Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড = বঙ্গবন্ধুকে সম্মান করে ব্রিটেন সম্মানিত

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৮

বাপ্ নিউজ : ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২। লন্ডনে কনকনে ঠাণ্ডা। তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে। এমন হাড়কাঁপানো শীতে ব্রিটেনের জন্য তথা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের জন্য এক মুহূর্তের উষ্ণতা নিয়ে দেশটির হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করে পাকিস্তান এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট। এর ঠিক ঘণ্টাখানেক আগে ব্রিটেন জানতে পারে এই বিমানে করেই নামছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আর এভাবেই এক মহানায়কের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে যায় ব্রিটেনের নাম। বঙ্গবন্ধু মনেপ্রাণে চাইছিলেন তিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে সরাসরি বাংলাদেশেই ফিরবেন।

পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহমদ ইরান-তুরস্ক রুট ধরে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এ রুটটি পছন্দ হয় না বঙ্গবন্ধুর। তিনি কেবল ঢাকায় ফিরতে চান এবং তা সরাসরি। আজিজ আহমদ জানালেন, এটি সম্ভব নয়। কারণ ভারতের আকাশসীমা তারা ব্যবহার করতে পারবেন না। আজিজ আহমদ বলেন, ‘আমরা চাইছি পাকিস্তান এয়ারলাইনসে আপনাকে ফেরত পাঠাতে। যেহেতু আমরা ভারত হয়ে যেতে পারব না তাই অন্য একটি দেশে আপনাকে যেতে হবে।’ শেষ পর্যন্ত অন্য দেশ হিসেবে ব্রিটেনকে বেছে নেওয়া হয়। এরপর ৮ জানুয়ারি, রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা বজায় রেখে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডন পৌঁছে দেয় পাকিস্তান। হিথরোয় বিমান অবতরণের মাত্র এক ঘণ্টা আগে ব্রিটেন জানতে পারে, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অল্প সময়ের মধ্যেই লন্ডন এসে পৌঁছছেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই বিমানে ছিলেন সহযাত্রী ড. কামাল হোসেন। দ্রুতগতিতে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। এদিন বিবিসির ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে ভোরের খবরে জানিয়ে দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর লন্ডন আগমনের খবর। তারা জানায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী প্লেন হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। তাকে বরণ করে নিতে ৮ জানুয়ারি ভোরে লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে আলাদা প্রাণচাঞ্চল্য জাগে। এরই মধ্যে ব্রিটেন সিদ্ধান্ত নেয়, তারা বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করবে, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বরণ করবে। বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নেন ফরেন অফিসের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা স্যার ইয়ান সাদারল্যান্ড। তিনি জানান, বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ব্রিটেনের ক্ল্যারিজেস হোটেলে নিয়ে যাওয়া হবে। সবচেয়ে দামি অতিথিশালা ক্ল্যারিজেস হোটেলের নাম শুনে বঙ্গবন্ধু কিছুটা নাখোশ হন। তিনি বলেন, ‘আমার দেশের মানুষ যেন স্বস্তিতে এসে দেখতে পারে এমন কোনো হোটেল হলে ভালো হয়।’ ফরেন অফিসের কর্মকর্তা বলেন, ‘স্যার! একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে, রাষ্ট্রীয় সম্মান হিসেবে আমরা আপনাকে ক্ল্যারিজেস হোটেলে নিচ্ছি।’ হোটেলে পৌঁছার কিছু সময়ের পর লেবার পার্টির তৎকালীন লিডার (পরে প্রধানমন্ত্রী) হ্যারল্ড উইলসন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। হ্যারল্ড উইলসন হচ্ছেন প্রথম কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সম্বোধন করেন। বঙ্গবন্ধুর দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে তার প্রথম উচ্চারিত বাক্য ছিল, ‘গুডমর্নিং মিস্টার প্রেসিডেন্ট’। দুপুরেই ক্ল্যারিজেস হোটেলে আয়োজন করা হয় এক সংবাদ সম্মেলনের। এটিই ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুর প্রথম প্রেস কনফারেন্স। এতে আবেগঘন ভাষায় প্রবল আত্মবিশ্বাসী স্বরে তিনি বললেন, ‘আমি কনডেম সেলে ফাঁসির অপেক্ষায় ছিলাম, বাঁচব কি মরব কিছুই জানতাম না, তবে জানতাম বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই।’ হোটেলের ভিতরে বক্তব্য দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু, বাইরে তখন হাজারো বাঙালির ভিড়। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত অভিজাত মেফেয়ার এলাকা। দলে দলে আসছে মানুষ। কীভাবে তারা খবর পেল, কে দিল খবর? কেউ কাউকে খবর দেয়নি, খবর উড়ে যায় কানে কানে, বাতাসের বেগে, এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। প্রচণ্ড শীত, মেঘ-বৃষ্টি সব উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয় তাদের প্রিয় বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্য। যিনি তাদের দিয়েছেন একটি পতাকা, একটি মানচিত্র। বাইরে ভিড়ের খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু হোটেলের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ান। সমবেত জনতার উদ্দেশে হাসিমুখে হাত নাড়েন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে স্লোগান ওঠে, ‘জয় বাংলা’। বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পেয়ে বহু প্রবাসী বাঙালির চোখে জল এসেছিল সেদিন। বিকাল ৫টার দিকে বঙ্গবন্ধু গেলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে। তাকে বরণ করে নিলেন কনজারভেটিভ পার্টির লিডার, প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ। দুই রাষ্ট্রনায়কের মধ্যে বৈঠক হলো আন্তরিক পরিবেশে। বৈঠকের একপর্যায়ে এডওয়ার্ড হিথ জিজ্ঞাস করলেন, ‘আপনাকে আর কী সহযোগিতা করতে পারি, বলুন।’ তত্ক্ষণাৎ বঙ্গবন্ধু উত্তর দিলেন, ‘আপনার প্লেনটা চাই, ওটা দিতে পারবেন, আমি খুব দ্রুত দেশে ফিরতে চাইছি।’ এডওয়ার্ড হিথ ব্যবস্থা নিলেন সঙ্গে সঙ্গে। বৈঠক চলার সময়ই নিশ্চিত হয়ে গেল ব্রিটিশ রাজকীয় কমেট জেট বিমানে করে ৯ জানুয়ারি সকাল ৭টায় বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেবেন জাতির জনক। বৈঠক শেষে ঘটে একটা অভাবনীয় ঘটনা। বিদায় নিয়ে যখন বঙ্গবন্ধু তার গাড়িতে উঠবেন তখন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ নিজে এগিয়ে এসে তাঁর জন্য গাড়ির দরজা খুলে দিলেন। দরজা ধরে তিনি ততক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ভিতরে গিয়ে না বসলেন। আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য, আর কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এমন সম্মান দেখাননি কখনো, কস্মিনকালেও। ঘটনা নিয়ে তখন প্রধানমন্ত্রী হিথের সমালোচনা করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু এক বাক্যে সেই সমালোচনাকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন হিথ। বলেছিলেন, ‘আমি যাকে সম্মান করেছি, তিনি হচ্ছেন একটি জাতির মুক্তিদাতা মহান বীর। তাঁকে এই সম্মান প্রদর্শন করতে পেরে বরং আমরাই সম্মানিত হয়েছি।’ সকাল হলেই বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পথ ধরবেন। তাকে স্বাগত জানাবে বলে অপেক্ষার প্রহর গুনছে ৭ কোটি মানুষ।

Picture

বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে গাইলেন, আমার সোনার বাংলা : ৯ জানুয়ারি, ১৯৭২। ভোর ৬টা। লন্ডন হিথরো বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে পৌঁছালেন বঙ্গবন্ধু। তাঁকে স্বাগত জানালেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিভাগের কর্মকর্তা ইয়ান সাদারল্যান্ড ও লন্ডনে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার আপা বি পন্থ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ করিয়ে দেন আপা বি পন্থ। ৩০ মিনিট ধরে চলে ইন্দিরা-মুজিব টেলিফোন আলাপচারিতা। ঘণ্টাখানেক পরে ইন্দিরা গান্ধী আবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন।

ইন্দিরা গান্ধীর সম্মতিতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশে যাত্রাপথে সহযাত্রী হলেন ব্রিটেনস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের তৎকালীন রাজনৈতিক কর্মকর্তা শশাঙ্ক ব্যানার্জি। সঙ্গে ছিলেন সে সময়ের ভারতীয় হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি ভেদ মারওয়া। আরও ছিলেন স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী হামিদা হোসেন।

বিমানে তাঁরা পাশাপাশি আসনে বসলেন। সামনের টেবিলে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় সুগন্ধময় এরিনমোর তামাক, আর সেই বিখ্যাত পাইপ। উত্ফুল্ল মুজিবের তখন দেশে ফেরার তর সইছে না।

আপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ।’ তিনি ধন্যবাদ জানালেন দীর্ঘদিন তাঁকে সহযোগিতার জন্য। বললেন, ‘ব্যানার্জি! এবার একটি বিশেষ সহযোগিতা চাই।’ শশাঙ্ক বললেন, ‘আয়ত্তের মধ্যে হলে অবশ্যই চেষ্টা করব।’ ধীর লয়ে মুজিব বললেন, ‘দিল্লিতে ইন্দিরার সঙ্গে বৈঠকের আগেই তাঁর কাছে একটি খবর পৌঁছানো দরকার। বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় মিত্রবাহিনী সদস্যদের ৩১ মার্চ, ১৯৭২ সালের মধ্যে ভারতে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি চূড়ান্ত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর এ বিষয়ে কথা হয়েছে। ভারতীয় মিত্রবাহিনী চলে গেলে বাংলাদেশ ব্রিটিশ সরকারের স্বীকৃতি পেতে আর কোনো বাধা থাকবে না।’

মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি নিয়ে বিমানটি আবার উড়তে শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধু জানালা দিয়ে শ্বেতশুভ্র সাদা মেঘের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর দাঁড়িয়ে গাইতে লাগলেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’। তাঁর চোখ ভরে উঠেছে জলে। তিনি বললেন, ‘ব্যানার্জি! আপনিও ধরুন। রিহার্সেল দিয়ে নিই।’ তাঁরা দুজনে মিলে গানটা গাইলেন। বঙ্গবন্ধু চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করে বললেন, ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আরও কঠোর সংগ্রাম অপেক্ষা করে আছে। বুকে শুধু একটাই বল, আমার দেশের আপামর মানুষ।’

শশাঙ্ককে অবাক করে দিয়ে বঙ্গবন্ধু হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘এ গানটি হবে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। কেমন হবে বলেন তো?’ শশাঙ্ক জবাব দিলেন, ‘ইতিহাসে তাহলে প্রথমবারের মতো দুটি দেশের জাতীয় সংগীতের লেখক হবেন একই ব্যক্তি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’

শশাঙ্ক ব্যানার্জি বললেন, ‘দিল্লি অবতরণের তখন আর সময় বেশি বাকি নেই। পাইলট আমাদের দুটি ছবি তুলে দিলেন। শেখ মুজিবের সঙ্গে তোলা সেই ঐতিহাসিক ছবিটি এখনো খুব যত্ন করে তুলে রেখেছি।’

দিল্লিতে শেখ মুজিবকে স্বাগত জানালেন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিংসহ আরও অনেকে। রাষ্ট্রপতি ভবনে বঙ্গবন্ধুর জন্য কলকাতা থেকে আনা গুড়ের সন্দেশ, সমুচা, শিঙ্গাড়া আর দার্জিলিং চা তাঁকে তৃপ্তি দিয়েছিল। মুজিব-ইন্দিরা বৈঠকে তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টি নিয়ে কথা হয়।

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। দুপুরে বিমান থেকে ঢাকায় নামলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জনস্রোত আর মানুষের স্লোগানে মুখরিত চারপাশ। সোচ্চার ধ্বনি উঠছে, ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘জয় মুক্তিযুদ্ধ’। বিমানবন্দর থেকে পল্টন ময়দান এক বিপুল জনসমুদ্র। শশাঙ্ক বলেন, ‘সে এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত, চারদিকে মুক্তি আর মহানেতাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। আজও চোখে লেগে আছে মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটি।’

তথ্যসূত্র : ‘বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তেরো ঘণ্টা’, লেখক : উজ্জ্বল দাশ, ‘বিলেতে বাংলার রাজনীতি’, লেখক : ফারুক আহমদ ও ‘বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’, লেখক : সাঈম চৌধুরী।


সর্বজনীন উৎসবে সাম্প্রদায়িক চর্চা!

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৮

Picture

গত বড়দিনে কি মনে করে ক্রিশমাস ডে লিখে গুগলে সার্চ করলাম। উইকিপিডিয়ায় ঢুকে বড়দিন সম্পর্কে পড়ছিলাম। বড়দিন উদযাপন করার পদ্ধতিতে গীর্জায় উপাসনার বিষয়টা দেখে একটু খটকা লাগল মনে। চিন্তাটাও যেন সামান্য থমকে গেল। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে আবোলতাবোল ভেবে শারদীয়া দুর্গাপূজা উদযাপনের পদ্ধতি সার্চ করে উইকিপিডিয়ায় ঢুকলাম। দেখি, মহাসপ্তমীতে সপ্তমিবিহিত পূজা। মহাষ্টমীতে মহাষ্টমীবিহিত পূজা। মহানবমীতে কুমারী পূজা, অর্ধরাত্রবিহিত পূজা ও মহাপূজা। বিজয়াদশমীতে বিসর্জনাঙ্গ পূজা। নাহ আর ভাবতে পারি না। চিন্তটা খুব দ্রুত  ঘুরে এলো মুসলমানদের ঈদে। হুম,এখানেও তো দুঈদে বিশেষ নিয়মে নামাজ আছে।

প্রতিটা ধর্মীয় উৎসবেই আরাধনা আছে যা একেক ধর্মে একেক নামে পরিচিত। চিন্তাটা ক্লান্ত হয়ে যায় আমার! ঈদ, পূজা, বড়দিন যে উৎসবগুলোকে সর্বজনীন বলে ভাবতে শুরু করেছি, প্রচার করছি সেখানে সাম্প্রদায়িক চর্চা? যে উৎসবগুলোতে সাম্প্রদায়িক চর্চা হয় সেগুলো সর্বজনীন হয় কীভাবে? কীভাবে এ উৎসবগুলোকে আমাদের দেশের বিদ্বান বুদ্ধিজীবী এবং বিদগ্ধ রাজনীতিবিদরা সর্বজনীন বলে মহা সমারোহে প্রচার করেন! অধিকন্তু আরো গভীরে বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, প্রতিটা ধর্মীয় উৎসব এই ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক বিজ্ঞাপন! মাথাটা ভো ভো করছে। আর ভাবতে পারছি না। এই ধর্মীয় উৎসবগুলো কোনভাবেই আমাদের বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, ভাষা দিবসের মতো সর্বজনীন হতে পারে না। ধর্মীয় উৎসব গুলো ওই ধর্মের অনুসারীদেরকেই উৎসর্গ করা। অন্যকারো জন্য না। বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।

ইলিয়াস আলমগীর: লেখক: কবি ও কলামিস্ট, কুবি,কুষ্টিয়া


শিক্ষিত স্বাবলম্বী নারীরাই ডিভোর্সের শীর্ষে

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৮

ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগের চেয়ে কর্মক্ষেত্রে নারীদের কাজ করার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় নারীরা সামাজিকতা ও লোকলজ্জার চেয়ে নিজের আত্মসম্মানকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। আর তাই সংসারে অশান্তি নিয়ে থাকার পরিবর্তে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তই বেশি নিচ্ছেন।

জানা গেছে, ঢাকায় গত এক দশকে বিবাহ বিচ্ছেদের হার আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এক্ষেত্রে বিচ্ছেদের বেশি আবেদন করছেন শিক্ষিত ও সাবলম্বী নারীরা। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দুই এলাকাতেই নারীরা বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য পুরুষের চেয়ে বেশি আবেদন করছেন।

জরিপের তথ্যে, বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করছেন ৭০ দশমিক ৮৫ ভাগ নারী আর পুরুষের হার মাত্র ২৯ দশমিক ১৫ ভাগ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৬ সালে যেখানে বাংলাদেশে প্রতি হাজারে বিচ্ছেদের হার ছিল দশমিক ৬ জন। বর্তমানে এই হার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে এক দশমিক এক জন। বিচ্ছেদের আবেদনকারীদের মধ্যে যারা উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন তারা হাজারে এক দশমিক ৭ জন বিচ্ছেদের আবেদন করেন। আর অশিক্ষিতদের মধ্যে এই হার হাজারে শূন্য দশমিক ৫।

রাজধানীর গত পাঁচ বছরের বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত শালিসি পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পাঁচ বছরে রাজধানীতে তালাকের মোট আবেদনের ৬৬ দশমিক ১৬ শতাংশ স্ত্রী এবং ৩৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ স্বামীর পক্ষ থেকে করা হয়েছে।

Picture

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্যে, চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত তালাকের নোটিস পাওয়া গেছে ১৯৮টি। এর মধ্যে নারীরা দিয়েছেন ১৪২টি নোটিস।

উত্তর সিটি করপোরেশনও তাদের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানায়, নারীদের তালাক দেওয়ার হার পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি। পেশাগত উন্নয়ন, আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা আগের চেয়ে বেশি সচেতন। নারীরা লোকলজ্জার ভয়ে এখন আর আপস করছেন না। বরং অশান্তি এড়াতে বিচ্ছেদের আবেদন করছেন।  

