Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

কক্সবাজার: যে কথা এখনও কেউ বলেনি , লেখেনি,ক’জনাইবা জানে? = সিকদার গিয়াসউদ্দিন

রবিবার, ২১ জানুয়ারী ২০১৮

বিজয়ের পরপরই সকলে বার্মা কিংবা ভারত অথবা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসতে থাকে।অনেকেই দেশমাতৃকার জন্য ইতিমধ্যেই না ফেরার দেশে চলে গেছেন কিংবা হারিয়ে গেছেন।এঁদের মধ্যে শিশু,কিশোর,যুবা,বৃদ্ধ কেউই বাকী ছিলোনা।২২’শে ডিসেম্বর রোজ বুধবার ১৯৭১’সালের এইদিনে ইতিমধ্যেই ফিরে আসা কক্সবাজারের বিজয়ী জনতার পক্ষে সর্বদলীয় কক্সবাজার সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবন্দসহ বিভিন্ন এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সর্বসম্মতিক্রমে দক্ষিন মিটাছড়ি জুনিয়র হাইস্কুলে(বর্তমানে পূর্ণ হাইস্কুল)র ময়দানে কক্সবাজারের প্রথম মহাবিজয়ের অনুষ্টানের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। অনুষ্টানে যে দূ’টি জায়গায় বিজয় সভা অনুষ্টানের ব্যবস্থা সম্পন্ন করার জন্য আলোচনা চলে-সে দূ’টি স্থান হচ্ছে প্রথমত: তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান শান্তি কমিটির অন্যতম প্রধান মৌলভী ফরিদ আহমদের মাছূয়াখালী’র বাড়ীর সামনে অথবা কক্সবাজার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান কনভেনশন মুসলীম লীগের জাফর আলম চৌধূরী’র বাড়ীর সামনে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে অবশেষে রামু থানার রাজারকুল ইউনিয়নের(পরে দক্ষিন মিঠাছড়ী ইউনিয়ন)কূখ্যাত জাফর আলম চৌধূরী(প্রকাশ জাফর মিয়া)র বাড়ীর পাশের জুনিয়র হাইস্কুল(এখন হাইস্কুল) মাঠে কক্সবাজারের প্রথম বিজয়সভা’র অনুষ্ঠানের জন্য ১৯৭১’সালের ২৭’শে ডিসেম্বর রোজ সোমবার দিন ধার্য্য করা হয়।সবকিছু বিবেচনা পূর্ব্বক রামু,উখিয়া ও টেকনাফ থেকে বিজয়ী তথাকথিত পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ওসমান সরওয়ার আলম চৌধূরীকে ও বঙ্গবন্ধুর অতি ঘনিষ্ট কক্সবাজার থানার খরুলিয়ার জমাদার ফজল করিমকে(পরবর্তিতে কক্সবাজার সেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রধান)শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিরাপদে সভা অনুষ্ঠানের জন্য দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।

জমাদার ফজল করিম ও ওসমান সরওয়ার আলম চৌধূরী রামুর মুক্তিযুদ্ধ ফেরত তরুন তুর্কিরা সহ স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের নিয়ে আলোচনাক্রমে রাজারকুলের বিজয়সভাকে সাফল্যমন্ডিত করার জন্য বিভিন্ন উদ্দ্যোগ গ্রহন করেন।তম্মধ্যে যুদ্ধফেরৎ মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে কূখ্যাত জাফর মিয়া’র ঘর যাতে কেউ জ্বালিয়ে বা ভেঙ্গে দিতে না পারে তজ্জন্য জাফর মিয়ার বড় শত্রু মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক খ্যাতনামা জমিদার ঈশান পালের বড় ছেলে পরিমল পাল ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা জহরলাল পাল এবং বিশিষ্ট  আনসার কমান্ডার ও মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হক সিকদারকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।নিয়তির করুন পরিহাস এই যে,কূখ্যাত জাফর মিয়ার নির্দ্দেশে বিশিষ্ট জমিদার ঈশান পালের ও রামু থানা অস্ত্রাগার দখলের অন্যতম আসামী আনসার কমান্ডার আবদুল হক সিকদারের বাড়ী জ্বালিয়ে পুড়িয়ে বা ভেঙ্গে দিয়ে ছারখার কিংবা লন্ডভন্ড অথবা লুঠতরাজ করা হয়-সেই কূখ্যাত অত্যাচারী জাফর মিয়ার ঘর ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন-যাঁরা অত্যাচার,অবিচার ও সমূহ নির্যাতন সহ্য করেছিলেন এবং মহান জনযুদ্ধের সাথী ছিলেন।এইসব জনযোদ্ধারাই সেদিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কিভাবে ধারণ করতে হয়-তা শিখিয়েছিলেন।আইনকে যাতে কেউ হাতে তুলে না নেন-স্বাধীন দেশের মানুষকে নব্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত স্বাধীন জনগোষ্টিকে তা জানাতে এঁদের মহানুভবতার দৃষ্টান্ত তুলে ধরার বিষয়ে ওসমান সরওয়ার আলম চৌধূরীর তখনকার রাতদিন পরিশ্রমের বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য বটে।অবশ্য ১৬’ই ডিসেম্বরের পরপরই জাফর মিয়া ও কক্সবাজারের সাকাচৌ হিসাবে পরিচিত কূখ্যাত দিদার মিয়া সহ জাফর মিয়ার সবছেলেরাই তখন পালিয়ে বেড়াচ্ছিলো।

Picture

অবশেষে এলো কক্সবাজারের ইতিহাসের জাগ্রত বিজয়ী মহাজনতার মহাসমাবেশের সেই কাঙ্খিত দিনটি।কক্সবাজার মহুকুমা’র বিভিন্ন থানা ও গ্রাম থেকে যথাক্রমে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া থেকে লন্চযোগে,টেকনাফ থেকে চকরিয়া পর্য্যন্ত সকল থানা থেকে ট্রাক বাস যোগে,রামু ও উখিয়া থেকে মিছিলের পর মিছিল।হাজারো জনতার বিজয় মিছিল বিশেষ করে অনেকগুলো লাটি মিছিল ছিলো দেখার মতো।জমাদার ফজল করিম ও রামু থানার তখনকার বিশিষ্ট ছাত্রযুবনেতা রামু থানার মেরোংলোয়ার ওবায়দুল হকের নেতৃত্বে (পরবর্তিতে জাসদ নেতা ও রামু ফতেখাঁরকুলের চেয়ারম্যান)কাউয়ারকোপের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ইপিআরের নূর মোহাম্মদ(মুক্তিযুদ্ধের সময় মেঝর খ্যাত যদিও মেঝর ছিলেননা তবুও স্থানীয় লোকজন সে নামে ডাকতো),মনির ঝিলের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা নূরুল হক(পরবর্তিতে কাউয়ারকোপের চেয়ারম্যান ও রামু মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান)রামু চৌমুহনীর ছাত্র ইউনিয়নের নেতা দীপক বড়ুয়া(পরে অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ রামু কলেজ),শেখর বড়ুয়া ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আবু আহমদ,ছাত্রলীগের সূমথ বড়ুয়া,মাহবুব(পরে জাসদ ও বি এন পি নেতা,জোয়ারিয়ানালার চেয়ারম্যান)মেরোংলোয়ার গোলাম কবির সহ স্থানীয় আনসার বাহিনী,সেচ্ছাসেবকসহ অনেকেই মহাসমাবেশের শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য চতুর্দিকে বুহ্য রচনা করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে ব্যস্ত ছিলো।বিরাট মাঠে তিল ধরনের জায়গা ছিলোনা।ইতিমধ্যেই কক্সবাজারের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা  যথাক্রমে কক্সবাজার মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি উখিয়ার দিদারুল আলম চৌধূরী,কক্সবাজার মহকুমা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক কক্সবাজারের বিপ্লবী কন্ঠস্বর খ্যাত ছুরত আলম(পরবর্তিতে জাসদ নেতা),কক্সবাজার কলেজের নির্বাচিত ভিপি গর্জনিয়ার তৈয়বউল্লাহ(পরবর্তিতে জাসদ নেতা)অনুষ্টানে উপস্থিত হলে চতুর্দিকে গগনবিদারী মুহুর্মুহু শ্লোগানে চতুর্দিক মূখরিত হয়ে উঠে।অত:পর কক্সবাজার মহকুমা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা এসে পৌঁছূলে পূরো ময়দান শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠে।মাঠের বেশ দূরে চতুর্দিকের গাছগাছালীর উপরে অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরও সাধারণ মানুষের সাথে শ্লোগান দিতে দেখা গিয়েছিলো।অবশেষে ছাত্রলীগের ছূরত আলম  মাইকের স্পীকার হাতে নিয়ে জনগনকে শান্ত হতে বললে চতুর্দিকে পিনপতন নীরবতা।কারো মূখে কোন কথা নেই।সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে সভাপতির আসন গ্রহন করেন কক্সবাজার মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি জোয়ারিয়ানালার আবছার কামাল চৌধূরী।অনুষ্টানের প্রধান অতিথি ছিলেন কক্সবাজার মহকুমার ১৯৭০’সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে ভূমিধ্বস বিজয়ী টেকনাফের উকিল নূর আহমদ। তিনি পাকিস্তানের বিখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান সাবেক ডাকসূ ভি পি পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রধান মৌলভী ফরিদ আহমদকে বিপুল ভোটে পরাজিত করেন।(পরবর্তিতে তিনি জাসদের অন্যতম নেতা ছিলেন) আসন গ্রহন করার পর যথাক্রমে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে বিজয়ী রামুর ওসমান সরওয়ার আলম চৌধূরী(পরবর্তিতে অধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট সমাজ সেবক হিসাবে স্বীকৃতি অর্জন), চকরিয়ার জহিরুল ইসলাম চৌধূরী(পরবর্তিতে গনফোরামে যোগ দেন ও অন্যতম কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন), পূর্ব পাকিস্তান মোজাফ্ফর ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য অধ্যাপক মোশতাক আহমেদ(পরবর্তিতে অধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের স্বীকৃতি অর্জন),মহেশখালীর উকিল মওদুদ আহমদ(পরবর্তিতে জাসদ নেতা)এবং তিন ছাত্রনেতা আসন গ্রহন করেন।

সভার শুরুতে পবিত্র কোরান তেলাওয়াত,পবিত্র গীতা ও পবিত্র ত্রিপিটক থেকে পড়ে শুনানোর পর পরই প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ওসমান সরওয়ার আলম চৌধূরী আসন থেকে উঠে ঘোষনা দেন আজকের অনুষ্টান উদ্ভোধন করবে আপনাদের এলাকা’র
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হক সিকদারের পুত্র রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র বিপ্লবের অগ্নিঝরা দিনগুলোর অগ্নিস্বাক্ষী,স্বাধীনতা আন্দোলনের বলী,হারিয়ে যাওয়া লক্ষ শিশু কিশোরদের প্রতিনিধি,বোন শিরীণকে হারিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা আপনাদের আমাদের সকলের সন্তান এস  এম গিয়াসউদ্দিন।অবশ্য আগের দিন রাতে ওসমান সরওয়ার আলম চৌধূরী,পরিমল পাল,গিয়াসউদ্দিনের মা মরিয়ম বেগম চার পাঁচ ঘন্টা প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।পরবর্তিতে জানা যায় যে-জাফর মিয়া সহ মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী সকল মহলকে বিজয় সভার গুরুত্ব ও এক ধরনের ঈঙ্গিত প্রদান আর পরবর্তি প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ করার লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত আগেই নেয়া হয়েছিলো।যা ছিলো দস্তুরমতো বিরাট চমক।

দেখতে ছোটখাট ছেলেটিকে টুলের উপর দাঁড় করিয়ে দেয়া হলে সারারাত ধরে শিখিয়ে দেয়ার বক্তব্যের সেদিনের সারসংক্ষেপ ও ম্যাসেজ ছিলো-“স্বাধীন বাংলাদেশ হিন্দু,বৌদ্ধ,খৃষ্টান ও মুসলমান একথায় সকলের।ধর্ম নিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতির কবর ইতিমধ্যেই রচিত হয়ে গেছে।ধর্ম নিয়ে আবার কেউ রাজনীতি করতে চাইলে তার ভয়াবহ পরিনামের কথা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে সাবধান করে দেয়ার বিষয়টি ছিলো বিজয়সভা’য় ছেলেটিকে দিয়ে বলানোর আসল কারন।নিয়তির কি করুণ পরিহাস-স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মই এখন রাজনীতির বর্ম হয়ে ইতিমধ্যেই ক্যান্সারের মতো তা ছড়িয়ে গেছে।অথচ সেই ছেলেটি তার কয়েক যুগ পরেও তা ভূলেনি।সাম্য,সামাজিক ন্যায় বিচার ও গনতান্ত্রিক আচরনের বিকাশ আর মানুষের মুক্তির সংগ্রাম এখন আরো বেশী দরকার বলে সে মনে করে।
অত:পর সেদিন পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন-রামু থানা আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য ও রাজারকুল আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলম সিকদার(পরবর্তিতে রাজার কুলের চেয়ারম্যান)।বক্তব্য প্রদান করেন যথাক্রমে ছাত্রনেতা তৈয়বউল্লাহ সিকদার,দিদারুল আলম চৌধূরী,ছূরত আলম।পরে উকিল মওদুদ আহমদ,জহিরুল ইসলাম চৌধূরী,অধ্যাপক মোস্তাক আহমেদ,ওসমান সরওয়ার আলম চৌধূরী,উকিল নূর আহমদ।পিনপতন নীরবতার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু ফিরে না আসা পর্য্যন্ত মুজিবনগর সরকারের অধীনে কিভাবে দেশ পরিচালিত হবে,জনগনের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে বিশ্লেষনধর্মী বক্তব্য প্রদান করেন সকলেই।অত:পর সভার সভাপতি আবছার কামাল চৌধূরী উপস্থিত জনগনকে দশ বারোটি নির্দেশাবলী পড়ে শুনান।আইন যেনো কেউ হাতে তুলে না নেন-সে বিষয়ে জনগনকে সতর্ক থাকতে বলেন।পরবর্তি নির্বাচন না হওয়া পর্য্যন্ত প্রতিটি ইউনিয়নে পন্চায়েত গঠনের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়।মাগরিবের বেশ কিছুক্ষন পর সভাপতি অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষনা করার পর পরই মশাল মিছিল সহকারে বিজয়ী বীর জনতার বিজয় মিছিল স্ব স্ব গন্তব্যে প্রস্থান করেন।উল্লেখ্য-সেদিনের মহাসমাবেশের শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষায় বিজয়ীর বেশে বেরিয়ে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের কড়া প্রহরা সকলের আশীর্বাদ ও সুনাম কুড়িয়েছিলো।কক্সবাজারের ইতিহাসে এতো দূ:খ বেদনার মাঝেও বিজয়ের খূশীর আমেজ,কোলাকুলি ও মত বিনিময়ের এমন আন্তরিক দৃশ্য আর কখনও দেখা যায়নি।এরকম ঐক্যমত্যের,আন্তরিকতার স্পর্শের শীতের হিমেল হাওয়ার মধ্য দিয়ে জনতার সমাগমও আর হয়নি।সম্ভাবনার কথা বাদই দিলাম।

১৫’ই জানুয়ারী,লাসভেগাস।
নেভাদা,যুক্তরাষ্ট্র।


মতামত : বাংলাদেশের সামনে কঠিন চ্যলেঞ্জ = আবু সাঈদ রতন

রবিবার, ২১ জানুয়ারী ২০১৮

২০১৮ সাল বাংলাদেশের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবেই পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। এই টার্নিং পয়েন্টহলো রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নতুনমাত্রা নিয়ে বছরটি পার করবে এতে কারো সন্দেহ নেই। অভ্যন্তরীন রাজনীতি একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে।
এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে যে অবস্থানে দাঁড়িয়েছে তা চলমান রাখাই হবে সরকারের বড় চ্যলেঞ্জ। অর্থনৈতিকক্ষেত্রে বড় চ্যলেঞ্জের কারণহলো আগামী মার্চ মাসেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেতে যাচ্ছে। এই খবরটি একদিকে যেমন আনন্দের, তেমনি টেনশানের বিষয়ও। কেননা  উন্নয়শীল দেশের কিছু নিয়ম-কানুন আছে যা মেনে চলতেগেলে অর্থনৈতিক অবকাঠামো সূদৃঢ় হতে হয়। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্থা (ইকোসক) উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দিয়ে থাকে। কেননা বাংলাদেশ তাদের সব শর্তই ইতোমধ্যে পূরণ করেছে। যেমন উন্নয়নশীল দেশ হতে হলে মাথাপিছু আয় হতে হবে ১২৩০ ডলার, যা বাংলাদেশের আছে ১৬১০ ডলার। মানবসম্পদ সূচক হতে হবে ৬৬, যা বাংলাদেশের আছে ৭২.৮.। অর্থনৈতিক ভঙ্গুর সূচকের স্কোর হতে হবে ২৫ বা তার কম। বাংলাদেশের আছে ২৫।
বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে থেকেই স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা পেয়ে আসছিল। এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নাম লেখানোর ফলে যে আশংকা দেখা দিয়েছে তা হলো, স্বল্পোন্নত দেশের বাজার ও কম সুদের বহি: ্র্ঋণ সুবিধা হারাবে।
ট্রাম্প প্রশাষণ ইতিমধ্যেই ৪০ শতাংশ সাহায্য বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে।


অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব দেশ এ মর্যাদা পেয়েছে তারা সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের কাজগুলো করেছে। এই কাজগুলো যদি বাংলাদেশ দ্রুততার সংগে করতে না পারে তবে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে যাবে। পৃথিবীর অনেক উন্নয়নশীল দেশ আছে যারা উন্নয়নশীল হওয়ার পরেও আর এগুতে পারেনি। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা ধরে রাখার জন্য ৩ বছর সময় পাবে। এর মধ্যে সবগুলো শর্ত ধরে রাখতে হবে। আর সবশর্ত পূরণ করতে পারলে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যেম আয়ের দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সম্ভাবনা আছে। উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার ফলে ঋণ সাহায্যে কমে যাবে। তবে অন্যদিকে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হবে। এখন সবকিছু নির্ভর করছে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর। কারণ দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরী এবং মানষিকভাবে প্রস্তুতি সরকারের আছে এবং চেস্টাও আছে। পদ্মাসেতু নিজস্ব অর্থায়নে করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস অনেকে বেড়েগেছে। বিগত ৪ বছর দেশে কোন রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিলনা বললেই চলে। তাই বাংলাদেশে যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে এবং সামাজিক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে তার গতি ধরে রাখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের মতেও উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন করা ও সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি যে বৈষম্যের সৃস্টি হচ্ছে তা উন্নয়নের কাজ  আরও দ্রুত করতে হবে। এখানেই বাংলাদেশের মুল চ্যলেঞ্জ। কেননা রাজনৈতিক অস্থিরতা দক্ষিণ এশিয়ার একটি কমন ফ্যাক্টর। বাংলাদেশে নির্বাচনকে সামনে রেখেতো আছেই এবং তা কতদূর পর্যন্ত গড়ায় তা দেখার বিষয়। সরকার ইতোমধ্যেই বিরোধীদলকে অনেকটা দূর্বল করে ফেলেছে।
২০১৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে চ্যালেঞ্জ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তা ২০১৮ সালে এসে চুড়ান্তরূপ নিয়েছে। সরকারি দল এক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কেননা ২০১৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এবং জামায়াত মিলে নির্বাচন প্রতিরোধের ডাক দিলেও কার্যত তা বাস্তবায়ন হয়নি। আর তা বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে তাদের জ্বালাও পোড়াও নেতিবাচক রাজনীতিরচিত্র সরকার অর্থাৎ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট বেশ সফলভাবেই জনগণের কাছে উপস্থাপন করতে পেরেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে জামায়াতের প্রায় শীর্ষ স্থানীয় নেতার ফাঁসি হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে বিএনপি জামায়াতের অনেককর্মীই এখন মামলা মোকাদ্দমা নিয়ে ব্যস্ত। এমন কি বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া মামলার হাজিরা দিতে দিতেই বছরটি পার করে দিতে পারেন এমনটি আভাষ পাওয়া যাচ্ছে। সরকার চাচ্ছে বিএনপিকে মামলা মোকাদ্দমার চাপে রেখে দায়সারাভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহন করাতে। বিএনপি’র অবস্থান এক্ষেত্রে কি হবে তা পরিস্কার নয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করতে পারলেও অর্থনৈতিক অস্থিরতা এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। রোহিঙ্গা সংকটে অর্থনৈতিক কাঠামো দূর্বল করেছে। প্রাইভেট ব্যাংকগুলো চলছে ফ্রি স্টাইলে। বড় বড় ব্যাংকের স্লথগতি উন্নয়নের কাজকে ব্যহত করছে। একনেকের বৈঠকে প্রকল্প পাশ হলেও সময়মত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ঋণদাতা ও সাহায্যেকারি দেশগুলো অর্থ ফেরত নিয়ে যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই।  মুক্তবাজার অর্থনীতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে যে দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি জ্ঞান ও বিশ্ব অর্থনীতির ধারণা বাংলাদেশের ঘাটতি আছে বলেই মনে হয়, মানে পর্যাপ্ত নয়। আমদানী, রপ্তানীর ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে আরো কার্যকর ভূমিকা নেয়া প্রয়োজন। নতুন নতুন বাজার সৃস্টিকরে সে রপ্তানীর উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে পণ্যের মাননিয়ন্ত্রণ যেন আন্তর্জাতিক মানের হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, বাংলাদেশ আমাদের সকলের। নিজ নিজ দলের নেতা নেত্রীদের সেই নেতৃত্বদানের স্বক্ষমতা অর্জন করে এবং দক্ষ প্রশাসন, আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলেই আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাবো। তাই সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশ কি পারবে সেই চ্যলেঞ্জ মোকাবেলা করতে?

-লেখক, সম্পাদক ইউএস বাংলা নিউজ, নিউইর্য়ক


ইতিহাসকে নিজের পক্ষে বয়ান করার একটা প্রবণতা আমাদের দেশে প্রবল, যা প্রকৃত ইতিহাস চর্চাকে ব্যাহত করে --- বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখিকা ফাতেমা মিয়া

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৮

সমাজে গড়পরতা মানুষের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা নিজ পরিবারের পাশাপাশি নিজের সমাজ, দেশ তথা পৃথিবী নিয়ে চিন্তা করেন। তেমনি একজন অসাধারণ মানুষ ফাতেমা মিয়া। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখিকা ফাতেমা মিয়া ইংরেজি ভাষায় লিখেছেন ইতিহাসভিত্তিক বই  Unspoken। ১৯৭১ এ বাংলাদেশে চলমান গণহত্যা, মার্কিন যুক্তরাস্ট্র, আরব বিশ্বসহ মুসলিম দেশগুলোর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এবং এর পূর্বাপর নানা প্রাসঙ্গিক বিষয়কে উপজীব্য করে বইটি লেখা। ২০১৪ সালের শেষ দিকে বইটি প্রকাশের পর বইটি নিয়ে ফাতেমা মিয়া'র এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেন বর্তমানে লন্ডনে নির্বাসিত বাংলাদেশী মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী শাহ আলম ফারুক। দীর্ঘ তিন বছর পর স্পেন ভিত্তিক একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে এ বছরের মার্চে সংক্ষিপ্ত আকারে সাক্ষাৎকারটি প্রথম ছাপা হয়। বোস্টন বাংলা নিউজ ডটকম  পাঠকদের জন্য বিজয়ের ৪৬ তম বার্ষিকী উপলক্ষে সাক্ষাৎকারটি বর্ধিত কলবরে প্রকাশিত হলো ।

alt

• শাহ আলম ফারুক : আপনি আরো বই লিখেছেন বিশেষ করে Ache in my heart, Friendship Offer  Rejection এর মত আলোচিত ফিকশন, যে গুলো আন্তর্জাতিকভাবে পাঠক সমাদৃত হয়েছে । তা ফিকশন থেকে হঠাৎ করে ইতিহাসের মত বিষয়ে Unspoken বইটি লেখার চিন্তাটা কেমন করে আসলো ?

•• ফাতেমা মিয়া : ২০১১ এ পাকিস্তানীরা আমাকে ভাল করে ধাক্কা দিয়েছে । তারা কোন এককারণে হঠাৎ করে দেখাতে চাইতেছিল, তারা বাংগালীদের ধর্ম নাই বলে মন্তব্য শুরু করে দিয়েছে। বাংগালির কালচার নিয়ে ব্যংগ করা শুরু করছিল। বাংগালির বাচ্চারা পর্যন্ত ইতিহাস জানে না। তখন আমি আমার বাচ্চাদের ইতিহাস জানাই। সাথে সাথে আমাদের কিছু ইমেল সার্কুলেশন গ্রুপ ছিল, সেগুলোতে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ ও বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে লিখতে শুরু করলাম। এক পর্যায়ে চিন্তা করলাম এ সব নিয়ে একটা বই করা যায়। আর সে সূত্র ধরেই আমার এই বই।

• শাহ আলম ফারুক: তা বই লেখার প্রস্তুতি টা কেমন ছিল -
•• ফাতেমা মিয়া : আমার কাছে অনেক ইনফরমেশন ছিল। আমি আমার ২২ বছর আগের সংগ্রহ করা ইনফরমেশনগুলো নতুন করে খোঁজা শুরু করলাম। এছাড়া অন্য অনেকের কাছে তথ্য সহযোগিতা চাইলাম। কিন্তু কেউ দেয় না। কেউ কেউ অনেক কন্ডিশন দিল। কেউ কেউ তাদের সাথে নিয়ে কাজ করতে বললো। আমি রাজী হলাম না। মানুষ অনেক বেশি পলিটিক্যাল। তাদের অনেকের মতামতের সাথে আমি একমত ছিলাম না। ইন্ডিয়ার দু একজনের সাথে যোগাযোগ হলো। তারা অনেক ডকুমেন্ট দিল। এতে তাদের ভার্সনটা পেলাম ! কিন্তু নানা কারণে সেগুলো ঠিক সেভাবে ব্যবহার করতে পারি নি। সে যাক প্রথমত: আমার আব্বা থেকে পাওয়া জ্ঞান দিয়ে শুরু। ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থেকে বাংলাদেশ। ৭১ এর ঘটনাবলীর বিষয়ে আমার বড় আপার চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা এবং বোধের বিষয় লেখায় রাখার ইচ্ছে হলো । বাংগালি জাতির গুণ, বেদনা, আশা ও সম্ভাবনার কথা লিখার তাড়না ছিল মনে। ৭১ নিয়ে কিছু রেফারেন্সের দরকার ছিল। শাহ আলম ফারুক (সাক্ষাৎকার গ্রহীতা) শেষের দিকে কিছু বাংলা বই দিলেন, সে বইগুলো থেকে কিছু তথ্য নিলাম। আমার আব্বা চাচাদের ভূমিকা নিয়ে অনেক লেখার আছে, লেখার ছিল। শেষ পর্যন্ত যদিও উনাদের সম্পর্কে যদিও ঠিক সেভাবে লেখা হয়ে উঠেনি।
• শাহ আলম ফারুক : আপনি দেশ থেকে অনেক দূরে আছেন। আপনি কি মনে করেন যদি দেশে থাকতেন তাহলে অনেক বেশি তথ্য পেতেন, বইটি লিখতে আরো সুবিধা পেতেন ?

•• ফাতেমা মিয়া : আমি মনে করি না। বাংলাদেশ থেকে লেখা যেত না। বাংলাদেশে তুমি আওয়ামী লীগ হতে হবে, বিএনপি হতে হবে নইলে এরশাদ পার্টি হইতে হবে ! মুজিবর রহমান বংগবন্ধু হইতে হইবে, জাতির পিতা হইতে হইবে। না হলে উনার বিরোধী হইতে হইবে, তোমার জিয়াউর রহমানকে পছন্দ হইতে হইবে। মুসলিম হলে তুমি ফানাটিক বা নাস্তিক হতে হবে। লাকুম দি নুকুম - যার ধর্ম তার কাছে। অথচ আমাদের ওখানে দেখা যায়-মুসলিম হলে অন্য ধর্মকে ঘৃণা করতে হবে, আমি মানি না। বাংলাদেশে থাকলে নিজের মত করে লিখতে পারতাম না। ইতিহাসকে নিজের মত করে বোঝা নিজের পক্ষে বয়ান করার একটা প্রবণতা আমাদের দেশে প্রবল। যা প্রকৃত ইতিহাস চর্চাকে ব্যাহত করে।

• শাহ আলম ফারুক : বাংলাদেশের গণহত্যা, বাংলাদেশের জন্ম প্রক্রিয়া নিয়ে মূলত: আলোচনা করেছেন। এই বইতে ১৩ টি অধ্যায় আছে। এই অধ্যায়ের পরিকল্পনা কেমন করে হয়েছে ?
•• ফাতেমা মিয়া : বিভিন্ন বিষয় আলাদা করে এটার ব্যাকগ্রাউন্ড, থিম আর কনকুলেশন করে বইটি লিখতে চেয়েছি। বাংগালির ঐতিহ্য, মর্যাদা স্ট্যাটাস যে অনেক উপরে ছিল, এ ব্যাপারগুলো মাথায় রেখে। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয় পূর্ববতী ২০০/৩০০ বছরের ব্রিটিশ ভারতের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী। একাত্তরের গণহত্যা এবং সমকালীন বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী জাতি গোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া - গণহত্যার সময় পাকিস্তানী শাসকগোস্ঠীর প্রতি বিশেষত: আমেরিকার সমর্থন, আরব ও মুসলিমবিশ্বের নীরবতা। এ সব বিষয়ে অধ্যায়ভিত্তিক আলোকপাত করেছি।

• শাহ আলম ফারুক : বইটি লেখার পেছনে অন্য কোন অনুপ্রেরণা কি ছিল ?
•• ফাতেমা মিয়া : ইতিহাস মানুষের জানা উচিৎ। এত বড় একটা গণহত্যা, এটা নিয়ে সবার কথা বলা উচিত। ২০১১ এ স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তির সময় অনেক কথা হলো আমাদের কমিউনিটিতে। যা নিয়ে স্থানীয় পাকিস্তানীদের অনেকে অসন্তুষ্ট ছিল। তখন আরো বেশি করে মনে হলো কিছু ঐতিহাসিক সত্য সবার জানা উচিত। অনেক জিনিস এটার মধ্যে কাজ করেছে।
• শাহ আলম ফারুক : আমরা জানতে পেরেছি(২০১৭), Unspoken এর ড্রাফট পান্ডুলিপি দেখে বাংলাদেশের খ্যাতনামা প্রকাশক বইটি বড় আকারে ছাপাবার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ ব্যাপারটা নিয়ে লেখিকা'র চিন্তা ভাবনা কি?

•• ফাতিমা মিয়া : সময় সুযোগ বুঝে অবশ্যই বইটি বড় আকারে ঢাকা ভিত্তিক প্রকাশক ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড
( ইউপিএল) কে দেবার ইচ্ছে আছে।

• শাহ আলম ফারুক : গত তিন বছরে বইটি ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাঠকের কাছে গেছে। পঠিত হয়েছে। তা বইটির বিষয়ে ২০১৭ এর শেষ দিকে এসে পাঠক-সমালোচকদের মতামতকে কিভাবে মূল্যায়ণ করবেন?

•• ফাতেমা মিয়া : সচেতন পাঠকের মতামত আমাকে মুগ্ধ করেছে। এতে লেখক হিসেবে দায়বদ্ধতার বিষয়টি আরো বেড়ে গেছে বলে মনে করি।

• শাহ আলম ফারুক : বইটি লেখা, প্রকাশনা, বিপনন ও প্রসারের ব্যাপারে স্বজন-বন্ধু-পরিচিতদের সহযোগিতা কেমন ছিল? এ ক্ষেত্রে বিশেষ কোন স্মৃতি কি আপনার মনে পড়ে ?

•• ফাতেমা মিয়া : সবচেয়ে মজার ঘটনাটি ঘটেছে কলকাতা এয়ারপোর্টে। ঢাকা থেকে কলকাতায় যাবার সময় আমাদের পরিচিত এক জনের কাছে কিছু বই দেয়া হয়েছিল। সেখানে বিক্রি ও সৌজন্য হিসেবে কিছু মানুষকে দেবার জন্য। বইয়ের কাভারে আল কায়েদা শব্দ দেখেই এয়ারপোর্টে বই গুলো জব্দ করা হয়।
দেখুন ভাল কাছে সাধারণভাবে সহযোগিতা সে ভাবে পাওয়া যায় না। তবে এক বন্ধুর সহযোগিতা প্রচেস্টার কথা বলতেই হয়। এখানে তার নাম বলে তাকে ছোট করতে চাই না।

alt
• শাহ আলম ফারুক : গত ক বছর ইউ কে'র কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রীর জন্য আপনার নাম প্রস্তাব ও সংক্ষিপ্ত তালিকায় বিবেচিত হয়েছে। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন? এমন বিরল সম্মানে ভূষিত হলে আপনার অনুভূতি কেমন হবে?

•• ফাতেমা মিয়া : হ্যাঁ জেনেছি কটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাব ও সংক্ষিপ্ত তালিকায় বিবেচিত হয়েছে। এটা অবশ্যই লেখক হিসেবে অনেক আনন্দের। গর্বের ও বিষয়। আমার স্বজনদের কেউ কেউ খুবই উৎসাহী, এমন সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রী পেলে অবশ্যই তা অনেক বড় স্বীকৃতি ।
• শাহ আলম ফারুক :
লেখালেখি এখন কেমন চলছে?

•• ফাতেমা মিয়া : চলছে কম বেশি । তবে খুব বেশি না। অবশ্য বাংলা মিরর নামের লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকাতে নিয়মিত লিখছি।

• শাহ আলম ফারুক : পাঠকদের সবশেষে কি বলবেন

•• ফাতেমা মিয়া : সবাই অনেক বেশি সবাই পড়ুক। কিছু সত্য সবার জানা উচিৎ, বিশেষত: নিজ দেশ জাতির বিষয়ে। এটা নিয়ে ভবিষ্যতে আরো কাজ করার ইচ্ছে। সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়েও লেখার ইচ্ছে আছে।

 
উল্লেখ্য, Unspoken বইটিতে পাক সেনাবাহিনীর নৃশংস গণহত্যা এবং পাকিস্তানী এলিট ও রাজনৈতিকদের আচরণের সাথে ধর্মের নামে সাম্প্রতিককালে আফ্রিকা ও আরবে যে উগ্রপন্থী কর্মকান্ড চলছে, সে বিষয়ে যোগসুত্র ও সামন্জস্যের ব্যাপারে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ আছে। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী ও তাদের দোসরদের চলমান গণহত্যায় আমেরিকার প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সহায়তা, মুসলিম বিশ্বের নীরবতার বিষয়ও তথ্য ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ৭১ সালের গণহত্যার ভয়াবহতা, সমাজ জীবনে এর প্রভাব, যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ের নানাদিক প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতায় আনস্পোকেন বইটিতে উঠে এসেছে। ৭১এর গণহত্যাকে কেন্দ্র করে লেখা বইটিতে পূর্ববতী দুই শ বছরের ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ রাজত্ব, সমাজ, রাজনীতি-সংস্কৃতির বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। বইটি বর্তমানে আমেরিকার ম্যানহাটান, বেলজিয়ামের এনথ্রুপ, ঢাকার আজিজ সুপার মার্কেট, প্যারিস, টরেন্টো, কলকাতার কলেজ স্ট্রিট ও ইউ কে তে পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া অনলাইনে আমাজান, Ebay তে পাওয়া যাচ্ছে।
লেখিকা ফাতেমা মিয়ার জন্ম সিলেটের ওসমানীনগর থানার খাদিমপুরে। শৈশবে তিনি পারিবারিকসূত্রে ব্রিটেনে আসেন।তিনি সপরিবারে দীর্ঘ দিন ধরে ওয়েস্ট মিডল্যান্ডের অভিজাত এলাকা সলিহলে বসবাস করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই পুত্র সন্তানের গর্বিত জননী।
সাক্ষাৎকার গ্রহণে : শাহ আলম ফারুক
এই ইমেইল ঠিকানা স্পামবট থেকে রক্ষা করা হচ্ছে।এটি দেখতে হলে আপনাকে JavaScript সক্রিয় করতে হবে।


