Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

পহেলা বৈশাখের কবিতা - জুলি রহমান

রবিবার, ০৯ এপ্রিল ২০১৭

জীবন রৌদ্রময়
জুলি রহমান

চৈত্রের চিতায় পুড়ে খাঁটি হও
স্ফটিক পাথরে চোখ রেখে
হীরকসন্ধানী-

লাঙলের ফলা বোনে স্বর্নবীজ
সোনার চেয়েও দামী আছে কিছু
সোদাঁগন্ধ মাটি-

মেঘলা সন্ধায় নেই শস্য- সম্ভাবনা
জীবনটাইএমন ঝাঁঝালো
রৌদ্রময়-

আকাশের নীল মেখে গায়
গোধূলি-মদির রামধনু রঙ ফেলে যায়
ময়ূরের পেখমে ছড়ায় দ্যোতনা
জীবনের প্রলাপ পরতে পরতে-

সকাল থেকে সন্ধা কাহিনী সকল
বাঁধে বুনট পাখির ঘর
পালিত সূ্র্যের আলোয় কুসুমস্তর-

টলোমলো হাওয়ার সবুজের ডানা
জীবনের সংগীত আনে সুখ -দুঃখ
ঘিরে স্রোতময় সময়ের ধারা


এ কী হাল স্বাস্থ্যের! উদ্বিগ্ন আমেরিকা

রবিবার, ০৯ এপ্রিল ২০১৭

বাপ্ নিউজ : সমৃদ্ধির জোয়ার চারপাশে। ঝাঁ চকচকে হাসপাতাল, আধুনিকতম পরিকাঠামো, দক্ষ ডাক্তার, গবেষণায় অন্যান্য দেশের থেকে বহু যোজন এগিয়ে। তবু স্বাস্থ্য নিয়ে আমেরিকার ‘সুখ নেইকো মনে’।

মার্কিন সরকারের ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটর লিডারশিপ প্রোগ্রাম-এ ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে এই দেশে এসে দেখা যাচ্ছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক-গবেষক, নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কলেজ পড়ুয়া, ব্যাঙ্ক কর্মী থেকে শুরু করে সান দিয়েগোর পার্কের বাইরে বসে থাকা গৃহহীন, একটা বড় অংশেরই হা-হুতাশ, মোটে ভাল নয় স্বাস্থ্য পরিষেবার হাল। মাস কয়েক আগে কাইজার ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষাতেও ধরা পড়েছে স্বাস্থ্য নিয়ে ৪৫% মানুষের মনোভাব নেতিবাচক। মোটামুটি ইতিবাচক মনে করেন ৪৩%। বাকিরা মতামত দেননি।

এই মুহূর্তে ‘ওবামা কেয়ার’ তথা আমেরিকার ‘অ্যাফর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট’ নিয়ে সরগরম গোটা বিশ্ব। ৭ বছর আগে বারাক ওবামার চালু করা এই আইনকে নস্যাৎ করতে চেয়ে বারবার ধাক্কা খাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এই টানাপড়েনে রীতিমতো বিভ্রান্ত আমজনতা। তাঁদের একটা বড় অংশের মতে, স্বাস্থ্য পরিষেবা সকলের নাগালের মধ্যে থাকাটাই কাম্য। তাই তাঁরা চাইছেন, ‘ওবামা কেয়ার’ থাকুক। শুধু এর ত্রুটিগুলি শুধরে নেওয়া হোক। বিমা সংস্থাগুলির উপরে নিয়ন্ত্রণ বাড়াক প্রশাসন। তাঁদের বক্তব্য, উন্নয়নের জোয়ার বইছে আমেরিকার স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে। কিন্তু তার খরচ এত বেশি যে, সেই উন্নয়নের সুফল কাজে লাগাতে পারছেন না তাঁরা।

মেয়ো ক্লিনিক বা ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটালে বেশ ক’জন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁরা এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঘৃণা করেন। ‘‘কারণ সাধারণ মানুষ এই উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পান না। আমরা চিকিৎসক হিসেবে তখন অসহায় হয়ে পড়ি,’’ বলছেন এক শল্য চিকিৎসক।

Picture

হার্ভাড এবং এমআইটি-র এক সমীক্ষাতেও দেখা গিয়েছে, আমেরিকার প্রায় অর্ধেক মানুষ এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ। মার্কিন নাগরিকরা এই সমীক্ষায় জানিয়েছেন, বিমা থাকা সত্ত্বেও সব সময়ে তাঁরা এই চিকিৎসার সুযোগ নিতে পারেন না। বিমা সংস্থা খরচ দেওয়ার পরেও যে অংশটা রোগীকে মেটাতে হয়, সেটা বিপুল। ব়ড়সড় অসুখ হলে তো দেউলিয়া হওয়ার জোগাড়!

সান দিয়েগোর এক অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এমা রবার্ট বললেন, ‘‘আমি যে বিমা করিয়েছি, তার প্রিমিয়াম যথেষ্ট বেশি। বিমা সংস্থা ৮০% দেয়। কিন্তু যে বাকি ২০% মেটাতে গিয়েই ফতুর হয়ে যাচ্ছি। আমাদের পোষা কুকুরের জন্যও চিকিৎসা বিমা করানো আছে। নয়তো বড় অসুখ হলে চিকিৎসাই করানো যাবে না খরচের ধাক্কায়।’’

এ দেশে সাধারণ ভাবে কর্মীদের বিমার ব্যবস্থা করেন নিয়োগকর্তারাই। কিন্তু রাস্তার ধারের ফাস্টফুড সেন্টার বা ছোট কল সেন্টারের মতো খুব ছোট সংস্থার কর্মীদের বিমা থাকে না বহু ক্ষেত্রে। এঁরা ‘আংশিক সময়ের কর্মী’, এই যুক্তি দিয়ে কর্তৃপক্ষ দায় এড়ান। এই বিপুল সংখ্যক কর্মী ও আরও বিপুল সংখ্যক দরিদ্র মানুষ যাঁরা গরিবদের জন্য তৈরি হওয়া ‘মেডিকেড’ প্রকল্পের বাইরে রয়েছেন, তাঁদের সকলকেই বিমার আওতায় আনতে চেয়েছিলেন ওবামা। কিন্তু অধিকাের হস্তক্ষেপ ও বেশি প্রিমিয়ামের অভিযোগ তুলে অনেকে এই বিমা করাননি।

এঁদের অনেকের বক্তব্য, ‘ওবামা কেয়ার’ গরিবদের জন্য ভাল। কিন্তু গরিবদের ভর্তুকি দিতে হবে বলে বিমা সংস্থাগুলি যে ভাবে বাকিদের বিমার প্রিমিয়াম বাড়াচ্ছে, তাতে মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস উঠছে। গরিবদের সাহায্য করতে হলে সরকার করুক, নাগরিকরা কেন তার দায় নেবে সেই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

বস্তুত, গরিব নাগরিকদের জন্য যে ‘মেডিকেড’ প্রকল্প চালু আছে, এই মুহূর্তে তার আওতায় আছেন ৭ কোটি ৩০ লক্ষেরও বেশি মার্কিন। ওবামা চেয়েছিলেন, এই প্রকল্প আরও বিস্তৃত হোক। ট্রাম্প এসে তাতেও বাদ সাধছেন। ট্রাম্পের পরিকল্পনা— ‘মেডিকেড’ বদলে আমেরিকার প্রদেশগুলিকে আলাদা ভাবে কিছু অর্থ (ব্লক গ্রান্ট) দেওয়া হোক। তারা গরিবদের জন্য প্রয়োজন মতো তা খরচ করবে। আমেরিকার সাধারণ গরিব মানুষ এতে আতঙ্কিত। তাঁদের বক্তব্য, ‘মেডিকেড’ বাতিল হলে তাঁরা বিনা চিকিৎসায় মরবেন। যে ভাবে কাগজে-কলমে প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও তার সুযোগ পান না বহু গৃহহীন, যে ভাবে টাকা না থাকা গরিবদের এমার্জেন্সি চিকিৎসা করতে বাধ্য হওয়া সত্ত্বেও বহু হাসপাতাল তা মানে না, সেই ভাবেই এই ব্লক গ্রান্টও কাগজে-কলমেই থেকে যাবে। তার সুফল পাওয়া যাবে না।

এই কারণে শুধু ওবামার প্রতি বিদ্বেষ থেকে ‘ওবামা কেয়ার’ নস্যাৎ না করে, বরং তার ত্রুটিগুলো শুধরে সেটাকেই নতুন রূপ দেওয়া হোক, একটা বড় অংশের আমেরিকাবাসী এখন সেটাই চান। তাঁদের বক্তব্য, প্রযুক্তি-গবেষণায় এগিয়ে থাকা দেশ এ বার এ দিকটা নিয়েও ভাবুক!


নিউইয়র্ক টাইমসে তাহমিমা আনামের কলাম - যেভাবে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক সৃষ্টি করল বাংলাদেশ

বুধবার, ০৫ এপ্রিল ২০১৭

লাইনে আমি একমাত্র ব্যক্তি ছিলাম যাকে অধিক সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হত এবং আমার পেছনের মানুষরা অধৈর্য হয়ে ঘোরাফেরা করতেন। আমি যে দেশেই যেতাম আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র, ব্যাংকের তথ্য, কলেজের অনুলিপি পর্যন্ত নিয়ে যেতাম।

একবার আমার বার্সেলোনায় পারিবারিক সফরে যাওয়ার কথা ছিল। ভিসার জন্য রাতে আমি ঢাকার স্পেন দূতাবাসে যাই। আমি দূতাবাস থেকে বের হই সকালের সূর্য দেখে। আমার সঙ্গে ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকা, জর্ডান, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়ার নাগরিকরা। এরা সবাই আমার মত পাসপোর্ট জটিলতায় পড়েছিলেন।

যদিও আমার এই পাসপোর্টের মূল্য অসীম। কারণ এটি অনেক কষ্টে অর্জিত হয়েছিল। আমার দাদা ভারতীয় উপমহাদেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আমার বাবা-মা জন্মেছিলেন পূর্ব-পাকিস্তানে। ১৯৭১ সালের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বাধীনতা পায় নি এবং আমার শৈশবের আগেই সেই কঠিন দিনগুলো আমার দেশ পার করেছে। নিজের কাছে প্রশ্ন জাগে, আমারা পাকিস্তানের আওতাভূক্ত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ছিলাম আজ আমি স্বাধীন বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করে কতটা সৌভাগ্যবান। জন্মসূত্রে এই দেশে জন্মগ্রহণ করে আমি আমার অধিকার কতটা পেয়েছি।

Picture

ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে মন্ত্রীসভা ২০১৬ সালের নাগরিক আইনের খসড়া প্রণয়ন করে। এতে দ্বি-নাগরিকত্বের প্রস্তাবনা দেয়া হয়। বেশিরভাগ দেশই এখন স্থায়ী নাগরিক এবং দ্বি-নাগরিকত্ব অনুমোদন দিচ্ছে।

বাংলাদেশে আগে দ্বি-নাগরিকত্বের বিষয়ে কোন বিধি-নিষেধ ছিল না। নতুন আইনে এটি পাল্টে গেল। দ্বি-নাগরিকত্বধারীরা কোন রাজনীতিক সংগঠন এবং সরকারী কাজে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। সবচাইতে খারাপ দিক টি হলো তাদের সন্তানদের জন্যও বিভিন্ন বিধি-নিষেধ জারি করা হয়েছে। যদি এগুলো পালন না করা হয় তাহলে তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হবে।

এই আইনের সবচাইতে অশুভ দিকটি হল রাষ্ট্র চাইলে কিছু নির্দিষ্ট কারণে নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারবে। যেমন, যদি বাংলাদেশে সঙ্গে কোন দেশের যুদ্ধ লাগে এবং বাংলাদেশি দ্বি-নাগরিকত্বধারী কোন নাগরিক যদি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বা সংবিধানকে অমান্য করেন অথবা তার বাবা-মা যদি শত্রদের মিত্র হয়ে থাকেন তাহলে তার নাগরিকত্ব রাষ্ট্র বাতিল করতে পারবে।

এই দুইটি শর্তই অশুভ এবং অস্পষ্ট। এই আইনে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বা সংবিধানকে অমান্য বলতে কি বোঝানো হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর হল, সরকার এই সমস্ত বিষয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে একশ্রেণীর কর্মকর্তাদের প্রস্তাব দিবেন ( আমরা জানি না তারা কারা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা না কি সেনাবাহিনীর লোক অথবা সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত কি না)। তবে এরা যে সিদ্ধান্ত নিবেন সেটিই চুড়ান্ত বলে গণ্য হবে। কোন আদালত তাদের সিদ্ধান্তের বাহিরে যেতে পারবে না। এর মাধ্যমেই বোঝা যায়, প্রস্তাবিত এই আইনে কি ঘটতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র তার পছন্দমত নাগরিক বাছাই করতে পারবে এবং রাষ্ট্রের বিবেচনা মোতাবেক ও শর্তানুযায়ী নাগরিকত্ব দেয়া হবে।

পরিশেষে এটিই দাঁড়ায় যে, এই আইন দ্বৈত নাগরিকত্বের আইন নয়। এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা একীভূতকরন ও কি কি বিষয় থাকলে যোগ্য নাগরিক হওয়া সম্ভব এবং নাগরিকত্ব বাতিলের আইন।

এটি একটি নির্মম পরিহাস। যারা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের নাগরিক এবং ভবিষ্যতে যারা নাগরিকত্ব দাবি করতে পারবেন বাংলাদেশ তাদের অধিকার সীমিত করতে চাইছে। কিন্তু এটি মৌলিকতার ওপর মিথ্যারোপ। আমাদের মত লক্ষ লক্ষ মানুষ অর্থনীতিক, সামাজিক এবং রাজনীতিক কারণে জন্মস্থান ছেড়ে আসেন। আমরা অন্য দেশের দরজায় কড়া নাড়ি। আমাদের ভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক হয় এবং আমরা সন্তান ধারণ করি। আমরা শান্তিরক্ষী, নির্মাতা, গৃহকর্মী এবং ড্রাইভার হিসেবে কাজ করি। আমরা শরণার্থী এবং অভিবাসী।