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আইন বিভাগের কর্মকর্তা এস এম মাসুদুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সামাজিক জটিলতার জন্য সমাজে বিচ্ছেদের ঘটনা এক দশকে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে সন্তানের মঙ্গল ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ রোধে বিচ্ছেদে যাওয়ার মধ্যে নেতিবাচক কিছু নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকায় একজন নারী এখন তার পরিবারকেও আর্থিক সহায়তা করতে পারছে। পারিবারিক বন্ধনের চেয়ে অনেক নারী নিজের পেশা জীবনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। আর মনস্তাত্ত্ব্বিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ফলে নারী নিজেই এখন বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।


ইসলামি বিপ্লব রক্ষার অঙ্গীকারে জাতীয় ঐক্য। আবু জাফর মাহমুদ

বৃহস্পতিবার, ০৪ জানুয়ারী ২০১৮

ইরানে গণতান্ত্রিক দাবি নিয়ে আন্দোলনে দাঙ্গা বাঁধানোর বিদেশী উস্কানীর বিরুদ্ধে রাস্তায় রাস্তায় ইসলামী বিপ্লব রক্ষার প্রত্যয়ে নেমেছে জনতার মিছিল।এই মিছিলে বিপ্লবের নেতা খোমেনী ও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার ছবি বহন করছে মানুষ আর মানুষ।ইসলামী বিপ্লবে সমৃদ্ধ ইরানে দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টারত ডোনাল্ড ট্রাম্প,নেতানিয়াহু ও সৌদি বাদশাহর প্রকাশ্য স্বীকারোক্তির প্রেক্ষিতে জনতার প্রতিবাদ রূপান্তর হয়েছে চেতনার আগ্নেয়গিরিতে।রাষ্ট্র,সার্বভৌমত্ব ও ইসলামী বিপ্লব রক্ষার অঙ্গিকারে প্রথম কোন দেশ বর্তমান যুগে এতো শক্ত অবস্থানে লৌহকঠিন ঐক্যের দৃঢ়তা দেখাচ্ছে।লেবানন,প্যালেষ্টাইন সিরিয়া মিসর তুরস্কের গণমানুষের কাছে সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রেরণার প্রতীক উঠছে ইরাণী জাতি।   
মধ্যপ্রাচ্যে প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে কে সন্ত্রাসী?কে নীরিহ মানুষের জন্যে বিপজ্জনক?ইরান?লেবাননের হিজবুল্লাহ  বাহিনী? মুক্তিকামি ইয়েমেনী হুতি? মুক্তিকামী ফিলিস্তিনি হামাস? নাকি ইজরাইলের সামরিক বাহিনী?নাকি সৌদি সরকারী বাহিনী?কে আগ্রাসী জঙ্গি- আক্রমণ প্রতিরোধকারী  নাকি আগ্রাসনকারী ?    
ইরানে গণতান্ত্রিক দাবিতে আন্দোলকারীদের সভা সমাবেশকে হঠাৎ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি রূপান্তর করার চেষ্টায় বিশৃঙ্খলাকারীদের প্রতি সমর্থন করে ভিডিও বার্তা দিয়েছেন ইজরাইলের প্রধানমন্ত্রী।ইতিপূর্বে টুইটারে সমর্থন দিয়েছেন মার্কিণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।তাদের উভয়ের দাবি,তারাই ইরানে এই বিশৃংখলা ও উত্তেজনা উস্কে দিয়েছেন।কৃতিত্ব দাবিকারি এই দুজন নেতা আসলে কি সফল হলেন নাকি বিশ্ববিবেকে বিরক্তির কারণ হলেন এই আলোচনা চলছে কূটনৈতিক মহলে।
অবশ্য ইরানী প্রশাসনের দাবি তারা ওদের এজেণ্টদের চিহ্নিত এবং গ্রেফতার করেছেন।কথা হচ্ছে অন্য দেশে এভাবে হস্তক্ষেপের প্রকাশ্য রীতি কি দুনিয়ার সকল দেশের জন্যে নিরাপত্তা বয়ে আনে?জাতিসংঘ এই আচরণ মেনে নেবার কথা নয় জেনেও এই দুই সরকারপ্রধান বিশেষ স্বার্থে যে সমীকরণ মিলিয়েছেন তাতে মনে হতেই পারে এরা জাতিসংঘকে থোরাই করেননা।
এই বিশেষ ধারাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আমেরিকাকে যে জটিল অবস্থায় জড়ানো হচ্ছে,তাতে আমেরিকার ইওরোপীয় মিত্ররা চীন-রাশিয়া নেতৃত্বাধীন বলয়ে যুক্ত হবে জেনেও এই ঝুঁকি নেয়া হয়েছে।এই মিত্রেরা যে প্রেক্ষাপটে ইরাক,লিবিয়া,সিরিয়া, মিশর, আফগানিস্তান, আক্রমনে আমেরিকাকে সমর্থন দিয়েছিলো একই পরিস্থিতি কি এখনো আছে? ইরান ও প্যালেষ্টাইন প্রশ্নে ওরা কি আগ্রাসনের পক্ষে অবস্থান নেবেন? সাম্প্রতিককালে সিরিয়ায় ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু যুদ্ধ করেও হেরে গেলেন। এই পরাজয় কি গোপ্ন আছে?  
এদিকে ১জানুয়ারী সোমবার রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়েছে ইরানে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে।ইরাণের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অস্থিতিশীল করার ঘটনা গ্রহন যোগ্য নয়।আমরা আশা করি পরিস্থতিতি রক্তপাত ও সহিংসতার দিকে যাবেনা।এই হস্তক্ষেপের বিরোধীতা করেছে করেছে রাশিয়া তুরস্ক ও সিরিয়া।  
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জিততে পারার মত অবস্থা থাকলে ওবামা-কেরি-হিলারী প্রশাসন কি নেতানিয়াহুর চাপে যুদ্ধ চাপিয়ে দিতেননা?  সৌদি রাজপরিবারের শক্তির উপর ভর করে কতটুকুন বেশী অগ্রসর হওয়া যাবে?সৌদী জোটের বাহিনী ইয়েমেনে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে সবচেয়ে আপন প্রতিবেশী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
 ইজরাইলের পক্ষ হয়ে সৌদি জোট লড়াই করতে গেলে ইয়েমেনি হুতি যোদ্ধারা, ইরান, তুরস্ক,ইরাক,লেবানন,ফিলিস্তিনীদের সাথে এক হয়ে লড়বেনা? পারমানবিক শক্তিধর পাকিস্তানকে ক্ষেপিয়ে তুলছেন ট্রাম্প প্রশাসন।এদিক থেকে আফগানিস্তান পাকিস্তান সহ ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো রাশিয়ার দিক থেকে আজারবাইজান,কাজাখিস্তান,কিরঘিজিয়া,তাজিকিস্তান এবং উজবেকিস্তান ইরানের পক্ষে সমর্থন দিয়ে জোটবদ্ধ হবেই।
বুঝলাম তাতে সমরাস্ত্র কারখানাগুলোর গুরুত্ব বাড়বে।এদের অনেকদিনের পুরাতন অস্ত্রগুলোর অনেকগুলো শেষ হয়ে যাবে।নতুন অস্ত্রের বাজা্রে চাহিদা বাড়বে।শক্তি সামর্থ্যের বলয়ে নয়া পরিস্থিতির উদ্ভব হবে।আমেরিকার কি হবে?  আমেরিকা দূর্বল হবে।এই দূর্বল হওয়াটা আমেরিকান নাগরিক এবং যোদ্ধাদের জন্যে কষ্টের।যন্ত্রণার।
তবে বাস্তবতা হলো, যে ফাঁদে পা ও গলা একসাথে ঢুকিয়ে ট্রাম্প ব্যবসার রাজা থেকে হোয়াইট হাউসের রাজা বনেছেন,তাতে তার যুদ্ধ বাদ দিয়ে কৌশলগত কূটনীতিতে যাওয়ার পথও খোলা নেই।সন্ত্রাস ও গোলমালের পথ আমেরিকার জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও এই পথ চলাই তার একমাত্র পথ।
এটাই তার প্রেসিডেন্ট পদ পাবার আগে পৃষ্ঠপোষকদের সাথে সম্ভবতঃ ছিল তার রফা দফা।তাই অনেক বিশ্লেষক বলছেন, আমেরিকাকে একা করে হলেও ট্রাম্প এই একেলা পথে চলবেন,পা কেঁপে কেঁপে উঠলেও তিনি চলবেন নেতানিয়াহুর হাত ধরে।রাশিয়া নিবে দুই দিকের সুবিধে।কেননা পুটিনের আছে সেই যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা।রাশিয়া তার অবস্থান পরিবর্তন না করেই তার সামর্থ্য বাড়িয়ে চলেছে।আমেরিকা যা হারাচ্ছে তা অনায়াসেই যুক্ত হচ্ছে রাশিয়ার সাথে।      
জেরুজালেমকে ইজরাইলের রাজধানী করার ইচ্ছাকে সমর্থন জানিয়ে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অসম্মানজনক কম ভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন।ট্রাম্প মূলতঃ সন্ত্রাস এবং জোরপূর্বক দখলকে সমর্থন দিয়েছেন প্রকাশ্যে।ধারণা করা হচ্ছে ইরান গ্রাস করাকে শক্তিমত্তার জোরে নিজেদের অধিকার ভাবছে এই দুই নেতা।
তাছাড়া নেতানিয়াহু সস্ত্রীক সরকারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবার পর এবং আরো বড় আকারের অভিযোগগুলো প্রমাণ হবার পর তাকে রাজনীতি থেকে বিদায় নিতে হবার চূড়ান্ত পরিস্থিতি আসার  আগে এই মরণ কামড় দেয়াটা তার ছলচাতুরী বলে অনেক বিশ্লেষক দাবি করছেন।ইজরাইল জুড়ে একাধারে এক সপ্তাহের বিক্ষোভ তার ভেতরের বাহিরের পরিচয়কে তুলোধুনো করে চলেছে।তার পদত্যাগের দাবি তুঙ্গে উঠেছে।বিক্ষোভ থামছেনা।
কথা হচ্ছে ইরান বিপ্লবের পর এই প্রথম তারা  জাতীয়ভাবে আত্নরক্ষার পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য হচ্ছে।তারা কখনো শত্রু সম্পর্কে শিথিল হয়নি।পয়ারজিত হয়ে ইরান থেকে নিয়ন্ত্রণ হারানো পরজীবিদের ব্যাপারে উদাসীনও হয়নি।দীর্ঘ অবরোধ দিয়েও ইরানের সমৃদ্ধি থামানো কি সম্ভব হয়েছে?ইরান দরিদ্রও নয়।সামরিক দিক থেকেও দূর্বল নয়।এরা আমেরিকাকে ভয় পাওয়ার জাতি নয়।এরা আমেরিকার প্রভাবিত সরকারকে উথখাত করেছে বিপ্লবের মাধ্যমে।ইরান প্রতিনিয়ত ঠান্ডা মাথায় নিজেদেরকে দুনিয়ার অপরাপর শক্তিগুলোর কাছে গ্রহনযোগ্য করেছে।এরা কেবলমাত্র মুসলমান দেশ নয়।চীন রাশিয়া ও ইওরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ইরানের সম্পর্ক বাস্তবতার নিরিখে সূতায় গাঁথা।        
সন্ত্রাসীদের দমনও ও আফগানিস্তানের নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে আমেরিকার রিপাবলিকান সরাকার এবং তার মিত্ররা আফগানিস্তানে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় ২০০১সালে। এতো বছর যাবত এখনো আফগানিস্তাননে আমেরিকান সেনা বাহিনী প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কাছে মার খাচ্ছে। আমেরিকান সৈন্যরা আফিম চাষ করছে এবং আফগানিস্তান থেকে আফিম রফতানী তা আমেরিকায় আমদানী করছে।আমেরিকার প্রায়ই ৭০%শতাংশের বেশী আফিম(মারিজুয়ানা)আফগানিস্তানে উৎপাদিত।
জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি গোলাম আলী দাবি করেন,ইরান ৩৯বছর যাবত আফগানিস্তানের লক্ষ লক্ষ শরণার্থীদেরকে আশ্রয় ও খাবার দিয়ে চলেছে।এরা শরনার্থী হতে বাধ্য হয়েছে আমেরিকার আগ্রাসনের ফলে।সৌদি আরব সরকার ইজরাইলের নির্দেশ মেনে মধ্যপ্রাচ্যে আল্লাহর নবীদের নির্দেশিত পথ ত্যাগ করে নীরিহ  মানুষ হত্যা ও অনৈতিকতার দায় মুসলমানদের উপর চাপানোর সুযোগ দেয়ার সমালোচনার প্রমাণ মিলছে প্রতিদিন।এই অপরাধের খেসারত ইহলোক ও পরলোকে  নির্ধারিত।আমাদেরকে সৃষ্টিকর্তা আদিকাল থেকেই সতর্ক করে চলেছেন এবং সঠিক পথ ও তৈরী করে দিয়েছেন।নবী রাসুলরা কোন গোষ্ঠীর জন্যে নয়,আল্লাহ্‌ তাদেরকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে পাঠিয়েছেন।


বাংলাংলাদেশীবংশদভুতআকায়েদ, নাইমুর ও নাফিসগংদের পরিণতির জন্য দায়ী কে? - প্রদীপ মালাকার