লন্ডনে সেদিন বঙ্গবন্ধু যা বলেছিলেন

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৮

জুলকার নাইন: পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন পৌঁছানোর পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি হোটেল ক্যারিজেসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম সংবাদ সম্মেলন করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিনের সেই সংবাদ সম্মেলনে শুধু ব্রিটিশ নয়, বিশ্বের বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। হোটেল লবিতে জনাকীর্ণ এই সংবাদ সম্মেলনে ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের জন্য আমাদের লড়াইয়ের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। পাকিস্তানের কারাগারের কনডেম সেলে আমি যখন ফাঁসির জন্য অপেক্ষা করছিলাম তখন বাংলাদেশের জনগণ আমাকে তাদের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছে। আমি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্বাধীনতাকামী সব রাষ্ট্র যারা আমাদের সমর্থন দিয়েছে তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বিশেষত ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড ও অন্যান্য পূর্ব ইউরোপিয়ান রাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্বাধীনতাকামী জনগণ যারা আমাদের সমর্থন জানিয়েছেন তাদের সকলকে আমি ধন্যবাদ জানাই। আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগোষ্ঠীকেও তাদের সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানাতে চাই। এখন আমি সকল রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানাই বাংলাদেশকে অতিসত্বর স্বীকৃতি দিতে এবং জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তিতে সমর্থন জানাতে। ’

আধা ঘণ্টার কিছু কম সময়ের এই সংবাদ সম্মেলনের আগমুহূর্তে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চুরুটে আগুন ধরিয়ে নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর ২ মিনিটের লিখিত বক্তব্য শেষ করে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বিশ্বের আর কোনো দেশের মানুষকে বাংলাদেশিদের মতো স্বাধীনতার জন্য এতটা মূল্য দিতে হয়নি।

আমিও একটি মুহূর্তের জন্য তাদের এই দুর্দশার কথা ভুলতে পারিনি। তাই আমি দেশ ও দেশের বাইরে থাকা প্রত্যেক বাংলাদেশিকে ধন্যবাদ জানাই। অভিনন্দন জানাই মুক্তিবাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে। যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করা লাখ লাখ মানুষের শোকাহত পরিবারের প্রতি জানাচ্ছি সমবেদনা ও বিদেহী আত্মার মাগফিরত কামনা করছি। ’

Picture

এক ব্রিটিশ সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশে কী বীভৎসতা চালানো হয়েছে তা শুনলে আপনারা আশ্চর্য হবেন। লাখ লাখ মানুষকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, মাইলের পর মাইল যেভাবে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, বেঁচে থাকলে হিটলারও হয়তো লজ্জা পেতেন। ’ পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী থাকার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এটা আমার জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়, আমি গত ১০-১৫ বছর ধরেই এর মধ্যে রয়েছি। আর একটা বিষয় মনে রাখবেন, যে নিজেই মরতে চায়, তাকে কেউ মারতে পারে না। ’ অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি ৩৫ বছর ধরে রাজনীতি করছি, আমি জানতাম, আমি যদি কারাগারেও যাই বা বেঁচে নাও থাকি বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনবেই। ’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমাকে যে কারাগারের যে সেলে রাখা হয়েছিল সেখানে সূর্যের আলো বা বাতাস কিছুই ঢুকত না, কোনো রেডিও বা খবরের কাগজও দেওয়া হতো না। বিশ্বের কোনো কিছুর সঙ্গেই আমার যোগাযোগ ছিল না। অবশ্য জুলফিকার আলী ভুট্টো আমার কাছে এসেছিল। তার মাধ্যমেই প্রথম জানতে পারি বাংলাদেশের সরকার গঠনের কথা, আমাকে প্রেসিডেন্ট করার কথা। ’ সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি সহায়তার জন্য সারা বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানাই। কারণ সুজলা সুফলা বাংলাদেশে শুধু লাখ লাখ মানুষই মারা যায়নি, হাজার হাজার কিলোমিটার রাস্তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, রেলপথ ধ্বংস করা হয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, অর্থনীতিকে পুরো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আমি আবেদন জানাই দরিদ্র মানুষকে বাঁচানোর জন্য। ’ প্রশ্নকারী ব্রিটিশ সাংবাদিককে উদেশ করে তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ যে কতটা সম্পদশালী ছিল তা আপনারা জানেন। কিন্তু এক শ-দেড় শ বছরের বিদেশি শাসনে থেকে অনেক কিছুই হারিয়েছে বাংলাদেশ। আমি মনে করি ব্রিটিশ সরকারেরও এখন দায়িত্ব বাংলাদেশকে সহায়তা করা। কারণ বাংলাদেশের সম্পদ আহরণ করেই আজকের ব্রিটেনে অনেক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। সেই ঋণ আজ পরিশোধের সময় এসেছে। শুধু ব্রিটেন নয়, আমি সারা বিশ্বের প্রতি লাখ লাখ মানুষকে ক্ষুধার জ্বালা থেকে বাঁচানোর আহ্বান জানাই। ’

এর আগে, সেদিন সকালেই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পান। একটি পাকিস্তানি সামরিক বিমানে খুব গোপনে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেদিন সকাল ৭টায় বিবিসির ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে প্রচারিত খবরে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিমানযোগে লন্ডনে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানটি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। ’ প্লেনটি বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর নেমে বঙ্গবন্ধু ভিআইপি লাউঞ্জে এলে তাকে ব্রিটিশ বৈদেশিক দফতরের উপস্থিত কিছু কর্মকর্তা স্বাগত জানান। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে ব্রিটিশ ফরেন অফিসের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা স্যার ইয়ার মাদারল্যান্ড উপস্থিত হয়ে জানান ব্রিটিশ সরকার বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদা দিয়েছে। সকাল ৮টার মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে ব্রিটিশ সরকারের সম্মানিত অতিথি হিসেবে লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হোটেল ক্যারিজেস নিয়ে যাওয়া হয়। অল্প সময়ের মধ্যে ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা (পরে প্রধানমন্ত্রী) হ্যারল্ড উইলসন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যান হোটেলে। বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডনে পৌঁছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ ছিলেন লন্ডনের বাইরে। বঙ্গবন্ধুর পৌঁছানোর কথা শুনে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী হিথ ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ছুটে আসেন। প্রধানমন্ত্রী হিথ তাকে নজিরবিহীন সম্মান দেখান। ওইদিন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথ নিজে তার কার্যালয়ের বাইরে এসে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইলেন, যতক্ষণ শেখ মুজিব গাড়ি থেকে বেরিয়ে না আসেন। অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতির কথা জেনে হাজার হাজার বাঙালি হোটেল ক্যারিজেসকে ঘিরে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে। দুপুরে এই হোটেলেই জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরদিন ৯ জানুয়ারি লন্ডন সময় সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে ঢাকায় ফেরার জন্য বঙ্গবন্ধু ওঠেন ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবহরের কমেট জেটে। বাংলাদেশে ফেরার পথে বিমানটি দুই ঘণ্টার যাত্রাবিরতি করে দিল্লিতে। ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নয়াদিল্লিতে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান। পরে ঢাকায় ফেরার পরের গণসংবর্ধনার কথা আজ ইতিহাসে লিপিবদ্ধ।


ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড = বঙ্গবন্ধুকে সম্মান করে ব্রিটেন সম্মানিত

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৮

বাপ্ নিউজ : ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২। লন্ডনে কনকনে ঠাণ্ডা। তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে। এমন হাড়কাঁপানো শীতে ব্রিটেনের জন্য তথা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের জন্য এক মুহূর্তের উষ্ণতা নিয়ে দেশটির হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করে পাকিস্তান এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট। এর ঠিক ঘণ্টাখানেক আগে ব্রিটেন জানতে পারে এই বিমানে করেই নামছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আর এভাবেই এক মহানায়কের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে যায় ব্রিটেনের নাম। বঙ্গবন্ধু মনেপ্রাণে চাইছিলেন তিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে সরাসরি বাংলাদেশেই ফিরবেন।

পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহমদ ইরান-তুরস্ক রুট ধরে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এ রুটটি পছন্দ হয় না বঙ্গবন্ধুর। তিনি কেবল ঢাকায় ফিরতে চান এবং তা সরাসরি। আজিজ আহমদ জানালেন, এটি সম্ভব নয়। কারণ ভারতের আকাশসীমা তারা ব্যবহার করতে পারবেন না। আজিজ আহমদ বলেন, ‘আমরা চাইছি পাকিস্তান এয়ারলাইনসে আপনাকে ফেরত পাঠাতে। যেহেতু আমরা ভারত হয়ে যেতে পারব না তাই অন্য একটি দেশে আপনাকে যেতে হবে।’ শেষ পর্যন্ত অন্য দেশ হিসেবে ব্রিটেনকে বেছে নেওয়া হয়। এরপর ৮ জানুয়ারি, রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা বজায় রেখে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডন পৌঁছে দেয় পাকিস্তান। হিথরোয় বিমান অবতরণের মাত্র এক ঘণ্টা আগে ব্রিটেন জানতে পারে, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অল্প সময়ের মধ্যেই লন্ডন এসে পৌঁছছেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই বিমানে ছিলেন সহযাত্রী ড. কামাল হোসেন। দ্রুতগতিতে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। এদিন বিবিসির ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে ভোরের খবরে জানিয়ে দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর লন্ডন আগমনের খবর। তারা জানায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী প্লেন হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। তাকে বরণ করে নিতে ৮ জানুয়ারি ভোরে লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে আলাদা প্রাণচাঞ্চল্য জাগে। এরই মধ্যে ব্রিটেন সিদ্ধান্ত নেয়, তারা বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করবে, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বরণ করবে। বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নেন ফরেন অফিসের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা স্যার ইয়ান সাদারল্যান্ড। তিনি জানান, বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ব্রিটেনের ক্ল্যারিজেস হোটেলে নিয়ে যাওয়া হবে। সবচেয়ে দামি অতিথিশালা ক্ল্যারিজেস হোটেলের নাম শুনে বঙ্গবন্ধু কিছুটা নাখোশ হন। তিনি বলেন, ‘আমার দেশের মানুষ যেন স্বস্তিতে এসে দেখতে পারে এমন কোনো হোটেল হলে ভালো হয়।’ ফরেন অফিসের কর্মকর্তা বলেন, ‘স্যার! একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে, রাষ্ট্রীয় সম্মান হিসেবে আমরা আপনাকে ক্ল্যারিজেস হোটেলে নিচ্ছি।’ হোটেলে পৌঁছার কিছু সময়ের পর লেবার পার্টির তৎকালীন লিডার (পরে প্রধানমন্ত্রী) হ্যারল্ড উইলসন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। হ্যারল্ড উইলসন হচ্ছেন প্রথম কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সম্বোধন করেন। বঙ্গবন্ধুর দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে তার প্রথম উচ্চারিত বাক্য ছিল, ‘গুডমর্নিং মিস্টার প্রেসিডেন্ট’। দুপুরেই ক্ল্যারিজেস হোটেলে আয়োজন করা হয় এক সংবাদ সম্মেলনের। এটিই ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুর প্রথম প্রেস কনফারেন্স। এতে আবেগঘন ভাষায় প্রবল আত্মবিশ্বাসী স্বরে তিনি বললেন, ‘আমি কনডেম সেলে ফাঁসির অপেক্ষায় ছিলাম, বাঁচব কি মরব কিছুই জানতাম না, তবে জানতাম বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই।’ হোটেলের ভিতরে বক্তব্য দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু, বাইরে তখন হাজারো বাঙালির ভিড়। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত অভিজাত মেফেয়ার এলাকা। দলে দলে আসছে মানুষ। কীভাবে তারা খবর পেল, কে দিল খবর? কেউ কাউকে খবর দেয়নি, খবর উড়ে যায় কানে কানে, বাতাসের বেগে, এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। প্রচণ্ড শীত, মেঘ-বৃষ্টি সব উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয় তাদের প্রিয় বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্য। যিনি তাদের দিয়েছেন একটি পতাকা, একটি মানচিত্র। বাইরে ভিড়ের খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু হোটেলের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ান। সমবেত জনতার উদ্দেশে হাসিমুখে হাত নাড়েন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে স্লোগান ওঠে, ‘জয় বাংলা’। বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পেয়ে বহু প্রবাসী বাঙালির চোখে জল এসেছিল সেদিন। বিকাল ৫টার দিকে বঙ্গবন্ধু গেলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে। তাকে বরণ করে নিলেন কনজারভেটিভ পার্টির লিডার, প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ। দুই রাষ্ট্রনায়কের মধ্যে বৈঠক হলো আন্তরিক পরিবেশে। বৈঠকের একপর্যায়ে এডওয়ার্ড হিথ জিজ্ঞাস করলেন, ‘আপনাকে আর কী সহযোগিতা করতে পারি, বলুন।’ তত্ক্ষণাৎ বঙ্গবন্ধু উত্তর দিলেন, ‘আপনার প্লেনটা চাই, ওটা দিতে পারবেন, আমি খুব দ্রুত দেশে ফিরতে চাইছি।’ এডওয়ার্ড হিথ ব্যবস্থা নিলেন সঙ্গে সঙ্গে। বৈঠক চলার সময়ই নিশ্চিত হয়ে গেল ব্রিটিশ রাজকীয় কমেট জেট বিমানে করে ৯ জানুয়ারি সকাল ৭টায় বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেবেন জাতির জনক। বৈঠক শেষে ঘটে একটা অভাবনীয় ঘটনা। বিদায় নিয়ে যখন বঙ্গবন্ধু তার গাড়িতে উঠবেন তখন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ নিজে এগিয়ে এসে তাঁর জন্য গাড়ির দরজা খুলে দিলেন। দরজা ধরে তিনি ততক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ভিতরে গিয়ে না বসলেন। আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য, আর কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এমন সম্মান দেখাননি কখনো, কস্মিনকালেও। ঘটনা নিয়ে তখন প্রধানমন্ত্রী হিথের সমালোচনা করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু এক বাক্যে সেই সমালোচনাকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন হিথ। বলেছিলেন, ‘আমি যাকে সম্মান করেছি, তিনি হচ্ছেন একটি জাতির মুক্তিদাতা মহান বীর। তাঁকে এই সম্মান প্রদর্শন করতে পেরে বরং আমরাই সম্মানিত হয়েছি।’ সকাল হলেই বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পথ ধরবেন। তাকে স্বাগত জানাবে বলে অপেক্ষার প্রহর গুনছে ৭ কোটি মানুষ।

Picture

বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে গাইলেন, আমার সোনার বাংলা : ৯ জানুয়ারি, ১৯৭২। ভোর ৬টা। লন্ডন হিথরো বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে পৌঁছালেন বঙ্গবন্ধু। তাঁকে স্বাগত জানালেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিভাগের কর্মকর্তা ইয়ান সাদারল্যান্ড ও লন্ডনে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার আপা বি পন্থ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ করিয়ে দেন আপা বি পন্থ। ৩০ মিনিট ধরে চলে ইন্দিরা-মুজিব টেলিফোন আলাপচারিতা। ঘণ্টাখানেক পরে ইন্দিরা গান্ধী আবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন।

ইন্দিরা গান্ধীর সম্মতিতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশে যাত্রাপথে সহযাত্রী হলেন ব্রিটেনস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের তৎকালীন রাজনৈতিক কর্মকর্তা শশাঙ্ক ব্যানার্জি। সঙ্গে ছিলেন সে সময়ের ভারতীয় হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি ভেদ মারওয়া। আরও ছিলেন স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী হামিদা হোসেন।

বিমানে তাঁরা পাশাপাশি আসনে বসলেন। সামনের টেবিলে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় সুগন্ধময় এরিনমোর তামাক, আর সেই বিখ্যাত পাইপ। উত্ফুল্ল মুজিবের তখন দেশে ফেরার তর সইছে না।

আপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ।’ তিনি ধন্যবাদ জানালেন দীর্ঘদিন তাঁকে সহযোগিতার জন্য। বললেন, ‘ব্যানার্জি! এবার একটি বিশেষ সহযোগিতা চাই।’ শশাঙ্ক বললেন, ‘আয়ত্তের মধ্যে হলে অবশ্যই চেষ্টা করব।’ ধীর লয়ে মুজিব বললেন, ‘দিল্লিতে ইন্দিরার সঙ্গে বৈঠকের আগেই তাঁর কাছে একটি খবর পৌঁছানো দরকার। বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় মিত্রবাহিনী সদস্যদের ৩১ মার্চ, ১৯৭২ সালের মধ্যে ভারতে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি চূড়ান্ত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর এ বিষয়ে কথা হয়েছে। ভারতীয় মিত্রবাহিনী চলে গেলে বাংলাদেশ ব্রিটিশ সরকারের স্বীকৃতি পেতে আর কোনো বাধা থাকবে না।’

মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি নিয়ে বিমানটি আবার উড়তে শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধু জানালা দিয়ে শ্বেতশুভ্র সাদা মেঘের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর দাঁড়িয়ে গাইতে লাগলেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’। তাঁর চোখ ভরে উঠেছে জলে। তিনি বললেন, ‘ব্যানার্জি! আপনিও ধরুন। রিহার্সেল দিয়ে নিই।’ তাঁরা দুজনে মিলে গানটা গাইলেন। বঙ্গবন্ধু চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করে বললেন, ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আরও কঠোর সংগ্রাম অপেক্ষা করে আছে। বুকে শুধু একটাই বল, আমার দেশের আপামর মানুষ।’

শশাঙ্ককে অবাক করে দিয়ে বঙ্গবন্ধু হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘এ গানটি হবে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। কেমন হবে বলেন তো?’ শশাঙ্ক জবাব দিলেন, ‘ইতিহাসে তাহলে প্রথমবারের মতো দুটি দেশের জাতীয় সংগীতের লেখক হবেন একই ব্যক্তি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’

শশাঙ্ক ব্যানার্জি বললেন, ‘দিল্লি অবতরণের তখন আর সময় বেশি বাকি নেই। পাইলট আমাদের দুটি ছবি তুলে দিলেন। শেখ মুজিবের সঙ্গে তোলা সেই ঐতিহাসিক ছবিটি এখনো খুব যত্ন করে তুলে রেখেছি।’

দিল্লিতে শেখ মুজিবকে স্বাগত জানালেন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিংসহ আরও অনেকে। রাষ্ট্রপতি ভবনে বঙ্গবন্ধুর জন্য কলকাতা থেকে আনা গুড়ের সন্দেশ, সমুচা, শিঙ্গাড়া আর দার্জিলিং চা তাঁকে তৃপ্তি দিয়েছিল। মুজিব-ইন্দিরা বৈঠকে তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টি নিয়ে কথা হয়।

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। দুপুরে বিমান থেকে ঢাকায় নামলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জনস্রোত আর মানুষের স্লোগানে মুখরিত চারপাশ। সোচ্চার ধ্বনি উঠছে, ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘জয় মুক্তিযুদ্ধ’। বিমানবন্দর থেকে পল্টন ময়দান এক বিপুল জনসমুদ্র। শশাঙ্ক বলেন, ‘সে এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত, চারদিকে মুক্তি আর মহানেতাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। আজও চোখে লেগে আছে মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটি।’

তথ্যসূত্র : ‘বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তেরো ঘণ্টা’, লেখক : উজ্জ্বল দাশ, ‘বিলেতে বাংলার রাজনীতি’, লেখক : ফারুক আহমদ ও ‘বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’, লেখক : সাঈম চৌধুরী।


সর্বজনীন উৎসবে সাম্প্রদায়িক চর্চা!