এটি আমার মত ১৫ লক্ষ বাংলাদেশি অভিবাসীর জন্য চিন্তার বিষয়। কারণ বাংলাদেশে তারা রেমিটেন্স পাঠায় এবং ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের হিসেব মতে এর পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির ৮ শতাংশ। তারা সরকারের কাছ থেকে জন্মগত অধিকার ছাড়া আর কোন কিছুই আশা করে না।

বাংলাদেশ সরকারের এর নাগরিকত্বের সুযোগ সহজ করা উচিত। দ্বি-নাগরিকত্ব ও ভিন্ন ধরণের নাগরিকত্বের মত শাস্তি না দিয়ে অভিবাসনের শক্তিকে কাজে লাগানো উচিত। ইতিহাসবিদ এবং লেখক বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন যাকে ‘গভীর আনুভূমিক সঙ্গী’র কথা বলেছেন যা নাগরিকত্ব থেকে আসে।

আমি বিদেশে বসবাস করা কোন বাংলাদেশি অভিবাসীর আশা আকাঙ্খার কথা জানি না। জানি না তারা তাদের ঘর-বাড়ি নিয়ে কি আশা করে। ২০১০ সালে আমি একজন আমেরিকানকে বিয়ে করি। এক বছর পর আমি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পাই। আমাদের বিয়ে পরবর্তী অনুষ্ঠান লন্ডনের ক্যামডান টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আমাদের সন্তান ইস্ট লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেছে। তাদের ব্রিটিশ পাসপোর্ট আছে। যার জন্য তাদের কখোনোই ভিসা পাওয়ার জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হবে না এবং ইমিগ্রেশন দপ্তরে তারা কোন রকম অস্বস্তি বোধ করবে না। তাদের দুইটি পরিচয় আছে, যেখানে তার জন্মেছে এবং তার মা যে দেশে জন্মগ্রহণ করেছে। আমার প্রত্যাশা বাংলাদেশ সরকার এটি কখোনোই অবহেলা করবে না।

লেখক ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনামের কন্যা।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে অনুবাদ করেছেন লিহান লিমা।


এপ্রিল ফুল - মোহাম্মদ নাসিরুল্লাহ

রবিবার, ০২ এপ্রিল ২০১৭

আমি স্বপ্নের মধ্যে ঘুমাই

ঘুমের মধ্যে ঘুম থেকে জেগে

দেখি নতুন শহর,

পানির ধারা,

আমার রোমকূপে|

নতুন শহরে অনেক দূর হেটে

একটা পাথরে হেলানো লতা দেখে

মনে হল বুকের জমাট কথা গুলি

দুর্বলতা|

রচনা কাল এপ্রিল ১, ২০১৭ নিউ ইয়র্ক


স্বাধীনতার অপর নাম বঙ্গবন্ধু - ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ

রবিবার, ০২ এপ্রিল ২০১৭

২৬ মার্চ, আমাদের মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার সেনারা নিরীহ বাঙালির প্রতি যে বর্বর গণহত্যা চালিয়েছিল, সেই মৃত্যুর বিভীষিকা থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল দেশের মুক্তিপাগল বীরসন্তানরা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে অস্ত্র কাঁধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রণাঙ্গনে। আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটেছিল বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের। ডাক এসেছিল দেশকে হানাদারের কবল থেকে মুক্ত করার। এই মার্চ মাস এলেই সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা খুবই মনে পড়ে।

আমি দেখেছি, কীভাবে রক্তস্নাত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। ২৫ মার্চ রাতে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে গ্রেফতার হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে নিরস্ত্র বাঙালিরা যেভাবে একটি সুশৃঙ্খল অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, পৃথিবীর ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত বিরল। বাংলাদেশ যে মুক্তিযুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে, সে বোধ তৈরি হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্যে দিয়ে। তার ভাষণ শোনার পর কোনো বাঙালির মনেই আর দ্বিধা রইল না। সেদিন থেকেই সারাদেশের মানুষ প্রস্তুতি নিতে থাকল স্বাধীনতার জন্য। সে ধারাবাহিকতায় ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা তাই প্রত্যাশিত ছিল। সেদিন থেকে এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তুলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে অংশ নিল মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে। পাকিস্তানের বিমাতাসুলভ বৈষম্যের সম্পর্কে যাদের কখনো কোন ধারণা ছিল না, গ্রামের সেই খেটে খাওয়া দিন মজুর কৃষক তারাও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। মুক্তিসংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে দেশের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার অগণিত মানুষ। যারা সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার সুযোগ পায়নি, তারা মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে, বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছিল।

কুমিল্লার জেলার হোমনা থানার মানুষের মাঝে সেদিন আমি স্বাধীনতার যে দৃঢ়তা ও শক্তি দেখেছি তা ভাষায় লিপিবদ্ধ করে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মার্চের ২৬ তারিখ গণহত্যা চালানোর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানিসেনারা ঢাকার কর্তৃত্ব গ্রহণের পর সারাদেশে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কাজে রত হয়ে পড়ে।

স্বাধীনতার অপর নাম বঙ্গবন্ধু

২৬ মার্চের কায়দায় বড় বড় জেলায় ও মহকুমায় প্রবেশ করতে থাকে। এছাড়া কিছু কিছু শহর ও থানাগুলোও তাদের দখলে নিয়ে যায়। ফলে প্রতিরোধ গড়ে তোলে মুক্তিযোদ্ধারা। মে মাসের শেষ দিকে আমার বন্ধু আমিন, খুখুসহ কয়েকজন ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে প্রথমে পঞ্চবটি তারপর বাতাকান্দি বাজারে মুসলিম লীগ নেতা বারেক ডাক্তারের চেম্বারে গ্রেনেড হামলা চালায়। এতে বারেক ডাক্তার মারাত্মক আহত হয়। আর দু’জন লোক চেম্বারের ভেতরেই মৃত্যুবরণ করে। এ হামলার ফলে হোমনাতে মুক্তিযোদ্ধারা আছে জেনে পাকিস্তানিবাহিনীর সেনারা আসতে পারে- এ ধারণা থেকে মুক্তিযোদ্ধারা হোমনা লঞ্চঘাটের রাস্তায় গ্রেনেড পুঁতে রাখে। পাকিস্তানিসেনারা অগ্রগামী হিসেবে সাধারণ জনগণকে আগে হাঁটায়, সেজন্য গ্রেনেড বিস্ফোরণে সাধারণ জনগণ আহত হয়। তারপর হোমনা থানার সিও অফিসের বাংকার করে পাকিস্তানিসেনারা শান্তি কমিটির সহায়তায় আশপাশের গ্রামে মেয়েদের ওপর অত্যাচার, বাড়িঘর পোড়ানো, গরুছাগলসহ মূল্যবান দ্রবাদি লুটপাট শুরু করে।

জুলাইয়ের শেষদিকে পাকিস্তানিবাহিনী আামদের এলাকার জয়পুর গ্রামে তিতাস নদী দিয়ে লঞ্চযোগে প্রবেশের চেষ্টা করলে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা সশস্ত্র আক্রমণ চালায়। আক্রমণে টিকতে না পেরে পাকিস্তানিবাহিনী দ্রুত মাছিমপুরের দিকে চলে যায়। পরে পাকিস্তানিবাহিনী জগন্নাথকান্দি মাথাভাঙ্গার হিন্দু জেলেপাড়ায় প্রবেশ করে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ দেড় শতাধিক লোককে হত্যা করে। লাশগুলো নদীতে ভাসতে থাকে। মুসলিমপাড়ার দেলোয়ার মাস্টার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে তার বাবা হোরা মিয়াকে (ডাক নাম) পাকিস্তানিবাহিনী গুলি করে মেরে ফেলে। একের পর এক হামলার ফলে স্থানীয় লোকজন জীবনরক্ষার ট্রলারে করে বিক্রমপুর হতে ভারতের যাওয়া পথে হোমনার পাকিস্তানিবাহিনী দুইশ’ নারীপুরুষকে আটক করে, তাদেরও হত্যা করে।

১ অক্টোবর সকাল ১০টায় পাকিস্তানিসেনারা মিরশ্বিকারী ও ভবানীপুর গ্রামে বাড়িঘরে আগুন দিয়ে লুটপাট শুরু করলে ওপারচর গ্রাম থেকে মুক্তিযোদ্ধারা মর্টারশেল নিক্ষেপ করে। হামলায় পাকিস্তানিসেনারা টিকতে না পেরে হোমনা থানার ফিরে আসে। এর পরদিন রাতে ইব্রাহিম কমান্ডারের নেতৃত্বে হোমনা থানার আক্রমণ করলে বাহের খোলার খোরশেদ এবং হারুন নিহত হয়। আমার ২ ব্যাচ সিনিয়র আলী আহম্মদ (যুগ্ম-সচিব) গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের আঘাতের ফলে অর্ধেকটা আঙ্গুল কেটে ফেলা হয়। এতে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা আহত এবং ৩০ জন রাজাকার ধরা পরে।

alt

২ নভেম্বর পাকিস্তানিবাহিনী জয়পুর গ্রামে প্রবেশ করে ব্যাপক লুটপাট ও বাড়িঘর পোড়ায়। তারা গরুছাগল, হাঁসমুরগি জবাই করে খেয়ে বিকালের দিকে আবাইত্তা (তিতাস নদীর শাখা) নদী দিয়ে গান বোটের ছাদে উল্লাস করে যাওয়ার পথে ইব্রাহিম কমান্ডারের নেতৃত্বে মনির, কাদের, মোশারফ, তাজুল ইসলামসহ আরো অনেকে মিরাশ, শ্যামনগর ও পঞ্চবটির বট গাছের নিচে থেকে আক্রমণ করে।

এতে পাকিস্তানিবাহিনীর অনেক সেনা মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু একটানা যুদ্ধ করায় অনেকের গুলি শেষ হয়ে যায়। ফলে তাদের প্রতিরক্ষার অবস্থান নাজুক হয়ে পড়ে। অসীম সাহসী মনিরের গুলি ছিল। একাই সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তানিবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। এক পর্যায় মনির মাথার উঁচু করলে তাদের একটা গুলি তার মুখের ভেতর দিয়ে মাথায় লাগে। সঙ্গে সঙ্গে সে শহীদ। ২ দিন যুদ্ধ চলে। দ্বিতীয় দিনে ঢাকা থেকে পাকিস্তানির গানবোট এসে জীবিত ও মৃত্যু সেনাদের নিয়ে যায়।

১৫ ডিসেম্বর ফজরের নামাজের পর বাঞ্ছারামপুরের অবস্থানরত চার শতাদিক পাকিস্তানিবাহিনী হোমনা থানায় ঘাগুটিয়া গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন মসজিদের মধ্যে প্রবেশ করে বাংকার করে শক্ত অবস্থান নেয়। এ খবর মুক্তিবাহিনী অবগত হলে দুই শতাদিক মুক্তিযোদ্ধা দুলালপুর চন্দ্রমনি উচ্চ বিদ্যালয়ে একত্রিত হয়ে পাকিস্তানিবাহিনীকে দুই দিক থেকে একদিকে রামপুর, নুরালাপুর, উত্তরে শেখ আলমের বাগ দিয়ে অন্যদিকে সাপলেজী অতিক্রম করে ছোট ঘাগুটিয়ার উত্তর দিক থেকে অতর্কিত সাড়াশি আক্রমণ করে। সরাসরি যুদ্ধে পাথালিয়াকান্দির অলেক মিয়া শহীদ হন এবং ১৭ জন আহত হন। এর মধ্যে কমান্ডার ইব্রাহিমের ঊরুতে গুলি লাগে। হানাদার বাহিনীর অনেকে নিহত ও আহত হয়। যার সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। কৌশলগত কারণে মুক্তিবাহিনী পিছিয়ে তিন দিক থেকে বাংকার করে পজিশন নিয়ে পাকিস্তানিবাহিনীকে অবরুদ্ধ করে রাখে। সময় সময় পাকিস্তানিবাহিনী গুলি ছুড়লে মুক্তিবাহিনীও পাল্টাগুলি ছুড়ে অবস্থানের কথা জানান দেয়। এতে অনেক সৈন্য নিহত ও আহত হয় যা পাকিস্তানিবাহিনীর আত্মসমর্পণকালে জানা যায়। ১৮ ডিসেম্বর ময়নামতি ক্যান্টমেন্ট থেকে মিত্র বাহিনীর তিনজন সৈন্য মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে এসে হানাদার বাহিনীকে ওয়ারলেসের মাধ্যমে আহ্বান জানান আত্মসমর্পণ করার জন্য। হানাদার বাহিনী মিত্রবাহিনী হিসেবে তাদের বিশ্বাস করেনি। যার জন্য পাকিস্তানিবাহিনী আত্মসমর্পণে রাজি হয়নি।

পাকিস্তানিবাহিনী মনে করেছিল মুক্তিবাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করলে তাদের মেরে ফেলা হবে। ২৩ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর সদস্যরা পুনরায় তিনটি ট্যাংক নিয়ে আসে। হানাদারবাহিনীতে পুনরায় ওয়ারলেসের মাধ্যমে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। পাকিস্তানিবাহিনী এতেও রাজি না হওয়ার মিত্রবাহিনী ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণসহ সরাসরি আক্রমণ করে। এ আক্রমণের কারণে হানাদার বাহিনীর বিশ্বাস জন্মে যে তারা মিত্রবাহিনীর লোক। মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের সম্মত হয়ে তারা ঘাগুটিয়া গ্রাম থেকে বাহির হয়ে আসে। ১৮১ জন জীবিত ও আহত হানাদার সদস্য আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণের পরে অবশিষ্ট হানাদার বাহিনীর সদস্যরা ঘাগুটিয়াতেই মৃত্যুবরণ করে।

