Editors

Slideshows

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/605744Finding_Immigrant____SaKiL___0.jpg

কুইন্স ফ্যামিলি কোর্টে অভিবাসী

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ দ্যা ইন্টারফেইস সেন্টার অব নিউইয়র্ক ও আইনী সহায়তা সংগঠন নিউইয়র্ক এর উদ্যোগে গত ২৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ৯ See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/455188Hasina__Bangla_BimaN___SaKiL.jpg

দাবি পূরণের আশ্বাস প্রধানমন্ত্

বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ দাবি-দাওয়া বাস্তবায়নে আলোচনা না করে আন্দোলন করার জন্য পাইলটরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন। পাইলটদের আন্দোলনের কারণে ফ্লাইটসূচিতে জটিলতা দেখা দেয়ায় যাত্রীদের কাছে দুঃখ See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/701424image_Luseana___sakil___0.jpg

লুইজিয়ানায় আকাশলীনা‘র বাৎসরিক

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ লুইজিয়ানা থেকে ঃ গত ৩০শে অক্টোবর শনিবার সনধ্যায় লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির ইণ্টারন্যাশনাল কালচারাল সেণ্টারে উদযাপিত হলো আকাশলীনা-র বাৎসরিক বাংলা সাহিত্য ও See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/156699hansen_Clac__.jpg

ইতিহাসের নায়ক মিশিগান থেকে বিজ

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ ইতিহাস সৃষ্টিকারী নির্বাচনে ডেমক্র্যাটরা হাউজের আধিপত্য ধরে রাখতে সক্ষম হলো না। সিনেটে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুন্ন রাখতে সক্ষম হলেও আসন হারিয়েছে কয়েকটি। See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/266829B_N_P___NY___SaKil.jpg

বিএনপি চেয়ারপারসনের অফিসে পুলি

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ নভেম্বর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটস্থ আলাউদ্দিন রেষ্টুরেন্টের সামনে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি তাৎক্ষণিক এক বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। এই See details

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

আগে স্থানীয় সরকারের প্রকার, স্তর ও গন্তব্য ঠিক করতে হবে; জিয়া’র ‘গ্রাম সরকার’ আর এরশাদ’র ‘উপজেলা’ হচ্ছে মিথ

বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬

বাপসনিউজ (হাকিকুল ইসলাম খোকন): প্রথমে স্থানীয় সরকারের স্তর, প্রকার ও গন্তব্য কেন ঠিক করতে হবে তা জানতে হলে, বুঝতে হলে বিদ্যমান স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও এর অতীত সম্পর্কে ভাল ধারণা থাকতে হবে; অতীতে স্থানীয় সরকার কেন্দ্রীক অবৈধ শাসকদের অসৎ উদ্দেশ্যমূলক গৃহীত কর্মকান্ড, তার ধারাবাহিকতা ও সাংঘাতিক কুফলগুলো কিভাবে রাজনৈতিক দলগুলো, জনগণ, সরকার, এনজিওসহ সমাজের অগ্রসরমান বলে পরিচিত গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে চলেছে তাও ভালভাবে জানতে হবে, বুঝতে হবে। এই লেখাটি সংক্ষিপ্ত ও ছোট রাখার স্বার্থে কেবল বাংলাদেশ আমলের দুইজন অবৈধ শাসক এর অপকর্মের স্মারক (উপজেলা ও গ্রাম সরকার) এবং এগুলোর কুপ্রভাব কিভাবে গোটা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে সাংঘাতিকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে, করছে তা জানার, বুঝার প্রয়াস নেয়া যেতে পারে। এই প্রয়াসের মাধ্যমে প্রথমে কেন স্থানীয় সরকারের স্তর, প্রকার ও গন্তব্য ঠিক করতে হবে তাও স্পষ্ট হয়ে যাবে বলে আমরা মনে করি। সেই সঙ্গে সামগ্রিকভাবে স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত আরও অনেক অনেক দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা ও এগুলোর উপযুক্ত সমাধান প্রাসঙ্গিকভাবে এই নিবন্ধে উপস্থাপিত, আলোচিত হবার কারণে ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল নাগাদ পরিবর্তনশীল সূচকগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রণীত সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয় (যা এই নিবন্ধের শেষে সংযুক্ত করা হয়েছে) ও সমাধানমূলক অন্যান্য উপায়গুলি জানতে, বুঝতে সহজতর হবে বলে প্রতীয়মান হয়; সর্বোপরি বলা যায় যে, ১৯৯৭ সালে উপস্থাপিত ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’টির বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা ও এর সুদূরপ্রসারী উপকারীতা অনুধাবন করতে সহায়ক হবে। সেইসঙ্গে স্থানীয় সরকারের প্রকারভেদকরণ ও এর শেষ গন্তব্য ঠিক হওয়া কেন জরুরী তাও স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে, কেননা তা ঠিক হওয়ার সঙ্গে সঠিকভাবে স্তরগুলো নির্ধারিত হবার বিষয়টি যুক্ত রয়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের গন্তব্য কোথায়, স্থানীয় সরকারের প্রকারভেদকরণ ও স্তরবিন্যাসকরণ কি অবস্থায় দাঁড়াবে সেসব পরিষ্কারভাবে জানা যাবে, বোঝা যাবে। এই নিবন্ধে এক সময়ের কৃষিজ সমাজ থেকে বর্তমানকার গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ এবং বর্তমানকার গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ থেকে পরিপূর্ণ নগরীয় সমাজমুখী পরিবর্তন সময়ের সাথে সাথে রূপান্তর প্রক্রিয়াটির চলমান অবস্থা বোঝা যাবে, জানা যাবে, কারণ তা জানা-বোঝার সঙ্গে স্থানীয় সরকারের প্রকারভেদকরণ ও স্তরভেদকরণ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত রয়েছে। স্থানীয় সরকারের একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জোর না দিয়ে একেক সময় একেকটি ইউনিট নিয়ে টানাটানি, হইচই ( যা কয়েকটি বাজেট বক্তৃতায় অসফল অর্থমন্ত্রি মুহিত সাহেবও করেছেন) হচ্ছে মূলত অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত কর্মকান্ড; এই বিষয়টি বৈধ-অবৈধ সব শাসকদের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য; এখানে সেই বিষয়টি দুইজন অবৈধ শাসকের অপকর্মমূলক ঘটনা আলোচনায় এনে গভীরভাবে জানার, বোঝার প্রয়াস নেয়া হল।
অবৈধ শাসক এরশাদ প্রবর্তিত উপজেলা হচ্ছে মূলত একটা মিথ, একটা মিথ্যা নোশান এবং এটি বেশ দায়দায়িত্বহীন, স্বশাসনহীন একটি মধ্যবর্তী প্রশাসনিক ইউনিট। উপজেলা নামকরণটিও সার্থক ও যথার্থ নয়; দেশের আইনকানুন ও বইপুস্তকে বর্ণিত এর সংজ্ঞাটিও বাস্তবতার নিরিখে সঠিক নয়। অথচ গোটা জাতি এই মিথ, এই দায়দায়িত্বহীন ইউনিট, এই স্বশাসনহীন মধ্যবর্তী ইউনিট, এই অসার্থক নামকরণ আর ভুল সংজ্ঞার বেড়াজালেই ঘুরপাক খেয়ে চলেছে। এই বিষয়গুলো বিশেষভাবে তলিয়ে দেখলে তা বুঝতে কারো অসুবিধা হবার কথা নয়; কিন্তু তা বুঝতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রীপরিষদ, নিকার, একনেক, পরিকল্পনা কমিশন ও জাতীয় সংসদ’র বেশ অসুবিধা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়।
অনুরূপভাবে অবৈধ শাসক জিয়া প্রবর্তিত ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ এবং পরবর্তীতে তা কেন্দ্রীক ‘পল্লী পরিষদ,’ ‘গ্রাম সভা,’ ‘গ্রাম পরিষদ,’  ‘গ্রাম সরকার’ ও ‘ওয়ার্ড সভা’ নিয়ে গোটাদেশ মিথ্যা নোশানের বেড়াজালে ঘুরপাক খেয়েছে, খাচ্ছে; ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রাম কেন্দ্রীক কিংবা প্রতিটি ওয়ার্ড কেন্দ্রীক এসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট নিয়ে এক সময় প্রচুর মাতামাতি, লাফালাফি হয়েছে; সবাই ভালভাবে জানে যে, তাতে কাজের কাজ কিছু-ই হয়নি। দেশের এই দু’জন অবৈধ শাসক (প্রেসিডেন্ট জিয়া ও প্রেসিডেন্ট এরশাদ) এর সাংঘাতিক অপকর্ম আর হিমালয়সম দুর্নীতির স্মারক হিসেবে এই গ্রাম সরকার ও উপজেলাকে নিয়ে গোটা জাতির প্রচুর মাতামাতি ও লাফালাফিটা ইতিহাসের পাতায় জাতিগতভাবে ও সমষ্টিগতভাবে ভুল করার, ভুলের মধ্যে ডুবে থাকার এক মহা জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে থাকবে। এবং এর মাধ্যমে জনগণও যে সমষ্টিগতভাবে ভুল করতে পারে, ভুলের মধ্যে ডুবে থাকতে পারে তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল; জনগণ ভুল করেনা, জনগণ ভুল করতে পারেনা-এই ধরনের আপ্ত বাক্য যারা কথায় কথায় বলে থাকেন তাতে তাদেরও বোধদয় হবে বলে আশা করা যায়।
‘উপজেলা’ কেন একটা মিথ, কেন একটা মিথ্যা নোশান, কেন অন্যতম মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে এটি বেশ দায়দায়িত্বহীন তার কারণগুলি ভালভাবে জানা ও বোঝা খুবই দরকার; পাশাপাশি, আর বিলম্ব না ঘটিয়ে এই মিথ্যা নোশানের বেড়াজাল থেকে গোটাদেশ যেন বের হয়ে আসতে পারে তার জন্য সঠিক করণীয় ঠিক ও তা বাস্তবায়ন করাও খুবই জরুরী কর্তব্য।
মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনিক ইউনিটগুলির মধ্যে উপজেলা হচ্ছে অন্যতম মধ্যবর্তী ইউনিট। এর উপরে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট যেমন জেলা ও বিভাগ, এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট যেমন ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড, এবং কোনো কোনো জেলায় এর পাশে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট যেমন “সিটি কর্পোরেশন”। প্রাসঙ্গিকভাবেই “সিটি কর্পোরেশন” শব্দবন্ধটি নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার; অনেকে ভুলবশত “সিটি” শব্দটির বাংলা “মহানগর” বলে থাকেন ও লিখে থাকেন; মিডিয়া, রাজনৈতিক দলগুলো, আইনপ্রণেতাগণ ও নীতিপ্রণেতাগণও তাই করেন; মূলত “সিটি” শব্দটির বাংলা হবে “নগর”; আর সবাই  জানে যে, “কর্পোরেশন” শব্দটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ব্যবহার হয়ে থাকে, তাই কর্পোরেশন শব্দটি বললে বা শুনলে মানুষের মনে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কথাই ভেসে ওঠে; মুনাফা, লাভালাভ কেন্দ্রিক কর্মকান্ডের কথা মানসপটে চলে আসে; প্রশ্ন হল স্থানীয় সরকার কি মুনাফামুখী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান? গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় জনাব আবু তালেব কেবল “নগর” আর “নগর সরকার” শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন; সুতরাং, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা অনুযায়ী কল্যাণমূলক, সেবামূলক ও উন্নয়নমূলক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে ভুল নামকরণ আর মুনাফার গন্ধ যুক্ত নামকরণ থেকে অবিলম্বে মুক্ত করতে হবে; আমরা আশা করি এই ধরনের বড় ভুল থেকে সবাই দায় স্বীকার করেই বের হয়ে আসবেন। সে যাই হোক, স্থানীয় ইউনিটগুলির, স্থানীয় সরকারগুলোর এমনতরো এলোমেলো, গোজামিল অবস্থা কোনোভাবেই কাম্য নয়; এই এলোমেলো গোজামিল অবস্থার নিরসনকল্পে স্থানীয় সরকারের একটি সঠিক ও সমন্বিত স্তরবিন্যাস তথা স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো আগে গ্রহণ করতে হবে; সেই গৃহীত প্রশাসনিক কাঠামোয় সর্বাদিক গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট (জেলা সরকার কিংবা বিভাগীয় সরকার) ও সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয়কে (একদিকে গ্রামীণ এলাকায় ‘ইউনিয়ন সরকার’ ও  অপরদিকে নগরীয় এলাকায় ‘নগর সরকার’) কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে হবে; তা না করে স্থানীয় ইউনিটগুলি ও স্তরগুলির এলোমেলো অবস্থা বজায় রেখে, স্থানীয় ইউনিটগুলির অসঠিক প্রকারভেদকরণ বজায় রেখে, স্থানীয় ইউনিটগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ইউনিট ও সর্বনি¤œ ইউনিটদ্বয় ঠিক না করে এবং তাতে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে কেবল একটি মধ্যবর্তী ইউনিট তথা উপজেলাকে নিয়ে গোটাদেশ অতি উৎসাহ, অতি মনোযোগ, অতি তৎপরতা দেখিয়ে আসছে; ফলে এই উপজেলার জন্মলগ্ন থেকে প্রতিটি নির্বাচনে প্রতিটি উপজেলায় সংশ্লি¬ষ্ট পদপ্রার্থীদের সহিংস কর্মকান্ড অতি মাত্রায় চলে আসছে। পাশাপাশি, হীন রাজনৈতিক স্বাথর্, ব্যক্তি বিশেষের প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্নীতি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, নিকার ও একনেক’র অদূরদর্শি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে উপজেলার সংখ্যা কমে আসার পরিবর্তে এর সংখ্যা বেড়েই চলেছে, এবং আরও নতুন নতুন উপজেলা গঠনের প্রক্রিয়া, প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে; তাতে প্রশাসনিক সিস্টেম কস্ট বাড়ছে; উন্নয়ন ও সেবামূলক ব্যয়ে ঘাটতি থাকছে। অথচ বাংলাদেশে উপজেলার সংখ্যা বাড়ানোর অপ্রয়োজনীয়তা নিয়ে সিডিএলজি, বাপসনিউজ ও এমপো বাস্তবায়ন ফোরাম ছাড়া অন্য কারো বক্তব্য শোনা যায় না; এ এক আশ্চর্য ব্যাপার নয় কি?
বাস্তব ঘটনাগুলো হল, উপজেলায় তেমন কোনো কাজকর্ম নেই, দায়দায়িত্ব নেই, এতে পরিপূর্ণ স্থানীয় সরকার কাঠামো নেই, স্বশাসন নেই, এর নিজস্ব আয়ের তেমন কোনো উৎস নেই, নিজস্ব রাজস্ব আয়ের উৎস সৃষ্টির সুযোগও তেমন একটা নেই বললে চলে, এটির নিজস্ব রাজস্ব আয় সৃষ্টির সুযোগ করতে গেলে তৃণমূলের ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের রাজস্ব আয়ের বেশ কিছু উৎস কর্তন করতে হবে, আর তা করতে গেলে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনবোর্ডের সঙ্গে বিরোধ অনিবার্য হয়ে পড়বে; উপজেলায় জনগণকে সেবামূলক সার্ভিস দেয়ার মত তেমন কোনো সুযোগ নেই বললে চলে. কিংবা এর মাধ্যমে যেসব সেবামূলক সার্ভিস দেয়ার কথা বলা হয় তা দেয়ার কোনো প্রয়োজনই নেই, কারণ সেসব সার্ভিস অনায়াসে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে দেয়া সম্ভব; অন্যসব স্থানীয় ইউনিটগুলি যেমন ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, জেলা, বিভাগ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এর সম্পর্ক কেমন হবে, কিভাবে কতটুকু থাকবে তা সুনির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট করা নেই; বিশেষত ইউনিয়ন ও পৌরসভার সঙ্গে উপজেলার এক ধরনের সাপে নেউলে সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে, এই সাপে নেউলে সম্পর্ক যে কোনো সময় সংঘাতরূপে প্রকাশ্যে আসতে পারে, যা কোনো অবস্থাতেই কারোরই কাম্য নয়, ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই ধরনের একটা নাজুক দৃশ্যমান অবস্থার মধ্যে অন্য ধরনের আরেকটা দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়, তা হল উপজেলার প্রতিনিধিগণের জন্য গাড়ী, ড্রাইবার, বাসা, বিশাল দাপ্তরিক ভবন, পিয়ন, সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে লোভনীয় পদবী, বেতন-ভাতা, সামাজিক মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, বিদেশ ভ্রমণ, অপক্ষমতা ও নানাবিধ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সুযোগসুবিধার দৃশ্য; এসব লোভনীয় বিলাসবহুল সুযোগসুবিধা থাকায় পদপ্রার্থী হবার জন্য পদপ্রার্থীদের মধ্যে এক ধরনের প্রচন্ড মোহ, লোভ তৈরী হয়; পাশাপাশি, উপজেলা নির্বাচনে যারা চেয়ারপারসন ও ভাইস-চেয়ারপারসন পদপ্রার্থী হয়, হতে চায়, তাদের লক্ষ্য কিন্তু উপজেলায় দায়িত্ব পালন করা নয়, উপজেলা কেন্দ্রীক উন্নয়নমূলক, সেবামূলক কর্মকা- নিয়ে চিন্তাভাবনা করাও নয়, তাদের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারী সুযোগসুবিধা ও পদবী কাজে লাগিয়ে জাতীয় সংসদ এর সদস্য হবার পথে উপজেলাকে মই হিসেবে ব্যবহার করা, এবং অন্যসব উপায় অবলম্বনে কেবল নিজস্ব ভাগ্য উন্নয়নে প্রচেষ্টা চালানো; আর কাজকর্ম, দায়দায়িত্ব ছাড়া কেবলই ‘বাবুগিরি,’ ‘নেতাগিরি’ করার, কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে সদায় তৎপর থাকার, নিজেকে একজন বিকল্প ‘এমপি’ ভাবার যে সুযোগসুবিধা রয়েছে তা কার না ভাল লাগে; ফলে এই উপজেলা নির্বাচনে দলীয় ও নির্দলীয় প্রার্থীগণের বেশী বেশী আগ্রহ ও বেশী বেশী সহিংস আচরণ দেখা যায়।
এতে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, এই উপজেলার জন্মগত অসৎ উদ্দেশ্য ও জঘন্য কলংক এখনো বহাল রয়েছে; জেনারেল এরশাদ অবৈধ উপায়ে ক্ষমতায় এসে অবৈধ ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত ও পাকাপোক্ত করতে এবং স্থানীয় মধ্যবর্তী পর্যায়ে নিজস্ব অনুগত দলীয় মোড়ল তৈরী করতে উপজেলা সৃষ্টি করেন, এবং তিনি বিশেষ ব্যবস্থায় সমস্ত আইনকানুন লংঘন করে রাষ্ট্রীয় অর্থ ও ক্ষমতা বিলিয়ে দিয়ে উপজেলার প্রতি প্রবল মোহ ও একটি অনুগত মোড়লগোষ্ঠী তৈরী করতে সক্ষম হন। আর এই অনুগত মোড়লগোষ্ঠীই পরবর্তীতে জাতীয় পার্টির স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী মধ্যবর্তী খুঁটি হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়; একটু খোঁজ নিলে দেখা যাবে এঁরাই এখনকার জাতীয় পার্টির স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে মূল খুঁটি হিসেবে কাজ করছে। রাষ্ট্রীয় অর্থে ও সরকারী ক্ষমতাবলে নিজস্ব দলীয় খুঁটি, মোড়ল তৈরী করাটা হচ্ছে মহা অপরাধ, মহা দুর্নীতি; এই মহা অপরাধ, এই মহা দুর্নীতির কথা মনে রাখা, আমলে নেয়া উচিত নয় কি? অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় এসব অপরাধ, এসব দুর্নীতি যেন কিছু-ই না। এসব বিষয়ে দেশের অন্য সব রাজনৈতিক দলও নীরব; তাই তো দেখা যায়, অবৈধ শাসক এরশাদকে, তাঁর দল জাতীয় পার্টিকে এখনও ‘উপজেলা’ তথা ‘উপজ্বালা’ নিয়ে গর্ব করতে শোনা  যায়! হায় রে বাংলাদেশ!
এই ধরনের একটা অবৈধ অপরাধমূলক শাসনিক অবস্থার মধ্যেই আরও অনেকে ক্ষমতা, সুবিধা ও অর্থ লোভের পাশাপাশি বুঝে, না বুঝে উপজেলার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যান। বেশ কিছু এনজিও দাতা সংস্থার টাকায় দেশীয় শাসকের চাহিদায় আয়োজিত সভা-সমাবেশে এই উপজেলাকে নিয়ে বেশ মাতামাতি, লাফালাফি করে; আবার কিছু কিছু এনজিও কর্মকর্তার মধ্যে নিজস্ব ব্যক্তিগত স্বার্থে এনজিও কমসূচী, অর্থ, জনবল ইত্যাদি কাজে লাগিয়ে নিজস্ব উপজেলায় চেয়ারপার্সন, ভাইস-চেয়ারপার্সন হবার খায়েশ ও লোভ প্রচন্ডভাবে ক্রিয়াশীল থাকায় উপজেলা কেন্দ্রিক অতি তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায়। এদের সঙ্গে যুক্ত হয় জাতীয়ভাবে পরিচিত কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তি, যাঁরা প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বোঝে না, মওকা বুঝে কথায় কথায় গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে অথচ গণতন্ত্রায়ন বোঝে না, গণতন্ত্রায়ন শব্দটি উচ্চারণ করতে চায়না, গণতন্ত্রায়ন কর্মসূচী সম্পর্কে ধারণা নেই; বিশেষত এঁ রা সুবিধাবাদী অবস্থান থেকে সুবিধাজনক শব্দ “সং¯কার” শব্দটি নিয়ে সব ধরনের শাসনিক আমলে পাগলপ্রায় থাকে, থেকে কেবল সুযোগসুবিধা হাতিয়ে নেয়; এঁরা মূলত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ, প্রকারভেদকরণ, সার্থক নামকরণ, সঠিক সংজ্ঞায়িতকরণ, অর্থায়ন, দায়িত্ব বণ্টন, পারস্পরিক সম্পর্ক, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, নির্বাহিক ও বিধানিক পরিষদের পার্থক্য সম্পর্কে জানেনা বুঝেনা, বুঝতে চায়ওনা; এঁরাই স্থানীয় সরকার আর কেন্দ্রীয় সরকারের কাঠামোতে নারীর শতভাগ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এমপো’র প্রয়োগ চায়না, ইত্যাদি ইত্যাদি; অথচ তাঁরা নিজেদেরকে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে সবসময় পরিচয় দিয়ে থাকে এবং এনজিও আয়োজিত সভা, সেমিনার, মানববন্ধন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার টকশোতে কখনও অতিথি বক্তা, কখনও অযাচিত বক্তা হয়ে বিশেষত উপজেলা কেন্দ্রিক অসার কথামালা জোর গলায় ব্যক্ত করেন; এঁদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মিডিয়ার বেশকিছু সাংবাদিক ও উপস্থাপক কর্মকর্তা, যাঁরা আর্থিক সুযোগসুবিধার বিনিময়ে উপজেলা বিষয়ক সংবাদ প্রকাশে প্রচারে সহযোগিতা দিয়ে থাকেন; এবং এদেরই কেউ কেউ মাঝেমধ্যে স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত অসার প্রতিবেদন প্রচার প্রকাশের মাধ্যমে ‘স্থানীয় সরকার বিষয়ক সাংবাদিক/প্রতিবেদক’ এর পরিচয় দাঁড় করিয়ে বিশেষ সুবিধা আদায়ে সচেষ্ট থাকেন।
পাশাপাশি, খুবই দুঃখজনক হলেও শতভাগ সত্যি যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠায় ও তার ক্রমাগত উন্নয়নে আকাংখা, পরিকল্পনা, কর্মসূচী ও প্রস্তুতি রয়েছে এমনতরো একটি রাজনৈতিক দলও খুঁজে পাওয়া যায় না, যায়নি; অথচ রাজনৈতিক দলগুলি গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন প্রসঙ্গে সবসময় লিপ সার্ভিস দিয়ে থাকে; এই লিপ সার্ভিস আর অন্তর্গত বিশ্বাস কখনো এক ছিলনা, এখনো নেই বলে প্রতীয়মান হয়; অপ্রিয় হলেও সত্য কথা হল, বাংলাদেশে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনই হয়নি; বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে মিশ্রিত লক্ষ্য প্রসূত রাস্তার, মাঠের আন্দোলন হয়েছে, হয়; আপাত দৃষ্টিতে ওইসব আন্দোলনে সফলতা দেখা গেলেও সেই সফলতা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও তার উন্নয়নে কাজে লাগেনি; কারণ সমাজ, দল ও দেশের সার্বিক অর্থে গণতন্ত্রায়ন সম্পন্ন করার শিক্ষাগত ও মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ প্রক্রিয়া এই সব আন্দোলনে, সংগ্রামে একেবারেই ছিলনা বললে অত্যুক্তি হবেনা। সে যাই হোক, বড় দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে সময়ে সময়ে বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনে বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্য সাধন করতে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিগণকে, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হতে আগ্রহী দলীয় ব্যক্তিবর্গকে ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ব্যবহার করতে দেখা যায়; এবং জাতীয় নির্বাচনে দলীয় ইশতেহারে গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকার উন্নয়ন প্রসঙ্গ বেশ জোরালোভাবে উপস্থাপিত করা হয়। তা করতে গিয়ে এসব দলের কিছু সুচতুর নকলবাজ ব্যক্তি প্রতিটি জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনের পূর্বলগ্নে দলীয় ইশতেহার প্রণয়ন কালে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্র বিষয়ে নকল করার মহড়ায় নেমে থাকে। এসব নকলবাজ ব্যক্তিরা অন্য কারো আইডিয়া, স্লোগান, গবেষণা, অন্য কারো প্রণীত, প্রস্তাবিত বিষয় ও কর্মসূচী জাতীয় স্বার্থে অনুসরণের জন্য, গ্রহণের জন্য নিয়মনীতি মেনে দলীয় ইশতেহারে কিংবা দলীয় কর্মসূচীতে তা অন্তর্ভুক্ত করেন না, করতে চান না; তাঁরা দেশের ব্যক্তি বিশেষের নিজস্ব স্ট্যাডি, গবেষণা, কর্মসূচী, শ্লোগান, ক্যাম্পেইন, অবদানকে অস্বীকার করার, চুরি করার বাতিকগ্রস্ততা থেকে কেবল নগ্নভাবে নকলেই সিদ্ধহস্ত; এঁরা মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক চোর এবং জনগণের অর্থ ও সম্পদ চোর তো বটেই। অথচ এঁরা স্ব স্ব দলের কাছে সম্মানীয় বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, নির্বাচনী ইশতেহার প্রণেতা, দলীয় কর্মসূচী প্রণেতা, ইত্যাদি ইত্যাদি! এ এক মহা আজব কারবার নয়কি! তাই তো দেখা যায়, এসব দলের উপজেলা সম্পর্কীয় ইশতেহারগত অংগীকার শুধু কথার ফুলঝুরি আর অন্তঃসার শূন্য কথামালায় ভরপুর; কারণ স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে উপজেলার অবস্থান, গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, ক্ষমতা, দায়দায়িত্ব, স্বশাসন, অর্থায়ন, কাঠামো ইত্যাদি সম্পর্কে এসব দলের জেনে বুঝে কোনও সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট অবস্থান নেই; এ হচ্ছে একজন অবৈধ শাসকের চরম অপকর্মের কুফলে প্রভাবিত হয়ে উত্তরাধিকার বহনে রাজনৈতিক দলগুলোর অশুভ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকা; এ যেন এক চরম হ-য-ব-র-ল অবস্থার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর দিকহারা হয়ে ছোঁটাছুটিতে লিপ্ত থাকা। পাশাপাশি, জনগণেরও একটা বিরাট অংশ উপজেলা নির্বাচন কালীন সময়ে নগদে পাওয়া আদর আপ্যায়ন আর কদরেই তুষ্ট থাকে। নির্বাচনে ও তার পরে কি হল তা তাঁদের নজরদারি ও তদারকির বিষয় হিসেবে থাকে না। ভোটারগণ মূলত জানেওনা উপজেলা কেন্দ্রিক কি কি দায়িত্ব সম্পন্ন করানোর জন্য উপজেলা চেয়ারম্যান-ভাইসচেয়ারদ্বয় নির্বাচিত করেছে, করছে; ঠিক যেমন পদপ্রার্থীগণ ভালভাবে জানেনা কি কি দায়িত্ব পালন করার জন্য নির্বাচিত হতে চায়, হয়েছে। অতএব, সার্বিক অর্থেই বলা যায়, উপজেলা হচ্ছে একটা মিথ, একটা অলীক স্বপ্ন, একটা মিথ্যা নোশান, একটা দায়দায়িত্বহীন, স্বশাসনহীন মধ্যবর্তী ইউনিট। গোটাদেশ এই মিথ্যার বেড়াজালে ঘুরপাক খাওয়াটা, সরব থাকাটা হচ্ছে এক মহা আশ্চর্যজনক ব্যাপার!
    অনুরূপভাবে, গোটা জাতি আরেকটা মিথ, আরেকটা মিথ্যা নোশানের বেড়াজালে ঘুরপাক খেয়ে আসছে; সেই মিথ আর মিথ্যা নোশানটা হল, অবৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রবর্তিত তথাকথিত ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’। এই মিথ তথা অপকর্মের কুফলে প্রভাবিত হয়ে এবং একে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসক দ্বারা সৃষ্ট পল্ল¬¬ী পরিষদ, গ্রাম সভা, গ্রাম পরিষদ, গ্রাম সরকার ও ওয়ার্ড সভা নামের অপ্রয়োজনীয় ইউনিটগুলি নিয়ে গোটা জাতি মিথ্যার বেড়াজালে জড়িয়ে থাকে; ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিটি গ্রাম কিংবা প্রতিটি ওয়ার্ডে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অবৈধ ও বৈধ শাসকগণ দ্বারা এসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠিত হয় কিংবা গঠন করার অপচেষ্টা চলে; এসব ইউনিট কেন অপ্রয়োজনীয়, কেন মিথ, কেন মিথ্যা নোশান, কেন অপচয়মূলক আর অসৎ উদ্দেশ্যমূলক তার স্বরূপ বুঝাটাও খুবই জরুরী। এর স্বরূপ বুঝার মাধ্যমে এও বুঝা যাবে যে, কেন স্থানীয় সরকারের স্তরগুলো, প্রকারগুলো ও গন্তব্য আগে ঠিক করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
মূলত, ইউনিয়ন হচ্ছে গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের মৌলিক গ্রামীণ প্রশাসনিক ইউনিট; সাধারণত ১০ থেকে ১৫টি গ্রাম নিয়ে একেকটি ইউনিয়ন গঠিত হয়ে থাকে; এই ইউনিয়নের মধ্যে অবস্থিত হাট-বাজার-ঘাট-গঞ্জগুলিও কোনো না কোনও গ্রামের মধ্যেই অবস্থিত। সেজন্য দেশের মানুষের কাছে ইউনিয়ন মানে গ্রাম আর গ্রাম মানেই ইউনিয়ন; গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী নগরীয় স্থানীয় সরকারের নগরীয় প্রশাসনিক ইউনিট (পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড) এর সংখ্যা ও আয়তন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ ইউনিট হিসেবে ইউনিয়নের মোট সংখ্যা ও আয়তন কমে আসার কথা; কিন্তু প্রশাসনিক দুর্নীতি আর অশুভ রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ইউনিয়নের সংখ্যাও বেড়েই চলেছে, এবং আরও কিছু নতুন নতুন ইউনিয়ন গঠনের প্রচেষ্টা চালু রয়েছে; তাতে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক সিস্টেম কস্ট অনেক অনেক গুণ বেড়ে গেছে, এবং তা আরও বাড়তে থাকবে; অথচ ইউনিয়নের সংখ্যা যথা সম্ভব কমিয়ে এনে প্রশাসনিক সিস্টেম কস্ট যথা সম্ভব সীমিত রেখে তাতে উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক ব্যয় বাড়ানো খুবই জরুরী প্রয়োজন ছিল, রয়েছে।
