Editors

Slideshows

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/605744Finding_Immigrant____SaKiL___0.jpg

কুইন্স ফ্যামিলি কোর্টে অভিবাসী

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ দ্যা ইন্টারফেইস সেন্টার অব নিউইয়র্ক ও আইনী সহায়তা সংগঠন নিউইয়র্ক এর উদ্যোগে গত ২৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ৯ See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/455188Hasina__Bangla_BimaN___SaKiL.jpg

দাবি পূরণের আশ্বাস প্রধানমন্ত্

বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ দাবি-দাওয়া বাস্তবায়নে আলোচনা না করে আন্দোলন করার জন্য পাইলটরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন। পাইলটদের আন্দোলনের কারণে ফ্লাইটসূচিতে জটিলতা দেখা দেয়ায় যাত্রীদের কাছে দুঃখ See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/701424image_Luseana___sakil___0.jpg

লুইজিয়ানায় আকাশলীনা‘র বাৎসরিক

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ লুইজিয়ানা থেকে ঃ গত ৩০শে অক্টোবর শনিবার সনধ্যায় লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির ইণ্টারন্যাশনাল কালচারাল সেণ্টারে উদযাপিত হলো আকাশলীনা-র বাৎসরিক বাংলা সাহিত্য ও See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/156699hansen_Clac__.jpg

ইতিহাসের নায়ক মিশিগান থেকে বিজ

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ ইতিহাস সৃষ্টিকারী নির্বাচনে ডেমক্র্যাটরা হাউজের আধিপত্য ধরে রাখতে সক্ষম হলো না। সিনেটে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুন্ন রাখতে সক্ষম হলেও আসন হারিয়েছে কয়েকটি। See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/266829B_N_P___NY___SaKil.jpg

বিএনপি চেয়ারপারসনের অফিসে পুলি

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ নভেম্বর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটস্থ আলাউদ্দিন রেষ্টুরেন্টের সামনে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি তাৎক্ষণিক এক বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। এই See details

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

বার হাত কাকরের তের হাত বিচি - মেজর (অব.) মো. আখতারুজ্জামান

রবিবার, ২৬ জুলাই ২০১৫

২৫ ও ২৬ জুলাই ২০১৫ ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ২৮তম সম্মেলন হচ্ছে। আমি আমার ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে ছাত্রলীগের সকল নেতাকর্মীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাছি। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষই বিশ্বাস করে এই দেশের রাজনীতির এবং রাজনৈতিক নেতাদের গুণগত মান প্রতিষ্ঠিত হয় ছাত্র সংগঠনের মান ও চারিত্রিক গুণাবলীর ওপর। মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীসহ অনেক মাননীয় মন্ত্রীর রাজনীতির হাতেখড়ি এই ছাত্রলীগের মাধ্যমে। এছাড়াও অন্য দলের অনেক মন্ত্রী মিনিস্টার ও রাজনৈতিক বিজ্ঞ নেতাদেরও রাজনীতি শুরুও কিন্তু ছাত্রলীগ থেকেই

এছাড়াও বামঘেঁষা ছাত্র সংগঠন, স্বাধীনতা উত্তর জাসদভিত্তিক এবং ৮০র দশকের পরে জাতীয়তাবাদী ছাত্র সংগঠন থেকে অনেক রাজনৈতিক নেতার জন্ম হয়েছে। ছাত্র রাজনীতি নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও আমার ব্যক্তিগত অভিমত ছাত্র রাজনীতির ভালো কোনো বিকল্প এখনও আমরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সৃষ্টি করতে পারিনি এবং চেষ্টাও করিনি। ক্ষমতায় গেলে সবাই বিপক্ষ ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে বড় বড় বুলি আওড়াই, কিন্তু নিজেদের ছাত্র সংগঠনের কার্যকলাপ নিয়ে কোনো রা করি না বরং ছাত্রদের আরও উসকিয়ে দিই।

যানজটে পিষ্ট এবং ঈদ ফেরত মানুষদের নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে ঘরে ফেরার পথে মরার উপরে খারার ঘা সম্মেলনের নামে সারা দেশের ছাত্রদের ঢাকায় এনে সদাশয় সরকার জনগণকে কী মেসেজ দিতে চাচ্ছে তা জনগণ ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারছে না। ভাব সাব দেখে মনে হচ্ছে এখন ছাত্রলীগ কারা করে তা সম্ভবত সরকার বাহাদুর জানে না। তবে বর্তমান ছাত্রলীগ কী এবং তারা কোন রাজনীতিতে বিশ্বাস করে তার জ্বলন্ত উদাহরণ তারা ইতিমধ্যেই জাতির সামনে তুলে ধরেছে। তারা যে দলের চেইন অব কমান্ড মানে না তা কিন্তু দিবালোকের মতো স্পষ্ট করে দিয়েছে।

বার হাত কাকরের তের হাত বিচি। ১১০টি জেলা ইউনিট নিয়ে গঠিত ছাত্রলীগের এবারের সম্মেলনে সভাপতি পদে ৬৪ জন এবং সাধারন সম্পাদক পদে ১৪২ জন প্রার্থী হয়েছে। সরকারি দলের অনেক প্রভাবশালী কোনো প্রকার নির্বাচন ছাড়া নেতা নির্ধারণ করে দিতে চাচ্ছেন। আর এতো প্রার্থীর মধ্যে নির্বাচন করেই বা কী হবে। দেড় ইউনিটের ভোট পেয়ে সভাপতি এবং পৌনে এক ইউনিটের ভোট পেয়ে সাধারণ সম্পাদক হবে। নির্বাচনের কী মাহাত্ম তা জাতিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আমার ছাত্রলীগের সন্তানেরা। তাই তারা গো ধরেছে নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্রলীগের নেতা নির্বাচিত করতে হবে।

গত  বছরের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে সরকার বাহাদুর জাতিকে দেখিয়েছে নির্বাচনে প্রার্থী না থাকলেও এবং নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হলেও বৈধ হয় এবং এবার ছাত্রলীগের সম্মেলনের মাধ্যমে দেখাতে যাচ্ছে ১১০টি জেলা ছাত্রলীগের ভোটে ১.৫% ভোট পেয়েও সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে অবজ্ঞা করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হওয়া যায়। এভাবে যারা সংগঠনের নেতা হয়ে তারা দেশ ও জাতির কী উপকারে আসবে তা নিয়ে জনগণ সঙ্গত কারণেই উৎকণ্ঠিত। ৬৪ জন সভাপতি ও ১৪২ জন সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী প্রকাশ্যভাবে বলে দিল তারা কাউকে মানে না। তারা তাদের সঙ্গের সাথীদেরও মানে না, অনৈক্য তাদের নিজেদের মধ্যে, প্রকাশ্যে প্রার্থীর ঘোষণা দিয়ে আবার নির্বাচনের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের দাবি দিয়ে তারা প্রমাণ করে দিল তারা কারো নয়। তারা কারো কথা শুনে না। তারা নিজেরাই রাজা তাদের নিজ রাজত্যে। ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন যদি তাদের দাবি মতো নির্বাচন দেয়া হয় সে নির্বাচন যে জনগণের কাছে হাস্য রসিকতার খোরাক হবে তাতে যেমন সন্দেহ নাই। তেমনি কোনো নেতা-নেত্রী যদি তার ক্ষমতাবলে নেতা নির্ধারণ করে দেন তাহলে আগামীদিনে এই নতুন কমিটির সকল বিরূপ ও অসন্তোষের দায়ভার তার কাঁধে নিতে হবে।

এই ৬৪ ও ১৪২ রা আগামী দিনে সরকারের কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে। এই ৬৪ ও ১৪২এর প্রভাবে কেউ কাজ করতে পারবে না, তারা নিজেরাও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে না এবং তারা কেউ কাউকে মানবেও না। তাদেরকে বাদ দিয়েও কেন্দ্রীয় কমিটি করা যাবে। সরকারকে এই ৬৪ ও ১৪২ উভয় সংকটে ফেলে দিয়েছে বলেই জনগণের ধারণা। তাই জনগণ শংকিত, ভীত। এবারের ছাত্রলীগের সম্মেলন জনমনে যে ভীতির সঞ্চার করেছে তার আলামত অচিরেই দেখা যাবে বলে জনবিশ্বাস। তবে এই ব্যাপারে সরকার ও সরকার প্রধান সজাগ থাকবেন তা জনগণের প্রত্যাশা।


পাখির নাম কালাঘাড় রাজন - আলম শাইন

শনিবার, ২৫ জুলাই ২০১৫

রাজধানীতে বেওয়ারিশ কুকুর পেটানোর দায়ে আদালত শাস্তি দিয়েছেন কয়েকজন যুবককে। নি:সন্দেহে এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক সাজা। এমন একটি দৃষ্টান্তমূলক সাজা আমরা প্রত্যশা করছি শিশু রাজন হত্যার প্রত্যক্ষদর্শীদের। আর হ্যাঁ, অবশ্যই শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যাকারীদের ফাঁসি প্রত্যশা করছি আমরা। প্রিয় পাঠক, বন্যপ্রাণী নিয়ে লিখে যাচ্ছি, আর মানুষ নিয়ে লিখবো না তা কি হয়! আগে মানুষ, তারপরেই তো বন্যপ্রাণী। কেন জানি আজ লিখতে ইচ্ছে করছে না শিশু রাজনের ওপর নির্যাতনের ভিডিও চিত্রটা দেখে। অসহ্য সে অনুভূতি জানানোর মতো নয়। লিখতে হচ্ছে তথাপিও ‘দৈনিক মানবকন্ঠ’ পত্রিকার প্রকৃতি সিরিজের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে। বর্বর পশুদের নির্যাতনের শিকারে প্রাণ হারিয়েছে সিলেটের সামিউল আলম রাজন, ঘটনার সমবেদনা জানিয়ে আজকের লেখার বিষয়  হিসাবে বেচে নিয়েছি ‘কালাঘাড় রাজন’ পাখি।
Bird A Shinস্বভাবে চঞ্চল হলেও অনিষ্টকারী নয় প্রজাতিটি। পারতপক্ষে স্বজাতি বা অন্য প্রজাতির কারো ক্ষতি করে না। অধিকাংশ সময় জোড়ায় কিংবা ছোট দলে বিচরণ করে। মাঝেমধ্যে একাকিও দেখা যায়। শীত মৌসুমে সমতলের ঝোপ-জঙ্গলে বেশি দেখা যায়। ‘চুইচ চুইচ চুউ’ সুরে ডেকে ছুটে বেড়ায় তখন। এমতাবস্থায় ভালোমতো ওদের গতরটা দেখারও উপায় থাকে না অনেক সময়। তার ওপর মানুষ দেখলে তো আর কথাই নাই। পালিয়ে বেড়ায়। কোথাও খানিকটা দাঁড়াবার সময় নেই এদের। বড়ই ব্যস্ত যেন এরা। আমদের দেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এদের দেখা যায়। দেখতে ভীষণ সুন্দর। বলা যায় চেহারাটা নজরকাড়া। মায়াবীও বটে। এদের প্রতি নজর পড়লে নিমেষেই চোখ ফিরিয়ে নেয়া যায় না। সুচিকন গড়নের তনুতে নীলের দ্যুতি ঢেউ খেলে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় বুঝি ওদের শরীরে কেউ নীল মিশানো জল ঢেলে দিয়েছে।
পাখিটার বাংলা নাম :‘কালাঘাড় রাজন’  ইংরেজী নাম :‘ব্ল্যাক নেপড মোনার্ক,’Õ(Black-naped monarch) বৈজ্ঞানিক নাম: Hypothymis azurea। এরা ‘কালো গ্রীবা পতঙ্গভূক’ নামেও পরিচিত। অনেকে ডাকে ‘কালোঘাড় নীলাকটকটিয়া’ নামেও।
দৈর্ঘ্য কমবেশি ১৬ সেন্টিমিটার। ঘাড়ে কালো প্যাঁচ। গলার নিচে সরু চিলতে কালো রেখা। পুরুষপাখির প্রধান রঙ লালচে নীল। তবে নীলের আধিক্য বেশি থাকাতে লালচে ভাবটা খুব একটা দেখা যায় না। বুক নীল। নীলটা ফ্যাকাসে হয়ে তলপটে পর্যন্ত সাদাটে হয়ে পৌঁছেছে। চোখ কালো। ঠোঁট নীল-কালো। পা ও পায়ের অঙ্গুল নীলচে কালো। পুরুষ-স্ত্রী পাখির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্ত্রী পাখির বর্ণ পুরুষের তুলনায় নিস্প্রভ। তা ছাড়া গলায় কালো রেখাটি দেখা যায় না।  
প্রধান খাবার পতঙ্গ। উড়ন্ত অবস্থায় পতঙ্গ শিকার করে।
প্রজনন সময় মার্চ থেকে আগষ্ট। গাছের তে-ডালায় পেয়ালা আকৃতির মজবুত বাসা বানিয়ে ৩টি ডিম পাড়ে। ডিম ফোটতে সময় লাগে ১২-১৪ দিন।
লেখক: আলম শাইন, কথাসাহিত্যিক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ। এই ইমেইল ঠিকানা স্পামবট থেকে রক্ষা করা হচ্ছে।এটি দেখতে হলে আপনাকে JavaScript সক্রিয় করতে হবে।


নিউইয়র্কের ঘটনা এবং আমার ‘বন্ধুদের’ রটনা - আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০১৫