বৃহস্পতিবার, ০৪ জানুয়ারী ২০১৮

প্রদীপ মালাকার –নিউইয়রক, ইউ,এস,এ, : কিছুদিন পূর্বে আমার এক শিক্ষক বন্ধুর সাথে দেখা হয় নিউইয়র্ক সিটির ব্রঙ্কসের এক  ম্যাকডোনালডসে। আমরা দুই জনই এক সাথে দীর্ঘদিন জন,এফ, কেনেডি হাই স্কুলে আমি গণিত শিক্ষক ও মিঃ ফিলিপ ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে কাজ করি । মিঃ ফিলিপের পিতা ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা ছিলেন । সেই সুবাদে মিঃফিলিপ ছোটবেলায় পিতার সাথে অনেকবার ঢাকায় আসা যাওয়া করেছে ।বলতে গেলে তখন থেকেই ফিলিপ বাংলাদেশের স্বাধীনতাও রাজনীতির ব্যাপারে বরাবরই তার আগ্রহ ছিল ।স্কুলে যখনই সময় পেতেন তখনই আমার সাথে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতেন । আজও দেখা হতেই কুশল বিনিময়ের পর নিউইয়র্ক সিটির টাইমস্কয়ারে আত্নঘাতি হামলাকারী জঙ্গি বাংলাদেশী তরুণের নিরীহ মানুষের উপর হামলা এবং গত বৎসর আর্লি আটিজান রেস্তোরাঁয় ১৭ জন বিদেশীসহ ২১জন কে হত্যার জঙ্গি হামলার কথা উল্লেখ করেন । তিনি বলেন , ২৭ বছরের আকায়েদ উল্লাহর বিরুধবে তদন্তকারীরা ম্যানহাটনের ফেডারেল কোর্টে বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠনকে সহায়তা ,জনসমাগম স্থলে বোমা হামলা, ধবংসাত্বক ডিভাইস ও বিস্ফোরক ব্যবহার করেসনপদের ক্ষতির অভিযোগ সহ হামলার কিছুক্ষণ আগে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনালডস ট্রাম্প কে (Donalds Trump)হুসিয়ারি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে । এসব অভিযোগে দোষী সাব্যস্থ হলে বাকি জীবন জেলেই কাটতে হবে ।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে নাইমুর জাকারিয়া রহমান (২০) ও মোহাণ্মদ আকীব রহমান (২১) নামের দুই যুবককে লন্ডনের মেট্রো পুলিশ গ্রেপ্তার করে । ২০ বছর বয়সী বাংলাদেশী –ব্রিটিশ নাগরিক নাইমুরের বিরুব্দে ঘরে বসে তউরি বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এবং বিশ্রুখল পরিস্থিতির সুযোগে বিস্ফোরক বেল্ট ও ছুরি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের ওপর হামলার পরিকল্পনা ও প্রস্ততি  অভিযোগ আনা ছাড়া ও পাকিস্তানি আকিবকে লিবিয়ায় আই,এস, যাওয়ার সহায়তা করার অভিযোগ আনা হয়েছে । তাদেরও একই শাস্থি হতে পারে ।মিঃফিলিপ  বলেন , দেখুন গত বছের ২১ শে জুলাই ম্যাচাচুসেটস স্টেটের বোস্টনে ২৬ বছরের যুবক রেজাউল ফেরদৌস  পেন্টাগনে হামলার ষড়যন্ত্রে ১৭ বছরের জেল  হয় । একই বছরের অক্টোবরে আরেক বাংলাদেশী কাজী নাফিস নামে ২১  বছরের  যুবক নিউইয়র্ক সিটির ফেডারেল রিজার্ভ বিল্ডিং- এ হামলার ষড়যন্ত্রে  আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তারও সাজা হয় । এতে আপনাদের দেশের দুর্নাম হয় । তিনি আর ও বলেন , জঙ্গি হামলা গুলিতে প্রায়ই নামি দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী ছাত্রদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় । তারা কেন  সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দিকে জোঁকে পড়লো ? বর্তমান সরকারতো  গণতান্ত্রিক ও সেকুলার । এই গুলি তো হওয়ার কথা নয় । ব্লুন তো আসলে আপনাদের দেশে কি হচ্ছে ।
আমি বললাম , যে গুষ্টির মানুষেরা জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাইদিকে চাঁদে দেখা গিয়েছে বলে বিশ্বাস করে তাণ্ডব চালায় এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সত্য মিত্যা যাচাই না করে অন্যের উপাসনালয়ে আগুন দেয়, বাড়ি ঘর ভাংচুর, লুটপাট চালায় সেই সমাজে আকায়েদ, নাইমুর গংদের জ্রন্ম হবে না তো রবীন্দ্রনাথ , নজরুল , আইনস্টাইনের জন্ম হবে ?  দেখুন , এক সময় আপনাদের সরকারই এই জামায়াতি ইসলামকে মডারেট ডেমোক্রেট এবং বাংলাদেশকে মডারেট মুসলিম কান্ট্রি হিসেবে সার্টিফিকেট  দিয়েছিল । অথচ এই সার্টিফিকেট পেয়ে তারা নতুন উদ্যমে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তাদের মুল লক্ষ্য রাষ্ট্র ক্ষমতায় ইসলামী হুকমত কায়েম বা তালেবানি রাষ্ট্র কায়েমে এগিয়ে যায় । জোট শাসনামলে বাংলা ভাই, আব্দুর রহমানের জেএমবি সহ অসংখ্য সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠনের আবির্ভাব হয়েছে জামায়াতের তত্ত্বাবধানে । পরে অবশ্য মার্কিন সরকার জামায়াত সম্পর্কে ধারনা পাল্টায় । আমি মিঃ ফিলিপকে আরও বলি , দেখুন আপনি যে বাংলাদেশী যুবকদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কথা বলেছেন , পাশাপাশি দেখুনতো গত ১লা মে ২০১০ সালে বাংলাদেশী –আমেরিকান আরেক যুবক ‘” মানব ক্যামেরা” সেজে ৩৩ বছর বয়সী ফয়সল শাহজাদ নামে পাকিস্তানী _ আমেরিকান যুবককে টাইম স্কয়ারে বোমা হামলার ষড়যন্ত্রে ধরিয়ে দেয় । মানব ক্যামেরা সাজা যুবকটির বাল্য,  কৌশোর তথা এই দেশের (আমেরিকার) লেখাপড়া শিখে বড় হয়েছে । অপর দিকে যুবকদের প্রাথমিক , মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষার  সহিত এ অঞ্চলের ধর্মান্ধ রাজনীতির চলমান আবহ দ্বারা প্রভাবিত এটাই স্বাভাবিক বলে রাজনউতিক বিশেষজ্ঞগন মনে করেন ।
আমি এখানে মিঃ ফিলিপের সকল প্রশ্ন পাঠকের সুবিধার্থে এক সাথে মিশিয়ে আলোচনা করতে চাই । আজকের লেখায় জামায়াতসহ সমমনা কয়েকটি ধর্মান্ধ রাজনউতিক দলের কয়েক দশকের রাজনউতিক কর্মকাণ্ডের সামান্য কিছু ফিরিস্থি উপস্থাপন করছি । দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সরকার জামায়াত , মুসলিম লীগ,নেজামি ইসলামসহ, আরও ২/১ টি দলকে মুক্তি যুব্দের বিরুদবে বিরোধিতা সহ পাক বাহিনীর সহযোগী হয়ে গণহত্যা নারী ধর্ষণ , লুটপাট, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের অপরাধে আইন করে নিসিদব করেছিলেন । ৭৫ এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সামরিক ফরমান বলে সকল দলের উপর থেকে বিধি নিষেধ তুলে নিয়ে জামায়াত সহ ধর্মান্ধ দল্গুলিকে প্রত্যক্ষ রাজনীতি করার অনুমতি প্রদান করেন । প্রথম থেকেই সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লিগাররা ক্ষমতাসীনদের সাথে সখ্যতার পাশাপাশি তাদের দলেও ব্যাপকভাবে ডুকে পড়ে ।৭৫-এর পর বাংলাদেশ আবার পাকিস্তানী ভাবধারায় ফিরে গেলে জামায়াত ইসলামী নতুন পরিবেশে নব উদ্যমে রাজনীতির মাঠে নেমে পড়ে । সামরিক  বেসামরিক নেতাদের দুর্বলতা ও ক্ষমতার রাজনীতির সুযোগে জামায়াত তার বাংলাদেশ বিরোধী তথা তার পূর্বের দর্শন বহাল রেখেই চলতে থাকে।
জামায়াতিরা কখনো মনে প্রানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা মেনে নেয়নি ।৭৫ পরবর্তী শাসনামলে জামায়াত অধ্যুষিত প্রায় স্থানেই মাদ্রাসায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হতো না। ১৯৭৬ সোহরাওয়ারদী   উদ্যানে আয়োজিত ইসলামী জলসায় জামায়াত নেতৃবৃন্দ জাতীয় সংগীত পরিবর্তন ,পতাকা বদল, বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা এবং দেশের সকল শহীদ মিনার ভেঙ্গে ফেলার দাবি তুলেছিল । এভাবেই জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির ১৯৭৫ এর পর অনুকূল পরিবেশ পেয়ে ক্রমান্বয়ে সাংগঠনিক শক্তি  বাড়ানোর পাশাপাশি মৌলবাদী অর্থনীতি তথা ব্যাংক, বীমা,ব্যবসা বাণিজ্য ও বিভিন্ন এণজিও      প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে । এ সময়েই ইসলামী ঐক্য়জোট, খেলাফত আন্দোলন সহ আরও কয়েকটি ধর্মীয়  রাজনউঁতিক  দল গড়ে উঠে । তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হলেও শরীয়তী কিংবা হাদিস আন্দোলনে বিশ্বাসী । জামায়েতিরা মুখে গণতন্ত্র, স্বাধীনতার কথা বললেও আসলে তারা আল্লাহ্‌র শাসন ছাড়া অন্য কিছু মানে না । মানলে নির্বাচনের পূর্বে জামায়াতের গঠনতন্ত্রে আল্লাহর শাসনের পরিবর্তে গণতন্ত্র  এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি আনুগত্যে বাধ্য করা হয় । অন্যথায় রেজিস্ট্রেশন ভুক্ত হবে না । নির্বাচনের পর জামায়াত আবার পূর্বের গঠনতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার খবরে নির্বাচন কমিশন হুশিয়ারি দিয়ে নোটিশ পাঁঠায় এই বলে যে পূর্বের সংশোধনীতে ফিরে না গেলে রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে যাবে ।  জামায়াত এইভাবেই দীর্ঘদিন ছলচাতুরী ও প্রতারণার রাজনীতি করে আসছে । আর সেই সাথে বিএনপির আশ্রয় প্রশ্রয়ে জামায়াত ফুলে ফেঁপে উঠে ২০০১ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতার পার্টনার বনে যায় । এই সময়েই জামায়াতের ছত্রছায়ায় ও পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থার আশীর্বাদে তালেবানি রাষ্ট্র কায়েমের লক্ষ্যে নামে-বেনামে অসংখ্য সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন গড়ে উঠে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেয় ।                
জামায়াত রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ার কারনে আকস্মিক ও অ্সনভব দ্রুততায় জঙ্গি নেটওয়ার্কের বিস্থার ঘটেছে । জোট সরকার গত  অক্টোবর  ২০০৬সালে এ বিদায়ের সময় দেশে জঙ্গি সংগঠনের সংখ্যা ছিল ৬১ । কিন্তু পরবর্তীতে বেড়ে দাঁড়ায় ১১৭ এ ।আমি এখানে কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের নাম উল্লেখ করছি ১-জামায়তুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ(জেএমবি ) ২হরকাতুল ৩-শাহদত-ই-আল হিকমা ৪- আহলে হাদিস আন্দোলন- বাংলাদেশ  ৫-জামায়াতুল ফালাইয়া ৬-জইশে  মোস্তফা ৭-জাগ্রত মুসলিম জনতা –বাংলাদেশ (জেএমজেবি)৮-হিজবুত তাহরির৯- আল-কায়েদা ১০- রোহিঙ্গা স লিডারিটি  অর্গানাইজেশন । এই জঙ্গি সংগঠন গুলির ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচী থাকলেও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা যায় ,সংগঠনের অনুসারীরা কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবনধারা পরিচালনার কথা বললেও বাস্তবে তারা ইসলামের ছত্রছায়ায় গোপনে এক শ্রেণীর তরুণ যুবকদের  জিহাদী তথা সশ্ত্র প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করা । এ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রতিটি মুসলমানের জন্য সশ্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা ফরজ ও সশ্ত্র জিহাদের মাধ্যমে ইসলামী জাতীয় মতবাদে তারা সংগঠনের সদস্যদের অনুপ্রাণিত করে থাকে । জেএমবির দাবি করে, তাদের ২৫ সশস্ত্র প্রশিক্ষিত কর্মী রয়েছে
এছারা মুফতি হান্নানের( হরকাতুল্র জিহাদ ),হিজবুত তহরিরের ও অনুরূপ  সশস্ত্র সদস্যের কথা পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায় । আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারি তথা কমিউনিস্টদের বিরুদব্দে গুলবদরের মুজাহিদ বাহিনীকে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার যুবক যায় আফগানিস্তানে । ৯/১১ ওয়ার্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের পর আমেরিকা আফগানিস্তান আক্রমণের ফলে শত শত নারী, শিশু , ব্রিব্ধ হত্যার প্রতিশোধে মোল্লা ওমরের সরকার ও ওসামা বিন লাদেন কে সহায়তার জন্য আবারও বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার যুবক আফগানিস্তানে  গিয়েছিল যুব্ধের জন্য । এদের অধিকাংশই  সশস্ত্র ট্রেনিং নিয়ে এবং তালেবানি ভাবধারায় উজ্জীবিত হয়ে দেশে ফিরে অনেকে  সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন গড়ে তুলে । জোট সরকারের পুরো পাঁচ বছরে স্বাধীনতার পক্ষের লেখক, কবি, বুব্ধিজীবী , শিল্পী ,রাজনীতিবিদ ,বিচারক,আইন জীবী হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে তালেবানি রাষ্ট্র কায়েমের লক্ষে ক্ষমতায় থাকা শক্তির ইশারায় এ সকল জঙ্গি সংগঠন জাপিয়ে পড়ে । এই পাঁচ বছরে আমরা দেখতে পাই,কবি শামসুর রহমানের উপর হামলা, হুমায়ূন আজাদের উপর হামলা, সাবেক অর্থ মন্ত্রী ডঃ কিবরিয়া হত্যা,২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলায় ২৩ জন নিহত  এবং গাজীপুরে এজলাসে হামলা চালিয়ে তিন আইনজীবীকে হত্যা, কমিউনিস্ট পার্টির সমাবেশে বোমা হামলায় ৭ জন নিহত, ময়মনসিংহ  শহরে ৪টি সিনেমা বোমা হামলা, ব্রিটিশ হাই কমিশনারের উপর হামলা, প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উব্দেশ্যে গোপালগঞ্জের জনসভাস্থলে শক্তিশালী বোমা পুতে রাখা, সারা জাগানো উদীচীর অনুষ্ঠানে জঙ্গিদের হামলায় ১৭ জন নিহত হয় । এছাড়া সংখ্যালুগুদের উপর হামলা,তাদের বাড়ি ঘর, উপাসনালয়ে ভাংচুর ও আগুন পুড়িয়ে দেওয়া,সনপত্তি দখল সহ অসংখ্য ঘটনা এই আমলে ঘটে । জঙ্গিরা যে কতটা শক্তিশালী তার প্রমান, দেশ বিদেশ সাড়া জাগানো ১৭ই আগস্ট ২০০৫ সালে সারা দেশের ৬৩ জেলায়  তিনশ স্থানে একই সময়ে ৫শটি বোমা হামলা চালাতে জঙ্গিদের ব্যবহার করতে হয়েছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক । এছারা উত্তরাঞ্চলে রাজশাহীর বাগমারা, নওগাঁয়ে সাবেক শিবির ক্যাডার , জাগ্রত মুসলিম জনতা-বাংলাদেশ (জেএমজেবি) এর প্রধান সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই এর নেতৃত্বে প্যারালাল শাসন গড়ে উঠেছিল । দেশ ও বিদেশের মানুষ সর্বহারা বা চরমপন্থি শায়েস্থার অজুহাতে ২২ জন প্রগতিশীল কর্মী হত্যা ও লোমহর্ষক  নির্যাতনের খবর জেনেছে । এ সকল ঘটনা সরেজমিনে দেখা ও জানার জন্য ঢাকা থেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এই অঞ্চলে ছুটে গিয়েছিলেন ।
পাশাপাশি ইসলামী  ঐক্যজোটের একাংশের নেতা প্রয়াত মুফতি ফজলুল হক আমেনি তার নিয়ন্ত্রণাধীন হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসাগুলিতে কোমলমতি ছাত্রদের ধর্মীয় শিক্ষার সহিত অ্যামেরিকাসহ অমুসলিমদের বিরুব্দে জেহাদি ভাবধারা ও বাছাইকৃত মাদ্রাসাগুলিতে  সশস্ত্র প্রশিক্ষণের একাধিক রিপোর্ট দৈনিকপত্রিকাগুলোতে  প্রকাশিত হয়  । এই আমেনির দল আমরা ঢাকাবাসীসহ ধর্মীয় সংগঠন গুলো  ঢাকার বকশীবাজার ও খুলনায় কাদিয়ানীদের মসজিদে নামাজ পড়তে বাধা দেওয়ার ঘটনাও পত্রিকার রিপোর্টে পড়েছি । জোট আমলে বোমা ও জঙ্গিহামলায় যে সকল জঙ্গি পুলশের হাতে ধরা পড়েছে , তাদের অধিকাংশের জবানবন্দীতে জামায়াতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার  কথা বেরিয়ে আসে  এবং কোন কোন ক্ষেত্রে জামায়াত প্রত্যক্ষ ইন্ধনের কথা জানিয়াছে দৈনিক সংবাদ ২২ আগস্ট ২০০৬ এ  রিপোর্টে।  
শেষপর্যন্ত জোট সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আমেরিকার চাপে  জেএমবি প্রধান শাইখ আব্দুর রহমান ও বাংলাভাই সহ  ছয় শীর্ষ  নেতাকে আটক ও বিচারের ব্যবস্থা করে । আদালতের রায়ে ছয় শীর্ষ নেতার ফাঁসির আদেশ হলেও জোট সরকার তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি । পরে তত্বাবধায়ক সরকার  ক্ষমতায় এসে ঐ ছয় শীর্ষ  জঙ্গি নেতার  ফাঁসি কার্যকর করে । ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসেই জঙ্গি দমনে উঠে পড়ে লাগে । অনেকেই মনে করেছিল , শীর্ষ জঙ্গিদের ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে জঙ্গি কর্মকাণ্ড শেষ হয়ে গেছে । কিন্তু তা নয় । সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউল হক ও  জামায়াতের সাবেক কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য মুফতি জসিমুদ্দিন রাহমানির নেতৃত্বে নব্য জেএমবি ও আনসারউল্লাহ্‌ বাংলা টীম নামে দইটি নতুন সংগঠন গড়ে তুলে । নিসিধদ ঘোষিত এই জঙ্গি সংগঠন গুলি সুকৌশলে স্কলাসটিকা ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মত অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উঠতি বয়সী ছাত্রদের জিহাদি মন্ত্রে  ও আত্নঘাতি সদস্য বানাতে অনুপ্রবেশ করে । তারা নব উদ্যমে জঙ্গি তৎপরতা চালায় ।  এই সময়ে      আন্তর্জাতিক জঙ্গি গুষ্টি আইএস এর কর্মকাণ্ডে দেশীয় জঙ্গি গুষ্টিগুলি প্রভাবিত হয় । এই সময়েই জঙ্গিরা ভিন্ন মত , লেখক, প্রকাশক, পুরোহিত ,যাজক ,ও বিদেশদের চাপাতি দ্বারা হত্যর মাধ্যমে  গলা কাটার সংক্রিতি   চালু করে । আমেরিকা প্রবাসী লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ , ব্লগার- রাজীব ,প্রকাশক- দীপেন ,ব্লগার- নিলাদ্রি সহ আরও অনেকে তাদের হাতে খুন হয় । দেশ বিদেশে সবচেয়ে আলোচিত  ও নৃশংস জঙ্গি হামলা হয় গত বছরের ১ লা জুলাই এ আর্লি আটিজান রেস্তুরায়। ঐ দিনের হামলায় দুই পুলিস কর্মকর্তা, তিন জন আমেরিকা প্রবাসী এবং বাকি ইতালি ও জাপানি নাগরিক সহ ২১ জন জঙ্গিদের হাতে নিহত হয় ।  এ দিন নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে সকল জঙ্গি নিহত হয় । এর পর থেকে সরকার শক্ত অবস্থান নিয়ে ধারাবায়িকভাবে জঙ্গি ডেরা ধবংস ও জঙ্গি নিধন করে চলেছেন । অন্যতম পালের গোদা মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানীকে সরকার গ্রেপ্তারে  সমর্থ হলেও মেজর জিয়াউল হক এখনো ধরাছোঁয়ার বাহিরে।    
সরকার জঙ্গি দমনে  সফল হয় । জঙ্গিদের মেরুদণ্ড বা নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে গেলেও একেবারে সমাজ , রাজনীতি থেকে তারা নিঃশেষ হয়ে যায়নি । দীর্ঘ ৪২ বছরের জামায়াত সহ অন্যান্য ধর্মান্ধ দলগুলি সমাজের একটি অংশের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িকতা, জিহাদিসহ আমেরিকা বিদ্বেষী মনোভাব গড়ে উঠেছিল তা মহাজোট বা আওয়ামী সরকারের ৯ বছরের  গণতান্ত্রিক ও সেমি-সেকুলার শাসনে ধুয়ে মুছে যাওয়ার কথা নয় । কিংবা এই দীর্ঘ সময়ে দেশের বাহিরে তথা আমেরিকা , ব্রিটেনের মত দেশে ধর্মান্ধ রাজনীতিবিদ ও  তাদের অনুসারীরা (আধ্যাত্মিক নেতারা) বিভিন্ন সময়ে দ্বীন ও ইসলামের  দাওয়াতের ছদ্রাবরনে যুবকদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগও আছে ।  
এ বিষয়ে আমার নিজের একটু অভিজ্ঞতার কথা বলি । গত ২০০৯ সালে নিউইয়র্ক থেকে   ঢাকায় শ্বশুর বাড়ীতে যাই বেড়াতে । আমি মেজ শ্যালিকাকে তার ৫ বছর বয়সী পুত্র সন্তানের  নাম জিজ্ঞেস করি । শালিকা উত্তরে জানায় ,লাদেন নাম রেখেছি ।আমি অবাক হয়ে লেখাপড়া না জানা শালিকাকে প্রশ্ন না করে তার বরকে জিজ্ঞেস করি নাম রাখার মানে কি? সে উত্তর দেয় ,লাদেনতো আমাদের দেশে বীর , সুপার পাওয়ার আমেরিকার কোমর ভেঙ্গে দিয়ে সে এখন বিশ্ব বীরে পরিণত হয়েছে । তাই এই বীরের নামে নিজ সন্তানের নাম রেখেছি । আমি আর কথা না বাড়িয়ে ছোট শ্যালককে নিয়ে  টেম্পো করে নিউমার্কেট ,এলিফ্যানট রোড যাই কিছু শপিং –এর জন্য। যাওয়ার পথে  দেখি ফুটপাতে  হকাররা নিজে লাদেন গেঞ্জি, শার্ট বিক্রি করছে । আসার পথে দেখলাম অনেক রিকশাওয়ালা মাথায় লাদেন ক্যাপ লাগিয়ে রিক্সা চালাচ্ছে ।  এবার আমার শিক্ষক বন্ধু মিঃফিলিপের কথায় আসি , আমেরিকা সহ যে পশ্চিমা বিশ্ব ওসামা বিন লাদেন কে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংস ও নিরাপরাধ  সাড়ে তিন হাজার মানুষের হত্যার দায়ে  বিশ্ব সন্ত্রাসী হিসেবে জানে , বাংলাদেশের একটি অংশের মানুষ জানে তার উল্টোটা । আজ যে মেধাবী যুবকদের কথা বলা হচ্ছে তার মধ্যে একজন রেজাউল ফেরদৌস ইতিমধ্যে ১৭ বছরের জেল হয়েছে । কাজী রেজাউনুল আহসান নাফিসের বিচারে সাজা হয়েছে ।আকায়েদ এবং নাইমুর গংদের আদালতের বিচারে সাজা হবে এবং বাকি জীবন জেলেই কাটাতে হতে পারে ।এছারা গত ২০০৮ সালে দৈনিক জনকণ্ঠের রিপোর্ট থেকে জানা যায় , বাংলাদেশের দুই সহোদর যুবক পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তেউয়াবার  সদস্য হয়ে নয়াদিল্লী গিয়েছিল পার্লামেন্ট ভবনে হামলার জন্য । কিন্তু নিরাপত্তা রক্ষীর হাতে আটক হয় । বর্তমানে তাদের বিচারে সাজা হয়ে দিল্লীর ত্রিহার জেলে ধুকে ধুকে মরছে । আমি এ সকল যুবকরা সন্ত্রাসী ঘটনায় কতটুকু  বা কিভাবে জড়িত এ বিতর্কে না গিয়ে শুধু বলব , এই যুবকরা  বা তাদের পরিবার যে স্বপ্ন দেখেছিল আজকে তাদের  এই পরিণতির জন্য কে দায়ী ?যুবকরা নিজে , পিতা মাতা, সরকার না ধর্মান্ধ রাজনীতি ? এমনিতেই ৯/১১ এর ঘটনার  পর পশ্চিমা বিশ্ব এশিয়ানদের বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করে । তারপর বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানী বা আফ্রিকানদের  সন্ত্রাসী ঘটনায় নাম আসলেও বাংলাদেশের নাম থাকে উজ্জল ভুমিকায় । গত বছর দুই বাংলাদেশী  আমেরিকার বিরুব্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি লুটিয়ে পড়ে । আমেরিকানরা এখন সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছে । ভারত বা আমেরিকা আমাদের শত্রু নয় বরং বন্ধু কিংবা যুব্ধাবস্থাও বিদ্যমান নয় ।  যতদূর জানা যায় , নাফিসের পরিবারটি উচ্চশিক্ষিত । পিতা একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা , এবং একটি বোনও ডাক্তার । আকায়েদের পিতা একজন মুক্তিযুব্ধা । এসকল পরিবার থেকে আসা আকায়েদ, নাফিসরা কেন  আমেরিকা , ব্রিটেন বিদ্বেষীহয়ে তাদের ভবিষৎ সোনালী  দিনগুলো অন্ধকারে বিসর্জন দিতে গেল? এর জবাবে কেউ যদি বলে বাংলাদেশের ধর্মান্ধ বুলশিট রাজনীতির শিকার  হয়েছে তারা , তবে কি তাকে খুব একটা দোষ দেওয়া যাবে?


মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ফিরিয়ে দিন আমার শৈশব

বৃহস্পতিবার, ০৪ জানুয়ারী ২০১৮

আনন্দকে চিরদিনের মতো ঠেলে দিয়েছে সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে। কেন পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে আমাদের জ্ঞানকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে? এত কেন-এর উত্তর জানতে ইচ্ছে করে মাননীয় মন্ত্রী। কারণ যখন আমার পিতা-মাতার কাছে শুনি তাদের শৈশবের উল্লাসের কথা, যখন তাদের মুখে শুনি বিকালের মাঠে গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্দা, বউছি, কুতকুত, দড়িলাফসহ নানা খেলার কথা, তখন আমাদের মনটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আমাদেরও মন চায় শৈশবকে এনজয় করতে। আমাদেরও মন চায় দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠের আইল ধরে হেঁটে বেড়াতে। আমাদেরও মন চায় বাড়ির উঠানে মাদুর পেতে বসে রাতের চাঁদ দেখতে। আর দাদা-দাদী কিংবা নানা-নানীর মুখে কিস্‌সা শুনতে। আমি শুনেছি, আপনাদের সময় এসবই ছিল চিত্র। সে সময় শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকে বিকালে ফিরে সবাই ছুটতেন খেলার মাঠে। সন্ধ্যায় যখন আজান পড়তো সঙ্গে সঙ্গে খেলা বন্ধ করে সবাই যার যার বাড়ি চলে যেতেন। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসতেন।

কারণ তখন জিপিএ-৫ নামক বিষফোঁড়া আপনাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, ক্লাস ফাইভে যে পিইসি পরীক্ষা চালু করেছেন এ ব্যবস্থাও আমাদের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। আমাদের অভিভাবকরা জিপিএ-৫ এবং সমাপনী পরীক্ষা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। বইয়ের বাইরের কোনো জ্ঞান আমরা অর্জন করতে পারি না। মাননীয় মন্ত্রী আপনি নিশ্চয় আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, শিশুরা যত বেশি বাইরে ঘুরবে ততবেশি তাদের বুদ্ধি খুলবে। কিন্তু আপনার আমলে এসব যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আপনার শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের জীবন স্কুল, কোচিং, প্রাইভেট আর বাসার মধ্যে আবদ্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় ঠিকমতো ঘুমুতেও পারি না আমরা শিশুরা। ফলে ঘরকুনো হয়ে পড়ছি। আত্মীয়স্বজন ও রক্তের সম্পর্কীয় চাচা, ফুফু, মামা, খালাকেও ভালোবাসতে পারি না। তাদের প্রতি কোনো প্রেমও জন্মায় না।

Picture

এছাড়া পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে ধুমধাম করে। কিন্তু এ পরীক্ষার সার্টিফিকেট তো কোনো কাজেই আসছে না। চাকরি, উচ্চশিক্ষা কোনো কাজেই এ দুটি পরীক্ষার সার্টিফিকেট চাওয়া হয় না। এসএসসি সার্টিফিকেট থেকেই মূল্যায়ন শুরু হয় সার্টিফিকেটের। এখানেও প্রশ্ন জাগে- যে সার্টিফিকেটের কোনো মূল্যই নেই তাহলে এত ঘটা করে এ সার্টিফিকেট অর্জনের জন্য পরীক্ষার প্রয়োজন কি? মাননীয় মন্ত্রী একটি কথা বলতে চাই, যে শৈশব হওয়ার কথা দুরন্ত, ঝলমলে, উজ্জ্বল। সেই শৈশবকে আপনি করে দিয়েছেন চিন্তাযুক্ত, আবদ্ধ আর অন্ধকার। আপনি আপনার শৈশব আর আমার শৈশবকে কি কখনো মিলিয়ে দেখেছেন। একবার চোখ বুঝুন তো। দেখুন, খেয়াল করুন আপনার শৈশব কিভাবে কেটেছে। কিভাবে আপনি শীতের সকালে পিঠা আর পুলির গন্ধে নিজে শিহরিত হয়েছেন। নিশ্চয় আমার মায়ের মতো আপনার মা আপনাকে ঘুম থেকে তুলে টেনে হিঁচড়ে স্কুলে নিয়ে যায়নি।

আবার স্কুল থেকে আসার পর তাড়াতাড়ি কিছু মুখে দিয়ে পড়ার টেবিলে জোর করে বসায়নি। যদি এমনটা না করে আপনি দেশের সম্পদ হতে পারেন তাহলে আমরা কেন আপনার ছোট্ট সময়ের মতো লেখাপড়া করে, আনন্দ করে, শৈশবকে শৈশবের মতো কাটিয়ে দেশের সম্পদ হতে পারবো না। বলতে পারবেন কি? শেষ করতে চাই মাননীয় মন্ত্রী এই বলে, আমাদের শৈশব ফিরিয়ে দিন। আমাদের কোমল হৃদয়কে নিজের মতো করে ভালোবাসতে দিন। দেখবেন আপনার স্বপ্ন এমনিতেই পূরণ হবে। এমনটা হলে আমরা শিশুরা আপনাকে মনে রাখবো আজীবন। হাজারো শিশু ফিরে পাবে তার শৈশব।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: শিক্ষামন্ত্রী আপনি হয়তো বলবেন, এটা আপনার দপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের অধীন নয়। এটা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার। কিন্তু আমরা বলতে চাই, শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে আপনার পরিকল্পনা নিতে হবে। বিষয়টি নিয়ে আপনাকেই ভাবতে হবে। আর এবছর তো প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পাশাপাশি ফলও ফাঁস হয়েছে। আরো কত কি ঘটবে কে জানে? তাই বলছি, আর দেরি নয়, আমার শৈশব ফিরিয়ে দেয়ার পাশাপাশি প্রশ্নফাঁস বন্ধ করুন। আমরা এ থেকে মুক্তি চাই। সত্যিকারের মেধাবীরা এগিয়ে যাক। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষায় পাস করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই।


শেখ ফজিলাতুন নেছা – আমার মা : শেখ হাসিনা

বৃহস্পতিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭

আগস্ট মাস। এই আগস্ট মাসে আমার মায়ের যেমন জন্ম হয়েছে; আবার কামাল, আমার ভাই, আমার থেকে মাত্র দুই বছরের ছোট, ওরও জন্ম এই আগস্ট মাসে। ৫ আগস্ট ওর জন্ম। নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস যে, এই মাসেই ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে জীবন দিতে হয়েছে আমার মাকে। আমার আব্বা, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ১৫ আগস্ট যারা শাহাদাতবরণ করেছেন, আমার মা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, কামাল, জামাল, রাসেল, কামাল-জামালের নব পরিণীতা বধূ, সুলতানা রোজী, আমার একমাত্র চাচা শেখ আবু নাসের, আমার ফুফা আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, তার ১৩ বছরের মেয়ে বেবী, ১০ বছরের আওরাফ, ৪ বছরের নাতি সুকান্ত, সুকান্তের মা এখানেই আছে। আমার বাবার সামরিক সচিব কর্নেল জামিল, যে ছুটে এসেছিল বাঁচানোর জন্য। এই ১৫ আগস্টে একই সঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, এভাবে পরিবারের এবং কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারসহ প্রায় ১৮ জন সদস্যকে।

alt

এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল কেন? একটাই কারণ, জাতির পিতা দেশ স্বাধীন করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তার ডাকে সাড়া দিয়ে লাখো মানুষ অস্ত্র তুলে নিয়ে সেই যুদ্ধ করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা শাহাদাতবরণ করেছেন আমি তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। পৃথিবীর ইতিহাসে কত নাম না জানা ঘটনা থাকে। আমার মায়ের স্মৃতির কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে যে আজকে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। স্বাধীন জাতি। কিন্তু এই স্বাধীনতার জন্য আমার বাবা যেমন সংগ্রাম করেছেন, আর তার পাশে থেকে আমার মা, আমার দাদা-দাদি সব সময় সহযোগিতা করেছেন। আমার মা’র জন্মের পরেই তার পিতা মারা যান। তার মাত্র তিন বছর বয়স তখন। আমার নানা খুব শৌখিন ছিলেন। তিনি যশোরে চাকরি করতেন এবং সব সময় বলেছেন আমার দুই মেয়েকে বিএ পাস করাব। সেই যুগে টুঙ্গিপাড়ার মতো অজপাড়াগাঁয়ে ঢাকা থেকে যেতে লাগত ২২ থেকে ২৪ ঘণ্টা। সেই জায়গায় বসে এই চিন্তা করা। এটা অনেক বড় মনের পরিচয়। তখনকার দিনে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। মিশনারি স্কুলে কিছু প্রাথমিক শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেন। কিন্তু তারপর আর বেশি দিন স্কুলে যেতে পারেননি, স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল বলে। আর ওই এলাকায় স্কুলও ছিল না। একটাই স্কুল ছিল, জিটি স্কুল। অর্থাৎ গিমাডাঙ্গা টুঙ্গিপাড়া স্কুল। যেটা আমাদের পূর্বপুরুষদেরই করা। আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় এক মাইলের ওপর, প্রায় দেড় কিলোমিটারের কাছাকাছি। দূরে কাঁচা মাটির রাস্তা। একমাত্র কাঁচা মাটির রাস্তা দিয়ে যাও অথবা নৌকায় যাও, মেয়েদের যাওয়া একদম নিষিদ্ধ। বাড়িতে পড়াশোনার জন্য পণ্ডিত রাখা হতো। মাস্টার ছিল আরবি পড়ার জন্য। কিন্তু আমার মা’র পড়শোনার প্রতি অদম্য একটা আগ্রহ ছিল। মায়ের যখন তিন বছর বয়স তখন তার বাবা মারা গেলেন।

আপনারা জানেন যে, সে সময় বাবার সামনে ছেলে মারা গেলে মুসলিম আইনে ছেলের ছেলে-মেয়েরা কোনো সম্পত্তি পেত না। আমার মায়ের দাদা তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে তার দুই নাতনিকে তার নিজেরই আপন চাচাতো ভাইয়ের ছেলেদের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে যান এবং সব সম্পত্তি দুই নাতনির নামে লিখে দিয়ে আমার দাদাকে মোতাওয়াল্লি করে দিয়ে যান। এর কিছু দিন পর আমার নানীও মারা যান, সেই থেকে আমার মা মানুষ হয়েছেন আমার দাদির কাছে। পাশাপাশি বাড়ি একই বাড়ি, একই উঠোন। কাজেই আমার দাদি নিয়ে আসেন আমার মাকে। আর আমার খালা দাদার কাছেই থেকে যান। এই ছোট বয়সে বিয়ে হয়ে যায়, শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদের সঙ্গেই তিনি বেড়ে ওঠেন ছোটবেলা থেকেই। উনার ছোটবেলায় অনেক গল্প আমরা শুনতাম। আমার দাদা-দাদির কাছে, ফুফুদের কাছে। বাবা রাজনীতি করছেন সেই কলকাতা শহরে পড়াশোনা করতেন তখন থেকেই। এবং মানবতার জন্য তার যে কাজ এবং কাজ করার যে আকাঙ্ক্ষা যার জন্য জীবনে অনেক ঝুঁকি তিনি নিয়েছেন। সেই ’৪৭-এর রায়টের সময় মানুষকে সাহায্য করা, যখন দুর্ভিক্ষ হয় তখন মানুষকে সাহায্য করা; সব সময় স্কুল জীবন থেকেই তিনি এভাবে মানুষের সেবা করে গেছেন। আমরা দাদা-দাদির কাছেই থাকতাম। যখন পাকিস্তান হলো আব্বা যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেন। সে সময় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য আন্দোলন করলেন। ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হলেন।