আত্মসমর্পণের পর মিত্রবাহিনী পাকিস্তানি সৈন্যদের ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। এরপর হতে ২৩ ডিসেম্বরকে হোমনা মুক্তদিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়। উপজেলার চম্পক নগর, ঘাগুটিয়া, নিলখী বাজার, দুলাল বাজার-হোমনা সদর ও পঞ্চবটি প্রভৃতি জায়গায় সংঘটিত পাকিস্তানিবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের একাধিক লড়াইয়ে ২৩জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং ২৪জন আহত হন। তাছাড়া পাকিস্তানিবাহিনী বর্তমান হোমনা ডিগ্রি কলেজের পাশে বহুসংখ্যক নারী, পুরুষ ও শিশুকে জীবন্ত কবর দেয়। গনেশ নাথের পুকুর পাড়ে কারো হাত, কারো খুলি মাটির নিচ থেকে বের হয়েছিল। এ স্থানটি বধ্যভূমি হিসেবে বিবেচনা করে স্মৃতিস্তম্ভ করা দরকার। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার মা ভাত, মাংস, ডাল প্রভৃতি রান্না করে দিলে আমরা এ খাবার মাথায় করে ৪ মাইল দূরে ঘারমোড়া মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে পৌঁছে দিতাম। ক্যাম্পে আমার বন্ধু করিম, নাজিমউদ্দিনসহ অনেকের সঙ্গে গ্রেনেড ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ে নানা অভিজ্ঞতার কথা আলোচনা করতাম। আমাদের গ্রামের মিজান, বেলাল, আউয়াল, তমিজ উদ্দিন, মতিন, হায়েত আলী ও হক মিয়া (সামসুল হক), রূপসদি-বেলানগর থেকে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছে। শুনলাম তাদের নাম নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, বিশ্বেও ছিল সাড়া জাগানো একটি ঘটনা। শুধু মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। এ জন্য দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ এ পথপরিক্রমায় বঙ্গবন্ধু দুঃসাহসিক ভূমিকা পালন করেন। মৃত্যুকে তুচ্ছ ভেবে তিনি এগিয়ে গেছেন অবিচল চিত্তে। এ জন্যই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রাণপুরুষ। ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’, ‘বাঙালির স্বাধিকার’, ‘জয় বাংলা’, ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’- যাই বলি না কেন এগুলোর অপর নাম ‘বঙ্গবন্ধু’। লাল-সবুজের পতাকায় তিনি হয়ে আছেন চিরস্মরণীয়। আজ বিশ্বব্যাপী যেখানেই মুক্তির সংগ্রাম, সেখানেই অনুপ্রেরণা বঙ্গবন্ধু। তার নির্ভেজাল স্বদেশী চিন্তা-চেতনা থেকে তারা শিক্ষা নেন।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা লাভ ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মৌলিক ধারণা ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা, শোষণহীন সমাজ গঠন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা। যে নীতি অনুসরণ করে তার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এগিয়ে চলছেন। নতুন প্রজন্মকে বলছি- ইসলামের ধারণা সম্পূর্ণই নিহিত রয়েছে গঠনতন্ত্রে এবং শোষণহীন সমাজ গঠনের সব উপাদান রয়েছে সেখানে। শুধুমাত্র সঠিকভাবে অনুধাবনের মাধ্যমে আমাদের একটি বৈষম্যহীন শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন করতে হবে।

দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে ঐক্যবদ্ধভাবে আরো শক্তিশালী এবং সব ষড়যন্ত্রকারীকে প্রতিহত করব- এটাই হোক স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার।

লেখক: ভাইস-চ্যান্সেলর, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়


মহাকাব্যের মহাকবি ’বঙ্গবন্ধু অবদানে’ স্বাধীনতা প্রসঙ্গ : সোনা কান্তি বড়ুয়া

রবিবার, ০২ এপ্রিল ২০১৭

বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ঠ্রের জন্মদাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ আমাদের বাঙালি জাতির মহাকাব্যের নাম ”বঙ্গবন্ধু অবদান।” সেই মহা গৌরবময় ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অমর স্বাধীনতা মহাকাব্যের মহাকবি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ঢাকার রেসকোর্সের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মহাজনসমুদ্রে জনগণমনের মুক্তির মঞ্চে দাঁড়িয়ে জলদ গম্ভীর স্বরে ঘোষণা করেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এমন অকুতোভয় বঙ্গবন্ধুর মতো মহাবীর কে কবে দেখেছেন? পাল রাজত্বের পর আগামি দিনের ইতিহাসে “বঙ্গবন্ধু অবদান” কাহিনী হয়ে বিজয় সিংহ এর ‘সিংহল অবদান’ এর পাশে সগৌরবে দেদীপ্যমান হয়ে থাকবে।
বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মহাবীর ’বিহঙ্গ ’ হয়ে আবির্ভাব হয়েছিলেন এবং আজ হাজার হাজার বাঙালি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে বিরাজমান। স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অবদান ”বাংলাদেশ স্বাধীনতার মহাকাব্য” শীর্ষক মহাকাব্যের মহাকবি শেখ মুজিব। স্বাধীনতার মহাকবি শেখ মুজিবের কন্ঠ ভরা থাকতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা. ” নমো নমো সুন্দরী মম / জননী জন্মভ’মি / গঙ্গার তীর ¯িœগ্ধ সমীর/ জীবন জুড়ালে তুমি। ” ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্ত হয়ে আসেন এবং ঢাকার জন সভায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা বলেছিলেন, ” সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী / রেখেছ বাঙালি বাঙালি করে মানুষ কর নি।” তারপর বঙ্গবন্ধু তাঁর পরমপ্রিয় রবি ঠাকুরকে উদ্দেশ্যে করে বঙ্গবন্ধুর মনের কথা মুখে আনলেন, ”বাঙালি আজ মানুষ হইয়াছে। কবির কথা মিথ্যা প্রমান হইয়াছে।” হায় রে ইতিহাস! তুমি কথা কও! হারে হারে বজ্জাত ধর্মান্ধ অমানুষ বাঙালিকে বঙ্গবন্ধু চিনে ও ভাল করে বুঝতে পারলেন না। কারন অমানুষ গুলো দেখতে অবিকল মানুষজাতির মতো, কিন্তু আসলে তা’রা ভয়্কংর বিশ্বাসঘাতক এবং পশুর চেয়ে ও অধম। সময় এসেছে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার।
বাঙালিত্বের খোঁজে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস বাঙালি জাতির পরশমনি। জগতে মনুষ্যত্বের আসনে আজ বাঙালি জাতি স্বাধীনতার পরশমনির জোরে বিরাজমান। তাই আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা মহাকাব্যের মহাকবি এবং মানবতার পরশমনি। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে পাকিস্তানের সামরিক সরকার বেঈমানী করে বাংলাদেশের বাঙালি জাতিকে সর্বনাশ করার গভীর ষড়যন্ত্র করেছিল। আজ ও সেই ষড়যন্ত্র শেষ হয় নি। ধর্মের নামে ও মিথ্যা বন্ধুত্বের মুখোষ পরে পাকিস্তান সর্বদা বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে প্রস্তুত। ১৯৪৭ সালে ধর্মকে পূঁজি করে ভারত বর্ষ দ্বিখন্ডিত হয়ে হিন্দুস্থান ও পাকিস্তান হল। ১৯৭১ সালে ৭ই মার্চ ধর্মকে বাদ দিয়ে মানবতার মনুষ্যত্ব রক্ষার জন্যে পুর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হবার স্বপ্ন দেখলেন।
পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই জনসমুদ্রে বিনা অস্ত্রে অভিনব অহিংসার বাণী দিয়ে “বাংলাদেশের স্বাধীনতা” ঘোষণা করেছিলেন ; এবং পালিয়ে না গিয়ে নব রসে (১. আদি ২. রৌদ্র ৩. বীভৎস ৪. ভয়ানক ৫. বীর ৬. হাস্য ৭. কারুণ্য. ৮. অদ্ভূত ও ৯. শান্ত) স্বাধীনতার মহা কাব্য রচনা করতে শত্রুর কারাগারে বসে দেশের স্বাধীনতার জন্যে নিজের প্রাণদান করতে প্রস্তুত ছিলেন।া বঙ্গবন্ধুর আশা ছিল বাঙালি জাতি সুখী হোক।

মহাকাব্যের মহাকবি ’বঙ্গবন্ধু অবদানে’ স্বাধীনতা প্রসঙ্গ : সোনা কান্তি বড়ুয়া

বাংলা আমার, মাতা আমার চির বিজয়ী বাংলাদেশ,
জগৎ জুড়িয়া বাঙালি জাতি জয় বাংলা গাইছে বেশ!
হাজার বছর আগের বাঙালির ইতিহাস কি কথা কয়?
অতীশ দীপঙ্করের বাংলাদেশ বাংলাভাষা অমর অক্ষয়।
আমার স্বপ্ন বাংলাদেশ মহাজাতক বুদ্ধের বাংলাদেশ
বাংলার অমোঘ বাণী মহাশান্তি মহাপ্রেম অশেষ।
জন্ম লগনে বাংলাদেশ, কান্নায় আমার বাংলাদেশ
মন্ত্র আমার বাংলাদেশ হাঁসিতে আমার বাংলাদেশ।
কথায় কথায় বাংলাদেশ, রক্তে আমার বাংলাদেশ।
তীর্থ আমার বাংলাদেশ, বিত্ত আমার বাংলাদেশ,
আমার আমি বাংলাদেশ, পরিচয় আমার বাংলাদেশ।
প্রেমিকা আমার বাংলাদেশ, সেবিকা আমার বাংলাদেশ,
পিতা আমার বাংলাদেশ, ভাই বোন আমার বাংলাদেশ।
অস্তিত্ব আমার বাংলাদেশ, রাজত্ব আমার বাংলাদেশ ।
জীবন আমার বাংলাদেশ, মরন আমার বাংলাদেশ,
সুখ আমার বাংলাদেশ, দুঃখ আমার বাংলাদেশ।
অনুভূতি আমার বাংলাদেশ, দর্শন আমার বাংলাদেশ,
কবিতা আমার বাংলাদেশ, রক্ষক আমার বাংলাদেশ ।
প্রসঙ্গত: হিন্দু ধর্মের নাম অপব্যবহার করে আজ ও ভারতে মানুষ জাতিকে চন্ডাল, দলিত, চামার ও ছোট লোক বানিয়ে ধনী ও শাসকগণ মানব জাতির মাববতা বা আশরাফুল মাকলুকাত কেড়ে নিয়েছে। ধনীরা মানুষ হলে, সর্বহারা গরীবগণ চন্ডাল হবে কেন? ইতিহাসের কালো অধ্যায় একাত্তর থেকে আজ ও অবধি বাঙালির বুকে পাথর হয়ে বসে আছে। ভাই বলে যেই পাকিস্তানকে জড়িয়ে ধরে ছিলুম, কিন্তু সে শত্রু হয়ে বাঙালির সর্বনাশ করেছে। সাইকোলিজিক্যাল ধর্মান্ধ রোগ থেকে বাঙালি বের হতে পারবে কি?
স্বরচিত কবিতায় আমার বাংলাদেশ :
একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর ভাষনের ৭ই মার্চের বজ্রকন্ঠস্বর
বাঙালি জাতির নব জন্ম হ’ল, পাল রাজত্বের পর।
ইতিহাস কথা কয়, ভুলতে দেয়না সেই দিন,
সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর কাছে আমাদের অনন্ত ঋণ ।
বাংলাদেশ মহাকাব্যের মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি
বাংলাদেশের জাতির পিতাকে মোদের সাষ্ঠাঙ্গ প্রনতি।
বঙ্গবন্ধুকে কা’ারা মেরেছে, কেন মেরেছে, জনতা জানতে চায়,
জাতির পিতৃ হত্যা মহাপাপ, বিশ্বাসঘাতকদল তিলে তিলে ক্ষয়।
স্বাধীনতার দীপ ছিল, শিখা ছিল সব ছিল হায়
জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান আজ তুমি কোথায়?
যখন জাতির মাথায় ভেঙ্গে পড়লো বাংলার আকাশ
নিশুতি রাত গুমরে কাঁদে দেশে বিশ্বাসঘাতকতার বাতাস!
৭৫সালের ১৫ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর মুকুট তো পড়ে আছে,
জাতির পিতা সহ তাঁর পরিবার স্বজন শুধু নেই।
দেশের রক্তাক্ত আকাশের উপর সূর্য ওঠেছে ওই
জন্মভূমি বাংলা মা গো তোমার শহীদ ছেলেরা কই?
প্রাচীন মহাকাব্য যুগের পরে জয় বাংলাদেশে। কালজয়ী মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ’ জীবন বাংলাদেশের জন্যে, পরার্থে কামনা।’ অধিকার কি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ছিল না? “রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি।” আজ ও বাঙালি বিবেক প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে। বিশ্বাসঘাতক আমাদের বিশ্বাসের ছায়ায় ছায়ায় ঘুরে। সামরিক শাসকগণের দুর্নীতির মাফিয়াচক্র থেকে বাঁচতে বঞ্চিত সর্বহারা মানুষ তাই আশ্রয় খুঁজেছে শেখ মুজিবের ভাষণে এবং বুদ্ধিজীবিদের লেখার মাধ্যমে। আমার লেখা কবিতায়:
সমতট থেকে আমি হাঁটিতেছি বাংলার পথে,
পাল রাজত্বের ইতিহাস বলেছি পদ্মা ব্রহ্মপুত্রের সাথে।
অনেক ঘুরেছি আমি ধর্মপাল ভুসুকুপাদ চর্যাপদের জগতে
সেখানে ছিলেম আমি, দূরে বগুড়ার পুন্ড্রবর্দ্ধন নগরে।
ঐতিহাসিক পাহাড়পুর জুড়ে কত কী যে হল
টুপি ঠিকির বাহারে বাহারে ইতিহাসের রং বদলালো।
অতীশ দীপঙ্কর বাঙালি সভ্যতা ও ধর্মের প্রচারক,
তিব্বতের ইতিহাসে তিনি বিশ্ব শান্তির শিক্ষক।
ঘরে বাইরে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত শ্রান্ত আমি
কয়েকদন্ড শান্তি দিয়েছিল মোরে মহাস্থানের সুমি।
মা বোন সেই বাঙালি নারী একাত্তরে বীরাংগনা গণ
হল বলিদান লভিতে স্বাধীনতা কত লক্ষ ভাই বোন ।

