Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

জন্মদিন স্মৃতিতে ভাস্বর কামাল ভাই

শনিবার, ০৫ আগস্ট ২০১৭

কামাল ভাই। আমাদের কামাল ভাই। সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রাণবন্ত কামাল ভাই। একদিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, আবার অন্যদিকে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে ভরপুর কামাল ভাই। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, ইতিহাসের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ত যে দেহে প্রবাহিত, সেই দেহ-প্রাণও যে হিমালয়সদৃশ ও প্রাণবন্ত হবে, তা কামাল ভাইকে দেখে, তার সঙ্গে মিশে উপলব্ধি করেছি সব সময়। আজ তার জন্মদিনে অতীত রোমান্থনে কিছু টুকরো স্মৃতি ভেসে উঠছে মানসপটে। ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে সেগুলো লিখব তরুণ প্রজন্মের জন্য, এই ভেবে কলম ধরতে গিয়ে দেখছি কলম চলছে না, হাত যেন অবশ হয়ে আসছে। অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে খাতার ওপর। এই অশ্রুই বলে দিচ্ছে হৃদয়ের কোন মণিকোঠায় তিনি আছেন, তাকে কতটা ভালোবাসতাম, কতটা শ্রদ্ধা করতাম। মূলত তিনি ছিলেন আমাদের সিনিয়র বড় ভাই, বন্ধু, আবার পথপ্রদর্শক অভিভাবকও।
বাহাত্তর সালে কামাল ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। আমি তখন ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। রাজেন্দ্র কলেজের মাঠে ছাত্রলীগের একটি স্কুল শাখার সম্মেলনে তাকে আমরা অতিথি করে নিয়ে আসি। তাকে ঢাকা থেকে নিয়ে আসার পথে সেদিনই বুঝেছিলাম তিনি কত মহৎপ্রাণ। তাকে নিয়ে আমরা আরিচা ঘাটে যখন পৌঁছাই, তখন ঘাটে কোনো ফেরি ছিল না। বাধ্য হয়ে আমাদের এক বন্ধু, তৎকালীন ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার রুমী বঙ্গবন্ধু তনয় শেখ কামালের কথা বলে একটি বিশেষ ফেরির ব্যবস্থা করেন। শেখ কামাল আমাদের ডেকে বলেছিলেন, ‘তোরা কি আমার বাবা ও আমার নাম ভাঙিয়েছিস?’ আমরা মাথা নেড়ে সময় স্বল্পতার দোহাই দিয়েছিলাম। তিনি আমাদের ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘কখনও নাম ভাঙিয়ে বিশেষ সুবিধা নেয়া ঠিক নয়। দেশের সব মানুষেরই সমান সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার আছে। তোরা এই কথাটি কখনও ভুলে যাসনে।’ সেদিনের সেই কথাটি আজও আমার হৃদয়ে সুর হয়ে বাজে। সেদিনের সেই কথা, সেই সুরই জানিয়ে দেয় বঙ্গবন্ধুর সন্তান তারই আদর্শকে কীভাবে বুকে ধারণ করেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। তিনি আমাকে সব সময় সাহস জুগিয়েছেন। আমি সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। কামাল ভাইও এই বিভাগের ছাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন আমার এক বছরের সিনিয়র। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। প্রথম পাঁচজনের একজন ছিলেন তিনি। সমাজবিজ্ঞান বিভাগে আমরা নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতাম। আর সেসব অনুষ্ঠানের মূল নেতৃত্বে থাকতেন তিনি। তার নেতৃত্বেই আমরা সব অনুষ্ঠান অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারতাম। তিনি আমাদের কাজগুলো কেবল তদারকিই করতেন না, অনেক সময় নিজেও কাজে যুক্ত হতেন। তিনি খুব ভালো গিটার বাজাতে পারতেন। তার বাজনা শুনে আমরা মুগ্ধ হতাম। কাজের গতি বেড়ে যেত, ক্লান্তি দূর হয়ে যেত। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তার প্রবল আগ্রহ থাকলেও তিনি কখনও তারুণ্যের উচ্ছলতায় নিষিদ্ধ জগতে পা বাড়াননি, যদিও সেই বয়সে সেটা অস্বাভাবিক ছিল না। সামাজিক মূল্যবোধ ও চেতনা তার অন্তরে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল।
কামাল ভাই ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক। ছাত্রলীগকে তিনি সংগঠিত করেছিলেন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সব সময় নানা দিকনির্দেশনা দিতেন। আবাহনী ক্রীড়াচক্র তারই হাতে গড়া সংগঠন। তিনি ভালো ফুটবল, ক্রিকেট খেলতেন। স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী, নাট্যচক্র তারই হাতে গড়া সংগঠন। চুয়াত্তর সালে উদ্যাপিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সপ্তাহে একক অভিনয়, গান, খেলাধুলাসহ অনেকগুলো ইভেন্টে কামাল ভাই বিজয়ী হয়েছিলেন। সর্বত্রই যেন ছিল তার বিচরণ। তার সেই বিচরণের সঙ্গী হয়েছিলাম আমরা কয়েকজনও। কামাল ভাই আমার সিনিয়র হলেও মিশতেন ঠিক অতি আপনজনের মতো। সুুখে-দুঃখে আপন ভাইয়ের মতো কাঁধে হাত রেখে ভরসা দিতেন, স্বপ্ন দেখাতেন। আমিও বুনে যেতাম সেই স্বপ্নের জাল। ছোট-বড় সবার সঙ্গে ছিল তার বন্ধুত্ব। চাল-চলন ছিল একেবারে সাদাসিধা। তাকে দেখে কখনও মনে হতো না, তিনি প্রধানমন্ত্রীর ছেলে। এমনকি অনেক সময় তার পকেটে কোনো টাকাও থাকত না। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কেউ যখনই কোনো বিপদে পড়ত, কামাল ভাইয়ের কাছে ছুটে আসত। তিনি কখনই কাউকে নিরাশ করতেন না। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সবার কথা শুনতেন। সর্বোচ্চ সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। তিনি অন্যায় একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র একটি দোকান থেকে দিনের পর দিন বাকি খেলেও টাকা পরিশোধ করত না। কামাল ভাই সে কথা জানতে পেরে ওই ছাত্রমস্তানটিকে ডেকে এনে আমাদের সামনে এমন ধমক দিয়েছিলেন, ওই মস্তান সেদিনই সব বাকি পরিশোধ করে দিয়েছিল। কামাল ভাইয়ের এমন চারিত্রিক সদগুণ আমাকে ভীষণ নাড়া দিত। আমি অভিভূত হতাম। নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবতাম, এমন একজন মানুষের ছায়াতলে থাকার সুযোগ পাওয়ায়।
আমরা ছাত্রলীগের পনেরো সদস্যের একটি দল বিশ্ব যুব সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য বার্লিনে গিয়েছিলাম। সেই দলের নেতা ছিলেন কামাল ভাই। সেই উৎসবের মূল থিম ছিল ‘সামাজ্যবাদবিরোধী সংহতি, শান্তি ও বন্ধুত্ব’। পুরো বিমান ভ্রমণে কামাল ভাই জারিগান গেয়ে আমাদের মাতিয়ে রেখেছিলেন। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি আমাদের ছুতেই পারেনি। বার্লিন শহরের একদিনের কথা বলতে গেলে এখনও আমার চোখে জল চলে আসে। একদিন একটি শপিং সেন্টারে আমরা ঢুকেছিলাম। একটি সুন্দর প্যান্ট পিসের দিকে আমার চোখ পড়েছিল। আমি সেটি নিয়ে অনেকক্ষণ নাড়াচাড়া করলাম। কিন্তু তা কেনার মতো অর্থ ছিল না। আফসোস নিয়ে সেটা রেখে দিলাম। আমাদেরই এক বড় ভাই সেই প্যান্ট পিস আমার হাত থেকে টেনে নিয়ে সেটা কিনে নিয়েছিলেন। পুরো ব্যাপারটিই যে কামাল ভাই লক্ষ্য করছিলেন, তা জানতাম না। পরদিন সকালে আমাকে তিনি বললেন, ‘তুই প্যান্ট পিসটি কিনলি না কেন?’ আমি চুপচাপ ছিলাম। তিনি সবকিছু বুঝতে পারলেন এবং পকেটে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে ওইরকম একটি প্যান্ট পিস কিনতে বললেন। আজ এত বছর পরও এ দৃশ্য এখনও আমার চোখে ভাসে। একজন কর্মীর প্রতি তার হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা ভালোবাসার সেই নমুনার কথা ভাবলেই এখনও অশ্রু সংবরণ করতে পারি না।
কামাল ভাই ছিলেন মাটির মানুষ। তার কাছে সাহায্য চেয়ে কেউ কোনোদিন নিরাশ হননি। অথচ মানবিক সব গুণাবলিসম্পন্ন সেই কামাল ভাইয়ের বিরুদ্ধেই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ফেঁদেছিল একের পর এক সাজানো মিথ্যে বানোয়াট গল্প। তিনি নাকি বাংলাদেশ ব্যাংক লুট করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন। আসলে প্রকৃত ঘটনা ছিল ভিন্ন। ১৯৭৪ সালের ৩ জুন ছিল সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির হরতাল। এর আগের রাতে কামাল ভাই আবাহনী ক্রীড়া চক্রের মাঠে আড্ডা দিচ্ছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে। হঠাৎ ফকিরেরপুলের দু’জন খেলোয়াড়ের মাধ্যমে তিনি জানতে পারলেন, সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির ক্যাডাররা মতিঝিলের ব্যাংক লুট করবে। সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার পুলিশ সুপার বীর বিক্রম মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলমকে খবর দেন তিনি। এরপর দুষ্কৃতকারীদের ধরার জন্য নিজেই সঙ্গে থাকা বন্ধুদের নিয়ে মাইক্রোবাসে মতিঝিল এলাকায় ছুটে যান। ওদিকে তার মাধ্যমে খবর পেয়েই ঢাকার পুলিশ সুপার বীর বিক্রম মাহবুবের পুলিশ বাহিনী জিপ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। দুর্ভাগ্যক্রমে মতিঝিলের কাছাকাছি শেখ কামালের মাইক্রোবাস এবং পুলিশের জিপ মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে। অন্ধকারে কেউ কাউকে চিনতে না পারায় এবং পুলিশের জিপ থেকে কোনো সতর্ক সংকেত না দিয়েই অতর্কিতে গুলি চালানোয় মাইক্রোর প্রায় সবাই আহত হন। পায়ে গুলি লেগে গুরুতর আহত হন কামাল। ভুল বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কামাল ভাইকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে এবং পরে পিজি হাসপাতালে নিয়ে যায়। এ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পরের দিন দৈনিক মর্নিং নিউজে প্রকাশিত হয়েছিল।
কামাল ভাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল উনিশ’শ পঁচাত্তর সালের চৌদ্দই আগস্ট রাতে। কামাল ভাই কলা ভবনে আমাদের কাছে এসেছিলেন। জাতির পিতা আসবেন বলে আমরা এক মাস ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তিনি আমাদের অনুপ্রাণিত করতে জারিগান গাইলেন, অনেক হাস্যকৌতুক করলেন। রাত সাড়ে এগারোটার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির এক নিরাপত্তাকর্মী এসে জানাল, বঙ্গবন্ধু ডেকেছেন। তিনি আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে বললেন এবং ভোর পৌনে পাঁচটার মধ্যে আসবেন বলে কথা দিয়ে চলে গেলেন। পরে শুনেছি, তিনি আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রথমে বকশীবাজারে শ্বশুরবাড়িতে যান এবং সেখান থেকে সুলতানা কামালকে নিয়ে ধানমণ্ডির উদ্দেশে রওনা হন। আর এরপরই আসে পনেরো আগস্টের ভয়াল রাত। ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বরের সেই বাড়ির তিনিই ছিলেন প্রথম শহীদ। তিনি বলেছিলেন, ভোর পৌনে পাঁচটার মধ্যে ফিরে আসবেন, অথচ নিয়তির কী নির্র্মম পরিহাস- তিনি আমাদের মাঝে আর ফিরে আসতে পারেননি; নরাধমরা তাকে আসতে দেয়নি। আমাদের মাঝ তিনি থেকে হারিয়ে গেলেন। সত্যিই কি হারিয়ে গেলেন? না, কামাল ভাই হারিয়ে যেতে পারেন না। তিনি আছেন আমাদের অস্তিত্বের ভেতর। সদা জাগ্রত বিবেক হয়ে এখনও আমাদের স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছেন আমাদের আদর্শিক নেতা, আমাদের পথনির্দেশক শ্রদ্ধাভাজন কামাল ভাই।
বাহালুল মজনুন চুন্নূ : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ


বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

শনিবার, ০৫ আগস্ট ২০১৭

বাংলাদেশের কথা বলতে গিয়ে অনিবার্যভাবে এসে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। জনগণের স্বার্থের সঙ্গে, দেশের স্বার্থের সঙ্গে নিজের স্বার্থকে তিনি একাত্ম করতে পেরেছিলেন অবলীলায়া।

আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয়, দেশের স্বার্থের কাছে, জনগণের স্বার্থের কাছে তিনি নিজের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন।

এ কারণেই বোধ করি কবি-মনীষী অন্নদাশঙ্কর রায় বাংলাদেশের আর এক নাম রেখেছেন mujibland. এক অর্থে বঙ্গবন্ধুই একটা পর্বের, বাংলাদেশের ইতিহাস। তার জীবন ও কর্মের ক্রমিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি বিশেষ সময়খণ্ডের কথা আমরা জানতে পারি।

শোষক ও শোষিতের সংগ্রামে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে বঙ্গবন্ধু পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির শৃঙ্খল থেক তিনি বাঙালি জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করতে চেয়েছেন, চেয়েছেন দেশকে স্বাধীন করতে।

এ মুক্তির সংগ্রামে তিনি নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভেবে জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, কিশোর বয়স থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছেন প্রতিবাদ, সর্বদা বলেছেন সত্য ও ন্যায়ের কথা এবং হয়ে উঠেছেন স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক। সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে তিনি কখনও দূরে সরে যাননি, ভীতি ও অত্যাচারের মুখেও সর্বদা তিনি সত্য ও ন্যায়ের কথা বলেছেন, শোষিত মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন।

শোষিত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর এ নির্ভীক অবস্থানের কারণে তিনি কেবল বাংলাদেশেই নয়, শোষিত-নির্যাতিত বিশ্বমানব সমাজেও অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।

প্রসঙ্গত স্মরণ করতে পারি, ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত আলজিয়ার্সের জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণের কথা, যেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন- ‘বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত- শোষক ও শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন- এসব স্থানে শোষিত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়, বিশ্বের শোষিত-নির্যাতিত মানুষ বঙ্গবন্ধুকে গ্রহণ করে নেয় নিজেদের নেতা হিসেবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন গণতন্ত্রের অতন্দ্র সৈনিক। তার কর্ম ও সাধনা, চিন্তা ও ধ্যানে সর্বদা ক্রিয়াশীল থেকে বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ। কৈশোর থেকেই তিনি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে ছিলেন সোচ্চার।

বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আটান্নর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা-আন্দোলন, ছিষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের মহান গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ- প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি পালন করেন নেতৃত্বের ভূমিকা।

বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান শক্তি-উৎস ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে তিনি ছিলেন সর্বদা বজ কণ্ঠ। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের তার ভাষণ ছিল গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে স্বাধিকারের পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে এক ঐতিহাসিক দলিল। একটি ভাষণ একটি জাতিকে জাগ্রত করেছে, সবাইকে মিলিয়েছে একবিন্দুতে- এমন ঘটনা বিশ্ব ইতিহাস বিরল।

বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর নাম চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এ কথাই যেন ব্যক্ত হয়েছে অন্নদাশঙ্কর রায়ের এই শব্দগুচ্ছে- ‘যতদিন রবে পদ্মা-যমুনা গৌরী-মেঘনা বহমান/তত দিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’

বাংলাদেশের মাটিতে বিদেশি কোনো শক্তির শাসন তিনি মেনে নেননি। এজন্য তাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, কারাগারে কাটাতে হয়েছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। দেশের প্রতি, দেশের মাটির প্রতি তার ভালোবাসা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে তিনি স্বাধীনতার যে ঘোষণা দেন, সেখানেও দেশের মাটির কথা তিনি চরম বিপদের মুখেও উচ্চারণ করেন নির্ভীকচিত্তে।

দেশকে ভালোবাসতেন বলে বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছেন মিলিত বাঙালির। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছিল তার মজ্জাগত, মানবিক চেতনায় তিনি সর্বদা ছিলেন উচ্চকিত। তিনি ছিলেন বাঙালির ঐতিহ্যিক সংস্কৃতির ধারক।

মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে তার কাছে সর্বদা প্রাধান্য পেয়েছে মানবপরিচয়। এ কারণে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে তিনি ঐতিহ্যিক সংস্কৃতির ধারক বাঙালির জন্য অসম্মানের বলে মনে করতেন।

বাংলাদেশ ও বাঙালি সত্তাকে তিনি কী বিপুলভাবে ভালোবাসতেন, তা বোঝা যায় ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে তিনি যে ভাষণ দেন, তা থেকে। ওই ভাষণে তিনি বলেছিলেন- পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের মুখের ওপর তিনি বলেছেন : ‘আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবরও খোঁড়া হয়েছিল।... আমি ঠিক করেছিলাম, আমি তাদের কাছে নতি স্বীকার করব না। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা, জয় বাংলা।’

এ বক্তব্য থেকেই অনুধাবন করা যায়, দেশের জন্য, বাঙালির জন্য, বাংলা ভাষার জন্য বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম ভালোবাসা। ১০ জানুয়ারির ভাষণে কেবল দেশপ্রেম নয়, বঙ্গবন্ধুর উদার মানবতাবোধ এবং সদর্থক বিবেচনারও পরিচয় ব্যক্ত হয়েছিল। সেদিনের ভাষণে সুস্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছিল এই উদার মানবচেতনা, এই মহৎ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা-

আমার পশ্চিম পাকিস্তানের ভায়েরা, আপনাদের প্রতি আমার কোনো বিদ্বেষ নেই। আমি চাই আপনারা সুখে থাকুন। আপনাদের সেনাবাহিনী আমাদের অসংখ্য লোককে হত্যা করেছে, আমাদের অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করেছে, আমাদের গ্রামগুলো বিধ্বস্ত করেছে, তবুও আপনাদের প্রতি আমার কোনো আক্রোশ নেই। আপনারা স্বাধীন থাকুন, আমরাও স্বাধীন থাকি। বিশ্বের অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের যে ধরনের বন্ধুত্ব হতে পারে আপনাদের সঙ্গেও শুধু সেই বন্ধুত্বই হতে পারে। কিন্তু যারা অন্যায়ভাবে আমাদের মানুষদের মেরেছে, তাদের অবশ্যই বিচার হবে।

-শেষের বাক্যটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু সচেতনভাবে এখানে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলেছেন। যুদ্ধাপরাধের এই বিচার প্রক্রিয়ার ঐতিহাসিক এক ডিসকোর্সের সামনে আজ বাংলাদেশ। এ প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর সেদিনের বক্তব্য আরও তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে।

হেমিলনের বংশীবাদকের মতো বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতিকে একসূত্রে গ্রথিত করেছেন। তিনি হলেন রাজনীতির কবি- Poet of politics। রাজনীতিকে তিনি সৃষ্টিশীল চেতনা দিয়ে নিজের হাতে আকার দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু আজীবন স্বপ্ন দেখেছেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের। বঙ্গবন্ধুর সে স্বপ্ন এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

তাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে হলে, শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হলে, প্রকৃত দেশপ্রেম নিয়ে সচেতনতার সঙ্গে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। সেটিই হবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের শ্রেষ্ঠ উপায়। শ্রুতিলিখন- এমরান হোসেন


আমেরিকার মহামানবের সাগরতীরে বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস = সোনা কান্তি বড়ুয়া

শুক্রবার, ০৪ আগস্ট ২০১৭

নির্ভেজাল সত্যবচন।  ‘বৌদ্ধ সংস্কৃতি’ নামের জোড়কলম শব্দটা বাংলাদেশে বসে যে ভাবে চোখের সামনে ভাসে, সেই অক্ষদ্রাঘিমা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বসে তার আদলটা বোঝা অত সহজ কর্ম নয়। কিন্তু মনে হচ্ছে দিন কয়েকের জন্যে খাস আমেরিকাতেই যেন বাংলাদেশের বৌদ্ধগণ একটি ধর্ম দ্বীপে উঠে এসেছেন, সকাল বিকাল বুদ্ধ ধর্ম সংঙ্ঘ বন্দনায়।   চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করছি, বাংলাদেশ থেকে বহুদূরে থাকা প্রবাসী বৌদ্ধগণ আপ্রাণে তাঁদের শিকড়ের বৌদ্ধ সংস্কৃতি টা ছুঁয়ে থাকার চেষ্ঠা করে চলেছেন।  বোষ্টন, আমেরিকা। মানবতার জয়গানে বিগত ১৯ এবং ২০ জুলাই ২০১৩ বোষ্টন বাংলাদেশ বুড্ডিষ্ট এসোসিয়াশনের উদ্যোগে স্থানীয় সুমনোরম ম্যাকলিন মিডল স্কুল হলে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশী বৌদ্ধদের সহযোগীতায় উত্তর আমেরিকা বৌদ্ধ সৌভ্রাতৃত্ব সন্মেলন ২০১৩ মহাসমারোহে সমাপ্ত হয়েছে। বহু দূর প্রবাসে বৌদ্ধ সংস্কৃতির শিকড় ছুঁয়ে থাকার থাকার প্রয়াসে বৌদ্ধ জাতির এই মহান সন্মেলনে আমেরিকা এবং কানাডার বিভিন্ন শহর থেকে বিপুল বৌদ্ধ জনতার সমাগমে আকাশ বাতাসের কোলাহল বিদীর্ণ করে “বুদ্ধং সরনং গচ্ছামি” ধ্বনিত হয়।  সবাই মুখে ্একই কথা, কথাটা আসলে ওটাই! ঘরের বাইরে ঘর। সীমানা ছাড়ানো ঘর। এই গন্ডি ভাঙার ছবিটা বারবারই এই সম্মেলন ২০১৩ উপলক্ষে স্পষ্ঠ হয়ে উঠছে। সম্প্রতি ৭ জুলাই ২০১৩ সালে বুদ্ধগয়ায় বোমা বিস্ফোরণে উক্ত বৌদ্ধসম্মেলন “মহাবোধি মন্দিরে সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনাকে তীব্র ধিক্কার জানিয়েছেন।”
প্রসঙ্গত: ডিসকভারি অব বৌদ্ধধর্ম in  Grand Canyon of Arizona.  আমেরিকায় before European civilization Chinese বৌদ্ধ প্রসঙ্গ “In the vast Grand Canyon of Arizona, USA, there is an Egyptian-style tomb full of Buddhist art showing that Asians migrated to America and brought the Dharma and advanced technology to Native Americans in the distant past. It is similar to the Valley of Kings in Luxor, Egypt. While this will be too fantastic for most readers to believe, the trail of evidence begins with an article published on the front page of the Arizona Gazette on April 5, 1909. It claims that just such a rock-cut cavern temple full of Buddhist, Vedic, and Egyptian art and architecture, hieroglyphs, and mummies -- an almost incomprehensible wealth of archaeological treasures -- was discovered (Jamyang 190/blog, Better than feathers).”     Buddhist cave temples found in Grand Canyon dated March 27, 2014 (Wisdom Quarterly in U.S.A).      Dhr. Seven and Ashley Wells (eds.), Wisdom Quarterly, Jack Andrews, "Was the carved 'installation' in the Grand Canyon an ancient Buddhist temple?" (Lost Civilizations / in Spanish)
 
The Arizona Gazette headlines of April 5, 1909 document the reality of these unbelievably astounding finds, some of the greatest US archeological discoveries ever. Why were they covered up?
এই প্রসঙ্গে ইহা ও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে  ১৯৬৪ সালে আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় অনেক আমেরিকান সৈন্য উক্ত যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে মুক্তি পেতে থাইল্যান্ডে এসে বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়েছেন। অবশেষে আমেরিকা ভিয়েনামের কাছে পরাজিত হলেন এবং ১৯৭৯ সালে হাজার হাজার ভিয়েতনামী, লাওস এবং কম্বোডিয়ার বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং জনতা শরণার্থী হয়ে আমেরিকা ও কানাডায় জীবন যাপন করতে আসেন। বর্তমানে উত্তর আমেরিকায় থেরবাদ, মহাযান, বজ্রযান এবং তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম বিরাজমান।

বোষ্টনের পর নিউইয়র্কে পা ফেলার পর থেকে ঝলক দর্শনে দেখা গেল, তা থেকেই মনে হয়েছে, এ বারের সম্মেলনে একাধিক স্থানীয় আমেরিকা এবং কানাডার প্রবাসী বাংলাদেশী বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানের প্রযোজনা আন্তরিক সাড়া জাগিয়েছে।  In 1978  আমেরিকার বিদর্শন সোসাইটি আমাদের চট্টগ্রামের বিদর্শন শিক্ষক মুনিন্দ্র বড়ুয়া এবং বিদর্শন সাধিকা দীপা মা (ননী বালা বড়ুয়া) কে কোলকাতা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় নিমন্ত্রন করেছিলেন। আমেরিকায় বৌদ্ধধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে উভয়ের নাম সশ্রদ্ধায় লিপিবদ্ধ থাকবে।  নিউইয়র্কে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ শান্তি প্রতিষ্ঠানের সম্মেলন এবং উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশী বৌদ্ধ সম্মেলনদ্বয়ের শুভ উদ্বোধন হ’ল ২০১৫ সালের ৮ ও ৯ আগষ্ঠ।
 
১৮৭৯ সালে লন্ডন টাইম পত্রিকার সম্পাদক বিখ্যাত ’লাইট অব এশিয়া ’ শীর্ষক গৌতমবুদ্ধের জীবনী ইংরেজি ভাষায় কবিতা রচনা করে জগৎ জুড়ে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। বিভিন্নদেশের বৌদ্ধ বিহারে ইসলামি জঙ্গীদের তান্ডব দাহন হলে ও ইউরোপ এবং আমেরিকায় বাংলাদেশের প্রাচীন পালরাজত্ব ও বঙ্গরতœ অতীশ দীপঙ্কেরের বৌদ্ধধমের্র বিপুল বিজয়। বৌদ্ধধর্ম প্রচার ও প্রসারের জন্যে ১৮৯৪ সালে আমেরিকান বৌদ্ধ লেখক পল সারাস ’দি গসপেল অব বুড্ডিজম’ রচনা করেছিলেন । অনাগরিক ধর্মপাল সহ চীন, শ্রীলঙ্কা এবং জাপানী বৌদ্ধদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আমেরিকা এবং কানাডায় অনেক মন্দির স্থাপিত হয়েছিল।
জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানব সভ্যতায় বৌদ্ধধর্মের ধ্যান পদ্ধতির দুর্লভ অবদান নিয়ে টাইম ম্যাগাজিন চলমান আমেরিকান সমাজে বৌদ্ধদর্শনের মূল্যায়ণ করেছেন।   ১৮৭৫ সালে আমেরিকার বৌদ্ধ আন্দোলনের অগ্রদূত মহাত্মা কর্নেল হেনরি ষ্টিল অলকট থিউসোফিক্যাল সোসাইটির মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় (সিংহল) গিয়ে মুখোমুখি বৌদ্ধধর্মের পক্ষ নিয়ে খ্রীষ্ঠান পন্ডিতদের সাথে তর্ক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিান বিশ্ববৌদ্ধ ফেলোশিপের পতাকা এবং আন্তর্জাতিক বৌদ্ধধর্মের রতœমালা (ক্যাতেসিজম) সম্পাদনা করেছিলেন। তাঁরই অনুপ্রেরনায় শ্রীলঙ্কার অনাগারিক ধর্মপাল তাঁর পুরানো ডেভিড নাম ত্যাগ করে ধর্মপাল নামে পরিচিতি হয়েছিলেন।
বৌদ্ধধর্মের জয়গান গেয়ে আমেরিকার বিশ্ববিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন নিজেকে ধন্য মনে করেছেন। অহিংসার বিশ্বমৈত্রীর সাধনায় আমেরিকাস ফ্যাসসিনেশান উইথ বুড্ডিজম এবং মহামান্য দালাইলামর নিকট আমেরিকান স্ত্রী ও পুরুষ দলে দলে বৌদ্ধধর্ম গ্রহন করেছেন (টাইম, ১৩ অক্টোবর ১৯৯৭ সাল)।
বিভিন্ন কারনে তিব্বত থেকে ১৯৫৬ সালে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের প্রতিনিধি মহামান্য দালায় লামা ভারতে এলেন। ১৯৮৯ সালে আমেরিকায় আমন্ত্রিত হয়ে এলেন এবং বৌদ্ধধর্ম, ধ্যান এবং অহিংসা পরম ধর্ম সম্বন্ধে বিবিধ ভাষন আমেরিকার সাধারন জনতা সহ হলিউডের নায়ক নায়িকাগণকে গভীরভাবে আকর্ষন করেছেন।
বাঙালি জাতির প্রথম গ্রন্থ চর্য়াপদের বিষয়বস্তু ছিল বৌদ্ধধর্ম এবং বিশ্বমানবতাবাদী সর্বকালের বৌদ্ধ দর্শন। একুশে ভাষা আন্দোলনের আলোকে বাংলা ভাষা এবং একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্যে ”কত প্রান হল বলিদান / লেখা আছে অশ্রুজলে।” ঢাকার আমেরিকা দূতাবাস আমার লেখা ইংরেজি বই ”সত্যের সন্ধানে (IN QUEST OF TRUTH)  শীর্ষক বৌদ্ধ উপন্যাস পাঠে সন্তুষ্ঠ হয়ে বিগত ১২ মে ১৯৮৯ সালে (আমাকে) আমেরিকা ভ্রমনের সরকারি নিমন্ত্রন পত্র আমার ঠিকানায় প্রেরন করেছিলেন। ১৯৮৭ সালে চীন ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন বৌদ্ধ গ্রন্থ প্রকাশনী সমিতি আমার লেখা ইংরেজি বই ”আনবিক যুগে বৌদ্ধ চিন্তা ও ধ্যান প্রসঙ্গ (Buddhist thought & Meditation in the Nuclear Age”) ) শীর্ষক বৌদ্ধ গ্রন্থের ত্রিশ হাজার কপি আমেরিকার লাইব্রেরি অব কংগ্রেস সহ বিশ্বজুড়ে পরিবেশন করেছেন।
গত বছর কানাডার বৌদ্ধ পত্রিকা সুমেরু (ও অতীশ দীপঙ্কর ফেসবুকে) সংবাদছিল:
ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী মহামান্য জর্জ অসবোর্ন রাজনীতির রাজসিংহাসন ত্যাগ করে বেীদ্ধ
ভিক্ষু হয়েছেন এবং নেপালের গভীর জঙ্গলে ধ্যান প্রশিক্ষণ বৌদ্ধ মন্দিরে গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকেন। কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশের বৌদ্ধগণ উক্ত সংবাদ পাঠে পুলকিত এবং আনন্দ বোধ করছেন যে, বাংলাদেশের পাহাড়পুরের মতো কানাডায় ১,৭০০ একরের বৃহত্তম বৌদ্ধ বিহার নির্মিত হচ্ছে অহিংসা পরম ধর্ম মানব সমাজে প্রচারের জন্যে।  
১৮৯৬ সালে বৌদ্ধ পন্ডিত হেনরি ওয়ারেন ক্লার্ক ”বুড্ডিজম ইন ট্রানশ্লেশন” শীর্ষক মূল্যবান গ্রন্থ লেখা এবং হার্ভাট অরিয়েন্টাল সিরিস সম্পাদনা করে অমর হয়েছেন। আমেরিকায় বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্যে ১৮৯৭ সালে লেখক পল সারাস জাপানী জেন (ধ্যান) বৌদ্ধধর্মের মহাপন্ডিত মহামহোপাধ্যায় ডি টি সুজুকিকে আমেরিকায় আসার নিমন্ত্রন করলেন। ডি টি সুজুকির বৌদ্ধ ধ্যানের বক্তৃতামালা আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় সমুহ এবং বুদ্ধিজীবি জগতে গভীর আলোড়ন সৃষ্ঠি করেছিলেন।
রক্তাক্ত কলিঙ্গ যুদ্ধের পর সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মকে নিরপেক্ষ শান্তির সনদ করে জগত জুড়ে প্রচার করেন, “অহিংসা পরম ধর্ম।” জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বৌদ্ধধ্যান প্রনালী (মেডিটেশন) আজ মানব চিত্তের একমাত্র ঔষধ। যুদ্ধের মাধ্যমে মানব জাতির সমস্যার সমাধান নেই কিন্তু অহিংসার বিশ্বমানবতাই একমাত্র সমাধান। হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খৃষ্ঠান সহ সর্ব ধর্মের মানুষ একত্রে মানুষের ভাই বোন আত্মীয় স্বজন। কোন মানুষ অন্য মানুষের শত্রু নয়। সকল ধর্মের উপদেশে বিরাজমান, “মানুষ মানুষের ভাইবোন।” বিশ্বকবির ভাষায়:
“অহমিকা বন্দীশালা হতে। ভগবান তুমি!
নির্দ্দয় এ লোকালয়, এ ক্ষেত্র তব জন্মভূমি।
ভরসা হারালো যারা, যাহাদের ভেঙেছে বিশ্বাস
তোমারি করুনা বিত্তে ভরুক তাদের সর্বনাশ
আপনারে ভুলে তারা ভুলুক দুর্গতি। আর যারা
ক্ষীণের নির্ভও ধ্বংস করে, রচে দুর্ভাগ্যের কারা;
দুর্বলের মুক্তি রুধি, বোসো তাহাদেরি দুর্গদ্বারে,
তপের আসন পাতি, প্রমাদ বিহ্বল অহঙ্কারে।
পড়–ক সত্যের দৃষ্ঠি; তাদের নিঃসীম অসম¥ান,
তব পুণ্য আলোকেতে লভুক নিঃশেষ অবসান।”(২৯ জুলাই ১৯৩৩ সাল)।