চলতি মাসের গোড়ায় নিউইয়র্কে গিয়েছিলাম। বাংলাদেশের ওপর একটা ডকুমেন্টারি ছবি করছি। তাতে কয়েকজন মার্কিন নেতার ইন্টারভিউ রেকর্ড করার ইচ্ছা নিয়েই আমার এই আটলান্টিক পাড়ি দেয়া। আমি নিউইয়র্কে যাচ্ছি জেনে সেখানে বাংলাদেশ মিশনের প্রধান আবুল মোমেন আমাকে অনুরোধ জানালেন, আমি যেন তাদের মিশনে আয়োজিত এক সভায় একটি বক্তৃতা দেই। এটি একাডেমিক আলোচনা সভা। প্রতিবছরই একটি বক্তৃতা দেয়া হয়। বিষয় ‘বাংলাদেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত।’ আমি সানন্দে তার অনুরোধে রাজি হয়েছি।
তেসরা জুলাই শুক্রবার সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গিয়ে দেখি এটি সাধারণ জনসভা নয়। নিউইয়র্কের শিক্ষিত ও বিশিষ্ট বাংলাদেশীদের উপস্থিতিতে একটি আলোচনা সভা। সেখানে মন খুলে কথা বলতে পারব ভেবে আনন্দিত হই। আমার এক ঘণ্টার বক্তৃতায় বাংলাদেশের অতীত নিয়ে আলোচনা করেছি। বাঙালী জাতীয়তা, তার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভিত্তি হিসেবে বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক ভূমিকা বিশ্লেষণ করেছি। প্রাচীনকালে উচ্চবর্ণের হিন্দু শাসকেরা বাংলা ভাষাকে ধ্বংস করার জন্য একে ‘রৌরব নরকের ভাষা’ আখ্যা দিয়েছিলেন। বেদ বা কোন ধর্মগ্রন্থ বাংলায় পড়া হলে পাঠককে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার বিধান দেয়া হয়েছিল। বাংলা ভাষাকে রক্ষার জন্য বাংলায় রচিত গ্রন্থ নিয়ে তখনকার বাংলাভাষী বৌদ্ধরা নেপালে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তারই একটি গ্রন্থ চর্য্যাচর্য্য বিনিশ্চয়।
হোসেন শাহী আমলে বাংলা ভাষা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পায়। ফার্সি সাহিত্যের প্রভাবে বাংলা সাহিত্যেও প্রেম-প্রণয়মূলক পুঁথি রচিত হয়। বাংলায় রামায়ণ-মহাভারত অনূদিত হয়। ইংরেজ আমলে খ্রিস্টান মিশনারিরা ক্রিশ্চান ধর্ম প্রচারের জন্য বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করে ভাষার উন্নতি ঘটায়। পাকিস্তান আমলে আবার বাংলা ভাষার ওপর হামলা শুরু হয়। বাংলা ভাষাকে হিঁদুয়ানি ভাষা এবং বাংলা সংস্কৃতিকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়। এরই প্রতিবাদে লোকায়ত বাঙালী জাতীয়তার নবজাগরণ। এই জাগরণের ভিত্তিতে বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা অর্জন।
ভাষা-জাতীয়তা সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে আমি বলেছি, ভাষার কোন ধর্মীয় পরিচয় নেই। ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবী ভাষা অমুসলিমদের ভাষা ছিল। সেই ভাষাতেই কোরান নাজেল হয়েছে এবং ইসলাম প্রচারিত হয়েছে। আল্লাহর বহু গুণবাচক নাম আরবী ভাষা থেকেই সংগৃহীত এবং আগে তা কাবার দেবতাদের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দেবতাদের মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলার পর এই নাম শুধু আল্লাহর গুণবাচক নাম হয়ে দাঁড়ায়। ধর্মের অবমাননা করার জন্য আমি একথা বলিনি। ভাষার বিবর্তন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছি। আমার এই বক্তব্যের কোন প্রতিবাদ নিউইয়র্কের সভাগৃহে হয়নি। আমি যদি ভুল বলে থাকি, তাহলে নিশ্চয়ই আমার বক্তব্য কেউ খ-ন করতে পারেন এবং আমিও ভুল শোধরাতে পারি। কিন্তু এই বক্তব্য দ্বারা আমি কি করে মুরতাদ, কাফের হয়ে গেলাম, তা এখনও বুঝে উঠতে পারিনি।
যাহোক, আমার নিউইয়র্কের বক্তব্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করতে চাই না। আমার শুভাকাক্সক্ষীরা বলেছেন, আপনি নিউইয়র্কের বক্তব্যের যে ব্যাখ্যা দু’দিন পরেই দিয়েছেন, সেটাই যথেষ্ট। তার পুনরুক্তি নিষ্প্রয়োজন। আমারও তাই মনে হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে অসত্য প্রচারণার প্রতিবাদে নিউইয়র্কের ড. নুরুন্নবী, সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লা, ফাহিম রেজা নূর, হাসান আবদুল্লাহ, শহীদ কাদরি প্রমুখ ৩৮ জন বুদ্ধিজীবী একটি যুক্ত বিবৃতি দিয়েছেন। ঢাকায় ড. মুনতাসীর মামুন ‘জনকণ্ঠে’ সিরিজ আর্টিকেল লিখে মৌলবাদীদের মিথ্যা প্রচারের দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছেন। শাহরিয়ার কবির তথ্যসমৃদ্ধ নিবন্ধ লিখেছেন। কানাডা থেকে ইসলামী শাস্ত্রবিশেষজ্ঞ হাসান মাহমুদ তার নিবন্ধে আমার বক্তব্য যে অসত্য ও ধর্মবিরোধী নয়, তা জোরাল তথ্যপ্রমাণ দিয়ে উত্থাপন করেছেন। আরও অনেকে আমাকে সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় লিখেছেন। লন্ডনে সুজাত মাহমুদসহ বিশিষ্ট তরুণ বুদ্ধিজীবীরা আমার সমর্থনে কলম ধরেছেন। ঢাকায় গণজাগরণ মঞ্চ আমার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। এদের সাহসী ভূমিকাকে আমি অভিনন্দন জানাই। তাই নিউইয়র্ক-বক্তব্যের নিজে আর কোন বিশ্লেষণ দিতে চাই না।
তবে নিউইয়র্কে কি ঘটেছে তার একটা বিবরণ আমার কাছে অনেকেই জানতে চেয়েছেন। নিউইয়র্ক, ঢাকা এবং লন্ডনের বিএনপি ও জামায়াতপন্থী কয়েকটি কাগজ এ সম্পর্কে যে অসত্য ও বানোয়াট কাহিনী অতিরঞ্জিত করে প্রচার করেছে, তাতে এদের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বুঝতে আমার দেরি হয়নি। নিউইয়র্কের অধিকাংশ বাংলা মিডিয়াই জামায়াতিদের কব্জায়। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী মীর কাশিমের অর্থে একটি টেলিভিশন ও বাংলা সাপ্তাহিক পরিচালিত হয়।
নিউইয়র্কের একটি বাংলা সাপ্তাহিকের ভূমিকা রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক। বিদেশে বাস করে অনবরত দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে অবমাননামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের উচিত এই ধরনের পত্রিকার অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা যাতে জনগণের মন বিষাক্ত না করে সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা। নিউইয়র্কের এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি একবার প্রথম পৃষ্ঠায় ব্যানার হেডিংয়ে খবর ছেপেছে, ‘ঢাকার রাজপথে ভারতের সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে।’ ঢাকায় একাত্তরের এক যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ার সময় খবরের হেডিং দিয়েছে ‘ঢাকায় ফাঁসির মহোৎসব।’ আমার নিউইয়র্ক বক্তব্যের শুধু বিকৃতি সাধন করেই এই পত্রিকাটি ক্ষান্ত হয়নি। আমি রাষ্ট্রীয় অর্থে মার্কিন মুল্লুকে গিয়েছি, আমার বক্তব্যের জন্য নিউইয়র্কের বাংলাদেশ মিশনের প্রধান আবুল মোমেন সাহেবও দায়ী এবং অবিলম্বে তার অপসারণ দরকার ইত্যাদি অসত্য ও উদ্দেশ্যমূলক প্রচার চালাতেও এই পত্রিকাটি দ্বিধা করেনি।
ঢাকা-নিউইয়র্ক-লন্ডনের জামায়াত ও বিএনপিপন্থী এবং তাদের অর্থে পরিচালিত মিডিয়াগুলোর মধ্যে একটা লিঙ্ক আছে। সব শিয়ালের এক রা’র মতো এরা একই সুরে প্রচারণা চালায়। আমার বিরুদ্ধে প্রচারণার সময় অশ্লীল মন্তব্য জুড়তেও এরা দ্বিধা করেনি। ইসলাম রক্ষার নামে এই পত্র-পত্রিকাগুলো সাংবাদিকতাকে কতটা নিচু স্তরে নামাতে পারে, এবারেও তার প্রমাণ তারা দিয়েছে। আমি নিউইয়র্কে বক্তৃতা দিয়েছি ৩ জুলাই শুক্রবার। শনিবারেই শুনতে পাই ঢাকায় একটি দৈনিকে আমার বক্তব্যকে কাটছাঁট করে এমনভাবে প্রচার করা হয়েছে যাতে মনে হতে পারে আমি আল্লা, রসূল এবং ইসলাম ধর্মের চরম অবমাননা করেছি।
এভাবে এবং ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এরা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চায়। সরল ধর্মপ্রাণ মানুষকে এরা মিথ্যা প্রচারণা দ্বারা উত্তেজিত করে এবং তাদের অনেকের মনে খুনের নেশা জাগিয়ে দেয়। আজ একথা প্রমাণিত যে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর উস্কানিমূলক ফতোয়ার জন্যই হুমায়ুন আজাদের প্রাণনাশের জন্য নৃশংস চাপাতি হামলা চালানো হয়েছিল। কবি শামসুর রাহমানকেও মুরতাদ আখ্যা দিয়ে তাঁর বাড়িতে ঢুকে হামলা চালানো হয়েছিল। তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান।
আমার ধারণা, আমার নিউইয়র্ক-বক্তৃতার বিকৃতি ঘটিয়ে এবং বিকৃত ব্যাখ্যা প্রচার করে উগ্রপন্থী জামায়াতি মৌলবাদীরা চেয়েছিল কিছু সরলপ্রাণ মুসলমানকে উত্তেজিত করে আমাকেও হত্যা করার প্ররোচনা দিতে। তাদের এই উস্কানি সফল হলে আমার ওপর দৈহিক হামলা হতে পারতো। এখনও হতে পারে না তা নয়। আমার ওপর হামলা চালানোর জন্য নিউইয়র্কের দুটি সাপ্তাহিক, লন্ডনের দুটি এবং ঢাকায় তিনটি জামায়াত ও বিএনপিপন্থী দৈনিক অনবরত ধর্মপ্রাণ মানুষকে উস্কানি দেয়ার মতো রঞ্জিত অতিরঞ্জিত খবর ছেপেছে। মসজিদের ইমাম সাহেবদের কাছে গিয়ে আমার বক্তব্য বিকৃতভাবে শুনিয়ে তাদের কাছ থেকেও আমার বিরুদ্ধে ফতোয়া বের করে তা ফলাও করে প্রচার করেছে। এক শ্রেণীর ইমাম ও খতিবও আমার বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে না জেনে এবং অভিযুক্ত হিসেবে আমার কাছ থেকে কোন ব্যাখ্যা দাবি না করেই কাগুজে খবর শুনেই মুরতাদ ও কাফের বলে ফতোয়া দিয়েছেন। তার ফলে যে একজন মুসলমানের জীবন বিপন্ন হতে পারে, সেই বিবেচনা তাদের মাথায় ঢোকেনি। তারা সিরিয়ার আইসিসের মতো মুসলমান হয়ে মুসলমানের কল্লাকাটার অভিযানে মদদ জোগাতে চান কিনা আমি জানি না। আইসিস চালাচ্ছে অস্ত্র দিয়ে হত্যা অভিযান। এদের অনুসারীরা বাংলাদেশে একই হত্যাভিযান চালাতে চায় প্রচারণা ও ফতোয়ার দ্বারা।
আল্লার অপার মহিমা। আমি যে আল্লার অবমাননা করেছি বলে এই ধর্ম-ব্যবসায়ীরা প্রচারণা চালাচ্ছেন, সেই আল্লাই আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেছেন। ঢাকা-লন্ডন-নিউইয়র্কে একযোগে প্রচারণা চালিয়ে, ফতোয়াবাজি করেও এরা ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলমানকে আমার বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে পারেনি। আমেরিকায় তারা আমার একটি সভাও প- করতে পারেনি। অথচ জোর প্রচারণা চালিয়েছে, আমার সভা প- করেছে এবং জুতো হাতে বিক্ষোভকারীদের সাজানো ছবি প্রকাশ করেছে। কোন প্রকৃত সাংবাদিক ও সংবাদপত্র এই ধরনের মিথ্যা প্রচার করতে পারে না।
নিউইয়র্কে আমার সভায় এসে জামায়াত ও বিএনপিপন্থীরা কোন প্রশ্ন করতে চাইলে আমি তার উত্তর দানে প্রস্তুত ছিলাম। প্রশ্ন করার মতো জ্ঞানবুদ্ধি তাদের ছিল না। তাই তারা চেয়েছিল সভায় এসে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধাতে। কিন্তু সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও উত্তেজিত করে সভায় আনতে না পেরে তারা সভা যাতে না হতে পারে তার জন্য অন্য কৌশল গ্রহণ করে। নিউইয়র্কের তাজমহল হোটেলে একটি সভা অনুষ্ঠানের কথা ছিল। হোটেলের মালিককে ভয় দেখানো হয়, তার হোটেলে সভা হলে ভাঙচুর হবে। তিনি ভয় পেয়ে হোটেলে সভা করার অনুমতি বাতিল করে দেন।
এরপর সভার উদ্যোক্তারা শহরের জুইস সেন্টারে সভাটি করার আয়োজন করেন। সেখানেও একই কৌশল গ্রহণ করা হয়। টেলিফোনে জুইস সেন্টার ভেঙে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। সেন্টার কর্তৃপক্ষও সভা করার অনুমতি বাতিল করেন। এই দুই স্থানের সভাতেই জামায়াত-বিএনপির হুমকি অগ্রাহ্য করে যেতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু সভার উদ্যোক্তারা সভা বাতিল করেছেন জানানোর ফলে আর যাইনি। আমি যখন জুইস সেন্টারের ধারে কাছেও নেই, বরং ম্যানহাটনের এক বাড়িতে বসে আড্ডা দিচ্ছি, তখন জুইস সেন্টারের সামনে জনাত্রিশেক জামায়াতিকে হাতে জুতো ধরিয়ে দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে বলা হয়। সেই সাজানো বিক্ষোভের ছবি একশ্রেণীর পত্র-পত্রিকায় বড় করে ছাপিয়ে তার ক্যাপশন দেয়া হয়েছে, ‘গণবিক্ষোভের মুখে গাফ্ফার চৌধুরীর জনসভা প-।’ মুখে ইসলাম কিন্তু কাজে ক্যামেরার অসৎ কারসাজিÑ এটাই হচ্ছে বিএনপি-জামায়াতপন্থী কাগজগুলোর সাংবাদিকতার স্ট্যান্ডার্ড!
তবে বোস্টনে আয়োজিত আমার সভায় শ্রোতা সেজে কিছু জামায়াতি ঢুকেছিল। মজার কথা, আমার বক্তৃতার সময় তারা কোন গ-গোল করেনি। কেবল বক্তৃতা শেষ হলে আমাকে কিছু প্রশ্ন করতে চেয়েছে। আমি নিউইয়র্কের সভায় কেন বলেছি ‘আমি আগে বাঙালী, তারপর মুসলমান (জামায়াতিরা প্রচার করেছে আমি নাকি বলেছি, আমি মুসলমানত্ব ছাড়তে পারি, বাঙালিত্ব ছাড়তে পারি না)। এর জবাবে রসুলুল্লাহ (দ) যে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলতেন, ‘মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল আরাবী, আল মাক্কি’ আমি একথা বলতেই তারা নিশ্চুপ হয়ে যায় এবং হঠাৎ প্রশ্ন করার বদলে হাঙ্গামা শুরু করার চেষ্টা চালায়।
মজার কথা এই যে, সভার পুরুষ শ্রোতারা নন, কয়েকজন মহিলা শ্রোতা তাদের প্রতি আঙুল দেখিয়ে তালেবান, তালেবান বলে চিৎকার শুরু করলে তারা পালাতে শুরু করে। উগ্রমূর্তিধারণকারী দু’একজনকে পুলিশ বের করে দেয়। তাদের ভেতরের দু’চারজন সভায় থেকে যান এবং পুলিশকে জানায়, একজন কাফের এখানে সভা করছেন এবং তাকে বাধা দিতে হবে এই কথা বলে জামায়াতিরা তাদের এই সভায় ডেকে নিয়ে এসেছে। কিন্তু তারা এসে দেখছেন, সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা বলে তাদের এখানে ডেকে আনা হয়েছে। তারা এজন্য দুঃখিত।
আমি নিউইয়র্ক ছেড়েছি ১৪ জুলাই। তার আগে তাজমহল হোটেলে ও জুইস সেন্টারে যে সভাটি হতে পারেনি সেটি অনুষ্ঠিত হয় জেএফ কেনেডি এয়ারপোর্ট সংলগ্ন ক্রাউন প্লাজা হোটেলে। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক এবং প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলোর উদ্যোগে এই সভা হয়। নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির বহু বিশিষ্ট বাঙালী এই সভায় এসেছিলেন। এই সভাতেও আমি বর্তমান যুগে মুক্তচিন্তার বিরোধী ধর্মান্ধদের দ্বারা ধর্মের দুর্বৃত্তায়নের ইতিহাসটি তুলে ধরেছি। বলেছি, কবি কাজী নজরুল ইসলামকে কাফের আখ্যা দেয়ার পর তিনি লিখেছিলেন, ফতোয়া দিলাম কাফের কাজীও, যদিও শহীদ হইতে রাজিও।’ আমি সে কথা বলি না; আমি শুধু বলি এই অসৎ, ঘাতক ধর্মব্যবসায়ীদের দিন শেষ হয়ে এসেছে। এরা জনগণের শত্রু এবং ধর্মেরও শত্রু। মধ্যপ্রাচ্যে যে আত্মঘাতী বর্বরতা তারা শুরু করেছে, তা-ই তাদের চূড়ান্ত পতন ও পরাজয় ডেকে আনবে।
‘দানবের মূঢ় অপব্যয়
গ্রন্থিতে পারে না কভু ইতিহাসে শাশ্বত অধ্যায়।’


