেনবংশের যুগ।
চতুর্দশ শতকে সুলতান শামশুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বর্তমানের বাংলাদেশ,ভারতের পশ্চিম বঙ্গ,বিহার,উড়িষ্যা,আসাম,মেঘালয় ও ত্রিপুরা ইত্যাদি পৃথক পৃথক অঞ্চলগুলোকে একত্রিত করে নামকরণ করেন 'বাঙ্গেলা'।প্রথমবারের মতো ঢাকাকে রাজধানী হিসাবে বেছে নেয়া হয়।ষোড়শ শতকে আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে শ্রী চৈতন্য দেবের জাতপাতমুক্ত সমাজ ও ইসলামের উঁচুনিচু ভেদাভেদহীন ধ্যানধারনাকে কেন্দ্র করে এক নতুন সমাজের জন্ম হলে বাংলাভাষা রাজকীয় মর্যাদা লাভ করে।
১৫২৬ সালে মোগল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন ভারত উপমহাদেশে।১৫৭৮ সালে পর্তুগীজ ও ১৬১২ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ব্যবসার নামে বাংলার মাটিতে ঘাঁটি স্থাপন করে।সম্রাট আকবরের আমলে কৃষিকাজের সাথে সঙ্গতি রেখে বাংলা মাস গননার বিষয়টি তাৎপর্য্যপূর্ণ।সুবে বাংলা নামে এই অঞ্চলকে মোগলরা শাসন করেছিলো।উনবিংশ শতাব্দীতে ফকির লালনশাহের আবির্ভাবও গুরুত্বপূর্ণ।১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজউদ্দৌলাহর পরাজয় এবং ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন শুরু।১৮৫৭ সালে শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের নেতৃত্বে সিপাহী বিপ্লব ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতার লক্ষ্যে গুনগত পরিবর্তনের এক উল্লেখযোগ্য দিক।১৮৫৮ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বিলোপ করে সরাসরি বৃটিশরাজ বাংলার ক্ষমতা গ্রহন করে।১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গঠন করা হয়।১৯০৫ সালে বঙ্গবঙ্গের ঘোষনা।১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম।১৯১১ সালে বঙ্গবঙ্গ রদ করা হয়।ক্ষুদিরাম,সূর্যসেন তিতুমীর হাজী শরীয়তউল্লাহর আত্মদান ঐতিহাসিক।এককথায় স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে ওয়াহাবী,ফারায়েজী,তেভাগা,সন্ন্যাস বিদ্রোহ,সন্ত্রাসবাদী,অসহযোগ আন্দোলন পরবর্তিতে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কাব্য ও সাহিত্যে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ও বিদ্রোহী কবি নজরুলের আবির্ভাব ঘটে।ভারতীয় উপমহাদেশে একদিকে মহাত্মা গান্ধী,মওলানা আবুল কালাম আজাদ,জওয়াহেরলাল নেহেরু,সরদার প্যাটেল,সরোজিনী নাইডু,মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ,লিয়াকত আলী খান,সীমান্তগান্ধী খ্যাত আব্দুল গাফ্ফার খান,অন্যদিকে দেশবন্ধু চিত্তরন্জন দাস,শ্যামাপ্রসাদ মূখার্জী,শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক,হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী,নেতাজী সুভাষ বোস,মওলানা ভাসানীর মতো কালজয়ী নেতাদের আবির্ভাব ও উত্থান বৃটিশ শাসন থেকে মুক্তির লক্ষ্যে নবযুগের সূচনা লক্ষনীয়।স্বাধীনতার লক্ষ্যে মহাত্মা গান্ধী পরিচালিত নন ভায়োলেন্ট অসহযোগ আন্দোলন অন্যদিকে নেতাজী সূভাষ বোস পরিচালিত 'আজাদ হিন্দ ফৌজ'য়ের সশস্ত্র আন্দোলন খূবই তাৎপর্য্যপূর্ণ।এমন একটি মোক্ষম সময়ে অখ্যাত টুঙ্গীপাড়ার সন্তান শেখ মুজিবুর রহমানের ছাত্রনেতা হিসাবে কলকাতায় অবস্থান বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দীর অন্যতম রাজনৈতিক শিষ্য হিসাবে মহাত্মা গান্ধীকে কাছে থেকে দেখার সূযোগ পান এবং নেতাজী সূভাষ বোসের সশস্ত্র আন্দোলনের বিষয়ে কাছে থেকে দেখতে পান।যা পরবর্তিতে অসহযোগ ও সশস্ত্র আন্দোলনের সমন্বয় সাধনে বিভিন্ন গ্রুপের সাথে প্রকাশ্যে বা গোপনে কাজ করার অনুপ্রেরনা যুগিয়েছিলো।বিশেষ করে শেখ মুজিবকে জানতে হলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সহ শেরে বাংলা ফজলুল হক ও মওলানা ভাসানীকে জানতেই হবে।