বৈদিক ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করে খৃষ্ঠ পূর্ব ৫,০০০ বছর পূর্বে বৈদিক রাজা ইন্দ্র কাশ্যপবুদ্ধের বৌদ্ধধর্ম (স্বপন বিশ্বাসের লেখা মহেঞ্জোদারো হরপ্পায় বৌদ্ধধর্ম) ধ্বংস করে ভারতে বৈদিক সভ্যতা স্থাপন করেন। উদাহরন স্বরুপ গৌতমবুদ্ধের ধ্যানভূমি বুদ্ধগয়া কে হিন্দুরাজনীতি আজ দখল করে আছে । হিন্দুরাজনীতি গায়ের জোড়ে বুদ্ধের নাম জগন্নাথ ও তিরুপতি রেখে পুরীর জগন্নাথ (উড়িষ্যা) মন্দির এবং তিরুপতি মন্দির (অন্ধ্রপ্রদেশ) সহ হাজার হাজার বৌদ্ধমন্দির সমূহ দখলে নিয়েছে (সম্পাদকীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা আগষ্ট ২২, ১৯৯৩) ।
বিশ্ব সভ্যতা এবং বাংলা ভাষার জনক গৌতমবুদ্ধ বাংলাদেশে পুন্ড্রবর্ধনে (বগুড়ার মহাস্থানগড়) প্রাচীন বাংলাদেশের জনতাকে দিনের পর দিন দান শীল সমাধি এবং প্রজ্ঞা শিক্ষা দিয়ে বিশ্বশান্তি স্থাপন করেছিলেন।

বিশ্ব ইতিহাস বিজয়ী বাংলা ভাষার জনক এবং বিশ্বসভ্যতার সর্বপ্রথম পথ প্রদর্শক গৌতমবুদ্ধকে সশ্রদ্ধ বন্দনা এবং বুদ্ধপূজার মাধ্যমে বিগত ১৯ এবং ২০ জুলাই ২০১৩ বোষ্টন বাংলাদেশ বুড্ডিষ্ট এসোসিয়াশনের উদ্যোগে স্থানীয় সুমনোরম ম্যাকলিন মিডল স্কুল হলে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশী বৌদ্ধদের সহযোগীতায় উত্তর আমেরিকা বৌদ্ধ সৌভ্রাতৃত্ব সন্মেলন ২০১৩; মহাসমারোহের সফলতার সময় আমরা উক্ত শুভ সংবাদের জন্যে অপেক্ষা করেছিলাম।
চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করছি, বাংলাদেশ থেকে বহুদূরে থাকা প্রবাসী বৌদ্ধগণ আপ্রাণে তাঁদের শিকড়ের বৌদ্ধ সংস্কৃতি টা ছুঁয়ে থাকার চেষ্ঠা করে চলেছেন। টরন্টো থেকে বোষ্ঠনে পা ফেলার পর থেকে ঝলক দর্শনে দেখা গেল, তা থেকেই মনে হয়েছে, এ বারের সম্মেলনে একাধিক স্থানীয় আমেরিকা এবং কানাডার প্রবাসী বাংলাদেশী বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানের প্রযোজনা আন্তরিকসাড়া জাগিয়েছে। প্রথম উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশী বৌদ্ধ সুভ্রাতৃত্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো ২০১৩ সালের ১৯ ও ২০ জুলাই।
(2)    উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশী বুড্ডিষ্টস' ফেডারেশনের আত্মপ্রকাশ  
২৬শে আগষ্ট ২০১৭ইং বোষ্টনে বৌদ্ধ সম্মেলন

গত ১৬ই জুলাই ২০১৭ইং, উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশী বৌদ্ধদের ব্যাপক উৎসাহ, প্রচেষ্টা, সহযোগিতা এবং সমর্থন নিয়ে নিউ ইয়র্কের জেএফকে হিলটন হোটেলে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে "নর্থ আমেরিকা বাংলাদেশী বুড্ডিষ্ট ফেডারেশন"-এর আত্ম প্রকাশ অনুষ্ঠিত হয়। বিগত প্রায় দুইমাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার প্রবাসী বাংলাদেশী বৌদ্ধ ভিক্ষু সহ সর্বস্তরের বৌদ্ধ নেতৃবৃন্দ এবং জনসাধারণের সাথে ব্যাপক ভিত্তিক আলাপ-আলোচনা, মত বিনিময় সভা, ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে লেখালেখি ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে সমর্থন ও সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে নিরংকুশ জন সমর্থন নিয়ে "নর্থ আমেরিকা বাংলাদেশী বুড্ডিষ্ট ফেডারেশন" তাঁর যাত্রার শুভ সূচনা করলো।

আগামী ২৬শে আগষ্ট ২০১৭ইং বোষ্টনে উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশী বৌদ্ধ সম্মেলন অনুষ্ঠানে সকলের উপস্থিতিতে ফেডারেশনের পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব এবং দিক নির্দেশনা ঘোষণা করা হবে।
গত ৯ই জুলাই বোস্টনে অনুষ্ঠিত উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দের যৌথ সাধারণ সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে নিউ ইয়র্ক মৈত্রী ফাউন্ডেশনের সভাপতি সমীরণ বড়ুয়া "নর্থ আমেরিকা বাংলাদেশী বুড্ডিষ্ট ফেডারেশন"এর আহবায়ক হিসাবে দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। তিনি ২০১৫ সালে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত উত্তর আমেরিকা বৌদ্ধ সম্মেলনের আহবায়ক ছিলেন। বোষ্টন বাংলাদেশ বুড্ডিষ্ট এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি সুহাস বড়ুয়া সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক এবং একই সংগঠনের প্রাক্তন সভাপতি শিমুল বড়ুয়া যুগ্ন আহবায়ক মনোনীত হন।

আমেরিকা এবং কানাডার বিভিন্ন অঙ্গ রাজ্য এবং প্ৰদেশে বসবাসরত বাংলাদেশী বৌদ্ধ, তাঁদের বিভিন্ন সংগঠন এবং বিবিধ বৌদ্ধ সমাজ, বৈশিষ্ট্য মন্ডিত/বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি বৃন্দ এবং প্রতিষ্ঠান সমূহের সমন্বয়ে এবং প্রতিনিধিত্বে পরিচালিত হবে বৌদ্ধদের বৃহত্তর এই ছাতা সংগঠন "নর্থ আমেরিকা বাংলাদেশী বুড্ডিষ্ট ফেডারেশন"। বাংলাদেশী বৌদ্ধদের ইতিহাস, কৃষ্টি, সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মদের কাছে পরিচিত করে তুলতে এবং ধর্মীয় রীতি-নীতি, সংষ্কৃতি, প্রচলিত প্রথা চর্চা ও সংরক্ষণে দেশে এবং প্রবাসে নানাবিধ উদ্যেগ গ্রহণ করবে এবং সহায়ক ভূমিকা রাখবে এই বৃহৎতম সংগঠন। আমেরিকা ও কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশী বৌদ্ধ এবং তাঁদের প্রজন্মদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি বৃদ্ধি করতে এবং ধর্মীয় ও উত্তরাধিকার পরিচয় সংরক্ষণে জোরালো ভূমিকা রাখবে এই ফেডারেশন ।সেবা ও সহযোগিতার সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে কাজ করবে এই সংগঠন।

বাংলাদেশী এবং প্রবাসী বৌদ্ধদের দৈনন্দিন জীবন জীবিকা এবং পেশাগত সকল কাজে উচ্চতম নৈতিক মান বজায় রাখতে উত্সাহ এবং সহযোগিতা মূলক প্রকল্প গ্রহনের চেষ্টা চালাবে এই ফেডারেশন। আমরা নতুন প্রজন্মকে জানিয়ে দিতে চাই বাংলাদেশের বৌদ্ধদের অতীতের সেই গৌরব উজ্জ্বল দিন গুলির কথা, যাঁরা চর্যাপদ আর দোহা থেকে শুরু করে শিল্প, সাহিত্য, সংগীত এবং স্থাপত্যের পাশাপাশি ধর্ম নিরপেক্ষতা ও নাগরিক সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছিল এই বাংলায়। মহামতি বুদ্ধের শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে জাতি, ধর্ম, রং -গোত্র, উঁচু -নীচু সম্প্রদায়িক শ্ৰেণী ভেদের বিরুদ্ধে সাম্যবাদ আর মানবতাবাদের জাগরণ সৃষ্টি করেছিল এই বৌদ্ধ জাতি।

বাংলাদেশে বিগত এবং সাম্প্রতিক বছর গুলোতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক ঘটনা গুলি বিশেষ করে রামু, কক্সবাজার এবং পার্বত্য জেলা সমূহের অমানবিক ঘটনাগুলিবাংলাদেশের বৌদ্ধদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। বৌদ্ধরা একদিকে যেমন কর্মবাদী এবং জ্ঞানীর পূজারী ও সেবক অপর দিকে অজ্ঞানী বা অজ্ঞতার প্রতি ঘৃণা ও সঙ্গ ত্যাগ পরায়ন। ১১৫০ ইং সালের পর থেকেই বাংলাদেশ নামক এই ভুখন্ডে বৌদ্ধরা মূলত তরবারির আঘাতে শিরচ্ছেদ ভয়ে এবং নির্যাতনের শিকার হয়েই ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হতে থাকে এবং কালের পরিণতিতে সংখ্যা গুরু বৌদ্ধ জাতি নিজ দেশে সংখ্যা লঘু থেকে আজ বিলুপ্ত জাতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। সকল মানব ও  প্রাণীর প্রতি মৈত্রী পরায়ন এবং ধর্ম নিরপেক্ষ এই বৌদ্ধ জাতি শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারনে নিজ দেশ থেকে উচ্ছেদ হবে কিংবা বিলুপ্ত হবে তা সভ্য মানব সমাজ কখনও মেনে নিতে পারে না।

হাজার বছরের শ্বাশত বাংলা, এই বাংলাদেশই হচ্ছে বাংলাদেশী বৌদ্ধদের হাজার বছরের আদি এবং একমাত্র দেশ। বাংলাদেশী বৌদ্ধরা বাংলাদেশ ছাড়া অন্য্ কোন দ্বিতীয় দেশকে কখনো নিজের মাতৃভূমির মত আপন ভাবতে পারেনি। বাংলাদেশকে ছেড়ে যে যেখানেই থাকুক না কেন, নিজের মাতৃভাষা, ধর্ম, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি থেকে কখনোনিজেকে সরিয়ে সাথে বিশেষ কোন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্ঠা কিংবা সুযোগের প্রহর গুণন করেনি, অহিংসা ও ভালোবাসা দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে আপন দেশ ও জাতিকে। ফেডারেশনের সুবিশাল ছায়ায় নর্থ আমেরিকার বাংলাদেশী প্রবাসী বৌদ্ধরা সম্মিলিত ভাবে একে অপরের সহায়ক শক্তি হয়ে জ্ঞান প্রধান, মেধা সম্পন্ন ও মানবিক বৈশিষ্ট্য মন্ডিত, কর্মবীর বৌদ্ধ জাতির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখাবে। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় নানাবিধ প্রকল্প গ্রহণ সহ বাংলাদেশ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, সংস্থা সমূহের সাথে সম্পর্ক ও সহযোগিতার মাধ্যমে কল্যাণময় পরিবেশ গঠনে ও শান্তিময় বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় একযোগে কাজ করে যাবে।

২৬শে আগষ্ট, ২০১৭ ইং বোষ্টনে নর্থ আমেরিকা বাংলাদেশী বৌদ্ধ সম্মেলনে আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা, দেশ ত্যাগ নয়, দেশের কল্যাণময় পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সকলকেআবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আমরা আমাদের গৌরব গাঁথা ইতিহাসকে সামনে রেখে আবারও নতুন গৌরব গাঁথা রচনা করবো। হাজার বছরের মাতৃভূমিকে ত্যাগ করে নয়, হৃদয়ে ধারণ করে, বাংলাদেশের সকল ধর্মের মানুষকে মৈত্রী, ভালবাসা আর সংলাপে মুগধ করে রচনা করবো শান্তির মমতাময় পরিবেশ। বোষ্টন সম্মেলনে আপনাদের সরব উপস্থিতিতে জেগে উঠবে আমাদের অতীত গৌরব, রচিত হবে প্রত্যাশার নতুন দিগন্ত।
সম্মেলন স্থানঃ McGlynn Middle School 3002 Mystic Valley Pkwy, Medford, MA 02155.
সময়ঃ বেলা ১১টা থেকে রাত ১০:৩০মিঃ

সকলের সুস্বাস্থ্য কামনা করছি এবং সম্মেলনে যোগদানের বিনীত আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।  "জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।"   
(Reported  by  সুহাস বড়ুয়া, আহবায়কঃ নর্থ আমেরিকা বাংলাদেশী বুড্ডিষ্টস' কনফারেন্স ২০১৭, বোষ্টন, ম্যাসাচুসেটস, যুক্তরাষ্ট্র। ).   
 
বিশ্ববৌদ্ধ পুরস্কার প্রাপ্ত প্রখ্যাত মানবতাবাদী লেখক এবং জাতিসংঘে সাবেক বৌদ্ধ প্রতিনিধি এস. বড়ুয়া, প্রবাসী রাজনৈতিক ভাষ্যকার, ও কলামিষ্ট টরন্টো, কানাডা।
Dear Editor, Please attach the photo with this essay.


১৯৭৫ সালের ১৫ -ই আগস্ট পরবর্তী পরিবর্তিত সময়ে যেমন ছিল আমাদের শৈশব,কৈশর আর তারুণ্য : ফাহরা দীবা দীপ্তি

শুক্রবার, ০৪ আগস্ট ২০১৭

১৫-ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট, নির্মম হত্যাকান্ডে শহীদ জাতির পিতা বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ তাঁর পরিবারের সকল শহীদদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
ছোটবেলার স্মরণীয়, করুণ,ভয়ংকর, ভালোলাগা বা বিপর্যস্ত যে ঘটনাই মনে করতে চাই না কেন প্রথমেই চলে আসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। তখন আমি ৮ বছরের শিশু। সেদিন খুব সকালে টেলিফোনের রিং এর শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। আসলে ঘুম ভেঙেছিল অনেক আগেই কিন্তু আম্মার ভয়ে ঘাপটি মেরে বিছানায় পড়ে ছিলাম! কারন এ দিনটি ছিল ছোট খালা'র(সাহানা খালাম্মা) বিয়ে। আগের দিন খালার গায়ে হলুদ হল, আমরা পিচ্চি বাহিনীরা অতি উৎসাহে ধানমন্ডির বিভিন্ন বাড়ি থেকে ফুল চুরি করে, কুকুরের ধাওয়া খেয়ে নানু আর আম্মা'র বকুনি খেয়েছি। সেই বকুনিও ভুলে গিয়েছি কারন আজ খালাম্মা'র বিয়ে, নতুন জামা পড়বো,কতো মানুষ আসবে, এই উত্তেজনায়!
তখন মোবাইলের যুগ ছিল না।ল্যান্ড ফোনটা ছিল আব্বার ঘরে। রিং হওয়ার পর আব্বা বলছেন,"জিল্লুর ভাই(শ্রদ্ধেয় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান) কি বলছেন আপনি,এটা কি বললেন,কিভাবে সম্ভব!" দরোজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম আব্বার হাত থেকে ফোনের রিসিভারটা মাটিতে ঝুলছে, আব্বা হাউমাউ করে কাঁদছেন আম্মাকে জড়িয়ে ধরে, আম্মাও কাঁদছেন। আব্বা বার বার বলছেন, "আমাদের সব শেষ হয়ে গেলো, আমাদের আর কেউ রইল না!বাচ্চাদের দেখে রেখ,জানিনা তোমাদের সাথে আবার কবে দেখা হবে! " দেখলাম আম্মা আব্বা'র ছোট কালো ব্যাগটাতে কিছু কাপড় গুছিয়ে দিচ্ছেন। ছোট্ট আমি ভাবলাম, আব্বা আমাদের রেখে এতো সকালে আগে আগে নানুর বাড়িতে যাচ্ছেন সাহানা খালার বিয়েতে। দৌড়ে গিয়ে বললাম, আমিও যাবো আপনার সাথে। তখনো আব্বা'র চোখ দিয়ে জল পড়ছে!আব্বা বললেন,"আব্বা,দোয়া করো তোমার আব্বাকে যেনো আবার দেখতে পাও। জাতীর পিতাকে ওরা শেষ করে দিয়েছে,আমাদেরকেও ওরা বাঁচতে দিবে না!(আব্বা, জনাব মোঃ মুজাফফর আলী তখন জাতীয় সংসদের তৃতীয় বারের মতো সংসদ সদস্য) তোমার আম্মার সব কথা শুনবে, ছোট ভাইবোনদের খেয়াল করবে।" ৮ বছরের একটি শিশুর কিছুই বোঝার কথা না, আমিও বুঝলাম না কি হয়েছে! আব্বা চলে যাওয়ার পর দেখলাম আম্মা নানুকে ফোনে বলছেন," দীপ্তি'র আব্বা'র বন্ধু জিল্লুর রহমান ভাই(শ্রদ্ধেয় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান) এই মাত্র ফোনে বললেন বংগবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের সবাই, কেউ নাকি বেঁচে নাই, তাঁদেরকে মেরে ফেলা হয়েছে,ওরা নাকি বংগবন্ধু'র কাছের সবাইকে মেরে ফেলবে!" আম্মা কথা শেষ করতে পারছিলেন না, অনবরত কাঁদছিলেন।বাড়ির কাজের বুয়াদেরকেও কাঁদতে দেখলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম না এতো সকালে কেনো বাড়ির সবার কান্নাকাটি। আম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম কেনো সবাই কাঁদছে! আম্মা বললেন, "গত ঈদে তোমার আব্বার সাথে বংগভবনে গিয়েছিলে মনে আছে?বংগবন্ধুকে সালাম করেছিলে মনে আছে? তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে চুল এলোমেলো করে দিয়েছিলেন! মনে পড়ে?"বললাম, সবই মনে আছে, তো কি হয়েছে? আম্মা বললেন, সেই বংগবন্ধুকে তাঁর পরিবার সহ মেরে ফেলা হয়েছে!" আমি বললাম তিনিতো প্রেসিডেন্ট, কেনো, কারা তাঁকে মেরে ফেললো! আম্মা কোন উত্তর দিলেন না! একটি শিশুকে কি বলবেন তিনি! কাঁদতে কাঁদতে একটা ব্যাগে আমাদের কাপড় চোপড় গুছিয়ে আমাদেরকে নিয়ে নানুর বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন।


নানুর বিশাল বাড়িটা প্যান্ডেল টানানো,আজ খালার বিয়েতে সবাই আসবে, পোলাও রোস্ট আরও কত কি রান্না হয়েছে, গাড়ি থেকে নেমেই ঘ্রাণ পেলাম। কিন্তু কই, কোন আনন্দ নেই! নানু খালা মামারা সবাই চিন্তিত! একেক জায়গা থেকে একেক রকম খবর আসছিল বংগবন্ধু'র পরিবার সম্মন্ধে,বেঁচে থাকা না থাকা নিয়ে। আম্মা,নানা নানু আমাদের ছোটদের ডেকে বললেন, 'তোমরা হইচই কোরো না, আল্লাহ্‌কে ডাকো, অনেক বড় বিপদে আছি আমরা, ঘরের বাইরে বের হয়ো না কারফিউ চলছে, তোমার খালার বিয়েটা কিভাবে হবে আল্লাহ্‌ই জানেন, কারফিউয়ের জন্য বরযাত্রীরা মিরপুর থেকে আসতে পারছে না..... এমন আরো কতো কথা।একবার বিয়ে ভেঙে গেলে তার আবার বিয়ে হতে কষ্ট হয়, তাই যেভাবেই হোক খালু যেনো দুই একজনকে নিয়ে হলেও আসেন তেমন অনুরোধ করা হল।পুরা ঢাকা শহরে কারফিউর জন্য কেউ আসতে পারে নি, তিন শত মানুষের খাবার নষ্ট হওয়ার অবস্থা। আমার মনে আছে বিয়ে বাড়ির সব খাবার তখন ডেকচিতে করে প্রতিবেশী ও আশ পাশের গরীব দুঃখীদের মাঝে বিলি করা হয়েছিল। মিরপুর থেকে খালু আর তার বড় ভাই জিগাতলায় নানুর বাড়ি পৌচেছিলেন অনেক রাতে, পায়ে হেটে, বুড়িগংগা নদী হয়ে।দুপুরের বিয়ে হয়েছিল অনেক রাতে। বরযাত্রী ছিল মাত্র দুই জন, খালুর বড় ভাই আর ছোট বোন।
সেই সময় এটুকু বুঝেছিলাম বিড়াট কষ্টকর কিছু একটা হয়েছে, যার জন্য আমরা আজ নানুর বাড়ি তো কাল খালার বাড়ি, পরশু পরিচিত কারো বাড়ি। নিজেদের বাড়ির কথা মনে পড়তো, আমরা কাঁদতাম, থাকতে চাইতাম না অন্যের বাসায়। নিজের খেলনা, নিজেদের মতো করে থাকা খুব অনুভব করতাম। এতো কিছুর মাঝেও আম্মা আমাদের লেখা পড়া সব কিছুই চালিয়েছেন। দেখা গেলো ঐ সময়টায় দুই দিন নিজেদের বাসায় তো তিনদিন অন্যদের বাসায় থেকেছি।বাসায় এলে বাসার গার্ডরা আম্মাকে বলতো,'বেগম সাহেব আর্মির কিছু লোক আপনাদের খোঁজ করেছেন, আপনারা কোথায় আছেন জানতে চেয়েছে।'আব্বাকে মাঝে মধ্যে রাতে দেখতাম, আবার দেখতাম সকালে নেই।এভাবেই চলছিল আমাদের দিনগুলো।
এরই মধ্যে এক মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলো আব্বার গলার আওয়াজ শুনে। আব্বা বারান্দা থেকে কাদেরকে জেনো বলছেন,"ভাই, আপনারা এসেছেন আমার বাড়িতে, আপনারা আমার মেহমান, বাসায় এসে এক কাপ চা অন্তত খেতে হবে,আমার বাসা থেকে না খেয়ে কোন মেহমান যায় নি, আমি অবশ্যই আপনাদের সাথে যাবো,যেখানে যেতে বলেন।" এর পর ড্রইং রুমে অনেক মানুষের কথা শুনলাম, ভাবলাম কে এসেছে উঁকি দিয়ে একটু দেখি,দেখলাম ঘর ভরা আর্মি অফিসার,আব্বা তাদেরকে কি যেনো বোঝাচ্ছেন। আর বার বার আম্মার নাম ধরে বলছেন," চায়না, তারাতারি ভাইদের নাস্তা দাও, শেমাই রান্না কর।" আমি ছুটে গিয়ে দেখলাম আম্মা অনবরত কাঁদছেন আর শেমাই রান্না করছেন।আম্মা আমাকে দেখেই এক ধমকে বললেন, 'কি ব্যাপার এতো রাতে ঘুম থেকে উঠেছো কেন, তোমার আব্বা দেখলে বকা দিবেন, ঘুমাতে যাও।'ভয়ে আমি আমার রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। খুব সকালে আব্বা আমাদের ভাইবোনদের জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন, বললেন,'আব্বা,গত রাতই তোমাদের সাথে আমার শেষ রাত হত।খন্দকার মোস্তাক আহমেদ ওদের পাঠিয়েছিল আমাকে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলতে।ওদের মধ্যে একজন অফিসার কুমিল্লার, তিনি জানিয়েছেন যে,খন্দকার মোস্তাক তাদের অর্ডার দিয়েছে আমাকে নিয়ে গুম করে ফেলতে, আমার বাড়ীর একতলা নাকি অস্ত্রে বোঝাই, আমি নাকি মোস্তাক সরকারকে উৎখাত করার চেস্টায় দলীয় লোকদের আমার বাসায় জড়ো করেছি। এবং তাদের নির্দেশ ছিল, আমি পালানোর চেষ্টা করলে যেন সাথে সাথে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। বাড়ীর চতুর্দিক আর্মিরা ঘিরে রেখেছিল, আমার পারমিশনের আগেই তারা পুরা বাড়ী সার্চ করেছে, কিছুই পায় নাই। তারা আমার বিরুদ্ধে কিছুই দারা করাতে না পেরে আমাকে নিতে পারে নাই কিন্তু ওরা আবার আসবে, আমাকে না নিয়ে যাবে না, আর এই নেয়া হবে চিরজীবনের জন্য নেয়া।তোমরা তোমার আম্মার কথা মেনে চলবে, আমি তোমাদের খোঁজ খবর রাখবো।'এর পর আব্বা কোথায় চলে গেলেন জানি না,আম্মার কাছে শুনি তিনি ভালো আছেন। আব্বাকে নতুন করে ফিরে পাই ১৯৮৪ সালে, আমার এস এস সির বছর, ভয়ংকর অসুস্থ, ডায়াবেটিস, হাইপ্রেশারের রুগী হিসাবে!আওয়ামীলীগের বেশীর ভাগ নেতা কর্মীদের তখন এভাবেই দিন গিয়েছে। আমরা তবু সৌভাগ্যবান আব্বাকে ফিরে পেয়েছিলাম, কিন্তু অনেক নেতা, কর্মী গুম হয়েছিলেন যাদের হদিশ আজো মেলেনি!
এতোগুলো বছরে বয়স বাড়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম ১৫ ই আগস্টের নির্মমতা আর বাস্তবতা! বংগবন্ধু নামটা যেনো হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো! টিভি, রেডিও, খবরের কাগজ কোথাও তাঁর নাম নেই। ইনডেমনিটি এ্যাক্ট করে বংগবন্ধু'র আত্মসিকৃত হত্যাকারীদের পূনর্বাসিত করেছিলেন খুনি মোস্তাকের দোস্ত জিয়াউর রহমান, আমাদের শিশুমন থেকে বংগবন্ধুকে ভুলিয়ে দেবার জন্য জিয়াউর রহমান অনেক কিছুই করেছিলেন! তিনি প্রথমেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তৈরী করলেন শিশু পার্ক, বংগবন্ধু যেখানে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন! শিশুদের মগজ ধোলাইয়ের জন্য তিন 'নতুন কুঁড়ি'নামে শিশুদের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান চালু করেন, এবং পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি স্বসরিরে হাজির হতেন, তাদের সাথে হাসিমুখে সময় কাটাতেন! শিশুরা জাতীর ভবিষ্যৎ। তাই তিনি সুকৌশলে শিশুদের মগজ ধোলাইয়ের জন্য শিশু বিনোদনের ব্যবস্থা করেছিলেন! তিনি এতে খুব ভালো ভাবেই সফলতা লাভ করেছিলেন! কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুন সমাজের মধ্যে তিনি অস্ত্র আর টাকার নেশা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। তৈরী করেছিলেন অভি-নিরু-বাবলু -সজলদের মতো মাস্তান বাহিনী!বানের জলের মতো টাকা তিনি ব্যায় করেছেন ছাত্রদের ছাত্রত্ব নষ্ট করার কাজে!


