Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনাকে যে বার্তা দিচ্ছে : মুনতাসীর মামুন

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০১৫

রাষ্ট্রের যিনি অধিকর্তা হন বা রাষ্ট্র চালান তারাও মানুষ। এবং যেহেতু তারাও মানুষ সেহেতু অনেক ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ রাষ্ট্র নীতিতে প্রভাব ফেলে। নিক্সন ইন্দিরা গান্ধীকে পছন্দ করতেন না। তার ধারণা, একদা ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি পাকিস্তান গেলে তাকে যেমন খাতির যতœ করা হয়, ভারত তা করেনি। এই ধারণা মনে তিনি পুষে রেখেছিলেন এবং সে কারণে ইন্দিরা গান্ধীকে অপদস্থ করার চেষ্টা করেছেন, যেহেতু তিনি বাংলাদেশকে সমর্থন করেছিলেন। পাকিস্তানের প্রতি তাদের ভালবাসা প্রবল।

Picture

বঙ্গবন্ধু যখন ক্ষমতায় এলেন তখন তাঁকে অপদস্থ করার চেষ্টা করেছে মার্কিন সরকার। এমনকি বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা চালের চালানও বাংলাদেশে পৌঁছতে দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৪ সালে। বঙ্গবন্ধুর খুনীরা মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল তা উইকিলিক্স মারফত এখন জানা যাচ্ছে।

পরবর্তীকালে, যারা পাকিস্তানী মানসিকতায় যেমন সিক্ত জিয়া-এরশাদ-খালেদাকে সমর্থন করেছে যুক্তরাষ্ট্র, শেখ হাসিনাকে নয়। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের আশ্রয়দাতা হিসেবে খ্যাত যুক্তরাষ্ট্র আবার একই বার্তা দিল শেখ হাসিনাকে।

সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুর খুনী রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন, সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া তথ্যটি জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে। বাংলাদেশ তাকে ফিরিয়ে দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক আশ্রয় যেহেতু পেয়েছে সেহেতু তাকে ফেরত দেবে না বলেই জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের উর্ধতন মহল বঙ্গবন্ধু বা শেখ হাসিনাকে কখনই পছন্দ করেনি। লুঙ্গিপরা গরিব কিছু মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের জারজপুত্র পাকিস্তানীদের হারিয়ে দিয়েছিল এটা যুক্তরাষ্ট্র এখনও ভুলতে পারেনি। বড় দেশগুলোর এ ধরনের দম্ভ থাকে। সে সময় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেনÑ এটিও যুক্তরাষ্ট্র মানতে পারেনি। কিসিঞ্জার সবচেয়ে অপছন্দ করতেন ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধুকে। কিসিঞ্জার ক্ষমতায় না থাকলেও তাদের একটি ‘ওল্ড বয়েজ নেটওয়ার্ক’ থাকে। এরা সব সময় প্রশাসনে যেই থাকুক তাকে প্রভাবান্বিত করার ক্ষমতা রাখে।

আমেরিকা মানবতাবিরোধীদের পছন্দ করে। বিশ্বের দু’একটি দেশ বাদে আমেরিকা কোন দেশে ভাল কিছু করেছে এরকম উদাহরণ খুব কম। মানবতাবিরোধী, স্যাডিস্টদের বেশি পছন্দ যুক্তরাষ্ট্রের। যে কারণে ১৯৭১-এর খুনীদের দল জামায়াতে ইসলামী হলো তাদের কাছে ‘মডারেট ডেমোক্র্যাটিক পার্টি।’ বঙ্গবন্ধুর খুনীদের দল বিএনপি হলো ‘ডেমোক্র্যাটিক পার্টি’, এই খুনীদের দল যতদিন ক্ষমতায় ততদিন সুখী ছিল আমেরিকা। ২০০৭ সালের পর থেকে তারা চেষ্টা করছে খালেদা বা নিজামীরা যেন ক্ষমতায় থাকেন। এই প্রচেষ্টা নস্যাতের পর তারা শেখ হাসিনাকে মেনে নেয়। কিন্তু কয়েকটি ইস্যুতে তারা ক্রুদ্ধ শেখ হাসিনার ওপর। ক্ষুদ্র ‘গরিব’ একটি দেশ আমেরিকার কথা শুনবে না এটা তারা মানতেই পারছে না।

প্রথম ইস্যু হলো ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক। যদিও আদালতের আদেশে তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের নির্বাহীর পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য হন, কিন্তু বার বার দোষ চাপানো হয়েছে শেখ হাসিনার ওপর। মার্কিন প্রশাসন ও হিলারি ক্লিনটন ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ জানিয়েছিলেন শেখ হাসিনাকে, ড. ইউনূসের পুনর্বার পদে নিয়োগের জন্য। শেখ হাসিনা রাজি হননি।

এরই প্রতিক্রিয়া পদ্মা সেতুর ঋণ প্রস্তাব বাতিল। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর জন্য ঋণ মঞ্জুর করেছিল। সেতুর কাজ শুরু হওয়ার আগেই বিশ্বব্যাংক ঘোষণা করে এতে দুর্নীতি হয়েছে, সুতরাং ঋণ বাতিল। পদ্মা সেতু সাধারণ মানুষের একটি আকাক্সক্ষা। বিশ্বব্যাংকের ধারণা ছিল, সেতুর প্রকল্প বাতিল হলে মানুষ অসন্তুষ্ট হবে। এবং শেখ হাসিনাকে অপদস্থ করা যাবে।

এরপরও শেখ হাসিনা কাবু না হওয়ায় পোশাক শিল্পের জিএসপি বাতিল করা হয়। বাংলাদেশকে প্রচুর শর্ত দেয়া হয় জিএসপি ফেরত পাওয়ার জন্য। বাংলাদেশ সব শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও জিএসপি দেয়া যাবে না বলে মত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন।

তারপর ছিল নির্বাচন ইস্যু ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার। এ বিচার যুক্তরাষ্ট্রের না চাওয়াই স্বাভাবিক, কারণ ১৯৭১ সালে তারাও ছিল গণহত্যার অংশীদার। কিন্তু বিশ্ব জনমতের কথা ভেবে এ বিষয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করেনি; কিন্তু মোড়লগিরি করার জন্য কিছুদিন পর পর একজন দূত পাঠিয়েছে বিচার পর্যবেক্ষণের জন্য। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনÑ বিএনপির এই দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেই সময়কার কথা মনে করুন যখন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের দেশগুলো এক জোট হয়ে বিএনপির পক্ষ নিয়ে কথা বলছিল। কিন্তু, নির্বাচন হয়ে যাওয়ায় তারা সাময়িকভাবে হটে যায়। এরপর দেশজুড়ে বিএনপি-জামায়াত যে তা-ব শুরু করে তাতেও পাশ্চাত্যের মৃদু সমর্থন ছিল। পরে, নিজ দেশে জনমত বিরূপ হয়ে যেতে পারে এই চিন্তায় মৃদুভাবে বিএনপি-জামায়াতের সমালোচনা করে।

বঙ্গবন্ধুর খুনীদের আশ্রয় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এটি নতুন কথা নয়। আশ্রয় পেতেই পারে। অনেক সময় আশ্রয়প্রার্থী সত্য গোপন করে আশ্রয় ভিক্ষা করে। কিন্তু সত্য তথ্য প্রকাশিত হলে মানবতাবিরোধী কোন অপরাধীকে তো যুক্তরাষ্ট্র আশ্রয় দিতে পারে না। কিন্তু, বিচারে দ-প্রাপ্ত আশরাফুজ্জামান আছেন যুক্তরাষ্ট্রে। খুব সম্ভব শেখ হাসিনা প্রীত হবেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সব ডিকটাট মানবেন এই আশায় বঙ্গবন্ধুর এক খুনী মহিউদ্দিনকে ফেরত দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু, এবার রাশেদ চৌধুরীকে আশ্রয় দেয়া হলো। কেন?

বর্তমানে দু’টি ঘটনা প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনাকে পছন্দ করে না এবং তিনি বিদায় নিলে যুক্তরাষ্ট্র খুশি হবে। একটি ঘটনা হলো জিএসপি ফেরত। বাংলাদেশ কেন এর জন্য এতদিন কাকুতি মিনতি করেছে তা আমার বোধগম্য নয়। জিএসপির অধীনে কত ভাগ কাপড় যেত? সামান্য। এখনও সবচেয়ে বেশি শুল্ক দিয়ে বাঙালী ব্যবসায়ীরা যুক্তরাষ্ট্রে বস্ত্র রফতানি করছে। আগেই উল্লেখ করেছি, যুক্তরাষ্ট্র অনেকগুলো শর্ত দিয়েছিল। বাংলাদেশ তা পূরণও করেছিল। কিন্তু, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, বাংলাদেশকে জিএসপি দেয়া যাবে না। এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশকে দেখে নেয়া। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ এ পরিপ্রেক্ষিতে বলেছেন, বাংলাদেশ জিএসপি চাইবে না। আমরা মনে করি, এটি সঠিক সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তে টিকে থাকলে আমাদের মর্যাদা বাড়বে বই কমবে না।

পদ্মা সেতুর ঋণ বাতিলের পরও বাংলাদেশ নিজের টাকায় এই সেতু করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে এবং কাজ শুরু করেছে এটি যুক্তরাষ্ট্রের আঁতে লেগেছে। নির্বাচনের সময় শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের কথা শোনেননি, এটিও মেনে নেয়া যাচ্ছে না। ড. ইউনূসকে খাতির করা হয়নি। কোন কিছুই শেখ হাসিনা মেনে নিচ্ছেন নাÑ এটি যুক্তরাষ্ট্র আর মেনে নিতে রাজি নয়। রাশেদ চৌধুরীকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়া সেই বার্তাই দিচ্ছে। যে আইনে মহিউদ্দিন আশ্রয় পাননি, সে একই আইনে রাশেদ চৌধুরীকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়, যুক্তরাষ্ট্রে আইন নিজস্ব গতিতে সব সময় চলে না, মাঝে মাঝে রাজনৈতিক সঞ্জিবনীতেও চলে। আমাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র এর মাধ্যমে এই বার্তাই দিচ্ছে শেখ হাসিনাকে, তার পরিণতি তার পিতার মতোই হতে পারে। সেই লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র হয়ত কাজ করে যাবে, হয়ত সেই কারণেই রাশেদ চৌধুরীকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে।

একই কা- করেছে কানাডা। তাদের আইনে আছে মৃত্যুদ- দেয়া যাবে না। আমাদের আইনে মৃত্যুদ- আছে। রাশেদ ও নূর চৌধুরীর বিচার হয়েছে যাকে বলে ‘ডিউ প্রসেস অব ল’ মেনে। বিচারে তারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। তাদের দ- দেয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা যে যুক্তিতে আশ্রয় দিয়েছে তা এক ধরনের নৈতিক স্খলন। এরা সাধারণ খুনী নয়। একটি দেশের জাতির জনক বা ‘ফাদার অব দ্য নেশনের’ খুনী, যার শিশুপুত্র ও পরিবারের অসহায় নারীদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এরপর চার জাতীয় নেতারও এরা হত্যাকারী। এদের তো সাধারণ হত্যাকারী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

পৃথিবীর যাবতীয় খুনী কানাডায় গেলে কি কানাডা রাজনৈতিক আশ্রয় দেবে? হামাস বা তালেবান বা আইএসের কাউকে আশ্রয় দেবে? দেবে না। বলবে টেররিস্ট। তা নূর চৌধুরী কি? কিছুদিন আগে এই কানাডাই কিন্তু কানাডীয় এক খুনী রোনাল্ড স্মিথকে যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তর করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যে এখনও মৃত্যুদ- কার্যকর।

নূর চৌধুরী শরণার্থী স্ট্যাটাসের জন্য আবেদন করে ১৯৯৯ সালে। ২০০২, ২০০৪, ২০০৫ এবং ২০০৬ সালেও তার আবেদন নাকচ হয়। কিন্তু, তারপরও কানাডীয় সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে নূরকে ফেরত দেবে না।

মানবিকতার নামে তারা যা করছে তা মানবতাবিরোধী। তারা ঘাতকদের অধিকার দাবি করছে। কিন্তু ভিকটিমেরও যে অধিকার আছে তা তারা মানতে রাজি নয়। এর একটি কারণ হতে পারে, তারা সব সময় ঘাতকের কাজ করেছে, সেই মানসিকতা এখনও দূর হয়নি।

এ পরিপ্রেক্ষিতে অন্য দিকটি না ধরলে অন্যায় হবে। যুক্তরাষ্ট্র যখন গণহত্যাকে সমর্থন করেছে তখন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ বাঙালীদের সমর্থন করেছে। জোন বেজ বব ডিলান বা জর্জ হ্যারিসন কি বাংলাদেশকে নিয়ে গান গাননি? হোয়াইট হাউসের সামনে কি মার্কিনীরা বিক্ষোভ করেননি? এডওয়ার্ড কেনেডি কি সিনেটে দাঁড়িয়ে বাঙালীদের পক্ষে জোর গলায় কথা বলেননি? বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নাগরিককে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ও কানাডার নীতিনির্ধারকরা একটি বিষয়কেই গুরুত্ব দেয়, তা হলো জনমত। এ কারণেই হয়ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত একবার স্টেট ডিপার্টমেন্টকে জানিয়েছিলেন, ধরা যাক কেনেডির খুনী লী ওসওয়াল্ডকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তাকে ফেরত চাইছে। বাংলাদেশ দিচ্ছে না। তা হলে যুক্তরাষ্ট্র [বা এর নাগরিক]-এর কেমন লাগত?

বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফিরিয়ে আনবার জন্য সরকার সরকারের মতো কাজ করুক। কিন্তু নাগরিক গ্র“পগুলো সমন্বিতভাবে একটি কাজ শুরু করতে পারে। তা’হলো বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফেরত চেয়ে দুই দেশের সরকারকে একটি স্মারকলিপি প্রদান। সেখানে নেয়া হোক না কোটি খানেক স্বাক্ষর। তারপর সেই স্মারকলিপি পৌঁছে দেয়া হোক ঢাকাস্থ দুই দেশের দূতাবাসে। এটি একটি আন্তর্জাতিক সংবাদে পরিণত হবে এবং দু’টি সরকারকেই সাধারণ মানুষের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।

শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য ২১ বার চেষ্টা নেয়া হয়েছে। মার্কিনী বার্তায় ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এ ধরনের প্রচেষ্টা আরও গ্রহণ করা হতেও পারে। শেখ হাসিনার জন্য আল্লার কাছে প্রার্থনা করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফেরত আনার জন্য তার সরকার যা করছে করুক। আমরা আমাদের এই সামান্য কাজটুকু করি না কেন?


মোল্লা বাহাউদ্দিন: কিছু কথা কিছু স্মৃতি : হাসানআল আব্দুল্লাহ

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০১৫

মোল্লা বাহাউদ্দিন: কিছু কথা কিছু স্মৃতি : হাসানআল আব্দুল্লাহ

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ছোটো গল্পকার মোল্লা বাহাউদ্দিন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। সোমবার রাত আনুমানিক এগারোটা তিরিশ মিনিটে টরন্টোর ইস্ট জেনারেল হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন।মোল্লা বাহাউদ্দিনের জন্ম ৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৬, কুমিল্লায়। তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয় নিউইয়র্ক শহরে লেখালেখির সূত্রে, সময়টা সম্ভবত ১৯৯১। আমার বয়স মাত্র ২৪ বছর, বছরখানেক আগে দেশ থেকে এসেছি ভাগ্যান্বেষণে। 

অন্যদিকে লেখালেখি চালিয়ে যাবার প্রত্যয়েও ঘাটতি ছিলো না। বাহাউদ্দিনের মতো একজন উদ্যোগী সংগঠক; একদা যিনি মুজিব বাহিনির উচ্চপদে যুক্ত ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর সাথে যাঁর একটি ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো, এবং যিনি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংক মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, পরবর্তীতে, প্রবাস জীবনে সৌদিতে মিনিষ্ট্রি অব ডিফেন্স এন্ড এভিয়েশনে চাকরী ইত্যাদি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই মানুষটির সাথে দেখা এবং সাহিত্য নিয়ে নিউইয়র্কে বসবাসরত কবি-সাহিত্যিকদের একত্রে বসার আহ্বান পেয়ে আমিও সচকিত হয়ে উঠেছিলাম। ইতিমধ্যে ‘প্রবাসী’র কাল পেরিয়ে ‘ঠিকানা’ ও ‘বাঙালী’ পত্রিকা আমাদের সাহস বাড়িয়ে দিয়েছিলো। সপ্তাহান্তে যেমন ‘বাঙালী’ ও ‘প্রবাসী’র সাহিত্য সাময়িকী, তেমনি মাস শেষে যুক্তরাষ্ট্র সাহিত্য পরিষদের ‘সাহিত্য আসর’ নব্বই দশকের শুরুতে নিউইয়র্কে উদীয়মান লেখকদের প্রাণের স্পন্দনে পরিণত হয়েছিলো। একে একে পরিচয় হয়েছিলো শক্তিমান গল্পকার জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, গল্পকার ও বিজ্ঞানী পূরবী বসু, বিশিষ্ট মানবতাবাদি আব্দুল মালেক, প্রবাসী সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মাদউল্লাহ, বাঙালী সম্পাদক কৌশিক আহমেদ, প্রাবন্ধিক হাসান ফেরদৌস, কবি ফরিদা সরকার, অনুবাদক ফরিদা মজিদ, লেখক ও একাউন্টেন্ড কাজী ফয়সল আহমেদ, ডা. ফয়সল খান, ডা. আকরাম হোসেন, কবি শামস আল মমীন, কবি আলেয়া চৌধুরী, ড. সলিমুল্লাহ খান, লেখক আলম খোরশেদ, আবৃত্তিকার মুজিব বিন হক, কবি ধনঞ্জয় সাহা, কবি আব্দুল্লাহ ফিরোজ, গল্পকার আনোয়ার শাহাদাত, শিক্ষাবিদ আফিফা খানাম, লেখক লিজি রহমান, আবৃত্তিকার ও সমাজ সেবক সউদ চৌধুরী, নাট্যব্যক্তিত্ব ঝর্ণা চৌধুরী, কবি জাহানার আখতার, কবি ও আবৃত্তিকার ডা. ফারুক আজমসহ কতো কতো সাহিত্যপ্রাণ বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীর সাথে। আমাদের প্রথম আসরটি বসেছিলো তারেক মাহবুবের বাসায়। সিদ্ধান্ত হয়েছিলো যে আসরে পঠিত প্রতিটি লেখার উপর চুলচেরা বিশ্লেষণ, আলোচনা-সমালোচনা হবে, প্রতিমাসে একজন করে আহ্বায়ক নির্ধারণ করে তাঁর উপরেই আসরের ভার দেয়া হবে, এবং এই সংগঠনের কেউ সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদে থাকবেন না, সবাই একই সাথে সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। ইতিমধ্যে সৈয়দ শহীদ তারেক মাহবুবের গাড়ির ট্রাংকে বই রেখে একটি ভ্রাম্যমান বইয়ের দোকানও শুরু করে দেন, পরে যার নাম হয় ‘অনন্যা’। বেশ কয়েকটি আসর বসেছিলো মোল্লা বাহাউদ্দিনের বাসায়। তখনও তিনি এম. বাহাউদ্দিন নামেই লিখতেন। তাঁর এই নাম পরিবর্তনের গল্পটিও বেশ মজার। গল্পগ্রন্থ ‘বিবিসাব’ প্রকাশের পর তিনি একটি নাতিদীর্ঘ উপন্যাস লিখে ফেললেন দেশ বিভাগ ও স্বাধীনতা যুদ্ধকে উপজীব্য করে। নাম দিলেন ‘সীমান্ত সংবাদ’। 

পাঁচ বছর নিউইয়র্কে কাটিয়ে ১৯৯৫ সালে আমি যখন প্রথমবারের মতো দেশে বেড়াতে যাই, বাহাউদ্দিন ওই উপন্যাসের পাঁচটি কপি আমাকে ধরিয়ে দিলেন। এর একটি দিলাম আহমদ ছফা’র হাতে, এবং অন্যগুলো প্রয়োজন মতো বাংলা বাজারের প্রকাশকদের। আহমদ ছফা উপন্যাসটি পছন্দ করলেন এবং ছাপতে দিলেন মাওলা ব্রাদার্সকে। কিন্তু এম. বাহাউদ্দিন নামটি তাঁর পছন্দ হলো না। টেলিফেনে তিনি বাহাউদ্দিনের কাছে জানতে চাইলেন, এম-এর অর্থ। এবং সাথে সাথেই লুফে নিয়ে বললেন, এখন থেকে আপনার নাম হোক মোল্লা বাহাউদ্দিন। সেই থেকে এম. বাহাউদ্দিন হয়ে উঠলেন মোল্লা বাহাউদ্দিন। তবে উপন্যাস প্রকাশ পাবার কিছুদিনের মধ্যে তিনি টরেন্টোতে যাওয়া আসা শুরু করলেন এবং এক সময়ে সেখানেই স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে স্থায়ী হলেন। মাঝে মাঝে তিনি অবশ্য যোগ দিতেন আমাদের মাসিক আসরগুলোতে। টরেন্টো যাবার আগে তাঁর ওজন পার্কের বাসাতেও একাধিক আসর হয়েছে। ভাবীর রান্না গরুর রেজালার কথা হয়তো এখনো অনেকের মনে আছে। আসরে ঢাকা ও কলকাতার বিশিষ্ট অনেক কবি সাহিত্যিকও বিভিন্ন সময়ে যোগ দিয়েছেন, যেমন, শামসুর রাহমান, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সৈয়দ শামসুল হক, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, সিকদার আমিনুল হক, শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ, মুহম্মদ নুরুল হুদা প্রমুখ।

অনেকের মতো কর্মব্যস্ত বাহাউদ্দিন যদিও লেখালেখিকে জীবনের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান করে উঠতে সক্ষম হননি, তবে তাঁর রচনায় সর্বদাই হাস্যরসের খোরাক পাওয়া যেতো। আসরে তিনি গল্প পড়ছেন আর দমকে দমকে শ্রোতারা হাসছেন না এটা কখনো হয়নি। তিনি সর্বদাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ ছিলেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যা অটুট ও অক্ষুণ্ন ছিলো। বহু বছর পর, মৃত্যুর মাত্র দেড় সপ্তাহ আগে যখন টরেন্টোতে স্বপরিবারে হাজির হলাম, প্রথম দেখায় তিনি আমার ১৫ বছরের সন্তান, একককে এমন ভাবে কাছে টানলেন যেনো তিনি ছিলেন তাঁর পরম আত্মীয়। দীর্ঘ আলাপের মাঝে তিনি ওখানে রাজাকারদের দৌরাত্মের কথা বলতে ভুললেন না। 

কিভাবে ওরা মুক্তিযোদ্ধা সেজে পুরস্কার গ্রহণ করছে তারও একটি উদাহরণ দিলেন। এমনই এক আয়োজনে কয়েকবছর আগে তাঁকেও পুরস্কৃত করার কথা উঠলে তিনি প্রতিবাদী কণ্ঠে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে জানালেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁকে সর্বদাই শ্রদ্ধা করেছি এবং কখনো, এমনকি কোনো বৈরী পরিবেশেও, দেখিনি শত্রুর সামনে মাথা নত করতে। লেখালেখিতে উৎসাহ দেয়া সহ অনেককেই তিনি সাহস যুগিয়েছেন উত্তর-আমেরিকার বাস্তবতায় টিকে থাকার। বাহাউদ্দিন টরেন্টোতে স্থায়ী হলে আমার স্ত্রী, নাজনীন সীমন, যিনি নিজেও একজন কবি ও গল্পকার, ও আমি ধরে ছিলাম যুক্তরাষ্ট্র সাহিত্য পরিষদের হাল। সীমন ছিলেন বাহাউদ্দিনের ছোটো বোনের মতো। এতো বছর পরেও সেই সম্পর্ক যেনো এতোটুকু ম্লান হয়নি। 

আগষ্টের শুরুতে টরেন্টোর সেই সন্ধ্যায় আমরা যেনো অনির্ধারিত একটি ‘সাহিত্য আসর’ করে ফেললাম। কিন্তু মাত্র ক’দিনের ব্যবধানে প্রকৃতির এই নির্মম পরিহাসও তারপর মেনে নিতে হলো। এনায়েত করিম বাবুল ভাইয়ের ছোট্ট একটি টেক্সট, ‘কাল রাতে মোল্লা বাহাউদ্দিন মারা গেছেন,’ যেনো একটি আর্তনাদের মতো শোনালো। কবিতায় একবার উচ্চারণ করেছিলাম, “শকুন শুয়োর থেকে আস্তে আস্তে নিজেদের ঘাড় মাথা/হৃৎপিণ্ডের ভেতর বাহির অনাক্রান্ত রাখার ক্ষমতা…।” হ্যাঁ, এই ক্ষমতা অর্জনের জন্যে মোল্লা বাহাউদ্দিন সারা জীবন সংগ্রাম করে গেছেন। রেখে গেছেন উত্তর-আমেরিকায় বেড়ে ওঠা নতুন সাহিত্য-পরিমণ্ডলের একটি ইতিহাস, আর বেশ কয়েকখানা গ্রন্থ: রোমন্থন (গল্প) বিবিসাব (গল্প) সীমান্ত সংবাদ (উপন্যাস) কালোরক্ত (উপন্যাস) স্বপ্ন নগরী নিউইয়র্ক(উপন্যাস) রাজাকারের জবানবন্দি (গল্প) ইত্যাদি। তাছাড়া অল্প কিছুদিন সম্পাদনা করেছিলেন ‘দৃষ্টান্ত’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা। তাঁর চলে যাওয়াতে আমরা গভীর ভাবে শোকাহত; উত্তর-আমেরিকার বাঙালী নামক ফুল থেকে আরো একটি পাপড়ি ঝরে গেলো, কিন্তু রয়ে গেলো অনেকটা সুবাস—স্মৃতি, সম্পর্ক, সাহিত্য।


সৈয়দ আশরাফের উপলব্ধি ও আওয়ামী আত্মীয় লীগ

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০১৫

Masuda-Vatti-C
মাসুদা ভাট্টি : বাংলাদেশের মতো উঠতি অর্থনীতির দেশে সমস্যার অন্ত থাকার কথা নয়। বিশেষ করে জনসংখ্যাকে আমরা যতই শক্তি মনে করি না কেন এই অপ্রশিক্ষিত, শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত বিপুল জনসংখ্যা কোনওভাবেই যে দেশের সম্পদ হতে পারে না তা বোঝার জন্য প-িত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এদের নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে এবং সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা দেখেছি, বিএনপি-জামায়াত জোট অত্যন্ত নগ্নভাবে ব্যর্থ হয়েছে। শুধু ব্যর্থ হয়েছে তা নয়, বরং তারা জাতীয় উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত বাজেটকে নিজস্ব, পারিবারিক ও দলীয় উন্নয়নে কাজে লাগাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। সেদিক দিয়ে বিচার করতে গেলে, বিএনপি-জামায়াত জোট রাজনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে বাংলাদেশকে একটি পুরোপুরি ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। সৌভাগ্যবশতঃ সেটা ঠেকানো গেছে এবং এর ফলে তারা যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে তা থেকে অন্যান্য রাজনৈতিক দল বিশেষ করে আওয়ামী লীগের যে ব্যাপক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে তা বলাই বাহুল্য।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ সত্যই বলেছেন যে, ৭৫-এ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করা যায়নি। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এখনও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় কিন্তু ক্ষমতার চোরাগলি বেয়ে যদি এরকম বানের জলের মতো অব্যবস্থা, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ঢুকে যেতে থাকে তাহলে আওয়ামী লীগের মতো বিশাল রাজনৈতিক দলের যে দৃঢ় ও মজবুত গণসমর্থনের ঢাল, তা আলগা হতে খুব বেশি সময় লাগবে কি? এবং সেই জনসমর্থন যদি ঢিলে হতে থাকে তাহলে আরেকটি ৭৫ ঘটানোর জন্য যে পক্ষটি মরিয়া হয়ে উঠেছে, আখেরে তারাই কি লাভবান হবে না? সৈয়দ আশরাফ সতর্ক করে দিয়েছেন সকলকে এই বলে যে- এখনও সময় আছে, দল ও দেশের স্বার্থে সর্বোপরি নিজেদের স্বার্থেই দল ও দেশকে বাঁচানোর চেষ্টা করে যেতে হবে।

তিনি মানুষ, রোবট নন। স্বাভাবিকভাবেই তার পক্ষে চাইলেও সব দিকে নজর দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি চোখ ফেরালেই যদি সে দিক অন্ধকারে নেমে যায় আর সেই অন্ধকারের সুযোগে প্রবীর সিকদারের মতো কাউকে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে নিয়ে গিয়ে জেলে ঢোকানো হয় তাহলে তার উন্নয়নযজ্ঞে যেমন বাধা পড়ে তেমনই দেশে ও বিদেশে যারা শেখ হাসিনার সরকারকে আর এক মুহূর্তও ক্ষমতায় রাখতে চান না তারাই মূলত শক্তিশালী হয়।

ধরে নিচ্ছি, সৈয়দ আশরাফ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলের নেতাকর্মীদের আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে তিনি চিন্তিত। অতএব, আসছে সময়ে আমরা আওয়ামী লীগের ভেতরে ও বাইরে যে খেয়োখেয়ি চলছে তা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ দেখবো। কিন্তু আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? সম্প্রতি প্রবীর সিকদারের গ্রেফতার ও জনগণের প্রতিবাদের মুখে তাকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই সবার আগে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

প্রশ্ন করতে পারেন, প্রবীর সিকদারকে তো মুক্তি দেওয়া হয়েছে, এ নিয়ে আলোচনার কী আছে? একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের অন্তঃর্ঘাতের জটিল, কুটিল ও হিংস্রতাকে থামিয়ে দলটিকে সুপথে ফেরানোর জন্যই এই আলোচনা জরুরি হয়ে উঠেছে। আমরা প্রতিদিনই লক্ষ্য করছি, প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা দেশব্যাপী ছুটে বেড়াচ্ছেন। কোনও না কোনও প্রকল্প উদ্বোধন করছেন। বক্তব্য রাখছেন, দিচ্ছেন নির্দেশনা। আজকের পত্রিকা হাতে নিন। দেখবেন গতকাল ছুটির দিনও শেখ হাসিনা কাজ করেছেন। প্রশ্ন হলো মন্ত্রিসভার মন্ত্রিরা কি কাল ছুটি ভোগ করেছেন? অনেক মন্ত্রীই হয়তো নিজের এলাকায় গিয়েছিলেন নির্বাচকদের সঙ্গে সময় কাটাতে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কাজের দৌড়ে অন্যান্য মন্ত্রী বা দলীয় নেতৃত্ব যেন সর্বদাই পিছিয়ে থাকছেন। হতে পারে, তাদের কাজ যতোটা গণমাধ্যমে হাইলাইট হওয়ার কথা ততোটা হচ্ছে না। কিন্তু সাধারণ মানুষের সঙ্গে মন্ত্রী, এমপি ও নেতাদের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা সৈয়দ আশরাফের কথায় যেমন স্পষ্ট, তেমনই সাধারণ মানুষও সেটা বুঝতে পারে।

ফিরে যাই প্রবীর সিকদারকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর বিশ্লেষণে। আমার মনে হয়, বিশেষ ঘটনাটি আসলে আওয়ামী লীগকে অন্তত ৭৪-এর বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। ওই আমলেও এরকম মন্ত্রিসভার ঘনিষ্ঠজনদের কারণে জনগণের সামনে বঙ্গবন্ধুকে খাটো হতে হয়েছে। শেখ হাসিনাকেও সেরকমটাই হতে হয়েছে। একথা আমরা অনেকেই বহুবার লিখেছি যে, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ কিংবা অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের সদস্যদের দ্বারা সংঘঠিত যে কোনো দুষ্কর্মের দায়ভার এসে পুরোটাই বর্তায় শেখ হাসিনার ওপর। জবাবদিহিতা আসলে মানুষ শেখ হাসিনার কাছেই আশা করে। ফলে যে বিশাল উন্নয়নযজ্ঞে তিনি নেমেছেন তা শ্লথ হতে বাধ্য। তিনি মানুষ, রোবট নন। স্বাভাবিকভাবেই তার পক্ষে চাইলেও সব দিকে নজর দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি চোখ ফেরালেই যদি সে দিক অন্ধকারে নেমে যায় আর সেই অন্ধকারের সুযোগে প্রবীর সিকদারের মতো কাউকে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে নিয়ে গিয়ে জেলে ঢোকানো হয় তাহলে তার উন্নয়নযজ্ঞে যেমন বাধা পড়ে তেমনই দেশে ও বিদেশে যারা শেখ হাসিনার সরকারকে আর এক মুহূর্তও ক্ষমতায় রাখতে চান না তারাই মূলত শক্তিশালী হয়।

৭৫-এর পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে শেখ হাসিনার সময় লেগেছিল ২১ বছর। এরপর কতো ২১ বছর জাতিকে গুণতে হবে সেটা ভাবলে সুস্থ মানুষকে অসুস্থ হতে হয়। সৈয়দ আশরাফ যা বুঝেছেন তা দিয়ে তিনি হয়তো দলকে পথে ফেরাতে পারবেন, কিন্তু আওয়ামী আত্মীয় লীগকে পারবেন কি?

বিষয়টি না বোঝার মতো নয়। আজকে যারা লুটপাটে ব্যস্ত তারা কি একবারও ভাবেন যে, শেখ হাসিনা যদি ক্ষমতায় না থাকেন, তাকে যদি এই লোভাতুর গোষ্ঠীর অপকর্মের কারণে বিদায় নিতে হয়- তাহলে বাংলাদেশ যে ভয়ঙ্কর বিপদগ্রস্ত হবে এবং তার ফলে তারা কোন বিপদে পড়বেন? তখন তাদের বাঁচানোর পথ কে বাতলে দেবে? নাকি, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যেমন আওয়ামী লীগেরই একটি অংশ সরকার গঠন করে শত্রুদের সামনে কচুপাতার ঢাল হিসেবে বসেছিলেন তাদেরই মতো এরাও অপেক্ষা করছেন সেরকম কোনও ঘটনার? আশ্চর্য হবো না সেরকম কিছু ঘটলেও। কারণ জাতীয় চরিত্রের এই দিকটি আমরা ৭৫-এই প্রত্যক্ষ করেছি। যাদের পক্ষে মন্ত্রী হওয়াতো দূরের কথা, রাজনীতিতে একটি চেয়ারও পাওয়ার কথা ছিল না, বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যা দুজনেই এমন অনেককে সুযোগ দিয়েছেন কাজ করার, পদ দিয়েছেন, ক্ষমতা দিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে তারাই নিজেদের লোভ আর ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে প্রশাসনকে দিয়ে প্রবীর সিকদারকে গ্রেফতারের মতো ‘দুর্ঘটনা’ ঘটিয়ে দিচ্ছেন।

এর ফলে মূলতঃ সমস্যা দেখা দিয়েছে দুদিকে- এক. দেশের ভেতরে আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার সরকারের যারা প্রচ্ছন্ন সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে তাদের মনে এক ধরনের ভয় ঢুকেছে- কাল যদি প্রবীর সিকদারের জায়গায় তার বেলায় এমন ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে? ঘটতেই পারে, যে কোনও মন্ত্রী বা নেতার কোপানলে তিনিও পড়তে পারেন, তাই না? দলীয় নেতাকর্মীদের বাইরে আওয়ামী লীগ তথা সরকারের এই যে বিশাল প্রচ্ছন্ন সমর্থক গোষ্ঠী, তারাই আসলে প্রকৃত সমর্থক, কারণ এদের সমর্থন কোনও কিছুর বিনিময় দাবি করে না। বরং, তারা এক ধরনের স্বার্থহীন সমর্থন দিয়ে সরকারকে ক্রমাগত শক্তিশালী করে রাখে। এখন এই বিশাল গোষ্ঠীটিই যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে কিংবা সরকারের হাতে নিগৃহীত হওয়ার আশঙ্কায় আক্রান্ত হয় তাহলে অন্তে সরকারই যে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেটা সৈয়দ আশরাফ বুঝলেও আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাকর্মীরা কতটা বুঝেছেন তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়।

দুই. প্রবীর সিকদারের বেলায় আরেকটি বড় বিষয় আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আহত করেছে। তা হলো বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায় আসলে আওয়ামী লীগের আমলেও নিরাপদ নয়। অন্তত এদেশে সেক্যুলার রাজনৈতিক দর্শনের দাবিদার হিসেবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার কথা। কিন্তু সে দাবিকে হাস্যকর প্রমাণ করেছে প্রবীর সিকদারের ঘটনায়। যেহেতু এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের নাম জড়িত সেহেতু সরকারকে এ জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। শোনা যাচ্ছে, এই ঘটনার খলনায়ক মন্ত্রী জমি দখলের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের বাইরেও প্রেস কনফারেন্স করে তার শিকারের মুখ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করছেন। এতে যে ঘটনা আরও বাজে মোড় নেবে এবং তার ছড়ানো দুর্গন্ধে যে গোটা সরকারের ভিতই নড়বড়ে হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে সেটা তিনি কোনওভাবেই বুঝতে পারছেন বলে মনে হয় না।

বর্তমান সরকারের ঘনিষ্ঠতম আন্তর্জাতিক মিত্রের সঙ্গেও এই ঘটনা বিরূপ সংঘাতের সৃষ্টি করতে পারে। এটা আওয়ামী আত্মীয় লীগের ব্যক্তিটি বুঝতে পারছেন বলে প্রত্যয় হয় না। প্রশ্ন হলো, এই না-বোঝার প্রভাব আমরা ইতোমধ্যেই লক্ষ্য করতে শুরু করেছি। কিন্তু সে বিষয়ে লেখার সুযোগ এখানে নেই। কিন্তু একথা বলতে চাই যে, এই আন্তর্জাতিক মিত্রকে কোনওভাবে আহত করে শেখ হাসিনাকে ক্রমশ শক্তিহীন-মিত্রহীন করার কৌশল কোনও প্রকৃত আওয়ামী লীগারের কম্মো হতে পারে না।

আওয়ামী লীগ এখনও জামায়াত-বিএনপির তুলনায় অজনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। সেটা জনগণ এখনও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। আর সে কারণেই জনগণ আওয়ামী লীগকে সুযোগ দিয়ে চলেছে। কিন্তু ওই সমর্থন ঘৃণায় পরিণত হওয়ার আগেই যদি ব্যবস্থা না নেওয়া যায় তাহলে কেবল আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নয়, ‘৭৫-এ যেমন একটি জাতিকে ধংস করা হয়েছিল তেমনই আওয়ামী লীগকে সরানোর মধ্য দিয়ে একটি এগিয়ে যাওয়া অর্থনীতিকে ধংস করা হবে। ৭৫-এর পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে শেখ হাসিনার সময় লেগেছিল ২১ বছর। এরপর কতো ২১ বছর জাতিকে গুণতে হবে সেটা ভাবলে সুস্থ মানুষকে অসুস্থ হতে হয়। সৈয়দ আশরাফ যা বুঝেছেন তা দিয়ে তিনি হয়তো দলকে পথে ফেরাতে পারবেন, কিন্তু আওয়ামী আত্মীয় লীগকে পারবেন কি? বাংলাট্রিবিউন
লেখক: কবি ও কলামিস্ট