মানব জাতির মুক্তির মন্দির সোপাানতলে এমনতরো মানবতাবাদী কবিতার প্রথম আলোতে বাংলাদেশ প্রতিবিম্বিত আলোয় আলোয়। স্থিতপ্রজ্ঞ শেখমুজিবুর রহমানের সুখ্যাতি ছিল – দেশ জুড়ে, বাংলার দূরতম প্রান্ত থেকে জনতা এসেছিলেন “বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষনা”ঐতিহাসিক প্রথম শুভক্ষণ অনুভব ও অবলোকন করতে। আমার কবিতার ভাষায়:
জয় বাংলায় জয় বঙ্গবন্ধুর জয় !
যিনি মহাকাল করেছেন জয়।
বাংলার জন গণ মন অধিনায়ক বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা মহা ভাগ্যবান,
জয় হে বাংলার মর্মভেদী দেবদূত শেখ মুজিবুর রহমান।
বঙ্গবন্ধুর সাধনা ছিল বাংলাদেশে স্বাধীনতার আলো জ্বালাতে
দুষ্টের দল আঁধারের যাত্রী মার্কা রাজাকার মিশে গেছে জামায়তে।
“এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম” বজ্রযোগীনির বজ্রকন্ঠে আহ্বান।
“এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অমর অবদান।
বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ বীর পুরুষ সর্বকালের ইতিহাস প্রধান
জয় হে, জয় স্বাধীনতার বীর পুরুষ করে গেলে শতাব্দীর অগ্নিø¯œান।
আমাদের স্বাধীনতার জাতীয় ইতিহাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়, একটি জাতির পরিচয় ও অস্তিত্বের অভিনব স্বাক্ষর। আমার দেশ, আমার জন্মভূমি আমার কাছে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থভূমি। “অশোক যাহার কীর্তি গাইল. / হিমালয় থেকে জলধি শেষ।” ইতিহাস সত্যের জয় ও মিথ্যার পরাজয় ঘোষণা করে। বাঙালী মহাপ্রাণ নেতাগণ সহ বঙ্গবন্ধু বহু চড়াই-উৎরাইর মধ্যে দিয়ে এবং ষড়যন্ত্রের দুর্ভেদ্য প্রাচীর বিদীর্ণ করে সমাজে সত্য এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত প্রাণ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ‘এই সব মূঢ়¤¬ান মুখে দিতে হবে ভাষা, / এই সব শ্রান্ত শুস্ক-ভগ্ন বুকে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা’ নিয়ে দেশ ও দশের মঙ্গল সাধন করার ।
কবির ভাষায়: “পথ ভাবে আমি দেব, / রথ ভাবে আমি। / মূর্তি ভাবে আমি দেব/ হাঁসে অন্তর্যামী।” বাঙালি একতাবদ্ধ হবে কি? বিবেদ ও হিংসায় বাঙালি সমাজ ক্ষত বিক্ষত। অতীশ দিপংকরের সময়ে (৯৮২ খৃষ্ঠাব্দ থেকে ১০৫৪ খৃঃ) বাংলাদেশে ইসলাম ধর্ম ছিল না। বিগত ১১০০ খৃষ্ঠাব্দ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত ভারতীয় কোন গ্রন্থে বুদ্ধ ও অশোকের নাম লেখা ছিল না। বাংলা ভাষার সাথে বৌদ্ধধর্মের অবস্থান ঐতিহাসিক মিলন এবং তিব্বতি ভাষায় চর্যাপদের অনুবাদ আজ ও বিরাজমান। বাংলা বর্ণমালায় প্রতিবিম্বিত হয় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার সহ নাম না জানা অনেক শহীদ ভাই বোনদের স্মৃতি রাশি।
সপ্তম শতাব্দীতে মহাচীনের পরিব্রাজক হিউয়েন সাং বাংলাদেশের পাহারপুর ও বগুড়ায় এসে আমার দেশের মাটিতে অবনত মস্তকে আমাদের আলোকিত প্রাচীন ঐতিহ্য ও ধর্মকে পূজা করেছেন। বলে গেলেন যে বাংলাদেশে সাধনার ধন অহিংসা পরম কমের্, বাংলাদেশ বিশ্বমানবতার তীর্থভূমি। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায়, “বাঙালি অতীশ লভিল গিরি তুষারে ভয়ঙ্কর,/ তিব্বতে জ্বালিল জ্ঞানের প্রদীপ বাঙালি দীপংকর।” বাঙালি জাতি জ্ঞানের প্রদীপের আলোকে পৃথিবীর বুকে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” প্রতিষ্ঠা করে প্রমান করে দিয়েছেন, বিশ্বমানবতার সভায় মোরা বাংলা ভাষার জন্যে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের শহীদ মিনার হৃদয় বাংলায় সর্বদা বিরাজমান। জয় বাংলা।

“আমার বাপের ঘরে আগুন দিল কে রে, আমি খুঁজিয়ে বেড়াই তারে।” গত ২৪শে অক্টোবর ২০০৯ (ইং) দৃষ্ঠিপাত (সমিতি), আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসি চ্যাপ্টারের উদ্যোগে ডিরি র “বাস বয়েস এন্ড পোয়েটস” রেস্তেরায় বাংলাদেশের বিশিষ্ঠ সাংবাদিক ও মানবাধিকার নেতা শাহরিয়া কবিরের “পোট্রেইট অব জিহাদ” শীর্ষক ডকুমেন্টরিতে দেখানো হয় ‘হারকাতুল এবং বাংলাভাইয়ের’ মতো উগ্রপন্থীদের উৎস জামাত যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার ও আলবদর ছিল। ছবিটির বিষয় বস্তু ও প্রেক্ষাপট : ‘জামাত-যুদ্ধাপরাধীরা পাকি ফৌজিবাবাদের সুতনয় বটে। বাংলাদেশের তারা কেউ নয়, মগজে বিকার, চিন্তায় পাপী, পা-চাটা জাদু অতিশয়।’ কথায় বলে, জামাত তুমি ঘুঘু পাখীর মতো বার বার খেয়ে যাও ধান, এই বার ঘুঘু তোমার বধিব পরান।
আজ দেশ ও জগৎ জুড়ে যে গভীরতম অসুখ তার জন্যে মানুষের সর্বগ্রাসী লোভ এবং অমানবিক সাম্রাজ্যবাদই তৈরী করেছে “আহা রে মানুষ একটি বিপন্ন প্রজাতি।” সমাজের মুষ্টিমেয় রাজনীতিবিদগণ ও ধনিরা উচ্চশিখরে বসে সমস্ত ভোগবিলাস ভোগ করেছে। আর দুঃখীদের শ্রেণীতে চলছে নিদারুণ অভাব, দারিদ্র, ক্ষুধা, পীড়ন, শোষণ, বর্জন, যন্ত্রণা ও মৃত্যুভয় এখনও সর্বত্র নৈরাশ্য-নৈরাজ্য। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির পিতা। আমাদের মনে পড়ে বাংলার বিখ্যাত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬ -১৯৪৭) লিখেছিলেন, ”হে মহামানব একবার এসো ফিরে, / শুধু একবার চোখ মেলো এই গ্রাম নগরের ভিড়ে,/ এখানে মৃত্যু হানা দেয় বার বার;/ লোক চক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অকাল। / এই যে আকাশ , দিগন্ত মাঠ স্বপ্নে সবুজ মাটি,/ নীরবে মৃত্যু গেড়েছে এখানে ঘাঁটি।/ কোথাও নেই কো পার, / মারী ও মড়ক, মন্বন্তর, মহামানব, এখানে শুকনো পাতায় আগুন জ্বালো। (বোধন)” বার বার অনেক বারের পর বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের আলোকে প্রমান করে দিলেন যে বাঙালি বীরের জাতি এবং বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা “আমরা যখন মরতে শিখেছি, কেউ আমাদের মারতে পারবে না।” জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর এমন শিক্ষা জগতে বড়ই দুর্লভ।
যে কোন ধর্মের নামে মানব সন্তান হত্যা ও রক্তপাত ধর্ম নয়। আমাদের দেশ আমাদের জন্মান্তরের জীবনের অস্তিত্ব। সম্প্রতি ২৩শে অক্টোবর টরন্টোর এক পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় সংবাদের রক্তিম হেড লাইন ছিল, “সারাদেশে রেড এলার্ট।” দেশের সাথে আমাদের নাড়ীর সম্পর্ক। দেশের স্বাধীনতার ৪৫ টা বছর চলে গেল। আমরা প্রবাস থেকে দেশে শান্তির কথা শুনবার অপেক্ষায় থাকি। আমার দেশ আমার পরম তীর্থভূমি শান্তির ধর্ম ইসলামকে রক্তাক্ত রাজনীতির জন্য অপব্যবহার করে রাজাকার ও আলবদর বাহিনী আজ সার্বজনীন ইসলামকে অপমানিত করেছে। বিশ্বমানবতার আলোতে ইসলাম মহাকরুনায় জেগে ওঠে “আশরাফুল মাকলুকাত” মঙ্গললোকে। হিংসায় ধর্মের দারিদ্র দূর করবে কে? ধর্মের নামে হিজবুত তাহরির দিন শেষ।
সুদীর্ঘ রক্তাক্ত ভাষা আন্দোলনের পর মাযের ভাষাকে হালাল করতে সর্ব প্রথম বাংলাদেশের বুকে গড়ে তোলা হলো “শহীদ মিনার।” পাকিস্তানের আক্রমন থেকে বাঁচতে ৩০ লক্ষ দেশবাসী শহীদ হয়ে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হলো “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।” ঢাকা থেকে মামুন অর রশিদ লিখেছেন, “তারা জনপ্রশাসনে ধর্মান্ধ রাজনীতির অনুসারীদের প্রবেশের ব্যবস্থা করেন (জনকণ্ঠ, অক্টোবর ২৬, ২০০৯ ইংরেজী)।” জামাত ও যুদ্ধাপরাধীরা রাষ্ঠ্রদ্রোহী হয়ে ইসলামকে কলঙ্কিত করেছে। আজকের বুড়িগঙ্গার পানির মতো জামাত, মুজাহিদীন সন্ত্রাসী ও যুদ্ধাপরাধীদের ধর্ম পুরোপুরি বিষ এবং জামাতকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করতে হবে। ঘর পোষে চোর আর ও কহে জোর এ বড় কুটিনী ঘাগী।
এই প্রসঙ্গে ইহা ও বিশেষভাবে উলে¬খযোগ্য যে, ১৯৭১ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানের পাঞ্জাবি কবি আহমদ সেলিমের লেখা “সদা জিও বাংলাদেশ” শীর্ষক কবিতা করাচীর উর্দূ পত্রিকা ‘আওয়ামি আওয়াজে’ প্রকাশিত হলে; তদানিন্তন ইয়াহিয়া সরকার উক্ত কবির রাষ্ঠ্রদ্রোহীতার অপরাধে ছয়মাস জেল ও ডজন খানেক বেত্রাঘাতের শাস্তি দিয়েছিল।
মানুষ নিজের ভুবনে নিজেই সম্রাট। সেই ভুবনে বিচরণকারী অন্যান্য বাসিন্দারা পার্শ্ব চরিত্রমাত্র।। ধর্মের নামে যে পশু আমাদের অন্তরে প্রবেশ করেছে সেই পশুকে মানবতার অস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করে মানবতার দেশ গড়ে তুলতে হবে। অহিংসার মহব্বতই মানবিক কর্মযজ্ঞ। অপেক্ষার সময় ফুরিয়ে গেছে। বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া সহ জামাত মার্কা চার জোটে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী পাশবিক শক্তি বিরাজমান।
জামাত দ্বারা বাঙালী সমাজ শোষিত, নিপীড়িত, লাঞ্ছিত ও পাকি দালারদের দ্বারা অপমানিতের সমাজ। দেশবাসীরা নৈরাশ্য, নৈরাজ্য, অভাব ও দারিদ্র সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকার জন্য দায়ী আমাদের শাসক ও রাষ্ঠ্রক্ষমতার দুর্নীতির মাফিয়াচক্র। দুর্নীতি বধে রাষ্ঠ্রক্ষমতার পরাজয় হল কেন? বাংলাদেশে প্রতারক রাজনীতিবীদ ও আমলাগণের চরিত্র কয়লার মত শত ধু’লে ও ময়লা যায় না। প্রতারণার রাজনীতিতে দেশ ও জাতি স্বাধীনতায় অমৃতের সাধ ভোগ করতে করতে ও ভোগ করতে পারেন নি।

তুমি রাজাকার মুসলিম মৌলবাদী, আমার বাংলা ছাড়ো।
হাতেই আছে আমার দেশের যত আলো।
তুমি মৌলবাদী জঙ্গী, সরাও তোমার ছায়া,
তুমি আমাদের বৌদ্ধ বসতি ছাড়ো।
রামুর বড়–য়া পাড়ায় আগুন লাগায় ইসলামি জঙ্গী
পুলিশ প্রশাসন হল না আজ বৌদ্ধদের সঙ্গী ।
আমার দেশে তুমি কে জঙ্গী ইসলামি ?
জঙ্গীদের ভয়ে দেশ থেকে পালাবো না আমি।
দেশে মাটির নীচে বুদ্ধ থাকেন,
উপরে ধ্যানে জ্ঞানে বুদ্ধ আছেন।
পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহারে এসেছে জনতার ঢল
গৌতমবুদ্ধের অহিংসা পরম ধর্ম স্বদেশের বল।
জয় বাঙালি জয়
বাংলাদেশের জয়।
হাজার বছর ধরে চলেছেন বাঙালি বগুড়ার পুন্ড্রবর্ধনের পথে,
বঙ্গোপসাগর থেকে সিংহল সমুদ্রে মহাকালের রথে।
পালরাজ্যে ঘুরেছি আমি, ধর্মপালের অতীত জগত,
দেখেছি শালবন বিহার ও চট্টগ্রামের পন্ডিত বিহার যত।
ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত আমি, মনে পড়ে কত ঝর্ণা
আমারে কিছুক্ষণ শান্তি দিয়েছিল উৎপলা বর্ণা।
প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার জাতিধর্ম নির্বিশেষে ঐতিহ্যের ধন,
নববর্ষে বাঙালি ভাই বোনের পাহাড়পুরে মিলন।
আমরা কি মানুষ না আমাদেরকে ধর্মের নামে অধর্মের ভূতে পেয়েছে। বাংলাদেশে অর্পিত সম্পত্তি বা শত্র“ সম্পত্তির অর্থ কি? মানুষ জাতি বা আশরাফুল মাকলুকাত শয়তানের গোলাম হয়ে পাকিস্তানের লাল মসজিদ রক্ত গঙ্গায় ভাসানোর দরকার ছিল না। ধর্মের নামে নর নারী হত্যা কোন ধর্মেরই পবিত্র বাণী নয়। ্বৈজ্ঞানিকগণ গভীর গবেষনা করার পর বুঝতে পারলেন যে, মানুষ প্রকৃতির সৃষ্ঠি। নদী ও প্রকৃতি ধ্বংস হলে মানুষ ও ধ্বংস হবে। অমানবিক ধর্মের এতো উলঙ্গ দর্প কেন? বিশ্বপ্রেম ও অহিংসা ব্রতে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে মানুষকে বাঁচতে হবে। অহিংসা মানব জাতির পরম আশ্রয়। বিগত জোট সরকারের ধর্ম ও রাজনীতির অপপ্রয়োগের কারনে আজ বাংলাদেশে জনতা একটি বিপন্ন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
জয় বাংলা ! জয় বঙ্গবন্ধু!