কলেজে ভর্তীর পর নতুন সব বন্ধু। কিন্তু এ কি! বেশীর ভাগই ছাত্রদলের সমর্থক, শুধু তাই না, তারা বংগবন্ধু ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সন্মন্ধে মনগড়া কিছু কাহিনী তোতা পাখির মতো ভাঙা ঢোলের মতো বাজায়।ছাত্রলীগের মেয়েও হাতে গোনা যায়, এমন অবস্থা!মেয়েরা ছাত্রলীগ করতে ভয় পায়, কারণ ছাত্রদলের মেয়েরা তাদের হেনস্থা তো করেই মেয়েদের হলের রুম পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেয়। আর বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শেখ হাসিনার কোন পোষ্টার তো কোন ওয়ালে লাগানোই যেতো না। রাতে লাগালে সকালে নেই।এরকম চিত্র ছিল পুরা বাংলাদেশে।আর কারফিউ চলতো মাসের পর মাস জুড়ে!
তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের যে কি ভয়ংকর অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তা কয়েকটা লাইনে লিখে শেষ করা যাবে না!ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের নামে বিভিন্ন মামলা আর হুলিয়া দিয়ে, ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের অত্যাচার,আজ একজনের সাথে কথা বললাম, তো কাল শুনি তিনি লাশ হয়ে গিয়েছেন।গুম, খুন এগুলো ছিল ছাত্রদলের প্রতিদিনের কাহিনী! বংগবন্ধু'র ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ তখন আমাদের প্রজন্ম দেখেনি, শোনেনি। আমরা যারা রাজনৈতিক পরিবারের সদ্স্য,যারা রাজনৈতিক দলের সদস্য, তারা ছাড়া সাধারণ মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য, বি এন পি জামায়াত জোট সরকার টিভি, রেডিওতে তা দেখানো বন্ধ রেখেছিল। ইনডেমনিটী অর্ডিন্যান্স, এই কালো আইনটা করে জিয়াউর রহমান বংগবন্ধু'র খুনিদের বিচারের সব পথ বন্ধ করে রেখেছিলেন।আমরা সেই সব বীর নেতা কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞ, ঋণী যারা নিজের জীবনের পরোয়া না করে বংগবন্ধু'র খুনিদের বিচার চেয়ে নির্মম অত্যাচার শয়েছেন,জীবন দিয়েছেন। তাঁরা পথ দেখিয়েছেন, আমরা তাঁদের পথে হেটেছি। আমাদের কোন চাওয়া পাওয়া ছিল না।আমরা শুধু চেয়েছি আমাদের আপা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা আর বংগবন্ধু'র খুনিদের বিচার। আমরা স্বপ্ন দেখতাম একদিন আমাদের আপা প্রধানমন্ত্রী হবেন, খুনিদের বিচার করবেন। তবে সেই দিনটা কবে, কতো বছর পর তা আমাদের জানা ছিল না। আমরা হতাশ হইনি, আমরা যেকোন সমস্যা হলে বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের উপদেশ নিতাম। মাননীয় সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আমাদের প্রিয় কাদের ভাই তখন 'বাংলার বানী' অফিসে বসতেন। আমরা যেকোন সমস্যায় পড়লে তাঁর কাছে ছুটে গিয়েছি, তিনি অসীম মমতায় আমাদের রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছেন। আমাদের সময় ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের মধ্যে স্নেহ, শ্রদ্ধা আর ভালবাসার বন্ধন ছিল। এখনো আমরা তাঁদের শ্রদ্ধা করি। যেদিন ইনডেমনিটি এ্যাক্ট বাতিল হল আমাদের আপার হাত দিয়ে আমার মনে হয়েছে, দেশ নতুন করে স্বাধীন হয়েছে।
আজ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ তৃতীয় বারের মতো ক্ষমতায়। অতিথী পাখির ভিড়ে, দলের অনেক ত্যাগী নেতা কর্মীই নীরবে চোখের জল ফেলেন। দলীয় বিভিন্ন প্রোগ্রামে তাঁরা কিছু পেতে নয় শুধুই প্রাণপ্রিয় আপাকে এক নজর দেখতে যান। কিন্তু তাতেও দেখা যায়, এখনকার ছাত্রলীগ নামধারী কিছু নেতা তাঁদের ন্যুনতম সন্মানটুকুও দিতে চায় না। দেখা গেলো, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আর তাঁর সামনে তাঁর সন্তানসম ছাত্রলীগ নেতা চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে! একটি চেয়ারও তো তাঁর দিকে এগিয়ে দেয়া যায়! একজনকে সন্মান দিলে নিজেও যে সন্মানিত হওয়া যায়, এটা বোধহয় এরা জানে না! এখনকার কিছু ছেলেমেয়ে বলে, 'আরে মিয়া রাখেন, রাজপথ আমরা ধইরা রাখছি, আপনেরে চিনি না, আপনে কে?'
আমার কথা একটাই, রাজপথ এখন ধরে রাখার কিছুই নাই। দলের সুসময়ের মানুষ তোমরা। কিন্তু দলের দুঃসময়ে, ১৯৭০,১৯৮০,১৯৯০ দশকে যখন এক একজন কর্মী,নেতা তার যৌবনের মূল্যবান সময়টুকু নির্দিধায় ব্যায় করেছেন দলের জন্য দেশের জন্য, তাঁদের জন্য আর কিছু না হোক একটু সন্মানতো আমরা দেখাতে পারি! কারণ তাঁরা আমাদের ভিত্তি। ভিত্তিটা শক্ত ছিল বলেই আজ আমাদের পথটা এতো সহজ!
আজ,আমরা টিভিতে বংগবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ দেখতে পাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেখি,কতো পোষ্টার,কতো ছবি, কতো সমর্থক! ভালো লাগে এই ভেবে, এই দিনের অপেক্ষায়ই তো আমরা ছিলাম!
এখন একটাই চাওয়া আমাদের আপা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্থতা আর তাঁর দীর্ঘ জীবন। আল্লাহ্‌ আমাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করুন।
জয় বাংলা, জয় বংগবন্ধু।


৭৫ এর আগষ্ট - সেই কলংকিত কালো রাত = সাঈদুর রহমান সাঈদ

শুক্রবার, ০৪ আগস্ট ২০১৭

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট। ভোররাত। ধানমন্ডির বাড়িটি আক্রান্ত হওয়ার আগেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার আত্মীয় ও মন্ত্রিসভার সদস্য আবদুর রব সেরনিয়াবাতের হত্যাকান্ডের খবর পেয়ে যান। যে ঘরে বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার বাইরের বারান্দায় ঘুমিয়েছিল আবদুল ও রমা । উপর থেকেই বঙ্গবন্ধু নিচতলায় তার ব্যক্তিগত সহকারী এ এফ এম মহিতুল ইসলামকে টেলিফোন করে বলেন, 'সেরনিয়াবাতের বাসায় দুষ্কৃতকারীরা আক্রমণ করেছে। জলদি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন লাগা।' পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে, মহিতুল গণভবন (তৎকালীন রাষ্ট্রপতির কার্যালয়) এক্সচেঞ্জে চেষ্টা করতে থাকেন। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির রক্ষীরা বিউগল বাজিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন শুরু করামাত্রই বাড়িটি লক্ষ্য করে দক্ষিণ দিক থেকে সরাসরি আক্রমণ শুরু হয়।
একটু পরেই বঙ্গবন্ধু তার ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসেন। ঘুম থেকে উঠে আসে গৃহকর্মী আবদুল আর রমা। বেগম মুজিবের কথায় রমা নিচে নেমে মেইন গেটের বাইরে এসে দেখেন সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য গুলি করতে করতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে এগুচ্ছে। রমা বাড়ির ভেতরে ফিরে দেখেন, লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা অবস্থাতেই বঙ্গবন্ধু নিচতলায় নামছেন। দোতলায় গিয়ে দেখেন, বেগম মুজিব আতঙ্কিত অবস্থায় ছোটাছুটি করছেন। রমা আর আব্দুল দোতলায় দাঁড়িয়ে না থেকে তিনতলায় চলে যান এবং বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল ও তার স্ত্রী সুলতানা কামালকে ঘুম থেকে তোলেন। ঘটনা শুনে শার্ট-প্যান্ট পড়ে নিচতলায় নামেন শেখ কামাল। সুলতানা কামাল আসেন দোতলা পর্যন্ত। রমা দোতালায় শেখ জামাল ও তার স্ত্রীকেও ঘুম থেকে তোলেন। জামাকাপড় পরে শেখ জামাল তার স্ত্রীকে নিয়ে দোতলায় বেগম মুজিবের কক্ষে যান। ওদিকে গোলাগুলির মধ্যে অভ্যর্থনা কক্ষে বঙ্গবন্ধুর সামনেই বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে থাকেন মহিতুল। পুলিশ কন্ট্রোল রুম ও গণভবন এক্সচেঞ্জে চেষ্টার এক পর্যায়ে রিসিভার নিয়ে বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেন, 'আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি ...'। বঙ্গবন্ধু তার কথা শেষ করতে পারেননি। একঝাঁক গুলি জানালার কাচ ভেঙে অফিসের দেয়ালে লাগে। কাচের এক টুকরায় মহিতুলের ডান হাতের কনুই জখম হয়। ওই জানালা দিয়ে গুলি আসতেই থাকে। বঙ্গবন্ধু টেবিলের পাশে শুয়ে পড়েন এবং মহিতুলের হাত ধরে কাছে টেনে শুইয়ে দেন। এর মধ্যেই গৃহকর্মী আবদুলকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে তার পাঞ্জাবি ও চশমা পাঠিয়ে দেন বেগম মুজিব। কিছুক্ষণ পর গুলিবর্ষণ থেমে গেলে বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়িয়ে আবদুলের হাত থেকে পাঞ্জাবি আর চশমা নিয়ে বারান্দায় বের হয়ে বঙ্গবন্ধু পাহারায় থাকা সেনা ও পুলিশ সদস্যদের বলেন, 'এত গুলি হচ্ছে, তোমরা কী করছো ?' এ কথা বলেই বঙ্গবন্ধু উপরে চলে যান।
বঙ্গবন্ধু উপরে উঠতে না উঠতেই শেখ কামাল নিচে নেমে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলেন, 'আর্মি আর পুলিশ ভাইরা,  আপনারা আমার সঙ্গে আসেন।' এ সময় শেখ কামালের পেছনে গিয়ে দাঁড়ান মহিতুল ইসলাম ও পুলিশের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট (ডিএসপি) নুরুল ইসলাম খান। ঠিক তখনই মেজর নূর,  মেজর মহিউদ্দিন এবং ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা সৈন্যদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ঢোকে। গেটের ভেতর ঢুকেই তারা হ্যান্ডস আপ বলে চিৎকার করতে থাকে। মহিতুল ইসলামকে টেনে ঘরের মধ্যে নিয়ে যান নুরুল ইসলাম খান। কোন কথা না বলেই শেখ কামালের পায়ে গুলি করে বজলুল হুদা। নিজেকে বাঁচাতে লাফ দিয়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে পড়েন শেখ কামাল। মহিতুলকে বলতে থাকেন,  “আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল, আপনি ওদেরকে বলেন”।  মহিতুল ঘাতকদের বলেন,  “উনি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল”।  এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে শেখ কামালকে লক্ষ্য করে বজলুল হুদা তার হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে ব্রাশফায়ার করে। সঙ্গে সঙ্গে মারা যান শেখ কামাল। এর মধ্যে একটা গুলি মহিতুলের হাঁটুতে আর একটা নুরুল ইসলামের পায়ে লাগে। মুহূর্তের মধ্যে ওই ঘরে ঢুকে বজলুল হুদা সবাইকে বাইরে গিয়ে দাঁড়ানোর আদেশ দেয়।

Picture
বংগবন্ধুর টেলিফোনে যোগাযোগের প্রচেষ্টাঃ
নিচে কী হচ্ছে তার কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি দোতলায় তার ঘরের দরজা বন্ধ করে বিভিন্ন  জায়গায় ফোন করতে থাকেন। এক পর্যায়ে ফোনে তার সামরিক সচিব কর্নেল জামিলউদ্দিনকে পান। তিনি তাকে বলেন, 'জামিল, তুমি তাড়াতাড়ি আসো। আর্মির লোকেরা আমার বাসা অ্যাটাক করেছে। শফিউল্লাহকে ফোর্স পাঠাতে বলো।' তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকেও ফোন করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি তাকে বলেন, 'শফিউল্লাহ তোমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে, কামালকে (শেখ কামাল) বোধ হয় মেরে ফেলেছে। তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও।' জবাবে শফিউল্লাহ বলেন, 'আই অ্যাম ডুয়িং সামথিং। ক্যান ইউ গেট আউট অফ দ্যা হাউস?'
বঙ্গবন্ধুর কথা শোনার পরই কর্নেল জামিল বঙ্গবন্ধুর বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সঙ্গে ছিলেন নিজের গাড়িচালক আয়েনউদ্দিন মোল্লা। কিন্তু, পথেই সোবাহানবাগ মসজিদের কাছে তাকে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকরা। পালিয়ে বেঁচে যান আয়েনউদ্দিন। এদিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গেটের সামনে মহিতুল, নুরুল ইসলাম, আবদুল মতিন, পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যসহ অন্য সদস্যদের সারি করে দাঁড় করানো হয়। এর মধ্যে ঘাতকদের একজন পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যকে গুলি করলে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি পড়ে যান। এরপর ঘাতকরা গুলি করতে করতে ওপরে চলে যায়।
বংগন্ধুর সর্বশেষ প্রশ্ন
তোরা কী চাস?  কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?   বঙ্গবন্ধুর ঘরে তিনি ছাড়াও ছিলেন বেগম মুজিব, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, সুলতানা কামাল, রোজী জামাল। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ঘরের বাইরে অবস্থান নেয়। গোলাগুলি থামলে বঙ্গবন্ধু দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসলেই ঘাতকরা তাকে ঘিরে ধরে। মেজর মহিউদ্দিন ও তার সঙ্গের সৈন্যরা বঙ্গবন্ধুকে নিচে নিয়ে যেতে থাকে। ঘাতকদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, 'তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?' বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের কাছে মহিউদ্দিন ঘাবড়ে যায়। বঙ্গবন্ধু বলেন, 'তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবি, কী করবি- বেয়াদবি করছিস কেন?' এ সময় নিচতলা ও দোতলায় সিঁড়ির মাঝামাঝি অবস্থান নেয় বজলুল হুদা ও নূর। বঙ্গবন্ধুকে নিচে নিয়ে আসার সময় নূর কিছু একটা বললে মহিউদ্দিন সরে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে বজলুল হুদা ও নূর তাদের স্টেনগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। বঙ্গবন্ধুর বুকে ও পেটে ১৮টি গুলি লাগে। নিথর দেহটা সিঁড়ির মধ্যে পড়ে থাকে। সারা সিঁড়ি ভেসে যায় রক্তে।
রমাই প্রথম বেগম মুজিবকে জানায়, বঙ্গবন্ধুকে গুলি করা হয়েছে  
বঙ্গবন্ধুর পেছন পেছন রমাও যাচ্ছিল। কিন্তু, ঘাতকরা তাকে ঘরের মধ্যে চলে যেতে বলে। এর মধ্যে দোতলায় শেখ রেহানার ঘরে থাকা তার চাচা শেখ নাসের ওই কক্ষে যায়। তার হাতে গুলি লাগার ক্ষত ছিল। রমাই প্রথম বেগম মুজিবকে জানায়, বঙ্গবন্ধুকে গুলি করা হয়েছে। এ সময় ওই ঘরের বাথরুমে আশ্রয় নেন বেগম মুজিব, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, শেখ নাসের ও রমা। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে নিচে নেমে এসে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর পরই মেজর আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন তাদের সৈন্যসহ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আসে। আজিজ পাশা তার সৈন্যদের নিয়ে দোতলায় চলে যায়। তারা বঙ্গবন্ধুর ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা দরজায় গুলি করে। তখন বেগম মুজিব দরজা খুলে দেয় এবং ঘরের মধ্যে যারা আছে তাদের না মারার জন্য অনুরোধ করেন। ঘাতকরা বেগম মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে আসতে থাকে।      
বংগমাতার হত্যাকান্ড  
সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখেই বেগম মুজিব কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং চিৎকার দিয়ে বলেন, 'আমি যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেলো।' বেগম মুজিব নিচে নামতে অস্বীকৃতি জানান। ঘাতকরা শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে যায়। আর বেগম মুজিবকে তার ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। বেগম মুজিবসহ বঙ্গবন্ধুর ঘরে আগে থেকেই অবস্থান নেয়া শেখ জামাল, সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন। বেগম মুজিবের নিথর দেহটি ঘরের দরজায় পড়ে থাকে। বাঁদিকে পড়ে থাকে শেখ জামালের মৃতদেহ। রোজী জামালের মুখে গুলি লাগে। আর রক্তক্ষরণে বিবর্ণ হয়ে যায় সুলতানা কামালের মুখ।
শেখ রাসেলের আকুতি
ভাইয়া, ওরা আমাকে মারবে নাতো?  লাইনে দাঁড়িয়ে শেখ রাসেল প্রথমে রমাকে ও পরে মহিতুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরে বলে,  'ভাইয়া, ওরা আমাকে মারবে নাতো? পাশা মহিতুলের কাছ থেকে জোর করে তাকে দোতলায় নিয়ে যেতে বলে। আজিজ পাশার কথামতো এক হাবিলদার শেখ রাসেলকে দোতলায় নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে। রাসেলের চোখ বের হয়ে যায়। আর মাথার পেছনের অংশ থেতলে যায়। রাসেলের দেহটি পড়ে থাকে সুলতানা কামালের পাশে। পুরো ঘরের মেঝেতে মোটা রক্তের আস্তর পড়ে গিয়েছিল। এর মাঝেই ঘাতকের দল লুটপাট চালায়। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে সেদিন তার দু্থমেয়ে ছিলেন না। বড় মেয়ে শেখ হাসিনা স্বামীর সঙ্গে জার্মানিতে ছিলেন। ছোট বোন শেখ রেহানাকেও নিয়ে গিয়েছিলেন তারা।
পূর্ব ঘটনা
ঘাতকদের প্রস্তুতি  ১৯৭৫ সালের ১৪ আগষ্ট সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর ২ ফিল্ড রেজিমেন্টের যানবাহনগুলো সচল হয়ে ওঠে। ক্যান্টনমেন্টের দক্ষিণে অবস্থিত ইউনিট থেকে ১০৫এমএম কামানগুলোকে ভারি ট্রাক দিয়ে টেনে নির্মাণাধীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় নিয়মিত নৈশ প্রশিক্ষণের জন্য। রাত ১০টার দিকে সেনানিবাসের উত্তরপ্রান্ত থেকে বেঙ্গল ল্যান্সারের টি-৫৪ ট্যাংকগুলো ইউনিট থেকে বেরিয়ে পড়ে। এয়ারপোর্টে ১৮টি কামান ও ২৮টি ট্যাংক একত্রিত হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘাতক অফিসাররা সেখানে জড়ো হয়। ১৫ আগস্ট রাতের প্রথম প্রহরে মেজর ফারুক অফিসারদের নির্দেশ দেয় বিমানবন্দরের কাছে হেড কোয়ার্টারে স্কোয়াড্রন অফিসে মিলিত হতে। অফিসারদের আপারেশনের পরিকল্পনা জানায় মেজর ফারুক। সেই ছিল এই অপারেশনের দায়িত্বে। প্রধান টার্গেট বঙ্গবন্ধুর বাড়ি সরাসরি আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। ওই বাড়ি ঘিরে দুটো বৃত্ত তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। আরও সিদ্ধান্ত হয়, ভেতরের বৃত্তের সদস্যরা সরাসরি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণ করবে। বাহির বা ভেতর কোন আক্রমণ এলে তা ঠেকানোর দায়িত্বে দেয়া হয় বাইরের বৃত্তের সদস্যদের।  সিদ্ধান্ত হয় সবদিকের রাস্তা ব্লক করে রাখবে একটা দল। প্রধান টার্গেট বঙ্গবন্ধুর বাসা আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে ধানমন্ডিতেই শেখ ফজলুল হক মণি এবং আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় আক্রমণেরও সিদ্ধান্ত হয়। ডালিমকে বঙ্গবন্ধুর বাসায় আক্রমণের সময় উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করেন মেজর ফারুক। কিন্তু, পূর্বসম্পর্কের অজুহাতে বঙ্গবন্ধুর বাসায় আক্রমণে উপস্থিত না থেকে স্বেচ্ছায় সেরনিয়াবাতের বাসায় আক্রমণের দায়িত্ব নেয় ডালিম। ভারি মেশিনগান সংযোজিত দ্রুতগতির একটি জিপে রওনা দেয় ডালিম। সঙ্গে এক প্লাটুন ল্যান্সারসহ একটি বড় ট্রাক।
শেখ মণির বাসায় আক্রমণ
শেখ মণির বাসায় আক্রমণের দায়িত্ব দেয়া হয় রিসালদার মোসলেমউদ্দিনকে। তার সঙ্গে দেয়া হয় দু্ই প্লাটুন সৈন্য। এক কোম্পানি সেনাসহ রেডিও স্টেশন,  বিশ্ববিদ্যালয় ও নিউমার্কেট এলাকার দায়িত্বে থাকে মেজর শাহরিয়ার। একই সঙ্গে ওই গ্রুপকে বিডিআর থেকে কোন ধরনের আক্রমণ হলে প্রতিহত করার দায়িত্বও দেয়া হয়। ২৮টি গোলাবিহীন ট্যাংক নিয়ে শেরেবাংলা নগরে রক্ষীবাহিনীকে প্রতিহত করার দায়িত্ব নেন মেজর ফারুক নিজে। তবে ট্যাংকের মেশিনগানগুলোয় প্রচুর গুলি ছিল। মেজর মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণের জন্য ১২টি ট্রাকে সাড়ে তিনশ্থ সাধারণ সৈনিককে তৈরি করা হয়। মেজর রশিদের সরাসরি কোন আক্রমণের দায়িত্ব ছিল না। তার দায়িত্ব ছিল হত্যাকা- পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেয়া এবং সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সমন্বয় করা। তার নেতৃত্বে থাকা ১৮টি কামান গোলাভর্তি করে যুদ্ধাবস্থায় তৈরি রাখা হয়। কামানগুলো রক্ষীবাহিনীর হেড কোয়ার্টার এবং বঙ্গবন্ধুর বাসা লক্ষ্য করে তাক করা হয়। একটিমাত্র ১০৫ এমএম হাউইটজার কামান রাখা হয় আর্টিলারির মেজর মহিউদ্দিনের অধীনে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির উল্টো দিকে লেকের পাড়ে। দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার পর সবাইকে তাজা বুলেট ইস্যু করা হয়। ঘাতকের দল বিমানবন্দর এলাকা থেকে ভোররাত ৪টার দিকে ধানমন্ডির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ফারুকের নেতৃত্বে ২৮টি ট্যাংক বিমানবন্দর সড়কে বনানীর এমপি চেকপোস্ট দিয়ে সেনানিবাসের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এর মধ্যে ফজরের আজান পড়ে যায়। ফারুক তার ট্যাংক নিয়ে ৪৬ ব্রিগেড ইউনিটের লাইনের একেবারে ভেতর দিয়ে বাইপাস সড়ক ধরে সেনাসিবাসের প্রধান সড়কে চলে আসে। ঢাকা সেনানিবাসে সে সময়ে বিমানবাহিনীর যে হেলিপ্যাড ছিল, তার ঠিক উল্টো দিকের একটি গেট দিয়ে ফারুক তার ট্যাংক নিয়ে বিমানবন্দরের (পুরনো বিমানবন্দর) ভেতর ঢুকে পড়ে। এ সময় ফারুককে অনুসরণ করছিল মাত্র দুটি ট্যাংক। বাকি ট্যাংকগুলো পথ হারিয়ে জাহাঙ্গীর গেট দিয়ে ফার্মগেটের দিকে এগুতে থাকে। ফারুক এয়ারপোর্টের পশ্চিম দিকের দেয়াল ভেঙে রক্ষীবাহিনীর হেড কোয়ার্টারের সামনে উপস্থিত হয়। ভোর সোয়া ৫টার দিকে মেজর ডালিম ও রিসালদার মোসলেমউদ্দিনের নেতৃত্বে আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও শেখ মণির বাসা আক্রমণ করা হয়। শেখ মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে হত্যা করে ঘাতকরা। প্রাণে বেঁচে যান শেখ মণির ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ ও শেখ ফজলে নূর তাপস। ডালিমের নেতৃত্বে হত্যা করা হয় আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ১৪ বছর বয়সী মেয়ে বেবী, ১২ বছরের ছেলে আরিফ, চার বছরের নাতি বাবু (আবুল হাসনাত আবদুল্লার ছেলে), ভাতিজা শহীদ সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে আবদুল নইম খান রিন্টু (আওয়ামী লীগ নেতা আমীর হোসেন আমুর খালাতো ভাই), তিন অতিথি এবং চারজন কাজের লোককে।
শেষকৃত্য ও দাফন :  
পরের দিন ঢাকার স্টেশন কমান্ডার আবদুল হামিদ বঙ্গবন্ধুর লাশ ছাড়া ১৫ আগস্টে নিহতদের লাশ দাফন করেন। আবদুল হামিদ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবন থেকে কফিনে নিহতদের লাশ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে শেখ মণি ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারের সদস্যদের লাশ সংগ্রহ করে বনানী গোরস্তানে দাফনের ব্যবস্থা করেন। বনানী কবরস্থানে সারিবদ্ধ কবরের মধ্যে প্রথমটি বেগম মুজিবের, দ্বিতীয়টি শেখ নাসেরের, এরপর শেখ কামাল, সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজী জামাল, শেখ রাসেল, ১৩ নম্বরটি শেখ মণির, ১৪ নম্বরটি আরজু মণির, ১৭ নম্বরটি সেরনিয়াবাতের আর বাকি কবরগুলো সেদিন এই তিন বাড়িতে যারা মারা গিয়েছিলেন তাদের। ১৬ আগস্ট বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে বঙ্গবন্ধুর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় টুঙ্গিপাড়ায়। সেখানে তাকে দাফন করা হয় তার বাবার কবরের পাশে কিন্তু দাফনের পূর্বে যে ধর্মীয় বিধিবিধান তা পালন না করেই লাশের সাথে যাওয়া সেনাসদস্যরা জাতির পিতাকে কবরস্থ করতে আদেশ দিলেও স্থানীয় উপস্থিত ইমাম সাহেব ও অন্যান্য সবাই লাশ কবর দিতে অস্বীকৃতি জানালে বাধ্য হয়েই ঘাতকদের প্রতিনিধিরা মাত্র ১০ মিনিট সময় বেধে দেয়। ফলে একজন দৌড়ে গিয়ে পাশের মুদী দোকান থেকে একটা ৫৭০ কাপড় কাচা সাবান নিয়ে এসে সেই ৫৭০ সাবান দিয়েই বংবন্ধুকে যেন তেন গোসল করিয়ে সাদা পুরনো কাপড় দিয়েই বংগবন্ধুর লাশকে সমাহিত করা হয়েছিল।  বিমানবাহিনীর যে এমআই-৮ হেলিকপ্টারে বংগবন্ধুর লাশ বহন করা হয়েছিল তার পাইলট ছিলেন তদানিন্তন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (পরবর্তীতে এয়ার কমোডর) শমশের আলী যিনি এখনও বেচে আছেন ঐ সব করুন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হিসবে।  

সাঈদুর রহমান সাঈদ
মুক্তিযোদ্ধা বিমানসেনা
Email: এই ইমেইল ঠিকানা স্পামবট থেকে রক্ষা করা হচ্ছে।এটি দেখতে হলে আপনাকে JavaScript সক্রিয় করতে হবে।


জুলি রহমানের আটটি কবিতা

মঙ্গলবার, ০১ আগস্ট ২০১৭

Picture

১।বৃক্ষে বাকল যেমন

জুলি রহমান

বৃক্ষে যেমন বাকল থাকে
উরগে  থাকে ছলং!
তেমনি তোমার  আছে আবরণ
যা অনেকের অজানা!
তুমি যে কখন কোন রুপ ধারন করো
তা কেবল সেই অনুধাবন করতে পারে
যে তোমার ছোবলে ছোবলে বিষাক্ত

এবার তুমি আয়নায় দাঁড়াও!
দেখতে পাবে স্বয়ং তোমাকে
কিংবা নদীর জলে মুখ রাখো
আৎকে ওঠবে নিজের প্রতিবিম্বে!
এ ভাবে আর কতো ক্ষতি করবে তুমি
অপরের ,দেশের ,জাতির ,মানবের
মননের ,চিন্তনের ,ধী শক্তির?

তারচে বরং বৃক্ষের কাছে শিক্ষা নাও
কেমন এক খোলসেই সে আবৃত
চিরকাল ছায়ায় মায়ায় ঢেকে রাখে
মানব পাখিকূল পথিক !
আর তুমি!কেবলই খোলস পাল্টে চলো --

ডানবাম
জুলি রহমান

মানুষে মানুষে দেয়ালের কাহিনী বানাও তুমি?
অথচ জলের তরংগে ঢেউ তুলে ডাকো সাগর!
কী অদ্ভুত !বড়ো বেশী অবাক কথা
এ ভাবে অরনী ডেকে সুখ পাবে না
তারচে বরং গুনে যাও ঢেউ
যুগের নামতায় মিলে যেতে পারে
বিয়োগের বিষাক্ত সময়-

বুকের হাপড়ে কতোবার মেরেছো থাপ্পর?
উগলে দিয়ে স্বকীয় অহমের বাণী!
তুমিই শাদার জগতে বাকীরা তাম্র-
কৃষ্ণ ,?এটা নয় শালপ্রাংশু পরিচয়!
অথচ বাম ভেবে যাদের করছো ঘৃণা
তারাই মানব দখলে পৃথিবী করবে জয়--

সময় নিধন কারী হন্তারকগন
বুঝেনা জীবনের মানে
তাই পদে পদে করে যায় কাঁটার বিছানা
ক্ষতি নেই নদী কিংবা স্রোতধারার
যে চিরকাল বহতা ;বইবে আপন নিয়মে--

হায়রে ডানের মানুষ ;জীবনের পরিসর
ক্ষুদ্র অতি -না বুঝে জমজ কী আদল
অভিজ্ঞতার ঝুলি ঝেড়ে নিতে
আর কতো কাটাবে নিদাগী প্রহর?

শিক্ষার মান

জুলি রহমান

শিক্ষার মান বাড়াতে কেটেছে মগ্ন ত্রিকাল
বয়স বাড়াতে মোটেই লাগেনি সময়
তোমাকে বুঝতে যুগের পর যুগ
খোলা মাঠের গল্প বুনন পরিপাটী
বহু অংকুরে ফুটেছে কলি
কথারা বুমেরাং তাই যত্নে রাখা পাঁজরে---

মাঠ নয় দিগন্তের নীলে পেলব চাদর
জনতার ঢেউ লেগে কতোবার দোল খায় দক্ষিনা  হাওয়ার পাঠাগার
আর আমি সেই যে বসেছি অধ্যয়নে
তোমরা হাটে বাজারে ঈর্ষার পণ্য
ফেরী করে করে নাম নিয়ে কার
অহেতুক করছো দিন গুজার?

তারকা ইবন

জুলি রহমান

তাহলে একথা পাকা!
আসবে বসবে মান পাবে না।
হাসি হবে বাঁকা ঠোঁটে
দৃষ্টির কোশল তেরচা--

কূটনীতি ভেজাল ওষধি
চিরকালের সেবা যার
তাঁর সাথে বাদ বিস্মবাদ?
দুইশো বছরের গোলামীর কছম
হিমোগ্লোবিন নির্ভর যেথা--

আপনার ভাবনা বাতিল
এখন আমার চাল!
গুটি টা নড়ে বসলো আলবাৎ?
এটাই নিয়ম ন্যায় নীতি ভিটামিনহীন-

ভেতর কার আধার?
মেয়েলী স্বর বড়ো বেশী কটা
কয়েক পাতার বিদ্যা?
মা স্বরসতী দয়া করে ঘরের চৌকাঠে
না- মানে বিদ্যাধরির অরুচি বলে কথা--

ইতোমধ্যে উঠোন হাওয়া
বদলায় ঘোর ;তারকা ইবন বলে কথা!

সূর্যের পায়ে বেড়ি
জুলি রহমান

কী সব খেলছে আকাশ!
মেঘ কুমারীর আড়ি?
ঝাঁপসা চোখের নদী?
জল না জলতাংক বিমারী?

সূর্য্য প্রতাপী আকাশ সামিয়ানায়
বেঘোর বর্ষায় ধূয়ে যায় লবন শরীর
সাগরের ঢেউয়ে সেই গনিত ?
গভীর অরন্য দহনে জ্বলে
একলা যেমন জাগে শুকতারা

রাতের বাতাসে চেয়ে থাকে অন্ধ আকাশ!ফলত তাই হয়
পৃথিবীর পক্ষপাত দোষ?
সাক্ষী চারশ হাজার বছরের ইতিহাস!
সন্মানিত ঈভের এষণা--

এখন ঘর্মাক্ত কাদা না বৃস্টি
বিকেল না সকাল গীত না বাজনা
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা হিংস্র তীর্যক ফলকই
করবে হিসাব এই নক্ষত্র রাতের---

শব্দের শরীর
জুলি রহমান

জ্বলন্ত মেধা দেখে তাঁর সইলো না চোখ?
ছুঁড়ে দিলে বল্লম হাজার চাবুক!
অথচ কারিগর তুমিও ;তোমাদের পাথর মন
কী ভাবে গড়ো শব্দের বাগান ?
যদি না শরীর হৃদয় কথার কুহক!

মই সরানোর কারিগর বুদ্ধির জটে
তোমরা ঝানু অতি মানুষ বটে!
মানবের আদল নিলেই হয় কী মানুষ?
যতো বলি আমি নই সাতে পাঁচে
ততোবার ফেলো ঘোর প্যাচে--

শব্দের শরীরে যতোই মারো না কেনো তীর
নেহায়েত বিফল মনোরথ সফলের
বোবার শত্রু নেই জানে সকলে
ফাঁস হলে হতে পারে অলীক বিচারে
কতোবার ফেলে ডোমঘরে  ছুঁরি কাঁচি
বরফ ডেটল মৃতের ভৎসর্ণা কবলে--

এখন বুঝেছো নিশ্চয়ই ?শব্দের শরীরের নেই ক্ষয়!যতোক্ষণ জীবন আছে
শ্বাসের ঘরে দেবার তালা
তোমার তোমাদের নেই অধিকার!
আমার শব্দ শরীর নিয়ে আর করোনা
বেরশিক কাব্য কোনো
ইতিহাস করবেনা ক্ষমা আমি করলেও---

জিহবা শরীর
জুলি রহমান

এবার কেটে ফেলো জিহবা
যেনো আর কখনো উচ্চারিত না হয়
সত্যের উদ্ভাসন ;অলীকত্তে গড়বো পৃথিবী
সত্যকে জবাই করো আধুনিক কৌশলে--

ছল চাতুরী শিখে নাও পাখি ঠোঁটে
আকাশে ছড়াও অগ্নির ধোয়া
মুছে ফেলো বৃস্টির পারিজাত সংস্কৃতির ধ্বস
অপসংস্কৃতির ঢোল তবলায় সরোদে সুর
ধর্মের দোহাই ময়না আমার ;ঘোমটা তোলো মাথায়
নচেৎ কর্তনে গর্দান ফেলো মাটিতে--

আজ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর পূর্বেও
নাদের শাদা টুপিতে ঢেকে মস্তক
নারীর বস্ত্রের বাগান করেছিলো লুট
লুটেরা কামুক পুরুষ !
তবে কোথায় ডিজিটাল?যদি আজো তারা ফেলে লালা ফ্রকের তলায়!

ওদের আলজিব হেঁটে বেড়ায় গুপ্ত নগরে
তাইতো বারো কিংবা তাঁরও কম নারী শিশু হয় বলাৎকার
মিথ্যের দম্ভে ফাঁসির দড়ি হাসে
লুট হয় ডেস্টিনি ,শেয়ার বাজার,ব্যাংক
সত্য ঝুলে পড়ে সেলিং ফ্যানে---

অসহায় দারিদ্র বুক চাপড়ে মরে ডিজিটাল যুগে!
স্বাধীনতার শরীরে বারুদ বাতাস
মুক্তির পা নেই ;খুটিয়ে চলে সত্য ছলে
আবার তুমি সত্য বলবে?খুনের পয়গাম পাঠাবো তবে -যেমন ব্লগার মরে রাস্তায় পড়ে কিংবা আইরিন!