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৮

Picture

গত বড়দিনে কি মনে করে ক্রিশমাস ডে লিখে গুগলে সার্চ করলাম। উইকিপিডিয়ায় ঢুকে বড়দিন সম্পর্কে পড়ছিলাম। বড়দিন উদযাপন করার পদ্ধতিতে গীর্জায় উপাসনার বিষয়টা দেখে একটু খটকা লাগল মনে। চিন্তাটাও যেন সামান্য থমকে গেল। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে আবোলতাবোল ভেবে শারদীয়া দুর্গাপূজা উদযাপনের পদ্ধতি সার্চ করে উইকিপিডিয়ায় ঢুকলাম। দেখি, মহাসপ্তমীতে সপ্তমিবিহিত পূজা। মহাষ্টমীতে মহাষ্টমীবিহিত পূজা। মহানবমীতে কুমারী পূজা, অর্ধরাত্রবিহিত পূজা ও মহাপূজা। বিজয়াদশমীতে বিসর্জনাঙ্গ পূজা। নাহ আর ভাবতে পারি না। চিন্তটা খুব দ্রুত  ঘুরে এলো মুসলমানদের ঈদে। হুম,এখানেও তো দুঈদে বিশেষ নিয়মে নামাজ আছে।

প্রতিটা ধর্মীয় উৎসবেই আরাধনা আছে যা একেক ধর্মে একেক নামে পরিচিত। চিন্তাটা ক্লান্ত হয়ে যায় আমার! ঈদ, পূজা, বড়দিন যে উৎসবগুলোকে সর্বজনীন বলে ভাবতে শুরু করেছি, প্রচার করছি সেখানে সাম্প্রদায়িক চর্চা? যে উৎসবগুলোতে সাম্প্রদায়িক চর্চা হয় সেগুলো সর্বজনীন হয় কীভাবে? কীভাবে এ উৎসবগুলোকে আমাদের দেশের বিদ্বান বুদ্ধিজীবী এবং বিদগ্ধ রাজনীতিবিদরা সর্বজনীন বলে মহা সমারোহে প্রচার করেন! অধিকন্তু আরো গভীরে বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, প্রতিটা ধর্মীয় উৎসব এই ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক বিজ্ঞাপন! মাথাটা ভো ভো করছে। আর ভাবতে পারছি না। এই ধর্মীয় উৎসবগুলো কোনভাবেই আমাদের বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, ভাষা দিবসের মতো সর্বজনীন হতে পারে না। ধর্মীয় উৎসব গুলো ওই ধর্মের অনুসারীদেরকেই উৎসর্গ করা। অন্যকারো জন্য না। বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।

ইলিয়াস আলমগীর: লেখক: কবি ও কলামিস্ট, কুবি,কুষ্টিয়া


শিক্ষিত স্বাবলম্বী নারীরাই ডিভোর্সের শীর্ষে

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৮

ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগের চেয়ে কর্মক্ষেত্রে নারীদের কাজ করার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় নারীরা সামাজিকতা ও লোকলজ্জার চেয়ে নিজের আত্মসম্মানকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। আর তাই সংসারে অশান্তি নিয়ে থাকার পরিবর্তে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তই বেশি নিচ্ছেন।

জানা গেছে, ঢাকায় গত এক দশকে বিবাহ বিচ্ছেদের হার আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এক্ষেত্রে বিচ্ছেদের বেশি আবেদন করছেন শিক্ষিত ও সাবলম্বী নারীরা। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দুই এলাকাতেই নারীরা বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য পুরুষের চেয়ে বেশি আবেদন করছেন।

জরিপের তথ্যে, বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করছেন ৭০ দশমিক ৮৫ ভাগ নারী আর পুরুষের হার মাত্র ২৯ দশমিক ১৫ ভাগ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৬ সালে যেখানে বাংলাদেশে প্রতি হাজারে বিচ্ছেদের হার ছিল দশমিক ৬ জন। বর্তমানে এই হার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে এক দশমিক এক জন। বিচ্ছেদের আবেদনকারীদের মধ্যে যারা উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন তারা হাজারে এক দশমিক ৭ জন বিচ্ছেদের আবেদন করেন। আর অশিক্ষিতদের মধ্যে এই হার হাজারে শূন্য দশমিক ৫।

রাজধানীর গত পাঁচ বছরের বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত শালিসি পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পাঁচ বছরে রাজধানীতে তালাকের মোট আবেদনের ৬৬ দশমিক ১৬ শতাংশ স্ত্রী এবং ৩৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ স্বামীর পক্ষ থেকে করা হয়েছে।

Picture

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্যে, চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত তালাকের নোটিস পাওয়া গেছে ১৯৮টি। এর মধ্যে নারীরা দিয়েছেন ১৪২টি নোটিস।

উত্তর সিটি করপোরেশনও তাদের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানায়, নারীদের তালাক দেওয়ার হার পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি। পেশাগত উন্নয়ন, আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা আগের চেয়ে বেশি সচেতন। নারীরা লোকলজ্জার ভয়ে এখন আর আপস করছেন না। বরং অশান্তি এড়াতে বিচ্ছেদের আবেদন করছেন।  

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আইন বিভাগের কর্মকর্তা এস এম মাসুদুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সামাজিক জটিলতার জন্য সমাজে বিচ্ছেদের ঘটনা এক দশকে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে সন্তানের মঙ্গল ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ রোধে বিচ্ছেদে যাওয়ার মধ্যে নেতিবাচক কিছু নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকায় একজন নারী এখন তার পরিবারকেও আর্থিক সহায়তা করতে পারছে। পারিবারিক বন্ধনের চেয়ে অনেক নারী নিজের পেশা জীবনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। আর মনস্তাত্ত্ব্বিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ফলে নারী নিজেই এখন বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।


ইসলামি বিপ্লব রক্ষার অঙ্গীকারে জাতীয় ঐক্য। আবু জাফর মাহমুদ

বৃহস্পতিবার, ০৪ জানুয়ারী ২০১৮

ইরানে গণতান্ত্রিক দাবি নিয়ে আন্দোলনে দাঙ্গা বাঁধানোর বিদেশী উস্কানীর বিরুদ্ধে রাস্তায় রাস্তায় ইসলামী বিপ্লব রক্ষার প্রত্যয়ে নেমেছে জনতার মিছিল।এই মিছিলে বিপ্লবের নেতা খোমেনী ও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার ছবি বহন করছে মানুষ আর মানুষ।ইসলামী বিপ্লবে সমৃদ্ধ ইরানে দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টারত ডোনাল্ড ট্রাম্প,নেতানিয়াহু ও সৌদি বাদশাহর প্রকাশ্য স্বীকারোক্তির প্রেক্ষিতে জনতার প্রতিবাদ রূপান্তর হয়েছে চেতনার আগ্নেয়গিরিতে।রাষ্ট্র,সার্বভৌমত্ব ও ইসলামী বিপ্লব রক্ষার অঙ্গিকারে প্রথম কোন দেশ বর্তমান যুগে এতো শক্ত অবস্থানে লৌহকঠিন ঐক্যের দৃঢ়তা দেখাচ্ছে।লেবানন,প্যালেষ্টাইন সিরিয়া মিসর তুরস্কের গণমানুষের কাছে সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রেরণার প্রতীক উঠছে ইরাণী জাতি।   
মধ্যপ্রাচ্যে প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে কে সন্ত্রাসী?কে নীরিহ মানুষের জন্যে বিপজ্জনক?ইরান?লেবাননের হিজবুল্লাহ  বাহিনী? মুক্তিকামি ইয়েমেনী হুতি? মুক্তিকামী ফিলিস্তিনি হামাস? নাকি ইজরাইলের সামরিক বাহিনী?নাকি সৌদি সরকারী বাহিনী?কে আগ্রাসী জঙ্গি- আক্রমণ প্রতিরোধকারী  নাকি আগ্রাসনকারী ?    
ইরানে গণতান্ত্রিক দাবিতে আন্দোলকারীদের সভা সমাবেশকে হঠাৎ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি রূপান্তর করার চেষ্টায় বিশৃঙ্খলাকারীদের প্রতি সমর্থন করে ভিডিও বার্তা দিয়েছেন ইজরাইলের প্রধানমন্ত্রী।ইতিপূর্বে টুইটারে সমর্থন দিয়েছেন মার্কিণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।তাদের উভয়ের দাবি,তারাই ইরানে এই বিশৃংখলা ও উত্তেজনা উস্কে দিয়েছেন।কৃতিত্ব দাবিকারি এই দুজন নেতা আসলে কি সফল হলেন নাকি বিশ্ববিবেকে বিরক্তির কারণ হলেন এই আলোচনা চলছে কূটনৈতিক মহলে।
অবশ্য ইরানী প্রশাসনের দাবি তারা ওদের এজেণ্টদের চিহ্নিত এবং গ্রেফতার করেছেন।কথা হচ্ছে অন্য দেশে এভাবে হস্তক্ষেপের প্রকাশ্য রীতি কি দুনিয়ার সকল দেশের জন্যে নিরাপত্তা বয়ে আনে?জাতিসংঘ এই আচরণ মেনে নেবার কথা নয় জেনেও এই দুই সরকারপ্রধান বিশেষ স্বার্থে যে সমীকরণ মিলিয়েছেন তাতে মনে হতেই পারে এরা জাতিসংঘকে থোরাই করেননা।
এই বিশেষ ধারাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আমেরিকাকে যে জটিল অবস্থায় জড়ানো হচ্ছে,তাতে আমেরিকার ইওরোপীয় মিত্ররা চীন-রাশিয়া নেতৃত্বাধীন বলয়ে যুক্ত হবে জেনেও এই ঝুঁকি নেয়া হয়েছে।এই মিত্রেরা যে প্রেক্ষাপটে ইরাক,লিবিয়া,সিরিয়া, মিশর, আফগানিস্তান, আক্রমনে আমেরিকাকে সমর্থন দিয়েছিলো একই পরিস্থিতি কি এখনো আছে? ইরান ও প্যালেষ্টাইন প্রশ্নে ওরা কি আগ্রাসনের পক্ষে অবস্থান নেবেন? সাম্প্রতিককালে সিরিয়ায় ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু যুদ্ধ করেও হেরে গেলেন। এই পরাজয় কি গোপ্ন আছে?  
এদিকে ১জানুয়ারী সোমবার রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়েছে ইরানে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে।ইরাণের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অস্থিতিশীল করার ঘটনা গ্রহন যোগ্য নয়।আমরা আশা করি পরিস্থতিতি রক্তপাত ও সহিংসতার দিকে যাবেনা।এই হস্তক্ষেপের বিরোধীতা করেছে করেছে রাশিয়া তুরস্ক ও সিরিয়া।  
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জিততে পারার মত অবস্থা থাকলে ওবামা-কেরি-হিলারী প্রশাসন কি নেতানিয়াহুর চাপে যুদ্ধ চাপিয়ে দিতেননা?  সৌদি রাজপরিবারের শক্তির উপর ভর করে কতটুকুন বেশী অগ্রসর হওয়া যাবে?সৌদী জোটের বাহিনী ইয়েমেনে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে সবচেয়ে আপন প্রতিবেশী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
 ইজরাইলের পক্ষ হয়ে সৌদি জোট লড়াই করতে গেলে ইয়েমেনি হুতি যোদ্ধারা, ইরান, তুরস্ক,ইরাক,লেবানন,ফিলিস্তিনীদের সাথে এক হয়ে লড়বেনা? পারমানবিক শক্তিধর পাকিস্তানকে ক্ষেপিয়ে তুলছেন ট্রাম্প প্রশাসন।এদিক থেকে আফগানিস্তান পাকিস্তান সহ ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো রাশিয়ার দিক থেকে আজারবাইজান,কাজাখিস্তান,কিরঘিজিয়া,তাজিকিস্তান এবং উজবেকিস্তান ইরানের পক্ষে সমর্থন দিয়ে জোটবদ্ধ হবেই।
বুঝলাম তাতে সমরাস্ত্র কারখানাগুলোর গুরুত্ব বাড়বে।এদের অনেকদিনের পুরাতন অস্ত্রগুলোর অনেকগুলো শেষ হয়ে যাবে।নতুন অস্ত্রের বাজা্রে চাহিদা বাড়বে।শক্তি সামর্থ্যের বলয়ে নয়া পরিস্থিতির উদ্ভব হবে।আমেরিকার কি হবে?  আমেরিকা দূর্বল হবে।এই দূর্বল হওয়াটা আমেরিকান নাগরিক এবং যোদ্ধাদের জন্যে কষ্টের।যন্ত্রণার।
তবে বাস্তবতা হলো, যে ফাঁদে পা ও গলা একসাথে ঢুকিয়ে ট্রাম্প ব্যবসার রাজা থেকে হোয়াইট হাউসের রাজা বনেছেন,তাতে তার যুদ্ধ বাদ দিয়ে কৌশলগত কূটনীতিতে যাওয়ার পথও খোলা নেই।সন্ত্রাস ও গোলমালের পথ আমেরিকার জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও এই পথ চলাই তার একমাত্র পথ।
এটাই তার প্রেসিডেন্ট পদ পাবার আগে পৃষ্ঠপোষকদের সাথে সম্ভবতঃ ছিল তার রফা দফা।তাই অনেক বিশ্লেষক বলছেন, আমেরিকাকে একা করে হলেও ট্রাম্প এই একেলা পথে চলবেন,পা কেঁপে কেঁপে উঠলেও তিনি চলবেন নেতানিয়াহুর হাত ধরে।রাশিয়া নিবে দুই দিকের সুবিধে।কেননা পুটিনের আছে সেই যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা।রাশিয়া তার অবস্থান পরিবর্তন না করেই তার সামর্থ্য বাড়িয়ে চলেছে।আমেরিকা যা হারাচ্ছে তা অনায়াসেই যুক্ত হচ্ছে রাশিয়ার সাথে।      
জেরুজালেমকে ইজরাইলের রাজধানী করার ইচ্ছাকে সমর্থন জানিয়ে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অসম্মানজনক কম ভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন।ট্রাম্প মূলতঃ সন্ত্রাস এবং জোরপূর্বক দখলকে সমর্থন দিয়েছেন প্রকাশ্যে।ধারণা করা হচ্ছে ইরান গ্রাস করাকে শক্তিমত্তার জোরে নিজেদের অধিকার ভাবছে এই দুই নেতা।
তাছাড়া নেতানিয়াহু সস্ত্রীক সরকারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবার পর এবং আরো বড় আকারের অভিযোগগুলো প্রমাণ হবার পর তাকে রাজনীতি থেকে বিদায় নিতে হবার চূড়ান্ত পরিস্থিতি আসার  আগে এই মরণ কামড় দেয়াটা তার ছলচাতুরী বলে অনেক বিশ্লেষক দাবি করছেন।ইজরাইল জুড়ে একাধারে এক সপ্তাহের বিক্ষোভ তার ভেতরের বাহিরের পরিচয়কে তুলোধুনো করে চলেছে।তার পদত্যাগের দাবি তুঙ্গে উঠেছে।বিক্ষোভ থামছেনা।
কথা হচ্ছে ইরান বিপ্লবের পর এই প্রথম তারা  জাতীয়ভাবে আত্নরক্ষার পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য হচ্ছে।তারা কখনো শত্রু সম্পর্কে শিথিল হয়নি।পয়ারজিত হয়ে ইরান থেকে নিয়ন্ত্রণ হারানো পরজীবিদের ব্যাপারে উদাসীনও হয়নি।দীর্ঘ অবরোধ দিয়েও ইরানের সমৃদ্ধি থামানো কি সম্ভব হয়েছে?ইরান দরিদ্রও নয়।সামরিক দিক থেকেও দূর্বল নয়।এরা আমেরিকাকে ভয় পাওয়ার জাতি নয়।এরা আমেরিকার প্রভাবিত সরকারকে উথখাত করেছে বিপ্লবের মাধ্যমে।ইরান প্রতিনিয়ত ঠান্ডা মাথায় নিজেদেরকে দুনিয়ার অপরাপর শক্তিগুলোর কাছে গ্রহনযোগ্য করেছে।এরা কেবলমাত্র মুসলমান দেশ নয়।চীন রাশিয়া ও ইওরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ইরানের সম্পর্ক বাস্তবতার নিরিখে সূতায় গাঁথা।        
সন্ত্রাসীদের দমনও ও আফগানিস্তানের নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে আমেরিকার রিপাবলিকান সরাকার এবং তার মিত্ররা আফগানিস্তানে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় ২০০১সালে। এতো বছর যাবত এখনো আফগানিস্তাননে আমেরিকান সেনা বাহিনী প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কাছে মার খাচ্ছে। আমেরিকান সৈন্যরা আফিম চাষ করছে এবং আফগানিস্তান থেকে আফিম রফতানী তা আমেরিকায় আমদানী করছে।আমেরিকার প্রায়ই ৭০%শতাংশের বেশী আফিম(মারিজুয়ানা)আফগানিস্তানে উৎপাদিত।
জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি গোলাম আলী দাবি করেন,ইরান ৩৯বছর যাবত আফগানিস্তানের লক্ষ লক্ষ শরণার্থীদেরকে আশ্রয় ও খাবার দিয়ে চলেছে।এরা শরনার্থী হতে বাধ্য হয়েছে আমেরিকার আগ্রাসনের ফলে।সৌদি আরব সরকার ইজরাইলের নির্দেশ মেনে মধ্যপ্রাচ্যে আল্লাহর নবীদের নির্দেশিত পথ ত্যাগ করে নীরিহ  মানুষ হত্যা ও অনৈতিকতার দায় মুসলমানদের উপর চাপানোর সুযোগ দেয়ার সমালোচনার প্রমাণ মিলছে প্রতিদিন।এই অপরাধের খেসারত ইহলোক ও পরলোকে  নির্ধারিত।আমাদেরকে সৃষ্টিকর্তা আদিকাল থেকেই সতর্ক করে চলেছেন এবং সঠিক পথ ও তৈরী করে দিয়েছেন।নবী রাসুলরা কোন গোষ্ঠীর জন্যে নয়,আল্লাহ্‌ তাদেরকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে পাঠিয়েছেন।


বাংলাংলাদেশীবংশদভুতআকায়েদ, নাইমুর ও নাফিসগংদের পরিণতির জন্য দায়ী কে? - প্রদীপ মালাকার