প্রথম ভাষা আন্দোলন ’৪৮ সালে। ১১ মার্চ ধর্মঘট ডাকা হলো, সেই ধর্মঘট ডাকার সঙ্গে সঙ্গে তিনি গ্রেফতার হলেন। এরপর ’৫৯ সালে ভুখা মিছিল করলেন। তখনও গ্রেফতার, বলতে গেলে ’৪৭ সাল থেকে ’৪৯ সালের মধ্যে ৩-৪ বার তিনি গ্রেফতার হন। এরপর ’৪৯ সালের অক্টোবরে যখন গ্রেফতার করে আর কিন্তু তাকে ছাড়েনি। সেই ’৫২ সাল পর্যন্ত তিনি বন্দী ছিলেন এবং বন্দীখানায় থেকে ভাষা আন্দোলনের তিনি সব রকম কর্মকাণ্ড চালাতেন। গোপনে হাসপাতালে বসে ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে, আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হতো। মা শুধু খবরই শুনতেন, যে এই অবস্থা, কাজেই স্বামীকে তিনি খুব কম সময়ই কাছে পেতেন। আমি যদি আমাদের জীবনটার দিকে ফিরে তাকাই এবং আমার বাবার জীবনটা যদি দেখি, কখনো একটানা দুটি বছর আমরা কিন্তু বাবাকে কাছে পাইনি। কাজেই স্ত্রী হিসেবে আমার মা ঠিক এভাবে বঞ্চিত ছিলেন। কিন্তু কখনো কোনো দিন কোনো অনুযোগ-অভিযোগ তিনি করতেন না। তিনি সব সময় বিশ্বাস করতেন যে, তার স্বামী দেশের জন্য কাজ করছেন, মানুষের জন্য কাজ করছেন, যে কাজ করছেন তা মানুষের কল্যাণের জন্য করছেন। মায়ের দাদা যে সম্পত্তি দিয়ে গেছেন— প্রচুর জমিজমা। জমিদার ছিলেন। সব সম্পত্তি মার নামে। এর থেকে যে টাকা আসত আমার দাদা সব সময় সে টাকা আমার মার হাতে দিয়ে দিতেন। একটি টাকাও মা নিজের জন্য খরচ করতেন না, সব জমিয়ে রাখতেন। কারণ জানতেন যে, আমার বাবা রাজনীতি করেন, তার টাকার অনেক দরকার, আমার দাদা-দাদি সব সময় দিতেন।

alt

দাদা সব সময় ছেলেকে দিতেন, তার পরেও মা তার ওই অংশটুকু, বলতে গেলে নিজেকে বঞ্চিত করে টাকাটা বাবার হাতে সব সময়ই তুলে দিতেন। এভাবেই তিনি সহযোগিতা শুরু করেন তখন কতইবা বয়স। পরবর্তীতে যখন ’৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন হয়। সে নির্বাচনে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে নির্বাচনী কাজে সবাই সম্পৃক্ত। আমার মাও সে সময় কাজ করেছেন। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরে আব্বা আমাকে নিয়ে আসেন, আব্বার ইচ্ছা ছিল আমাদেরকে ভালোভাবে স্কুলে পড়াবেন। এর পরে উনি মন্ত্রিসভার সদস্য হলেন। আবার মন্ত্রিসভা ভেঙে গেল, আমার এখনো মনে আছে, তখন আমরা খুব ছোট, কামাল-জামাল কেবল হামাগুড়ি দেয়। তখন মিন্টুরোডের তিন নম্বর বাসায় আমরা। একদিন সকাল বেলা উঠে দেখি মা খাটের ওপর বসে আছেন চুপচাপ, মুখটা গম্ভীর। আমি তো খুবই ছোট, কিছুই জানি না। রাতে বাসায় পুলিশ এসেছে, বাবাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। মা বসা খাটের উপরে, চোখে দুই ফোটা অশ্রু। আমি জিজ্ঞেস করলাম বাবা কই, কয় তোমার বাবাকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেছে। চোখের সামনে থেকে এই প্রথম গ্রেফতার, ১৪ দিনের নোটিস দিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিল, কোথায় যাবেন কেবল ঢাকায় এসেছেন, খুব কম মানুষকে মা চিনতেন। মন্ত্রী থাকা অবস্থায় ওই বাসায় মানুষে মানুষে গমগম করত কিন্তু ওইদিন সব ফাঁকা, আমার আব্বার ফুফাতো ভাই, আমার এক নানা তারা এলেন, বাড়ি খোঁজার চেষ্টা। নাজিরাবাজার একটা বাড়ি পাওয়া গেল, সে বাসায় আমাদের নিয়ে উঠলেন, এভাবেই একটার পর একটা ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে।

কিন্তু একটা জিনিস আমি বলব যে, আমার মাকে আমি কখনো ভেঙে পড়তে দেখিনি। কখনো যত কষ্টই হোক আমার বাবাকে কখনো বলেননি যে তুমি রাজনীতি ছেড়ে দাও বা চলে আসো বা সংসার কর বা সংসারের খরচ দাও। কখনো না। সংসারটা কীভাবে চলবে সম্পূর্ণভাবে তিনি নিজে করতেন। কোনো দিন জীবনে কোনো প্রয়োজনে আমার বাবাকে বিরক্ত করেননি। মেয়েদের অনেক আকাঙ্ক্ষা থাকে স্বামীদের কাছ থেকে পাওয়ার। শাড়ি, গয়না, বাড়ি, গাড়ি কত কিছু। এত কষ্ট তিনি করেছেন জীবনে কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলেননি। চাননি। ’৫৪ সালের পরেও বারবার কিন্তু গ্রেফতার হতে হয়েছে। তারপর ’৫৫ সালে তিনি আবার মন্ত্রী হন, তিনি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচন করে জয়ী হন, মন্ত্রিসভায় যোগ দেন, আমরা ১৫ নম্বর আবদুল গণি রোডে এসে উঠি। আমরা বাংলাদেশের ইতিহাস দেখলে দেখব সবাই মন্ত্রিত্বের জন্য দল ত্যাগ করে, আর আমি দেখেছি আমার বাবাকে যে তিনি সংগঠন শক্তিশালী করার জন্য নিজের মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিলেন, ছেড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। কোনো সাধারণ নারী যদি হতো তাহলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করত যে, স্বামী মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিচ্ছে। এই যে আমার বাড়ি গাড়ি এগুলো সব হারাবে, এটা কখনো হয়তো মেনে নিত না। এ নিয়ে ঝগড়াঝাটি হতো, অনুযোগ হতো; কিন্তু আমার মাকে দেখি নাই, এ ব্যাপারে একটা কথাও তিনি বলেছেন। বরং আব্বা যে পদক্ষেপ নিতেন সেটাকেই সমর্থন করতেন। সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে তিনি চলে গেলেন ছোট্ট জায়গায়। এরপর আব্বাকে টি-বোর্ডের চেয়ারম্যান করলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব। তখন সেগুনবাগিচায় একটা বাসায় থাকতে দেওয়া হলো। এরপরই এলো মার্শাল ল। আইয়ুব খান যেদিন মার্শাল ল ডিক্লেয়ার করলেন আব্বা করাচিতে ছিলেন। তাড়াতাড়ি চলে এলেন, ওই দিন রাতে ফিরে এলেন। তারপরই ১১ তারিখ দিবাগত রাতে অর্থাৎ

১২ তারিখে আব্বাকে গ্রেফতার করা হলো। আমার দাদি আমাদের সঙ্গে ছিলেন, গ্রেফতার করার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে যে নগদ টাকা ছিল আমাদের গাড়ি ছিল সব সিজ করে নিয়ে যাওয়া হলো। অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে আমার মাকে দেখেছি সে অবস্থা সামাল দিতে। মাত্র ছয় দিনের নোটিস দিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিল। মালপত্র নিয়ে রাস্তার ওপর আমরা ছোট ছোট ভাইবোন। তখন রেহানা খুবই ছোট। একজন একটা বাসা দিল। দুই কামরার বাসাতে আমরা গিয়ে উঠলাম। দিন-রাত বাড়ি খোঁজা আর আব্বার বিরুদ্ধে তখন একটার পর একটা মামলা দিচ্ছে, এই মামলা-মোকদ্দমা চালানো, কোর্টে যাওয়া এবং বাড়ি খোঁজা সব কাজ আমার মা অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে করতেন। আওয়ামী লীগের এবং আব্বার বন্ধুবান্ধব ছিল। আমার দাদা সব সময় চাল, ডাল, টাকা-পয়সা পাঠাতেন। হয়তো সে কষ্টটা অতটা ছিল না, আর যদি কখনো কষ্ট পেতেন মুখ ফুটে সেটা বলতেন না। এরপর সেগুনবাগিচায় দোতলা একটা বাসায় আমরা উঠলাম। আওয়ামী লীগের কোনো নেতা-কর্মীর অসুখ-বিসুখ হলে তাকে সাহায্য করা, যারা বন্দী তাদের পরিবারগুলো দেখা, কার বাড়িতে বাজার হচ্ছে না সে খোঁজখবর নেওয়া এবং এগুলো করতে গিয়ে মা কখনো কখনো গহনা বিক্রি করেছেন। আমার মা কখনো কিছু না বলতেন না। আমাদের বাসায় ফ্রিজ ছিল, আব্বা আমেরিকা যখন গিয়েছেন ফ্রিজ নিয়ে এসেছেন। সেই ফ্রিজটা বিক্রি করে দিলেন। আমাদের বললেন, ঠাণ্ডা পানি খেলে সর্দি কাশি হয়, গলা ব্যথা হয়, ঠাণ্ডা পানি খাওয়া ঠিক না। কাজেই এটা বিক্রি করে দিই। কিন্তু এটা কখনো বলেননি যে আমার টাকার অভাব। সংসার চালাতে হচ্ছে, আওয়ামী লীগের নেতাদের সাহায্য করতে হচ্ছে। কে অসুস্থ তাকে টাকা দিতে হচ্ছে। কখনো অভাব কথাটা মায়ের কাছ থেকে শুনিনি। এমনও দিন গেছে বাজার করতে পারেননি। আমাদের কিন্তু কোনো দিন বলেননি আমার টাকা নাই, বাজার করতে পারলাম না। চাল-ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করেছেন, আচার দিয়ে বলেছেন প্রতিদিন ভাত ভালো লাগে নাকি; আজকে আমরা গরিব খিচুড়ি খাব। এটা খেতে খুব মজা। আমাদের সেভাবে তিনি খাবার দিয়েছেন।

একজন মানুষ তার চরিত্র দৃঢ় থাকলে যে কোনো অবস্থা মোকাবিলা করার মতো ক্ষমতা ধারণ করতে পারে। অভাব-অনটনের কথা, হা-হুতাশ কখনো আমার মার মুখে শুনিনি। আমি তার বড় মেয়ে। আমার সঙ্গে আমার মায়ের বয়সের তফাৎ খুব বেশি ছিল না। তার মা নাই বাবা নাই কেউ নাই। বড় মেয়ে হিসেবে আমিই ছিলাম মা, আমিই বাবা, আমিই বন্ধু। কাজেই ঘটনাগুলো আমি যতটা জানতাম আর কেউ জানত না। আমি বুঝতে পারতাম। ভাইবোন ছোট ছোট তারা বুঝতে পারত না। প্রতিটি পদে পদে তিনি সংগঠনকে, আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করেছেন। তবে প্রকাশ্যে আসতেন না। তিনি ঠাট্টা করে বলতেন আমি আইয়ুব খানকে ধন্যবাদ দেই, কেন? আব্বা ’৫৮ সালে অ্যারেস্ট হন, ’৫৯ সালের ডিসেম্বর মাসে হেবিয়াস কর্পাস করে মুক্তি পান। সোহরাওয়ার্দী সাহেব নিজে এসে মামলা পরিচালনা করেন। তখন তিনি জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু  ইমবার্গো থাকে যে, উনি ঢাকার বাইরে যেতে পারবেন না। রাজনীতি করতে পারবেন না। সব রাজনীতি বন্ধ। ওই অবস্থায় আব্বা ইন্স্যুরেন্সে চাকরি নেন। তখন সত্যি কথা বলতে কি হাতে টাকা-পয়সা, ভালো বেতন, গাড়ি-টাড়ি সব আছে। একটু ভালোভাবে থাকার সুযোগ মা’র হলো। তিনি ঠাট্টা করে বলতেন আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় আইয়ুব খান এনে দিয়েছিল। উনি চাকরি করছেন আমি স্থিরভাবে জীবনটা চালাতে পারছি। ওই সময় ধানমন্ডিতে দুইটা কামরা তিনি করেন।

এরপর আমাদের ওই ’৬১ সালের অক্টোবরে আমরা ধানমন্ডি চলে আসি। এ বাড়িটা তৈরি করার সময় লেবার খরচ বাঁচানোর জন্য আমার মা নিজের হাতে ওয়ালে পানি দিতেন, ইট বিছাতেন। আমাদেরকে নিয়ে কাজ করতেন। বাড়িতে সবকিছুই ছিল। আব্বা তখন ভালো বেতন পাচ্ছেন। তারপরেও জীবনের চলার পথে সীমাবদ্ধতা থাকা বা সীমিতভাবে চলা, সবকিছুতে সংযতভাবে চলা— এই জিনিসটা কিন্তু সব সময় মা আমাদের শিখিয়েছেন। এরপরে তো দিনের পর দিন পরিস্থিতি উত্তাল হলো। ’৬২ সালে আবার আব্বা গ্রেফতার হলেন, ’৬৪ সালে আবার গ্রেফতার হলেন, আমি যদি হিসাব করি কখনো আমি দেখিনি দুটো বছর তিনি একনাগাড়ে কারাগারের বাইরে ছিলেন। জেলখানায় থাকলে সেখানে যাওয়া, আব্বার কি লাগবে সেটা দেখা, তার কাপড়-চোপড়, খাওয়া-দাওয়া, মামলা-মোকদ্দমা চালানো সবই কিন্তু মা করে গেছেন। সব। পাশাপাশি সংগঠনের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ তার ছিল। বিশেষ করে ছাত্রলীগ তো তিনি নিজের হাতেই গড়ে তোলেন। ছাত্রলীগের পরামর্শ, যা কিছু দরকার তিনি দেখতেন। ’

alt

৬৪ সালে একটা রায়ট হয়েছিল। আব্বা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই সময় হিন্দু পরিবারগুলোকে বাসায় নিয়ে আসতেন, সেখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় তাদের শেল্টারের ব্যবস্থা করতেন। ভলেন্টিয়ার করে দিয়েছিলেন রায়ট থামানোর জন্য, জীবনে যত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ আমার বাবা করেছেন, আদমজীতে বাঙালি বিহারী রায়ট হলো, সেখানে তিনি ছুটে গেছেন। প্রতিটি সময় এই যে কাজগুলো করেছেন আমার মা কিন্তু ছায়ার মতো তাকে সাহায্য করে গেছেন, কখনো এ নিয়ে অনুযোগ করেননি। এই যে একটার পর একটা পরিবার নিয়ে আসতেন তাদের জন্য রান্নাবান্না করা, খাওয়ানো, সব দায়িত্ব পালন করতেন। সব নিজেই করতেন। এরপর দিলেন ৬ দফা। ৬ দফা দেওয়ার পর তিনি যে সারা বাংলাদেশ ঘুরেছেন, যেখানে বক্তৃতা দিয়েছেন, সেখানে মামলা হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছেন। আবার মুক্তি পেয়েছেন, আবার আরেক জেলায় গেছেন, এভাবে চলতে চলতে ’৬৬ সালের ৮ মে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করল। তারপর তো আর মুক্তি পাননি, এই কারাগার থেকে বন্দী করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেল, ৫ মাস আমরা জানতেও পারিনি তিনি কোথায় আছেন, বেঁচে আছেন কিনা। সে সময় আন্দোলন গড়ে তোলা, ৭ জুনের হরতাল পালন। আমার মাকে দেখেছি, তিনি আমাদেরকে নিয়ে ছোট ফুফুর বাসায় যেতেন, কেননা সেখানে ফ্ল্যাট ছিল। ওখানে গিয়ে নিজে পায়ের স্যান্ডেল বদলাতেন, কাপড় বদলাতেন, বোরকা পরতেন, একটা স্কুটারে করে আমার মামা ছিলেন ঢাকায় পড়ত তাকে নিয়ে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতেন, আন্দোলন চালাবে কীভাবে তার পরামর্শ নিজে দিতেন। তিনি ফিরে এসে আমাদের নিয়ে বাসায় ফিরতেন। কারণ গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সব সময় নজরদারিতে রাখত। কাজেই গোয়েন্দাদের নজরদারি থেকে বাঁচাতে তিনি এভাবেই কাজ করতেন। ছাত্রদের আন্দোলনকে কীভাবে গতিশীল করা যায়, আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা এবং এ হরতালটা যেন সফল হয়, আন্দোলন বাড়ে, সফল হয়; তার জন্য তিনি কাজ করতেন। কিন্তু কখনো পত্রিকায় ছবি ওঠা, বিবৃতি এসবে তিনি ছিলেন না। একটা সময় এলো ৬ দফা, না ৮ দফা, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নেতারা চলে এলেন। আমাদেরও অনেক বড় বড় নেতা চলে এলেন। কারণ আওয়ামী লীগ এমন একটা দল যে, আওয়ামী লীগের কর্মীরা সব সময় ঠিক থাকেন কিন্তু নেতারা একটু বেতালা হয়ে যান মাঝে মাঝে, এটা আমার ছোটবেলা থেকেই দেখা। এই সময়ও দেখলাম ৬ দফা, না ৮ দফা, বড় বড় নেতারা এলেন করাচি থেকে। তখন শাহবাগ হোটেল আজকে যেটা বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। আমার মা মাঝে মাঝে আমাকে পাঠাতেন যে, যা একটু, নেতারা আসছেন, তাদের স্ত্রীরা আসছেন, তাদের খোঁজখবর নিয়ে আয়, আমার সঙ্গে কে কে আছে দেখে আয়, মানে একটু গোয়েন্দাগিরি করে আসা আর কি, তো আমি রাসেলকে নিয়ে চলে যেতাম, মার কাছে এসে যা যা ব্রিফ দেওয়ার দিতাম। তাছাড়া মা’র একটা ভালো নেটওয়ার্ক ছিল ঢাকা শহরে।