পাখির নাম কালাঘাড় রাজন - আলম শাইন

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০১৫

রাজধানীতে বেওয়ারিশ কুকুর পেটানোর দায়ে আদালত শাস্তি দিয়েছেন কয়েকজন যুবককে। নি:সন্দেহে এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক সাজা। এমন একটি দৃষ্টান্তমূলক সাজা আমরা প্রত্যশা করছি শিশু রাজন হত্যার প্রত্যক্ষদর্শীদের। আর হ্যাঁ, অবশ্যই শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যাকারীদের ফাঁসি প্রত্যশা করছি আমরা। প্রিয় পাঠক, বন্যপ্রাণী নিয়ে লিখে যাচ্ছি, আর মানুষ নিয়ে লিখবো না তা কি হয়! আগে মানুষ, তারপরেই তো বন্যপ্রাণী। কেন জানি আজ লিখতে ইচ্ছে করছে না শিশু রাজনের ওপর নির্যাতনের ভিডিও চিত্রটা দেখে। অসহ্য সে অনুভূতি জানানোর মতো নয়। লিখতে হচ্ছে তথাপিও ‘দৈনিক মানবকন্ঠ’ পত্রিকার প্রকৃতি সিরিজের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে। বর্বর পশুদের নির্যাতনের শিকারে প্রাণ হারিয়েছে সিলেটের সামিউল আলম রাজন, ঘটনার সমবেদনা জানিয়ে আজকের লেখার বিষয়  হিসাবে বেচে নিয়েছি ‘কালাঘাড় রাজন’ পাখি।
স্বভাবে চঞ্চল হলেও অনিষ্টকারী নয় প্রজাতিটি। পারতপক্ষে স্বজাতি বা অন্য প্রজাতির কারো ক্ষতি করে না। অধিকাংশ সময় জোড়ায় কিংবা ছোট দলে বিচরণ করে। মাঝেমধ্যে একাকিও দেখা যায়। শীত মৌসুমে সমতলের ঝোপ-জঙ্গলে বেশি দেখা যায়। ‘চুইচ চুইচ চুউ’ সুরে ডেকে ছুটে বেড়ায় তখন। এমতাবস্থায় ভালোমতো ওদের গতরটা দেখারও উপায় থাকে না অনেক সময়। তার ওপর মানুষ দেখলে তো আর কথাই নাই। পালিয়ে বেড়ায়। কোথাও খানিকটা দাঁড়াবার সময় নেই এদের। বড়ই ব্যস্ত যেন এরা। আমদের দেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এদের দেখা যায়। দেখতে ভীষণ সুন্দর। বলা যায় চেহারাটা নজরকাড়া। মায়াবীও বটে। এদের প্রতি নজর পড়লে নিমেষেই চোখ ফিরিয়ে নেয়া যায় না। সুচিকন গড়নের তনুতে নীলের দ্যুতি ঢেউ খেলে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় বুঝি ওদের শরীরে কেউ নীল মিশানো জল ঢেলে দিয়েছে।
পাখিটার বাংলা নাম :‘কালাঘাড় রাজন’  ইংরেজী নাম :‘ব্ল্যাক নেপড মোনার্ক,’(ইষধপশ-হধঢ়বফ সড়হধৎপয) বৈজ্ঞানিক নাম: ঐুঢ়ড়ঃযুসরং ধুঁৎবধ। এরা ‘কালো গ্রীবা পতঙ্গভূক’ নামেও পরিচিত। অনেকে ডাকে ‘কালোঘাড় নীলাকটকটিয়া’ নামেও।
দৈর্ঘ্য কমবেশি ১৬ সেন্টিমিটার। ঘাড়ে কালো প্যাঁচ। গলার নিচে সরু চিলতে কালো রেখা। পুরুষপাখির প্রধান রঙ লালচে নীল। তবে নীলের আধিক্য বেশি থাকাতে লালচে ভাবটা খুব একটা দেখা যায় না। বুক নীল। নীলটা ফ্যাকাসে হয়ে তলপটে পর্যন্ত সাদাটে হয়ে পৌঁছেছে। চোখ কালো। ঠোঁট নীল-কালো। পা ও পায়ের অঙ্গুল নীলচে কালো। পুরুষ-স্ত্রী পাখির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্ত্রী পাখির বর্ণ পুরুষের তুলনায় নিস্প্রভ। তা ছাড়া গলায় কালো রেখাটি দেখা যায় না।  
প্রধান খাবার পতঙ্গ। উড়ন্ত অবস্থায় পতঙ্গ শিকার করে।
প্রজনন সময় মার্চ থেকে আগষ্ট। গাছের তে-ডালায় পেয়ালা আকৃতির মজবুত বাসা বানিয়ে ৩টি ডিম পাড়ে। ডিম ফোটতে সময় লাগে ১২-১৪ দিন।
লেখক: আলম শাইন, কথাসাহিত্যিক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।


বাংলাদেশের ১ম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের জন্মদিনঃ একটি বিশেষ লেখা

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০১৫

শারমিন আহমদঃ ১৯৬৬ বা ১৯৬৭ সালের কথা। ময়মনসিংহ কারাগার থেকে রাজবন্দি তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর স্ত্রীকে লিখেছিলেন, ‘সাধারণ, অসাধারণ, ছোট, বড় কোনো অভিজ্ঞতাই ফেলে দেবার নয়। সব অভিজ্ঞতাই জীবনের বিভিন্ন ফুলে গাঁথা মালা। জীবনের অমূল্য সঞ্চয়।’

হাসিকান্না, সাফল্য, ব্যর্থতা, সাধারণ, অসাধারণ এমনি সব ঘটনায় গড়া অতীতের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করলে মনে হয়, সত্যিই জীবনে সব ধরনের অভিজ্ঞতারই প্রয়োজন রয়েছে। জীবনের প্রতিটি ঘটনাই জীবনের এক একটি রত্নস্বরূপ। তারা যেন কোনো এক অদৃশ্য সুতায় গাঁথা বাহারি ফুলের সমাহার; জীবনের পরবর্তী ধাপে উত্তরণের পথনির্দেশক, যেন এক অনুপম, অপার্থিব সত্ত্বা!

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ 

আমি আজ এমনি কিছু স্মৃতিচারণা করব। ১৯৬৯ সালের একটি স্মৃতি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবে মুক্তি পেয়েছেন। তিনি পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং আমার বাবা তাজউদ্দীন আহমদ সে সময় সাধারণ সম্পাদক। তাঁরা সে সময়গুলোতে সব সময়ই পরস্পরের বাড়িতে যাতায়াত করতেন। দলীয় ও দেশ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন। একত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। সেদিনও তিনি এলেন। ৭৫১ সাতমসজিদ রোডে অবস্থিত আমাদের ধানমণ্ডির বাড়িটিতে। সে সময় পড়ন্ত বিকেল। প্রবেশদ্বারের দেয়ালটি মাধবীলতায় ছাওয়া। আমি ও আমার ছোটবোন রিমি বাড়ির ভেতরে ঢোকার পথটিতে দাঁড়িয়ে একমনে স্কিপিং করছি। স্কিপিং করতে করতেই হঠাৎ চোখ পড়ল ওনার দিকে। উনি দাঁড়িয়ে এই দুই বালিকার খেলা দেখছেন। ঠোঁটে কৌতুকমাখা স্মিত স্নেহময় হাসি- যেন কোনো মজার দৃশ্য উপভোগ করছেন। যেন তাঁর নেই অন্য কোনো তাড়া। আমরা স্কিপিং থামিয়ে আনন্দে ‘মুজিব কাকু’ বলে চেঁচিয়ে উঠলাম। (বঙ্গবন্ধুকে আমরা ওই নামেই সম্বোধন করতাম)। উনি এগিয়ে এসে আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আমরা কোন ক্লাসে উঠেছি, কোন স্কুলে পড়ছি, এমনি টুকিটাকি কথা জিজ্ঞেস করলেন। খুব ছোট্ট স্মৃতি। মাত্র কয়েক মিনিটের। পরবর্তীকালে মুজিব কাকুর সঙ্গে আরো কত দেখা হয়েছে। কত গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশে তাঁর ভাষণ শুনেছি, ঘরোয়া পরিবেশে আলোচনা খুব কাছ থেকে শুনেছি, অল্প স্বল্প কথাও বলেছি তাঁর সঙ্গে। অথচ স্মৃতির বর্ণালি উদ্যানে ওই মাধবীলতায় ঘেরা পড়ন্ত বিকেলে, এক অবিসংবাদিত নেতার স্নেহময় কৌতুকমাখা চোখের দৃষ্টিটিই হৃদয়কে অভিষিক্ত করেছে।

১৯৭০ সালের শেষের দিকে আমাদের একতলার বারান্দায় ঝোলানো টব, যাতে মানিপ্ল্যান্ট শাখা-প্রশাখায় বৃদ্ধি পেয়ে চলছিল, তাতে এক বুলবুলি পাখি এসে বাসা বাঁধল। শত ব্যস্ততার মাঝেও আমাদের আব্বুর (আমরা বাবাকে আব্বু সম্বোধন করতাম) সচেতন দৃষ্টি ছিল যাতে পাখিটিকে আমরা বিরক্ত না করি; সে যাতে নির্ভয়ে, নিরাপদে তার সযত্নে গড়া নীড়টিতে শান্তির আশ্রয় খুঁজে পায়। ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পরদিন আমি ও আমার ছোট দুই বোন রিমি ও মিমি আব্বুকে খুঁজে পাই ওই বুলবুলির পাখির ভাঙা নীড়টির সামনে। আব্বুর মেলে ধরা দুই হাতে পাখিটির প্রাণহীন দেহ। আব্বুর সজল দুটি চোখে মৌন আর্তনাদ। এরপর তিনি সারা দিন বিমর্ষ হয়ে রইলেন। বারবার নিজেকে ধিক্কার দিলেন পাখিটির নিরাপত্তাকে নিশ্চিত না করার জন্য। মাত্র কিছুকাল পরেই ওই মানুষটিই এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের সফল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, লাখকোটি নির্দোষ প্রাণের আকুতি এক নিরাপদ মুক্ত স্বদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।

১৯৭১ সালের শুরুতে অসহযোগ আন্দোলনের সময় আমাদের বৈঠকখানার জানালার সামনে ছোটখাটো হাসিখুশি চেহারার এক ব্যক্তি এসে উপস্থিত হলেন। আমি ও রিমি তখন জানালার সামনে বসে ইকড়িমিকড়ি চামচিকিড় জাতীয় খেলা খেলছি। তিনি আমাকে ও রিমিকে ইশারায় ডাকলেন। আমাদের নাম জিজ্ঞাসা করলেন। আমরা তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে আব্বুকে ডেকে দিতে বললেন। বললেন, ‘ওনাকে বলো যে তেজগাঁও থানা হতে শিলু দারোগা দেখা করতে এসেছে’। (ওনার প্রকৃত নাম ছিল সিরাজউদ্দিন)। আমরা দৌড়ে ভেতরে গিয়ে আব্বুকে খবর দিলাম। আব্বু তখন জরুরি কোনো বিবৃতি লেখার কাজে ব্যস্ত। তিনি খবরটি শোনামাত্রই লেখার কাজ অসমাপ্ত রেখে বৈঠকখানায় গেলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। এরপর বেশ কয়েকবারই শিলু দারোগা আমাদের বাসায় এসেছেন প্রায় একই সময়ে। সন্ধ্যা হয় হয়, এই সময়টিতে। তিনি ভেতরে ঢুকতেন না, বৈঠকখানার জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন আব্বুর অপেক্ষায়।

পরে জেনেছিলাম যে তিনি পাকিস্তানি প্রশাসনের ভেতরের গোপন খবর জোগাড় করে আব্বুর কাছে পৌঁছে দিতেন। বিশেষ করে তারা যেসব বাঙালি পুলিশ কর্মচারীদের ওপর কড়া নজর রাখছে, তাদের নিরস্ত্র করছে এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অবাঙালি সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানে চালান দিয়ে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করছে, এমনি সব গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ যা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হতে পারে।

১৯৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করল। আব্বু, আত্মগোপন করে তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে স্বাধীন বাংলা সরকার গঠন করলেন। তিনি তখন হলেন পাকিস্তান সামরিক সরকারের একনম্বর শত্রু। পাকিস্তানি শোষক সম্প্রদায় তখন প্রচার করল যে, তাঁর নাম আসলে তাজউদ্দীন নয়, ‘তেজারাম’। তিনি ভারতীয় হিন্দু এবং ভারতীয় চক্রান্তকে সফল করার জন্যই তাজউদ্দীন নামে তাঁর পূর্ব পাকিস্তানে অনুপ্রবেশ। তারা তাজউদ্দীন আহমদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নাম মৃত্যু তালিকায় ঢোকাল। আম্মা, সে সময় তাঁর চার নাবালক সন্তানসহ গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে চষে বেড়াচ্ছেন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে।

ঠিক এমনি এক দুর্যোগপূর্ণ সময়েই আবারও দেখা সেই শিলু দারোগার সঙ্গে, অনেকটা অলৌকিকভাবেই। এক গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথের ধারে আরো কিছু মানুষের সঙ্গে তিনি বসে রয়েছেন। আমাদের দুই বোনকে তাড়া খাওয়া মানুষের ভিড়ের মধ্যেও চিনতে পারলেন। (আমরা সবে অন্য একটি গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে এসেছি। সেই গ্রামটিকে পাকিস্তানি মিলিটারিরা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল।) এরপর সেই শিলু দারোগা হলেন আমাদের দুর্যোগপূর্ণ যাত্রাপথের সঙ্গী।

লাশের পাহাড়, আগুনে ছাই হয়ে যাওয়া কত গ্রাম অতিক্রম করে, পাকিস্তানি মিলিটারির গানবোট ও জিপ এড়িয়ে লাখ লাখ শরণার্থীর সঙ্গে আমরাও রওনা দিলাম ভারতীয় সীমান্তের পথে। রহমত আলী (বর্তমানে গাজীপুর জেলা থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সাংসদ), তাঁর শ্যালক রতন ভাই, মুক্তিযোদ্ধা মুস্তফা, মোশারফ ও শিলু দারোগাসহ আমরা একদিন ভারতীয় সীমান্তে প্রবেশ করলাম। আমাদের পৌঁছে দিয়েই শিলু দারোগা সেখান থেকেই বিদায় নিলেন। বললেন, শিগগিরই তাঁর স্ত্রী, ছেলেসহ আমাদের সঙ্গে মিলিত হবেন। তিনি চলে গেলেন। পেছনে ফেলে আসা প্রিয় জন্মভূমির বিচ্ছেদ বেদনার মতোই, তাকে হারানোর ব্যথা আমাদের দুই বোনকে ব্যথাতুর করে তুলল। তিনি ছিলেন ছোটবড়ো সবার যথার্থ সঙ্গী। আম্মার হাতে মুঠো করা বাংলাদেশের মাটি। শিলু দারোগা ফিরে গেলেন সেই মাটিতেই। কয়েক মাস পর আমরা সেই মর্মান্তিক খবরটি শুনতে পেলাম। শিলু দারোগা এই পৃথিবীতে আর নেই। তাঁর স্ত্রীর সামনেই তাঁর একমাত্র ছেলেসহ পাকিস্তানি মিলিটারিরা তাঁকে গুলি করে হত্যা করেছে। ওই মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী তাঁর স্ত্রী হারিয়েছেন মানসিক ভারসাম্য। শিলু দারোগা চলে গেলেন, বিজয়ের স্বপ্ন বুকে গেঁথে নিয়ে। নিঃসাড় মৌন প্রদোষের আঁধারে যেন তিনি আবারও ফিরে আসবেন, নতুন কোনো সংবাদ নিয়ে। এমনি প্রত্যাশায় আমরাও দিন কাটালাম অনেকদিন পর্যন্ত।

জীবনের এমনি সব ঘটনাবলি থেকে আহরিত অভিজ্ঞতার আলোকে জীবনের অনিত্য অবস্থান সম্বন্ধে ধারণা খুব অল্প বয়সেই হৃদয়ে প্রথিত হয়ে যায়। মানুষকে তার বিশাল পরিচিতির বাইরেও তার অন্যান্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের আলোকে একজন সম্পূর্ণ মানুষকে খোঁজার এবং জানার প্রচেষ্টাও এই অনিত্য জীবনের এক নিত্য অন্বেষায় রূপান্তরিত হয়।