ভাসা মিউসেট : দ্বিতীয় পর্ব - - তরূন বড়–য়া

শনিবার, ২২ আগস্ট ২০১৫

সত্যি বলতে কী? মনে এমনটাই যাচ্ছিল। কোন বিপদে না পড়লাম। ছেড়ে যেতোও পারছি না। পেছনে আঠার মত লেগে আছে। সত্যি সত্যি, সারলোক হোমস্ অমনিবাস!! সেড়েছে আমার। কী ঝামেলায় না পড়লাম। আমার এখন পালাতে ইচ্ছে হচ্ছে!! কিন্তু পালালে পার পাবো না। এক সেকেন্ডে অন্য জন ফলো করবে। কিসে পড়লাম গো। তরুন তুমি কোথায় গেলে? আমি তো ভেবেছি , তুমি কি চলে গেলে। বেশতো! এই ভাসা স¤বন্ধে কি জান বল আমাকে। আমাকে কিছু আইডিয়া নিয়ে যেত হবেতো। দেখ, আমি মিলিটারী ইতিহাস পরেছিলাম। সেখানে এটা সর্ম্পকে এবং ইউএসএস কন্সটিটিউশন  সম্বন্ধে জেনেছিলাম। এবার আমি স্থির জেনেনিলাম সে সিক্রেট সার্ভিসের লোক। না, হলে এই সব বিষয় সর্ম্পকে এত কম বয়েসে জানবার বিষয় নয়। ভালই হলো, চোর চামাড়ের হাত থেকে বাঁচা যাবে। বিনে পয়সায় একজন ডিটেকটিভ পাশে পাশে ঘুরছে। বুঝতে পারলাম আজ সূর্য ডোবা র্পযšত ওর ডিউটি। অসুবিধে নেই। এর ফাকে কিছু ছবি তুলে নিই। স্যরি, ইউ গেট্ এ রং গাই। ইউ স্যুড গেট্ এ্যা ক্রিমিন্যাল। স্যরি আই কেন নট্ গিভ এনি জব্। এই ভাসা জাহাজের সর্ম্পকে তুমি কি জান,বলবে কি?
 তবে শোন! রেনেসন্সের একটা প্রভাব এখানে ছিল। কিভাবে। ছিল এরকম। গু¯তাভ কিং শিক্ষিত এবং ইতিহাসে পারদর্শী ছিলেন। ১৬শ ও ১৭শ শতাব্দীতে ইওরোপে ধর্মদর্শনের প্রভাবে ভাটা পড়ে আসে। ধর্মভিত্তিক সমাজ, লোকাচার, শিল্প রেনেসন্সের উন্মুক্ত দর্শনের কাছে অন্ধকারচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। মানবিকবোধমাথা চাড়া দিয়ে ওঠে যায়। আমি জানি তুমি থেমে যাবে তোমার কাজ শেষ হল্ ে। যত জ্ঞান দেবার দিয়ে যাও।
453
তবে আমি জ্ঞানের এবং এত অল্প বয়েসে যে এত কিছু তুমি জান আমার প্রশংসায় কুলায় না। এই সব জিনিষ জানতে হলে, অনেক শতাব্দী অপেক্ষায় থাকতে হয়। অবাক হচ্ছি কিভাবে জানলে তুমি? আসলে বিদেশে ছেলে মেয়েরা লেখা পড়া করে। বাংলাদেশে  কোনদিন এইসব জিনিষ কিছুতেই জানতে পারিনি। আধুনিক জেনারেশন নিশ্চয়ই জেনে থাকবে। আমি তাই আশা করছি।  গৌরী আমাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কোন জেনারেশনের? দেখ! আমি তোমদের অন গোয়িং জেনারেশনের। কারন টা কি জান? কম্পিউটার সায়েন্স বের হলো, উইনডো , ডস্ থেকে মুক্তি পেয়ে আমাদের হাতে আসে? মাত্র দেড় যুগের কথা। তারপর ইন্টারনেট প্রতিটি ঘরে ঘরে একটি দুটি পিসি। এখন প্রতিটি হাতে এবং আমরা তোমদের সাথে আছি। অলওয়েজ নেক্সট্ জেনারেশন! দ্যাট্ মিন্স, আই এ্যাম নট্ অবসোলিট॥ । দ্যি ডিফারেন্স অব এইজ্ । আই এ্যাম স্যরি। ডাজ নট্ ওয়ার্ক এনি মোর। আই ক্যান অলওয়েজ রিফারবিশ্ মাইসেল্ফ। তরূন ইউ আর রিয়্যালী ব্রিলয়িান্ট। আই হেভ ট্যু এডমিট। বিকজ্ সাম ডে। আই উইল বী ইন ইউর র্কোস। ইয়েস্ মাই ডিয়ার। অল উই ড্যু। সো ড্যু আই!  
 তারপর। আমি ভাবছি অজ্ঞ্যানীর মত। অবোধের মত। মাত্র আর কয় ঘন্টা ? দু’জনে দু’পথে ছিড়ে যাব। একজন ড্রটি্এ্যংাটান আর তুমি যাবে ৩৮ ভাসাগাট্যান, স্টকহোল্ম। তরূন সাহস করে বলে দিলো। কাল তোমার প্ল্যান কেনস্যাল করে দাও। একসাথে আমরা ইউরো রেইলে ডেন্মার্কে যাবো। আমার কোন অসুবিধে নেই। মাই রেইল ইজ ওপেন। এন্ড আই উইল বাই ইউুর টিকেট। হাও ইজ দ্যাট্? দ্যাট ভেরী টেম্পটটিং।  এট্ লিস্ট ইউ রিকগনাইজ। ক্যান আই ট্যাল ওয়ান থিং, মে বি ইউ ডোন্ট লাইক। মাই ড্যাড্ মেনিটাইমস্ টোল্ড মি ট্যু রাইট ফিক্সান। আই থিং হি হিজ্ কোয়াইট ওল রাইট। ইউ অলসো ক্যান র্স্টাট নাও। হাও? ইটস্ মি উইথ্ ইউ? ক্যান দ্যাট লীড্ ট্যু??? আই রিয়্যালী ডোন্ট হাও কুড্ ইউ অফার ? ইউ আর ভেরী জেনারাস॥ এত কিছু বলে এলাম।
তিনিও বল্লেন। দিস্ ক্যান বি এ্যা ট্রিক॥ সী ডাস্ নট্ অ্যানসার মি? লেট্ মি ট্রাই।

 তরূন কিছু খাবে? ইউ লুক টার্য়াড। নো। আই লুক সেড্ । ওহাই! বিকজ্ আই উইল মিস্ ইু ফর এভার সুন্ । স্টিল উই হেভ্ সাম টাইম। উই ক্যান স্পেন্ড ইন গুড । মনে হল। কথাটা এমন শোানল। পৃথিবীটা ধ্বংস হবার সময় এখনো বাকি আছে। আর কয়েক প্রহর আমাদের ভাল যেতে পারে।
খাবার আমার দরকার নেই। এখন যে “কক্সকম্বে” আটকে গেছি। এটা থেকে আদৌ মুক্তি পাবো কী?
গৌরী বলেছে, “ডু ইউ নো এবাউট ইউ এস এস “ ওল্ড আয়রন সাইড” এখন বস্টনে নোংগড় করে আছে। মেটালিক ইকনমিক্স পড়তে হলে মিলিটারী হিস্টরীর সাথে কিসের যোগাযোগ। ক্যোন ইউ টেল মি ওয়াট দ্যা হিস্ট্রী ইজ।  দেখতে এতো “ইনোসেন্ট” , এই দুর্বলতাও মনে কাজ করতে লাগলো। ভাবলাম আমিতো পুরূষ। ডেলেই্লা এত ভালবাসা দিল স্যামসনকে। কিন্তু  মহাকবি মিল্টন তবুও ধরে রাখতে পারেন নি। ডেলেইলা, সত্যি সত্যি প্রতারনা করে এবং স্যামসনের  ট্রাজিক মৃত্যু হয়। অসুবিধা কী। মরলে না হয় মরলাম। তার আগে আমার কি হবে। আমার মাথায় চুল নেই। ভয়ও নেই । চুল গজালে আরো ভালো। পালাবো। সুইডেন মানব অধিকারের দেশ। অত সহজ নয়। সহজ নিজ দেশে। মাজারেটি দিয়ে মাথা থেকে পা পর্যšত সমান ভাগে কেটে নেবে? এই আমার দেশ। এই হচ্ছে, সব দিন পত্রিকায় আসছে। দূর বোকা! কি বলতে কি বলে যাও। মাথায় চুল নেই , তাহলেতো আরো ভয় বেশী। স্যামসনের চুল কাটাতে ওর সব শক্তির বিনাশ হয়। আমার হাতটা ওর হাতে তুলে নিল। তোমার হাত এত ঠান্ডা কেন?ভয়ে? কিসের ? সত্যি বলতে নেই। দেখ , একটু পরে তুমি চলে যাবে। তাই।  


মরুকরণের সঙ্গে তলিয়েও যাচ্ছে বাংলাদেশ - আলম শাইন

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০১৫

alam
বৈশ্বিক উষ্ণায়ণের ফলে সবুজ সুশোভিত ষড়ঋতুর দেশ নামে খ্যাত বাংলাদেশের জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে গ্রীস্মের তাপমাত্রা যেমনি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে তেমনি ঠান্ডাও অনভূত হচ্ছে বেশি। বেড়ে গেছে নানা রোগের সংক্রমণও। ঋতুচক্রে দেখা দিয়েছে বিশাল হেরফের। আগের মতো এখন আর প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে যথাসময়ে ঋতুর আবির্ভাব ঘটছে না। ঋতুর সংখ্যাও  হ্রাস পেয়েছে। এ কারণে গ্রীস্ম, বর্ষা, শীত ব্যতিত অন্যসব ঋতুর আমেজ উপভোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়াও বিলম্বিত হচ্ছে শীত, বর্ষার আগমন অথবা অসময়ে ভারি বর্ষণ কিংবা ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। যেকোন এলাকা মরুকরণের প্রাথমিক আলামতই হচ্ছে এসব। আর এ আলামতটি পরিলক্ষিত হচ্ছে সমগ্র বাংলাদেশেই। দেশের বরেন্দ্র অঞ্চল নামে খ্যাত নওগাঁ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আবহাওয়ায় মরুময়তার লক্ষণ অন্যসব এলাকার তুলনায় বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। অথচ একটা সময়ে এতদাঞ্চলের আবহাওয়া ছিলো নাতিশীতোষ্ণ। সেই সুষম আবহাওয়া এখন আর বিরাজ করছেনা। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বছর দশেক ধরে গ্রীস্মকালে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এবং শীতে সবচেয়ে বেশি ঠান্ডা অনভূত হচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলে। গত শীত মৌসুমে তাপমাত্রা প্রায় হিমাঙ্কের কাছাকাছি চলে গিয়েছে, আর চলতি গ্রীস্মে ৪০-৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করছে। উল্লেখ্য, কোন এলাকা মরুকরণের জন্য বৈরি  আবহাওয়ার সঙ্গে ৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাই যথেষ্ট। উদহারণস্বরূপ বলা যায়, উত্তর আমেরিকায় অবস্থিত ‘সোনোরান’ মরুভূমির কথা। এটি উত্তর আমেরিকার শুস্ক ও উষ্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে একটি। গ্রীস্মকালে সেখানকার তাপমাত্রা ৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে। শীতকালে গড় তাপমাত্রা থাকে ১০ থেকে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাতও তেমন সন্তোষজনক নয়। সোনোরান মরুভূমির তাপমাত্রার পরিসংখ্যান মোতাবেক বলা যায় আমাদের দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের তাপমাত্রা তারচেয়েও ভয়ানক। রক্ষা পেয়েছে শুধুমাত্র বৃষ্টিপাত এবং যৎসামান্য বনজ সম্পদের কারনে। এখানে সোনোরান মরুভূমির তুলনায় বৃষ্টিপাত একটু বেশি বিধায় মরুকরণ প্রক্রিয়া খানিকটা বিলম্বিত হচ্ছে। জলবায়ুর সামগ্রিক পরিসংখ্যানে দৃষ্টি দিলে নি:সন্দেহে বলা যায় এটি আমাদের বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্যে মহাবিপদ সংকেত।
বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের মরুকরণ নিয়ে বিশ্বের পরিবেশ বিশেষজ্ঞদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ হয়েছে। তারা সতর্কবার্তাও পাঠিয়েছেন আমাদের। মার্কিন ভূ-বিজ্ঞানী ড.নারম্যান ম্যাকলিয়ও যিনি সাহারা মরুভূমি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন, তিনি   জানিয়েছেন,‘সাহারা মরুভূমি শুরু থেকে যেভাবে মরুকরণের দিকে এগিয়েছে, ঠিক একই কায়দায় বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের মরুকরণ পক্রিয়া শুরু হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের বাতাসেও সাহারা মরুভূমির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো আগুনের ফুলকি বেরোচ্ছে’। মার্কিন ভূ-বিজ্ঞানীর দেয়া এ তথ্যের প্রেক্ষিতে আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি যে, আমাদের বরেন্দ্র অঞ্চলের ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা জানি, মরুকরণ প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিক ভাবে ঘটে না, খুব ধীরে ধীরে সংঘটিত হয়। এ নিয়ে তর্ক-বিতর্কের যথেষ্ট সুযোগ থেকে যায়। মানুষকে তাৎক্ষণিকভাবে বুঝানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্বাসের চেয়ে অবিশ্বাসই আঁচড় কাটে বেশি। কারন একবার মরুকরণ পক্রিয়া শুরু হলেও দেখা যায় এটি পরিপূর্ণতা পেতে অর্ধশতাব্দী বা তারও বেশি সময় পেরিয়ে যায়। ফলে মানুষের মাঝে বিতর্ক লেগেই থাকে। অর্থাৎ মরুকরণের পরিপূর্ণতা দেখে যেতে হলে একটা মানুষের জীবদ্দশায় তা সম্ভব হতে না-ও পারে। আবার হতেও পারে। সেটি নির্ভর করবে পরিবেশ বিপর্যয়ের পরিমাণের ওপর।
সূত্র মতে জানা যায়, বিশ্বে প্রতি মিনিটে ৪৪ হেক্টর আবাদী ভূমি এবং ২০ হেক্টর বনভূমি মরুকরণ হচ্ছে। সে হিসেব মোতাবেক দেখা যায় বছরে ৭০ লাখ হেক্টর জমি মরুকরণ হচ্ছে। মরুকরণের প্রভাবে পড়ে উত্তর আমেরিকার ৪০ শতাংশ আবাদি ভূমি মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। অপরদিকে সাহারার দক্ষিণ অংশে গত ৫০ বছরে ছয় লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি গ্রাস করে নিয়েছে মরুভূমি। জাতিসংঘের তথ্য মোতাবেক জানা যায়, পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে প্রতি বছর বিশ্বের কোন না দেশে প্রায় দুই বর্গ কিলোমিটার এলাকা মরুকরণ হচ্ছে। এটি সমগ্র বিশ্বের মানবগোষ্ঠীর জন্য একটি বিস্ময়কর সংবাদ। এ জন্য দায়ীও মানবকুল। পরিবেশের বিপর্যয় ঘটিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়িয়ে দেয়ার নেপথ্য নায়ক ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলো। বড় বড় শিল্পকারখানা, পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ, নির্বিচারে বন উজাড়, নদী শাসন ইত্যাদির ফলে দারুণভাবে পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে সমগ্র বিশ্বে। মেরু অঞ্চলের বড় বড় বরফের চাঁই গলে সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা একদিকে বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে মরুকরণ হচ্ছে পর্যাপ্ত জলের অভাবে  আরেক এলাকা । যার প্রধান শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া দুই মেরুর বরফ গলার ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল ছাড়াও মালদ্বীপ, মুম্বাই, ইন্দোনেশিয়া, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, ফিজি, মার্শাল আইল্যান্ড, মিশরের ব-দ্বীপ অঞ্চল, টোকিও, লন্ডন, নিউইয়র্ক ও ভিয়েতনামের উপকূলীয় শহর সমুদ্রে তলিয়ে যাবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দু’ভাবেই আক্রান্ত হচ্ছে এ দেশ। প্রথমত, দেশের দক্ষিণাঞ্চল তলিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে। দ্বিতীয়ত, দেশের উত্তরাঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হতে যাচ্ছে জল সংকটের কারনে।   অর্থাৎ জল বৃদ্ধি এবং জল হ্রাস দু’টি সমস্যাই এ দেশের জন্য প্রকট হয়ে দাঁড়াচ্ছে।  
ফারাক্কা বাঁধের ফলে পর্যাপ্ত জল বাংলাদেশের নদ-নদীতে প্রবাহিত না হওয়ায় নদীগুলো শুকনো মৌসুমে শুকিয়ে চৌচির হয়ে হয়ে পড়ছে এবং তারই প্রভাবে মরুকরণ তরান্বিত হচ্ছে। আবার গোদের ওপর বিষফোঁড়ার উৎপত্তি হতে যাচ্ছে টিপাইমুখ বাঁধের মাধ্যমে। জানা যায়, এ বাঁধের দৈর্ঘ্য ১৫০০ ফুট এবং উচ্চতা ৫০০ ফুট। বিশাল এ বাঁধ নির্মাণ হলে বাংলাদেশের সিলেটসহ এক তৃতীয়াংশ এলাকা এবং ভারতের মিজোরামপুর, মনিপুর, অসামের নৌপরিবহন, কৃষি, মৎস্যসম্পদের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হবে। শুধু সিলেট ও মৌলিভীবাজারের ৩৫ হাজার ৩৪৩ হেক্টর জমি বিরান হয়ে যাবে। এ বাঁধের ফলে মরুকরণের পাশাপাশি সমুদ্রের লোনাজল ওপরের দিকে উঠে আসবে। এতে সুপেয় জল সংকট দেখা দেবে। যেমন দেখা দিয়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলার ফলে। চরমভাবাপন্ন জলবায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাবে তখন মহাদুর্যোগ। জীববৈচিত্র পড়বে অস্তিত্ব সংকটে। বনভূমি বিরান হয়ে দেশের উত্তরাঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হবে আরো দ্রুত। ইচ্ছে করলেও মরুকরণ ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না কারো পক্ষে। আমরা যদি এখুনি এ মহুর্তে সতর্ক হতে  পারি তাহলে হয়তো বিপর্যয় কিছুটা ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমাদেরকে বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করা। যে কোন উপায়ে ভারতকে বুঝাতে সক্ষম হতে হবে যে, তিস্তার জলের ন্যায্য হিস্যা রয়েছে বাংলাদেশেরও। এটি রোহিত সম্ভব হলে কঠোর আইন প্রয়োগ করে বৃক্ষ নিধনসহ বন্যপ্রাণী নিধন বন্ধ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে প্রকৃতির সৃষ্টি প্রতিটি সন্তানই কোন না ভাবেই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মশা থেকে শুরু করে হাতি পর্যন্ত সবাইকে আমাদের প্রয়োজন পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষার্থে। এ সত্য তথ্যটি মানুষকে জানাতে হবে, বুঝাতে হবে। মরুকরণরোধে পাখ-পাখালির ভূমিকা যে অপরিসীম তা-ও জানান দিতে হবে মানুষকে। বিশেষকরে পরিযায়ী পাখিদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগও রয়েছে দেশের মানুষের। প্রধান অভিযোগটি হচ্ছে ওরা নাকি আমাদের ফল-ফলাদি কিংবা শস্য-বীজ খেয়ে ফেলে। অভিযোগটি একবারেই মিথ্যেও নয়,ওরা মানুষের ফসলাদি নষ্ট করছে ঠিকই কিন্তুু সেই ক্ষতিটি আমাদের জন্যে ‘শাপে বর’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যেমন পাখি আমাদের ফল খেয়ে ফেলেছে সত্যি, কিন্তুু ফলের বিচিগুলো মলত্যাগের মাধ্যমে মাটিতে ফেলে দিচ্ছে। এতে করে দুর্গম এলাকায়, নবদ্বীপসমূহে ও রুক্ষভূমিতে বনায়ন সৃষ্টিতে সহায়ক হচ্ছে। আর বনায়ন সৃষ্টির মানেই হচ্ছে মরুকরণের প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া। তাই আমাদের উচিত হবে যে কোন ধরনের বন্যপ্রাণীর প্রতি সদয় হওয়া। তাতে করে আমাদের লাভ বৈ লোকসান হবে না। পাখ-পাখালির কল্যাণে শুধু মরুকরণরোধই নয়, আমরা পাচ্ছি নির্ভেজাল অক্সিজেন ফ্যাক্টরিও। কাজেই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে দেশের প্রতিটি নাগরিককে। তাহলে হয়তো এ যাত্রায় আমরা কিছুটা হলেও নিস্তার পাব।
লেখক : আলম শাইন, কথাসাহিত্যিক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ। এই ইমেইল ঠিকানা স্পামবট থেকে রক্ষা করা হচ্ছে।এটি দেখতে হলে আপনাকে JavaScript সক্রিয় করতে হবে।


বিভীষিকাময় ২১ আগস্ট

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০১৫

এম নজরুল ইসলাম : ইতিহাসে কিছু আলোকিত, উজ্জ্বল দিন থাকে। আছে কিছু কালো দিন। আলোকিত দিনগুলো যেমন মহান কীর্তির কথা মনে করিয়ে দেয়, তেমনি কালো দিনগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় শিউরে ওঠার মতো কিছু স্মৃতি। আজ ২১ আগস্ট, ইতিহাসের তেমনি এক বিভীষিকাময় দিন। সাল ২০০৪। দেশে তখন চলছে জামায়াত-বিএনপি জোট সরকারের অপশাসন। তাদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় দেশজুড়ে বিস্তৃত হচ্ছিল ঘৃণ্য জঙ্গীবাদ। কোথাও কোথাও প্রশাসনের সমান্তরালে তখন জঙ্গী শাসন শুরু হয়ে গিয়েছিল সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে।
২০০৪ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউতে জননেত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় বোমা ও গ্রেনেড হামলা করা হয়। এতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী নিহত হন এবং গুরুতর আহত হন দুই শতাধিক নেতাকর্মী। বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউ সেদিন রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। হতাহত নেতাকর্মীদের আর্তনাদ ও বাঁচানোর আকুতিতে সৃষ্টি হয়েছিল এক হƒদয়বিদারক দৃশ্যের। দলীয় সভানেত্রীকে বাঁচানোর জন্য ট্রাকের ওপর মানববর্ম রচনা করেছিলেন আওয়ামী লীগের নেতারা। সেদিনের গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত আইভী রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মারা যান ২৪ আগস্ট। ওই দিন নিহত হন মোস্তাক আহমেদ সেন্টু, ল্যান্স কর্পোরাল (অব) মাহবুবুর রশীদ, রফিকুল ইসলাম আদা চাচা, সুফিয়া বেগম, হাসিনা মমতাজ রীনা, লিটন মুন্সী ওরফে লিটু, রতন সিকদার, মোঃ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, মামুন মৃধা, বেলাল হোসেন, আমিনুল ইসলাম, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারী, আতিক সরকার, নাসিরউদ্দিন সর্দার, রেজিয়া বেগম, আবুল কাশেম, জাহেদ আলী, মমিন আলী, শামসুদ্দীন, আবুল কালাম আজাদ, ইছহাক মিয়া এবং অজ্ঞাত পরিচয় আরো দুজন। হামলায় আহতের মধ্যে ছিলেন জিল্লুর রহমান, আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, মোঃ হানিফ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, এ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, কাজী জাফরউল্লাহ, ওবায়দুল কাদের, ড. হাছান মাহমুদ, আব্দুর রহমান, আখতারুজ্জামান, এ্যাডভোকেট রহমত আলীসহ পাঁচ শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়ে অনেকে কিছুটা সুস্থ হলেও পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে অনেককে। সেদিনের সেই দুঃসহ স্মৃতি প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাদের। সেই দুঃস্বপ্নের দিন আজ, ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার একাদশ বার্ষিকী।
সেদিনের ঘটনাপঞ্জির দিকে তাকানো যাক। মিছিল উপলক্ষে বিকেল ৪টা থেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষে ভরে ওঠে বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউ। ৫টার দিকে বুলেট প্রুফ গাড়িতে করে সমাবেশস্থলে পৌঁছান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। বক্তৃতায় তিনি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা এবং দেশব্যাপী বোমা হামলা বন্ধে সরকারকে হুঁশিয়ার করেন। প্রায় ২০ মিনিট বক্তৃতা শেষে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল শুরুর ঘোষণা দেয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে শুরু হয় গ্রেনেড হামলা। পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এরপর শেখ হাসিনার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। নিক্ষিপ্ত গ্রেনেডগুলোর মধ্যে তিনটি অবিস্ফোরিত থেকে যায়। শত শত মানুষের আর্তচিৎকার, ছড়িয়ে থাকা ছিন্নভিন্ন দেহ, রক্ত আর পোড়া গন্ধ, সব মিলিয়ে বীভৎস অবস্থার সৃষ্টি হয় পুরো এলাকায়। আহতদের সাহায্য করার বদলে বিক্ষুব্ধ এবং আহত মানুষের ওপর বেপরোয়া লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে তৎকালীন সরকারের পুলিশ। মুহূর্তের মধ্যে দোকানপাট ও যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে পালাতে শুরু করে সবাই।

Picture
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাণনাশের উদ্দেশ্যেই গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। অথচ বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সংঘটিত এ হত্যাকা- নিয়ে সেদিন সংসদে কোন শোক প্রস্তাবও তুলতে পারেনি আওয়ামী লীগ। শোক প্রস্তাব তুলতেই দেয়া হয়নি। জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে পরিচালিত সেদিনের সেই গ্রেনেড হামলায় যে চারদলীয় জোটের ইন্ধন ছিল তা আজ অনেকটাই প্রমাণিত সত্য। আর, সে কারণেই সেদিন জোট সরকার গ্রেনেড হামলার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল। সিআইডিকে দিয়ে সাজানো হয়েছিল জজ মিয়া প্রহসন।
বর্বর এ হত্যাকা-ের ঘটনা মনে হলে আজও গা শিউরে ওঠে। কোন গণতান্ত্রিক, স্বাধীন ও সভ্য দেশে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে প্রকাশ্য দিবালোকে জনসভায় এমন বর্বরোচিত ঘটনা ঘটতে পারে, তা ভাবনারও অতীত। গ্রেনেড হামলার ঘটনার পর এলাকায় নিয়োজিত পুলিশ হামলাকারীদের আটক করার ব্যাপারে কোন চেষ্টা কি করেছিল? এ প্রশ্নের মীমাংসা আজও হয়নি। গ্রেনেড হামলার পর দ্রুত ঘটনার আলামত নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। এত বড় একটি হত্যাকা-ে চারদলীয় জোটের অনেক নেতা শোক প্রকাশের বদলে হামলার জন্য আওয়ামী লীগকেই দায়ী করে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছিলেন। বিরোধীদলীয় নেতার জনসভায় এ রকম পৈশাচিক হামলার পরও দুঃখ প্রকাশ কিংবা লজ্জিত হওয়া তো দূরে থাক, আমাদের নষ্ট রাজনীতির নির্লজ্জ ঐতিহ্য ধরে তৎকালীন সরকারী দলীয় নেতৃত্ব হামলার জন্য উল্টো আওয়ামী লীগকেই দোষারোপ করে। মামলার তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার নানা চেষ্টা করা হয়।
বিগত জোট সরকারের সময় তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে এ দেশে জঙ্গীবাদ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছিল, এ সত্য আজ আর অস্বীকার করা যাবে না। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানী ঢাকার এক জনাকীর্ণ স্থানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভায় যে বর্বরোচিত ঘটনা ঘটানো হয়েছিল, সেটি যে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এক ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নীলনক্সা ছিল তাও এখন সবার কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে একটি চিহ্নিত অপশক্তি দেশ-জাতিকে উল্টোপথে ঠেলে দিতে চেয়েছিল, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ঘটনা এরই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। অবশ্য এর আগেও এমন অপচেষ্টা ওরা করেছিল কোটালীপাড়ায় জননেত্রী শেখ হাসিনার জনসভাস্থলে বোমা পুঁতে রেখে।
২১ আগস্টের ঘটনার সময় যে দল বা জোট ক্ষমতায় ছিল, তারা সে হামলার ঘটনার কোন বিচার করেনি। সেই ২৪ জনের হত্যার বিচার করেনি তৎকালীন সরকার। তদন্তের ভান করেছিল। ইন্টারপোলের সাহায্য নেয়ার কথা বলা হয়েছিল। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সাহায্য নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপর চুপচাপ ছিল সেদিনের সরকার। এতেই স্পষ্ট হয় এই গ্রেনেড হামলার পেছনে তৎকালীন জোট সরকারের হাত ছিল। জঙ্গী-জামায়াতবেষ্টিত সরকার চেয়েছিল বাংলাদেশ থেকে প্রগতিশীলতার ধারা মুছে ফেলতে। চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি চিরতরে নির্বাসনে পাঠাতে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। সত্যের জয় কোন কিছুতেই ঠেকিয়ে রাখা যায়নি।
শরতে বাংলার আকাশের রং বদলে যায়। বর্ষায় যে আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা, সেই আকাশই শরতে শ্বেতশুভ্র। আকাশে যেমন সাদা মেঘের ভেলা, মাটিতে শিউলি ও কাশ যেন প্রকৃতিকে শুভ্রতার পোশাক পরিয়ে দেয়। কিন্তু এই শরতেই, বাংলার ইতিহাসে একের পর এক কালো অধ্যায় রচিত হয়েছে। আগস্ট বাঙালীর শোকের মাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।
২০০৫ সালে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা হয়েছে। বাংলার মানুষ কিন্তু নতুন করে জেগে উঠেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিয়েছে প্রগতিশীলতার পক্ষে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে জামায়াত-বিএনপির জঙ্গী জোট নির্বাচনে অংশ নেয়ারই সাহস পায়নি। এভাবেই মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। ২১ আগস্টের বিভীষিকাময় স্মৃতি মনে রেখে বাংলার মানুষ আগামীতেও অপশক্তিকে রুখে দেবে, প্রত্যাখ্যান করবে, এমন আশা করাই যায়। বাংলার ইতিহাস তো তাই বলে।
লেখক : অস্ট্রিয়া প্রবাসী


বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র -- ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০১৫