গ্রামীণ এলাকায় প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে ইউনিয়ন কেন্দ্রীক সার্বিক উন্নয়ন মানেই ১০-১৫টি গ্রামের উন্নয়ন, গ্রামীণ মানুষের উন্নয়ন; অথচ, প্রকৃত ঘটনা হল, এই ইউনিয়ন ভিত্তিক গণতন্ত্রায়ন ও তার  সার্বিক উন্নয়ন সাধনে আজ অবধি কোনো বিশেষ উদ্যোগ, বিশেষ আয়োজন গৃহীত ও দৃশ্যমান হয়নি, হচ্ছেনা। বরং এই ইউনিয়নকে পাশ কাটিয়ে এর নীচে যেমন গ্রাম সরকার ও এর ওপরে যেমন উপজেলা নামক অপ্রয়োজনীয় ইউনিটগুলো গঠনের নামে নানান সময়ে নানান রকমের অপতৎপরতা চালানো হয়েছে, হচ্ছে; ওই সব অপতৎপরতার সঙ্গে দেশের অনেক নামকরা, নামী দামী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জড়িত। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অবৈধ উপায়ে ক্ষমতায় এসে ও থেকে, রাষ্ট্রীয় অর্থে ও সরকারী ক্ষমতায় নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন ও গ্রামীণ তৃণমূলে অনুগত, চাটুকার দলীয় কর্মী-সমর্থক তৈরীর লক্ষ্যে ইউনিয়নের মধ্যে ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ গঠন করার উদ্যোগ নেন; এবং এই ইউনিট কেন্দ্রীক বেশী বেশী দলীয় কর্মী-সমর্থক তৈরী করার লক্ষ্যে নতুন নতুন গ্রাম সৃষ্টিতে প্রবল উৎসাহ যোগায়; তাতে গ্রামের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে ৬৮ হাজার থেকে ৮৭ হাজারের বেশী সংখ্যক গ্রামে উন্নীত হয়ে যায়; কারণ যত বেশী বেশী গ্রাম, তত বেশী বেশী গ্রাম সরকার, আর তত বেশী বেশী অনুগত, চাটুকার, টাউট দলীয় সদস্য; এতে দীর্ঘকালের প্রতিটি গ্রামভিত্তিক দৃঢ় সামাজিক বন্ধন ও একতা ভেঙ্গে তছনছ, চুরমার হয়ে যায়; জাতীয় অর্থ, শ্রম ও সময়ের বিপুল অপচয় ঘটে; ইউনিয়ন পরিষদ হয়ে পড়ে চরম উপেক্ষিত, এবং গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক গ্রামীণ ইউনিটের পরিবর্তে ইউনিয়ন হয়ে পড়ে গুরুত্বহীন এক মধ্যবর্তী ইউনিট। রাষ্ট্রীয় অর্থে, দাপটে কেবল-ই ব্যক্তিগত ও নতুন রাজনৈতিক দলীয় কর্মী-সমর্থক তৈরীর স্বার্থে পরিচালিত এই সরকারী উদ্যোগ ছিলো এক মহা দুর্নীতি, এক মহা অপরাধ; এ হল অবৈধ শাসকের অবৈধ ক্ষমতায় সৃষ্ট এক মারাত্বক বিষফোঁড়া, যার যন্ত্রণায় গোটা জাতি এখনো খেসারত দিয়ে চলেছে। অবৈধ শাসক জিয়ার এই মহা অপরাধ, এই মহা দুর্নীতি আর এই সাংঘাতিক বিষফোঁড়ার বিষয় হালকাভাবে নেয়া একদম উচিত নয়। এই মহা অপরাধ, এই মহা দুর্নীতির কথা অবৈধ ক্ষমতাবলে সৃষ্ট সংশ্লিষ্ট দলটি স্বার্থগত কারণেই হালকাভাবে নিয়ে  থাকে, থাকতে পারে; কারণ একটু অতীতে গেলে, একটু অতীত স্মরণ করতে চেষ্টা করলেই মনে পড়ে যাবে যে, জিয়াউর রহমান তখনকার গ্রাম সরকারের মাধ্যমেই তৃণমূলে সুবিধাবাদী, নীতিহীন, টাউট ও বাটপার জাতীয় লোকদের নিয়ে বিএনপি’র সমর্থক গোষ্ঠী তৈরী করে ছিলেন; পরবর্তী কালে এঁরাই গ্রামে বিএনপি’র শক্ত খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়; তৃণমূলের মত  জাতীয় পর্যায়েও অনুরূপ চরিত্রের লোকজন নিয়েই জিয়াউর রহমান বিএনপি’র সমর্থক গোষ্ঠী তৈরী করেছিলেন; বিএনপি স্বার্থগত কারণেই এসব বিষয় ভুলে থাকে, থাকতে হয়। কিন্তু অন্যসব রাজনৈতিক দল ও  গোটা জাতি কেন তা ভুলতে বসেছে? তা কি ভুলে যাওয়া উচিত? এই প্রশ্ন থাকল সকল মানুষের প্রতি। একই ধারায় পরবর্তীতে বিএনপি ক্ষমতায় এসে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বাধীন স্থানীয় সরকার বিষয়ক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রি ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের নেতৃত্বে একবার ‘গ্রাম সভা’ গঠন করার অপচেষ্টা চালায় এবং আরেকবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূঁঞার নেতৃত্বে প্যাডসর্বস্ব ‘গ্রাম সরকার’ গঠন করতে গিয়ে দেশের প্রচুর অর্থ, শ্রম ও সময় নষ্ট করা হয়, এবং এই প্যাডসর্বস্ব গ্রাম সরকারের জন্য রাষ্ট্রীয় শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে করাপশনকে গ্রামীণ তৃণমূলে বিস্তৃত করা হয়। উভয় বার ক্ষমতায় থাকা কালে বিএনপির যেসব নেতা স্থানীয় সরকার বিষয়ক দায়িত্বে ছিল, তাদের দ্বারা স্থানীয় সরকারের কেবল ক্ষতিই সাধিত হয়েছে; তারাসহ এই দলের গোটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার স্থাপন ও তার উন্নয়নমুখী কোনো চিন্তাভাবনা করেছে কিংবা করতে চেয়েছে এমনতরো নজির একদম খুঁজে পাওয়া যায়না, যদিও ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ বিএনপির নীতিনির্ধারকগণের কাছেও বার বার তুলে ধরা হয়েছিল; তা তারা সবাই এক কান দিয়ে শুনেছে, আরেক কান দিয়ে তা বের করে দিয়েছে; তারা দেশ, দল ও সমাজের সার্বিক গণতন্ত্রায়ণ ও গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত হিসেবে স্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আমলে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা কখনও উপলব্ধি করেনি, করতে চায়নি, আর এখনও এই দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এসব বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে বলে, করতে চায় বলে একদম প্রতীয়মান হয়না; আর এই দলের জন্মগত কলংকিত চরিত্র একটুও পরিবর্তমুখী হয়েছে বা হতে চেয়েছে বলে কোনও নজির কি দলে কিংবা রাষ্ট্রে রয়েছে? তারপরও কি বিএনপি’র স্থানীয় সরকার, গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক অবস্থান, আকাংখা বুঝতে আর কিছু বাকি থাকে? সেসঙ্গে জিয়ার ওই অপকর্মের প্রভাব কিভাবে অন্যসব রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রভাবিত করেছে তাও জানার, বুঝার প্রয়োজন রয়েছে। ধরা যাক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর কথা; এই দল ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে গ্রামীণ তৃণমূলে দলীয় ভিত্তি আরও মজবুত করার এক অলীক স্বপ্নে তাড়িত হয়ে এ্যাডভোকেট রহমত আলীর নেতৃত্বাধীন স্থানীয় সরকার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান (পরে তিনি মাননীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন) এর নেতৃত্বে জাতীয় সংসদে তেমন কোনো আলাপ আলোচনা ছাড়াই অত্যন্ত তাড়াহুড়ার সহিত ইউনিয়নের মধ্যে প্রতি ওয়ার্ড কেন্দ্রিক ‘গ্রাম পরিষদ’ গঠন করার আইন প্রণীত হয়, এবং তাঁরই নেতৃত্বে তা বাস্তবায়নের জন্য অপচেষ্টা চলে; বিন্তু সেই অপচেষ্টা কেবল জনাব আবু তালেব এর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবল বাধার মুখে বন্ধ হয়ে যায়; প্রসঙ্গক্রমেই বলা প্রয়োজন যে, এ্যাডভোকেট রহমত আলী কমিশনের ওয়ার্ড ভিত্তিক তথাকথিত ‘গ্রাম পরিষদ’ গঠনের সুপারিশটি ও অন্যসব সুপারিশগুলো একদম অপরিপক্ক, ভঙ্গুর, খন্ডিত আর গোজামিলে ভরপুর; এক কথায় বলা যায় যে, রহমত আলী কমিশনের গোটা প্রতিবেদনটি সার্বিক বিবেচনায় বাস্তবায়নের অযোগ্য একটি প্রতিবেদন। তা সত্ত্বেও, বাস্তব অবস্থা দেখে মনে হয়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকগণ এ্যাডভোকেট রহমত আলী কমিশনের ওই গারবেজ তুল্য প্রতিবেদনটি নিয়ে এখনও সন্তুষ্ট কিংবা দ্বিধাগ্রস্ত রয়েছেন; পাশাপাশি আওয়ামী লীগের প্রায় সকল কেন্দ্রীয় নেতাগণ ও রহমত আলী কমিশনের সকল সদস্যগণ ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ সম্পর্কে বার বার অবগত হয়েছেন, এবং এর সবিস্তার ব্যাখ্যা শুনেছেন, জেনেছেন; তার পরও এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে, উপলব্ধিতে নিতে, বাস্তবায়নে যেতে এতবেশী সময় লাগার কারণ একদমই বোধগম্য নয়। সে যাই হোক, এখন তো বিএনপিকে ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার,’ ‘গ্রামসভা’ ও ‘গ্রাম সরকার’ নিয়ে কথা বলতে দেখা যায় না, শোনা যায় না। জাতীয় পার্টিকে ‘পল্ল¬ী পরিষদ’ নিয়ে কথা বলতে শোনা যায় না, দেখা যায় না; অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, অবৈধ শাসক এরশাদকে “পল্লী” শব্দ কেন্দ্রীক ও “পল্লী পরিষদ” কেন্দ্রীক ‘পল্লীবন্ধু’ বানানোর খায়েশও এই দলের ফুরিয়ে গিয়েছে! আর আওয়ামী লীগকে ইউনিয়নে ওয়ার্ড ভিত্তিক তথাকথিত ‘গ্রাম পরিষদ’ নিয়ে কোনও বক্তব্য দিতে, শব্দ করতে দেখা যায় না, শোনা যায় না। তবে প্রতি গ্রামে কিংবা ইউনিয়নের প্রতি ওয়ার্ডে ওইসব তথাকথিত ইউনিট গঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে যেসব ব্যক্তি নানাবিধ ফায়দা লুঠেছে, অপ্রয়োজনীয় বই-টই লিখে প্রচুর টাকাপয়সা কামিয়েছে, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ পরিচিতি মিডিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছে, দাতা গোষ্ঠীর টাকায় সভা-সেমিনার করেছে, নতুন নতুন এনজিও যেমন ‘স্থানীয় সরকার সহায়ক কমিটি’ গঠন করেছে, তারা এখনো মাঝেমধ্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠনের পক্ষে আড়ালে-আবড়ালে, চুপিসারে সাফাই গাইতে দেখা যায়। এসব অপকর্মকান্ডের বিরুদ্ধে, ইউনিয়নের মধ্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠনের বিরুদ্ধে সিডিএলজি’র লাগাতার ক্যাম্পেইন ও তীব্র প্রতিবাদ এর কারণে এক দিকে ওইসব ব্যক্তির জোরগলা বেশ ক্ষীণ ও দুর্বল হয়েছে; অপর দিকে ওইসব রাজনৈতিক দল বুঝতে পেরেছে যে, ইউনিয়নের মধ্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠন করার নামে আবার লাফালাফি, মাতামাতি করলে হালে আর পানি পাওয়া যাবে না; তাই তারাও চুপসে গেছে বা চুপসে যেতে বাধ্য হয়েছে বলে বোঝা যায়। শেষ তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গঠিত একটি স্থানীয় সরকার বিষয়ক কমিটিও ইউনিয়নের মধ্যে প্রতি ওয়ার্ডে ‘ওয়ার্ড সভা’ ও নগরীয় ওয়ার্ডে ‘ওয়ার্ড কমিটি’ গঠনের সুপারিশ করে; এই কমিটির জন্য অন্যসব খরচ ছাড়া শুধু ওই তথাকথিত সুপারিশ প্রকাশের জন্য ঢাকায় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত এক সভার জন্য ব্যয় করা হয়েছে প্রায় সোয়াশ কোটি টাকা, এর মাধ্যমে জাতীয় অর্থের অপচয় কারে কয়, তা ওই কমিটি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ভালভাবে দেখিয়েছে! ওই কমিটির প্রধান ড. শওকত আলী পুরস্কার স্বরূপ শেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাও হয়েছেন; তথাকথিত ওয়ার্ড সভা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠনের সুপারিশসহ ওই কমিটির অন্য সুপারিশগুলিও বড্ড সেকেলে, খন্ডিত ও বাস্তবায়নের একদম অযোগ্য; প্রথম দিকে মিডিয়াসহ অনেকেই না বুঝে, না জেনে ওই কমিটির প্রতিবেদনটির প্রতি সমর্থন জানায়, আবার জেনেবুঝেই কেবল স্বার্থগত কারণে তার পক্ষে শেষ তত্বাবধায়ক সরকারের গর্ভে সৃষ্ট ‘গভার্নেন্স কোয়ালিশন’ নামের একটি এনজিও গ্রুপ দাতা সংস্থার টাকায়, তত্বাবধায়ক সরকারের সেবাদাস হিসেবে সভা-সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে বেশ হইচই করে থাকে, ‘হাঙ্গার প্রজেক্ট’ নামের আরেকটি এনজিও’র বাংলাদেশস্থ কর্ণদার (ড. বদিউল আলম মজুমদার) এর বিশেষ ব্যক্তিগত স্বার্থে ওই এনজিওটিও অনুরূপ কাজে লিপ্ত থাকে, আর এই হাঙ্গার প্রজেক্ট এরই পকেট সংগঠন ‘সুজন’ও ওই প্রতিবেদন নিয়ে মাঠ গরম করার অপচেষ্টা চালায়, ‘ডেমক্রেসিওয়ার্চ’ নামের আরেকটি সুবিধাভোগী এনজিও ওই প্রতিবেদনের পক্ষে প্রচার প্রচারণায় সচেষ্ট থাকে, এবং এই এনজিও ইউনিয়ন পরিষদের তথাকথিত ‘স্থায়ী কমিটি’ শক্তিশালীকরণের নামে দাতা সংস্থার লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতে লোক দেখানো সভা সেমিনারও আয়োজন করত; অথচ ওই এনজিও বিধানিক পরিষদীয় বা সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কি, তা-ই বুঝত না, বুঝে না; এনজিওটি গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার চায়, বুঝে তার কোনও লক্ষণ এর কর্মকা-ে কখনও প্রতিফলিত হয়নি, হয়না। ওই অসার প্রতিবেদনটির পক্ষে বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রও নিজস্ব স্বার্থগত কারণে প্রবল প্রচার প্রচারণায় যুক্ত হয়ে পড়ে; ‘মানুষের জন্য’ নামক একটি এনজিও অনুরূপ কর্মকা-ে লিপ্ত থাকে, যদিও এই এনজিওতেও স্থানীয় সরকার বুঝে, জানে এমন কোনো কর্মকর্তা দেখা যায়নি; তখন এই এজিও’র এক বিশেষ সুবিধাভোগী কর্মকর্তা স্থানীয় সরকার বিষয়ক গার্বেজ তুল্য একাধিক নিবন্ধ ডেইলি স্টার নামক একটি পত্রিকায় প্রকাশ করায় এবং ইউরোপের একটি দেশ থেকে একটি স্কলারশিপ বাগিয়ে নেয়। অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলে পরিচিত ‘সিপিডি’ও ওই অসার প্রতিবেদনের পক্ষে অবস্থান নেয়, যদিও এই প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার, গণতন্ত্রায়ন বুঝে, জানে এমন কোনও গবেষক, কর্মকর্তা আছে বলে আমাদের অন্তত জানা নেই; কিন্তু সিডিএলজির বুদ্ধিবৃত্তিক তীব্র আন্দোলনের ফলে ওই প্রতিবেদনের সুপারিশগুলির অসারতা, দুর্বলতা খোলাসা হতে থাকায় তার প্রতি অনেকের সমর্থন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে, এবং ওই কমিটির সদস্যদের উচ্চকণ্ঠ আস্তে আস্তে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতম হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়; ওই কমিটির সুপারিশগুলি (মূলত একেও নকলবাজদের নকল বলাই শ্রেয়) এবং ওইগুলির ভিত্তিতে প্রণীত আইনকানুন বিধিবিধান যত দ্রুত সম্ভব বাতিল হয়ে যাওয়া উচিত। এই শেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদ্যোগে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি স্থানীয় সরকার কমিশনও গঠিত হয়; এ কমিটির সদস্যরা কেবল বেতন, ভাতা, অফিস, গাড়ী, বাড়ি, পদমর্যাদা ও নানা রকমের সুযোগসুবিধা নিয়েই ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে; এদের একজনেরও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার, বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও এর অভ্যন্তরীণ স্ট্যাটাসগত ও গুণগত পরিবর্তন সম্পর্কে তত্ত্বগত ও বাস্তব ধারণা ছিলনা; এদেরই একজন (ড. তোফায়েল আহমেদ) এখনও বিলুপ্ত কমিশনের পদবী ব্যবহার করে মিডিয়াসহ অন্যসব জায়গায় নানা রকমের সুযোগসুবিধা নিয়ে থাকেন, এবং তিনি তার অসার গার্বেজ তুল্য বক্তব্য কথায় লেখায় সবসময় তুলে ধরেন। তাজ্জব ব্যাপার হল, এই তিনি, যিনি স্থানীয় সরকারের প্রকারভেদ ঠিকভাবে করতে পারেন না, সর্বনি¤œ ইউনিট কোনটি তা বুঝতে পারেন না, সর্বোচ্চ ইউনিট ঠিক করার ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ করার প্রয়োজনীয়তা বুঝেন না, নির্বাহিক ও বিধানিক পরিষদের পার্থক্য বুঝেন না, স্তরবিন্যাসকরণ ও তার গুরুত্ব বুঝেন না, সার্থক নামকরণ ও যথার্থ সংজ্ঞায়িতকরণের গুরুত্ব অনুধাবন করেন না, ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন না, নারীর শতভাগ প্রতিনিধিত্ব তথা এমপোতে বিশ্বাস করেন না, গ্রামীণ থেকে গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশের রূপান্তরিত উপস্থিতি এখনও টেরই পাননা, বিদ্যমান গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ থেকে একটি পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এ উন্নীত হবার চলমান প্রক্রিয়া উপলব্ধিতে নিতে চাননা, স্থানীয় সরকারের শেষ গন্তব্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা জানেন না, বোঝেন না, ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ মিডিয়া কর্মিরা তাঁকে (এবং ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ড. আকবর আলি খান, ড. শওকত আলী সহ আরও কয়েক জনকে) স্থানীয় সরকার “বিশেষজ্ঞ” হিসেবে প্রচার প্রকাশ করেই চলেছে; প্রশ্ন হল, এসব ব্যক্তিসহ আরও কিছু ব্যক্তি (কারা তা বুঝে নিলে খুশী হব) ও কিছু এনজিও সম্পর্কে মিডিয়া কর্মিরা কবে সচেতন হবে? কবে শেষ হবে স্থানীয় সরকার নিয়ে সব ধরনের অপতৎপরতা, অপপ্রচার? আর কবে শেষ হবে অসার, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রচার প্রকাশের লাগাতার মহড়া?
প্রকৃতপক্ষে, স্থানীয় সরকার বিষয়ক যত রকমের মিথ আর অপতৎপরতা রয়েছে, তার বিরুদ্ধে সর্বাত্বক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে সূচিত হয় ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী থেকে। ওই দিন ঢাকায় জাতীয় জাদুঘরে এক জাতীয় সেমিনারে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ উপস্থাপিত করেন স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক গবেষক আবু তালেব, এবং সেই ১৩ জানুয়ারী থেকেই তাঁর উদ্যোগে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ও ২০২০ সালের মধ্যে একটি উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তথা গণস্বপ্ন ২০২০ প্রতিষ্ঠার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন সূচিত হয়; আর এই আন্দোলনই স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত যত রকমের মিথ, মিথ্যা নোশান, আনফাউন্ডেড নোশান, অপচেষ্টা, অপতৎপরতা রয়েছে তা আস্তে আস্তে দূরীভূত করে আসছে; শুরুতে অনেকেই এই আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য বুঝতে পারেননি; ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিটি গ্রাম কিংবা ওয়ার্ড ভিত্তিক স্থানীয় সরকারের ইউনিট স্থাপনের কোনো প্রয়োজন নেই, জনাব আবু তালেবের এই দৃঢ় বক্তব্যের, অবস্থানের সারবত্তাও অনেকে একেবারেই বুঝতে পারেননি, এবং অনেকেই তাঁর এই দৃঢ় বক্তব্যকে, অবস্থানকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি বলে তাঁকে অনেকেই ভুলও বুঝেছেন। তাতে কিন্তু তিনি একটুও দমে যাননি; তিনি তাঁর সুদৃঢ় বক্তব্য নিরলসভাবে গোটা জাতিকে সাধ্যমত লাগাতার জানিয়ে বুঝিয়ে চলেছেন। এটা তো ঠিক যে, সমষ্টিগত কিংবা জাতিগত ভুল ভাঙ্গানো সহজ কাজ নয় এবং এও ঠিক যে, যে কোনো সত্য বিষয় সহজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়না, যায়নি। এসব বিষয় মাথায় রেখেই সিডিএলজি লাগাতার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার স্থাপন, কার্যকর ও স্থায়ী না হওয়া পর্যšত সিডিএলজি’র এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন, সংগ্রাম অবশ্যই চলতে থাকবে। ফলে, আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, স্বনির্ভর গ্রাম সরকার, পল্ল¬ী পরিষদ, গ্রাম সভা, গ্রাম পরিষদ, গ্রাম সরকার ও ওয়ার্ড সভার মত উপজেলাও একটা মিথ ও অপ্রয়োজনীয় ইউনিট হিসেবে একদিন না একদিন অবশ্যই প্রমাণিত হবে; এবং তথাকথিত ‘গ্রাম সরকার’র মত উপজেলার প্রতিও দেশবাসী ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের প্রবল মোহ ভঙ্গ হবে; আর সেজন্য, ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী থেকে পরিচালিত দেশের সার্বিক গণতন্ত্রায়নের ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার বিরতিহীন বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও তার অপরিসীম গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে, এই ১৩ জানুয়ারীকেই “স্থানীয় সরকার দিবস” হিসেবে ঘোষণা ও পালন করার জন্য সিডিএলজি, এমপো বাস্তবায়ন ফোরাম ও বাপসনিউজ জোর দাবী জানিয়ে আসছে। আমরা আশাকরি সরকার তা বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে তার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
প্রাসঙ্গিকভাবে আরেকটি বিষয় পাঠক সমাজের অবগতির জন্য স্পষ্ট করা দরকার; তা হল, সরকারসহ অনেকেই ভুল ধারণা বশত শুধু সিটি কর্পোরেশনগুলোকে “নগর” মনে করে থাকে; এই ভুল ধারণাটি ভাঙ্গতে ও প্রকৃত বিষয় তুলে ধরতে এই প্রতিবেদনে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ অনুযায়ী নগর, নগরীয় ইউনিট ও নগরীয় এলাকা বলতে সিটি কর্পোরেশনগুলোর পাশাপাশি দেশের সকল পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকেও বুঝানো হয়েছে। প্র্রকৃত অর্থে, নগর ও নগরায়ন বোঝেনা, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বোঝেনা এমন সব ব্যক্তি ও সরকারী কর্মকর্তাগণ (বিশেষত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, একনেক, নিকার, মন্ত্রিপরিষদ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, সংসদ, বিচার ও রাষ্ট্রপতির সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনের সচিবালয়ের কর্মকর্তাগণ) এর কারণে নগরীয় এলাকায় অবস্থিত স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিটগুলোকে বিভিন্ন আইন ও বিধিতে বিভিন্ন নাম দিয়ে একটা বিভ্রান্তিকর অবস্থায় রাখা হয়েছে; একই আইনে গ্রামীণ এলাকার স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট “ইউনিয়ন” নামকরণের মত একই আইনে নগরীয় এলাকার স্থানীয় ইউনিটগুলিও শুধু “নগর” নামে পরিচিত হতে পারতো, হতে পারে, এবং ইউনিয়ন ও নগরে যথাক্রমে ইউনিয়ন সরকার ও নগর সরকার গঠিত হতে পারত, হতে পারে।  ইউনিয়নগুলির মধ্যে আয়তন, জন সংখ্যা, রাজস্ব আয়-ব্যয় ও গুরুত্বে যেমন পার্থক্য রয়েছে, ঠিক তেমনি নগরগুলোর মধ্যেও আয়তন, জনসংখ্যা, রাজস্ব আয়-ব্যয় ও গুরুত্বে পার্থক্য রয়েছে; যদি গ্রামীণ এলাকায় “ইউনিয়ন” নামকরণে অসুবিধা না থাকে, নগরীয় এলাকায় এক ধরনের নাম “নগর” হতে অসুবিধা কোথায়? সেই বিষয়টি একেবারেই বোধগম্য নয়। আবার, ইউনিয়নের জন্য ‘ইউনিয়ন সরকার’ গঠন করার বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে ইউনিয়নের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ‘ওয়ার্ড সভা’ গঠনের আইন রয়েছে, এবং নগরগুলির জন্য ‘নগর সরকার’ গঠন করার বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে প্রতিটি নগরীয় ওয়ার্ডে অপ্রয়োজনীয় ‘ওয়ার্ড কমিটি’ গঠন করার আইনও রয়েছে; এও এক ধরনের পাগলামি ছাড়া অন্য কিছু নয়। সে যাই হোক, বাংলাদেশ এখন আর শুধু গ্রামীণ দেশ নয়, কেবল কৃষিজ সমাজ নয়; বিদ্যমান বাস্তবতায় এখনকার বাংলাদেশ হচ্ছে গ্রামীণ-নগরীয় দেশ, গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ, অর্থাৎ একটি মিশ্র সমাজ; গ্রামীণ বাংলাদেশ আর গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এক বিষয় নয়; এই দু’টোর সম্ভাবনা, সমস্যা, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও লক্ষ্য এক ধরনের নয়; কৃষিজ সমাজ আর গ্রামীণ-নগরীয় সমাজের ধ্যান-ধারণা ও জীবনাচরণ এক নয়; তাই এই দু’টোর প্রশাসনিক কাঠামো ও তার কার্যাবলীও এক ধরনের হওয়া উচিত নয়; দুঃখজনক বিষয় হল, অন্যান্য পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনার মত ৭ম পঞ্চ বার্ষিক (২০১৬-২০২০) পরিকল্পনার চূড়ান্ত খসড়ায়ও তার ইঙ্গিত, স্বীকৃতি ও প্রস্তুতিমূলক বিষয় একদম নেই। রাজনৈতিক দলসহ মিডিয়াও এই বিষয়টি বুঝতে পারছেনা বলে প্রতীয়মান হয়। জনাব আবু তালেব বাংলাদেশের স্টাটাসগত ও গুণগত এই বিরাট পরিবর্তনের কথা সর্বপ্রথম ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী ঢাকায় আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে তুলে ধরেন; সেই থেকে অনেক সময় পার হয়েছে; নতুন কোনও কিছু বুঝে ওঠতে সময় লাগতেই পারে; কিন্তু এত বেশী সময় লাগাটা একদম মেনে নেয়া যায়না। এই বিষয়টি যত দ্রুত সম্ভব মিডিয়া, নীতিপ্রণেতাগণ, আইনপ্রণেতাগণ ও গোটা সমাজকে বুঝতে হবে, এবং সরকার কর্তৃক বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রামীণ-নগরীয় দেশ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে, গ্রামীণ সমাজ তথা কৃষিজ সমাজ থেকে গ্রামীণ-নগরীয় সমাজের ধ্যান-ধারণায় ও জীবনাচরণে অভিযোজন প্রক্রিয়া সচেতনভাবে সম্পন্ন করতে হবে, তার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রণীত, গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে হবে, এবং তারই ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো, ক্ষমতা ও কার্যাবলী ঠিকঠাক করতে হবে। এই তো গেল একটা দিক; অন্য দিক হল দ্রুত নগরায়নের ফলে বিদ্যমান গ্রামীণ-নগরীয় দেশ থেকে বাংলাদেশ একটি পরিপূর্ণ নগরীয় দেশ হবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে; একটি গ্রামীণ দেশ, কৃষজ সমাজ থেকে একটি পরিপূর্ণ নগরীয় দেশ, নগরীয় সমাজ হবার পথে গ্রামীণ-নগরীয় দেশ, গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ হচ্ছে একটা মধ্যবর্তী পর্যায়; তবে এর স্থায়িত্ব কালও কম সময় নয়; তা মাথায় রেখেই পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এর সমস্যা ও তার সম্ভাব্য সমাধানসূত্র বাস্তবায়নের জন্য সামগ্রিকভাবে মানসিক ও শিক্ষাগত প্রস্তুতিও এখন থেকে নিতে হবে। এক হিসাব অনুযায়ী দ্রুত নগরায়নের ফলে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ৫০% এলাকা হয়ে যাবে নগরীয় এলাকা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১০০% এলাকা হয়ে যাবে নগরীয় এলাকা; অন্যভাবে বলা যায়, গ্রামীণ ইউনিটগুলি যেমন ইউনিয়নগুলি বিলুপ্ত হয়ে যাবে; তাতে কি হবে? তাতে গোটাদেশ নগরীয় ইউনিটে বিভক্ত হয়ে পড়বে। ফলে আজকের যে গ্রাম কিংবা আগের যে সনাতন গ্রাম তা মূলত জাদুঘরে ও বই-পুস্তকে ঠাঁই পাবে; বাস্তবে সেই গ্রামের চিহ্ন কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা। এই বিষয়টি আরেকভাবে অনুধাবন করা যেতে পারে, বর্তমানে প্রায় ৩৫% জনগোষ্ঠী নগরীয় এলাকায় বসবাস করে, ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০% জনগোষ্ঠী নগরীয় এলাকায় বসবাস করবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১০০% জনগোষ্ঠী নগরবাসী হয়ে যাবে। চলমান এই নগরায়ন প্রক্রিয়ায় একদিকে গ্রামীণ কৃষি পেশাতে কর্মসংস্থান বিপুলভাবে কমছে, কমতে থাকবে, এবং অন্যদিকে অন্যসব নতুন নতুন অকৃষি পেশাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, হতে থাকবে। তার আলামত প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে, বুঝা যাচ্ছে। এতে পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ মানে নগরীয় বাংলাদেশ; তাই, এখন আর বাংলাদেশ গ্রামীণ দেশ নেই; অবার বিদ্যমান গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশও চিরকাল গ্রামীণ-নগরীয় দেশ থাকবেনা; এটি একটি মধ্যবর্তী পর্যায়; এই মধ্যবর্তী পর্যায় থেকে দ্রুত নগরায়নের মধ্যদিয়ে চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ, নগরীয় সমাজ, নগরীয় সভ্যতা; বাংলাদেশ খুব দ্রুত তালে সেদিকেই এগিয়ে চলেছে। এই বিষয়টি বিশ্বাসে রেখে, তারই ভিত্তিতে একটি পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগরীয় বাংলাদেশ, নগরীয় প্রশাসনিক ইউনিট ও তার জন্য গতিশীল ‘নগর সরকারের রূপরেখা’ ও তা স্থাপন সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট সুস্পষ্ট প্রস্তাব সর্বপ্রথম ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারীতে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’য় উপস্থাপিত করা হয়েছে; এটি একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বিধায় তখন অনেকেই তা বুঝে উঠতে পারেনি, দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও এখনও অনেকে তা বুঝে উঠতে পারছেনা বলে প্রতীয়মান হয়; তবে আশার আলো হল, এটি নিয়ে সিডিএলজি, বাপসনিউজ, এমপো বাস্তবায়ন ফোরামসহ আরও অনেকে লাগাতার ক্যাম্পেইন চালিয়ে আসছে; আর দুঃখজনক বিষয় হল, ১৯৯৭ সাল থেকে সিডিএলজি’র এই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যাম্পেইন চলমান ও দৃশ্যমান থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, কৃষি মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ, একনেক, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রীপরিষদ ও জাতীয় সংসদ তা পুরোপুরি বুঝতে অপারগ কিংবা বুঝতে চায়না বলে প্রতীয়মান হয়; এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাগণের সেকেলে চিন্তাভাবনা ও কর্মকা- জাতিকে অনেক অনেক পেছনে ফেলে রেখেছে; বাংলদেশকে পিছনে ফেলে রাখার সেই অদূরদর্শি ধারা পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক প্রণীত ৭ম পঞ্চ বার্ষিক (২০১৬-২০২০) পরিকল্পনার চূড়ান্ত খসড়ায়ও রয়েছে; আর যারা নগরীয় ইউনিটে মেয়র ও কাউন্সিলর হয়েছে কিংবা হতে চায় তারাও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগর, নগরায়ন, নগরবাদ, নগরীয় কৃষি, নগরীয় সভ্যতা, নগরীয় কালচার, নগরীয় জীবনধারা ও নগর সরকারের রূপরেখা নিয়ে তেমন একটা চিন্তাভাবনা করে বলে প্রতীয়মান হয়না; ২০২০ ও ২০৫০ সালদ্বয়কে সামনে রেখে প্রতিটি নগর ভিত্তিক উন্নয়ন ও সেবামূলক সার্ভিস পরিচালিত করার লক্ষ্যে নগরীয় প্রশাসনিক ইউনিটগুলো সাজানো ও তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা ও কর্মসূচী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই, তা স্পষ্টভাবে বুঝা যায়; এ এক মহা হতাশাজনক চিত্র; এর অবসান হওয়া খুবই জরুরী।
    সে যাই হোক, সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের প্রয়োজন হচ্ছে একটি দুই স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার পদ্ধতি; আর কেন্দ্রীয় সরকারসহ বাংলাদেশের প্রয়োজন হচ্ছে একটি তিন স্তরবিশিষ্ট সরকার পদ্ধতি। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে একটি দুই স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার কাঠামো স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করার দিকে যেতে হবে; দুইয়ের চেয়ে বেশী স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার কাঠামো থাকলে তাতে মধ্যবর্তী ইউনিট থাকবে, এখন যেমন উপজেলা রয়েছে; এই অপ্রয়োজনীয়, দায়দায়িত্বহীন, স্বশাসনহীন মধ্যবর্তী ইউনিটের অস্তিত্ব বজায় রাখাটা হচ্ছে, হবে কেবলই অপচয়মূলক ও উদ্দেশ্যমূলক; এই মধ্যবর্তী ইউনিট নিয়ে ইতোমধ্যে অনেক সময় ও অর্থ নষ্ট করা হয়েছে; আশাকরি, আর কাল বিলম্ব না ঘটিয়ে এই বিষয়টি নীতিপ্রণেতা ও আইনপ্রণেতাগণ যত দ্রুত সম্ভব বুঝার চেষ্টা করবেন এবং তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। ভুল ধারণা বশত বাংলাদেশকে এখনও একটি গ্রামীণ দেশ মনে করা হয়; কিন্তু বাংলাদেশ এখন আর শুধু গ্রামীণ দেশ নেই; এই ভুল ধারণার পরিবর্তে বিদ্যমান বাস্তবতায় বাংলাদেশকে একটি গ্রামীণ-নগরীয় দেশ হিসেবে ধরে নিয়ে এবং ২০২০ ও ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ ও বিশ্বময় পরিবর্তনশীল বিষয়গুলি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৯৬ সালে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ণ বিষয়ক গবেষক আবু তালেব স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ (১) ও স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ (২) প্রণয়ন করেন, এবং তিনি তা ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী ঢাকায় জতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক জাতীয় সেমিনারের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের বিবেচনার্থে উপস্থাপিত করেন; এটি গ্রামীণ বাংলাদেশ এর পরিবর্তে গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য গণতান্ত্রিক স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রথম উদ্যোগ, প্রথম প্রচেষ্টা; দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সেবামূলক কর্মকা- ধাপে ধাপে (কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত) ধারাবাহিকতায় স্থিতিশীল গতিশীল প্রক্রিয়ায় পরিচালিত করার জন্য স্থানীয় সরকারের একটি স্তরবিন্যাসকরণ দেশের সূচনা লগ্ন থেকে ঠিক করার প্রয়োজন থাকলেও আজ অবধি এই কাজটি সচেতনভাবে সঠিকভাবে করার কোনো উদ্যোগ গৃহীত হয়নি, হচ্ছেনা; তা অবশ্যই খুবই দুঃখজনক ঘটনা; সে যাই হোক, তিনি উক্ত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয়ে মধ্যবর্তী ইউনিটগুলি, যেমন উপজেলা, ও অন্যান্য গ্রামীণ ইউনিটগুলি, যেমন ইউনিয়ন, কীভাবে আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাবে তা রেখাচিত্রের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন; এবং, ওই প্রস্তাবিত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয়ে গোটা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কীভাবে একটি দুই স্তরবিশিষ্ট কাঠামো হয়ে ওঠবে তাও গ্রাফে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন; তাতে তিনি সরকারের আকার আয়তন আস্তে আস্তে ছোট করার ব্যবস্থা করেছেন, ফলে কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সিস্টেম কস্ট কমে গিয়ে উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। উভয় কাঠামোতে ২০৫০ সালে কিংবা তার আগেই একটি পরিপূর্ণ ‘নগরীয় (আরবান) বাংলাদেশ’ গঠনের স্বপ্ন ও তার বাস্তবরূপ তুলে ধরা হয়েছে। বিদ্যমান ‘গ্রামীণ-নগরীয় (রুরাল-আরবান) বাংলাদেশ’ কি প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আস্তে আস্তে পরিপূর্ণ ‘নগরীয় (আরবান) বাংলাদেশ’ হয়ে ওঠবে এবং পরিপূর্ণ ‘নগরীয় বাংলাদেশ’ এ কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে স্থানীয় সরকার তথা শুধু নগরীয় স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ কি রূপ নিবে, নিতে পারে, তা ওই কাঠামোগত রেখাচিত্রে সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ও বোধগম্য করা হয়েছে; এ এক মহা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কাজ; এ এক মহা বিস্ময়কর ব্যাপার, বিষয়। যে কেউ এই কাজের গভীরতা ও তাৎপর্য বুঝতে পারলে শ্রদ্ধায় ভালবাসায় নত হয়ে যাবারই কথা; আমাদের প্রবল বিশ্বাস হচ্ছে, জনাব আবু তালেব ২০৫০ সালের মধ্যে “নগরীয় বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে, “পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগরায়ন” শব্দবন্ধের ইনকুবেটার ও ক্যম্পেইনার হিসেবে, ২০২০ সালের মধ্যে একটি ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ নির্মাণের স্বপ্নদ্রষ্টা ও তার বাস্তবায়নমূলক পরিকল্পনার প্রণেতা ও ক্যাম্পেইনার হিসেবে, নারীপুরুষের ৫০/৫০ প্রতিনিধিত্বের প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ ধারণার পরিবর্তে নারীপুরুষের জন্য এমপো তথা একশো একশো (১০০/১০০) প্রতিনিধিত্ব ফর্মুলা ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রণীত ১১ দফার ইনকুবেটার ও  ক্যাম্পেইনার হিসেবে, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’র প্রণেতা হিসেবে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের রূপরেখার প্রণেতা হিসেবে, গণতান্ত্রিক আইনসভার রূপরেখার প্রণেতা হিসেবে, গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক অনেকগুলি শ্লোগানের রচয়িতা হিসাবে, গ্রামীণ বাংলাদেশ এর পরিবর্তে বর্তমান বাস্তবতায় একটি “গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ” এর ধারণা তুলে ধরার জন্য ইতিহাসের পাতায় চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এখানে আরও জানিয়ে রাখা উচিত হবে যে, তার এই প্রশাসনিক কাঠামোগত রূপরেখা হচ্ছে ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রথম প্রস্তাবিত পরিকল্পনা, প্রথম দৃষ্টান্ত; যেটি দেশের অন্যসব ক্ষেত্রের জন্য ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সবাইকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে আসছে। প্রসঙ্গত বলা দরকার যে, তিনি এই রূপরেখায় ২০২০ সালের মধ্যে একটি ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ (যেটি ‘গণস্বপ্ন ২০২০’ নামে বহুল পরিচিত) নির্মাণ করার যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন ও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার পরিকল্পনা হাজির করেছেন তা অনেকে পরিপূর্ণভাবে না বুঝে কিংবা বুঝে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ‘ ও ‘উন্নত বাংলাদেশ’ এর মধ্যেকার বিশাল তফাতকে গুলিয়ে ফেলে বক্তব্য হাজির করার অপচেষ্টা করছেন বলে প্রতীয়মান হয়; ঠিক যেমন অনেকে না বুঝে এক সময় ‘জাতীয় সরকার/কেন্দ্রীয় সরকার’ আর ‘জাতীয় একতা সরকার’ বিষয়দ্বয়ের মধ্যেকার তফাত গুলিয়ে ফেলতেন; ওই তফাতের বিষয়টি গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় সর্বপ্রথম সুস্পষ্টভাবে হাজির করার পর তা গুলিয়ে ফেলার বিষয়টি প্রায় বন্ধ হয়েছে বলে মনে হয়। এখন একইভাবে ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ আর ‘উন্নত বাংলাদেশ’ এর মধ্যেকার ফারাক গুলিয়ে ফেলার বিষয়টি বন্ধ হলে ভাল হয়; এটি যাদের উদ্দেশ্যে বলা হল, আশা করি, তারা তা বুঝবেন এবং নিজেদেরকে সংশোধন করবেন। সে যাই হোক, বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ অন্য যারা ২০২০ সালের কথা বলছে, ২০২১ সালের কথা বলছে, ২০৩০ সালের কথা বলছে, ২০৪০ সালের কথা বলছে, ২০৪১ সালের কথা বলছে, ২০৫০ সালের কথা একটু আধটু উচ্চারণ করছে, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা বলছে এবং সর্বোপরি এডহক ভিত্তিক পরিচালিত কর্মকা-ের পরিবর্তে স্বপ্ন (ভিশন) ভিত্তিক কর্মকা- পরিচালনার কথা বলছে, তার উৎস, অনুপ্রেরণা, পথপ্রদর্শক, অনুঘটক হচ্ছে ওই রূপরেখা, ওই স্তরবিন্যাসকরণদ্বয় অর্থাৎ জনাব আবু তালেব, যার লাগাতার ক্যাম্পেইন তিনি নিউ ইয়র্ক থেকে সূচনার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে সফলভাবে পরিচালিত করেন। তবে জনাব আবু তালেব এর আহবান ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৯৭ সাল থেকে যদি ২০২০ ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক দেশের সকল স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন, গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হত, যদি ‘গণস্বপ্ন ২০২০’ ভিত্তিক ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ নির্মাণ প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন শুরু হত, যদি ‘গ্রামীণ বাংলাদেশ’ এর পরিবর্তে ‘গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ’ এর ধারণা সবাই বুঝত, যদি ‘গণস্বপ্ন ২০৫০’ ভিত্তিক পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত ‘নগরীয় (আরবান) বাংলাদেশ’ মুখী নির্মাণ প্রক্রিয়া প্রচেষ্টা সচেতনভাবে শুরু হত, যদি ১০০/১০০ প্রতিনিধিত্ব তথা এমপো’র বাস্তবায়ন ১১ দফা অনুযায়ী ধাপে ধাপে শুরু হত, যদি স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ (১) অথবা স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ (২) অনুযায়ী স্থানীয় সরকার কাঠামো বাস্তবায়ন শুরু হত, তাহলে আজ বাংলাদেশ আরো অনেক অনেক দূর সকল ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকতে পারতো; কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল তথা ইউনিয়ন ও নগর পর্যন্ত ধাপে ধাপে ক্ষমতাশীল দায়িত্বশীল দায়বদ্ধ গতিশীল সরকার কাঠামো দাঁড়িয়ে যেতে পারতো; সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে উঠতে পারতো। তবে বিলম্বিত হলেও স্বপ্ন ভিত্তিক কর্মকান্ডের প্রয়োজনীয়তা বোঝা ও কোনো কোনো বিষয়ে স্বপ্ন ভিত্তিক কর্মকান্ড শুরু হওয়াটা অবশ্যই প্রশংসনীয়; এতে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা রয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; তা সত্ত্বেও একে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাই। সে যাই হোক, বরাবরের মত এখনো জাতীয় নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমাদের সবিনয় অনুরোধ হল, প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ (১) ও স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ (২) আরো ভালভাবে জানুন এবং তা আরো গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করুন। আমরা তো সবসময় বলে আসছি যে, আগে স্থানীয় সরকারের একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ গ্রহণ করতে হবে, এবং সে অনুযায়ী সর্বোচ্চ ইউনিট (বিভাগীয় সরকার কিংবা জেলা সরকার) ও সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয় (ইউনিয়ন সরকার ও  নগর সরকার) কার্যকর করতে হবে। স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট বিভাগ, না জেলা তা আজ অবধি নির্ধারিত হয়নি; বিভাগ স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হলে উপজেলার পাশাপাশি জেলাও হয়ে যাবে মধ্যবর্তী ইউনিট এবং জেলার ক্ষমতা ও দায়িত্বও মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে নির্ধারিত করতে হবে; বিদ্যমান ব্যবস্থায় জেলাও মধ্যবর্তী ইউনিট; এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে দেখতে হবে, বুঝতে হবে; ফলে বিদ্যমান ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপজেলার মতই হবে, হতে বাধ্য; এটা-ই অনেকে বুঝতে পারছেন না। বর্তমানে ৬৪টি জেলায় ৬৪ জন নিযুক্ত ‘নিধিরাম’ প্রশাসক রয়েছে, যাদের সঙ্গে  দায়দায়িত্বের কোনো সম্পর্ক নেই, যাদের সঙ্গে জনগণেরও কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু তাদের জন্য আরাম আয়েস ও সুযোগসুবিধার কোনো কমতি নেই; একে স্থানীয় সরকারের নামে সংকীর্ণ স্বার্থে সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার ও উদ্দেশ্যমূলক প্রয়োগ বলে মানুষ ভাবতে পারে; ঠিক যেমন স্থানীয় সরকারের নামে কেবল ব্যক্তিগত ও দলগত স্বার্থে অবৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট জিয়া ও অবৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট এরশাদ যথাক্রমে স্বনির্ভর গ্রাম সরকার ও উপজেলাকে নিয়ে করেছেন। তাতে তখনকার সময় ও পরিস্থিতিতে উভয় অবৈধ প্রেসিডেন্টদ্বয় ব্যক্তিগতভাবে ও দলগতভাবে লাভবান হয়েছেন; কিছু সুবিধাবাদী ক্ষমতালোভী নীতিহীন টাউট লোককে নতুন দল দু’টির জন্য হাতিয়ার হিসেবে পেয়েছেন, এবং ওইসব সুবিধাবাদী মানুষগুলোই ওই দু’টো দলের বর্তমানকার আসল কান্ডারি হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ৬৪টি জেলায় ৬৪ জন প্রশাসক দ্বারা এই সরকার ও এই দল এখন লাভবান হবার কোনও সম্ভাবনা নেই; কারণ এই দু’টো কাজের সময় ও পরিস্থিতি একদমই এক রকম নয়। তা বর্তমান সরকারকে, আওয়ামী লীগকে অবশ্যই বুঝতে হবে; আশাকরি, বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সরকার ও আওয়ামী লীগ চিন্তাভাবনা করবে, এবং সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। পাশাপাশি, প্রাসঙ্গিকভাবে জেলা সংক্রান্ত আরেকটি বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলা উচিত হবে, তা হল সার্বিক বিবেচনায় একজন অসফল অর্থমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত জনাব মুহিত কর্তৃক উপস্থাপিত জাতীয় বাজেটে কেন্দ্রীয় সরকারের তথাকথিত ‘জেলা বাজেট’ প্রসঙ্গ; জেলা বাজেট হবার কথা জেলা সরকারের, কেন্দ্রীয় সরকারের নয়; প্রশ্ন হল, জেলা সরকার কোথায়? স্বাভাবিকভাবে মনে এই প্রশ্নও এসে যায় যে, কেন্দ্রীয় সরকার কি তাইলে বিভাগীয় বাজেট, উপজেলা বাজেট, নগরীয় বাজেট, ইউনিয়ন বাজেটও করবে? জেলা বাজেট বিষয়টি জাতীয় বাজেট বক্তৃতায়, দলিলে বার বার আসাটা শুধু অর্থমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রণালয় নয়, মন্ত্রিপরিষদ ও জাতীয় সংসদের অপরিপক্কতারই পরিচয় বহর করে; সিপিডিসহ কয়েকটি এনজিও এবং কিছু ব্যক্তি স্বার্থগত কারণে এই বাজে বিষয়টিকে সমর্থন দিয়ে থাকে; প্রকৃত অর্থে স্থানীয় সরকার না বুঝলে, ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন সম্পর্কিত বিষয় জানা না থাকলে এমনটি-ই হয়! হবার কথা! জনাব আবু তালেব ১৯৯৬ সালে ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’র সঙ্গে একটি শ্লোগানও প্রণয়ন করেছিলেন; শ্লোগানটি হল, ‘জেলায় জেলায় গণতন্ত্রায়ন, জেলার জনগণের ক্ষমতায়ন’; জনাব মুহিত জনাব আবু তালেবের সঙ্গে এক ফোনালাপে ‘জেলা সরকার’ নামকরণ ও ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ বিষয়ক প্রস্তাবনার প্রতি প্রবল অপত্তি জানিয়ে ছিলেন; অথচ এই মুহিত সাহেব পরবর্তীতে ‘জেলায় জেলায় গণতন্ত্রায়ন’ শ্লোগানের আদলে ‘জেলায় জেলায় সরকার’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন; তাতে তিনি জনাব তালেব ও তার জেলা সরকারের রূপরেখা প্রসঙ্গ একটুও উল্লেখ করেননি; এই হল জনাব মুহিত কর্তৃক বুদ্ধিবৃত্তিক চুরির, ডাকাতির, অসততার একটি নজির মাত্র। আমরা দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলতে চাই যে, কোনো না কোনো দিন অর্থমন্ত্রীর এই তথাকথিত ‘জেলা বাজেট’ হারিয়ে যাবে; এই ভুলের জন্য অর্থমন্ত্রী,  মন্ত্রিসভা ও জাতীয় সংসদ দুঃখ প্রকাশ করবে; জনাব আবু তালেব প্রস্তাবিত ‘জেলা সরকার’ ও ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ একদিন না একদিন বাস্তব প্রয়োজনে সামনে চলে আসবে; তাতে শয়তানিপনা না থাকলে জাতি বিশেষভাবে উপকৃত হবে; তবে, সিডিএলজির সমালোচনার মুখে এবার কেন্দ্রীয় বাজেট ২০১৬-’১৭ তে তথাকথিত ‘জেলা বাজেট’ বিষয় উবে গেলেও জেলা নিয়ে অন্য শয়তানিপনা প্রকাশ পেয়েছে; জনাব মুহিতের সেই শয়তানি কি সাংসদগণ বুঝতে পেরেছেন? তা তো বাজেট আলোচনায় একদম বোঝা যায়নি। অনুরূপ আরেকটি চুরি-ডাকাতি কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার ঘটনা ‘বিভাগীয় সরকার’ ও বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা’ নিয়ে ঘটিয়েছেন ‘কবিতা চোর’ ও ক্ষমতা দখলদার হিসেবে খ্যাত জেনারেল এরশাদ, তার দল জাতীয় পার্টি ও তার রাজনৈতিক ও শাসনিক সহযোগী জেএসডি; ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী ঢাকায় এক জাতীয় সেমিনারে জনাব আবু তালেব গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় বিভাগ এর বিলুপ্তি কিংবা বিভাগের গণতন্ত্রায়ন এই নীতিগত অবস্থান তুলে করেন, এবং বিভাগ থাকলে বিভাগগুলির গণতন্ত্রায়নের লক্ষে ‘বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা’ উপস্থাপিত করেন; তখন রাষ্ট্রপতি এরশাদ কারাগারে ছিলেন এবং তাঁর দল ও তাঁর শাসনিক মিত্র জেএসডির বিভাগ নিয়ে কিংবা বিভাগীয় সরকার নিয়ে কোনো ধরনের বক্তব্য, কর্মসূচি ছিলনা; জনাব আবু তালেব এর প্রস্তাব অনুযায়ী বিভাগের বিলুপ্তি কিংবা বিভাগীয় সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যখন বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছিল, ঠিক তখনই, এরশাদ সাহেব কারাগার থেকে বের হবার কয়েক বছর পর বিভাগকে ‘প্রদেশ’ নামকরণ ও তাতে বিভাগীয় সরকারের রূপরেখার আদলে অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে ‘প্রাদেশিক সরকার’ করার দাবী করেন; এর কিছুদিন পর এরশাদের অনুসরণে জনাব আ.স.ম. রব, জনাব সিরাজুল আলম খান ও জেএসডি অনুরূপ বক্তব্য, দাবী উপস্থাপিত করেন, অথচ উভয় দল কোথাও কখনও জনাব আবু তালেব কিংবা গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখার কথা বলেননি, বলেননা; একে এক কথায় বলা যায় চরম রাজনৈতিক অসততা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চুরি কিংবা ডাকাতি। এইসঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবে আরও একটি বিষয় তুলে ধরা দরকার তা হল, এই রূপরেখায় পার্বত্য চট্রগ্রাম সমস্যার রজনৈতিক সমাধানের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ‘পার্বত্য বিভাগ’ নামে একটি নতুন বিভাগ গঠন করার প্রস্তাব করা হয়, এবং তাতে দেশের অন্যান্য বিভাগের মত, যেমন বরিশাল বিভাগে ‘বরিশাল বিভাগীয় সরকার’, পার্বত্য বিভাগে ‘পার্বত্য বিভাগীয় সরকার’ প্রতিষ্ঠার আহবান জানানো হয়, কারণ পার্বত্য চট্রগ্রামের বিষয়টিও অনেকাংশে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ক, স্থানীয় শাসনিক বিষয়ক একটি বিষয়, সমস্যা। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ১৯৯৭ সালের শেষ প্রান্তে সম্পাদিত পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে ‘আঞ্চলিক পরিষদ’ গঠন মূলত ‘বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা’র আদলে বিকৃত রূপে করা হলেও এই চুক্তির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার জন্য ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’, বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা তথা জনাব আবু তালেব এর অবদানের কথা, প্রস্তাবের কথা কোথাও বলা হয়নি, হয়না; পরবর্তীতে এই দলেরই বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদগুলির মধ্যে একজন সাংগঠনিক সম্পাদক এই পার্বত্য এলাকার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়; তার মাধ্যমে ‘পার্বত্য বিভাগ’ গঠনের নীতিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেছে, কবুল করেছে, অথচ এই বিষয়টিও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোথাও স্বীকার করেননি, করেননা; এও একটি চরম বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা নয়কি? সেই কারণে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা যে একটা বড় ধরনের অপরাধ, রোগ তা বাংলাদেশে মানুষকে বুঝানোর জন্য, জানানোর জন্য একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।। সে যাই হোক, জেলা স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হলে বিভাগ অবশ্যই বিলুপ্ত হতে হবে; তাতে উপজেলা শুধু মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে থাকবে, এবং তা আস্তে আস্তে কিংবা দ্রুততার সঙ্গে বিলুপ্ত হতে থাকবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট ও সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয় নির্ধারিত না হলে স্থানীয় সরকারের প্রতিটি ধাপে ক্ষমতা ও দায়িত্ব যথাযথভাবে ঠিকঠাক হবে-ই বা কেমন করে? সর্বোচ্চ ইউনিট এবং সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয়ে ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রদান করার পর মধ্যবর্তী ইউনিট তথা উপজেলায় ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেয়ার মত কিছু থাকলেই তো তা দেয়া যাবে। স্থানীয় সরকারের এসব জটিল ও কঠিন বিষয়গুলির একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বিত সমাধান ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’য় রয়েছে। এতে সর্বপ্রথম বিভাগীয় সরকার, জেলা সরকার, উপজেলা সরকার, ইউনিয়ন সরকার ও নগর সরকারের রূপরেখা একসঙ্গে উপস্থাপিত করা হয়েছে; যাতে একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ (প্রশাসনিক কাঠামো) গৃহীত হলে তার প্রতিটি টায়ার এ প্রয়োজন মত সুনির্দিষ্ট সরকার কাঠামো বসানোর কাজটি সহজে করা সম্ভব হয়। এই রূপরেখায় ইউনিয়ন ও নগর এর মধ্যে অন্য কোনো ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তা, প্রচেষ্টা একদম সমর্থন করা হয়নি, তার পরিবর্তে সর্বনি¤œ ইউনিট হিসেবে সমস্ত মনোযোগ, কর্মপ্রচেষ্টা এক দিকে গ্রামীণ এলাকায় ইউনিয়ন কেন্দ্রীক ও অপর দিকে নগরীয় এলাকায় নগর কেন্দ্রিক করার সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে; এবং এর মাধ্যমে শুধু গ্রামীণ এলাকা কেন্দ্রীক স্থানীয় সরকারের সর্বনি¤œ ইউনিট বিষয়ক দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা ধরিয়ে দিয়ে গ্রাম ও নগর কেন্দ্রীক একই স্তরে সর্বনি¤œ ইউনিটদ্বয় (ইউনিয়ন ও নগর এবং ইউনিয়ন সরকার ও নগর সরকার ) কেন্দ্রীক ধারণা উপস্থাপিত করা হয়।
 এবং এই রূপরেখায় গ্রামীণ বাংলাদেশ তথা শুধু কৃষি ভিত্তিক বাংলাদেশ এর চিরায়ত ধারণার পরিবর্তে বিদ্যমান বাস্তবতার নিরিখে গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর ধারণা তুলে ধরা হয়েছে, যার মাধ্যমে এই প্রথম বাংলাদেশের স্ট্যাটাসগত ও গুণগত পরিবর্তনের পরিচিতি উপস্থাপিত করা হয় এবং তা আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারীভাবে গ্রহণ করার দাবী জানানো হয়, তবে এই বিষয়টি  তখন ও এখন অনেকেই বিশেষত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, একনেক, অর্থ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ, জাতীয় সংসদ, মিডিয়া ও রাজনৈতিক দলগুলো বুঝতে পারছেনা বলে প্রতীয়মান হয়; প্রসঙ্গত এই বিষয়ে জানানো উচিত হবে যে, গ্রামীণ বাংলাদেশ আর গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এক বিষয় নয়, এক রূপ নয়, এক অবস্থা নয়; এ দু’টোর সমস্যা, সমাধান প্রক্রিয়া, গুরুত্ব ও তাৎপর্য এক রকম নয়; এই দু’টোর প্রশাসনিক কাঠামো, ক্ষমতা ও দায়িত্বও একরূপ হতে পারেনা; এই দু’টোতে মানুষের ভাবনাগত পার্থক্য থাকে, থাকবে। তাই এখন থেকে, গ্রামীণ বাংলাদেশ ভিত্তিক নয়, গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ ভিত্তিক সকল উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণীত, গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে হবে; এটি যত দ্রুত সম্ভব দেশের নীতিপ্রণেতাগণ, আইনপ্রণেতাগণ ও মিডিয়াকে বুঝতে হবে এবং তার স্বীকৃতি ও পরিচিতি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান দিতে হবে যে, বাংলাদেশ এখন হচ্ছে একটি গ্রামীণ-নগরীয় দেশ; বাংলাদেশ একদা গ্রামীণ তথা কৃষিজ দেশ ছিলো, এখন আর তা নেই; একে অবশ্যই একটি গুণগত পরিবর্তন হিসেবে নিতে হবে; সেইসাথে এও মনে রাখতে হবে যে, এই স্ট্যাটাসগত ও গুণগত পরিবর্তন কয়েক দশক স্থায়ী থাকবে; তা রাতারাতি উবে যাবেনা।
এই রূপরেখায় জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারের জন্য প্রস্তাবিত সংসদগুলো গঠনের ক্ষেত্রে এমপো’র প্রয়োগ প্রস্তাব করা হয়েছে; এমপো তথা নারীপুরুষের একশো একশো প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি অনুযায়ী, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউনিয়ন সংসদ ও নগর সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ১ জন নারী সদস্য ও ১ জন পুরুষ সদস্য প্রতিনিধিত্ব করবে এবং জাতীয় সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা থেকে ১ জন নারী সাংসদ ও ১ জন পুরুষ সাংসদ প্রতিনিধিত্ব করবে। এমপো শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা দুনিয়ার প্রতিটি দেশের প্রতিটি ধাপের সরকারের প্রতিটি বিধানিক সংসদ/পরিষদ গঠন করার জন্য বাস্তবায়নযোগ্য এক নতুন গণপ্রতিনিধিত্ব ফর্মুলা হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়েছে; তার জন্য বিশ্বজুড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যাম্পেইনও চলে আসছে; এই এমপো তথা একশো একশো প্রতিনিধিত্ব ফর্মুলার সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব ও তাৎপর্য এক বিস্ময়কর ব্যাপার।  নারী ও পুরুষ উভয়ের যে কেহ এই ফর্মুলার সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বুঝতে পারলে, অনুধাবন করতে পারলে নিজ থেকে নিজ নিজ শক্তিতে বলিয়ান হয়ে আন্দোলন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে; তাই দেশের প্রতিটি মানুষের প্রতি আমাদের বিশেষ অনুরোধ হল, একশো একশো প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি তথা এমপো গভীরভাবে জানার বুঝার চেষ্টা করুন; নিজেকে একুশ শতকের এই মহান আন্দোলনের সঙ্গে, সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করুন; তাতে আপনার ও গোটা মানব জাতির জন্য যারপর নাই এক মঙ্গলময় পরিবেশ বয়ে আনবে।
সে যাই হোক, সুচতুর দলীয় ও নির্দলীয় নকলবাজগণ এই গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখার কিছু কিছু জনপ্রিয়, পছন্দনীয় বিষয় বারবার কাটাছেঁড়া ও বিকৃত করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে, এবং এর কিছু কিছু বিষয় নকলবাজরা নিজেদের নামে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে; কিন্তু নকলবাজগণ, বুদ্ধিবৃত্তিক চোর-ডাকাতগণ এই রূপরেখার সমন্বিত রূপের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব একটুও খাটো করতে সক্ষম হননি, হবেনও না; বরং এই রূপরেখার কালজয়ী উপযোগিতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাই, সরকারের প্রতি আমাদের বিনীত অনুরোধ হল, যদি গ্রামীণ বাংলাদেশ এর পরিবর্তে বিদ্যমান বাস্তবতায় গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত হিসেবে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চান, যদি গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য তিন প্রকারের স্থানীয় সরকার তথা গ্রামীণ স্থানীয় সরকার, নগরীয় স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় সরকার স্থাপিত হোক চান, যদি স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা ও দায়িত্ব ধাপে ধাপে অর্পিত ও পালিত হোক চান, যদি স্থানীয় সরকারের একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ (প্রশাসনিক কাঠামো) প্রতিষ্ঠিত ও কার্যকরী হোক চান, যদি দ্বি-স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা স্থায়ী রূপ নিক চান, যদি স্থানীয় সরকারের প্রতিটি ধাপে নারীর শতভাগ প্রতিনিধিত্ব তথা এমপোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে চান, যদি স্থানীয় সরকারের প্রত্যেক ধাপে ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি কার্যকর হোক চান, যদি স্থানীয় সরকারে বিধানিক পরিষদ (যেমন ইউনিয়ন সংসদ, নগর সংসদ, উপজেলা সংসদ, জেলা সংসদ কিংবা বিভাগীয় সংসদ) স্থাপিত হোক চান, যদি প্রতিটি স্থানীয় ইউনিটে ন্যায়পাল এর পদ চালু হোক চান, যদি ২০২০ সালের মধ্যে একটি উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ তথা গণস্বপ্ন ২০২০ বাস্তবায়িত হোক চান, যদি ২০৫০ সাল কিংবা তার আগে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগরীয় বাংলাদেশ তথা গণস্বপ্ন ২০৫০ বাস্তবায়িত হোক চান, যদি পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ (প্রশাসনিক কাঠামো) বাস্তবরূপ নিক চান, যদি দক্ষ সরকার গড়তে সরকারের আকার আয়তন আস্তে আস্তে ছোট করতে চান, তাইলে আর কালবিলম্ব না করে এই রূপরেখার প্রতিটি বিষয় স্থাপন ও কার্যকর করার প্রকৃত উদ্যোগ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করুন; প্রসঙ্গত এও বলব, তা যেন নকল না হয়, তা যেন বুদ্ধিবৃত্তিক চুরি, ডাকাতি না হয়, তা যেন জনাব আবু তালেব এর অবদান অস্বীকার করার অভিপ্রায়, প্রয়াস না হয়। যিঁনি স্বপ্ন দেখেন, যিঁনি স্বপ্ন দেখান, যিঁনি স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপায় বাতলান, যিঁনি স্বপ্ন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করেন, যিঁনি স্বপ্নের বিষয়ে মানুষকে অনুপ্রাণিত করেন, সর্বোপরি যিঁনি স্বপ্ন বিষয়ে লাগাতার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন পরিচালিত করেন, তাঁকে অস্বীকারের সামান্যতম প্রয়াসও মহা অপরাধ, মহা কলংক; এটি যেন সবাই মনে রাখেন তা বলে রাখা উচিত হবে বলে মনে হয় ।
    প্রতিবেদনটি পাঠক সমাজের ভালভাবে বোঝার সুবিধার্থে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক গবেষক এবং সিডিএলজি’র নির্বাহী পরিচালক জনাব আবু তালেব প্রণীত ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ থেকে প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১, স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ এবং মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো) ও তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রণীত ১১ দফার কপি নিচে সংযুক্ত করা হল। আমরা আশা করি, পাঠকগণ, গবেষকগণ, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিগণ, নীতিপ্রণেতাগণ, আইনপ্রণেতাগণ, মন্ত্রীগণ, সরকারী কর্মকর্তাগণ, বিধি-প্রবিধি প্রণেতাগণ, সাংবাদিকগণ, আইনজীবীগণ, প্রকৌশলীগণ ও দেশের সকল পর্যায়ের সকল জায়গার নীতিনির্ধারকগণ বিশেষভাবে উপকৃত হবেন। যে কোনো ধরনের প্রশ্ন থাকলে, তথ্যমূলক প্রশ্ন থাকলে, কোনো কিছু অস্পষ্ট বলে মনে হলে তার জন্য সঠিক উত্তর যোগাতে আমরা যথাসাধ্য সচেষ্ট থাকব বলে অঙ্গীকার থাকল। পাঠকপাঠিকার বোঝার সুবিধার্থে আরও একটি বিষয় বলতে চাই, তা হল জনাব আবু তালেব এর গবেষণামূলক প্রস্তাবনাগুলোর উপস্থাপন পদ্ধতি হচ্ছে একজন দক্ষ চিত্রকরের মত; দক্ষ চিত্রকরের চিত্র দেখে তাঁর বিষয়, তাৎপর্য ও গভীরতা যেমন বুঝে নিতে হয়, ঠিক তেমনি তাঁর উপস্থাপিত রেখাচিত্র দেখে ও স্বল্প কথা পড়ে এর বিষয়গত সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য ও গভীরতা পাঠকপাঠিকাকে গভীর মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হবে, অনুধাবন করতে হবে। তবে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রায় দুই দশক সময় লেগে যাচ্ছে দেখে খুবই দুঃখ লাগে বইকি?
alt

মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো)
একশো একশো প্রতিনিধিত্ব; একশো একশো ক্যাম্পেইন

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এমপো অনুযায়ী প্রণীত ১১ দফা
(১) জাতীয় সংসদের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা হতে একজন মহিলা জাতীয় সংসদ সদস্য ও একজন পুরুষ জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে হবে; (২) জাতীয় সংসদে একজন মহিলা ডেপুটি স্পীকার ও একজন পুরুষ ডেপুটি স্পীকার নির্বাচিত করতে হবে; (৩) ইউনিয়নের প্রতি ওয়ার্ডে একজন মহিলা মেম্বার ও একজন পুরুষ মেম্বার নির্বাচিত করতে হবে; (৪) ইউনিয়নে একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন ও একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারপার্সন নির্বাচিত করতে হবে; (৫) পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের প্রতি ওয়ার্ডে একজন মহিলা কাউন্সিলর ও একজন পুরুষ কাউন্সিলর নির্বাচিত করতে হবে; (৬) পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনে একজন মহিলা ডেপুটি মেয়র ও একজন পুরুষ ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত করতে হবে; (৭) উপজেলায় ‘মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো)’ অনুযায়ী নির্বাচিত একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন ও একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারপার্সন এর ক্ষমতা ও দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে; (৮) উপজেলা সংসদ, জেলা সংসদ ও বিভাগীয় সংসদ এর প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা হতে একজন মহিলা সদস্য ও একজন পুরুষ সদস্য নির্বাচিত করতে হবে; (৯) জেলা ও বিভাগে একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন ও একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারপার্সন নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে; (১০) জাতীয় সভা (জাতীয় আইনসভার উচ্চকক্ষ হিসেবে যদি কখনও এটি গঠিত হয়) গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলাকে একেকটি নির্বাচনী এলাকা ধরে নিয়ে প্রত্যেক জেলা হতে একজন মহিলা জাতীয় সভাসদ ও একজন পুরুষ জাতীয় সভাসদ প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত করতে হবে; (১১) ‘মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো)’ এর আলোকে অন্যান্য ক্ষেত্রেও ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্বে নরনারীর ক্ষমতায়ন যথাসম্ভব সুনিশ্চিত করতে হবে। (এই ১১তম দফা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়দ্বয়ে একজন মহিলা উপ-উপাচার্য ও একজন পুরুষ উপ-উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে। এই প্রক্রিয়া অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর করা যেতে পারে।)
হাকিকুল ইসলাম খোকন:লেখক,সিনিয়র সাংবাদিক,রাজনীতিক,সদস্য ও মুখপাএ সিঊিএলজি : যুক্তরাষ্ট্র,এঊিটর- বাপসনিউজ এবং সভাপতি- আমেরিকান প্রেসক্লাব অব বাংলাদেশ অরিজিন (আপিবাঅ)।।ফোন:৯১৭-৮৩৭-৪৭০০


হাসানুর রহমানের বই ‘তুতু বাবা ’প্রকাশিত

বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬

হাকিকুল ইসলাম খোকন ,বাপসনিউজঃ  নিউইয়র্ক প্রবাসী প্রবীণ শিশু সাহিত্যিক হাসানুর রহমান বিরচিত গ্রন্থ ‘তুতু বাবা’ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ঢাকার অন্যতম প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘বাঙ্গালি’ থেকে।

alt
শিশু-কিশোরদের জন্যে লেখা পাঁচটি অনবদ্য গল্পের অপূর্ব সমাহারে ৩২ পৃষ্ঠার এই বইটির প্রচ্ছদ শিল্পী হলেন ধ্্রুব এষ, অলংকরণ শিল্পী ছিলেন দেলোয়ার রিপন। বইটির বিক্রয় মূল্য ধরা হয়েছে বাংলাদেশে প্রতিটি ১৫০ টাকা ও যুক্তরাষ্ট্র প্রতিটি ১০ ডলার।খবর বাপসনিঊজ।
গল্পগুলো হলোÑ তেনারা!, তুতু বাবা, ঘরকুনো আর পিনপিনো, লতা-পাতা আর ইমটু। শিশু সাহিত্যের অফুরন্ত ভান্ডাওে নতুন সংযোজিত এই বইটি পাঠকপ্রিয়তা পাবে বলে দৃঢ় প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন বইটির প্রকাশক আরিফ নজরুল। এই বইটিসহ শিশু সাহিত্যিক হাসানুর রহমানের এ যাবত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দাঁড়ালো ১৩ (তেরো) টি।


অন্য এক শেখ হাসিনার গল্প

বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬

তাকে নিয়ে ক্যামেরার সামনে বা পত্রিকার পাতায় আমরা যেটুকু গল্প শুনি তার বাইরেও থাকে ছোট-বড় অনেক ঘটনা। সেসবই মূলত প্রতিফলিত করে সত্যিকারের শেখ হাসিনাকে। সেই গল্পগুলোই শোনালেন দীর্ঘসময় ধরে আওয়ামী লীগ এবং প্রধানমন্ত্রী বিট কভার করা কয়েকজন সাংবাদিক। শোনালেন শেখ হাসিনাকে নিয়ে পর্দার পেছনের কিছু গল্প।

ঘুম থেকে উঠেই হাসুকে একটা ফুল দিয়েছি:
দৈনিক জনকণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি উত্তম চক্রবর্তী শোনালেন শেখ হাসিনার কোনো এক জন্মদিনের গল্প। বললেন, ‘উনি কখনোই জন্মদিনে আড়ম্বর পছন্দ করেন না। এত এত বছর ধরে তার রিপোর্ট কাভার করছি কোনোদিন দেখিনি তিনি কেক কেটে জন্মদিন পালন করেছেন। দেশের বাইরে আছেন বলেই না, দেশে থাকলেও তিনি সেটা করেন না। শুধু ফুল এবং শুভে”ছাবার্তা গ্রহণ করেন। একবার তার জন্মদিনে গেছি সুধাসদনে। ওয়াজেদ মিয়া মারা যাওয়ার ২-৩ বছর আগে। তিনি তখনও নিচে নামেননি। ওয়াজেদ মিয়া নেমেছেন। জানতে চাইলাম, জন্মদিনের পরিকল্পনা কি, হাসিমুখে বললেন, ঘুম থেকে উঠেই হাসুকে একটা ফুল দিয়ে শুভে”ছা জানিয়ে ফেলেছি। তার আরেকটি বড় গুণ তার আতিথেয়তা। নিজে রান্না করে বা পাতে তুলে দিয়ে খাওয়াতে ভালোবাসেন। বাঙালী নারীর যেসব গুণ থাকার কথা তার সবই তার মধ্যে আছে।’

Picture

যেখানে আমরা যেতে ভয় পেতাম সেখানেও তিনি যেতেন:
এটিএন নিউজের সিনিয়র রিপোর্টার আরাফাত সিদ্দিকী সোহাগের কাছ থেকে জানা গেলো শেখ হাসিনার চরিত্রের অন্য একটি দিক। তার ভাষায় ‘একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার মনে হয়েছে তার সবচেয়ে বড় গুণ তিনি অসাধারণ স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন একজন মানুষ। কখনো কোনো তথ্য তিনি ভুলে যান না। কোথাও গেলে যা যা তিনি দেখেন তা যেন শুধু দেখেন না, পর্যবেক্ষণও করেন। ছোট ছোট তথ্য আমরা ভুলে গেলেও তিনি অনেক সময় স্মরণ করিয়ে দেন। লিখিত বক্তব্যেও অনেক ছোট ছোট ভুল তার চোখ এড়ায় না। তাছাড়া তার সাহসও আমাকে মুগ্ধ করে। ২০১৩-১৪ সাল বাংলাদেশ এবং আওয়ামী লীগের জন্য খুবই কঠিন একটা সময় ছিলো। সেসময় তিনিও সারাদেশ ভ্রমণ করেছেন। তখন আমরা সাংবাদিকরাই দেশের কিছু কিছু জায়গায় যেতে ভয় পেতাম। কিš‘ তিনি সেসব জায়গাতেও চলে যেতেন। মানুষের কথা শুনতেন। তার নিরাপত্তা নিয়ে যেখানে সবাই উদ্বিগ্ন, সেখানে তিনি কোনো কিছু ভালো লাগলেই শিডিউলের বাইরে সেখানে চলে যেতেন। যদিও সেটা খুবই ভয়ঙ্কর তার জন্য এবং তার নিরাপত্তারক্ষীদের জন্যও।’

সেই ছোট্ট বিষয়টাও উনি মনে রেখেছিলেন:
শুধু আড়ম্বর বিমুখ বা সাহসীই নন, প্রচণ্ড যতœশীলও বঙ্গবন্ধুকন্যা। বিটিভির নির্বাহী প্রযোজক সাখাওয়াত মুন শোনালেন তেমনই একটি ঘটনার গল্প। ‘সেবার রাশিয়া, বেলজিয়াম আর জাপান ট্রায়াঙ্গেলে সফরে গেছেন প্রধানমন্ত্রী। সঙ্গে অনেকজন সাংবাদিক। রাশিয়া গিয়েই আমি আমার লাগেজ হারিয়ে ফেললাম। অনেক চেষ্টা করেও সেটা আর পেলাম না। পরে বেলজিয়ামে গিয়ে আবার ফেরত পেলাম। এর মধ্যে সফরে উনার সঙ্গে দেখা হলেই উনি আমাকে লাগেজের কথা জিজ্ঞাসা করেছেন। মজা করে বলেছেন, ভালোই হয়েছে, ক্লেইম করো বেশি টাকা ফেরত পাবা। এত ছোট একটা বিষয় উনি মনে রেখেছেন দেখে আমি খুবই আপ্লুত ছিলাম। তার মানবিকতার গুণটিতো কারো অজানা নয়। নায়িকা বনশ্রীকে ডেকে নিয়ে সহায়তা করা বা চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী শীর্ষেন্দু বিশ্বাসের চিঠির জবাব দেওয়াটাও কিš‘ সব প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে প্রত্যাশা করা যায় না। আর উনি তো কেবল প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি আমাদের সবার অভিভাবক। পরিবারের বড় সদস্য যেমন সবাইকে আগলে আগলে রাখেন, তিনিও দেশের প্রতিটি মানুষকে সেভাবেই আগলে রাখতে চান।’

নৌবিহারের ঘটনাটা খুব মনে পড়ে:
সেবার দক্ষিণ কোরিয়া ভ্রমণে গেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সঙ্গে অনেক অনেক সাংবাদিক। সেই সময়েরই স্মৃতিচারণ করলেন জাতীয় দৈনিক সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার অমরেশ রায়। ‘হাং নদীতে নৌবিহারের কথা খুব মনে পড়ে। সেবার সফরের শেষের দিন নৌবিহারের আয়োজন ছিলো। নৌবিহারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও ছিলো। কেউ কবিতা আবৃতি করছিলো, কেউবা গান গাইছিলো। প্রধানমন্ত্রীও তাদের সঙ্গে গলা মেলা”িছলেন। ২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে ভিডিও কনফারেন্সে তিনি বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চালা”িছলেন। সারাদেশের সঙ্গে এভাবেই তিনি যোগাযোগ করতেন। সেই সময় কভারেজের জন্য আমরা ৪-৫ জন সাংবাদিক ওখানে থাকতাম। দেখা যেত তিনি তখনও নিজের হাতে খাবার তুলে দিতেন। আবার কখনো সামনাসামনি বসে অনেক গল্প করছেন।’

কোনো সমস্যার কথা তার কানে গেছে কিš‘ সমাধান হয়নি, এমন কখনোই হয়নি:
মমতাময়ী শেখ হাসিনার কথাই আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিলেন চ্যানেল আইয়ের জয়েন্ট অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর তারিকুল ইসলাম মাসুম। বললেন, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) জেনেছেন মানেই সেই সমস্যার সমাধান হবে। তিনি জেনেছেন কিš‘ সমস্যাটির সমাধান হয়নি এমন কখনো দেখিনি। শুধু তার কান পর্যন্ত যেতে হবে , তাহলে সমাধান আসবেই। আরেকটি বিষয় হলো, সংবাদ সম্মেলনে আমরা তাকে অনেকবারই পেয়েছি। সেখানে তাকে একটি প্রশ্ন করলে ওই বিষয়ে পাল্টা প্রশ্নের জন্য প্রস্তুতি মাথায় নিয়ে তবেই প্রশ্ন করতে হয়।’

এমনই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের স্বার্থে নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল, কিš‘ ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড মায়াময়ী। জন্মদিনে গল্পগুলো শোনানো শেষে সবারই প্রত্যাশা, শেখ হাসিনা যেন অনেকদিন বাঁচেন। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ঠিক রাখার জন্য তার দীর্ঘদিন বেঁচে থাকাটা খুবই জর“রি।


উত্তরাধিকারের রাজনীতি বনাম রাজনীতির উত্তরাধিকার

সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬

মানুষ হত্যা আর রক্তের রাজনীতি, এটি আওয়ামীলীগের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এক ফ্যাসিবাদী চরিত্র। ভোট ডাকাতি, ভোট জালিয়াতি, বিনাভোটের নির্বাচন, বিরোধী দল ও ভিন্ন মতকে নির্মমভাবে হত্যা, দমন এটা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অতীত ঐতিহ্য। বিশেষ করে বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতাকে পদদলীত করে এরা ইতিহাসের পরিক্রমায় বারবার নিজেদেরকে ধিকৃত করেছে, অন্যদিকে গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিপরীতে একদলীয় বাকশালী নব্য ফ্যাসিজমকে ক্ষমতার হাতিয়ার বানিয়ে এদেশবাসীর স্বাভাবিক বাঁচার গ্যারান্টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দুর্বৃত্ত্বায়নের রাজনীতিতে এরা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এভাবে ষোল কোটি মানুষকে ভয় দেখিয়ে আর কতোদিন চলবে? এদেশের ষোল কোটি জনতা কিংবা তাদের ভোটাধিকারের বিপরীতে ভারত যাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার গ্যারান্টি, তাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের জনগনের আর কিইবা প্রত্যাশা থাকতে পারে? আওয়ামী লীগ নামক এই দলটি শুধুমাত্র তাদের ফ্যসিবাদী চরিত্রের কারণে, রাজনীতিতে দীর্ঘ পথ চলার পরিক্রমায় এরা ৭০-এর নির্বাচনের পর একাত্তরের মহান বিজয় ও স্বাধীন বাংলাদেশে একবার ৭২-৭৫, এবং পরবর্তীতে যখনই ক্ষমতায় এসেছে; এদেশের জনগন কখনোই তাঁদের বিশ্বাস কিংবা আস্থার অবস্খান থেকে বিবেচনায় নেয়নি। এদের ধর্ম নিরপেক্ষ মতবাদ _ বিশেষকরে ইসলাম, কোরআন এবং নবী মুহাম্মদ (সা:) এর জীবন বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এক মোনাফেকি মতবাদ। বাঙ্গালী মতবাদ নিয়েও একই ধরণের ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পাওয়া যায়! বিশেষকরে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৫০ কোটি বাংলা ভাষাবাসি মানুষ ভাষাগত দিক থেকে বাঙ্গালী হলেও এরা সবাই বাংলাদেশী নয়। পশ্চিম বঙ্গের মমতা দিদিরা, তাদের নাম পরিবর্তন করে এবার নাম রেখেছে বাংলা।

alt

এবার বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার অনুসারীরা সোনা কেটে বাংলা রাখলেই লেঠা চুঁকে যায়। বাংলাদেশের ভূখন্ডে বসবাসরত শুধু বাংলা ভাষাবাসির মানুষ না, সকল ভাষার মানুষই বাংলাদেশী এবং এ জাতীয়তাবাদী চেতনাকে ধারণ করেই এ দেশের মানুষ ৭১-এ বুকের রক্ত ঢেলে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে এদেশকে স্বাধীন করেছে! ভারতকে সুবিধা দেয়া কিংবা খুশী করার জন্য নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম রুপকার, সর্বজন শ্রদ্ধেয় মৌলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানীর মতো দেশবরেণ্য প্রবীণ নেতা, মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম . এ . জি ওসমানী, অন্যতম কারীগর _ বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলীল, আ.স.ম আবদুর রব, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, সংবিধান প্রণেতা শ্রদ্ধেয় ড: কামাল হোসেন, প্রয়াত শ্রদ্ধেয় ডেমোকরেটিক লীগ নেতা অলী আহাদ, বর্তমান সময়ে কর্পোরেট বিশ্বের আলোচিত ব্যক্তিত্ব নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী ডক্টর ইউনুস এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা শুধুমাত্র রাজনৈতিক ভিন্নতা, কিংবা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আওয়ামী লীগ নামক ফ্যাসিষ্ট এ দলটির দ্বারা নিগৃহীত হয়নি। এমনকি স্বাধীনতা পরবর্তীতে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ভিন্ন মত ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়ন, ভাষানী ন্যাপ এবং জাসদের বিপ্লবী ও ত্যাগী ত্রিশ হাজারের উপরে নেতাকর্মীকে একাত্তর পরবর্তী (৭২-৭৫) একদলীয় বাকশালী সরকার তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের পেটোয়া বাহিনী হিসেবে খ্যাত রক্ষীবাহিণী দিয়ে তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে। স্বাধীনতার ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা রণাঙ্গনের অকুতোভয় সৈনিক, বীরোত্তম, একজন সেক্টর কমান্ডার, ১৫ আগষ্টের শোকাবহ ঘটনার পর জাতি যখন নতুন করে গভীর সংকটে নিপতিত, ৭ নভেম্বরের সিপাহী জনতার সফল বিপ্লবের পটভূমিতে ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এই মহান বীর জিয়াউর রহমানই গোলামীর জিন্জির থেকে নতুন করে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী, প্রিয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সেদিন রক্ষা করেছেন। যারা একজন স্বাধীনতার ঘোষক, রণাঙ্গনের অকুতোভয় সৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরোত্তমকে নিয়ে বেফাস মন্তব্য করতে পারে, তারা কি আদৌ বাংলাদেশের বন্ধু নাকি ভারত প্রেমী। দেশপ্রেমিক নেতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যারা পাকিস্তানের চর, বিশেষকরে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ উনার স্বাধীনতার ঘোষণা ও জেড ফোর্সের প্রাণপুরুষ এই অসীম সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধাকে অস্বীকার করতে পারে, তারা এক স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশকে স্বীকার করে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। যে ভারত শেখ মুজিবকে হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে সেদিন জাসদের মতো একটি প্রতিবিপ্লবী সংগঠনের জন্ম দিয়েছিলো, আজ সেই জাসদ এবং ভারতই বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু ! এদের শেষ পরিণতি দেখার অপেক্ষায় থাকলাম, সময়ই নির্ধারণ করবে কে বন্ধু আর কে শত্রু !


আদিমপাথর = মানস গুণ

সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬

বন্যজীবন
ঘষে ঘষে আগুন
গাছে গাছে এসেছিলো
এই ভাবে বন্য ফাগুন।

বৃষ্টি নামুক প্রবল তোড়ে
ভেসেযাক পাথর সময়

ঘনিভূত হোক আমাদের
আত্মপরিচয়।

alt

জ্বলে ওঠো আপন তেজে
হে আদিম পাথর
তোমাকে ছুঁয়ে পূর্ণতা পাক
আমাদের অন্তর।


লন্ডনের থানা বনাম বাংলাদেশের থানা

সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Picture

বলছিলাম পূর্ব লন্ডনের বাঙালি অধু্যষিত টাওয়ার হ্যামলেটস বারার নবনিযুক্ত পুলিশ কমান্ডার সু্য উইলিয়ামের কথা। শুধু তাঁর অফিসেরই দৃশ্য নয় এটি, লন্ডনের সবগুলো পুলিশ স্টেশনের চিত্রই এরকম। থানা যে একটি শান্তির জায়গা, পুলিশ যে শান্তির প্রতীক তা বৃটেনের থানাগুলোতে গেলে অনুভব করা যায়।
সম্প্রতি একটি প্রেস ব্রিফিংঅনুষ্ঠানে থানায় দীর্ঘক্ষন কথা হয়েছিলো পুলিশ কমান্ডার সু্য উইলিয়ামের সঙ্গে। তার অফিসের সাদামাটা চিত্র দেখে চোখের সামনে ভেসে এলো বাংলাদেশের থানাগুলোর কথা ।

পেশাগত কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন থানায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। তবে আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে। সেসব থানায় অধিনস্ত পুলিশ কনস্টেবলদের সঙ্গে থানার ওসি সাহেবের ব্যবহার দেখে মনে করতাম এটিই বোধহয় পুলিশের নিয়ম। জুনিয়র ও অধিনস্থদের সঙ্গে ওসি সাহেব সবসময় ধমকের সুরে কথা বলবেন। প্রয়োজনে সময়-সময় অকথ্য ভাষায় গালিগালাজও করবেন। ওটা যেনো স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু বৃটেনের থানাগুলোর চিত্র দেখতে বুঝতে পারলাম-ওটা আসলে পুলিশের নিয়ম না। ওটা বাংলাদেশের নিয়ম।

বাংলাদেশে একটি মফস্বল থানায়ও ওসি সাহেবের একটি বিশাল রুম থাকে। রুমে থাকে বিশাল একটি টেবিল। এরপর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে একজন পুলিশ কনস্টেবল। ওসি সাহেব বসা থেকে দাঁড়ালেই দন্ডায়মান পুলিশ কনস্টেবল অনবরত স্যালেউট দিতে থাকে। এটি যেনো দৈনন্দিন রুটিন ওয়ার্ক। লন্ডনের থানা পুলিশের চিত্র দেখি আর ভাবি বাংলাদেশে কি কখনো সেটা সম্ভব?

তাইসির মাহমুদ
বেথনালগ্রীন, লন্ডন
ফেসবুক থেকে নেওয়া


উপহার :কস্তুরী দত্ত মজুমদার ( টুবু )

রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Picture

বনধু তোমাকে
দেবার  মত কিছুই নেই...তবে....
তোমাকে শূণ্য হাতে
ফিরিয়ে দেব না  
বনধু তোমাকে
আমার মনের আয়নাটি দেবো,  
যা দিয়ে তুমি আমায় দেখতে পাবে,
বনধু তোমাকে
আমার চাঁদ থেকে
তোমার নিষ্পাপ  হৃদয়ে  প্রানের ছোঁয়া দেবো ,  বনধু তোমাকে ....
সূর্যের আলো দিয়ে জ্যোতির্ময় করে তুলবো ।
বনধু  আমার ....
তোমায় শূণ্য হাতে
ফিরিয়ে দেবো না ।।


নিউ ইয়র্ক! নিউ ইয়র্ক!!

রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬

মুহম্মদ জাফর ইকবাল : চৌদ্দ ঘন্টা আকাশে উড়ে আমাদের প্লেনটা শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্কে পৌঁছেছে। টানা চৌদ্দ ঘন্টা প্লেনের ঘুপচি একটা সিটে বসে থাকা সহজ কথা নয়। সময় কাটানোর নানারকম ব্যবস্থা তারপরও সময় কাটতে চায় না। অনেকক্ষণ পর ঘড়ি দেখি, মনে হয় নিশ্চয়ই এর মাঝে ঘন্টাখানেক কেটে গেছে কিন্তু অবাক হয়ে দেখি পনেরো মিনিটও পার হয়নি!

এয়ারপোর্টে নামার পর ইমিগ্রেশানের ভেতর দিয়ে যেতে হয়-প্রত্যেকবারই নূতন নূতন নিয়মকানুন থাকে। এবারেও নূতন নিয়ম, যাত্রীদের নিজেদের পাসপোর্ট নিজেদের স্ক্যান করে নিতে হবে। কীভাবে করতে হবে খুব পরিষ্কার করে লেখা আছে, সেই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করি কিন্তু আমাদের পাসপোর্ট আর স্ক্যান হয় না। দেখতে দেখতে বিশাল হলঘর প্রায় খালি হয়ে গেছে, শুধু আমি আর আমার স্ত্রী পাসপোর্ট নিয়ে ধাক্কাধাক্কি করছি! কিছুতেই যখন পাসপোর্ট স্ক্যান করতে পারি না তখন শেষ পর্যন্ত লাজলজ্জা ভুলে, কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা একজন পুলিশ অফিসারের কাছে গিয়ে মিন মিন করে বললাম, ‘আমার পাসপোর্ট কিছুতেই স্ক্যান হচ্ছে না-’

আমার কথা শেষ করার আগেই পুলিশ অফিসার আঙুল দিয়ে আমাকে দেখিয়ে বলল, ‘আপনি জাফর ইকবাল না?’ পুলিশ অফিসার বাঙালি, শুধু যে বাঙালি তা নয়, আমাকে চেনে। দেশের এয়ারপোর্টে এটা অনেকবার ঘটেছে কিন্তু নিউইয়র্কের এয়ারপোর্টেও এটা ঘটবে কল্পনা করিনি।

বলা বাহুল্য এরপর আমার পাসপোর্ট মুহূর্তে স্ক্যান হয়ে গেল (কী কারণ জানা নেই আমার পাসপোর্টে পুরানো পাসপোর্ট লাগানো থাকে, সে কারণে সাইজ মোটা এবং স্ক্যান করার জন্যে যন্ত্রের মাঝে ঢোকানো যায় না! এরকম অবস্থায় কী করতে হবে আমাদের বাংলাদেশের বাঙালি পুলিশ অফিসার সেটা শিখিয়ে দিল।)

Picture

বিদেশের মাটিতে নামার পর নানানরকম আশঙ্কায় সব সময় আমার বুক ধুক ধুক করতে থাকে- এবারে মুহূর্তের মাঝে সব দুশ্চিন্তা, সব আশঙ্কা দূর হয়ে গেল। মনে হল এই শহরটি বুঝি অপরিচিত, নির্বান্ধব, স্বার্থপর নিঃসঙ্গ একটি শহর নয়- এই শহরে আমার দেশের মানুষ আছে, দেশের বাইরে তারা দেশ তৈরি করে রাখে।

আমার ধারণা যে ভুল নয় সেটি কয়েক ঘন্টার মাঝে আমি আবার তার প্রমাণ পেয়ে দেলাম। যারা খোঁজ খবর রাখে তারা সবাই জানে সারা পৃথিবীতেই এখন লিফট নামে নূতন সার্ভিস শুরু হয়েছে।

স্মার্টফোনে তার ‘অ্যাপস’ বসিয়ে নিলেই সেটা ব্যবহার করে গাড়িকে ডাকা যায়, ভাড়া নিয়ে দরদাম করতে হয় না, ক্রেডিট কার্ড থেকে সঠিক ভাড়া কেটে নেয় তাই কোনো টাকা পয়সার লেনদেন করতে হয় না। স্মার্ট ফোনের ম্যাপে গাড়িটা কোনদিকে আসছে সেটা দেখা যায়, গাড়িটির নম্বর কতো, ড্রাইভার কে, তার নাম কী, টেলিফোন নম্বর কতো সেটাও টেলিফোনের স্ক্রিনে উঠে আসে। নিউইয়র্কে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মাঝে আমাদের এক জায়গায় যেতে হবে বলে আমার মেয়ে এরকম একটা গাড়িকে ডেকে পাঠিয়েছে। সেটাতে ওঠার আগেই টের পেলাম গাড়ির ড্রাইভার বাংলাদেশের তরুণ। আমাকে দেখে তার সে কী আনন্দ, গাড়ি চালাতে চালাতে তার কতো রকম কথা। গাড়ি থেকে নামার পর সে আমার মেয়েকে বলল তার কোম্পানিকে সে জানিয়ে দেবে যেন আমাদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া কেটে নেয়া না হয়। আমি অনেক কষ্ট করে তাকে থামালাম।

আমি দুই সপ্তাহের মতো নিউইয়র্ক শহরে ছিলাম, যখনই ঘর থেকে বের হয়েছি দেশের মানুষের সাথে দেখা হয়েছে। কখনো ফল বিক্রেতা, কখনো রেস্টুরেন্টের কর্মচারী, কখনো ট্রাফিক পুলিশ, কখনো মিউজিয়ামের গার্ড কখনো সাবওয়ের সহযাত্রী। পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে এসে দেশের মানুষ এবং তাদের মমতাটুকু হৃদয়টাকে অন্যভাবে পরিপূর্ণ করে তুলে।

আমেরিকা দেশটি হচ্ছে গাড়ির দেশ, এই দেশে গাড়িটি চালিয়ে শুধুমাত্র এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়নি। আমেরিকায় গাড়ি হচ্ছে সেই দেশের কালচারের একটা অংশ। মাঝখানে পেট্রোলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে তেল-বান্ধব ছোট গাড়ির প্রচলন হতে শুরু করেছিল কিন্তু এখন পেট্রোলের দাম আবার কমেছে বলে বিশাল বিশাল বিলাসী গাড়িও আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে। খাঁটি আমেরিকানদের সম্ভবত নিউইয়র্ক শহরে গাড়ি চালাতে সমস্যা হয় না কিন্তু আমার কাছে বিষয়টাকে রীতিমত দুঃস্বপ্ন মনে হয়। তবে যারা নিউইয়র্ক শহরে থাকে তারা অবশ্য গাড়ি ব্যবহার না করেই দিন কাটাতে পারে, কারণ পুরো শহরের মাটির নিচে মেট্রো ট্রেন মাকড়শার জালের মতো ছড়িয়ে আছে। আমি যে দুই সপ্তাহ নিউইয়র্ক শহরে ছিলাম এই মেট্রো ট্রেনেই চলাফেরা করেছি।

নিউইয়র্ক শহরের নূতন প্রজন্ম অবশ্য চলাফেরার জন্যে নূতন আরেকটি সমাধান খুঁজে পেয়েছে। সেটি হচ্ছে বাই-সাইকেল। আমি যখন প্রথম জানতে পারলাম আমার মেয়ে বাই-সাইকেল চালিয়ে আমাদের সাথে দেখা করতে এসেছে আমি তখন জানতে চাইলাম সাইকেলটি সে কোথায় রেখেছে। রাস্তার পাশে কোনো একটা ল্যাম্প পোস্টে সাইকেলটি বেঁধে রেখে এলে কিছুক্ষণের মাঝেই সাইকেলের ফ্রেম ছাড়া বাকি সবকিছু হাওয়া হয়ে যায়।(আমার ধারণা এই ব্যাপারে নিউইয়র্কের মানুষের দক্ষতা আমাদের দেশের মানুষ থেকে বেশি!) আমার মেয়ে বলল সে নিউইয়র্ক শহরে এসে কোনো বাইসাইকেল কিনেনি যখনই দরকার হয় একটা ভাড়া নিয়ে নেয়। বিষয়টা আমার কাছে যথেষ্ট বিদঘুটে মনে হল, সাইকেল ভাড়া নিলেও ফেরত না দেয়া পর্যন্ত সেটাকে কোথাও না কোথাও নিজের হেফাজতে রাখতে হয়। পুরো সাইকেল ভাড়া নিয়ে শুধু তার কঙ্কালটা ফেরত দেয়া হলে সাইকেল ভাড়া দেয়ার ব্যবসা দুইদিনে লাটে উঠে যাবে।

আমার মেয়ের কাছ থেকে বাইসাইকেল ভাড়া দেয়া নেয়ার পুরো প্রক্রিয়াটির বর্ণনা শুনে আমি চমৎকৃত হলাম। সিটিবাইক নাম দিয়ে নিউইয়র্ক শহরের অসংখ্য অসংখ্য জায়গায় সাইকেল স্ট্যান্ড তৈরি করা হয়েছে। যার যখন দরকার হয় এক স্ট্যান্ড থেকে ভাড়া নেয়, গন্তব্যে পৌঁছানোর পর অন্য স্ট্যান্ডে জমা দিয়ে দেয়। কোথাও কোনো মানুষ নেই, পুরো ব্যাপারটা ইলেকট্রনিক। কে কোথা থেকে ভাড়া নিয়েছে কোথায় ফেরত দিয়েছে সবকিছু ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে হিসেব রাখা হচ্ছে এবং ক্রেডিট কার্ড থেকে ভাড়ার টাকা কেটে নেয়া হয়েছে। পুরো শহরে অল্প কয়েকটা জায়গায় সিটি-বাইকের স্ট্যান্ড থাকলে এই প্রক্রিয়া মোটেও কাজ করতো না কিন্তু যেহেতু শহরের প্রায় কোনায় কোনায় সিটি-বাইক স্ট্যান্ড বসানো হয়েছে কাজেই এখন কাউকেই বাই সাইকেলটা কোথা থেকে ভাড়া নিয়ে কোথায় ফেরত দেবে সেটা নিয়ে ভাবনা করতে হবে না। কাছাকাছি কোথাও সিটি-বাইক স্ট্যান্ড আছে সেটা জানার জন্য দরকার শুধু একটা স্মার্ট ফোন।

নিউইয়র্ক শহরে একটা সুন্দর দৃশ্য হচ্ছে এই সিটি-বাইক। তাদের জন্য আলাদা ভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। ডিজাইনটাও চমৎকার। একজন মানুষ চাকরীর ইন্টারভিউ দেয়ার জন্য স্যুট পরেও এই সাইকেল চালিয়ে যেতে পারবে।

নিউ ইয়র্ক শহরে কতো বড় বড় বিষয় থাকার পরও আমি ইচ্ছা করে সিটি বাইক নিয়ে আমার উচ্ছ্বাসটুকু প্রকাশ করছি। আমার মনে হয় আমাদের ঢাকা শহরেও কোনো একজন উদ্যাক্তা এই ধরণের একটা উদ্যোগ নিলে সেটি শহরের মানুষের জন্য অনেক বড় একটা আশীর্বাদ হতে পারতো। (আমাদের দেশের জন্য হুবহু এই মডেলটি হয়েতো কাজ করবে না। একটু অন্যরকম ভাবে শুরু করতে হবে। যেমন আমাদের এ.টি.এম মেশিন। সারা পৃথিবীতে এ.টি.এম মেশিনকে পাহারা দিতে হয় না। আমাদের দেশে সেখানে সার্বক্ষনিক ভাবে কাউকে না কাউকে পাহারা দিতে হয়।)

এটি আমেরিকার নির্বাচনী বছর। আমেরিকার ইতিহাসের যে কোনো নির্বাচন থেকে এটি অন্যরকম কারণ এবারে ডোনাল্ড ট্রাম্প নামে একজন ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট পদের জন্য আমেরিকার প্রধান দুই দলের একটি রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে নির্বাচন করেছে। আজ থেকে প্রায় দুই যুগ আগে আমি যখন আমেরিকাতে ছিলাম যমি তখন থেকে এই মানুষটিকে চিনি। তখন ডোলাল্ড ট্রাম্প ছিল স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন, স্থূলরুচির বাক সর্বস্ব একজন মানুষ। প্রথম যখন আমি শুনতে পেয়েছিলাম যে ডোলাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টি থেকে নমিনেশন পাবার চেষ্টা করছে তখন পুরো বিষয়টাকে একটা উৎকট রসিকতা হিসেবে ধরে নিয়ে আমি উড়িয়ে দিয়েছিলাম। এখন যখন নির্বাচন প্রায় এসে গেছে এবং ডোলাল্ড ট্রাম্প সত্যি সত্যি একজন পার্থী তখন ব্যাপারটা রসিকতার পর্যায় না থেকে বিভীষিকার পর্যায় চলে এসেছে।

আমেরিকার সংখ্যালঘু মানুষের প্রতি বিদ্বেষ কিংবা সাম্প্রদায়িকতা, আতঙ্ক এবং ঘৃণা এগুলোর অস্তিত্ব থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইলেকশনে জিতে গেলে অন্ধকার জগতের এইসব গ্লানি হঠাৎ করে নীতিমালার মাঝে চলে আসবে।

আমি যতদিন ছিলাম তার মাঝে একদিনও একটি মানুষকে পাইনি যে ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে ইতিবাচক কোনো কথা বলেছে। সত্যি কথা বলতে কী একজন অধ্যাপককে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা জিজ্ঞাসা করার পর তাকে আমি আক্ষরিক অর্থে শিউরে উঠতে দেখেছি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নানা রকম প্রচারণা চলছে। সবচেয়ে মজার প্রচারণাটা শুনেছি একজন গৃহহীন ভিক্ষুকের কাছ থেকে। সে পথের মোড়ে একটা কাগজ নিয়ে বসে থাকে। কাগজে লেখা ‘আমাকে যদি এক ডলার না দাও তাহলে আমি কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে দেব!’ আমি যতদূর জানি এই হুমকি কাজে দিয়েছে। প্রচুর মানুষ এই ভিক্ষুককে এক ডলার করে দিয়ে যাচ্ছে।

একদিন বিকেলে আমার ছেলে আমাদেরকে জানাল সে একটি বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দিতে যাচ্ছে। আমার ধারণা ছিল বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন এই ব্যাপারগুলো বুঝি শুধু আমাদের দেশের জন্য একচেটিয়া, আমেরিকাতেও যে বিক্ষোভ মিছিল হতে পারে সেটা অনুমান করিনি। আমি জানতে চাইলাম ‘কিসের বিক্ষোভ মিছিল?’ উত্তরে সে আমাকে যে কাহিনীটি শোনালো সেটি অবিশ্বাস্য! তার একজন সহকর্মী (ঘটনাক্রমে এই সহকর্মীর সাথে আমারও পরিচয় হয়েছে) লং আইল্যান্ড ইউনিভার্সিটি এট ব্র“কলিন নামে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছে। আমেরিকাতে শিক্ষকের পদ মোটামুটি সোনার হরিণ, সেখানে যোগ দিতে পারা কঠিন, কাজেই এরকম একটি পদে যোগ দেয়ার পরই একজন তাদের জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করতে পারে। লং আইল্যান্ড ইউনিভার্সিটির কর্মকর্তারা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি নতুন বেতন স্কেল তৈরি করেছে। শিক্ষকদের সেটা পছন্দ হয়নি তাই তারা সেটা গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট কলমের এক খোঁচায় চারশত শিক্ষককে বরখাস্ত করে দিল!

মুহূর্তের মাঝে একজন নয় দুইজন নয় চারশত শিক্ষক বেকার সবাই একেবারে পথে বসে গেছে। যেহেতু আমেরিকার একাডেমিক জগতে অসংখ্য মানুষ চাকুরীর খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভালো চাকরী না পেয়ে ছোটখাটো কাজ করে সময় কাটাচ্ছে তাই এই চারশ শিক্ষকদের বদলে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া খুব যে অসম্ভব ব্যাপার তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে লেখা পড়া চালিয়ে নেয়ার জন্য সেরকম শিক্ষকদের নেয়া শুরু হয়েছে। অনেকেই খণ্ডকালীন নিয়োগ পেয়ে কাজও করতে শুরু করেছে।

বলা বাহুল্য চাকুরী হারানো চারশত শিক্ষক, তাদের পরিবার, বন্ধু বান্ধব এই অবিশ্বাস্য ঘটনার প্রতিবাদ করতে শুরু করেছে। সে জন্য বিক্ষোভ মিছিল এবং আমার ছেলেও সেই বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দিতে যাচ্ছে। ‘আমার সময় থাকলে আমিও যোগ দিতাম’। শেষ খবর অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত বরখাস্ত করে দেয়া চারশত শিক্ষককে আবার ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট (আমাদের দেশে আমরা বলি ভাইস চ্যান্সলর) যে এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে তাকে প্রচুর গালমন্দ শুনতে হয়েছে। সাধারণ শিক্ষক এবং ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিলে তাকে একটা ‘ধাড়ী ইঁদুর’ বলে ডাকছে। আমি যতদূর জানি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট এখনো তার নিজের পদে বহাল আছে। হার্ভার্ডের প্রেসিডেন্টকে শুধু মাত্র ছেলে এবং মেয়ের মেধা তুলনা করতে গিয়ে একটি বেফাঁস কথা বলার জন্য চাকুরী হারাতে হয়েছিল। আমার ধারণা লং আইল্যান্ড ইউনিভার্সিটির এই ‘ধাড়ী ইঁদুর’ও সেখানে খুব বেশি দিন থাকতে পারবে না। আমরা আমাদের ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলরদের নিয়ে মাথা চাপড়াই। মনে হচ্ছে সমস্যাটি দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক!

শিক্ষক হওয়ার প্রধান আনন্দ হচ্ছে সারা পৃথিবীতে তার ছাত্রছাত্রীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। কাজেই নিউ ইয়র্কে আসার পর এই ছাত্রছাত্রীরা যে আমাদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে সেটি এমন কিছু অবাক ব্যাপার নয়। সে কারণে একদিন বিকেলে তাদের সাথে দেখা করার জন্য আমাদের ‘জ্যাকসন হাইট’ নামে একটা জায়গায় যেতে হল। (যারা জ্যাকসন হাইটের নাম শুনেননি তাদের বলা যায় এটি হচ্ছে নিউ ইয়র্কের মিনি বাংলাদেশ) জ্যাকসন হাইট জায়গাটি আমি যেখানে থাকি সেখান থেকে অনেক দূর কিন্তু মেট্রো ট্রেনে খুব সহজেই যাওয়া যায়। আমি সেভাবেই যাবো বলে ঠিক করে রেখেছিলাম। আমার ছাত্রছাত্রীদের তাদের প্রবল আপত্তি এবং তারা গাড়ি না করে আমাদের নেবে না। এর মাঝে নিশ্চয়ই যথাযথ সম্মান দেখানোর ব্যাপার আছে যেটা আমি জানি না। কাজেই যে দূরত্বটা অল্প সময় অতিক্রম করতে পারতাম গাড়ি করে ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে অনেক সময় নিয়ে অতিক্রম করতে হল।

যাই হোক ছাত্রছাত্রীদের সাথে গল্পগুজব করে খেয়ে দেয়ে, ছবি তুলে চমৎকার একটি সন্ধ্যা কাটিয়ে আমরা ফিরে আস্তে প্রস্তুত হয়েছি। আমরা আবার ছাত্রছাত্রীদের বলেছি আমদের মেট্রো ট্রেনে তুলে দিতে তারা আবার রাজি হল না। গাড়ী করে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরিয়ে দেবে। যখন মাঝমাঝি এসেছি তখন হঠাৎ করে আমার ছেলে ফোন করে জিজ্ঞাসা করলো ‘তোমরা কোথায়?’ ‘আমি জিজ্ঞাসা করলাম’ কেন কী হয়েছে? আমার ছেলে বলল ম্যানহাটানের মাঝখানে বোমা ফেটেছে। খবরদার ঐ পথে ফিরে আসার চেষ্টা করো না। শুনে আমি হাসব না কাঁদব বুঝতে পারলাম না। দেশে জঙ্গি এবং তাদের উৎপাতের খবর পড়তে পড়তে আমাদের সবার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম নিউ ইয়র্কে এসে অন্তত দুটি সপ্তাহ জঙ্গিদের উৎপাতের খবর পড়তে হবে না। কিন্তু আমাদের কপাল। এখানেও সেই একই জঙ্গি। একই উৎপাত।

ছাত্রছাত্রীরা আমাদের কথা না শুনে মেট্রো রেলে তুলে না দেয়ার কারণে আমরা খুব বাঁচা বেঁচে গিয়েছিলাম। কারণ বোমা ফাটার সাথে সাথে মেট্রো রেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো। অসংখ্য মানুষ অন্য কোনো ভাবে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল বলে ট্যাক্সি বা ক্যাবও পাওয়া যাচ্ছিল না। কাজেই আমদের হয়তো পুরো পথটুকু পায়ে হেঁটে ফিরে আসতে হতো! আমাদের ছাত্রছাত্রীরা তাদের গাড়িতে করে নিরাপদে একেবারে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের দরোজায় পৌঁছে দিয়ে গেল। আমার ছেলের অবশ্য এতো সৌভাগ্য হয়নি। পায়ে হেঁটে এবং একজন দয়ালু ক্যাব ড্রাইভারের সহযোগিতায় অনেক কষ্টে গভীর রাতে বাসায় ফিরে আসতে পেরেছিল।

যখনই আমাদের দেশে জঙ্গি হামলা হয় বাংলাদেশ সরকার তখন ঘোষণা দেয়, এটি স্থানীয় ঘটনা আন্তর্জাতিক জঙ্গিদের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এখানেও তাই হল। নিউ ইয়র্কের মেয়র ঘোষণা দিলেন এটি স্থানীয় ঘটনা আন্তর্জাতিক জঙ্গিদের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। বোঝাই যাচ্ছে পৃথিবীটা খুব ছোট!

মুহম্মদ জাফর ইকবাল : কথাসাহিত্যিক; অধ্যাপক, শাবিপ্রবি।


মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম ক্রুসিয়াল বিতর্ক ॥ কে জিতবেন হিলারি না ট্রাম্প? = আবদুল মালেক

রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬

দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন সমাপ্ত হওয়ার পর থেকেই মার্কিন নির্বাচনের ক্যানভাস যেন একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছিল তার বর্ণাঢ্যতা। কিন্তু তিনটি তর্কযুদ্ধের মাধ্যমে দুই প্রার্থীর ওয়ান টু ওয়ান আসন্ন এনকাউন্টারগুলো সেটিকে আবার ভরে তুলছে বর্ণে বর্ণে। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক রাজ্যের হফস্ট্রা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দুই প্রার্থীর মধ্যে নির্বাচন ১৬-এর প্রথম তর্কবিতর্ক।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উপলক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে এবার প্রথম যে টেলিভিশন বিতর্কটি হতে যাচ্ছে সেটি নিয়ে ভোটারদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। কারণ এবারের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ও রিয়াল এস্টেট মুঘল ও রিয়ালিটি টিভি স্টার রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়েই রয়েছেন ইমেজ সঙ্কটে। এক বছরেরও বেশি সময় নির্বাচনী প্রচারণা সত্ত্বেও হিলারি কিংবা ট্রাম্প কেউই তাদের ইমেজ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হননি।
বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, দুই তৃতীয়াংশ ভোটার এবারের নির্বাচনী প্রচারণাকে সাম্প্রতিককালের মধ্যে সর্বাপেক্ষা নেতিবাচক হিসেবে নিয়েছেন। দেশের অর্ধেকেরও বেশি ভোটার দুই প্রার্থীর প্রতি অনেকটাই আস্থাহীন ও আবেগশূন্য। রেজিস্টার্ড ভোটারদের বিশ্বাস উভয় প্রার্থীই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক রিস্কি চয়েস। ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্প এবং হিলারি ক্লিনটনকে পছন্দ ও অপছন্দের ব্যবধান খুব একটা লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু তারা জানেন মন্দের ভাল হিসেবে তাদের একজনকে বেছে নিতে হবে। এসব মতামত নিয়ে হিলারি ও ডোনাল্ডের প্রতি সমর্থনের পাল্লা কখনও দাঁড়াচ্ছে প্রায় সমান সমান, কখনওবা ভারি কয়েক পয়েন্টের ব্যবধানে। স্বভাবতই ধারণা করা হয়, এই বিতর্কগুলোতে যিনি তর্কবাগীশ হয়ে দর্শকশ্রোতার হৃদয়ে নাড়া দিতে সক্ষম হবেন তিনিই বিজয়ী হবেন নির্বাচনে। ভোটের মোড় ঘোরাতে এই বিতর্ক ডোনাল্ড কিংবা হিলারি কার জন্য সহায়ক হবে সেটা নিয়েই এখন চলছে জল্পনা-কল্পনার পালা।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হবে আমেরিকায় নির্বাচনের সঙ্গে প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক বাধ্যতামূলকভাবে জড়িত নয় এবং সংবিধানে এতদসম্পর্কে কোন নির্দেশনা দেয়া হয়নি। ব্যাপারটি পরবর্তীকালে যুক্ত হয়েছে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসেবে নয়, প্রথা হিসেবে। আক্ষরিক অর্থে প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কের সূচনা হিসেবে ধরা হয় ১৮৫৮ সালে ইলিনয় স্টেটে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র সিনেটের নির্বাচন উপলক্ষে আব্রাহাম লিংকন ও স্টিফেন ডগলাসের ডিবেটটি। দাসত্বের ফলে সমাজে নৈতিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয় ইস্যুতে মডারেটর বা প্যানেল ছাড়াই এটি চলে তিন ঘণ্টাব্যাপী এবং সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন ডগলাস। কিন্তু দু’বছর পর ১৮৬০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি থেকে লিংকন ও নর্দান ডেমোক্র্যাট পার্টি থেকে ডগলাস প্রার্থী হলেন তখন তারা পুনর্বার কোন বিতর্কে নামেননি। সে কারণেই সম্ভবত এটিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনী ডিবেটের সূচনা হিসেবে ধরা হয়। এরপর অবশ্য দীর্ঘ ১৫টি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আর কোন তর্কযুদ্ধের আয়োজন করা হয়নি। যথার্থ অর্থে প্রথম সাধারণ প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক হিসেবে সর্বমহলে স্বীকৃত হয়েছে ১৯৬০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর শিকাগোতে অনুষ্ঠিত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সিনেটর জন এফ কেনেডি এবং রিপাবলিকান প্রার্থী তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ডিবেটটি। তরুণ সিনেটর কেনেডির প্রখর বুদ্ধিমত্তা, সুতীতীক্ষ্ণ মেধা, আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি এবং সর্বোপরি সুদর্শন চেহারা ভোটারদের চমৎকৃত করতে সক্ষম হয়। বিপরীত দিকে অভিজ্ঞ রাজনীতিক হলেও এই অনুষ্ঠানে নিক্সনের পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত নিষ্প্রভ ও হতাশাজনক। সরাসরি টেলিভিশনে প্রদর্শিত এই বিতর্ক ৬৬ মিলিয়ন দর্শক প্রত্যক্ষ করেছিলেন। মনে করিয়ে দেয়া ভাল তখন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার পরিমাণ ছিল ১৭৯ মিলিয়ন।
ইদানীং প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেটের আয়োজক কমিশন অন প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেটস (সিপিডি) । বড় দুটি দলের সম্মতিক্রমে গঠিত সিপিডির নেতৃত্বে থাকে ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির সাবেক দুই চেয়ারপার্সন। অবশ্য দু’দল ব্যতীত থার্ড পার্টি ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রার্থীরাও বিতর্কে অংশ নিতে পারেন, যদি তারা ওপিনিয়ন পোলে ১৫% ভোট পেতে সক্ষম হন।
এবারের বিতর্কের দিনক্ষণ ও স্থান নির্ধারণ নিয়ে শুরুতে হিলারি ও ট্রাম্প শিবিরের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প সপ্তাহান্ত ছুটির দিন শনি ও রবিবার এবং মার্কিন ফুটবলের মতো জনপ্রিয় খেলার দিন বাদ দিয়ে মঙ্গল বা বুধবার এই ডিবেট করার পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ উইকেন্ডে খুব কম সংখ্যক মানুষই টিভি দর্শক হন। আর খেলার দিনগুলোতে দেশজুড়ে সবারই মধ্যে চলে খেলা নিয়ে মাতামাতি। রিপাবলিকানরা মনে করে হিলারি শিবির চাতুর্যতার সঙ্গে বার্নি ও হিলারির প্রাইমারি বিতর্কটি নির্ধারণ করেছিল একটি জনপ্রিয় খেলার দিনেই। ফলে অসংখ্য দর্শক সে অনুষ্ঠান দেখায় বঞ্চিত থেকেছে। অবশ্য হিলারি শিবির তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে এমন অভিযোগ। উপরন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প কোন মডারেটর এবং প্যানেল ছাড়া বিতর্ক করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। ফলে দুই শিবিরের মধ্যে তর্কযুদ্ধ নিয়ে সৃষ্টি হয় এক অচলবস্থা।
রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির চেয়ারপার্সন রিনে প্রিভিসের মধ্যস্থতা সেই জট খুলতে রাজি হওয়ায় অবশেষে ঘটতে যাচ্ছে আকাক্সিক্ষত ডোনাল্ড-হিলারির তর্কযুদ্ধগুলো। তিনটি বিতর্কের মধ্যে প্রথমটি অনুষ্ঠিত হবে ২৬ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের হফস্ট্রা ইউনিভার্সিটিতে, দ্বিতীয়টি ৯ অক্টোবর মিজৌরি স্টেটের সেন্ট লুইসস্থ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে ও ১৯ অক্টোবর সর্বশেষ বিতর্কটির স্থান নির্ধারিত হয়েছে লাসভেগাসের ইউনিভার্সিটি অব নেভাদায়।
মার্কিন নির্বাচন নিয়ে আগ্রহী মানুষেরা জানেন গত মাসে বিভিন্ন ন্যাশনাল পোলে সুইং স্টেটসহ লেজে-গোবরে ডোনাল্ডের চেয়ে প্রায় ডাবল ডিজিটে এগিয়ে ছিলেন হিলারি। কিন্তু ই-মেইল কেলেঙ্কারি, ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের বিপুল পরিমাণ ডোনেশন, লিবিয়ার বেনগাজিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হত্যার দায়ভার এসব ইস্যু যখন পুনর্বার তাকে জড়িয়ে ধরলো আষ্টেপৃষ্ঠে তখন বদল ঘটল চিত্রপটের। ডোনাল্ড উঠে দাঁড়ালেন এবং পরিস্থিতির ক্রমানবতিতে পেছাতে পেছাতে হিলারি চলে গেলেন প্রতিদ্বন্দ্বীর সমপর্যায়ে।
রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘আমেরিকা গ্রেট এগেইন’  স্লোগান তুললেও সেটা তিনি কিভাবে করবেন তা নিয়ে তার কোন সুস্পষ্ট পরিকল্পনা জনগণের সামনে হাজির করতে তো পারেনইনি, বরং নানা ইস্যুতে কটু মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি নিজেকে করে তুলেছেন বিতর্কিত। মার্কিন জেনারেলদের চেয়ে তিনি বেশি জানেন, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ, মুসলিম নিয়ে বিরূপ মন্তব্য, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে ভাল হিসেবে আখ্যায়িত করা ও ট্রাম্প ইউনিভার্সিটি কেলেঙ্কারির মতো বিষযয়গুলো তাকে তাড়া করে ফিরছে এখনও। ফলে ইদানীং অনেক বিষয়ে তাকে নমনীয় হতে দেখা যাচ্ছে। আফ্রিকান-আমেরিকানদের কাছে টানতে এখন তিনি স্বীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট ওবামার জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। হিস্পানিক ও অন্যান্য ইমিগ্রান্ট সম্প্রদায়ের বিরূপতা এড়াতে এমন কথাও তিনি এখন বলে বেড়াচ্ছেন যে, মানবিক কারণে সকল অবৈধ ইমিগ্রান্টকে এদেশ থেকে বহিষ্কার করবেন না।
সাবেক ফার্স্ট লেডি, সিনেটর ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে যুক্তিতর্কের বিপুল অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। ধীরস্থির হিলারি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সামনের টিভি বিতর্ক নিয়ে করছেন যথেষ্ট হোমওয়ার্ক। তিনি ব্রিফিং বিষয়ে বইপত্র যেমন পড়ছেন তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতিকৃতি স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে মক ডিবেট করে যাচ্ছেন। প্র্যাক্টিসের কারণে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি প্রচারণার জন্য জনসমক্ষে উপস্থিত হবেন না।
তুলনামূলকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়েল এস্টেট মুঘল ও রিয়ালিটি টিভি স্টার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলা যায় নবীন। এরপরেও ডিবেট বিষয়ে তিনি কোন রকম প্র্যাক্টিসে যাচ্ছেন না। ট্রাম্প আগেও বলেছেন, শেখানো বুলি বিতর্কে আওড়াতে পছন্দ করেন না। শনিবার পর্যন্ত তিনি ব্যস্ত থাকবেন প্রচার কাজে। শুধু রবিবারে তার পরিবারের সদস্য ও নির্বাচনী উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। এটা নিয়ে যেমন কিছু মহলে আশঙ্কা রয়েছে তেমনি আশঙ্কা রয়েছে টেম্পেরামেন্টের ব্যাপারে। তিনি দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে যুক্তিতর্কে টিকে থাকতে পারবেন কিনা সে কারণে অদ্যাবধি কোন মক ডিবেট পর্যন্ত করেননি। তারপরেও তিনি আশাবাদী প্রতিপক্ষের উস্কানি না থাকলে ভালই করবেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে যে যাই বলুন, তিনি যে তর্কযুদ্ধে একজন আনাড়ি ব্যক্তি সে কথা কিন্তু বলা যায় না। কারণ ১৭ জন ঝানু রিপাবলিকান সিনেটর, কংগ্রেসম্যান ও গবর্নরকে প্রাইমারি বিতর্কে পরাস্ত করে দলীয় নমিনেশন পেয়েছেন যে ট্রাম্প তাকে বিতর্ক অনুষ্ঠানে দেখার জন্য ২৬ সেপ্টেম্বর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার মতো শারীরিক সুস্থতা ও স্ট্যামিনা হিলারির নেই বলে বহুদিন ধরে ট্রাম্প অভিযোগ করছেন। এরই ভেতর গত ১১ সেপ্টেম্বর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংস স্মরণ অনুষ্ঠানে হিলারি অসুস্থ হওয়ার পর থেকে এ নিয়ে খোঁচা দেয়ার কোন সুযোগই হাতছাড়া করছেন না ট্রাম্প। গত ২১ সেপ্টেম্বর তারিখে টুইটারে ট্রাম্প লেখেন, ‘হিলারি আবারও একদিনের জন্য ছুটি নিয়েছেন। তার এখন বিশ্রাম দরকার। ভালমতো ঘুমান হিলারি। বিতর্কে দেখা হবে আপনার সঙ্গে।’
লেখক : আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক |
ই- মেইল এই ইমেইল ঠিকানা স্পামবট থেকে রক্ষা করা হচ্ছে।এটি দেখতে হলে আপনাকে JavaScript সক্রিয় করতে হবে।


বঙ্গবন্ধু ও জিয়া- কে মুক্তিযোদ্ধা নয়? = সিরাজী এম আর মোস্তাক

রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬

স্বাধীনতার স্থপতি বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধে ‘জেড ফোর্সের’ প্রধান শহীদ জিয়াউর রহমানের নাম বাংলাদেশে চির অম্লান। স্বাধীনতার পর তারা নিজেরা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা বা তালিকা নিয়ে বিতর্ক করেননি। বরং বঙ্গবন্ধু নিজেই জিয়াউর রহমানকে ‘বীর উত্তম’ খেতাব দিয়েছেন। তাকে সেনাবাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড করেছেন। বঙ্গবন্ধু মাত্র ৬৭৬ জন যোদ্ধাকে খেতাব দিয়ে ১৯৭১ এর অবশিষ্ট সকল বাঙ্গালীকে ‘সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা’ ঘোষণা করেছেন। বঙ্গবন্ধু নিজেও বন্দি যোদ্ধা হিসেবে একজন ‘সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয় দিয়েছেন। এ মহান চেতনায় জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী ও অসংখ্য ত্যাগী যোদ্ধা নিজেরা খেতাব না নিয়ে ‘সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয় দিয়েছেন। তারাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। অথচ বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তারা নেই। বর্তমানে মাত্র প্রায় দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা রয়েছে। এদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটা চালু হয়েছে। এদের সন্তান-সন্ততি ও নাতি-নাতনিরাও কোটাসুবিধা পাচ্ছে। এটিই মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে বিতর্কের কারণ। এতে প্রশ্ন উঠেছে, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কারা? বঙ্গবন্ধুসহ তালিকার বাইরে যারা, নাকি শুধু কোটাভোগীরা?

alt
সম্প্রতি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা পদক প্রত্যাহারে আরেকদফা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পদক’ (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। ২০১৬ সালে শুধু জিয়াউর রহমানের পদকটি কেড়ে নেয়া হয়। জাদুঘর থেকে তার পুরস্কার সরিয়ে ফেলা হয়। এতে প্রশ্ন ওঠে, বঙ্গবন্ধু ও জিয়ার মধ্যে কে মুক্তিযোদ্ধা নন?
এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর প্রয়োজন। এতে জাতীয় চার নেতা, জেনারেল ওসমানী, ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভমহারা মা-বোনেরও স্বীকৃতি মিলবে। তারা মুক্তিযোদ্ধা নাকি রাজাকার ছিলেন, তা পরিষ্কার হবে। শুধু তালিকাভুক্ত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধাই দেশ স্বাধীন করেছেন নাকি বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্যদেরও ভূমিকা ছিল, তা স্পষ্ট হবে।
মূলত যতদিন বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকবে এবং বঙ্গবন্ধুসহ অন্যদের নাম তাতে অর্ন্তভূক্ত না হবে, ততোদিন বিতর্ক চলবে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মিথ্যা ইতিহাস রচিত হবে। এটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি। এজন্য উচিত, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংশোধন করা এবং বঙ্গবন্ধুসহ ১৯৭১-এর সকল যোদ্ধা, শহীদ, বন্দি ও শরণার্থীদেরকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করা।
এ্যাডভোকেট, ঢাকা।


অনিল কি আদৌ ইউরোপে আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্খী নাকি ধ্বংসকারী ?

শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬

ইউরোপ আওয়ামী লীগ এর সাধারণ সম্পাদক জনাব এম, এ, গনি এর নেতৃত্বে ইউরোপ এর  সব দেশে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত হয়েছে।  বিশেষ করে জাতীয় শোক দিবস ২০১৬ উপলক্ষে সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামীম হক কে সাথে নিয়ে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বেলজিয়াম , নেদারল্যাণ্ড , পর্তুগাল ,স্পেন ও গ্রিস  আওয়ামী লীগের আলোচনা অনুষ্ঠান করেছেন। এই সব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সাধারণ কর্মীদের উজ্জীবিত করেছেন এবং নেতা কর্মী সমর্থকদের বিভিন্ন পরামর্শ আমলে সংগঠনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছেন। সেখানে অনিল দাশ গুপ্ত ঘরে বসে এম এ গনির সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য বয়কট এর ডাক দিয়েছেন। এছাড়া সুইডেন , ফ্রান্স আওয়ামী লীগের সম্মেলন এ উপস্থিত থেকে চেষ্টা করেছেন শক্তিশালী আওয়ামী লীগ গঠন করতে। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে ডেনমার্ক আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম -সাধারণ সম্পাদক দীপুমনি এর সাথে। এছাড়া নরওয়ে , ফিনল্যান্ড আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১২ বছর পর সম্মেলন এর আয়োজন করে এই অঞ্চলে শক্তিশালী আওয়ামী লীগ গঠন করেছেন। এম এ গনি পরিপূর্ণ রাজনীতিবিদ।  তাইতো এম , এ, গনি   বাংলাদেশে গেলে ও  ছুটে যান আওয়ামী লীগের তীর্থ স্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়।  গত জুলাই ২০১৬  ইউরোপ আওয়ামী লীগের সবাইকে নিয়ে গিয়েছিলেন টুঙ্গিপাড়ায়। সারাদিন  কর্মী নেতাদের  ফোনে সময় কাটে  এম এ গনি এর।  অন্যদিকে অনিল দাশ গুপ্ত কে ফোন দিয়ে পাওয়া যায় না। আপাদমস্তক কর্মী বান্ধব এম এ গনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিটিকে ধারণ করে সমৃদ্ধ হয়েছেন।এম এ গনি লন্ডনে উচ্চ শিক্ষায়  শিক্ষিত হলে ও খেলাধুলায় যথেষ্ট আগ্রহী ছিলেন।  তাইতো অল  এশিয়ান স্টুডেন্টস ক্রিকেট টীম ক্যাপ্টেন ছিলেন।  যেকোন দেখি  সেই সময় ক্রিকেট খেলোয়াড় ইমরান খান এর সাথে ছবি ও চট্টগ্রাম এর স্কুল এর সহপাঠী ৯০ এর আগে তোলা ড. ইউনুস ও মোর্শেদ খান এর ছবি দিয়ে নোংরা ও নিচ মানসিকতা প্রকাশ করে।  উল্লেখ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার মরহুম আতাউর রহমান খান কায়সার ও এম এ গনি , ড.ইউনুস , মোর্শেদ খান সহপাঠী ছিলেন।  বনেদি স্কুলে যখন পড়া হয় তখন সবাই বড় বড় নেতা হয় বিভিন্ন দলের তাই বলে কি তাদের মধ্যে সখ্যতা থাকতে পারে সেটা বেক্তিগত পর্যায়ে।  জনাব এম , এ , গনি কে  জিয়াউর রহমান মন্ত্রিত্বের টোপ দিয়ে ও বঙ্গবনধু এর আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারে নি। বঙ্গবন্দুর আদর্শ ও শেখ হাসিনার নেতৃত্ত কে ধারণ করে ২০০২ এর ২২ ফেব্রুয়ারী  ইউরোপ আওয়ামী লীগের সভাপতি অনিল দাশ গুপ্ত যখন পদত্যাগ করেন তখন প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা কে সাথে ইউরোপ এর বিভিন্ন দেশে ঘুরে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেছিলেন।  দলের দুঃসময়ে ইউরোপ এর এম এ গনি ই সাথে ছিলেন।  কেননা এম এ গনি বঙ্গবনধু   এর হাতে গড়া একজন সংগঠক।  তিনি স্বাধীনতার আগে জাতির জনক শেখ  মুজিবর রহমান  ঘোষিত  চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এর দায়িত্ত পালন করেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রাণ পুরুষ এম এ আজিজ ও জহুর আহমেদ চৌধুরীর সাথে। ১ /১১ পরবর্তী ইউরোপ ইউনিযন হেড অফিস বেলজিয়াম এর ব্রাসেলস শহরে ইউরোপ  ইউনিয়ন এর সাথে বৈঠকে ইউরোপ নেতৃবৃন্দের বোঝাতে সক্ষম হন শেখ হাসিনার মুক্তি ছাড়া বাংলাদেশে কোন গণতান্ত্রিক নির্বাচন সম্ভব না। ইউরোপ আওয়ামী লীগ ভীত আরো বেশি শক্তিশালী করার জন্য মেয়াদউত্তীর্ণ সকল কমিটির সম্মেলন এর ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সাংগঠনিক চিঠি প্রদান করেন। তিনি সাংগঠনিক কার্যকলাপ বিরোধী কোন কাজ কে প্রশ্রয় দেন না।  তাই   জাতির জনক শেখ মুজিবর রহমান  এর খুনি ডালিম এর প্রশংসা করায় জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে হল্যান্ড আওয়ামী লীগ এর সভাপতি মায়ীদ ফারুক ( বর্তমানে অব্যাহতি প্রাপ্ত ) কার্পণ্য বোধ করেন নি।  মায়ীদ ফারুক এক সময় জাসদ করা  ও ব্ঙ্গবন্দু এর খুনি মেজর ডালিম কে প্রাথমিক অবস্থায় হল্যান্ডে তার বাসায় আশ্রয় দেওয়ার যথেষ্ট প্রমান থাকার পর শ্রী অনিল দাশ গুপ্ত  হল্যান্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি করেন।  কিনতু কয়লা ধুলে ময়লা না যাওয়ার মত মায়ীদ ফারুক এখনো খুনি ডালিম এর গুনগান গাইতে  ছাড়ে না সুযোগ পেলে। সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ গনি কে  কে হল্যান্ড আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ কর্মী সমর্থক প্রমান সহ অভিযোগ করলে মায়ীদ ফারুক কে অব্যাহতি প্রদান করে। কিন্তু এই বিষয়ে শ্রী অনিল দশ গুপ্তের কোন বক্তব্য পাওয়া যায় নি। ইউরোপ এর কোন দেশে সাংগঠনিক সফর করেন না শ্রী অনিল দাশ গুপ্ত।  কথিত আছে তিনি সর্বশেষ দশ বছরে  বাংলাদেশ দূতাবাস জার্মান আয়োজিত জাতির জনকের হত্যা দিবস উপলক্ষে কোন আলোচনা অনুষ্ঠানে যান না ।

Picture


২০১৫ সালে আওয়ামী পরিবারের ঘনিষ্ঠজন সাংবাদিক ,অমর  একুশে গানের রচয়িতা আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী এর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা করে সেই সময় ডেনমার্ক  আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লিঙ্কন মোল্লা কে অব্যাহতি দিয়েছিলেন সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ।  লিঙ্কন মোল্লা প্রকাশ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন ,জনাব গাফ্ফার চৌধুরী নাকি তারেক জিয়া থেকে অর্থ পেলে তার পক্ষে লিখতেন। উল্লেখ জনাব আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী ডেনমার্ক আওয়ামী লীগের একটি গ্রূপের অনুষ্ঠানে আসলে সহ্য করতে না পেরে লিঙ্কন মোল্লা আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর বিরুদ্ধে লিখতে কার্পণ্য বোধ করে নি।  পরবর্তীতে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী সহ  ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এর কাছে মুচলেখা দিয়ে ডেনমার্ক আওয়ামী লিগে ফিরিয়ে আনা হয়।  কিন্তু কুকুরের লেজ এর মত আওয়ামী লীগ এ ফিরে এসে আবার ডেনমার্ক আওয়ামী লীগ এ স্বৈরতন্ত্র কায়দায় সংগঠন চালানোর চেষ্টা করে।  আবার ও অনলাইন সোশ্যাল মিডিয়া ও টেলিফোনে সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি অনিল দাশ গুপ্ত এর বিরুদ্ধে নগ্ন ভাষায় কথা বলে এই লিংকন মোল্লা।  অব্যাহতি প্রাপ্ত হল্যান্ডের মায়ীদ ফারুক রাট ১২ তার পর নাকি মাতাল থাকে , তাই যা কথা বলে ঐসবের কোন মূল্য নাই।  শ্রী অনিল দশ গুপ্ত দেশে দেশে হাইব্রিড পয়দা করে এবং  চাঙ্গা করে রাখে এই সব কথা অনলাইন সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই শুনেছে।  শ্রী অনিল দাশ গুপ্ত ভারতীয় নাগরিক প্রথম প্রকাশে ৯৬ - ৯৭ সালে প্রকাশিত হয় বলে জানা যায় লিংকন মোল্লার রেকর্ডিং ভয়েসে।  শ্রী অনিল  দাশ গুপ্ত নিজে বলেছেন লিংকন মোল্লা  খুব খারাপ সবার বিরুদ্ধে সে বলেছে।  ডেনমার্ক আওয়ামী লীগ যারা করে তারা সবাই জানে রাতের অন্ধকারে ডেনমার্ক বিএনপির  শীর্ষ স্থানীয় নেতার লিঙ্কন মোল্লার মামা ভাগ্নের সম্পর্ক।  তাইতো একসময় ডেনমার্কের মোস্তফা মজুমদার বাচ্চু এর সাথে খারাপ সম্পর্কের ফয়সালা  করার জন্য এই লিংকন মোল্লা ডেনমার্ক বিএনপির কাছে ধারস্ত হয়েছিল। ইউরোপের আওয়ামী লীগের নষ্ঠ ও নোংরা রাজনীতির কুলাঙ্গার বলা হয় লিংকন মোল্লা কে ।  তাই গত ১৮ জুলাই ২০১৬ লিংকন মোল্লাকে ৫ বছরের জন্য আওয়ামী লীগের সকল কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি প্রদান করা করা হয়। কিনতু কুলাঙ্গার লিঙ্কন মোল্লা অনলাইন এ  ইউরোপের আওয়ামী লীগের মধ্যে কুৎসা রটিয়ে বিএনপির এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত।
ইউরোপ জুড়ে এম এ গনি যখন সাংগঠনিক ভীত শক্ত করতে ব্যস্ত দেশে দেশে ঘুরে  তখন ইউরোপের অনেক আওয়ামী লীগ নেতা ঈর্ষান্বিত। এম এ গনি  শোকের মাস অগাস্ট জুড়ে যখন ইউরোপ চষে বেড়াচ্ছেন ইউরোপ বিভিন্ন দেশে শোক দিবস এর অনুষ্ঠানে তখন একটি অনিল দাশ গুপ্ত একটি অডিও টেপে বলেছেন গনি কে বয়কট কর।  যে কথা বিএন পি  বলার কথা সে কথা যদি সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি  শ্রী অনিল দশ যখন বলেন তখন অনিল দাশ গুপ্ত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এর অংশ হয়ে কাজ করছেন কিনা সে সন্দেহে করা অমূলক নয়। শ্রী অনিল দাশ শেখ মুজিবের খুনি ডালিম এর বনধু ও একসময় এর আশ্রয় দাতা মায়ীদ ফারুক ও ডেনমার্ক আওয়ামী লীগের অপকর্মের হোতা  লিংকন মোল্লা কে আশ্রয় দেন তখন প্রশ্ন জাগে শ্রী অনিল দাশ  গুপ্ত আওয়ামী লীগ এর এজেন্ট কিনা ? অনিল দাশ গুপ্ত কোনদিন কোন জায়গায় ইউরোপ আওয়ামী লীগের কোন কিছু কি সমাধান করেছেন কোন দিন ?   শ্রী অনিল দাশ গুপ্ত শুধু লাঞ্চিত হওয়ার অভিযোগে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা কোন দেশে আসলে সফর করেন।  কেননা ঐসময় নেত্রীর আগমন উপলক্ষে অন্তত আওয়ামী লীগ বান্ধব কর্মীরা অন্তত গোলযোগ করবেন না।এম এ গনির সাংগঠনিক কার্যক্রমে যখন  বিএনপি সহ আওয়ামী বিরোধীরা দিশে হারা  তখন  শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডে তাহের ঠাকুর  এর মত  ভূমিকা পালন করছেন ইউরোপ আওয়ামী লিগে শ্রী অনিল দাশ গুপ্ত। এম , এ গনিকে বয়কট এর ডাক দিয়ে শোকের মাস আগষ্টে কারো এজেন্ট বাস্তবায়নে অনিল দাশ গুপ্ত  কাজ করছেন কিনা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।  একজন ভারতীয় অনিল দাশ অন্তত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতা হতে পারে না।ইউরোপ আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী সমর্থক সবার মুখে অন্তরে একটি কথা -অনিল কি আদৌ  ইউরোপে আওয়ামী লীগের  শুভাকাঙ্খী নাকি ধ্বংসকারী ?

লেখক
ফয়সাল আহমেদ
সদস্য , আওয়ামী লীগ