নস্ট্রালজিয়া
জুলি রহমান

শ্রদ্ধেয় দেশ বরেন্য প্রয়াত কবি শহীদ কাদরী স্নরণে-

আমি এক ভবঘুরে
ঘুরে বেড়াই নিয়ম ভেঙে-
নিউবোল্ড থেকে নিউরেশল
দেখি কবি শহীদ কাদরী!

দাঁড়িয়ে আছেন দক্ষিণে চোখ মেলে
সেই সুবাদে আমি উত্তরে
যতোবার দেখেছি তাকে হুইল চেয়ারে
বেধ ,প্রস্থ ,উচ্চতার পরিমাপ না জানলেও
দৃস্টির নিপুনতা বলে দাঁড়ালে উনাকে
এমনি লাগতো

পূর্ব পুরুষের পারলৌকিক অভিজ্ঞানে
মানুষেরা বিশ্বজুড়ে
একই আদলে গোত্রজাত
তাই নির্দ্বিধায় বলতে পারি উনি কাদরীই হবেন--

নিমিশেই উত্তর আমাকে ছিটকে ফেলে দক্ষিণে
আপনি এখানে?নিরুত্তর উনি
একবার তাকিয়েও দেখলেন না!
কেননা উনি এখন পুরোপুরি আলোর গভীরে--

কর্ণকোহরে বেজে ওঠে হঠাৎ।
নীরা ,জুলি এসেছে !স্নৃতির সিম্ফনি।
চশমার স্বচ্ছ কাঁচে জল জমা হতেই
গাড়ির হর্ণ বেজে ওঠে
লাইট পোস্টটি তখন দিকনির্দেশনায়-


ভণ্ড কবির কাঁহন= রবিউল ইসলাম

মঙ্গলবার, ০১ আগস্ট ২০১৭

কে বলেছে নেই প্রয়োজন যোনতার ?
বংশ বৃদ্ধি দ্বার ঋদ্ধি দাবী স্বভাব মাতার ।
কাম ক্ষুধা সাঁইর সুধা লজ্জা কি কারণে ?
সুধা ছাড়া প্রেরণা হারা বন্ধ্যা ভুবনে ।
তাই বলে কি রীতি ধর্ম যাব সবাই ভুলে ?
সভ্যতা শিষ্টাচার দিয়ে রসাতলে ?
এ আবার কেমন কবি হয়ে বর্ণবাদী,
মৌলবাদী জাতিদ্বেষীর মানায় এই উপাধী ?
কবি করে স্বপ্ন ফেরি স্বপ্ন দেখতে শেখায়,
আগামীর স্বর্গ স্বমাজ কত দূরে রয় ?
খাঁচায় পুরে স্বপ্ন কেড়ে কবির তো কাজ নয় !
দানব যদি হয়গো কবি ভরসা কোথায় রয় ?
সৃষ্টি হবে ওলটপালট স্বভাব লঙ্ঘনে,
স্বভাব মাতার অমোঘ বিধান নিয়ম শাসনে ।
নারী হবে দাসীবাঁদী রান্নাঘরই স্থান,
স্বাধীনতা অশালীনতা শরীয়া লঙ্ঘনে ।
স্বাধীন হলে সুবিধামত খাঁচা থেকে বের করে,
কেমন করে মযহারের গং পশুখাদ্য করে ?
হেফাযত-মযনুর ইসলাম প্রীতি শুধুই কপটাচার,
রক্ষিতা ভোগ, ভ্রূণ হত্যা কোন্‌ ধর্মাচার ?
তনয়ার উচ্চবিদ্যা, দেশী নারী পায় বঞ্চনা,
মোদের ভাগ্যে যত ফতোয়া, সমাজ শাসন মানা ।
কন্যা হলে নাই যে অবাধ মেলামেশার গুণাহ্‌,
ইস্যু তখন হয়ে উঠে স্বতন্ত্র চেতনা !
এলিট শ্রেণীর বনেদী গুণে শরীয়া ভেসে যায়,
শরীয়া শুধু গরীব শাঁসায়, উন্নতির অন্তরায় ।
দূরালাপনীর বিনোদনী জীবন্ত আলাপনে,
বড় বড় ধর্ম কথার আঁতেলী ভাঁষণে,
ফরহাদ মযহার ভণ্ড কবি ধূর্ত মুখোশ পরে,
সত্য নাহি রহে গোপন, নরক বেরিয়ে পড়ে ।
রঙ্গী তুমি জঙ্গিসঙ্গী, সুশীল ভেকধারী,
অন্তসারশূন্য, মুখে শাস্ত্র ফুলঝুরি ।
কবি-রবিউল ইসলাম, নিউইয়র্ক প্রবাসী কবি ।


হিন্দুজঙ্গিদের শসস্ত্র ট্রেনিং এবং….............আবু জাফর মাহমুদ

মঙ্গলবার, ০১ আগস্ট ২০১৭

আসাম বা অসম প্রদেশে কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক দল ভিজেপি তার জঙ্গিকর্মীদেরকে শসস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছে প্রকাশ্যে।গণতন্ত্র হত্যা ও মানবিক চেতনার উপর আদিম বর্বরতার বিষাক্ত নখ বিস্তারের  এই মহড়াকে হিন্দুজঙ্গিত্বের নির্লজ্জ মহড়া বলছেন বিশ্লেষকরা।বাংলাদেশের সিলেট সীমান্তের এই প্রদেশের সামাজিক রাজনৈতিক ধারায় উগ্রবাদী পৃষ্ঠপোষকতার ফলে দ্রুত পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে ভয় ভীতির প্রভাবে।এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সিলেট সহ ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত জেলাগুলোয় নিরাপত্তাহীনতা আরো বেড়ে জনজীবনের অনিশ্চয়তার ধাপ এখন তুঙ্গে ওঠার পথ নিয়েছে।সীমান্ত থেকে শিল্প ও বন্দর এলাকাগুলো পর্যন্ত এই দীর্ঘ অর্থনৈতিক গতিপথে যে অস্থিরতার উত্থান করানো চলছে,তার প্রভাব ফুটে উঠছে  সকল বাসা বাড়ীতেও।
 এমনকি ভারত-বাংলাদেশে আমেরিকা,চীন রাশিয়া এবং ইওরোপীয় স্বার্থরক্ষার সামনে প্রধান বাধা হয়ে উঠছে।হিন্দু জঙ্গিবাদ দক্ষিণ ও দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়ায় নিরাপত্তাগত হুমকির প্রধান উপসর্গ হয়ে উঠেছে।মধ্য এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে এই জঙ্গিরা মুসলমান ছদ্মনামে যে পাশপোর্ট ও আইডি নিয়ে স্যাবোটেজ করছে তার সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে,ব্যাপকতা দেখা দেবে অন্যান্য অঞ্চলেও।বিশ্লেষকরা একথাও আভাস দিচ্ছেন,এই জঙ্গিবাদ ভারতীয় সমাজকে খন্ডিত করতে বাধ্য করতে চলেছে।           
 ভারতে এই জঙ্গিবাদী থাবায় হিন্দু-মুসলমান,হিন্দু-খৃষ্টান,হিন্দু-আদিবাসী ও হিন্দু- বাঙালির রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িকতা বিস্তারের ফাঁদ থাকার প্রমাণ প্রতিদিন পাওয়া যাচ্ছে। প্রকৃত অর্থে কেন্দ্রীয় সরকারের এই পলিসি হচ্ছে,স্থানীয় জনজীবনকে হানাহানিতে ব্যস্ত রেখে লুণ্ঠনের নতুন অধ্যায়ের পথ সহজ করা।অঞ্চল জুড়ে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস বিস্তার করে ভারতীয় আধিপত্যনীতি কার্যকর করা।একই সাথে সমগ্র অঞ্চলকে অশান্তি ও অস্থিতিশীলতার উত্তাপের চূলোয় রূপান্তর করা।উক্ত মধ্যযুগীয় কৌশলগত উত্যক্তের কড়া অভিযোগের চাপে মলিন হয়ে গেছে মোদী সরকারের মুখ।যার প্রেক্ষিতে ভারতে আভ্যন্তরীণ রাজনীতি আবার সংঘাতময় হয়ে উঠেছে।এবার সংঘাত চালুকারীর ভূমিকা নিয়েছে বিজেপি জোট সরকার নিজেই।
 কথা হচ্ছে,নিজ দলীয় লোক অথবা দলের প্রতি আগ্রহীদেরকে শসস্ত্র প্রশিক্ষণ করার এই রীতিনীতির সাথে গণতান্ত্রিক রাজনীতির সামান্য সংস্রবও নেই।তাই,কেন্দ্রীয় সরকারের বা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এই শসস্ত্র নীতি চালুর বিষয়টি নিয়ে ভারতের মিত্র এবং শত্রু দেশগুলোর দুশ্চিন্তাও যৌক্তিক।ভারতীয় সীমান্ত এবং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষুদ্র দেশগুলোর দুশ্চিন্তা ও নিরাপত্তাহীনতার ভয়ের তাপে মাত্রা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে।
এইভাবে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোয় নাগরিকদেরকে জঙ্গি বানানোর খোলা নীতি এবং বিজেপিহীন রাজ্যগুলোয় রাজ্য সরকারগুলোর বিরোধীতার অজুহাতে জঙ্গিবাদী চিন্তাধারাকে উৎসাহিত করায় আমেরিকা সহ  অন্যান্যদেশে ভারতীয় নাগরিকদের প্রবেশাধিকারে নিয়ন্ত্রণ চালু করার বিবেচনা দরকার।এই জঙ্গিরা যেকোন দেশে স্যাবোটাজ বা অন্তর্ঘাত করছে ছদ্মবেশে।জঞ্জীবনে হুমকি যেকোন দেশের জন্যে।হিন্দু জঙ্গিরা খৃষ্টানদের মুসলমানদের,আদিবাসীদের সহ সবাইকে হত্যা করছে,বসত ভিটা থেকে উচ্ছেদ করছে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে।এদের এই বিদ্বেষনীতি বিশ্বমানবতার শত্রুতা।এই ভয়াবহ রাজনৈতিক জঙ্গিত্বকে যত শীঘ্রই সম্ভব নিরুৎসাহিত করা জরুরী।      
 ভারতের বিজেপি শাসিত অসমে উগ্রবাদী বজরং দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কর্মীদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে কংগ্রেস। বৈধ লাইসেন্স ছাড়া অস্ত্র ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছে দলটি। ২৯জুলাই শনিবার অসম প্রদেশ কংগ্রেস দলের প্রধান রিপুন বোরা গণমাধ্যমকে বলেছেন, দু’টি ডানপন্থি সংগঠন তাদের সাংগঠনিক কাজের অংশ হিসেবে নিজ সদস্যদের হোজাইয়ের গীতা আশ্রমে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।  বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নারী শাখা ‘দুর্গা বাহিনী’র কর্মীরাও নলবাড়িতে একইভাবে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
বলাবলি হচ্ছে,ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশে হিন্দুজঙ্গিত্বের উৎপাত বাড়িয়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আগ্রাসনের চাপ বৃদ্ধির তৎপরতা এখন ভারতীয় লুটেরাদের।তাদের এই সন্ত্রাসী ধারাটির লক্ষণ কোনো যুক্তিতেই গণতন্ত্রের কল্যাণের কাজ নয় বলে সব মহল থেকে সমালোচনা আসছে।আসাম সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের জনগণকে পারস্পরিক হানাহানি ও রক্তপাতে ডুবিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ বিদ্বেষ নীতি চালু হয়েছে বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।    
 কংগ্রেস নেতা রিপুন বোরা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এক স্মারকলিপি দিয়েছেন। তাতে লাইসেন্স ছাড়া অস্ত্র ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।তিনি অস্ত্র প্রশিক্ষণের এক ভিডিও চিত্রও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন।বলেছেন রাজ্যের ভিজেপি সরকার এব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না ।   
 একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ফুটেজে দেখা গেছে,অসমের হোজাইতে একটানা ১০ দিন ধরে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দুর্গা বাহিনীর অস্ত্র প্রশিক্ষণ শিবির চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কয়েকদিন আগে অসমে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দুর্গা বাহিনীর অস্ত্র প্রশিক্ষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি দুর্গা বাহিনীর বন্দুক প্রশিক্ষণকে মারাত্মক প্রবণতা বলে মন্তব্য করেন।
 পশ্চিমবঙ্গের সিপিআইএম নেতা সুজন চট্টপাধ্যায় বলেন, "ভারতে যেভাবে আরএসএসের পরিকল্পনায় বিভিন্ন বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে বিজেপি চলছে,তা খুবই বিপজ্জনক।কোথাও বিজেপি-আরএসএসের নামে লাঠি খেলা ও তার প্রশিক্ষণ শিবির, কোথাও দুর্গা বাহিনীর নামে অস্ত্র প্রশিক্ষণ চলছে। আমরা পশ্চিম বাংলাতেও দেখেছি গত কয়েকদিন আগে রাম নবমীতে স্কুল ছাত্রীদের কীভাবে তলোয়ার দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেয়া হয়েছে।’
 গত এপ্রিল মাসে রাম নবমীতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় গেরুয়া শিবিরের পক্ষ থেকে তলোয়ার হাতে নিয়ে মিছিল করে শক্তি জাহির করা হয়। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের এক নেতা অবশ্য কোনো সমালোচনাতেই কান দিতে রাজি নন। পশ্চিমবঙ্গেও প্রয়োজনে দুর্গা বাহিনী বন্দুক হাতে তুলে নেবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।তিনি বলেন, এখনো আমরা বিষয়টি নিয়ে ভাবিনি তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী আগামীতে ওদেরকে আমরা বন্দুক প্রশিক্ষণ দেব। অন্যদিকে, বিএসপি নেত্রী মায়াবতী আজ বিজেপিকে ক্ষমতালোভী দল বলে মন্তব্য করেছেন।
  তিনি বলেন, বিজেপি অন্য দলের বিধায়ক,এমপিদের ভাঙিয়ে গণতন্ত্রের মর্যাদা লঙ্ঘন করেছে।মায়াবতী বলেন, মণিপুর, গোয়া, বিহার, গুজরাটের পর উত্তর প্রদেশে যা হয়েছে তাতে বলা যায় বিজেপি দেশের গণতন্ত্রের জন্য বিপদ। ভারতের উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব বলেছেন, বিজেপি বিহার থেকে উত্তর প্রদেশ পর্যন্ত রাজনৈতিক দুর্নীতিতে লিপ্ত রয়েছে। আজ (শনিবার) উত্তর প্রদেশের রাজধানী লক্ষনৌতে ওই মন্তব্য করেন তিনি।


নষ্ট্রালজিয়া = জুলি রহমান

শুক্রবার, ২৮ জুলাই ২০১৭

Picture

জালাল তোমাকে নিয়েতো আর পারিনা।
আমার চোখের কোনে বর্ষা ডেকো না!
আমরা কবেই ফেলে এসেছি অতীতের কথন;
যেমন আকাশে উড়াতাম ঘুড়ি মাটিতে তাঁর পতন---

সুরমা নদীর কূলে পানিতে পানসি ভাসে।
তোমাকে আমাকে খোঁজ করে কতোজনে আসে।
উদোম মাঠের দিগন্তের সীমানা আঁকতেই;
নজর তোমার যুবতীর কলসীতেই---

একথা বিলাতে কানে কানে কতো টান পড়ে,
বলতো বড়দা আহা বেচারার কর্ণ যাবে ছিঁড়ে।
মটর শুটির ক্ষেত মাড়িয়ে আমরা কতোবার!
দৌঁড়ের হাজার পথ মাড়িয়েছি দীঘল দীঘির পারাবার---

কাটতো যখন স্কুল ছুটির সেই সোনালী দিন!
সকাল দুপুর ডানকীনা আর খল্লার ঝাঁকে সময় করে লীন।
দিনের শেষেই দুজনেই খেতাম কতোশতো বকা;
কিভাবে বুঝাবো বাবা মাকে আমরা তো নই খোকা---

এখন তোমার অন্য জগৎ স্বর্গের ঠিকানা
তবুও আমাকে করছো জ্বালাতন ভোলা যায় না;
আমার চোখের ঘুম নিলে ;ক্ষুধা নিলে।
চোখের লবন কেড়ে নিয়ে নদী দিলে--

পুরনো দিনের স্নৃতি জ্বেলে ষাটের বছর পর।
জগৎ আঁধার সর্বহারা করলে এই অন্তর।
স্নৃতির ঘোরের এই যে জ্বালা ,বুঝলেনা তো তুমি!
আমার আগেই তোমাকে তুলে নিলো অন্তর্যামী---


এক সিলেটি কবি জালাল উদ্দীনের বন্ধু জালালকে হারানোর মর্ম বেদনার
চিত্র।কবিতাটি অক্ষর বৃত্তে অন্তমিলে।


গণস্বপ্ন ২০২০ ও গণস্বপ্ন ২০৫০ নিয়ে নকলবাজি ও ছোটাছুটি; ---হাকিকুল ইসলাম খোকন

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই ২০১৭

গণস্বপ্ন ২০২০ ও গণস্বপ্ন ২০৫০ নিয়ে নকলবাজি ও ছোটাছুটি;
‘গ্রামীণ দেশ’ থেকে ‘গ্রামীণ-নগরীয় দেশ’ থেকে ‘নগরীয় দেশ’;
‘গ্রাম সরকার’ ও ‘উপজেলা পরিষদ’ কেন্দ্রিক মিথ ও কুফলগুলো;
৬১টি জেলা পরিষদ কি করছে, তা কি জনগণ জানে?
২০৫০ সাল হচ্ছে টার্নিংপয়েন্ট, এমপো হচ্ছে একুশ শতকীয় তন্ত্রমন্ত্র;
স্থানীয় সরকারের প্রকার, স্তরসংখ্যা ও গন্তব্য ঠিক করা কেন জরুরি  ---হাকিকুল ইসলাম খোকন