সোনাকান্তি বড়ুয়া, বিবিধ গ্রন্থ প্রণেতা, কলামিষ্ট এবং মানবাধিকার কর্মী।

সোনাকান্তি বড়ুয়া, বিবিধ গ্রন্থ প্রণেতা, কলামিষ্ট এবং মানবাধিকার কর্মী।


প্রবাসের ভাবনা- পারভীন বানু

শনিবার, ০১ এপ্রিল ২০১৭

প্রবাসের ভাবনা- পারভীন বানু

প্রবাসে এই রঙের খেলা,

গ্রীস্মে বসে কত মেলা।

শত শত সংগঠন,

কি করে হয় দেশ গঠন।

স্বেচ্ছাচারের নিয়মনীতি

নেই পরোয়া নেইকো ভীতি।

মুখোশ পড়ে হয়ে বাহির,

করছে কেহ নেতা জাহির।

পদটি নিয়েই কাড়াকাড়ি,

সভার মাঝেই মারামারি।

ধর্ম বলো রাজনীতি,

কোথায় আছে সুনীতি।

হাজার হাজার বিভক্তি,

নেই সুজনের আসক্তি।

হিংসা কিংবা বিদ্বেষে,

সময় কাটে পরদেশে।


মায়ের কাছ থেকে শোনা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা ---- আম্বিয়া অন্তরা

শনিবার, ২৫ মার্চ ২০১৭

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিগুলো অনেক খানি কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছে । এসব স্মৃতিগুলো গল্পের মত মনে হয় । আজ আমি আমার মায়ের কাছ থেকে শোনা স্মৃতিকথা তুলে ধরছি পাঠকের জন্য।
মায়ের মুখে শোনা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি  পড়ে অনেকেই আমার কাছে জানতে চেয়েছেন বিশেষ করে স্বাধীনতার ১০/২০ বছর  পরের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা । তারা জানতে চেয়েছে কেন এবং কি কারণে এই মর্মান্তিক যুদ্ধ হয় ? তাই আমি আবার বই পড়ে এবং ভাইয়ের কাছে জানা কিছু  তথ্য লিখছি । আমাদের বাংলাদেশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ হয়েছিল । যুদ্ধের কারণ, পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈষম্যসহ নানা ধরণের বঞ্চনা ছিল । মোট জাতীয় বাজেটের সিংহ ভাগ বরাদ্দ থাকতো পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য । পাকিস্তানের মূল শাসক গোষ্ঠী ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের । পশ্চিমা শাসকেরা পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি সৎ মায়ের মত আচরণ করত । পূর্ব পাকিস্তান( বাংলাদেশ) চরম অর্থনৈতিক বঞ্চনার শিকার হয় । এ কারণে পূর্ব পাকিস্তানের(বাংলাদেশ) মানুষ পাকিস্তান সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ে এবং মানুষের মনে ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে । আর একটু অতীতে ফিরে যাচ্ছি শুধুই এই প্রজন্মের সন্তানদের জানানোর  জন্য । পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণমূলক আচরণ । কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়, বাঙ্গালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উপরও নিপীড়ন শুরু হয় । মাতৃভাষা বাংলা চাই দাবি নিয়ে আন্দোলন হয় । ১৯৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার জন্য রফিক, সালাম, বরকত ও জব্বারসহ অনেকে শহীদ হয় । এমন ঘটনা সারা বিশ্বে কোথাও কোনদিন ঘটেনি । ভাষা আন্দেলনের পর শুরু হয় আমাদের জাতির মুক্তির সংগ্রাম । মূলত ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনেই বপিত হয়েছিল স্বাধীনতার বীজ।১৯৭০ এর ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম ‘এক লোক এক ভোট’  এই সাধারণ নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের সমস্ত হিসাব নিকাশ ওলট পালট করে দেয়।  কারণ পূর্বপাকিস্তানে দুটি আসন বাদে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলীতে সবগুলো আসন পেয়ে সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ।  ১৯৭১ সালে ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল পাকিস্তানের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলীর প্রথম বৈঠক। এ অ্যাসেম্বলিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ছিল বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ।  ব্যাপারটা প্রথম থেকেই পাকিস্তানীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। সেই অ্যাসেম্বলি ১ মার্চ এক রেডিও ভাষণের মধ্য দিয়ে অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত করে দেয়  ইয়াহিয়া খান।বাঙালীদের ষড়যন্ত্রটি ধরতে কিন্তু কোন দেরী হয়নি। ইয়াহিয়া খানের রেডিও ভাষণ শেষ হতে না হতেই ঢাকার রাজপথে সেদিন নেমে এসেছিল মানুষের ঢল। মুখে ছিল স্লোগান “ভুট্টোর মুখে লাথি মার, বাংলাদেশ স্বাধীন কর” ‘বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। ইয়াহিয়া তার ভাষণে বলেছিল ভুট্টো ঢাকায় আসতে সম্মত হয়নি বলেই প্রধানত অধিবেশন স্থগিত করা হলো।
সেই শুরু স্বাধীনতার লক্ষ্যে বাঙালী জাতির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ‘তোমাদের যার যা আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করো’। বাঙালি জাতি মানসিকভাবে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল।   বাঙ্গালীরা  একত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশ স্বাধীন করার জন্য । নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হয়েছে । কিন্তু আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এখনো পুরোপুরি আসেনি । এটা আমাদের জন্য বড় ধরণের ব্যর্থতা ।  


এবার মায়ের কাছ থেকে শোনা আমাদের পারিবারিক জীবনের একটি স্মৃতিকথা তুলে ধরছি -
 ১৯৭১ সালের ২৩ নভেম্বর এইদিনে আমরা ঢাকা থেকে মেহেরপুর যাত্রা শুরু করেছিলাম। তখন আমি মায়ের কোলে যে ইতিহাস বড় হয়ে মায়ের কাছে  জেনেছি। বইতে পড়েছি, পাত্রিকাতে পড়েছি। আমি বলছি আমাদের ঘটনা। ঢাকা থেকে মেহেরপুর যেতে আমাদের ১১ দিন সময় লেগেছিল । পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী কিভাবে আমার ভাইকে নির্যাতন করেছিল তাই লিখব । গুছিয়ে লেখার চেষ্টা করবো, ভুল হলে ক্ষমা চাই ।

যুদ্ধ শুরুর আগেই ভাই ঢাকাতে থাকতেন । আমরা ৬ বোন ১ ভাই। ভাই সবার বড় ছিলেন।  ৭ ভাই বোনের মধ্যে আমি সবার ছোট । বাবা কলকাতাতে ব্যবসা করতেন , সে সময় শুধুই হরতাল হতো । বাবার ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেল । একদিন ঢাকায় একমাত্র ছেলেকে দেখতে গেলেন । হরতাল চলছে ভাইয়ের সাথে আর যোগাযোগ করতে পারছেন না। একসময় দেখতে পেলেন সবুর খানের বিল্ডিং-এ আগুন জ্বলছে। সবুর খানকে আমি আজো চিনিনা। বাবা ধরে নিয়েছিলেন ওই বিল্ডিং এ তাঁর ছেলে আছে । একমাত্র ছেলের শোক সইতে না পেরে হার্টফেল করেছিলেন । ঢাকা থেকে মেহেরপুর পৌঁছে আমাদের সবাইকে ছেড়ে বিদায় নিলেন । তার কিছুদিন পর ভাই বাড়িতে গেলেন । ২ বোন শ্বশুরবাড়িতে আর আমরা ৪ বোন মা আছি । ভাই ৩ আর ৪ নম্বর বোনকে বাড়িতে রেখে আমাকে আর মধু বোনকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসলো। আমি তখন ১ বছরের । ঢাকায় প্রথমে গুলিস্তান এলাকায় একটা হোটেলে উঠেছিলাম। আমরা মার্চ মাসের ১৫ তারিখে পৌঁছেছিলাম । শুধুই হরতাল আর কারফিউ, আমরা বের হতে পারতাম না । পরে রহিমা খালার (চলচিত্র অভিনেত্রী) সহযোগিতায় খিলগাঁতে ১৫০ টাকা ভাড়ায় বিশাল বড় বাসা পেয়েছিলাম । ভাই আমাদের রেখে কাজে যেতেন আর রহিমা খালা খোঁজ খবর নিতেন । ২৬ মার্চ রাতে গুলাগুলির শব্দ।  ভাই আমাদের সবাইকে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখেন, কাঁচের জানালা ভেঙ্গে গুলি আসছিল  ঘরের মধ্যে । সকাল হলে ভাই আমাদের নিয়ে আর কিছু হাঁড়ি পাতিল নিয়ে শরণার্থীদের সাথে নিরাপদ স্থান খুঁজতে লাগলো । টঙ্গীতে এক জঙ্গলের মধ্যে একজনের বাড়িতে আমাদের রেখে ভাই যুদ্ধে ট্রেনিং নিতে গেলেন । জঙ্গল বলতে মা বলেছিলেন অনেক গাছ গাছালি ঘেরা নির্জন বাড়ি । ভাই ট্রেনিং করে মাকে বললেন আমাদের কুমিল্লা যেতে হবে । আমাদের সাথে নিয়ে যাবে । ওদিকে ভাবী ৩ ছেলে নিয়ে মেহেরপুরের গাংণীতে তার বাবার বাড়িতে । কারো কোন খোঁজ নেই ----। যে ২ বোনকে বাড়িতে রেখে এসেছে মা তাদের জন্য প্রতি রাতে কান্নাকাটি করতেন । ভাই খবর নিয়ে আসতো মিলিটারিরা মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে । একদিকে বাবা হারানো শোক আর অপরদিকে ২ বোনের জন্য মায়ের আকুল আহাজারি ! কিছুদিনের মধ্যে খবর আসলো আমার ফুফাতো ভাই ২ বোনের বিয়ে দিয়েছেন । তারা ভাল আছে । কিন্তু ৪ নম্বর বোনের স্বামী কলেজ ছাত্র । তিনি বিয়ে করেই যুদ্ধে চলে গেছেন । মায়ের চিন্তা আরও বেড়ে গেল । ঘরে কোন খাবার নেই । ভাই একেকদিন একেক এলাকাই যুদ্ধে যেতেন । আমি নাকি ক্ষুধার জ্বালায় চিৎকার করে কান্না করতাম । মধু বোন ছিল চুপচাপ  (এখনো মধু তেমনি আছে ) । কুমিল্লা থেকে আবার আমাদের ঢাকায় খিলগাঁ বাসায় নিয়ে আসলো । রহিমা খালা মাঝে মধ্যে খাবার দিয়ে যেতো । একদিন ভাই আর বাসায় ফিরেনি। খবর আসলো মিলিটারিরা ভাইকে ধরে নিয়ে গেছে । মা এই খবর পেয়ে নাকি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন । এইসব গল্প যখন মা বলতেন আমি ভয়ে শিহরি উঠতাম । আমার লেখার প্রতিটি কথায় মায়ের মুখে শোনা । আপনাদের যদি ভাললাগে আমি লিখতেই থাকব । অনেক ভয়ংকর ঘটনা আছে পরে লিখব ।
পাক মিলিটারিরা ভাইকে মেহেদীর ডাল (বেত) দিয়ে মেরে সারা শরীর খত বিক্ষত করেছিল।  মা আমাদের নিয়ে সারারাত জেগে থেকেছে । ভাইয়ের কোন খবর নেই , একজন লোক এসে খবর দিল আপনার ছেলেকে গুলি করে মেরে ফেলবে  তাই শেষ ইচ্ছা মা আর ছোট ২টা নাবালিকা বোনকে  দেখবে । লোকটাকে মা চিনে ফেলেছে । ভাইকে লোকটাই ধরিয়ে দিয়েছে । শান্তি কমিটির লোক । মা বললেন যাব , ছেলের সাথে যেন আমাদেরকেও গুলি করে মেরে ফেলে । এমনিতে না  খাওয়া রহিমা খালারা অন্যত্র চলে গেছে । মিলিটারিরা একের পর এক বাড়ি ঘর বোমা মেরে জালিয়ে দিচ্ছে , মা পাথরের মত বসে আছে । এমন সময় শান্তি কমিটির লোক আর ২/৩ জন মিলিটারি ঠেলাগাড়িতে করে সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে ভাইকে নিয়ে আসলো । মা বুঝতে পারল বাবার মত ছেলের লাশ আসলো । কোন কথায়  বললেন না , শুধুই তাকিয়ে দেখলেন । ওনারা কাপড় সরিয়ে মুখটা বের করল ভাই মায়ের মুখের পানে চেয়ে আছে । একটু একটু পলক নড়ছে , মা চিৎকার করে কেঁদে উঠলো । আমরা ২ বোন ভাইয়ের কাছে , এই হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখে মিলিটারিদের মায়া হল , তাদের হয়তো আমাদের মত মা বোন ছিল তাই  ভাইকে আমাদের কাছে রেখে চলে গেল । কিন্তু ভাই নড়াচড়া করতে পারছেনা, কথা বলতে পারছেনা মনে হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যাবে । আমার মায়ের  চেহারা হয়েছিল পাগলিনীর মত । কি করবে কোথায় যাবে কিছুই বুঝতে পারছিলনা । এর মধ্যে শান্তি কমিটির একজন লোক এসে বলল আপনারা বের হবেন না বের হলে মিলিটারিরা গুলি করবে । আপনার ছেলেকে ছেড়ে দিয়েছি জানতে পারলে আমাকেও গুলি করে মারবে ।
কত যে ভয়ংকর জীবন পেরিয়ে আমার মা আমাদের মানুষ করেছিল ! লঞ্চে নদীর মাঝখানে আমরা ৪ রাত ৪ দিন ছিলাম । ক্ষুধার যন্ত্রণায় মায়ের চুল ধরে টানা ছেঁড়া করতাম , পরে ভাই সবাইকে নিয়ে লঞ্চের মধ্যে খাবার হোটেলে নিয়ে গেলেন । মা বললেন টাকা নেই হোটেলে কেন? তখন ভাই বললেন আগে  ভালমতো  খেয়ে নাও টাকার চিন্তা পরে হবে । খাওয়া শেষ হলে বিল দেবার জন্য দাঁড়িয়েছে, কয়েকজন লোকের দেয়ার পর ভাই গেছে  বললেন আমার বাকি টাকা ফেরত দেন , হোটেল মালিক বললেন টাকা দিলেন কখন ? ভাই বললেন কালির দাগ দেয়া ২০ টাকার নোট , খুঁজে দেখেন (একটু আগে একজন দিয়েছিল ভাই তা খেয়াল করে এই বুদ্ধি বের করেছিলেন )। পরে বাকি টাকা ফেরত পায় । ক্ষুধা পেলে মানুষের রুপ কি হয় তা যার ক্ষুধা পায় সেই বুঝে । লঞ্চের ছাদ বেয়ে ইলিশ মাছের পানি পড়ে আমাদের পরনের জামাকাপড় ভিজে যাচ্ছে ।  একেই বলে যুদ্ধ ! যুদ্ধ করিনি, কিন্তু যুদ্ধের স্বাদ কি তা ভাইয়ের মুখে শুনেছি ।  অবশেষে লঞ্চ তীরে ভিড়ল । একটি বাড়িতে আশ্রয় চাইল মা , কারণ পথে পথে মিলিটারি । দেখামাত্র গুলি করছে । উপর দিয়ে বিমানে বোমা ফেলছে । কি যে ভয়ংকর সময় গেছে! যে বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিলাম মাটির নিচে গর্ত করে গুহা বানিয়েছিল বোমা পড়ার ভয়ে । বিমান উড়লেই সবাই গুহার মধ্যে থাকতাম । গ্রামে কখন যাবো - সেই চিন্তায় অস্থির থাকতেন মা আর ভাই কিন্তু  যেতে পারতেন না । ভাই সুস্থ হলে মিলিটারি ক্যাম্পে আঁচল পেতে মা ভাইয়ের  প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছেন ! এইবারও ভাই ছাড়া পেলেন! কিন্তু তার শরীরের অবনতি হতে থাকে , বাসে করে আমরা চুয়াডাঙ্গা এসে পড়েছি , দোতালা একতলা বিল্ডিং গুলো আগুনে পুড়ে  ইট বের হয়ে আছে । কোন মিলিটারি চোখে পড়ছে না , কয়েকজন পথচারি বলল, মুক্তিযোদ্ধারা পাকসেনাদের হটাও করেছে । মা এবং  ভাইয়ের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো ।  ভাই  ঢাকাতে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে ৫ মাস  যুদ্ধ করেছেন , যুদ্ধকালীন অবস্থায় বাসায় ফেরার পথে শান্তি কমিটিরা ভাইকে চিহ্নিত করে মিলিটারিদের হাতে ধরিয়ে দেয় । মিলিটারিদের অমানুষিক নির্যাতনে ভাই তিলে তিলে ক্ষয় হচ্ছে । ভাবী ৩ ছেলে সহ বাপের বাড়ী গাংনিতে (মেহেরপুর)  আছে । এত কিছু ঘটনা তারা কিছুই জানেনা ।মা  বাড়িতে যাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে । মায়ের ধারনা ভাইকে আর বাঁচানো যাবেনা । তারপরও হাল ছাড়েনি  । আমরা বাড়ি এসে পড়লাম , কেউ নেই বাড়িতে । যে দুলাভাই যুদ্ধে গিয়েছেন, সে বোন দুলাভাইকে দেখতে গিয়েছেন । দুলাভাই শেষ বেলায় মিলিটারিদের হাতে ধরা পড়েছেন! ব্লেড দিয়ে কেটে কেটে লেবুর রস আর লবন মিশিয়ে  দুলাভাইকে নির্যাতন করে হত্যা করেছে । বোন খবর পেয়েছে চুয়াডাঙ্গা ব্রিজের নিচে লাশ পড়ে আছে । দুলাভাইয়ের নাম খাইরুল ইসলাম , চুয়াডাঙ্গা জেলার মজলিসপুর গ্রামে বাড়ি । এদের নাম ভাইয়ের নাম কখনো পত্রিকাতে ছাপানো হয়নি । নতুন বিয়ে করে যুদ্ধে গিয়েছিলেন ! বোন শোকে পাথর হয়ে গেছে । ভেবেছিল আমরাও বেঁচে নেই , বাড়িতে এসে আমাদের দেখে কেঁদে ফেললো । এইসব কষ্ট যুদ্ধের চাইতেও কঠিণ । মেহেরপুর তখন শত্রু মুক্ত হয়নি । যুদ্ধকালীন সময়ে ২ বোনের বিয়ে হয়েছিল এক বোন মেহেরপুর আর এক বোন চুয়াডাঙ্গা মজলিসপুরে । মেহেরপুরের বোনের শ্বশুর বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে সব পুড়িয়ে ফেলেছিল । তাই  বোনরা সবাই ভারতে পালিয়ে গেছে ।
আমার মায়ের কাছ থেকে শোনা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা তুলে ধরলাম । এমন হাজারো স্মৃতিকথা ছড়িয়ে আছে গ্রাম বাংলায় । সকল স্মৃতিকথাগুলো তুলে ধরা উচিত ।


জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক নন, ঘোষণাপত্রের পাঠক মাত্র = রাজু আলাউদ্দিন

শনিবার, ২৫ মার্চ ২০১৭

কে স্বাধীনতার ঘোষক: বঙ্গবন্ধু না, মেজর জিয়া? এই বিতর্ক দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে যারা বেড়ে উঠেছেন তাদের কাছে অবশ্য এই বিতর্ক হাস্যকর ও অবান্তর। ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল যে কারো কাছেই এটি কোনো বিতর্কের বিষয়ই হতে পারে না। কারণ ইতিহাসে এর সাক্ষ্যপ্রমাণ এতই স্পষ্ট, অতীর্যক ও উচ্চকিত যে, এ নিয়ে বাহাস করা মূর্খতা মাত্র।

তাহলে ইতিহাসের বাসরঘরে কোন ছিদ্রপথে বিতর্কের এই বিষাক্ত কুটিল ভুজঙ্গ প্রবেশ করেছে? মূলত রাজনীতি, যার রক্তে রয়েছে প্রতারণার বিষ। যে রাজনীতি মহান কোনো আদর্শ থেকে উৎসারিত হয় না, তা আমাদের ইতিহাস ও ঘটনার বিকৃতির মাধ্যমে বিপথগামী করে তোলার জন্য সব আয়োজন নিয়ে হাজির হয়।

বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় এরকম কোনো দুরন্ত আয়োজনের কোনো দুঃসাহস দেখায়নি কেউই, এমনকি মেজর জিয়াও কখনও ঘোষণার বিষয়টিকে বিতর্কিত বলে মন্তব্যও করেননি, দাবী তো দূরের কথা। কিন্তু জিয়াউর রহমান জীবদ্দশায় একে বিতর্কিত মনে না করলেও তাঁরই ঔরসে জন্ম বিএনপি একে বিতর্কিত করেছে। এবং এই বিতর্কের পেছনেও রয়েছে ইতিহাসের পদাঘাতে বিক্ষিপ্ত ও ছিটকে পড়া সেই সব রাজনৈতিক দলের লোকদের ষড়যন্ত্র যারা আওয়ামীবিরোধী রাজনীতিতে নিঃস্ব ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিল, বিশেষ করে ন্যাপ, মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলাম।

আরও পরে চীনাপন্থীদের যারা একসময় বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন– যেমন মান্নান ভূইয়া, তরীকুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল নোমান– তারা শুধু রাজনৈতিক ঈর্ষা থেকেই নয়, বরং রাজনৈতিক পরাজয়ের প্রতিশোধ চরিত্রার্থ করার উপায় হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি নিঃস্ব করার ষড়যন্ত্রের সুযোগটির সদ্ব্যবহার করতে চেয়েছেন। তারা বঙ্গবন্ধুর ‘আইকনিক ইমেজ’ ভেঙে স্বাধীনতার ‘ঘোষক’ হিসেবে জিয়াউর রহমানকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান নিজে এরকম কোনো আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ না করলেও তার অনুসারী চাটুকাররা তা-ই চেয়েছিল। চাওয়ার কারণ ১৯৭৯ সালে বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধী পরাজিত দল ও ব্যক্তিদের প্রতিশোধস্পৃহাকে এই নতুন দলের ছত্রছায়ায় উজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

নতুন দল মানেই নতুন হিরো, নতুন কাল্ট তৈরি করা, নতুন মিথ তৈরি করা। মেজর জিয়ার মধ্যে এর সম্ভাবনা অল্প হলেও ছিল। তিনি মহান মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। উপরন্তু, তিনিই ছিলেন সামরিক বাহিনীর সেই লোক যিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার পক্ষে ঘোষণা ‘পাঠ’ করেছিলেন। ‘বাঙালি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনিই সবার আগে বিদ্রোহ করেন।’ (মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর, গোলাম মুরশিদ, প্রথমা প্রকাশন, জানুয়ারি ২০১০, পৃঃ ৯২)

এই কৃতিত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না, উচিতও নয়। কিন্তু স্বাধীনতার পক্ষে ‘ঘোষণা পাঠ’ করা আর ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ দেওয়া দুটো ভিন্ন বিষয়। দুধ অল্প পরিমানে থাকলে তাতে জল মিশিয়ে বাড়ানো সম্ভব। সুবিধাবাদী পরাজিত রাজনীতিবিদরা সেই পদ্ধতিই অবলম্বন করেছিল নির্লজ্জভাবে, তা না হলে কেন তারা স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্কটি বঙ্গবন্ধু, এমনকি জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায়ও তোলেননি? আজ তারা যে আস্থা ও উগ্রতার সঙ্গে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তারা এই দাবির কথা তখন কেন জানাননি?

বিএনপির এই দাবি প্রবল হয়ে দেখা দেয় ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর। ক্ষমতা এমন এক জিনিস যার বদৌলতে মিথ্যাকে সত্য ও সত্যকে মিথ্যায় পরিণত করা সম্ভব। আর যদি হয় অর্ধসত্য, তবে তাকে পূর্ণসত্যে পরিণত করা আরও সহজ হয়ে পড়ে।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে বহু রাজনৈতিক কীটপতঙ্গকে পুনর্বাসিত করার সুযোগ দেওয়ায় সেই কৃতজ্ঞতাবোধের প্রকাশ হিসেবে যেমন, তেমনি আওয়ামী লীগ ও তার প্রতিষ্ঠাতার ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন না করলে বিএনপিকে প্রসারিত ও প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না– এই ভাবনা থেকেও জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে দেখানোটা জরুরি হয়ে পড়ে আওয়ামীবিরোধীদের পক্ষে। প্রতিটি দলেরই দরকার হয় একজন আইকনিক ব্যক্তিত্ব, বা কাল্টফিগার। জিয়াউর রহমানের তিলোপম ব্যক্তিত্বকে তাই তাল বানানোর চেষ্টা করেছে তারা। কিন্তু তারা আন্দোলন ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতার অনিবার্য ফলাফল অস্বীকার করে স্বেচ্ছাচার দিয়ে ইতিহাস গড়তে চেয়েছে।

Ziaur Rahman - 888

ইতিহাসে স্বেচ্ছাচারের জায়গা অল্পকালের জন্য হলেও নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনায় এর কোন স্থায়ী জায়গা হয় না। ঘটনার যৌক্তিক পারম্পর্য ও শৃঙ্খলা ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে অনিবার্য এক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে কাজ করে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইতিহাসের দিকে পেছন ফিরলে দেখতে পাব ১৯৬৩ সাল থেকে শেখ মুজিব ধাপে ধাপে পূর্ব বাংলার স্বাধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে যদি এই কালক্রমিক আন্দোলন না থাকত তাহলে ২৬ মার্চে যে কেউ এসে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেই দেশ যে স্বাধীন হত না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি আন্দোলনের এই দীর্ঘ ইতিহাস না থাকলে স্বয়ং শেখ মুজিবও হঠাৎ করে ২৬ মার্চে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেও দেশ স্বাধীন হত কি না, সন্দেহ।

স্বাধীনতার পক্ষে দেশবাসীকে তিনি ধাপে ধাপে উদ্বুদ্ধ ও প্রস্তুত করে তুলেছিলেন বলেই সেটা সম্ভব হয়েছে। সুতরাং কেউ একজন এসে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন বলেই দেশ স্বাধীন হয়নি। ইতিহাসের ঘটনাস্রোত ও বঙ্গবন্ধু পরস্পর এমন অবিচ্ছিন্নভাবে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে গিয়েছেন যে সেখানে শেখ মুজিব ছাড়া আর কারও পক্ষে সেই স্বাধীনতা ঘোষণা করা সম্ভবই ছিল না। যদি তা-ই হত, তা হলে শেখ মুজিব ছাড়াও তো তখন অনেক নেতাই ছিলেন, তারা কি সেটা করতে পেরেছিলেন?