বৃহস্পতিবার, ০৪ জানুয়ারী ২০১৮

প্রদীপ মালাকার –নিউইয়রক, ইউ,এস,এ, : কিছুদিন পূর্বে আমার এক শিক্ষক বন্ধুর সাথে দেখা হয় নিউইয়র্ক সিটির ব্রঙ্কসের এক  ম্যাকডোনালডসে। আমরা দুই জনই এক সাথে দীর্ঘদিন জন,এফ, কেনেডি হাই স্কুলে আমি গণিত শিক্ষক ও মিঃ ফিলিপ ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে কাজ করি । মিঃ ফিলিপের পিতা ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা ছিলেন । সেই সুবাদে মিঃফিলিপ ছোটবেলায় পিতার সাথে অনেকবার ঢাকায় আসা যাওয়া করেছে ।বলতে গেলে তখন থেকেই ফিলিপ বাংলাদেশের স্বাধীনতাও রাজনীতির ব্যাপারে বরাবরই তার আগ্রহ ছিল ।স্কুলে যখনই সময় পেতেন তখনই আমার সাথে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতেন । আজও দেখা হতেই কুশল বিনিময়ের পর নিউইয়র্ক সিটির টাইমস্কয়ারে আত্নঘাতি হামলাকারী জঙ্গি বাংলাদেশী তরুণের নিরীহ মানুষের উপর হামলা এবং গত বৎসর আর্লি আটিজান রেস্তোরাঁয় ১৭ জন বিদেশীসহ ২১জন কে হত্যার জঙ্গি হামলার কথা উল্লেখ করেন । তিনি বলেন , ২৭ বছরের আকায়েদ উল্লাহর বিরুধবে তদন্তকারীরা ম্যানহাটনের ফেডারেল কোর্টে বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠনকে সহায়তা ,জনসমাগম স্থলে বোমা হামলা, ধবংসাত্বক ডিভাইস ও বিস্ফোরক ব্যবহার করেসনপদের ক্ষতির অভিযোগ সহ হামলার কিছুক্ষণ আগে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনালডস ট্রাম্প কে (Donalds Trump)হুসিয়ারি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে । এসব অভিযোগে দোষী সাব্যস্থ হলে বাকি জীবন জেলেই কাটতে হবে ।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে নাইমুর জাকারিয়া রহমান (২০) ও মোহাণ্মদ আকীব রহমান (২১) নামের দুই যুবককে লন্ডনের মেট্রো পুলিশ গ্রেপ্তার করে । ২০ বছর বয়সী বাংলাদেশী –ব্রিটিশ নাগরিক নাইমুরের বিরুব্দে ঘরে বসে তউরি বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এবং বিশ্রুখল পরিস্থিতির সুযোগে বিস্ফোরক বেল্ট ও ছুরি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের ওপর হামলার পরিকল্পনা ও প্রস্ততি  অভিযোগ আনা ছাড়া ও পাকিস্তানি আকিবকে লিবিয়ায় আই,এস, যাওয়ার সহায়তা করার অভিযোগ আনা হয়েছে । তাদেরও একই শাস্থি হতে পারে ।মিঃফিলিপ  বলেন , দেখুন গত বছের ২১ শে জুলাই ম্যাচাচুসেটস স্টেটের বোস্টনে ২৬ বছরের যুবক রেজাউল ফেরদৌস  পেন্টাগনে হামলার ষড়যন্ত্রে ১৭ বছরের জেল  হয় । একই বছরের অক্টোবরে আরেক বাংলাদেশী কাজী নাফিস নামে ২১  বছরের  যুবক নিউইয়র্ক সিটির ফেডারেল রিজার্ভ বিল্ডিং- এ হামলার ষড়যন্ত্রে  আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তারও সাজা হয় । এতে আপনাদের দেশের দুর্নাম হয় । তিনি আর ও বলেন , জঙ্গি হামলা গুলিতে প্রায়ই নামি দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী ছাত্রদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় । তারা কেন  সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দিকে জোঁকে পড়লো ? বর্তমান সরকারতো  গণতান্ত্রিক ও সেকুলার । এই গুলি তো হওয়ার কথা নয় । ব্লুন তো আসলে আপনাদের দেশে কি হচ্ছে ।
আমি বললাম , যে গুষ্টির মানুষেরা জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাইদিকে চাঁদে দেখা গিয়েছে বলে বিশ্বাস করে তাণ্ডব চালায় এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সত্য মিত্যা যাচাই না করে অন্যের উপাসনালয়ে আগুন দেয়, বাড়ি ঘর ভাংচুর, লুটপাট চালায় সেই সমাজে আকায়েদ, নাইমুর গংদের জ্রন্ম হবে না তো রবীন্দ্রনাথ , নজরুল , আইনস্টাইনের জন্ম হবে ?  দেখুন , এক সময় আপনাদের সরকারই এই জামায়াতি ইসলামকে মডারেট ডেমোক্রেট এবং বাংলাদেশকে মডারেট মুসলিম কান্ট্রি হিসেবে সার্টিফিকেট  দিয়েছিল । অথচ এই সার্টিফিকেট পেয়ে তারা নতুন উদ্যমে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তাদের মুল লক্ষ্য রাষ্ট্র ক্ষমতায় ইসলামী হুকমত কায়েম বা তালেবানি রাষ্ট্র কায়েমে এগিয়ে যায় । জোট শাসনামলে বাংলা ভাই, আব্দুর রহমানের জেএমবি সহ অসংখ্য সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠনের আবির্ভাব হয়েছে জামায়াতের তত্ত্বাবধানে । পরে অবশ্য মার্কিন সরকার জামায়াত সম্পর্কে ধারনা পাল্টায় । আমি মিঃ ফিলিপকে আরও বলি , দেখুন আপনি যে বাংলাদেশী যুবকদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কথা বলেছেন , পাশাপাশি দেখুনতো গত ১লা মে ২০১০ সালে বাংলাদেশী –আমেরিকান আরেক যুবক ‘” মানব ক্যামেরা” সেজে ৩৩ বছর বয়সী ফয়সল শাহজাদ নামে পাকিস্তানী _ আমেরিকান যুবককে টাইম স্কয়ারে বোমা হামলার ষড়যন্ত্রে ধরিয়ে দেয় । মানব ক্যামেরা সাজা যুবকটির বাল্য,  কৌশোর তথা এই দেশের (আমেরিকার) লেখাপড়া শিখে বড় হয়েছে । অপর দিকে যুবকদের প্রাথমিক , মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষার  সহিত এ অঞ্চলের ধর্মান্ধ রাজনীতির চলমান আবহ দ্বারা প্রভাবিত এটাই স্বাভাবিক বলে রাজনউতিক বিশেষজ্ঞগন মনে করেন ।
আমি এখানে মিঃ ফিলিপের সকল প্রশ্ন পাঠকের সুবিধার্থে এক সাথে মিশিয়ে আলোচনা করতে চাই । আজকের লেখায় জামায়াতসহ সমমনা কয়েকটি ধর্মান্ধ রাজনউতিক দলের কয়েক দশকের রাজনউতিক কর্মকাণ্ডের সামান্য কিছু ফিরিস্থি উপস্থাপন করছি । দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সরকার জামায়াত , মুসলিম লীগ,নেজামি ইসলামসহ, আরও ২/১ টি দলকে মুক্তি যুব্দের বিরুদবে বিরোধিতা সহ পাক বাহিনীর সহযোগী হয়ে গণহত্যা নারী ধর্ষণ , লুটপাট, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের অপরাধে আইন করে নিসিদব করেছিলেন । ৭৫ এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সামরিক ফরমান বলে সকল দলের উপর থেকে বিধি নিষেধ তুলে নিয়ে জামায়াত সহ ধর্মান্ধ দল্গুলিকে প্রত্যক্ষ রাজনীতি করার অনুমতি প্রদান করেন । প্রথম থেকেই সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লিগাররা ক্ষমতাসীনদের সাথে সখ্যতার পাশাপাশি তাদের দলেও ব্যাপকভাবে ডুকে পড়ে ।৭৫-এর পর বাংলাদেশ আবার পাকিস্তানী ভাবধারায় ফিরে গেলে জামায়াত ইসলামী নতুন পরিবেশে নব উদ্যমে রাজনীতির মাঠে নেমে পড়ে । সামরিক  বেসামরিক নেতাদের দুর্বলতা ও ক্ষমতার রাজনীতির সুযোগে জামায়াত তার বাংলাদেশ বিরোধী তথা তার পূর্বের দর্শন বহাল রেখেই চলতে থাকে।
জামায়াতিরা কখনো মনে প্রানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা মেনে নেয়নি ।৭৫ পরবর্তী শাসনামলে জামায়াত অধ্যুষিত প্রায় স্থানেই মাদ্রাসায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হতো না। ১৯৭৬ সোহরাওয়ারদী   উদ্যানে আয়োজিত ইসলামী জলসায় জামায়াত নেতৃবৃন্দ জাতীয় সংগীত পরিবর্তন ,পতাকা বদল, বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা এবং দেশের সকল শহীদ মিনার ভেঙ্গে ফেলার দাবি তুলেছিল । এভাবেই জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির ১৯৭৫ এর পর অনুকূল পরিবেশ পেয়ে ক্রমান্বয়ে সাংগঠনিক শক্তি  বাড়ানোর পাশাপাশি মৌলবাদী অর্থনীতি তথা ব্যাংক, বীমা,ব্যবসা বাণিজ্য ও বিভিন্ন এণজিও      প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে । এ সময়েই ইসলামী ঐক্য়জোট, খেলাফত আন্দোলন সহ আরও কয়েকটি ধর্মীয়  রাজনউঁতিক  দল গড়ে উঠে । তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হলেও শরীয়তী কিংবা হাদিস আন্দোলনে বিশ্বাসী । জামায়েতিরা মুখে গণতন্ত্র, স্বাধীনতার কথা বললেও আসলে তারা আল্লাহ্‌র শাসন ছাড়া অন্য কিছু মানে না । মানলে নির্বাচনের পূর্বে জামায়াতের গঠনতন্ত্রে আল্লাহর শাসনের পরিবর্তে গণতন্ত্র  এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি আনুগত্যে বাধ্য করা হয় । অন্যথায় রেজিস্ট্রেশন ভুক্ত হবে না । নির্বাচনের পর জামায়াত আবার পূর্বের গঠনতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার খবরে নির্বাচন কমিশন হুশিয়ারি দিয়ে নোটিশ পাঁঠায় এই বলে যে পূর্বের সংশোধনীতে ফিরে না গেলে রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে যাবে ।  জামায়াত এইভাবেই দীর্ঘদিন ছলচাতুরী ও প্রতারণার রাজনীতি করে আসছে । আর সেই সাথে বিএনপির আশ্রয় প্রশ্রয়ে জামায়াত ফুলে ফেঁপে উঠে ২০০১ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতার পার্টনার বনে যায় । এই সময়েই জামায়াতের ছত্রছায়ায় ও পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থার আশীর্বাদে তালেবানি রাষ্ট্র কায়েমের লক্ষ্যে নামে-বেনামে অসংখ্য সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন গড়ে উঠে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেয় ।                
জামায়াত রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ার কারনে আকস্মিক ও অ্সনভব দ্রুততায় জঙ্গি নেটওয়ার্কের বিস্থার ঘটেছে । জোট সরকার গত  অক্টোবর  ২০০৬সালে এ বিদায়ের সময় দেশে জঙ্গি সংগঠনের সংখ্যা ছিল ৬১ । কিন্তু পরবর্তীতে বেড়ে দাঁড়ায় ১১৭ এ ।আমি এখানে কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের নাম উল্লেখ করছি ১-জামায়তুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ(জেএমবি ) ২হরকাতুল ৩-শাহদত-ই-আল হিকমা ৪- আহলে হাদিস আন্দোলন- বাংলাদেশ  ৫-জামায়াতুল ফালাইয়া ৬-জইশে  মোস্তফা ৭-জাগ্রত মুসলিম জনতা –বাংলাদেশ (জেএমজেবি)৮-হিজবুত তাহরির৯- আল-কায়েদা ১০- রোহিঙ্গা স লিডারিটি  অর্গানাইজেশন । এই জঙ্গি সংগঠন গুলির ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচী থাকলেও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা যায় ,সংগঠনের অনুসারীরা কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবনধারা পরিচালনার কথা বললেও বাস্তবে তারা ইসলামের ছত্রছায়ায় গোপনে এক শ্রেণীর তরুণ যুবকদের  জিহাদী তথা সশ্ত্র প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করা । এ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রতিটি মুসলমানের জন্য সশ্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা ফরজ ও সশ্ত্র জিহাদের মাধ্যমে ইসলামী জাতীয় মতবাদে তারা সংগঠনের সদস্যদের অনুপ্রাণিত করে থাকে । জেএমবির দাবি করে, তাদের ২৫ সশস্ত্র প্রশিক্ষিত কর্মী রয়েছে
এছারা মুফতি হান্নানের( হরকাতুল্র জিহাদ ),হিজবুত তহরিরের ও অনুরূপ  সশস্ত্র সদস্যের কথা পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায় । আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারি তথা কমিউনিস্টদের বিরুদব্দে গুলবদরের মুজাহিদ বাহিনীকে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার যুবক যায় আফগানিস্তানে । ৯/১১ ওয়ার্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের পর আমেরিকা আফগানিস্তান আক্রমণের ফলে শত শত নারী, শিশু , ব্রিব্ধ হত্যার প্রতিশোধে মোল্লা ওমরের সরকার ও ওসামা বিন লাদেন কে সহায়তার জন্য আবারও বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার যুবক আফগানিস্তানে  গিয়েছিল যুব্ধের জন্য । এদের অধিকাংশই  সশস্ত্র ট্রেনিং নিয়ে এবং তালেবানি ভাবধারায় উজ্জীবিত হয়ে দেশে ফিরে অনেকে  সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন গড়ে তুলে । জোট সরকারের পুরো পাঁচ বছরে স্বাধীনতার পক্ষের লেখক, কবি, বুব্ধিজীবী , শিল্পী ,রাজনীতিবিদ ,বিচারক,আইন জীবী হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে তালেবানি রাষ্ট্র কায়েমের লক্ষে ক্ষমতায় থাকা শক্তির ইশারায় এ সকল জঙ্গি সংগঠন জাপিয়ে পড়ে । এই পাঁচ বছরে আমরা দেখতে পাই,কবি শামসুর রহমানের উপর হামলা, হুমায়ূন আজাদের উপর হামলা, সাবেক অর্থ মন্ত্রী ডঃ কিবরিয়া হত্যা,২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলায় ২৩ জন নিহত  এবং গাজীপুরে এজলাসে হামলা চালিয়ে তিন আইনজীবীকে হত্যা, কমিউনিস্ট পার্টির সমাবেশে বোমা হামলায় ৭ জন নিহত, ময়মনসিংহ  শহরে ৪টি সিনেমা বোমা হামলা, ব্রিটিশ হাই কমিশনারের উপর হামলা, প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উব্দেশ্যে গোপালগঞ্জের জনসভাস্থলে শক্তিশালী বোমা পুতে রাখা, সারা জাগানো উদীচীর অনুষ্ঠানে জঙ্গিদের হামলায় ১৭ জন নিহত হয় । এছাড়া সংখ্যালুগুদের উপর হামলা,তাদের বাড়ি ঘর, উপাসনালয়ে ভাংচুর ও আগুন পুড়িয়ে দেওয়া,সনপত্তি দখল সহ অসংখ্য ঘটনা এই আমলে ঘটে । জঙ্গিরা যে কতটা শক্তিশালী তার প্রমান, দেশ বিদেশ সাড়া জাগানো ১৭ই আগস্ট ২০০৫ সালে সারা দেশের ৬৩ জেলায়  তিনশ স্থানে একই সময়ে ৫শটি বোমা হামলা চালাতে জঙ্গিদের ব্যবহার করতে হয়েছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক । এছারা উত্তরাঞ্চলে রাজশাহীর বাগমারা, নওগাঁয়ে সাবেক শিবির ক্যাডার , জাগ্রত মুসলিম জনতা-বাংলাদেশ (জেএমজেবি) এর প্রধান সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই এর নেতৃত্বে প্যারালাল শাসন গড়ে উঠেছিল । দেশ ও বিদেশের মানুষ সর্বহারা বা চরমপন্থি শায়েস্থার অজুহাতে ২২ জন প্রগতিশীল কর্মী হত্যা ও লোমহর্ষক  নির্যাতনের খবর জেনেছে । এ সকল ঘটনা সরেজমিনে দেখা ও জানার জন্য ঢাকা থেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এই অঞ্চলে ছুটে গিয়েছিলেন ।
পাশাপাশি ইসলামী  ঐক্যজোটের একাংশের নেতা প্রয়াত মুফতি ফজলুল হক আমেনি তার নিয়ন্ত্রণাধীন হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসাগুলিতে কোমলমতি ছাত্রদের ধর্মীয় শিক্ষার সহিত অ্যামেরিকাসহ অমুসলিমদের বিরুব্দে জেহাদি ভাবধারা ও বাছাইকৃত মাদ্রাসাগুলিতে  সশস্ত্র প্রশিক্ষণের একাধিক রিপোর্ট দৈনিকপত্রিকাগুলোতে  প্রকাশিত হয়  । এই আমেনির দল আমরা ঢাকাবাসীসহ ধর্মীয় সংগঠন গুলো  ঢাকার বকশীবাজার ও খুলনায় কাদিয়ানীদের মসজিদে নামাজ পড়তে বাধা দেওয়ার ঘটনাও পত্রিকার রিপোর্টে পড়েছি । জোট আমলে বোমা ও জঙ্গিহামলায় যে সকল জঙ্গি পুলশের হাতে ধরা পড়েছে , তাদের অধিকাংশের জবানবন্দীতে জামায়াতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার  কথা বেরিয়ে আসে  এবং কোন কোন ক্ষেত্রে জামায়াত প্রত্যক্ষ ইন্ধনের কথা জানিয়াছে দৈনিক সংবাদ ২২ আগস্ট ২০০৬ এ  রিপোর্টে।  
শেষপর্যন্ত জোট সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আমেরিকার চাপে  জেএমবি প্রধান শাইখ আব্দুর রহমান ও বাংলাভাই সহ  ছয় শীর্ষ  নেতাকে আটক ও বিচারের ব্যবস্থা করে । আদালতের রায়ে ছয় শীর্ষ নেতার ফাঁসির আদেশ হলেও জোট সরকার তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি । পরে তত্বাবধায়ক সরকার  ক্ষমতায় এসে ঐ ছয় শীর্ষ  জঙ্গি নেতার  ফাঁসি কার্যকর করে । ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসেই জঙ্গি দমনে উঠে পড়ে লাগে । অনেকেই মনে করেছিল , শীর্ষ জঙ্গিদের ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে জঙ্গি কর্মকাণ্ড শেষ হয়ে গেছে । কিন্তু তা নয় । সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউল হক ও  জামায়াতের সাবেক কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য মুফতি জসিমুদ্দিন রাহমানির নেতৃত্বে নব্য জেএমবি ও আনসারউল্লাহ্‌ বাংলা টীম নামে দইটি নতুন সংগঠন গড়ে তুলে । নিসিধদ ঘোষিত এই জঙ্গি সংগঠন গুলি সুকৌশলে স্কলাসটিকা ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মত অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উঠতি বয়সী ছাত্রদের জিহাদি মন্ত্রে  ও আত্নঘাতি সদস্য বানাতে অনুপ্রবেশ করে । তারা নব উদ্যমে জঙ্গি তৎপরতা চালায় ।  এই সময়ে      আন্তর্জাতিক জঙ্গি গুষ্টি আইএস এর কর্মকাণ্ডে দেশীয় জঙ্গি গুষ্টিগুলি প্রভাবিত হয় । এই সময়েই জঙ্গিরা ভিন্ন মত , লেখক, প্রকাশক, পুরোহিত ,যাজক ,ও বিদেশদের চাপাতি দ্বারা হত্যর মাধ্যমে  গলা কাটার সংক্রিতি   চালু করে । আমেরিকা প্রবাসী লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ , ব্লগার- রাজীব ,প্রকাশক- দীপেন ,ব্লগার- নিলাদ্রি সহ আরও অনেকে তাদের হাতে খুন হয় । দেশ বিদেশে সবচেয়ে আলোচিত  ও নৃশংস জঙ্গি হামলা হয় গত বছরের ১ লা জুলাই এ আর্লি আটিজান রেস্তুরায়। ঐ দিনের হামলায় দুই পুলিস কর্মকর্তা, তিন জন আমেরিকা প্রবাসী এবং বাকি ইতালি ও জাপানি নাগরিক সহ ২১ জন জঙ্গিদের হাতে নিহত হয় ।  এ দিন নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে সকল জঙ্গি নিহত হয় । এর পর থেকে সরকার শক্ত অবস্থান নিয়ে ধারাবায়িকভাবে জঙ্গি ডেরা ধবংস ও জঙ্গি নিধন করে চলেছেন । অন্যতম পালের গোদা মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানীকে সরকার গ্রেপ্তারে  সমর্থ হলেও মেজর জিয়াউল হক এখনো ধরাছোঁয়ার বাহিরে।    
সরকার জঙ্গি দমনে  সফল হয় । জঙ্গিদের মেরুদণ্ড বা নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে গেলেও একেবারে সমাজ , রাজনীতি থেকে তারা নিঃশেষ হয়ে যায়নি । দীর্ঘ ৪২ বছরের জামায়াত সহ অন্যান্য ধর্মান্ধ দলগুলি সমাজের একটি অংশের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িকতা, জিহাদিসহ আমেরিকা বিদ্বেষী মনোভাব গড়ে উঠেছিল তা মহাজোট বা আওয়ামী সরকারের ৯ বছরের  গণতান্ত্রিক ও সেমি-সেকুলার শাসনে ধুয়ে মুছে যাওয়ার কথা নয় । কিংবা এই দীর্ঘ সময়ে দেশের বাহিরে তথা আমেরিকা , ব্রিটেনের মত দেশে ধর্মান্ধ রাজনীতিবিদ ও  তাদের অনুসারীরা (আধ্যাত্মিক নেতারা) বিভিন্ন সময়ে দ্বীন ও ইসলামের  দাওয়াতের ছদ্রাবরনে যুবকদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগও আছে ।  
এ বিষয়ে আমার নিজের একটু অভিজ্ঞতার কথা বলি । গত ২০০৯ সালে নিউইয়র্ক থেকে   ঢাকায় শ্বশুর বাড়ীতে যাই বেড়াতে । আমি মেজ শ্যালিকাকে তার ৫ বছর বয়সী পুত্র সন্তানের  নাম জিজ্ঞেস করি । শালিকা উত্তরে জানায় ,লাদেন নাম রেখেছি ।আমি অবাক হয়ে লেখাপড়া না জানা শালিকাকে প্রশ্ন না করে তার বরকে জিজ্ঞেস করি নাম রাখার মানে কি? সে উত্তর দেয় ,লাদেনতো আমাদের দেশে বীর , সুপার পাওয়ার আমেরিকার কোমর ভেঙ্গে দিয়ে সে এখন বিশ্ব বীরে পরিণত হয়েছে । তাই এই বীরের নামে নিজ সন্তানের নাম রেখেছি । আমি আর কথা না বাড়িয়ে ছোট শ্যালককে নিয়ে  টেম্পো করে নিউমার্কেট ,এলিফ্যানট রোড যাই কিছু শপিং –এর জন্য। যাওয়ার পথে  দেখি ফুটপাতে  হকাররা নিজে লাদেন গেঞ্জি, শার্ট বিক্রি করছে । আসার পথে দেখলাম অনেক রিকশাওয়ালা মাথায় লাদেন ক্যাপ লাগিয়ে রিক্সা চালাচ্ছে ।  এবার আমার শিক্ষক বন্ধু মিঃফিলিপের কথায় আসি , আমেরিকা সহ যে পশ্চিমা বিশ্ব ওসামা বিন লাদেন কে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংস ও নিরাপরাধ  সাড়ে তিন হাজার মানুষের হত্যার দায়ে  বিশ্ব সন্ত্রাসী হিসেবে জানে , বাংলাদেশের একটি অংশের মানুষ জানে তার উল্টোটা । আজ যে মেধাবী যুবকদের কথা বলা হচ্ছে তার মধ্যে একজন রেজাউল ফেরদৌস ইতিমধ্যে ১৭ বছরের জেল হয়েছে । কাজী রেজাউনুল আহসান নাফিসের বিচারে সাজা হয়েছে ।আকায়েদ এবং নাইমুর গংদের আদালতের বিচারে সাজা হবে এবং বাকি জীবন জেলেই কাটাতে হতে পারে ।এছারা গত ২০০৮ সালে দৈনিক জনকণ্ঠের রিপোর্ট থেকে জানা যায় , বাংলাদেশের দুই সহোদর যুবক পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তেউয়াবার  সদস্য হয়ে নয়াদিল্লী গিয়েছিল পার্লামেন্ট ভবনে হামলার জন্য । কিন্তু নিরাপত্তা রক্ষীর হাতে আটক হয় । বর্তমানে তাদের বিচারে সাজা হয়ে দিল্লীর ত্রিহার জেলে ধুকে ধুকে মরছে । আমি এ সকল যুবকরা সন্ত্রাসী ঘটনায় কতটুকু  বা কিভাবে জড়িত এ বিতর্কে না গিয়ে শুধু বলব , এই যুবকরা  বা তাদের পরিবার যে স্বপ্ন দেখেছিল আজকে তাদের  এই পরিণতির জন্য কে দায়ী ?যুবকরা নিজে , পিতা মাতা, সরকার না ধর্মান্ধ রাজনীতি ? এমনিতেই ৯/১১ এর ঘটনার  পর পশ্চিমা বিশ্ব এশিয়ানদের বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করে । তারপর বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানী বা আফ্রিকানদের  সন্ত্রাসী ঘটনায় নাম আসলেও বাংলাদেশের নাম থাকে উজ্জল ভুমিকায় । গত বছর দুই বাংলাদেশী  আমেরিকার বিরুব্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি লুটিয়ে পড়ে । আমেরিকানরা এখন সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছে । ভারত বা আমেরিকা আমাদের শত্রু নয় বরং বন্ধু কিংবা যুব্ধাবস্থাও বিদ্যমান নয় ।  যতদূর জানা যায় , নাফিসের পরিবারটি উচ্চশিক্ষিত । পিতা একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা , এবং একটি বোনও ডাক্তার । আকায়েদের পিতা একজন মুক্তিযুব্ধা । এসকল পরিবার থেকে আসা আকায়েদ, নাফিসরা কেন  আমেরিকা , ব্রিটেন বিদ্বেষীহয়ে তাদের ভবিষৎ সোনালী  দিনগুলো অন্ধকারে বিসর্জন দিতে গেল? এর জবাবে কেউ যদি বলে বাংলাদেশের ধর্মান্ধ বুলশিট রাজনীতির শিকার  হয়েছে তারা , তবে কি তাকে খুব একটা দোষ দেওয়া যাবে?


মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ফিরিয়ে দিন আমার শৈশব

বৃহস্পতিবার, ০৪ জানুয়ারী ২০১৮

আনন্দকে চিরদিনের মতো ঠেলে দিয়েছে সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে। কেন পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে আমাদের জ্ঞানকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে? এত কেন-এর উত্তর জানতে ইচ্ছে করে মাননীয় মন্ত্রী। কারণ যখন আমার পিতা-মাতার কাছে শুনি তাদের শৈশবের উল্লাসের কথা, যখন তাদের মুখে শুনি বিকালের মাঠে গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্দা, বউছি, কুতকুত, দড়িলাফসহ নানা খেলার কথা, তখন আমাদের মনটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আমাদেরও মন চায় শৈশবকে এনজয় করতে। আমাদেরও মন চায় দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠের আইল ধরে হেঁটে বেড়াতে। আমাদেরও মন চায় বাড়ির উঠানে মাদুর পেতে বসে রাতের চাঁদ দেখতে। আর দাদা-দাদী কিংবা নানা-নানীর মুখে কিস্‌সা শুনতে। আমি শুনেছি, আপনাদের সময় এসবই ছিল চিত্র। সে সময় শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকে বিকালে ফিরে সবাই ছুটতেন খেলার মাঠে। সন্ধ্যায় যখন আজান পড়তো সঙ্গে সঙ্গে খেলা বন্ধ করে সবাই যার যার বাড়ি চলে যেতেন। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসতেন।

কারণ তখন জিপিএ-৫ নামক বিষফোঁড়া আপনাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, ক্লাস ফাইভে যে পিইসি পরীক্ষা চালু করেছেন এ ব্যবস্থাও আমাদের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। আমাদের অভিভাবকরা জিপিএ-৫ এবং সমাপনী পরীক্ষা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। বইয়ের বাইরের কোনো জ্ঞান আমরা অর্জন করতে পারি না। মাননীয় মন্ত্রী আপনি নিশ্চয় আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, শিশুরা যত বেশি বাইরে ঘুরবে ততবেশি তাদের বুদ্ধি খুলবে। কিন্তু আপনার আমলে এসব যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আপনার শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের জীবন স্কুল, কোচিং, প্রাইভেট আর বাসার মধ্যে আবদ্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় ঠিকমতো ঘুমুতেও পারি না আমরা শিশুরা। ফলে ঘরকুনো হয়ে পড়ছি। আত্মীয়স্বজন ও রক্তের সম্পর্কীয় চাচা, ফুফু, মামা, খালাকেও ভালোবাসতে পারি না। তাদের প্রতি কোনো প্রেমও জন্মায় না।

Picture

এছাড়া পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে ধুমধাম করে। কিন্তু এ পরীক্ষার সার্টিফিকেট তো কোনো কাজেই আসছে না। চাকরি, উচ্চশিক্ষা কোনো কাজেই এ দুটি পরীক্ষার সার্টিফিকেট চাওয়া হয় না। এসএসসি সার্টিফিকেট থেকেই মূল্যায়ন শুরু হয় সার্টিফিকেটের। এখানেও প্রশ্ন জাগে- যে সার্টিফিকেটের কোনো মূল্যই নেই তাহলে এত ঘটা করে এ সার্টিফিকেট অর্জনের জন্য পরীক্ষার প্রয়োজন কি? মাননীয় মন্ত্রী একটি কথা বলতে চাই, যে শৈশব হওয়ার কথা দুরন্ত, ঝলমলে, উজ্জ্বল। সেই শৈশবকে আপনি করে দিয়েছেন চিন্তাযুক্ত, আবদ্ধ আর অন্ধকার। আপনি আপনার শৈশব আর আমার শৈশবকে কি কখনো মিলিয়ে দেখেছেন। একবার চোখ বুঝুন তো। দেখুন, খেয়াল করুন আপনার শৈশব কিভাবে কেটেছে। কিভাবে আপনি শীতের সকালে পিঠা আর পুলির গন্ধে নিজে শিহরিত হয়েছেন। নিশ্চয় আমার মায়ের মতো আপনার মা আপনাকে ঘুম থেকে তুলে টেনে হিঁচড়ে স্কুলে নিয়ে যায়নি।

আবার স্কুল থেকে আসার পর তাড়াতাড়ি কিছু মুখে দিয়ে পড়ার টেবিলে জোর করে বসায়নি। যদি এমনটা না করে আপনি দেশের সম্পদ হতে পারেন তাহলে আমরা কেন আপনার ছোট্ট সময়ের মতো লেখাপড়া করে, আনন্দ করে, শৈশবকে শৈশবের মতো কাটিয়ে দেশের সম্পদ হতে পারবো না। বলতে পারবেন কি? শেষ করতে চাই মাননীয় মন্ত্রী এই বলে, আমাদের শৈশব ফিরিয়ে দিন। আমাদের কোমল হৃদয়কে নিজের মতো করে ভালোবাসতে দিন। দেখবেন আপনার স্বপ্ন এমনিতেই পূরণ হবে। এমনটা হলে আমরা শিশুরা আপনাকে মনে রাখবো আজীবন। হাজারো শিশু ফিরে পাবে তার শৈশব।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: শিক্ষামন্ত্রী আপনি হয়তো বলবেন, এটা আপনার দপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের অধীন নয়। এটা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার। কিন্তু আমরা বলতে চাই, শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে আপনার পরিকল্পনা নিতে হবে। বিষয়টি নিয়ে আপনাকেই ভাবতে হবে। আর এবছর তো প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পাশাপাশি ফলও ফাঁস হয়েছে। আরো কত কি ঘটবে কে জানে? তাই বলছি, আর দেরি নয়, আমার শৈশব ফিরিয়ে দেয়ার পাশাপাশি প্রশ্নফাঁস বন্ধ করুন। আমরা এ থেকে মুক্তি চাই। সত্যিকারের মেধাবীরা এগিয়ে যাক। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষায় পাস করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই।


শেখ ফজিলাতুন নেছা – আমার মা : শেখ হাসিনা

বৃহস্পতিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭

আগস্ট মাস। এই আগস্ট মাসে আমার মায়ের যেমন জন্ম হয়েছে; আবার কামাল, আমার ভাই, আমার থেকে মাত্র দুই বছরের ছোট, ওরও জন্ম এই আগস্ট মাসে। ৫ আগস্ট ওর জন্ম। নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস যে, এই মাসেই ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে জীবন দিতে হয়েছে আমার মাকে। আমার আব্বা, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ১৫ আগস্ট যারা শাহাদাতবরণ করেছেন, আমার মা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, কামাল, জামাল, রাসেল, কামাল-জামালের নব পরিণীতা বধূ, সুলতানা রোজী, আমার একমাত্র চাচা শেখ আবু নাসের, আমার ফুফা আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, তার ১৩ বছরের মেয়ে বেবী, ১০ বছরের আওরাফ, ৪ বছরের নাতি সুকান্ত, সুকান্তের মা এখানেই আছে। আমার বাবার সামরিক সচিব কর্নেল জামিল, যে ছুটে এসেছিল বাঁচানোর জন্য। এই ১৫ আগস্টে একই সঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, এভাবে পরিবারের এবং কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারসহ প্রায় ১৮ জন সদস্যকে।

alt

এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল কেন? একটাই কারণ, জাতির পিতা দেশ স্বাধীন করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তার ডাকে সাড়া দিয়ে লাখো মানুষ অস্ত্র তুলে নিয়ে সেই যুদ্ধ করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা শাহাদাতবরণ করেছেন আমি তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। পৃথিবীর ইতিহাসে কত নাম না জানা ঘটনা থাকে। আমার মায়ের স্মৃতির কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে যে আজকে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। স্বাধীন জাতি। কিন্তু এই স্বাধীনতার জন্য আমার বাবা যেমন সংগ্রাম করেছেন, আর তার পাশে থেকে আমার মা, আমার দাদা-দাদি সব সময় সহযোগিতা করেছেন। আমার মা’র জন্মের পরেই তার পিতা মারা যান। তার মাত্র তিন বছর বয়স তখন। আমার নানা খুব শৌখিন ছিলেন। তিনি যশোরে চাকরি করতেন এবং সব সময় বলেছেন আমার দুই মেয়েকে বিএ পাস করাব। সেই যুগে টুঙ্গিপাড়ার মতো অজপাড়াগাঁয়ে ঢাকা থেকে যেতে লাগত ২২ থেকে ২৪ ঘণ্টা। সেই জায়গায় বসে এই চিন্তা করা। এটা অনেক বড় মনের পরিচয়। তখনকার দিনে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। মিশনারি স্কুলে কিছু প্রাথমিক শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেন। কিন্তু তারপর আর বেশি দিন স্কুলে যেতে পারেননি, স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল বলে। আর ওই এলাকায় স্কুলও ছিল না। একটাই স্কুল ছিল, জিটি স্কুল। অর্থাৎ গিমাডাঙ্গা টুঙ্গিপাড়া স্কুল। যেটা আমাদের পূর্বপুরুষদেরই করা। আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় এক মাইলের ওপর, প্রায় দেড় কিলোমিটারের কাছাকাছি। দূরে কাঁচা মাটির রাস্তা। একমাত্র কাঁচা মাটির রাস্তা দিয়ে যাও অথবা নৌকায় যাও, মেয়েদের যাওয়া একদম নিষিদ্ধ। বাড়িতে পড়াশোনার জন্য পণ্ডিত রাখা হতো। মাস্টার ছিল আরবি পড়ার জন্য। কিন্তু আমার মা’র পড়শোনার প্রতি অদম্য একটা আগ্রহ ছিল। মায়ের যখন তিন বছর বয়স তখন তার বাবা মারা গেলেন।