মহানগর আওয়ামী লীগের গাজী গোলাম মোস্তফার নেতৃত্বে কখন কী হচ্ছে সমস্ত খবর আমার মা’র কাছে চলে আসত। তখন তিনি এভাবে সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। মফস্বল থেকেও নেতারা আসতেন, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতেন। কারণ রাজনৈতিকভাবে তিনি যে কত সচেতন ছিলেন সেটা আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। কাজেই সেই সময় ৬ দফা থেকে এক চুল এদিক-ওদিক যাবেন না এটাই ছিল তার সিদ্ধান্ত। এটা আব্বাকে বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের নেতারা সব উঠেপড়ে লাগলেন ৮ দফা খুবই ভালো। ৮ দফা মানতে হবে, আমার নিজের অভিজ্ঞতা আছে; আমি তখন কলেজে পড়ি, তারপর আমি ইউনিভার্সিটিতে চলে গেলাম, সে সময় আমাদের নামিদামি নেতারা ছিলেন, কেউ কেউ বলতেন তুমি মা কিছু বোঝ না। আমি বলতাম কিছু বোঝার দরকার নেই, আব্বা বলেছেন ৬ দফা। ৬ দফাই দরকার এর বাইরে নয়। আমার মা’কে বোঝাতেন, আপনি ভাবী বুঝতে পারছেন না, তিনি বলতেন আমি তো ভাই বেশি লেখাপড়া জানি না, খালি এই টুকুই বুঝি ৬ দফাই হচ্ছে বাংলার মানুষের মুক্তির সনদ। এটা উনি বলে গেছেন, এটাই আমি মানি এর বাইরে আমি কিছু জানি না। এভাবে তারা বোঝাতে চেষ্টা করেছেন, আমাদের বাসায় ওয়ার্কিং কমিটির তিন দিনের মিটিং। রান্নাবান্না, তখন তো এত ডেকোরেশন ছিল না; অত টাকা-পয়সা পার্টির ছিল না। আমার মা নিজের হাতেই রান্না করে খাওয়াতেন, আমরা নিজেরাই চা বানানো, পান বানানো— এগুলো করতাম।

তখন আবার পরীক্ষার পড়াশোনা। পরীক্ষার পড়া পড়ব না বক্তৃতা শুনব। একটু পড়তে গিয়ে আবার দৌড়ে আসতাম কী হচ্ছে কী হচ্ছে, চিন্তা যে ৮ দফার দিকে নিয়ে যাবে কিনা, কিন্তু সেখানে দেখেছি আমার মায়ের সেই দৃঢ়তা, মিটিংয়ে রেজুলেশন হলো যে ৬ দফা ছাড়া হবে না। নেতারা বিরক্ত হলেন, রাগ করলেন। অনেক কিছু ঘটনা আমার দেখা আছে। আব্বার কাছে দেখা করতে যখন কারাগারে যেতেন, তখন সব বলতেন। আমার মায়ের স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ, আমরা মাঝে মাঝে বলতাম তুমি তো টেপরেকর্ডার। মা একবার যা শুনতেন তা ভুলতেন না। আমাদের কতগুলো কায়দা শিখিয়েছিলেন যে জেলখানায় গিয়ে কী করতে হবে। একটু হৈচৈ করা, ওই ফাঁকে বাইরের সব রিপোর্ট আব্বার কাছে দেওয়া এবং আব্বার নির্দেশটা নিয়ে আসা, তারপর সেটা ছাত্রদের জানানো। স্লোগান থেকে শুরু করে সবকিছুই বলতে গেলে কারাগার থেকেই নির্দেশ দিয়ে দিতেন, সেভাবেই কিন্তু মা ছাত্রলীগকে কাজে লাগাতেন। ’৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ওনাকে নিয়ে গেল ক্যান্টনমেন্টে। আমরা কোনো খবর পেলাম না, তখন মায়ের যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা যখন দেয় তখন কিন্তু আমার মা’কেও ইন্টারগেশন করেছে, যে কী জানে এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে। উনি খুব ভালোভাবে উত্তর দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা আমাদের দরকার, আমার মনে আছে, ভুট্টোকে যখন আইয়ুব খান তাড়িয়ে দিল মন্ত্রিত্ব থেকে।

ভুট্টো চলে এলে তখনকার দিনের ইস্ট পাকিস্তানে এসেই ছুটে গেল ৩২ নম্বর বাড়িতে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। আমাদের বসার ঘরটার নিচে যে ঘরটা আছে ওখানে আগের দিনে এ রকম হতো যে ড্রয়িং রুম, এরপর ডাইনিং রুম, মাঝখানে একটা কাপড়ের পর্দা। মা যখন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা আসতেন পর্দাটা টেনে ভিতরে বসে কথা বলতেন, বলতেন আমি পর্দা করি, আমাদের বলতেন ওদের সঙ্গে থাকব না, দেখা করব কেন। আমার আব্বা যে মিনিস্টার ছিলেন, এমপি ছিলেন এমএলএ ছিলেন, করাচিতে যেতেন আমার মা কিন্তু জীবনে একদিনও করাচিতে যাননি, কোনো দিন যেতেও চাননি। উনি জানতেন, উনিই বেশি আগে জানতেন যে, এদেশ স্বাধীন হবে। এই যে স্বাধীনতার চেতনায় নিজেকে উদ্বুদ্ধ করা, এটা মায়ের ভিতরে তীব্র ছিল। একটা বিশ্বাস ছিল। আগরতলা মামলার সময় আব্বার সঙ্গে প্রথম আমাদের দেখা জুলাই মাসে। যখন কেস শুরু হলো, জানুয়ারির পর জুলাই মাসে প্রথম দেখা হয়, তার আগ পর্যন্ত আমরা জানতেও পারিনি। ওই জায়গাটা আমরা মিউজিয়াম করে রেখেছি। ক্যান্টনমেন্টে যে মেসে আব্বাকে রেখেছিল এবং যেখানে মামলা হয়েছিল সেখানেও মিউজিয়াম করে রাখা হয়েছে। এরপরে আমাদের নেতারা আবারও উঠেপড়ে লাগলেন, আইয়ুব খান গোলটেবিল বৈঠক ডাকল, সেখানে যেতে হবে, না গেলে সর্বনাশ হবে। মা খবর পেলেন। আমাকে পাঠালেন, বললেন আমার সঙ্গে কথা না বলে কোনো সিদ্ধান্ত যেন উনি না দেন। আমাদের বড় বড় নেতারা সবাই ছিলেন, তারা নিয়ে যাবেন, আমার আব্বা জানতেন, আমার উপস্থিতি দেখেই বুঝে যেতেন যে মা কিছু বলে পাঠিয়েছেন। মা খালি বলে দিয়েছিলেন আব্বা কখনো প্যারোলে যাবে না যদি মুক্তি দেন তখন যাবে। সে বার্তাটাই আমি পৌঁছে দিয়ে এসেছিলাম, আর তার জন্য আমাদের নেতারা বাসায় এসে বকাঝকা। তুমি কেমন মেয়ে, তুমি চাওনা তোমার বাবা বের হোক জেল থেকে, মাকে বলতেন আপনি তো বিধবা হবেন।

মা শুধু বলেছিলেন, আমি তো একা না, এখানে তো ৩৪ জন আসামি, তারা যে বিধবা হবে এটা আপনারা চিন্তা করেন না? আমার একার কথা চিন্তা করলে চলবে? আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ৩৫ জনের মধ্যে ৩৪ জনই তো বিবাহিত। মামলা না তুললে উনি যাবেন না। তার যে দূরদর্শিতা রাজনীতিতে সেটাই কিন্তু আমাদের স্বাধীনতার পথ খুলে দিয়েছে। কারণ সেদিন যদি প্যারোলে যেতেন তাহলে কোনো দিনই আর বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না, এটা হলো বাস্তবতা। এরপর অসহযোগ আন্দোলনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আমি দেখেছি মায়ের দৃঢ় ভূমিকা। ৭ মার্চের ভাষণের কথা বারবারই আমি বলি, বড় বড় বুদ্ধিজীবীরা লিখে দিয়েছেন এটা বলতে হবে, ওটা বলতে হবে, কেউ কেউ বলছেন এটাই বলতে হবে, না বললে সর্বনাশ হয়ে যাবে, এ রকম বস্তাকে বস্তা কাগজ আর পরামর্শ। গুরুত্বপূর্ণ কিছুতে যেতে হলে আমার মা কিন্তু আব্বাকে বলতেন কিছুক্ষণ তুমি নিজের ঘরে থাক, তাকে ঘরে নিয়ে তিনি একটা কথা বললেন যে, তোমার মনে যে কথা আসবে তুমি সে কথা বলবা। কারণ লাখো মানুষ সারা বাংলাদেশ থেকে ছুটে এসেছে, হাতে বাঁশের লাঠি, নৌকার বৈঠা নিয়ে।

আর এদিকে পাকিস্তানি শাসকরাও অস্ত্র-টস্ত্র নিয়ে বসে আছে এই বলে যে, বঙ্গবন্ধু কি নির্দেশ দেন। তারপর মানুষগুলোকে আর ঘরে ফিরতে দেবে না। নিঃশেষ করে দেবে। স্বাধীনতার স্বাদ বুঝিয়ে দেবে, এটাই ছিল পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত। আর সেখানে আমাদের কোনো কোনো নেতা বলে দিলেন যে, এখানেই বলে দিতে হবে যে, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। কেউ বলে, এটা বলতে হবে, ওটা বলতে হবে। মা বাবাকে বললেন যে, সারা জীবন তুমি সংগ্রাম করেছ, তুমি জেল-জুলুম খেটেছ। দেশের মানুষকে নিয়ে যে স্বপ্ন কীভাবে স্বাধীনতা এনে দেবেন সে কথাই তিনি ওই ভাষণে বলে এলেন। যে ভাষণ আজকে সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণ। আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে যত ভাষণ আছে, যে ভাষণ মানুষকে উজ্জীবিত করেছে সে ভাষণের শ্রেষ্ঠ একশটি ভাষণের মধ্যে এ ভাষণ স্থান পেয়েছে।  যে ভাষণ এদেশের মানুষকে প্রেরণা দিয়েছিল এবং এরপর ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যখন তিনি এলেন ফোনে বলেছিলেন খসড়াটা ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে চলে যাবে, ব্যবস্থাটা সবই করা ছিল, সবই উনি করে গিয়েছিলেন। জানতেন যে, যে কোনো সময় তাকে গ্রেফতার বা হত্যা করতে পারে। মা সব সময় জড়িত আমার বাবার সঙ্গে, কোনো দিন ভয়ভীতি দেখিনি।

যে মুহূর্তে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন তারপরই সেনাবাহিনী এসে বাড়ি আক্রমণ করল, ওনাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল, পরের দিন এসে আবার বাড়ি আক্রমণ করল, আমার মা পাশের বাসায় আশ্রয় নিলেন। তারপর এ বাসা ও বাসা করে মগবাজারের একটা বাসা থেকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাওয়া হলো। ১৮ নম্বর রোডের একতলা বাসায় রাখা হলো। খোলা বাড়ি। কিছু নাই, পর্দা নাই। রোদের মধ্যে আমাদের পড়ে থাকতে হয়েছে, দিনের পর দিন। মা’কে কিন্তু কখনো ভেঙে পড়তে দেখিনি। সব সময় একটা আত্মবিশ্বাস ছিল, সাহস ছিল সে সাহসটাই দেখেছি। এরপর যেদিন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর সারেন্ডার করে, আমরা কিন্তু সেদিন মুক্তি পাইনি, আমরা পেয়েছি এক দিন পরে ১৭ ডিসেম্বর। এখানে একটা ছবি দেখিয়েছে, মা দাঁড়িয়ে আছে মাঠের ওপর। মানুষের সঙ্গে হাত দেখাচ্ছে, ওটা কিন্তু বাংকার। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ বাড়িতে মাটির নিচে বাংকার করেছিল, কাজেই ওই বাংকারের ওপর দাঁড়িয়ে যখন ইন্ডিয়ান আর্মি এসে পাকিস্তান আর্মিকে স্যারেন্ডার করে নিয়ে গেল হাজার হাজার মানুষ ওখানে চলে এলো, মা হাত নেড়ে দেখাচ্ছেন। স্যারেন্ডার করার সময় গেটে যে সেন্ট্রি ছিল, আমরা ভিতরে বন্দী, আমরা তো বের হতে পারছি না, জানালা দিয়ে মা হুকুম দিচ্ছে। ওই সিপাহিটার নামও জানতেন, বলছেন যে হাতিয়ার ডালদো। ওই যে হাতিয়ার ডালদো প্রচার তখন তিনি জানতেন, বেচারা ভ্যাবাচেকা খেয়ে জি মা জি বলে অস্ত্রটা নিয়ে ব্যাংকারে চলে গেল। কাজেই ওনার যে সাহসটা তা ওই সময়েও ছিল। ওই দিন রাতেও আমাদের মেরে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, যেভাবে হোক আমরা বেঁচে গেছি। আমার মা’র যে তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত আমরা দেখেছি, স্বাধীনতার পর তিনি কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বৌ হিসেবে বিলাসী জীবনযাপনে ফিরে যাননি, ওই ধানমন্ডির বাড়িতে থেকেছেন, বলেছেন না আমার ছেলেমেয়ে বেশি বিলাসিতায় থাকলে ওদের নজর খারাপ হয়ে যাবে, অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে। উনার জীবনে যেভাবে চলার ঠিক সেভাবেই উনি চলেছেন, কিন্তু স্বাধীনতার পর যেসব মেয়ে নির্যাতিত ছিল, নির্যাতিত মেয়েদের সাহায্য করা, তাদেরকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়া। বোর্ডের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসনের যখন ব্যবস্থা হয় ওই মেয়েদের যখন বিয়ে দিতো, মা নিজেও তখন উপস্থিত থেকেছেন। নিজের হাতের নিজের গহনা, আমি আমারও গহনা অনেক দিয়ে দিয়েছিলাম, বলতাম, তুমি যাকে যা দরকার তা দিবা।

তিনি প্রচারবিমুখ ছিলেন, আমাকে একদিন বললেন, মাত্র ১৪ বছরের বাচ্চা মেয়ে তাকে যেভাবে অত্যাচার করেছে, তা দেখে তার খুব মন খারাপ হয়েছে। এভাবে নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানো, যে এসে যা চেয়েছে হাত খুলে তা দিয়ে দিয়েছে; দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল না। দেশের কথাই সব সময় চিন্তা করেছেন। আমি অনেক স্মৃতির কথা বললাম এ কারণে যে আমি মারা গেলে অনেকেই হয়তো অনেক কিছু জানবে না। কাজেই এই জিনিসগুলো জানাও মানুষের দরকার। একজন যখন একটা কাজ করে তার পেছনে যে প্রেরণা শক্তি সাহস লাগে, মা সব সময় সে প্রেরণা দিয়েছেন, কখনো পিছে টেনে ধরেননি। যে আমার কী হবে, কী পাব, নিজের জীবনে তিনি কিছুই চাননি, আমি বলতে পারব না যে, কোনো দিন তিনি কিছু চেয়েছেন। কিন্তু দেশটা স্বাধীন করা, দেশের মানুষের কল্যাণ কীভাবে হবে সে চিন্তাই তিনি সব সময় করেছেন। স্বাধীনতার পর অনেক সময় আব্বার সঙ্গে আলোচনা করেছেন, তখন একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ কী ভয়াবহ পরিস্থিতি, তখন সেই অবস্থায়ও তিনি খোঁজখবর রাখতেন। তথ্যগুলো আব্বাকে জানাতেন।

জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাশে ছিলেন, যখন ঘাতকরা আমার বাবাকে হত্যা করল তিনি তো বাঁচার আকুতি করেননি। তিনি বলেছেন, ওনাকে যখন মেরে ফেলেছ আমাকেও মেরে ফেল, এভাবে নিজের জীবনটা উনি দিয়ে গেছেন। সবাইকে নিয়ে চলে গেলেন, আমরা দুই বোন থেকে গেলাম, বিদেশে চলে গিয়েছিলাম মাত্র ১৫ দিন আগে। মাঝে মাঝে মনে হয় এভাবে বেঁচে থাকা যে কী কষ্টের, যারা আপনজন হারায় শুধু তারাই বুঝে। আমি সবার কাছে দোয়া চাই। আমার মায়ের যে অবদান রয়েছে দেশের স্বাধীনতার জন্য এবং দেশকে যে গভীরভাবে ভালোবাসতেন এদেশের মানুষ আব্বার সঙ্গে একই স্বপ্নই দেখতেন যে, এ দেশের মানুষ সুন্দর জীবন পাবে, ভালোভাবে বাঁচবে। গরিব থাকবে না। আব্বা যে এটা করতে পারবেন এ বিশ্বাসটা সব সময় তার মাঝে ছিল। কিন্তু ঘাতকের দল তো তা দিল না। কাজেই সে অসমাপ্ত কাজটুকু আমাকে করতে হবে, আমি সেটাই বিশ্বাস করি। এর বাইরে আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। তবে আমার মায়ের সারা জীবন দুঃখের জীবন, আর সেই সঙ্গে মহান আত্মত্যাগ তিনি করে গেছেন। আমি তার জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।  ১৫ আগস্ট যারা শাহাদাতবরণ করেছেন সবার জন্য দোয়া চাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন তাকে বেহেস্ত নসিব করেন।