১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট পাকিস্তান ও ১৫'ই আগষ্ট ভারত বৃটিশ শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে।স্বাধীনতা অর্জন করে।শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান ও মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন।আওয়ামী মুসলিম লীগে মওলানা ভাসানী সভাপতি ও শেখ মুজিবুর রহমানের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহন।মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে কেবলমাত্র ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নামকরন রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট।কাগমারী সম্মেলনে আওয়ামী লীগে ভাঙন।মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সভাপতি ও শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক।পরবর্তিতে সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ও সাধারন সম্পাদক শামশুল হক।তৎপরবর্তিতে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমদ সাধারন সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহন ও স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে কৌশলে ধারাবাহিক কার্যক্রমের দিকে দলকে পরিচালনার প্রচেষ্টা।বিশেষ করে ছাত্রলীগের সাথে বিশেষ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগের শক্তির সাথে ভারসাম্য বিধান করে আওয়ামী লীগকে পরিচালনার বিষয়টি বিজ্ঞ মহলে আলোচিত সমালোচিত।কারন ছাত্রলীগ স্বাধীনতার পূর্বে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন ছিলোনা।ছাত্রলীগের নেতারা কেবলমাত্র বেগম মুজিব ও শেখ মুজিবের সাথে সংযোগ রক্ষা করতেন।ছাত্রলীগের সাথে চট্টগ্রামের এম এ আজিজের গভীর সম্পর্কের জনশ্রুতি আছে।
পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে জিন্নাহর বিরোধিতা,বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রমিক কর্মচারীদের আন্দোলনকে ঘিরে বহি:স্কার,ভাষা আন্দোলনের সময় শেখ মুজিবের কারাবরণ প্রনিধানযোগ্য।তারপরতো কারাজীবনের সে এক দীর্ঘ কাহিনী।যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে দেশব্যাপী বিচরন ও মন্ত্রিত্ব গ্রহন। দলের প্রয়োজনে মন্ত্রিত্ব বর্জন উল্লেখ করার মতো।সেনানায়ক ইস্কান্দর মির্জা ও তারপর আইয়ূব খানের ক্ষমতা গ্রহনের পরপর শেখ মুজিবকে ঘন ঘন কারাগারে গমন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে বসে।তখন আওয়ামী লীগ অফিসে বসার লোকও পাওয়া যেতোনা।এমনি এক দূ:সহ অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সারাদেশের ছাত্রলীগের মধ্য দিয়েই শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের দূ:সময়ের দিনগুলো অতিবাহিত হতে থাকে।১৯৬২'সালে শিক্ষা আন্দোলন শুরু হলে তখনও ছাত্র ইউনিয়ন সারাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয় সংগঠন হিসাবে পরিচিত।এমনি এক সময়ে ছাত্রলীগের কনভেনশনে সিরাজুল আলম খান সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পরপরই ছাত্রলীগকে  স্বাধীনতার লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিলে ধারাবাহিকভাবে জনপ্রিয়তায় ছাত্র ইউনিয়নের চাইতেও এগিয়ে যেতে থাকে।১৯৬২'সালেই সিরাজুল আলম খান,আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরিফ আহমেদ স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে গোপন সংগঠন নিউক্লিয়াস গঠন করার কথা এখন সর্বজনবিদিত।স্বাধীনতা অব্যবহিত পূর্বে সারাদেশে সাতহাজার নিউক্লিয়াসের সদস্যের কথা বিভিন্ন লেখায় দেখা যায়।১৯৬৫ সালে শেখ ফজলুল হক মনি ছাত্র রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহন করলে ছাত্রলীগে সিরাজুল আলম খানের একক নেতৃত্ব প্রতিষ্টিত হয়।ইতিমধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান জেলে অবস্থান করলে প্রায়সময় সিরাজুল আলম  খানকে আওয়ামী লীগ অফিসে বসে থাকার বিষয়টি অনেককে বলতে দেখা যায়।১৯৬৬ সালে জেল থেকে মুক্তির পর গোলটেবিল বৈঠককে কেন্দ্র করে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে শেখ মুজিবুর রহমান ছয়দফা ঘোষনা করেন।পাকিস্তানের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে।ঢাকায় ফিরে এলে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের অনেকের বিরোধিতা মূখে সিরাজুল আলম খান ও ছাত্রলীগ শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে শক্ত অবস্থান গ্রহন করে।কনভেনশন মুসলীম লীগের ফজলুল কাদের চৌধূরী আর আওয়ামী লীগের একাংশের শক্ত বিরোধীতা স্বত্তেও চট্টগ্রামের এম এ আজিজের ও ছাত্রলীগের সদস্যদের শক্ত অবস্থানকে কেন্দ্র করে স্বয়ং মুজিবর কর্তৃক চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে ৬ দফা ঘোষিত হলে লক্ষ জনতা করতালি ও মুহুর্মুহু শ্লোগানের মাধ্যমে তা অনুমোদন করে।আইয়ূবশাহীর ষডযন্ত্র ভয়াবহ আকার ধারন করে।ইতিমধ্যেই ছাত্রলীগের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে।ছাত্রইউনিয়ন চীন ও রাশিয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে তাদের জনপ্রিয়তায় বিরাট ধ্বস নামে।৬ দফার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ১১ দফা ঘোষিত হলে ছাত্র ইউনিয়ন ১১ দফাকে সমর্থন করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে অংশগ্রহন করতে বাধ্য হওয়া ব্যতিত তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের আর কোন পথ খোলা ছিলোনা।ততদিনে ছাত্রলীগের সভাপতি তোফায়েল আহমেদ ও সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন আ স ম আবদুর রব।ছাত্রলীগ কেবলমাত্র ছাত্রছাত্রী ছাড়াও শ্রমিক ও সাধারণ জনমানসে স্থায়ী আসন তৈরী করে নেয়।বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষডযন্ত্র মামলায় গ্রেফতার করা হলে ছাত্রলীগ ও ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে আন্দোলন দাবানলের মতো সারাদেশ ছডিয়ে পড়ে।তোফায়েল আহমদ তখন ডাকসূ ভিপি।এই সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে বিভিন্ন বক্তারা সিংহশার্দুল বা বঙ্গশার্দুল বলে অভিহিত করতো।এমতাবস্থায় ১৯৬৮ সালে ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের সম্পাদক রেজাউল হক চৌধূরী মুশতাক প্রতিধ্বনি নামে চারপাতার প্রচারপত্রে সারথী ছদ্মনামে বঙ্গবন্ধু শব্দটি উল্লেখ করেন।তা সিরাজুল আলম খান ও শেখ ফজলুল হক মনির ভীষন মনপুত হয়।তবে আইয়ূবশাহীর বর্বরতা থেকে ঢাকা কলেজের নেতৃত্ব যাতে মুক্ত থাকতে পারে তাই সাময়িকভাবে এটি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়।অবশ্য উপযুক্ত সময়ে তা কাজে লাগানোর কথা জানিয়ে দেয়া হয়।আগরতলা ষডযন্ত্র মামলা থেকে মুক্তির পর ততদিনে সারাদেশে শেখ মুজিবুর রহমান একক নেতা হিসাবে জনমনে অধিষ্টিত হয়।জেল থেকে মুক্তির পর ১৯৬৯ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারী রেসকোর্স ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা সভায় ছাত্র ইউনিয়নের উভয় গ্রুপের বিরোধিতা স্বত্ত্বেও সিরাজুল আলম খান ও অন্যান্যদের সিদ্বান্তক্রমে ডাকসূ ভিপি ও ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতা হিসাবে তোফায়েল আহমদ "বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান"বলে  ঘোষনা করলে লক্ষ জনতা মুহুর্মুহু করতালি ও শ্লোগান সহকারে তা অনুমোদন করে।এভাবেই বাঙালী জাতি তাঁর সর্বশ্রেষ্ট সন্তানকেই বঙ্গবন্ধু অভিধায় অভিষিক্ত করেছিলো।যা চলছে ও চলবে।
বঙ্গবন্ধু অভিধায় অভিষিক্ত হওয়ার পরপরই বঙ্গবন্ধুর অনুরূধে সিরাজুল আলম খান,শেখ ফজলুল হক মনি,আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে নিউক্লিয়াস পরবর্তি বি এল এফ পূণর্গঠিত হয়।কাজী আরিফকে বি এল এফ গোয়েন্দা প্রধান হিসাবে গোপনে নিয়োগের বিষয় এখন আলোচিত হতে দেখা যায়।আইয়ূবশাহীর পতন হলে ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসক হিসাবে নির্বাচন দিলে ততদিনে ছাত্রলীগের চার নেতাকে চার খলিফা হিসাবে সারাদেশের জনগনকে বলতে দেখা গেছে।ক্রমশ:'চার খলিফা' শব্দটিও বাঙালী জনমানসে স্থায়ী আসন লাভ করে।ছাত্রলীগের এই চার খলিফা খ্যাত ডাকসূ ভি পি আ স ম আবদুর রব,ডাকসূ সাধারন সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস মাখন,ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী,ছাত্রলীগ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ উল্কার বেগে সারাদেশ চষে বেড়ায়।তখনকার দিনে ছাত্রদের কথা সাধারণ জনগন দৈববানীর মতো মেনে নিতো।বঙ্গবন্ধুর বাঙালী জাতির একক নেতা ও আওয়ামী লীগকে একক জনপ্রিয় সংগঠনে পরিনত করার পেছনে ১৯৭১' পূর্ববর্তি জেনারেশনকে ছাত্রলীগের চার খলিফার কর্মকান্ডের কথা বলতে দেখা যায়।নির্বাচনে অবশেষে পাকিস্তানের সকল গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট মিথ্যা প্রমানিত করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে।
ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে তালবাহানা চলতে থাকে।একপর্যায়ে ইয়াহিয়া খান পার্লামেন্ট স্থগিত ঘোষনা করলে সারাদেশ আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে উঠে।ছাত্রজনতার প্রবল চাপে বি এল এফ নেতাদের পরামর্শক্রমে ১৯৭১'সালের ১'লা মার্চ চার খলিফার নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ঘোষিত হয়।২'রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ডাকসূ ভিপি ও সংগ্রাম পরিষদের নেতা আ স ম আবদুর রব ছাত্র জনতার মুহুর্মুহু করতালি ও শ্লোগানের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন।৩'রা মার্চ পল্টন ময়দানে অনির্ধারিতভাবে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক শাজাহান সিরাজ।সর্বসম্মতিক্রমে বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার স্থপতি ঘোষনা,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তোলিত পতাকাকে স্বাধীন বাংলার জাতীয় পতাকা,কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের "আমার সোনার বাংলা-আমি তোমায় ভালবাসি"গানটি জাতীয় সংগীত হিসাবে ঘোষনা সহ আরও বিস্তারিত কর্মপন্থা ঘোষিত হয়।জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত নির্ধারনের ক্ষেত্রে নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্তের বিষয়টি বিভিন্ন লেখাতে দেখা যায়।৭'ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান তথা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক পরবর্তি জনসভার ঘোষনা দেয়া  হয়।৩'রা মার্চের পরপরই বি এল এফের চার নেতা,চার খলিফা ও বংগমাতা বেগম মুজিবের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড গঠনের কথা জানা যায়। সাতই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বাঙালী জাতির স্মরণকালের ঐতিহাসিক ভাষন দান কালে তিনি বলেন-"এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।"এর পর আর বাকী থাকে কি?২৩'শে মার্চ পল্টন ময়দানে পাকিস্তান দিবসের পরিবর্তে প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়।সারাদেশে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দেয়া হয়।পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দেয়া হয়।এলো ২৫'শে মার্চ।মধ্যরাতে বর্বর পাকবাহিনী স্মরনকালের বৃহত্তম গনহত্যা শুরু করে।বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়।স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দ্রুততম সময়ের ব্যবধানে মুক্তিযুদ্ধ তথা জনযুদ্ধে রূপান্তরের প্রক্রিয়া অবাক বিস্ময়ে সারা দুনিয়া তাকিয়ে রইলো।জনযুদ্ধ চলাকালীন বর্বর পাকিস্তানের সামরিক শাসক কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর বিচার ও ফাঁসীর বিষয়টি বিশ্বব্যাপী আলোচিত।নয়মাসের ব্যবধানে মুক্তি ও মিত্রবাহিনী সমন্বয়ে দেশ স্বাধীন হলো।১৯৭২'সালের ১০'ই জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন বিজয়ীর বেশে।এসেই স্বাধীন দেশের শাসনভার গ্রহন করলেন।চক্রান্তকারীদের কৌশলে যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদকে দূরে সরিয়ে খন্দকার মোশতাককে সবসময় ৩২'নম্বর ধানমন্ডীর বাসায় বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিলো।জনশ্রুতি আছে যে,৩২'নম্বরের বাড়ীতে খোন্দকার মোশতাকের প্রবেশের পর থেকেই মহিয়সী বেগম মুজিবকে কেউ হাসতে দেখেনি।অন্যদিকে সিরাজুল আলম খান কর্তৃক বিপ্লবী জাতীয় সরকার গঠন ও অন্যান্য দাবীকে উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগ দলীয় সরকার গঠিত হলে সদ্য যুদ্ধফেরত অধিকাংশ তরুন তুর্কীরা বিদ্রোহী মনোভাব পোষন করতে থাকে।তাছাড়াও স্বাধীনতাপূর্ব বিরোধীতার জের ধরে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ যথাক্রমে পল্টন ও রেসকোর্স ময়দানে অবশ্য বঙ্গবন্ধুর সম্মতি নিয়ে ছাত্রলীগের কনভেনশনের আয়োজন করে।তবে পরবর্তিতে বঙ্গবন্ধু কেবলমাত্র রেসকোর্সের সভায় যোগ দিলে ছাত্রলীগের পল্টনের অংশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।পরে সিরাজুল আলম খানের নির্দেশনায় স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল হিসাবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল তথা জাসদ আত্মপ্রকাশ করে।১৯৭৪'সালে দেশীয় ও বিদেশী চক্রান্তে দূর্ভিক্ষ দেখা দিলে কিংবা নানা অরাজক অবস্থা ঘরের ভেতরে ও বাইরে দেখা গেলে বিশেষ বিবেচনায় চতুর্থ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে ন্যাপ মোজাফফর ও কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়ে বাকশালের আত্মপ্রকাশ ঘটে।১৯৭৫'সাল।ততদিনে নদীর জল অনেক গড়ালেও বঙ্গবন্ধু অনেক গোয়েন্দা রিপোর্ট কে পাত্তা দেননি এই ভেবে যে-"কোন বাঙালী অন্তত:তাকে হত্যার চিন্তাও করতে পারেনা।"অবশেষে এলো সেই শোকাবহ দিন।পনেরোই আগষ্ট।বাঙালী জাতির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু সহ স্বপরিবারে ইতিহাসের বর্বরতম পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের দিনটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শোকের দিন হিসাবে বাঙালী জাতি ও বাংলাদেশ স্মরণ করবেই।বিশ্বাসঘাতক খূনী মোশতাক চক্রকে জাতি কখনো ক্ষমা করবেনা।বঙ্গবন্ধুর রক্তের উপর দিয়ে আওয়ামী লীগের মোশতাক গং ক্ষমতার মসনদ দখলের বিষয়টি ছাড়াও জিয়া চক্রের সংশ্লিষ্টতা বিশিষ্ট সাংবাদিক অ্যান্তনী ম্যাসকারেনহাস কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর খূনী ফারুক রহমানের সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।ইতিহাসের এই কালো অধ্যায়কে বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতি কখনো ভূলবেনা।অবশ্য বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু তৎপরবর্বর্তি প্রতিবাদ জানানো ও মোশতাক-জিয়া চক্রের সাথে ক্ষমতার সহযোগীদের নিয়ে গবেষনা এখনো চলছে।তাছাড়াও বিশিষ্ট মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ডা: মাহফুজুর রহমানে লেখায় প্রশ্ন- "বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথমে প্রতিবাদ জানানো উচিত ছিলতো আওয়ামী লীগের। এবং তাদের ক্ষমতার পার্টনার মোজাফফর ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির।আর জানানো উচিত ছিলো বঙ্গবন্ধু যাদের বাকশালে নিয়েছিলেন সেই মে.জে.শফিউল্লাহ,মে.জে.জিয়ার।সবচাইতে অবাক করা ব্যাপার হলো তখন দেশের উপ রাষ্ট্রপতি ছিলেন সম্ভবত:সৈয়দ নজরুল ইসলাম।প্রেসিডেন্টের মৃত্যু হলে তারই প্রেসিডন্ট হওয়ার কথা এবং একই সাথে সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হওয়ার কথা।প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মনচুর আলী।এই দুইজন ব্যক্তিত্ব কেন দ্রুততার সাথে এগিয়ে এলেননা----।"অনেককে বলতে শুনা যায়-আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় থাকে তখন আওয়ামী লীগের বাইরের শত্রুর দরকার হয়না।তোষামোদকারী,মোসাহেব আর অতি ভক্তিসম্পন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্টের লোকজন চতুর্দিকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্টে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে যে-ত্যাগী কর্মীরা লজ্জায় লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়।শোকাবহ আগষ্টকে শক্তিতে পরিনত করতে হলে বঙ্গবন্ধুর মতো নির্লোভ,নির্মোহ ও উদার হতে হবে।অর্থ ও ক্ষমতার মোহ কিংবা দাম্ভিকতা অথবা অশিষ্ট আচরনের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।বর্তমানের ও আগামী প্রজন্মের সন্তানেরা যাতে আমাদের দায়ী করতে না পারে সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে।ইতিহাসের এই কালো অধ্যায় থেকে শিক্ষা গ্রহনের শেষ নেই।নিরন্তর গবেষনার বিকল্প নেই।মূখে বললেও ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহনের নজির আজকাল নেই বললে চলে।আমাদের স্মরণ রাখতে হবে-সত্য প্রকাশিত ও মিথ্যা একদিন ভূলূন্টিত হবেই।মৃত্যুন্জয়ী বঙ্গবন্ধুর দেশ বাংলাদেশ।এভারেষ্টশৃঙ্গকে সমুন্নত রাখতে হলে হিমালয়ের চতুর্পার্শ্বের পর্বতরাজিকে সুশোভিত করে তুলতে হবে।শহর,বন্দর ও গ্রামের নদী ও পাহাডগুলোকেও সাজিয়ে তুলতে হবেই।বাংলাদেশের আগামী দিনগুলো সাম্য,সামাজিক ন্যায়বিচার,দূর্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মানে সর্বোপরি গনতান্ত্রিক আচরনের সমৃদ্ধির মধ্য দিয়ে এগুলেই কেবল তখন বঙ্গবন্ধুর আত্মার শান্তি নিশ্চিত হবে।
তথ্যসূত্র:
অসমাপ্ত আত্মজীবনী:শেখ মুজিবুর রহমান
একুশ শতকে বাংলাদেশ-সিরাজুল আলম খান।
Education in Ancient India-Hartmut Sgharfe
বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্ব-নীহাররঞ্জন রায়।
মোস্তফা জব্বার,জাগো নিউজ24.কম
মহিউদ্দিন আহমদের জাসদের উত্থান পতন
বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ফেসবুক ষ্ট্যাটাস।
১৫'ই আগষ্ট,লাস ভেগাস
নেভাদা,যুক্তরাষ্ট্র।