আপনারা জানেন যে, সে সময় বাবার সামনে ছেলে মারা গেলে মুসলিম আইনে ছেলের ছেলে-মেয়েরা কোনো সম্পত্তি পেত না। আমার মায়ের দাদা তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে তার দুই নাতনিকে তার নিজেরই আপন চাচাতো ভাইয়ের ছেলেদের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে যান এবং সব সম্পত্তি দুই নাতনির নামে লিখে দিয়ে আমার দাদাকে মোতাওয়াল্লি করে দিয়ে যান। এর কিছু দিন পর আমার নানীও মারা যান, সেই থেকে আমার মা মানুষ হয়েছেন আমার দাদির কাছে। পাশাপাশি বাড়ি একই বাড়ি, একই উঠোন। কাজেই আমার দাদি নিয়ে আসেন আমার মাকে। আর আমার খালা দাদার কাছেই থেকে যান। এই ছোট বয়সে বিয়ে হয়ে যায়, শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদের সঙ্গেই তিনি বেড়ে ওঠেন ছোটবেলা থেকেই। উনার ছোটবেলায় অনেক গল্প আমরা শুনতাম। আমার দাদা-দাদির কাছে, ফুফুদের কাছে। বাবা রাজনীতি করছেন সেই কলকাতা শহরে পড়াশোনা করতেন তখন থেকেই। এবং মানবতার জন্য তার যে কাজ এবং কাজ করার যে আকাঙ্ক্ষা যার জন্য জীবনে অনেক ঝুঁকি তিনি নিয়েছেন। সেই ’৪৭-এর রায়টের সময় মানুষকে সাহায্য করা, যখন দুর্ভিক্ষ হয় তখন মানুষকে সাহায্য করা; সব সময় স্কুল জীবন থেকেই তিনি এভাবে মানুষের সেবা করে গেছেন। আমরা দাদা-দাদির কাছেই থাকতাম। যখন পাকিস্তান হলো আব্বা যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেন। সে সময় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য আন্দোলন করলেন। ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হলেন।

প্রথম ভাষা আন্দোলন ’৪৮ সালে। ১১ মার্চ ধর্মঘট ডাকা হলো, সেই ধর্মঘট ডাকার সঙ্গে সঙ্গে তিনি গ্রেফতার হলেন। এরপর ’৫৯ সালে ভুখা মিছিল করলেন। তখনও গ্রেফতার, বলতে গেলে ’৪৭ সাল থেকে ’৪৯ সালের মধ্যে ৩-৪ বার তিনি গ্রেফতার হন। এরপর ’৪৯ সালের অক্টোবরে যখন গ্রেফতার করে আর কিন্তু তাকে ছাড়েনি। সেই ’৫২ সাল পর্যন্ত তিনি বন্দী ছিলেন এবং বন্দীখানায় থেকে ভাষা আন্দোলনের তিনি সব রকম কর্মকাণ্ড চালাতেন। গোপনে হাসপাতালে বসে ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে, আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হতো। মা শুধু খবরই শুনতেন, যে এই অবস্থা, কাজেই স্বামীকে তিনি খুব কম সময়ই কাছে পেতেন। আমি যদি আমাদের জীবনটার দিকে ফিরে তাকাই এবং আমার বাবার জীবনটা যদি দেখি, কখনো একটানা দুটি বছর আমরা কিন্তু বাবাকে কাছে পাইনি। কাজেই স্ত্রী হিসেবে আমার মা ঠিক এভাবে বঞ্চিত ছিলেন। কিন্তু কখনো কোনো দিন কোনো অনুযোগ-অভিযোগ তিনি করতেন না। তিনি সব সময় বিশ্বাস করতেন যে, তার স্বামী দেশের জন্য কাজ করছেন, মানুষের জন্য কাজ করছেন, যে কাজ করছেন তা মানুষের কল্যাণের জন্য করছেন। মায়ের দাদা যে সম্পত্তি দিয়ে গেছেন— প্রচুর জমিজমা। জমিদার ছিলেন। সব সম্পত্তি মার নামে। এর থেকে যে টাকা আসত আমার দাদা সব সময় সে টাকা আমার মার হাতে দিয়ে দিতেন। একটি টাকাও মা নিজের জন্য খরচ করতেন না, সব জমিয়ে রাখতেন। কারণ জানতেন যে, আমার বাবা রাজনীতি করেন, তার টাকার অনেক দরকার, আমার দাদা-দাদি সব সময় দিতেন।

alt

দাদা সব সময় ছেলেকে দিতেন, তার পরেও মা তার ওই অংশটুকু, বলতে গেলে নিজেকে বঞ্চিত করে টাকাটা বাবার হাতে সব সময়ই তুলে দিতেন। এভাবেই তিনি সহযোগিতা শুরু করেন তখন কতইবা বয়স। পরবর্তীতে যখন ’৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন হয়। সে নির্বাচনে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে নির্বাচনী কাজে সবাই সম্পৃক্ত। আমার মাও সে সময় কাজ করেছেন। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরে আব্বা আমাকে নিয়ে আসেন, আব্বার ইচ্ছা ছিল আমাদেরকে ভালোভাবে স্কুলে পড়াবেন। এর পরে উনি মন্ত্রিসভার সদস্য হলেন। আবার মন্ত্রিসভা ভেঙে গেল, আমার এখনো মনে আছে, তখন আমরা খুব ছোট, কামাল-জামাল কেবল হামাগুড়ি দেয়। তখন মিন্টুরোডের তিন নম্বর বাসায় আমরা। একদিন সকাল বেলা উঠে দেখি মা খাটের ওপর বসে আছেন চুপচাপ, মুখটা গম্ভীর। আমি তো খুবই ছোট, কিছুই জানি না। রাতে বাসায় পুলিশ এসেছে, বাবাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। মা বসা খাটের উপরে, চোখে দুই ফোটা অশ্রু। আমি জিজ্ঞেস করলাম বাবা কই, কয় তোমার বাবাকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেছে। চোখের সামনে থেকে এই প্রথম গ্রেফতার, ১৪ দিনের নোটিস দিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিল, কোথায় যাবেন কেবল ঢাকায় এসেছেন, খুব কম মানুষকে মা চিনতেন। মন্ত্রী থাকা অবস্থায় ওই বাসায় মানুষে মানুষে গমগম করত কিন্তু ওইদিন সব ফাঁকা, আমার আব্বার ফুফাতো ভাই, আমার এক নানা তারা এলেন, বাড়ি খোঁজার চেষ্টা। নাজিরাবাজার একটা বাড়ি পাওয়া গেল, সে বাসায় আমাদের নিয়ে উঠলেন, এভাবেই একটার পর একটা ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে।

কিন্তু একটা জিনিস আমি বলব যে, আমার মাকে আমি কখনো ভেঙে পড়তে দেখিনি। কখনো যত কষ্টই হোক আমার বাবাকে কখনো বলেননি যে তুমি রাজনীতি ছেড়ে দাও বা চলে আসো বা সংসার কর বা সংসারের খরচ দাও। কখনো না। সংসারটা কীভাবে চলবে সম্পূর্ণভাবে তিনি নিজে করতেন। কোনো দিন জীবনে কোনো প্রয়োজনে আমার বাবাকে বিরক্ত করেননি। মেয়েদের অনেক আকাঙ্ক্ষা থাকে স্বামীদের কাছ থেকে পাওয়ার। শাড়ি, গয়না, বাড়ি, গাড়ি কত কিছু। এত কষ্ট তিনি করেছেন জীবনে কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলেননি। চাননি। ’৫৪ সালের পরেও বারবার কিন্তু গ্রেফতার হতে হয়েছে। তারপর ’৫৫ সালে তিনি আবার মন্ত্রী হন, তিনি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচন করে জয়ী হন, মন্ত্রিসভায় যোগ দেন, আমরা ১৫ নম্বর আবদুল গণি রোডে এসে উঠি। আমরা বাংলাদেশের ইতিহাস দেখলে দেখব সবাই মন্ত্রিত্বের জন্য দল ত্যাগ করে, আর আমি দেখেছি আমার বাবাকে যে তিনি সংগঠন শক্তিশালী করার জন্য নিজের মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিলেন, ছেড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। কোনো সাধারণ নারী যদি হতো তাহলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করত যে, স্বামী মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিচ্ছে। এই যে আমার বাড়ি গাড়ি এগুলো সব হারাবে, এটা কখনো হয়তো মেনে নিত না। এ নিয়ে ঝগড়াঝাটি হতো, অনুযোগ হতো; কিন্তু আমার মাকে দেখি নাই, এ ব্যাপারে একটা কথাও তিনি বলেছেন। বরং আব্বা যে পদক্ষেপ নিতেন সেটাকেই সমর্থন করতেন। সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে তিনি চলে গেলেন ছোট্ট জায়গায়। এরপর আব্বাকে টি-বোর্ডের চেয়ারম্যান করলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব। তখন সেগুনবাগিচায় একটা বাসায় থাকতে দেওয়া হলো। এরপরই এলো মার্শাল ল। আইয়ুব খান যেদিন মার্শাল ল ডিক্লেয়ার করলেন আব্বা করাচিতে ছিলেন। তাড়াতাড়ি চলে এলেন, ওই দিন রাতে ফিরে এলেন। তারপরই ১১ তারিখ দিবাগত রাতে অর্থাৎ

১২ তারিখে আব্বাকে গ্রেফতার করা হলো। আমার দাদি আমাদের সঙ্গে ছিলেন, গ্রেফতার করার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে যে নগদ টাকা ছিল আমাদের গাড়ি ছিল সব সিজ করে নিয়ে যাওয়া হলো। অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে আমার মাকে দেখেছি সে অবস্থা সামাল দিতে। মাত্র ছয় দিনের নোটিস দিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিল। মালপত্র নিয়ে রাস্তার ওপর আমরা ছোট ছোট ভাইবোন। তখন রেহানা খুবই ছোট। একজন একটা বাসা দিল। দুই কামরার বাসাতে আমরা গিয়ে উঠলাম। দিন-রাত বাড়ি খোঁজা আর আব্বার বিরুদ্ধে তখন একটার পর একটা মামলা দিচ্ছে, এই মামলা-মোকদ্দমা চালানো, কোর্টে যাওয়া এবং বাড়ি খোঁজা সব কাজ আমার মা অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে করতেন। আওয়ামী লীগের এবং আব্বার বন্ধুবান্ধব ছিল। আমার দাদা সব সময় চাল, ডাল, টাকা-পয়সা পাঠাতেন। হয়তো সে কষ্টটা অতটা ছিল না, আর যদি কখনো কষ্ট পেতেন মুখ ফুটে সেটা বলতেন না। এরপর সেগুনবাগিচায় দোতলা একটা বাসায় আমরা উঠলাম। আওয়ামী লীগের কোনো নেতা-কর্মীর অসুখ-বিসুখ হলে তাকে সাহায্য করা, যারা বন্দী তাদের পরিবারগুলো দেখা, কার বাড়িতে বাজার হচ্ছে না সে খোঁজখবর নেওয়া এবং এগুলো করতে গিয়ে মা কখনো কখনো গহনা বিক্রি করেছেন। আমার মা কখনো কিছু না বলতেন না। আমাদের বাসায় ফ্রিজ ছিল, আব্বা আমেরিকা যখন গিয়েছেন ফ্রিজ নিয়ে এসেছেন। সেই ফ্রিজটা বিক্রি করে দিলেন। আমাদের বললেন, ঠাণ্ডা পানি খেলে সর্দি কাশি হয়, গলা ব্যথা হয়, ঠাণ্ডা পানি খাওয়া ঠিক না। কাজেই এটা বিক্রি করে দিই। কিন্তু এটা কখনো বলেননি যে আমার টাকার অভাব। সংসার চালাতে হচ্ছে, আওয়ামী লীগের নেতাদের সাহায্য করতে হচ্ছে। কে অসুস্থ তাকে টাকা দিতে হচ্ছে। কখনো অভাব কথাটা মায়ের কাছ থেকে শুনিনি। এমনও দিন গেছে বাজার করতে পারেননি। আমাদের কিন্তু কোনো দিন বলেননি আমার টাকা নাই, বাজার করতে পারলাম না। চাল-ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করেছেন, আচার দিয়ে বলেছেন প্রতিদিন ভাত ভালো লাগে নাকি; আজকে আমরা গরিব খিচুড়ি খাব। এটা খেতে খুব মজা। আমাদের সেভাবে তিনি খাবার দিয়েছেন।

একজন মানুষ তার চরিত্র দৃঢ় থাকলে যে কোনো অবস্থা মোকাবিলা করার মতো ক্ষমতা ধারণ করতে পারে। অভাব-অনটনের কথা, হা-হুতাশ কখনো আমার মার মুখে শুনিনি। আমি তার বড় মেয়ে। আমার সঙ্গে আমার মায়ের বয়সের তফাৎ খুব বেশি ছিল না। তার মা নাই বাবা নাই কেউ নাই। বড় মেয়ে হিসেবে আমিই ছিলাম মা, আমিই বাবা, আমিই বন্ধু। কাজেই ঘটনাগুলো আমি যতটা জানতাম আর কেউ জানত না। আমি বুঝতে পারতাম। ভাইবোন ছোট ছোট তারা বুঝতে পারত না। প্রতিটি পদে পদে তিনি সংগঠনকে, আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করেছেন। তবে প্রকাশ্যে আসতেন না। তিনি ঠাট্টা করে বলতেন আমি আইয়ুব খানকে ধন্যবাদ দেই, কেন? আব্বা ’৫৮ সালে অ্যারেস্ট হন, ’৫৯ সালের ডিসেম্বর মাসে হেবিয়াস কর্পাস করে মুক্তি পান। সোহরাওয়ার্দী সাহেব নিজে এসে মামলা পরিচালনা করেন। তখন তিনি জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু  ইমবার্গো থাকে যে, উনি ঢাকার বাইরে যেতে পারবেন না। রাজনীতি করতে পারবেন না। সব রাজনীতি বন্ধ। ওই অবস্থায় আব্বা ইন্স্যুরেন্সে চাকরি নেন। তখন সত্যি কথা বলতে কি হাতে টাকা-পয়সা, ভালো বেতন, গাড়ি-টাড়ি সব আছে। একটু ভালোভাবে থাকার সুযোগ মা’র হলো। তিনি ঠাট্টা করে বলতেন আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় আইয়ুব খান এনে দিয়েছিল। উনি চাকরি করছেন আমি স্থিরভাবে জীবনটা চালাতে পারছি। ওই সময় ধানমন্ডিতে দুইটা কামরা তিনি করেন।

এরপর আমাদের ওই ’৬১ সালের অক্টোবরে আমরা ধানমন্ডি চলে আসি। এ বাড়িটা তৈরি করার সময় লেবার খরচ বাঁচানোর জন্য আমার মা নিজের হাতে ওয়ালে পানি দিতেন, ইট বিছাতেন। আমাদেরকে নিয়ে কাজ করতেন। বাড়িতে সবকিছুই ছিল। আব্বা তখন ভালো বেতন পাচ্ছেন। তারপরেও জীবনের চলার পথে সীমাবদ্ধতা থাকা বা সীমিতভাবে চলা, সবকিছুতে সংযতভাবে চলা— এই জিনিসটা কিন্তু সব সময় মা আমাদের শিখিয়েছেন। এরপরে তো দিনের পর দিন পরিস্থিতি উত্তাল হলো। ’৬২ সালে আবার আব্বা গ্রেফতার হলেন, ’৬৪ সালে আবার গ্রেফতার হলেন, আমি যদি হিসাব করি কখনো আমি দেখিনি দুটো বছর তিনি একনাগাড়ে কারাগারের বাইরে ছিলেন। জেলখানায় থাকলে সেখানে যাওয়া, আব্বার কি লাগবে সেটা দেখা, তার কাপড়-চোপড়, খাওয়া-দাওয়া, মামলা-মোকদ্দমা চালানো সবই কিন্তু মা করে গেছেন। সব। পাশাপাশি সংগঠনের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ তার ছিল। বিশেষ করে ছাত্রলীগ তো তিনি নিজের হাতেই গড়ে তোলেন। ছাত্রলীগের পরামর্শ, যা কিছু দরকার তিনি দেখতেন। ’

alt

৬৪ সালে একটা রায়ট হয়েছিল। আব্বা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই সময় হিন্দু পরিবারগুলোকে বাসায় নিয়ে আসতেন, সেখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় তাদের শেল্টারের ব্যবস্থা করতেন। ভলেন্টিয়ার করে দিয়েছিলেন রায়ট থামানোর জন্য, জীবনে যত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ আমার বাবা করেছেন, আদমজীতে বাঙালি বিহারী রায়ট হলো, সেখানে তিনি ছুটে গেছেন। প্রতিটি সময় এই যে কাজগুলো করেছেন আমার মা কিন্তু ছায়ার মতো তাকে সাহায্য করে গেছেন, কখনো এ নিয়ে অনুযোগ করেননি। এই যে একটার পর একটা পরিবার নিয়ে আসতেন তাদের জন্য রান্নাবান্না করা, খাওয়ানো, সব দায়িত্ব পালন করতেন। সব নিজেই করতেন। এরপর দিলেন ৬ দফা। ৬ দফা দেওয়ার পর তিনি যে সারা বাংলাদেশ ঘুরেছেন, যেখানে বক্তৃতা দিয়েছেন, সেখানে মামলা হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছেন। আবার মুক্তি পেয়েছেন, আবার আরেক জেলায় গেছেন, এভাবে চলতে চলতে ’৬৬ সালের ৮ মে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করল। তারপর তো আর মুক্তি পাননি, এই কারাগার থেকে বন্দী করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেল, ৫ মাস আমরা জানতেও পারিনি তিনি কোথায় আছেন, বেঁচে আছেন কিনা। সে সময় আন্দোলন গড়ে তোলা, ৭ জুনের হরতাল পালন। আমার মাকে দেখেছি, তিনি আমাদেরকে নিয়ে ছোট ফুফুর বাসায় যেতেন, কেননা সেখানে ফ্ল্যাট ছিল। ওখানে গিয়ে নিজে পায়ের স্যান্ডেল বদলাতেন, কাপড় বদলাতেন, বোরকা পরতেন, একটা স্কুটারে করে আমার মামা ছিলেন ঢাকায় পড়ত তাকে নিয়ে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতেন, আন্দোলন চালাবে কীভাবে তার পরামর্শ নিজে দিতেন। তিনি ফিরে এসে আমাদের নিয়ে বাসায় ফিরতেন। কারণ গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সব সময় নজরদারিতে রাখত। কাজেই গোয়েন্দাদের নজরদারি থেকে বাঁচাতে তিনি এভাবেই কাজ করতেন। ছাত্রদের আন্দোলনকে কীভাবে গতিশীল করা যায়, আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা এবং এ হরতালটা যেন সফল হয়, আন্দোলন বাড়ে, সফল হয়; তার জন্য তিনি কাজ করতেন। কিন্তু কখনো পত্রিকায় ছবি ওঠা, বিবৃতি এসবে তিনি ছিলেন না। একটা সময় এলো ৬ দফা, না ৮ দফা, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নেতারা চলে এলেন। আমাদেরও অনেক বড় বড় নেতা চলে এলেন। কারণ আওয়ামী লীগ এমন একটা দল যে, আওয়ামী লীগের কর্মীরা সব সময় ঠিক থাকেন কিন্তু নেতারা একটু বেতালা হয়ে যান মাঝে মাঝে, এটা আমার ছোটবেলা থেকেই দেখা। এই সময়ও দেখলাম ৬ দফা, না ৮ দফা, বড় বড় নেতারা এলেন করাচি থেকে। তখন শাহবাগ হোটেল আজকে যেটা বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। আমার মা মাঝে মাঝে আমাকে পাঠাতেন যে, যা একটু, নেতারা আসছেন, তাদের স্ত্রীরা আসছেন, তাদের খোঁজখবর নিয়ে আয়, আমার সঙ্গে কে কে আছে দেখে আয়, মানে একটু গোয়েন্দাগিরি করে আসা আর কি, তো আমি রাসেলকে নিয়ে চলে যেতাম, মার কাছে এসে যা যা ব্রিফ দেওয়ার দিতাম। তাছাড়া মা’র একটা ভালো নেটওয়ার্ক ছিল ঢাকা শহরে।