লেখক : প্রধানমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার


আমর নাম দিয়েছে রহিংগা = সীমু

বৃহস্পতিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭

Picture

নীজের দেশেই জুটল না মোর জায়গা
অনতোহীন পথের যাত্রি হয়ে ,
আমি যে তৃসনারতো
চারিদিকে শুধু গোলাবারুদের শব্দ,
পালাতে পালাতে হয়ে গেছি পরিশ্রানত
দিকবিক হারিয়ে আমার জায়গা হল অবশেষে ,
সাধীন একদেশ বাংলাদেশে
এখানে কেউ আসে নাকো
আমার সতীত্ব হরন করতে ,
মেশানগানের ভয় দেখিয়ে
কাপর খুলে নিতে ,
অশ্রাব্য গালি দিয়ে চুলের মুঠি ধরে
হির হির করে ,টেনে নিয়ে যায় নাতো উঠনে ,
নগ্ন দেহের উল্লাসে হয়ে যায় ভোর
রক্ত চক্ষুর ভয়ে হিদয় কমপন মোর
জবনিকা মোর যায় নাতো  এখানে ।
কচি ঘাসের বুকে নগ্ন পায়ে
হেঁটে বেরাই বুকে সাহসভরে ।
নিত্য হেটে বা দৌরে যাই ,কোথায়?
কোথায় আবার , ত্রাণের মাল আনতে ।
পরিশ্রান্ত নই দারিয়ে লম্বা লাইনে
খন পরেই খোজ নেয় লোকজনে জনে ।
আততাহুতি দেইনি আমি
বিরংগনা হয়ে প্রসুতি
সাধীন দেশেই উঠিবে জলিয়া
আমার আলোর বাতি ।


রাহুল গান্ধীই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী? আবু জাফর মাহমুদ

বৃহস্পতিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০১৭

গুজরাটে পরাজিত হতে হতে খুবই সামান্য ব্যবধানে ক্ষমতাধর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতার সাথে ঝুলে থাকলেন বলে  নির্বাচনী ভোট গণনার পর জানা গেলো।বেসরকারি ফলে দেখা যাচ্ছে গুজরাটে মোট ১৮২ আসনের মধ্যে ৯৯ আসনে বিজেপি, কংগ্রেস ৮০ আসনে এবং অন্যরা ৩ আসনে এগিয়ে রয়েছে।

রাজ্যে এবং কেন্দ্রীয় সরকারে থেকেও জঙ্গিহিন্দুত্ববাদী বিজেপির পক্ষে বিপক্ষে সমর্থন যেভাবে নড়তে দেখা গেলো তাতে প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতির মুখে হাসি কমে গেছে।জাতীয় রাজনীতিবিদ ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন নির্বাচনে প্রভাব খাটিয়ে গুজরাটের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী যেভাবে জয় কেড়ে নিয়েছেন তাতে তার নৈতিক পরাজয় হয়েছে।গুজরাটে কংগ্রেস অনেক এগিয়েছে অর্থাৎ বিজেপির সমর্থন কমেছে অনেক।

জনপ্রিয়তার পাহাড় ক্ষয়ে যাওয়া নিয়ে নয়,কথা আসছে কে হবেন গুজরাটের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী?বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে সরিয়ে নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্ট এবং নির্বাচনী ষ্ট্র্যাটেজিষ্টরূপে বিজেপি নেতৃত্বে আলোচিত যে ব্যক্তির নাম সামনে আসছে তিনি হচ্ছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি অমিত শাহ্‌।বিজেপিতে মধ্যপন্থীদের প্রমোশনের লক্ষণ খুবই সীমিত।তাই ক্ষমতার পুরস্কার এবং ক্ষমতার জন্যে নির্ভরযোগ্য উত্তরাধিকারী অনিবার্য্যভাবেই উগ্রবাদী সাহসীরা।কংগ্রেসের সামর্থ্য অর্জনের পরিস্থিতি বিজেপিকে ভবিষ্যতের ব্যাপারে সন্ত্রস্থ করে তুলেছে।

তাই বিজয় রূপানি বাদ পড়তে পারেন,প্রায়ই নিশ্চিত।রূপানি স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন আনন্দিবেন প্যাটেলের.২০১৬সনের আগষ্ট মাসেই হয়েছিলো এই পরিবর্তন। রূপানির সুনাম ব্যবহার করেই এই নির্বাচনী পাড়ি হয়ে গেছে।পরের কাজ তাকে বিদায় দেয়া।তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা অমিতকে রাজধানীতে গুরুত্ব দিচ্ছেন বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনে বিজয়ের নীতি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনার জন্যে। ২০১৯সনে লোকসভা নির্বাচনের বিষয়টিও গভীরভাবে ভাবতে হচ্ছে বিজেপিকে।

গত নির্বাচনে অমিত মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা,জম্মু এবং কাস্মীর,ঝারখন্ড,আসাম এবং উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে দলকে জিতিয়ে আনেন।ওখানে বিজয়ের চাবিকাঠি ছিলেন তিনি। উত্তরপ্রদেশ থেকে লোকসভা নির্বাচনে মূল কৃতিত্বও তার।১৯৯৭সনে সার্খেজ উপ্নির্বাচনে এম এল এ হয়েই ১৯৯৮,২০০২ এবং ২০০৭সনে তিনি পর পর জিতে আসেন।

অবশ্য আরেকজনের নামও দোল খাচ্ছে রাজনৈতিক বাতাসে।ডেপুটি চীফ মিনিষ্টার নিতিন প্যাটেলের নাম বাদ যায়নি আলোচনায়। আনান্দিবেন প্যাটেল বিদায় নেবার পরিস্থিতিতে তার নাম আসছিলো বেশী করে।গুজরাট বিজেপির রাজ্যসভাপতি জিতু ভাঘানির নামও ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো ঠং ঠং করে শব্দ বাজাচ্ছে।যাইহোক এসপ্তাহেই নাম চলে আসবে এবং একজনের বিষয়ে দলের ও সংসদের সিদ্ধান্ত চলে আসবে বলে ধরে নেয়া যায়।

কংগ্রেস কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে তরুণ নেতৃত্ব নিয়েছে।রাহুলগান্ধী কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট পদে আসায় দলের দিকে সাধারণ মানুষের আলাদা মনোযোগ আসাটা স্বাভাবিক।একদিকে গুজরাট ও হিমাচল প্রদেশে বিজেপির বিজয় অপরদিকে ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ ওনিন্মকক্ষ লোকসভায় তুমুল হট্টগোল হয়েছে নরেন্দ্র মোদীর নীচ স্বভাবের আচরণের প্রতিবাদে।ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভা ও নিম্নকক্ষ লোকসভায় বিরোধীদের গোলযোগের জেরে অধিবেশন স্থগিত করে দেয়া হয়েছে।

 সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সিনিয়র কংগ্রেস নেতা মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন অভিযোগ করে কংগ্রেস এমপিরা হট্টগোল করেন।গুজরাট নির্বাচনের সময় নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী   

মনমোহন সিং সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানকে জড়িয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন বলে কংগ্রেসের অভিযোগ। স্পিকার  সারাদিনের জন্যে অধিবেশন মুলতবীর ঘোষণা দিতে বাধ্য হন।

অন্যদিকে,রাজ্যসভাতেও কংগ্রেস সদস্যরা কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলে সংসদের কাজ বারবার বিঘ্নিত হয়।পরে ডেপুটি চেয়ারম্যান মঙ্গলবার পর্যন্ত অধিবেশনের কাজ মুলতুবি করে দিতে বাধ্য হন।সম্প্রতি গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সিনিয়র কংগ্রেস নেতা মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন বলে কংগ্রেসের অভিযোগ।

তৃণমূল এমপিরা গলায় বড় বড় পোস্টার ঝুলিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখান। পোস্টারে ‘খেটে খাওয়া মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার বিপন্ন করা মানছি না, মানবো না’, ‘এফআরডিআই বিল ফিরিয়ে নাও’ প্রভৃতি শ্লোগান লেখা ছিল।

পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে ভারতে।বিজেপি শিবির থেকেও কংগ্রেস সভাপতি রাহুলগান্ধীর উপর ভারতের নেতৃত্বের কথা উঠছে বেশ গুরুত্ব সহকারে। গুজরাটের উপরের অবস্থার সাথে ভেতরে যেনো গড়মিল।জাতীয় পর্যায়েও পরিবর্তনের বাতাসে শক্তি বাড়ছে।ভারতের সাবেক বিজেপি নেতা সুধীন্দ্র কুলকার্নি বলেছেন, দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন রাহুল গান্ধী। কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে রাহুল গান্ধী দায়িত্ব গ্রহণের পরে তিনি ওই মন্তব্য করেছেন।

১৮ই ডিসেম্বর রোববার গণমাধ্যমে প্রকাশ, সুধীন্দ্র কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেছেন, ‘এক নতুন নেতার উত্থান হয়েছে। তিনি এমন একজন নেতা যাকে ভারতের প্রয়োজন। তিনি এমন নেতা যার মতাদর্শ গান্ধীবাদী রাজনীতি। আদর্শবাদ, রাজনীতি, প্রেম, সেবা এবং সংলাপের রাজনীতির নেতা।’তিনি আরো বলেছেন যে, ‘আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে, কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন। এবং তারই হওয়া উচিত।’

 সুধীন্দ্র কুলকার্নি ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সিনিয়র বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের ওএসডি থাকার সুবাদে তার মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সিনিয়র বিজেপি নেতা এল কে আদবানী ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সুধীন্দ্র কুলকার্নি। তিনিই আদবানীর ভাষণ তৈরি করে দিতেন। ২০১৫ সালে সাবেক পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী খুরশিদ মাহমুদ কাসুরির বই প্রকাশকে কেন্দ্র  করে শিবসেনা সমর্থকরা তাকে পাকিস্তানের এজেন্ট আখ্যা দিয়ে তার মুখে কালি মাখিয়ে দিয়েছিল।

এক সময় বিজেপি নেতা এল কে আদবানি কুলকার্নির কথাতেই পাকিস্তানের জনক মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র প্রশংসা করেছিলেন বলে শিবসেনার দাবি। পেশায় সাংবাদিক কুলকার্নি ১৩ বছর বিজেপিতে থাকার পর ২০০৯ সালে তিনি বিজেপি ছেড়েছিলেন।আবার আলোচনায় এসেছেন কুলকার্নি।তিনি প্রকাশ্যে জোর দিয়ে বলছেন রাহুলই হবে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। আর এতে উগ্রবাদী হিন্দুত্বে অতিষ্ঠরা উতসাহ পেয়ে জনসমর্থনের দিকে দিচ্ছেন গুরুত্ব।ভারতীয় রাজনীতির এই শ্রোতের ভেতরের শ্রোতে কি ঘটতে চলেছে সেদিকে নজর রাখছেন রাশিয়া,চীন আমেরিকা এবং ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন।  

(লেখক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান)। 


স্বাধীনতাযুদ্ধের বিজয় চেতনা কাঁটাতারে বন্দী কেন?আবু জাফর মাহমুদ

মঙ্গলবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৭

স্যালিউট টু বাংলাদেশ ন্যাশনাল লিবারেশান ওরিয়ার্স!তুমি পুরুষ অথবা মহিলা,তুমি পাহাড়ি বা সমতলের স্বাধীনচেতা অসাধারণ দৃঢ় প্রত্যয়ী মানুষ।তুমি স্রষ্টাকে আল্লাহ,ভগবান অথবা গড বলে সম্বোধন করো অথবা তুমি স্রষ্টাকে চেনাজানার আগ্রহী কেউ না হয়েও বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে সশস্ত্র হয়েছো-লড়াই করে জীবন হারিয়েছো অথবা বিজয়ী বীরের একজন হয়েছো,তোমাকে অভিবাদন হে মহাপুরুষ!উষ্ণ আলিঙ্গন তোমাকে,দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে দেখে, তোমাতে আমাতে মিল পেয়ে আমি স্পন্দিত হয়েছি।আমার অভিবাদন কেবল তোমাকেই,তুমি জীবন তুচ্ছ করেছো অপরাপর জীবন বাঁচাতে।মানুষ মারা বন্ধ না করলে মানচিত্র বদলে দেবার প্রত্যয়ে।       

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের বিজয় দিবস ১৬ই ডিসেম্বর।১৯৭১সনের এই মহান দিনটি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বর্ণনাতীত গৌরবদীপ্ত।এই গৌরবকে জোর করে ছিনিয়ে নিতে দলীয় রাজনীতিকরা স্বাধীন দেশের প্রথম দিন থেকেই যে  অপরিণামদর্শী রাজনীতি চালু করেছেন তার তূলনা সম্ভবত আরেকটি নেই। তারই ধারাবাহিকতায় ফিরে তাকাচ্ছি জীবনের এই প্রশ্নবিদ্ধ ৪৬ বছরের স্মৃতি এবং নিজদেশ- জাতির প্রতি দায়িত্ব পালনে আমাদের  নির্লজ্জ ব্যর্থতার দিকে।

প্রিয় পাঠক,প্রিয় বংশধর এবং প্রিয় বাংলাদেশবাসী,আমরা স্বাধীনতা যোদ্ধারা বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছি যুদ্ধ করে।তবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় সামান্যও দায়িত্ব পালন করিনি।যে বাংলাদেশ আমাদের যুদ্ধের ফসল,সেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রপরিচালনায় পরিচালিত  রাজনীতিতে স্বাধীনতাযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও এই অতূলনীয় চেতনার সর্বোচ্চ মানবিক বিশেষত্বকে সামান্যও হিসেবে নেয়নি বাংলাদেশের রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকরা।ফলে আমরা ও বাংলাদেশ হয়ে গেছি নিরাপত্তাহীন।

সূচনাকাল থেকেই আমাদের সরকার রওয়ানা দিয়েছে পরাধীনতার পথ ধরে।স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার শত্রুবাহিনীর স্থানীয় প্রধান দোসর পুলিশ বাহিনীর চাকরি বহাল রেখে তাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো স্বাধীনতাযোদ্ধাদের চরিত্র ও দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট প্রস্তুত করার এবং গোপন নথি তৈরী করে সরকারের মন্ত্রীর দফতরে পাঠানোর। স্বাধীনতাযুদ্ধের সনদপত্রে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে দস্তখত দেয়া হয় দীর্ঘ নয় মাস হানাদার বাহিনীর সচিব তসলিম আহমদের।বাংলাদেশের প্রথম সরকারের প্রধান ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সেই মন্ত্রীসভায় সচিবরা ছিলেন পাকিস্তানী হানাদার শত্রুবাহিনীর পক্ষ হয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধের শত্রু আমলা।গতকাল যারা ছিলেন  পাকিস্তানী আগ্রাসী বাহিনীর আমলা, পরেরদিন তাদেরকে করা হয়েছে আওয়ামীলীগ সরকারের আমলা।

 মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে আওয়ামীলীগ সরকারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।স্বাধীনতাযোদ্ধাদের নিয়ে  রাজনৈতিক অঙ্গনে কি করতে হবে,তা অজানা থাকায় আওয়ামীলীগ আছাড় খেয়ে পড়তে লাগলো স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয়ী বীরদের সম্মানের উচ্চতা থেকে।বিবাদ বিরোধে শুরু হলো বাংলাদেশের বিয়োগান্ত নাটকের প্রথম সোপান।জাসদ গড়তে বাধ্য করা হলো।তাতে যুক্ত হলো কলকাতার চরমপন্থি চারুমজুমদারের নক্সালি অনুসারীরাও। ভিন্নপথে নিজের বিরুদ্ধে নিজের শক্তিকে রক্তাক্ত যুদ্ধে জড়ালো বাংলাদেশ।  

 সেনাবাহিনী ও বিডিআর যতটুকু পেরেছে চাকরির দায়িত্ব পালন করেছে পেশাদারিত্বের কাঠামোর মধ্যে থেকে।রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিরোধীদল বা ভিন্নমতাদর্শের ছাত্র যুবক স্বাধীনতাযোদ্ধাদেরকে নির্মূল করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো তাদেরকে।বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিডিআর স্বাধীনতাযুদ্ধ করতে করতে গড়ে ওঠায়  সীমান্তরক্ষায় ছিলো যথার্থ অতন্দ্র প্রহরী।দায়িত্বপালনে এরা নজিরবিহীন সফলতা অর্জন করেছে।