১৫ই আগষ্ট অভিবাদন স্বাধীনতা।আবু জাফর মাহমুদ

শনিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৭

ভারতের স্বাধীনতা দিবসে ভারতীয়দের জানাই অভিনন্দন।বৃটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তির লড়াই এবং সংগ্রামে অংশগ্রহনকারী সকলের প্রতি জানাই সম্মান।নিজেদের দেশ ও জাতির জন্যে যুদ্ধে ও সংগ্রামে জীবন বলিদানকারীদের মৃত্যু হয়েছে বলা যায়না।এই মহান অবদানের জন্যে জগৎস্রষ্টার কাছে তারা নিশ্চয়ই শ্রেষ্ট মানবদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। সর্বাধিনায়ক সুভাষ বোস এবং স্বাধীনতার অন্যান্য সকল বীরদের জানাই আভিবাদন।
 দীর্ঘকাল যাবত আন্দোলন সংগ্রাম বিদ্রোহে জীবন উৎসর্গ ও আধুনিক ভারতে রূপান্তরের শিক্ষা ভারতের স্বাধীনতার বিজয় আনে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরিবেশে বৃটিশ শাসকদের পরাজয় নিশ্চিত হবার পরিস্থিতি দেখা দিলে সফলভাবে সাময়িক পিছু হটার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিলো যুদ্ধের কৌশলে।ফলে ভারত পাকিস্তান ভাগ করে দুই রাষ্ট্রকে স্বাধীনতা দিয়ে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ চালু করা হয়েছিলো।ভারতবর্ষের অভ্যন্তরে স্বাধীনতাপন্থী শক্তিগুলোর উপর্যুপরি সামর্থ্যায়ন দেখানো সম্ভব হয়েছিলো বলেই শাসক বৃটেনকে এই সিদ্ধান্তে যাওয়া সম্ভব করেছিলো।
বিশাল ভারতবর্ষের এই রাজনৈতিক আন্দোলনে কেবল হিন্দুরাই নেতৃত্ব করেছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে এবং ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তরের লক্ষ্যে খোলাখুলি ঘোষণা করছেন বর্তমান ভারতীয় শাসকরা। এদের এই দাবি যে সমগ্র ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা তা বই ঘাটলেই জানা যায়।তর্কের দরকার হয়না।অধিকন্তু বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দুর্গের নাম আর এস এস বা রাষ্ট্রীয় সেবা সংঘ।এই সংঘ যে মূলতঃ ভারতের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি এবং ঐতিহ্যগতভাবে ভারত বিরোধী শক্তি তা ভারতের রাজনীতিবিদরাই প্রকাশ্যে অতীতের রেকর্ড হাতে নিয়েই বলছেন।ভয়াল সংঘাতময় বিশ্ব পরিস্থিতিতে ভারতে যে রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রপরিচালনার ম্যন্ডেট হাতিয়ে নিয়েছে তাদের ভেতরের চিত্র প্রকাশ্যে আসায় পরিস্থিতি সচেতন হওয়া সহজ হয়ে উঠেছে।   
বৃটিশ শাসন থেকে মুক্তির আন্দোলন সংগ্রামের রাজনীতি এবং গেরিলা আক্রমণ ধারায় কখনো সাম্প্রদায়িকতা দেখা যায়নি।মুসলমান রাজনীতিবিদ এবং স্বাধীনতাযোদ্ধাদের মধ্যে হাজার হাজারতো আছেই সর্বোচ্চ সম্মানিত ও সর্বদলের কাছে সমাদৃত টপ ১০ মুসলমান রাজনৈতিক নেতা এবং স্বাধীনতা যোদ্ধাদের নাম এখানে উল্লেখ করা যায়,যাদের নেতৃত্ব এবং অবদানের গুণগতমান কখনো বর্তমান ভারত সরকারের প্রচারণার সাথে মিলেনা।একটা উদাহরণ দেই;  
মুজাফফর আহমেদ(৫ই আগষ্ট ১৮৮৯-১৮ই আগষ্ট ১৯৭৩) কম্যুনিষ্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সবার কাছে  তিনি এতই গ্রহন যোগ্য ছিলেন যে তার নামেই কলকাতায় কম্যুনিষ্ট পার্টির প্রধান কার্যালয় করা হয়।তিনি ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম সারির অন্যতম নেতা এবং স্বাধীনতা যোদ্ধা।স্বাধীনতাযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক সুভাস বোসের সাথে সৈনিক সংগ্রহ এবং জনগণকে স্বাধীনতা যুদ্ধে উদ্ধুদ্ধ করার নেতৃত্ব করার কথা ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।তিনি ভারতীয় সমাজে সকল ধর্ম জাত বংশের মানুষের কাছে কাকাবাবু বলেই সম্মানিত।ভারতীয় স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রথম ১০জন(টপ টেন)রাজনৈতিক নেতা ও যোদ্ধাদের মধ্যে তার নাম উল্লেখিত।বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের সন্দ্বীপে মুছাপুর ইউনিয়নে তিনি জন্মগ্রহন করেন।১৯১৮ সনে তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির যুগ্ম সম্পাদক হন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সহ নবযুগ সাহিত্য ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন।পরবর্তীতে ১৯২২ সনে ধুমকেতু প্রকাশে তিনি সরাসরি অবদান রাখতেন।    
কাকাবাবুকে সম্পাদক করে ১৯২২সনে ভারত সাম্যতন্ত্র সমিতি গঠন হয়েছিলো।কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলার অভিযোগে সহকর্মী শ্রীপদ অমৃত ডাঙে, নলিনী গুপ্ত, শওকত ওসমানীসহ ৪বছর জেল বন্দী ছিলেন।১৯২৫সনে তিনি কারামুক্ত হন অসুস্থতার কারণে।ঐ বছরই তিনি কাজী নজরুল ইসলাম,হেমন্ত কুমার সরকার এবং অন্যান্যদের নিয়ে অবিভক্ত বাংলায় লেবার স্বরাজ পার্টি গড়েন। ১৯২৯ সনের ২০ মার্চ বৃটিশ ঔপনিবেশিক সরকার ৩১জন শ্রমিক নেতাকে গ্রেফতার করে মিরাট নিয়ে যায় বিচারের লক্ষ্যে।কাকাবাবু ছিলেন প্রধান আসামী।
 সবাইকে সাজা দেয়া হয়েছিলো।প্রধান আসামী হিসেবে তার সাজার মেয়াদ ছিলো সবার চেয়ে বেশী।তিনি ১৯৩৬সনে মুক্তি পান।১৯৪৮সনের ২৫মার্চ কম্যুনিষ্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া ব্যান্ড করা হয় এবং কাকাবাবুকে জেলে বন্দী করা হয়।১৯৫১সনে তাকে ছাড়া হয়।১৯৬২সন ও ১৯৬৫সনে বৃটিশ দালাল সরকার কর্তৃক পুনরায় তিনি গ্রেফতার হন।তারপর আরো কয়েকবার বৃটিশ-পন্থী  কংগ্রেস সরকার তাকে গ্রেফতার করে তার তৎপরতা থামিয়ে দিতে।১৯৭৩সনে ৮৪বছর বয়সে কলকাতায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কলকাতার রিপন ষ্ট্রীট মুজাফফর আহমদ সড়ক নামকরণ করা হয়েছে।
লেখক নিজেই বাংলাদেশের স্বাধীনতাযোদ্ধা।ভারতীয়দের কাকাবাবুর জন্মস্থান সন্দ্বীপের গাছুয়া ইউনিয়নে জন্মেছি।স্বাধীনতার আন্দোলন করার পথ ধরে বেড়ে উঠেছি।কম্যুনিষ্ট রাজনীতি ও বিপ্লবের রাজনীতি্র সমসাময়িক গতিপ্রকৃতি ও সাম্রাজ্যবাদী পক্ষের রাজনীতির বিশ্লেষণ করছি বছরের পর বছর।ভারতের রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি আমার আগ্রহের অন্যতম হয়ে উঠেছে প্রাকৃতিক নিয়মেই।     
 
ভারতে কংগ্রেস শাসনে দেখেছি যতো, তার চেয়ে হাজারগুণ বেশী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রভাবে ভারতে বিজেপির সরকার চলছে।সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদী হিন্দুত্ব থাবা মেলে ভারতীয় স্বাধীনতার মূল্যবোধ চিবিয়ে চিবিয়ে ছোবড়া করে ফেলছে। মুসলমানদেরকে নির্মূল করা এবং ভারত ছাড়া করার তৎপরতা চলছে ভারতে।এই বিজেপি সরকারই সীমান্তে রাখছে যুদ্ধ এবং দেশের ভেতরে বাঙালির উপর,মুসলমান খৃষ্টান ও পাহাড়ি আদিবাসীদের উপর চালাচ্ছে ইতিহাসের জঘন্য নিপীড়ন।এই সময় নিজেদের মহাঅপরাধ গোপন করে যেই কাগুজে সাধুবাদী স্বাধীনতার নিয়ম জারি করতে নোটিশ করলেন কেন্দ্রীয় সরকার, প্রতিরোধের পদক্ষেপ নিলো পশ্চিম বাংলা সরকার।                
 সতর্ক হওয়া দরকার এজন্যে যে,ভারতের স্বাধীনতা দিবস (১৫ আগস্ট) পালনের নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে সংঘাত দেখা দিয়েছে।


মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাপরাধীঃ সংখ্যায় কারা বেশী? - সিরাজী এম আর মোস্তাক

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট ২০১৭

বাংলাদেশে প্রায় ২লাখ তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে। তারা মোটা অংকের ভাতা পাচ্ছে। তাদের সন্তান-সন্ততিরা দেশের সকল চাকরিতে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে শতকরা ৩০ভাগ কোটাসুবিধা পাচ্ছে। বাংলাদেশের ১৬কোটি জনতা ও লাখো শিক্ষিত বেকার এর চরম মূল্য দিচ্ছে। সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের পরও এসংখ্যা দুই লাখ দশ হাজার পেরোয়নি। যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ২লাখই চুড়ান্ত ও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত, সুতরাং বাকী জনতা যুদ্ধাপরাধী কিনা তা প্রশ্নবিদ্ধ। এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধে প্রাণদানকারী ৩০লাখ শহীদের বিষয়টি আরো গুরুত্বপুর্ণ। শহীদগণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত নন। তাদের বংশ ও পরিবারের অস্তিত্ব বাংলাদেশে নেই। অর্থাৎ শহীদগণ মুক্তিযোদ্ধা নাকি যুদ্ধাপরাধী, তা স্পষ্ট নয়। বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানও মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত নন। তিনি যুদ্ধাপরাধীও নন। আশ্চর্য্যরে বিষয় হল, ভারতের লালবই থেকে ৬৬হাজার মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হলেও যুদ্ধকালে ভারতে অবস্থানকারী জাতীয় চার নেতাসহ মুজিবনগর সরকারের বহু নেতা মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত নন। যেমন, খন্দকার মোশতাকের মতো প্রখ্যাত নেতা খুনী ও য্দ্ধুাপরাধী। অন্যদিকে বাংলাদেশে অবস্থিত আন্তর্জতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২তে ইতিমধ্যে কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর চুড়ান্ত সাজা হয়েছে। আরো বহু যুদ্ধাপরাধীর বিচার চলছে। উক্ত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে কোনো পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়নি। বরং বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আরো কতো যুদ্ধাপরাধী রয়েছে, তার অন্ত নেই। এ বিচার পৃথিবীর সর্বোচ্চ আদালত তথা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে, ত্ইা এটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ও সর্বজনগ্রাহ্য। এখন বিশ্বব্যাপী পরিব্যাপ্ত যে, বাংলাদেশে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ও তাদের প্রজন্ম রয়েছে। তবে তাদের প্রকৃত সংখ্যা স্পষ্ট নয়।


বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান নিজেই করে গেছেন, মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাপরাধীর সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের সমাধান। আমরা তাঁর মহান আদর্শ ও চেতনা বর্জন করে শুধু শোকেই মুহ্যমান। তাঁর সময়ে দেশে ছিলনা মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা-শহীদ-যুদ্ধাপরাধী ব্যবধান। স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিতর্কের স্থান। দেশে ছিলনা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা দাবি করার সাহসী প্রাণ। সন্তান-সন্ততির জন্য মুক্তিযোদ্ধাকোটা তো একেবারেই বেমানান। কতিপয় কুচক্রীর প্রভাবে বঙ্গবন্ধু কথিত দালালদের বিচার শুরু করলেও ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বরেই তা বাতিল করেন। শুধু বাতিল নয়, বিচারের সামান্য কাগজও বিনষ্ট করেন। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী তৎকালিন আইন মন্ত্রী ড. কামাল হোসেন এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ। এরপর বঙ্গবন্ধু সুস্পষ্টভাবে দেশের সাড়ে সাত কোটি নাগরিককে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেন। মাত্র ৬৭৬ যোদ্ধাকে বিশেষ খেতাব দেন। সাতজন শহীদকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দেন। এভাবে যোদ্ধা ও শহীদের অনুপাত শিখান। শহীদগণ মুক্তিযোদ্ধা তালিকার বাইরে নন। ৩০লাখ বীর শহীদ ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বীর বাঙ্গালির চেয়ে অধিক মর্যাদাবান। এ মহান আদর্শের ফলে, বঙ্গবন্ধুর সময়ে শহীদ-গাজী নির্বিশেষে দেশের সবাই ছিলেন সমান। তারা যুদ্ধাপরাধী বা অমুক্তিযোদ্ধা নন, আত্মত্যাগী ও বীরের জাতি হিসেবে মহীয়ান।
এখন সব উল্টো। পাকিস্তানিদের পরিবর্তে বাংলাদেশিরাই বিশ্ব আদালতে যুদ্ধাপরাধী স্বীকৃত। মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে যুদ্ধাপরাধীর বিষয় বেশি প্রচারিত। যেহেতু বিশ্ববাসী আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুগত, তাদের কাছে ১৯৭১ এর ইতিহাস সেকেলে ও অতীতরূপে বিবেচিত। ফলে এখন বিশ্বে পাকিস্তানিদের পরিবর্তে বাংলাদেশীরাই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে লান্থিত ও নিগৃহিত। যুদ্ধাপরাধী ইস্যু এখন কতিপয় বা সংখ্যাগত নয়, এ লান্থণা পুরো জাতিগত।
অতএব, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে মেকি স্মৃতিচারণ ও লোকদেখানো শোকপালন বাদ দিয়ে আমাদেরকে তাঁর মহান আদর্শ ও চেতনা বাস্তবায়ন করতে হবে। বঙ্গবন্ধুসহ ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বীর বাঙ্গালিকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ-গাজী পার্থক্য দূর করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বর্তমান তালিকাভুক্ত ২লাখ মুক্তিযোদ্ধাগণ বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চারনেতা ও ৩০লাখ শহীদের চেয়ে কখনোই বড় মানের নয়। যেখানে বঙ্গবন্ধু ও লাখো শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নন, সেখানে ২লাখ তালিকা মোটেও সঠিক নয়। তাই বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ৬৭৬ যোদ্ধা ব্যতিত সকল তালিকা বাতিল করতে হবে। এতে দেশবাসী লাখো বীরযোদ্ধা ও শহীদের পরিবারভুক্ত হবে। বঙ্গবন্ধুর সময়ের মতো ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠিত হবে। দেশে যুদ্ধাপরাধীর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যাবেনা। বাংলাদেশিরা মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম, আর পাকিস্তানিরা যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত হবে।
শিক্ষানবিশ আইনজীবী, ঢাকা।