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই যে, রাজনৈতিক চর্চা ও আন্দোলন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তির পক্ষে তা ছিল আরও অসম্ভব। সুতরাং জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে দাবি করাটা স্রেফ গায়ের জোরে চাপিয়ে দেওয়া একটা ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়।

গবেষক গোলাম মুরশিদ জানাচ্ছেন যে, “বস্তুত, ফেব্রুয়ারি মাঝামাঝি তিনি (বঙ্গবন্ধু) তাজউদ্দীন ও কামাল হোসেনকে দিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার একটি খসড়া লিখিয়ে নেন।” (গোলাম মুরশিদ, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর’, প্রথমা, জানুয়ারি ২০১০, পৃ-৬৭)

সেই সময়ের আন্দোলনের ইতিহাসটি যারা জানেন তারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে, ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার পর “পূর্ব পাকিস্তান চলতে শুরু করে মুজিবের আদেশে। কেবল আওয়ামী লীগের নয়, তিনি সবার নেতায় পরিণত হন ততদিনে। তাঁর নেতৃত্বে দেশের জনগণ আন্দোলনে ফেটে পড়লেন।” (গোলাম মুরশিদ, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর’, প্রথমা, জানুয়ারি ২০১০, পৃ-৬৭)

বঙ্গবন্ধু তখন রাজনৈতকি ব্যক্তিত্ব হিসেবে এতই প্রবল ও পরাক্রমশালী হয়ে উঠেছিলেন যে, একটি রাষ্ট্র তখন চালিত হচ্ছে সশস্ত্র শাসকদের দ্বারা নয়, বরং নিরস্ত্র বিরোধী দলের একজন নেতার নির্দেশে। এমন ঘটনা ইতিহাসে খুবই বিরল। তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে তো তিনি স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, যাকে স্বাধীনতার ঘোষণা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না:

“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

“এর পর থেকে সরকারী অফিস-আদালত, ব্যাংক, সমুদ্রবন্দরের কাজ– সবই চলতে থাকে তাঁর হুকুম মতো।” (গোলাম মুরশিদ, মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর, প্রথমা, জানুয়ারি ২০১০, পৃ-৭২)

বঙ্গবন্ধুর সমকালে আরও অনেক নেতাই ছিলেন, ন্যাপ ও বাম দলগুলোর নেতারা ছিলেন, তাদেরও বঙ্গবন্ধুর হুকুমের বাইরে কিছুই করার ছিল না। এরকম অবস্থায়, যিনি জনপ্রতিনিধি নন, নিতান্তই একজন সামরিক কর্মকর্তা, তিনি এসে হুট করে স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন– এটা উদ্ভট কল্পনাশক্তি ছাড়া সম্ভব নয়।

রাজনীতির প্রবল ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধুর পরিবর্তে সেকালে জিয়াউর রহমানের মতো অজ্ঞাত ও অপরিচিত এক লোককে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগটা বিএনপি গ্রহণ করেছে মূলত চট্টগ্রামের ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে প্রচারিত ঘোষণাটিকে পুঁজি করে। কিভাবে সম্ভব হয়েছিল সেই ঘোষণাটি? কোনো সামরিক লোক নয়, বরং স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করার কথা বেতার কেন্দ্রের কর্মীরাই প্রথম ভেবেছিলেন জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে। ঘোষণা তো বঙ্গবন্ধু ২৭ মার্চের আগেই দিয়ে রেখেছেন তাঁর বক্তৃতায়, মুক্তিযোদ্ধা মঈদুল হাসান সে কথা স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন তার ‘মূলধারা ’৭১’ বইয়ে: “ঢাকার বাইরে এ কথা রাষ্ট্র হয়ে পড়ে যে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন এবং পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিরোধ সংগ্রামের নেতৃত্ব দান করে চলেছেন।” (মঈদুল হাসান, ‘মূলধারা ‘৭১’, ইউপিএল, জানুয়ারি ২০১৬ পৃ: ৪)।

কিন্তু বেতারের কর্মীরা বঙ্গন্ধুর ‘স্বাধীনতার ডাক’ জনসাধারণে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য জিয়াউর রহমানকে বেছে নিয়েছিলেন। শুধু এই কারণে বিএনপির উৎসাহী নেতা ও কর্মীরা জিয়াকেই স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে দেখাতে চান। জিয়াউর রহমান কি শেখ মুজিবের আগে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন? ২৭ মার্চের যে ঘোষণাটির কথা বলা হয় সেটাও তো নিজে স্বেচ্ছায় গিয়ে ঘোষণা করেননি জিয়াউর রহমান, যদিও জানি যে, “বাঙালি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনিই সবার আগে বিদ্রোহ করেন।” (মঈদুল হাসান, ‘মূলধারা ‘৭১’, ইউপিএল, জানুয়ারি ২০১৬, পৃ-৯২)

এবং এও সত্য যে, “মেজর জিয়ার ঘোষণা এবং বিদ্রোহী ইউনিউগুলোর মধ্যে বেতার যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হবার ফলে এই সব স্থানীয় ও খণ্ড বিদ্রোহ দ্রুত সংহত হতে শুরু করে।” (মঈদুল হাসান, ‘মূলধারা ‘৭১’, ইউপিএল, জানুয়ারি ২০১৬, পৃ-৭)

চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের তখনকার কর্মকর্তা বেলাল মোহাম্মদ জানিয়েছেন, জিয়াউর রহমানকে ডেকে নিয়ে এসে তাঁরা স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করান। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী কারোর লেখা স্মৃতিচারণেই এ কথা বলা হয়নি যে, তিনি নিজে যেচে গিয়ে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে ঘোষণাটি দিয়েছেন।

যেহেতু ২৫ মার্চের আক্রমণটি ছিল আকস্মিক যা আওয়ামী লীগের নেতারা কেউ কল্পনাও করেননি, ফলে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে পরিকল্পনার কোনো নিপুণতা ছিল না, ছিল না যথাযথ সমন্বয়ও। বেতার কেন্দ্রের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল। এমনকি যেসব ভাষ্য তখন পাঠ করা হত সেগুলোও খুব গোছানো ও সুশৃঙ্খল ছিল না। যে কারণে মেজর জিয়া তাঁর প্রথম বক্তৃতায় নিজেকে ‘রাষ্ট্রপ্রধান’ বলে ঘোষণা করে ফেলেছিলেন। বোঝাই যায়, এটি স্বেচ্ছাকৃত নয়, অনিচ্ছাকৃত ভুল।

মঈদুল হাসান তাঁর বইয়ে জিয়ার ঘোষণাটি সম্পর্কে বলেছেন, “স্বল্পকালের জন্য চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র যখন বিদ্রোহীদের দখলে আসে, তখন ২৬শে মার্চ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান এবং ২৭শে মার্চ সন্ধ্যায় ৮ ইবির বিদ্রোহী নেতা মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। মেজর জিয়া তাঁর প্রথম বেতার বক্তৃতায় নিজেকে ‘রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবে ঘোষণা করলেও, পরদিন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা প্রকাশ করেন।” (পৃ: ৫-৬)

মঈদুল ইসলামের এই বক্তব্যের সঙ্গে আমরা মিল খুঁজে পাব জিয়াউর রহমানের সেই ঘোষণাটির:

“On behalf of our great national leader, the supreme commander of Bangladesh Sheikh Mujibur Rahman do hereby proclaim the independence of Bangladesh. It is further proclaimed that Sheikh Mujibur Rahman is the solo leader of the elected representatives of 75 million people of Bangladesh. I therefore appeal on behalf of our great leader Sheikh Mujibur Rahman to the government of all the democratic countries of the world specially the big world part and neighboring countries to take effective steps to stop immediately the awful genocide that has been carried on by the army of occupation from Pakistan. The legally elected representatives of the majority of the people as repressionist. It is cruel joke and contradiction in terms which should be fool none. The guiding principle of a new step will be first neutrality, second peace and third friendship to all and anomity to none. May Allah help us. Joy Bangla.”


বঙ্গবন্ধুর পক্ষে জিয়াউর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণার পাঠ শোনার জন্য উপরের লিংকে ক্লিক করুন।

জিয়া ও বিএনপির উগ্র, অন্ধ সমর্থকরা, এমনকি দলীয় ইতিহাস লেখকরাও নির্বোধের মতো জিয়াকে স্বাধীনতার ‘ঘোষক’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে’ কথাটি পুরোপুরি বর্জন করে। অথচ এই ঘোষণাতেই জিয়া স্পষ্ট করে বলেছেন:

“মহান জাতীয় নেতা, বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।”

এমনকি এই ঘোষণার তৃতীয় বাক্যটিতেও জিয়াউর রহমান আবারও ড়হ নবযধষভ ব্যবহার করে বলেন:

“অতএব আমাদের মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে…”

জিয়াউর রহমান কর্তৃক এই ঘোষণা পাঠে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের কৃতিত্বই একমেবাদ্বিতীয়তম। জিয়াউর রহমান এখানে শেখ মুজিব কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের পাঠক মাত্র। টেলিভিশনে সংবাদ পাঠক (News caster) যেমন পাঠের সূত্রে সংবাদের নায়ক হতে পারেন না, বরং নিছকই পাঠক, তেমনি জিয়াউর রহমান ঘটনাক্রমে এর পাঠক মাত্র। এমনকি তিনি এর প্রথম পাঠকও নন, কারণ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান তার আগেই স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন। ফলে পাঠক হিসেবেও তিনি প্রথম নন। আর ঘোষক হিসেবে তিনি প্রথম বা দ্বিতীয়– কোনোটাই নন।

কবিতার আবৃত্তিকার যেমন আবৃত্তির সূত্রে কবিতাটির রচয়িতা বলে নিজেকে দাবি করতে পারেন না, ঠিক একইভাবে জিয়াউর রহমানকে কোনোভাবেই স্বাধীনতার ঘোষক বলা যায় না।


‘সমুদ্রস্তন দ্বীপের মতো সে আছে ঘুমিয়ে’ : ডেরেক ওয়ালকটের প্রস্থান

শনিবার, ২৫ মার্চ ২০১৭

Walcott১.
শীতল কাচ ছায়াময় হয়ে ওঠে। এলিজাবেথ একবার লিখেছিল—
আমরা কাচকে আমাদের ব্যথার চিত্রকল্প বানিয়ে ফেলি।

২.
কাছে এসো ফিরে
আমার ভাষা।

ওয়ালকট, তাঁর নিজের ভাষায়, প্রথমত এক ক্যারিবীয় লেখক যিনি মানবগোষ্ঠীর একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে সবকিছু দেখেছেন আর বলেছেন, পরিপক্বতা হলো প্রত্যেক পূর্বসূরির বৈশিষ্ট্যের সাঙ্গীকরণ। তাঁর একীকরণের বিষয় ছিল ল্যাঙ্গুয়েজ কনটিনাম আর কালচারাল স্ট্রেটাম। ১৯৯২ সালে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত, সেন্ট লুসিয়ার ক্যাস্টিসে ১৯৩০-এর ২৩ জানুয়ারি জন্মগ্রহণকারী ডেরেক ওয়ালকট মনে করতেন যে, অধিকাংশ কৃষ্ণাঙ্গ লেখকই তাঁদের আত্মবিচ্ছিন্নতা দ্বারা নিজেদের পঙ্গু করে ফেলেন, কবি হিসেবে মানবতার বিভাজনে বিশ্বাস অনুচিত। তাঁর স্টার-আপেল কিংডম কাব্যের ‘দ্য স্কুনার ফ্লাইট’ কবিতায় এই চেতনার স্যাবাইন বলছে এমন কথা যা থেকে তাঁর প্রাতিস্বিকতার পরিচয় ধরা পড়ে:
আমি হলাম সোজাসাপটা একজন লাল নিগার যে সমুদ্রপ্রেমিক,
আমার রয়েছে ঠিকঠাক ঔপনিবেশিক শিক্ষা,
আমি একাধারে ডাচ, কৃষ্ণাঙ্গ এবং ইংরেজ
আর হয় আমি কেউ নই নতুবা
আমি এক জাতি।

তাঁর ভেতর ইউরোপীয় ইতিহাস, শিল্পসাহিত্য আর সেন্ট লুসিয়ার আফ্রিকানির্ভর সংস্কৃতির সার্থক মিলন ঘটেছে। তিনি ছিলেন না ইউরোপীয় গোছের, আবার সেন্ট লুসিয়ার কৃষ্ণাঙ্গদের মতো কালোও ছিলেন না, ছিলেন কিছুটা সাদাটে। ফলে বিভিন্ন ঐতিহ্য থেকে গ্রহণের ক্ষমতা তাঁকে দিয়েছে সময়ের এক অতলান্ত কৌলিনত্ব। তিনি বলেছিলেন: ‘আামি এক বিচ্ছিন্ন লেখক: আমার মধ্যে রয়েছে এমন-এক ঐতিহ্য যা একদিকে গ্রহণ করে যায়, আর আছে অন্য এক ঐতিহ্য যা অন্যদিকে বিস্তারিত হয়। একদিকে অনুকরণশীল, বর্ণনাত্মক ও নৃতাত্ত্বিক উপাদান অন্যদিকে তা আবার সাহিত্য ও ধ্রুপদি ঐতিহ্যে শক্তিশালী।’

কবি হিসেবে সততই তিনি নিজেকে পুনরাবিষ্কার করে গেছেন। ১৯ বছর বয়সে প্রকাশিত প্রথম কাব্য ২৫টি কবিতা এবং যুবকের জন্য এপিটাফ থেকে ওমেরস পর্যন্ত, এবং তিরিশটির মতো নাটকে, বিশাল বিস্তার ও গভীরতা তাঁকে করে তুলেছে মহান লেখক। প্রথম দিকের কবিতায় এলিঅট, পাউন্ড, ডিলান টমাস, অডেনদের তুমুল ছায়াসম্পাত সত্ত্বেও পরবর্তীসময়ে এই প্রভাবকে আত্মস্থ করে তিনি স্বকীয় হয়ে ওঠেন। ‘মিউজ অব হিস্টি’তে তিনি বলেছেন: ‘অনুকরণের ভয় গৌণ কবিদের অবশ করে রাখে। বড়ো কবিরা যা পাঠ করে তাকে আত্মস্থ করেই নিজ মৌলিকত্বকে প্রতিষ্ঠা করে যায়।’ এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেছেন: ‘কোনোদিন আমি স্পেন্ডারের মতো লিখি, কোনোদিন লিখি ডিলান টমাসের মতো, আর যখন বুঝি যে পছন্দের অনেক কবিতা লেখা হয়ে গেছে, কেবল তখনই তা ছাপতে দিই।’
১৯৯০ সালে প্রকাশিত ওমেরস এক মহাকাব্য, কবিতায় লিখিত এক আধুনিক উপন্যাসও বলা যায় তাকে। তিনশ পৃষ্ঠায় ব্যাপ্ত তিনচরণবিশিষ্ট স্তবকবিন্যস্ত তেরসারিমা ছন্দে এক আশ্চর্য বুনুনশৈলীর উদ্ভাাসন, যাকে সমালোচকেরা বলেছেন–প্লট, ইমেজ আর ভাষাতাত্ত্বিক নাটকীয়তার এক দীর্ঘ ও জটিল ইন্দ্রজাল। এতে রয়েছে ৬৪টি অধ্যায় যা আাবার ৭টি পুস্তকে বিন্যস্ত। প্রতিটি অধ্যায়ে ৩টি ভাগ। প্রথম পুস্তকে ১৩টি, দ্বিতীয়টিতে ১১টি, তৃতীয়টিতে ৮টি, চতুর্থ পুস্তকে ৪টি, পঞ্চমে ৭টি, ষষ্ঠে ১২টি আর সপ্তম পুস্তকে ৯টি অধ্যায় রয়েছে। ওমেরস-এ প্লটের তিনটি প্রধান গ্রন্থি রয়েছে: প্রথমটি, হেক্টর আর অ্যাকিলিস সেন্ট লুসিয়ার মাঝি হেলেনের অনুগ্রহের জন্য প্রতিযোগিতারত; দ্বিতীয়টি, মেজর ডেনিস প্লাংকেট আর তার স্ত্রী মড আয়ারল্যান্ড থেকে সেন্ট লুসিয়ায় এসে দ্বীপের ইতিহাসবিষয়ে অনুসন্ধান চালায়, হেলেন, যে তাদের জন্য কাজ করবে, সেও এই কাহিনিতে গুরুত্বপূর্ণ; তৃতীয়টি, লেখক গল্পের বাতাবরণে আশ্চর্যান্বিত হন, অন্ধ দ্রষ্টা সাতসমুদ্রের সহযোগী হন।
ওয়ালকটের অ্যানাদার লাইফ আত্মজীবনীমূলক দীর্ঘ কবিতা। ২৩টি অধ্যায়ের এই গ্রন্থ চারটি প্রধান অংশে বিভক্ত যার প্রতিটিই একটি এপিটাফ দিয়ে শুরু হয়। জীবন ও শিল্পের সহসম্পর্ক সার হয়ে দেখা দেয় এই গ্রন্থে:
না কোনো রূপক, না রূপান্তর,
যেন কয়লার চুলা তার ধোঁয়ার দরজায় পরিণত।
তিনটি জীবন কল্পনায় অপসৃত,
তিনটি ভালোবাসা: শিল্প, প্রেম আর মৃত্যু,
নিশ্বাসে মেঘাবৃত দর্শন থেকে মুছে যায়,
কোনোটাই বাস্তব নয়,তারা বাঁচতেও পারে না মরতেও পারে না,
তারা সব অস্তিত্বময়,