আগে স্থানীয় সরকারের প্রকার, স্তরসংখ্যা ও শেষ গন্তব্য কেন ঠিক করতে হবে তা জানতে হলে, বুঝতে হলে বিদ্যমান স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও এর অতীত সম্পর্কে ভাল ধারণা থাকতে হবে; পাশাপাশি অতীতে স্থানীয় সরকারকে নিয়ে অবৈধ শাসকদের অসৎ উদ্দেশ্যমূলক কর্মকান্ড, তার ধারাবাহিকতা, কুফলগুলো ও মিথগুলো কিভাবে জনগণ, সরকার, রাজনৈতিক দল, সুশীলসমাজ ও এনজিওগুলিকে প্রভাবিত করে চলেছে তাও ভালভাবে জানতে হবে, বুঝতে হবে। এই লেখাটি অবয়বে ছোট্ট রাখতে কেবল বাংলাদেশ আমলের দুইজন অবৈধ শাসক এর অপকর্মের স্মারক হিসেবে “উপজেলা” ও “গ্রাম সরকার” সংক্রান্ত মিথগুলো ও এগুলোর কুপ্রভাব কীভাবে গোটা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে সাংঘাতিকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে, করছে তা জানার, বুঝার প্রয়াস নেয়া যেতে পারে। এই প্রয়াসের মধ্য দিয়ে আগে স্থানীয় সরকারের প্রকার, স্তরসংখ্যা ও গন্তব্য কেন ঠিক করতে হবে তা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যাবে বলে আশা করা যায়। সেসঙ্গে এই নিবন্ধে সামগ্রিকভাবে স্থানীয় সরকার বিষয়ক অনেক দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গক্রমে উপস্থাপিত ও আলোচিত হয়েছে। তাতে ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল নাগাদ পরিবর্তনশীল বিষয়গুলি (জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষিত) বিবেচনায় নিয়ে প্রণীত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১, স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২, নরনারীর গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়ন বিষয়ক বৈশ্বিক ফর্মুলা এমপো, এমপো আলোকে বাংলাদেশ প্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রণীত ১১ দফা ও সমাধানমূলক অন্যান্য উপায়গুলো জানতে, বুঝতে সহজতর হবে। স্তরবিন্যাসকরণ ১ ও ২, এমপো ও ১১ দফা এই নিবন্ধের শেষে সংযুক্ত করা রয়েছে; এগুলোতে শুরুতে পাঠকপাঠিকা একটু চোখ বুলিয়ে নিলে এই নিবন্ধটি বোঝতে বিশেষভাবে উপকৃত হবেন; এবং ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারিতে ঢাকায় উপস্থাপিত ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’টি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা, এর সুদূরপ্রসারী উপকারীতা ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে সহায়ক হবে। স্থানীয় সরকারের প্রকার ও শেষ গন্তব্য সঠিকভাবে বুঝা ও ঠিক হওয়া কেন জরুরি তা যেমন স্পষ্টভাবে বুঝা যাবে;  আবার তা বুঝা ও ঠিক হওয়ার সঙ্গে কেন সঠিকভাবে স্থানীয় সরকারের স্তরগত কাঠামো নির্ধারিত হবার বিষয়টি যুক্ত রয়েছে তাও স্পষ্ট হবে; ১৯৯৬ সালে প্রণীত এবং ১৯৯৭ সালে ১৩ জানুয়ারীতে উপস্থাপিত এই রূপরেখায় নির্দিষ্ট সময় বিবেচনায় ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল নাগাদ স্থানীয় সরকারের গন্তব্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, স্থানীয় সরকারের প্রকারভেদকরণ ও স্তরবিন্যাসকরণ কি অবস্থায় গিয়ে পৌঁছাবে, বাংলাদেশ সার্বিকভাবে কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র, গণতন্ত্রায়ন, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, যোগাযোগ ও সমাজ কোন স্তরীয় হবে, এখনকার বাস্তবতায় এসবের দৃশ্যমান অবস্থা কতটুকু বোধগম্য হচ্ছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে, সুস্পষ্টভাবে জানা যাবে, বোঝা যাবে; যদিও ১৯৯৭ সালে অনেকেই এসব উপস্থাপিত আইডিয়া, ভিশন, মিশন, গোল ও উদ্দেশ্যকে কেবলই কাল্পনিক অবাস্তব বলে মনে করতো। এই নিবন্ধে একসময়ের কৃষিজ সমাজ, কৃষিপ্রধান দেশ তথা গ্রামীণ দেশ থেকে বর্তমানকার গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ তথা গ্রামীণ-নগরীয় দেশ এবং গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ থেকে পরিপূর্ণ নগরীয় সমাজ তথা পরিপূর্ণ নগরীয় দেশ তথা পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ মুখী পরিবর্তনসমূহ ও সময়ের সাথে সাথে রূপান্তর প্রক্রিয়াটির চলমান অবস্থা বোঝা যাবে, জানা যাবে; তা জানা, বোঝা ও নির্দিষ্ট সময় ভিত্তিক ভবিষ্যৎ অনুমানে ঘোষিত ফোরকাস্টের সঙ্গে স্থানীয় সরকারের জন্য প্রস্তাবিত প্রকারভেদকরণ ও স্তরবিন্যাসকরণ বিষয়দ্বয় ভালভাবে বোঝা ও জানার সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে কেন জড়িত রয়েছে তা পরিষ্কার হবে। স্থানীয় সরকারের একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ গ্রহণ ও তা একইসঙ্গে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জোর না দিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে একেক সময় একেকটি ইউনিট (যেমন কখনও গ্রাম, কখনও ওয়ার্ড, কখনও উপজেলা, কখনও জেলা) নিয়ে প্রবল টানাটানি ও হইচই করা হয়েছে, হচ্ছে; দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এই বিষয়টি বৈধ-অবৈধ সব শাসকদের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়; তারই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক কালে অসফল অর্থমন্ত্রি মুহিত সাহেবও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় কেবল জেলা ও জেলা বাজেট নিয়ে অনুরূপ হইচই, টানাটানি করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছেন, যেটি মন্ত্রিসভা ও জাতীয় সংসদ বাকহীন থেকে অনুমোদন দিয়ে চলেছে; এখানে সেই বিষয়টি ও দুইজন অবৈধ শাসকের অপকর্মমূলক, অপরাধমূলক বিষয় (এরশাদের উপজেলা ও জিয়ার গ্রাম সরকার) আলোচনায় সমালোচনায় এনে তা গভীরভাবে জানার, বোঝার প্রয়াস নেয়া হল।
অবৈধ শাসক এরশাদ প্রবর্তিত উপজেলা হচ্ছে মূলত একটা মিথ, একটা মিথ্যা নোশান এবং এটি বেশ দায়দায়িত্বহীন, স্বশাসনহীন একটি মধ্যবর্তী প্রশাসনিক ইউনিট। উপজেলা নামকরণটিও সার্থক ও যথার্থ নয়; দেশের আইনকানুন ও বইপুস্তকে বর্ণিত এর সংজ্ঞাটিও বাস্তবতার নিরিখে সঠিক নয়। অথচ গোটা জাতি এই মিথ, এই দায়দায়িত্বহীন ইউনিট, এই স্বশাসনহীন মধ্যবর্তী ইউনিট, এই অসার্থক নামকরণ আর ভুল সংজ্ঞার বেড়াজালেই ঘুরপাক খেয়ে চলেছে। এই বিষয়গুলো বিশেষভাবে তলিয়ে দেখলে তা বুঝতে কারও অসুবিধা হবার কথা নয়; কিন্তু তা বুঝতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রীপরিষদ, নিকার, একনেক, পরিকল্পনা কমিশন ও জাতীয় সংসদ’র বেশ অসুবিধা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। অনুরূপভাবে আরেক অবৈধ শাসক জিয়া প্রবর্তিত ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ এবং পরবর্তীতে একে ঘিরেই ‘পল্লী পরিষদ,’ ‘গ্রাম সভা,’ ‘গ্রাম পরিষদ,’ ‘গ্রাম সরকার’ ও ‘ওয়ার্ড সভা’ নিয়ে গোটাদেশ মিথ্যা নোশানের বেড়াজালে ঘুরপাক খেয়েছে, খাচ্ছে; ইউনিয়নের মধ্যে অবস্থিত প্রতিটি গ্রাম কেন্দ্রীক কিংবা প্রতিটি ওয়ার্ড কেন্দ্রীক এসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট নিয়ে এক সময় প্রচুর মাতামাতি, লাফালাফি হয়েছে, এখনও মাঝেমধ্যে হয়; সবাই ভালভাবে জানে যে, তাতে কাজের কাজ কিছু-ই হয়নি, হবার নয়া। দেশের এই দু’জন অবৈধ শাসক (প্রেসিডেন্ট জিয়া ও প্রেসিডেন্ট এরশাদ) এর সাংঘাতিক অপকর্ম আর হিমালয়সম দুর্নীতির স্মারক হিসেবে এই গ্রাম সরকার ও উপজেলাকে নিয়ে গোটা জাতির প্রচুর মাতামাতি ও লাফালাফিটা ইতিহাসের পাতায় জাতিগতভাবে ও সমষ্টিগতভাবে ভুল করার, ভুলের মধ্যে ডুবে থাকার এক মহা জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে থাকবে। এবং এর মাধ্যমে জনগণও যে সমষ্টিগতভাবে ভুল করতে পারে, ভুলের মধ্যে ডুবে থাকতে পারে তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল; তাতে, জনগণ ভুল করেনা, জনগণ ভুল করতে পারেনা-এই ধরনের আপ্ত বাক্য যাঁরা কথায় কথায় বলে থাকেন, তাঁদেরও বোধদয় হবে বলে আশা করা যায়।
‘উপজেলা’ কেন একটা মিথ, কেন একটা মিথ্যা নোশান, কেন মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে এটি বেশ দায়দায়িত্বহীন থাকছে তার কারণগুলি ভালভাবে জানা ও বোঝাই জরুরি নয়, পাশাপাশি, এই মিথ্যা নোশানের বেড়াজাল থেকে গোটাদেশ যেন বের হয়ে আসতে পারে তার জন্য সঠিক করণীয় ঠিক ও তা বাস্তবায়ন করাও খুবই জরুরি কর্তব্য। মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনিক ইউনিটগুলির মধ্যে উপজেলা হচ্ছে অন্যতম মধ্যবর্তী ইউনিট। এর উপরে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট যেমন জেলা ও বিভাগ, এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট যেমন ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড, এবং কোনো কোনো জেলায় এর পাশে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট সিটি কর্পোরেশন; এই অবস্থাটা হচ্ছে একটি চরম হ-য-ব-র-ল অবস্থা। এসব স্থানীয় ইউনিটগুলোর মধ্যে উপজেলায় অর্পিত ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিলে সেসব অর্পণ উপযুক্ত ও যথাযথ বলে মনে হয়না; স্থানীয় ইউনিটগুলির, স্থানীয় সরকারগুলোর এমনতরো এলোমেলো, গোজামিল অবস্থা কারও কাছেই কোনোভাবেই কাম্য নয়; তাই আমরা সবসময় বলি যে, এই এলোমেলো গোজামিল অবস্থার নিরসনকল্পে স্থানীয় সরকারের একটি সঠিক ও সমন্বিত স্তরবিন্যাস তথা স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো আগে গ্রহণ করতে হবে; সেই গৃহীত প্রশাসনিক কাঠামোয় সর্বাদিক গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট (জেলা সরকার কিংবা বিভাগীয় সরকার) ও সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয়কে (একদিকে গ্রামীণ এলাকায় ‘ইউনিয়ন সরকার’ ও  অপরদিকে নগরীয় এলাকায় ‘নগর সরকার’) কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে হবে; তা না করে স্থানীয় ইউনিটগুলি ও স্তরগুলির এলোমেলো অবস্থা বজায় রেখে, স্থানীয় ইউনিটগুলির অসঠিক প্রকারভেদকরণ বজায় রেখে, স্থানীয় ইউনিটগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ইউনিট ও সর্বনি¤œ ইউনিটদ্বয় ঠিক না করে এবং তাতে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে কেবল একটি মধ্যবর্তী ইউনিট তথা ছাগলের তৃতীয় বাচ্চা তুল্য উপজেলাকে নিয়ে গোটাদেশ অতি উৎসাহ, অতি মনোযোগ, অতি তৎপরতা দেখিয়ে আসছে; ফলে এই উপজেলার জন্মলগ্ন থেকে প্রতিটি নির্বাচনে প্রতিটি উপজেলায় সংশ্লি¬ষ্ট পদপ্রার্থীদের সহিংস কর্মকান্ড অতি মাত্রায় চলে আসছে। পাশাপাশি, হীন রাজনৈতিক স্বাথর্, ব্যক্তি বিশেষের প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্নীতি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, নিকার ও একনেক’র অদূরদর্শি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে উপজেলার সংখ্যা কমে আসার পরিবর্তে এর সংখ্যা বেড়েই চলেছে, এবং আরও নতুন নতুন উপজেলা গঠনের প্রক্রিয়া, প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে; তাতে প্রশাসনিক সিস্টেম কস্ট বাড়ছে; উন্নয়ন ও সেবামূলক ব্যয়ে ঘাটতি থাকছে। অথচ বাংলাদেশে উপজেলার সংখ্যা বাড়ানোর অপ্রয়োজনীয়তা নিয়ে সিডিএলজি, বাপসনিউজ ও এমপো বাস্তবায়ন ফোরাম ছাড়া অন্য কারও বক্তব্য শোনা যায় না; এ এক আশ্চর্য ব্যাপার নয় কি? সাধারণত মনে করা হয়, নতুন নতুন বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন গঠন করাটাই হচ্ছে “উন্নয়ন”! এই ভ্রান্তি আর মিথ কবে শেষ হবে? আয়তনে ছোট্ট একটা দেশে আর কত বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন গঠন করতে হবে?
সে যাই হোক, বাস্তব ঘটনাগুলো হল, উপজেলায় তেমন কোনো কাজকর্ম নেই, দায়দায়িত্ব নেই, এতে পরিপূর্ণ স্থানীয় সরকার কাঠামো নেই, স্বশাসন নেই, এর নিজস্ব আয়ের তেমন কোনও উৎস নেই, নিজস্ব রাজস্ব আয়ের উৎস সৃষ্টির সুযোগও তেমন একটা নেই, এটির নিজস্ব রাজস্ব আয় সৃষ্টির কিছু সুযোগ তৈরী করতে গেলে  ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের রাজস্ব আয়ের বেশ কিছু উৎস কর্তন করতে হবে, আর তা করতে গেলে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সঙ্গে বিরোধ অনিবার্য হয়ে পড়বে; উপজেলায় জনগণকে সেবামূলক সার্ভিস দেয়ার মত তেমন কোনো সুযোগ নেই বললে চলে, কিংবা এর মাধ্যমে যেসব সেবামূলক সার্ভিস দেয়ার কথা বলা হয় তা দেয়ার কোনও প্রয়োজনই নেই, কারণ সেসব সার্ভিস অনায়াসে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে দেয়া সম্ভব; অন্যসব স্থানীয় ইউনিটগুলি যেমন ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, জেলা, বিভাগ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এর সম্পর্ক কেমন হবে, কিভাবে কতটুকু থাকবে তা সুনির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট করা নেই; বিশেষত ইউনিয়ন ও পৌরসভার সঙ্গে উপজেলার এক ধরনের সাপে নেউলে সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে, এই সাপে নেউলে সম্পর্ক যে কোনো সময় সংঘাতরূপে প্রকাশ্যে আসতে পারে, যা কোনো অবস্থাতেই কারোরই কাম্য নয়।
এই ধরনের একটা নাজুক দৃশ্যমান অবস্থার মধ্যে অন্য ধরনের আরেকটা দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় তা হল, উপজেলার প্রতিনিধিগণের জন্য গাড়ী, ড্রাইবার, বাসা, বিশাল দাপ্তরিক ভবন, পিয়ন, সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে লোভনীয় পদবী, বেতন-ভাতা, সামাজিক মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, বিদেশ ভ্রমণ, অপক্ষমতা ও নানাবিধ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সুযোগসুবিধার দৃশ্য; এসব লোভনীয় বিলাসবহুল সুযোগসুবিধা থাকায় পদপ্রার্থী হবার জন্য, পদাধিকারী হবার জন্য এক ধরনের প্রচন্ড মোহ, লোভ তৈরী হয়; পাশাপাশি, উপজেলা নির্বাচনে যারা চেয়ারপারসন ও ভাইস-চেয়ারপারসন পদপ্রার্থী হয়, হতে চায়, তাদের লক্ষ্য কিন্তু উপজেলায় দায়িত্ব পালন করা নয়, উপজেলা কেন্দ্রীক উন্নয়নমূলক, সেবামূলক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে চিন্তাভাবনা করাও নয়, তাদের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারী সুযোগসুবিধা ও পদবী কাজে লাগিয়ে জাতীয় সংসদ এর সদস্য হবার পথে উপজেলাকে মই হিসেবে ব্যবহার করা, এবং অন্যসব উপায় অবলম্বনে কেবল নিজস্ব ভাগ্য উন্নয়নে প্রচেষ্টা চালানো; আর কাজকর্ম, দায়দায়িত্ব ছাড়া কেবলই ‘বাবুগিরি,’ ‘নেতাগিরি’ করার, কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে সদায় তৎপর থাকার, নিজেকে একজন বিকল্প ‘এমপি’ ভাবার যে সুযোগসুবিধা রয়েছে তা কার না ভাল লাগে; ফলে এই উপজেলা নির্বাচনে দলীয় ও নির্দলীয় প্রার্থীগণের বেশী বেশী আগ্রহ ও বেশী বেশী সহিংস আচরণ দেখা যায়।
এতে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, এই উপজেলার জন্মগত অসৎ উদ্দেশ্য ও জঘন্য কলংক এখনো বহাল রয়েছে; জেনারেল এরশাদ অবৈধ উপায়ে ক্ষমতায় এসে অবৈধ ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত ও পাকাপোক্ত করতে এবং স্থানীয় মধ্যবর্তী পর্যায়ে নিজস্ব অনুগত দলীয় মোড়ল তৈরী করতে উপজেলা সৃষ্টি করেন, এবং তিনি বিশেষ ব্যবস্থায় সমস্ত আইনকানুন লংঘন করে রাষ্ট্রীয় অর্থ ও ক্ষমতা বিলিয়ে দিয়ে উপজেলার প্রতি প্রবল মোহ ও একটি অনুগত মোড়লগোষ্ঠী তৈরী করতে সক্ষম হন। আর এই অনুগত মোড়লগোষ্ঠীই পরবর্তীতে জাতীয় পার্টির স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী মধ্যবর্তী খুঁটি হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়; একটু খোঁজ নিলে দেখা যাবে এঁরাই এখনকার জাতীয় পার্টির স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে মূল খুঁটি হিসেবে কাজ করছে। রাষ্ট্রীয় অর্থে ও সরকারী ক্ষমতাবলে নিজস্ব দলীয় খুঁটি, মোড়ল তৈরী করাটা হচ্ছে মহা অপরাধ, মহা দুর্নীতি; এই মহা অপরাধ, এই মহা দুর্নীতির কথা মনে রাখা, আমলে নেয়া উচিত নয় কি? অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় এসব অপরাধ, এসব দুর্নীতি যেন কিছু-ই না। এসব বিষয়ে দেশের অন্য সব রাজনৈতিক দলও নীরব; তাই তো দেখা যায়, অবৈধ শাসক এরশাদ, তাঁর দল জাতীয় পার্টি, তাঁর শাসনিক মিত্র জেএসডি, কিছুসংখ্যক অবুঝ ব্যক্তি ও চরম চাটুকারকে এখনও ‘উপজেলা’ তথা ‘উপজ্বালা’ নিয়ে গর্ব করতে, উদাহরণ দিতে শোনা যায়! এবং কথায় কথায় বলতে শোনা যায়, জেনারেল এরশাদ ও তাঁর দল না কি এই ‘উপজেলা’র জন্যই চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে! প্রশ্ন হল, যেখানে কোনও একদিন জনাব আবু তালেব প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ অথবা স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ অনুযায়ী “উপজেলা” নামটিই থাকবেনা, যখন উপজেলা সম্পর্কীয় মিথগুলি জনমনে খোলাসা হতে থাকবে, এবং যখন মানুষ চাটুকারীয় গর্বমূলক তাৎপর্যহীন কথামালায় একদম কর্ণপাত করবে না; তখন সেখানে অবৈধ শাসক এরশাদ ও তাঁর দল চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে কীভাবে? অনুরূপভাবে, জনাব আবু তালেব প্রস্তাবিত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয় অনুযায়ী নগরায়িত প্রবাহে উপনিবেশিক শাসক বৃটিশ প্রবর্তিত ও আয়ুবীয় গন্ধযুক্ত “ইউনিয়ন” নামটিও থাকবেনা, এবং তাতে এই নামটিকে ঘিরে আবর্তিত বৃটিশ উত্তরাধিকার ও আয়ুবীয় গন্ধও মুছে যাবে। আরও বলা প্রয়োজন যে, এই রূপরেখা অনুযায়ী “বিভাগ” স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হলে মধ্যবর্তী ইউনিট হিসাবে “জেলা” নামটিও এক পর্যায়ে মুছে যাবে, আর জেলাকে স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট করা হলে বিভাগকে একইসঙ্গে মুছে দিতে হবে। তা হলে স্বাধীন দেশে স্বাধীন ভাবনায় নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী সাজানো সর্বস্তরীয় অর্থাৎ তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত অথবা কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত একটি গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামো পাওয়া যাবে। এটি ভালভাবে অনুধাবন করতে এই নিবন্ধের শেষে সংযুক্ত প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ ও স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ মনোযোগ দিয়ে ভালভাবে অনুধাবন করার জন্য, বুঝার জন্য পাঠকপাঠিকাকে বিনীত অনুরোধ করছি।
সে যাই হোক, এই ধরনের একটি শাসনিক অবস্থার মধ্যেই আরও অনেকে ক্ষমতা, সুবিধা ও অর্থ লোভের পাশাপাশি বুঝে, না বুঝে উপজেলার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যান। বেশ কিছু এনজিও দাতা সংস্থার টাকায় দেশীয় শাসকের চাহিদায় আয়োজিত সভা-সমাবেশে এই উপজেলাকে নিয়ে বেশ মাতামাতি, লাফালাফি করে; আবার কিছু কিছু এনজিও কর্মকর্তার মধ্যে নিজস্ব ব্যক্তিগত স্বার্থে এনজিও কমসূচী, অর্থ, জনবল ইত্যাদি কাজে লাগিয়ে নিজস্ব উপজেলায় চেয়ারপার্সন, ভাইস-চেয়ারপার্সন হবার খায়েশ ও লোভ প্রচন্ডভাবে ক্রিয়াশীল থাকায় উপজেলা কেন্দ্রিক অতি তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায়। এদের সঙ্গে যুক্ত হয় জাতীয়ভাবে পরিচিত কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তি, যাঁরা প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বোঝে না, মওকা বুঝে কথায় কথায় গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে অথচ গণতন্ত্রায়ন বোঝে না, গণতন্ত্রায়ন শব্দটি উচ্চারণ করতে চায়না, গণতন্ত্রায়ন কর্মসূচী সম্পর্কে ধারণা নেই; বিশেষত এঁরা সুবিধাবাদী অবস্থান থেকে সুবিধাজনক শব্দ “সং¯কার” শব্দটি নিয়ে সব ধরনের শাসনিক আমলে পাগলপ্রায় থাকে, থেকে কেবল সুযোগসুবিধা হাতিয়ে নেয়; এঁরা মূলত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ, প্রকারভেদকরণ, সার্থক নামকরণ, সঠিক সংজ্ঞায়িতকরণ, অর্থায়ন, দায়িত্ব বণ্টন, পারস্পরিক সম্পর্ককরণ, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, নির্বাহিক ও বিধানিক পরিষদের পার্থক্য সম্পর্কে জানেনা বুঝেনা, বুঝতে চায়ওনা; এঁরাই স্থানীয় সরকার আর কেন্দ্রীয় সরকারের কাঠামোতে নারীর শতভাগ (১০০%) প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিগতভাবে (যা অবশ্যই চমক, দয়া, করুণা বা বাহাবা কেন্দ্রিক নয়) নিশ্চিত করতে এমপো ও ১১ দফার প্রয়োগ চায়না, ইত্যাদি ইত্যাদি; অথচ তাঁরা নিজেদেরকে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে সবসময় পরিচয় দিয়ে থাকে এবং এনজিও আয়োজিত সভা, সেমিনার, মানববন্ধন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার টকশোতে কখনও অতিথি বক্তা, কখনও অযাচিত বক্তা হয়ে বিশেষত উপজেলা কেন্দ্রিক অসার কথামালা জোর গলায় ব্যক্ত করেন। এঁদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মিডিয়ার বেশকিছু সাংবাদিক, সম্পাদক, উপস্থাপক কর্মকর্তা, যাঁরা আর্থিক সুযোগসুবিধার বিনিময়ে উপজেলা বিষয়ক সংবাদ প্রকাশে প্রচারে সহযোগিতা দিয়ে থাকেন; এই সম্পর্কিত বিভিন্ন সভায় সঞ্চালক হয়ে সভা সঞ্চালনায় বিশেষ কৃতিত্ব নিয়ে থাকেন; এবং এঁদেরই কেউ কেউ মাঝেমধ্যে স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত অসার প্রতিবেদন প্রচার প্রকাশের মাধ্যমে ‘স্থানীয় সরকার বিষয়ক সাংবাদিক/প্রতিবেদক’ এর পরিচয় দাঁড় করিয়ে বিশেষ সুবিধা-সুনাম আদায়ে সচেষ্ট থাকেন। এ কি হল স্থানীয় সরকার বিষয়ক সাংবাদিকতা? এই প্রশ্ন থাকল।
পাশাপাশি, খুবই দুঃখজনক হলেও শতভাগ সত্যি যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠায় ও তার ক্রমাগত উন্নয়নে আকাংখা, পরিকল্পনা, কর্মসূচী ও প্রস্তুতি রয়েছে এমনতরো একটি রাজনৈতিক দলও খুঁজে পাওয়া যায় না, যায়নি; অথচ রাজনৈতিক দলগুলি গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন প্রসঙ্গে সবসময় লিপ সার্ভিস দিয়ে থাকে; এই লিপ সার্ভিস আর অন্তর্গত বিশ্বাস কখনো এক ছিলনা, এখনো নেই বলে প্রতীয়মান হয়; অপ্রিয় হলেও সত্য কথা হল, বাংলাদেশে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনই হয়নি, হচ্ছেনা; বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে মিশ্রিত লক্ষ্য প্রসূত রাস্তার, মাঠের আন্দোলন হয়েছে, হয়; আপাত দৃষ্টিতে ওইসব আন্দোলনে সফলতা দেখা গেলেও সেই সফলতা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও তার উন্নয়নে কাজে লাগেনি; কারণ সমাজ, দল ও দেশের সার্বিক অর্থে গণতন্ত্রায়ন সম্পন্ন করার শিক্ষাগত ও মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ প্রক্রিয়া এসব আন্দোলনে, সংগ্রামে একেবারেই ছিলোনা বললে অত্যুক্তি হবেনা। সে যাই হোক, বড় দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে সময়ে সময়ে বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনে বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্য সাধন করতে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিগণকে, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হতে আগ্রহী দলীয় ব্যক্তিবর্গকে ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ব্যবহার করতে দেখা যায়; এবং জাতীয় নির্বাচনে দলীয় ইশতেহারে গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকার উন্নয়ন প্রসঙ্গ বেশ জোরালোভাবে উপস্থাপিত করা হয়। তা করতে গিয়ে এসব দলের কিছু সুচতুর নকলবাজ ব্যক্তি প্রতিটি জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনের পূর্বলগ্নে দলীয় ইশতেহার প্রণয়ন কালে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্র বিষয়ে নকল করার মহড়ায় নেমে থাকে। এসব নকলবাজ ব্যক্তিরা অন্য কারো আইডিয়া, স্লোগান, গবেষণা কর্ম, প্রণীত বিষয়, প্রস্তাবিত বিষয় ও কর্মসূচী জাতীয় স্বার্থে অনুসরণের জন্য, গ্রহণের জন্য নিয়মনীতি মেনে দলীয় ইশতেহারে কিংবা দলীয় কর্মসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করেন না, করতে চান না; তাঁরা দেশের ব্যক্তি বিশেষের নিজস্ব স্ট্যাডি, গবেষণা, কর্মসূচী, শ্লোগান, ক্যাম্পেইন, অবদানকে অস্বীকার করার, চুরি করার বাতিকগ্রস্ততা থেকে কেবল নগ্নভাবে চুরিতে, নকলেই সিদ্ধহস্ত; এঁরা মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক চোর এবং জনগণের অর্থ ও সম্পদ চোর তো বটেই। অথচ এঁরা স্ব স্ব দলের কাছে সম্মানীয় বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, নির্বাচনী ইশতেহার প্রণেতা, দলীয় কর্মসূচী প্রণেতা, ইত্যাদি ইত্যাদি! এ এক মহা আজব কারবার নয় কি! তাই তো দেখা যায়, এসব দলের উপজেলা সম্পর্কীয় ইশতেহারগত অংগীকার শুধু কথার ফুলঝুরি আর অন্তঃসার শূন্য কথামালায় ভরপুর; কারণ স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে উপজেলার অবস্থান, গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, ক্ষমতা, দায়দায়িত্ব, স্বশাসন, অর্থায়ন, কাঠামো ইত্যাদি সম্পর্কে এসব দলের জেনে বুঝে কোনও সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট অবস্থান, কর্মসূচী নেই; এ হচ্ছে একজন অবৈধ শাসকের চরম অপকর্মের কুফলে প্রভাবিত হয়ে উত্তরাধিকার বহনে রাজনৈতিক দলগুলোর অশুভ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকা ছাড়া অন্য কিছু নয়; এ যেন এক চরম হ-য-ব-র-ল অবস্থার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর দিকহারা হয়ে ছোটাছুটিতে লিপ্ত থাকা। পাশাপাশি দেখা যায় যে, জনগণেরও একটা বিরাট অংশ উপজেলা নির্বাচন কালীন সময়ে নগদে পাওয়া আদর আপ্যায়ন আর কদরেই তুষ্ট থাকে। নির্বাচনে ও তার পরে কি হল তা তাঁদের নজরদারি ও তদারকির বিষয় হিসেবে থাকে না। ভোটারগণ মূলত জানেওনা উপজেলায় কি কি দায়িত্ব সম্পন্ন করানোর জন্য উপজেলা চেয়ারপারসন-ভাইস চেয়ারপারসনদ্বয় নির্বাচিত করেছে, করছে; ঠিক যেমন পদপ্রার্থীগণ ভালভাবে জানেনা কি কি দায়িত্ব পালন করার জন্য নির্বাচিত হতে চায়, হয়েছে। অতএব, সার্বিক অর্থেই বলা যায়, উপজেলা হচ্ছে একটা মিথ, একটা অলীক স্বপ্ন, একটা মিথ্যা নোশান, একটা দায়দায়িত্বহীন, স্বশাসনহীন মধ্যবর্তী ইউনিট। গোটাদেশ এই মিথ্যার বেড়াজালে ঘুরপাক খাওয়াটা, সরব থাকাটা হচ্ছে এক মহা আশ্চর্যজনক ব্যাপার!
    অনুরূপভাবে, গোটা জাতি আরেকটা মিথ, আরেকটা মিথ্যা নোশানের বেড়াজালে ঘুরপাক খেয়ে আসছে; সেই মিথ আর মিথ্যা নোশানটা হল, অবৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রবর্তিত তথাকথিত ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’। এই মিথ তথা অপকর্মের কুফলে প্রভাবিত হয়ে এবং একে ঘিরেই পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসক দ্বারা সৃষ্ট পল্ল¬¬ী পরিষদ, গ্রাম সভা, গ্রাম পরিষদ, গ্রাম সরকার ও ওয়ার্ড সভা নামের অপ্রয়োজনীয় ইউনিটগুলি নিয়ে গোটা জাতি মিথ্যার বেড়াজালে জড়িয়ে থাকে; ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিটি গ্রাম কিংবা প্রতিটি ওয়ার্ডে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অবৈধ ও বৈধ শাসকগণ দ্বারা এসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠিত হয় কিংবা গঠন করার অপচেষ্টা চলে; এসব ইউনিট কেন অপ্রয়োজনীয়, কেন মিথ, কেন মিথ্যা নোশান, কেন অপচয়মূলক আর অসৎ উদ্দেশ্যমূলক তার স্বরূপ বুঝাটাও খুবই জরুরী। এর স্বরূপ বুঝার মাধ্যমে এও বুঝা যাবে যে, কেন স্থানীয় সরকারের স্তরসংখ্যা, প্রকার ও শেষ গন্তব্য আগে ঠিক করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
মূলত, ইউনিয়ন-ই হওয়া উচিত গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের মৌলিক গ্রামীণ প্রশাসনিক ইউনিট; সাধারণত ১০ থেকে ১৫টি গ্রাম নিয়ে একেকটি ইউনিয়ন গঠিত হয়ে থাকে; এই ইউনিয়নের মধ্যে অবস্থিত হাট-বাজার-ঘাট-গঞ্জগুলিও কোনো না কোনও গ্রামের মধ্যেই অবস্থিত। সেজন্য দেশের মানুষের কাছে ইউনিয়ন মানে গ্রাম আর গ্রাম মানেই ইউনিয়ন; গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী নগরীয় স্থানীয় সরকারের নগরীয় প্রশাসনিক ইউনিট (পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড) এর সংখ্যা ও আয়তন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে ইউনিয়নের মোট সংখ্যা ও আয়তন আস্তে আস্তে কমে আসার কথা; কিন্তু আমরা দেখছি বিপরীত চিত্র; নগরীয় প্রশাসসিক ইউনিট ও মোট আয়তন দিনে দিনে সম্প্রসারিত হচ্ছে, বিপরীতে গ্রামীণ প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে ইউনিয়নের সংখ্যা কমছে না; বরং প্রশাসনিক দুর্নীতি আর অশুভ রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ইউনিয়নের সংখ্যাও বেড়েই চলেছে, এবং আরও নতুন নতুন ইউনিয়ন গঠনের প্রচেষ্টা চালু রয়েছে। তাতে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক সিস্টেম কস্ট অনেক অনেক গুণ বেড়ে গেছে, এবং তা আরও বাড়তে থাকবে; অথচ ইউনিয়নের সংখ্যা যথাসম্ভব কমিয়ে এনে গ্রামীণ প্রশাসনিক সিস্টেম কস্ট যথাসম্ভব সীমিত রেখে তাতে উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক ব্যয় বাড়ানো খুবই জরুরি প্রয়োজন বলে প্রতীয়মান হয়। গ্রামীণ এলাকায় “একটি ইউনিয়ন, একটি সমন্বিত উন্নয়ন” ভিশন কর্মপরিকল্পনা ‘ইউনিয়ন সরকার’র মাধ্যমে বাস্তবায়িত করতে জনাব আবু তালেব ১৯৯৭ সালের শুরুতে ‘গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন সরকারের রূপরেখা’য় বিশেষ আহবান রেখেছিলেন, কিন্তু তৎকালীন সরকার, বিরোধীদল ও অন্যান্য দলগুলো ওই বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বলে মনে হয়নি। বিলম্বে বুঝলে, বিলম্বে শুরু, বিলম্বে থাকা, বিলম্বে ফলাফল; তা তো হবেই। তাই তো কথায় বলা হয় যে, সময়ের এক ফোড় আর অসময়ের দশ ফোড়- এ যেন বাংলাদেশের নিয়তি।