১৫ আগস্ট ॥ বাঙালিত্বকে পাকিস্তানীকরণের চেষ্টা--অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট ২০১৭

শোকের মাস আগস্ট। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার বাংলাদেশের স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মার প্রতি জাতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। সেদিনের শাহাদাতবরণকারী সকলের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা নিছক কোন সাধারণ হত্যাকা- ছিল না। এদিন কেবল জাতির পিতাকে হত্যা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করাই মূল উদ্দেশ্য ছিল না। সেদিন তিনটি হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছিল। এক. বঙ্গবন্ধু, দুই. বাংলাদেশ এবং তিন. বাঙালিত্ব। আমরা অনেক সময় দাবি করি, এ অঞ্চলের মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিল। আমাদের এ ভূ-খ- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু ইতিহাস ঠিক তেমনটি বলে না। এক সময় আমরা হয়তো অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলাম। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের শেষের দিকে এসে সেই চেতনার বিলুপ্তি ঘটে। কেননা সাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতেই ভারত উপমহাদেশ ভাগ হয়ে যায়। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে হিন্দু এবং মুসলমান নামে দুটি ভিন্ন জাতির জন্য দুটি কৃত্রিম রাষ্ট্র তৈরি করা হয়। অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক চেতনার বদ্ধমূল ধারণা থেকেই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির জন্ম। আর অন্য সাম্প্রদায়িক অনুষঙ্গের উপস্থিতির কথা বাদই থাক। দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি পুরোটাই সাম্প্রদায়িকতায় ভরপুর ছিল। তারা ইসলামের নামে বিভিন্ন নির্যাতন ও শোষণে লিপ্ত ছিল। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা কুক্ষিগত করে মানুষকে নিপীড়ন করার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আর একটি রাষ্ট্র ভারত। মোটকথা ইসলামের অপব্যবহার আর ভারতের বিরোধিতা করাই ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ। শোষণ আর নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে আমাদের এ অঞ্চলের মানুষ জাতির পিতার নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুরু থেকেই অনুমান করেছিলেন, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে বাঙালিত্ব চেতনা বিকশিত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। তখন থেকেই শুরু হয় আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মালিক হই। কিন্তু দেখা গেল, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে কেবল রাষ্ট্রনায়ক অথবা স্বাধীনতার স্থপতিকে হত্যা করা হলো তা নয়, ইতিহাসের কলঙ্কময় এ হত্যাকা-ের মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশকে ফের পূর্ব পাকিস্তানে রূপান্তর করা হয়। সব ধরনের মৌলবাদী চিন্তা-চেতনার অনুষঙ্গ ফিরে আসে। বাংলাদেশকে আবার পূর্ব পাকিস্তান বানিয়ে উল্টোপথে যাত্রা শুরু হয়। এতে করে আমরা আবার আমাদের বাঙালিত্বকে হারিয়ে ফেলি। বাঙালিত্ব এবং বাঙালিত্বের অনুষঙ্গের ওপর শুরু হয় একের পর এক আক্রমণ। অর্থাৎ বাঙালিত্বের বিপরীতে ধর্মীয় মৌলবাদী চেতনার বিকাশের সব ধরনের আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা অকল্পনীয় ছিল। বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় কখনও আসেনি যে, বাঙালীরা ষড়যন্ত্র করে তাকে হত্যা করতে পারে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বিষয়ে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য তার কাছে ঠিক মতো পৌঁছে ছিল কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অনিশ্চিত এ কারণেই যে, মিলিটারি ব্যুরোক্রেসিসহ যারা গোয়েন্দা সংস্থায় থাকেন, তারা তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এক ধরনের বাধার সৃষ্টি করেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধে ১০০ জনের কম বাঙালী সেনাবাহিনীর অফিসার পদে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেছিল এক হাজার জনের মতো অফিসার। আমি বলব না যে, যারা পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেছিলেন তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিলেন। পাকিস্তানে যারা অবস্থান করছিলেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রশিক্ষণ ছিল অন্য রকমের। যুদ্ধের সময় তারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং ৯ মাসের যুদ্ধের নৃশংসতা দেখেননি। স্বাধীন দেশের শুরুতেই সামরিক এবং আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে, সামরিক বাহিনীর কয়েকজন বাঙালী অফিসার, সম্ভবত সাতজন, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেছিল, যারা বাংলাদেশের বিপক্ষে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। যেসব পাকিস্তানী সামরিক অফিসার আত্মসমর্পণ করেছিল, তাদের মধ্যে ওই সাত বাঙালী সামরিক অফিসার ছিল। চাকরি চলে যাওয়ায় না খেয়ে মরতে বসেছে বলে জেনারেল ওসমানী তাদের বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে জানানো হয়, তারা পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করে আত্মসমর্পণ করেছে। তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এদের আর্মিতে নিয়েছিল কে? এরা তো পুলিশ হওয়ারও উপযুক্ত না।’ বঙ্গবন্ধুর অনুকম্পায় তাদের পুলিশে রূপান্তর করা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে এরাই ডিআইজি পর্যন্ত হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রামে শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার সময় ২৭ জন আওয়ামী লীগ কর্মী জীবন দিয়েছিল, ওই হত্যাকা-ের অর্ডার দিয়েছিল ওই ঘরানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা। আমাদের মনে রাখতে হবে ১৯৭০ সালে যখন প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন হয় তখনও সুস্পষ্টভাবে স্বাধীনতার কথা আসেনি। কেবল ছয় দফা উত্থাপিত হয়। কারণ, বঙ্গবন্ধু মনে করতেন ছয় দফা বাস্তবায়িত হলেই আমরা স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাব। সেই ১৯৭০-এর নির্বাচনেও প্রায় ২৪ শতাংশ মানুষ ছয় দফার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। স্বাধীনতা তো দূরের কথা, ছয় দফার বিরুদ্ধেই ছিল ২৪ শতাংশ মানুষ। এ লোকগুলো কোথায় গেল? এ লোকগুলোর পরাজয়ের গ্লানি এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয় পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র, সামরিক এবং বেসামরিক ষড়যন্ত্রকারী চক্র। ফলে বঙ্গবন্ধুর প্রশাসন এবং সরকারকে অকার্যকর করা, জনপ্রিয়তা হ্রাস করাসহ সব জায়গা থেকে সব ধরনের ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল। আজকে আমেরিকা আমাদের উন্নয়ন সহযোগী এবং চীন আমাদের অন্যতম বন্ধু রাষ্ট্র। মনে রাখতে হবে, আমাদের স্বাধীনতার শেষ মুহূর্তে এসে যখন জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটাভুটি হয়, তখন সোভিয়েত বলয়ের মাত্র কয়েকটি রাষ্ট্র আমাদের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। জাতিসংঘের অনেক রাষ্ট্র, যাদের আমরা ইসলামী রাষ্ট্র এবং বৃহৎ শক্তি বলি তারা কিন্তু আমাদের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল। কাজেই সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টি কেবল পাকিস্তানের পরাজয়ই ছিল না, ওই সকল বৃহৎ শক্তিরও পরাজয় ছিল। ১৯৭৫ সালে সারাবিশ্বে ভিন্ন অবস্থা বিরাজ করে। সামরিক শক্তি হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন, পুঁজিবাদের দেশ আমেরিকা এবং কমিউনিজম দেশ চীন এ বিষয়গুলো এক একটি ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্ব নেতা যেমনÑ ফিদেল কাস্ট্রো, মার্শাল টিটো, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়গুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। অর্থাৎ সব ঘটনার সম্মিলিত ফলাফলই ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা। এর মধ্য দিয়ে পরাজিত শক্তি এবং তাদের দোসরদের আক্রোশ মিটে। আজকে আমরা যাদের বন্ধু রাষ্ট্র বা উন্নয়ন সহযোগী বলি তাদেরও কিন্তু আক্রোশ ছিল। হেনরি কিসিঞ্জারের বক্তব্যগুলো এবং পরবর্তীকালে তাদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেবল পাকিস্তানই যে পরাজিত শক্তি তা নয়, অন্যরাও পরাজয় মেনে নিতে পারেনি। তারা শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রকে সমর্থন করেছিল এবং যুদ্ধে অংশীদারিত্ব ছিল। এর সঙ্গে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবির রাজাকারদের ষড়যন্ত্র তো ছিলই।

র্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা কি আজীবন মুক্তিযোদ্ধা থাকেন? রাজাকার সারাজীবনের জন্য রাজাকার কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা আজীবনের জন্য মুক্তিযোদ্ধা নাও হতে পারেন। ড. হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ‘১৯৭১ সালেও আমি এত রাজাকার দেখিনি। যা এখন দেখি।’ অর্থাৎ রাজাকারদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, তারা আজীবন যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ না করে এবং একপর্যায়ে বলেই ফেলেন মুক্তিযুদ্ধ করাটাই ভুল ছিল। তাহলে তিনি আর মুক্তিযোদ্ধা থাকেন কি করে? এর মানে হচ্ছে, ভুল কাজ করে আপনি আজীবন চলতে পারেন না। আজকাল অনেকে বলেন, জঙ্গী, শিবির, মৌলবাদী সংগঠনের যুদ্ধাংদেহী গ্রুপ এদের অনেকেরই জন্ম সাম্প্রতিককালে। এমন অনেক সংগঠনের জন্ম আবার ’৭৫-এর পরে। তাহলে এদের আমরা কেন রাজাকার বলব? মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজাকার চেতনাগত বিষয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালিত্বকে স্বীকার করে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, তারা যদি এখন তা অস্বীকার করেন তাহলে তারা আর মুক্তিযোদ্ধা থাকতে পারেন না। যার নেতৃত্বে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করলাম, আবার তারই হত্যাকারীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে কথা বলি, আবার অব্যাহতভাবে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করি তাহলে এর চেয়ে হটকারী এবং অপমানজনক আর কিছু হতে পারে না। তবে বঙ্গবন্ধু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন, তাদের রাজনীতি করা নিষিদ্ধ করে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানÑ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ে যার ভূমিকা এখন স্পষ্ট, ক্ষমতায় এসে আবার স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিতে বৈধতা দেয়। তথাকথিত ইসলামিক দলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে। চাপাতি-নির্ভর ইসলামিক জঙ্গী সংগঠন, ’৭১ এর স্বাধীনতাবিরোধীদের আলাদা করে দেখার কোন সুযোগ নেই। এদের মাঝে এক ধরনের যোগসূত্র রয়েছে। এরা ওই ছয় দফার বিরোধী ২৪ শতাংশের অংশ। ঠিক এরাই রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং পহেলা বৈশাখের বিরোধিতা করেছিল। এমনকি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেরও বিরোধিতা করেছিল। ১৯৪৮ সালের ৮ আগস্ট পাকিস্তান শাসনতন্ত্র পরিষদের মিটিংয়ে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় কেবল কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছাড়া পূর্ব বাংলার প্রতিনিধিরা উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার পক্ষে মত দিয়েছিল। কাজেই চাপাতি মতবাদের উৎপত্তি বর্তমানের আদলে দেখলে হবে না। তাদের উৎপত্তি ভাষা আন্দোলন থেকেই। যা কিছু আমাদের জন্য ভাল এবং মঙ্গলজনক, তার সবকিছুর বিরোধিতা করতে করতে তারা এত দূর এসেছে। বিষয়গুলো চিন্তা করলে রাজাকারদের সংখ্যা বাড়া নিয়ে আশ্চর্য হওয়ার কোন কারণ নেই। অব্যাহতভাবে এদের দমন করার জন্য আইনী ও পুলিশী ব্যবস্থা যেমন থাকবে, তেমনি দরকার এক ধরনের সামাজিক আন্দোলন। তাদের উৎপত্তি ইতিহাস বলে তাদের বিরুদ্ধে সবাইকে দাঁড় করাতে হবে। কেবল র‌্যাব-পুলিশ দিয়ে এ অপশক্তি দূর করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু অনেক দূরদর্শী নেতা ছিলেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী আমলের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল ধর্মীয় মৌলবাদ সৃষ্টির উর্বরভূমি। আর পাকিস্তান আমলে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ছিল ভারত বিরোধিতা এবং ইসলামের নামে শাসন ও শোষণের সকল উপকরণ। বঙ্গবন্ধু প্রথমেই একটি বিজ্ঞানমনস্ক জাতি তৈরিতে মনোযোগ দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের ধর্মীয় উন্মাদনা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরুতেই তিনি কুদরত-ই-খোদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। যাতে আমরা একটি বিজ্ঞানমনস্ক জাতিতে রূপান্তরিত হই। এখন আমরা অনেক কথাই বলি, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকনির্দেশনা কিন্তু বঙ্গবন্ধুই দিয়ে গেছেন। কুদরত-ই-খোদা শিক্ষা কমিশনে শিক্ষাকে একমুখীকরণসহ অনেক বিষয়ই ছিল। মানবিকতাকে বিকশিত করার সামাজিক শিক্ষা যদি আমরা সন্তানদের দিতে না পারি, তাহলে কোনভাবেই জঙ্গীবাদের ভয়াবহতা মোকাবেলা করতে পারব না।