লেখিকাঃ

alt

শারমিন আহমদ : বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে। তাজউদ্দীন আহমদ জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই। তিনি বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও স্বাধীনতা সংগ্রামের সম্মুখ সারির নেতা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। আজ এই সৎ ও মেধাবী রাজনীতিবিদের জন্মদিনে তাঁর মেয়ে শারমিন আহমদের স্মৃতিচারণামূলক লেখাটি ছাপা হলো। রচনাটি শারমিন আহমদের প্রকাশিতব্য বই ‘মুক্তির কাণ্ডারী তাজউদ্দীন : কন্যার অভিবাদন’ থেকে নেওয়া হয়েছে।


নিউইয়র্কের একটি বাংলা সাপ্তাহিকের ভূমিকা রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক – আবদুল গাফফার চৌধুরী

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০১৫

চলতি মাসের গোড়ায় নিউইয়র্কে গিয়েছিলাম। বাংলাদেশের ওপর একটা ডকুমেন্টারি ছবি করছি। তাতে কয়েকজন মার্কিন নেতার ইন্টারভিউ রেকর্ড করার ইচ্ছা নিয়েই আমার এই আটলান্টিক পাড়ি দেয়া। আমি নিউইয়র্কে যাচ্ছি জেনে সেখানে বাংলাদেশ মিশনের প্রধান আবুল মোমেন আমাকে অনুরোধ জানালেন, আমি যেন তাদের মিশনে আয়োজিত এক সভায় একটি বক্তৃতা দেই। এটি একাডেমিক আলোচনা সভা। প্রতিবছরই একটি বক্তৃতা দেয়া হয়। বিষয় ‘বাংলাদেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত।’ আমি সানন্দে তার অনুরোধে রাজি হয়েছি।
তেসরা জুলাই শুক্রবার সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গিয়ে দেখি এটি সাধারণ জনসভা নয়। নিউইয়র্কের শিক্ষিত ও বিশিষ্ট বাংলাদেশীদের উপস্থিতিতে একটি আলোচনা সভা। সেখানে মন খুলে কথা বলতে পারব ভেবে আনন্দিত হই। আমার এক ঘণ্টার বক্তৃতায় বাংলাদেশের অতীত নিয়ে আলোচনা করেছি। বাঙালী জাতীয়তা, তার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভিত্তি হিসেবে বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক ভূমিকা বিশ্লেষণ করেছি। প্রাচীনকালে উচ্চবর্ণের হিন্দু শাসকেরা বাংলা ভাষাকে ধ্বংস করার জন্য একে ‘রৌরব নরকের ভাষা’ আখ্যা দিয়েছিলেন। বেদ বা কোন ধর্মগ্রন্থ বাংলায় পড়া হলে পাঠককে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার বিধান দেয়া হয়েছিল। বাংলা ভাষাকে রক্ষার জন্য বাংলায় রচিত গ্রন্থ নিয়ে তখনকার বাংলাভাষী বৌদ্ধরা নেপালে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তারই একটি গ্রন্থ চর্য্যাচর্য্য বিনিশ্চয়।

নিউইয়র্কের একটি বাংলা সাপ্তাহিকের ভূমিকা রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক – আবদুল গাফফার চৌধুরী  

হোসেন শাহী আমলে বাংলা ভাষা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পায়। ফার্সি সাহিত্যের প্রভাবে বাংলা সাহিত্যেও প্রেম-প্রণয়মূলক পুঁথি রচিত হয়। বাংলায় রামায়ণ-মহাভারত অনূদিত হয়। ইংরেজ আমলে খ্রিস্টান মিশনারিরা ক্রিশ্চান ধর্ম প্রচারের জন্য বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করে ভাষার উন্নতি ঘটায়। পাকিস্তান আমলে আবার বাংলা ভাষার ওপর হামলা শুরু হয়। বাংলা ভাষাকে হিঁদুয়ানি ভাষা এবং বাংলা সংস্কৃতিকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়। এরই প্রতিবাদে লোকায়ত বাঙালী জাতীয়তার নবজাগরণ। এই জাগরণের ভিত্তিতে বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা অর্জন।
ভাষা-জাতীয়তা সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে আমি বলেছি, ভাষার কোন ধর্মীয় পরিচয় নেই। ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবী ভাষা অমুসলিমদের ভাষা ছিল। সেই ভাষাতেই কোরান নাজেল হয়েছে এবং ইসলাম প্রচারিত হয়েছে। আল্লাহর বহু গুণবাচক নাম আরবী ভাষা থেকেই সংগৃহীত এবং আগে তা কাবার দেবতাদের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দেবতাদের মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলার পর এই নাম শুধু আল্লাহর গুণবাচক নাম হয়ে দাঁড়ায়। ধর্মের অবমাননা করার জন্য আমি একথা বলিনি। ভাষার বিবর্তন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছি। আমার এই বক্তব্যের কোন প্রতিবাদ নিউইয়র্কের সভাগৃহে হয়নি। আমি যদি ভুল বলে থাকি, তাহলে নিশ্চয়ই আমার বক্তব্য কেউ খ-ন করতে পারেন এবং আমিও ভুল শোধরাতে পারি। কিন্তু এই বক্তব্য দ্বারা আমি কি করে মুরতাদ, কাফের হয়ে গেলাম, তা এখনও বুঝে উঠতে পারিনি।
যাহোক, আমার নিউইয়র্কের বক্তব্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করতে চাই না। আমার শুভাকাক্সক্ষীরা বলেছেন, আপনি নিউইয়র্কের বক্তব্যের যে ব্যাখ্যা দু’দিন পরেই দিয়েছেন, সেটাই যথেষ্ট। তার পুনরুক্তি নিষ্প্রয়োজন। আমারও তাই মনে হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে অসত্য প্রচারণার প্রতিবাদে নিউইয়র্কের ড. নুরুন্নবী, সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লা, ফাহিম রেজা নূর, হাসান আবদুল্লাহ, শহীদ কাদরি প্রমুখ ৩৮ জন বুদ্ধিজীবী একটি যুক্ত বিবৃতি দিয়েছেন। ঢাকায় ড. মুনতাসীর মামুন ‘জনকণ্ঠে’ সিরিজ আর্টিকেল লিখে মৌলবাদীদের মিথ্যা প্রচারের দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছেন। শাহরিয়ার কবির তথ্যসমৃদ্ধ নিবন্ধ লিখেছেন। কানাডা থেকে ইসলামী শাস্ত্রবিশেষজ্ঞ হাসান মাহমুদ তার নিবন্ধে আমার বক্তব্য যে অসত্য ও ধর্মবিরোধী নয়, তা জোরাল তথ্যপ্রমাণ দিয়ে উত্থাপন করেছেন। আরও অনেকে আমাকে সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় লিখেছেন। লন্ডনে সুজাত মাহমুদসহ বিশিষ্ট তরুণ বুদ্ধিজীবীরা আমার সমর্থনে কলম ধরেছেন। ঢাকায় গণজাগরণ মঞ্চ আমার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। এদের সাহসী ভূমিকাকে আমি অভিনন্দন জানাই। তাই নিউইয়র্ক-বক্তব্যের নিজে আর কোন বিশ্লেষণ দিতে চাই না।
তবে নিউইয়র্কে কি ঘটেছে তার একটা বিবরণ আমার কাছে অনেকেই জানতে চেয়েছেন। নিউইয়র্ক, ঢাকা এবং লন্ডনের বিএনপি ও জামায়াতপন্থী কয়েকটি কাগজ এ সম্পর্কে যে অসত্য ও বানোয়াট কাহিনী অতিরঞ্জিত করে প্রচার করেছে, তাতে এদের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বুঝতে আমার দেরি হয়নি। নিউইয়র্কের অধিকাংশ বাংলা মিডিয়াই জামায়াতিদের কব্জায়। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী মীর কাশিমের অর্থে একটি টেলিভিশন ও বাংলা সাপ্তাহিক পরিচালিত হয়।
নিউইয়র্কের একটি বাংলা সাপ্তাহিকের ভূমিকা রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক। বিদেশে বাস করে অনবরত দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে অবমাননামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের উচিত এই ধরনের পত্রিকার অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা যাতে জনগণের মন বিষাক্ত না করে সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা। নিউইয়র্কের এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি একবার প্রথম পৃষ্ঠায় ব্যানার হেডিংয়ে খবর ছেপেছে, ‘ঢাকার রাজপথে ভারতের সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে।’ ঢাকায় একাত্তরের এক যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ার সময় খবরের হেডিং দিয়েছে ‘ঢাকায় ফাঁসির মহোৎসব।’ আমার নিউইয়র্ক বক্তব্যের শুধু বিকৃতি সাধন করেই এই পত্রিকাটি ক্ষান্ত হয়নি। আমি রাষ্ট্রীয় অর্থে মার্কিন মুল্লুকে গিয়েছি, আমার বক্তব্যের জন্য নিউইয়র্কের বাংলাদেশ মিশনের প্রধান আবুল মোমেন সাহেবও দায়ী এবং অবিলম্বে তার অপসারণ দরকার ইত্যাদি অসত্য ও উদ্দেশ্যমূলক প্রচার চালাতেও এই পত্রিকাটি দ্বিধা করেনি।
ঢাকা-নিউইয়র্ক-লন্ডনের জামায়াত ও বিএনপিপন্থী এবং তাদের অর্থে পরিচালিত মিডিয়াগুলোর মধ্যে একটা লিঙ্ক আছে। সব শিয়ালের এক রা’র মতো এরা একই সুরে প্রচারণা চালায়। আমার বিরুদ্ধে প্রচারণার সময় অশ্লীল মন্তব্য জুড়তেও এরা দ্বিধা করেনি। ইসলাম রক্ষার নামে এই পত্র-পত্রিকাগুলো সাংবাদিকতাকে কতটা নিচু স্তরে নামাতে পারে, এবারেও তার প্রমাণ তারা দিয়েছে। আমি নিউইয়র্কে বক্তৃতা দিয়েছি ৩ জুলাই শুক্রবার। শনিবারেই শুনতে পাই ঢাকায় একটি দৈনিকে আমার বক্তব্যকে কাটছাঁট করে এমনভাবে প্রচার করা হয়েছে যাতে মনে হতে পারে আমি আল্লা, রসূল এবং ইসলাম ধর্মের চরম অবমাননা করেছি।
এভাবে এবং ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এরা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চায়। সরল ধর্মপ্রাণ মানুষকে এরা মিথ্যা প্রচারণা দ্বারা উত্তেজিত করে এবং তাদের অনেকের মনে খুনের নেশা জাগিয়ে দেয়। আজ একথা প্রমাণিত যে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর উস্কানিমূলক ফতোয়ার জন্যই হুমায়ুন আজাদের প্রাণনাশের জন্য নৃশংস চাপাতি হামলা চালানো হয়েছিল। কবি শামসুর রাহমানকেও মুরতাদ আখ্যা দিয়ে তাঁর বাড়িতে ঢুকে হামলা চালানো হয়েছিল। তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান।
আমার ধারণা, আমার নিউইয়র্ক-বক্তৃতার বিকৃতি ঘটিয়ে এবং বিকৃত ব্যাখ্যা প্রচার করে উগ্রপন্থী জামায়াতি মৌলবাদীরা চেয়েছিল কিছু সরলপ্রাণ মুসলমানকে উত্তেজিত করে আমাকেও হত্যা করার প্ররোচনা দিতে। তাদের এই উস্কানি সফল হলে আমার ওপর দৈহিক হামলা হতে পারতো। এখনও হতে পারে না তা নয়। আমার ওপর হামলা চালানোর জন্য নিউইয়র্কের দুটি সাপ্তাহিক, লন্ডনের দুটি এবং ঢাকায় তিনটি জামায়াত ও বিএনপিপন্থী দৈনিক অনবরত ধর্মপ্রাণ মানুষকে উস্কানি দেয়ার মতো রঞ্জিত অতিরঞ্জিত খবর ছেপেছে। মসজিদের ইমাম সাহেবদের কাছে গিয়ে আমার বক্তব্য বিকৃতভাবে শুনিয়ে তাদের কাছ থেকেও আমার বিরুদ্ধে ফতোয়া বের করে তা ফলাও করে প্রচার করেছে। এক শ্রেণীর ইমাম ও খতিবও আমার বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে না জেনে এবং অভিযুক্ত হিসেবে আমার কাছ থেকে কোন ব্যাখ্যা দাবি না করেই কাগুজে খবর শুনেই মুরতাদ ও কাফের বলে ফতোয়া দিয়েছেন। তার ফলে যে একজন মুসলমানের জীবন বিপন্ন হতে পারে, সেই বিবেচনা তাদের মাথায় ঢোকেনি। তারা সিরিয়ার আইসিসের মতো মুসলমান হয়ে মুসলমানের কল্লাকাটার অভিযানে মদদ জোগাতে চান কিনা আমি জানি না। আইসিস চালাচ্ছে অস্ত্র দিয়ে হত্যা অভিযান। এদের অনুসারীরা বাংলাদেশে একই হত্যাভিযান চালাতে চায় প্রচারণা ও ফতোয়ার দ্বারা।
আল্লার অপার মহিমা। আমি যে আল্লার অবমাননা করেছি বলে এই ধর্ম-ব্যবসায়ীরা প্রচারণা চালাচ্ছেন, সেই আল্লাই আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেছেন। ঢাকা-লন্ডন-নিউইয়র্কে একযোগে প্রচারণা চালিয়ে, ফতোয়াবাজি করেও এরা ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলমানকে আমার বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে পারেনি। আমেরিকায় তারা আমার একটি সভাও পন্ড করতে পারেনি। অথচ জোর প্রচারণা চালিয়েছে, আমার সভা পন্ড করেছে এবং জুতো হাতে বিক্ষোভকারীদের সাজানো ছবি প্রকাশ করেছে। কোন প্রকৃত সাংবাদিক ও সংবাদপত্র এই ধরনের মিথ্যা প্রচার করতে পারে না।
নিউইয়র্কে আমার সভায় এসে জামায়াত ও বিএনপিপন্থীরা কোন প্রশ্ন করতে চাইলে আমি তার উত্তর দানে প্রস্তুত ছিলাম। প্রশ্ন করার মতো জ্ঞানবুদ্ধি তাদের ছিল না। তাই তারা চেয়েছিল সভায় এসে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধাতে। কিন্তু সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও উত্তেজিত করে সভায় আনতে না পেরে তারা সভা যাতে না হতে পারে তার জন্য অন্য কৌশল গ্রহণ করে। নিউইয়র্কের তাজমহল হোটেলে একটি সভা অনুষ্ঠানের কথা ছিল। হোটেলের মালিককে ভয় দেখানো হয়, তার হোটেলে সভা হলে ভাঙচুর হবে। তিনি ভয় পেয়ে হোটেলে সভা করার অনুমতি বাতিল করে দেন।
এরপর সভার উদ্যোক্তারা শহরের জুইস সেন্টারে সভাটি করার আয়োজন করেন। সেখানেও একই কৌশল গ্রহণ করা হয়। টেলিফোনে জুইস সেন্টার ভেঙে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। সেন্টার কর্তৃপক্ষও সভা করার অনুমতি বাতিল করেন। এই দুই স্থানের সভাতেই জামায়াত-বিএনপির হুমকি অগ্রাহ্য করে যেতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু সভার উদ্যোক্তারা সভা বাতিল করেছেন জানানোর ফলে আর যাইনি। আমি যখন জুইস সেন্টারের ধারে কাছেও নেই, বরং ম্যানহাটনের এক বাড়িতে বসে আড্ডা দিচ্ছি, তখন জুইস সেন্টারের সামনে জনাত্রিশেক জামায়াতিকে হাতে জুতো ধরিয়ে দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে বলা হয়। সেই সাজানো বিক্ষোভের ছবি একশ্রেণীর পত্র-পত্রিকায় বড় করে ছাপিয়ে তার ক্যাপশন দেয়া হয়েছে, ‘গণবিক্ষোভের মুখে গাফ্ফার চৌধুরীর জনসভা প-।’ মুখে ইসলাম কিন্তু কাজে ক্যামেরার অসৎ কারসাজিÑ এটাই হচ্ছে বিএনপি-জামায়াতপন্থী কাগজগুলোর সাংবাদিকতার স্ট্যান্ডার্ড!
তবে বোস্টনে আয়োজিত আমার সভায় শ্রোতা সেজে কিছু জামায়াতি ঢুকেছিল। মজার কথা, আমার বক্তৃতার সময় তারা কোন গ-গোল করেনি। কেবল বক্তৃতা শেষ হলে আমাকে কিছু প্রশ্ন করতে চেয়েছে। আমি নিউইয়র্কের সভায় কেন বলেছি ‘আমি আগে বাঙালী, তারপর মুসলমান (জামায়াতিরা প্রচার করেছে আমি নাকি বলেছি, আমি মুসলমানত্ব ছাড়তে পারি, বাঙালিত্ব ছাড়তে পারি না)। এর জবাবে রসুলুল্লাহ (দ) যে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলতেন, ‘মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল আরাবী, আল মাক্কি’ আমি একথা বলতেই তারা নিশ্চুপ হয়ে যায় এবং হঠাৎ প্রশ্ন করার বদলে হাঙ্গামা শুরু করার চেষ্টা চালায়।
মজার কথা এই যে, সভার পুরুষ শ্রোতারা নন, কয়েকজন মহিলা শ্রোতা তাদের প্রতি আঙুল দেখিয়ে তালেবান, তালেবান বলে চিৎকার শুরু করলে তারা পালাতে শুরু করে। উগ্রমূর্তিধারণকারী দু’একজনকে পুলিশ বের করে দেয়। তাদের ভেতরের দু’চারজন সভায় থেকে যান এবং পুলিশকে জানায়, একজন কাফের এখানে সভা করছেন এবং তাকে বাধা দিতে হবে এই কথা বলে জামায়াতিরা তাদের এই সভায় ডেকে নিয়ে এসেছে। কিন্তু তারা এসে দেখছেন, সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা বলে তাদের এখানে ডেকে আনা হয়েছে। তারা এজন্য দুঃখিত।
আমি নিউইয়র্ক ছেড়েছি ১৪ জুলাই। তার আগে তাজমহল হোটেলে ও জুইস সেন্টারে যে সভাটি হতে পারেনি সেটি অনুষ্ঠিত হয় জেএফ কেনেডি এয়ারপোর্ট সংলগ্ন ক্রাউন প্লাজা হোটেলে। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক এবং প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলোর উদ্যোগে এই সভা হয়। নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির বহু বিশিষ্ট বাঙালী এই সভায় এসেছিলেন। এই সভাতেও আমি বর্তমান যুগে মুক্তচিন্তার বিরোধী ধর্মান্ধদের দ্বারা ধর্মের দুর্বৃত্তায়নের ইতিহাসটি তুলে ধরেছি। বলেছি, কবি কাজী নজরুল ইসলামকে কাফের আখ্যা দেয়ার পর তিনি লিখেছিলেন, ফতোয়া দিলাম কাফের কাজীও, যদিও শহীদ হইতে রাজিও।’ আমি সে কথা বলি না; আমি শুধু বলি এই অসৎ, ঘাতক ধর্মব্যবসায়ীদের দিন শেষ হয়ে এসেছে। এরা জনগণের শত্রু এবং ধর্মেরও শত্রু। মধ্যপ্রাচ্যে যে আত্মঘাতী বর্বরতা তারা শুরু করেছে, তা-ই তাদের চূড়ান্ত পতন ও পরাজয় ডেকে আনবে।
‘দানবের মূঢ় অপব্যয় গ্রন্থিতে পারে না কভু ইতিহাসে শাশ্বত অধ্যায়।’