সে যাই হোক, গ্রামীণ এলাকায় প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে ইউনিয়ন কেন্দ্রীক সার্বিক উন্নয়ন মানেই ১০-১৫টি গ্রামের উন্নয়ন, গ্রামীণ মানুষের উন্নয়ন; অথচ, প্রকৃত ঘটনা হল, এই ইউনিয়ন ভিত্তিক গণতন্ত্রায়ন ও তার  সার্বিক উন্নয়ন সাধনে আজ অবধি কোনো বিশেষ উদ্যোগ, বিশেষ আয়োজন গৃহীত ও দৃশ্যমান হয়নি, হচ্ছেনা। বরং এই ইউনিয়নকে পাশ কাটিয়ে এর নীচে যেমন গ্রাম সরকার ও এর ওপরে যেমন উপজেলা নামক অপ্রয়োজনীয় ইউনিটগুলো গঠনের নামে নানান সময়ে নানান রকমের অপতৎপরতা চালানো হয়েছে, হচ্ছে; ওই সব অপতৎপরতার সঙ্গে দেশের অনেক নামকরা, নামী দামী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জড়িত। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অবৈধ উপায়ে ক্ষমতায় এসে ও থেকে, রাষ্ট্রীয় অর্থে ও সরকারী ক্ষমতায় নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন ও গ্রামীণ তৃণমূলে অনুগত, চাটুকার দলীয় কর্মী-সমর্থক তৈরীর লক্ষ্যে ইউনিয়নের মধ্যে ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ গঠন করার উদ্যোগ নেন; এবং এই ইউনিট কেন্দ্রীক বেশী বেশী দলীয় কর্মী-সমর্থক তৈরী করার লক্ষ্যে নতুন নতুন গ্রাম সৃষ্টিতে প্রবল উৎসাহ যোগায়; তাতে গ্রামের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে ৬৮ হাজার থেকে ৮৭ হাজারের বেশী সংখ্যক গ্রামে উন্নীত হয়ে যায়; কারণ যত বেশী বেশী গ্রাম, তত বেশী বেশী গ্রাম সরকার, আর তত বেশী বেশী অনুগত, চাটুকার, টাউট, সুবিধাবাদী, নীতিহীন, আদর্শহীন দলীয় সদস্য; এতে দীর্ঘকালের প্রতিটি গ্রামভিত্তিক দৃঢ় সামাজিক বন্ধন ও একতা ভেঙ্গে তছনছ, চুরমার হয়ে যায়; জাতীয় অর্থ, শ্রম ও সময়ের বিপুল অপচয় ঘটে; ইউনিয়ন পরিষদ হয়ে পড়ে চরম উপেক্ষিত, এবং গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক গ্রামীণ ইউনিটের পরিবর্তে ইউনিয়ন হয়ে পড়ে গুরুত্বহীন এক মধ্যবর্তী ইউনিট। বহুল পরিচিত প্রচারিত শ্লোগান “৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে, বাংলাদেশ বাঁচবে” শ্লোগানটি হয়ে পড়ে প্রকৃত তথ্যভিত্তিক ঘটনায় অসঙ্গতিপূর্ণ; বিদ্যমান বাস্তবতায় এই শ্লোগানে গ্রামের সংখ্যাগত ভুল তো রয়েছেই; পাশাপাশি প্রশ্ন এসে যায় এই শ্লোগানে নগর, নগরীয় এলাকা আর নগরীয় মানুষ কোথায়? তা তো এই কবিতে কবিতায় অনুপস্থিত রয়েছে; কবিকে কবিতা লেখায়ও যে তথ্যগতভাবে আপডেট থাকতে হবে তা ভুললে চলবে কী? প্রকৃত ঘটনা হল, বাংলাদেশ এখন একটি গ্রামীণ-নগরীয় দেশ; তাই গ্রাম আর নগরকে নিয়েই বাংলাদেশকে বাঁচতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে; তাই কবিতায়, গানে, শ্লোগানে, বই-পুস্তকে, ভাবনায়, পরিকল্পনায়, কর্মপ্রচেষ্টায় গ্রাম আর নগর একসঙ্গে থাকতে হবে; এটি একসঙ্গে ততদিন পর্যন্ত বজায় রাখতে হবে, যতদিন পর্যন্ত গ্রাম বজায় থাকবে, এবং নতুন নতুন নগরীয় এলাকাও সৃষ্টি হতে থাকবে । সে যাই হোক, অবৈধ শাসক জিয়া কর্তৃক রাষ্ট্রীয় অর্থে, দাপটে কেবল-ই ব্যক্তিগত ও নতুন রাজনৈতিক দলীয় কর্মী-সমর্থক তৈরীর স্বার্থে পরিচালিত এই সরকারী উদ্যোগ ছিলো এক মহা দুর্নীতি, এক মহা অপরাধ; এ হল অবৈধ শাসকের অবৈধ ক্ষমতায় সৃষ্ট এক মারাত্বক বিষফোঁড়া, যার যন্ত্রণায় গোটা জাতি এখনো খেসারত দিয়ে চলেছে। অবৈধ শাসক জিয়ার এই মহা অপরাধ, এই মহা দুর্নীতি আর এই সাংঘাতিক বিষফোঁড়ার বিষয় হালকাভাবে নেয়া একদম উচিত নয়। এই মহা অপরাধ, এই মহা দুর্নীতির কথা অবৈধ ক্ষমতাবলে সৃষ্ট সংশ্লিষ্ট দলটি (বিএনপি) স্বার্থগত কারণেই হালকাভাবে নিয়ে থাকে এবং তা চাপিয়ে রাখতে চায়, লুকিয়ে রাখতে চায়; কারণ একটু অতীতে গেলে, একটু অতীত স্মরণ করতে চেষ্টা করলেই মনে পড়ে যাবে যে, জিয়াউর রহমান তখনকার গ্রাম সরকারের মাধ্যমেই তৃণমূলে সুবিধাবাদী, নীতিহীন, আদর্শহীন, টাউট ও বাটপার জাতীয় লোকদের নিয়ে বিএনপি’র সমর্থক ও কর্মী গোষ্ঠী তৈরী করে ছিলেন; পরবর্তী কালে এঁরাই গ্রামে বিএনপি’র শক্ত খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়; তৃণমূলের মত জাতীয় পর্যায়েও অনুরূপ চরিত্রের লোকজন নিয়েই জিয়াউর রহমান বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তৈরী করেছিলেন; তখন একটি কথা বেশ চালু ছিল তা হল, ‘দিনে বায়তুল মোকাররম, রাতে বঙ্গভবন’; ওই সময়ে পল্টন ময়দানে সভা সমাবেশ করা বন্ধ রেখে বায়তুল মোকাররমে পার্শ্ব রাস্তায় সভা সমাবেশ করতে বাধ্য করা হয়।  মূলত, ওই সময় থেকেই বাংলাদেশে অবৈধ ক্ষমতাবলে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী বেচাকেনা শুরু হয়, সেজন্য ওই বাক্যটি মানুষ মুখে মুখে দেশময় বলে বেড়াত। অবৈধ শাসক জিয়ার এসব অপকর্ম স্বার্থগত, জন্মগত কারণেই বিএনপিকে ভুলে থাকতে হয়, চাপিয়ে যেতে হয়। কিন্তু অন্যসব রাজনৈতিক দল ও  গোটা জাতি কেন তা ভুলতে বসেছে? তা কি ভুলে যাওয়া উচিত? এই প্রশ্ন থাকল সকল মানুষের প্রতি। একই ধারায় পরবর্তীতে বিএনপি ক্ষমতায় এসে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বাধীন স্থানীয় সরকার বিষয়ক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রি ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের নেতৃত্বে একবার ‘গ্রাম সভা’ গঠন করার অপচেষ্টা চালায় এবং আরেকবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূঁঞার নেতৃত্বে প্যাডসর্বস্ব ‘গ্রাম সরকার’ গঠন করতে গিয়ে দেশের প্রচুর অর্থ, শ্রম ও সময় নষ্ট করা হয়, এবং এই প্যাডসর্বস্ব গ্রাম সরকারের জন্য রাষ্ট্রীয় শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে করাপশনকে গ্রামীণ তৃণমূলে বিস্তৃত করা হয়। উভয় বার ক্ষমতায় থাকা কালে বিএনপির যেসব নেতা স্থানীয় সরকার বিষয়ক দায়িত্বে পরামর্শে ছিলেন, তাদের দ্বারা স্থানীয় সরকারের কেবল ক্ষতিই সাধিত হয়েছে; তারাসহ এই দলের গোটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার স্থাপন ও তার উন্নয়নমুখী কোনো চিন্তাভাবনা করেছে কিংবা করতে চেয়েছে এমনতরো নজির একদম খুঁজে পাওয়া যায়না, যদিও ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ বিএনপির নীতিনির্ধারকগণের কাছেও বার বার তুলে ধরা হয়েছিল; তা তারা সবাই এক কান দিয়ে শুনেছে, আরেক কান দিয়ে তা বের করে দিয়েছে; তারা দেশ, দল ও সমাজের সার্বিক গণতন্ত্রায়ণ ও গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত হিসেবে স্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আমলে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা কখনও উপলব্ধি করেনি, করতে চায়নি, আর এখনও এই দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এসব বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে বলে, করতে চায় বলে একদম প্রতীয়মান হয়না; আর এই দলের জন্মগত কলংকিত চরিত্র একটুও পরিবর্তনমুখী হয়েছে বা হতে চেয়েছে বলে কোনও নজির কি দলে কিংবা রাষ্ট্রে রয়েছে? তারপরও কি বিএনপি’র স্থানীয় সরকার, গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক অবস্থান, আকাংখা বুঝতে আর কিছু বাকি থাকে? সেসঙ্গে অবৈধ শাসক জিয়ার ওই অপকর্মের প্রভাব কিভাবে অন্যসব রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রভাবিত করেছে তাও গভীরভাবে জানার, বুঝার প্রয়োজন রয়েছে। এই প্রসঙ্গে ধরা যাক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর কথা; এই দল ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে গ্রামীণ তৃণমূলে দলীয় ভিত্তি আরও মজবুত করার এক অলীক স্বপ্নে তাড়িত হয়ে এ্যাডভোকেট রহমত আলীর নেতৃত্বাধীন স্থানীয় সরকার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান (পরে তিনি মাননীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন) এর নেতৃত্বে জাতীয় সংসদে তেমন কোনো আলাপ আলোচনা ছাড়াই অত্যন্ত তাড়াহুড়ার সহিত স্বল্প সময়ে ইউনিয়নের মধ্যে প্রতি ওয়ার্ড কেন্দ্রিক ‘গ্রাম পরিষদ’ গঠন করার বিল পাস করা হয় ও তা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক স্বাক্ষরিত হয়ে আইনে পরিণত হয়, এবং তাঁরই নেতৃত্বে তা বাস্তবায়নের জন্য অপচেষ্টা চলে; বিন্তু সেই অপচেষ্টা কেবল জনাব আবু তালেব এর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবল বাধার মুখে বন্ধ হয়ে যায়; প্রসঙ্গক্রমেই বলা প্রয়োজন যে, এডভোকেট রহমত আলী কমিশনের ওয়ার্ড ভিত্তিক তথাকথিত ‘গ্রাম পরিষদ’ গঠনের সুপারিশটি ও অন্যসব সুপারিশগুলো একদম অপরিপক্ক, ভঙ্গুর, খন্ডিত আর গোজামিলে ভরপুর; এক কথায় বলা যায় যে, রহমত আলী কমিশনের গোটা প্রতিবেদনটি সার্বিক বিবেচনায় বাস্তবায়নের অযোগ্য একটি প্রতিবেদন। তা সত্ত্বেও, বাস্তব অবস্থা দেখে মনে হয়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকগণ এ্যাডভোকেট রহমত আলী কমিশনের ওই গারবেজ তুল্য প্রতিবেদনটি নিয়ে এখনও সন্তুষ্ট কিংবা দ্বিধাগ্রস্ত রয়েছেন; পাশাপাশি আওয়ামী লীগের প্রায় সকল কেন্দ্রীয় নেতাগণ ও রহমত আলী কমিশনের সকল সদস্যগণ ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ সম্পর্কে বার বার অবগত হয়েছেন, এবং এর সবিস্তার ব্যাখ্যা শুনেছেন, জেনেছেন; তার পরও এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে, উপলব্ধিতে নিতে, বাস্তবায়নে যেতে এতবেশী সময় লাগার কারণ একদমই বোধগম্য নয়। সে যাই হোক, এখন তো বিএনপিকে ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার,’ ‘গ্রামসভা’ ও ‘গ্রাম সরকার’ নিয়ে কথা বলতে দেখা যায় না, শোনা যায় না। জাতীয় পার্টিকে ‘পল্ল¬ী পরিষদ’ নিয়ে কথা বলতে শোনা যায় না, দেখা যায় না; অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, অবৈধ শাসক এরশাদকে “পল্লী” শব্দ কেন্দ্রীক, “পল্লী পরিষদ” কেন্দ্রীক ও “পল্লীনিবাস” কেন্দ্রীক ‘পল্লীবন্ধু’ বানানোর খায়েশও এই দলের ফুরিয়ে গেছে বলে মনে হয়! আর আওয়ামী লীগকে ইউনিয়নে ওয়ার্ড ভিত্তিক তথাকথিত ‘গ্রাম পরিষদ’ গঠন নিয়ে কোনও বক্তব্য দিতে, টুঁ শব্দ করতে দেখা যায় না, শোনা যায় না। তবে প্রতি গ্রামে কিংবা ইউনিয়নের প্রতি ওয়ার্ডে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে যেসব ব্যক্তি নানাবিধ ফায়দা লুঠেছে, অপ্রয়োজনীয় বই-টই লিখে প্রচুর টাকাপয়সা কামিয়েছে, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ পরিচিতি মিডিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছে, দাতা গোষ্ঠীর টাকায় সভা-সেমিনার করেছে, নতুন নতুন এনজিও যেমন ‘স্থানীয় সরকার সহায়ক কমিটি’ গঠন করেছে, তারা এখনো মাঝেমধ্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠনের পক্ষে আড়ালে-আবড়ালে, চুপিসারে সাফাই গাইতে দেখা যায়। এসব অপকর্মকান্ডের বিরুদ্ধে, ইউনিয়নের মধ্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠনের বিরুদ্ধে সিডিএলজি’র লাগাতার ক্যাম্পেইন ও তীব্র প্রতিবাদ এর কারণে এক দিকে ওইসব ব্যক্তির জোরগলা বেশ ক্ষীণ ও দুর্বল হয়েছে; অপর দিকে ওইসব রাজনৈতিক দল বুঝতে পেরেছে যে, ইউনিয়নের মধ্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠন করার নামে আবার লাফালাফি, মাতামাতি করলে হালে আর পানি পাওয়া যাবে না; তাই তারাও চুপসে গেছে বা চুপসে যেতে বাধ্য হয়েছে বলে বোঝা যায়। শেষ তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গঠিত একটি স্থানীয় সরকার বিষয়ক কমিটিও ইউনিয়নের মধ্যে প্রতি ওয়ার্ডে ‘ওয়ার্ড সভা’ ও নগরীয় ওয়ার্ডে ‘ওয়ার্ড কমিটি’ গঠনের সুপারিশ করে; এই কমিটির জন্য অন্যসব খরচ ছাড়া শুধু ওই তথাকথিত সুপারিশ প্রকাশের জন্য ঢাকায় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত এক সভার জন্য ব্যয় করা হয়েছে প্রায় সোয়াশ কোটি টাকা, এর মাধ্যমে জাতীয় অর্থের অপচয় কারে কয়, তা ওই কমিটি ও স্থানীয় সরকার বিভাগ ভালভাবে দেখিয়েছে! ওই কমিটির প্রধান ড. শওকত আলী পুরস্কার স্বরূপ শেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাও হয়েছেন; তথাকথিত ওয়ার্ড সভা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠনের সুপারিশসহ ওই কমিটির অন্য সুপারিশগুলিও বড্ড সেকেলে, খন্ডিত ও বাস্তবায়নের একদম অযোগ্য; প্রথম দিকে মিডিয়াসহ অনেকেই না জেনে, না বুঝে ওই কমিটির প্রতিবেদনটির প্রতি সমর্থন জানায়, আবার জেনেবুঝেই কেবল স্বার্থগত কারণে তার পক্ষে শেষ তত্বাবধায়ক সরকারের গর্ভে সৃষ্ট ‘গভার্নেন্স কোয়ালিশন’ নামের একটি এনজিও গ্রুপ দাতা সংস্থার টাকায়, শেষ তত্বাবধায়ক সরকারের সেবাদাস হিসেবে সভা-সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে বেশ হইচই করে থাকে, ‘হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশ’ নামের আরেকটি এনজিও’র বাংলাদেশস্থ কর্ণদার (ড. বদিউল আলম মজুমদার) এর বিশেষ ব্যক্তিগত স্বার্থে ওই এনজিওটিও অনুরূপ কাজে লিপ্ত থাকে, আর এই হাঙ্গার প্রজেক্টএরই পকেট সংগঠন ‘সুজন’ও ওই প্রতিবেদন নিয়ে মাঠ গরম করার অপচেষ্টা চালায়, ‘ডেমক্রেসিওয়ার্চ’ নামের আরেকটি সুবিধাভোগী এনজিও ওই প্রতিবেদনের পক্ষে প্রচার প্রচারণায় সচেষ্ট থাকে, এবং এই এনজিও ইউনিয়ন পরিষদের তথাকথিত ‘স্থায়ী কমিটি শক্তিশালীকরণ’র নামে দাতা সংস্থার লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতে লোক দেখানো সভা সেমিনারও আয়োজন করত; অথচ ওই এনজিও বিধানিক পরিষদীয় বা সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কি, তা-ই বুঝত না, বুঝে না; মিসেস তালেয়া রেহমান কর্তৃক পরিচালত এই এনজিওটি গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার চায়, বুঝে তার কোনও লক্ষণ এর কর্মকান্ডে কখনও প্রতিফলিত হয়নি, হয়না; শুধু স্বার্থগত হয়ে খান ফাউন্ডেশন নামক এনজিওটিও অনুরূপ কর্মে জড়িত থাকে। ওই অসার প্রতিবেদনটির পক্ষে বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রও নিজস্ব স্বার্থগত কারণে প্রবল প্রচার প্রচারণায় যুক্ত হয়ে পড়ে; ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ নামক এনজিওটি অনুরূপ কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকে, যদিও এই এনজিওতেও স্থানীয় সরকার বুঝে, জানে এমন কোনো কর্মকর্তা দেখা যায়নি; তখন এই এনজিও’র এক বিশেষ সুবিধাভোগী কর্মকর্তা স্থানীয় সরকার বিষয়ক গার্বেজ তুল্য একাধিক নিবন্ধ ইংরেজী দৈনিক ডেইলি স্টারে প্রকাশ করায় এবং ইউরোপের একটি দেশ থেকে একটি স্কলারশিপ নিয়ে চলে যায়। অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ‘সিপিডি’ও ওই অসার প্রতিবেদনের পক্ষে জোর অবস্থান নেয়, যদিও এই প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার, গণতন্ত্রায়ন বুঝে, জানে এমন কোনও গবেষক, কর্মকর্তা আছে বলে আমাদের অন্তত জানা নেই; কিন্তু সিডিএলজির বুদ্ধিবৃত্তিক তীব্র আন্দোলনের ফলে ওই প্রতিবেদনের সুপারিশগুলির অসারতা, দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা খোলাসা হতে থাকায় তার প্রতি অনেকের সমর্থন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে, এবং ওই কমিটির সদস্যদের উচ্চকণ্ঠ আস্তে আস্তে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতম হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়; ওই কমিটির সুপারিশগুলি (মূলত একেও নকলবাজদের নকল বলাই শ্রেয়) এবং ওইগুলির ভিত্তিতে প্রণীত আইনকানুন বিধিবিধান যত দ্রুত সম্ভব বাতিল হয়ে যাওয়া উচিত। এই শেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদ্যোগেই তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি স্থানীয় সরকার কমিশনও গঠিত হয়; এ কমিটির সদস্যরা কেবল বেতন, ভাতা, অফিস, গাড়ী, বাড়ি, পদমর্যাদা ও নানা রকমের সুযোগসুবিধা আদায়ে ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে; এঁদের একজনেরও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার, বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও এর অভ্যন্তরীণ স্ট্যাটাসগত ও গুণগত পরিবর্তন সম্পর্কে তত্ত্বগত ও বাস্তব ধারণা ছিলোনা; এঁদেরই একজন হচ্ছেন ড. তোফায়েল আহমেদ; তিনি এখনও বিলুপ্ত কমিশনের পদবী ব্যবহার করে মিডিয়াসহ অন্যসব জায়গায় নানা রকমের সুযোগসুবিধা নিয়ে থাকেন, এবং তিনি তার অসার গার্বেজ তুল্য বক্তব্য কথায় লেখায় সবসময় তুলে ধরেন। তাজ্জব ব্যাপার হল, এই তিনি, যিনি আর্থ-সামাজিক স্তরীয় অবস্থা বুঝে স্থানীয় সরকারের প্রকার ঠিকভাবে করতে পারেন না, সর্বনি¤œ ইউনিট কতটি তা বুঝতে পারেন না, সর্বোচ্চ ইউনিট বিভাগ না জেলা তা ঠিক করার ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ করার প্রয়োজনীয়তা বুঝেন না, নির্বাহিক ও বিধানিক পরিষদের পার্থক্য বুঝেন না, সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ ও তার গুরুত্ব বুঝেন না, সার্থক নামকরণ ও যথার্থ সংজ্ঞায়িতকরণের গুরুত্ব অনুধাবন করেন না, ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন না, নারীর গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়নে ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি তথা এমপোতে বিশ্বাস করেন না, গ্রামীণ তথা কৃষিপ্রধান থেকে গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশের রূপান্তরিত উপস্থিতি এখনও টের-ই পাননা, বিদ্যমান গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ থেকে একটি পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এ উন্নীত হবার চলমান প্রক্রিয়া উপলব্ধিতে নিতে চাননা, স্থানীয় সরকারের স্তরীয় গন্তব্য ২০২০ সালে, ২০৫০ সালে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা জানেন না, বোঝেন না, বোঝতে চাননা, ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ মিডিয়া কর্মিরা তাঁকে এবং ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ড. আকবর আলি খান, ড. শওকত আলী সহ আরও কয়েক জনকে স্থানীয় সরকার “বিশেষজ্ঞ” হিসেবে প্রচার প্রকাশ করেই চলেছে; এতে তাঁরাও খুবই পুলকিত বোধ করেন! প্রশ্ন হল, এসব ব্যক্তিসহ আরও কিছু ব্যক্তি (কারা তা বুঝে নিলে খুশী হব) ও কিছু এনজিও সম্পর্কে মিডিয়া কর্মিরা কবে সচেতন হবে? কবে শেষ হবে স্থানীয় সরকার নিয়ে সব ধরনের অপতৎপরতা, অপপ্রচার? আর কবে শেষ হবে অসার, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রচার প্রকাশের লাগাতার মহড়া? আমরা চাই, মিডিয়া কর্মিরা স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ে শিক্ষিত হোক, আপডেটেড থাকুক, জেনে-বুঝে লিখুক, প্রতিবেদন প্রকাশ করুক; তাতে মিডিয়া কর্মিরা নিজে উপকৃত হবেন এবং তাতে দেশময় জনগণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপকৃত হয়ে থাকবেন।
প্রকৃতপক্ষে, স্থানীয় সরকার বিষয়ক যত রকমের মিথ, ভুল আর অপতৎপরতা রয়েছে, তার বিরুদ্ধে সর্বাত্বক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে সূচিত হয় ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী থেকে। ওই দিন ঢাকায় “গণতন্ত্র সংহতি সংসদ” আয়োজিত জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘স্থানীয় সরকার: গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে কীনোট বক্তা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ উপস্থাপিত করেন স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক গবেষক আবু তালেব, এবং সেই ১৩ জানুয়ারী ১৯৯৭ সাল থেকেই তাঁর উদ্যোগে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার, ২০২০ সালের মধ্যে একটি উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তথা “গণস্বপ্ন ২০২০” ও  ২০৫০ সালের মধ্যে একটি নগরীয় বাংলাদেশ তথা “গণস্বপ্ন ২০৫০” প্রতিষ্ঠার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন সূচিত হয়; বলা উচিত হবে যে, প্রকৃত অর্থে সেই থেকে বাংলাদেশে স্বপ্ন (ভিশন) ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে সচেতনতা আন্দোলন সূচিত হয়, এবং তারও আগে জনাব তালেব নিউ ইয়র্ক থেকে ২০২০ ও ২০৫০ সালদ্বয়কে সামনে রেখে বাংলদেশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণীত ও বাস্তবায়িত হোক সেই আন্দোলন পরিচালিত করেন-এই আন্দোলন একই সংগে নিউ ইয়র্ক ও ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়ে আসছে। আর এই আন্দোলনই স্থানীয় সরকার সম্পর্কে যত রকমের মিথ, মিথ্যা নোশান, আনফাউন্ডেড নোশান, অপচেষ্টা, অপতৎপরতা রয়েছে তা আস্তে আস্তে দূরীভূত করে আসছে; শুরুতে অনেকেই এই আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য বুঝতে পারেননি; ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিটি গ্রাম কিংবা ওয়ার্ড ভিত্তিক স্থানীয় সরকারের ইউনিট স্থাপনের কোনো প্রয়োজন নেই, জনাব আবু তালেবের এই দৃঢ় বক্তব্যের, অবস্থানের সারবত্তাও অনেকে একেবারেই বুঝতে পারেননি, এবং অনেকেই তাঁর এই দৃঢ় বক্তব্যকে, অবস্থানকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি বলে তাঁকে অনেকেই ভুল বুঝেছেন, ক্ষুরধার সমালোচনা করেছেন; অনেকেই ২০২০ ও ২০৫০ নিয়ে উপহাস করেছেন; জনাব তালেব দেশে থাকেন না, বিদেশে থেকে তিনি কি বাংলাদেশ ভালভাবে বুঝবেন? বাংলাদেশ চলে এডহক ভিত্তিক ভাবনায়, ভিশন ভিত্তিক বাংলাদেশের কথা তথা ২০২০ ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক স্বপ্নময় কথা কেবলই পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছু নয়; এমন সব কথা পিছনে তো বলতই, মাঝেমধ্যে সামনাসামনি বলে তাঁকে নিরাশ করার চেষ্টা করা হত; কিন্তু তিনি ওসব কথা সহজভাবে নিয়ে হেসে উড়িয়ে দিতেন। অনুরূপ কঠোর সমালোচনায় পড়তে হয়েছিল “গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা” নামকরণে “গণতান্ত্রিক” শব্দটি লাগানোর জন্যও। তাতে কিন্তু তিনি একটুও দমে যাননি; তিনি তাঁর সুদৃঢ় বক্তব্য নিরলসভাবে গোটা জাতিকে সাধ্যমত লাগাতার জানিয়ে বুঝিয়ে চলেছেন। এটা তো ঠিক যে, সমষ্টিগত কিংবা জাতিগত ভুল ভাঙ্গানো সহজ কাজ নয় এবং এও ঠিক যে, যে কোনো সত্য বিষয় সহজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়না, যায়নি। এসব বিষয় মাথায় রেখেই সিডিএলজি লাগাতার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার স্থাপন, কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক না হওয়া পর্যšত সিডিএলজি’র এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন, সংগ্রাম অবশ্যই চলতে থাকবে। ফলে, আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, স্বনির্ভর গ্রাম সরকার, পল্ল¬ী পরিষদ, গ্রাম সভা, গ্রাম পরিষদ, গ্রাম সরকার ও ওয়ার্ড সভার মত উপজেলাও একটা মিথ ও অপ্রয়োজনীয় ইউনিট হিসেবে একদিন না একদিন অবশ্যই প্রমাণিত হবে; এবং তথাকথিত ‘গ্রাম সরকার’র মত উপজেলার প্রতিও দেশবাসী ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের প্রবল মোহ ভঙ্গ হবে; আর সেজন্য, ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী থেকে পরিচালিত দেশের সার্বিক গণতন্ত্রায়নের ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার বিরতিহীন বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও তার অপরিসীম গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে, এই ১৩ জানুয়ারীকেই “স্থানীয় সরকার দিবস” হিসেবে ঘোষণা ও পালন করার জন্য সিডিএলজি, এমপো বাস্তবায়ন ফোরাম ও বাপসনিউজ জোর দাবী জানিয়ে আসছে। আমরা আশা করি সরকার তা বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে তার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
প্রাসঙ্গিকভাবে দুইটি বিষয় পাঠক-পাঠিকা সমাজের অবগতির জন্য স্পষ্ট করা দরকার বলে মনে হয়; তার একটি হল, “সিটি কর্পোরেশন” শব্দবন্ধটি নিয়ে; অনেকে ভুলবশত “সিটি” শব্দটির বাংলা “মহানগর” বলে থাকেন, লিখে থাকেন যেমন ঢাকা মহানগর, চট্রগ্রাম মহানগর, রাজশাহী মহানগর ইত্যাদি; গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দলগুলো, স্থানীয় প্রতিনিধিগণ, আইনপ্রণেতাগণ ও নীতিপ্রণেতাগণও তাই বলে-কয়ে চলেছেন। মূলত “নগর” শব্দটির ইংরেজী অনুবাদ হবে “সিটি” কিংবা “সিটি” শব্দটির  বাংলা অনুবাদ হবে “নগর”; “মহানগর” হল কীভাবে? তা তো মাথায় আসেনা। এবং সবাই জানে যে, “কর্পোরেশন” শব্দটি সাধারণত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ব্যবহার হয়ে থাকে, এবং এই “কর্পোরেশন” শব্দটি বললে বা শুনলে মানুষের মানসপটে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কথাই ভেসে ওঠে, এবং মুনাফা, লাভালাভ কেন্দ্রিক কর্মকান্ডের কথা চলে আসে; প্রশ্ন হল, স্থানীয় সরকার কি মুনাফামুখী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান? তা তো নয়; তাইলে “কর্পোরেশন” শব্দটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নাম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে কেন? এ কি “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি” তুল্য নাম? এই দুইটি বিষয় বিবেচনায় এনে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় জনাব আবু তালেব কেবল “নগর” আর “নগর সরকার” শব্দবন্ধদ্বয় ব্যবহার করেছেন। তাই তো আমরা সবসময় বলে আসছি যে, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা অনুযায়ী কল্যাণমূলক, সেবামূলক ও উন্নয়নমূলক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে ভুল নামকরণ “মহানগর” নামটি থেকে আর মুনাফার গন্ধ যুক্ত নামকরণ “কর্পোরেশন” নামটি থেকে অবিলম্বে মুক্ত করতে হবে; আমরা আশা করি এই ধরনের বড় ভুল আর গোজামিল থেকে সরকারসহ সবাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দায় স্বীকার করেই বের হয়ে আসবেন। অপরটি হল, সরকারসহ অনেকেই ভুল ধারণা বশত শুধু সিটি কর্পোরেশনগুলোকে আরবান ইউনিট মনে করে থাকে; এই ভুল ধারণাটি ভাঙ্গতে ও প্রকৃত বিষয় তুলে ধরতে এই প্রতিবেদনে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ অনুযায়ী নগর, নগরীয় ইউনিট ও নগরীয় এলাকা বলতে সিটি কর্পোরেশনগুলোর পাশাপাশি দেশের সকল পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকেও বুঝানো হয়েছে। প্র্রকৃত অর্থে, নগর ও নগরায়ন বোঝেনা, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বোঝেনা এমন সব ব্যক্তি ও সরকারী কর্মকর্তাগণ (বিশেষত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, একনেক, নিকার, মন্ত্রিপরিষদ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, সংসদ, বিচার ও রাষ্ট্রপতির সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনের সচিবালয়ের কর্মকর্তাগণ) এর কারণে নগরীয় এলাকায় অবস্থিত স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিটগুলোকে বিভিন্ন নীতি, আইন ও বিধিতে বিভিন্ন নাম দিয়ে একটা বিভ্রান্তিকর অবস্থায় রাখা হয়েছে; একই আইনে গ্রামীণ এলাকার স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট “ইউনিয়ন” নামকরণের মত একই আইনে নগরীয় এলাকার স্থানীয় ইউনিটগুলিও শুধু “নগর” নামে পরিচিত হতে পারতো, হতে পারে, এবং ইউনিয়ন ও নগরে যথাক্রমে ইউনিয়ন সরকার ও নগর সরকার গঠিত হতে পারত, হতে পারে। ইউনিয়নগুলির মধ্যে আয়তন, জন সংখ্যা, রাজস্ব আয়-ব্যয় ও গুরুত্বে যেমন পার্থক্য রয়েছে, ঠিক তেমনি নগরগুলোর মধ্যেও আয়তন, জনসংখ্যা, রাজস্ব আয়-ব্যয় ও গুরুত্বে পার্থক্য রয়েছে; যদি গ্রামীণ এলাকায় “ইউনিয়ন” নামকরণে অসুবিধা না থাকে, নগরীয় এলাকায় এক ধরনের নাম “নগর” হতে অসুবিধা কোথায়? সেই বিষয়টি একেবারেই বোধগম্য নয়। আবার, ইউনিয়নের জন্য ‘ইউনিয়ন সরকার’ গঠন করার বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে ইউনিয়নের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ‘ওয়ার্ড সভা’ গঠনের আইন রয়েছে, এবং নগরগুলির জন্য ‘নগর সরকার’ গঠন করার বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে প্রতিটি নগরীয় ওয়ার্ডে অপ্রয়োজনীয় ‘ওয়ার্ড কমিটি’ গঠন করার আইনও রয়েছে; এও এক ধরনের পাগলামি ছাড়া অন্য কিছু নয়। সে যাই হোক, বাংলাদেশ এখন আর শুধু গ্রামীণ দেশ নয়, কেবল কৃষিজ সমাজ নয়; বিদ্যমান বাস্তবতায় এখনকার বাংলাদেশ হচ্ছে গ্রামীণ-নগরীয় দেশ, গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ, অর্থাৎ একটি মিশ্র সমাজ; গ্রামীণ বাংলাদেশ আর গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এক বিষয় নয়; এই দু’টোর সম্ভাবনা, সমস্যা, উন্নয়ন পরিকল্পনা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক ধরনের নয়; কৃষিজ সমাজ আর গ্রামীণ-নগরীয় সমাজের ধ্যান-ধারণা ও জীবনাচরণ এক নয়; তাই এই দু’টোর প্রশাসনিক কাঠামো ও তার কার্যাবলীও এক ধরনের হওয়া উচিত নয়; দুঃখজনক বিষয় হল, অন্যান্য পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনার মত ৭ম পঞ্চ বার্ষিক (২০১৬-২০২০) পরিকল্পনার চূড়ান্ত খসড়ায়ও তার ইঙ্গিত, স্বীকৃতি ও প্রস্তুতিমূলক বিষয় একদম নেই বললে চলে। রাজনৈতিক দলসহ মিডিয়াও এই বিষয়টি বুঝতে পারছেনা বলে প্রতীয়মান হয়। জনাব আবু তালেব বাংলাদেশের স্ট্যাটাসগত ও গুণগত এই বিরাট পরিবর্তনের কথা সর্বপ্রথম ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী ঢাকায় আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে তুলে ধরেন; সেই থেকে অনেক সময় পার হয়েছে; নতুন কোনও কিছু বুঝে ওঠতে সময় লাগতেই পারে; কিন্তু এত বেশী সময় লাগাটা একদম মেনে নেয়া যায়না। এই বিষয়টি যত দ্রুত সম্ভব মিডিয়া, নীতিপ্রণেতাগণ, আইনপ্রণেতাগণ ও গোটা সমাজকে বুঝতে হবে, এবং সরকার কর্তৃক বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রামীণ-নগরীয় দেশ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে; গ্রামীণ সমাজ তথা কৃষিজ সমাজ থেকে গ্রামীণ-নগরীয় সমাজের ধ্যান-ধারণায় ও জীবনাচরণে অভিযোজন প্রক্রিয়া সচেতনভাবে সম্পন্ন করতে হবে, তার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রণীত, গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে হবে, এবং তারই ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো, ক্ষমতা ও কার্যাবলী ঠিকঠাক করতে হবে। এই তো গেল একটা দিক; অন্য দিক হল দ্রুত নগরায়নের ফলে বিদ্যমান গ্রামীণ-নগরীয় দেশ থেকে বাংলাদেশ একটি পরিপূর্ণ নগরীয় দেশ হবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে; একটি গ্রামীণ দেশ, কৃষজ সমাজ থেকে একটি পরিপূর্ণ নগরীয় দেশ, নগরীয় সমাজ হবার পথে গ্রামীণ-নগরীয় দেশ, গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ হচ্ছে একটা মধ্যবর্তী পর্যায়; তবে এর স্থায়িত্ব কালও কম সময় নয়; তা মাথায় রেখেই পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এর সমস্যা ও তার সম্ভাব্য সমাধানসূত্র বাস্তবায়নের জন্য সামগ্রিকভাবে মানসিক ও শিক্ষাগত প্রস্তুতিও এখন থেকে নিতে হবে। এক হিসাব অনুযায়ী দ্রুত নগরায়নের ফলে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ৫০% এলাকা হয়ে যাবে নগরীয় এলাকা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১০০% এলাকা হয়ে যাবে নগরীয় এলাকা; অন্যভাবে বলা যায়, গ্রামীণ ইউনিটগুলি যেমন ইউনিয়নগুলি বিলুপ্ত হয়ে যাবে; তাতে কি হবে? তাতে গোটাদেশ নগরীয় ইউনিটে বিভক্ত হয়ে পড়বে। ফলে আজকের যে গ্রাম কিংবা আগের যে সনাতন গ্রাম তা মূলত জাদুঘরে ও বই-পুস্তকে ঠাঁই পাবে; বাস্তবে সেই গ্রামের চিহ্ন কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা। এই বিষয়টি আরেকভাবে অনুধাবন করা যেতে পারে, বর্তমানে প্রায় ৩৫% জনগোষ্ঠী নগরীয় এলাকায় বসবাস করে, ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০% জনগোষ্ঠী নগরীয় এলাকায় বসবাস করবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১০০% জনগোষ্ঠী নগরবাসী হয়ে যাবে। চলমান এই নগরায়ন প্রক্রিয়ায় একদিকে গ্রামীণ কৃষি পেশাতে কর্মসংস্থান বিপুলভাবে কমছে, কমতে থাকবে, এবং অন্যদিকে অন্যসব নতুন নতুন অকৃষি পেশাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, হতে থাকবে। তার আলামত প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে, বুঝা যাচ্ছে। সুতরাং, দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায় যে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ মানে পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ; তাই গ্রামীণ বাংলাদেশ থেকে বিদ্যমান গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশও চিরকাল গ্রামীণ-নগরীয় দেশ থাকবেনা; এটি একটি মধ্যবর্তী পর্যায়; এই মধ্যবর্তী পর্যায় থেকে দ্রুত নগরায়নের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ, নগরীয় সমাজ, নগরীয় সভ্যতা; বাংলাদেশ খুব দ্রুত তালে সেদিকেই এগিয়ে চলেছে। এই বিষয়টি বিশ্বাসে রেখে, তারই ভিত্তিতে একটি পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগরীয় বাংলাদেশ, নগরীয় প্রশাসনিক ইউনিট ও তার জন্য গতিশীল ‘নগর সরকারের রূপরেখা’ ও তা স্থাপন সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট সুস্পষ্ট প্রস্তাব সর্বপ্রথম ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারীতে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’য় উপস্থাপিত করা হয়েছে; এটি একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বিধায় তখন অনেকেই তা বুঝে উঠতে পারেনি, দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও এখনও অনেকে তা বুঝে উঠতে পারছেনা বলে প্রতীয়মান হয়; বিশেষত দুঃখজনক বিষয় হল, ১৯৯৭ সাল থেকে সিডিএলজি’র এই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যাম্পেইন চলমান ও দৃশ্যমান থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, কৃষি মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ, একনেক, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রীপরিষদ ও জাতীয় সংসদ তা পুরোপুরি বুঝতে অপারগ কিংবা বুঝতে চায়না বলে প্রতীয়মান হয়; এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাগণের সেকেলে চিন্তাভাবনা ও কর্মকা- জাতিকে অনেক অনেক পেছনে ফেলে রেখেছে; বাংলদেশকে পিছনে ফেলে রাখার সেই অদূরদর্শি ধারা পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক প্রণীত ৭ম পঞ্চ বার্ষিক (২০১৬-২০২০) পরিকল্পনার চূড়ান্ত খসড়ায় ছিলো এবং তা চূড়ান্ত পরিকল্পনায়ও রয়েছে; আর যারা নগরীয় ইউনিটে মেয়র ও কাউন্সিলর হয়েছে কিংবা হতে চায় তারাও “পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত” নগর, নগরায়ন, নগরবাদ, নগরীয় কৃষি, নগরীয় সভ্যতা, নগরীয় কালচার, নগরীয় জীবনধারা ও নগর সরকারের রূপরেখা নিয়ে তেমন একটা চিন্তাভাবনা করে বলে প্রতীয়মান হয়না; সেই ১৯৯৭ সালে জনাব আবু তালেব “পরিকল্পিত” শব্দটির আগে “পরিবেশবান্ধব” শব্দটি জুড়িয়ে দিয়ে আগে “পরিবেশ” বিষয়টি সকলের সামনে নিয়ে আসেন-যার গুরুত্ব ও তাৎপর্য এখনও অনেকে বুঝেন না বলে বুঝা যায়; তবে “পরিবেশবান্ধব” শব্দটি আস্তে আস্তে হলেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে; বুঝে হোক আর না বুঝে হোক লেখালেখিতে শব্দটি প্রায়োগিক গুরুত্ব পাচ্ছে। শুরুতে অনেকেই এই শব্দটির ব্যবহার বাঁকা চোখে দেখতেন, এ নিয়ে জনাব আবু তালেব কর্তৃক বাড়াবাড়ি বলে আলোচনা-সমালোচনা করতেন এবং এই শব্দ আর স্থানীয় সরকারের রূপরেখা-এ দু’য়ে সম্পর্ক কোথায় তা নিয়েও প্রশ্ন করতেন। এতো সত্য যে, ২০২০ ও ২০৫০ সালদ্বয়কে সামনে রেখে প্রতিটি নগর ভিত্তিক পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সেবামূলক সার্ভিস পরিচালিত করার লক্ষ্যে নগরীয় প্রশাসনিক ইউনিটগুলো সাজানো ও তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা ও কর্মসূচী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই, তা স্পষ্টভাবে বুঝা যায়; এ এক মহা হতাশাজনক চিত্র; এর অবসান হওয়া খুবই জরুরি বৈকি। সেক্ষেত্রে আশার আলো হল, এটি নিয়ে সিডিএলজি, বাপসনিউজ, এমপো বাস্তবায়ন ফোরামসহ আরও অনেকে লাগাতার ক্যাম্পেইন চালিয়ে আসছে; ফলে একদিন না একদিন এই হতাশাজনক চিত্র একটি আলোকিত চিত্রে পরিণত হবে, হতে বাধ্য।