অপশক্তির সঙ্গে অর্থনীতি জড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক শক্তি এ গোষ্ঠীর চালিকাশক্তি হিসেবে ইন্ধন জোগায়। রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধী বা যুদ্ধাপরাধী যাই বলি না কেন, তাদের দখলে রাষ্ট্রের অর্থনীতির বিরাট এক অংশ চলে গেছে। কাজেই অর্থনীতি এবং সামাজিক ক্ষেত্রে আমাদের আরও জোর দিতে হবে। প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের রাজাকার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
আমাদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে ধাবিত হতে হবে, যা বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে শুরু করেছিলেন। পাকিস্তান এবং তাদের দোসররা কেবল ১৫ আগস্ট ঘটিয়ে চলে গেছে তাই নয়। ১৫ আগস্টের পর গণতন্ত্রকে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী করে গিয়েছিল। ক্যান্টনমেন্টেই আমাদের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী থাকতেন, এমনকি বেসামরিক তথাকথিত গণতন্ত্রের লেবাসেও। ক্যান্টনমেন্ট ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর ঠিকানাই ছিল ক্যান্টনমেন্ট। ফলে পাকিস্তান ক্যান্টনমেন্টভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে এ দেশের রাজনীতিতে ১৫ আগস্টের মতো ঘটনা বারবার ঘটানোর চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকবে কিনা? সম্পর্ক আমরা কোন পর্যায়ে রাখব? এসব বিষয়ে যথেষ্ট চিন্তা সাপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাকিস্তানীরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। সংসদে প্রস্তাব পাস করেছে। তাদের সঙ্গে আমাদের সামান্য কিছু বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। কিছু ব্যবসায়ী ব্যবসা করছে। আবার সার্ক ও ওআইসিসহ কিছু আন্তর্জাতিক ফোরামে তাদের সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। তবে পাকিস্তানী দূতাবাস এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকা- নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখতেই হবে। কারণ পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ক্ষমতার পালাবদল তথা জুডিসিয়াল ক্যু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সেই ভারত বিরোধিতা এবং ক্যান্টনমেন্টের শক্তির ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। তারা এ ষড়যন্ত্র কেবল পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না, বাংলাদেশেও রফতানি করার চেষ্টা করবে।
লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
শোকের মাস আগস্ট। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার বাংলাদেশের স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মার প্রতি জাতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। সেদিনের শাহাদাতবরণকারী সকলের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা নিছক কোন সাধারণ হত্যাকা- ছিল না। এদিন কেবল জাতির পিতাকে হত্যা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করাই মূল উদ্দেশ্য ছিল না। সেদিন তিনটি হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছিল। এক. বঙ্গবন্ধু, দুই. বাংলাদেশ এবং তিন. বাঙালিত্ব। আমরা অনেক সময় দাবি করি, এ অঞ্চলের মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিল। আমাদের এ ভূ-খ- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু ইতিহাস ঠিক তেমনটি বলে না। এক সময় আমরা হয়তো অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলাম। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের শেষের দিকে এসে সেই চেতনার বিলুপ্তি ঘটে। কেননা সাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতেই ভারত উপমহাদেশ ভাগ হয়ে যায়। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে হিন্দু এবং মুসলমান নামে দুটি ভিন্ন জাতির জন্য দুটি কৃত্রিম রাষ্ট্র তৈরি করা হয়। অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক চেতনার বদ্ধমূল ধারণা থেকেই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির জন্ম। আর অন্য সাম্প্রদায়িক অনুষঙ্গের উপস্থিতির কথা বাদই থাক। দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি পুরোটাই সাম্প্রদায়িকতায় ভরপুর ছিল। তারা ইসলামের নামে বিভিন্ন নির্যাতন ও শোষণে লিপ্ত ছিল। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা কুক্ষিগত করে মানুষকে নিপীড়ন করার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আর একটি রাষ্ট্র ভারত। মোটকথা ইসলামের অপব্যবহার আর ভারতের বিরোধিতা করাই ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ। শোষণ আর নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে আমাদের এ অঞ্চলের মানুষ জাতির পিতার নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুরু থেকেই অনুমান করেছিলেন, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে বাঙালিত্ব চেতনা বিকশিত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। তখন থেকেই শুরু হয় আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মালিক হই। কিন্তু দেখা গেল, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে কেবল রাষ্ট্রনায়ক অথবা স্বাধীনতার স্থপতিকে হত্যা করা হলো তা নয়, ইতিহাসের কলঙ্কময় এ হত্যাকা-ের মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশকে ফের পূর্ব পাকিস্তানে রূপান্তর করা হয়। সব ধরনের মৌলবাদী চিন্তা-চেতনার অনুষঙ্গ ফিরে আসে। বাংলাদেশকে আবার পূর্ব পাকিস্তান বানিয়ে উল্টোপথে যাত্রা শুরু হয়। এতে করে আমরা আবার আমাদের বাঙালিত্বকে হারিয়ে ফেলি। বাঙালিত্ব এবং বাঙালিত্বের অনুষঙ্গের ওপর শুরু হয় একের পর এক আক্রমণ। অর্থাৎ বাঙালিত্বের বিপরীতে ধর্মীয় মৌলবাদী চেতনার বিকাশের সব ধরনের আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা অকল্পনীয় ছিল। বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় কখনও আসেনি যে, বাঙালীরা ষড়যন্ত্র করে তাকে হত্যা করতে পারে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বিষয়ে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য তার কাছে ঠিক মতো পৌঁছে ছিল কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অনিশ্চিত এ কারণেই যে, মিলিটারি ব্যুরোক্রেসিসহ যারা গোয়েন্দা সংস্থায় থাকেন, তারা তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এক ধরনের বাধার সৃষ্টি করেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধে ১০০ জনের কম বাঙালী সেনাবাহিনীর অফিসার পদে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেছিল এক হাজার জনের মতো অফিসার। আমি বলব না যে, যারা পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেছিলেন তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিলেন। পাকিস্তানে যারা অবস্থান করছিলেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রশিক্ষণ ছিল অন্য রকমের। যুদ্ধের সময় তারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং ৯ মাসের যুদ্ধের নৃশংসতা দেখেননি। স্বাধীন দেশের শুরুতেই সামরিক এবং আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে, সামরিক বাহিনীর কয়েকজন বাঙালী অফিসার, সম্ভবত সাতজন, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেছিল, যারা বাংলাদেশের বিপক্ষে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। যেসব পাকিস্তানী সামরিক অফিসার আত্মসমর্পণ করেছিল, তাদের মধ্যে ওই সাত বাঙালী সামরিক অফিসার ছিল। চাকরি চলে যাওয়ায় না খেয়ে মরতে বসেছে বলে জেনারেল ওসমানী তাদের বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে জানানো হয়, তারা পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করে আত্মসমর্পণ করেছে। তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এদের আর্মিতে নিয়েছিল কে? এরা তো পুলিশ হওয়ারও উপযুক্ত না।’ বঙ্গবন্ধুর অনুকম্পায় তাদের পুলিশে রূপান্তর করা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে এরাই ডিআইজি পর্যন্ত হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রামে শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার সময় ২৭ জন আওয়ামী লীগ কর্মী জীবন দিয়েছিল, ওই হত্যাকা-ের অর্ডার দিয়েছিল ওই ঘরানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা। আমাদের মনে রাখতে হবে ১৯৭০ সালে যখন প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন হয় তখনও সুস্পষ্টভাবে স্বাধীনতার কথা আসেনি। কেবল ছয় দফা উত্থাপিত হয়। কারণ, বঙ্গবন্ধু মনে করতেন ছয় দফা বাস্তবায়িত হলেই আমরা স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাব। সেই ১৯৭০-এর নির্বাচনেও প্রায় ২৪ শতাংশ মানুষ ছয় দফার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। স্বাধীনতা তো দূরের কথা, ছয় দফার বিরুদ্ধেই ছিল ২৪ শতাংশ মানুষ। এ লোকগুলো কোথায় গেল? এ লোকগুলোর পরাজয়ের গ্লানি এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয় পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র, সামরিক এবং বেসামরিক ষড়যন্ত্রকারী চক্র। ফলে বঙ্গবন্ধুর প্রশাসন এবং সরকারকে অকার্যকর করা, জনপ্রিয়তা হ্রাস করাসহ সব জায়গা থেকে সব ধরনের ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল। আজকে আমেরিকা আমাদের উন্নয়ন সহযোগী এবং চীন আমাদের অন্যতম বন্ধু রাষ্ট্র। মনে রাখতে হবে, আমাদের স্বাধীনতার শেষ মুহূর্তে এসে যখন জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটাভুটি হয়, তখন সোভিয়েত বলয়ের মাত্র কয়েকটি রাষ্ট্র আমাদের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। জাতিসংঘের অনেক রাষ্ট্র, যাদের আমরা ইসলামী রাষ্ট্র এবং বৃহৎ শক্তি বলি তারা কিন্তু আমাদের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল। কাজেই সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টি কেবল পাকিস্তানের পরাজয়ই ছিল না, ওই সকল বৃহৎ শক্তিরও পরাজয় ছিল। ১৯৭৫ সালে সারাবিশ্বে ভিন্ন অবস্থা বিরাজ করে। সামরিক শক্তি হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন, পুঁজিবাদের দেশ আমেরিকা এবং কমিউনিজম দেশ চীন এ বিষয়গুলো এক একটি ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্ব নেতা যেমনÑ ফিদেল কাস্ট্রো, মার্শাল টিটো, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়গুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। অর্থাৎ সব ঘটনার সম্মিলিত ফলাফলই ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা। এর মধ্য দিয়ে পরাজিত শক্তি এবং তাদের দোসরদের আক্রোশ মিটে। আজকে আমরা যাদের বন্ধু রাষ্ট্র বা উন্নয়ন সহযোগী বলি তাদেরও কিন্তু আক্রোশ ছিল। হেনরি কিসিঞ্জারের বক্তব্যগুলো এবং পরবর্তীকালে তাদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেবল পাকিস্তানই যে পরাজিত শক্তি তা নয়, অন্যরাও পরাজয় মেনে নিতে পারেনি। তারা শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রকে সমর্থন করেছিল এবং যুদ্ধে অংশীদারিত্ব ছিল। এর সঙ্গে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবির রাজাকারদের ষড়যন্ত্র তো ছিলই।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা কি আজীবন মুক্তিযোদ্ধা থাকেন? রাজাকার সারাজীবনের জন্য রাজাকার কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা আজীবনের জন্য মুক্তিযোদ্ধা নাও হতে পারেন। ড. হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ‘১৯৭১ সালেও আমি এত রাজাকার দেখিনি। যা এখন দেখি।’ অর্থাৎ রাজাকারদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, তারা আজীবন যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ না করে এবং একপর্যায়ে বলেই ফেলেন মুক্তিযুদ্ধ করাটাই ভুল ছিল। তাহলে তিনি আর মুক্তিযোদ্ধা থাকেন কি করে? এর মানে হচ্ছে, ভুল কাজ করে আপনি আজীবন চলতে পারেন না। আজকাল অনেকে বলেন, জঙ্গী, শিবির, মৌলবাদী সংগঠনের যুদ্ধাংদেহী গ্রুপ এদের অনেকেরই জন্ম সাম্প্রতিককালে। এমন অনেক সংগঠনের জন্ম আবার ’৭৫-এর পরে। তাহলে এদের আমরা কেন রাজাকার বলব? মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজাকার চেতনাগত বিষয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালিত্বকে স্বীকার করে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, তারা যদি এখন তা অস্বীকার করেন তাহলে তারা আর মুক্তিযোদ্ধা থাকতে পারেন না। যার নেতৃত্বে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করলাম, আবার তারই হত্যাকারীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে কথা বলি, আবার অব্যাহতভাবে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করি তাহলে এর চেয়ে হটকারী এবং অপমানজনক আর কিছু হতে পারে না। তবে বঙ্গবন্ধু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন, তাদের রাজনীতি করা নিষিদ্ধ করে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানÑ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ে যার ভূমিকা এখন স্পষ্ট, ক্ষমতায় এসে আবার স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিতে বৈধতা দেয়। তথাকথিত ইসলামিক দলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে। চাপাতি-নির্ভর ইসলামিক জঙ্গী সংগঠন, ’৭১ এর স্বাধীনতাবিরোধীদের আলাদা করে দেখার কোন সুযোগ নেই। এদের মাঝে এক ধরনের যোগসূত্র রয়েছে। এরা ওই ছয় দফার বিরোধী ২৪ শতাংশের অংশ। ঠিক এরাই রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং পহেলা বৈশাখের বিরোধিতা করেছিল। এমনকি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেরও বিরোধিতা করেছিল। ১৯৪৮ সালের ৮ আগস্ট পাকিস্তান শাসনতন্ত্র পরিষদের মিটিংয়ে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় কেবল কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছাড়া পূর্ব বাংলার প্রতিনিধিরা উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার পক্ষে মত দিয়েছিল। কাজেই চাপাতি মতবাদের উৎপত্তি বর্তমানের আদলে দেখলে হবে না। তাদের উৎপত্তি ভাষা আন্দোলন থেকেই। যা কিছু আমাদের জন্য ভাল এবং মঙ্গলজনক, তার সবকিছুর বিরোধিতা করতে করতে তারা এত দূর এসেছে। বিষয়গুলো চিন্তা করলে রাজাকারদের সংখ্যা বাড়া নিয়ে আশ্চর্য হওয়ার কোন কারণ নেই। অব্যাহতভাবে এদের দমন করার জন্য আইনী ও পুলিশী ব্যবস্থা যেমন থাকবে, তেমনি দরকার এক ধরনের সামাজিক আন্দোলন। তাদের উৎপত্তি ইতিহাস বলে তাদের বিরুদ্ধে সবাইকে দাঁড় করাতে হবে। কেবল র‌্যাব-পুলিশ দিয়ে এ অপশক্তি দূর করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু অনেক দূরদর্শী নেতা ছিলেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী আমলের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল ধর্মীয় মৌলবাদ সৃষ্টির উর্বরভূমি। আর পাকিস্তান আমলে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ছিল ভারত বিরোধিতা এবং ইসলামের নামে শাসন ও শোষণের সকল উপকরণ। বঙ্গবন্ধু প্রথমেই একটি বিজ্ঞানমনস্ক জাতি তৈরিতে মনোযোগ দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের ধর্মীয় উন্মাদনা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরুতেই তিনি কুদরত-ই-খোদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। যাতে আমরা একটি বিজ্ঞানমনস্ক জাতিতে রূপান্তরিত হই। এখন আমরা অনেক কথাই বলি, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকনির্দেশনা কিন্তু বঙ্গবন্ধুই দিয়ে গেছেন। কুদরত-ই-খোদা শিক্ষা কমিশনে শিক্ষাকে একমুখীকরণসহ অনেক বিষয়ই ছিল। মানবিকতাকে বিকশিত করার সামাজিক শিক্ষা যদি আমরা সন্তানদের দিতে না পারি, তাহলে কোনভাবেই জঙ্গীবাদের ভয়াবহতা মোকাবেলা করতে পারব না।
অপশক্তির সঙ্গে অর্থনীতি জড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক শক্তি এ গোষ্ঠীর চালিকাশক্তি হিসেবে ইন্ধন জোগায়। রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধী বা যুদ্ধাপরাধী যাই বলি না কেন, তাদের দখলে রাষ্ট্রের অর্থনীতির বিরাট এক অংশ চলে গেছে। কাজেই অর্থনীতি এবং সামাজিক ক্ষেত্রে আমাদের আরও জোর দিতে হবে। প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের রাজাকার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
আমাদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে ধাবিত হতে হবে, যা বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে শুরু করেছিলেন। পাকিস্তান এবং তাদের দোসররা কেবল ১৫ আগস্ট ঘটিয়ে চলে গেছে তাই নয়। ১৫ আগস্টের পর গণতন্ত্রকে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী করে গিয়েছিল। ক্যান্টনমেন্টেই আমাদের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী থাকতেন, এমনকি বেসামরিক তথাকথিত গণতন্ত্রের লেবাসেও। ক্যান্টনমেন্ট ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর ঠিকানাই ছিল ক্যান্টনমেন্ট। ফলে পাকিস্তান ক্যান্টনমেন্টভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে এ দেশের রাজনীতিতে ১৫ আগস্টের মতো ঘটনা বারবার ঘটানোর চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকবে কিনা? সম্পর্ক আমরা কোন পর্যায়ে রাখব? এসব বিষয়ে যথেষ্ট চিন্তা সাপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাকিস্তানীরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। সংসদে প্রস্তাব পাস করেছে। তাদের সঙ্গে আমাদের সামান্য কিছু বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। কিছু ব্যবসায়ী ব্যবসা করছে। আবার সার্ক ও ওআইসিসহ কিছু আন্তর্জাতিক ফোরামে তাদের সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। তবে পাকিস্তানী দূতাবাস এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকা- নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখতেই হবে। কারণ পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ক্ষমতার পালাবদল তথা জুডিসিয়াল ক্যু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সেই ভারত বিরোধিতা এবং ক্যান্টনমেন্টের শক্তির ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। তারা এ ষড়যন্ত্র কেবল পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না, বাংলাদেশেও রফতানি করার চেষ্টা করবে।