সৈয়দ আশরাফ কী অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন?

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

asraf-thereport24

দীপক চৌধুরী : জনপ্রশাসনমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটে তিনি গণভবনে যান। সেখানে আশরাফ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তাদের মধ্যে আগামী ডিসেম্বরে সম্ভাব্য আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন, মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা, দলের সাংগঠনিক অবস্থা, ঈদ পরবর্তী রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এর আগে, বিকালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সৈয়দ আশরাফকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়।

আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানায়, দলের প্রবীণ নেতাদের কারো কারো মনে প্রশ্ন জেগেছেÑ তবে কী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের জন্য অপরিহার্য নেতা হয়ে গেলেন। ওই নেতাকে দলে দফতরবিহীন মন্ত্রী করার পর তাকে দফতর দিতেই হলো আওয়ামী লীগকে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একজন উপদেষ্টাপরিষদের সদস্য বলেন, সৈয়দ আশরাফ গুনী মানুষ আমরা যতভাবেই বলার চেষ্টা করি না কেন, তিনি তো রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী বা গবেষক নন। সুতরাং রাজনীতিবিদকে দলের জেলা শাখার সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকরা পাবেন না তা তো রাজনীতিবিদের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে অব্যাহতি পেয়ে দফতরবিহীন মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে গত এক সপ্তাহ ধরে রাজনৈতিক পাড়ায় আশরাফকে নিয়ে নানান কথা শোনা যাচ্ছিল। সরকার ও দলের ভেতরে তাকে নিয়ে চলছিল গুঞ্জন। তবে তা এ নতুন দায়িত্বের মধ্যে দিয়ে আর থাকছে না বলেও মত আওয়ামী লীগ নেতাদের।

দপ্তরছাড়া করার সাত দিনের মধ্যে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে নতুন অফিস দিয়েছেন শেখ হাসিনা।২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর শেখ হাসিনার বন্দি হওয়া এবং প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার উল্টোযাত্রার মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে বিরূপ পরিস্থিতি সামাল দিয়ে দলীয় সভানেত্রীর পূর্ণ আস্থা অর্জন করেন আশরাফ।

এরপর বিডিআর বিদ্রোহ, হেফাজতের উত্থান সামাল দেওয়া এবং বিএনপিকে বাদ দিয়েই নির্বাচন করে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার ক্ষেত্রে আশরাফের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা আওয়ামী লীগে আলোচিত।

আশরাফকে আকস্মিকভাবে শেখ হাসিনা দপ্তর ছাড়া করার পর আওয়ামী লীগ নেতারা প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও সমর্থকদের অনেকেই মেনে নিতে পারছিলেন না সৈয়দ নজরুলের ছেলের এভাবে বিদায়।

গত ৯ জুলাই দলের সাধারণ সম্পাদককে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর নানা গুঞ্জনের মধ্যে গত ১৩ জুলাই শেখ হাসিনার সঙ্গে একান্তে কথা বলার পর লন্ডন যাত্রা বাতিল করে দেশেই থেকে যান আশরাফ। তার দুদিনের মধ্যে নতুন দপ্তর পেলেন তিনি।

দেড় বছর ধরে এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত এএইচএসকে সাদেকের স্ত্রী ইসমত আরা সাদেক। মন্ত্রণালয়টি নিজের হাতেই রেখেছিলেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে সৈয়দ আশরাফকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করার পর থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। কিশোরগঞ্জের সংসদ সদস্য আশরাফ ছাত্রজীবনে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জেলখানায় সৈয়দ নজরুলসহ জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর লন্ডনে চলে যান আশরাফ। সেখানে আওয়ামী লীগে সক্রিয় ছিলেন তিনি।

১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর শেখ হাসিনার ওই সরকারে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হন আশরাফ। এরপর প্রতিটি সংসদ নির্বাচনেই সংসদ সদস্য হয়ে আসছেন তিনি।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ওই মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়েছিল আশরাফকে, যদিও এতে তার ইচ্ছা ছিল না বলে গণমাধ্যমের খবর। এরপর সাত বছর আশরাফের গুরুত্বপূর্ণ ওই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার মধ্যে তার নিয়মিত সময় না দেওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় ওঠে।


ঈদুল ফিতরে কবি মিশুক সেলিমের একক ভিডিও অ্যালবাম “হৃদয় মিনারে বাবার ঠিকানা” আসছে

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

ঈদুল ফিতরে আসছে মানবতাবাদী কবি মিশুক সেলিমের কিছু ভালো লাগার মতো কবিতা নিয়ে একক ভিডিও অ্যালবাম “হৃদয় মিনারে বাবার ঠিকানা” । অ্যালবামটিতে মোট ১৫ টি ট্রাক রয়েছে, যেগুলো আবৃত্তি করেছেন দেশের স্বনামধন্য চারজন আবৃত্তিকার। তারা হলেন- সাফিয়া খন্দকার রেখা, জিল্লুর রহমান সোহাগ, লাভ গুরু রাজীব সরকার, আর. জে. রঞ্জন। মিউজিক করেছেন সৈয়দ এ. আর. হাসান।
এছাড়া অ্যালবামটির মূল আকর্ষণ হলো গল্প নির্ভর এর ১১টি ভিডিও ট্রাক, যা বাঙালিসহ সকল দর্শকের মন ছুয়ে যাবে এবং কবিতাগুলোকে সমৃদ্ধশালী করবে। পরিচালনা করেছেন এই সময়ের তরুণ পরিচালক সাইফুল হাফিজ খান ও সকাল আহমেদ রাজু। এতে অভিনয় করেছেন – স্বাধীন খসরু, আফরোজা হোসাইন, সৈয়দ মোশারফ, সৈকত প্রমানিক, অধরা নদীয়া, ইখতিয়ার রাসেল, শূণ্যতা, সালমা জেবিন, ম. ফারুক, সালমান সুমন, তানভীর, রাগীব, প্রথমা ও আরো অনেকে।

ঈদুল ফিতরে কবি মিশুক সেলিমের একক ভিডিও অ্যালবাম “হৃদয় মিনারে বাবার ঠিকানা” আসছে  

দেশপ্রেম, প্রকৃতি প্রেম ও মানব প্রেমের উপলদ্ধিতে লেখা কবি মিশুক সেলিমের দারুন কিছু কবিতার সংমিশ্রণে গড়া এই অ্যালবামটি নিয়ে অনেকের মতো অ্যালবামের পরিচালকগণ সাইফুল হাফিজ খান ও সকাল আহমেদ রাজুও বেশ আশাবাদী।
পরিচালক সাইফুল হাফিজ খান বলেছেন, “ আমি এর আগেও অনেক কাজ করেছি। কিন্তু এই কাজটি একটি ভিন্নধর্মী কাজ এবং এইরকম একটি কাজ পরিচালনা করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। আশা করি অ্যালবামটি সবার মনোপূত হবে।”
অ্যালবামের মূল পরিকল্পনাকারী, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক সকাল আহমেদ রাজু বলেছেন, “ আমি এর আগে কিছু শর্টফিল্মের কাজ করলেও এই ধরনের কাজ প্রথমবার পরিচালনা করলাম। চেষ্টা করেছি কিছু ভিন্নধর্মী কাজের মাধ্যমে সবাইকে ভালো কিছু দেবার। আশা করি আমার মতো সবার কাছেই এটি ভালো লাগবে।”
“হৃদয় মিনারে বাবার ঠিকানা” অ্যালবামটি কবি মিশুক সেলিম ও সালমা জেবিনের যৌথ প্রযোজনায় গিতালী প্রডাকশনের ব্যানারে এই ঈদের মূল আকর্ষণ হয়ে আসছে।


গাফফার চৌধুরী এলেন, চলেও গেলেন - শিতাংশু গুহ

বুধবার, ১৫ জুলাই ২০১৫

শিতাংশু গুহ : নিউইয়র্ক থেকে :মুক্তিবুদ্ধি চর্চার মহানায়ক আবদুল গাফফার চৌধুরী নিউইয়র্ক এলেন, একাশি বছর বয়সে একাত্তরের মত ফাইট করলেন মৌলবাদের বিরুদ্ধে, তারপর চলেও গেলেন বিজয়ীর বেশে। পেছনে রেখে গেলেন একরাশ প্রশ্ন। এসেছিলেন হাসিখুশি প্রফুল্ল মনে, গেলেন কিছুটা চিন্তাক্লিস্ট। চিন্তা নিজেকে নিয়ে নয়, দেশকে নিয়ে। বাংলাদেশকে কি পারবে এর আবহমান কালের ঐতিহ্য মুক্তিবুদ্ধির চর্চা অব্যাহত রাখতে? পরক্ষণে এর উত্তরও তিনি নিজেই দিয়ে গেছেন, বলেছেন, 'বাংলাদেশে তালেবানী পতাকা উড়বে না'। যাবার আগে রোববার শেষ প্রকাশ্য সভায় তিনি বলে গেলেন, 'আমি আশাবাদী, শত অপপ্রচার ও প্রতিরোধের মধ্যে আপনারা এই যে সভা আয়োজন করেছেন, তাতে মনে হয়, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তিই বিজয়ী হবে'।

কি ঘটেছিলো নিউইয়র্কে? ৩রা জুলাই বাংলাদেশ মিশনে তিনি দীর্ঘ বক্তৃতা দেন। আমন্ত্রিত হলেও আমি উপস্থিত ছিলাম না। রাতেই দু'তিন জন অভিযোগ করলেন, ফটো সেশনের কারণে অনেকেই তাদের প্রিয় ব্যাক্তিত্ব গাফফার চৌধুরীর কাছে ঘেষতে পারেননি। তাত্ক্ষনিক ইন্টারনেট ক্লিপিং, ছবি বা সংবাদে বোঝা গেল জমজমাট অনুষ্টান হয়েছে। পরদিন নেটে কিছু হেডিং দেখে 'অশনিসংকেত'-এর আশংকা করলাম। দু'একটি নিউজে উস্কানি দেখলাম। দু'এক জনের সাথে কথা বললাম, তারা আস্বস্থ করলেন, জানালেন, উনি এমন কিছু বলেননি যে সমস্যা হতে পারে

‘বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা ভাষাই বাংলাদেশকে রক্ষা করবে’


সেদিনই বিকালে এক ঘরোয়া আড্ডায় গাফফার চৌধুরীর সাথে দেখা। দেখেই তিনি এমন এক সম্বোধন করলেন যে, শুনলে হিন্দুরা ক্ষেপে যাবে! বললাম, গাফফারভাই মিশনে কি বলেছেন, মনে হয় আগুন তো প্রায় লাগছে। আড্ডায় যা হয়, সবাই সবকথা ঠিকমত শুনেনা। তাই কেউ পাত্তা দিলেন না। ড: নূরন নবীর বাসভবনে ওই আড্ডা ছোট হলেও শহরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু এ প্রসঙ্গ আর ওঠেনি। পরদিন রোববার বেশ দেরিতে ঘুম থেকে উঠে দেখি, আগুন ইতিমধ্যে বেশ ছড়িয়ে পড়েছে। সেদিন সন্ধ্যায় একটি অনুষ্ঠান ছিলো তা বাতিল হয়। স্থান পরিবর্তন করে অন্যত্র সভা করার প্রচেষ্টাও ভেস্তে যায়। মৌলবাদীরা মিছিল করে। আয়োজক একজন মুক্তিযোদ্ধা কিছুটা নাজেহাল হন।

এরই মধ্যে বহু বক্তৃতা-বিবৃতি দেখি বা শুনি। আওয়ামী লীগের বড়নেতার একটি ভিডিও ক্লিপ শুনি। তাতে তিনি যা বলেন তা অনেকটা এরকম: 'আওয়ামী লীগ ইসলামের বিরুদ্ধে কোন কথা সহ্য করেনা; গাফফার চৌধুরীর বক্তব্য ইসলাম বিরোধী কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে'। অথচ মিশনের মিটিং-এ ওনারা উপস্থিত ছিলেন, মিডিয়ায় গাফফার চৌধুরীর দুই পাশে স্বামী-স্ত্রীর হাস্যোজ্জ্বল ছবি এসেছে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, মিশনের সভায় গাফফার চৌধুরীর বক্তব্যের সামান্য প্রতিবাদও হয়নি। তথায় উপস্থিত শ'দুই মানুষের পঁচানব্বই শতাংশই  জ্ঞানীগুণী, প্রগতিশীল মুসলমান। সবাই বক্তৃতা শুনলেন, হাততালি দিলেন, ছবি তুললেন, কারো মনে আচড়ও লাগলো না; অথচ আটচল্লিশ ঘন্টার ব্যবধানে পরিস্তিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেল!!