এতে রাষ্ট্রের সরকারগুলো ধারাবাহিকভাবে পুরস্কারের পরিবর্তে শাস্তি দিয়েছে সেনাবাহিনীও সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিডিআরকে।প্রথম থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশী রাজনীতি  স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয় সংহত করার পরিবর্তে উগ্র মেজাজের সাথে  নয়া পরাধীনতার রাজনৈতিক দালাল হয়ে এসেছে।ওপথেই হত্যা হয়েছে্ন হাজার হাজার স্বাধীনতাযোদ্ধা। ওপথেই হত্যা হয়েছেন বঙ্গবন্ধু মুজিব নিজে এবং তাজউদ্দীন আহমদ সহ অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতারা।  

মেজর জেনারেল এ.এল.এম ফজলুর রহমানকে বিডিআর থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিলো তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দ্দেশে।পরবর্তীতে অন্যদল সরকার গঠন করলে তাকে সামরিক বাহিনীর চাকরি থেকে বিদায় করে দেয়া হয়েছিলো  চিরতরে।ভারতীয় বাহিনীকে পরাজিত করায় বাংলাদেশের আওয়ামীলীগ ও বিএনপি-জামাত জোট উভয় সরকারই এই বিডিআর ডিজির উপর ক্ষুদ্ধ হয়েছিলেন।

পিলখানা হত্যাকান্ডে যে ৫৭জন সেনাঅফিসারকে পরিকল্পিত হত্যায় শেষ করে দেয়া হয়েছিলো তাদের মধ্যে বিডিআরের ডিজি সহ বেশ কয়েকজন ছিলেন ২০০১সনে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বাংলাদেশ রক্ষার অকুতোভয় বিজয়ী বীর সেনাঅফিসার।বিডিআরের সৈনিকদের গ্রেফতারের পর নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে সীমান্তে ভারতীয় আক্রমণ প্রতিরোধে বিজয়ী সৈনিক সহ কয়েকশত চৌকস সৈনিকদের। বিডিআর নামটিও মুছে ফেলেছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলীয় সরকার।     

মুক্তিযুদ্ধের বিজয় বা স্বাধীনতাযুদ্ধের বিজয় ভোগকারী বর্তমান সরকার বাংলাদেশেরই সরকার।গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের সব মানুষের সরকার।রাজনৈতিক অথবা নৈতিক বিতর্ক যতই থাকুক এই সরকারের পরিবর্তে  অন্যকোন সরকার রাষ্ট্রপরিচালনায় না থাকা পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারই বাংলাদেশ সরকার।রাষ্ট্র সরকার ছাড়া চলেনা।

বাংলাদেশের সব নাগরিক এবং রাষ্ট্রস্বীকৃত সকল রাজনৈতিক দল কি সমান সুযোগে বিজয় দিবস উদযাপন করতে পারছে আজ? এক রাজনৈতিক দল অপর রাজনৈতিক দলকে কি শুভেচ্ছা জানাতে পারছে? প্রধানমন্ত্রী কি সাবেক প্রধানমন্ত্রীদেরকে, রাষ্ট্রপতি কি সাবেক রাষ্ট্রপতিদেরকে শুভেচ্ছা জানাতে পারছে আনুষ্ঠানিকতায়?  আমাদের যুদ্ধ ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ কি শকুনের পায়ে আটকানো নাকি নৈতিক যোগ্যতায় মর্যাদাবান রাজনীতিবিদদের পরিচালনায় সমৃদ্ধ?

 বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকে এবং যুদ্ধের বিজয়কে অপরের দানদক্ষিণা বলে হেয় করার চেতনাধারীরা অথবা জাতীয় চেতনার বিভ্রান্তকারী মহল নিজেদের হীনস্বার্থে স্বাধীনতাযোদ্ধাদেরকে মন থেকে গ্রহন করতে পারেনি।কখনো  পারবেওনা। স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধীরা এই যুদ্ধের ফল ভোগ করতে দেরী করেনি।তবে স্বাধীনতাযোদ্ধাদেরকে ভয় পায় ও হিংসা করে এসেছে।রাজনৈতিক ফায়দা আত্নসাৎকারী সুবিধাবাদী ও নীচ নৈতিকতার রাজনৈতিক নেতা নেত্রীরাও স্বাধীনতাযোদ্ধা দেরকে ভয় পায় ও হিংসা করে।এক্ষেত্রে এই উভয় রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজেদের শত্রুতা ও প্রতিযোগীতা ভূলে গিয়ে যার যার অবস্থান থেকে বাংলাদেশের জাতীয় গৌরবের মেরুদন্ড কুপিয়ে কুপিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছে,অযোগ্য নেতৃত্বগুলোকে নিরাপদ করার আশায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের  আনুষ্ঠানিক প্রথম প্রতিরোধ করে চট্টগ্রামে তৎকালীন ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেল্‌স- (ইপিআর)। বাঙালি অধিনায়ক ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম তার অধীনস্থ বাঙালি অফিসারও সৈনিকদেরকে সংগঠিত করে প্রতিরোধে বাধ্য হয়েছিলেন ঢাকায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আগ্রাসনের খবর পাওয়ার পর।নিজে ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানকে যোগাযোগ করে আওয়ামী লীগ নেতা ডাঃ জাফর উল্ল্যাহ এবং একে খানের সাথে সভা করে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু করা এবং রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের জন্যে ব্যবস্থা করেন।পরবর্তীতে মেজর পদমর্যাদায় উন্নীত মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম যুদ্ধের সেক্টর নং ১ সংগঠিত করেন এবং তার সেক্টর কমান্ডারের সফল দায়িত্ব পালন করেন।

ইপিআরের নায়েক রুহুল আমীন বীরশ্রেষ্ঠ স্বাধীনতাযুদ্ধে সর্বোচ্চ বীরত্বপূর্ণ অবদান দিয়েই নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন জেনেও ইপিআর থেকে বিডিআর হওয়া বীরত্ববহনকারী সীমান্তরক্ষাবাহিনীর নাম মুছে দিয়ে  যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে, তাকে পরাধীনতার চেতনা বলা


আমেরিকার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার আহবান আরবলীগে - আবু জাফর মাহমুদ

শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭

বিশ্বের সকল দেশে ও শক্তি মার্কিণ প্রেসিডেণ্ট ডোনাল্ড ট্রাম্ফের ঘোষণার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আমেরিকা ও ইসরাইল ছাড়া সবার সর্বসম্মতিতে ঘোষণাটার বিরোধীতা করেছে। আরব লীগের এক জরুরি বৈঠকে আমেরিকার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেবরান বাসিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে জেরুজালেম আল-কুদসকে দখলদার ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রতিবাদে তিনি এ আহ্বান জানান।৯ই ডিসেম্বর শনিবার কায়রোয় অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাসিল বলেন, “ট্রাম্পের ঘোষণার বিরুদ্ধে আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে।কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা শুরু করতে হবে, এরপর রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং তারপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে।”
 সারা বিশ্বের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার জেরুজালেম আল-কুদসকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি মার্কিন দূতাবাসকে তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তর করা হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন।এ ঘোষণার প্রতিবাদে লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এবারের এই বিপর্যয় কি আমাদেরকে (আরব সরকারগুলোকে) আমাদের ঘুম থেকে জাগাতে পারবে? জেনে রাখুন ইতিহাস কোনোদিনও আমাদের ক্ষমা করবে না এবং আমরা যা করছি তা নিয়ে আরব জাতিগুলো কোনোদিন গর্ব করতে পারবে না।”
 আরব লীগের জরুরি বৈঠকে সংস্থার মহাসচিব আহমেদ আবুল-গেইত পূর্ব জেরুজালেম আল-কুদসকে রাজধানী করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য বিশ্বের দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ট্রাম্পের এ ঘোষণা শান্তি প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওয়াশিংটনের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মার্কিন সরকারের এ সিদ্ধান্ত প্রকারান্তরে দখলদারিত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আরব লীগের জরুরি বৈঠকে সবচেয়ে নিস্ক্রিয় অবস্থান ঘোষণা করেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবায়ের। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ করেন।
বৈঠকে ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইব্রাহিম আল-জাফারি ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে ‘যুদ্ধের উস্কানি’ বলে উল্লেখ করে বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রতিহত করার জন্য আরব দেশগুলোকে সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে হবে।বৈঠকে সুদানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইব্রাহিম গান্দুর ট্রাম্পের ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানান এবং এই ঘোষণা বাস্তবায়ন রুখে দিতে মুসলিম দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
তিউনিশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খামিস আল-জাহিনাভি মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণার বিপরীতে ঐক্যবদ্ধ ও সক্রিয় ভূমিকা নেয়ার জন্য আরব দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুলকাহের মাসাহিল ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ প্রতিহত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
আরব লীগের জরুরি বৈঠকে জর্দানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান আল-সাফাদি বলেন, জেরুজালেম আল-কুদস মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরে আসবে না।
 মার্কিণ ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের সাথে সাক্ষাৎ বর্জন করছেন ফিলিস্তিন সরকার।ফিলিস্তিনের স্বশাসিত সরকারের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের সঙ্গে আসন্ন পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বর্জন করবেন বলে ঘোষণা করেছেন।স্বশাসিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াদ আল-মালিকি এ ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে জেরুজালেম শহরকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রতিবাদে মাহমুদ আব্বাস এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।


আগামী ১৯ ডিসেম্বর মাইক পেন্সের  ইসরাইল ও জর্দান নদীর পশ্চিম তীর সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। রিয়াদ আল-মালিকি বলেন, এ সফরে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ফিলিস্তিনি স্বশাসিত সরকারের কোনো ধরনের সম্পর্ক স্থাপিত হবে না।
 এদিকে মিশরের কপটিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপ দ্বিতীয় ট্যাওয়াড্রোসের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, তিনি চলতি মাসের শেষের দিকে কায়রোয় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট পেন্সের সঙ্গে পূর্ব নির্ধারিত সাক্ষাৎ বাতিল করেছেন।
মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড মুফতি আহমাদ আল-খতিবও ট্রাম্পের ঘোষণার প্রতিবাদে মাইক পেন্সের সঙ্গে পরিকল্পিত বৈঠক বাতিল করেছেন। আগামী ২০ ডিসেম্বর কায়রোয় মাইক পেন্সের সঙ্গে সঙ্গে আহমাদ আল-খতিবের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।
মুসলমানদের প্রথম ক্বেবলার শহর আল-কুদস বা জেরুজালেমকে মুসলমানরা নিজেদের তৃতীয় পবিত্রতম শহর বলে মনে করেন। এ কারণে মুসলমানদের কাছে ফিলিস্তিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এই শহরের গুরুত্ব অপরিসীম এবং তারা ট্রাম্পের ঘোষণার পর থেকেই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।  ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইহুদিবাদী ইসরাইল জেরুজালেম শহরের পূর্ব অংশ দখল করে নেয় এবং ওই অংশেই মুসলমানদের প্রথম ক্বেবলা আল-আকসা মসজিদ অবস্থিত।
 বায়তুল মুকাদ্দাস হবে ইসরাইলের কবরস্থান: জেনারেল জাফারি।ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ আলী জাফারি বলেছেন, পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস শহর ইহুদিবাদী ইসরাইলের জন্য কবরস্থানে পরিণত হবে।রাজধানী তেহরানে আইআরজিসি’র সদস্যদের এ অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন। জেনারেল জাফারি বলেন, পবিত্র আল-আকসা মসজিদ ধ্বংস করার লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বায়তুল মুকাদ্দাস শহরকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ইসরাইল ও আমেরিকা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বোকামি করেছে এবং আল্লাহর রহমতে বায়তুল মুকাদ্দাস হবে অবৈধ ইসরাইলের কবরস্থান। ইসরাইল ও আমেরিকার এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় দ্রুত রুখে দাঁড়াতে মুসলিম বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যথায় দেরি হয়ে যাবে।জেনারেল জাফারি বলেন, “আমরা জানতে পেরেছি যে, পর্দার আড়ালে কয়েকটি আরব দেশ বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে পরামর্শ, সমঝোতা ও সমন্বয় করেই ট্রাম্প এ ঘোষণা দিয়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে কয়েক মাস আগে থেকে তারা পরামর্শ করছে।” জেনারেল জাফারি বলেন, সৌদি আরব ও মার্কিন সরকারের এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে।
 ইন্তিফাদা ছাড়া ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান সম্ভব নয় বলে ঘোষণা দিয়েছেন  আয়াতুল্লাহ খাতামি।তেহরানের জুমার নামাজের অস্থায়ী খতিব আয়াতুল্লাহ আহমাদ খাতামি বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে আধিপত্যকামী শক্তির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শান্তিকামী দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তিনি আরো বলেছেন, মার্কিন সরকারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হওয়ার আগ পর্যন্ত ইরান নিজের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বাড়াতেই থাকবে।
আয়াতুল্লাহ আহমাদ খাতামি শুক্রবার তেহরানের জুমার নামাজের খুতবায় আরো বলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সঙ্গে শত্রুদের সক্ষমতার পার্থক্য রয়েছে। কারণ, শত্রুরা চায় আগ্রাসন চালাতে আর ইরানের উদ্দেশ্য আত্মরক্ষা করা। ”  
তেহরানের জুমার নামাজের খতিব বলেন, “ইহুদিবাদী ইসরাইল নামক উন্মাদ যদি কখনো ইরানে আগ্রাসন চালানোর মতো ভুল করে তাহলে তেল আবিব ও হাইফা শহরকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়ার জন্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস শহরকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রসঙ্গেও কথা বলেন আয়াতুল্লাহ আহমাদ খাতামি। তিনি বলেন, “শুধু মুসলিম বিশ্ব ট্রাম্পের এই অবিবেচনাপ্রসূত কাজের নিন্দা জানায়নি সেইসঙ্গে আমেরিকার মিত্ররাও এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। ”তিনি বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ট্রাম্পের ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু শুধু প্রতিবাদ যথেষ্ট নয় বিশ্বের সব দেশে ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতদের তলব ও ইহুদিবাদী দূতাবাস বন্ধ করে দিতে হবে। ”
তেহরানের জুমার নামাজের অস্থায়ী খতিব আরো বলেন, “ট্রাম্পের ঘোষণা প্রমাণ করেছে ইন্তিফাদা আন্দোলন ছাড়া ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। যে কেউ যেকোনো উপায়ে ইহুদিবাদী ইসরাইলের ক্ষতি করতে পারবে সেটা আল্লাহ তায়ালার দরবারে সৎকাজ হিসেবে গৃহিত হবে।”
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন ট্রাম্ফের এই ধোষণা কেউ গ্রহন করবেনা। বিরোধীদল জামাতে ইসলামি বাংলাদেশ দেশ ব্যাপী আন্দোলনের ডাক দিয়েছে।প্রভাবশালী সামাজিক শক্তি হেফাজতে ইসলাম আমেরিকান দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচী দিয়েছে। সাধারণ নাগরিকরা বিক্ষোভে নেমেছে দলমত নির্বিশেষে।
 রাশিয়া ও তুরস্কের প্রেসিডেণ্ট একতে কথা বলেছেন ফোনে।তুরস্কে শফরে চলে এসেছেন পুটিন।ইরান প্রস্তুতি রেখেছে যেকোন পরিস্থিতিতে মুসলমানদের প্রথম কেবলা রক্ষার শপথে। সৌদি প্রিন্স সালমান ফিলিস্তিনের প্রেসিডেণ্ট মাহমুদ আব্বাসকে ফোন একটা প্রস্তাব করে চিন্তায় ফেলে দিয়েছেন বলে ৪জন ফিলিস্তিন নেতা সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন। যে প্রস্তাব কার্যকর মেনে নিলে জেরুজালেম ফিলিস্তিনের রাজধানী হবেনা এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীরা কোন দিন আর দেশে ফিরতে পাএবেনা। সৌদি বলয়ের দেশ বাহরাইনের সরকার সঙ্ঘতি জানাতে ইসরাইল পৌঁছেছেন। এদেরকে মুসলমানদের বিশ্বাসঘাতক বলে দাবি করছেন ফিলিস্তিনিরা।
প্রশ্ন আসতে পারে ট্রাম্ফ এই অঘটন ঘটানোর জন্যে বর্তমান সময় কেন বেছে নিলেন? অনেকের ধারণা আমেরিকার শত্রু রাশিয়ার কাছে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা সরব্রাহের বিনিময়ে ট্রাম্ফ তার নির্বাচনে রাশিয়ার সহায়তা নিয়েছেন।যে বিষয়ে তদন্ত চলার সময় ট্রাম্ফকে দোষী প্রমানের কথা উঠছে সুনামীর গতিতে। এমতাবস্থায় ট্রাম্ফ উত্তর কোরিয়া ইস্যু দিয়ে মনোযোগ ফিরাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। তাই শেষ অস্ত্র জেরুজালেমে ফিলিস্তিন-ইজরাইল বিবাদকে যুদ্ধে জড়ানোর উস্কানী দিয়ে দুনিয়ের সকল মনোযোগ তিনি সরালেন তার নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ থেকে।
এই কৌশলের পরিণতি কি হবে এই মূহুর্তে বলা যাচ্ছেনা।তবে ফিলিস্তিন ইস্যু দুনিয়ার প্রধান ইস্যু হয়ে গেছে।ফিলিস্তিনের পক্ষে সারা দুনিয়া মতামত দিয়ে চলেছে।ট্রাম্ফের ঘোষণাকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং সাদ্গারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের লংঘন বলে হুঁশিয়ার করা অব্যাহত আছে।টড়াম্ফ তার নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ করছেন বলে দাবি করছেন
(লেখক আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান)।