শেখ কামাল হোক প্রজন্মের প্রেরণার শিক্ষক

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট ২০১৭

altমুক্তিযুদ্ধের অবিসংবিদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবনের প্রতিটি পরতে এবং বাংলাদেশ প্রাপ্তিতে তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্যের যে অসামান্য অবদান এবং ত্যাগ রয়েছে, তা আমরা ভুলে যাচ্ছি একটু একটু করে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই মাপের নেতা এবং জাদুকর, যার দেখানো পথে লাখো লাখো বাঙালী যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল।শুধু তাই নয় জাতির পিতার বড় দুই ছেলে, শেখ কামাল ও শেখ জামালও সেই যুদ্ধের অগ্রসেনানী ছিলেন। তাদের বিরত্বের কথা এবং তাদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা খুব কমই আলোচনা দেখতে পাই। ইতিহাস বিকৃতিকারীরা সুকৌশলে যুব সমাজের যারা আইকন হতে পারতেন, তাদের কথা আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে যুগের পর যুগ ধরে, নানা অপকৌশল খাটিয়ে।আমাদের তরুণরা বিদেশি তরুণদের বীরত্বের কথা জানে কিন্তু নিজের দেশের রত্নদের বীরত্বের কথা জানা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। বঙ্গবন্ধুর পরিবার নিয়ে মিথ্যাচারের যে বেসাতি প্রচলিত আছে, তার মধ্যে অন্যতম একটি যে, তাঁর পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি, এবং তারা ভারতে পালিয়ে ছিলেন ইত্যাদি।

আজ ৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের জন্মদিন। এই দিনটিকে অগ্রগণ্য করে জেনে নেওয়া যাক বাংলার ঝরে যাওয়া এক অসামান্য নক্ষত্র শেখ কামালের কিছু জীবনগাঁথা। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ সহ সার্বিক ক্ষেত্রে তিনি যে অসামান্য অবদান রেখে গিয়েছেন, তার কিছু ঐতিহাসিক সংক্ষিপ্ত ধারাবর্ণনা।

শেখ কামাল ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বড় বোন শেখ হাসিনার পরেই বাবা মার কোল আলোকিত করে এসেছিলেন তিনি এই ধরার বুকে! পড়াশোনায় দারুন মনোযোগী ও মেধাবী শেখ কামাল শাহীন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছিলেন। এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ণরত অবস্থায়ই মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আত্মগোপণ করতে সক্ষম হলেও বঙ্গবন্ধুর পরিবারের বাকি সদস্যরা গ্রেফতার হয়েছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে।

পাকিস্তান সরকারের তৎকালীন গণপরিষদ নেতা ইলিয়াস চৌধুরী এবং তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা শহিদুল ইসলামের সাথে মে মাসের প্রথম দিকে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি থানা হয়ে মুকসুদপুর দিয়ে যশোর সীমান্ত পার হয়ে ভারতে গমন করেন। ভারতের বেলুনিয়া থেকে সেনাবাহিনীর প্রথম যে ব্যাচটি কমিশন্ড লাভ করেছিল, তার একজন সফল অগ্রসেনানী হিসেবে শেখ কামাল কৃতকার্য হয়েছিলেন। সেই অর্থে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর প্রথম ব্যাচের পাসকৃত ক্যাডেটদের মধ্যে অন্যতম একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেনাসদস্য ছাড়াও তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রধানসেনা অধিনায়ক এজিএম ওসমানীর এডিসি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেছিলেন এবং পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নে ফিরে এসেছিলেন এবং অত্যন্ত সফলতার সাথে  সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছিলেন।

বহুমুখী প্রতিভার সমন্বয় ঘটা একজন ব্যক্তিত্ব বলতে যা বুঝানো হয়, শেখ কামাল ছিলেন সেধরনের একজন মানুষ, যিনি তার উজ্জল ও প্রদীপ্ত মেধার আলোয় উদ্ভাসিত ছিলেন। যুদ্ধফেরত একজন শেখ কামাল যে শুধু পড়াশুনায় তুখড় ছিলেন তা নয়; একই সাথে তিনি অসাধারণ সেতার বাজিয়ে ছিলেন। ছায়ানট বিদ্যায়তনে সেতারের তামিল নিয়েছিলেন সফলতার সাথে। সবকিছু ছাড়িয়ে তিনি সর্বোচ্চ মনযোগী ছিলেন খেলাধুলায়। তার সমসাময়িককালে তার মতো এত বড় এবং উচ্চতার ক্রিয়াসংগঠক বাংলাদেশের ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি জন্ম নেয়নি। ঐতিহ্যবাহী আবাহনী ফুটবল ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বাংলাদেশের ফুটবলের যে মানোন্নয়ন তিনি করে গিয়েছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ায় সম্মানজনক জায়গা দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছে। সেই অর্থে স্বাধীন বাংলাদেশের ফুটবল এবং আবহানী ক্লাবকে আলাদা করে ভাবার কোনও যৌক্তিক কারণ নেই। ক্রীড়ামোদী শেখ কামাল আজো বেঁচে আছেন আবাহনী ক্রীড়া চক্রের প্রতিটা ধুলিকণার সাথে এবং সেই সাথে বাংলাদেশের প্রতিটি ক্রীড়াপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে। শুধুমাত্র ফুটবলেই তার কর্মযজ্ঞ সীমাবদ্ধ ছিল না। একাধারে ক্রিকেট, হকি, ভলিবল সহ প্রায় সব খেলায়ই তার দারুন ঝোঁক আর আগ্রহ ছিল।

স্কুলজীবন থেকেই নিয়মিত ক্রিকেট খেলায় অংশ নিয়ে যথেষ্ঠ সুনাম কুড়িয়েছিলেন তিনি। প্রথম বিভাগে জাতীয় ক্রিকেট টুর্নামেন্টে খেলেছেন আজাদ বয়েজ ক্লাবের পক্ষ হয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত অবস্থায় ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি তিনি নিয়মিত খেলাধুলায় আত্মনিয়োগ করেছেন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বাস্কেটবল দলের অধিনায়ক হিসেবে যে অসামান্য নৈপুণ্য তিনি দেখিয়েছিলেন,  সেই তথ্য হয়তো সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের অনেক ছাত্রই আজ জানে না।