বিএনপি ও মৌলবাদীরা ঘোষণা দিলো, গাফফার চৌধুরীকে নিউইয়র্কে আর সভা করতে দেয়া হবেনা। জামাতীরা তলে তলে মুসল্লীদের ক্ষেপিয়ে দিলো। তারা তওবা করার আহবান জানালো। কেউ কেউ একধাপ এগিয়ে গাফফার চৌধুরীকে 'মুরতাদ' ফতোয়া দিলেন। বিএনপি যখন ঘোষণা দেয় সভা করতে দেয়া হবেনা; তখন আওয়ামী লীগের ওপর দাযিত্ব বর্তায় ওই সভা করার। কিন্তু আওয়ামী লীগ কিছু করেনা। দাযিত্ব তখন এসে পরে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির ওপর। তারা তাদের মহান দাযিত্ব পালন করেন। পত্রিকা, মিডিয়া, নেটে শ'শ' স্টেটমেন্ট আসে গাফফার চৌধুরী ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। সবাই তারপাশে দাড়ায়।

কিন্তু কে শুনে কার কথা! মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ ধর্মান্ধ শক্তি পরিস্থিতি থেকে রাজনৈতিক ফায়দা নেবার প্রয়াস নেয়। ফেইসবুকে আমি একটি পোস্টিং দেই, জামাত-বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের কারণে গাফফার চৌধুরীর সভা পন্ড হয়েছে'। দু'এক জন এর বিরোধিতা করে লম্বা ফিরিস্তি দেন। কয়েক ঘন্টার মধ্যে গাফফার চৌধুরীর ভিডিও স্টেটমেন্ট বেরোয়: 'আওয়ামী লীগের অন্তর্কলহে সভা পন্ড হয়েছে'। যাহোক, এরমধ্যে তিনি বস্টন যান এবং সফল সভা করেন। ফিরে এলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি রোববার বাঙালী জনাকীর্ণ জ্যাকসন হাইটস এলাকায় সভা দেয়, গাফফার চৌধুরীর নাগরিক সম্বর্ধনা। আওয়ামী লীগের নীচতলার নেতাকর্মীরা এবং সবাই ঝাপিয়ে পরে এইসভা সফল করতে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন।

বিএনপি-জামাত, মৌলবাদীরা বসে ছিলোনা, তারাও সকল চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে শেষপর্যন্ত ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। সভাস্থল কর্তিপক্ষকে কে বা কারা হুমকি দেয়, পুলিশ আসে, নিরাপত্তার কারণে কর্তিপক্ষ ভেন্যু বাতিল করে। আয়োজকরা সকাল দশটায় একটি তিনতারা হোটেলের সভাকক্ষ ভাড়া করে বিকাল তিনটায় সকল বাঁধাবিপত্তি উপেক্ষা করে গাফফার চৌধুরীর নাগরিক সম্বর্ধনার কাজ সমাপ্ত করে। যারা ঘোষণা করেছিলো গাফফার চৌধুরীর সভা করতে দেবেনা, তাদের মুখে ছাই দিয়ে স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি একুশের গানের প্র্নেতাকে যথাযোগ্য সন্মান জানায়। সম্পন্ন হয় নাগরিক সম্বর্ধনার কাজ।

যাবার আগে ওটাই ছিলো গাফফার চৌধুরীর শেষ প্রকাশ্য সভা। সেখানে তিনি আশা-নিরাশার কথা বলেছেন। বলেছেন, ফতোয়াবাজদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কামাল আতাতুর্কের মত বিপ্লবী সরকারের কথাও তিনি বলেছেন। এও বলেছেন শেখ হাসিনার পক্ষে একা এই দানব ধ্বংশ করা সম্ভব নয়, সবাইকে একসাথে এর বিরুদ্ধে সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে হবে। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, মৌলবাদ বাংলাদেশের প্রধান অন্তরায়। বিভিন্ন সময়ে মুরতাদ ফতোয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, কাজী নজরুলকে এরা 'কাফের' উপাধি দিয়েছিলো; এখন তারা তাকে বলে 'মুসলিম জাগরণের কবি'। কবি ইকবালকে-ও এরা 'কাফের' ঘোষণা দিয়েছিলো, এই কবি ইকবাল এখন পাকিস্তানের জাতীয় কবি এবং এরা এখন বলে 'আল্লামা ইকবাল'।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনাকেও এরা বহুবার কাফের বলেছে এবং আওয়ামী লীগকে তো বলে, 'ভারতের দালাল'।

প্রশ্ন হলো, গাফফার চৌধুরীর বিরুদ্ধে যারা বিক্ষোভ করলো, ফতোয়া দিলো, এরা কারা? সমস্যাটা সেখানেই। সাধারণ মানুষ এরমধ্যে নেই। এরা সেই পুরানো চিহ্নিত মহল। মিশনের সভায় যারা যোগ দিয়েছিলেন তারা কেউ বিক্ষোভে যোগ দেননি, বরং অনেকেই গাফফার চৌধুরীর পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন। এর মানে হলো, কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে একটি মহল এথেকে ফায়দা লুটতে চাচ্ছে। পবিত্র রমজান মাসে ধর্মীয় উস্কানি দিয়ে কেউ কেউ ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার প্রয়াস নিচ্ছে।

গাফফার চৌধুরী শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি প্রতিষ্টান। তার অসন্মান একুশের অসন্মান। একুশের পথ বেয়ে আমাদের স্বাধীনতা। একুশ মানে বাংলাভাষা। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ। যারা গাফফার চৌধুরীর বিরোধিতা করেছেন তারা প্রায় সবাই একুশের বিরোধী, স্বাধীনতার বিরোধী; বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ বা বাংলা ভাষার বিরোধী। এরা গণতন্ত্র ও প্রগতির বিরোধী। এরা পাকিস্তানপন্থী স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। এদেরই পূর্বসূরীরা রাজাকার-আলবদর ছিলো, এরাই যুদ্ধপরাধীদের বিচার চায়না এবং এরাই বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তান বানাতে চায়। এরা কেউ থাকবে না। আবদুল গাফফার চৌধুরীই থাকবেন। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন মহান একুশ থাকবে, ততদিন গাফফার চৌধুরী থাকবেন।

শিতাংশু গুহ, কলাম লেখক। 


ঈদ-উল-ফিতর, কেন মুসলিমের সব চেয়ে বড় উৎসব ?

বুধবার, ১৫ জুলাই ২০১৫

প্রতি বৎসর দু’দুটি ঈদ উৎসব মুসলমানদের জীবনে নিয়ে আসে আনন্দের ফল্গুধারা। এ দু’টি ঈদের মধ্যে ঈদুল ফিতরের ব্যপ্তি ও প্রভাব বহুদূর বিস্তৃত মুসলিম মানসে ও জীবনে। পূর্ণ একমাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ উৎসব মুসলিম জাতির প্রতি সত্যিই মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে এক বিরাট নিয়ামত ও পুরস্কার। মুসলিম উম্মার প্রত্যেক সদস্যের আবেগ, অনুভূতি, ভালবাসা, মমতা ঈদের এ পবিত্র ও অনাবিল আনন্দ উৎসবে একাকার হয়ে যায়। ‘‘নিশ্চয়ই তোমাদের এ জাতি একক একটি জাতি’’ মহান আল্লাহর এ ঘোষণার বাস্তবরূপটি চরমভাবে প্রকটিত হয় বিশ্বাবাসীর সামনে।
পবিত্র রমজান মাস শেষ হওয়ার পর শাওয়াল মাসের পহেলা তারিখে যে ঈদ উত্সব অনুষ্ঠিত হয় সেটাই হলো পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদ শব্দের অর্থ খুশি বা আনন্দ। রমজান মাসের রোজাগুলো আল্লাহ পাকের নির্দেশ অনুযায়ী পালনের জন্য এবং শয়তান ও কুরিপুর সাথে বিজয় আনন্দে এ ঈদ বা খুশির উত্সব অনুষ্ঠিত হয় বলে এবং কিছু খেয়ে রোজা ভঙ্গ করা হয় বলে এই দিনটির নাম ঈদুল ফিতর রাখা হয়েছে। দুনিয়ার প্রত্যেক জাতিরই একাধিক আনন্দ উত্সবের দিন থাকে। মুসলমানদের তেমনি আনন্দ উত্সবের দিন হচ্ছে দুটি। দিন দুটি হচ্ছে ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আযহা। যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে আনন্দ উপভোগে যেন ক্রটি না হয় সেজন্য এ দুটি দিনে রোজা রাখার উপর ইসলামে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন "ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আযহার দিন রোজা রাখতে হযরত নবী করিম (স.) নিষেধ করেছেন"। হযরত নবী করিম (স.) যখন মাতৃভূমি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করেন তখন থেকেই ঈদের সূচনা হয়। মদিনায় হিজরত করার পর মহানবী (স.) লক্ষ্য করলেন মদিনার বাসিন্দারা দুটি নির্দিষ্ট দিনে আমোদ-প্রমোদে মেতে উঠছে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করেন, এই বিশেষ দিনে তোমাদের আনন্দ উল্লাসের কারন কি? মদিনার নও মুসলিমগণ বলেন "আমরা যাহেলী যুগে দিন দুটোকে এভাবে পালন করতাম।" হুজুরে পাক (স.) বলেন "আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ঐ উত্সব দিনের পরিবর্তে আরও উত্কৃষ্ট দুটি দিন তোমাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। একটি ঈদ-উল-ফিতর ও অন্যদিন ঈদ-উল-আযহা।" পবিত্র সিয়াম সাধনার পর মুসলিম জাহানে আনন্দের বন্যা বইয়ে দিতে আসে ঈদ-উল-ফিতর। যারা রমজান মাসে সিয়াম বা রোজা পালন করেছেন শুধু তাদের জন্যই ঈদ-উল-ফিতর। ঈদ অর্থ আনন্দ এবং খুশি। আরবী ঈদ শব্দের অর্থ উত্সব। উদুন মূল ধাতু থেকে ঈদ শব্দের উত্পত্তি। এর অর্থ বার বার আগমন করা, পুন:পুন:প্রত্যাবর্তন করা। বর্ষ পরিক্রমায় ঈদের আনন্দ উত্সব বার বার ফিরে আসে বলেই একে ঈদ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ঈদ-উল-ফিতর হচ্ছে রমজানের রোজা ভাঙ্গার উত্সব। এ উত্সব শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে উদযাপন করা হয়। ফিতর শব্দের অর্থ হলো রোজার অবসান। রমজানের দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে আল্লাহর মেহমান হিসেবে মুসলমানগণ আল্লাহর দাওয়াত কবুল করে সানন্দে খাওয়া-দাওয়া করেন। এ খাওয়া-দাওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে একমাস সিয়াম সাধনার পুরস্কার। এ পুরস্কার ধনী-দরিদ্র সবার অংশগ্রহণের অধিকার আছে। ধনীরা তাদের নিজেদের সম্পদ দিয়ে নিজেদের জন্য আনন্দ উপভোগের ব্যবস্থা করবে আর গরীবরা যাতে এমন উত্সবে অংশগ্রহণ করতে পারে সেজন্য তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে প্রয়োজন পূরনের মত সুবিধা করে দিতে আল্লাহ তায়ালা ধনীদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তারা গরীবদের সুখ-সুবিধার যেন কমতি না হয় সে দিক নিশ্চিত করার জন্য ঈদের দিনের সকাল বা তার আগে গরীবদেরকে তার অর্থসম্পদের নির্দিষ্ট অংশ দান করবেন। এর নাম সদকায়ে ফিতর। এ সদকায়ে ফিতর গরীবদেরকে মালিক বানিয়ে দান করতে হবে। এ অর্থে গরীবরা আল্লাহর নির্ধারিত ঈদের খুশী উপভোগ করে। ঈদের আনন্দ শুধু খাওয়া-দাওয়া আর সদকায়ে ফিতরের মত এবাদত আদায়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। এর এবাদতের সীমানা আরও ব্যাপক। তাই ঈদের দিন সকালে এলাকার সব মুসলমান মিলে নিকটস্থ ঈদগাহে মিলিত হয়ে জামাতের সাথে পবিত্র ঈদের নামাজ আদায় করবে। ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড়, আমির ফকির, নির্বিশেষে সবাই একই কাতারে শামিল হয়ে ঐক্যের এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সকলে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে মাথা নত করে। হযরত আনাস (রা.) বলেন, রসূলূল্লাহ (স.) বলেছেন "যখন রোজাদার বান্দাদের ঈদ-উল-ফিতরের দিন হয়, তখন মহান আল্লাহ তায়ালা রোজাদার বান্দাদের সম্পর্কে ফেরেশতাগণের সাথে গর্ব করে বলেন, "হে আমার ফেরেশতাগণ! বল দেখি আমার কর্তব্যপরায়ন প্রেমিক বান্দার বিনিময় কি হবে?" ফেরেশতাগণ বলেন "হে প্রভু! পূর্ণরূপে তার পারিশ্রমিক দান করাই তার প্রতিদান।" আল্লাহ বলেন "আমার বান্দারা তাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন করেছে। অত:পর দোয়া করতে করতে ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে গমন করেছে। আমার মর্যাদা, সম্মান, দয়া, মহত্বের কসম, জেনে রাখ আমি তাদের দোয়া কবুল করব।" তারপর আল্লাহ আবার বলেন "হে আমার বান্দাগণ ! তোমরা এখন যেতে পার, আমি তোমাদের পাপ সমূহকে নেকীর দ্বারা পরিবর্তন করে দিলাম।" নবী করিম (স.) বলেন "অত:পর তারা ক্ষমা প্রাপ্ত হয়ে বাড়ী ফিরে আসে।" আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (স.) পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের দিনটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। এদিনে তিনি সুন্দর ও উত্তম পোষাক পরিধান করতেন। তিনি কখনও সবুজ এবং লাল ডোরা বিশিষ্ট চাদর পরিধান করতেন। ইয়ামানে নির্মিত চাদরকে বুরদে ইয়ামানী বলা হতো। হুজুর (স.) ঈদের দিন এ বুরদে ইয়ামানী পরে ঈদের নামাজ আদায় করতে যেতেন।
ঈদ মুসলমানদের জীবনে শুধুমাত্র আনন্দ-উৎসবই নয়, বরং এটি একটি মহান ইবাদাত যার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা খুঁজে পায়, ধনী-গরীব, কলো-সাদা, ছোট-বড়, দেশী-বিদেশী সকল ভেদাভেদ ভুলে যায় এবং সর্বশ্রেণী ও সকল বয়সের নারী-পুরুষ ঈদের জামাতে শামিল হয়ে মহান প্রভুর শুকর আদায়ে নুয়ে পড়ে। ঈদের এ মহান উপলক্ষকে সামনে রেখে আজ আমাদের এ আত্মজিজ্ঞাসা উত্থাপিত হওয়া প্রয়োজন যে, সত্যিই আমাদের ঈদ কি মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ হবার কারণ হতে পেরেছে? যে মহান স্রষ্টা তাদেরকে এরকম বিশাল আনন্দ উৎসবের অনুমোদন দিয়েছেন, তারা তাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে সর্বদা তাঁকে স্মরণ রেখেছে? যে প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত হিসাবে তারা ঈদ পালন করছে, সে রাসূলের আর সকল সুন্নাতের অনুসরণ কি তারা করছে? আমার বিশ্বাস এসব প্রশ্নের সমাধানের মধ্য দিয়েই আমরা করণীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের ফিরিস্তি পেয়ে যাব।
পাশাপাশি কল্যাণ, বরকত ও আনন্দের এ শুভদিনে আমাদের সে সকল ভাই-বোনদের কথাও স্মরণ করা উচিৎ, মৃত্যু যাদেরকে এ জগত থেকে এমন এক জগতে নিয়ে গিয়েছে, যেখান থেকে ফেরার কোন উপায় নেই। সেখানে তারা পার্থিব জীবনে নিজেদের কৃতকর্মের ফলাফল ভোগ করছে। এ মহান দিবসে আমরা তাদেরকে ভুলে না গিয়ে আমাদের উচিৎ তাদের মাগফিরাতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং তাদের পথে আমাদেরকেও একদিন পা বাড়াতে হবে – মনে সব সময় এ কথা জাগরুক রাখা।
ঈদ উৎসব পালনকালে সেই সব ভাই-বোনদের কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে, যারা কঠিন পীড়ায় অসুস্থ হয়ে বাড়ীতে কিংবা হাসপাতালে পড়ে আছে। ব্যথা, যন্ত্রণা ও মানসিক পীড়নে ঈদের আনন্দ তাদের মাটি হয়ে গিয়েছে। আমাদের উচিৎ প্রথমত: আল্লাহ যে সুস্থতা ও নিরাপত্তার অশেষ নিয়ামতের উপর আমাদেরকে রেখেছেন তার জন্য শুকরিয়া আদায় করা এবং দ্বিতীয়ত: এ সবল রোগাক্রান্তদের আরোগ্য লাভের জন্যে দোয়া করা এবং সম্ভব হলে তাদের শুশ্রষা করা।
আজ আমাদের সে সব ভাই-বোনদের কথাও বিস্মৃত হলে চলবে না, যুদ্ধ যাদেরকে সর্বস্বান্ত করেছে, গৃহহীন করেছে, দেহের রক্ত-বন্যা প্রবাহিত করেছে, বহু নরীকে করেছে বিধবা এবং হাজারো শিশুকে করেছে পিতৃহীন-এতীম; এবং সেই বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদেরকেও, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অমোঘ বিধানে যারা আজ সর্বহারা। আমরা আমাদের সাধ্যানুযায়ী আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে এদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পারি এবং আল্লাহ যেন তাদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন সে দোয়াও করতে পারি।
প্রতি ঈদেই সবাই সাধ্যানুযায়ী নতুন নতুন মডেলের সুন্দর সুন্দর পোষাক ক্রয় করে থাকে। আমরা কি কখনো ভাবি সে-সব ভাই-বোনদের কথা দারিদ্রের কষাঘাতে যাদের জীবন জর্জরিত। নতুন পোষাক কেনা দূরে থাক, পুরানো কোন ভাল পোষাকই তাদের নেই। বরং প্রতিদিনের অন্নের প্রয়োজনীয় যোগানও তাদের নেই। আমরা যারা স্বচছল তারা কি সামান্যতম হাসিও এদের মুখে ফোটাতে পরি না? অথচ মহান আল্লাহ বলেন,

‘‘নিজেদের কল্যাণের জন্য তোমরা যে উত্তম কাজ করে থাকো, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে পাবে…।’’ [সূরা আল-বাকারাহ: ১১০]

এ মুবারক রামাদান মাসে আমাদের অনেককেই আল্লাহ সামর্থ্য দিয়েছেন সিয়াম-সাধনা, কিয়ামুল-লাইল পালন, দান-দাক্ষিণ্য ও কুরআন অধ্যায়নের মাধ্যমে তাঁর ইবাদাত পালনের। কিন্তু ইবাদাতের এ ভরা মৌসুমেও আমাদের এমন অনেক ভাই-বোন রয়েছেন পাপের সাগরে যারা আকন্ঠ নিমজ্জিত, স্রষ্টাদ্রোহী কাজে যারা লিপ্ত, পার্থিব জীবনের মরিচিকাসম খেল-তামাশায় মগ্ন হয়ে যারা জীবনের প্রকৃত কর্তব্য ভুলে গিয়েছে। আমরা কি এদেরকে স্রষ্টার সুন্দর সরল পথের দিকে আহবান করেছি? পাপ-সাগর থেকে তাদেরকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছি? তাদের সমানে সত্যের অনুপম আদর্শের গভীর সৌন্দর্যের সঠিক ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছি? মহান রাববুল আলামীন সমীপে এদের হিদায়াতের জন্য দোয়া করেছি?
ঈদুল ফিতর এসব প্রশ্নের সুন্দর জবাব খুঁজে পেতে আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে। এবারের ঈদুল ফিতরকে তেমনই অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ করার পাশাপাশি আমাদের উচিত হবে ঈদের সাথে সংশ্লিষ্ট শরয়ী বিধান মেনে চলা ও শিষ্টচারিতা রক্ষা করা। সংক্ষেপে ঈদের সে শরয়ী বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরছি।

এক. ঈদের আগের দিন সূর্যাস্ত থেকে শুরু করে ঈদের সালাত আদায় করা পর্যন্ত তাকবীর তথা ‘আল্লাহু আকবর’’ বলতে থাকা। এ হচ্ছে বিশ্ববাসীর সামনে মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘‘আর যাতে তোমরা সংখ্যাপূর্ণ কর এবং তিনি যে তোমাদেরকে হিদায়াত দিয়েছেন তার জন্য ‘আল্লাহ মহান’ বলে ঘোষণা দাও এবং যাতে তোমরা শোকর কর।’’ [সূরা আল- বাকারাহঃ ১৮৫]

তাকবীরের শব্দগুলো হল: ‘‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’’ পুরুষরা মসজিদে, বাজারে ও ঘরে এ তাকবীর ধ্বনি জোরে দিতে থাকবে। আর মহিলারা তাকবীর বলবে আস্তে।

দুই. যাকাতুল ফিতর প্রদান করা, রোযাদারের যে ভুল-বিভ্রান্তি ও পাপ হয়েছে তা মোচন করার জন্য এবং মিসকীনদের খাদ্য যোগানের উদ্দেশ্যে যাকাতুল ফিতর দেয়ার বিধান দেয়া হয়েছে। যাকাতুল ফিতর ঈদের একদিন বা দুইদিন আগেও দেয়া যায়। তবে সালাতুল ঈদের পর পর্যন্ত বিলম্ব করা যাবে না, আগেই আদায় করতে হবে।

তিন. ঈদের দিন সকালে গোসল করা ও সুন্দর পোষাক পরিধান করা এবং ঈদের সালাতে যাওয়ার প্রাক্কালে পুরুষদের খোশবু ব্যবহার করা উত্তম। মেয়েদের জন্যও সুন্নাত হলো পর্দার সাথে ও খোশবু ব্যবহার না করে ঈদগাহে এসে ঈদের আনন্দ ও সালাতে শরীক হওয়া। ঈদ দিন এই তাকবীর পড়া উওম তাকবীর পড়ুন “আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকরব, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু,আল্লাহু আকবর,আল্লাহু আকবর, ওয়া লিল্লাহিল হামদ” (আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, আল্লাহ সবচেয়ে বড়,আল্লাহ সবচেয়ে বড়, এবং সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য)

চার. ঈদগাহে যাওয়ার আগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত অনুসরণ করে তিনটি বা পাঁচটি করে বেজোড় সংখ্যক খেজুর খাওয়া।

পাঁচ. ঈদের জামাতে শামিল হওয়া এবং পুরো খুতবা শোনা। ইমাম ইবনু তাইমিয়া সহ আরো অনেক মুহাক্কিক আলেমের মতে ঈদের সালাত ওয়াজিব, কোন ওজর ছাড়া ত্যাগ করা যাবে না। এমনকি হায়েযরতা মহিলাগণ পর্যন্ত ঈদগাহে আসবেন এবং সালাতে অংশ না নিয়ে একপ্রান্তে অবস্থান করবেন। অনেকের ধারণা, নামাজের নিয়ত আরবিতে করা জরুরি। এমনটি ঠিক নয়। যে কোনো ভাষাতেই নামাজের নিয়ত করা যায়। নিয়ত মনে মনে করাই যথেষ্ট। ঈদের দিন ইমামের পেছনে কিবলামুখী দাঁড়িয়ে মনে এই নিয়ত করতে হবে—‘আমি অতিরিক্ত ছয় তাকবিরসহ এই ইমামের পেছনে ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করছি।’ এরপর উভয় হাত কান বরাবর উঠিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত বাঁধতে হবে। হাত বাঁধার পর ছানা অর্থাৎ  ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা’ শেষ পর্যন্ত পড়তে হবে।এরপর আল্লাহু আকবার বলে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিতে হবে। দ্বিতীয়বারও একই নিয়মে তাকবির বলে হাত ছেড়ে দিতে হবে। ইমাম সাহেব তৃতীয়বার তাকবির বলে হাত বেঁধে আউজুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ে সূরা ফাতিহার সঙ্গে অন্য যে কোনো সূরা তিলাওয়াত করবেন।এ সময় মুক্তাদিরা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকবেন। এরপর ইমাম সাহেব নিয়মমত রুকু-সিজদা সেরে দ্বিতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়াবেন। মুক্তাদিরা ইমাম সাহেবের অনুসরণ করবেন। দ্বিতীয় রাকাতে ইমাম সাহেব প্রথমে সূরা ফাতিহার সঙ্গে অন্য সূরা পড়বেন। এরপর আগের মতো তিন তাকবির বলতে হবে। প্রতি তাকবিরের সময়ই উভয় হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিতে হবে। চতুর্থ তাকবির বলে হাত না উঠিয়েই রুকুতে চলে যেতে হবে। এরপর অন্যান্য নামাজের নিয়মেই নামাজ শেষ করে সালাম ফেরাতে হবে।
ঈদের নামাজ শেষে ইমাম সাহেব খুতবা পাঠ করবেন। মুসল্লিদের জন্য জুমার খুতবার মতো এই খুতবা শোনা ওয়াজিব। খুতবার সময় কথাবার্তা বলা, চলাফেলা করা, নামাজ পড়া সম্পূর্ণরূপে হারাম। কারও ঈদের নামাজ ছুটে গেলে কিংবা যে কোনো কারণে নামাজ নষ্ট হয়ে গেলে পুনরায় একাকী তা আদায় বা কাজা করার কোনো সুযোগ নেই। তবে চার বা তার অধিক লোকের ঈদের নামাজ ছুটে গেলে তাদের জন্য ঈদের নামাজ পড়ে নেয়া ওয়াজিব।

ছয়. রাসূলুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ অনুসরণ করে এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফেরা। ঈদের দিন সকালে বিজোড় সংখ্যক খেজুর বা সেমাই খেয়ে নামায পড়তে যান। এক রাস্তা দিয়ে তাকবীর পড়তে পড়তে যান এবং অন্য রাস্তা দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসুন। ঈদের নামযে হেটে যাওয়া এবং ফিরে আসা সুন্নাত।

সাত. ঈদের অভিভাদন জানাতে গিয়ে, ‘‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়ামিনকা’’ অর্থাৎ ‘আল্লাহ আমাদের ও আপনার পক্ষ থেকে কবুল করুন’ বলা ভাল। এছাড়া সুন্দর সুন্দর দোয়ার মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় ও কোলাকুলি করাতে কোন অসুবিধা নেই। বরং এতে পারস্পারিক সম্পর্ক অনেক মধুর হয়ে উঠে।

আট. ঈদ উৎসবকে উপলক্ষ করে সকল প্রকার পাপাচার ও অশ্লীলতায় নিমজ্জিত হওয়া থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করা।
সাদকায়ে ফিতরা
ফিতরাকে বলা হয় রোযার যাকাত। যাকাত যেমন মালকে পবিত্র করে তেমনি ফেতরাও রোযাকে পবিত্র করে, অর্থাৎ রোযা রেখে যে ভুল-ত্রুটি হয় তা ফেতরার মাধ্যমে পূরণ হয়ে কবুলিয়তের কারণ হয়ে যায়।
ফিতরা কাদের ওপর ওয়াজিব
সঙ্গতি সম্পন্ন (যে ব্যক্তি জীবিকা নির্বাহের অত্যাবশ্যকীয় উপকরন ব্যতীত যাকাত ওয়াজিব হওয়া পরিমান মালের মালিক) রোজাদারের উপর তার নিজের পক্ষ হতে এবং নাবালক পুত্র-কন্যাদরে পক্ষ হতে এবং দাস-দাসীর পক্ষ হতে ঈদের দিন ফিতরা দেয়া ওয়াজিব। ইমামে আজম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে যাদের এমন মাল আছে যে ঘরের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত থাকে তার ওপর ফেতরা ওয়াজিব। ফেতরা দিতে হয় নিজের পক্ষ থেকে এবং পৌষ্যের পক্ষ থেকে।
ফিতরার পরিমাণ
ফিতরার জন্য মালের এক বছর হওয়া জরুরী নয়। ঈদের দিন জামাতের পূর্বে ফেতরা আদায় করা উত্তম। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে ফিতরার পরিমাণ হলো গমের অর্ধ ছা’য়া বা এক সের বারো ছটাক। অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের পূর্ণ এক ছা’য়া বা তিন সের নয় ছটাক। নাবালগের ফিতরা তার অভিবাবকের পক্ষ থেকে দিতে হয়। যাকাত যাদের দেয়া যায় ফিতরা ও তাদেরকে দেয়া যায়। বিষয়টি সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন ‘মুসলমান ক্রীতদাস ও আজাদ, নারী পুরুষ, ছোট বড় সবার ওপর রাসূলে করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদকায়ে ফিতর এক ছা’য়া খেজুর বা যব নির্ধারণ করেছেন। মানুষ ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।’ (মুত্তাফেকুন আলাইহে)।
সাদকায়ে ফেতরা দেওয়ার ফযীলত
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সল¬াল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল¬াম ফিতরার যাকাত রোযাদারকে বেহুদা অবাঞ্ছনীয় ও নির্লজ্জতামূলক কথা বার্তা বা কাজ কর্মের মলিনতা হতে পবিত্র করার এবং গরীব মিসকিনদের (ঈদের দিনের উত্তম) খাদ্যের ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে অবশ্য আদায় যোগ্য বলে ঘোষণা করেছেন। যে লোক তা ঈদের নামাজের পূর্বে আদায় করবে, তা ওয়াজিব সাদকাত বা সাদকাহ হিসাবে আল্লাহর নিকট গৃহীত হবে। আর যে লোক তা ঈদের নামাযের পর আদায় করবে, তা সাধারণ দান রুপে গণ্য হবে। (আবু দাউদ ও ইবনে মাযা)

ঈদ-উল-ফিতর, কেন মুসলিমের সব চেয়ে বড় উৎসব ?
আনাস ইবন মালিক (রাঃ) বরনিতঃ
" রাসুললাহ (সঃ) যখন [মদিনায়] আসলেন ,তখন তাদের ২টি উৎসবের দিন ছিল। তিনি (সঃ) বলেন 'এ ২ টি দিন এর তাৎপর্য কি?' তারা বলল 'জাহিলিয়াতের যুগে আমরা এ ২ টি দিনে উৎসব করতাম।' রাসুলুল্লাহ (সঃ) বললেন ' আল্লাহ্‌ তোমাদের কে এদের পরিবর্তে উত্তম কিছু দিয়েছেনঃ ইয়াওমুদ্দুহা ও ইয়াওমুল ফিতর।"
 
এ হাদিস থেকে দেখা যাচ্ছে যে ইসলাম আগমনের পর ইসলাম বহির্ভূত সকল উৎসবকে বাতিল করে দেয়া হয়েছে এবং নতুন উৎসবের জন্য দুটো দিন কে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সাথে অমুসলিমদের অনুসরন এর যাবতীয় উৎসব পালনের পথকে বন্ধ করা হয়েছে।
 
অমুসলিম ,কাফির , কিংবা মুশরিকদের উৎসব এর দিন গুলো হচ্ছে তাদের জন্য উচ্ছৃঙ্খল আচরনের দিন, এ দিনে তারা নৈতিকতার সকল বাঁধ ভেঙ্গে দিয়ে অশ্লীল কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। আর এই কর্মকাণ্ডের অবধারিত রুপ হচ্ছে মদ্যপান ও ব্যভিচার । এমনকি খ্রিস্টান সম্প্রদায় এর বহুলোক বড়দিনে ও ভাবগাম্ভীর্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে মদ্যপ হয়ে উঠে, এবং পশ্চিমা বিশ্বে এই রাত্রিতে কিছু লোক নিহত হয় মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর কারণে।
 