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে, দু’লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে দীর্ঘ নয় মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের পর পৃথিরীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হল। সবুজ জমিনের মধ্যে রক্তলাল সূর্য আবৃত পতাকা পত পত করে উড়তে লাগলো বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে। আপনজনকে হারানোর বেদনা, নয় মাস ব্যাপী হানাদার বাহিনীর নিষ্ঠুর অত্যাচার, নিপীড়ন সব ভুলে গিয়ে নতুন আশায় জনগণ বুক বাধলো। একশ’ নব্বই বছর ইংরেজ বেনিয়াদের শাসন, ২৪ বছর পাকিস্তানী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ঈসা খাঁর উত্তরসূরিরা আবার নিজ ভূমে শাসন করার অধিকার পেয়েছে। এবার আর কেউ বাঙালীদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে পারবেনা। মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার ভুলুণ্ঠিত হবে না। মুক্ত স্বাধীন স্বদেশে আমরাই আমাদের শাসক। আমরাই আমাদের সেবক। কিন্তু একদিন পার না হতেই তাদের সে আশায় ছেদ পড়ে। ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা স্টেডিয়ামে ধরে নিয়ে কাদেরীয়া বাহিনী নির্বিচারে প্রায় একশ’ লোককে হত্যা করে। ২২ ডিসেম্বর কলকাতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় বিমানে ঢাকায় অবতরণ করে। তারও কয়েকদিন পর মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল (অবঃ) আতাউল গণি ওসামানী ঢাকায় আসেন। তিনি কেন পাকিস্তান বাহিনীর আত্মমর্পণের সময় উপস্থিত থাকেন নি, সে প্রশ্ন অবশ্য রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে সাধারণ মানুষের কাছে। ওসমানীও সে তথ্য প্রকাশ করেন নি। যতদর জানা যায় যে, ভারতীয় বাহিনী তাকে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আসতে দেয় নি। সে যাই হোক, বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে বসে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের সরকার গঠন করা হয়েছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতিতে। সেই ভিত্তিতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন। ঢাকায় এসে প্রবাসী লীগ সরকার বললেনঃ ‘আমরা বিপ্লবী সরকার’। সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রীছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ। রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান আটক ছিলেন পাকিস্তানের লায়ালপুরের কারাগারে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাজ করছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। এই ‘বিপ্লবী সরকার’-এর ঘোষণা প্রথম চ্যালেঞ্জ করেছিল বামপন্থী গোপন রাজনৈতিক দলসমহ। তারা ঐ সময় প্রচারিত তাদের প্রচারপত্রে বলেছিলো, আওয়ামী লীগ সরকার বিপ্লবী সরকার হতে পারে না। তারা বললেন, দেশে বিপ্লব যদি হয়ে থাকে, তবে তা একা আওয়ামী লীগ করে নি, করেছে এ দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ। আর তাই সরকার গঠন করতে হবে সকল দলের প্রতিনিধি নিয়ে। তাজউদ্দিন - শেখ মনির দ্বন্ধ ২২ ডিসেম্বর, ১৯৭১ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ঢাকা এসেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে মুজিব নগরে বসে বাংলাদেশের জন্য যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছিল তা বাস্তবায়িত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার এবং তাদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এই পরিকল্পনা কার্যকর করতে সমর্থ হলো না বাংলাদেশ সরকার। শেখ মনির নেতৃত্বে তারা আবার সোচ্চার হয়ে উঠলো। তারা বললো, বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত না করা পর্যন্ত আমরা কেউ অস্ত্র জমা দেব না। কাদের সিদ্দিকীও শেখ মুজিব মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অস্ত্র জমা দিতে অস্বীকার করলো। এদিকে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে অসংখ্য তরুণ মুজিব বাহিনীতে যোগদান করে। ঐ সব তরুণের অধিকাংশ ছিল রাজাকার। যুব নেতৃবৃন্দ (শেখ মনি গং) তখন তাদের সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে তৎপর ছিল। মুক্তিবাহিনীতেও ঐদিন অনেক রাজাকার ঢুকে পড়ে। এরাই বাংলার ইতিহাসে ষোড়শতম ডিভিশন বা সিক্সটিনথ ডিভিশন নামে খ্যাত’। শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে যুব নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশে ফিরে এসে মুজিব পরিবারের অনুকম্পা এবং সুহানুভূতি লাভের আশায় তাজউদ্দিন আহমদ সম্পর্কে কদর্য চিত্র তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্য ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাজউদ্দিনের কোন শ্রদ্ধাবোধ নেই। স্বাধীনতা সংগ্রামের সম্পর্কে কৃতিত্বের দাবিদার তিনি একাই হতে চান। স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বঙ্গবন্ধু যে ডাক দিয়েছিলেন, জনাব তাজউদ্দিন সেটাও অস্বীকার করেন। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুকে উপেক্ষা করার আর একটি নজির এই যে, তিনি বঙ্গবন্ধুকে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীনা করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য নিজে প্রধানমন্ত্রীহয়েছেন এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়মতান্ত্রি ক প্রেসিডেন্ট করেছেন। তার উদ্দেশ্য ভাল হলে তিনি বঙ্গবন্ধুকে প্রধানমন্ত্রী করে নিজে উপপ্রধানমন্ত্রী হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করতে পারতেন। এমনিভাবে শেখ মুজিবের পরিবারের প্রত্যেকের মন তাজউদ্দিন সাহেবের প্রতি বিষিয়ে দিয়েছিল তারা। শেখ মুজিব যেদিন পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে এলেন, সেদিন থেকে উল্লেখিত যুব নেতৃবৃন্দ তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে আরও সক্রিয় হয়ে উঠলেন। শেখ মুজিবের প্রত্যাবর্তন ও দেশের ক্ষমতা গ্রহণ এবং মুজিববাদের নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন  ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে যুক্তরাজ্য- ভারত হয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। আনন্দের আতিশয্যে মানুষ আÍহারা। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে তিনি সোজা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় এলেন। .....সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সভা সমাপ্ত করে দীর্ঘ ৯ মাস ৯ দিন পর ফিরে এলেন পরিবারবর্গের কাছে। কিন্তু একটুও স্বস্তির নিঃশ্বাস তিনি ফেলতে পারলেন না। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেল। এই মুহুর্তটির জন্যই অপেক্ষায় ছিল যুব নেতৃবৃন্দ। শেখ মুজিবকে প্রভাবিত করার জন্য কূট কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করল তারা। শেখ মুজিবের সামনে কেঁদে কেঁদে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো এদের অনেকেই আপনার ভাবমূর্তি রক্ষা করার যথাসাধ্য চেষ্টা করে তাজউদ্দিন সাহেবের বিরাগভাজন হয়েছি আমরা। তিনি নানাভাবে এই নয় মাস আমাদের হয়রানি করেছেন। ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাবেন বলে হুমকি দিয়েছেন। তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে আরও অনেক কথা বলে শেখ মুজিবের মনকে বিষিয়ে দিল তারা। শেখ মুজিব নিশ্চুপ হয়ে শুনলেন তাদের কথা। তাদের কথার সত্যতা যাচাই করার অবকাশ পেলেন না তিনি। কেননা তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যগণ আরও রুঢ় ভাষায় তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে মনের খেদ প্রকাশ করলো শেখ মুজিবের কাছে। তাজউদ্দিন আহমদ ১১ জানুয়ারি অতি প্রত্যুষে শেখ মুজিবকে দেখতে গেলেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে। শেখ মুজিব বাইরের ঘরে এলেন। তাকে মনে হলো অন্য এক ব্যক্তি। তাজউদ্দিনের সঙ্গে কোন কথা বললেন না তিনি। শুধু নীরবে তাকিয়ে রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। এবার তাজউদ্দিন মুখ খুললেনঃ ‘ভেবেছিলাম, আপনার অবর্তমানে কিভাবে কত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করেছি, সে সম্পর্কে আপনি জিজ্ঞাসা করবেন। কিন্তু দেখছি আমার ব্যাপারে আপনার কোন আগ্রহ নেই। তবে দেশের স্বার্থে একটি কথা বলা আবশ্যক মনে করি। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র রয়েছে। আমি সেই অস্ত্র জমা দেওয়ার জন্য প্রত্যেক মহকুমায় কমিটি করার নির্দেশ দিয়েছি। এখনো কোন তরুণ অস্ত্র জমা দেয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের পর আলজিরিয়াতে যেভাবে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, আমি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সেভাবে অস্ত্র উদ্ধারের পরিকল্পনা নিয়েছি। বাংলাদেশ আপনার প্রিয়। আপনি অস্ত্র জমা দেয়ার নিদের্শ দিলে সবাই অস্ত্র জমা দেবে। নইলে দেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি রক্ষা করা কষ্ট সাধ্য হবে।’ এইবার শেখ মুজিব কথা বললেন, আমার ছেলেদের হাতে অস্ত্র রয়েছে, তোমার এত মাথা ব্যথা কেন? আমি যখন বলব, তখনই তারা অস্ত্র জমা দেবে। বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন তাজউদ্দিন। কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলেন না তিনি। তারপর সম্বিত ফিরে এলে বললেন, ‘মুজিব ভাই, কোনদিন সম্পর্ক অস্ত্র জমা হবে না। এই অস্ত্রই হবে আমাদের কাল। আমরা কেউই এর হাত থেকে রেহাই পাবোনা।’ তাজউদ্দিন চলে এলেন। শেখ মুজিব দেশে ফেরার পর মাত্র একদিন তাজউদ্দিন নামমাত্র বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। শেখ মুজিব স্বাধীনতা সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রাপ্ত আইনগত ক্ষমতাবলে দেশের শাসন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন। তদনুসারে ১১ জানুয়ারি, ১৯৭২ একটি রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আম ল পরিবর্তন সাধন করা হয়। এভাবে বাংলাদেশ সাময়িক সংবিধান আদেশ ১৯৭২ - এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তে ওযেস্টমিনিষ্টার টাইপের সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের পদক্ষেপ নেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পরিবর্তন করে সংসদীয় ব্যবস্থা প্রর্বতন করতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমে বিচারপতি এ. এস. এম সায়েমকে সাময়িক সংবিধান আদেশের ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ করেন এবং ১২ জানুয়ারি সকালে তার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করে সাথে সাথেই তিনি তার পদত্যাগ ঘোষণা করেন। পদত্যাগ ঘোষণার পর সাময়িক আদেশের ৮ নং ধারাবলে মন্ত্রিপরিষদ বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ করেন এবং প্রধান বিচারপতি তাঁর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অতঃপর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ সহ মন্ত্রিপরিষদের অন্যান্য সদস্যরা পদত্যাগ করেন এবং রাষ্ট্রপতি সাময়িক আদেশের ৭ নং ধারাবলে শেখ মুজিবকে প্রধানমন্ত্রীহিসেবে নিয়োগ করেন। এ সময় শেখ মুজিব তাঁর ১১ সদস্য বিশিষ্ট নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন এবং ১০ নং ধারাবলে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীও অন্যান্য  মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণ করান। শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার পরপরই শেখ মনির নেতৃত্বে যুব নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত দ্রুত প্রশাসনের সর্বত্র নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে লাগলেন। তাজউদ্দিন আহমদ মন্ত্রিপরিষদে থাকলেও তাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হল। শেখ মুজিব প্রশাসনিক ব্যাপারে যুব নেতৃবৃন্দের উপর নিভরশীল হয়ে পড়লেন। যুব নেতৃবৃন্দ এ দেশের সর্বময় ক্ষমতা পরিচালনার অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেন। শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগ, সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে যে সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলো সেগুলো হ’লঃ (১) প্রশাসন সুষমকরণ, (২) ভারত প্রত্যাগত প্রায় এক কোটি শরনার্থীর পুনর্বাসন, (৩) আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা ও অন্যান্য সশস্ত্র লোকদের নিয়ন্ত্রণ, (৪) যুদ্ধকালীন সময়ে ক্ষতিগ্রস্থ সড়ক, সেতু এবং রেলসড়কের মেরামত, এবং (৫) জাতীয় অর্থনীতি, বিশেষ করে শিল্প এবং অর্থ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল করে তোলা। এছাড়াও বেশ কয়েকটি কারণে জরুরি ভিত্তিতে সমাধানযোগ্য যে কয়েকটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার উদ্ভব ঘটেছিলো সেগুলো হলঃ (ক) বাংলাদেশে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবস্থান, (খ) সীমান্তে চোরাচালান, (গ) যুদ্ধকালীন সময়ে পাক বাহিনীকে সহায়তা করেছিল এমন দালালদের উপস্থিতি, এবং (ঘ) যুদ্ধবন্দি সংক্রান্ত সমস্যা। এছাড়া বাংলাদেশে আটকেপড়া বিহারী অবাঙালী এবং পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালীদের পুনর্বাসনের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এসবের পাশাপাশি সংগ্রামে সফলতা আসার পর দেশের জনগণের আচার আচরণে গগণচুম্বী আশা - আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটছিলো। স্বাভাবিকভাবেই শেখ মুজিবের দায়িত্ব ছিল দেশের প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তার দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন সোনার বাংলার বাস্তব রূপায়ন। কিন্তু মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী নেতৃত্ব এসবের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে তারা ‘মুজিববাদ’ প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। মুক্তিযুদ্ধের গতিরোধ করার জন্য ১৯৭১ সালে  ভারতের কুখ্যাত কূটনীতিক ডি.পি ধরের অঙ্গুলি হেলনে মুক্তি বাহিনীর পাশাপাশি ভারতীয় সেনাপতি জেনারেল ওভানের নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয় যে মুজিব বাহিনী, তার নেতা তোফায়েল আহমদকে দিয়ে প্রথম এই কথাটি বাজারে ছেড়ে দেয়া হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২ তোফায়েল আহমদ ঘোষণা করলেনঃ ‘মুজিববাদ প্রতিষ্ঠা করব’। এবং এই মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য তোফায়েল আহমদ জনগণের প্রতি ‘দ্বিতীয় পর্যায়ের বিপ্লব’ শুরু করার আহবান জানান। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের তৃতীয় মতবাদ হচ্ছে মুজিববাদ। মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আসবে আদর্শের পূ র্ণ সাফল্য। আর এর স্তম্ভ হবে গণতন্ত্র , সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।’ তোফায়েল আহমদ ঐ বক্তৃতায়  মুজিববাদের একটি ব্যাখ্যাও দেন। তিনি বলেন, ‘মহান মার্কিন নেতা আব্রাহাম লিংকন জনগণকে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা দিয়েছেন, কিন্তু সমাজতন্ত্র দিতে পারেন নি। জার্মান কার্ল মার্কস সমাজতন্তে র প্রচার করেন, কিন্তু গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা দিতে পারেন নি। মুজিববাদে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র বিধৃত হয়েছে। সুতরাং এ হচ্ছে বিশ্বের তৃতীয় মতবাদ। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্তে র মধ্যে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে মুজিববাদ প্রতিষ্ঠা করা হবে।’ সেই সময়ই তাজউদ্দিন আহমদ বললেন ভিন্ন কথা। তিনি বললেন, ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। খাটি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে বাংলাদেশে, অন্য কিছু নয়।’ ৯ এপ্রিল, ১৯৭২ আওয়ামী লীগ নেতা কামরুজ্জামান ঘোষণা করলেন, থানায় থানায় মুজিববাদ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। তৎকালীন তথ্য মন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী বললেন, মুজিববাদ বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকা খার প্রতীক। তারপর থেকে তার মন্ত্রীত্বের কাল পর্যন্ত একথা অবিরাম বলে যেতে থাকলেন। এরপর থেকে চলতে থাকল মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা। সারা বছর ধরে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, হবুমন্ত্রী, নেতা, উপনেতা, পাতিনেতা, হবুনেতারা চীৎকার করে বলতে থাকলেন, মুজিববাদ প্রতিষ্ঠা করা হবে। যারা এই মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাধা দেবে, তাদের বিষদাঁত ভেঙ্গে দেয়া হবে। এসময় থেকেই ‘মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে’ গড়ে উঠতে থাকল একের পর এক বেসামরিক বাহিনীঃ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, জয় বাংলা বাহিনী, লাল বাহিনী এমনি বহু। আর আইন-শৃ খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় এইসব উচ্ছৃ খল বাহিনী দৌর্দন্ড প্রতাপে চালাতে থাকল হয়রানি, নির্যাতন। যাকে তাকে যখন তখন দিতে থাকল হুমকি। এ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রদেরকে দিয়ে ক্লাস শুরু হওয়ার প র্বে মাঠে পি.টি করার পর শেখানো হতঃ ‘বিশ্বে এলো নতুনবাদ মুজিববাদ, মুজিববাদ’। ‘এক নেতা, এক দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’। ১৯৭২ সালের মার্চ মাস থেকেই দেশে মহা-অরাজকতা সৃষ্টি হয়। খুন, ডাকাতি, রাহাজানি, গুন্ডামি, মুজতদারি, মুনাফাখোরি দিন দিন রাড়তে থাকে। এর ফলে ১০মে ১৯৭২ চট্টগ্রামের এক জনসভায় ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ দেশের ক্রমবর্ধমান সমস্যার মোকাবেলার জন্য সর্বদলীয় সরকার গঠনের দাবি জানান। ১৯৭২ সালের প্রায় শুরু থেকেই মুজিববাদ প্রশ্নে ছাত্রলীগের মধ্যে সংকটের সৃষ্টি হয়। এদিক ওদিক ছিঁটে ফোঁটা হাতাহাতিও হল ছাত্রদের মধ্যে। ছাত্রলীগে দেখা দিল অনৈক্য। ১২ মে ’৭২ ছাত্রলীগের চার নেতা (চার খলিফা বলে খ্যাত) দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। আ.স.ম আব্দুর রব ও শাহজাহান সিরাজ একদিকে, অপরদিকে আবদুল কুদ্দুস মাখন ও ন রে আলম সিদ্দিকী। আ.স.ম আব্দুর রব ও শাহজাহান সিরাজ বললেন যে, তারা মুজিববাদ মানেন না। বললেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অপরদিকে আবদুল কুদ্দুস মাখন ও নূ রে আলম সিদ্দিকী ঘোষণা করলেন, যে কোন মূ ল্যে মুজিববাদ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কয়েকদিনের মধ্যে এই দ্বন্ধ প্রকট আকার ধারণ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন হলে রব সমর্থক ও মাখন সমর্থক ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। একই সময় শ্রমিক লীগের ভাংগন সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো। দেখা দিল অভ্যন্তরীণ কোন্দল। মুজিববাদ বিরোধী ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগ তৎকালীন গণ পরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে বিপ্লবী সরকার গঠনের আহবান জানান। আর সে সময় ২৬ জুন ’৭২ ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ জোর গলায় ঘোষণা করলেন যে, ‘বিপ্লবী সরকারের কথা যারা বলছে তারা জনগণের শত্রু’। তখন থেকেই মোজাফফর ন্যাপ ও সিপিবি আওয়ামী লীগের বি-টিম বলে নিন্দিত হতে থাকে। কিন্তু ভারতীয় বাহিনী যখন ফেব্রুয়ারি ’৭২ বাংলাদেশ থেকে কল-কারখানা ও সমরাস্ত্র ভারতে নিয়ে যায় তখন মেজর জলিল ছাড়া অন্য কোন নেতা টু শব্দটিও করেননি। এরপর আসর জমে উঠতে থাকে। একদিকে মুজিববাদ, অপরদিকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। আ.স.ম আব্দুর রব ৩ মার্চ ’৭২ এক বক্তৃতায় বলেন, ‘জীবনের সকল ক্ষেত্রে আম ল পরিবর্তনের জন্য জাতি কেবল আর একটি বিপ্লবের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বেশ কিছু সংখ্যক সরকারি আমলা ও শিল্পপতি এবং আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লোকজন পরবর্তী বিপ্লবের জন্য আমাদের এই প্রস্তুতির বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে চলছে এবং গণবিরোধী প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে’। ৮ মার্চ ’৭২ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতাকালে তিনি বলেন, ‘পতাকা বদল হলেই জনগণের মুক্তি আসে না; তার জন্য দরকার প্রত্যক্ষ সমাজতান্তি ক কর্মসূচি।’ সম্ভবত এর জবাবদানের চেষ্টায় ৫ মে ’৭২ ছাত্রলীগের নূ রে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘মুজিববাদের প্রতি হুমকি সমাজতন্তে র প্রতি হুমকি স্বরূপ।’ ২৩ মে ’৭২ আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ও আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান আব্দুর রাজ্জাক দিন তারিখ দিয়ে ঘোষণা করেন যে, ৭ জুন ’৭২ থেকে মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু হবে।’ ১৩ জুন ’৭২ গৃহীত এক প্রস্তাবে সিদ্দিকী মাখন গ্রুপ ছাত্রলীগ দাবি করে যে, মুজিববাদের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে হবে।’ ৬ জুলাই ’৭২ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমদ কুমিল্লার এক জনসভায় ঘোষণা করেন যে, ‘যারা বিদেশী মতবাদ প্রচার করছে, তারা দেশের বন্ধু নয়।’ তিনি বলেন, ‘মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সব সমস্যার সমাধান নিহিত এবং মুজিববাদ সমৃদ্ধির এক নতুন অধ্যায় স চনায় সাহায্য করবে।’ একই জনসভায় আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দেব কিভাবে গণতন্ত্র , সমাজতন্ত্র এক সাথে চলতে পারে।’ ১৬ জুলাই আওয়ামী লীগ নেতা জিল্লুর রহমান বলেন, ‘মুজিববাদ বাংলাদেশের আশা-আকা খার প্রতীক। যার বাস্তবায়নে মানুষের সর্বাঙ্গীন মুক্তি নিহিত।’ একই দিন সিদ্দিকী- মাখন গ্রুপ ছাত্রলীগের এক সভায় গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয় যে, ‘মাওবাদী বিভ্রান্ত নেতৃত্বে সিআইএ’র এজেন্ট দল ও ছাত্রলীগ নামধারী বিভ্রান্ত নেতৃত্ব, পলাতক আল-বদর, আল-শামস, রাজাকার, শান্তি কমিটি, তিন মুসলিম লীগ, জামায়াত, নেজাম, জমিয়তে ওলামায়ে, পিডিপি-সহ প্রতিক্রিয়াশীল সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বানচাল করতে চায়। তারপর থেকেই বিরোধীদের ওপর চলতে থাকল নির্যাতন, হয়রানি, হুমকি। ১৮ জুলাই ’৭২ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী চট্টগ্রামে ঘোষণা করেন যে, ‘গণতন্ত্রে র নীতি ও আদর্শেই দেশ পরিচালিত হবে।’ তার একদিন আগে ঠাকুরগাঁও-এ এক জনসভায় আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘মুজিববাদের চার নীতি দ্বারাই দেশ শাসিত হবে।’ আর তার কয়েকদিন পর ৩১ জুলাই আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কমিটিতে ‘সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে মুজিববাদ কায়েমের শপথ গ্রহণ করা হয়।’ ১২ আগস্ট ’৭২ তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ ভাওয়ালে এক জনসভায় বলেন, ‘সমাজতন্ত্রের প্রতি বাধা এলে গণতন্ত্র ত্যাগ করব।’ ২০ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ধার করা আর্দশ এবং মাওবাদী চক্রান্ত ।’ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতন্ত্র হবে। মন্ত্রী বলেন, সমাজতন্তে র জন্য গণতন্ত্র ত্যাগ করবেন। নেতা বলেন দু’টোকে মিশিয়ে মুজিববাদ বানান হবে। এভাবেই সৃষ্টি করা হল একটি আর্দশগত বিভ্রান্তি কর অবস্থা। তবে তাজউদ্দিন আহমদ কোনদিনই মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার কথা বলেন নি। তিনি বেশি জোর দিলেন সমাজতন্তে র উপর। শেখ মুজিবুর রহমান সম্ভবত তার এই মনোভাব পছন্দ করেন নি। কোনদিন প্রকাশ্য সভায় শেখ মুজিব অবশ্য নিজে মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের কথা বলেন নি। কিন্তু দলের অভ্যন্তরে মুজিববাদী নন এমন সব লোক কোনঠাসা হয়ে পড়তে থাকে। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে সৃষ্ট তাজউদ্দিন আহমদের ইমেজ সম্ভবত শেখ মুজিবুর রহমানকে তাজউদ্দিনের ওপর বিরক্ত করে তুলেছিল। এর প্রতিফলন ঘটে শেখ মুজিব দেশে ফেরার পর পরই। যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে তাজউদ্দিন আহমদকে মন্তি সভা থেকে বের করে দেয়ার ভেতর দিয়ে। এবং পরের দিন কাগজে তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে এমন সব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়, যা ছিল নির্মম এবং নিষ্ঠুর। ১৯৭২ সালের জুন মাস থেকেই বিরোধী দলের ওপর শুরু হয় বর্বর নির্যাতন। যাতে সরকারি বাহিনীই কেবল অংশ নেয় না, অংশ নেয় সরকার সমর্থিত বেআইনী অস্ত্র ধারীরা এবং অন্যসব লাঠিয়াল ও সশস্ত্র পেটোয়া বাহিনী। নির্যাতনের অভিযোগ করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, ন্যাপ নেতা কাজী জাফর আহমদ, ছাত্রলীগ (রব-সিরাজ)। ১২ জুলাই ’৭২ ছাত্রলীগ (রব-সিরাজ) এক বিবৃতিতে অভিযোগ করে যে, ‘ছাত্রকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর পুলিশী নির্যাতন চলছে।’ তারা সরকারের নির্যাতনম লক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াবার আহবান জানান। বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ও ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ শক্তিকে দাবিয়ে রাখার জন্য পুলিশী নির্যাতনের পথ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যে রাজনীতিকেরা মাত্র সাত মাস আগে নির্যাতন ও পুলিশী বা মিলিটারীর গুলি চালাবার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর হতেন, ক্ষমতায় আসীন হয়ে তারা গত সাত মাসে প্রায় ডজন খানেক জায়গায় ছাত্র-জনতার সমাবেশ ও মিছিলের ওপর গুলি চালিয়েছেন। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সহায়তাকারী দালালদের যোগসাজসে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিবিদরা প্রশাসনযন্ত্রকে প্রভাবিত করে ছাত্রকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন ও তাদের গ্রেফতার করেছেন। তারা অভিযোগ করেন যে, ‘ঢাকা থেকে সরাসরি টেলিফোনযোগে কোনো কোনো রাজনীতিবিদ ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্ধী ছাত্র ও যুবকর্মীদের বিরুদ্বে প্রশাসন যন্ত্রে র মাধ্যমে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করছেন।
শেখ মুজিব এর  রাজনৈতিক গুরু ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রের চর্চা ছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মূল লক্ষ্য। শেখ মুজিব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আদর্শে লালিত হয়েছিলেন। যে কারণে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি বাংলার মাটিতে পা রেখেই তিনি বলে দিয়েছিলেন 'বাংলাদেশ হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র'। অপরদিকে মাওলানা ভাসানী, কমরেড মনিসিংহ, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ এবং আরো অনেকে দাবি তুলেছিলেন 'বাংলাদেশ হবে একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ'। তাঁদের দাবির সাথে সমন্বয় করে ১৯৭২ সালে সংবিধানে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে সমাজতন্ত্রের কথাটি সংযোজন করেছিলেন। তবে তিনি গণতন্ত্রের জন্য একটু সময় চেয়েছিলেন। কিন্তু সমাজতন্ত্রের আন্দোলন যারা করছিলেন তারা শেখ মুজিবকে সময় দিতে রাজি হননি। তরুণ নেতাদের কাছ থেকে দাবি উঠেছিল অতিদ্রুত দেশে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েমের। উল্লেখযোগ্য তরুণ নেতা আ স ম আব্দুর রব, মেজর জলিল, কর্ণেল তাহের প্রমুখ দেশের তরুণ ছাত্রসমাজ গভীর আবেগ সহকারে সাড়া দিয়েছিল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের পক্ষে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে দেশে শুরু হয়েছিল চরম অরাজকতা, মারামারি, হানাহানি।
এরই মধ্যে ২ জুলাই ’৭২ সিরাজুল আলম খান ও আ.স.ম আব্দুর রব গণকণ্ঠ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। পত্রিকা প্রকাশের পর থেকেই তাতে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের লাইন গ্রহণ করা হয়। ২১ জুলাই ছাত্রলীগ (সিদ্দিকী-মাখন) গ্রুপের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সেই সম্মেলন উদ্বোধন করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ছাত্রলীগের সেই সম্মেলনে মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার শপথ গ্রহণ করা হয়। একই দিন ছাত্রলীগ (রব-সিরাজ) গ্রুপের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় পল্টন ময়দানে। ছাত্রলীগ (সিদ্দিকী-মাখন)-এর সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণ দিতে গিয়ে পল্টনের রব-সিরাজ গ্রুপ ছাত্রলীগের সম্মেলনের প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ মুজিব বলেন, ‘সত্তর মন গরুর গোস্ত, সত্তর মন খাসির গোস্ত, টাকা কোথা থেকে আসে?’ আর দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তিরিশ বছর রাজনীতি করলাম, একটা পত্রিকা বের করতে পারলাম না। এক ইঞ্চি বিজ্ঞাপন নাই, আমরা বুঝিনা?’ উল্লেখ্য, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্তে র নীতি গ্রহণ করার পর থেকে দৈনিক গণকণ্ঠে এক ইঞ্চিও সরকারি বিজ্ঞাপন দেয়া হত না। ২১ জুলাই ছাত্রলীগ (রব-সিরাজ) গ্রুপের সম্মেলনে আ.স.ম আব্দুর রব ঘোষণা করেন, ‘শ্রেণীশত্রু  খতম করে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েম করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘কাল মার্কসের পর সমাজতন্তে র কোনো নতুন সংজ্ঞা কেউ দিতে পারেনা। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং আমাদের দেশে এই সমাজতন্ত্রই কায়েম করা হবে।’ রব বলেন, ‘মুজিববাদ কোন সমাজতান্তি ক রূপরেখা নয়।’ এই সম্মেলন শেষে ২৪ জুলাই মুজিববাদী ছাত্রলীগের একটি মিছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পল্টন ময়দানে রব-সিরাজ গ্রুপে ছাত্রলীগের ওপর চড়াও হয় এবং তাদের হামলায় আ.স.ম আব্দুর রব সহ শতাধিক ছাত্র আহত হন। পরে রব-সিরাজ গ্রুপের একজন আহত সদস্য হাসপাতালে মারা যান। এরই এক পর্যায়ে আমাদের লক্ষ্য বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ স্লোগান নিয়ে  ৩১ অক্টোবর ’৭২ মেজর (অবঃ) এম এ জলিল ও আ.স.ম আব্দুর রবকে যুগ্ম আহবায়ক করে জাতীয় সমাজতান্তি ক দল (জাসদ) নামে একটি নয়া রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের যে বিপুল আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা ছিল তা পূরণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হতে যাচ্ছিল। অন্যদিকে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কার্যকর রাজনৈতিক দলও তখন ছিল না। ষাটের দশকের শেষ দিকে ও সত্তর-একাত্তর সালে বামপন্থী দল হিসেবে ন্যাপ মোজাফফর ও সিপিবি (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি) এবং তাদের সমর্থক বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক শক্তি বেশ মজবুত ছিল। বাহাত্তরে ডাকসু নির্বাচনেও ছাত্র ইউনিয়ন জয়ী হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে তাদের আওয়ামী লীগ-তোষণনীতি সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীদের আশাহত করে। ফলে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান নিয়ে আসা নবাগত জাসদ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
অবশ্য এর আগে বাহাত্তরের ২৩ জুলাই আওয়ামী লীগের সমর্থক ছাত্রলীগ আ স ম রব ও শাজাহান সিরাজ এবং নূরে আলম সিদ্দিকী ও আবদুল কুদ্দুস মাখন গ্রুপে আনুষ্ঠানিক ভাগ হয়ে যায়। প্রথম গ্রুপ পল্টন ময়দান এবং দ্বিতীয় গ্রুপ রমনা রেসকোর্সে সম্মেলন আহ্বান করে এবং উভয় পক্ষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান অতিথি হওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু তিনি সিদ্দিকী-মাখন গ্রুপের সম্মেলনে গেলেন, রব-শাজাহান সিরাজ গ্রুপের সম্মেলনে গেলেন না। সেই থেকে ছাত্রলীগ ‘মুজিববাদী’ ও ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী’ নামে দুটি আলাদা সংগঠন হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে।
ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের এমপি ও নেতাদের নানা অপকর্মের কারণে সরকারের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে; যদিও শেখ মুজিবুর রহমান তখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা। ১ জনুয়ারি ভিয়েতনাম সংহতি দিবসে ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। এতে মতিউল ইসলাম ও মীর্জা কাদের নামে দুজন কর্মী নিহত হন। এর প্রতিবাদে ছাত্র ইউনিয়ন হরতালসহ আন্দোলনের নানা কর্মসূচি দেয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পাল্টা কর্মসূচির নামে বিভিন্ন স্থানে ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে হামলা চালায়। কিন্তু এর পরই ‘অভিভাবক সংগঠনের’ পরামর্শে ছাত্র ইউনিয়ন সরকার-সমর্থক ছাত্রসংগঠনটির সঙ্গে কৌশলগত মৈত্রী স্থাপন করে। এই সুযোগে জাসদ-সমর্থিত ছাত্রলীগ সারা দেশে ছাত্রসমাজের কাছে জনপ্রিয় ছাত্রসংগঠন হিসেবে আবির্ভূত হয়। ১৯৭৩ সালের ডাকসু নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ প্যানেল জাসদ ছাত্রলীগের কাছে কার্যত পরাজিত হয়, যদিও ভোটের বাক্স ছিনতাইয়ের কারণে সেই ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।
জাসদ প্রতিষ্ঠার পাঁচ মাসের মাথায় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তারা ২৩৭টি আসনে প্রার্থী দিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনের আগেই বিভিন্ন স্থানে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। তারা বিরোধী দলের অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র দাখিলেও বাধা দেয়। বেশ কিছু আসনে বিরোধী দলের জয়ী প্রার্থীকে হারিয়ে দেওয়া হয়। দাউদকান্দিতে জাসদ প্রার্থী আবদুর রশীদ ইঞ্জিনিয়ারের কাছে খন্দকার মোশতাক আহমদ হেরে গিয়েছিলেন। কিন্তু হেলিকপ্টারে করে ভোটের বাক্স ঢাকায় এনে তাঁকে জিতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে।
৭ মার্চের নির্বাচন সম্পর্কে মওদুদ আহমদের বিশ্লেষণ হচ্ছে, ‘এটা সত্য যে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করতো। আওয়ামী লীগ বিঘ্ন সৃষ্টি না করলে যে ৯টিতে বিরোধী দল জয়লাভ করেছিল তার সাথে আর বড় জোর ২০টি আসন যোগ হতো। ...সরকারি সংবাদপত্রের রক্ষণশীল হিসেবেও বিরোধী দলগুলোর অন্তত ৩০টি আসনে বিজয় ছিলো প্রায় নিশ্চিত।’ (শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল, মওদুদ আহমদ, ইউপিএল)
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ৭ মার্চের নির্বাচনে বিরোধী দলের পাওয়া আসনগুলো ছিনিয়ে নেওয়া না হলে দেশের রাজনীতি ভিন্ন হতে পারত। নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। ভাসানী ন্যাপের মতো দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনের ঘোষণা দিলেও তাদের কর্মী ছিল না । কিন্তু জাসদ-সমর্থক ছাত্রলীগে সেই সময়ের চৌকস ও মেধাবী ছাত্রদের ভিড় বাড়তে থাকে। ফলে তাদের পক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয়। যদিও সেই আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে নেতাদের পরিষ্কার ধারণা ছিল না। কখনো তারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করার কথা বলতেন, কখনো মুজিব সরকারকে হঠানোর আওয়াজ তুলতেন। এ সময় স্বাধীনতা-বিরোধিতাকারী রাজনীতিক ও দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তারাও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগানধারী সংগঠনটিতে আশ্রয় নেন। উদাহরণ হিসেবে আবদুল আওয়াল ও মাওলানা মতিনের (পরবর্তীকালে লেবার পার্টির নেতা) কথা উল্লেখ করতে পারি। প্রথমজন দুর্নীতির দায়ে আদমজী থেকে চাকরিচ্যুত, দ্বিতীয়জন একাত্তরের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন। (সূত্র: বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস: বঙ্গবন্ধুর সময়কাল, ড. মোহাম্মদ হাননান)
এই বিপুল ও ব্যাপক জনপ্রিয়তাকে সম্বল করে জাসদ নেতারা কী করলেন? তাঁরা কি সত্যিকারভাবে একটি বিপ্লবী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন? তাঁরা কি জনগণের সামনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কোনো কর্মসূচি হাজির করলেন? সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপকভিত্তিক গণ-আন্দোলন গড়তে চাইলেন? না, গণ-আন্দোলনে তাদের তেমন আগ্রহ ছিল না। ‘শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারকে জাসদ বুর্জোয়া শ্রেণীর সরকার বলে ঘোষণা করে এবং তাকে উৎখাতের সর্বাত্মক সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়’ (জাসদের রাজনীতি, নজরুল ইসলাম, প্রাচ্য প্রকাশনী, ১৯৮১)।
জাসদ বাংলাদেশের সমাজকাঠামোর স্তর নির্ধারণ করেছিল ধনতান্ত্রিক। অন্য বাম দলগুলো মনে করে, আধা ধনতান্ত্রিক, আধা সামন্ততান্ত্রিক। এ কারণে ওই সব দল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আগে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে আশু কর্তব্য বলে মনে করে। কিন্তু জাসদ সরাসরি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিল এবং বিপুলসংখ্যক তরুণও তাতে আকৃষ্ট হয়েছিল।
জাসদের পক্ষ থেকে বলার চেষ্টা হয়েছিল, তৎকালীন (আওয়ামী লীগ) সরকারের দমন-পীড়নের কারণে তারা প্রকাশ্য গণতান্ত্রিক আন্দোলন বাদ দিয়ে গোপন ও সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল। তাদের এই যুক্তি যে সঠিক নয়, তা জাসদের পরবর্তী দলিলেও স্বীকার করা হয়েছে।
একদিকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, অন্যদিকে বাকশালী সমাজতন্ত্র। একদিকে জাসদ নামের বিরাট বিরোধী দল। অন্যদিকে জনবিচ্ছিন্ন পরিবার কেন্দ্রিক বাকশালীয় রাজনীতি। ছাত্র ও তরুণদের চুম্বকের মতো আকর্ষণ করছে এই জাসদীয় বিরোধী দল। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় জাসদ তথা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী ছাত্রলীগ এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হয়। দেশের প্রায় সবগুলো ছাত্র সংসদ চলে যায় ওই ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। সরকারপন্থী ছাত্রলীগ পরিণত হয় অপাঙক্তেয় এক ছাত্র সংগঠনে। রাশিয়ান সমাজতন্ত্র শিক্ষায় তাদের নেতাদের পাঠানো হয় মস্কো। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ ঢাকার মিন্টু রোডে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর (বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের পিতা) বাসভবন ঘেরাওয়ের কর্মসূচি নেয়া হয়। সেদিন পল্টনের ময়দান থেকে জনসভা শেষে হাজার হাজার মানুষ রওনা দেয় মিন্টু রোডের দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন অভিমুখে। এই জঙ্গি মিছিলের সঙ্গে রক্ষীবাহিনী ও পুলিশের সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে আসম রব, মেজর এমএ জলিলসহ জাসদ নেতৃবৃন্দ গ্রেফতার হন। বন্ধ করে দেয়া হয় জাসদের মুখপত্র দৈনিক গণকণ্ঠ। গ্রেফতার করা হয় এর সম্পাদক কবি আল মাহমুদকে (এ বছর তিনি ৮০তম জন্মদিন পালন করেছেন)। : ১৯৭৫-এর ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের হালি শহর গোপন শেল্টার থেকে একজন পার্টি কর্মীসহ সিরাজ সিকদার যাচ্ছিলেন আরেকটি শেল্টারে। বেবীট্যাক্সিতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একজন অপরিচিত লোক এসে তার কাছে লিফট চান। বলেন সঙ্গে স্ত্রী অসুস্থ। ডাক্তার ডাকা প্রয়োজন। তিনি সামনেই নেমে যাবেন। চট্টগ্রাম নিউমার্কেটের কাছে আসতেই অপরিচিত লোকটি হঠাৎ লাফ দিয়ে বেবীট্যাক্সি থেকে নেমে ড্রাইভারকে পিস্তল ধরে থামতে বলেন। কাছেই সাদা পোশাকে বেশ কয়েকজন অপেক্ষমাণ পুলিশ স্টেনগান উঁচিয়ে ঘিরে ফেলে বেবীট্যাক্সিকে। সিরাজ সিকদারকে হাতকড়া অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় ডাবলমুরিং থানায়। সেদিন সন্ধ্যায় বিশেষ ফসার বিমানে তাকে নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। রাখা হয় মালিবাগস্থ স্পেশাল ব্রাঞ্চ অফিসে। সারাদেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ভিড় পড়ে যায় মালিবাগ মোড়ে। : ৩ জানুয়ারির দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয় বন্দী অবস্থায় পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি নামে পরিচিত একটি গুপ্ত চরমপন্থী দলের প্রধান সিরাজুল হক সিকদার ওরফে সিরাজ সিকদার। ছাপানো হয় সিরাজ সিকদারের মৃতদেহের ছবিও। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোথায় আজ সিরাজ সিকদার? সিরাজ সিকদারের মৃত্যুতে তৎকালীন জাসদের নেতাকর্মীরাও হয়ে পড়ে বিস্মিত। আতঙ্কিত। বিশেষ করে কর্নেল তাহের চিন্তিত হন। কারণ সিরাজ সিকদারের সঙ্গে তার সখ্য ছিল দীর্ঘদিনের। রাজনৈতিক চিন্তার পার্থক্য থাকলেও তারা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন। (সূত্র : ক্রাচের কর্নেল, লেখক : শাহাদুজ্জামান, প্রকাশক : মাওলা ব্রাদার্স, ৩৯ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০) : জাসদ সতর্ক হয়। মাঠে তখন সরকারের জাতীয় রক্ষীবাহিনীর বিপরীতে জাসদের গণবাহিনী। এই গণবাহিনীর প্রধানের ভূমিকায় তখন কর্নেল তাহের। একটি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের আশায় এই বাহিনী লড়ে চলেছে। ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে লেখা ‘বিপ্লবী গণবাহিনীতে যোগ দিন’। নেপথ্যে পরামর্শ দিচ্ছেন সিরাজুল আলম খান (আজকের প্রবীণ নেতা)। : সে সময় ঢাকাসহ সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে আকর্ষণীয়ভাবে লেখা হতো। ‘আমরা লড়ছি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের জন্য’। কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের পরিষ্কার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যেতো না। অপরদিকে সরকার ও তাদের দল হয়ে পড়ে অবরুদ্ধ। চলে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার চেষ্টা।
ছাত্রলীগের বিভক্তি আওয়ামী লীগেও টানাপোড়নের সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জাতি হয় বিভক্ত।
সদ্য প্রতিষ্ঠিত একটি দেশের জন্য এ ধরনের বিরোধ ছিল মারাত্মক ক্ষতিকর।
১৯৭২ সালের প্রায় গোড়া থেকেই মুজিববাদ নিয়ে ছাত্রলীগের মাঝে দেখা দেয় সংকট। সৃষ্টি করে অনৈক্য। ’৭২ সালের ১২ই মে ছাত্রলীগের চার নেতা খোলাখুলিভাবে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পরেন। জনাব রব ও শাহজাহান সিরাজ বললেন, “মুজিববাদে তারা বিশ্বাসী নন। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মাধ্যমেই আসিবে জনমুক্তি।” অপরদিকে আব্দুল কুদ্দুস মাখন ও নূরে আলম সিদ্দিকী ঘোষণা দিলেন, “যে কোন মূল্যে মুজিববাদ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।” অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই সংকট দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলে মুজিববাদী ও মুজিববাদ বিরোধী ছাত্রদের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ ঘটে। বিরোধ চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে যখন দুই গ্রুপই আলাদাভাবে মহাসম্মেলনের আয়োজন করে। শেখ মুজিব অবশ্য মাখনদের সম্মেলনই নিজে উদ্বোধন করেন।
ছাত্রলীগের ভাঙ্গনের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমিক লীগেও কোন্দল ঘনীভূত হয়। ফলে শ্রমিক লীগও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। মুজিববাদ বিরোধী ছাত্রলীগ এবং তাদের সমর্থক শ্রমিক লীগ তৎকালীন গণপরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে বিপ্লবী সরকার গঠনের আহ্বান জানান। তখন থেকেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে। একদিকে মুজিববাদ অপরদিকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। আসম রব ১৯৭২ সালের ৩রা মার্চ এক ভাষণে বলেন, “জীবনে সকল ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের জন্য জাতি যখন আর একটি বিপ্লবের প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিক সে মুহুর্তে বেশ কিছু সংখ্যক সরকারি আমলা, শিল্পপতি, আওয়ামী লীগসহ কিছু রাজনৈতিক লোকজন জাতীয় বিপ্লবের নামে আমাদের এই প্রস্তুতির বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে চলেছে এবং গণবিরোধী প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে চলেছে। ৮ই মার্চ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতায় তিনি আরো বলেন, “পতাকা বদল হলেই জনগণের মুক্তি আসে না, তার জন্য দরকার সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচী।” এর জবাবে ’৭২ সালের ৫ই মে ছাত্রলীগ (মুজিববাদী) নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, “মুজিববাদের প্রতি হুমকি বিপ্লবীদের সমাজতন্ত্রের প্রতিই হুমকি স্বরূপ।” ২৩শে মে ’৭২ তৎকালীন আওয়ামী সেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রধান এবং পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক জনাব আব্দুর রাজ্জাক দিন তারিখ দিয়ে ঘোষণা করেন, “৭ই জুন থেকে মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম দেশব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।” ১৩ই জুন গৃহিত এক প্রস্তাবে মাখন সিদ্দিকী গ্রুপ দাবি করে, “মুজিববাদের চার নীতির উপর ভিত্তি করে দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে হবে।” ৬ই জুলাই তোফায়েল আহমদ কুমিল্লার এক জনসভায় ঘোষণা করলেন, “যারা বিদেশী মতবাদ প্রচার করছেন তারা দেশের জনগণের বন্ধু নয়, তারা জাতীয় শত্রু। মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত রয়েছে সব সমস্যার সমাধান এবং মুজিববাদ দেশে সমৃদ্ধির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।” একই জনসভায় জনাব আবদুর রাজ্জাক বলেন, “আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দেবো কিভাবে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র একসঙ্গে চলতে পারে।” ১৬ই জুলাই নেতা জিল্লুর রহমান বললেন, “মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শোষণমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব। মুজিববাদ বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকঙ্খার প্রতীক। এর বাস্তবায়নের মধ্যেই মানুষের সর্বাঙ্গীন মুক্তি নিহিত।” একই দিনে ঢাকায় মাখন সিদ্দিকী গ্রুপ ছাত্রলীগের এক সভায় গৃহিত প্রস্তাবে বলা হয়, “মাওবাদী বিভ্রান্ত নেতৃত্ব, সিআইএ-র এজেন্ট দল ও ছাত্রলীগ নামধারী বহিস্কৃত নেতৃত্ব, পলাতক আলবদর, আলশামস, রাজাকার, শান্তি কমিটির মেম্বার, মুসলিম লীগারস, জামায়াত, নেজাম, জমিয়তে ওলামা, পিডিপি সহ প্রতিক্রিয়াশীল সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বানচাল করতে চায়।”
২৪শে জুলাই ’৭২ ছাত্রলীগের প্রতিদ্বন্দী উভয় গ্রুপের মধ্যে বায়তুল মোকাররমে গোলাগুলি হল। ২১শে জুলাই ছাত্রলীগ মুজিববাদী অংশের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সম্মেলনে শেখ মুজিবের উপস্থিতিতেই মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার শপথ গ্রহণ করা হয়। একই দিন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছাত্রলীগ রব গ্রুপের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় পল্টন ময়দানে। সেই সম্মেলনে জনাব আসম রব ঘোষণা করেন, “কার্ল মার্কসের পর সমাজতন্ত্রের কোন নতুন সংজ্ঞা কেউ দিতে পারে না। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তার রূপরেখাই চূড়ান্ত এবং আমাদের এই বাংলাদেশে সেই সমাজতন্ত্রই কায়েম করা হবে।” জনাব রব দৃঢ়ভাবে বললেন, “মুজিববাদের ককটেল কোন সমাজতান্ত্রিক রূপরেখা নয়।” ২৪শে জুলাই ৭২ মুজিববাদী ছাত্রলীগের একটি মিছিল অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে পল্টন ময়দানে রব গ্রুপ ছাত্রলীগের একটি সভার উপর চড়াও হয়। তাদের হামলায় জনাব রবসহ শতাধিক ছাত্র আহত হন। পরে আহতদের একজন ছাত্র হাসপাতালে মারা যায়।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকারকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকার পড়াশুনার জন্য একশতটি বৃত্তি দেয়। মেধা অনুসারে একশত জন ছাত্র নির্বাচিত হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। ৮ই জুলাই নির্বাচিত তালিকা থেকে হঠাৎ করে অন্যায়ভাবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ৪১ জনকে বাদ দিয়ে নতুন করে তাদের জায়গায় অন্য ৪১ জনকে নির্বাচিত করা হয়। মুজিববাদে বিশ্বাসী ছিল না বলেই প্রথম নির্বাচিত ৪১ জনকে বাদ দেয়া হয়। ইতিমধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়েও মুজিববাদকে কেন্দ্র করে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। নেতাদের বিবৃতি বক্তব্যে এ বিরোধ ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠে।
১৯৭২ সালের ১৮ই জুলাই তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী চট্টগ্রামে ঘোষণা করলেন, “গণতন্ত্রের নীতি ও আদর্শেই দেশ পরিচালিত হবে।” তার একদিন আগে ঠাকুরগাঁয়ে এক জনসভায় লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরী বললেন, “মুজিববাদের চার নীতি দ্বারাই দেশ চালিত হবে।” তার কয়েকদিন পর ৩১শে জুলাই আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কমিটিতে সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে মুজিববাদ কায়েমের শপথ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়। ১২ই আগষ্ট অর্থমন্ত্রী ও প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজুদ্দিন আহমদ ভাওয়ালের এক জনসভায় বললেন, “সমাজতন্ত্রের প্রতি বাধা আসলে গণতন্ত্র ত্যাগ করব।” ২০শে আগষ্ট আওয়ামী লীগের নেতা আব্দুর রাজ্জাক বললেন, “বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ধার করা আদর্শ এবং মাওবাদী  চক্রান্ত।” রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, “গণতন্ত্র কায়েম হবে!” মন্ত্রী বলেন, “সমাজতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনে গণতন্ত্র ত্যাগ করব!!” শীর্ষ নেতা শেখ মুজিব বলেন, “দু’টাকে মিলিয়ে মুজিববাদ কায়েম করা হবে!!!” এভাবেই দেশে সৃষ্টি করা হল আদর্শগত বিভ্রান্তিকর এক চরম অবস্থা। আর এ বিভ্রান্তির ফলে শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগই নয় সমস্ত জাতি হল দ্বিধা-বিভক্ত।
ম্যাকনামারা ঢাকায় আসেন ১৯৭২-এর ফেব্রুয়ারিতে। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সদস্যকরণ এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা করা। তাজউদ্দীনের কাছে এই দুই প্রস্তাবের কোনোটিই গ্রহণযোগ্য মনে হয় নি। তিনি তখন অর্থ ও পরিকল্পনা দপ্তরের মন্ত্রী; অতিথির সঙ্গে বৈঠক একটা করতে হয় বলেই তিনি করেছেন; কিন্তু বাংলাদেশের জন্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কী কী করতে পারে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি যা বলেছিলেন তা কেবল তার পক্ষেই বলা সম্ভব ছিল। বৈঠকে পরিকল্পনা কমিশনের উপ-প্রধান প্রফেসর নূরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। নূরুল ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী ম্যাকনামারাকে তাজউদ্দীন জানিয়েছিলেন, তার দেশের জন্য এই মুহূর্তে প্রয়োজন হলো ষাঁড়ের। প্রফেসার ইসলামের ভাষায়-

He solemnly went on to explain that during the war the bullocks were either killed or dispersed all over the country as farmers fled from the marauding Pakistani army. Cattlesheds and ropes were destroyed in the process. Therefore, there was also a need for sheds and ropes.
একথা বলে তাজউদ্দীন যোগ করেছিলেন এই মন্তব্য যে, এ ধরনের প্রয়োজন পূরণ করা যেহেতু ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কর্মধারার আওতায় আসবে না ওই ব্যাংকের পক্ষে তাই বাংলাদেশকে সহায়তা দান সম্ভব হবে না। তাজউদ্দীনের বক্তব্যে কৌতুক হয়তো ছিল, কিন্তু দেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে গরু ও ষাঁড়ের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি যে বিশেষভাবেই অবহিত ছিলেন এ খবর কিন্তু তার ডায়েরিতেও পাই।
তাঁর মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে তাজউদ্দীনের গুরুতর মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল বাকশাল গঠনের প্রশ্নে। এ নিয়ে দু’জনের ভেতর কথা হয়, এবং তাজউদ্দীন একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম যে কিছুতেই উচিত হবে না সে-কথা খুব জোর দিয়ে বলেছেন। তার চূড়ান্ত বক্তব্যটি ছিল এই রকম : “মুজিব ভাই, এই জন্যই কি আমরা ২৪ বছর সংগ্রাম করেছিলাম? যে ভাবে দেশ চলছে, আপনিও থাকবেন না, আমরাও থাকব না। দেশ চলে যাবে আলবদর রাজাকারের হাতে।” বাকশাল যখন গঠিত হয় তাজউদ্দীন অবশ্য তখন আর মন্ত্রিসভায় নেই; তবু তাকে নতুন দলের সাধারণ সম্পাদক হতে বলা হয়েছিল। প্রস্তাবটি নিয়ে গিয়েছিলেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর। তাজউদ্দীন তাকে বলেছিলেন, “বঙ্গবন্ধুকে হাজার সালাম। কিন্তু দাদা, আমি আর সহমরণের পার্টিতে যাব না।” বাকশাল প্রসঙ্গে ন্যাপের মোজাফফর আহমদকেও তিনি বলেছিলেন, “আপনারাও সহমরণের পার্টিতে যোগ দিয়েছেন।” তার রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির স্বচ্ছতা এক্ষেত্রেও প্রকাশ পেয়েছে।
বাকশাল গঠনের আগে আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপ (মোজাফফর) নিয়ে যে ত্রিদলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয় তার ব্যাপারেও তাজউদ্দীনের আপত্তি ছিল। ওই ঐক্যকে ত্রিশূল আখ্যা দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংকে তিনি বলেছিলেন, “মণি দা, আপনারা ত্রিদলীয় ঐক্যজোট করেন নি, ত্রিশূল করেছেন। এক শূলে মুজিব ভাই মারা যাবেন, অপর শূলে আপনারা ও আমরা।” ইতিহাস সাক্ষী, তার এই ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণিত হয় নি। আওয়ামী লীগের দু’জন নেতাই নিহত হয়েছেন, এবং কমিউনিস্ট পার্টি বিলোপবাদীদের আক্রমণসহ একাধিক রাজনৈতিক বিপদের মুখোমুখি হয়েছে।
ইতিহাস আরো বলবে যে, ত্রিদলীয় ঐক্যজোট বাকশালের পূর্বাভাস এবং ওই পথ ধরে এগুনোটা যে কেবল সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য তা নয়, গোটা দেশের জন্যই অকল্যাণকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। স্বাধীনতার পরে খুব বেশি দরকার ছিল একটি কার্যকর বিরোধী দলের, যে দল সরকারের ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিতে পারবে এবং একই সঙ্গে জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে বিকল্প রাজনৈতিক ধারার প্রতিশ্রুতি দেবে। মুক্তিযুদ্ধের ভেতর লালিত সমষ্টিগত মুক্তির স্বপ্ন বাস্তবায়নে জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগ যে সমর্থ হবে না, সেটা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার পরেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, মানুষ তাই অপেক্ষা করছিল সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসীদের এগিয়ে আসার জন্য। সমাজতন্ত্রীদের ভেতর উগ্র বামপন্থী বলে কথিতরা তখন বিক্ষিপ্ত এবং সরকারি বেসরকারি নিপীড়নে বিধ্বস্ত। কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপই তখন বামপন্থীদের একমাত্র দৃশ্যমান ও প্রধান ধারা; তাদের পক্ষেই সম্ভব ছিল বিকল্প হিসাবে উপস্থিত হওয়া। কিন্তু সেটা না-করে তারা যখন সরকারি দলের সঙ্গে ঐক্য গড়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তখন স্বভাবতই একটি শূন্যতার সৃষ্টি হলো।
প্রকৃতিতে যেমন রাজনীতিতেও তেমনি, শূন্যতা সৃষ্টি হলেই অঘটন ঘটে। সেটা ঘটলো। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বেরিয়ে এসে খালি জায়গাটা দখল করে নিল। এই দলের নেতারা এক সময়ে মুজিব বাহিনীরই নেতা ছিলেন, কেবল নেতা নয় সংগঠকও। তারা মোটেই সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন না, ছিলেন ঘোরতর দক্ষিণপন্থী, বামবিরোধী এবং পুঁজিবাদে বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগের বলয় থেকে তারা যে বেরিয়ে এসেছিলেন তার পেছনে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব ছিল না। ছিল স্বার্থের বিরোধ। জনগণ অপেক্ষা করছিল বামপন্থী আওয়াজের, এরা সেই আওয়াজটাই তুললেন; সমাজতন্ত্র তো বটেই, অঙ্গীকার করলেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। সমাজতন্ত্রীদের কাছ থেকে শুধু নেতৃত্ব নয়, রণধ্বনিগুলোও ছিনতাই হয়ে গেল। হাজার হাজার তরুণ তাদের পতাকাতলে সমবেত হলো। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য বড় রকমের ক্ষতি ঘটে গেল। জনকাঙ্ক্ষিত সামাজিক বিপ্লবের বাস্তবায়নের পথটা সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়ল; এবং বহু তরুণ, বিপ্লবের স্বপ্নে তাড়িত হয় যারা যেকোনো আত্মত্যাগে প্রস্তুত ছিল, তারা বিপথগামী হলো এবং রক্ষীবাহিনীসহ অন্যান্য সরকারি ও সরকারসমর্থক প্রতিপক্ষের হাতে প্রাণ দিল। দুই দশজন নয়, শত শত। সবকিছু মিলিয়ে বামপন্থী নেতাদের ব্যর্থতার দরুন বাম আন্দোলনের পক্ষে সংগঠিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ল।

 কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশ আমলে লড়াই করেছে, তারাই প্রকৃত স্বাধীনতার কথা বলেছে। কমিউনিস্ট পার্টি তো লীগ ও কংগ্রেসের বিকল্প হতে পারেনি। পাকিস্তান আমলেও কমিউনিস্ট পার্টি আওয়ামী লীগের বিকল্প হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তারা আওয়ামী লীগের পেছনে চলেছে। কিন্তু এখানে বিরাট একটা শক্তি ছিল, সম্ভাবনা ছিল। সমাজতন্ত্রীরা এখানে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে, ঐতিহাসিকভাবে ঘটনাটি ঘটল। মওলানা ভাসানীর মতো লোক ছিলেন। তিনি কিন্তু অনেক বড় মাপের নেতা, তিনি কৃষকের নেতা এবং কৃষক ছাড়া এ দেশের অর্থনৈতিক বিপ্লব কখনো সম্ভব হবে না। কারণ, কৃষক শতকরা ৯৫ জন লোক, কৃষকই হচ্ছে শক্তি। ওই কৃষকের নেতাকে, যিনি সমাজতন্ত্রে দীতি হয়েছিলেন, সমাজতন্ত্রীরা তাকে পরিত্যাগ করল। তিনি যে আওয়ামী লীগের মধ্যে ছিলেন, সেখানে কিন্তু তিনি থাকতে পারলেন না। কারণ, তারা সেখানে সমাজতন্ত্র গ্রহণ করে না। তিনি ন্যাপ করলেন, ন্যাপ থেকে প্রথমে বেরিয়ে গেল কে, বেরিয়ে গেল মস্কোপন্থীরা। সাতষট্টিতে বেরিয়ে গেল। মওলানা দুর্বল হয়ে গেলেন, ন্যাপ ছোট হয়ে গেল। কোথায় মওলানা ভাসানী আর কোথায় মুজাফফর আহমদ। কোনো তুলনা হয় না। মুজাফফর আহমদ থেকে তার পরে ওই মওলানা ভাসানীর যে দুই শক্তিশালী বাহু একটা শ্রমিক, একটা হচ্ছে কৃষক। মওলানা ছিলেন কৃষক সমিতির গুরু। কৃষক কমিটির নেতা হচ্ছেন আব্দুল হক। মওলানা ভাসানী হচ্ছেন তার সভাপতি। আব্দুল হক চলে গেল নকশালে, আবার শ্রমিকদের সভাপতি হচ্ছেন মোহাম্মদ তোহা, মওলানা হচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা। মওলানা তখন একা হয়ে গেলেন। তোহা চলে গেল নকশালে। স্বাধীনতার লড়াইটা যদি মওলানার নেতৃত্বে হতো, সেই লড়াইটা ভিন্ন রকম হতো। সমাজতান্ত্রিক দিকে যেত, কিন্তু সেটা হওয়ার সম্ভব ছিল না। বামপন্থীরা দাঁড়াবে কী করে? যখন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন চমৎকার একটা সুযোগ ছিল এই সিপিবির প।ে বিকল্প শক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারত তারা। বিকল্প হওয়ার মানে হচ্ছে সিপিবি ছিল, ন্যাপ ছিল, গণতন্ত্রী দল ছিল। এই তিনটি মিলে যদি দাঁড় করাত। আওয়ামী লীগের বিকল্প একটা শক্তি দাঁড়াত। বাকশালও আসত না। তারা কী করল, তারা ঐক্যজোট বানাল আওয়ামী লীগের সঙ্গে। এই শূন্যতার মধ্যে জাসদ বেরিয়ে এল আওয়ামী লীগ থেকে। আওয়ামী লীগের অতিশয় রণশীল অংশ মুজিব বাহিনী, সেই বাহিনীর তরুণদের মধ্যে থেকে জাসদ বেরিয়ে এলো। তারা আওয়াজ দিল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের। মানুষ স্তম্ভিত হয়ে গেল। কেবল সমাজতন্ত্র নয়, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র! যারা বলত সমাজতন্ত্রের নাম নিলে জিহ্বা কেটে নেওয়া হবে, তারা বলা শুরু করল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। লড়াইটা হলো। জাসদের ছেলেরা যারা হতাশ হয়েছে যে তাদেরকে পাত্তা দেওয়া হচ্ছে না, মতার কাছাকাছি যাওয়া যাচ্ছে না। সিরাজুল আলম খানের আশা ছিল যে তাকে সাধারণ সম্পাদক করা হবে, কিন্তু সে দেখল যে তা তাকে করা হচ্ছে না। সে দল খাঁড়া করে ফেলাে তার আগ্রহটা ছিল যে শেখ মুজিব তাকে ডাকবে, কিন্তু ডাকে না যখন, তখন সে সেইখানে রয়ে গেল। তখন তার রাজনীতি শেষ হয়ে গেল। জাসদের রাজনীতিও শেষ হয়ে গেল শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর। এই রাজনীতি আর দাঁড়াল না। তারা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। কারণ, তাদের কোনো মতাদর্শগত ভিত্তি ছিল না। কিন্তু ওই যে বড় শূন্যতাটা, সমাজতন্ত্রের নামে হাজার হাজার তরুণকে তারা নিয়ে এসেছিল, কত মানুষ যে আহত হয়েছে, কত মানুষ মারা গেছে, কত ছেলে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে তার হিসাব আমরা জানি না। কিন্তু ওই শূন্যতাটা তৈরি করল কে, তৈরি করল সিপিবি যেটা প্রধান দল ছিল। চীনপন্থীরা তখন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, চীনপন্থীরা তো স্বাধীনতা আন্দোলনেও অংশ নিতে পারেনি তাদের বিভ্রান্তির কারণে। সিপিবির ঐতিহাসিক ব্যর্থতা ও মৃত্যু ঘটল। এটাই বামপন্থীদের আন্দোলন এগিয়ে যেতে দেয়নি।
জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষাতেই যুদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু আঞ্চলিক শোষণের অবসানের পরে শ্রেণী শোষণের অবসান যে মানুষ চাইবে সেটা তো ছিল খুবই স্বাভাবিক। জনমুক্তির এই স্বপ্নের কথা তাজউদ্দীন জানতেন, যে জন্য ঐ যুদ্ধসময়ে তার প্রথম ভাষণেই যুদ্ধটিকে গণযুদ্ধ বলে অভিহিত করেছিলেন। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া যে শোষণমুক্তি সম্ভব নয়, এ বিষয়ে তার অস্পষ্টতা ছিল না। স্বাধীনতার পরে ঢাকার সচিবালয় প্রাঙ্গণে সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশ্য করে প্রদত্ত তার বক্তৃতায় এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। তার বক্তব্যের মধ্যে এই কথাটা ছিল যে, “শহীদের রক্তে উর্বর মাটিতে উৎপন্ন ফসল ভোগ করবে চাষি, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। কোনো শোষক, জালেম ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বাংলাদেশকে শোষণ করতে পারবে না।” সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা সম্পর্কে তার যে কথাটি বলার ছিল তা হলো, তারা যেন এই সত্যটাকে ভুলে না যান যে, বিপ্লব সম্পূর্ণ করার জন্য প্রয়োজন হবে ‘সাম্যাবাদী অর্থনীতি, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ কায়েম করা।’ প্রথম দিকে ওই তিন লক্ষ্যের বাস্তবায়নই ছিল রাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্য। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর রেসকোর্সে দেওয়া বক্তৃতাতে শেখ মুজিবও গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথাই বলেছিলেন।
৭২ এ গঠিত জাসদ আজ যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে,সমালোচকরা বলেন,সমাজ পরিবর্তনের যে আদর্শ নিয়ে জাসদের জন্ম হয়েছিল,সেই জাসদ এখন নিজেই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। অনেকে বলেন, ম্রিয়মান জাসদ এখন বিলীন হচ্ছে আওয়ামীলীগে। কে জানে সময়ের বিবর্তনে আমরা দেখব জাসদ একাকার হয়ে গেছে আওয়ামীলীগে।
জাসদের জন্মগ্রহে এখনো হটকারীতা,ষড়যন্ত্র আর সদ্য স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধা তারুন্যের হতাশার বেদনা আর বিদ্রোহের বর্নমালা লেখা আছে ইতিহাসের অক্ষরে। হটকারীতার রাজনীতির কারনে জাসদের হাজারো তরুনকে প্রান দিতে হয়েছে কেবল ভুল সমীকরনের রাজনীতির ফলাফলে। দ্রুত ক্ষমতায় পৌছাবার অথবা যে করেই হোক ক্ষমতায় যাবার বাংলাদেশের রাজনীতির বিকৃতির ইতিহাসে জাসদ এখনো জলন্ত উদাহরন।

পরিত্যক্ত সম্পত্তি দখলীকরণ আইন
এদিকে সরকার পরিত্যক্ত সম্পত্তি দখলীকরণ আইন পাশ করে ৩ জানুয়ারি, ১৯৭২ এবং পরবর্তীকালে সংবিধানের নামে এটিকে রক্ষা করা হয়। এটি ছিল শিল্প এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সম হের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ দখল সংক্রান্ত একটি আদেশ। বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর অবাঙালী মালিকানায় কোটি কোটি টাকা ম ল্যের অসংখ্য শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রেখে মালিকরা পালিয়ে গেলে সেগুলো রক্ষা করার জন্য এই আইন প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীকালে এই আইনকে বাংলাদেশ পরিত্যক্ত সম্পত্তি আদেশ (নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা ও বিক্রয়), ১৯৭২-এর সঙ্গে সমন্বিত করা হয়। উক্ত আইনে রাষ্ট্রপতির ১৬ নং আদেশের (চঙ ১৬) পরিধি ছিল আরো বিবৃতি। কারণ উক্ত আদেশের মাধ্যমে শুধু সম্পত্তির দখল নয়, তার বিক্রয়ের অধিকারও সরকারের হাতে ন্যস্ত করা হয়। পিও ১৬ -এর মাধ্যমে শুধুমাত্র পাকিস্তানীদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির উপরই নয়, দেশের নাগরিকদের যে কোন সম্পত্তি দখল করার ব্যাপারেও সরকারকে অনন্য সাধারণ ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এই আইনে আওয়ামী নেতা-কর্মীদের অপরের সম্পত্তি আইনের আবরণে লুট করার বিশেষ সুযোগ এনে দেয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকারের নেতা-কর্মীরা সরকারের ভীত সন্ত্রস্ত কর্মকর্তাদরে মাধ্যমে পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার করেন এবং পক্ষান্তরে তাদেরই সাহায্য নিয়ে সরকারের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা তাদের লুটের অংশীদারে পরিণত হন। এমনও দেখা গেছে যে, নিছক সামাজিক অথবা রাজনৈতিক শত্রুতাবশে মালিক উপস্থিত জেনেও একজনের সম্পত্তি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে দখল করে নেয়া হয়েছে। যে সম্পর্কে অবাঙালী ভারতীয় বা বিহারী বহু বছর আগে বাংলাদেশে মাইগ্রেশন করে বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং পাকিস্তানের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রদর্শন করেন নি, ভীতি প্রদর্শন করে এমন প্রায় সকল অবাঙালীর সম্পত্তি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে দখল করে নেয়া হয়। আওয়ামী ধ্বজাধারী লোভী রাজনৈতিক প্রতারকেরা তাদের বিপর্যয়ের সুযোগ গ্রহণ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন নি। প্রাথমিকভাবে কোন বিধান জারি করা হয়নি বলে ছোট বড় সকল পরিত্যক্ত সম্পত্তির ব্যবস্থাপক, প্রশাসক এবং বোর্ড সদস্য হিসেবে ঢালাওভাবে দলীয় নেতা-কর্মীদের অথবা রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রীদের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত লোকদের নিয়োগ করা হয়। বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী অথবা তাদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্তদের নিয়োগ করা হতে থাকে। অনেক শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞতা এবং কারিগরী জ্ঞানবিহীন দলীয় নেতা-কর্মী অথবা প্রতিষ্ঠানের অধঃস্তন কর্মচারীদের ব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এভাবে দীর্ঘদিন যাবৎ পাকিস্তানী ব্যবসায়ী অথবা তাদের বিশ্বস্ত ব্যবস্থাপকদের দ্বারা পরিচালিত অসংখ্য পাটকল, বস্ত্রকল এবং শত শত বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান কতিপয় অদক্ষ, অনভিজ্ঞ ব্যবস্থাপকের করায়ত্ত হয়। গোলযোগ, দুর্নীতি, লুট হয়ে দাঁড়ায় এর অনিবার্য ফল। সংঘবদ্ধ চোরাচালানীদের মাধ্যমে শিল্প প্রতিষ্ঠানের দামী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়, উৎপাদন দ্রুত নেমে আসে নিচের দিকে, যে কোন সুবিধাজনক ম ল্যে এই সম্পত্তির বিক্রি বা বিনিময় করা হতে থাকে। প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থ বা তার নামে ব্যাংকে রক্ষিত টাকা হিসাববিহীনভাবে চলে আসে ব্যক্তি বিশেষের হাতে। ফলে অচিরেই এ ধরনের অধিকাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠান দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়, কিংবা সেগুলো বন্ধ বা বিক্রি করে দেয়া হয়। সম্ভবত এটা ছিল এমনি একটি ক্ষেত্র, যেখানে মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা, ষোড়শ বাহিনীর সদস্য যাই হন না কেন, তাদের মধ্যে দেশপ্রেমের ছিঁটে ফোঁটাও ছিল কিনা সন্দেহ, তাদের আত্মীয়-স্বজন সমর্থক এবং পৃষ্ঠপোষক প্রাপ্তদের কথা তো বলাই বাহুল্য। ব্যাংক, বীমা, সংস্থা ও বৃহৎ শিল্পের জাতীয়করণ আওয়ামী লীগ শুধুমাত্র পরিত্যক্ত সম্পত্তি দখল করেই ক্ষান্ত হয়নি। ‘সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা এবং মানুষ কর্তৃক মানুষের ওপর শোষণ দূর করার লক্ষ্যে পরিত্যক্ত সম্পত্তি আদেশ প্রণয়নের মাত্র এক মাসের মধ্যে ২৫ মার্চ ’৭২ পাট, বস্ত্র ও চিনিকলসমু হ, ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণ করে আইন পাশ করা হয় এবং এর মাধ্যমে দেশের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ শিল্প, ব্যাংক, বীমা ব্যবসা সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আনা হয়। এ সমস্ত ব্যবসায়ের মালিকানার অধিকাংশই ছিল পাকিস্তানীদের এবং ইতোমধ্যে এগুলোর দখল পরিত্যক্ত সম্পত্তি আদেশের মাধ্যমে সরকারের অধীনে নিয়ে আসা হয়েছিল। কাজেই এ সমস্ত শিল্প বা সংস্থার দখলীস্বত্ব আর পরিবর্তন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি। শুধুমাত্র পরিত্যক্ত সম্পত্তি না বলে তখন থেকে এগুলোকে রাষ্ট্রায়াত্ত খাত বলে আখ্যায়িত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পরিত্যক্ত সম্পত্তি (পিও-১৬) আদেশের আওতায় সম্পত্তির মালিকানা ফিরে পাওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানানোর সামান্য হলেও অবকাশ ছিল এবং সেক্ষেত্রে স্বাভাবিক সুবিচার প্রাপ্তিরও নিশ্চয়তা ছিল। এছাড়া উচ্চ আদালতগুলোও তাদের অন্ত র্লীন রীট জুরিসডিকশনের ভিত্তিতে সরকারের আদেশের বিরুদ্ধে রায় প্রদান করতে পারতো। কিন্তু জাতীয়করণ আদেশের বিরুদ্ধে কোন আবেদন পেশ করার অবকাশ ছিল না এবং এই সম্পত্তি ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে সরকারেরও কোন ক্ষমতা ছিলনা। সরকার কর্তৃক একবার কোন সম্পদ জাতীয়করণ করা হলে আর তা বিজাতীয়করণের কোন অবকাশ ছিল না। শেখ মুজিবের ভাষায়, ‘যে সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল সেগুলো ছিল সরকারের বিপ্লবী পদক্ষেপ’ এবং নতুন গৃহীত এই নীতি ‘ শ্রম ও ম লধনকে দ্বিধাবিভক্তকারী সকল চিরায়ত প্রথার’ বিলুপ্তি ঘটানোর পথে এগিয়ে যাবে। সেদিন শেখ মুজিব জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, তাঁর সরকার অভ্যন্ত রীণ সমাজতান্তি ক বিপ্লবে বিশ্বাস করেন এবং সরকার ও তাঁর দল ছিল দেশে একটি ‘বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজতান্তি ক অর্থনীতি’ প্রতিষ্ঠায় ওয়াদাবদ্ধ। শোষণ এবং অবিচারমুক্ত একটি সমাজ গঠনের প্রয়োজনে এবং একটি নতুন সমাজের গোড়াপত্তনের লক্ষ্যে শেখ মুজিব ঘোষণা করেছিলেন যে, তাঁর সরকার অর্থনীতির ম ল চালিকাশক্তিগুলো ধাপভিত্তিকভাবে জাতীয়করণ করার নীতি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদেরধর পর হতে ইসলাম সমগ্র বিশ্বে এক নব জাগরণের সূচনা করেছে। এর বিপরীতে পুঁজিবাদ তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে তুমুল সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন তার রণকৌশল পরিবর্তিত হচ্ছে। সমাজতন্ত্র তো ইতিমধ্যেই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত। যেমন আকস্মিক তার আবির্ভাব তেমনি আকস্মিক তার তিরোভাব। যেসব দেশ এখওন সমাজতন্ত্রের দাবীদার তারা বহুবার সংশোধনের মাধ্যমে প্রকারান্তরে পুঁজিবাদের নামাবলী গায়ে চড়িয়ে দিয়েছে। অপর দিকে আজ দেশে দেশে দিকে দিকে ইসলামী আন্দোলনের সবুজ ঝান্ডা উড়ছে। বহু দেশ আজ ইসলামের নামেই রাষ্ট্রপতাকা উড্ডীন করেছে। যেসব দেশে একদা ইসলামী জীবনাদর্শ চর্চা নিষিদ্ধ ছিলো, ছিলো অপাংক্তেয়, সেসব দেশে ইসলাম আজ শুধু অগ্রসরমান শক্তিই নয়, বরং তারা সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের অচলায়তন ভেঙে নতুন জীবনের ডাক দিচ্ছে। সেজন্যেই Economist-এর মতো পত্রিকা বেসামাল হয়ে ধান ভানতে শিবের গীত গেয়েছে। অর্থনীতির আলোচনা বাদ দিয়ে ‘ইসলাম ঠেকাও জিগির তুলেছে। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় পুঁজিবাদের চিন্তাশীল নেতারা গত শতাব্দীতেই বলেছে- “পুঁজিবাদের মুকাবিলায় আগামী শতাব্দীর চ্যালেঞ্চ ইসলাম।” স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের মতো লোকেরা বলছেন শ্রেণী দ্বন্দ্ব (Class Struggle) নয়, সভ্যতার সংঘর্ষই (Clash of Civilization) ইতিহাসের ধ্রুব সত্য। পুঁজিবাদী সভ্যতার মুকাবিলায় ইসলামী সভ্যতা তার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে কেন ইসলামকে তাদের এত ভয়, তাদের গলতগুলো কি, এবং তাদের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা কোথায় তা আজ ভালভাবে জানা প্রয়োজন। এই আলোচনায় সেই চেষ্টাই করা হয়েছে।
উদ্ভব ও বিকাশ
ইসলামের পূর্ণ রূপলাভ ঘটে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ বিশ্বের কালজয়ী আদর্শপুরুষ হযরত মুহাম্মদ (স)-এর আমলে, তাঁর মদীনার জীবনে। ইসলামী সমাজদর্শন তথা জীবন বিধানের ভিত্তি হলো তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাত। আল-কুরআন ও সুন্নাহ এবং ইজমা ও ক্বিয়াস অর্থাৎ ইজতিহাদের মাধ্যমে এই জীবন ব্যবস্থা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত গতিধারায় বহমান থাকবে। পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদমের স্রষ্টা আল্লাহর দেওয়া বিধি-বিধানের মধ্যেই যেমন রয়েছে তার জন্যে শান্তি ও পূর্ণতা তেমনি রয়েছে সার্বিক কল্যাণ ও মঙ্গল।
এরই বিপরীতে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা তাদের নিজেদের মনগড়া মতবাদ ও জীবন বিধানের প্রেসক্রিপসান দিয়ে পৃথিবীতে যে অশান্তি, ধ্বংস, হানাহানি ও সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে তার একমাত্র তুলনা তারা নিজেরাই। পুঁজিবাদের ইতিহাস শোষণ-নিপীড়ন, অন্যায় যুদ্ধ ও সংঘাতের ইতিহাস। পুঁজিবাদের দর্শন চরম ভোগবাদী ও ইন্দ্রিয়পরায়ণতার দর্শন। পুঁজিবাদের প্রাথমিক উর্মেষ ঘটে মধ্যযুগীয় ইউরোপে। সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণীর ক্রমবিকাশের ধারায় বুর্জোয়া শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। পুরোহিদের সাথে যোগসাজসে রাজতন্ত্র হয়ে ওঠে চরম শোষণতন্ত্র ও একই সাথে পীড়নবাদী শাসনব্যবস্থা। ফ্রান্সে ভূমিবাদীদের প্রভাব মিলিয়ে না যেতেই প্রথমে ইংল্যান্ডে ও পরে সমগ্র ইউরোপে বাণিজ্যবাদ বা মার্কেন্টাইলিজমের বিকাশ ঘটে। এদের মূল কথা ছিলো বেশী রপ্তানী করো, প্রাপ্য অর্থ সোনাদানায় বুঝে নাও আর গোটা দুনিয়ার সম্পদ এনে জড়ো করো নিজের দেশে। এর নেতৃত্ব দিয়েছিলো দুনিয়অর সেরা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বৃটেন। পুঁজিবাদের বীজ নিহিত ছিলো এসব কর্মকান্ডের মধ্যেই। সেটি আরও উচ্চকিত ও প্রবল হয় শিল্প বিপ্লবের ফলে। এ সময়েই রচিত হলো পুঁজিবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তির কালজয়ী গ্রন্থ –An Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations (১৭৭৬)।
শিল্প বিপ্লবের ফলে উপনিবেশবাদ আর জাঁকিয়ে বসে। বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের আবিষ্কার ও শিল্প উৎপাদনের ক্রমবিকাশমান কলাকৌশলকে বেনিয়ারা নিজেদের স্বার্থে ব্যাপক ও নির্দয়ভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এরই ফসল শিল্প বিপ্লব। একই সাথে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা হলো “খাও, দাও আর ফুর্তি করো” এই ভোগবাদী দর্শনদিয়ে। প্রকৃতপক্ষে যান্ত্রিক ও ইতর বস্তুবাদ হয়ে পড়লো সমাজ দর্শনের ভিত। ভোগবাদী জীবন ও বস্তুবাদের সমন্বয়ের আগুনেঘি ঢালার কাজটি সম্পন্ন করলো অবাধ ও নিরংকুশ ব্যক্তি মালিকানা এবং ধর্মনিরপেক্ষ ধ্যান-ধারণা। প্রথম দিকে চার্চের পুরোহিতরা কিছুটা বাধার সৃষ্টি করতে চাইলেও তাদের সে চেষ্টা রাজন্যবর্গ ও বুর্জোয়া শ্রেণীর চাপে স্রোতের মুখে খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। এরই সাথে পরবর্তীকালে যুক্ত হলো মানবতার অস্তিত্ববিনাশী ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা আল্লাহর অফুরন্ত নিয়ামত ভোগে চরম বাধাসৃষ্টিকারী সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ। পুঁজিবাদ এভাবেই তার শক্তিমত্তা ও দাপট বৃদ্ধি করে চললো। বাণিজ্যিক পুঁজিবাদ দিয়ে তার শুরু। ক্রমে শিল্প পুঁজি, বিনিয়োগ পুঁজি ইত্যাদি পর্যায়ে পেরিয়ে সে পৌঁচেছে বহুজাতিক পুঁজির বিশাল বাজারে। এ বাজার তারই রচিত, বিশ্বকে শোষণের জন্যে তারই উদ্ভাবিত কৌশল। এর অপ্রতিহত গতি ও সাফল্যকে ধরে রাখতে পুঁজিবাদের উদ্ভাবিত সর্বশেষ কৌশল হলো বিশ্বায়ন (Globalization) ও উদারীকরণ (Liberalization)।
জার্মান ইহুদী কার্ল মার্ক্স (১৮১৮-১৮৮৩) ভাগ্যের অন্বেষণে ঘুরতে ঘুরতে ফ্রান্স ও বেলজিয়াম হয়ে এক সময়ে পৌঁছে যান পুঁজিবাদের তৎকালীন সবচেয়ে বড় ধ্বজাধারী দেশ ইংল্যান্ডে। সেদেশে তখন রবার্ড ওয়েন, থমাস হজকিন্স, সিডনী ওয়েব, চার্লস ফুরয়ার, সেন্ট সাইমন, লুই ব্লাঁ, জেরেমি বেনথামেরমতো ফেবিয়ান সোস্যালিস্ট, হবসন ও বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো গিল্ড সোসালিস্ট ও পিশুর মতো গণদ্রব্য সরবরাহ করার প্রবক্তাদের আলোচনা ও লেখালেখির ফলে বিদগ্ধ মহলে সমাজতন্ত্র নিয়ে বেশ উত্তেজনা ছিলো। এই পটভূমিতেই কার্ল মার্কস দেখলেন শিল্প বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট শ্রমিকদের বেদনাবিধুর বিপর্যস্ত মানবেতর জীবন যাপন। এরই সমাধানের জন্যে তিনি গ্রহণ করলেন দ্বান্দ্বিক বাস্তুবাদ তত্ত্ব, ডাক দিলেন শ্রেণী সংগ্রামের। তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ Das Dapital (১৮৬৭) এই সময়েইরচিত। তাঁর Theory of Surblus Value এই পটভূমিতেই উদ্ভাবিত। তাঁর প্রস্তাবিত শ্রেণী সংগ্রামের পথ ধরে পরবর্তীকালে রাশিয়ায় লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টির মাধ্যমে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার সময়ে শ্রেণী শত্রু উৎখাত ও নির্মূলের নামে কত লক্ষ বনি আদম যে বন্দুকের নলের শিকার হয়েছিলো, কত লক্ষ লোক ভিটেমাটি হতে উচ্ছিন্ন হয়ে সুদূর সাইবেরিয়ায় নির্বাচিত হয়েছিলো তার হদিস মিলবে না কোনো দিনই। সমাজতন্ত্র যখন একটা সংগঠিত শক্তির রূপ নেওয়া শুরু করে তখন তার কার্যাবলীর মধ্যে প্রধান হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তি মালিকানা ও ব্যক্তি স্বাধীনতার উচ্ছেদ, সর্বহারা একনায়কত্বের (Dictatorship of the Proletariat) নামে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, জনগণের মালিকানর নামে উৎপাদনের উপায় উপকরণে রাষ্ট্রীয় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার এবং ধর্মের আমূল উচ্ছেদ।
মার্ক্স-এঙ্গেলসের পুঁথিগত ও নিজস্ব ধ্যান-ধারণার উপর ভিত্তি করে রচিত জীবন দর্শনকে অভ্রান্ত মনে করে পরবর্তীকালে লেলিন-স্যালিন-ক্রশ্চেভ রাশিয়ায় যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিলো সেই ক্ষত কাটিয়ে উঠতে নবতর কৌশল উদ্ভাবন করতে হয়েছে, দীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে হয়েছে। তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি। এমনকি তুরুপের তাস হিসেবে গ্লানস্ত ও পেরেসত্রয়কাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন কমরেড মিখাইল গরবাচেভ্ তাতে বরং আগুনে পেট্রোল ঢালারই কাজ হয়েছিলো। খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়লো পৃথিবীর দ্বিতীয় পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন।
রাশিয়ার প্ররোচনায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালানো হয়েছিলো পূর্ব ইউরোপীয় দেশ পোলান্ড হাঙ্গরী রুমানিয়া বুলগেরিয়া আলবেনিয়া ও যুগোস্লোভিয়ায়। এজন্যে অনেক ক্ষেত্রে রাশিয়া সরাসরি সামরিক মদদ যুগিয়েছে, ট্যাংকের বহর পাঠিয়েছে। একই চেষ্টা চললো কিউবায়, আফ্রিকার কাঙ্গো এঙ্গোলা নামিবিয়া ও ইথিওপিয়ায়। এ ঢেউ এসে আছড়ে পড়লো চীনেও। কিন্তু তাত্ত্বিক নীতি ও আদর্শ পরিবর্তিত হতে শুরু করলো বাস্তবের কঠিন পরিস্থিত মুকাবিলা করতে যেয়ে। শতাব্দী প্রাচীন কম্যুনিস্ট মেনিফেস্টো (১৮৪৮) ততদিনে লক্ষ লক্ষ লোককে কবরে পাঠিয়ে দিয়েছে। আরও লক্ষ লক্ষ বনি আদমকে ভিটেমাটি ছাড়া করেছে। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বা বাধ্যতামূলক শ্রমশিবিরে যে কত লোক লাপাত্তা হয়েছে তার কোন লেখাজোখা বা বাধ্যতামূলক শ্রমশিবিরে যে কত লোক লাপাত্তা হয়েছে তার কোন লেখাজোখা নেই। যাহোক বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে পশ্চিমা দেশগুলোর সাতে তাল মিলিয়ে চলার বাসনায় সমাজতন্ত্রী ও সাম্যবাদী দেশগুলো তাদের পূর্বঘোষিত আদর্শের পরিবর্তন পরিমার্জনা করে পুঁজিবাদের সাথে আপোষরফার নীতি গ্রহণ করে। এ উদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যুগোশ্লোভিয়া। পরবর্তীকালে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর সোস্যালিস্ট বা কম্যুনিস্ট পার্টি কর্তৃক গৃহীত সোস্যালিজমবা কম্যুনিজমের নতুন ব্যাখ্যা চাই বহুক্ষেত্রেই ছিলো মার্কসবাদের সাতে দারুণ অসংগতিপূর্ণ।
চীনও এর ব্যতিক্রম নয়। কমরেড মাও ঝে দং লং মার্চের মাধ্যমে চীনে কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠার ডাক দেন। রেড গার্ড আন্দোলনের নামে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে বিরোধ মনোভাবাপন্ন বুদ্ধিজীবীদের মেথরে স্তরে নামিয়ে আনেন। মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের হত্যা ও পাইকারী হারে বন্দী করেন। উইঘুরদের (চীনে মুসলমানদের উইঘুর ও হুই বলা হয়) নাম-নিশানা মুছে ফেলার সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়া হয়। সমাজতন্ত্রের ইতিহাস সীমাহীন রক্তপাত ধ্বংসযজ্ঞ নির্যাতন পতারণা ও ছলনার ইতিহাস। চীন তার ব্যতিক্রম হবে কি করে? কিন্তু এত করেও শেষ রক্ষা হয়নি। মাওয়ের মৃত্যুর পর পরই দেং জিয়াও পিং মার্কিন ও ইউরোপীয় পুঁজিপতিদের উদার আমন্ত্রওণ জানালেন, উপকূলবর্তী সকল এলাকা মুক্ত অঞ্চল গোষিত হলো; কাজের মান ও পরিমাণ অনুযায়ী উঁচুহারে বেতন নির্ধারিত হলো। এমনকি গণকমিউনিকেও (People’s Commune) ঢেলে সাজানো হলো। আর কিউবার মহান (!) ফিদেল ক্যাস্ট্রো কর্তৃক খ্রীস্টান বিশ্বের ধর্মগুরু পোপকে তার দেশে আমন্ত্রণ জানাবার কথা কে না জানে?
সমাজতন্ত্র একদা তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোকে তার আপাতঃমধুর মোহনীয় বাক্যজালে প্রভাবিত করেছিলো। মুসলিম বিশ্বের অনেক শে এই ভ্রান্তির বেড়াজালে আটকেছিলো। লিবিয়া মিশর সুদান সিরিয়া ও ইরাক তার প্রকৃষ্ট নজীর। তবে এরা পুঁজিবাদকেও পুরো বর্জন করতে পারেনি। সেজন্যেই এদের ব্যবহারিক দর্শনে একই সঙ্গে ধর্মীয় অনুসঙ্গ জাতীয়তাবাদ পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মিশ্রণ দেখতে পাওয়া যায়। এই মিশ্রণ তাদের জন্যে কোন কোন দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণ বা মঙ্গল বয়ে আনেনি। বরং শেষ অবধি অনেক দেশেরেই মোহভঙ্গ ঘটেছে। কিন্তু ততদিনে সর্বনাশ যা হবার তা হয়ে গেছে।
এখানেই শেষ নয়। পরাভূত মৃতপ্রায় সমাজতান্ত্রীরা পুনরায় তাদের থাবার লুানো নখর বের করতে শুরু করেছে। নানা নতুন নামে জনগণকে আবার ধোঁকা দেবার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। প্রতারণা ও ছলনার নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করছে। তাদের পুরনো দোসররাও বসে নেই। তারাও নিমকহালালীর পরিচয় দেবার জন্যে নেতাদের জন্মদিন, স্মরণ উৎসব, প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, বৈজ্ঞানিক চিন্তার অনুশীলন ইত্যাকার নানা উপলক্ষ্য বের করে সেমিনার সিম্পোজিয়াম সমাবেশ আলোচনা সভা ইত্যাদির আয়োজন করে চলেছে। উপরন্তু বৈজ্ঞানিক চিন্তার আদর্শ অনুসারী, মুক্তবুদ্ধি চর্চার একনিষ্ঠ কর্মী, সংস্কারমুক্ত প্রগতিশীল তরুণ বুদ্ধিজীবী ইত্যাদি চটকদার শব্দের লোভনীয় টোপ ফেলে গেঁথে তুলছে নামের লোভে স্বীকৃতির মোহে পাগলপারা তরুণ-তরুণীদের। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়ুয়া সেসব ছাত্র-ছাত্রীরাই এদের পাতা ফাঁদে পা ফেলে যারা নিজেদের অতীত ঐতিহ্যকে জানে না, জানার চেষ্টাও করেনি। একই সঙ্গে ভবিষ্যত সম্পর্কেও এদের সুস্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। এরাই নব্য সমাজতন্ত্রী ও সাম্যবাদীদের সহজ শিকার।
মৌলিক পার্থক্য
পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের সাথে ইসলামের তুলনা করতে হলে অর্থাৎ এদের বিভিন্নতা বুঝতে হলে প্রত্যেকের বৈশিষ্ট্য বা পার্থক্যও জানতে হবে।
পুঁজিবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. জড়বাদী দৃষ্টিভঙ্গী
২. ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রদর্শন
৩. অবাধ ব্যক্তি স্বাধীনতা
৪. উন্মুক্ত বা অবাধ অর্থনীতি
৫. ব্যক্তির নিরংকুশ মালিকানা
৬. লাগামহীন চিন্তার স্বাধীনতা
৭. গণতন্ত্রের নামে বুর্জোয়া শ্রেণীর শাসন
৮. পুরোপুরি সাম্রাজ্যবাদী।
সমাজতন্ত্রে প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ
২. ধর্মের উৎখাত
৩. ব্যক্তি স্বাধনিতার উচ্ছেদ
৪. নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি
৫. রাষ্ট্রীয় নিরংকুশ মালিকানা
৬. চিন্তার পরাধীনতা
৭. সর্বহারা নামে একদলীয় শাসন
৮. তাত্ত্বিকভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী হলেও বাস্তবে সাম্রাজ্যবাদী।
ইসলামের প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. তৌহিদভিত্তিক বিশ্বাস
২. আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠা
৩. শরীয়াহ অনুমোদিত ব্যক্তিস্বাধীনতা
৪. পরিমিতির অর্থনীতি
৫. শরীয়াহ স্বীকৃত মালিকানা
৬. সুস্থ চিন্তার স্বাধীনতা
৭. শুরাভিত্তিক শাসন
৮. পুরোপুরি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী।
এই বৈশিষ্ট্যগুলোর ভিত্তিতে উল্লেখিত তিনটি মতাদর্শের তথা জীবন দর্শনের পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা যেতে পারে। প্রমাণ করা যেতে পারে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের এবং আগামী শতাব্দীতে তার অনিবার্য বিজয়ের কথা। নীচে পর্যায়ক্রমে বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণের ও সেসবের তাৎপর্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো।

১. জীবন দর্শনের পার্থক্য
ইসলাম, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রে পার্থিব জীবন আচরণে রয়েছে মৌলিক পার্থক্য। পুর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে পুঁজিবাদের জীবন দর্শন হলো জড়বাদী বা বস্তুবাদী জীবন দর্শন যেখানে এই নশ্বর জীবন পুরোপুরি ভোগের বস্তু বলে স্বীকৃত। ভোগের পরিমাণও লাগামহীন ও অপরিমেয়। সেখানে প্রকাশ্যে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি গোষিত না হলেও বাস্তবতা তাই-ই। ভোগের সামগ্রী আহরণের জন্যে, ইন্দ্রিয় লালসা চরিতার্থতার জন্যে হালাল-হারাম বৈধ-অবৈধ ও ন্যায়-অন্যায়ের বাছ-বিচার করা হয় না। জীবনটা যেহেতু স্বল্প দিনের এবং তার সমাপ্তি তা জানা নেই তাই কত অল্প সময়ে কত বেশী ভোগ করা যায়, কত ক ম ব্যয়ে কত বেশী অর্থ উপার্জন করা যায় সেই প্রতিযোগিতাই এখানে তীব্র। আসলেই জড়বাদী সভ্যতায় ইন্দ্রিয়পরায়ণতা এত দূর পৌঁচেছে, পরিবারে যে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়েছে, যৌনজীবনের যে ভয়াবহ সও কদর্য বিকৃতি ঘটেছে তা শুধু রাসূল (স) পূর্ব যুগের আরবের সমাজের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয। পুঁজিবাদের মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষেট্ট্র সমকামতার মতো জঘন্য অপরাধকেও রাজনৈতিক স্বার্থে আইন করে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
এর বিপরীতে সমাজতান্ত্রিক জীবন দর্শনের মূল ভিত্তি হলো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism)। জার্মান দার্শনিক হেগেলের বিরোধমূলক বিকাশের ধারণার দ্বারা মার্ক্স বিশেষভাবে প্রভাবিত হন। এ তত্ত্বের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- থিসিস, এন্টিথিসিসি ও সিনথিসিস। আজকের সত্যই থিসিস। এই থিসিসের বিরুদ্ধে তৈরী হয় িএন্টিথিসিস। দুয়ের সংঘর্ষে উদ্ভব হয় সিনথিসিসের। এই সিনথিসিসই পরবর্তীতে পুনরায় থিসিস হয়ে দাঁড়ায়। হেগেলের এই দ্বান্দ্বিক বিকাশের ধারণাকেই কার্ল মার্ক্স তাঁর সমাজবিকামের ধারণা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন। মার্ক্স ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে তাঁর তত্ত্ব নির্মাণের প্রয়াস পেয়েছেন। সেই প্রয়াসে তিনি বারবার তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তাঁর প্রিয় প্রসঙ্গ শ্রেণী সংগ্রামকে। তাঁর মতে পৃথিবীর বিকাশ হয়ে বিবর্তনবাদ ও শক্তিবাদের মধ্য দিয়ে। চার্লস ডারউইনের (১৮০৯-১৮৮২) বিবর্তনবাদ (Theory of Evolution) ও প্রকৃতির নির্বাচন (Natural Selection) বা যোগ্যতমেরই বেঁচে থাকার অধিকার তত্ত্ব (Survival of the Fittest) মার্ক্সকে তাঁর মতবাদে আস্থাশীল হতে বিপুলভাবে সহায়তা করেছিলো। ফলে তিনি তাঁর ও অনুসারীরা জোরে-শোরেই বললেন- পৃথিবীর ইতিহাসে শক্তিমানরাই শুধু টিকে থাকবে, অন্যেরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাদের মত পৃথিবীর ইতিহাস শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস, শ্রেণী সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সমাজ অগ্রসর হয়েছে।
মার্কসের বস্তুবাদী ও নাস্তিক্যবাদী মতবাদের ভিত হিসেবে কাজ করেছিলো ডারউইনের On the Origin of Species (১৮৫৯) বইটি। দুর্ভাগ্যবশতঃ খোদ ডারউইন আজ আর আগের মত বিজ্ঞানী মহলে আদৃত নন। তাঁর বিবর্তনবাদ ও প্রকৃতির নির্বাচন তত্ত্ব পরবর্তীকালের বৈজ্ঞানিক তথ্য ও যুক্তির কাছে মার খেয়ে গেছে। বৈজ্ঞানিকরা দেখিয়েছেন তেলাপোকা লক্ষ বধর ধরে টিকে রয়েছে, কিন্তু শক্তিধর অতিকায় সব প্রাণী পৃথিবী হতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, আজও যাচ্ছে। িএর পিছনে যত না তাদের নিজেদের দুর্বলতা দায়ী তার চেয়ে অনেক বেশী দায়ী মানুষের অবিবেচনা ও অর্থগৃধ্নুতা। অনুরূবভাবে কবে কখন কি প্রক্রিয়ায় বানর মানুষষের রূপান্তরিত হয় তার কোন সর্বজনগ্রহা্য ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায় নি। কেনইবা বানর ও গরিলা এখন মানুষে রূপান্তরিত হচ্ছে না তারও কোন ব্যাখ্যা নেই।
বিজ্ঞানীরা বিশেষ করে প্রাণিবিজ্ঞানী, পদার্থবিজ্ঞানী, অনুজীব বিজ্ঞানী, এমনকি গণিতবিদরা পর্যন্ত বিবর্তনবাদকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এবং এর অসারতা ও যুক্তিহীনতাকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। এদের তালিকা বেশ দীর্ঘ; এখানে শুধু কয়েকজনের নাম উল্লেখই যথেষ্ট হবে। এঁদের মধ্যে রয়েছেন Louis Bounoure, Lemonie, W. R. Bird, Falmmarion, D. Dewar, S. H. Slusher, Agassiz, E. Schute, P. S. Morhead, M. M. Kaplan, Arthur Koester প্রমুখ খ্যাতনামা বিজ্ঞানীরা। নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী প্রাণরসায়নবিদ J. Monod-এর মতে বিবর্তন দূরে থাক, পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির সম্ভাবনাই প্রকৃতপক্ষে শূন্য। এইচ. এম. মরিস বলেন, পরীক্ষামূলকভাবেও বিবর্তনের প্রমাণ করা সম্ভব নয় (H. M. Morris, Evolution in Turmoil, San Deigo, Californina: Creation Life Publishers, 1982)। প্রখ্যাত অষ্ট্রেলীয় অনুজীব বিজ্ঞানী মাইকেল ডেনটনের মতে বৈজ্ঞানিক যুক্তির সাহায্যে ডারউইনের তত্ত্ব প্রমাণ করা অসম্ভব (Michal Denton, Evolution: A Theory in Crisis, London: Burnett Books, 1985, p. 323)। জেনেটিক কোডের আবিষ্কারক নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী স্যার ফ্রান্সিস ক্রীকের মতে ডারউইনের তত্ত্বের মধ্যে শুধু অসগতিই নেই, অসম্ভবতাও বিপুল (Sir Francis Crick, Life Itself, New York; Simon & Schuster, 1971, p 71)।

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, বিবর্তনবাদ ও শক্তিবাদের তত্ত্বের উপর নির্মিত মার্ক্স-এঙ্গেলসের শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্ব। পৃথিবীর সৃষ্টি হতে ধ্বংস পর্যন্ত সময়কে মার্ক্স পাঁচটি পর্বে ভাগ করেছেন। পর্বগুলো হলো: (ক) আমিদ সমাজ, (খ) দাসভিত্তিক সমাজ, (ঘ) সামন্ত সমাজ, (ঘ) পুঁজিবাদী সমাজ এবং (ঙ) সমাজতান্ত্রিক সমাজ তথা সাম্যবাদ। দুর্ভাগ্যের বিষয়, সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের কট্টর অনুসারীরা সর্বশেষ এই ভ্রান্ত মতাদর্শের জন্যে অর্থ শতাব্দীর বেশী সময় ধরে চেষ্টা চালিয়ে রক্তের স্রোত ও অত্যাচারের বিভীসিকা সৃষ্টি করেও মার্ক্সের ঈপ্সিত সমাজ দর্শন কায়েমে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
জীবন দর্শন সম্পর্কে এই দুই দৃষ্টিভঙ্গীর সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান ইসলামের। ইসলামী জীবন দর্শনের মুল ভিত্তিই হলো তওহদি, রিসালাত ও আখিরাত। মানুষের স্রষ্টা আল্লাহই তার রব এবং তিনিই তার ইহকাল ও পরকালের জীবনের মালিক। ইহকালের এই জীবনে চলার পথ দেখাবার জন্যে তিনি যুগে যুগে নবী-রাসূলদের প্রেরণ করেছেন, তাঁদের মাধ্যমে মানব জাতির কাছে পাঠিয়েছেন হেদায়েতের বাণী। সে আলোকে চললে জীবন হবে সত্য ও সুন্দরের, কল্যাণ ও মঙ্গলের। পরিণামে আখিরাতে তার জন্যে রয়েছে অনন্ত পুরস্কার ও শান্তি। এরই ব্যত্যয় ঘটাতে মরদুদ শয়তান সদা সচেষ্ট। তার কুমন্ত্রণা ও কুপ্ররোচনার ফলেই চলে আসছে সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব, হক ও বাতিলের লড়াই। এই লড়াইয়ে জিততে হলে যে অস্ত্র চাই সে অস্ত্র ঈমানের। সে অস্ত্র কেমন হবে, তার লড়াইয়ের শক্তি কতটা হবে তা জানবার একমাত্র উপায় নবী-রাসূলদের অনুসরণ করা। শুধু তাই নয়, ইহকালের কৃতকর্মের ফল অবধারিত রয়েছে আখিরাতে এই বোধ ও বিশ্বাস যার মধ্যে, যে জনসমষ্টির মধ্যে যত বেশী তারাই তত বেশী সফলকাম। মুমিনের কাছে এই দুনিয়া পরকালের জন্যে কর্ষণক্ষেত্রে। সুতরাং, তার কাছে জড়বাদীতা যেমন গ্রহণযোগ্য নয় তেমনি গ্রহণযোগ্য নয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। বরং আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস, তাঁরই প্রেরিত ঐশী বাণী আল-কুরআন ও রাসূলে করীমের (স) সুন্নাহ হলো তার জীবনের ধ্রুবতারা।
২. ধর্মীয় বিশ্বাস
পুঁজিবাদী জীবন দর্শনে ধর্মের কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেই। ধর্ম সেখানে সাক্ষী গোপালের মতো। রাষ্ট্র বা সরকার যতটা আচরণের সুযোগ দেয় ব্যক্তি ততটাই মাত্র ধর্মীয় দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের সুযোগ বা স্বাধীনতা পায়। প্রকৃতপক্ষে খ্রীষ্টান ইহুদী বৌদ্ধ জৈন হিন্দু প্রভৃতি ধর্ম ইসলামের মতো জীবনের সকল ক্ষেত্রের নিয়ামত শক্তি নয়, সর্বব্যাপী এবং সার্বিকও নয়। বিভিন্ন ধর্মে ব্যক্তিজীবন, এমনকি পারিবারিক জীবনের আচরণবিধি থাকলেও সমষ্টিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনদর্শন কারোরই নেই। অর্থনৈতিক আচরণবিধি থাকলেও সামষ্টিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনদর্শন কারোরই নেই। অর্থনৈতিক সামাজিক রাজনৈতিক আন্তর্জাতিক- কোনো ক্ষেত্রেই ঐসব ধর্মের কোন নীতি-নির্দেশনা নেই, কোনো বিধি-বিধান নেই। পুঁজিবাদে সব ধর্মই সহঅবস্থঅন করতে পারে। কর্মক্ষেত্রে অসুবিধা না ঘটিয়ে, পুঁজিবাদী উৎপাদন চক্রের কোনোও রকম বিঘ্ন না ঘটিয়ে বা রাষ্ট্র ক্ষমতায় হস্তক্ষেপের কোন আশংকা সৃষ্টি না করে ব্যক্তি তার আপন গৃহে অথবা উপাসনালয়ে ধর্মচর্চা করতে পারে। সেটুকু স্বাধীনতা তার আছে।
পুঁজিবাদে ধর্ম আপোষরফা করেছে রাষ্ট্র ক্ষমতার সাথে। মধ্যযুগে এক সময়ে ইউরোপে চার্চের ক্ষমতা প্রবল হয়ে উঠলে রাজন্যবর্গ এর বিরোধিতা শুরু করে। খোদ ইংল্যান্ডেই গীর্জার সাথে বিরোধ বাধে রাজার। ফলে ক্যাথলিক রাজা হয়ে যান প্রটেস্ট্যান্ট। খ্রীস্টানদের মধ্যে যে বহুধা বিভক্তি বিদ্যমান তার মূল নিহিত এই বিরোধের মধ্যেই। এক সময়ে অবশ্য আপোষরফা হয়। সেজন্যে পরবর্তীকালে বলা শুরু হয়- পোপকে তার প্রাপ্য দাও, রাজকে দাও তার প্রাপ্য। বৌদ্ধ হিন্দু বা জৈন ধর্মে যখন রাজা প্রবল হয়ে ওঠে তাদের ধর্ম তখন রাজধর্ম রূপে স্বীকৃতি পায়। কিন্তু রাজার পতনের সাথে সাথে ধর্মের সেই গুরুত্ব লোপ পায়। যাজকরা তখন হয়ে পড়ে পরের অনুগ্রভাজন। রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে তাদের কোনো ভূমিকাই আর থাকে না।
শিল্প বিপ্লবের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুঁজির গুরুত্ব যখন ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে রাষ্ট্র ক্ষমতার উপরও তার প্রভাব পরিলক্ষিত হতে থাকে। পুঁজিই হয়ে ওঠে সমাজের প্রধান নিয়ামক শক্তি। এই প্রেক্ষিতে ধর্মের সাথে আপোষরফার জন্যে তৈরী হলো নতুন মতবাদ-ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বা সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজমের মৌখিক বক্তব্য যাই হোক, বাস্তব অবস্থা হলো ধর্মহীনতা। রাষ্ট্রের অনুমোদন ও প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধার মাত্রার উপরেই ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মহীনতায় রূপান্তররিত হওয়া না-হওয়া সম্পূর্ণতঃ নির্ভরশীল। ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশ রুদ্ধ করে, ধর্মাচরণের সুযোগ সংকীর্ণ করে, ধর্মীয় নেতাদের সামাজিক গুরুত্ব ও মর্যাদা হ্রাস করে, ধর্মীয় নীতিমালার উপর পুঁজিবাদের নিয়ম ও স্বার্থের প্রাধান্য চাপিয়ে দিয়ে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যক্তিকে আসলে ধর্মহীনতা তথা স্বেচ্ছাচারিতার দিকেই ক্রমান্বয়ে ঠেলে দেয়।
সেক্যুলারতন্ত্রের নামে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় খোদায় আইন ও বিচার তথা জীবন বিধানকে অস্বীকার এবং পরকালের অনন্ত জীবনের শান্তি/শাস্তি সম্পর্কে খ্রীষ্টীয় বিশ্বাসের কারণে গোটা পাশ্চাত্য তথা বিশ্বের জনসংখ্যার বৃহত্তম অংশ খ্রীষ্টান সম্প্রদায় উপযোগবাদ (Utilitarianism) এবং ভোগবাদকে (Epicurism) তাদের উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে। যথেচ্ছ ভোগলিপ্সা ও ধর্মীয় বিশ্বাসসঞ্জাত নৈতিকতা বিবর্জিত হওয়ার কারণে তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এদের মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থার প্রতি নজর ফেরালে এ সত্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। বছর পাঁচেক পূর্বের এক পরিসংখ্যান হতে দেখা যায় সেখানে প্রতি বারো সেকেণ্ডে একটি অপরাধ, প্রতি ঘন্টায় একটি খুন, প্রতি পঁচিশ মিনিটে একটি ধর্ষন, প্রতি পাঁচ মিনিটে একটি ডাকাতি এবং প্রতি মিনিটে একটি গাড়ী চুরির ঘটনা ঘটে। সেদেশে ভীতিপ্রদ অবরাধ বৃদ্ধির হার জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারের চেয়ে তেরো গুণেরও বেশী (দৈনিক সংগ্রাম, ২৯ নভেম্বর, ১৯৯৯)। নতুন শতাব্দীতে এই হার যে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে তা বলাই বাহুল্য।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, পশ্চিমা শক্তি মুসলিম দেশগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণের জন্যে শুধু প্রভাবিত করাই নয়, রীতিমতো চাপ দিয়ে যাচ্ছে। এর অন্তর্নিুহিত আসল উদ্দেশ্য হলো ইসলামকে জানা ও তা পালনে প্রতিবন্ধখতা সৃষ্টি করা। এর ফলে ধীরে ধীরে দেশের কিশোর ও যুবসমাজ ধর্মীয় জীবনদর্শন ও তার বিধিবিধান জানার ও তা যথাযথ পালনের সুযোগ হারাতে থাকবে। এসব দেশে খ্রীষ্টবাদ প্রচার ও প্রসারের জন্যে পশ্চিমারা কোটি কোটি ডলার খরচ করছে। ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের পথ রুদ্ধ করার সকল অপতৎপরতার এরা নেপথ্যে থেকে ইন্ধন যোগাচ্ছে। পক্ষান্তরে খ্রীষ্টধর্ম সম্বন্ধে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্যে বাংরাদেশের মতো মুসলিম প্রধান দেশেও তারা আলাদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। এদেরই অপতৎপরতার ফলে আফ্রিকার বেশ কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে খ্রীষ্টানরা সংখ্যাসাম্য অর্জন করতে চলেছে। নিজেদের স্বার্থরক্ষায় এরা সিদ্ধহস্ত। মুখে সেক্যুলারিজমের কথা বললেও খ্রীষ্টধর্ম প্রচারকসহ গীর্জার ও নবদীক্ষিত খ্রীষ্টানদের সামান্যতম ক্ষতি হলে পশ্চি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সকল রাজধানী হতে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। এরাই ইউরোপে কোনো ইসলামী রাষ্ট্রের অভ্যুদয় প্রয়াস বরদাশত করতে রাজী নয়, বরং সুকৌশলে তা নস্যাৎ করার চেষ্টা চালায়।
সমাজতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর (Corner Stone) হলো নাস্তিক্যবাদ (Atheism)। মার্কস-এঙ্গেলস গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন ধর্মই সব অনর্থের মূল। ধর্মের কারণে সমাজে শোষণ দৃঢ়মূল হয়ে রয়েছে। তাই এর বিনাশ ও উচ্ছেদ অপরিহার্য। মার্ক্সের বিশ্বাস এক অর্থে অংশতঃ ঠিক ছিলো। কারণ তিনি যে শোষণ-নির্যাততন লক্ষ্য করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন তা ছিলো খ্রীষ্ট সমাজে চার্চের পীড়ন ও শোষণ। সমগ্র ইউরোপে তো বটেই, আফ্রিকাতেও চার্চের অত্যাচার ছিলো নির্মম। সেই সাথে রাজ-ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতায় এই অত্যাচার-শোষণ-নিপীড়ন হয়েছিলো দীর্ঘস্থায়ী, সর্বব্যাপী ও সমাজে আমূল প্রোথিত। ভারতে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের বিলাসী জীবন এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু ও অচ্ছ্যুতদের উপর তাদের অত্যাচারের কাহিনী ইউরোপে অজানা ছিলো না। কিন্তু মার্ক্সের যা অজানা ছিলো তা হলো ইসলামী সমাজদর্শন। মার্ক্স-এঙ্গেলস ইসলাম সম্বন্ধে আদৌ পড়াশুনা করেছেন বা এর সংস্পর্শে এসেছিলো এমন কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। ধর্ম বলতে তিনি চোখের সামনে যা দেখেছিলেন তারই ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছিলো ধর্মকে উৎপাটনের কর্মসূচী ও নাস্তিক্যবাদের ফর্মূলা। এ মতবাদে ধর্মকে মনে করা হয় শোষণ ও যুলুমের হাতিয়ার। আফিমের সাথে তুলনা করা হয়েছে ধর্মকে। তাই এর উৎখাতের জন্যে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের নেতারা বদ্ধপরিকর। এমনকি এজন্যে তারা শঠতা ও ধূর্ততার আশ্রয় নিতে কসুর করেনি।
লেনিনের নেতৃত্বে জার নিকোলাইকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের সময়ে ব লশেভিক পার্টির প্রয়োজন ছিলো মুসলমান ও খ্রীষ্টানদের সহযোগিতা ও সমর্থনলাভ। মুসলমানদের ধর্মাচরণ এবং জানমালের নিরাপত্তার ওয়াদা দিয়েছিলেন স্বয়ং লেনিন। কিনতউ সমাজতন্ত্রের অন্যতম আপ্তবাক্য হলো-লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্যে প্রতারণা শঠতা ছলনা হত্যা কোনো কিছুই অন্যায় নয়। তাই গোটা মধ্য এশিয়ায় প্রথমে ইসলামের সাথে সহঅবস্থান, পরে ব্যক্তিজীবনে ইসলামী অনুশাসনের সীমিত অনুসরণের অনুমতি এবং শেষ অবধি ইসলামের উৎখাতের জন্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বশক্তি প্রয়োগ করা হয়। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চীন আলবেনিয়া বুলগেরিয়া পোল্যান্ড ও যুগোশ্লোভিয়ায়। এতসবের পরেও সমাজতন্ত্রী ও সাম্যবাদীরা ইসলামের অফুরন্ত প্রাণশক্তিকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি। তার প্রমাণ দিয়ে চলেছে চেচনিয়া দাগেস্তান কসোভা বসনিয়া-হারজেগোভিনা, চ ীনের হোনান গানসু জিনজিয়াং সিচুয়ান প্রভৃতি জনপদ।
সোভিয়েত রাশিয়ায় ধর্মকে উচ্ছদের জন্যে সর্বশক্তি প্রয়োগ করার ফলে যে ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয় তার একটা ক্ষুদ্র নমুনাহল:
“যতটা নৃশংসভাবে কোকন্দ অধিকৃত ও ভস্মীভূত হয় তা মধ্যযুগীয় দেশজয়ী মঙ্গোলেরও (অর্থাৎ চেঙ্গিস খান) বিস্ময়ের কারণ ছিলো। চৌদ্দ হাজারেরও বেশী লোককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মসজিদ ও ধর্মস্থানের অবমাননা চরমে পৌঁছে। মুসলিম সাহিত্যের সুন্দর সুন্দর গ্রন্থাগার পুড়িয়ে অবমাননা চরমে পৌঁছে। মুসলিম সাহিত্যের সুন্দর সুন্দর গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং অবরোধের ফলে স্থানীয় অধিবাসীগণের পক্ষে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে খাদ্যশস্য আমদানী করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাদের মজুদ খাদ্যশস্য এরই মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যায়। কারণ তার অধিকাংশেই কমিউনিস্টগণ বাজেয়াপ্ত করে নেয়। নয় লক্ষ লোক দুর্ভিক্ষে মারা যায়।” (Lt. Col. P.T. Elerton-In the Heart of Asia, 1926, p. 153)
সোভিয়েত রাশিয়ার তথা বলশেভিক পার্টির ইসলামবিরোধী আগ্রাসন প্রতিরোধের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন মুস্তফা চোকাইয়েভ (কোকন্দ), জাবিদ খাঁ (আজারবাইজান), শামিল বেগ (দাগেস্তান) প্রমুখ। এই উদ্দেশ্যে নানা সংগঠনও গড়ে ওঠে। মুস্তাফা চোকাইয়েভ গড়ে তোলেন মিলিজে তুর্কীস্তান বিরলিগা, জামাল পাশা ও আনোয়ার পাশা গড়ে তোলেন বাসমাকী আন্দোলন, মুরাদ ওরাজত তুর্কমেন আজতলিগি, আবদুর রহীম বাইয়েভ ওয়ালী ইবরাহীমভ মিল্লি ফিরকা এবং মুহাম্মদ আমীন ও ফতেহ আলী খাঁ আজারবাইজান প্রতিরোধ আন্দোলন। অন্যান্য যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বিশ্বজনতম গড়ে তোলার জন্যে বিদেশ সফর করেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আয়ায ইসহাকী, জাকি ওয়ালিদী তুকতারভ, সাদরী মাকসুদী আসাল, মির্যা বালা কুলতুক, হামদী ওরলূ, সাইয়ীদ শামিল, ইউসুফ আকচুরা, আলী মারদান বে তোপচিবাসী, ইসমাইল বে গ্যাসপিরিলি, আবু সাদ আহতেম ও সাইয়ীদ গিরাই আলকীন প্রমুখ বরেণ্য ও ত্যাগী ব্যক্তিত্ব।
ধর্ম তথা ইসলামকে সমূলে উৎখাতের জন্যে সোভিয়েত রাশিয়ার গৃহীত কর্মসূচীর ফলাফল জানা যাবে ড. হাসান জামানের সুবিখ্যাত গ্রন্থ কমিউনিস্ট শাসনে ইসলাম হতে:
“১৯০৭ সালের হিসাবে দেখা যায় যে, ইউরোপীয় রাশিয়াতেই মসজিদের সংখ্যা ছিলো ৭,০০০। ১৯৪২ সালে ১৬ই মে প্রকাশিত Soviet War News-এ দেখা যায় যে, সমগ্র রাশিয়াতে মজদের সংখ্যা মাত্র ১,৩১২-তে। ১৯১৭ সালে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিলো ৮০০। ১৯১৮ সালে এর একটিরও অস্তিত্ব ছিলো না। মসজিদসমতে এসব ধর্ম শিক্ষার কেন্দ্র নাট্যশালা, প্রেক্ষাগৃহ, ক্লাব ও গুদামে পর্যবসিত করা হয়েছে।” (পৃ. ১৩)
সমাজতন্ত্রী ও কম্যুনিস্টদের শঠতা ও প্রবঞ্চনার আরও একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ককেশীয় মুসলমানরা ১৯১৭ সালে দাগেস্তান নামে একটি মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। তুরস্ক, জার্মানী এমনকি রাশিয়াও এই স্বাধীন রাষ্ট্রকে সার্বভৌম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বলশেভিক শাসনের সূচনাতেও দাগেস্তানের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকে। এমনকি ১৯২১ সালেও স্ট্যালিন দাগেস্তানের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিয়ে এক প্রস্তাব গ্রহণ করেন। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বলশেভিক পার্টির নীতি পরিবর্তিত হয়। শুরু হয় বিশ্বাসঘাতকতার নতুন ধারা। ফলশ্রুতিতে ১৯৩৭ সালে ককেশাস অঞ্চলে সংঘটিত হয় ইতিহাসের েএক মর্মন্তুদ অধ্যায়। লেলিনের উত্তরসূরীরা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দাগেস্তানকে সোভিয়েত শাসনের আওতায় নিয়ে আসে। এ জন্যে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় দশ লক্ষ মুসলমানকে, লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে নির্বাসনে পাঠানো হয় সুদূর সাইবেরিয়ায়। পাইকারীভাবে হত্যা করা হয় বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ীদের। ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয় শত শত মসজিদ ও মাদরাসা।
ইহুদী ও খ্রীষ্টানরাও এ অত্যাচারের বিভিষীকা হতে রেহাই পায়নি। তবে ইহুদীদের সৌভাগ্যে তারা দলে দলে দেশ ত্যাগ করে ইঙ্গ-মার্কিন তৎপরতায় প্রতিষ্ঠিত নতুন ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইলে এসে আশ্রয় নেয়। খ্রীস্টানদেরও বিরাট এক অংশ পশ্চিম ইউরোপে পাড়ি জমায়। দেশ ত্যাগের সুবিধা ছিলো না শুধু মুসলমানদের। তাছাড়া তারা জন্মভূমি ও স্বদেশ ছেড়ে আসার চেয়ে নিজেদের আজাদী রক্ষার লড়াইয়ে শহীদ হওয়াই শ্রেয় বিবেচনা করেছিলো।

একই অবস্থা ঘটে মহাচীনেও। ইসলামের সঙ্গে চীনের মুসলমানদের সংযোগ বহু শতাব্দী প্রাচীন। হযরত মুহাম্মদের (স) মৃত্যর পাঁচ বছর পূর্বেই ৬২৭ খৃষ্টাব্দে ক্যান্টনে দেশের প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। এদেশে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক মুসলমান বাস করে জিনজিয়াং (পূর্বের সিনকিয়াং) এলাকায়। এর আদি নাম ছিলো পূর্ব তুর্কিস্তান। এর পরেই রয়েছে সিচুয়ান, ইউনান এবং কানসূ (বর্তমানে গানসু) ও শানসী। চীনা কম্যুনিস্টরা সর্বপ্রথম আঘান হানে কানসু শানসী এলাকায়। মুসলমানরা এখানে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তখন প্রলোভন দেখিয়ে কম্যুনিস্টরা এ আন্দোলন ১৯৫০ সালে স্তিমিত করে দেয়। তারা খুব সতকর্তকার সাথে মুসলিম নেতৃবৃন্দের নামে অপপ্রচার চালাতে থাকে। একই সাথে দ্বিতীয় জাতীয কমিটিতে মা সুং তিং ও তা পু কোন্ নামে দুজন মুসলিম সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
জিনজিয়াং কমিউনিস্ট দখলে আসে ১৯৪৯ সালে। বহু আলিম, মুসলিম রাজকর্মচারী ও নেতাকে বন্দী করা হয়। আহমদ জান, ইসহাক বেগ, লি সু বাং, চেং আন ফু, শাও শফূ, শাও চেং তান, আবদুল করীম আবাসভ, ডা. মাসুদ সাবেরী প্রমুখ গণ্যমান্য নেতাকে হত্যা করা হয়। তা সত্ত্বেও মুসলমানরা দীর্ঘদিন ই মিং, আ হো মাইতি এবং শাই মুর নেতৃত্বে আন্দোলন চালিয়ে গেছে। ১৯৩৮ সালের হিসাব অনুযায় চীনে মুসলমানের সংখ্যা ছিলো পাঁচ কোটির কাছাকাছি, মসজিদের সংখ্যা ছিলো ৪২,৩২১টি। সেই চীনেই কম্যুনিস্ট সরকার প্রদত্ত ১৯৫২ সালের তথ্য অনুযায়ী মুসলমানের সংখ্যা এক কোটিরও নীচে, মসজিদের সংখ্যা মাত্র ৪,০০০। মাত্র চৌদ্দ বছরে চার কোটি মুসলমান কোথায় হারিয়ে গেল? ম্যালথাসের তত্ত্ব অনুযায়ী লোকসংখ্যা তো বৃদ্ধি পাওয়ারই কথা ছিলো।
বুলগেরিয়ার কম্যুনিস্ট সরকার ১৯৫১ সালে সেদেশের ষাট হাজার মুসলমান পরিবারের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তাদের সে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়। যুগোশ্লোভিয়ায়ও মুসলমানদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়, তাদের নেতাদের পাইকারী গ্রেফতার ও গুমখুন করা হয়। সকল পূর্ব ইউরোপীয় কম্যুনিস্ট দেশে প্রধান প্রধান দু-একটি মসজিদ রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে রেখে বাকী সব বন্ধ করে দেওয়া হয়। মুসলমানদের আরবী ভাষার নাম পরিত্যাগে বাধ্য করা হয় জাতিগত স্বাতন্ত্র্য বিলুপ্তির হীন উদ্দেশ্যে। কুরআন-হাদীস চর্চা দূরে থাক, শুধুমাত্র কুরআন শরীফ পড়াই ছিলো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিশ্বব্যাপী কম্যুনিজম ও সোস্যালিজমের পতন দশা শুরু হওয়া পর হতে এই অবস্থার পরিবর্তন শুরু হতে শুরু করেছে। অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে ইসলামের দ্রুত প্রসার ঘটেছে এসব দেশে।
ইসলামের অবস্থান এ দুয়ের বিপরীতে। ব্যক্তিজীবন হতে শুরু করে পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন সকল ক্ষেত্রেই ধর্মের অনুশাসন বাস্তবায়ন অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রদত্ত বিধি-নির্দেশ বাস্তবায়ন ইসলামের দাবী। এই লক্ষ্যেই নবী-রাসূলরা সংগ্রাম করে গেছেন আজীবন। ব্যক্তি পূজা, মুর্তি পূজা, ইন্দ্রিয় পূজা সকল কিছুর বিরুদ্ধেই ইসলামের অবস্থান। মানুষ একমাত্র তার ইলাহ বা রব ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত করবে না, আর কারো হুকুম মান্য করবে না এ শিক্ষা ইসলামের। মানুষের মনগড়া মতবাদ আসলেই তাগুতী মতবাদ। এ মতবাদ একটা-দুটো নয়, শত-সহস্র। এসবের কিছু অস্ত্রের জোরে, কিছু অস্ত্রের জোরে, কিচু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবে আবার কিছু শঠতা বা চতুরতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পৃথিবীর নানা দেশে নানা সময়ে। খোদাদ্রোহীতা বা ধর্মের পূর্ণ উচ্ছেদ এরই আরেক চরম ও বিপরীত রূপ। কিন্তু এসবের পরিণাম হয়েছে নিদারুণ হতাশাব্যঞ্জক ও অমানবিক। ইতিহাস সাক্ষী, রাসূলে করীমের (স) মাধ্যমে যে দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তার মাধ্যমে যে কল্যাণ ও মঙ্গলময় সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে তা নজীরবিহীন। ইসলামের দূতরা তাই যখনই যেদিকে গেছে মজলুম জনতা, তাগুতী ধর্মের পীড়নে ক্লিষ্ট জনতা, মনগড়া আইনের শাসকদের স্বেচ্ছাচারিতায় অতিষ্ট জনতা তাদের সাদর আহ্বান জানিয়েছে। ইসলামতাদের আশার বাণী শুনিয়েছে। তাদের আত্মাকে স্বাধীনতা দিয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-দেশ-কাল-পাত্র সব কিছুকেই দু পায়ে মাড়িয়ে আল্লাহই মহান ও সর্বশক্তিমান এবং মানুষ একমাত্র তার দাস, আর কারো নয়- এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করেছে। এজন্যেই ক্লিমোভিচ দুঃখ করে বলেছেন- “আধ্যাত্মিক ব্যাপারে আমরা ইসলামের সাথে এঁটে উঠতে পারি না। ইসলামের দুদর্ম ধর্মবিশ্বাস বিরাট শক্তির পরিচায়ক।” (Kilmovich-Islam Vs Tsarsky Rossi, Moscow, 1936)
৩. ব্যক্তি স্বাধীনতা
পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের সাথে ইসলামের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রে। পুঁজিবাদে ব্যক্তির স্বাধীনতা নিরংকুশ; সমাজতন্ত্রে এই স্বাধীনতা অস্বীকৃত ও উপেক্ষিত। ইসলামে এই স্বাধীনতা শরীয়াহ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পুঁজিবাদী জীবন ব্যবস্থায় একজন লোকের নিজের খেয়াল-খুশী মতো যেকোন কিছুই করার স্বাধীনতা রয়েছে। তার এই স্বাধীনতা খর্ব করতে পারে শুধু তারই তৈরী আইন অর্থ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত পার্লামেন্ট অথবা স্বৈরাচারী শাসক, ক্ষেত্রবিশেষে সামরিক জান্তা। তার ভোগের পেয়ালা উপচে পড়লেও সে নিবৃত্ত না হলে দোষের কিছুই নেই। শত সহস্র বনি আদম ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হলেও তার খাবার টেবিল বহুবিচিত্র পদে সজ্জিত ও ভরপুর থাকা চাই। শুধু ভোগই নয়, বিনিয়োগ, বন্টন, উৎপাদন পারিবারিক জীবন, সাংসারিক জীবন-সর্বত্রই তার এই স্বাধীনতা স্বীকৃত ও কাজে-কর্মে প্রতিফলিত। ইন্দ্রিয়পরায়ণতাই এর মুখ্য উদ্দেশ্য।
সমাজতন্ত্রের অবস্থান এর বিপরীত মেরুতে। ব্যক্তিকে সেখানে ‘কথা বলার যন্ত্রের চািইতে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তার জীবনের সর্বক্ষেত্রই-পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্র, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সবই রাষ্ট্র তথা পার্টি নিয়ন্ত্রিত। যতটুকু স্বাধীনতা পার্টি অনুমোদন করবে তার বেশী চাইবার অধিকার তার নেই। পার্টিই ঠিক করে দেবে তার আচরণ, কর্মক্ষেত্র, বিশ্বাস, এমনডকি তার পরিবারও। এর ব্যতয় ঘটলো কি না তার তদারকী ও খোঁজ-খবর নেবার রয়েছে গোয়েন্দা বাহিনী। সে বাহিনী এতই বিশাল, এতই ব্যাপক তার নেটওয়ার্ক যে সেখানে স্বামী স্ত্রীর বিরুদ্ধে, স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে, পুত্র পিতার বিরুদ্ধে, পিতা পুত্রের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করে। পার্টি বসের, এলাকর কমরেড চীফের বন্তুষ্টি অর্জন হয়ে দাঁড়ায় জীবনের সর্বপ্রধান বা একমাত্র ব্রত। তাইতো সুযোগ পেলেই তারা ছিটকে বেরিয়ে আসে প্রিয় স্বদেশ(?) হতে। এদের বিপুল সংখ্যক জীবন দিয়েছে বিত্যুতায়িত কাঁটা তারের বেড়ায়, লুটিয়ে পড়েছে পাহারারত সেন্ট্রির গুলিতে। এর পরও সারা জীবন যাদের বিরুদ্ধে শ্রেণী সংগ্রামের শিক্ষা পেয়েছে সেই শ্রেণী শত্রুর দেশে যেয়ে তারা আশ্রয় নেয়। সেই বার্লিন ওয়াল আজ আর নেই, কিন্তু তার রক্তাক্ত ক্ষত রয়ে গেছে হাজার হাজার পরিবারে। আজও রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে তারা আঁতকে ওঠে।
এর ভিন্ন একটা চিত্রও রয়েছে। ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে যেটুকু সুযোগ এখন সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের মক্কা, মস্কো ও বেইজিং এর নাগরিকেরা অর্জন করেছে এবং তার ফলে তাদের প্রাত্যহিক জীবন আচরণে যে পরিবর্তন এসেছে তা অভাবিত। যত দ্রুত তারা পুঁবিাদী সভ্যতার ভোগবাদী জীবনকে গ্রহণ করেছে তা বিস্ময়কর। মেট্রোপলিস দুটোর যুবক-যুবতীরা নিউইয়র্ক শিকাগো লস এঞ্জেলস শহরের মতো ভোগ-বিলাসপূর্ণ জীবনযাপনের জন্যে পাল্লা দিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। মদ জুয়া ডিসকো নাচ ক্যাবারে পপ সঙ্গীত ম্যাকডোনাল্ডের ফাস্ট ফুট সফ্ট ড্রিংক হতে শুরু কর কালোবাজারী চোরাকারবারী ও বেশ্যাবৃত্তি কোনো কিছুই বাদ নেই। পাশ্চাত্যের উদ্দাম উচ্ছৃংখল ও নৈতিকতাহীন জীবনের অন্ধ অনুকরণে তারা মেতেছে ব্যক্তি স্বাধীনতার নামেই। ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ ও শান্তিময় জীবন তাদের কাছে অজ্ঞাত। তাদের কাছে তা তুলে ধরার সুযোগ ধ্বংস করেছে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের মোড়লরাই।
ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ইসলামের দাবী খুবই যৌক্তিক। ইসলামে আল্লাহ ব্যক্তিকে স্বাধীনতা দিয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত অবাধে চলাফেরার, স্বাধীনতার সকল কর্মকান্ড পরিচালনার। এক্ষেত্রে তার নিয়ন্তা হবে তারই বিবেক, তার ধ্রুবতারা হবে আল-কুরআন ও সুন্নাহ। বিবেক কখনোই মানুষকে অশুভ বা অন্যায়ের দিকে ধাবিত হতে রায় দেয় না। সেই রায় আরও সুন্দর, কল্যাণময়ী ও সমাজের জন্যে সর্বৈব মঙ্গলের হয়ে দাঁড়ায়্ যখন তা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা পরিচালিত করে তার নিজের ও সমাজের কল্যাণই নিশ্চিত করে। এখানে না আছে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ, না আছে ব্যক্তি মানুষের মনগড়া আইনে নিগড়ে বন্দী হওয়ার আশংকা। ব্যক্তি এখানে না প্রবৃত্তির দাস, না এখানে অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ইসলামে ব্যক্তি স্বাধীনতা তাই একাধারে যেমন খুবই মূল্যবান তেমনিসমাজের কল্যাণ ও অগ্রগতিতে তার ভূমিকা অসাধারণ।
অর্থনৈতিক দর্শন
অর্থনৈতিক দিক নির্দেশনার ক্ষেত্রেও আলোচ্য তিনটি মতবাদের মধ্যে চরম বিরোধ ও বৈপরীত্য বিদ্যমান। জড়বাদী জীবন দর্শনের অর্থনৈতিক মতাদর্শ পুরোপুরিই ভোগবাদী ও ব্যক্তির ইচ্ছা-আকাঙ্খা নির্ভর। সমাজের কল্যাণ বা রাষ্ট্রীয় মঙ্গলের প্রসঙ্গ এক্ষেত্রে গৌণ। ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় এই ইচ্ছারও রূপান্তর ঘটেছে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে কিভাবে ভূমিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ক্রমে মার্কেন্টাইলিজম, সংরক্ষণবাদ, অবাধ অর্থনীতি এবং অদুনা উদারীকরণ ও বিশ্বায়নের রূপ পরিগ্রহ করেছে। বাজার অর্থনীতির নামে অবাধ ও অসম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরীতে রাষ্ট্রও উৎসাহ ও মদদ যুগিয়েছে। সেভাবেই তৈরী হয়েছে দেশের বিচার ও আইন কাঠামো। নিজ দেশের সম্পদ যখন পর্যাপ্ত মনে হয়নি তখন ছলে-বলে-কৌশলে অন্যের সম্পদ আহরণে তৎপর হয়েছে। কখনও এরা জোট বেধে চড়াও হয়েছে অন্যের উপর, কখনও বা একাকী প্রাকৃতিক সম্পদ ও কাঁচামাল লুটে নিয়েছে। শুধু বাণিজ্যের নামেই পুঁজিবাদ যা করেছে ও করছে তা নজীরবিহীন। ধনতান্ত্রিক দেশগুলোর স্বার্থেই গড়ে উঠেছে World Bank। বাণিজ্যিক সুবিধা লাভের জন্যে GATT, UNCTAD হতে উত্তরণ ঘটেছে WTO–তে। অসম প্রতিযোগিতা ও অসীম মুনাফার জের ধরে মুষ্টিমেয় ব্যক্তির হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। এরাই অর্থনীতির নিয়ামক শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুষ্টিমেয় কয়েকটি পরিবার পুঁজিবাদী বিশ্বের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। ব্যাংক, বীমা ও অন্যান্য ফাইন্যান্সিং প্রতিষ্ঠানকে এরাই কুক্ষিতগ করে রেখেছে। ফলে পূঁজিবাদী দেশগুলোয় বারবার আবির্ভাব হয়েছে মন্দার, কখনো তার রূপ হয়েছে মহামন্দার। পরিবর্তিত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতেও তার আধিপত্য বিস্তারে সমর্থ হয়েছে।
চরম ব্যক্তিস্বার্থপরতা, একচেটিয়া কারবার, অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জনের অভিলাষ এবং নিত্র প্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদনে গরুত্ব না দিয়ে বিলাস সামগ্রী উৎপাদন জোরদারের ফলশ্রুতিতে ১৯৩০ এর দশকে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে সংঘটিত হয়েছিলো মহামন্দা (Great Depression)। একদিকে হাজার হাজার টন গম সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, ক্ষেত্রে ভুট্টা ক্ষেতেই পড়েছে, আপেল-আঙ্গুর-পীচ-কমলা গাছতলাতেই পচেছে, অন্যদিকে নিরন্ন বুভুক্ষ লক্ষ লক্ষ নর-নারী কর্মহীন উপার্জনহীন ও চরমদারিদ্র্যক্লিষ্ট অবস্থায় কাটিয়েছে। ব্যাংকের পর ব্যাং লালবাতি জ্বালিয়েছে, কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সেই গভীর সংকট হতে উত্তরণের জন্যে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হয়েছে, পুঁজি বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে। অসহায় শ্রমিকদের বাঁচাবার জন্যে ভাতা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হয়েছে।
সুদ পুঁজিবাদের জীয়নকাঠি। সুদের মাধ্যমেই তার সকল লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু যে অপরিমেয় ক্ষতি করে সুদ তা পুষিয়ে নেবার বা তার প্রতিবিধানের কোন উপায় নেই এই অর্থনীতিতে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান উৎপাদন, বন্টন, ভোগ, মুনাফা সকল কিচুরই নেপথ্যে নির্ণয়াক ও নির্ধারক শক্তি সুদ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে রাষ্ট্র সুদের হার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও তা সব সময়ে ফলপ্রসু হয় না। এর পরিণাম ফলও সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণে আসে না। নয়া অর্থনৈতিক মতবাদ বা কল্যাণ অর্থনীতির কথা বললেও মিল্টন ফ্রীডম্যান, ম্যাক্স ওয়েবার, গুনার মিরডাল, পল এন্থনী স্যামুয়েলসন, ডাবলিউ, ডাবলিউ, রস্টো, আর্থার লুইস, টি. ডাবলিউ সুলজ, সাইমন কুজনেটস, জন কেনেথ গলব্রেথ অথবা অমর্ত্য সেন-কেউই পুঁজিবাদের অশুভ চক্রের খপ্পর হতে বেরিয়ে আসতে পারেনি। বরং সকলেই একে ঘষে-মেজে নাট-বল্টু পাল্টিয়ে প্রকারান্তরে এর অন্তর্নিহিত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করেছেন। একজনের ভুল প্রেসক্রিপসন অন্যজন শুধরে দিয়েছেন। ফন হায়েক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরকারী হস্তক্ষেপের ঘোরতর বিরোধিতা করলেও কেইনস, গলব্রেথরা এগিয়ে এসেছেন সরকারের হাতকেই শক্ত করতে। পুঁজিবাদের রেলগাড়ী লাইনচ্যুত হয়ে গেলে তাকে আবার লাইনে তুলে দিয়ে সচল করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।
পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিপরীতে অবস্থান সমাজতন্ত্রের কঠোর নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি। এর অপর নাম কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত অর্থনীতি (Centrally Planned Economy)। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তির পরিবর্তে রাষ্ট্রই সকল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বলাই হয়ে থাকে, প্রলেতারিয়েতদের জন্যে নতুন অর্থনীতি বিনির্মাণ করা দরকার। আসলেই প্রলেতারিয়েতদের নিজেদের শ্রম চাড়া বিক্রির জন্যে কিচুই থাকে না। কারণ অন্য সব কিছুই ইতিমধ্যে পার্টির দখলে চলে গেছে। তাই প্রকৃত অর্থেই তারা এখন সর্বহারা। সর্বহারা রাষ্ট্রের নামে পার্টির পক্ষে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় কোনো দ্রব্য কি পরিমাণে কোথায় কখন এবং কিভাবে উৎপন্ন হবে। একইভাবে উৎপাদিত দ্রব্য কত মূল্যে কতখানি কোন্ জায়গায় কার মাধ্যমে বিক্রি হবে সে সিদ্ধান্তও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের। প্রলেতারিয়েতরা এবং পার্টির কমরেড ডিরেক্টর ও পলিটবুরোর সদস্যরা কতখানি ভোগ করতে তারও সিদ্ধান্ত দেয় সরকারই। দুর্ভাগ্যের বিষয়, অসকার লাঙ্গে বা জাঁ টিনবার্জেনের মতো অর্থনীতিবিদদের হাতেও এর পূর্ণতা আসেনি। খোলা বাজারে চাহিদা ও যোগানের পারস্পরিক ক্রিয়া-পতিক্রিয়ার পরিবর্তে সমাজতন্ত্রে মূল্য নির্ধারিত হয়ে আসছে Trial and Error প্রক্রিয়ায়। ফলে কোন দ্রব্যের সঠিক বা উচিৎ মূল্য কি হবে সে বিসয়ে সমাজতন্ত্র কোন সর্বসম্মত সমাধান নেই। বাজারে অর্থনীতির পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি তথা পরিকল্পিত অর্থনীতি এবং ব্যক্তি মালিকানার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় মালিকানা সমাজতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
এই অবস্থা কিছুতেই কাঙ্খিত হতে পারে না। এতে জনগণের সার্বিক কল্যাণ অর্জিত হতে পারে না, পারেও নি। সোভিয়েত রাশিয়ার সুবিখ্যাত সিজার্স ক্রাইসিস কিংম্বা চীনের গ্রেট লীপ ফরওয়ার্ড-এর নেপথ্যে কাহিনী যারা জানেন তাদের বিস্তারিত করে বলার দরকার নেই। সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের নামে কৃষি জমি জবরদখলের পর যখন দেখা গেল উৎপাদনের পরিমাণ বিপ্লব পূর্বকালের চেয়ে হ্রাস পেয়েছে, সৈন্য দিয়ে গ্রাম থেকে খাদ্য ছিনিয়ে এনেও শহরের অভাব পূরণ হচ্ছে না, লাল ফিতা ও পদক উপহার দিয়েও কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করা যাচ্ছে না, বরং লাশের স্তূপ বাড়ছেই তখন কিচেন গার্ডেনের নামে ব্যক্তিগত খামার গড়ে তোলার অনুমতি দেওয়া হলো। চীন রাশিয়া যুগোশ্লোভিয়া কিউবা পোল্যান্ড হাঙ্গেরী- কোনো দেশই এর ব্যতিক্রম নয়। আসলেই মানুষের স্বভাবধর্ম বা ফিতরারতকে উপেক্ষা বা অস্বীকার করে যাই-ই তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাই-ই পরিণামে বুমেরাং হয়ে আঘাত করেছে উদ্যোক্তাদেরকেই।
ইসলামের অবস্থান এ দুয়ের মাঝামাঝি। ইসলাম ব্যক্তিগত উদ্যোগকে অবাধ স্বাধীনতা দেয়নি আবার তার পায়ে শিকল পরিয়ে বেঁধেও রাখেনি। বরং হিসবাহ ও হিজর-েএর দ্বারা ইসলামী সরকার ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের উপর নজরদারী করে; শরীয়াহর সীমা লংঘনকারীকে শাস্তি দেয়। ব্যক্তিকে শরীয়াহ অনুমোদিত উপায় অনুসরণ করে শরীয়াহর সীমার মধ্যেই উপায়-উপার্জন করতে এবং ভোগ ও ব্যয়কে সীমিত রাখতে বলে। রাষ্ট্র এখানে না Laissez Faire নীতি অবলম্বন করে, না এই অর্থনীতির কর্মকান্ড Command নির্ভর, অর্থাৎ পুরোপুরি কেন্দ্রনিয়ন্ত্রিত। সকল ক্ষেত্রে ভারসাম্য অর্জন এই অর্থনীতি তথা জীবনদর্শনের অন্যতম দাবী। ব্যক্তির উৎপাদন ও উপার্জনের অধিকার এখানে স্বীকৃত। যাকাত ও উশর আদায় ছাড়াও ইনফাক ফি সাবিল আল্লাহ এই অর্থনীতির অন্যতম ভিত। সর্বক্ষেত্রে হালাল উপার্জন ও হারাম বর্জন পরিমিতির এই অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য। তাছাড়া আল-কুরআনে বলা হয়েছে- সম্পদ যেন কেবল তোমাদরে ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়। আরও বলা হয়েছে- সম্পদশালীদের ধন-সম্পদে হক রয়েছে বঞ্চিত ও অভাবগ্রস্তদের।
৫. সম্পদের মালিকানা
সম্পদের মালিকানার ক্ষেত্রেও তিনটি মতাদর্শের মধ্যে ঘোরতর পার্থক্য রয়েছে। পুঁজিবাদে ব্যক্তি তার অর্জিত ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের নিরংকুশ মালিকানা ভোগ করে। এই সম্পত্তি সে ইচ্ছামতো ব্যবহার করলে তার বাধা দেবার কেউ নেই। আত্মীয়-স্বজনকে বঞ্চিত কর কুকুর-বিড়ালকে সম্পদ দিয়ে গেলেও বলার কেউ নেই। মৃতের সম্পদের ওয়ারিশ তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা বা পরিবারের সবাই নয়, বরং ব্যক্তি যার নামে উইল করে যাবে বা যাকে নোমিনী করবে সম্পদ সেই পাবে। অন্যথায় পাবে জীবিত জ্যেষ্ঠ পুত্র বা কন্যা। এ ব্যবস্থা ইনসাফ ও ইহসানের বরখেলাপ।
সমাজতন্ত্রে সম্পদের উপর ব্যক্তির স্থায়ী মালিকানা ও উত্তরাধিকারিত্বের স্বীকৃতি নেই। সে যা ভোগ করছে তার মৃত্যুর পর সবই পুনরায় রাষ্ট্রের মালিকনায় চলে যাবে। তার স্ত্রী-পরিজনসরা রাষ্ট্রের আনুকুল্য লাভের জন্যে নতুন করে আবেদন জানাবে এ ব্যবস্থা মানবতা তথা ইনসাফ ও ইহসানবিরোধী। কৃষি জমির মালিকানার ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো ঠেকে ঠেকে কিছু ছাড় দিলেও ঘর-বাড়ী বা অন্যান্য সম্পত্তির ক্ষেত্রে সেই ছাড় প্রযোজ্য নয়। অবশ্য সমাজতন্ত্রের পতনের পর এখন রাশিয়াসহ পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোয় ব্যক্তিগত উদ্যোগেই স্বাধীন ব্যবসা করা যায়। হোটেল চালানো যায়। ব্যাংক ব্যালেন্সের মালিক হওয়া যায়, বাড়ি-ঘঞরের মালিকও হওয়া যায়। চীনেও এখন একই অবস্থা বিরাজমান। সেখানে এখন দ্রুত শিল্পপতি গড়ে উঠছে, ব্যবসায়ের বিত্তে কোটিপতি তৈরী হচ্ছে। কিন্তু এই অবস্থায় ফিরে আসার জন্যে অগণিত মানুষকে জানমালের কি বিপুল খেসারতই না দিতে হয়েছে।
ইসলামে ব্যক্তি মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদের জিম্মাদার বা ট্রাস্টি। সে এই সম্পদ ভোগ-দখল করতে পারবে, ব্যবহার করতে পারবে কিন্তু তার অপচয়ং ও অপব্যবহার করতে পারবে না। উপরন্তু তার মৃত্যুর সাথে সাথেই তা বন্টিত হয়ে যাবে তার ওয়ারিশদের মধ্যে। অবশ্য ঋণ রেখে মারা গেলে তা সবার আগে পরিশোধিতব্য। ব্যক্তি ইচ্ছা করলে স্বজনদের মধ্যে বিশেষ কাউকেও সম্পত্তির অংশবিশেষ দান করতেও পারবে, তবে কোনক্রমেই এক-তৃতীয়াংশের বেশী নয়। ব্যক্তি এখানে সম্পদের নিরংকুশ মালিক নয়, সে ব্যবহারকারী মাত্র। এই ধ্যান-ধারণা বা বোধ-বিশ্বাস জাগ্রত করা ও বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটানোই ইসলামী জীবনাদর্শের লক্ষ্য দুনিয়াজোড়ে যে জানাজানি ও রক্তপাত তার অধিকাংশের মূলে রয়েছে সম্পত্তির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিবাদ-বিসম্পাদ, সীমানা নিয়ে বিরোধ। সম্পত্তি নারীর অধিকারের স্বীকৃতি ইসলামের অনন্য অবদান। নারী শুধু তার পিতার সম্পত্তিরই অংশ পায় না, বিবাহিতা নারী স্বামীর সম্পত্তিরও অংশীদার। উপরন্তু সমাজসেবা ও জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে সম্পত্তি ওয়াক্ফ করারও বিধান রয়েছে ইসলামে। জায়গাজমি ভোগ-দখলের অধিকার ও স্বাধীনতা না থাকলে যেমন উৎপাদন বাড়ে না, সমাজের অগ্রগতি ঘটে না তেমনি অবাধ, অসীম ও নিরংকুশ মালিকানা লাভের উদগ্র লালসা সমাজে রক্তপাত, জিঘাংসা ও সংঘাতকে অনিবার্য করে তোলে। ইসলাম এর প্রতিবিধানের জন্যেই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে; সম্পত্তির মালিকানা, বন্টন ও উত্তরাধিকারিত্বের ক্ষেত্রে আদল ও ইহসানের যৌথ নীতি গ্রহণ করেছে।

৬. চিন্তার স্বাধীনতা
সমাজের অগ্রগতি ও শ্রীবৃদ্ধির জন্যে চিন্তার স্বাধীনতা ও বিকাশের সুযোগ থাকা অপরিহার্য। আল্লাহ নিজেই বারংবার আল-কুরআনে আহ্বান জানিয়েছেন তার সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনার জন্যে, গবেষণার জন্যে। চিন্তাশীলদের আল্লাহ পছন্দ করেন। চিন্তার ক্ষেত্রে চাই বিবেকের শাসন, সামাজিক কল্যাণ ও মঙ্গলের দৃষ্টিভঙ্গি, সর্বোপরি সুস্থ মানসিকতা। পুঁজিবাদের ইতিহাসে চিন্তহার স্বাধীনতার নামে যা ইচ্ছা বলার অবারিত সুযোগ রয়েছে, সমাজতন্ত্রে রয়েছে ঠিক তার উল্টোটা। সেখানে রাষ্ট্র, সরকার, পার্টি এবং সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদের দর্শন নিয়ে কটুক্তি দূরে থাক, বিন্দুমাত্র সমালোচনাও সহ্য করা হয় না। সমালোচার পুরস্কার বাধ্যতামূলক শ্রমশিবির বা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী জীবন যাপন অথবা কারো অন্তরালে অনির্দিষ্টকালের জন্যে অন্তরীণ হওয়া। খুবই সৌভাগ্যবান হলে দেশের বাইরে নির্বাসিত হওয়ার দুর্লভ সুযোগ জোটে। কিন্তু সবাই সোলঝেনিৎসিন হওয়ার ভাগ্য নিয়ে আসে না। কারাজীবন হতে মুক্তির জন্যে আন্দ্রে শাখারভের মতো সৌভাগ্র সকলের হয় না। চিন্তার পার্থক্রের কারণেই নোবেল পুরস্কার পেয়েও প্রত্যাখ্যান করতে হয় বোরিস পাস্তারনাকের মতো সাহিত্যকদের। এর উল্টো চিত্রও আছে। সমাজতন্ত্রের বন্দনা করে গুণগান গাইলে, মহান লেলিন-স্ট্যালিন-ক্রুশ্চেভের জয়গাঁথা রচনা করলে, কুলাক বা গুলাগ নিধন ও বাশকিরীদের উচ্ছেদকে স্বাগত জানালে, চেচেন-ইংগুশদের ধ্বংস কামনা করলে, তুর্কী তাতারদের ভিটেমাটি হতে উচ্ছেদ সমাজতন্ত্রেরই মহান দায়িত্ব বলে সংগতি রচনা করলে অর্ডার অব লেলিনসহ নানা রাষ্ট্রীয় ভূষণ ও সম্মান তার পায়ে লুটোয়। অ-কবিও রাতারাতি সেরা কবি হয়ে যায়।
চিন্তার স্বাধীনতার নামে পুঁজিবাদী বিশ্বে যেভাবে ইসলাম বিরোধিতার প্রশ্রয় দেওয়া হয় সেভাবে তার নিজেদের ধর্ম-খ্রীষ্টধর্মকে সমালোচিত হতে দেয় না। খোদ ইংল্যান্ডে খ্রীষ্টধর্মও যীশুখ্রীষ্টকে নিয়ে ব্যঙ্গচিদ্রুপ বা তীক্ষ্ম সমালোচনা সে দেশের ব্লাসফেমী আইনে ফঅঁসির মঞ্চ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেদেশেই ইসলামের জীবন দর্শন ও পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ নবী মুহাম্মদের (স) জীবন নিয়ে স্যাটানিক ভার্সেস লিখলে মুরতাদ রুশদীর শাস্তি তো হয়ই না, বরং পুরস্কারে পাশাপাশি সরকারী নিরাপত্তা বা হেফাজত লাভের সৌভাগ্য জোটে। আল-কুরআনে শাশ্বত বিধানের অশোভন ও অরুচিকর সমালোচনা করলে, মুসলিম জীবনে মসীলিপ্ত ব্যঙ্গচিত্র আঁকালে বিদেশের সাহিত্য পুরষ্কার জোটে, জোটে বিদেশের ইসলাম বিরোধীচক্রের সাদর আমন্ত্রণ, অভ্যর্থনা ও আশ্রয়। সে সম্মান হতে বাংলাদেশী ললনাও বঞ্চিত নয়।
অপরপক্ষে চিন্তার স্বাধীনতার কথা সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদে কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। স্বাধীন চিন্তা দূরে থাক, ক্ষমতাসীন সরকারের সমালোচনা দূরে থাক, লেনিন স্ট্যালিন ক্রশ্চেভ ব্রেঝনেভ অথবা মাও ঝে দং, লিন পিয়াও, দেং জিয়াও পিং বা কিম লি সুং এর জীবননিয়ে বেফাঁস কথা বললে দশ বছর কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে কাটানো মোটেই বিচিত্র নয়। সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদে পরিবর্তন যা এসেছে তা সেদেশের জনগণ বা বুদ্ধিজীবীদের চিন্তার ফসল হিসেবে নয়। সে পরিবর্তন এসছে মুকাবিলার অসাধ্য অভ্যন্তরীণ সংকট ও অর্থনৈতিক দুর্দশা কাটিয়ে ওঠার ও বাইরের দুনিয়ায় মিত্র অনুসন্ধানের স্বার্থে। সমাজতন্ত্রের ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে তাকে গ্রহণযোগ্র করে তোলার উদ্দেশ্যে অকম্যুনিস্ট বিশ্বের বেশ কিছু বুদ্ধিজীবী (যারা নব্য মার্ক্সবাদী বলে সাধারণ্যে পরিচিত) হাল আমলেবেশ লেখালেখি করে চলেছেন। এই দলে রয়েছেন অসভালদো সানকেল, সেলসো ফূর্তাদো, পল ব্যারন, আদ্রেঁ গুন্দার ফ্রাক, সামির আমিন প্রমুখ।
এর বিপরীতে ইসলামের বরাবরই সুস্থ ও গঠনমূলক চিন্তাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ইজমা ও কিয়াস তথা ইজতিহাদের বিধান এই চিন্তার স্বাধীনতারই স্বীকৃতি। সমস্যা মুকাবিলায় সঠিক পন্থা উদ্ভাবনের জন্যে মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা বরাবরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। বিজ্ঞানের যে সূত্র আবিষ্কারের জন্যে প্রকাশ্যে গ্যালিলিওকে ক্ষমা চাইতে হয়েছিলো তার চেয়ে ঢের বেশী গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেছিলেন মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। সেজন্যে তাঁদের কিন্তু রাজদরবারে কৈফিয়ত দিতে দাঁড়াতে হয়নি। চিন্তার স্বাধীনতার সুযোগ ইসলামে অবারিত রয়েছে বলেই শিল্প বিপ্লবের ফলে উদ্ভূত সামাজিক পরিবর্তনের সাথে ইসলাম অনায়াসে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে। আল-কুরআন বা সুন্নাহর কোথাও আধুনিক ব্যাংক বা বীমার উল্লেখ নেই। কিনতউ সেজন্যে ইসলাম বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি। বরং অর্থয়ানের এই নতুন প্রক্রিয়াকে ইসলাম প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিমার্জন করে আত্মস্থ করেছে। ইসলামে চিন্তার স্বাধীনতার অর্থ খোদাদ্রোহীতা বা তাগুতী শক্তির পক্খে কলম চালানো নয়। বরং ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় যা সত্য ও সুন্দর, মানবতার পক্ষে কল্যাণকর তার জন্যেই চিন্তাশীলরা কাজ করবে। বুদ্ধিজীবীরা সমাজের সচেতন লোক হিসেবে সে উদ্দেশ্যেই তাদের লেখনী পরিচালনা করবে। অন্যায় ও অসত্যকে নির্মূল করার জন্যে, সকল ইবলিসী তৎপরতার মূলোচ্ছেদের জন্যে এবং তাগুতী অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুমিনদের উদ্বুদ্ধ করার জন্যেই চিন্তার স্বাধীনতাকে কাজে লাগানো ইসলামী আচরিত ও স্বীকৃত উপায়।
৭. গণতন্ত্র বনাম প্রলেতারিয়েততন্ত্র
পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালিত হয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে। রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো বলেই ফরাসী বিপ্লবের (১৭৮৯) এত গুরুত্ব। আধুনিক গণতন্ত্রের আন্দোলন সেই থেকে দানা বেঁধে উঠতে শুরু করে। যদিও রাষ্ট্রযন্ত্রকে বলা হচ্ছিল Necessary Evil বা প্রয়োজনীয় অশুভ প্রতিষ্ঠান কিন্তু রাজতন্ত্রের অত্রাচার থেকে রেহাই পাবার জন্যে সমকালীন ইউরোপে এর কোন বিকল্পও জানা ছিলো না। গ্রীক দার্শনিক পেরেক্লিস হতে শুরু করে জন লক, জন স্টুয়ার্ট মিল, জাঁ জ্যাক রুশো, টমাস জেফারসন, হ্যারল্ড জে. লাস্কি, লর্ড ব্রাসি প্রমুখ ধনতান্ত্রিক জীবনাদর্শে বিশ্বাসী দার্শনিক-রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গণতন্ত্রের অন্যতম প্রবক্তা। অপরদিকে গণতন্ত্রের যারা চুলচেরা বিশ্লেষণ ও কঠোর সমালোচনা করে একে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন গ্রীক দার্শনিক প্লেটো, ঐতিহাসিক লেকী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টেলি র্যাণ্ড, স্যার হেনরী মেইন, এমিল ফাগুয়ে প্রমুখ ব্যক্তিত্ব।
প্লেটো তার রিপাবলিক গ্রন্থে গণতন্ত্রকে মূর্খের শাসন বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, সমাজে বুদ্ধিমানের চেয়ে মূর্খ ও অবিবেচকের সংখ্যাই বেশী। তাই সংখ্যাধিক্যের শাসনের অর্থ এদেরই শাসন। এমিল ফাগুয়ের মতে বিজ্ঞ ও বিদগ্ধ জনেরা নির্বাচনের হট্টগোলে যেতে নারাজ। দুয়ারে দুয়ারে ধর্ণা দিয়ে ভোট ভিক্ষাতেও তারা অসমর্থ। ফলে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সত্যিকার বিজ্ঞজনদের অবদান রাখার কোনোই সুযোগ নেই। টেলি ব্যাণ্ড গণতন্ত্রকে ‘শয়তানের শাসন’ ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করেছেন। ঐতিহাসিক লেকী বলেন গণতন্ত্র কোনোক্রমেই শ্রেষ্ঠতম প্রশাসনিক ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দেয় না। অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করেছেন স্যার হেনরী মেইন। উপরন্তু গণতন্ত্র শুধু অপচয়ধর্মী ব্যবস্থাই না, দুর্নীতির প্রশ্রয়দানকারীও বটে। পৃথিবীর যে কোন গণতান্ত্রিক দেশের সরকারের প্রতি নজর দিলে এ সত্য সহজেই উপলব্ধি করা যাবে। গণতন্ত্রে ধনীদের প্রভাব খুব বেশী। নির্বাচনের সময় চাঁদা দিয়ে তারা দলের নেতাদের হাত করে এবং পরবর্তীতে তাদের স্বার্থের অনুকূলে কাজ করতে বাধ্য করে। বিপুল অরথ ব্যয়ে নিরন্তর প্রচারণা ও ক্ষেত্র বিশেষে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পছন্দসই লোককে ভোট দিতে সাধারণ ভোটারদের উদ্বুদ্ধ বা বাধ্য করে। শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিপুল অংকের চাঁদা দেয় যেন বিজয়ী দল তাদের স্বার্থবিরোধী কোন পদক্ষেপ নিতে না পারে। নির্বাচনে বিজয়ী দল তাদের সমর্থকদের মধ্যে ঠিকাদারীর কাজ, লাইসেন্স, পারমিট ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিতরণ করে। ফলে সরকারী তহবিলের পুরোটাই ব্যবহৃত হয় দলীয় স্বার্থে। সাধারণ জনগণের এখানে ঠাঁই কোথায়?
এতসব অসংগতি ও ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও পুঁজিবাদী দেশগুলো বিশ্বের কাছে তাদের আচরিত গণতন্ত্রকে গ্রহণ করতে এবং সেটিই যে শ্রেষ্ঠ তা প্রমাণ করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের দৃষ্টিতে আব্রাহাম লিংকনের প্রদত্ত সংজ্ঞার সরকারই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ধারক ও বাহক। কারণ সে সরকার হলো জনগণের দ্বারা জনগণের জন্যে জনগণের সরকার (Government of the people, by the people and for the people) এই সরকারই গণতন্ত্রের সর্বোত্তম রক্ষাকবচ। কিন্তু বাস্তব চিত্র কি আসলে তাই? রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে ‘জনগণের ইচ্ছা’ আসলে ‘জনগণের’ও না ‘ইচ্ছা’ও না। কতিপয় নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিমান ব্যক্তির গৃহীত ও চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তই জনগণের সিদ্ধান্ত বা রায় বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় নির্বাচনের মাধ্যমে, জিতে আসা সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে। নির্বাচনী কর্মকান্ড এখন এমন এক বিশাল ব্যয়বহুল ব্যাপার যে শুধুমাত্র ধনীরাই এতে অংশ নিতে পারে। মার্ক্স যে বুর্জোয়া শ্রেণীকে তার শ্রেণী সংগ্রামের অন্যতম প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করিয়েছেন সেই শ্রেণী শত্রুরাই নির্বাচনে দাঁড়ায়। নির্বাচনী কর্মকাণ্ড দেশব্যাপী এক বিশাল হুলস্থুল ব্যাপার। রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন হলে তো কথাই নেই। এর ব ্যয়বার বহন একা কোন প্রার্থীর পক্ষে শুধু দুঃসাধ্য নয়, দুঃস্বপ্নের শামিল। সে ব্যয়বহন করে দল। দল চাঁদা তোলে, হাজার ডলার দামের ডিনারে আমন্ত্রণ জানায় সমর্থকদের। মার্কিন মুলূকে রস পেরেট েএর মতো ধনীরাই শুধু নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। অন্যদিকে নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণা করেও নাম প্রত্যাহার করে নেয় মিসেস এলিজাবেথ ডোলের মতো প্রার্থীরা। খবরের কাগজে প্রকাশ্য বিবৃতি দেন রিপাবলিকান দলের এই প্রার্থ- তার পর্যাপ্ত অর্থ নেই বলে নির্বাচনী যুদ্ধ হতে সরে দাঁড়ালেন। (দৈনিক ইনকিলাব, ২২ অক্টোবর, ১৯৯৯)। পুঁজিবাদী বিশ্বের সর্বত্রই এই একই চিত্র দেখা যাবে।
নির্বাচনে যারা জেতে তারা কি প্রকৃত অর্থেই অধিকাংশ লোকের সমর্থন পেয়ে নির্বাচিত হয়? তারা কি সত্যিকার অর্থেই সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের প্রতিনিধি? যদি তিনজন প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং একজন ৪০%, অপরজন ৩২% এবং বাকী অন্যজন ২৮% ভোট পায় তাহলে প্রথম জনই নির্বাচিত বলে স্বীকৃত হবে। তার সিদ্ধান্তই গৃহীত হবে, চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। অথচ বাস্তবতা হলো তার পেছনে সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের অর্থাৎ ৬০% লোকেরই সমর্থন নেই। এই হলো গণতন্ত্রের ফাঁকি। তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শাসন পরিচালনার এই পদ্ধতি না জনগণের বৃহৎ অংশের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম, না এখানে সৎ দক্ষ ও যোগ্য লোকের মূল্য আছে, না রয়েছে বিত্তহীনদের জন্যে কোন সুযোগ। এরপরেও যদি কোন দেশে গণতন্ত্রের েএই ভোটাভুটির মাধ্যমে এমন কোনো লোক বা দল ক্ষমতায় এসে যায় পুঁজিবাদের মোড়লদের কাছে যারা পছন্দনীয় নন তাহলে তাকে উৎখাত করা হয় অস্ত্রের মুখে। জারী করা হয় সামরিক শাসন। তখন ঐ দেশের জন্যে গণতন্ত্রের চ র্চা আর অনুমোদনযোগ্য থাকে না। আলজেরিয়া এর উজ্জ্বল উদাহরণ। এ ধরনের দ্বিচারণে অভ্যস্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার দোসররা। এ জন্যেই পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের পথ ধরে বা এই প্রক্রিয়ায় মিশর লিবিয়া সিরিয়া ইরাক নাইজেরিয়া ইন্দোনেশিয়া মালয়েশিয়া বা পাকিস্তানে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। ইরানে ইসলামী বিপ্লব তথা রাষ্ট্রক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গণতন্ত্রের মাধ্যমে নয়, ইসলামী জিহাদের মাধ্যমে।]
সমাজতন্ত্রে গণতনেত্রর নাম-নিশানাও থাকে না। বরং সেখানে চালু হয় একনায়কতন্ত্র যা আরও ভয়ঙ্কর, আরও বিভীসিকাময়। সমাজতন্ত্র বা কম্যুনিজমের ধ্বজাধারীরা বুর্জোয়া গণতন্ত্র উচ্ছেদের ডাক দিয়ে ‘জালিমশাহী নিপাত যাক’ শ্লোগান দিয়ে, ‘দুণিযার মজদুর এক হও’ আওয়াজ তুলে রক্তপাত, শঠতা ও ধূর্ততার মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হয়েই তাদের ভোল্ট পাল্টে ফেলে। প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারাদের নামে দখল করা ক্ষমতায় আর কেউ যেন ভাগ না বসাতে পারে সে জন্যে একদিকে যেমন চালু হয় একদলীয় শাসন ব্যবস্থা ও একনায়কতন্ত্র (যেমন বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালে হয়েছিলো বাকশাল) তেমনি অন্যদিকে বিরোধীদের নির্মূল করার জন্যে চালানো হয় সাঁড়াশী অভিযান। পৃথিবীর কোনো সোস্যালিস্ট ও কম্যুনিষ্ট দেশে এর কোন ব্যত্যয় ঘটেনি। এর বিপরীত উদাহণ কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না নতুন এই শাসন ব্রবস্থার গাল ভরা নাম দেওয়া হয় সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্র বা Dictatorship of the Proletariat।
গণতন্ত্র তো তদূরের কথা, সত্যিকার অর্থে গৃহযুদ্ধ ছাড়া শুধুমাত্র বিপ্লবের দ্বারা সমাজতন্ত্র কায়েম হতে পারে না। খোদ লেনিনেরই কথা হলো: “….a Socialist revolution in particular, even if there were no external war, is inconceivalble without internal war i. e., Civil war” অর্থাৎ, যদি বৈদেশিক যুদ্ধ নাও থাকে তাহলে বিশেভভাবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ অর্থাৎ, গৃহযুদ্ধ ছাড়া অচিন্ত্যনীয়। (Lenin, Selected Works, Russian Edition, Vol. 2, p. 278)
তিনি আরও বলেন, “…. The Soviet Socialist Democracy is in no way inconsistant with the rule and dictatorship of one person.” (Collected Works, Vol. xvii, p. 89, 1923)। অর্থাৎ, সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র কোনোভাবেই একব্যক্তি ছাড়া কম্যুনিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা না কায়েম হতে পারে না, না তা একদণ্ড স্থায়ী হতে পারে।
এজন্যেই যে মেহনতী জনতার হাতুড়ী-শাবল-কাস্তে নিয়ে রাজপ্রাসাদের বন্ধ দুয়ার খুলেছিলো তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছিলো তাদের সাবেক জায়গাতেই। ক্ষমতার মসনদে অসীন হলো পার্টির প্রধানরাই, ক্ষমতার মালিক হলো পল্যিটব্যুরোর সদস্যরা। একবার পলিটব্যুরোর সদস্য হতে পারলে সেখান হতে সরবার আর কোন সম্ভাবনা নেই। একমাত্র গুপ্ত হত্যা বা কয়েদ ছাড়া স্বাভাবিক মৃত্যু হলে তবেই এর অবসান ঘটে। মাও ঝে দং, ভ্লাদিমীর ইলিচ লেনিন, যোসেফ ব্রজ টিটো, ফিদেল কাস্ট্রো, হো চি মিন, কিম ইল সুং, যোশেফ স্ট্যালিন, লিওনিদ ব্রেঝনেভ, এনভের হোক্সা (আনোয়ার হোজা) সকলেই আমৃত্যু থাকেন কমরেড কমান্ডার, দেশের সর্বময় হর্তাকর্তা।
পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর অনেকেরই গাঁটছড়া বাধা ছিলো পুঁজিবাদের সাথে। কিন্তু পুঁজিবাদের শোষণ সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পর (বৃটেন কর্তৃক মিশরে সুয়েজ খাল দখল করে রাখা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ) তারা বিকল্প আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজতে থাকে। সেই সময়েই এরা সোভিয়েত কূটনীতির খপ্পরে পড়ে। দেশে সমাজতান্ত্রিক দল গটিত হয় এবং তারাই সুকৌশলে ক্ষমতা দখল করে। কখনো বা ক্ষমতাসীন সরকার এদের সাথে আঁতাত করে ক্ষমতায় টিকে থাকে। তাই মিশর লিবিয়া সিরিয়া ইরাক প্রভৃতি মুসলিমপ্রধান দেশে ব্যক্তিজীবনে ইসলাম আচরণের সুযোগ থাকলেও সেসব দেশে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে সমাজতন্ত্রের সামাজিক ও রাষ্ট্রনৈতিক দর্শন। এসব দেশে পার্টি প্রধানরাই একাধারে রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার প্রধান ও সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। আমৃত্যু তাই ক্ষমতায় থাকেন জামাল আবদুল নাসের, আনোয়ার সাদাত, হাফিস আল-আসাদ, মুয়াম্মমের গাদ্দাফী। সাদ্দাম হোসেনরা ক্ষমতায় থাকেন গ্রেফতারীর পূর্বপর্যন্ত।
মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে খিলাফত প্রথা উৎখাত করে তুরস্কেই সবা আগে পাশ্চাত্য ধাঁচের গণতন্ত্র প্রবর্তিত হয়। ইসলামের দুশমন মুস্তফা কামাল পাশা এই সর্বনাশা পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি সর্ববিধ উপায়ে জীবনের সকল ক্ষেত্র হতে ইসলামকে উৎখাতের জন্যে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন। কুরআন শরীফ লেখার চেষ্টা করা হয় রোমান হরফে। মসজিদে আযান দেওয়া পর্যন্ত নিষিদ্ধ হয়। অধুনা হিযাব পরিধানের বিরুদ্ধে সে দেশের পার্লামেন্ট আইন তৈরী করেছে। তুরস্কের ইসলামবিরোধী রাষ্ট্রনেতাদের বড় সাধ ইউরোপ তথা পাশ্চাত্য তাকে তাদেরই একজন বলে গ্রহণ করুক। কিন্তু ময়ূরপুচআছ ধারণ করলেই দাঁড়কাক ময়ূর হয়ে যায় না। পাশ্চাত্য তাকে গ্রহণ করতে চাইছে না। কারণ শত নির্যাতন পীড়ন দলন সত্ত্বেও তুরস্কে আজও ইসলাম তার অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়েই টিকে রয়েছে।
আসলেই মানুষের মনগড়া মতবাদ কোনো কল্যাণ নেই। নেই আপামর জনসাধারণের সার্বিক স্বাধীনতা, নেই সার্বজনীনতা তথা বিশ্বজনীনতা। মানুষের তৈরী দু-দুটো ভিন্নধর্মী ও বিপরীতমুখী রাষ্ট্রদর্শনের যাঁতাকলে পরে অগণিত মানুষের নিষ্পিষ্ট হওয়ার কাহিনীতে ইতিহাস ভরপুর। ইসলামের পরামর্শভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা বা শুরা পদ্ধতি এ দুয়ের প্রত্যেকটির চেয়েই উত্তম ও বৈজ্ঞানক পদ্ধতি। খিলাফত বা প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন হয় হযরত আবু বকরের (রা) সময় হতে। মহান খুলাফায়ে রাশিদূনের (রা) যুগের শেষে শুরু হয় রাজতন্ত্র যা ইসলামে আদৌ কাম্য ছিলো না। অবশ্য সুলতান ও আমীররা (যাদের অনেকেই খলীফা পদবী ব্যবহার করতেন) রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে দেশের গুণীজনদরে মধ্যে থেকে লোক বাছাই করে তাদের পরামর্শ সভার সদস্য করতেন। ইসলামের দাবী হলো তাকওয়া (খোদাভীতি) ও পরহেজগারীর ভিত্তিতে সর্বোত্তম লোকেরাই হবে সরকারের পরামর্শ সভা বা শুরার সদস্য। দেশ শাসনের জন্যে আল-কুরআন ও সুন্নাহই হবে আইনের উৎস। সকল ক্ষমতা, শক্তি ও আইনের উৎস হবেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। এপথে না এগুবার কারণেই অর্থাৎ সঠিক শুরাভিত্তিক রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা না করার কারণেই মুসলিম মিল্লাতে আজ এই দশা। পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তা বা রাষ্ট্রদর্শন, জাতীয়তাবাদ এবং গণতন্ত্র যার অন্যতম ভিত, মুসলিম উম্মাহর জন্যে একেবারেই অনুপযুক্ত। একইভাবে অনুপযুক্ত সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের রাষ্ট্রদর্শন। মুসলমানের যথার্থ মুক্তি ও সাফল্য নিহিত রয়েছে রসূলে করীম (স) প্রদর্শিত ও প্রবর্তিত রাষ্ট্র দর্শনে। পৃথিবীর অন্য কোনো মতবাদই এর সমকক্ষ নয়, তারা সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হয়নি।
কিন্তু সমাজতন্ত্র যেমন ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা বা জীবন দর্শনকে মেনে নেয়নি তেমনি পশ্চিমা পুঁজিবাদী শক্তি, বিশেষতঃ তার মোড়ল গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী মার্কিন যুক্তরাস্ট্র কখনই ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা তথা ইসলামী জীবনাদর্শ বাস্তবায়নকে বরদাশত করতে রাজী নয়। বরং সুকৌশলে এর বিরোধিতার জন্যে এবং একই সঙ্গে বিশ্বজনমতকে ধোঁকা দেবার জন্যে জাতিসংঘকে তাদের ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। পাশ্চাত্র শক্তি কোন মুসলিম দেশকেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দিতে নারাজ। বরং সবাইকে সে অনুগত গোলাম করে রাখতে চায়। সুদান লিবিয়া ইরাক ইরান তার গোলামী মেনে নেয়নি। সেজন্যে তাদের উপর অর্থনৈতিকক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আধুনিক সভ্যতার দাবীদার গোটা পাশ্চাত্য সমাজ তাতে নীরব সম্মতি জ্ঞাপন করছে।
৮. আন্তর্জাতিক
ইসলাম যে অর্থে আন্তর্জাতিক সেই অর্থে পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্র আন্তর্জাতিক নয়। ইসলামের রয়েছে বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গী বা উম্মাহর ধারণা। এ ধারণা অপর দুটি মতবাদে নেই। সমাজতন্ত্রে একদা যে অর্থে কমরেড শব্দ ব্যবহৃত হতো আজ সেই অর্থে শব্দটি চালু নে নেই, বরং দ্রুত বিলুপ্তির পথে। পুঁজিবাদের আন্তর্জাতিকতা প্রকৃতপক্ষে সাম্রাজ্রবাদেরই ভদ্র খোলস। মার্কেন্টাইলিজমের সময় হতে পাশ্চাত্যের দেশগুলো বিশ্ব জুড়ে গড়ে তুলেছিলো তাদের উপনিবেশ বা কলোনী। কলোনীগুলো হতে তাদের দেশে (হোমল্যান্ড বা মাদারল্যান্ড) যেত লুট করা ধনরত্ন কাঁচামাল সস্তা শ্রম পুঁজি দাস খনিজ সামগ্রী ঠিক যেভাবে শরীরের বিভিন্ন অংশ হতে ধমনী দিয়ে রক্ত চলে যায় হৃদপিন্ডে। কলোনীগুলো নিয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিলো বৃটেন ফ্রান্স স্পেন হল্যান্ড ও জার্মানীর মধ্যে। শেষ অবধি অবশ্য বৃটেনের সাম্রাজ্যই ছিলো সর্ববৃহৎ– এত বিশাল ও বিস্তৃত যে একদা এ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনই অস্তমিত হতো না। রাজনৈতিকভাবে আজ পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী দেশগুলোর উপনিবেশ নেই সত্যি, কিন্তু তাদের সাম্রাজ্যবাদী কৌশল রয়ে গেছে ঠিকই। এই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বৃহৎ ফাইন্যান্স ক্যাপিটালের মাধ্যমে। বিশ্বব্যাপী পুঁজির যোগানদার হিসেবে পাশ্চাত্যের ধনী দেশগুলো আজ নব্য উপনিাবেশ গড়ে তুলেছে। এদের মদদগার হচ্ছে বিশ্বব্যাংক, সহায়ক শক্তি হলো বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো। এদের দোসর হয়ে কাজ করেছে এদেরই মদদপুষ্ট এনজিওগলো।
নব্য উপনিবেশবাদ তথা আন্তর্জাতিকতাবাদের আরেক রূপ হলো সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ। প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাহায্যে চালাচ্ছে তথ্যসন্ত্রাস ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে সর্বশেস প্রযুক্তি –কম্পিউটার ও স্যাটেলাইট। এসবের নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন যেমন পুঁজিবাদী গোষ্ঠী নিজেদের হাতে রেখে দিতে চাইছে তেমনি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে আরও সুসংহত ও শক্তিশালী করার স্বার্থে তার বেপরোয়া ব্যবহারও করে চ লেছে। মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী আধিপত্য ও কর্তৃত্ব বহাল রাখা। এ প্রসঙ্গে পুঁজিবাদের অন্যতম সমাজবিজ্ঞানী Michael Kunezik বলেন,“Cultural imperalism through communication is a vital process for securing and maintaining economic domination is a vital process for securing and maintaining economic domination and political hegemmony over others.” (Television in the Third World)। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক আধিপত্য ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অর্জন ও তা বহাল রাখার জন্যে যোগেোগ মাধ্যমের সহায়তায় সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা এক গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ডি এন্টেনার সাহায্যে পাশ্চাত্যের ধর্মবিমুখ খোদাদ্রোহী ইন্দ্রিয়পরায়ণ ভোগবাদী জীবনের সকল অনুসঙ্গই আজ মুসলমানদের অন্দরমহলে ঢুকে পড়েছে। এর বিষময় ফল ফলতে শুরু করছে। েএকারণেই পৃথিবীর অনেকদেশে ডিস এন্টেনার ব্যবহার সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করছে। বিশেষ বিশেষ ক্যাসেট ও বাজেয়াপ্ত করছে। কিনতউ তাতেও কি শেষ রক্ষা হচ্ছে?
সমাজতন্ত্র তাত্ত্বিকভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী হলেও বাস্তবিকতা এ থেকে অনেক দূরে। সমাজতন্ত্র সত্যি সত্যি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসাবে বিকাশ লাভ করতে না চাইলে তার মোড়ল সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ার ওয়ারশ চুক্তি করার প্রয়োজন হতো না। প্রয়োজন হতো না নেপথ্যে থেকে বান্দুং কনফারেন্স সফলতার জন্যে সকল আয়োজন সম্পন্ন করার। হাঙ্গেরী পোল্যান্ড অষ্ট্রিয়া বা চেকোশ্লোভাকিয়াতে সমাজতনত্্র আদৌ কায়েম হতো না যদি না সোভিয়েত রাশিয়া সেসব দেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চালাতো। ভিয়েতনাম ও কম্পুচিয়ায় বছরের পর বছর হাজার হাজার লোক নিহত, গৃহহীন ও পঙ্গু হতো না যদি না রাশিয়া তাদের সমাজতনত্্র কায়েমের জন্যে স্বপ্ন দেখাতো, এজন্রে রসদ ও যুদ্ধ সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা না করতো। কিউবায় সোভিয়েত মদদের কথা কে না জনে? একইভাবে সমাজতন্ত্র তার দীর্ঘ বাহু বিস্তৃত করেছে আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায়। পেরু বলিভিয়া চিলি নিকারাগুয়া কিংবা কঙ্গো এ্যঙ্গোলা নামিবিয়া ও ইথিওপিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা, গুপ্ত হত্যা, ষড়যন্ত্র ও রক্তপাতের মাধ্যমে গৃহযুদ্ধের পরিবেশ তৈরীর পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক মত ও পথ গ্রহণের নেপথ্যে সোভিয়েত রাশিয়ার ভূমিকা ছিলো সর্বজনবিদিত।
ইসলাম বরাবরই আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। প্রকৃতিগতভাবেই ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীতে যুগে যুগে দেশে দেশে যখনই অত্যাচার, শোষণ পীড়নের সয়লাব বয়ে গেছে, ক্ষমতাসীনদের নির্যাতন ও কুশাসনে জনসাধারণের মধ্যে আর্তরব উঠেছে তখনিইসলাম তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর বহু দেশেই মুসলিম বীর সেনানীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে মুক্তির দূত হিসেবে। কিন্তু কোথাও তারা সাম্রাজ্যবাদ কায়েমকরেনি, উপনিবেশ স্থাপন করেনি। বরং বিজয়ী ও বিজিত এক হয়ে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্যে কাজ করেছে। ইসলাম পুরোপুরি আধিপত্যবাদবিরোধী, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, এমনকি সংকীর্ণ জাতীযতাবাদেরও বিরোধ। বরং কিভাবে বিশ্ব মুসলিম এক উম্মাহর পতাকা তলে জমাযেত হবে, কিভাবে মুসলমানরা সমগ্র পৃথিবীতে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করবে তাই তার লক্ষ্য। কোন জাতি বা রাষ্ট্র বিশেষকে পদানত করে রাখা, তার সম্পদের উপর লোলুপ থাবা বিস্তার কখনই মুসলমানদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিলো না। প্রকৃত অর্থেই মুসলমানরা আন্তর্জাতিকবাদী। তার কাছে আরব-আযমের কোন ভেদাভেদ নেই। তার মধ্যে জাতীয়তাবাদের ভেদবুদ্ধি অনুপ্রবেশ করিয়েছে পাশ্চাত্যের সুযোগ সন্ধানী কুচক্রী মমহল। ক্ষুদ্র স্বার্থের বেড়াজালে আটকে তাকে বৃহৎ স্বার্থের বিরোধী করেছে পাশ্চাত্যের ভোগবাদী দর্শন। প্রকৃত মুমিনের শিক্ষা হতে বিচ্যুতির কারণে, আরও সঠিক করে বললে ইসলামের যথার্থ শিক্ষা করে মোহমুক্তি ঘটাতে পারলেই আবর প্রস্ফুটিত হবে তার সত্যিকার চেহারা, বিকশিত হবে তার যথার্থ চরিত্র। মানব জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই ইসলামের এই কল্যাণমুখী ভ্রাতৃত্বধর্মী আন্তর্জাতিকবাদ ও উম্মাহর ধ্যান-ধারণা গ্রহণ এখন সময়ের দাবী।

অন্যান্য বৈশিষ্ট্য
উপসংহারে পৌঁছানোর পূর্বে পুঁজিবাদের অপরাপর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যও তুলে ধরা প্রয়োজন। এ সবের মধ্যে এই জীবন দর্শনে আত্মিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়ন প্রয়াসের অনুপস্থিতির কথাই আসে সবার আগে। বৈষয়িক উন্নতিই এর একমাত্র বা চূড়ান্ত লক্ষ্য। চরম ব্যক্তি স্বার্থ ও উপযোগিতাবাদই এর আইন-কানুন বা নীতি নির্ধারণের প্রধান মানদন্ড হিসেবে কাজ করে থাকে। এ জন্যেই আইন করে এরা একবার ধূমপান নিষিদ্ধ করে পরক্ষণে সেই আইন আবার নাকচ করে। ব্যবসায়ী তথা মুনাফা লুটেরাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে বলে ধূমপান নিষিদ্ধ না করে, সিগারেট উৎপাদন বন্ধ না করে ‘ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর’ শ্লোগান সিগারেট প্যাকেটে ছাপার নির্দেশ দিয়েই সামাজিক দায়িত্ব সচেতনতার পরাকাষ্ঠা দেখায়। এখানে সম্পদ ও ক্ষমতার দাপটে মানুষ মানুষের উপর প্রভূত্ব করে। চরিত্রহীনতার সংজ্ঞা এখানে নতুন করে লেখা হচ্ছে। মানুষের স্বার্থে মানুষের মনগড়া আইন দিয়েই এই সমাজব্যবস্থা পরিচালিত বলে পুঁজিবাদী জীবনদর্শন ভারসাম্যহীন ও একদেশদর্শী।

পুঁজিবাদের বর্তমান চরিত্রকে সংক্ষেপে তুলে ধরলে যা দাঁড়ায়:
১. একক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ;
২. চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরাজমান (ধনী-দরিদ্রের জীবন যাপনের ব্যয়সূচক বিগত দুই দশকে ১০:১ হতে ৭০:১ এ উন্নীত);
৩. বিশ্বায়ন ও উদারীকরণের ছলে বিশ্বকে শোষণের কৌশল গ্রহণ;
৪. যুগপৎ চরম দারিদ্র্য ও ভোগ-বিলাসপূর্ণ জীবন যাপন নিত্যকার দৃশ্য;
৫. গণতন্ত্রের ধোঁকা দিয়ে মুষ্টিমেয় বিত্তশালী লোকের শাসন প্রতিষ্ঠা;
৬. স্যাটেলাইট ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রবাহ ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে পুঁজিবাদী জীবনাদর্শের স্লো পয়জনিং;
৭. এনজিও কালচার পত্তনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে শোষণের বিস্তৃতি;
৮. আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল; এবং
৯. ইসলামের মুকাবিলায় সমাজতন্ত্রের সাথে অভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ
একইবাবে সমাজতন্ত্র সম্বন্ধে সম্যক জানার স্বার্থে তার আরও কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী বা কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা জীবন দর্শনের এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে আত্মিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের অস্বীকৃতি, বেতন ও সুযোগ-সুবিধার নিদারুণ বৈষম্যের কথা বাদ দিলেও পার্টিসৃষ্ট সামাজিক বৈষম্য (রুশ প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রীপরিষদ সদস্যবৃন্দ, পলিটব্যুরোর সদস্যবৃন্দ ও জেনারেলরা বিশ্রামের জন্যে যে ডাচা-তে সময় কাটান তা সাধারণ রুশ নাগরিকের শুধু কল্পনাতীত নয় তার ধারে কাছে ঘেঁষাও অপরাধ), ধর্মহীনতাকে নৈতিকতার মানদন্ড হিসেবে গ্রহণ, মানুষের উপর মানুষের অন্যায় প্রভুত্ব, রেজিমেন্টেড জীবন যাপন, সর্বোপরি অবাস্তব ও অলীক আশার বাণী শুনিয়ে ধোঁকা দেবার অভ্যাস।
সমাজতন্ত্রের মদাদুর্ভাগ্য হলো এর প্রফেট কার্ল মার্ক্সের ভবিষ্যদ্বাণীগুলো মিথ্যা প্রতিপন্ন হওয়া। মার্ক্স তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীতে শুনিয়েছিলেন পুঁজিবাদী দেশে শিল্প শ্রমিকদের অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হবে। ফলে তারাই সংহত হয়ে শ্রেণী সংগ্রাম করবে। বাস্তবে তা তো হয়ই নি, বরং সেসব দেশের শ্রমিকদের জীবন যাপনের মান সাম্যবাদী বা সমাজতন্ত্রী দেশের শ্রমিকদের চেয়ে ঢের বেশী উন্নত। তিনি আশা করেছিলেন মুনাফা হার ক্রমাগত হ্রাস পাবে এবং জাতীয় আয়ের মজুরীর অবদানও দ্রুত কমে আসবে। বাস্তবে ঘটেছে এর উল্টোটা। তার ভবিষ্যদ্বাণী ছিলো ব্যাপক শিল্প উৎপাদনের ফলে বাজারে পণ্যের স্তূপ জমে যাবে। ফলে দেখা দেবে ব্যাপক বেকারত্ব িএবং ঘন ঘন মন্দা, ফলশ্রুতিতে নাভিঃশ্বাস উঠবে পুঁজিবাদের। সরকারী হস্তক্ষেপের ফলে, বিশেষতঃ কেইনসের উদ্ভাবিত তত্ত্ব অনুসরণের ফলে মার্ক্সের এই প্রত্যাশাও পূরণ হয়নি। মার্ক্সের ভবিষ্যদ্বাণী ছিলো, ইতিহাসের অমোধ নিয়মে বিবর্তনবাদের পরিণতি হিসেবেই পুঁজিবাদ তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বের কারণেই ধ্বংস হবে। এই ভবিষ্যদ্বাণীও সফল হয়নি। বিশ্বের বহুদেশেই পুঁজিবাদ ছিলো, আজও আছে। সেসব দেশে পুঁজিবাদের মৃত্যুঘন্টা বাজেনি। অপরদিকে যেসব দেশে রক্ষক্ষয়ী বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রী ও সাম্যবাদীরা ক্ষমতার কুক্ষিগত করেছিলো সেসব দেশে পুঁজিবাদ বলে তেমন কিছু ছিলো না। বরং তাদের সবগুলোই ছিলো সামন্তবাদী বা আধাসামন্তবাদী দেশ, শিল্পভিত্তিক পুঁজিবাদী দেশ কখনই নয়।
এখানেই শেষ নয়। যে পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের জন্যে এত রক্তপাত, এত শত্রুতা ও শঠতা সেই দেশগুলোতে সমাজতন্ত্রের আদর্শের দশা আজ এই পর্যায়ে পৌঁচেছে যে স্কোয়ারে স্কোয়ারে স্থাপিত কার্ল মার্ক্স আর লেনিনের ব্রোঞ্জের তৈরী অতিকায় মূর্তিগুলো ক্রেন দিয়ে টেনে নামানো হয়েছে। তারপর সেগুলো নীলামে চড়ানো হয়েছে অথবা ফ্যাকটরীতে নিয়ে গয়ে ফেলা হয়েছে। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে সমাজতন্ত্রের পতনে বিশেষ অবদান রাখার জন্যে পুরস্কৃত করা হয়েছে ছয় জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে। এদের মধ্যে রয়েছে মিখায়েল গরবাচেভ, লেস ওয়ালেসা, জর্জ বুশ, মার্গারেট থ্যাচার, হেলমুট কোহল এবং ফ্রাঁসোয়া মিতেরা। পুরস্কারটি দিয়েছেন চেক প্রেসিডেন্ট ভেক্লাব হ্যাভেল। (দৈনিক ইনকিলাব, ৪ নভেম্বর, ১৯৯৯)। নব্য মার্ক্সবাদীরা মার্ক্সবাদের এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে এর নতুন ব্যাখ্যা, নতুন প্রেক্ষিত ও সংশোধন আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই অব্যাহত সংশোধন ও পরিবর্তনের ফলে সাম্যবাদ ও সমাজতন্ত্র শুধু তাদের চরিত্রই হারায় নি, কঠোর বাস্তবতার মুকাবিলায় নিজেদের অস্তিত্বকেই সংকটাপন্ন করে তুলেছে।
সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের বর্তমান বৈশিষ্ট্যকে সংক্ষেপে তুলে ধরলে যা দাঁড়ায়:
১. সমাজতন্ত্রের বর্তমান গতি ক্রমাগত সংশোধনবাদের দিকে;
২. পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলো ক্রমাগত গ্রহণ (সুদ, ব্যক্তিমালিকানা, বাজার ব্যবস্থা, মুনাফা ইত্যাদি);
৩. শিল্প উৎপাদনে পুঁজিবাদী বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ;
৪. পার্টি এলিট ও জনসাধারণের মধ্যে শোষণমূলক সম্পর্ক;
৫. পীড়নমূলক, ধোঁকাপূর্ণ গোঁজামিলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পর্যবসিত;
৬. রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণীর সৃষ্টি;
৭. অর্থনৈতিক ও সামাজিক শ্রেণীবৈষম্য বিলুপ্ত করতে ব্যর্থ;
৮. পুঁজিবাদের সাথে সহঅবস্থানের নীতি গ্রহণ; এবং
৯. ইসলামের মুকাবিলায় পুঁজিবাদের সাথে অভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ।
এই আলোচনা শেষ করার আগে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের অন্তর্নিহিত কতকগুলো বড় বড় ত্রুটি বা গলওদ তুলে ধরা সমীচিন। তা না হলে এই আলোচনা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসম্পূর্ণতা ও বিচ্যুতিগুলো উল্লেখ করা জরুরী। এ থেকে উভয় মতবাদের অপূর্ণতা ও ব্যর্থতা সম্পর্কে আরও সুষ্ঠু ধারণা জন্মাবে।
পুঁজিবাদের ত্রুটি:
১. অপচয়মূলক প্রতিযোগিতা;
২. অর্থনৈতিক অস্তিতিশীলতা ও বেকারত্ব;

৩. সম্পদের ত্রুটিপূর্ণ বন্টন;
৪. একচেটিয়া ব্যবসায়ীর উদ্ভব ও তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা সংহতকরণ;
৫. চাণিজ্য চক্রের পর্যায়ক্রমিক উপস্থিতি; এবং
৬. চরম নৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের ক্রম বিস্তৃতি।
সমাজতন্ত্রের ত্রুটি:
১. সম্পদের ভুল মালিকানা ও অসম বন্টন;
২. প্রকৃত চাহিদা নির্ধারণ ও সঠিক মূল্য নিরূপণে ব্যর্থ;
৩. ব্যক্তিস্বার্থ পূরণের সুযোগ না থাকায় প্রেষণা অকার্যকর;
৪. ভোক্তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হরণ;
৫. কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা সত্ত্বেও কাংখিত অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যর্থ; এবং
৬. নৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে ব্যর্থ।
উপসংহার
ইসলামী জীবনাদর্শ এক কালজয়ী জীবনাদর্শ হিসাবে চলতি শতাব্দীতে বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করবে এ সত্য দিবালোকের মত স্পষ্ট। মুসলমানদের উপলব্ধির আগেই এ সত্য উপলব্ধি করেছে পুঁজিবাদের সমাজবিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদরা। এজন্যে তারা উদ্বেগকুল। তারা উপায় খুঁজজে ইসলামের এই দুর্নিবার জোয়ার প্রতিরোধের। কতকগুলো উপায় তারা উদ্ভাবন করেছেও। সেসবের মধ্যে সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ হলো যেখানেই মুসলমানদের জাগরণ শুরু হয়েছে, সেখানেই মৌলবাদের জিগির তুলে ত াকে প্রতিহত করা। তাদরে সে উদ্দেশ্য কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে সাফল্য হয়েছে। এরা মুসলিম নেতাদের চরিত্র হননের বিশ্বব্যাপী ষড়যন্ত্রও চালিয়ে যাচ্ছে। উদ্দেশ্যমূলকভাবেই পুঁজিবাদের মোড়লরা সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গীবাদ ও ইসলামকে একাকার করে ফেলেছৈ। পৃথিবীর সেখান যত নাশকতামূরক কাজ, ধ্বংস ও হত্যা সব কিছুরই দায়ভার চাপানো হচ্ছে ইসরামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের উপর।
ইসলামের নামে স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম এদের কাছে বড়ই না পছন্দ-। পরিকল্পিতভাবে এর ধ্বংসের জন্যে যুব সমাজকে প্ররোচিত করছে ভোগ-লালসাময় জীবনের দিকে। কাশ্মীর মিন্দানাও আচেহ চেচনিয়া ইংগুশতিয়া বসনিয়া হারজেগোভিনায় পাইকারী হারে মুসরিম নিধন যজ্ঞে তারা কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণ করে শাস্তি উদ্যোগের নামে মাসের পর মাস কালক্ষেপণ করে। রেড ক্রিসেন্টের সাহায্য ও শান্তিবাহিনী পৌঁছাতে পৌঁছাতে জনপদের পর জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আলীয়া ইজত বেগোভিচ কিংবাআসলান মাসখাদভকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার জন্যে তারা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে। এরই বিপরীতে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব তিমুরের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের প্রতি বিশ্বজনসমর্থন আদায়ের উদ্দেশ্যে তাদের নেতাদের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। সেখানকার খ্রীষ্টানদের জন্যে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে শান্তি স্থাপনের শর্তে ঝাঁকে ঝাঁকে বিমান বোঝাই সৈন্য ও রসদগ পাঠাতে খ্রীষ্টান বিশ্বের কোনো বিলম্ব হয় না, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এর বিরুদ্ধে কোনো ভেটো পড়ে না। অথচ অধিবাসীদের ৯০% মুসলমান হওয়ার ‘অপরাধে’ কাশ্মিরীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার পঞ্চাশ বছরেরও বেশী ভূলুন্ঠিত। এশিয়ার নব্য আগ্রাসী শক্তি ভারত তাকে জবর দখল করে রাখলেও তার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করে না বিশ্ব মোড়লরা।

পাশ্চাত্যের তথা পুঁজিবাদের দ্বিমুখী ও দ্বিচারিণী মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে আণবিক বোমার ক্ষেত্রেও। যে আণবিক বোমা ফাটানোর কারণে সিটিবিটিতে স্বাক্ষর না করলে পাকিস্তানকে সাহায্য দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে সেই একই ‘অপরাধ’ অনেক আগেই ভারত করলেও তাকে সিটিবিটিতে স্বাক্ষর করার জন্যে নেই সে ধরনের কোনো চাপ। একই কারণে ইরাকের আণবিক প্রকল্প বোমা মেরে উড়িয়ে দিলে ইসরাইল বাহবা কুড়ায়। এখন সেই একই পায়তারা চলেছে ইরানের বিরুদ্ধে। গণচীনও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। চরম পীড়ন, দলন ও দমন চলেছে জিনজিয়াং সিচুয়ান ও গানসু প্রদেশে। সেদেশে জনসংখ্যা নীতির প্রধান টার্গেট মুসলমানরাই। জিয়াং জেমিনের আমলেই ২১০ জন মুসলমান ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠানো হয়েছে (দৈনিক সংগ্রাম, ৯ নভেম্বর, ১৯৯৯)। তাদের অপরাধ তারা ইসলামী জীবন বিধানের অনুসারী ছিলো, ইসলামী হুকুমাতের প্রত্যাশী ছিলো।
এটাই নির্মম বাস্তবতা। কারণ আল্লাহ নিজেই বলেছেন- “আল-কুফরু মিল্লাহু ওয়াহিদাহ্।” অর্থাৎ, সমস্ত বাতিল শক্তিই এক। তাই তারা যে এক পর্যায়ে হকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, জীবনপণ করে লড়বে এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বরং সেটাই নিষ্ঠুর সত্য, রূঢ় বাস্তবতা। এর মুকাবিলায় জয়ী হতে হলে, ইসলামকে বিজয়ী শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চাইলে দরকার বিশ্ব মুসলিমের সমবেত সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রয়াস। সেই প্রয়াসে কুরবানী করতে প্রস্তুত থাকতে হবে জীবনের সকল প্রিয় সম্পদকে।
লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও  রাজনীতিবিদ, যুক্তরাজ্য বিএনপির কার্যনির্বাহী সদস্য, জিয়া পরিষদের সহ আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের যুক্তরাজ্য শাখার যুগ্ম আহবায়ক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম যুক্তরাজ্য শাখার সাবেক সহ সভাপতি, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক রিসার্চ ইনস্টিটিউট’র প্রতিষ্ঠিতা, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষনা পরিষদের সিনিয়র সহ সভাপতি এবং চার্টাড ইনস্টিটিউট অব লিগ্যাল এক্সিকিউটিভের মেম্বার।
 


নিউইয়র্ক ঐক্য পরিষদ নেতৃত্বের কোন্দল থেকে আদৌ বেরিয়ে আসতে পারবে? - সুব্রত বিশ^াস

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০১৫

সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন হলে দেশের ঐক্য পরিষদের তেমন ভূমিকা না দেখা গেলেও নিউইয়র্ক ঐক্য পরিষদের ভূমিকা সব সময় লক্ষ্য করা যেত। এখন আর সেটা লক্ষ্য করা যায়না। সম্প্রতি জনাব আব্দুল গাফফার চৌধূরী লন্ডনে একাত্তরে সিলেট বুরুঙ্গাবাজার গণহত্যা দিবসের এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, ঐক্য পরিষদ এখন নপুংসকে পরিণত হয়ে গেছে।
  নিউইয়র্ক ঐক্য পরিষদের স্থবিরতার কারণ নিয়ে ইতিপূর্বে কয়েকবার লিখেছি। কিন্তু সবটাই ঐ প্রবাদবাক্যের ন্যায় পাঠায় শোনেনা ধর্মের কাহিনী। সংখ্যালঘু স্বার্থের চেয়ে নেতৃত্বের কোন্দল আর ব্যক্তিস্বার্থের দলাদলি এখন প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থা আগে বেশি ছিল দেশের সংগঠনে। নিউইয়র্কে ছিলনা তা নয় তবে কম ছিল। কিন্তু এক পর্যায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাদের আজ্ঞাবহ চামচা তৈরির অশুভ উদ্দেশ্যে নিউইয়র্কের নেতৃত্বেও কোন্দল সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়।
সাম্প্রতিক দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার নির্যাতন, উচ্ছেদ, জবরদখল চরম আকার ধারণ করেছে। এনিয়ে নিউইয়র্ক ঐক্য পরিষদের কোন ভ্রক্ষেপ নেই। তারই প্রেক্ষিতেসূদূর অতীতেনা গিয়েবর্তমান অবস্থান ও কর্মকান্ড তুলে ধরতেই আজকের এ প্রতিবেদন।
উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কারণে দীর্ঘদিন থেকে নবেন্দু-শিতাংশ ও দ্বিজেন ভট্টাচার্যএই দু’টি গ্রুপের অস্থিত্ব বিরাজ করছিল। যদিও মূলত নবেন্দু-শিতাংশু গ্রুপই কর্মকান্ডে সক্রিয় ছিল।  মূলত এ গ্রুপই বহিঃর্বিশে^ সকল সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করে। স্বাভাবিকভাবে তাদের প্রভাব ও অবস্থান খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ইচ্ছামাফিক জিহুজুরের ভূমিকা ছিল না।ফলে জিহুজুরে পরিণত করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় কমিটির স্বার্থবাদী গ্রুপ বার বার কোন্দল সৃষ্টির অপচেষ্টা করেছে। কিন্তু তাদের সে চেষ্টা প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে।
এমনি অবস্থায় বছর দেড়েক আগে অন্যতম সভাপতি নবেন্দ্র দত্ত ঢাকায় গেলে কমিটি নিয়ে কথা হয় কেন্দ্রীয় কমিটির দ্বিপেন চাটার্জির সাথে। উভয়ের আলোচনায় উভয়ে একমত হন বিবদমান দু’টি কমিটি বাতিল করে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন। আহ্বায়ক কমিটিছয় মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করবে। এজন্য দ্বিপেনবাবু নবেন্দুবাবুর কাছেউভয়ের কাছে গ্রহনযোগ্যএকজন আহ্বায়কের নাম চান। নবেন্দুবাবু জানিনা কোন যুক্তি ও বিবেচনায়এটর্নী অশোক কর্মকারের নাম দিয়ে আসেন। তবে যে চিন্তা বা যুক্তি থেকেই অশোক কর্মকারের নাম তিনি দিয়ে আসেন সেটা হয়ে দাঁড়ায় এক মস্তবড় ভুল সিদ্ধান্ত। যে ভুলের মাশুলকড়ায় গন্ডায় নিউইয়র্ক ঐক্য পরিষদ এখন দিয়ে যাচ্ছে। বাস্তবে একজন আহ্বায়কের বয়স, প্রভাব, পরিচিতি, গ্রহনযোগ্যতা এবং যোগ্যতার মাপকাটি যতটুকু থাকা প্রয়োজন অশোক কর্মকারের তা নেই। ইতিমধ্যে তার কর্মকান্ডে সেটা দিবালোকের ন্যায় প্রমাণ করে দিয়েছে।
 দ্বিতীয়তঃসুব্রত চৌধুরী সহ কিছুকেন্দ্রীয় নেতারসাথে তার মধুর সম্পর্ক রয়েছে। যারা শুরু থেকে নিউইয়র্ক ঐক্য পরিষদে ভাঙ্গন সৃষ্টি করেএকজন আজ্ঞাবহব্যক্তিকে দিয়ে একটি কমিটি গঠনের চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। তারা আমেরিকায় এলেবিনে খরচে তার বাসায় থাকা-খাওয়ার সুযোগ পান। আনন্দে আমেরিকা ঘুরে বেড়ান। বাক্সভর্তি উপটৌকনও পাওয়া যায়। আরো শুনেছি এসব কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের অনেকের ছেলেমেয়ে আমেরিকায় পড়ালেখা করে। অশোক কর্মকার তাদের ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত বিষয়াদি সহ দেখভাল করে থাকেন।
 মূল কথায় আবার ফিরে আসি। নবেন্দ্র দত্তের সাথে দ্বিপেন চাটার্জির আলোচনা অনুসারে নিউইয়র্কের বিবদমান দ’ুটি কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে অশোক কর্মকারকে আহ্বায়ক করে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। তার কিছুদিন পর দ্বিপেন চাটার্জি কার্যপলক্ষেনিউইয়র্ক এসে উদ্যেগ নেন ভেঙ্গে দেওয়া উভয় গ্রুপকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিট্ িগঠনের। উভয় গ্রুপ থেকে প্রশ্ন উঠে মতামত ছাড়া অশোক কর্মকারকে আহ্বায়ক করা নিয়ে।অভিযোগ উঠে অশোক কর্মকারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও। অন্যদিক উভয় গ্রুপের অভিযোগের মধ্যেও দ্বিপেন চাটার্জি চাচ্ছিলেন অশোক কর্মকারকে আহ্বায়ক রেখে পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি করতে। এক্ষেত্রে নবেন্দু দত্তের বাড়তি আশ^াস ও সহযোগিতা সত্বে দ্বিপেনবাবু ব্যর্থ হয়ে দেশে ফিরে যান।
ইত্তবসরে অশোক কর্মকার আহ্বায়ক কমিটিতে নিজের পছন্দসই লোক ঢুকিয়ে সংখ্যাবৃদ্ধির প্রয়াস চালান। সাংগঠনিক ক্ষমতাবহির্ভূত ভাবে মহিলা ঐক্য পরিষদ গঠন করে দল ভারী করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হন।তার গ্রহনযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা আদৌ ছিল কিনা তবে এসব কর্মকান্ডে নিজেই নিজেকে আরো বিতর্কিত করে ফেলেন। তারপরও ঐক্য পরিষদের কর্মকান্ড স্থবির হওয়া বিবেচনা করে  নবেন্দ্র-শিতাংশু-চন্দন সেনগুপ্ত যারা ঐক্য পরিষদের মূল লোক বৃহত্তর স্বার্থে অশোক কর্মকারেরঅন্যায় মেনে নিয়েও চেষ্টা করেন একট্ িপূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার। কিন্তু অশোক কর্মকার আহ্বায়ক হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে করে সময় ক্ষেপন করতে থাকেন। যখনই কমিটি গঠনের চেষ্টা হয়েছে তিনি দাবি তুলেছেন সভাপতি অন্য কেউ হলে সম্পাদক আমার হতে হবে। অথবা সম্পাদক অন্য কেউ হলে সভাপতি আমার লোক হতে হবে। কমিটিতে নিজের পছন্দসই লোকের সংখ্যা অধিক রাখার অপচেষ্টা করায় কমিটি গঠিত হতে পারছিল না। শুনেছি এক পর্যায় চন্দন সেনগুপ্তকে বেশির ভাগ সদস্য সভাপতি করার মত প্রকাশ করেন। কিন্তু হতে দেওয়া হয়নি। আবার নবেন্দু দত্তকে সভাপতি করার প্রশ্ন উঠলে অশোক কর্মকার তার মনোনীত স্বপন দাসকে সেক্রেটারী করার দাবি তুলে আটকে দেওয়া হয়। যদিও শুনেছি নবেন্দু দত্ত সভাপতি এবং স্বপন দাস সেক্রেটারী হওয়া অনেকে নাকি মেনে নিতে রাজী হননি।
 এমনি অবস্থায় কমিটি করতে না পারায় কেন্দ্রের কিছু নেতাও আবার অশোক কর্মকারের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করছিলেন। কেউ কেউ চিন্তা করছিলেন অশোক কর্মকারকে বাদ দিয়ে একটি কমিটি করা যায় কিনা। এজন্য অশোক কর্মকারকে বাদ দিয়ে একজন গ্রহনযোগ্য ব্যক্তিকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটির নামের তালিকা নাকি চেয়ে পাঠানো হয়।অন্যদিকে আবার শোনা যাচ্ছে কেন্দ্রের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি অশোক কর্মকারকে রেখেই আপাতত চালাতে চান। এমনি অবস্থায় শোনা যাচ্ছে অন্যতম নেতা পরেশ সাহা  চেষ্টা চালাচ্ছেন নবেন্দু দত্তকে সভাপতি এবং অশোক কর্মকারের প্রস্তাবিত স্বপন দাসকে সেক্রেটারী করে কমিটি করে নিতে। তবে জানিনাশুনেছি পরেশ সাহার এ উদ্যোগকে অনেকেই পক্ষপাতমূলক মনে করছেন।
এটাই হচ্ছে নিউইয়র্ক ঐক্য পরিষদের বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থা। সংখ্যালঘু স্বার্থের আন্দোলন এখন নেতৃত্বের কোন্দলে স্থবির। সম্প্রতি ফরিদপুরে মন্ত্রী মোশারফ ও ঠাকুরগাঁও-এর এমপি দবিরুল ইসলামের সংখ্যালঘু সম্পত্তি দখল ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ সভা করার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। তারা বলেছেন, আমাদের তো এখন কোন কমিটি নেই আপনি উদ্যোগ নিলে আমরা সাথে থাকবো। বললাম, আমি যদি উদ্যোগ নিতে হয় তবে কমিটি ছাড়া আপনারা কেন করতে পারবেন না।আসলে এমনি অবস্থায় কে নেতা হবেন, কার নেতৃত্বে হবে সেটাই মনে হয়েছে তাদের কাছে বড় বিষয়।
 এখন প্রশ্ন হলো, কেন্দ্র যদি কমিটি না করে অশোক কর্মকারকে রেখে দিতে চায়। অথবা অশোক কর্মকার কমিটিতে নিজের গ্রুপের পছন্দসই অধিক সংখ্যক লোক না থাকলে কমিটি হতে দেবেনা। যদিএমন হয় তাহলে কি আদৌ কমিটি হবেনা বা করা যাবেনা। সংখ্যালঘু আন্দোলন মুখথুবড়ে পড়ে থাকবে। অতীতে  অশোক কর্মকারের ন্যায় দ্বিজেনবাবুকে দিয়ে কেন্দ্র কি একই ভূমিকা পালন করেনি। ঐক্য পরিষদের কমিটি করা আটকে ছিল কি?। সংখ্যালঘু আন্দোলন চলেনি? আমার ধারণা নবেন্দু-শিতাংশু গ্রুপের মাঝেকিছু ভুল বুঝাবুঝি অথবা নেতৃত্বের টানাপোড়ন চলছে। সেটাঅশোক কর্মকারকে আহ্বায়ক করা নিয়ে অথবা নেতৃত্ব নিয়েহতে পারে। কারণ অনেকের মাঝে একটি চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সে চাপা ক্ষোভ থেকেই সম্ভবত পরেশ সাহা নবেন্দু দত্তকে সভাপতি এবং অশোক কর্মকারের পছন্দের বা গ্রুপের স্বপন দাসকে সম্পাদক করে যে সমঝোতা কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন সেটাকেও অনেকে মেনে নিতে পারছেন না বলে মনে হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে সংখ্যালঘুদের স্বার্থে ঐক্য পরিষদের কার্যক্রম কি বন্ধ থাকবে? অথচ দেশের বর্তমান সংখ্যালঘু পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে নিউইয়র্ক ঐক্য পরিষদের দায়িত্ব ও করণীয় অনেক। এবং তাহলে কি ধরে  নিতে হবে,শিতাংশু গুহ, নবেন্দু দত্ত, চন্দন সেনগুপ্ত, পরেশ সাহা, সুশীল সাহা এরা  নেতৃত্বের কোন্দলের কারণে অতীত আন্দোলন সংগামের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধূয়ে মুছে ফেলবেন?  নেতা হওয়র সংকীর্ণ স্বার্থের উচ্চাবিলাসের উর্ধে উঠতে পারবেননা। রতন বড়–য়ার মৃত্যুর পর নতুন করে স্বীকৃতি বড়ৃয়া যুক্ত হয়েছেন। একইভাবে চন্দন সেনগুপ্তের অবদানও যোগ্যতার দাবি রাখে।আরো অনেকেই আছেন। ত্যাগের মনোভাব নিয়ে নতুন চিন্তা-ভাবনা করতে আপত্তি কোথায়। চন্দুন সেনগুপ্তের আর্থিক অবদান, যোগ্যতা, সামাজিক পরিচিতি সবই ইতিমধ্যে প্রমাণিত। স্বীকৃতি বড়–য়া ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কর্মকান্ডে তার গ্রহনযোগ্যতা পরিচিত ও যোগ্যতা অস্বীকার করার নয়। এসবকিছু  চিন্তায় রেখে সংখ্যালঘু স্বার্থে উর্ধে বিচেনায় নিয়ে এগুতে ব্যর্থ হলে আমার ধারণা কি অযৌক্তিক হবে। তারপরও বলছি, এখন আর অশোক কর্মকার কি করলেন, কেন্দ্র কি চিন্তা করলো সেটা বিচার্য বিষয় নয়। নিউইয়র্ক ঐক্য পরিষদ নেতৃব্ন্দৃ ত্যাগের মনোভাব নিয়ে তাদের অতীত ঐতিহ্য রক্ষায় যথাযথ ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসবেন সেটিই মূখ্য বিষয়। আশা করি নেতৃত্বের বোধদয় হবে।
 


যেভাবে ১৫ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পটুভূমি তৈরি হয় - সুব্রত বিশ^াস

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০১৫

কথিত আছে,রামের বনবাসের অনুপস্থিতিতে তাঁর পাদুকা সিংহাসনে রেখে ভরত রাজ্য শাসন করেছিলেন। পাকিস্তান কারাগারে বঙ্গবন্ধুর বন্দী অবস্থায় তেমনি তাজউদ্দীন আহমেদ প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুকে মনের সিংহাসনে বসিয়ে রেখে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাজউদ্দীন আহমেদের এই গভীর শ্রদ্ধা ও আনুগত্যসম্ভবত কেবলমাত্র চে, ফিদেল আর রাহুল ক্যাস্ট্রোর আদর্শিক আনুগত্যের সাথেই তুলনা চলে। অথচ বঙ্গবন্ধু কান কথায় ভুলে গেলেন সংকট কালের একমাত্র পরীক্ষিত সহযোদ্ধাকে। অপাংথেয় হয়ে গেল তাঁর সকল অতীত কর্মকান্ড ও বিশ^াসযোগ্যতা। পরবর্তীতে সে ভুলের মাশুলদিতে হয়বঙ্গবন্ধুকে জীবন দিয়ে।যে সহযোদ্ধা ছায়ার মতো পাশে থেকে কখনো জ্ঞাতসারে কখনো অজান্তে মোশতাক, তাহের ঠাকুর, নুরুল ইসলাম শিশু চক্রের চক্রান্ত বার বার ভেস্তে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের  পথ নিষ্কণ্ঠক করে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। অস্বীকার করার নয় বঙ্গবন্ধুর অদূরদর্শী বুদ্ধিমত্তা, সময়োপযোগীসঠিক সিদ্ধান্ত ও হিমালয়সম ভাবমুর্তি। কিন্তু তাজউদ্দীন ছিলেন তার অনুঘটক। দলীয় সিদ্ধান্ত, গঠনতন্ত্র ও মেনোফেস্টো তৈরির কারিগর। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে নির্বাচনী ইশতেহার ও আন্দোলনের কর্মসূচী প্রণয়ন, গোলটেবিল বৈঠকের খসড়া তৈরি এসবই ছিল তাঁর মস্তিষ্কের ফসল।
নেতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেযুদ্ধ জয়ের অসীম উচ্ছাসা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্য দেশ গড়ার কাঁচামাল, নয় মাসের অভিজ্ঞতা বাক্সবন্দী করে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু একটি বারের জন্যও জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন বোধ করলেন না অনুজ সহযোদ্ধার অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ বাক্সে কি কাঁচামাল ছিল। গলা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন মন্ত্রীত্ব সহ সকল সরকারী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে। নেতার এহেন অশোভনীয় আচরণে সামান্যতম প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ না করে সরে গেলেন নীরবে নিঃশব্দে।দেশের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা করে চেপে গেলেন সকল অন্যায়, অপবাদ। শঙ্কা আর সংশয়ে কেবল ভেবেছেন,কোথায় কোন অপরিণামদর্শী অন্ধকারের পথে দেশ ও জাতিকে নিয়ে চললেন বঙ্গবন্ধু। আশঙ্কিত হয়ে ভেবেছেন, ২৪ বছরের সংগ্রাম আর ৯ মাসে জাতির ত্যাগ শত্রুপক্ষের খাম্চে ধরার অজানা আশঙ্কায়। দেশের ভবিষ্যৎ অশনিসংকেতের কথা ভেবে গায়ে পড়ে চেষ্টা করেছেন একটিবার নয় মাসের অভিজ্ঞতার বাক্সট্ িখুলে দেখানোর। কিন্তু না, নেতা কানকথার আতিশয্যে তাচ্ছিল্যভরে প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন,দুঃসময়ের একমাত্র নির্ভরশীল সহযোদ্ধার দেশের ভবিষ্যৎচিন্তায় শংকা আর আশঙ্কা প্রকাশের অনুরোধ।
তারপর যা হবার তাই হলো। যে যুবসমাজ নিয়ে দেশগড়ার মহাপরিকল্পনা গড়েছিলেন সব ভেস্তে গেল। মোশতাক চক্রের চক্রান্ত অপ্রতিরোধ্য গতি পেল। দ্বিধাবিভক্তি দেখা দিল ছাত্র ও যুবসমাজের মাঝে। সুযোগ নিল বিদেশী চক্রান্তকারী গোষ্ঠী। রব, জলিল, শাহজাহান সিরাজরা আলিঙ্গন করলো তাদের সাথে। মুক্তিযুদ্ধের অপরিসীম ত্যাগের মনোভাব নিয়ে দেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর যুব সমাজকে বিভ্রান্ত করতে সমাজ বদলের নামে বিদেশী অর্থ মদতে সমাজতন্ত্রের খোলসের আড়ালে গড়ে তোলা হলো জাসদ নামক সন্ত্রাসী দল। নেপথ্য চক্রান্ত সংগঠিত করার অশুভ লক্ষ্যে সামরিক কায়দায় গঠন করা হলো তথাকথিত গণবাহিনী। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চটকদার বক্তব্য দিয়ে চরম অসন্তেুাষ তৈরির পথ বেছে নেওয়া হয়। রব বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে জুতা তৈরির মতো অশোভন বক্তব্য দিতেও দ্বিধা করেনি। পার্টির মুখপত্র গণকণ্ঠে চললো মিথ্যা ও উগ্র প্রচারণা। করূণা হয় আজ যখন দেখি বঙ্গবন্ধুর অনুসারী পরিচয়দানকারী এক শ্রেণীর লোক এই রবেেদর ন্যাূয় ব্যক্তিদের মাথায় তুলে তার প্রশসংসায় মাতম করতে।
রেল লাইন উপ্ড়ে ফেলে, পাঠের গুদামে আগুন দিয়ে, রাস্থাঘাট ধ্বংস করে চললো নাশকতা। খাদ্য গুদামে আগুন, খাদ্য বোঝাই জাহাজডুবিয়ে দিয়ে মু্িক্তযুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশের খাদ্য সংকট আরো ঘনীভূত করে তোলা হলো। এরই সাথে যুক্ত হলো স্মরণকালের প্রলয়ঙ্কারী বন্যা। দেখা দিল দুর্ভিক্ষ। সমাজতান্ত্রিক ব্শি^ ও বন্ধুপ্রতীম দেশ যথাসম্ভব সাহায্যের হাত প্রসারিত করলো। নিতান্ত অপ্রয়োজন সত্বে কিউবা শুকনো মরিচ আমদানী কর্।ে কিন্তু এসবই ছিল নিতান্ত অপ্রতুল।বাধ্য হয়ে খাদ্য আমদানী করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে খাদ্যচুক্তি  করতে হয়।
মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় তাজউদ্দীন আহমেদ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যথাসম্ভব আমেরিকার অসম সাহায্য সহযোগিতা এড়িয়ে চলার। তাই মুক্তিযুদ্ধের পর মার্কিন পররাষ্ট্র সেক্রেটারী কিসিঞ্জারের সাহায্যের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। অপমানে ক্ষুব্দ কিসিঞ্জার তখনতাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন বাংলাদেশ একটি তলাবিহীন ঝুড়ি। তারপর প্রতিশোধের সুযোগ তৈরিতেও বেশি সময় লাগেনি। চুক্তিমত গম বোঝাই বাংলাদেশগামী জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়ে দুর্ভিক্ষে খাদ্য সংকট আরো বাড়িয়ে তোলা হয়।
বঙ্গবন্ধু অবস্থা সামাল দিতে সৌদি আরব সহ ইসলামী দেশগুলোর স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে যোগ দিতে গেলেন পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ও আই সি সম্মেলনে। গঠন করলেন ইসলামী বোর্ড। কিন্তু এসব কিছুই পরিস্থিতি মোকবেলায় সহায়ক হয়নি। যদিও ইসলামী সম্মেলনে পাকিস্তান না যেতে অনেকেই দ্বিমত প্রকাশ করেছিলেন।
যে আওয়ামীকে নিয়ে দেশ গড়বেন তারা চরম দুর্নীতি আর লুটপাঠে আকুণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে পড়লো। লুটপাঠ-দুর্নীতি বন্ধ করতে রক্ষীবাহিনী, আর্মি নামালেন। দেখা গেল যাদের ধরা হচ্ছে তাদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। এরই সঙ্গে জাসদ ও তাদের গণবাহিনীর হঠকারী কর্মকান্ড তার সাথে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের অপ্রপচার ও নাশকতা। মোশতাক চক্রের অশুভ চক্রান্তের সাথে বিদেশী চক্রান্ত এসব মিলে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর সরকারকে চরম অস্থিতিশী করে তুলে সংকট ঘনীভূত করা হলো।
বাধ্য হন বঙ্গবন্ধু নতুন চিন্তা করতে। সিদ্ধান্ত নেন বাকশাল গঠনের। যুদ্ধের পর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে নিয়েতাজউদ্দীন আহমেদ সর্বদলীয় সরকার গঠনের যে চিন্তা করেছিলেন বাকশালের পরিকল্পনা ছিল অনেকটা তারই অনুরূপ। কিন্তু ততক্ষণে অনেক সময় বয়ে গেছে। শত্রু পক্ষ তাদের শেকড় অনেক গভীরে প্রেথিত করে ফেলেছে। নিজের দল আওয়ামী লীগই হয়ে দাঁড়ায় বাকশালের বড় বিপক্ষ। যদিও বাকশালের আদর্শ-উদ্দেশ্য,লক্ষ্য, কর্মসূচী ছিল জনগণের পক্ষে।
সব প্রতিকুলতা উপেক্ষা করেবঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করলেন। গঠনের পর গভর্নরদের ট্রেনিং চলছে। ট্রেনিং শেষে গভর্নররা ফিরে গেলে নতুন প্রশাসনিক কর্মযজ্ঞ শুরু করবে। ছাত্র-যুবকরা কর্মসূচী বাস্তবায়নে গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়বে। তারপর চক্রান্তের মূলৎপাটনে হাত দেবেন। এরূপ চিন্তাই পোষণ করেছিলেন। কিন্তু শত্রুরা মরিয়া হয়ে ওঠে শেষ সুযোগ নিতে।
  রবার্ট ক্লাইভ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হয়ে ব্যবসা করার নামে মীরজাফরের সাথে গোপন আঁতাত করে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে বিশ^াসঘাতকতা করেছিল। সরল মনে নবাব ক্লাইভকে বিশ^াস করেছিলেন। ক্লাইভ সে বিশ^াসের সুযোগ নিয়ে যুদ্ধে পরাজিত নবাবকে হত্যা করা হয়েছিল। বাংলা বিহার উড়িশ্যা তথা বাংলার পতন ঘটেছিল।খন্দকার মোশতাক চক্র তেমনিফারুক-রসিদ চক্রকে দিয়ে বিজয় অনুষ্ঠানে ট্যাঙ্ক প্রদর্শনের নামে ব্যারাক থেকে ট্যাঙ্ক বের করার অনুমতি চায় বঙ্গবন্ধুর কাছে। বঙ্গবন্ধু সরল বিশ^াসে অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘাতকের দল মীরজাফরের ভূমিকায় অবতীর্ন হলো। ঘাতকের দলগভীর রাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে সেই ট্যাঙ্ক নিয়ে আক্রমণ করে বিশ^াসঘাতকের দল। কাপুরুষের ন্যয় হত্যা করে বঙ্গবন্ধুকে। স্তব্দ করে দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নকে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে চালিত করার অপপ্রয়াস শুরু হয় তার চেতনা ও আদর্শের বিপরীত ধারায়। প্রতিষ্ঠিত করা হয় স্বাধীনতাবিরোধী খুনীচক্রকে। এভাবেই বঙ্গবন্ধু হত্যার পটভূমি তৈরি করা হয়।
পলাশীর মাঠে মীরজাফরের বিশ^াসঘাতকতা উপলব্দি করে প্রতিশোধ নিতে ভারতবর্ষের সময় লেগেছিল দ্ইুশত বছর। পঁচাত্তরে মোশতাক-জিয়া-এরশাদ-খালেদা চক্রের বিশ^াসঘাতকতার প্রতিশোধ নিতে বাঙালির সময় লেগেছে চল্লিশ বছর। যদিও এত সময় লাগার কথা ছিলনা। তারপর আজও স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অর্জন শত্রুপক্ষের কবলমুক্তনিশ্চিত বলাযাবেনা। তথাপি দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, ভুল-ভ্রান্তি, আপোষকামীতা, দুর্বলতা সত্বে খুনীদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে, আংশিক শাস্তি কার্যকর হয়েছে। জাতি কলঙ্ক মোচনের দায়বদ্ধতা কিছুটা হলেও করতে পেরেছে।
দুঃখ হয় আজও যখন দেখি নব্য মোশতাক-তাহের ঠাকুর চক্র ক্ষমতার চারপাশে ঘোর ঘোর করছে। ঘৃনা ও করুণা হয় কথিত বঙ্গবন্ধুর অনুসারী পরিচয়দানকারী কিছু ব্যক্তিরা বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে অপমানকারী রবের ন্যায় সুবিধাবাদীদের নিয়ে মাতম করতে দেখে। আতঙ্কিত হই যে ইনু ৯১ সালে বিএনপির নমিনেশন না পেয়ে আজ আওয়ামী লীগের মন্ত্রী হতে দেখে। আশঙ্কিত হই কখ্যাত নূরু রাজাকারের ছেলে প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই মন্ত্রী মোশাররফ ও এমপি দবিরুলদের সরকারের ভাবমুর্তি বিনষ্টের কর্মকান্ডে। শংকিত হয় রাজাকারের ছেলে আওয়ামী লীগ এমপি মাহমুদুস সামাদকে দেশবরেণ্য মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষক ড. জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে দেখে। ভয় হয় একটি চক্র যখন দেখি সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থে খুনী জামাত চক্রকে আওয়ামী লীগের দলে ভীড়াতে দেখে। ভয় হয় যখন দেখি আওয়ামী লীগেরই অঙ্গসংগঠন আওয়ামী উলামা ফরাম ব্লগারদের ধর্মবিরোধী আখ্যায়িত করে মানববন্ধন করে দেখে। অথচ এদের উত্তরসূরীরাই একসময় বঙ্গবন্ধুর আশেপাশে ভীড় করেছিল। নবাব সিরাজউদৌলাকে হত্যা করতে পলাশীর মাঠে মীরজাফর যেভাবে বিরাট সংখ্যক সৈন্য নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এরা কেবল নীরব দর্শকই ছিলনা বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর দিয়ে ঁেহটে ক্ষমতার অংশীদার হয়েছিল। এদের সম্পর্কে সতর্ক না হলে আরও একটি পচাত্তরের অশনিসংকেত অপেক্ষা করছেনা একথা নিশ্চিত করে বলা যাবে?  
 


জিএসপি সুবিধা স্থগিত নয় বরং শিল্প ও শ্রমজীবীদের স্বার্থে জরুরী - মোঃ আতিকুর রহমান

সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০১৫

ওভেন ও নীটওয়্যার গার্মেন্টস অর্থাৎ তৈরী পোশাক শিল্প হলো বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানী খাত। এই রপ্তানী খাতের প্রায় অর্ধেক ক্রেতাই যুক্তরাষ্ট্রের, যা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশাল বাজার আমরা অর্জন করেছি মূলত: স্বল্পমূল্যে তাদেরকে মানসম্মত পোশাক রপ্তানি করার সক্ষমতা ও তাদেরকে উৎপাদিত পণ্যে অধিক মুনাফা অর্জনের সুযোগ তৈরী করে দেওয়ার মাধ্যমে। মূলত: শ্রমজীবী স্বার্থ রক্ষার চাইতে স্বল্পমজুরীর কারণেই বিশেষ করে উন্নত দেশগুলি এদেশের গার্মেন্টস শিল্পের প্রতি অধিক আকৃষ্ট তা মূলত সবাই জানেন। বিশেষ করে আমাদের অপার সম্ভাবনাময়ি সুবিশাল মানবসম্পদ ও সস্তাশ্রম আমাদের এই পোশাক শিল্পের সাফল্যের সবচেয়ে বড় শক্তি যা আমরা ইতিমধ্যেই অর্জন করতে পেরেছি। আজ আমরা পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছি মূলত আমাদের এই শক্তির জন্যই। বিশ্বের অন্যান্য দেশের চাইতে এতো অল্প সময়ে মধ্যে শিল্পে আমাদের এমন সাফল্য সত্যিই ঈর্ষনীয় এবং অবাক করার মতো, যা ইতিমধ্যেই অনেক দেশকে ভাবিয়ে তুলেছে। ফলে এই শিল্প ঘিরে অনেক শত্রুও সৃষ্টি হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে ও বাহিরে তারা এই শিল্পটিকে ধ্বংসের নানা রকমের নীল নকশায় সর্বদা মত্ত আছে। এইরূপ পরিস্থিতিতে একে অপরকে দোষারোধ না করে এই শিল্পকে বাঁচাতে সকলকে যার যার জায়গা থেকে আরো অধিক সচেতন ও দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করতে হবে। এমনেতেই দেশে শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গার স্বল্পতা, উদ্যোক্তাদের আর্থিক অস্বচ্ছলতা, শিল্পে অবকাঠামোগত দূর্বলতা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ  সংকট এবং বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতার নানা কারণে উক্ত শিল্পটি নানাবিদ চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন হচ্ছে আবার সম্প্রতিক এরসঙ্গে যুক্ত হয়ে মার্কিন প্রশাসনের জিএসপি স্থগিতের ঘোষনা যা শিল্প সংশ্লিষ্টরাসহ সরকারকে উক্ত বিষয়ে ভাবিয়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষনা দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও বিনিয়োগসহ বর্হিবিশ্বে শিল্পে বিরূপ প্রভাব সেইসঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি সংকটে যে কালো মেঘের ঘনঘঠা পরিলক্ষিত হচ্ছে তা উত্তোরণে বিশেষ করে পোশাক আমদানিকারক, শিল্প উদ্যোক্তা, শ্রমিক, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠান, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, মিডিয়া, সুশীলসমাজ, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিরোধীদলসহ সকলে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশ ও জাতির প্রতি দায়বন্ধতা থেকে উক্ত সংকট মোকাবেলায় শিল্প নিয়ে সমালোচনা ও একে অপরকে দোষারোপ না করে বরং কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সেইসঙ্গে বর্হিবিশ্বে এই শিল্পের ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রাখতে এদেশের প্রতিটি নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে। এদেশের শ্রমমান নিয়ে বর্হিবিশ্বে যে ধারনা ইতিমধ্যেই জন্ম হয়েছে তা গোঁচাতে শ্রমিক সংগঠনসহ সকলকে ঐক্যবন্ধ ভাবে সংকট মোকাবেলায় একযোগে কাজ করতে হবে। অন্যথায় এদেশের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

 বর্তমানে সম্ভাবনাময়ি এই শিল্পটিকে ঘিরে দেশ-বিদেশে বেশ কিছুদিন হলো একধরনের অস্থিরতা ও সংকট বিরাজ করছে। বর্হিবিশ্বে এই শিল্পটিকে নিয়ে একধরনের নেতিবাচক প্রচারণা বিশেষ করে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিশেষ কিছু গোষ্ঠীর নানামুখি ষড়যন্ত্র ও মিডিয়ার ঢালাও তথ্য পরিবেশনের ফলে এই শিল্পের ভাবমূর্তি নানা কারণে ক্ষুন্ন হচ্ছে। যা শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয় ইউরোপসহ অন্যান্য দেশেও এর নেতিবাচক প্রভাব পরবে বলে অনেকে ধারনা করছে। যা শিল্পের অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায় বলে মনে করি। বর্তমানে মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পে জিএসপি সুবিধা স্থগিতের যে ঘোষনা দিয়েছে এতে বাংলাদেশের শ্রমমান নিয়ে বিশ্বজুরে দারুণ ভাবমূর্তির সংকট তৈরী করবে, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। এতে বিশেষ করে বিনিয়োগ ও বর্হিবিশ্বে বাণিজ্য সম্প্রসারণ মারাক্তক ভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার শর্তানুয়ায়ি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আমাদের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অগ্রাধিকারমূলক যে বাজার সুবিধা ভোগ করার কথা তা না করে দেশটি কর্তৃক জিএসপি স্থগিতের এই ধরনের একটি ঘোষনা সত্যিই আমাদেরকে মর্মাহত ও ব্যথিত করেছে। এ জাতি হিসেবে আমরা অধিক খুশি হতাম যদি যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা বহাল রেখে এদেশের তৈরী পোশাক কারখানার কাজের পরিবেশ ও শ্রমজীবীদের স্বার্থ সুরক্ষায় পণ্যের উৎপাদন খরচ কিছুটা বৃদ্ধি করে কারখানার শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ উন্নয়ণে সহযোগিতার হাতকে সম্প্রসারণ করতে সক্ষম হতো। এক্ষেত্রে অনেকে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে এদেশের তৈরী পোশাক কারখানার কাজের পরিবেশ ও শ্রমজীবীদের স্বার্থ সুরক্ষায় যে হুশিয়ারি বাণি শোনাচ্ছে এতে পোশাক কারখানার মানোন্নয়নের বিপরিতে হয়তো বা কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিকদের দুঃখদুর্দশা যেমন বাড়বে পাশাপাশি অধিক বেকারত্ব বাড়বে, যোগাযোগ ও ব্যাংকিং খাতসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্রশিল্পগুলি অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সম্প্রতি সিপিবি আয়োজিত ‘কমপ্লায়েন্সের সঙ্গে উদ্যোক্তা যে মূল্যমান পান, তা সঙ্গত কি না’ বিষয়ক এক সেমিনারের তথ্যানুযায়ী দেশের ৩০-৪০ ভাগ বড় ও মাঝারি কারখানার কাজের পরিবেশ এবং নিরাপত্তাও বেশ ভালো। ঐসব ফ্যাক্টরী কমপ্লায়েন্স ফ্যাক্টরী হিসেবে পরিচিত। যদিও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু ছোট ও সাব কন্ট্রাক্টে কাজ করা ফ্যাক্টরীর মধ্যে কিছু গ্যাপ রয়েছে কিন্তু মজার বিষয় যে সব ফ্যাক্টরীতে কমপ্লায়েন্স হিসেবে পরিচিত কিন্তু সেইসব ফ্যাক্টরীর উদ্যোক্তারা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় পোশাকের দাম পাচ্ছে কম, যা কাম্য নয়। এই বিয়য়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী।

A Rahman Baps

সর্বোপরি এই শিল্পে জিএসপি বাতিলের ফলে শিল্পে নারীর ক্ষমতায়নের যে সাফল্য তা চরম ভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। মূলত: মার্কিন প্রশাসন যাদেরকে উদ্দেশ্যে করে এই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে এদেশের সেইসব শ্রমজীবী মানুষগুলির স্বার্থ রক্ষায় তাদের এই উদ্যোগ কতটুকু ফলুপ্রসু হবে, নাকি শ্রমিকদের দুঃখদুর্দশা আরো বাড়বে সেটাই এখন মূলত ভাবনার বিষয়? ইতিমধ্যেই বিজিএমইএ এর নবনির্বাচিত সভাপতি জনাব আতিকুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে ‘যুক্তরাষ্ট্রের এধরনের সিন্ধান্তের সুদূরপ্রসারী কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়লে এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা’ এ ব্যাপারে তিনি তার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তার এই বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের ঘোষনা শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার বিপরিতে শ্রমিকদের দুঃখদুর্দশাকেই অধিক ইঙ্গিত বহন করছে। যা শ্রমজীবী মানুষগুলির জন্য কাম্য হতে পারে না। আমরা আশা করবো দুইদেশের মধ্যে অবাদ বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র এমন সিন্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থেকে বন্ধুন্তের হাতকে আরো সম্প্রসারণ করবে। সেইসঙ্গে জিএসপি সুবিধা বহাল রেখে এদেশের শ্রমজীবীদের স্বার্থ সুরক্ষায় এগিয়ে আসবে এমনটিই উক্ত রাষ্ট্রের কাজে সকলের প্রত্যাশা।

যদিও বর্তমান সরকার শ্রমজীবীবান্ধব। সম্প্রতিক সাভারের রানা প্লাজা ধস ও আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় হাজার শ্রমিকের মৃর্ত্যর মতো ঘটনা যেন আর না দেখতে হয় সেই উদ্দেশ্যে কারখানার মানোন্নয়নে সরকার ও বিজিএমইএ অধিক আন্তরিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যেই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরী প্রদানের সিন্ধান্ত, কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত, ২০০৬ সালের শ্রম আইনের ত্রুটি সংশোধন, কারখানায় শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার প্রদান, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নেতৃত্বে সরকার, মালিক ও শ্রমিকদের সমন্ময়ে ত্রিমুখী চুক্তি সাধন এবং সর্বোপরি পোশাক কারখানার যুগোপযোগি কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে বিশেষ কমিটি গঠনসহ বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যা ইতিবাচক বলে মনে করি। শিল্পে বিরাজমান সংকট মোকাবেলায় বর্তমান সরকার ও বিজিএমইএ যার যার সাধ্য মতে কাজ করে যাচ্ছে যা উক্ত শিল্পের সমস্যা মোকাবেলায় আমাদের মনে নতুন করে আশার সঞ্চয় করেছে। যদিও একথা সত্য দীর্ঘ দিনের পুঞ্জিভূত নানামুখি সমস্যা একেবারে রাতারাতি সমাধান করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সকলে সম্মিলিত ভাবে যদি উক্ত সমস্যাগুলি সমাধানে উদ্যোগী হয় কেবল তখনই সম্ভব উক্ত সংকট সমাধান করা। বর্তমান সরকার শ্রমিকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যখন একের পর এক ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে ঠিক এমন সময় মার্কিন প্রশাসনের তরফ থেকে এমন একটি বার্তা এজাতিকে চরম হতাশ করেছে। সম্প্রতিক জাপানের টোকিওতে বাংলাদেশের পোশাক খাতে সর্মথন অব্যাহত রাখার বিষয় নিয়ে পোশাক আমদানিকারক শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিবার্হীদের নিয়ে যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বৈঠকে আমদানিকারকরা বাংলাদেশের পোশাক খাতে তাঁদের সমর্থন অব্যাহত রাখার ব্যাপারে নীতিগত সিন্ধান্ত গ্রহণ ও অঙ্গীকার করেন। সেইসঙ্গে উক্ত সংকট কাটিয়ে উঠতে তারা নানা ধরনের আর্থিক সাহায্য সহযোগিতারও আশ্বাস দিয়ে যা ইতিবাচক। এইরূপ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সম্প্রতিক এই বার্তা মূলত দুইদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাঝে ফাটল ধরাবে বলে অনেকে ধারনা করছে। যা কাম্য হতে পারে না। আমরা আশা করবো সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ একে অপরের ঘাড়ে দোষ না চাপিয়ে কিভাবে উক্ত সংকট নিরশন করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে উক্ত সুবিধা বহাল রাখা যায় সেই লক্ষ্যে আরো অধিক মনোনিবেশ করবে। অনুরূপ ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে তাদের এই সিন্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে এদেশের পোশাক শিল্পকে আরো অধিক টেকসই করতে গঠনমূলক ভুমিকা পালন করবে। বর্তমান সংকট উত্তোরণ এবং এই শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সকলকে আরো অধিক ফলপ্রসূ ও কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সকলকে মনে রাখতে হবে এই শিল্পে ধস নামলে তা হবে দেশ, জাতি ও দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ। দেশে এধরনের বিপর্যয় আসুক এটা কারে কাছে কখনই কাম্য হতে পারে না। তাই যখন কোন ঘটনা ঘটে তখন ঐ ঘটনাকে নিতে তৎপর না থেকে গুরুত্ব বুঝে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে উক্ত সমস্যাগুলি সমাধানে সকলকে সচেষ্ট হতে হবে। যে কোন ভুলের ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে এবং নিজেদেরকে শুদ্ধি বা সংশোধন করতে হবে। তা যদি আমরা করতে না পারি তবে তার পরিনতি হবে সত্যিকারের ভয়াবহ ও বিভীষিকাময়।

মূলত: দেশের স্বার্থে, গামেন্টস কারখানার লাখ লাখ শ্রমজীবী হতদরিদ্র্য মানুষগুলির পরিবারের স্বার্থে যেকোন উপায়ে এই পোশাক শিল্পকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তাই যতদ্রুত সম্ভব শিল্পে উল্লেখিত প্রতিবন্ধকতা গুলি দুর করতে হবে। এই শিল্পকে ঘিড়ে কোন প্রকার ষড়যন্ত্র হলে সকলে মিলে তা রুখতে হবে। বর্হিবিশ্বে এই শিল্পকে ঘিড়ে বর্তমানে যে গুনজন চলছে তা যথাযথ দক্ষতা ও বিচক্ষনতার সাথে মোকাবেলা করতে হবে। বর্হিবিশ্বের সঙ্গে আমাদের ক’টনৈতিক তৎপরতা আরো জোড়দার করতে হবে। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে বিশ্বমন্দার সময় সম্ভবনাময়ি এই পোশাক শিল্পটি আমাদের দেশের অর্থনীতিকে মজবুত ভীতের ওপর দাঁড় করাতে এবং প্রবৃদ্ধি আনায়নে যে বিশেষ ভুমিকা পালন করেছে তা যেন কিছু ভুলের কারণে বিনষ্ট না হয়। সে ব্যাপারে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাকে এখন সকলের মুল কাজ মনে করছি। আশা করি এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই একযোগে উক্ত সমস্যাগুলি সমাধানে অধিক সচেষ্ট হবেন। যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধা বহাল রাখতে শ্রমিকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলির দিকে মালিকদের অধিক নজর দিতে হবে এব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতার হাতকে আরো প্রসারিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা, পেশাগত নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, নূর্ন্যতম মজুরি প্রদান এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া পথ সুগম করতে হবে। মিড লেভেল অফিসারদেরকে শ্রমবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে, মালিকদেরকে সার্বক্ষনিক তত্ত্বাবধায়কের ভুমিকা নিয়ে শ্রমিকদের খোঁজ খবর নেওয়ার পাশাপাশি তাদের ভাল-মন্দের বিষয়গুলির সঙ্গে নিজেকে সংম্পৃক্ত করতে হবে। শ্রমিক ভাল থাকলে মালিক ভাল থাকবো এই ভাবনা বোধ প্রতিটি মালিকের মধ্যে সৃষ্টি করতে হবে। অনুরুপ ভাবে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক মঙ্গলে শ্রমিকদেরকেরও আতœনিয়োগ করতে হবে। কারখানায় যেকোন ধরনের বৈরী পরিস্থিতিতে ধৈর্য্য ও শান্তিপূর্ণ ভাবে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় শ্রমিকদের কাজ করতে হবে। দুস্কৃতিকারীদের প্ররোচনায় রাজপথ অবরোধ, প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও জনগণের জান-মালের ক্ষয় ক্ষতি সাধন ও বর্হিবিশ্বে এই শিল্পের ভাবমূর্তি নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তথ্য প্রচারে সংশ্লিষ্ট সকলকে আরো অধিক দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করতে হবে। নিজের দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় এমন তথ্য পরিবেশন থেকে বিরত থাকতে হবে। সমষ্ঠিগত ভাবে শিল্পের মান উন্নয়নে শিল্পে মালিক, শ্রমিক ও সরকার উভয়কেই একযোগে কাজ করতে হবে। শুধু শ্রমিকদের একার আতœত্যাগে শিল্পে সমৃদ্ধির সোপন তৈরী করা যাবে না। কারখানায় শ্রমিকরা যেন আনন্দঘন পরিবেশে নিরাবিচ্ছিন্ন উৎপাদন কাজ করতে পারে এর জন্য শ্রমিকদের যা যা প্রয়োজন তা নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। শ্রমজীবী মানুষগুলির স্বার্থে মালিকদেরকে সপ্তাহে অন্তত: একদিন হলেও সশরীরে কারখানা তদারকি করতে হবে। সময়মত শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি পরিশোধ করতে হবে, শ্রমিকদের অন্তত: দুবেলা পেটপুরে খাবার জন্য উপযুক্ত মজুরি নির্ধারন করতে হবে। শ্রমআইন অনুযায়ী যথাযথ কারখানা পরিচালনা করতে হবে। যেহেতু নিরাপদ কর্মপরিবেশ আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের অনুষঙ্গ। তাই শ্রমিক অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক শ্রমমানের উপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। যদিও এ লক্ষ্যে সরকার শ্রম আইনের যুগোপোযোগী করণ, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিল গঠন, ব্যক্তিমালিকানাধীন সড়ক পরিবহন শ্রমিক কল্যাণ বোর্ড গঠন, শ্রম আদালত পুর্ণগঠন, জাতীয় ও শিশু শ্রমনীতি,পেশাগত স্বাস্থ্য ও সার্বিক নিরাপত্তার নীতি প্রনয়নের নানাবিধ কাজ করে যাচ্ছে। এখন শুধু প্রয়োজন মালিকদের অধিক সদিচ্ছ