alt
সে যাই হোক, সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের প্রয়োজন হচ্ছে একটি দুই স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার পদ্ধতি; আর কেন্দ্রীয় সরকারসহ বাংলাদেশের প্রয়োজন হচ্ছে একটি তিন স্তরবিশিষ্ট সরকার পদ্ধতি। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে একটি দুই স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার কাঠামো স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করার দিকে যেতে হবে; দুইয়ের চেয়ে বেশী স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার কাঠামো থাকলে তাতে মধ্যবর্তী ইউনিট থাকবে, এখন যেমন উপজেলা রয়েছে; এই অপ্রয়োজনীয়, দায়দায়িত্বহীন, স্বশাসনহীন মধ্যবর্তী ইউনিটের অস্তিত্ব বজায় রাখাটা হচ্ছে, হবে কেবলই অপচয়মূলক ও অসৎউদ্দেশ্যমূলক; এই মধ্যবর্তী ইউনিট নিয়ে ইতোমধ্যে অনেক সময় ও অর্থ নষ্ট করা হয়েছে; আশাকরি, আর কাল বিলম্ব না ঘটিয়ে এই বিষয়টি নীতিপ্রণেতা ও আইনপ্রণেতাগণ যত দ্রুত সম্ভব বুঝার চেষ্টা করবেন এবং তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। ভুল ধারণা বশত বাংলাদেশকে এখনও একটি গ্রামীণ দেশ (রুরাল কান্ট্রি) মনে করা হয়; কিন্তু বাংলাদেশ এখন আর শুধু গ্রামীণ দেশ নেই; এই ভুল ধারণার পরিবর্তে বিদ্যমান বাস্তবতায় বাংলাদেশকে একটি গ্রামীণ-নগরীয় (রুরাল-আরবান) দেশ হিসেবে ধরে নিয়ে এবং ২০২০ ও ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ ও বিশ্বময় পরিবর্তনশীল বিষয়গুলি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৯৬ সালে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ণ বিষয়ক গবেষক আবু তালেব স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ ও স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ প্রণয়ন করেন, এবং তিনি তা ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী ঢাকায় জতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক জাতীয় সেমিনারের মাধ্যমে জনগণ ও বাংলাদেশ সরকারের বিবেচনার্থে উপস্থাপিত করেন; এটি গ্রামীণ বাংলাদেশ এর পরিবর্তে গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য গণতান্ত্রিক স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রথম উদ্যোগ, প্রথম প্রচেষ্টা; দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সেবামূলক কর্মকা- ধাপে ধাপে (কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত) ধারাবাহিকতায় স্থিতিশীল গতিশীল প্রক্রিয়ায় পরিচালিত করার জন্য স্থানীয় সরকারের একটি স্তরবিন্যাসকরণ দেশের সূচনা লগ্ন থেকে ঠিক করার প্রয়োজন থাকলেও আজ অবধি এই কাজটি সচেতনভাবে সঠিকভাবে করার কোনো উদ্যোগ গৃহীত হয়নি, হচ্ছেনা; তা অবশ্যই দুঃখজনক ঘটনা; সে যাই হোক, তিনি উক্ত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয়ে মধ্যবর্তী ইউনিটগুলি, যেমন উপজেলা, ও অন্যান্য গ্রামীণ ইউনিটগুলি, যেমন ইউনিয়ন, কীভাবে আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাবে তা রেখাচিত্রের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন; এবং, ওই প্রস্তাবিত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয়ে গোটা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কীভাবে একটি দুই স্তরবিশিষ্ট কাঠামো হয়ে ওঠবে তাও গ্রাফে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন; তাতে তিনি সরকারের আকার আয়তন আস্তে আস্তে ছোট করার ব্যবস্থা করেছেন, ফলে কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সিস্টেম কস্ট কমে গিয়ে উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। উভয় কাঠামোতে ২০৫০ সালে কিংবা তার আগেই একটি পরিপূর্ণ ‘নগরীয় (আরবান) বাংলাদেশ’ গঠনের স্বপ্ন ও তার বাস্তবরূপ তুলে ধরা হয়েছে। বিদ্যমান ‘গ্রামীণ-নগরীয় (রুরাল-আরবান) বাংলাদেশ’ কি প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আস্তে আস্তে পরিপূর্ণ ‘নগরীয় (আরবান) বাংলাদেশ’ হয়ে ওঠবে এবং পরিপূর্ণ ‘নগরীয় বাংলাদেশ’ এ কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে স্থানীয় সরকার তথা শুধু নগরীয় স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ কি রূপ নিবে, নিতে পারে, তা ওই স্তরীয় কাঠামোগত রেখাচিত্রে সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ও বোধগম্য করা হয়েছে; এ এক মহা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কাজ; এ এক মহা বিস্ময়কর ব্যাপার, বিষয়। যে কেউ এই কাজের গভীরতা ও তাৎপর্য বুঝতে পারলে শ্রদ্ধায় ভালবাসায় নত হয়ে যাবারই কথা; আমাদের প্রবল বিশ্বাস হচ্ছে, জনাব আবু তালেব ২০৫০ সালের মধ্যে “নগরীয় বাংলাদেশ” এর স্বপ্নদ্রষ্টা ও ক্যাম্পেইনার হিসেবে, আগে পরিবেশ এই বিষয়টি মাথায় রেখে “পরিকল্পিত” শব্দটির আগে “পরিবেশবান্ধব” শব্দটি লাগিয়ে “পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগর ও নগরায়ন” শব্দবন্ধের ইনকুবেটার ও ক্যম্পেইনার হিসেবে, ২০২০ সালের মধ্যে একটি ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ নির্মাণের স্বপ্নদ্রষ্টা ও তার বাস্তবায়নমূলক পরিকল্পনার প্রণেতা ও ক্যাম্পেইনার হিসেবে, দেশের অন্য সকল ক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০২০ ও ২০৫০ সাল কেন্দ্রিক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া মান্য করানোর প্রবক্তা ও ক্যাম্পেইনার হিসেবে, নারীর ৫০% প্রতিনিধিত্বের প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ ধারণার পরিবর্তে নারীপুরুষের জন্য এমপো তথা একশো একশো (১০০-১০০) প্রতিনিধিত্ব ফর্মুলা ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রণীত ১১ দফার ইনকুবেটার ও ক্যাম্পেইনার হিসেবে, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’র প্রণেতা হিসেবে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের রূপরেখার প্রণেতা হিসেবে, গণতান্ত্রিক আইনসভার রূপরেখার প্রণেতা হিসেবে, গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক অনেকগুলি শ্লোগানের রচয়িতা হিসাবে, কেবল কৃষি ভিত্তিক ধারণায় ‘গ্রামীণ বাংলাদেশ’ নামে চিরায়ত পরিচিতি পাল্টে দিয়ে কৃষি-অকৃষি পেশাভিত্তিক মিশ্র ধারণায় একটি “গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ” নামীয় পরিচিতি তুলে ধরার জন্য, আবার ২০৫০ সালের মধ্যে “গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ” থেকে একটি পরিপূর্ণ “নগরীয় বাংলাদেশ’ নির্মাণে স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এখানে আরও জানিয়ে রাখা উচিত হবে যে, তার এই প্রশাসনিক স্তরীয় কাঠামোগত রূপরেখা হচ্ছে ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রথম প্রস্তাবিত পরিকল্পনা, প্রথম দৃষ্টান্ত; যেটি দেশের অন্যসব ক্ষেত্রের জন্য ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সবাইকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে আসছে, এবং সকলকে তাতে অনুপ্রাণিত করতে লাগাতার ক্যাম্পেইন চলে আসছে। প্রসঙ্গত বলা দরকার যে, তিনি এই রূপরেখায় ২০২০ সালের মধ্যে একটি ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ (যেটি ‘গণস্বপ্ন ২০২০’ নামে বহুল পরিচিত) নির্মাণ করার যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন ও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার পরিকল্পনা হাজির করেছেন তা অনেকে পরিপূর্ণভাবে না বুঝে কিংবা বুঝে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ‘ ও ‘উন্নত বাংলাদেশ’ এর মধ্যেকার বিশাল তফাতকে গুলিয়ে ফেলে বক্তব্য হাজির করার অপচেষ্টা করছেন বলে প্রতীয়মান হয়; ঠিক যেমন অনেকে না বুঝে এক সময় ‘জাতীয় সরকার/কেন্দ্রীয় সরকার’ আর ‘জাতীয় একতা সরকার’ বিষয়দ্বয়ের মধ্যেকার তফাত গুলিয়ে ফেলতেন; ওই তফাতের বিষয়টি গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় সর্বপ্রথম সুস্পষ্টভাবে হাজির করার পর তা গুলিয়ে ফেলার বিষয়টি প্রায় বন্ধ হয়েছে বলে মনে হয়। এখন একইভাবে ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ আর ‘উন্নত বাংলাদেশ’ এর মধ্যেকার ফারাক গুলিয়ে ফেলার বিষয়টি বন্ধ হলে ভাল হয়; কারণ ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ হচ্ছে টু ইন ওয়ান আর ‘উন্নত বাংলাদেশ’ হচ্ছে ওয়ান ইন ওয়ান; এটি যাঁদের উদ্দেশ্যে বলা হল, আশা করি, তাঁরা তা বুঝবেন এবং নিজেদেরকে সংশোধন করবেন। সে যাই হোক, এই আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ আরও অনেকে ২০২০ সালের কথা বলছে, ২০২১ সালের কথা বলছে, ২০৩০ সালের কথা বলছে, ২০৪০ সালের কথা বলছে, ২০৪১ সালের কথা বলছে, ২০৫০ সালের কথাও একটু আধটু উচ্চারণ করছে, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা বলছে এবং সর্বোপরি এডহক ভিত্তিক পরিচালিত কর্মকান্ডের পরিবর্তে স্বপ্ন (ভিশন) ভিত্তিক কর্মকান্ড পরিচালনার কথা বলছে; এক্ষেত্রে মনে করিয়ে দেয়া প্রয়োজন  যে, তার উৎস, অনুপ্রেরণা, পথপ্রদর্শক, পথিকৃৎ হচ্ছে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা, ওই রূপরেখায় উপস্থাপিত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয় অর্থাৎ জনাব আবু তালেব, যার লাগাতার ক্যাম্পেইন তিনি নিউ ইয়র্ক থেকে সূচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সফলভাবে চালিয়ে আসছেন; তিনি নিজে একটা লম্বা সময় বাংলাদেশে থেকে ২০০৮ সালে ও ২০০৯ সালে এই ক্যাম্পেইন পরিচালিত করেছেন। তবে জনাব আবু তালেব এর আহবান ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৯৭ সাল থেকে যদি ২০২০ ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক দেশের সকল ক্ষেত্রে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন, গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হত, যদি ‘গণস্বপ্ন ২০২০’ ভিত্তিক ২৫টি ক্ষেত্রে ২৫টি গণতস্ত্রায়ন কর্মসূচী নিয়ে ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ নির্মাণ প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন শুরু হত, যদি ‘গ্রামীণ বাংলাদেশ’ এর পরিবর্তে ‘গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ’ এর ধারণা সবাই বুঝত ও গ্রহণ করত, যদি ‘গণস্বপ্ন ২০৫০’ ভিত্তিক পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত ‘নগরীয় (আরবান) বাংলাদেশ’ মুখী নির্মাণ প্রক্রিয়া প্রচেষ্টা সচেতনভাবে শুরু হত, যদি ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি তথা ‘এমপো’ ও ১১ দফা অনুযায়ী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে শুরু হত, যদি ২০২০ ও ২০৫০ সন ভিত্তিক প্রণীত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ অথবা স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ অনুযায়ী স্থানীয় সরকার কাঠামো বাস্তবায়ন শুরু হত, তাহলে আজ বাংলাদেশ আরো অনেক অনেক দূর সকল ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকতে পারতো; কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল তথা ইউনিয়ন ও নগর পর্যন্ত ধাপে ধাপে ক্ষমতাশীল দায়িত্বশীল দায়বদ্ধ গতিশীল সরকার কাঠামো দাঁড়িয়ে যেতে পারতো; সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে উঠতে পারতো। তবে বিলম্বে হলেও ভিশন ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা বোঝা ও কোনও কোনও বিষয়ে ভিশন ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপিত হওয়াটা অবশ্যই প্রশংসনীয়; কোনও কিছু অনুসরণে ও গ্রহণে যেসব রীতিনীতি মান্য করতে হয় তা বিবেচনায় নিলে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা, নকলবাজী দলীয় ঘোষণাপত্রে পিডিপি ২০৫০ নিয়ে করেছে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০২০, ২০২১ ও ২০৪১ নিয়ে করছে, সম্প্রতি একই বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা, নকলবাজী বিএনপিও ২০৩০ নিয়ে করছে, আরও অনেকে বিভিন্নভাবে করছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; এই দলগুলি জনাব আবু তালেবের প্রতি কৃতজ্ঞতা, ধন্যবাদ জানাতে পারত; তা তো কোনও দলই করেনি; অথচ নকল আর অনুসরণ নিয়ে বাহাস হচ্ছে, বাহবা নিতে কসরত চলছে; কোন দল নকলে প্রথম হল আর কোন দল নকলে দ্বিতীয়, তৃতীয় হল, তা নিয়ে। এসব নিয়ে মিডিয়াও তালি বাজাচ্ছে, ঢোল পেটাচ্ছে, অথচ সত্য কথা বলছেনা; তাসত্ত্বেও, আমরা বলব, ভিশন ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপিত করাকে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাই, স্বাগত জানিয়ে যাব; কারণ আমরা চাই সবাই ভিশন ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করুক, এডহক ভিত্তিক কর্মকান্ড বর্জন করুক। প্রসঙ্গত আরও বলব যে, ভিশন, মিশন, গোল ও অবজেকটিভ এই শব্দগুলোর অর্থ, তাৎপর্য ও নির্দিষ্ট রূপ রয়েছে, তা যেন কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে বজায় রাখা হয়, মান্য করা হয়; যেনতেন উপায় অবলম্বনে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপিত হওয়া কাম্য নয়, অথচ হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। সে যাই হোক, বরাবরের মত এখনো জাতীয় নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমাদের সবিনয় অনুরোধ হল, ২০২০ ও ২০৫০ সন ভিত্তিক প্রণীত প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ ও স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ আরও ভালভাবে জানুন এবং তা আরও গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করুন। আমরা তো সবসময় বলে আসছি যে, আগে স্থানীয় সরকারের একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ গ্রহণ করতে হবে, এবং সে অনুযায়ী গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় সরকার হিসেবে সর্বোচ্চ ইউনিট (বিভাগীয় সরকার অথবা জেলা সরকার) ও সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয় (একদিকে গ্রামীণ স্থানীয় সরকার হিসেবে “ইউনিয়ন সরকার” ও অন্যদিকে নগরীয় স্থানীয় সরকার হিসেবে “নগর সরকার”) কার্যকর করতে হবে। স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট বিভাগ, না জেলা তা আজ অবধি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত করা হয়নি; ক্ষমতা ও দায়িত্ব বিভিন্ন স্তরে যথাযথভাবে বণ্টনের স্বার্থে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি কেন ঠিক করা হয়নি সে প্রশ্ন রেখেই বলব সর্বোচ্চ ইউনিট কোন্টি তা অবশ্যই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঠিক করতে হবে। বর্তমানে বিভাগ হচ্ছে কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোয় মাঠ পর্যায়ে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ইউনিট; এই বিভাগ স্থানীয় সর্বোচ্চ ইউনিট থাকলে উপজেলার পাশাপাশি জেলাও থাকছে মধ্যবর্তী ইউনিট; ফলে জেলার ক্ষমতা ও দায়িত্ব মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে নির্ধারিত করতে হবে; মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে জেলায় গঠিত স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা কতটুকু থাকবে তা বুঝতে হবে; এ প্রসঙ্গে দৃঢ়তায় বলা যায় যে, বর্তমান কাঠামোয় মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে জেলার গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা উপজেলার মতই হবে, হতে বাধ্য, এবং তাতে জনগণ হতাশ হবে, জেলায় স্থানীয় সরকারের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হবে, এবং এটি নিয়ে নীতিনির্ধারকগণকে মুখ লুকিয়ে থাকতে হবে। সেজন্য মনে করিয়ে দেয়া দরকার যে, বহু স্তরীয় স্থানীয় সরকার কাঠামোয় মধ্যবর্তী ইউনিট থাকলে তা সাধারণত বেশ গুরুত্বহীন ভূমিকায় থাকে, এবং কর্মকান্ড, তৎপরতা বেশ সীমিত পর্যায়ে থাকে। এই বিষয়টি অনেকেই বুঝতে পারছেন না বলে প্রতীয়মান হয়; এই অনেকেরাই “বিভাগ” বিষয়েও অন্ধ-বোবা সাজেন; অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে? যেহেতু সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে বিভাগ আছে, তাই বিভাগ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত অবশ্যই নিতে হবে; তা হলো, হয় বিভাগ বিলুপ্ত করতে হবে, নয় বিভাগে স্থানীয় সরকার স্থাপন করতে হবে। সে যাই হোক, বিদ্যমান ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে জেলা সম্পর্কিত বিষয়টি উদাহরণ দিয়েই দেখা যাক; পার্বত্য ৩ জেলা ছাড়া বাকি ৬১টি জেলায় ৬১ জন নিযুক্ত ‘নিধিরাম’ জেলা পরিষদ প্রশাসক ছিলো, যাদের সঙ্গে দায়দায়িত্ব পালনের কোনো সম্পর্ক ছিলনা, যাদের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক ছিলনা, যাদের উপস্থিতি, কর্মতৎপরতা একদম টেরযোগ্য ছিলনা; এর বড় কারণ হচ্ছে উপজেলার মত জেলাও বিদ্যমান ব্যবস্থায় গুরুত্বহীন, কামকাজহীন মধ্যবর্তী ইউনিট; এতে ক্ষমতা ও দায়িত্ব তথা কর্মকান্ড দৃশ্যমান নয়। কিন্তু এই ৬১ জন প্রশাসকের জন্য আরাম আয়েস ও সুযোগসুবিধার কোনো কমতি ছিলনা; এটি ছিল স্থানীয় সরকারের নামে সংকীর্ণ স্বার্থে সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার ও উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রয়োগ; ঠিক যেমন স্থানীয় সরকারের নামে কেবল ব্যক্তিগত ও দলগত স্বার্থে অবৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট জিয়া ও অবৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট এরশাদ যথাক্রমে গ্রাম সরকার ও উপজেলাকে নিয়ে করেছেন। তাতে তখনকার সময় ও পরিস্থিতিতে উভয় অবৈধ প্রেসিডেন্টদ্বয় ব্যক্তিগতভাবে ও দলগতভাবে লাভবান হয়েছেন; কিছু সুবিধাবাদী ক্ষমতালোভী নীতিহীন টাউট লোককে নতুন দল দু’টির জন্য হাতিয়ার হিসেবে পেয়েছেন, এবং ওইসব সুবিধাবাদী মানুষগুলোই ওই দু’টো দলের বর্তমানকার আসল কান্ডারি হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ৬১টি জেলায় ৬১ জন প্রশাসক দ্বারা এই সরকার ও এই দল (আওয়ামী লীগ)  লাভবান হবার কথা নয়; কারণ এই দু’টো কাজের সময় ও পরিস্থিতি একদম এক রকম নয়। তবে দলীয় ৬১ জন ব্যক্তিকে সরকারী টাকায় পোষা জাতীয় স্বার্থ হতে পারেনা; তা বর্তমান সরকার ও আওয়ামী লীগ বুঝে থাকলে তো অবশ্যই ভাল; পাশাপাশি, প্রাসঙ্গিকভাবে জেলা সংক্রান্ত আরেকটি বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলা উচিত হবে, তা হল সার্বিক বিবেচনায় একজন অসফল অর্থমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত জনাব মুহিত কর্তৃক উপস্থাপিত জাতীয় বাজেটে বার বার কেন্দ্রীয় সরকারের তথাকথিত ‘জেলা বাজেট’ প্রসঙ্গ উত্থাপন; জেলা বাজেট হবার কথা জেলা সরকারের, কেন্দ্রীয় সরকারের নয়; প্রশ্ন হল, জেলা সরকার কোথায়? স্বাভাবিকভাবে মনে এই প্রশ্নও এসে যায় যে, কেন্দ্রীয় সরকার কি তাইলে বিভাগীয় বাজেট, উপজেলা বাজেট, নগরীয় বাজেট, ইউনিয়ন বাজেটও করবে? জেলা বাজেট বিষয়টি জাতীয় বাজেট বক্তৃতায়, দলিলে বার বার আসাটা শুধু অর্থমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রণালয় নয়, মন্ত্রিপরিষদ ও জাতীয় সংসদের অপরিপক্কতারই পরিচয় বহর করে; সিপিডিসহ কয়েকটি এনজিও এবং কিছু ব্যক্তি স্বার্থগত কারণে এই বাজে বিষয়টিকে সমর্থন দিয়ে থাকে; প্রকৃত অর্থে স্থানীয় সরকার না বুঝলে, ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন সম্পর্কিত বিষয় জানা না থাকলে এমনটি-ই হয়! হবার কথা! জনাব আবু তালেব ১৯৯৬ সালে সর্বপ্রথম ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ প্রণয়ন করেন এবং সেসঙ্গে একটি শ্লোগানও প্রণয়ন করেছিলেন; শ্লোগানটি হল, ‘জেলায় জেলায় গণতন্ত্রায়ন, জেলার জনগণের ক্ষমতায়ন’; জনাব মুহিত জনাব আবু তালেবের সঙ্গে এক ফোনালাপে ‘জেলা সরকার’ নামকরণ ও ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ বিষয়ক প্রস্তাবনার প্রতি প্রবল আপত্তি জানিয়ে ছিলেন; অথচ এই মুহিত সাহেব পরবর্তীতে ‘জেলায় জেলায় গণতন্ত্রায়ন’ শ্লোগানের আদলে ‘জেলায় জেলায় সরকার’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন; তাতে তিনি জনাব আবু তালেব ও তাঁর জেলা সরকারের রূপরেখা প্রসঙ্গ একটুও উল্লেখ করেননি; এই হল জনাব মুহিত কর্তৃক বুদ্ধিবৃত্তিক চুরির, ডাকাতির, অসততার একটি নজির মাত্র। আমরা দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলতে চাই যে, কোনো না কোনো একদিন অর্থমন্ত্রীর এই তথাকথিত ‘জেলা বাজেট’ বিষয় হারিয়ে যাবে; এই ভুলের জন্য অর্থমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও জাতীয় সংসদকে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে; সিপিডি’রও তোষামোদী মুখোশ উন্মোচিত হবে; আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, জনাব আবু তালেব কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘জেলা সরকার’ ও ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ একদিন না একদিন বাস্তব প্রয়োজনে সামনে চলে আসবে; তাতে শয়তানিপনা না থাকলে জাতি বিশেষভাবে উপকৃত হবে; তবে, সিডিএলজির সমালোচনার মুখে কেন্দ্রীয় বাজেট ২০১৬-১৭ তে তথাকথিত ‘জেলা বাজেট’ বিষয় উবে গেলেও এই বাজেটে জেলা নিয়ে অন্য শয়তানিপনা প্রকাশ পেয়েছে; জনাব মুহিতের সেই শয়তানিপনা কি মন্ত্রীগণ ও সাংসদগণ বুঝতে পেরেছেন? তা তো বাজেট আলোচনায়-সমালোচনায় একদম বোঝা যায়নি। অনুরূপ আরেকটি চুরি-ডাকাতি কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার ঘটনা ‘বিভাগীয় সরকার’ ও বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা’ নিয়ে ঘটিয়েছেন ‘কবিতা চোর’, ‘বৌ চোর’ ও ক্ষমতা দখলদার হিসেবে খ্যাত জেনারেল এরশাদ, তাঁর দল জাতীয় পার্টি ও তাঁর রাজনৈতিক ও শাসনিক সহযোগী জেএসডি; ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী ঢাকায় এক জাতীয় সেমিনারে জনাব আবু তালেব গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় বিভাগ এর বিলুপ্তি কিংবা বিভাগের গণতন্ত্রায়ন এই নীতিগত অবস্থান তুলে ধরেন, এবং বিভাগ থাকলে বিভাগগুলির গণতন্ত্রায়নের লক্ষ্যে ‘বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা’ উপস্থাপিত করেন; তখন রাষ্ট্রপতি এরশাদ কারাগারে ছিলেন এবং তাঁর দল ও তাঁর শাসনিক মিত্র জেএসডির বিভাগ নিয়ে কিংবা বিভাগীয় সরকার নিয়ে কোনো ধরনের বক্তব্য, কর্মসূচি ছিলনা; জনাব আবু তালেব এর প্রস্তাব অনুযায়ী বিভাগের বিলুপ্তি কিংবা বিভাগীয় সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যখন বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছিল, ঠিক তখনই, এরশাদ সাহেব কারাগার থেকে বের হবার কয়েক বছর পর বিভাগকে ‘প্রদেশ’ নামকরণ ও তাতে বিভাগীয় সরকারের রূপরেখার আদলে অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ‘প্রাদেশিক সরকার’ করার দাবী করেন; এর কিছুদিন পর এরশাদের অনুসরণে জনাব আ.স.ম. আবদুর রব, জনাব সিরাজুল আলম খান ও জেএসডি অনুরূপ বক্তব্য, দাবী উপস্থাপিত করেন, অথচ উভয় দল কোথাও কখনও জনাব আবু তালেব কিংবা গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখার কথা বলেননি, বলেননা; একে এক কথায় বলা যায় চরম রাজনৈতিক অসততা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চুরি কিংবা ডাকাতি। এইসঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবে আরও একটি বিষয় তুলে ধরা দরকার তা হল, ১৯৯৭ সালে ১৩ জানুয়ারীতে এই রূপরেখায় পার্বত্য চট্রগ্রাম সমস্যার রজনৈতিক সমাধানের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ‘পার্বত্য বিভাগ’ নামে একটি নতুন বিভাগ গঠন করার প্রস্তাব করা হয়, এবং তাতে দেশের অন্যান্য বিভাগের মত, যেমন বরিশাল বিভাগে ‘বরিশাল বিভাগীয় সরকার’, পার্বত্য বিভাগে ‘পার্বত্য বিভাগীয় সরকার’ প্রতিষ্ঠার আহবান জানানো হয়, কারণ পার্বত্য চট্রগ্রামের বিষয়টিও অনেকাংশে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ক, স্থানীয় শাসনিক বিষয়ক একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ১৯৯৭ সালেই শেষ মাসে তথা ডিসেম্বরই সম্পাদিত পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে ‘আঞ্চলিক পরিষদ’ গঠন মূলত ‘বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা’র আদলে কিছুটা বিকৃত রূপে করা হয়; কিন্তু এই চুক্তি প্রণয়নে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার জন্য ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’, বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা তথা জনাব আবু তালেব এর অবদানের কথা, প্রস্তাবের কথা কোথাও বলা হয়নি, হয়না; অথচ, জনাব আবু তালেব তাঁর প্রণীত গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখার কপি নিজ হাতে নিউ ইয়র্কে সরকার কর্তৃক গঠিত পার্বত্য চট্র্রগ্রাম বিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক জনাব আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহকে প্রদান করেছেন এবং তাঁর প্রস্তাবিত পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক সমাধানমূলক প্রস্তাবনা বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন; সেই সময় এই প্রতিবেদকসহ যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও দপ্তর সম্পাদক যথাক্রমে জনাব আব্দুস ছালাম ও আতাউর রহমান শামীম উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে এই দলেরই বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদগুলির মধ্যে একজন সাংগঠনিক সম্পাদক এই পার্বত্য এলাকার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়; তার মাধ্যমে ‘পার্বত্য বিভাগ’ গঠনের নীতিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেছে, কবুল করেছে, অথচ এই বিষয়টিও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোথাও স্বীকার করেননি, করেননা; এও একটি চরম বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা নয় কি? অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও; ৮ জন বুদ্ধিবৃত্তিক ডাকাতের ডাকাতির ফসল হচ্ছে বর্তমানকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর; এই অপকর্ম সম্পর্কে দেশের কয়েকশত বিশিষ্ট ব্যক্তি জানেন; তিনি সরকারীভাবে মুক্তিসংগ্রামের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে সোহরাওয়ার্দি উদ্যান কেন্দ্রিক আরও একটি যুগান্তকারী প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন; দেখা যাক এ নিয়ে কি ঘটে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কি ঘটান! এসব কারণে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা যে একটা বড় ধরনের অপরাধ, বড় ধরনের রোগ তা বাংলাদেশে মানুষকে বুঝানোর জন্য, জানানোর জন্য এবং তা বন্ধ করানোর জন্য একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবল আন্দোলন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বলে প্রতীয়মান হয়; প্রাসঙ্গিকভাবে আরো উল্লেখ করা সমীচীন হবে যে, জনাব আবু তালেব প্রতিটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে অন্যান্য বিষয়ক সম্পাদক পদ যেমন রয়েছে, ঠিক তেমন ‘স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক’ পদ সৃষ্টি করতে আহবান জানিয়ে আসছেন; যাতে স্থানীয় সরকার বিষয়টি দলীয় কমিটিতে, দলীয় ভাবনায়, দলীয় কাজে বিশেষ গুরুত্ববহ হয়; প্রায় সব রাজনৈতিক দলেই শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, ক্রীড়া, সমাজকল্যাণ, সাংগঠনিক, দপ্তর, প্রচার, প্রকাশনা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ত্রাণ, শ্রম, জনশক্তি, বন, সমবায়, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক, মহিলা ইত্যাদি বিষয়ক সম্পাদকীয় পদ রয়েছে, অথচ স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদকীয় পদ নেই; কেন? এতে এটা কি বোঝা যায়না, রাাজনৈতিক দলীয় কাঠামোতে স্থানীয় সরকার ও তার ভাবনাচিন্তা চরমভাবে গুরুত্বহীন রয়েছে। স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক পদ সৃষ্টিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও আজ অবধি সাড়া দেয়নি; আমরা আশা করেছিলাম, জনাব আবু তালেবের আহ্বান অনুয়ায়ী, এই বছর ২০১৬ সালে ঢাকায় ২২ ও ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলনে ৬ হাজার ৭০ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ‘স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক’ এর পদ সৃষ্টি করবেন, সেজন্য ড. আব্দুর রাজ্জাক নেতৃত্বাধীন গঠনতন্ত্র উপকমিটি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, তার জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনাব আবু তালেব এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে উদার হবেন, এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার দায় থেকে নিজ দলকে মুক্ত রাখতে প্রয়াস নেবেন; কিন্তু ৬ হাজার ৭০ সদস্যবিশিষ্ট একটি মহাঢাউস কাউন্সিলে কয়েকজন চাটুকারের অপ্রাসঙ্গিক চাটুকারিতা ছাড়া দলীয় ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র নিয়ে আালোচনায়-সমালোচনায় অংশ নেয়া কি সম্ভব ছিল? গঠনতন্ত্র উপকমিটি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটি কি স্থানীয় সরকার উন্নয়ন বিষয়ে আপডেট ও আন্তরিক ছিল? আমরা হ্যাঁ সূচক লক্ষণ তো একটুও দেখিনা। সে যাই হোক, জেলা স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হলে বিভাগ অবশ্যই বিলুপ্ত হতে হবে; সেক্ষেত্রে উপজেলা শুধু মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে থাকবে, এবং তা আস্তে আস্তে কিংবা দ্রুততার সঙ্গে বিলুপ্ত হতে থাকবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট ও সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয় নির্ধারিত না হলে স্থানীয় সরকারের প্রতিটি ধাপে ক্ষমতা ও দায়িত্ব যথাযথভাবে ঠিকঠাক হবে-ই বা কেমন করে? সর্বোচ্চ ইউনিট এবং সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয়ে ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রদান করার পর মধ্যবর্তী ইউনিট যেমন উপজেলায় ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেয়ার মত কিছু থাকলেই তো তা দেয়া যাবে। স্থানীয় সরকারের এসব জটিল ও কঠিন বিষয়গুলির একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বিত সমাধান ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’য় রয়েছে। এতে সর্বপ্রথম বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা, জেলা সরকারের রূপরেখা, উপজেলা সরকারের রূপরেখা, ইউনিয়ন সরকারের রূপরেখা ও নগর সরকারের রূপরেখা একসঙ্গে উপস্থাপিত করা হয়েছে; যাতে একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ (প্রশাসনিক কাঠামো) গৃহীত হলে তার প্রতিটি টায়ার এ প্রয়োজন মত সুনির্দিষ্ট সরকার কাঠামো বসানোর কাজটি সহজে করা সম্ভব হয়। এই রূপরেখায় ইউনিয়ন ও নগর এর মধ্যে অন্য কোনো ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তা, প্রচেষ্টা একদম সমর্থন করা হয়নি, তার পরিবর্তে সর্বনি¤œ ইউনিট হিসেবে সমস্ত মনোযোগ, কর্মপ্রচেষ্টা এক দিকে গ্রামীণ এলাকায় ইউনিয়ন কেন্দ্রীক ও অপর দিকে নগরীয় এলাকায় নগর কেন্দ্রিক করার সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে; এবং এর মাধ্যমে শুধু গ্রামীণ এলাকা কেন্দ্রীক স্থানীয় সরকারের সর্বনি¤œ ইউনিট বিষয়ক দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা ধরিয়ে দিয়ে গ্রাম ও নগর কেন্দ্রীক একই স্তরে সর্বনি¤œ ইউনিটদ্বয় (ইউনিয়ন ও নগর এবং ইউনিয়ন সরকার ও নগর সরকার ) কেন্দ্রীক ধারণা উপস্থাপিত করা হয়। সাম্প্রতিককালে সরকার জেলায় ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ না নিয়ে অত্যন্ত তড়িগড়ি করে একটি ভঙ্গুর জেলা পরিষদ অধ্যাদেশ জারী করল এবং তা অল্প কয়েকদিনের মাথায় মন্ত্রিপরিষদ সংশোধনও করল; তাতে স্থানীয় সরকার বিষয়ে ভাল মানসিক, শিক্ষাগত ও আইনগত প্রস্তুতি যে এই মন্ত্রিসভার ছিলনা তা ভালভাবে ফুটে উঠে; এবং জেলা পর্যায়ে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার তেমন কোনো প্রস্তুতি যে আওয়ামী লীগেরও নেই তা জোর দিয়েই বলা যায়; দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলিরও একই অবস্থা। আরও দুঃখজনক ঘটনা হল এই যে, এই সংক্রান্ত আইনও কোনো ধরনের আলোচনা-সমালোচনা ছাড়া স্বল্প সময়ে জাতীয় সংসদে পাস হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হল যে সংসদ সদস্যগণেরও স্থানীয় সরকার বিষয়ে কোনো আইনগত, গবেষণামূলক ও শিক্ষামূলক প্রস্তুতি নেই; এতে আরও প্রমাণিত হল যে, শুধু হাত তোলা আর নামানোর মধ্য দিয়ে জাতীয় সাংসদগণ নিজ নিজ বিধানিক দায়িত্ব পালন করছেন! জাতীয় সংসদে পাসকৃত এই আইনটি অসম্পূর্ণ, ভঙ্গুর, সেকেলে ও গারবেজতুল্য; তাছাড়া, এই আইনটি হচ্ছে প্রত্যাখাত আয়ুবীয় মৌলিক গণতন্ত্র বাংলাদেশে র্চ্চা করতে নগ্ন প্রয়াস। এই ধরনের একটি কঠিন অথচ চরম খারাপ পরিস্থিতিতে আমরা জোর দাবী করেছিলাম যে, জনাব আবু তালেব প্রণীত জেলা সরকারের রূপরেখাটি গভীরভাবে বিবেচনায় নিয়ে পার্বত্য তিন জেলাসহ সকল জেলায় একরূপ জেলা সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হোক; জেলা স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট না মধ্যবর্তী ইউনিট তা ঠিক করা হোক; জেলা মধ্যবর্তী ইউনিট হলে এতে গ্রামীণ স্থানীয় সরকার হিসেবে জেলা সরকার প্রতিষ্ঠা করা হোক, আর জেলা সর্বোচ্চ ইউনিট হলে এতে গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় সরকার হিসেবে জেলা সরকার স্থাপন করা হোক; তাতে ক্ষমতার পৃথকীকরণ করা হোক; এতে নারীর ১০০% প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এমপো’র প্রয়োগ করা হোক; জেলা সরকারের বিধানিক পরিষদ হিসেবে “জেলা সংসদ” গঠন করা হোক; প্রতি জেলায় জেলা সাংসদ কতজন থাকবে তা সংশ্লিষ্ট জেলায় কত জনসংখ্যা রয়েছে তা বিবেচনায় নিয়ে জেলা নির্বাচনী ওয়ার্ড/এলাকা গঠন করা হোক; প্রতিটি জেলা নির্বাচনী ওয়ার্ডে/এলাকায় এমপো অনুযায়ী ১জন মহিলা জেলা সাংসদ ও ১জন পুরুষ জেলা সাংসদ প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত করা হোক; জেলা সরকারের প্রধান হিসেবে জেলা চেয়ারপারসন ও দুই জন ভাইস-চেয়ারপারসন (১ জন নারী ও ১ জন পুরুষ) এর পদ সৃষ্টি করা হোক এবং ওসব পদ প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত করা হোক; (প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখা উচিত হবে যে, এমপো অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে প্রণীত ১১ দফায় ৯ম দফা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক প্রণীত খসড়া জেলা পরিষদ অধ্যাদেশে ১জন মহিলা ভাইস-চেয়ারপারসন ও ১জন পুরুষ ভাইস চেয়ারপারসন নির্বাচিত করতে একটি বিধান ছিল, তা কেন সংসদে পাসকৃত জেলা পরিষদ আইনে যুক্ত হলো না? এই প্রশ্ন থাকল)। জেলা ন্যায়পালের পদ সৃষ্টি করা হোক; জেলার সঙ্গে সিটি কর্পোরেশন ও অন্যান্য স্থানীয় ইউনিটের সম্পর্ক (যেমন পদমর্যাদা, কর্মপরিধি, ক্ষমতা, বেতন-ভাতা ইত্যাদি) কিরূপ হবে, তা ঠিক করা হোক; জেলা নির্বাচনী বোর্ড গঠিত হোক; তথাকথিত আয়ুবীয় কায়দায় চালুকৃত নির্বাচনী পদ্ধতি বাতিল করা হোক, ইত্যাদি ইত্যাদি; এক কথায় বলব যে, জনাব আবু তালেব প্রণীত, প্রস্তাবিত গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় উপস্থাপিত জেলা সরকারের রূপরেখাটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হোক, এবং “জেলায় জেলায় গণতন্ত্রায়ন, জেলার জনগণের ক্ষমতায়ন” এই শ্লোগানে প্রতিটি জেলাকে মুখরিত করা হোক, আন্দোলিত করা হোক। কিন্তু তা করা হয়নি; পরিবর্তে একটা অসম্পূর্ণ, অদূরদর্শী আইন দ্বারা জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছে। এই ২১ সদস্য বিশিষ্ট ‘জেলা পরিষদ’ কতটুকু কার্যকরী হয় তা দেখতে জাতিকে কিছু সময় অপেক্ষায় থাকতে হবে, তবে আমরা আগেরমত এখনও বলতে চাই যে, এটি উপজেলা পরিষদেরই মত আশাহীন, কাজকামহীন, তাৎপর্যহীন, গুরুত্বহীন, শক্তিহীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবাইকে হতাশ করবে; নব গঠিত এই ২১ সদস্য বিশিষ্ট জেলা পরিষদ কেবল নিজ নিজ স্বার্থগত সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়ে দেবে।
     এই গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় গ্রামীণ বাংলাদেশ তথা শুধু কৃষি ভিত্তিক সমাজ, দেশ এর চিরায়ত ধারণার পরিবর্তে বিদ্যমান বাস্তবতার নিরিখে গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ তথা কৃষি ও অকৃষি পেশা ভিত্তিক সমাজ, দেশ এর ধারণা তুলে ধরা হয়েছে, যার মাধ্যমে এই প্রথম বাংলাদেশের স্ট্যাটাসগত ও গুণগত পরিবর্তন জনিত নতুন পরিচিতি উপস্থাপিত করা হয় এবং তা আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারীভাবে গ্রহণ করার দাবী জানানো হয়, তবে এই বিষয়টি তখন ও এখন অনেকেই বিশেষত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, একনেক, অর্থ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ, জাতীয় সংসদ, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলগুলো বুঝতে পারছেনা বলে প্রতীয়মান হয়; প্রসঙ্গত এই বিষয়ে আরও জানানো উচিত হবে যে, গ্রামীণ বাংলাদেশ আর গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এক বিষয় নয়, এক রূপ নয়, এক অবস্থা নয়; এ দু’টোর সমস্যা, সমাধান প্রক্রিয়া, গুরুত্ব ও তাৎপর্য এক রকম নয়; তাই, এই দু’টোর প্রশাসনিক কাঠামো, ক্ষমতা ও দায়িত্বও একরূপ হতে পারেনা; এই দু’টোতে মানুষের মনোগত, ভাবনাগত পার্থক্য থাকে, থাকবে। তাই এখন থেকে, গ্রামীণ বাংলাদেশ ভিত্তিক নয়, গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ ভিত্তিক সকল উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণীত, গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে হবে; এটি যত দ্রুত সম্ভব দেশের নীতিপ্রণেতাগণ, আইনপ্রণেতাগণ, বিধি-প্রবিধি প্রণেতাগণ ও মিডিয়াকে বুঝতে হবে এবং তার স্বীকৃতি ও পরিচিতি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান দিতে হবে যে, বাংলাদেশ এখন হচ্ছে একটি গ্রামীণ-নগরীয় দেশ; বাংলাদেশ একদা গ্রামীণ তথা কৃষিজ দেশ ছিলো, এখন আর তা নেই, এবং একে অবশ্যই একটি গুণগত পরিবর্তন হিসেবে নিতে হবে; সেইসাথে এও মনে রাখতে হবে যে, এই স্ট্যাটাসগত ও গুণগত পরিবর্তন কয়েক দশক স্থায়ী থাকবে; তা রাতারাতি উবে যাবেনা; আবার এও মনে রাখতে হবে যে, এই সময়টাতেই একটি পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য গোটা জাতিকে মানসিক ও শিক্ষাগত প্রস্তুতি যথাসম্ভব সম্পন্ন করতে হবে, এবং এই সময়ের মধ্যেই একটি নগরীয় বাংলাদেশের মানে, গুরুত্ব ও তাৎপর্য যথাসম্ভব অনুধাবন করতে সচেষ্ট থাকতে হবে। সেসঙ্গে যাঁরা অকৃষি পেশায় যুক্ত রয়েছেন, সন্তানগণকে অকৃষি পেশায় নিযুক্ত করছেন, নগরীয় সুযোগ-সুবিধা বেশ উপভোগ করছেন, অথচ অন্যদেরকে কেবল কৃষি পেশায় রাখতে, গ্রামীণ সমাজ হিসেবে রাখতে ওকালতি করছেন, কান্নাকাটি করছেন, কুমতলব আঁটছেন, গলাবাজি, লেখাবাজি করছেন, তাঁদেরকে অবশ্যই চোখে চোখে রাখতে হবে, নজরদারিতে রাখতে হবে; এটি যেন আমরা ভুলে না যাই।
গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের এই রূপরেখায় কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারের জন্য প্রস্তাবিত সংসদগুলো গঠনের ক্ষেত্রে এমপো ও ১১ দফা’র প্রয়োগ করা হয়েছে; এমপো ও ১১ দফা এই নিবন্ধের শেষে সংযুক্ত করা হয়েছে, তা বিশেষভাবে দেখুন ও জানুন; এমপো তথা নারীপুরুষের জন্য একশো একশো প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি অনুযায়ী, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউনিয়ন সংসদ ও নগর সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ১ জন নারী সদস্য ও ১ জন পুরুষ সদস্য প্রতিনিধিত্ব করবে, জেলা সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলা সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা/ওয়ার্ড হতে একজন নারী সাংসদ ও একজন পুরুষ সাংসদ জেলা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবে এবং জাতীয় সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা থেকে ১ জন নারী সাংসদ ও ১ জন পুরুষ সাংসদ প্রতিনিধিত্ব করবেন; যদি তা হয়, তার মাধ্যমে বিধানিক সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে নারীর জন্য অবমাননাকর “সংরক্ষিত আসন” শব্দবন্ধটি আর থাকবে না এবং তা এক কলংকিত অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে। প্রসঙ্গক্রমে মনে রাখতে বলব যে, এমপো শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা দুনিয়ার প্রতিটি দেশের প্রতিটি ধাপের/স্তরীয় সরকারের প্রতিটি বিধানিক সংসদ/পরিষদ গঠন করার জন্য বাস্তবায়নযোগ্য এক নতুন গণপ্রতিনিধিত্ব ফর্মুলা হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়েছে; এর মাধ্যমে নারীর জন্য অবমাননাকর সংরক্ষিত পদ্ধতি, ৩৩% পদ্ধতি, ৫০% পদ্ধতি, প্রতি তিন ওয়ার্ডে একজন সংরক্ষিত নারী সদস্য পদ্ধতি, সংরক্ষিত ঘূর্ণায়নমান নারী সদস্য পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাগুলো, দুর্বলতাগুলো সংশোধিত হয়ে যাবে; নারী ও পুরুষ উভয় একই সাধারণ পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন; নারী যে পদ্ধিতে নির্বাচিত হবেন সেই একই পদ্ধতিতে পুরুষও নির্বাচিত হবেন বলে নারীর জন্য প্রয়োগকৃত “সংরক্ষিত” শব্দটি ইতিহাসে স্থান পাবে; চমক সৃষ্টি করতে দু’একজন নারীকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় বসিয়ে দিয়ে বাহবামূলক কাজের পরিবর্তে নারীর জন্য পদ্ধতিগত ক্ষমতায়নের ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। তার জন্য বিশ্বজুড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যাম্পেইন চলছে; এই এমপো তথা একশো একশো প্রতিনিধিত্ব ফর্মুলার সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব ও তাৎপর্য হচ্ছে এক বিস্ময়কর ব্যাপার। নারী ও পুরুষ উভয়ের যে কেহ এই ফর্মুলার সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বুঝতে পারলে, অনুধাবন করতে পারলে নিজ থেকে নিজ নিজ শক্তিতে বলিয়ান হয়ে আন্দোলন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে; তাই দেশের প্রতিটি মানুষের প্রতি আমাদের বিশেষ অনুরোধ হল, একশো একশো প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি তথা এমপো গভীরভাবে জানার বুঝার চেষ্টা করুন; নিজেকে একুশ শতকের এই মহান আন্দোলনের সঙ্গে, সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করুন; তাতে আপনার ও গোটা মানব জাতির জন্য যারপর নাই এক মঙ্গলময় পরিবেশ বয়ে আনবে। (প্রিয় রিডার এই বিষয়টি আরও ভালভাবে জানতে চাইলে, বুঝতে চাইলে এই নিবন্ধের শেষে সংযুক্ত এমপো ও ১১ দফা বিশেষ মনোযোগ দিয়ে দেখুন, পড়–ন ও বিবেচনা করুন।)
সে যাই হোক, সুচতুর দলীয় ও নির্দলীয় নকলবাজগণ এই গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখার কিছু কিছু জনপ্রিয়, পছন্দনীয় বিষয় বারবার কাটাছেঁড়া ও বিকৃত করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে, এবং এর কিছু কিছু বিষয় নকলবাজরা নিজেদের নামে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে; কিন্তু নকলবাজগণ, বুদ্ধিবৃত্তিক চোর-ডাকাতগণ এই রূপরেখার সমন্বিত রূপের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব একটুও খাটো করতে সক্ষম হননি, হবেনও না; বরং এই রূপরেখার কালজয়ী উপযোগিতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাই, সরকারের প্রতি আমাদের বিনীত অনুরোধ হল, যদি গ্রামীণ বাংলাদেশ এর পরিবর্তে বিদ্যমান বাস্তবতায় গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত হিসেবে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চান, যদি গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য তিন প্রকারের স্থানীয় সরকার তথা গ্রামীণ স্থানীয় সরকার, নগরীয় স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় সরকার স্থাপিত হোক চান, যদি স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা ও দায়িত্ব ধাপে ধাপে পাশাপাশি অর্পিত ও পালিত হোক চান, যদি স্থানীয় সরকারের একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ (প্রশাসনিক কাঠামো) প্রতিষ্ঠিত ও কার্যকরী হোক চান, যদি দ্বিস্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা স্থায়ী রূপ নিক চান, যদি স্থানীয় সরকারের প্রতিটি ধাপে নারীর শতভাগ (১০০%) প্রতিনিধিত্ব তথা এমপোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে চান, যদি স্থানীয় সরকারের প্রত্যেক ধাপে ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি কার্যকর হোক চান, যদি স্থানীয় সরকারে বিধানিক পরিষদ (যেমন ইউনিয়ন সংসদ, নগর সংসদ) স্থাপিত হোক চান, যদি প্রতিটি স্থানীয় ইউনিটে ন্যায়পাল এর পদ চালু হোক চান, যদি ২০২০ সালের মধ্যে ২৫টি ক্ষেত্রে ২৫টি গণতন্ত্রায়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ তথা “গণস্বপ্ন ২০২০” বাস্তবায়িত হোক চান, যদি কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরীয় গণতন্ত্রায়ন দ্বারা জনগণের সর্বস্তরীয় ক্ষমতায়ন হোক চান, যদি ২০৫০ সাল কিংবা তার আগে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত “নগরীয় বাংলাদেশ” তথা “গণস্বপ্ন ২০৫০” বাস্তবায়িত হোক চান, যদি পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ অথবা স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ বাস্তবরূপ নিক চান, যদি খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে “নগরীয় কৃষি” ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক চান, যদি “নগর মানে কৃষি নয়” এর পরিবর্তে “কৃষিকে নিয়েই নগর” বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হোক চান, যদি দক্ষ সরকার গড়তে সরকারের আকার আয়তন আস্তে আস্তে ছোট হোক চান, তাইলে আর কালবিলম্ব না করে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’র প্রতিটি বিষয় স্থাপন ও কার্যকর করার প্রকৃত উদ্যোগ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করুন; প্রসঙ্গত এও বলব যে, তা যেন নকলবাজী না হয়, তা যেন বুদ্ধিবৃত্তিক চুরি, ডাকাতি না হয়, তা যেন জনাব আবু তালেব এর অবদান অস্বীকার করার অভিপ্রায়, প্রয়াস না হয়। যিঁনি স্বপ্ন দেখেন, যিঁনি স্বপ্ন দেখান, যিঁনি স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপায় বাতলান, যিঁনি স্বপ্ন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করেন, যিঁনি স্বপ্নের বিষয়ে মানুষকে অনুপ্রাণিত করেন, সর্বোপরি যিঁনি স্বপ্ন বিষয়ে লাগাতার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন পরিচালিত করেন, তাঁকে অস্বীকারের সামান্যতম প্রয়াসও মহা অপরাধ, মহা অন্যায়, মহা কলংক হয়ে থাকবে; ঠিক যেমন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ৮ (আট) জন অসৎ লোক তা করেছে এবং তার জন্য এদেরকে মহা অপরাধের দায়ে মহা কলংক বহে বেড়াতে হচ্ছে, হবে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় এই মহা কলংকজনক বিষয়টি সম্পর্কে জনাব সৈয়দ হাসান ইমাম, জনাব নাসির উদ্দিন ইউসুফ, জনাব ড. মুনতাসির মামুন, জনাব ডা. মুশতাক হোসেন, জনাব শাহরিয়ার কবির সহ দেশ ও বিদেশের কয়েক শত বিশিষ্ট ব্যক্তি বিশেষভাবে অবগত রয়েছেন, সেসব ব্যক্তিরকথা লিখতে গেলে অনেক অনেক পৃষ্ঠা কাগজ লাগবে বইকি; নিউ ইয়র্ক থেকে পরিচালিত মুক্তিসংগ্রাম বিষয়ক গবেষণা ও স্মৃতি সংরক্ষণ করতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরসহ ৫টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ও ক্যাম্পেইন বিষয়ে প্রয়াত কবি সুফিয়া কামাল, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, ভাষা সৈনিক এডভোকেট গাজীউল হক, অধ্যাপক কবির চৌধুরী, কবি শামসুর রাহমান, সাহিত্যিক শওকত ওসমান, কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদসহ আরও অনেকে ভালভাবে জানতেন। তথাপি এই ৮ জন লোক তাদের অসৎ কর্ম থেকে শুদ্ধতায় যায়নি, যাচ্ছেনা; এঁরা যেন দুই কান কাটা মানুষের মত রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলার আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে; সে ধারা বজায় রেখে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে চরম বানোয়াট কাহিনী সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোতে (১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬ সংখ্যায়) দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বিবৃত করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে দেয়া বক্তব্যও চরম মিথ্যাচার; কারণ, ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় নির্বাচনী ইস্তেহারটিতে সরকারী উদ্যোগে “মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর” প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে স্পষ্ট ঘোষণা ছিল; সেই সালেই প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ করেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরটি কোথায় প্রতিষ্ঠিত হবে তা স্পষ্টভাবে জাতিকে জানিয়ে ছিলেন; কেন তা বাস্তবায়িত হয়নি সেই প্রশ্ন থাকলেও এ কথা দৃঢ়তায় বলা যায় যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নূরগংয়ীও অপকর্ম ভালভাবেই জানতেন। সেসব কারণেই, স্বভাবতই প্রশ্ন এসে যায় যে, মহান মুক্তিসংগ্রামের স্মৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনে নির্মিত প্রতিষ্ঠান গড়ার স্মৃতি নিয়ে, মানুষের আবেগ জড়িত বিষয় নিয়ে যাঁরা মিথ্যাচার করে বেড়ায়, কল্পিত কাহিনী শোনায় তাঁদের হাতে মুক্তিসংগ্রামের স্মৃতি সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন কতটুকু নিরাপদে আছে, থাকবে? তা নিয়ে ভাবা উচিত নয় কি? “মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর” শব্দবন্ধটি যাঁর কাছ থেকে জানা যায়, সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে “মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর” প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে যাঁর কাছ থেকে জানা যায়, তাঁকে ও তাঁর ক্যাম্পেইনকে, উদ্যোগকে, প্রচেষ্টাকে অস্বীকার করে চরম মিথ্যাচার করার জন্য মন্ত্রী হিসেবে, সাংসদ হিসেবে নূরের এখনই পদত্যাগ করা উচিত, আর সংস্কৃতিবিষয়ক একজন কর্মী হিসেবে তাঁর লজ্জিত হওয়া উচিত। যাইহোক, তাই তো বলি, অনুরূপ ঘটনা যেন স্থানীয় সরকার স্থাপনের ক্ষেত্রে না ঘটে, সেটি সরকারসহ সবাই মনে রাখবেন বলে আশা করি। আরও মনে রাখা দরকার যে, জনাব আবু তালেব তদবির চালিয়ে নবেল প্রাইজ নেয়ার লোক নয়, প্রতিবাদ আর দাবিতে স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পুরস্কার আদায় করার লোকও নয়; তিনি নিজস্ব মিডিয়ায় কিংবা তোয়াজী কায়দায় অন্য মিডিয়ায় আতœ-প্রচারণায় বিশ্বাসী মানুষও নন।
পুনশ্চ: প্রতিবেদনটি পাঠকপাঠিকা সমাজের ভালভাবে বোঝার সুবিধার্থে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক গবেষক এবং সিডিএলজি’র নির্বাহী পরিচালক জনাব আবু তালেব প্রণীত ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ থেকে প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১, স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ এবং মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো) ও তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রণীত ১১ দফার কপি নিচে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাতে, আমরা আশা করি, পাঠকপাঠিকাগণ, গবেষকগণ, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিগণ, নীতিপ্রণেতাগণ, আইনপ্রণেতাগণ, বিধিপ্রণেতাগণ, মন্ত্রীগণ, সরকারী কর্মকর্তাগণ, সাংবাদিকগণ, আইনজীবীগণ, প্রকৌশলীগণ, কৃষিবিদগণ ও দেশের সকল পর্যায়ের সকল জায়গার নীতিনির্ধারকগণ বিশেষভাবে উপকৃত হবেন। এসব বিষয়ে যে কোনো ধরনের প্রশ্ন থাকলে, তথ্যমূলক প্রশ্ন থাকলে, কোনো কিছু অস্পষ্ট বলে মনে হলে তার জন্য সঠিক উত্তর যোগাতে আমরা যথাসাধ্য সচেষ্ট থাকব বলে অঙ্গীকার থাকল। পাঠক-পাঠিকার বোঝার সুবিধার্থে আরও একটি বিষয় বলতে চাই তা হল, জনাব আবু তালেব এর গবেষণামূলক প্রস্তাবনাগুলোর উপস্থাপন পদ্ধতি হচ্ছে একজন দক্ষ চিত্রকরের মত; দক্ষ চিত্রকরের চিত্র দেখে তাঁর বিষয়, তাৎপর্য ও গভীরতা যেমন বুঝে নিতে হয়, ঠিক তেমনি তাঁর উপস্থাপিত রেখাচিত্র দেখে ও স্বল্প কথা পড়ে এর বিষয়গত সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য ও গভীরতা পাঠক-পাঠিকাকে গভীর মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হবে, অনুধাবন করতে হবে। তবে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রায় দুই দশক সময় লেগে যাচ্ছে দেখে খুবই দুঃখ লাগে বইকি? তাই অনুরোধ করব, গুরুত্ব দিয়ে সময়মত ভালভাবে নিজে বুঝুন এবং অন্যকে বুঝতে অনুপ্রাণিত করুন।