মহানগর আওয়ামী লীগের গাজী গোলাম মোস্তফার নেতৃত্বে কখন কী হচ্ছে সমস্ত খবর আমার মা’র কাছে চলে আসত। তখন তিনি এভাবে সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। মফস্বল থেকেও নেতারা আসতেন, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতেন। কারণ রাজনৈতিকভাবে তিনি যে কত সচেতন ছিলেন সেটা আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। কাজেই সেই সময় ৬ দফা থেকে এক চুল এদিক-ওদিক যাবেন না এটাই ছিল তার সিদ্ধান্ত। এটা আব্বাকে বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের নেতারা সব উঠেপড়ে লাগলেন ৮ দফা খুবই ভালো। ৮ দফা মানতে হবে, আমার নিজের অভিজ্ঞতা আছে; আমি তখন কলেজে পড়ি, তারপর আমি ইউনিভার্সিটিতে চলে গেলাম, সে সময় আমাদের নামিদামি নেতারা ছিলেন, কেউ কেউ বলতেন তুমি মা কিছু বোঝ না। আমি বলতাম কিছু বোঝার দরকার নেই, আব্বা বলেছেন ৬ দফা। ৬ দফাই দরকার এর বাইরে নয়। আমার মা’কে বোঝাতেন, আপনি ভাবী বুঝতে পারছেন না, তিনি বলতেন আমি তো ভাই বেশি লেখাপড়া জানি না, খালি এই টুকুই বুঝি ৬ দফাই হচ্ছে বাংলার মানুষের মুক্তির সনদ। এটা উনি বলে গেছেন, এটাই আমি মানি এর বাইরে আমি কিছু জানি না। এভাবে তারা বোঝাতে চেষ্টা করেছেন, আমাদের বাসায় ওয়ার্কিং কমিটির তিন দিনের মিটিং। রান্নাবান্না, তখন তো এত ডেকোরেশন ছিল না; অত টাকা-পয়সা পার্টির ছিল না। আমার মা নিজের হাতেই রান্না করে খাওয়াতেন, আমরা নিজেরাই চা বানানো, পান বানানো— এগুলো করতাম।

তখন আবার পরীক্ষার পড়াশোনা। পরীক্ষার পড়া পড়ব না বক্তৃতা শুনব। একটু পড়তে গিয়ে আবার দৌড়ে আসতাম কী হচ্ছে কী হচ্ছে, চিন্তা যে ৮ দফার দিকে নিয়ে যাবে কিনা, কিন্তু সেখানে দেখেছি আমার মায়ের সেই দৃঢ়তা, মিটিংয়ে রেজুলেশন হলো যে ৬ দফা ছাড়া হবে না। নেতারা বিরক্ত হলেন, রাগ করলেন। অনেক কিছু ঘটনা আমার দেখা আছে। আব্বার কাছে দেখা করতে যখন কারাগারে যেতেন, তখন সব বলতেন। আমার মায়ের স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ, আমরা মাঝে মাঝে বলতাম তুমি তো টেপরেকর্ডার। মা একবার যা শুনতেন তা ভুলতেন না। আমাদের কতগুলো কায়দা শিখিয়েছিলেন যে জেলখানায় গিয়ে কী করতে হবে। একটু হৈচৈ করা, ওই ফাঁকে বাইরের সব রিপোর্ট আব্বার কাছে দেওয়া এবং আব্বার নির্দেশটা নিয়ে আসা, তারপর সেটা ছাত্রদের জানানো। স্লোগান থেকে শুরু করে সবকিছুই বলতে গেলে কারাগার থেকেই নির্দেশ দিয়ে দিতেন, সেভাবেই কিন্তু মা ছাত্রলীগকে কাজে লাগাতেন। ’৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ওনাকে নিয়ে গেল ক্যান্টনমেন্টে। আমরা কোনো খবর পেলাম না, তখন মায়ের যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা যখন দেয় তখন কিন্তু আমার মা’কেও ইন্টারগেশন করেছে, যে কী জানে এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে। উনি খুব ভালোভাবে উত্তর দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা আমাদের দরকার, আমার মনে আছে, ভুট্টোকে যখন আইয়ুব খান তাড়িয়ে দিল মন্ত্রিত্ব থেকে।

ভুট্টো চলে এলে তখনকার দিনের ইস্ট পাকিস্তানে এসেই ছুটে গেল ৩২ নম্বর বাড়িতে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। আমাদের বসার ঘরটার নিচে যে ঘরটা আছে ওখানে আগের দিনে এ রকম হতো যে ড্রয়িং রুম, এরপর ডাইনিং রুম, মাঝখানে একটা কাপড়ের পর্দা। মা যখন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা আসতেন পর্দাটা টেনে ভিতরে বসে কথা বলতেন, বলতেন আমি পর্দা করি, আমাদের বলতেন ওদের সঙ্গে থাকব না, দেখা করব কেন। আমার আব্বা যে মিনিস্টার ছিলেন, এমপি ছিলেন এমএলএ ছিলেন, করাচিতে যেতেন আমার মা কিন্তু জীবনে একদিনও করাচিতে যাননি, কোনো দিন যেতেও চাননি। উনি জানতেন, উনিই বেশি আগে জানতেন যে, এদেশ স্বাধীন হবে। এই যে স্বাধীনতার চেতনায় নিজেকে উদ্বুদ্ধ করা, এটা মায়ের ভিতরে তীব্র ছিল। একটা বিশ্বাস ছিল। আগরতলা মামলার সময় আব্বার সঙ্গে প্রথম আমাদের দেখা জুলাই মাসে। যখন কেস শুরু হলো, জানুয়ারির পর জুলাই মাসে প্রথম দেখা হয়, তার আগ পর্যন্ত আমরা জানতেও পারিনি। ওই জায়গাটা আমরা মিউজিয়াম করে রেখেছি। ক্যান্টনমেন্টে যে মেসে আব্বাকে রেখেছিল এবং যেখানে মামলা হয়েছিল সেখানেও মিউজিয়াম করে রাখা হয়েছে। এরপরে আমাদের নেতারা আবারও উঠেপড়ে লাগলেন, আইয়ুব খান গোলটেবিল বৈঠক ডাকল, সেখানে যেতে হবে, না গেলে সর্বনাশ হবে। মা খবর পেলেন। আমাকে পাঠালেন, বললেন আমার সঙ্গে কথা না বলে কোনো সিদ্ধান্ত যেন উনি না দেন। আমাদের বড় বড় নেতারা সবাই ছিলেন, তারা নিয়ে যাবেন, আমার আব্বা জানতেন, আমার উপস্থিতি দেখেই বুঝে যেতেন যে মা কিছু বলে পাঠিয়েছেন। মা খালি বলে দিয়েছিলেন আব্বা কখনো প্যারোলে যাবে না যদি মুক্তি দেন তখন যাবে। সে বার্তাটাই আমি পৌঁছে দিয়ে এসেছিলাম, আর তার জন্য আমাদের নেতারা বাসায় এসে বকাঝকা। তুমি কেমন মেয়ে, তুমি চাওনা তোমার বাবা বের হোক জেল থেকে, মাকে বলতেন আপনি তো বিধবা হবেন।

মা শুধু বলেছিলেন, আমি তো একা না, এখানে তো ৩৪ জন আসামি, তারা যে বিধবা হবে এটা আপনারা চিন্তা করেন না? আমার একার কথা চিন্তা করলে চলবে? আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ৩৫ জনের মধ্যে ৩৪ জনই তো বিবাহিত। মামলা না তুললে উনি যাবেন না। তার যে দূরদর্শিতা রাজনীতিতে সেটাই কিন্তু আমাদের স্বাধীনতার পথ খুলে দিয়েছে। কারণ সেদিন যদি প্যারোলে যেতেন তাহলে কোনো দিনই আর বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না, এটা হলো বাস্তবতা। এরপর অসহযোগ আন্দোলনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আমি দেখেছি মায়ের দৃঢ় ভূমিকা। ৭ মার্চের ভাষণের কথা বারবারই আমি বলি, বড় বড় বুদ্ধিজীবীরা লিখে দিয়েছেন এটা বলতে হবে, ওটা বলতে হবে, কেউ কেউ বলছেন এটাই বলতে হবে, না বললে সর্বনাশ হয়ে যাবে, এ রকম বস্তাকে বস্তা কাগজ আর পরামর্শ। গুরুত্বপূর্ণ কিছুতে যেতে হলে আমার মা কিন্তু আব্বাকে বলতেন কিছুক্ষণ তুমি নিজের ঘরে থাক, তাকে ঘরে নিয়ে তিনি একটা কথা বললেন যে, তোমার মনে যে কথা আসবে তুমি সে কথা বলবা। কারণ লাখো মানুষ সারা বাংলাদেশ থেকে ছুটে এসেছে, হাতে বাঁশের লাঠি, নৌকার বৈঠা নিয়ে।

আর এদিকে পাকিস্তানি শাসকরাও অস্ত্র-টস্ত্র নিয়ে বসে আছে এই বলে যে, বঙ্গবন্ধু কি নির্দেশ দেন। তারপর মানুষগুলোকে আর ঘরে ফিরতে দেবে না। নিঃশেষ করে দেবে। স্বাধীনতার স্বাদ বুঝিয়ে দেবে, এটাই ছিল পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত। আর সেখানে আমাদের কোনো কোনো নেতা বলে দিলেন যে, এখানেই বলে দিতে হবে যে, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। কেউ বলে, এটা বলতে হবে, ওটা বলতে হবে। মা বাবাকে বললেন যে, সারা জীবন তুমি সংগ্রাম করেছ, তুমি জেল-জুলুম খেটেছ। দেশের মানুষকে নিয়ে যে স্বপ্ন কীভাবে স্বাধীনতা এনে দেবেন সে কথাই তিনি ওই ভাষণে বলে এলেন। যে ভাষণ আজকে সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণ। আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে যত ভাষণ আছে, যে ভাষণ মানুষকে উজ্জীবিত করেছে সে ভাষণের শ্রেষ্ঠ একশটি ভাষণের মধ্যে এ ভাষণ স্থান পেয়েছে।  যে ভাষণ এদেশের মানুষকে প্রেরণা দিয়েছিল এবং এরপর ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যখন তিনি এলেন ফোনে বলেছিলেন খসড়াটা ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে চলে যাবে, ব্যবস্থাটা সবই করা ছিল, সবই উনি করে গিয়েছিলেন। জানতেন যে, যে কোনো সময় তাকে গ্রেফতার বা হত্যা করতে পারে। মা সব সময় জড়িত আমার বাবার সঙ্গে, কোনো দিন ভয়ভীতি দেখিনি।

যে মুহূর্তে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন তারপরই সেনাবাহিনী এসে বাড়ি আক্রমণ করল, ওনাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল, পরের দিন এসে আবার বাড়ি আক্রমণ করল, আমার মা পাশের বাসায় আশ্রয় নিলেন। তারপর এ বাসা ও বাসা করে মগবাজারের একটা বাসা থেকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাওয়া হলো। ১৮ নম্বর রোডের একতলা বাসায় রাখা হলো। খোলা বাড়ি। কিছু নাই, পর্দা নাই। রোদের মধ্যে আমাদের পড়ে থাকতে হয়েছে, দিনের পর দিন। মা’কে কিন্তু কখনো ভেঙে পড়তে দেখিনি। সব সময় একটা আত্মবিশ্বাস ছিল, সাহস ছিল সে সাহসটাই দেখেছি। এরপর যেদিন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর সারেন্ডার করে, আমরা কিন্তু সেদিন মুক্তি পাইনি, আমরা পেয়েছি এক দিন পরে ১৭ ডিসেম্বর। এখানে একটা ছবি দেখিয়েছে, মা দাঁড়িয়ে আছে মাঠের ওপর। মানুষের সঙ্গে হাত দেখাচ্ছে, ওটা কিন্তু বাংকার। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ বাড়িতে মাটির নিচে বাংকার করেছিল, কাজেই ওই বাংকারের ওপর দাঁড়িয়ে যখন ইন্ডিয়ান আর্মি এসে পাকিস্তান আর্মিকে স্যারেন্ডার করে নিয়ে গেল হাজার হাজার মানুষ ওখানে চলে এলো, মা হাত নেড়ে দেখাচ্ছেন। স্যারেন্ডার করার সময় গেটে যে সেন্ট্রি ছিল, আমরা ভিতরে বন্দী, আমরা তো বের হতে পারছি না, জানালা দিয়ে মা হুকুম দিচ্ছে। ওই সিপাহিটার নামও জানতেন, বলছেন যে হাতিয়ার ডালদো। ওই যে হাতিয়ার ডালদো প্রচার তখন তিনি জানতেন, বেচারা ভ্যাবাচেকা খেয়ে জি মা জি বলে অস্ত্রটা নিয়ে ব্যাংকারে চলে গেল। কাজেই ওনার যে সাহসটা তা ওই সময়েও ছিল। ওই দিন রাতেও আমাদের মেরে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, যেভাবে হোক আমরা বেঁচে গেছি। আমার মা’র যে তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত আমরা দেখেছি, স্বাধীনতার পর তিনি কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বৌ হিসেবে বিলাসী জীবনযাপনে ফিরে যাননি, ওই ধানমন্ডির বাড়িতে থেকেছেন, বলেছেন না আমার ছেলেমেয়ে বেশি বিলাসিতায় থাকলে ওদের নজর খারাপ হয়ে যাবে, অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে। উনার জীবনে যেভাবে চলার ঠিক সেভাবেই উনি চলেছেন, কিন্তু স্বাধীনতার পর যেসব মেয়ে নির্যাতিত ছিল, নির্যাতিত মেয়েদের সাহায্য করা, তাদেরকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়া। বোর্ডের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসনের যখন ব্যবস্থা হয় ওই মেয়েদের যখন বিয়ে দিতো, মা নিজেও তখন উপস্থিত থেকেছেন। নিজের হাতের নিজের গহনা, আমি আমারও গহনা অনেক দিয়ে দিয়েছিলাম, বলতাম, তুমি যাকে যা দরকার তা দিবা।

তিনি প্রচারবিমুখ ছিলেন, আমাকে একদিন বললেন, মাত্র ১৪ বছরের বাচ্চা মেয়ে তাকে যেভাবে অত্যাচার করেছে, তা দেখে তার খুব মন খারাপ হয়েছে। এভাবে নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানো, যে এসে যা চেয়েছে হাত খুলে তা দিয়ে দিয়েছে; দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল না। দেশের কথাই সব সময় চিন্তা করেছেন। আমি অনেক স্মৃতির কথা বললাম এ কারণে যে আমি মারা গেলে অনেকেই হয়তো অনেক কিছু জানবে না। কাজেই এই জিনিসগুলো জানাও মানুষের দরকার। একজন যখন একটা কাজ করে তার পেছনে যে প্রেরণা শক্তি সাহস লাগে, মা সব সময় সে প্রেরণা দিয়েছেন, কখনো পিছে টেনে ধরেননি। যে আমার কী হবে, কী পাব, নিজের জীবনে তিনি কিছুই চাননি, আমি বলতে পারব না যে, কোনো দিন তিনি কিছু চেয়েছেন। কিন্তু দেশটা স্বাধীন করা, দেশের মানুষের কল্যাণ কীভাবে হবে সে চিন্তাই তিনি সব সময় করেছেন। স্বাধীনতার পর অনেক সময় আব্বার সঙ্গে আলোচনা করেছেন, তখন একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ কী ভয়াবহ পরিস্থিতি, তখন সেই অবস্থায়ও তিনি খোঁজখবর রাখতেন। তথ্যগুলো আব্বাকে জানাতেন।

জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাশে ছিলেন, যখন ঘাতকরা আমার বাবাকে হত্যা করল তিনি তো বাঁচার আকুতি করেননি। তিনি বলেছেন, ওনাকে যখন মেরে ফেলেছ আমাকেও মেরে ফেল, এভাবে নিজের জীবনটা উনি দিয়ে গেছেন। সবাইকে নিয়ে চলে গেলেন, আমরা দুই বোন থেকে গেলাম, বিদেশে চলে গিয়েছিলাম মাত্র ১৫ দিন আগে। মাঝে মাঝে মনে হয় এভাবে বেঁচে থাকা যে কী কষ্টের, যারা আপনজন হারায় শুধু তারাই বুঝে। আমি সবার কাছে দোয়া চাই। আমার মায়ের যে অবদান রয়েছে দেশের স্বাধীনতার জন্য এবং দেশকে যে গভীরভাবে ভালোবাসতেন এদেশের মানুষ আব্বার সঙ্গে একই স্বপ্নই দেখতেন যে, এ দেশের মানুষ সুন্দর জীবন পাবে, ভালোভাবে বাঁচবে। গরিব থাকবে না। আব্বা যে এটা করতে পারবেন এ বিশ্বাসটা সব সময় তার মাঝে ছিল। কিন্তু ঘাতকের দল তো তা দিল না। কাজেই সে অসমাপ্ত কাজটুকু আমাকে করতে হবে, আমি সেটাই বিশ্বাস করি। এর বাইরে আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। তবে আমার মায়ের সারা জীবন দুঃখের জীবন, আর সেই সঙ্গে মহান আত্মত্যাগ তিনি করে গেছেন। আমি তার জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।  ১৫ আগস্ট যারা শাহাদাতবরণ করেছেন সবার জন্য দোয়া চাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন তাকে বেহেস্ত নসিব করেন।

লেখক : প্রধানমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার