Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

বাঙলা ভাষার পুঁথি = জুলি রহমান

শনিবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

ষোলো বছরের বেলাল বেগকে জানাই তিরাশি কোটি সালাম।
তাঁর নামে ভাষা আন্দোলনের বয়ান শুরু করিলাম।
আহা বেশ বেশ। অ আহা বেশ বেশ।
ওরে অ মন্টু ভাই ধরি পায় আর নাড়াসনে বুদ্ধি মাথার গনা-গাঁথা কেশ।
শোনো শোনো আদনান ভাই!
এক খাইল্লা ঠিল্লার গল্প বইল্লা যাই।
আ আ আ হা হা হা হা
কেমনে পেলাম অ আর আ?
ওরে বোন ও মনিজা ;তুই যে আমার কলিজা।
আমি জুলি নগন্যা  ;সেই আজিজা।
ও তোর ডাগর চোখের কাজল ধুয়ে ডাকিসনা-রে  বান।
বাঙ্গাল কথা শোনার জন্য করি আহবান!
কচুর পাতায় জলের ফোটা যেমন টলোমলো।
বঙ্গ ভংগের তালে আইন ছিলো এলোমেলো।
এবার চলো আসল কথায় যাই।
বাঙলা ভাষার ইতি কথা সকলকে জানাই।

আরে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকবে কারা করলো উত্তোলন?
বাঙলা ভাষা কবে এলো কেমনে এলো সেই কথাটাই বলি।
বাংলা সবার প্রাণের ভাষা মারেন হাতে তালি।
alt
সাতচল্লিশ সালে ভারত ভাগে পাকিস্তান ভাষার।
এখানে অবস্থানটা দেখাই একবার।
চৌধুরী খালেকুজ্জামান নবাব লিয়াকত আলী খান!
ভাষার বুকে রিফিউজি যেনো উর্দুপাকিস্তান।
তখন চুয়ান্ন লক্ষ উর্দুভাষী ছিলো ছিলো মোহাজের।
করাচী আর হায়েদ্রাবাদে পশতু বেলুচের।
জিন্নাহ রত্না দীনা বাঈ মোম্বাই গুজরাট।
আরে রুমির টুপি মাথায় দিয়া ঘটাইলো বিভ্রাট।


উর্দু নয়রে নিজের ভাষা তবু উর্দুর জন্য টান।
বাঙালীর বাঙলা ভাষা ভেঙে করতে চায় খান খান।
ডঃ শহীদ সলিমুল্লাহ ভেবে হয়রান।
পূর্ব বাঙলার ছাত্র সমাজ শক্ত নওজোয়ান।
ঢাকায় প্রগতি লেখক শিল্পী সংঘের বসলো যে বৈঠক।

স্বাস্থমন্ত্রী হাবিবুল্লাহর মনের কথা বোঝা ভার।
আরে গোমড়া মুখের খ্যামড়া তোলে চায় চারিধার।
খাজা নাজিমুদ্দীন ভেবে কয়
উর্দু হবে রাষ্ট্রভাষা এর বিকল্প নয়।
তখন গোল টেবিল বৈঠক বসে
বুদ্ধিজীবি গন অংক কষে।
দিন গলে রাত হয় রাত গলে দিন।
বাঙলা ভাষার আয়ু যেনো হয়ে আসে ক্ষীণ।

বাঙলার বাঘ শেরে বাঙলা তেড়ে ওঠেন তাই!
তাঁরই সংগে কন্ঠ মিলান ভাষানী ভাই।
রাজপথে মিছিল নামে ।
পুলিশ থাকে তারই বামে।
ডাঃ মোঃশামসুদ্দুহা বাঙলার প্রথম বুদ্ধিজীবি।
নিজের প্রাণটা বিলিয়ে দিয়ে ফোটায় বাঙলার ছবি।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র দলে শ্লোগান তোলে।
বাঙলা মোদের প্রাণের ভাষা বাঁচবো মুখের বোলে।
সালাম বরকত রাস্তায় নামে।
রফিক শফিক কেউ রইলো না ধরাধামে।
শত্রুদের বাড়ে মনে দ্বেষ।
সন্তান হারা মায়ে কাঁদে ছড়িয়ে কেশ।


ঝরায় রক্ত বাড়ায় ভক্ত বাঙলার সন্তান।
জিরো পয়েন্ট টা হয়ে গেলো নিঠুর কবরস্থান।
ঘটনাটা ঘটে গেলো বায়ান্ন সালে।
এই রক্তঝরা দিনটিকে একুশে ফেব্রুয়ারী বলে।
নতুন প্রজন্মের কাছে করি নিবেদন।
এই দিনটির রাখিও সন্মান।
মনে রেখো খেলার মাঠে দূর্বাদলে পায়ে পায়ে জড়িয়ে ধরে।
খেলার সাথী নাইরে।
কতো রক্তে গড়াগড়ি ঢাকারই শহর।
কতো মায়ে সন্তান হারা কাঁদে তাদের অন্তর।
সেই বাঙলাকে বাঙলার মানুষ ভালোবাসো ভাই।
এই কামনায় আমি জুলি ইতি টানতে চাই-।

২১শে ফেব্রুয়ারীর জন্য।১লা ফেব্রুয়ারী ২০১৭ইং নিউইর্য়ক-


একুশের চেতনা - জুলি রহমান

শনিবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

একুশ আমাদের শেকড়।যার হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে হেঁটে হেঁটে পেয়েছি স্বাধীনতা।দু শো বছরের গোলামীর কারাগার ভেঙে পেয়েছিলাম  অবাধ সাঁতার।গাঙচিল শংখ্খ চিলে উড়া আকাশ আর সূর্য্য আভার নয়া ভোর।তাই একুশই আমাদের প্রথম চিৎকার।বাঙালী জাতিকে অনুপ্রানিত করার পূর্ব শর্ত ।সাহস একুশ।তাই অনুরোধ একুশকে পোশাকী না করে অতি সাচ্চা নিয়মে
আমাদের প্রাণের ভেতরে এর আসন পেতে দেওয়া।বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।কতো রক্ত ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে পাওয়া এই  একুশ।

একুশে ফেব্রুয়ারী মাতৃভাষা দিবস প্রতি বছর অতি নিষ্ঠার সাথে পালিত হচ্ছে।ইউনেস্কো এই দিনটিকে বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।পৃথিবীর ইতিহাসে এই বৃহৎ কর্মটি করেছে একটা জাতি তা হলো আমরা এই বাঙালী জাতি।বাঙালী ও বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে অত্যান্ত গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা এবং একটা সংবেদনশীল;একটা দিবস হিসাবে একুশ উদ্যাপিত হয় হচ্ছে।

Picture

গেলো বছর জাতিসংঘের মূল চত্বরে
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সন্মানে একটি ভাস্কর্য স্থাপিত হয়।তাতে বাঙলা অক্ষর দেয়া হয়।
এই মার্কিন মুল্লুকের বাঙালী তথা
ভাষাপ্রেমী বাঙালীকঠিন শীতকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন সময়ে ছবি তুলেছেন মনের সুখে।
একটা সুখের সংবাদ বাংলা ভাষাকে
জাতি সংঘের অন্যতম একটি দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে গৃহিত হওয়ার জন্য বাংলাদেশের মাননীয় পররাস্ট্র মন্ত্রী জাতি সংঘের সব কটি দেশের
পররাস্ট্র মন্ত্রীকে আবেদন করেছেন।বাংলা ভাষাকে বিশ্বের অন্যতম ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলছে ।আমরা যারা প্রবাসে ছড়াই বাংলার শব্দবীজ ।তাদের কথা অবশ্যই বলতে হবে ।আমরা শব্দ চাষা গড়ি বাংলা।করি লালন বাংলায় ফোটাই কবিতার
খই। এই প্রবাসে চল্ছে বাঙলা চর্চা তুখর গতিতে।প্রয়াত কবি শহীদ কাদরী র একটি কবিতা সন্ধা।নীরা পরিচালিত এই কবিতা সন্ধা বিভূঁই ভূমিতে সাহিত্যকে করেছে আরো সম্নৃদ্ধি।এছাড়াও মাসিক সংগঠন গুলোতে প্রবাসী লেখক কবি শিল্পী বাচিক শিল্পী গন তাদের মেধা মননকে প্রতিনিয়তই শান দিচছে।যেমন সাহিত্য
একাডেমী, গাংচিল,স্বদেশ ফোরাম, বহুবচন,সাজুফতা ও উনোবাঙ্গাল ইত্যাদি।এখানে কয়েকজন কবির কবিতার উদ্ধৃতি দিচ্ছি-

কবি শহীদ কাদরী
হে নবীনা, এই মধ্য ম্যানহাটনে বাতাসের ঝাপটায়
তোমার হঠাৎ খুলে যাওয়া উদ্দাম চুল
আমার বুকের পর আছড়ে পড়লো।

শামসাল মমীন
বন্ধুরা জীবন একঘেঁয়ে;এ কথা বলো না।
এখনো আকাশে রঙ বদলায়,সমুদ্র উজ্জ্বল ভালোবাসা দিয়ে ঢেউ তোলে--

ফকির ইলিয়াস-
একদা পরিব্রাজক হয়ে পরিভ্রমন করবো তোমার নগরী সে আশায়
তাকিয়েছিলাম বৃষ্টির কৃতিত্বের দিকে।
ভাষার আয়নায় লিখেছিলাম সোনালী আলোর রেশম।

তমিজ উদ্দীন লোদী
একাকিত্বের  একটি ভাষা আছে।
এ ভাষা আমি রপ্ত করেছিলাম শৈশবে
বৃক্ষ লতাগুল্ম ও ঝোপের ভেতর থেকে
রোদ্দোরে ও চন্দ্রিমায় এক অজানা শব্দের ঘ্রাণ উঠে আসতো।

জুলি রহমান-
রাত্রির মৌনতা ভেঙে চলেছো তুমি সাথে সবুজ সকাল
উদ্বেল কথার মালায়
গেঁথে যাও দুধেল শব্দ
অথচ ঘ্রাণটা ত্রুমাগত
ঘন হয়ে উঠার বিষয়
যেমন বর্ণের চিতই বাষ্প কেবল-

হাসান আল আব্দুল্লাহ

আকাশ কাঁপানো শব্দ ওঠে ব।
সম্মিলিত আওয়াজ আসে হ হ হ
আপনি কইছেন বায়ান্ন
কর্তা হাসেন ,ঠিকই ধরছ

সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী

শহীদ মিনার গেলে সবার
আকুল হয় যে মন,
সব শহীদের মান রাখতে
করছে সবাই পণ।

সংস্কৃতির পৃষ্টপোষক স্যার মমতাজউদ্দীন আহমদ
কাজ করে গ্যাছেন স্যার মমতাজ উদ্দীন ।বলেছেন-
ভাষার শহীদরা স্বাধীনতার যোদ্ধারা রক্তের দরিয়ায় স্নাত হয়ে তাকিয়ে আছে প্রিয় বাঙলার দিকে।তাই ভাষার শহীদ আর স্বাধীনতার শহীদকে একসাথে বুকে নিয়ে মিনার স্থাপিত করবো।এই প্রবাসে।

প্রবাসে শেকড় গেড়েছে বাঙলা ভাষা।
আর তো কোনো দুঃখ নাই।লক্ষলক্ষ বাঙালীর সন্তান নতুন প্রজন্ম কবিতা পড়ছে লিখছে।নাচে গানে নাটকে অংশ নিচ্ছে।আবৃত্তি করছে কবিতা।বাচিক শিল্পীগন সন্মানিত এই প্রবাসে ।কবিদের ফুটিয়ে তুলছেন নিরলস প্রচেষ্টায়।বাঙলাতেই ।জি এইচ আর্জু,শ্যামন্তী ওয়াহেদ।মুমু আনসারী,গোপন সাহা , মিজান, ক্লারা রোজারিও,আরো অনেকই বাংলা যেনো এদের ষাস্টাংগে শেকড় পুতেছে। তেমনি গানের প্রথিত যশা শিল্পী শাহ মাহবুব,তাহমীনা শহীদ, খায়রুল ইসলাম সবুজ।সাঈদা নাসরীন চৌধুরী,তাজুল ইমাম।গুরু মোত্তালিব বিশ্বাস।সেলিমা আশরাফ।কাবেরী দাস।আরো অনেকে।

এই প্রবাসে আমরা ধনে ধান্যে পরিপূর্ণ তাই পাশে পেয়েছি এমন ই একজন পূজনীয় ব্যাক্তিত্ব।মিডি মিউজিক স্বনাম ধন্য গীতিকার সুরকার নাদিম আহমদ।যিনি সুরকে শব্দকে কন্ঠে ধারন করিয়ে বইয়ে দেন আনন্দের ফল্গু ধারা।
আরো একজনের নাম না নিলে আমি অকৃতজ্ঞ থাকবো গীতিকার সুরকার
হারুন সাহেব।
এই প্রবাসে বাঙলা পত্রিকা গুলোর নাম না নিলে সম্পূর্ণ রুপে অসমাপ্ত থেকে যাবে সকল কথার কথা।এই পত্রিকার অবদান লেখক কবি সামাজিক রাজনৈনিত সকল ক্ষেত্রে সমান ভূমিকা রাখছে।কোনো একটা দিকেও বাঙলা অপূর্ণ নয় প্রবাসে।বাঙলা পত্রিকা আবু তাহের।ঠিকানায় জনাব ফজলুর রহমান ,শাহীন,বাঙালীতে কৌশিক সাহেব বর্ণমালায় মাহফুজ।আজকাল সহ আরো বহু পত্রিকা মনের যোগান দিয়ে যাচ্ছে।শুধু তাই নয়।এই সুদূর মার্কিন মুল্লুকে প্রতি বছর বই মেলার আয়োজন করেন সকলের প্রিয় বিশ্বজিৎ।তিন দিনের এই আয়োজনে বিশাল বাঙলার প্রান্তরে উপনীত হয় এই প্রবাস মাটি।কানায় কানায় পূর্ণ সোঁদাগন্ধময়।

উপসংহারে এটাই বলবো যে উত্তর গ্রাসী শাসক গোষ্ঠী বাঙলা ভাষা নিধনে স্বত্রুিয় হয়ে ওঠেছিলো সেই বেনীয়াদের ঘায়েল করতে সক্ষম হয়েছে বাঙালী জাতি।তাই সুদূর প্রবাস নিবাস বলে কোন কিছু নেই।বাঙালী চাঁদে গেলেও বাংলাকে সাথে নিয়ে যাবে।কারন বিশ্বব্যাপী বাংলা এবং বাঙালী।একুশের চেতনায় উদ্বোদ্ধ হয়েই একসাথে পা ফেলে হাঁটছেন এবং হাঁটবেন।বাঙালীর প্রতিদিনের জীবন চেতনায় একুশ গেড়েছে আসন।


ন্যায়কণ্ঠ বিতর্কমুক্ত থাকুক সার্চ কমিটি

শনিবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর নির্বাচন কমিশন একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যূন চারজন নির্বাচন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগদান বিষয়ে সংবিধানে সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ রয়েছে, এতদবিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি নিয়োগদান করবেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৫ বছর অতিবাহিত হলেও অদ্যাবধি নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক পদগুলোয় নিয়োগদান বিষয়ে কোনো আইন প্রণীত হয়নি। বর্তমানে যে নির্বাচন কমিশনটি কার্যকর রয়েছে এটি একাদশ নির্বাচন কমিশন। এটির কার্যকাল ফেব্রুয়ারিতে সমাপ্ত হবে। একটি নির্বাচন কমিশনের কার্যকাল শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পুনঃনিয়োগ বারিত হলেও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারের প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ বারিত নয়।

বর্তমান একাদশ নির্বাচন কমিশন গঠনের সময় দেখা গেছে, গঠন-পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে সাংবিধানিক পদধারী চার ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি সার্চ বা বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই বাছাই কমিটিতে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারক সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। সদস্য হিসেবে ছিলেন সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং সরকারি কর্ম কমিশনের সভাপতি। দ্বাদশ নির্বাচন কমিশন গঠনের উদ্দেশ্যে একাদশ নির্বাচন কমিশনের মতো সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগেকার সার্চ কমিটির সঙ্গে এটির পার্থক্য হল, এটিতে সদস্য হিসেবে অতিরিক্ত দু’জনের স্থান মিলেছে। তারা দু’জনই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাদের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অপরজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। বর্তমান কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব যিনি পেয়েছেন তিনি আগেকার কমিটিরও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান কমিটির অপর তিন সদস্যের পদবি আগেকার কমিটির অনুরূপ হলেও ব্যক্তি হিসেবে তারা ভিন্ন।

আমাদের বর্তমান সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় সরকারের সব নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর ওপর ন্যস্ত। এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধানরূপে রাষ্ট্রের অন্যসব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করলেও প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি এ দুটি পদের নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতি তার অন্যসব দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সমাধা করে থাকেন। এ দুটি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির পক্ষে স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই।

একাদশ নির্বাচন কমিশন ও বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক যে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে, আমাদের সংবিধান বা অন্য কোনো আইনে অনুরূপ সার্চ কমিটির উল্লেখ নেই। এ বাস্তবতায় এ ধরনের সার্চ কমিটির আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গঠিত বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতির পক্ষে এ ধরনের সার্চ কমিটি গঠনের সুযোগ নেই।

বর্তমান সার্চ কমিটি গঠন বিষয়ে বঙ্গভবন, আইন মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র উল্লেখ করে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, ২৫ জানুয়ারি সকালে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে এক নারী প্রতিনিধিসহ ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে চিঠি পাঠায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়। বঙ্গভবনের চিঠি পাওয়ার পর নাম নির্ধারণ এবং এটি গেজেট আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বিষয়টি নিয়ে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এরপর তারা দু’জন প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎপূর্বক তার সঙ্গে আধঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রধান বিচারপতি কর্তৃক সার্চ কমিটির প্রধান ও সদস্য হিসেবে দু’জন বিচারককে মনোনয়ন দেয়ার পর পূর্ণাঙ্গ সার্চ কমিটি গঠন করা হয়, যার প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সার্চ কমিটি গঠনের আগে একটি সারসংক্ষেপ পাঠানো হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর সেটি আবার পাঠানো হয় রাষ্ট্রপতির কাছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। উপরোক্ত সামগ্রিক প্রক্রিয়া অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, সার্চ কমিটিতে যারা অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির যে সাংবিধানিক অবস্থান তা যথারীতি প্রতিপালিত হয়েছে।

বর্তমান সার্চ কমিটিও ধারণা করা যায় আগেকার সার্চ কমিটির মতো প্রতিটি পদের বিপরীতে দুটি করে নামের সুপারিশ রাষ্ট্রপতি বরাবর প্রেরণ করবে। আগেকার সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে যে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল, তা এ পর্যন্ত গঠিত নির্বাচন কমিশনগুলোর মধ্যে সর্বাধিক বিতর্কিত ও সমালোচিত। সার্চ কমিটির পক্ষে দলীয় মতাদর্শী ও সুবিধাভোগী নয় এমন সৎ, দক্ষ, যোগ্য, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং বাস্তবিক অর্থেই নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে সুপারিশ প্রদান সম্ভব। এমন ব্যক্তির সংখ্যা আমাদের দেশে অপর্যাপ্ত নয়। তাদের খুঁজে বের করতে যা দরকার তা হল, নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে দৃষ্টি প্রসারিত করে দলীয় মতাদর্শী, দলীয় সুবিধাভোগী ও দুর্নীতিগ্রস্তদের বিবেচনায় না নিয়ে সৎ, দক্ষ, যোগ্য ও ব্যক্তিত্বসম্পন্নদের সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত করে রাষ্ট্রপতি বরাবর প্রেরণ। স্বভাবতই প্রশ্নের উদয় হতে পারে, দলীয় সুবিধাভোগী ও দলীয় মতাদর্শী কারা? এ বিষয়ে বিজ্ঞজনের সুচিন্তিত মত হল, অবসরের পর বিশেষ বিবেচনায় যারা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দফতর ও সংস্থায় চুক্তিভিত্তিক বা মেয়াদি পদে নিয়োগ লাভ করেছেন তারা হলেন দলীয় সুবিধাভোগী আর যাদের জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দফতর ও সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে তারা দলীয় মতাদর্শী। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় সরকারের আমলেই এ ধরনের অগণিত কর্মকর্তা মেধা, দক্ষতা, সততা ও যোগ্যতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও অতিমূল্যায়িত হয়ে পুরস্কৃত হয়েছেন। তাদের কাছে দেশ ও জাতির স্বার্থের চেয়ে নিজের স্বার্থ অনেক বড়। এ ধরনের ব্যক্তিরা এর আগে জাতিকে কখনও ভালো কিছু দিতে পারেননি। আর ভবিষ্যতেও যে দিতে পারবেন না, এ বিষয়ে সচেতন দেশবাসীর মনে কোনো সংশয় নেই।

এ প্রশ্নে কোনো বিতর্ক নেই যে, সার্চ কমিটি কর্তৃক রাষ্ট্রপতি বরাবর প্রতিটি পদের বিপরীতে যে দুটি নামের সুপারিশ যাবে তার একটির পক্ষে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির কাছে তার পরামর্শ ব্যক্ত করবেন। সার্চ কমিটি প্রেরিত সুপারিশে প্রকৃত অর্থেই দলীয় সুবিধাভোগী ও মতাদর্শী নয় এমন ব্যক্তির ঠাঁই হলে আশা করা যায়, জাতি এমন একটি নির্বাচন কমিশন পাবে যেখানে সৎ, দক্ষ, যোগ্য ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমাবেশ ঘটবে। অতীতে সার্চ কমিটি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছে কিনা, তা বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি অনুধাবনের মধ্য দিয়েই দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট। সার্চ কমিটির আন্তরিকতা ও নিরপেক্ষতা নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের সুপারিশের মধ্যে এমন নামের অন্তর্ভুক্তি ঘটাতে পারে, যা সার্বিক বিবেচনায় কমিশনকে যে কোনো ধরনের দলীয় আবরণের দায় থেকে মুক্ত রাখবে।

আমাদের দেশে এর আগে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনে যেমন সরকারি দল জয়ী হয়েছে, অনুরূপ দলীয় সরকারের অধীনে গঠিত নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সরকারি দলের বিজয় হয়েছে। অপরদিকে কর্মরত প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন অস্থায়ী সরকার, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিরোধী দলের বিজয় লাভ ঘটেছে। উপরোক্ত সরকারগুলো ক্ষমতাসীন থাকার সময় একটি মাত্র ক্ষেত্র অর্থাৎ অষ্টম নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন কর্মরত নির্বাচন কমিশন ছাড়া দলীয় সরকার কর্তৃক গঠিত অপর সব নির্বাচন কমিশনকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। অষ্টম সংসদ নির্বাচনকালীন যে নির্বাচন কমিশন কর্মরত ছিল সেটি সপ্তম সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক গঠিত হয়েছিল। ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক গঠিত নির্বাচন কমিশনের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারার পেছনের মূল কারণ হল, সে সময় কর্মরত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করেনি।

সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী একাদশ সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হবে। একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন দ্বাদশ নির্বাচন কমিশন কর্মরত থাকবে। স্বভাবতই এ নির্বাচন কমিশনে দলীয় সুবিধাভোগী ও দলীয় মতাদর্শী ব্যক্তিদের ঠাঁই হলে নির্বাচনী ফল কী হবে, তা দেশের সচেতন মানুষ অনুধাবন করতে সক্ষম। আর এ কারণেই দ্বাদশ নির্বাচন কমিশনে নিরপেক্ষ, সৎ, দক্ষ, যোগ্য ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি জরুরি।

দশম সংসদ নির্বাচন ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের মতো একতরফা, ভোটারবিহীন ও সহিংস ছিল। উভয় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এ দুটি নির্বাচনের মধ্যে পার্থক্য হল, প্রথমোক্তটি অনুষ্ঠানের পর যে সংসদ গঠিত হয়েছিল তা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিল পাস করার ফলে অবলুপ্তির মধ্য দিয়ে সে সরকারের বিদায় ঘটে; পক্ষান্তরে শেষোক্তটি অনুষ্ঠানের পর একই সরকার বহাল রয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান প্রবর্তিত হয়; অপরদিকে ২০১৩ সালে ক্ষমতাসীন সরকার একতরফাভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অবসান ঘটায়।

১৯৯০-পরবর্তী দেশে পর্যায়ক্রমে বড় দুটি দল সরকার পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে আসছে। দশম সংসদ নির্বাচন একতরফা হলেও আশা করা যায়, একাদশ সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে। একাদশ সংসদ নির্বাচন কতটুকু অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হবে, তা বহুলাংশে নির্ভর করছে এ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন কর্মরত নির্বাচন কমিশনের ওপর। এ কমিশন গঠন বিষয়ে এরই মধ্যে সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে নিবন্ধিত দলগুলো থেকে সম্ভাব্য কমিশনারদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। নিবন্ধিত দলগুলো এরই মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে সার্চ কমিটির কাছে তালিকা হস্তান্তর করেছে। বড় দুটি দলসহ বিভিন্ন দলের তালিকায় কাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, এ বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও এর সত্যতা নিয়ে বড় দুই দল এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে কিছুই বলা হয়নি। প্রকাশিত নামগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের সবাই যে সৎ, দক্ষ, যোগ্য, নিরপেক্ষ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এমনটি জোর দিয়ে বলা যাবে না। আর তাই এদের মধ্যে প্রকৃত অর্থেই কারা সৎ, দক্ষ, যোগ্য, নিরপেক্ষ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এটি নির্ধারণের দায়িত্ব অবশ্যই সার্চ কমিটিকে পালন করতে হবে। এ দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের শৈথিল্য আগামী অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কর্তৃক সুপারিশকৃত নয় এমন ব্যক্তির নাম কাক্সিক্ষত যোগ্যতাসম্পন্ন বিবেচনায় সুপারিশে অন্তর্ভুক্তি সার্চ কমিটির জন্য বারিত নয়। সার্চ কমিটি কী পন্থা ও পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কমিশনে নিয়োগের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি বরাবর তালিকা সংবলিত সুপারিশ প্রেরণ করবে, তা তাদের একান্ত নিজস্ব বিষয় হলেও এর স্বচ্ছতা নিয়ে যেন কোনো প্রশ্ন না ওঠে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদের ওপরই ন্যস্ত।

সার্চ কমিটির সুপারিশের মাধ্যমে গঠিতব্য নির্বাচন কমিশনটি নিয়ে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে তা শুধু কমিশন নয়, সার্চ কমিটি নিয়েও বিতর্কের জন্ম দেবে। আর এ ধরনের বিতর্ক যে আমাদের জন্য অবমাননাকরভাবে বহুজাতিক সংস্থার নেতৃত্বে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ প্রশস্ত করবে- অন্তত এ সত্যটি উপলব্ধি করে সংশ্লিষ্ট সবাই দায়িত্বশীল আচরণ করবেন, এটিই আজ দেশবাসীর প্রত্যাশা।

ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক


বইমেলায় পলাশ মাহবুবের ৭ নতুন বই

শনিবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

আয়েশ আক্তার রুবি,আমেনা আক্তার নিপা.বাপসনিঊজ:অমর একুশে বইমেলায় লেখক, নাট্যকার পলাশ মাহবুবের বেশ কিছু নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। নতুন বইয়ের মধ্যে আছে মজার কিশোর উপন্যাস ‘লজিক লাবু’। এটি প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী। এছাড়া পলাশ মাহবুবের জনপ্রিয় কিশোর অ্যাডভেঞ্চার সিরিজ টো টো কোম্পানি’র সপ্তম উপন্যাস ‘টো টো কোম্পানি ও বীরপ্রতীকের মেডেল’ বরাবরের মতো প্রকাশিত হয়েছে অন্বেষা থেকে।

http://www.mujibsenanews.com/uploads/images/1486806908_89.jpg" alt="">
অন্যপ্রকাশ থেকে আসছে ছোটদের গল্পের বই ‘সূর্যমুখিরা দুইবোন’। পাঞ্জেরী থেকে আসবে আরও দুটি বই। কিশোর গল্পের বই ‘তালা’ এবং ছড়াগ্রন্থ ‘থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে’। তাম্রলিপি প্রকাশ করছে বড়দের গল্পের বই ‘রোমিওপ্যাথি’। অনিন্দ্য প্রকাশন থেকে মেলায় এসেছে পলাশ মাহবুবের জনপ্রিয় প্রেমাণুকাব্য সিরিজের দ্বিতীয় বই ‘প্রেমাণুকাব্য-২’। পাশাপাশি ১৫ বছর আগে প্রকাশিত প্রেমাণুকাব্য-১ বইটিও পুনঃমুদ্রণ করেছে অনিন্দ্য প্রকাশন। খবর বাপসনিঊজ:

এছাড়া কিশোর উপন্যাস ‘পিটি রতন সিটি খোকন’ নতুনভাবে আসবে পাঞ্জেরী থেকে এবং কিশোর গল্পগ্রন্থ ‘বই খুললেই ভুত’ পুনঃমুদ্রিত হচ্ছে অনিন্দ্য প্রকাশন থেকে।


বানু রতনের বর্ণমালা = জুলি রহমান

বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

ষোলতে পা রাখলো  বানু যখন
একুশে রতন পড়লো তখন
চাপিল নগরীতে কলমাই নদীর চড়
কৈশোর কাটে তাদের বালুচড়ে বেঁধে খেলাঘর-

তিলেক না দরশনে ব্যাকুল দুইজনে
অন্ধ্য নয়ন যেনো এই ভূবনে
এমন যখন তাদের মনের গতি
ছাড়তে হলো গাও রতনের ছেড়ে প্রীতি

কলমাই নদী ভরা যৌবনা উছলায় দু কূল
দক্ষিনা পাগল করা নাড়ায় কাশের ফুল
নোলক পরা বধূ যেনো উড়ায় শাড়ির আঁচল
গো-ধূলি লগনে আকাশে জড়ায় মায়ার কাজল-

সলিমাবাদ আসে ধেয়ে নিতে রতন কে
কলমাইর বুক ভেঙে ঢেউয়ের তবকে তবকে
জল যেমন করে দুভাগ সলিমাবাদের গাও
বানুর হৃদয় তেমন ভাঙে বিচছেদের বাও-

রতন ছাড়ে ঘর মা বোন বানুকে করে পর।
বানুর চোখেতে রাতের আঁধার করে ভর।
প্রিয় তাঁর ছাড়ে ঘর নিতে উচ্চ শিক্ষা
যাবে সে ঢাকা কলেজে নিতে দীক্ষা-

বানুর হয়নি শেষ স্কুল জীবন
রতন বিহনে তাঁর যে আসে মরন
দেখতে দেখতে রতন বিশ্ব বিদ্যালয়ে রাখে পা
মেধায় মননে রতনের নেই তুলনা-
Picture
বাবা মায়ের স্বপ্ন যেমন রতনকে ঘিরে
বানুর তেমনি সাধ জাগে অন্তরে
রতন বীনা বানু ;বানু বিহীন রতন
অতল অশান্তি যেনো অকাল মরন-

আসে সন ঊনিশ শো বায়ান্ন
উর্দু হবে বাংলা ভাষা মুখে উঠে না তাই অন্ন।
ছাত্র সমাজ হলো যুথবদ্ধ
প্রয়োজনে করবে সকলে যুদ্ধ-

গোল টেবিল বৈঠক বসে বুদ্ধিজীবি মহলে
বাংলার উপর দখল বসায় জিন্নাহর দলে
ছাত্র সমাজ উঠলো তাতে ক্ষেপে
কথা হবে না বাংলায় কোনো সবে উর্দু জপে-

একি আজগুবি কারবার ভাষা নিয়ে চলে দরবার
জিন্নাহ,রত্না দীনা বাঈ উর্দু  হবে রাষ্ট্রভাষা বলে বারবার-

আমার মাকে ডাকবো আমি মা বলে
সেই কথাটা কেড়ে নিবি কোন ছলে?
বাংলা আমার মায়ের ভাষা যার তুলনা নাই রে-
মিছিল নামে রাজপথে জিরু পয়েন্ট ধরে-

রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই উর্দু ঝেঁটে কর বিদাই।
বাঙাল আমরা ভাই ভাই বাংলা করবো ভাষাটাই।
গুলি ছুড়ে পুলিশের রাইফেল বাট
যেনো চৌদিকে বৃষ্টির ঘন ছাঁট-

মিছিলের মধ্যমনি রতন চলে আগে।
প্রথম গুলি রতনের বুকের মাঝে লাগে
ঊড়ে পঙ্খীকূল ছেড়ে দিয়ে ঘর
খেলার মাঠের সাথীরা হয়ে গেলো পর

মায়ের হাতের ভাতের থালা মাটিতে গড়ায়
বানুর বুকের  দহন পীড়া কহন না যায়-
কাঁদে বাংলা কাঁদে মানুষ হয়রে বেহুষ
ইতিহাস জুড়ে সোনার ছেলেরা প্রানহীন ফানুষ-

বাহান্ন থেকে দুই হাজার সতেরো
বানুর প্রেমে পড়ে নাই গাতরো
ফুল দেয় বানুএকুশ এলে প্রতিটি বছর
এই দিনটিতেই পায় সে প্রেমেরই কদর-

শোন শোন বলি ভাই ও বোন
বাংলা ভাষার জন্য ঝরে কতো খুন
বাহান্নর এই ভাষা আন্দোলন করলো যারা
তাদের জন্যই ভাষাটাকে ধরে রাখিস
তোরা--

আমি অধম জুলি রহমান
বাংলার মাঝে থাকি বহমান
ডিজিটালের এই যুগে মিশ্র হলে ভাষা
কান্দে পরাণ হিন্দি গানে ভাঙে বুকের আশা-


ফাগুনে দেখা বৈশাখে প্রেম - জুলি রহমান

শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

ভূগভর্স্থ ফিফটি নাইনের এ্যাস্ক্যালেটর বেয়ে উপরে ওঠেই জয় ভাবে কোথায় দেখেছিলাম
এর আগে তাকে? আজ আবার দেখা।কিন্তু ক্ষনিকের। ট্রেনটি ছেড়ে দিলো ; আশ্চর্য কেনোই বা দেখা হলো তবে?

জয়ের মনটা খারাপ হয়ে গেলো।ই-ট্রেনে বসে সে হরেক শব্দে নিজেকে ডুবিয়ে
রাখলেও অপ্সরীকে ভুলতে পারছেনা।
ট্রেনটি থেমে আছে রেল কর্তৃপক্ষের বিলম্ব হওয়ার কারন বলছে আর বার বার ক্ষমা চেয়ে নিচেছ!জয় ভাবছে ইস সিক্স ট্রেনটি কেনো
এমন লেট করলোনা? আমি ঐ অচেনা অনিন্দ অনন্যাকে আরেকটু দেখে নিতাম।
তাঁর সান্নিধ্যের নিবিড় আনন্দ আরো খানিক্ষণ উপভোগ্য হয়ে ওঠতো।
প্রচন্ড শীতের দাপটে তীক্ষ্নতর চাবুকের মতো শরীরের বহিরাংশ যেনো কেটে নিয়ে
যেতে চায়। তবুও দরজার কাছ থেকে ওঠে অন্যত্র বসার বিন্দুমাত্র ইচছা হলোনা। যেনো বার বার হৃদয়ের গভীর চিত্ততল থেকে একটি আশা প্রবল হয়ে এ কথাই উত্থিত হতে লাগলো হয়তো বা ভুল করে ঐ অপরিচতা মেয়েটি ই - ট্রেনে এসে বসবে আবার
তারই বিপরীথমুখী হয়ে।
জেবা টিকেট কাটতে জ্যাকসনহাইট যাবে ।ম্যানহাটন কসকোতে  শপিং করতে করতে ভাবে জেবা ।বাবার কথা  .!
এবার আর তাঁর
উপেক্ষা করার কোনো উপায় নেই।বন্ধু নোহাকে বলে জেবা।
নোহা আমি বুঝতে পারছিনা তুই কী করে একটা অপরিচিত জনকে নিজের স্বজন করে
নিবি? তা-ও কী-না বাংলাদেশী ছেলে!
জেবা বাবা মায়ের স্বপ্নতো সন্তানের পূরণ করতেই হবে।আমার বাবা মা নিশ্চয়ই অযোগ্য কোনো ছেলের কাছে আমাকে পাত্রস্থ করবেন না।
আমি পারবনা এই আমেরিকায় বাই বর্ন হয়ে
একজন বাঙালীকে জীবনের সাথে জড়াতে।
অ মাই গড! প্লীজ সেভ মি।
জেবা হাসে ।দেখাই যাকনা এই ডিজিটাল যুগে ও আমি বিয়ের পরই প্রেম করতে চাই।
জয়ও টিকেট কাটবে দেশে যাওয়ার জন্য কিন্তু  এই মূর্হূতে সে ডিসিশান চেইন্জ করলো দেশে সে যাবে না।ঐ মেয়েটির সংগে
যদি তার আবার দেখা হয় সেই আশায়।
জয় সেভেনটি  থ্রী স্ট্রীটের সোনালী ট্রাভেলস থেকে
বের হয়ে  সেভেন্টি টুর দিকে মোর নিতেই জেবা সোনালী ট্রাভলসে ঢুকে।
বিপরীথ মুখী বলে কেউ কাউকে দেখতে পেলো না।
জয়ের বাবার ফোন আসে বাংলাদেশ থেকে।
হ্যালো বলতেই  জয়ের বাবা প্রফেসার জামান বলে ওঠেন ;কী বাবা তোমার আসার ডেট কনফার্ম হলো? আমাকে জানাও। আমি
জাকির ভাইকে পাকা কথা দিয়েছি। আমার
কথার  উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁরা স্বপরিবারে দেশে আসছেন।

এপাশ থেকে জয় বলে, আব্বু আমার একটু
প্রবলেম হয়ে গ্যাছে তাই আর কয়টা দিন দেরী  হবে।

Picture

ফোন ছেড়ে দিয়ে জয় ভাবতে থাকে কেনো এই অপরুপার সাথে দেখা হলো? হলোই যদি কথা কেনো হলো না?তাঁর দু চোখ বর্ষার ভরা নদী এখন আমাকে কেবলই ভাসিয়ে নিয়ে যাচেছ কোন অজানার  ঠিকানায়।  ? চোখের কোনে যে দৃশ্যটি
জীবন্ত হয়ে আছে তা হলো মেয়েটির ক্ষীন স্ফিত শান্ত সুশীল হাসি। যে হাসির মাধ্যমে
তাঁর হৃদয় দুয়ার খুলে দিয়ে আমার ঘুমন্ত মনটিকে জাগিয়ে দিয়ে গেলো। এখন আমি
নিদ্রাহীন কাল কীভাবে কাটাবো?

আজ জেবার বাবা মা ভাই বোন তৈরী
হচেছ স্বপরিবারে দেশে যাওয়ার জন্য!

জয় ম্যানহাটনের  খোলা চত্তরে একটা পাথরের উপর বসে ।হেরাল্ড পাকের্র রুপ পরিগ্রহ করতেই বিস্তৃত কঠিন ধাতব দীপ্তিতে ফেটে পড়া আকাশে চোখ রাখে সে।
এতো যে রোদের দ্বীপ্তি তাও গায়ে কোনো উত্তাপ তৈরী করেনা।শুধু আগাগোরা এক নীলের মিরাকল্ ।জয়ের এতো ভালো লাগছে কেনো এই পৃথিবী?তবে কী সে ফাগুনের স্সর্শ পেলো?একেই কী বলে প্রেম?মনের কোনে একটা
মেঘ ছেঁড়া কাগজের মতো হঠাৎই উড়ে এসে বসলো। আচছা ঐ মেয়েটি যদি কারো বিবাহিতা বৌ হয়তো লাভ কী হলো?
এই প্রথম জয় নিজেকে ভীষণ বোকা মনে
করলো। এবার সে উঠে দাঁড়ায়।
এয়ারপোর্টে এসে জেবার বাবা আবার প্রাক্তন বন্ধু প্রফেসর জাকির সাহেবকে কল দেন।
আমরা রওয়ানা দিয়ে দিলাম ।দোয়া করবেন।
জয়ের বাবা অস্থির হয়ে ওঠেন। ছেলেকে আবার কল করেন।
শোন বাবা তোমার ভাবি শ্বশুরের কাছে আমাকে ছোট করোনা। তাঁরা আজ রওয়ানা
দিয়েছেন।আর তুমি টিকেট কনফার্মই করলে না?তবে কী তুমি আমার অবাধ্য হবে? বলেই জয়ের বাবা ফোন কেটে দেয়।
জয় ভাবনায় পড়ে যায়।বাবার অবাধ্য কখনো সে হয়নি এখন কোথায় পাবো
তাঁরে?পেয়ে হারানোর বেদনা নিয়েই কী তবে কাল কাটাতে হবে?আর ওদিকে বাবার সময়ই নেই।বিয়ে করতেই হবে।

জেবাদের বাড়িতে এক প্রকার বিয়ের আনন্দ।জাকির সাহেব স্বপরিবারে ঢাকা সিটিটা ঘুরে ঘুরে দেখেছন দীর্ঘ দশ বছর পর।

জয় চলে আসাতে জামান সাহেবের মনের কোনে এক স্বস্থিরতা ফিরেএসেছে।
তিনি ছেলেকে বলেন ড্রাইভারকে বলে দিচিছ তুমি একটু যমুনা ফিচার ঘুরেএসো।
কিছু কেনাকাটাও হলো আবার দেশের পরিস্থতিটাও দেখে নিলে। তবে একা কোথাও যেওনা।

জেবা ঘুরে যমুনা ফিচার শপিং মলটা দেখলো।কিছু কেনাকাটাও করলো।
স্বচছ কাঁচের এলিভটরে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জেবা।
দূর থেকে জয়ের দৃষ্টি পড়ে জেবার উপর।জয় ভূত দেখার মতোই চমকে উঠে এটা কীকরে সম্ভব?সেই মেয়েটি এখানে?হ্যা সেই তো!
জয় দৌঁড়ে কাছে যেতেই ওরা গাড়ি ছেড়ে দিলো।
আজ জয় দেখতে যাবে তাঁর হবু স্ত্রীকে কিন্তু তাঁর মন পড়ে রইলো বার বার দেখা সেই ষোড়শীর কাছে।
জয় মনে মনে ভাবে  কেনো আমার এমন লাগছে?মনে হচেছ  ওকে ছাড়া আমার বেঁচে থাকাই বৃথা।কেনো আজ আবার তাঁর সংগে এখানে দেখা? কে এই রহস্যময়ী নারী?  বাবার পছন্দের মেয়েকে বিয়ে না করলে
বাবার মান সম্নান বাঁচবেনা। কিন্তু আমি ঐ মেয়েকে না পেলে আমার এ জীবনের কোনো
দাম নেই। কাল আমি তাঁকে এই কথাটাই বুঝিয়ে বলবো।
জেবার ঘুম আসছেনা কাল তাঁরজীবনের চরম ফায়সালা। বাবার সুখের মূল্য দিতে গিয়ে তাঁর জীবনটা যদি নরকে পরিনত হয়?
ঐ ছেলে আমেরিকায় থাকে অথচ বাবা তাঁকে একটি বার দেখার প্রয়োজন বোধ করলো ন? বাবার বন্ধু প্রীতির প্রশংসা করতে হয়।

জেবাদের বাড়িতে হৈ চৈ পড়ে গেলো।আজ তাঁদের বড় মেয়ের আর্থ বলে কথা।অবশেষে
জয় ও তাঁর পরিবার কণে বাড়িতে এলো।
বেশ গুছানো পরিপাটি ঘরটি জয়ের খুব
পছন্দ হলো কিন্তু মেয়েটিকে কী করে তাঁর
মনের কথা খুলে বলবে?কতো আশায় বুক বেঁধে যে বধূ হবার স্বপ্ন দেখছে তাঁর একটি কথায়
সব তছনছ হয়ে যাবে।কিন্তু আমি -ই-বা ক করতে পারি?মনের গহীনে একজনকে ঠাঁই দিয়ে একই দৃষ্টিতে দুই জনকে দেখা।এতো ঠকানো!চরম দৃষ্টতা।এ আমি পারবোনা।সব তাকে খুলে বলতেই হবে।
জেবার মনের কোনে বৈশাখের কালো ঝড় বইছে।যাকে জীবনে এক নজর দেখিনি।চিনি না।কেমন তাঁর চাওয়া পাওয়া মিলবে কী আমার ভাবনার সাথে? চিন্তার ক্লীস্টতা পায়ে পায়ে জড়িয়েই জেবা তার বাবার কাঙ্খিত পাত্রের দিকে অগ্রসর হলো।

জয়ের সাত পাঁচ ভাবনার ভেতর কণেকে নিয়ে এক সময় হাজির হলেন গৃহ কর্তৃ মিসেস জাকির।
জেবা অতি ঘরোয়া স্বাভাবিক সাজেই জয়ের
মুখোমুখি বসলো।জয় তাঁর ভাঙা হৃদয় নিয়ে আকুতি ভরা চোখে একবার তাকাতেই চার
চোখের দৃষ্টি এক হতেই যা সে দেখলো তাতে সে নির্বিকার নিথর হয়ে অপলক শুধু
চেয়েই থাকলো।আবার যদি সে হারিয়ে যায়;
এই ভয়ে সে দৃষ্টিকে স্থবির করে রাখলো তাঁর সেই হারিয়ে পাওয়া সুপোরী সুন্দর আদলে।যক্ষের ধনকে।চিরতরে দৃস্টিতে বেঁধে নিলো এক জোড়া ভ্রমর কালো রেটিনায়!তাদের চারপাশের কথার গুন্জন দীর্ঘ ক্ষণ উভয়ের কর্নকোহরের প্রবেশ দ্বার পর্যন্ত পৌঁছুলো না।


মধুর বিভ্রম ---রাবেয়া রাহীম

শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

রাতের আকাশের অগুনিত তারকা রাশি সাথে মৃদু মন্দ বাতাস
কখনো আমাকে টেনে নিয়ে যায় নির্জন কোন হাইওয়ে ধরে অনেক দূরে
গাড়ীর গতি আরও বাড়িয়ে প্রায় উড়ে যাওয়ার মত করে;
------কখনো আবার ব্যাক ইয়ার্ডের এককোণে
নিজের হাতে লাগানো বাহারি গোলাপের রূপ সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে পড়ি।।
আবার কখনো নিজ গৃহের প্রিয় কোণটিতে বসে
পিয়ানো বাজিয়ে গান গেয়ে যাই,
তখনই দূরে বহুদুরে জানলার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা
একটি মানব-ছায়ার মতো দেখতে পাই
অনুভবে বুঝতে পারি সে রাত জেগে-জেগে আমারই গান শুনছে,
আনমনে আমার দিকে চেয়েই থাকে--অন্যকিছুও হতে পারে,
দূর থেকে এমন কতো কিছুই যে মনে হয়...
আমি গেয়ে যাই
কখনো নিজের লেখা আবৃত্তি করি
সম্মোহনী আমি ভেসে যাই ওই বিশাল আকাশের তারার ভেলায়।।
ভোরের সূর্যটা জাগতে থাকে একটু একটু করে
পূর্বাকাশটায় রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ে
দুরের জানালায় শেষ জ্যোৎস্নাটুকুও ম্লান হয়ে আসে ,
হয়তোবা ছায়াটি আমারই অপেক্ষায় মিলিয়ে যায়,
সেই সাথে আমিও।।
আবারও তেমনি করে আরেকটি রাতের জন্য নিজেকে তৈরি করি
এভাবেই রাতের পর রাত ঘুমহীন কেটে যায় কিছু মধুর বিভ্রমে;
আসলে পুরো জীবনটাই কেটে যাচ্ছে এভাবেই,
বুঝতে পারি কি!!
alt
২)
জীবিত সংসারে জন্মের অস্তিত্ব
ব্যস্ত নগরীর যান্ত্রিক কোলাহল কমে আসতে থাকে
সন্ধ্যে জেগে উঠে গভীর অন্ধকারচ্ছন্ন আকাশ নিয়ে
নির্জন একলা রাজপথ, দাম্ভিক ফ্লাইওভার, মাটিতে পড়ে থাকা জেব্রাক্রসিং,
রাত আরো গাড় হয় বস্তির ঘরের ভেতর মোটা কাঁথা দিয়ে বিভক্ত করা ছোট ছাউনিতে
ষোল বছরের উঠতি বয়স -- খেয়ে পরে গায়ে গতরে বেশ।
মাতাল, লম্পট আর শিকারী টহল পুলিশের তির্যক চাহনি
ছোট দুটি অবুঝ ভাই বোন, অসুস্থ মা ---চারটে পেটের জ্বালা ।।

নীল ব্লাউ্জটাও ঘামে ভিজে হয়েছে কালচে নীল
অস্ফুট কান্নার স্বর ভেসে এল-- "সাহেব টাকাটা দিইয়ে যেও"
রুঢ় বাস্তবতার মুখে কিছু কাগুজে নোট ফর ফর শব্দ তুলে ঘুরপাক খায়
মাঝরাতে শরীরে হাজার হাজার বিছার কামড় টের পায়, শেফালি
হাট করে খুলে রাখা ময়দানের বুকে-- ছুটে বেড়াচ্ছে অজস্র বিষাক্ত বাতাস,
ক্ষুধার্ত অবুঝ পেট গুলো ডাকছে কাতর স্বরে।।

"বেশ্যা শরীর" নাম নিয়ে জীবিত সংসারে জন্মের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখে সে
রোজ লোকালয়ে চেনা মুখ অচেনায় পাশ কাটিয়ে যায়।
তাচ্ছিল্যের সাথে ধিক্কার দিয়ে বলতে চায় শেফালি--"দিনের আলোয় আমি খুব অচেনা"
নগ্ন, নোংরা পর্দাহীন শরীর ডুবে থাকে পঙ্কিলতায়
প্রয়োজন শেষ সব শেষ,
অচেনা সাহেবেরা শহরের আনাচে কানাচে নগ্নতার উপহাসে মত্ত,
বাতাসে ভাসেনা কখনো পারিজাত সুবাস, আকাশে জুড়ে ছেয়ে থাকেনা প্রশান্তি।
প্রতিদিন মৃত্যুর সাথে দেখা হয় শেফালিদের ।


বাঙলা ভাষার পুঁথি = জুলি রহমান

বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

ষোলো বছরের বেলাল বেগকে জানাই তিরাশি কোটি সালাম।
তাঁর নামে ভাষা আন্দোলনের বয়ান শুরু করিলাম।
আহা বেশ বেশ। অ আহা বেশ বেশ।
ওরে অ মন্টু ভাই ধরি পায় আর নাড়াসনে বুদ্ধি মাথার গনা-গাঁথা কেশ।
শোনো শোনো আদনান ভাই!
এক খাইল্লা ঠিল্লার গল্প বইল্লা যাই।
আ আ আ হা হা হা হা
কেমনে পেলাম অ আর আ?
ওরে বোন ও মনিজা ;তুই যে আমার কলিজা।
আমি জুলি নগন্যা  ;সেই আজিজা।
ও তোর ডাগর চোখের কাজল ধুয়ে ডাকিসনা-রে  বান।
বাঙ্গাল কথা শোনার জন্য করি আহবান!
কচুর পাতায় জলের ফোটা যেমন টলোমলো।
বঙ্গ ভংগের তালে আইন ছিলো এলোমেলো।
এবার চলো আসল কথায় যাই।
বাঙলা ভাষার ইতি কথা সকলকে জানাই।

আরে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকবে কারা করলো উত্তোলন?
বাঙলা ভাষা কবে এলো কেমনে এলো সেই কথাটাই বলি।
বাংলা সবার প্রাণের ভাষা মারেন হাতে তালি।

সাতচল্লিশ সালে ভারত ভাগে পাকিস্তান ভাষার।
এখানে অবস্থানটা দেখাই একবার।
চৌধুরী খালেকুজ্জামান নবাব লিয়াকত আলী খান!
ভাষার বুকে রিফিউজি যেনো উর্দুপাকিস্তান।
তখন চুয়ান্ন লক্ষ উর্দুভাষী ছিলো ছিলো মোহাজের।
করাচী আর হায়েদ্রাবাদে পশতু বেলুচের।
জিন্নাহ রত্না দীনা বাঈ মোম্বাই গুজরাট।
আরে রুমির টুপি মাথায় দিয়া ঘটাইলো বিভ্রাট।
alt
উর্দু নয়রে নিজের ভাষা তবু উর্দুর জন্য টান।
বাঙালীর বাঙলা ভাষা ভেঙে করতে চায় খান খান।
ডঃ শহীদ সলিমুল্লাহ ভেবে হয়রান।
পূর্ব বাঙলার ছাত্র সমাজ শক্ত নওজোয়ান।
ঢাকায় প্রগতি লেখক শিল্পী সংঘের বসলো যে বৈঠক।

স্বাস্থমন্ত্রী হাবিবুল্লাহর মনের কথা বোঝা ভার।
আরে গোমড়া মুখের খ্যামড়া তোলে চায় চারিধার।
খাজা নাজিমুদ্দীন ভেবে কয়
উর্দু হবে রাষ্ট্রভাষা এর বিকল্প নয়।
তখন গোল টেবিল বৈঠক বসে
বুদ্ধিজীবি গন অংক কষে।
দিন গলে রাত হয় রাত গলে দিন।
বাঙলা ভাষার আয়ু যেনো হয়ে আসে ক্ষীণ।

বাঙলার বাঘ শেরে বাঙলা তেড়ে ওঠেন তাই!
তাঁরই সংগে কন্ঠ মিলান ভাষানী ভাই।
রাজপথে মিছিল নামে ।
পুলিশ থাকে তারই বামে।
ডাঃ মোঃশামসুদ্দুহা বাঙলার প্রথম বুদ্ধিজীবি।
নিজের প্রাণটা বিলিয়ে দিয়ে ফোটায় বাঙলার ছবি।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র দলে শ্লোগান তোলে।
বাঙলা মোদের প্রাণের ভাষা বাঁচবো মুখের বোলে।
সালাম বরকত রাস্তায় নামে।
রফিক শফিক কেউ রইলো না ধরাধামে।
শত্রুদের বাড়ে মনে দ্বেষ।
সন্তান হারা মায়ে কাঁদে ছড়িয়ে কেশ।

ঝরায় রক্ত বাড়ায় ভক্ত বাঙলার সন্তান।
জিরো পয়েন্ট টা হয়ে গেলো নিঠুর কবরস্থান।
ঘটনাটা ঘটে গেলো বায়ান্ন সালে।
এই রক্তঝরা দিনটিকে একুশে ফেব্রুয়ারী বলে।
নতুন প্রজন্মের কাছে করি নিবেদন।
এই দিনটির রাখিও সন্মান।
মনে রেখো খেলার মাঠে দূর্বাদলে পায়ে পায়ে জড়িয়ে ধরে।
খেলার সাথী নাইরে।
কতো রক্তে গড়াগড়ি ঢাকারই শহর।
কতো মায়ে সন্তান হারা কাঁদে তাদের অন্তর।
সেই বাঙলাকে বাঙলার মানুষ ভালোবাসো ভাই।
এই কামনায় আমি জুলি ইতি টানতে চাই-।

২১শে ফেব্রুয়ারীর জন্য।১লা ফেব্রুয়ারী ২০১৭ইং নিউইর্য়ক-


যুগান্তর কাদের কাগজ?

বুধবার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

যুগান্তর আঠারো বছরে পা দিল। আঠারো বছর আগে ভাষা আন্দোলনের মাসের প্রথম দিনটিতেই যুগান্তরের জন্ম। ফলে একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের মাসের গন্ধ জন্ম থেকেই যুগান্তরের শরীরে জড়িত। যুগান্তর তাই যুগের হুজুগে মাতেনি। নিরপেক্ষতায় নামার্জন গায়ে পাঠকদের প্রতারিত করতে চায়নি। পত্রিকাটি দল-নিরপেক্ষ, কিন্তু মত-নিরপেক্ষ নয়। দেশের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির মতাদর্শে যুগান্তর দীক্ষিত। পত্রিকাটির সাংবাদিকতায় অনেক ভুলত্রুটি থাকতে পারে। কিন্তু এ একটি ক্ষেত্রে তার কোনো দ্বিধা ও আপস নেই।
 
যুগান্তরের জন্মলগ্ন থেকে আমি কলামিস্ট হিসেবে এর সঙ্গে জড়িত। পত্রিকাটির সম্পাদক কয়েকবার বদলেছেন। কিন্তু নীতি বদলায়নি। দেশের আরও কয়েকটি দৈনিকের মতো ‘যুগান্তরে’ লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আমার লেখায় সম্পাদকীয় কোনো হস্তক্ষেপ নেই। অন্য একটি তথাকথিত দৈনিকে যে হস্তক্ষেপটি অহরহ সহ্য করতে হতো এবং শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে ওই দৈনিকে লেখাই ছেড়ে দিতে হল। ভাবতে বিস্ময় লাগে। যুগান্তরের সতেরো বছর বয়স পার হল। আর আমিও এ কাগজটিতে সতেরো বছর ধরে লিখছি। যতদিন বেঁচে আছি এবং লেখার শক্তি আছে, ততদিন হয়তো লিখব।
 
যুগান্তরের সম্পাদনা পরিষদের সবাই তরুণ এবং আমার পরিচিত। সম্পাদক সাইফুল আলম সম্পাদনায় মুনশিয়ানার পরিচয় দিচ্ছেন। সম্পাদকীয় পরিষদের সিনিয়র সদস্য মাহবুব কামালের ধারালো লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় বহুদিনের। যায়যায়দিন এবং চলতিপত্র নামে দুটি অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিকে তার ক্ষুরধার লেখনি আমাকে মুগ্ধ করত। এখন যুগান্তরেও তার লেখা বেরোয়। এককালে ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকার শিশু-কিশোরদের পাতা চাঁদের হাটের পরিচালক রফিকুল হক দাদুভাই নামে জনপ্রিয় হয়েছিলেন। তিনিও এখন যুগান্তরে কর্মরত। এক কথায় যুগান্তর পরিবারের সঙ্গে আমার একটা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা আছে। ‘যুগান্তর’ বাংলাদেশের একটি প্রথম শ্রেণীর জাতীয় সংবাদপত্রের মর্যাদায় উন্নীত হওয়া এবং সতেরো বছর ধরে সেই মার্যাদা ধরে রাখা পত্রিকাটির সকল সাংবাদিকতার প্রমাণ।


 
যুগান্তরের মালিক একজন সফল ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতি। কিন্তু ব্যবসায়ী হওয়া সত্ত্বেও তার মধ্যে গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্লুরালিজমের প্রতি বিশ্বাস কাজ করে বলে আমার ধারণা। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি যখন এক সময় ক্ষমতায় ছিল এবং অগণতান্ত্রিক কার্যক্রম দ্বারা বাংলাদেশকে বিরোধী দলশূন্য করার চেষ্টা চালিয়েছিল, তখন বিএনপি থেকে বেরিয়ে ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরী একটি নতুন বিরোধী দল গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। বিএনপির অভিযোগ, যুগান্তরের সত্বাধিকারী নুরুল ইসলাম এ চেষ্টার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। সম্ভবত এ জন্যই তাকে নানা মামলায় জড়িয়ে কারাগারে ঢুকিয়ে দীর্ঘদিন হয়রানি করা হয়েছিল। যুগান্তরের ওপরও সেই আঘাত এসে পড়েছিল। যুগান্তর সেই অগ্নিপরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হয়।
 
বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় যুগান্তরের নিজস্ব ভূমিকাটি কী? আমার মনে হয়েছে যুগান্তর শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পাঠকের যেমন কাগজ, তেমনি স্বল্পশিক্ষিত নিন্মবিত্ত মানুষেরও কাগজ। সুবিধাবাদী উচ্চবিত্ত সুশীল সমাজের মুখপত্র এটি নয়। সেই মুখপত্রের একটি আলাদা হাউস আছে। যুগান্তর সাংবাদিকতায় তার এ বৈশিষ্ট্যটি ধরে রেখেছে। সে কোনো বিশেষ শ্রেণীর মুখপত্র হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশে যে দু-চারটি দৈনিক সাংবাদিকতায় শ্রেণী স্বার্থের মুখপত্র হয়ে ওঠেনি যুগান্তর তার একটি।
 
উন্নত পশ্চিমা বিশ্বেও এখন সাংবাদিকতায় শ্রেণী বিভাজন ঘটেছে। মিডিয়া এখন কর্পোরেটগুলোর হাতের মুঠোয় এবং তাদের স্বার্থে পরিচালিত। বিলাতে টাইমস, টেলিগ্রাফ, এক্সপ্রেস প্রভৃতি দৈনিকগুলো ধনী ও শাসকশ্রেণীর মুখপত্র। এসব কাগজে সাধারণ মানুষের কথা বলা হয়, কিন্তু তাদের স্বার্থ ও অধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং সূক্ষ্মভাবে তার বিরোধিতা করে। স্বল্পশিক্ষিত এবং কর্মজীবী সাধারণ মানুষের জন্য এক সময় মিরর নামে একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকা বের করা হয়। ‘মিরর’ একটু বামঘেঁষা পত্রিকা। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে এর প্রভাব রোধ করার জন্য অল্প দামের ট্যাবলয়েড পত্রিকা বের করা হয়েছিল, নাম ‘সান’। সেক্স, সাসপেন্স এবং নানারকম সত্য অসত্য উত্তেজক ছবি ও খবর প্রকাশ করে এ কাগজটি শ্রমজীবী সাধারণ মানুষকে তাদের রুটি-রুজির আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা চালাত এবং এখনও চালায়।
 
বিলাতে শিক্ষিত ও উদারপন্থী মধ্যবিত্তের জন্য একটি পত্রিকা আছে, নাম ‘গার্ডিয়ান’। মধ্যবিত্ত ব্রিটিশ পাঠকদের মধ্যে এ কাগজটির প্রচার বেশি। লন্ডনে এখন একটা কথা প্রচলিত। কথাটা হল- যারা দেশ শাসন করে তাদের মুখপত্র হল টাইমস, টেলিগ্রাফ প্রভৃতি পত্রিকা। যারা দেশ শাসন করতে চায়, তাদের মুখপত্র হল গার্ডিয়ান, ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রভৃতি কাগজ। আর যারা কোনোদিন দেশ শাসনের সুযোগ পায় না, বরং শাসিত এবং নিপীড়িত শ্রেণী তাদের কাগজ হল মিরর, মরনিং স্টার ইত্যাদি।
 
বাংলাদেশে- তথা উপমহাদেশের সংবাদপত্র জগতে এ ধরনের বিভাজন তথা শ্রেণী বিভাজন এখনও হয়নি। একটা ব্রড বিভাজন আছে। সরকার-সমর্থক ও সরকারবিরোধী পত্রিকা। বিশেষভাবে পেশাজীবী শ্রেণীর কিছু ছোট ছোট পত্রিকা আছে। তার প্রচার সীমাবদ্ধ। অবিভক্ত বাংলায় কুষ্টিয়ার শামসুদ্দীন আহমদ কৃষক-প্রজার মুখপত্র হিসেবে দৈনিক কৃষক নামে একটি পত্রিকা বের করেছিলেন। সেটি পরবর্তীকালে কৃষক প্রজার পরিবর্তে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কাগজে পরিণত হয়েছিল।
 
অবিভক্ত বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি ‘দৈনিক স্বাধীনতা’ নামে কাগজ বের করেছিল। কৃষক শ্রমিক আন্দোলনের খবর তাতে বেশি থাকত। কিন্তু সর্বহারা শ্রেণীর কাগজের চেয়েও সেটি বেশি পার্টি-কাগজে পরিণত হয়েছিল। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের দৈনিক গণশক্তিও শ্রমিক কৃষক শ্রেণীর মুখপত্র হওয়ার দাবিদার। আসলে পার্টি-কাগজ সেটিও। বাংলাদেশে ঠিক শ্রেণী চরিত্রের কাগজ নয়, বামপন্থী রাজনীতির মুখপত্র দৈনিক সংবাদ। কিন্তু বর্তমানে মিডিয়ায় নব্য ধনিকদের মালিকানার যুগে সংবাদও তার আগের চরিত্র হারিয়েছে। কেবল তার চরিত্র একটু বাম রাজনীতিঘেঁষা।
 
একালের যুগান্তর এদিক থেকে বামঘেঁষা অথবা ডানঘেঁষা কোনোটিই নয়। বলা চলে প্রগতিশীল উদারনীতির কাগজ। সরকারের সমর্থক নয় আবার সরকারের বিরোধীও নয়। ভালো ও মন্দ কাজের নিরিখে সে সরকারকে সমর্থন দেয় অথবা সমালোচনা করে। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ঘরে যেমন তার সমাদর রয়েছে, তেমনি তার মধ্যে রয়েছে স্বল্পশিক্ষিত নিন্ম মধ্যবিত্ত ও নানা পেশার মানুষের চাহিদা অনুযায়ী খবর, খবর-ভাষ্য এবং নানা ফিচার। উগ্র মৌলবাদী রাজনীতির সে বিরোধী এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় বিশ্বাসী। এক কথায় যুগান্তর যেমন সমাজের উঁচু তলার কাগজ, তেমনি নিচু তলারও। যুগান্তরের এ বৈশিষ্ট্যটা লক্ষ্য করার মতো।
 
পত্রিকার শ্রেণী-বিভাজন নিয়ে আমার একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। লন্ডনে আসার পর থেকে গার্ডিয়ান পত্রিকাটি পড়ি। অন্য কাগজ যেমন টাইমস, টেলিগ্রাফ যে পড়ি না, তা নয়। কিন্তু ঘরে রাখি গার্ডিয়ান। আমার মেজ মেয়ে চিন্ময়ী তখন স্কুলের হায়ার গ্রেডে ভর্তি হবে। তাকে পাড়ায় স্কুলে ভর্তি করতে নিয়ে গেছি। ইন্টারভিউয়ের সময় এক শিক্ষিকা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা বাসায় কোন দৈনিক রাখ? আমার মেয়ে বলল ‘গার্ডিয়ান’। শিক্ষিকা একটু ঢোক গিলে বললেন, ওহ্, তোমরা মিডল ক্লাস!
 
পত্রিকা পাঠের নিরিখে বিলাতে শ্রেণী-চরিত্র বিচার করা হয় এটা জেনে বিস্মিত হয়েছিলাম। পরে দেখেছি, বিচারটা ভুল নয়। টিউবে ট্রেনে বাসে দেখেছি সাধারণ মানুষের হাতে সান, মিরর, স্টার, পিপল ইত্যাদি কাগজ। এ ট্যাবলয়েডগুলো ওয়ার্কিং ক্লাসের মানুষের কাগজ বলে পরিচিত। টাইম, গার্ডিয়ান ট্রেনে বাসে বা সাধারণ মানুষের হাতে খুব একটা দেখা যায় না। সে জন্যই অভিজাত দৈনিক টাইমসের প্রচার যেখানে সাত কি আট লাখ, সানের প্রচার সেখানে চল্লিশ থেকে ষাট লাখ। সান বা মিররে আন্তর্জাতিক খবর বড় করে দেয়া হয় না। থাকে খুন, ধর্ষণ, জালিয়াতি ইত্যাদি সামাজিক অপরাধের ফলাও খবর। সানে পৃষ্ঠাজোড়া নগ্নবক্ষ সুন্দরী তরুণীর ছবি তো ছিল এক সময় প্রধান আকর্ষণ।
 
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শিক্ষিত মধ্যবিত্তের রুচিকে এখনও আঘাত করেনি। রম্য পত্রিকা অনেক আছে। কিন্তু তারা ওয়েস্টার্ন ন্যুডিজমকে অনুসরণ করে না। আমাদের দৈনিক পত্রিকাগুলোও এদিক থেকে শ্রেণী বিভাজিত নয়। কয়েকটি পত্রিকার ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও অধিকাংশ দৈনিককেই সব শ্রেণীর পাঠকের পত্রিকা বলা চলে। এ ক্ষেত্রে যুগান্তরের বৈশিষ্ট্য আগেই বলেছি। যুগান্তর সংবাদ পরিবেশনে অনেকটাই বস্তুনিষ্ঠ। মন্তব্য প্রকাশে দল-নিরপেক্ষ। সব শ্রেণীর এবং মতের চাহিদা মেটাতে সক্ষম বলেই যুগান্তর এখন বাংলাদেশের অগ্রগণ্য জাতীয় দৈনিকের একটি।
 
যুগান্তরের সাংবাদিকতা সম্পর্কে বলতে পারি, বয়স আঠারো হলেও পত্রিকাটি এ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একটি বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে সব শ্রেণীর মানুষের দল-নিরপেক্ষ পত্রিকা হিসেবে। আগেই বলেছি, পত্রিকাটি মত-নিরপেক্ষ নয়। সেই মত বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ও গণতন্ত্রের আদর্শ রক্ষার।
 
এ ধরনের দৈনিকের দীর্ঘ আয়ু যেমন কামনা করি, তেমনি কামনা করি যুগান্তরের মতো কাগজের সংখ্যা দেশে আরও বাড়ুক।
 
লন্ডন ২৫ জানুয়ারি, বুধবার ২০১৭
লেখক : কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, কবি ও কলামিস্ট


মুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধ এবং আমার অবস্থান : সাঈদুর রহমান সাঈদ

শনিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০১৭


১৯৭১ সন। অগ্নিঝরা মার্চ মাস। ২৫ তারিখের বংগবন্ধুর রেসকোর্স ময়দানের ডাক দিয়েছেন, “—এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, তোমাদের যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা কর—”। আর সেই ডাকে মুক্তিপাগল আবাল, বৃদ্ধ, বনিতা, প্রতিটা দেশপ্রেমিক বাঙ্গালী মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপ দিয়েছেন। ঐ সময় আমি পাকিস্তান এয়ার ফোর্সে বিমান সেনা হিসেবে চাকুরীর করার কারনে ছিলাম তদানিন্তন পশ্চিম পাকিস্তানে। গভীর রাতে কম্বলের নীচে শুয়ে বিবিসি’র খবর শুনতাম কানের কাছে রেডিও রেখে। কারন আশে পাশে ছিল সব পশ্চিম পাকিস্তানী পাঞ্জাবী ও অন্যান্যরা। আর মনে মনে ভাবতাম কি ভাবে বংগবন্ধুর ঐ ডাকে সাড়া দেয়া যায়। খুজে ফিরছিলাম বাহানা ও সুযোগ যার উপর ভিত্তি করে করে পাকিস্তান ত্যাগ করতে পারি এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে পারি। ধারনামতে প্রতিটা বাংগালীই আমার মত ভাবিছিল কিন্তু কারও সাথে কেহ এ বিষয়ে কোনো আলাপ আলোচনা করতাম না একান্ত সংগত কারনেই। হঠাত একটি নির্দেশনা জারী হলো; রাষ্ট্রীয় এমার্জেন্সীর কারনে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের ছুটি দেয়া বন্ধ। দেশের আত্মীয়স্বজনের সাথে চিঠির মাধ্যমেই হতো যোগাযোগ এবং সে চিঠিপত্রও স্ক্রিনিং হবে বলে ঘোষনায় বলা হলো। ফলে আমরা হয়ে পড়েছিলাম আতঙ্কগ্রস্থ। এভাবেই আতংক ও উদ্বিগ্নে ভরা ভবিষ্যতের কথা মাথায় নিয়েই দিন কেটে যাচ্ছিল। আমাদেরকে কর্মস্থল থেকেও দূরে রাখা হচ্ছিল কারন তাদের মনে ভয় ছিল যদি আমরা কোনো ধ্বংসাত্মক কাজে নিয়োজিত হই!
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই আমার ঘাটি থেকে আমারই বন্ধু কর্পোরাল সামসুল হক ও কর্পোরাল মোহসীন নামে দুই মুক্তি পাগল বিমান সেনা সিন্ধু প্রদেশের সীমান্ত দিয়ে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে পালিয়ে যাবার উদ্যোগ নেন কিন্তু দুর্ভাগ্যবসতঃ তারা সীমান্ত রক্ষীদের হাতে ধরা গ্রেফতার হন। ঐ সামসুল হক এবং মোহসীনদের পেশা ছিল সীমান্ত গ্রাউন্ড সিগ্নালিং ফলে সীমান্ত সম্পর্কে তাদের প্রচ্ছন্ন ধারনা ছিল। তারা উভয়েই ছিলেন শহীদ বিমান সেনা, তথাকথিত আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী, পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সার্জেন্ট জহুরুল হক ও তার ভাই কর্পোরাল ইউসুফের একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ঐ দুই বন্ধু কর্পোরালের পরিকল্পনা ছিল যে কোনো প্রকারে সীমান্ত পাড়ী দিয়ে ভারতে ঢুকতে পারলে তারা ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীদের কাছে আত্মসমর্পন করে রাজনৈতি আশ্রয় চাইবে। কিন্ত ধরা পরে যাওয়ায় তাদেরকে পি এ এফ বাদিন নামক বিমান বাহিনীর বেসে এনে কোর্ট মার্শাল করে এজ বছর করে জেল দেয়া হয়। সেই সাথে আমাদের চলাফেরার উপরও তীক্ষ খবরদারী শুরু হয়ে যায়।
বাংলা মায়ের ঐ সন্তানদের সীমান্ত দিয়ে পালাবার উদ্যোগের খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে একদিন তদানিন্তন বিমান বাহিনী প্রধান আমাদের ঘাটিতে আসেন এবং সব বাংগালী বিমান সেনাদেরকে নিয়ে একটি মিটিং করেন। সেখানে তিনি আমাদেরকে সতর্ক করেন এবং সেই সাথে আশ্বস্ত করেন, “পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর কার্যক্রমের ফলে কারও পারিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে থাকলে স্বাভাবিক কারনেই আপনারা উদ্বিগ্ন হবেন কিন্তু ওভাবে পালিয়ে যাবার প্রচেষ্টা না চালিয়ে ছুটির জন্য দরখাস্ত করুন, আমি মঞ্জুর করব।“ সেই সাথে তিনি ঘাটি অধিনায়ককে নির্দেশ দিলেন যাতে ঐ ছুটির দরখাস্ত অনুমোদনের জন্য বিমান বাহিনী সদর দপ্তরে তাঁর অনুমোদনের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়।
বিমান বাহিনী প্রধানের ঐ ঘোষনায় ছুটিতে যাবার এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার একটা সুযোগ এসে গেল ভেবে খুব খুশী হলাম। ঐ দিনই ঢাকাতে চাকুরীরত আমার মামার কাছে চিঠি লিখলাম যেন মায়ের অসুখের সংবাদ দিয়ে পর পর দুটো চিঠি লিখেন এবং পরবর্তীতে মা’র গুরুতর অসুস্থতার খবর দিয়ে একটা টেলিগ্রাম। মামা তাই করলেন এবং ঐ চিঠি এবং টেলিগ্রাম সংযুক্ত করে ছুটির দরখাস্ত করলাম। যথাসময়ে দরখাস্ত বিমান বাহিনীর সদর দপ্তর পেশোয়ারে পাঠিয়ে দেয়া হলো এবং প্রায় একমাস পরে ছুটির দরখাস্ত অনুমোদিত হয়ে এল। আমার ঘাটি কমান্ডার, গ্রুপ ক্যাপ্টেন আয়াজ আহমেদ খান আমাকে ডেকে সে খবর দিলেন এবং উপদেশ দিলেন করাচী গিয়ে পি আই এর টিকেট বুকিং দিতে। আরও বললেন যে ফ্লাইটের দিন থেকেই ছুটি শুরু হবে। কিন্তু আমার পরিকল্পনা ছিল যে কোনোভাবে পাকিস্তান থেকে চলে আসার। ছুটি শেষ হবার একদিন আগেও যদি করাচী ত্যাগ করতে পারি সেটাই হবে আমার জন্য সব চেয়ে বড় পাওয়া। তাই আমি বিমান ভ্রমনের ওয়ারেন্ট ও ছাড়পত্র নিয়ে করাচী যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। ঐ সময় আমাদের ঘাটির হিসাবরক্ষন অফিসার, একান্ত সজ্জন ফ্লাইং অফিসার নুরুল ইসল্লাম সাহেবের কাছে আমি সব খোলাখুলি ভাবে বলেছিলাম “আমি পি আই এর টিকেট পেয়ে গেলে আর ফেরত আসতে নাও পারি। কাজেই যদি সম্ভব হয় তবে আমার যাবতীয় বেতন ভাতা দেবার ব্যবস্থা করুন।
ঐ সময় সর্বত্র একটা সতর্ক সংবাদ প্রচলিত ছিল যে কোনো বাংগালী সামরিক সদস্যরা ঢাকাতে অবতরনের পর পাক সেনারা তাদেরকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে ফেলে। এই বিষয়েও নুরুল ইসলাম সাহেবের কাছে উপদেশ চেয়েছিলাম কারন তারই বন্ধু একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (সময়ের ব্যবধানে নাম ভুলে গেছি) কয়েক দিন আগেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে ছুটি কাটিয়ে ফেরত এসেছিলেন কারন তিনি তার পরিবারকে ওখানে রেখেই ছুটিতে ঢাকা গিয়েছিলেন। নুরুল ইসলাম সাহেব একদিন সময় নিয়ে প্ররের দিন তার সাথে দেখা করতে বলেছিলেন। তার কথামত আমি তার কাছে গেলে তিনি বলেছিলেন, “সাঈদ, যা শোনা যায় তা সব সত্য নয়, তবে ভাগ্যে যা আছে তা এখানে থাকলেও হবে আর ঢাকায় গেলেও হবে সুতরাং চলে যান।“ তিনি আমার সব দিয়ে দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন।
এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে আমি করাচী গেলাম এবং সাথে সব প্রয়োজনীয় লাগেজ নিয়ে নিলাম যাতে টিকেট পেয়ে গেলেই ঢাকায় চলে যেতে পারি। আমি প্রশাসনে কর্মরত ছিলাম বিধায় সব কাগজপত্র তৈরী করে নিয়ে পি আই এর টিকেট কাটার উদ্দেশ্যে, মনে মনে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের বাসনা, করাচীর পথে রওয়ানা দিলাম। করাচীর কোরাংগী ক্রীক নামক বেইসে আমার চাচাত ভাই বিমান সেনা নুরুল ইসলাম কর্মরত ছিল এবং তার কাছে গিয়েই উঠলাম। তারই এক বাংগালী বন্ধুর পরিচিত পি আই এর এয়ার হোষ্টেজের সহায়তা নিয়ে দুই দিন পরেই একটা টিকেটের ব্যবস্থা হয়ে গেল। নির্দিষ্ট দিনে করাচী থেকে ঢাকা ২ ঘন্টা ৩০ মিনিটের আকাশ পথ শ্রীলংকা হয়ে ছয় ঘন্টায় অতিক্রম করে জুলাইয়ের ৭ তারিখ বিকেল বেলা ঢাকা বিমান বন্দরে এসে পৌছলাম। রওয়ানা করার আগেই বিভিন্ন সূত্রে খবর পাচ্ছিলাম যে ঢাকায় অবতরন করার পর বাঙ্গালী সামরিক সদস্যদেরকে এক অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে গিয়ে সামরিক ইন্টেলিজেন্সের লোকেরা নানাভাবে ইন্টারোগেশন করে এবং কোনো রকম সন্দেহ হলে তাদেরকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেয়া হয়।
ঢাকায় অবতরনের পর সব যাত্রীরাই তাদের মালামাল নিয়ে চলে গেলেও আমার লাগেজ না পেয়ে পূর্বশ্রুত ভীতিজনক কথা স্মরণে আসছিল এবং ভয়ে হৃদ কম্পন শুরু হয়ে গিয়েছিল। মনে মনে ভাবছিলাম আমার লাগেজ হয়তোবা পাকসেনারা জব্দ করেছে এবং সহসাই আমাকে ইন্টারোগেশনের জন্য নিয়ে যাবে আরও কিছুক্ষন অতিবাহিত হল এবং একে একে সকল যাত্রীরাই চলে গেল। আমি একা যখন লাগেজ চেইনের কাছে বিষন্ন মনে দাড়িয়ে ভখনই ওখানে কর্মরত এক বাঙ্গালী এসে আমার কাছে জানতে চাইলেন দাড়িয়ে থাকার কারন এবং তাকে জানালাম আমার লাগেজ পাইনি। ভদ্রলোক আমা্কে নিয়ে দরজার কাছে নিয়ে একটা লাগেজ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন সেটা আমার কিনা। আমি “হ্যাঁ” বলতেই সুটকেসটির ছেড়া হাতল দেখিয়ে বললেন যে হাতল ছিড়ে যাওয়ার কারনে ওখানেই সেটা ফেলে রেখেছে কেহ।
যাহোক, তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে টার্মিনাল থেকে বের হলাম। আমার মামা মহাখালী প্যারামেডিকেলে চাকুরী করতেন তাকে অনুরোধ করেছিলাম আমাকে নেয়ার জন্য বিমান বন্দরে থাকতে। কিন্তু বের হয়ে কাউকেই না দেখে আবার চিন্তিত হয়ে পরলাম। হঠাৎ বিমান বন্দর সড়কের অপর পাশে অবস্থিত ‘হাবিব ফ্রটস’ এর সামনে আমার বড় ভাই এবং মামাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আনন্দে চোখে পানি এসে গেল। সিড়িতে দাড়িয়ে হাত জাগাতেই মামা আমাকে দেখতে পেলেন এবং ইঙ্গিতে বললেন রাস্তা পাড় হয়ে তাদের কাছে যাবার জন্য এবং আমি তাই করলাম। তারা জানালেন যে সবাই চলে গেলেও আমাকে না দেখে তারা ভেবেছিলেন আমি বোধ হয় আসিনি।
বড় ভাইকে দেখে বেশ খুশী এবং আশ্চর্য্য হলাম কারন আমি জানতাম তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে ভারতে অবস্থান করছিলেন। পরে তিনি জানিয়েছিলেন যে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ট্রেনিং শেষ করে ঢাকার কাছ দিয়ে মাদারীপুর যাওয়ার পথে মামাকে দেশে নিয়ে যাবার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন এবং এসেই মামার কাছ থেকে আমার আসার খবর পেয়ে অপেক্ষা করছিলেন আমার ফ্লাইটের জন্য। যাহোক, ঢাকায় চলাফেরা করা খুব নিরাপদ নয় তাই রিক্সা কিংবা বেবি টেক্সিতে না গিয়ে নাখাল পাড়া হয়ে রেল লাইনের উপর দিয়ে পায়ে হেটে মহাখালী যাওয়ার জন্য প্রস্তাব দিলেন কারন ঐ পথই কিছুটা নিরাপদ ছিল। আমরা তাই করলাম এবং ভাগ্য ভাল পথে কোনো সমস্যা হয়নি। যদিও এদিক সেদিক অনেক গোলাগুলীর শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। আল্লাহ তা’আলার অশেষ রহমতে নিরাপদেই মামার বাসায় গিয়ে পৌছলাম। পরিচিত অনেকের সাথেই দেখা হলো এবং অনেক ভাল লাগল।
পরের দিনই লঞ্চযোগে দেশের বাড়ী যাবার জন্য তৈরী হলাম। আমি পাকিস্তান এয়ার ফোর্স থেকে ছুটিতে আসার প্রমানস্বরূপ সব কাগজপত্র নিয়েই এসেছিলাম যা আমার কাছে ছিল বিধায় আমার মনে কোনো সংকোচ বা ভয় ছিল না। তবুও মামা বললেন ভাল কাপড় চোপড় না পরতে কারন ভাল কাপড় পরিহিত তরুনদেরকে দেখলেই নাকি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা মুক্তিযোদ্ধা বলে সন্দেহ করতো এবং পাক সেনাদেরকে খবর দিত। তাই লুঙ্গী ও একটা সাধারন জামা গায়ে জড়িয়েই পরের দিন সকালেই সদরঘাট থেকে লঞ্চযোগে মাদারীপুরের পথে রওয়ানা হলাম। লঞ্চে উঠার পর প্যান্ট পরেছিলাম। পথিমধ্যে তালতলা নামক এক স্থানে লঞ্চ থেকে সব যাত্রী নামিয়ে পাকিস্তানী সেনারা তল্লাশী চালাতে থাকলো। আমার কাছে এলে আমি তাদেরকে পাকিস্তান এয়র ফোর্স এর পরিচয় পত্র দেখালাম এবং আর্মির সেপাই আমাকে সেলুট করলো। কারন সে মনে করেছিল আমি বিমান বাহিনীর অফিসার এবং ঐ পরিচয়ে আমার বড় ভাইকেও আর তল্লাসী করেনি। আমাকে সেলুট করা্য লঞ্চের সারেং আমাকে এক রকম জোড় করেই তাদের কেবিনে নিয়ে বসালেন। পাক সেনা সদস্য আমাকে স্যালুট দেয়ায় সারেং ও অন্যান্য ষ্টাফরা আমাকে পাকিস্তান সেনা বাহিনীর অফিসার হিসেবেই সন্মান দেখিয়েছিলেন বলেই মনে হয়। এমন কি লঞ্চের ভাড়া দিতে চাইলেও আমার কাছ থেকে ভাড়া নেননি, উপরন্তু একাধিকবার আমার এবং আমার ভাইয়ের চা-নাস্তার ব্যাবস্থাও তারাই করেছিল। বিকল ৩/৪টার দিকে মাদারীপুর গিয়ে লঞ্চ থামলে আমরা লঞ্চের সারেং ষ্টাফদেরকে তাদের আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম এবং বাসে করে ভুরঘাটা হয়ে বাড়ীতে চলে এলাম। গ্রামের সবাই আমাকে এমন ভাবে অভ্যর্থনা জানালেন যেন আমি মৃত্যুকূপ থেকে উঠে এসেছি।
বাড়ীতে গিয়ে সবার সাথে কুশল বিনিময়ের পর যখন সব সমবয়সীদের খবর নিচ্ছিলাম তখন জানতে পারলাম যে প্রায় সবাই হয় মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পে না হয় ভারতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষন নিচ্ছেন। তাই আমিও বাড়ীতে থাকাটা নিরাপদ মনে করতে পারছিলাম না। তাই ৬/৭ দিন পরেই আমার এক ক্লাসমেট মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প থেকে বাড়ী এলে ওর সাথে মাদারীপুরের খলিল বাহিনীর ক্যাম্পে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেই।
মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে গিয়ে আমাদের গ্রাম ও থানার অনেক পরিচিত মুখকেই পেলাম যাদের কেহ আমার সহপাঠি আবার কেহবা বন্ধু। সবচেয়ে বড় পাওনা হিসেবে পেয়েছিলাম পাকিস্তান এয়ার ফোর্সেরই অন্য এক পতিরিত বন্ধু কর্পোরাল আলমগীরকে। তিনি ছিলেন খলিল বাহিনী নামের ঐ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। আমি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত একজন বিমান সেনা বিধায় বাহিনীর সবাই অনেক খুশি হয়েছিলেন। এমনকি মাদারীপুর মহকুমার অনেক অপারেশনেও আমাকে সন্মুখভাগের দায়ীত্ব নিতে হতো। বেশ কিছু অপারেশন কৃতকার্যতার সাথেই সম্পাদন করেছিলাম।
একদিন হঠাত করেই মাদারীপুরের নির্বাচিত প্রাদেশিক সংসদ সদস্য জনাব আচমত আলী খান (বর্তমান মাননীয় নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খানের পিতা) আমাদের ক্যাম্পে এসে খবর দিলেন যে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্য এবং সেই সাথে যারা অন্যান্য সরকারী চাকুরীজীবি মুক্তিযোদ্ধা তাদেরকে নাম তালিকাভুক্ত করার জন্য সেকটর সদর দপ্তরে যেতে হবে। কারন হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত কারন তাদের কেহ যুদ্ধে প্রান হারালে তাদের তাদের পরিবারের জন্য অবসরভাতা দেয়ার প্রশ্ন জড়িত। তাই আগষ্টের শেষভাগে খান সাহেবের দেয়া একটা চিঠি নিয়ে আমরা ১৪ জন ভারতের মেলাঘরে অবস্থিত ২ নং সেক্টর সদর দপ্তরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। নানা ধরনের প্রতিকুলতাকে মোকাবিলা করে ১০/১২ দিন পরে নৌকাযোগে মেলাঘরে গিয়ে পৌছি। সেক্টর হেডকোয়াটারে নাম রেজিষ্ট্রি করে আরও কিছুদিন সেখানে অবস্থান করতে হয়েছিল নানা কারনে যা এখানে উল্লেখ না করে পরবর্তী অন্য প্রবন্ধে উল্লেখ করার বাসনা রইল। যাহোক ১৯৭১ সনের ইদুল ফিতরের দিন ইন্ডাকটেড হয়ে মাদারীপুরে চলে আসি। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করতে চাই ঈদুল আজহার ২ দিন আগে আমাদেরকে নিয়ে সেকটর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ একটি ঘরোয়া বৈঠক করে আশ্বস্ত করেছিলেন যে সহাসাই আমরা দেশের ইভ্যন্তরে চলে যাব। এবং ঐদিনই মোশাররফ আখাউড়া (কসবা)র যুদ্ধে শত্রুর গোলায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এবং সে কারনেই আমাদের দেশে ফিরতে একটু দেরী হয়ে গিয়েছিল।
দেশে এসে আবার সেই মাদারীপুরের খলিল বাহিনীর সাথেই যোগ দিয়ে বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহন করার সৌভাগ্য হয়েছিল। অবশেষে মাদারীপুরের পাক সেনারা ১৯৭১ সনের ডিসেম্বর মাসের ৫/৬ তারিখ মাদারীপুর থেকে পালিয়ে ঢাকা যাবার প্রস্তুতি নিলে আমরা, খলিল বাহিনী এবং গোপালগঞ্জের হেমায়েত বাহিনী টেকের হাট নামক ফেরিঘাটে এম্বুসের ব্যবস্থা করি এবং পাক সেনারা আমাদের কাছে আত্মসমর্পন করে। তাদেরকে আমরা মাদারীপুর জেল খানায় বন্দী করে মাদারীপুর শহরে ৪টি ক্যাম্প স্থাপন করে ১৬ ডিসেম্বরের পরেও অবস্থান করি। আমি তদানিন্তন মহিউদ্দিন উকিলের বাসা স্থাপিত ক্যাম্পের দায়ীত্বে থাকি।
১৯৭২ এর জানুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহে ক্যাম্প থেকে বিদায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগদানের উদ্দেশ্যে ঢাকায় চলে যাই এবং বিমান বাহিনীতে যোগ দিয়েই জানুয়ারীর ১০ তারিখ বংগবন্ধুর প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে তাকে গার্ড অফ অনার দিয়ে স্বাধীন বাংলার বুকে বরন করার সৌভাগ্য অর্জন করি ।
১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর পাক হায়েনারা আত্মসমর্পন করা থেকে শুরু করে ১৯৮৫ অক্টোবরে অবসর নেয়া পর্যন্ত ছিলাম বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একজন বিমান সেনা। আর যে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছিলাম সেই দেশ ছেড়ে অদৃষ্টের নির্মম পরিহাসে আজ বসবাস করছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। হয়তোবা এখানেই হবে শেষ শয্যা। তবুও তৃপ্ত আমার দেশের পাস্পোর্ট নিয়েই বাংগালী পরিচয়ে এখানে আছি। আজ গর্ব করে বলছি আমি বাংগালী, আমি বাংলাদেশের নাগরিক। সুতরাং আজ অহঙ্কারের সাথে বলতে পারি; জয় বাংলা, জয় বংগবন্ধু, জয় হোক মেহনতি মানুষের।

alt
সাঈদুর রহমান (সাঈদ)
মুক্তিযোদ্ধা, বিমানসেনা (অবঃ)
নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
Email: এই ইমেইল ঠিকানা স্পামবট থেকে রক্ষা করা হচ্ছে।এটি দেখতে হলে আপনাকে JavaScript সক্রিয় করতে হবে।


মাটির টানে - জুলি রহমান

বৃহস্পতিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০১৭

অন্তরঙ্গ করে যতোই টানো আমাকে
আমি পারিনা ছুটে যেতে
দিনগত পাপক্ষয় হৃদয়ের ফাঁস লেগেই থাকে ।
শেকড় কখন পুঁতেছি কঠিন মাটিতে!

Picture


ভয়াবহ দুর্বিপাকের নিপাত সময়
বহুবিধ বন্ধনে বেঁধে রাখে
চুলের মতোই কালো কাল
চোখের রেটিনা ছায়ায় ক্রমাগত ঘোরপাক খায়-

অথচ মাটির ঘ্রাণ আমার স্বপ্ন শেমিজ
যা কখনোই আর খোলা যায়না।
পায়ের তলায় যে পাথর ভর করে আছি ;তা অতি ক্ষণিক কালের জেনেও
মাটি আর জল বৃক্ষের স্বপনই বুনি-