alt

মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো) একশো একশো প্রতিনিধিত্ব; একশো একশো ক্যাম্পেইন


alt
 বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এমপো অনুযায়ী প্রণীত ১১ দফা
(১) জাতীয় সংসদের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা হতে একজন মহিলা জাতীয় সংসদ সদস্য ও একজন পুরুষ জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে হবে; (২) জাতীয় সংসদে একজন মহিলা ডেপুটি স্পীকার ও একজন পুরুষ ডেপুটি স্পীকার নির্বাচিত করতে হবে; (৩) ইউনিয়নের প্রতি ওয়ার্ডে একজন মহিলা মেম্বার ও একজন পুরুষ মেম্বার নির্বাচিত করতে হবে; (৪) ইউনিয়নে একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন ও একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারপার্সন নির্বাচিত করতে হবে; (৫) পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের প্রতি ওয়ার্ডে একজন মহিলা কাউন্সিলর ও একজন পুরুষ কাউন্সিলর নির্বাচিত করতে হবে; (৬) পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনে একজন মহিলা ডেপুটি মেয়র ও একজন পুরুষ ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত করতে হবে; (৭) এমপো অনুযায়ী একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন ও একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হয়েছে; তা কার্যকর করতে ক্ষমতা ও দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে; (৮) উপজেলা সংসদ, জেলা সংসদ ও বিভাগীয় সংসদ এর প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা হতে একজন মহিলা সদস্য ও একজন পুরুষ সদস্য নির্বাচিত করতে হবে; (৯) জেলা ও বিভাগে একজন মহিলা ভাইস-চেয়ারপার্সন ও একজন পুরুষ ভাইস-চেয়ারপার্সন নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে; (১০) জাতীয় সভা গঠনের ক্ষেত্রে (যদি কখনও গঠিত হয়) প্রতিটি জেলাকে একেকটি নির্বাচনী এলাকা ধরে নিয়ে প্রত্যেক জেলা হতে একজন মহিলা জাতীয় সভাসদ ও একজন পুরুষ জাতীয় সভাসদ প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত করতে হবে (জাতীয় আইনসভার উচ্চকক্ষের নাম ও কাঠামো ‘গণতন্ত্রিক আইনসভার রূপরেখা’ অনুযায়ী করা হয়েছে); (১১) এমপো’র আলোকে অন্যান্য ক্ষেত্রেও ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্বে নরনারীর ক্ষমতায়ন যথাসম্ভব সুনিশ্চিত করতে হবে। (১১তম দফা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়দ্বয়ে একজন মহিলা উপ-উপাচার্য ও একজন পুরুষ উপ-উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছেন; এই পদ্ধতি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর করা উচিত হবে। এমপো অনুযায়ী উপজেলায় একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হয়েছেন। উপজেলায় ও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদ্ধতিগতভাবে ক্ষমতায়িত নারী নেতৃত্ব সৃষ্টি ও বিকাশে দৃশ্যমান সুফল আস্তে আস্তে  ফুটে ওঠতে থাকবে। ৯ম দফা অনুযায়ী  ওই সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত খসড়া জেলা পরিষদ অধ্যাদেশে একজন নারী ভাইস-চেয়ারপার্সস ও একজন পুরুষ ভাইস-চেয়ারপার্সন নির্বাচিত করার বিধান ছিল; পদ্ধতিগতভাবে নারী নেতৃত্ব সৃষ্টি ও বিকাশে এটি গ্রহণ করার পরিবর্তে বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ ও জাতীয় সংসদ তা বাদ দিয়ে একটি ভঙ্গুর জেলা পরিষদ আইন করেছে, তা অবশ্যই একটি অদূরদর্শি কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকবে। ২য় দফা অনুযায়ী জাতীয় সংসদে সরকার একজন মহিলা ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করতে পারতেন। তাতে না গিয়ে কেবল চমক সৃষ্টি করতে, কেবল বাহবা পেতে একজন অনভিজ্ঞ ব্যক্তিকে স্পিকার করেছেন, এবং তাতে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি বিধানিক প্রধান পদে দায়িত্ব পালনে বঞ্চিত হয়েছেন। আমরা নারীর ক্ষমতায়নের নামে চমক, করুণা আর দয়া চাইনা, চাই এমপো অনুযায়ী, ১১ দফা অনুযায়ী নারীর পদ্ধতিগত গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন হোক; তাতে অভিজ্ঞতায় ঘাটতি দিয়ে নির্বাহিক, বিধানিক ও বিচারিক কাজে দেশের কোনও ক্ষতি সাধিত হবে না, ক্ষতি সাধনে সম্ভাবনা থাকবে না; তাই আমরা সবাইকে এমপো ও ১১ দফা গভীরভাবে অনুধাবনে সচেষ্ট হতে অনুরোধ করব; এবং নারী মানুষের ক্ষমতায়ন পদ্ধতি বিষয়ক স্থানীয়, জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি, কর্মসূচী বুঝতে, জানতে বলব। তা করা হলে এমপোর সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে আরও সহজ হবে বলে প্রতীয়মান হয়। প্রসঙ্গক্রমে একটি বিষয় জানিয়ে রাখতে চাই যে, বাংলাদেশে যদি কেবল স্থানীয় সরকার পরিষদসমূহেও এমপো বাস্তবায়ন করা হয়, তা হলে বাংলাদেশ একটি নোবেল প্রাইজ পেয়ে যাবে বলে প্রতীয়মান হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি এই সম্ভাবনা ও সুযোগ গ্রহণে উদ্যোগী হবে?)
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক,সিনিয়র সাংবাদিক,রাজনীতিক,সদস্য ও মুখপাএ সিঊিএলজি যুক্তরাষ্ট্র,এডিটর বাপসনিঊজ এবং সভাপতি আমেরিকান প্রেসক্লাব অব বাংলাদেশ অরিজিন।ফোন:৯১৭-৮৩৭-৪৭০০


শব্দের গুন্জনে = জুলি রহমান

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই ২০১৭

দুলাল আমাকে ছেড়ে দিয়ে গেলো
গুলবাহারের ক্ষুধিত পাষাণ পুরিতে।
যেখানে হাওয়ার দাপাদাপি শব্দের গুন্জন!
প্রাচীন প্রাসাদের অর্গল খুলতেই
এলিভেটরের পাদপীঠ সন্মুখস্ত--

আমি নেশাগ্রস্ত; প্রাক্তন মুঘলীয় বংশধর!
নয়তো এই জঠরস্ত মোহরস আমাকে বশ করবে কেনো?

উপর তলার নূপূরের রিনিক ঝিনিক
সুরেলা কন্ঠের মোহময় সুরালাপ
আমাকে টেনে নিয়ে যায় এই নির্জন
প্রাসাদ পুরির  অভ্যন্তরে
একের পর এক তোরন খুলতেই শুধু হাসির বিলাপ
আমাকে যাদু মন্ত্রের মতোই টানে--

এ্যাশলেইর এই গভীর অরন্যে পাহাড়
সমান দালান?
রাস্তাটা সরু হতে হতে ক্ষীণ ক্ষুদ্র অতি সুরং পথ
বহু দূর থেকে কেমন ভয়াবহ সাপের চোখের বিস্তার যেনো।
সবুজের শেষ নেই আকাশের মেঘ ছুঁয়েছে পাতারা
বিস্তীর্ন সূর্য বিভার রেশ পড়েছে লাল ইটের উপর--

এবার হৃদমটা স্পস্ট হতে হতে পেঁচালো শরীর
হাজার বালিকা নৃত্যরত গৌরবর্ণা
কাতানের ভাঁজে ভাঁজে মখমলি সুর
রৌদ্রের ঝালরে বিদ্ধ করে পা যুগল
সপ্তরঙের নহবতে সানাই বাদক
আমাকে পেঁচিয়ে তুলে নিলো সপ্তম তলায়---

দেখি ইরানী গোলাপ পড়ে আছে বিছানায়
খুশ আমদুদ ;আমিতো নই রাজার পোষ্য কিংবা রাজপুত্র!
অতীতের কোনো খানশামা প্রাগৈতিক!
হঠাৎ একি !জেগে ওঠে এ্যাশলের চর
বজরায় শায়িত আমরা সেযুগের
নাম তাঁর এ্যাশলে রাজার কণে---

চোখ তাঁর হাজার নিয়নের বাতি
মুখ তাঁর ডাবের জলে মেজেছে কে -বা
সিঁথির পথটা জোনাক জ্বলা রাত
বহুদূরাগত দ্বীপের ভেতর নাম না জানা
সে পথেই আমরা দুজন হঠাৎ দেখা
যাকে খুঁজেছি জীবন ভর---

লক্ষকোটি পথ পাড়ি দিয়ে এ্যাশলের চর।
খুশিতে অন্তর ভরপুর যখন
চোখের পাতায় আঁকা হলো তাঁর নাম

দুলাল ঘটালো আজগুবি কারবার
জানেন তো কবি?এ জায়গাটা কী চমৎকার!--!