খেলাধুলার পাশাপাশি তিনি সংস্কৃতি চর্চায়ও ছিলেন পুরোধা। তার নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী’ ছিল তখনকার সময়ে বাঙালি সমাজের অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও সুস্থ্য সংস্কৃতিচর্চার সুতিকাগার। তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যে স্পন্দন তিনি রেখে গিয়েছিলেন, তা হতে পারত আধুনিক তরুণ সমাজের প্রেরণার উৎস। মঞ্চ নাটকেও তিনি তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছিলেন। ‘নাট্যচক্র’ নামে নাট্যগোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক ছিলেন তিনি। নাট্যচক্রের হয়ে দেশে-বিদেশে মঞ্চ নাটকে তিনি নিজের উদ্ভাসিত প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে গিয়েছিলেন। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হয়েও সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপণ করেছেন। একজন তুখোড় ছাত্রনেতা ও ক্ষমতাধর রাজনীতির খুব কাছের মানুষ হয়েও তিনি কোনোদিন প্রধানমন্ত্রী বাবার প্রভাব খাটাননি। রাজনৈতিক শিষ্টাচার চর্চায় তিনি থেকেছেন আরো দশটা সাধারণ কর্মীর মতোই।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময় তখন, ছাত্রলীগ তার অন্যতম গৌরবময় সময় অতিবাহিত করছে যা ছিল সবচেয়ে দাপুটে সংগঠন তখন বাংলাদেশের। তৎকালীন সময়ের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা চাইতেন শেখ কামাল ছাত্রলীগের সর্বাগ্রে থাকুক এবং নেতৃত্ব দিক। কিন্তু তাতে রাজী হননি তিনি। তিনি পছন্দ করতেন নিজে পেছনে থেকে সবাইকে সামনে এগিয়ে দিতে। তার উৎসাহ ও পরামর্শে তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের যে উৎসাহ ছিল, তা স্মরণকালের স্বর্ণাক্ষরেই লেখা থাকবে। কর্মীদের মনোবল বাড়াতে এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে শুধু নামমাত্র কেন্দ্রীয় কমিটির পদে থেকেছেন; তবে দলের শীর্ষপদ নিতে সব সময়ই নারাজি ছিলেন। তিনি জাতীয় ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্ত থেকে তার রাজনীতির সঙ্গবদ্ধতা চালিয়ে গিয়েছিলেন।

শেখ কামাল ছিলেন একজন আড্ডাপ্রিয় মানুষ। ক্যাম্পাসের সব আড্ডার মধ্যমণি হিসেবে তিনি ছিলেন সবার প্রিয় একজন মানুষ।

খ্যাতিমান তারকা ডলি জহুর তার এক স্মৃতিচারণে শেখ কামালের তার নাট্যচক্রের নিয়ে আসার কথা উল্লেখ করেন এবং তার মতো বিনয়ী এবং বহুমুখী প্রতিভার একজন মানুষকে নিয়ে যে নানান রকম মিথ্যাচার করা হয়েছে সেই বিষয়ে আক্ষেপ করেন!

বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের আজ ৬৮ তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হওয়ার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। ২৬ বছর বয়সেই তিনি বাংলাদেশের ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গন যেভাবে সংগঠিত করেছিলেন সেটা শুধুমাত্র বাংলাদেশে নয় পৃথিবীতেই খুব বিরল। তবে পরিতাপের বিষয় যে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের প্রত্যেকেরই বাংলাদেশ গঠনের পেছনে যে ঘাম, পরিশ্রম, ভালোবাসা, ত্যাগ রয়েছে সেটা আমরা খুব কম মানুষই জানি। আগস্ট যায়, আগস্ট আসে কিন্তু গুগল সার্চ ইঞ্জিনে শুধুমাত্র শেখ কামালকে নিয়ে অপপ্রচার আর মিথ্যাচারই থেকে যায়। তরুণ প্রজন্মের জন্য যে মানুষটি আইকন হতে পারতো, হতে পারতো আলোকবর্তিকা তার সবটাই আজ স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের মিথ্যাচারে নিভু নিভু। এখন সময় এসেছে এইসব মিথ্যাচারের সমুচিত জবাব দেওয়ার এবং তার পরিবারের প্রতিটি সদস্যের বীরত্বগাথা প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার। আজ এই দিনে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি শেখ কামাল আপনাকে। ভালো থাকুন ওপারে; আমাদের ক্ষমা করবেন আমরা আপনার রক্তের দাগের মাধ্যমে যে কলঙ্ক লেপন হয়েছে বাংলায় তা পুরোপুরি মুছতে পারিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সাথে চিরতরে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার আলোকে। তার জীবদ্দশায় যে কীর্তি তিনি রেখে গিয়েছিলেন, সঠিক ইতিহাসের পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মের সামনে তা উন্মোচিত হলে শেখ কামাল আজো হয়ে উঠবেন তরুণ সমাজের ‘প্রতীকী নেতা’, যাকে অণুসরন করে উন্নয়নের অগ্রগতিতে এগিয়ে যাবে তরুণ সমাজ। বাংলাদেশ সরকার তথা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে এই ক্ষণজন্মা নেতার জীবন উন্মোচিত করা হোক প্রজণ্মের প্রেরণার শিক্ষক হিসেবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তরে বেঁচে থাকুন শেখ কামাল আমাদের নেতা হিসেবে!

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা


ভারতের সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে ধোলাই।আবু জাফর মাহমুদ।

শুক্রবার, ১১ আগস্ট ২০১৭

ভারতের সংসদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পররাষ্ট্র নীতির তীব্র সমালোচনা করল প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। ৩জুলাই বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায়  কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা আনন্দ শর্মা ভারতের প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কথা উত্থাপন করেন।আনন্দ শর্মা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্রেডিট নেয়া প্রসঙ্গে বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমেরিকায় যাওয়ার পর বলেন, ভারতের ক্ষমতার সামনে বিশ্ব মাথা নত করেছে। বিশ্ব ভারতের ক্ষমতাকে মেনে নিয়েছে, তাকে স্বীকার করে নিয়েছে।আনন্দ শর্মা বলেন, ‘ ভারতের শক্তিকে তো বিশ্ব মেনে নিয়েছে কিন্তু পাকিস্তান মানছে না। সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের পর অনেক ঘটনা ঘটেছে যা বন্ধ হচ্ছে না। ১৯৭১ সালে সেনাবাহিনী বড় জয় পেয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী   নরেন্দ্র মোদীর মতো এ ধরণের কোনো বিবৃতি দেননি।’
তিনি বলেন,‘পাকিস্তান ইস্যুতে সরকারের নীতি স্পষ্ট নয়। প্রথমে আলোচনার কথা বলা হল কিন্তু একবারেই তা শেষ করে দেয়া হলো। এমন কী হয়েছিল যে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আফগানিস্তান সফর থেকে ফেরার সময় লাহোরে চলে যেতে হয়েছিল? প্রধানমন্ত্রী যখন পাকিস্তানের মাটিতে পা রাখেন, তখন তিনি সালামি বা গার্ড অব অনার পাননি বরং উপহারস্বরূপ সন্ত্রাসী হামলা পেয়েছেন।’ তিনি বলেন, ৬৫ বার বিদেশ সফর করে কী ফল পাওয়া গেছে,সংসদে প্রধানমন্ত্রীর তা জানানো উচিত।
আনন্দ শর্মা বলেন, ‘ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার দাবি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ভারতকে এধরণের দাবি করা উচিত নয়।  আমরা পাকিস্তানকে একঘরে করে দিয়েছি বলে প্রাচার করা হচ্ছে। এ ধরণের কথাই বা কেন বলা হচ্ছে? একটি দায়িত্বশীল দেশ এধরণের বিবৃতি দেয় না। পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে কী ভালো সম্পর্ক নেই? পাকিস্তান কী বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সেনাবাহিনীর মহড়া  চালায় নি?’আনন্দ শর্মা বলেন, ‘প্রতিবেশি নেপালের সঙ্গে আমদের সম্পর্ক বেশ জটিল। সেখানকার সমস্যা বোঝা প্রয়োজন। আমাদের এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়। নেপালের সঙ্গে আমাদের পদক্ষেপ বড়ভাইয়ের মতো হওয়া উচিত নয়।’
শ্রীলংকার সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার তাদের ঠিকভাবে হ্যান্ডেল করতে পারছে না। আনন্দ শর্মা বলেন, চীন পাকিস্তানে বন্দর তৈরি করছে, মালদ্বীপ হাতের বাইরে চলে গেছে। আমরা তাদের সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারছি না।আনন্দ শর্মা বলেন, ‘দোকালাম ইস্যুতে চীনের অবস্থান খুব আক্রমণাত্মক ও তাদের বিবৃতি খুব উদ্বেগের। চীনা প্রেসিডেন্ট দু’বার ওই ইস্যুতে বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু ভারতের জবাব কী?’ প্রধানমন্ত্রী ওই ইস্যুতে চুপ থাকতে পারেন না বলেও আনন্দ শর্মা মন্তব্য করেন।
চীনা দাঁতে দাঁত ঘষছে।   
সীমান্ত থেকে সেনা প্রত্যাহার না করলে মারাত্মক পরিণতি বরণ করতে হবে বলে ভারতকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে চীন। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৩ অগাষ্ট বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, সীমান্তে ভারতীয় সেনা সমাবেশ অবশ্যই শান্তির জন্য নয়। যদি তারা শান্তি চায় তাহলে শিগগিরি এসব সেনা সরিয়ে নিত হবে।চীনের ডেপুটি চিফ অব মিশন লিউ জিনসং বলেছেন, “তৃতীয় পক্ষ ভুটানের নিরাপত্তার অজুহাত তুলে ভারতীয় সেনাদের সীমানা রেখা পার হওয়া বেআইনি।”
এর আগে, গত মাসে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ভারতকে কোনো রকম মোহাচ্ছন্ন না হওয়ার জন্য হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র উ কিয়ান ২৪ জুলাই এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভারতকে উদ্দেশ করে বলেন, নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করবেন না এবং কোনো অলীক স্বপ্নের পেছনে ছুটবেন না। চীনা গণমাধ্যমও সতর্ক করে বলেছে, বাড়াবড়ি করলে ভারতকে ১৯৬২ সালের চেয়ে খারাপ পরাজয়ের মুখ দেখতে হবে।
বিতর্কিত সীমান্তে অবৈধভাবে চীনের সেনা প্রবেশের বিষয়ে অজুহাত তৈরির জন্য ভারতকে অভিযুক্ত করেছে চীন। দেশটি বলেছে, ভারতের এ মিথ্যা অজুহাতের পরও বেইজিং অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “ভারতের সেনারা এখনো চীনের ভূখণ্ডে রয়েছে। চীন ধৈর্য ধরলেও এসব সেনাকে দ্রুত সরিয়ে নেয়ার দাবি করে আসছে। কিন্তু ভারত তার ভুল সংশোধন করার জন্য সত্যিকার অর্থে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয় নি বরং সেনা মোতায়েন রাখার পক্ষে নানা ধরনের মিথ্যা অজুহাত তৈরি করছে।”
চীনা বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ভারতের এসব তৎপরতার মাধ্যমে শুধুমাত্র চীনের সীমানা লঙ্ঘনই হচ্ছে না বরং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক স্বাভাবিক আইন-শঙ্খলাও লঙ্ঘিত হচ্ছে।গত জুন মাসে  ভারত, চীন ও ভুটান সীমান্তের দোকালাম মালভূমিতে চীনের সেনারা একটি রাস্তা তৈরি করতে গেলে বাধা দেয় ভারত। ওই ঘটনার পর থেকে সেখানে দু দেশের মধ্যে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। দু পক্ষই পরস্পরকে যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে। 


The Road and A Student

শুক্রবার, ১১ আগস্ট ২০১৭

Literature #
I would not be
A teacher.
I would remain as a student
Of Literature.
No lecture.
No torture.
I am not a teacher
I am a student
Of Literature.
#notU

2.
পথ #
মাটির দিকে চোখ
হেটে যাচ্ছিলাম দুরে
কুড়িয়ে নিলাম একটা দুটা
সবকটা পাথেয়
হেটে যাবো দুরে
মেপল বার্চ আর ওক গাছের
ছায়ায় শক্ত রাজপথে ধুলা আর পাথরের
কার্পেটে মোড়ানো সোনালী স্বপ্নের কাধে
ভর করে দুরে আরো দুরে
পথের দিকে চোখ রেখে
শেষ হলো পথ |


জন্মদিন স্মৃতিতে ভাস্বর কামাল ভাই

শনিবার, ০৫ আগস্ট ২০১৭

কামাল ভাই। আমাদের কামাল ভাই। সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রাণবন্ত কামাল ভাই। একদিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, আবার অন্যদিকে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে ভরপুর কামাল ভাই। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, ইতিহাসের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ত যে দেহে প্রবাহিত, সেই দেহ-প্রাণও যে হিমালয়সদৃশ ও প্রাণবন্ত হবে, তা কামাল ভাইকে দেখে, তার সঙ্গে মিশে উপলব্ধি করেছি সব সময়। আজ তার জন্মদিনে অতীত রোমান্থনে কিছু টুকরো স্মৃতি ভেসে উঠছে মানসপটে। ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে সেগুলো লিখব তরুণ প্রজন্মের জন্য, এই ভেবে কলম ধরতে গিয়ে দেখছি কলম চলছে না, হাত যেন অবশ হয়ে আসছে। অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে খাতার ওপর। এই অশ্রুই বলে দিচ্ছে হৃদয়ের কোন মণিকোঠায় তিনি আছেন, তাকে কতটা ভালোবাসতাম, কতটা শ্রদ্ধা করতাম। মূলত তিনি ছিলেন আমাদের সিনিয়র বড় ভাই, বন্ধু, আবার পথপ্রদর্শক অভিভাবকও।
বাহাত্তর সালে কামাল ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। আমি তখন ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। রাজেন্দ্র কলেজের মাঠে ছাত্রলীগের একটি স্কুল শাখার সম্মেলনে তাকে আমরা অতিথি করে নিয়ে আসি। তাকে ঢাকা থেকে নিয়ে আসার পথে সেদিনই বুঝেছিলাম তিনি কত মহৎপ্রাণ। তাকে নিয়ে আমরা আরিচা ঘাটে যখন পৌঁছাই, তখন ঘাটে কোনো ফেরি ছিল না। বাধ্য হয়ে আমাদের এক বন্ধু, তৎকালীন ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার রুমী বঙ্গবন্ধু তনয় শেখ কামালের কথা বলে একটি বিশেষ ফেরির ব্যবস্থা করেন। শেখ কামাল আমাদের ডেকে বলেছিলেন, ‘তোরা কি আমার বাবা ও আমার নাম ভাঙিয়েছিস?’ আমরা মাথা নেড়ে সময় স্বল্পতার দোহাই দিয়েছিলাম। তিনি আমাদের ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘কখনও নাম ভাঙিয়ে বিশেষ সুবিধা নেয়া ঠিক নয়। দেশের সব মানুষেরই সমান সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার আছে। তোরা এই কথাটি কখনও ভুলে যাসনে।’ সেদিনের সেই কথাটি আজও আমার হৃদয়ে সুর হয়ে বাজে। সেদিনের সেই কথা, সেই সুরই জানিয়ে দেয় বঙ্গবন্ধুর সন্তান তারই আদর্শকে কীভাবে বুকে ধারণ করেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। তিনি আমাকে সব সময় সাহস জুগিয়েছেন। আমি সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। কামাল ভাইও এই বিভাগের ছাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন আমার এক বছরের সিনিয়র। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। প্রথম পাঁচজনের একজন ছিলেন তিনি। সমাজবিজ্ঞান বিভাগে আমরা নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতাম। আর সেসব অনুষ্ঠানের মূল নেতৃত্বে থাকতেন তিনি। তার নেতৃত্বেই আমরা সব অনুষ্ঠান অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারতাম। তিনি আমাদের কাজগুলো কেবল তদারকিই করতেন না, অনেক সময় নিজেও কাজে যুক্ত হতেন। তিনি খুব ভালো গিটার বাজাতে পারতেন। তার বাজনা শুনে আমরা মুগ্ধ হতাম। কাজের গতি বেড়ে যেত, ক্লান্তি দূর হয়ে যেত। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তার প্রবল আগ্রহ থাকলেও তিনি কখনও তারুণ্যের উচ্ছলতায় নিষিদ্ধ জগতে পা বাড়াননি, যদিও সেই বয়সে সেটা অস্বাভাবিক ছিল না। সামাজিক মূল্যবোধ ও চেতনা তার অন্তরে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল।
কামাল ভাই ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক। ছাত্রলীগকে তিনি সংগঠিত করেছিলেন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সব সময় নানা দিকনির্দেশনা দিতেন। আবাহনী ক্রীড়াচক্র তারই হাতে গড়া সংগঠন। তিনি ভালো ফুটবল, ক্রিকেট খেলতেন। স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী, নাট্যচক্র তারই হাতে গড়া সংগঠন। চুয়াত্তর সালে উদ্যাপিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সপ্তাহে একক অভিনয়, গান, খেলাধুলাসহ অনেকগুলো ইভেন্টে কামাল ভাই বিজয়ী হয়েছিলেন। সর্বত্রই যেন ছিল তার বিচরণ। তার সেই বিচরণের সঙ্গী হয়েছিলাম আমরা কয়েকজনও। কামাল ভাই আমার সিনিয়র হলেও মিশতেন ঠিক অতি আপনজনের মতো। সুুখে-দুঃখে আপন ভাইয়ের মতো কাঁধে হাত রেখে ভরসা দিতেন, স্বপ্ন দেখাতেন। আমিও বুনে যেতাম সেই স্বপ্নের জাল। ছোট-বড় সবার সঙ্গে ছিল তার বন্ধুত্ব। চাল-চলন ছিল একেবারে সাদাসিধা। তাকে দেখে কখনও মনে হতো না, তিনি প্রধানমন্ত্রীর ছেলে। এমনকি অনেক সময় তার পকেটে কোনো টাকাও থাকত না। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কেউ যখনই কোনো বিপদে পড়ত, কামাল ভাইয়ের কাছে ছুটে আসত। তিনি কখনই কাউকে নিরাশ করতেন না। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সবার কথা শুনতেন। সর্বোচ্চ সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। তিনি অন্যায় একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র একটি দোকান থেকে দিনের পর দিন বাকি খেলেও টাকা পরিশোধ করত না। কামাল ভাই সে কথা জানতে পেরে ওই ছাত্রমস্তানটিকে ডেকে এনে আমাদের সামনে এমন ধমক দিয়েছিলেন, ওই মস্তান সেদিনই সব বাকি পরিশোধ করে দিয়েছিল। কামাল ভাইয়ের এমন চারিত্রিক সদগুণ আমাকে ভীষণ নাড়া দিত। আমি অভিভূত হতাম। নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবতাম, এমন একজন মানুষের ছায়াতলে থাকার সুযোগ পাওয়ায়।
আমরা ছাত্রলীগের পনেরো সদস্যের একটি দল বিশ্ব যুব সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য বার্লিনে গিয়েছিলাম। সেই দলের নেতা ছিলেন কামাল ভাই। সেই উৎসবের মূল থিম ছিল ‘সামাজ্যবাদবিরোধী সংহতি, শান্তি ও বন্ধুত্ব’। পুরো বিমান ভ্রমণে কামাল ভাই জারিগান গেয়ে আমাদের মাতিয়ে রেখেছিলেন। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি আমাদের ছুতেই পারেনি। বার্লিন শহরের একদিনের কথা বলতে গেলে এখনও আমার চোখে জল চলে আসে। একদিন একটি শপিং সেন্টারে আমরা ঢুকেছিলাম। একটি সুন্দর প্যান্ট পিসের দিকে আমার চোখ পড়েছিল। আমি সেটি নিয়ে অনেকক্ষণ নাড়াচাড়া করলাম। কিন্তু তা কেনার মতো অর্থ ছিল না। আফসোস নিয়ে সেটা রেখে দিলাম। আমাদেরই এক বড় ভাই সেই প্যান্ট পিস আমার হাত থেকে টেনে নিয়ে সেটা কিনে নিয়েছিলেন। পুরো ব্যাপারটিই যে কামাল ভাই লক্ষ্য করছিলেন, তা জানতাম না। পরদিন সকালে আমাকে তিনি বললেন, ‘তুই প্যান্ট পিসটি কিনলি না কেন?’ আমি চুপচাপ ছিলাম। তিনি সবকিছু বুঝতে পারলেন এবং পকেটে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে ওইরকম একটি প্যান্ট পিস কিনতে বললেন। আজ এত বছর পরও এ দৃশ্য এখনও আমার চোখে ভাসে। একজন কর্মীর প্রতি তার হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা ভালোবাসার সেই নমুনার কথা ভাবলেই এখনও অশ্রু সংবরণ করতে পারি না।
কামাল ভাই ছিলেন মাটির মানুষ। তার কাছে সাহায্য চেয়ে কেউ কোনোদিন নিরাশ হননি। অথচ মানবিক সব গুণাবলিসম্পন্ন সেই কামাল ভাইয়ের বিরুদ্ধেই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ফেঁদেছিল একের পর এক সাজানো মিথ্যে বানোয়াট গল্প। তিনি নাকি বাংলাদেশ ব্যাংক লুট করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন। আসলে প্রকৃত ঘটনা ছিল ভিন্ন। ১৯৭৪ সালের ৩ জুন ছিল সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির হরতাল। এর আগের রাতে কামাল ভাই আবাহনী ক্রীড়া চক্রের মাঠে আড্ডা দিচ্ছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে। হঠাৎ ফকিরেরপুলের দু’জন খেলোয়াড়ের মাধ্যমে তিনি জানতে পারলেন, সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির ক্যাডাররা মতিঝিলের ব্যাংক লুট করবে। সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার পুলিশ সুপার বীর বিক্রম মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলমকে খবর দেন তিনি। এরপর দুষ্কৃতকারীদের ধরার জন্য নিজেই সঙ্গে থাকা বন্ধুদের নিয়ে মাইক্রোবাসে মতিঝিল এলাকায় ছুটে যান। ওদিকে তার মাধ্যমে খবর পেয়েই ঢাকার পুলিশ সুপার বীর বিক্রম মাহবুবের পুলিশ বাহিনী জিপ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। দুর্ভাগ্যক্রমে মতিঝিলের কাছাকাছি শেখ কামালের মাইক্রোবাস এবং পুলিশের জিপ মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে। অন্ধকারে কেউ কাউকে চিনতে না পারায় এবং পুলিশের জিপ থেকে কোনো সতর্ক সংকেত না দিয়েই অতর্কিতে গুলি চালানোয় মাইক্রোর প্রায় সবাই আহত হন। পায়ে গুলি লেগে গুরুতর আহত হন কামাল। ভুল বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কামাল ভাইকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে এবং পরে পিজি হাসপাতালে নিয়ে যায়। এ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পরের দিন দৈনিক মর্নিং নিউজে প্রকাশিত হয়েছিল।
কামাল ভাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল উনিশ’শ পঁচাত্তর সালের চৌদ্দই আগস্ট রাতে। কামাল ভাই কলা ভবনে আমাদের কাছে এসেছিলেন। জাতির পিতা আসবেন বলে আমরা এক মাস ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তিনি আমাদের অনুপ্রাণিত করতে জারিগান গাইলেন, অনেক হাস্যকৌতুক করলেন। রাত সাড়ে এগারোটার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির এক নিরাপত্তাকর্মী এসে জানাল, বঙ্গবন্ধু ডেকেছেন। তিনি আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে বললেন এবং ভোর পৌনে পাঁচটার মধ্যে আসবেন বলে কথা দিয়ে চলে গেলেন। পরে শুনেছি, তিনি আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রথমে বকশীবাজারে শ্বশুরবাড়িতে যান এবং সেখান থেকে সুলতানা কামালকে নিয়ে ধানমণ্ডির উদ্দেশে রওনা হন। আর এরপরই আসে পনেরো আগস্টের ভয়াল রাত। ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বরের সেই বাড়ির তিনিই ছিলেন প্রথম শহীদ। তিনি বলেছিলেন, ভোর পৌনে পাঁচটার মধ্যে ফিরে আসবেন, অথচ নিয়তির কী নির্র্মম পরিহাস- তিনি আমাদের মাঝে আর ফিরে আসতে পারেননি; নরাধমরা তাকে আসতে দেয়নি। আমাদের মাঝ তিনি থেকে হারিয়ে গেলেন। সত্যিই কি হারিয়ে গেলেন? না, কামাল ভাই হারিয়ে যেতে পারেন না। তিনি আছেন আমাদের অস্তিত্বের ভেতর। সদা জাগ্রত বিবেক হয়ে এখনও আমাদের স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছেন আমাদের আদর্শিক নেতা, আমাদের পথনির্দেশক শ্রদ্ধাভাজন কামাল ভাই।
বাহালুল মজনুন চুন্নূ : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