অপরদিকে মুসলিমদের উৎসব হচ্ছে এবাদাতের সাথে সম্পৃক্ত। এই বিষয়টি বুঝতে হলে ইসলামের সার্বিকটাকে বুঝতে হবে। ইসলাম কেবল কিছু আচার - অনুষ্ঠান এর সমষ্টি নয়, বরং টা মানুষের গোটা জীবনকে আল্লাহ'র সন্তুষ্টি অনুযায়ী বিন্যস্ত ও সজ্জিত করতে উদ্যোগী হয়। তাই একজন মুস্লিমের জন্য জীবনের গোটা উদ্দেশ্যেই হচ্ছে এবাদাত, যেমনটি কুরআনে আল্লাহ্‌ ঘোষণা করেছ্বন
 
"আমি জিন ও মানুষকে আমার এবাদাত করা ছাড়া অন্য  কোন কারণে সৃষ্টি করিনি। "(৫২:৫৬)
 
সেজন্য মুসলিম জীবনের আনন্দ- উৎসব আল্লাহর বিরুদ্ধাচারন ও অশ্লীলতা নয়। বরং টা নিহিত হচ্ছে আল্লাহর দেয়া আদেশ পালন করতে পারার মাঝে। কেননা মুসলিমের ভোগবিলাসের স্থান ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী নয়,বরং চিরস্থায়ী জান্নাত। তাই মুসলিমের জীবনের প্রতিটি কাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে থাকবে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ,তাদের ঈমান , আখিরাত এর প্রতি তাদের বিশ্বাস ,আল্লাহর প্রতি তাদের ভয় ও  ভালবাসা।
তাই ঈদ- উল- ফিতর ও ঈদ- উল- আযাহ... - এ দুটি উৎসবই নির্ধারণ করা হয়েছে ইসলামের দুটি স্তম্ভ সম্পন্ন করার প্রাক্কালে। ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ সাওম পালন করার পর পর ই মুসলিমরা পালন করে ঈদ- উল- ফিতর। কেননা এই দিন্ টি আল্লাহর আদেশ পালনের পর আল্লাহের কাছ থেকে পুরষ্কার ও ক্ষমার ঘোষণা পাওয়ার দিন বিধায় এটি সাওম পালনকারির জন্য বাস্তবিকই উৎসবের দিন। এ দিন এজন্য উৎসবের দিন নয় যে এইদিন এ আল্লাহর নিষেধ ভুলে গিয়ে অশ্লীল কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। বরং মুসলিমদের জীবনে এমন একটি মুহূর্ত নেই , যে মুহূর্তে টার ওপর আল্লাহর আদেশ নিশেধ শিথিলযোগ্য।
তেমনি ভাবে ঈদ- উল- আযাহ পালিত হয় ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হজ্ব পালনের প্রাক্কালে । কেননা ৯ই জিলহজ্জ হচ্ছে আনন্দের দিন- ঈদ- উল আযাহ। এমনিভাবে মুসলিমদের উৎসবের এ দুটি দিন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করার দিন। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন এবং শারিয়াত মোতাবেক বৈধ আনন্দ উপভোগ করার দিন- এই উৎসব মুসলিমদের এমানের চেতনার সাথে একই সূত্রে গাঁথা।
 
বর্তমানের আমরা যারা ঈদ পালন করি ,তারা কি কখনো এভাবে চিন্তা করি? অনেকে বলে থাকেন ঈদ এর চেয়ে নাকি তাদের কাছে পহেলা বৈশাখ,31st night বেশি উপভোগ্য, তারা বেশি মজা করতে পারেন এই দিন গুলোতে... । তাদের কাছে আমার প্রশ্ন হল 'আপনি কি একজন মুসলিম হিসেবে এ কথা বলছেন? " এক জন মুসলিমের কাছে ঈদ এর চেয়ে বেশি অন্য কোন অনুষ্ঠান প্রিয় হতে পারে না। এবং মুসলিমদের জন্য এ দুটি উৎসব নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই নিজেকে প্রশ্ন করুন আপনি কি মুসলিম ? নাকি বাঙ্গালী?
কোন অমুসলিমকে দেখেছেন আপানার সাথে এসে একটি রোজা রাখতে? দেখবেন নাহ,কারন তারা তাদের পরিচয়, তাদের বিশ্বাস এর দিক দিয়ে ঠিক অবস্থানেই আছে।  তবে আমরা কেন নিজেদের পরিচয় ভুলে গিয়ে পদে পদে ঠকর খাবো? ইহকাল , পরকাল ২ ই হারাবো?
আল্লাহ্‌ তালা আমাদের সঠিকটা বুঝবার তাওফিক দান করুন। আসুন এবারের রমজানে আমরা কেনাকাটা ,রান্না-বান্নায় ব্যস্ত না থেকে এর সঠিক মূল্যায়ন করি... এমন তো হতে পারে এটাই আমাদের শেষ রামজান !!!
 
সর্বশেষে বলবো- সিয়াম সাধানার পবিত্র মাস রামাদানুল মুবারক ছিল মূলত: আমাদের জন্য তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণ লাভের মাস, সর্বপ্রকার ইবাদাতে অভ্যস্থ হওয়ার মাস, ঈমান মযবুত করার মাস, প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে মহান চরিত্রে বিভূষিত হওয়ার মাস, কুরানের মর্ম উপলব্ধি করে জীবনের সর্বক্ষেত্রে কুরআনমুখী হওয়ার মাস, মুসলিম জাতির জেগে উঠার মাস এবং সকল প্রকার অনাহুত শক্তির বলয় থেকে মুক্ত হয়ে হক প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞাকে সুদৃঢ় করার মাস।
একটি মাস ধরে আমরা যারা নিজেদেরকে এভাবে প্রস্তুত করেছি, মাসটি অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে যদি তা ভুলে যাই এবং আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্য থেকে দুরে সরে যাই, তাহলে তা কুতটুকু সঙ্গত হবে? মূলত: যারা ভাবে যে, রমাদান মাসে ইবাদাত করাই যথেষ্ট, তাদের সে ভাবনা অসঙ্গত ও ভুল। এদিকে ইঙ্গিত করে এক মুসলিম মনিষী বলেছিলেন,

‘‘সে সকল ব্যক্তিবর্গ কতই না মন্দ, যারা রামাদান ছাড়া আল্লাহকে চেনে না।’’

তাছাড়া আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন,

‘‘মৃত্যু আসা পর্যন্ত তোমার রবের ইবাদাত করতে থাক’’। [সূরা আল-হিজর:৯৯]

উপরোক্ত আলেচনার আলোকে আমরা যদি আমাদের কর্তব্য কাজে তৎপর হতে পারি তাহলেই আমার বিশ্বাস আমাদের ঈদুল ফিতরের এ মহোৎসব অর্থবহ ও সার্থক হবে।

লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও  

রাজনীতিবিদ, জিয়া পরিষদের সহ আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের যুক্তরাজ্য শাখার যুগ্ম আহবায়ক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম যুক্তরাজ্য শাখার সাবেক সহ সভাপতি, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক রিসার্চ ইনস্টিটিউট’র প্রতিষ্ঠিতা এবং চার্টাড ইনস্টিটিউট অব লিগ্যাল এক্সিকিউটিভের মেম্বার।


তারেক মাহমুদ-এর পাঁচটি কবিতা

রবিবার, ১২ জুলাই ২০১৫

তিনিই আমার হিরো বা হিরোইন
তাকেই বলছি আমি—
পড়তেই পারেন
কারো প্রেমে পড়তেই পারেন
এই বয়সে কাউকে ভালো লাগতেই পারে

ভালো লাগার জন্য বয়স কোনো বিষয় নয়
সন্তানকে বাদ দিয়ে
যেমন দাদু আর নাতির সম্পর্ক গাঢ় হয়
বৃক্ষের চেয়ে কখনো ভালো লাগে ফল— কখনো ফুল
কখনো নদী— কখনো তার দুই কুল

এভাবে চোখ যেতেই পারে পাশের বাসার জানালায়
খোলা মাঠে কিষানবধুর রঙিন হাসিতে
জেলেমেয়ের জলভেজা দেহে
কৃষকপুত্রের পেশীল বাহুতে
নিপাট তরুণ স্কুল মাস্টারের দিকে
কলেজের  সুতির শাড়ি পড়া
তরুণী  অধ্যাপিকার দিকে

অবসরপ্রাপ্ত মানুষেরাও মুগ্ধ হতে পারেন
কারো ঝলক চাহনীতে

হতেই পারে
ভালোবাসার কোনো সীমানা থাকে না
এই বয়সে কাউকে ভালো লাগতেই পারে


এভাবে যেতে নেই, যেওনাকো— প্লিজ

জানো না, এভাবে যেতে নেই
বোঝো না কেনো— এভাবে চলে যেতে হয় না

কতো করে তোমাকে বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে— দেবো
পাখিটিকে খাঁচা থেকে মুক্ত করে দেবো
সে স্বাধীন আকাশে উড়বে একেবারে নিজের মতো

এই প্রমিজ করলাম—
অমন করে আর রাগাবো না তোমাকে
তোমার ভেজা চুলে হাত দিয়ে আর বলবো না— আহ্
কথা দিচ্ছি
জোছনা রাতে নৌকা করে তোমাকে নিয়ে যাবো মাঝনদীতে
নৌকাতে বসে নদীতে পা ভেজাতে আর বারণ করবো না কখনো

আমি বলে দেবো
কৃষ্ণচূড়ার সমস্ত ফুলগুলো যেনো তোমার দিকেই তাকিয়ে থাকে
কাঁচা সড়ককে বলে দেবো
সে যেনো তার ধূলোতে তোমার দৃষ্টিকে আর ধূসর না করে
বাতাসকে বলে দেবো
তোমার আঁচল যেনো তার চেয়ে বেশি এলোমেলো না করে
যতোখানি তুমি চাও
সূর্য্যকে বলে দেবো আরো সহনীয় তাপ ছড়াতে
যেনো আপেলের মতো তোমার রঙিন ত্বক
তোমার মন খারাপের কারণ না হয়ে ওঠে

তুমি যা যা চাও আমি তাই তাই দেবো
শুধু একটা কথা রাখো
এভাবে চলে যেওনা— প্লিজ

ঠিক আছে
আমি কথা দিচ্ছি
যদি যেতেই হয়, আমি তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসবো
সবুজ ফসলের আল দিয়ে
বাঁশবাগানের পেলব হাওয়ায় ভেসে ভেসে
সুন্দর আকাশের নীচ দিয়ে
আমি তোমাকে রেখে আসবো

এভাবে যেওনা, এভাবে যেতে হয় না একা
সাথে করে নিয়ে যাবো আরো
তোমার প্রিয় বেলী ফুল, টগর,বকুল,শিউলী,কদম, ঘাসফুল
আর গন্ধরাজের মাতাল গন্ধে সন্ধ্যের হাত ধরে যাবো
নিশ্চয়ই যাবো, তোমাকে সাথে নিয়ে

তবু একা যেওনা, ওভাবে যেতে নেই, যেওনাকো— প্লিজ
তারেক মাহমুদ-এর পাঁচটি কবিতা

বরাবর ডাকঘর

হারিয়ে ফেলেছি তোমার সম্ভাব্য সকল ঠিকানা
হারিয়ে ফেলেছি তোমাকেও

শহরে স্থাপিত লাল ক্যাপ পড়া
লোহার প্রতিটি লেটার বক্সে
পোষ্ট করেছি তোমাকে লেখা এক কোটি চিঠি
কোনো ঠিকানা পাইনি
তাই পৃথিবীর সমস্ত ডাকঘরের ঠিকানায়
পোষ্ট করেছি তোমাকে লেখা আমার সকল চিঠি

এ কথা বিশ্বাস করি আমি
খাকি পোশাক পড়া ব্রেক ভাঙা সাইকেল চালিয়ে
কাঁধে চৈত্রের খরতার মতো কাপড়ের লম্বা মলিন ব্যাগ
ইউকেলিপটাস গাছের মতো শুকনো দীর্ঘ এক ডাকপিওন
ঠিকই খুঁজে খুঁজে আমার চিঠিখানি বয়ে নিয়ে যাবে
তোমার ঠিকানা বরাবর
কোনো চিঠির উত্তর নয়
ডাকপিওনকে তোমার আদরটুকু দিয়ে দিও
আমাকে দেয়ার জন্য

কতোদূর আছো জানিনা
সবাই বলে পৃথিবী নাকি ছোট হতে হতে
হাতের মুঠোয় চলে এসেছে
কিন্তু কই? আমার পৃথিবী তো ওরকম নয়।
আমার এক দিকে দেহ অন্যদিকে মন
একদিকে হাত অন্যদিকে সম্পর্কহীন পা
আমার চোখ একদিকে তাকায় অন্যদিকে দেখে
হৃৎপিন্ড থেকে আমার নিঃশ্বাস এক সমুদ্র দূরে
পৃথিবীর কোনো থিওরিই আমার জন্য নয়

তবে তুমি নেই বলেই কি সব ডিসটিউন হয়ে যাচ্ছে?

আমি সেই ডাকপিওনের বুক ভরা আদর
ডেলিভারী নেয়ার জন্য বসে আছি প্রায় দেড়শো বছর ধরে
যা কেবল তোমার পৃথিবী থেকে আসবে শুধু আমারই জন্য।
 

টিক চিহ্ন

সেদিন ফ্রান্সের বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ফ্রঁসোয়া ক্রফোর
একটি লেখা পড়ে খুব স্বান্তনা পেলাম
ধীমান দাশগুপ্তের অনুবাদে তিনি বলেছেন—

‌'ব্রেস তার ছবিতে পেশাদার অভিনেতার সাহায্য নেন না
তাঁর মতো করে তিনি সঠিক
হিচককের পিরিয়ড ফিল্ম তৈরিতে আপত্তি রয়েছে
তাঁর মতো করে তিনি সঠিক
যে সমাজ ব্যবস্থার বিরদ্ধে তার লড়াই
সেই সমাজের জন্যে গদার আর ছবি করতে চান না
তাঁর মতো করে তিনি সঠিক
বুনুয়েল তাঁর ছবিতে আর সংগীতের ব্যবহার রাখছেন না
তাঁর মতো করে তিনি সঠিক
রোজেলিনি কাহিনীহীন চিত্র নির্মাণে আসক্ত
তাঁর মতো করে তিনি সঠিক
হাওয়ার্ড হক্স সব সময়ই মানুষের চোখের উচ্চতায় ক্যামেরাকে স্থাপন করেন
তার মতো করে তিনি সঠিক।'

আমিও ভেবে দেখলাম মানুষ যা করে তার জায়গা থেকে সে সঠিক
একজন খুনী যখন খুন করে তার পেছনে নিশ্চয়ই একটা লজিক থাকে
এই যে তুমি আমার সঙ্গে ক্যাট ক্যাট করো
ভেবে দেখলাম তুমি তোমার জায়গা থেকে ঠিকই আছো

এখন প্রশ্ন হচ্ছে সবই যদি ঠিক থাকে তাহলে—
মানুষ কেনো আত্মহত্যা করে
কেনো রেপ্ড হয়— কেনো অসুখী হয়
কেনো সিকিউরিটির প্রয়োজন হয়
কেনো এতো হসপিটালের সংখ্যা বাড়ে
একটি শহরে যদি হসপিটালের সংখ্যা বাড়ে
এটা নিশ্চয়ই খুব সুখের ব্যাপার নয়
তবুও ভেবে দেখলাম— না, ঠিকই আছে
আমি যেমন আমার জায়গা থেকে ঠিক— তেমনি অন্যেরাও তাদের জায়গায় ঠিক

তবুও একটা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে— উত্তরটা হলো
যা কিছু কল্যাণের জন্যে, যত বেশি কল্যাণের জন্যে
বিশেষ করে নিজের স্বার্থের চাইতে অন্যের শুভ-স্বার্থ যেখানে গাঢ়ভাবে জড়িত
সেটাই বেশি করে ঠিক— কি বলেন?

                                                    
নোট

অর্থ— একটি সম্ভাবনার নাম
অর্থহীনতা— একটি মৃত্যুর নাম

আমি আপাতত মৃত্যুর কোনো সম্ভাবনা দেখছি না