ওয়ালকটের লেখায় দেখা মেলে ভাষার দার্ঢ্য ব্যঞ্জনা, প্রসারিত আর জাগতিক রূপকের কানামাছি খেলা। ক্যারিবীয় সাহিত্যের তিনি এক বিনির্মাণকারী। একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন: ‘প্রতিটি সূর্যাস্ত তোমার জীবনের রক্ত থেকে তুলে নেয় আঠালো তরল।’ তাঁর মৃত্যু ক্যারিবীয় তথা বিশ্বসাহিত্যের অপূরণীয় এক স্তব্ধতা।

ওয়ারকটের তিনটি কবিতা

নতুন বিশ্বের মানচিত্র
১. দ্বীপপুঞ্জ

এই বাক্যের শেষে, নামবে বৃষ্টি,
বৃষ্টির প্রান্তে, একটি পাল।

ধীরে পাল হারিয়ে বসে দ্বীপের দৃশ্যাবলি;
পোতাশ্রয়ে কুয়াশামগ্ন হয়ে পড়ে সমগ্র জাতির বিশ্বাস।

দশ বছরের যুদ্ধ শেষ।
হেলেনের চুল, ধূসর মেঘমালা।
ট্রয়, সমুদ্রের ধারে
এক সাদা অগ্নিকুণ্ড।

বীণার তারের মতো ঋজু সব ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি।
মেঘময় চোখের একজন তুলে নেয় তা
আর রচনা করে ওদিসির প্রথম পঙ্ক্তিটি।

সমাপ্তি

জলের ওপর বাস,
একা। নেই স্ত্রী বা সন্তানাদি।
সব সম্ভাবনাকে নিয়েই
এখানে আসা:
ধূসর জলের ধারে নীচু ঘরখানা,
জীর্ণ সমুদ্রের দিকে জানালাটি খোলা।
এসব পছন্দের নয় আমাদের,

কিন্তু আমরা হলাম আমাদেরই নির্মাণ।
কষ্ট পাই, সময় যায় চলে, আমরা ছেড়েছি
পথ পারাপার, কিন্তু তা নয়
নির্ভারের প্রয়োজনে।
ভালোবাসা হলো পাথর
ধূসর জলের তলে সমুদ্রবিছানায় রয়েছে যে স্থিত।
এখন, কবিতা থেকে কিছুই নেই পাওয়ার শুধু
সত্যবোধ ছাড়া,
না করুণা, না খ্যাতি, না উপশম। নিশ্চুপ স্ত্রী,
ধূসর জল দেখতে এসো বসি,

ক্লিশে আর তুচ্ছতায় প্লাবিত জীবন
পাথরের মতোই করে বাস।
অনুভবকে ভুলে যাব আমি,
ভুলে যাব আর সব চাওয়াপাওয়ার চাল।
জীবনের অপসৃয়মাণতার চেয়ে এসব
কঠিন আর সত্যিই বিশাল।

সমুদ্রগুল্ম

অর্ধেক বন্ধুরাই চলে গেছে মৃতদের দেশে।
পৃথিবী দিতে চাইল নতুন বন্ধু আমাকে।
চিৎকার করে বললাম,তা-না করে তুমি ফিরিয়ে দাও তাদের, মৃত বন্ধুদের,
যেমনটি তারা ছিল ভালোমন্দ মিলিয়ে একদা।

আজ রাতে গুল্মবনের ভেতর
মিইয়ে যাওয়া সমুদ্রের একটানা গর্জনে
শোনা যাচ্ছে মৃত বন্ধুদের কথাবার্তা।
কিন্তু আমি হাঁটতে পারি না সমুদ্রে বিছানো জোছনায়

পরিষ্কার পথ ধরে নির্জনে একা
অথবা জগতের থেকে মুক্ত হয়ে
উড়তে পারি না লক্ষ্মী পেঁচার মতো।
হে আমার ব্রহ্মাণ্ড, প্রেমের জন্যে যারা গেছে
তার চেয়ে বেশি রয়েছে অনেকে জীবনে।

সবুজ ও রূপালি সমুদ্রের উজ্জ্বলতা,
গুল্মবন, বন্ধুর পথ,
আমার বিশ্বাসের ফেরেশতার বর্শা ছিল তারা
কিন্তু যারা গেছে হারিয়ে তাদের চেয়ে উত্তম কেউ জন্মাক তো।

যৌক্তিক উজ্জ্বল পাথর, সহনীয় জোছনা তার গায়
পেরিয়ে নিরাশা, বাতাসের তোড়
ফালা ফালা করা গুল্মবন
মৃত বন্ধুদের নিয়ে আসবে
তাদের ভালোমন্দসহ।

উৎস: ডেরেক ওয়ালকট: কালেক্টেড পোয়েমস, ১৯৪৮-১৯৮৪, ফেবার অ্যান্ড ফেবার।


"ইতিহাসের অমোঘ সত্যের লালন,বিকাশ,রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি:প্রয়োজনীয়তা: করনীয়।"---সিকদার গিয়াসউদ্দিন

রবিবার, ১৯ মার্চ ২০১৭

১৯৭১' সাল।১'লা মার্চ,২'রা মার্চ,৩'রা মার্চ।তারই ধারাবাহিকতায় ৭'ই মার্চ।বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষন।অত:পর ২৩'শে মার্চ পাকিস্তান দিবসের পরিবর্তে প্রতিরোধ দিবস।তথাকথিত পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে ২৫'শে মার্চ বঙ্গবন্ধুকে আটক ও গনহত্যা।তারপর বঙ্গবন্ধুর নামে ২৬'শে মার্চ জনযুদ্ধে রূপান্তর।অগ্নিঝরা মার্চের এসব দিনগুলো পূর্বানী হোটেল ভায়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,পল্টন ময়দান হয়ে রেসকোর্স ময়দান।আবারো পল্টন ময়দানের সেই দিনগুলো সমগ্র দেশের সর্বস্তরের জনগনকে জনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে যেভাবে উদ্ভুদ্ধ করেছিলো-ইতিহাসে তা খূবই বিরল।কোন একটি দিনকে অন্যদিন থেকে আলাদা করার উপায় নেই।বঙ্গবন্ধুর নামে আমাদের মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে গোপন সংগঠন নিউক্লিয়াসের মাধ্যমে ছাত্র-যুব সমাজের গোপন ও প্রকাশ্য পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক ব্যাপক কর্মকান্ড দলমত নির্বিশেষে সমগ্র দেশের ছাত্র-শ্রমিক ও সর্বস্তরের জনগনকে একই সূঁতোয় বেঁধে জনযুদ্ধে রূপান্তরের প্রক্রিয়া দস্তুরমতো এখন ইতিহাসের আকর।এসব দিনগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোন উপায় নেই।ধারাবাহিকতায় দিনগুলো অবশ্যই পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ইতিহাসের অমোঘ সত্যের লালন ও বিকাশে এসব দিনগুলোর মহিমামন্ডিত ইতিহাসকে ঐতিহাসিক কারনে জাতীয় স্বার্থে ক্ষুদ্র দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির উর্ধ্বে স্থান দিয়ে দীর্ঘ কয়েক যুগের ব্যবধানে দেরী হয়ে গেলেও জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা গ্রহন সময়ের দাবী বলে পত্র-পত্রিকা,তথ্য মাধ্যম,গনমাধ্যমে,সোশ্যাল মিডিয়া সহ নবীন প্রবীন বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞজনদের বলতে দেখা যায়।শুধু তাই নয়-চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে ৬ দফা ঘোষনার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর সাথে এম এ আজিজ সহ জনযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নামে মুজিবনগর সরকারের অবদান,মওলানা ভাসানী,অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ,কমরেড মনি সিং,মনোরঞ্জন ধর সহ ছাত্র ইউনিয়নের কর্মকান্ড বেশ প্রনিধানযোগ্য।ছাত্র ইউনিয়নের কাজী জাফর,রাশেদ খান মেনন,মতিয়া চৌধূরী,হায়দার আকবর খান রনো,আতিকুর রহমান শালু ইউছুফজাই সহ অনেকের কর্মকান্ডও আলোচ্য।

তথাকথিত পাকিস্তানের সামরিক বেসামরিক সকল গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টকে মিথ্যা প্রমানিত করে ১৯৭০'সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে।নির্বাচনের পরপরই ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা শাসকগোষ্টির তালবাহানা ও ষডযন্ত্র লক্ষনীয়।দীর্ঘ ২৪ বছরের শাসন-শোষন,অবিচার,অনাচারের কথা বাদ দিলেও নির্বাচনের আগে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্নিঝড়ে লক্ষ লক্ষ লোকের প্রানহানির পর পশ্চিমা শাসকদের উপেক্ষা সারাবিশ্বকে স্তম্ভিত করে।বাঙালী জাতির প্রতি এতোবড়ো উপেক্ষা নির্বাচনে বিরাট প্রভাব রাখে এবং পূরো জাতিকে একই সূঁতোয় গেঁথে ফেলে।যাহোক-১৯৭১'সালের ১'লা মার্চ সামরিক স্বৈরশাসক আচানক রেডিওতে ৩'রা মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষনা করলে ঢাকাসহ সারাদেশ আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে উঠে।ঢাকা ষ্টেডিয়ামে তখন ক্রিকেট খেলা চলছিলো।ইয়াহিয়ার ভাষনের পরপরই তা পন্ড হয়ে যায়।অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে ঢাকা শহরের বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতা "বীর বাঙালী অস্ত্র ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর","ছয় দফা না এক দফা-এক দফা এক দফা",পিন্ডি না ঢাকা-ঢাকা ঢাকা","তোমার নেতা আমার নেতা-শেখ মুজিব শেখ মুজিব" ইত্যাদি গগনবিধারী শ্লোগান সহকারে হোটেল পূর্বানীর চতুর্পাশ্বে জড়ো হতে থাকে।দ্রুততম সময়ের ব্যবধানে ততক্ষনে হোটেল পূর্বানীর চতুর্দিকে লোকে লোকারণ্য।বঙ্গবন্ধু তখন আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারী অধিবেশন ও দেশীবিদেশী সাংবাদিকদের নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন।ইয়াহিয়ার ভাষনের পরপরই হোটেল পূর্বানীর ভেতরের অবস্থা থমথমে।বাইরে বিক্ষুব্ধ জনতার গগনবিধারী শ্লোগানের গর্জনের একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু হোটেল পূর্বানীর ব্যালকনীতে দাঁড়িয়ে সবাইকে আন্দোলন অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।ছাত্রজনতা বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত ভাষনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যেতে থাকে।বিক্ষুব্ধ ছাত্র জনতা চার খলিফা খ্যাত ছাত্রনেতাদের সমন্বয়ে "স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ"ঘোষনার জন্য প্রচন্ড চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।এক পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় ডাকসূ ভিপি আ স ম আবদুর রব,ডাকসূ সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন,বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী,বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ চতুষ্টয়ের সমন্বয়ে "স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ"য়ের ঘোষনা দেয়া হলে উপস্থিত ছাত্রজনতা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে শ্লোগানের পর শ্লোগান সহকারে চতুর্দিক প্রকম্পিত করে তোলে।স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পরবর্তি দিন ২'রা মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠানের ঘোষনা দিলে ছাত্র জনতা সেদিনের মতো শ্লোগান দিতে দিতে যার যার গন্তব্যে গমন করে।ততক্ষনে সমাবেশের কথা ঢাকা নারায়নগন্জ সহ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।উল্লেখ্য ১৯৭০'সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উপরোল্লিখিত চার ছাত্রনেতা উল্কার বেগে সারাদেশ চষে বেড়ায়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জয়যুক্ত করার লক্ষ্যে।এক পর্যায়ে জনগন তাঁদেরকে চার খলিফা বলে সম্বোধনের বিষয়টি আলোড়ন সৃষ্টিকারী।

এলো ২'রা মার্চ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গন।স্মরণকালের বৃহত্তম ছাত্রজনসভায় তিলধরনের ঠাঁই ছিলোনা।এই সভায় চার খলিফার কন্ঠে বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষনা করা হয়।উল্লেখ্য শ্লোগানে মূখরিত উত্তেজিত ছাত্রজনতাকে ১০:৪৫ মিনিটে ডাকসূ ভি পি আ স ম আবদুর রব মাইক হাতে নিয়ে সভায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী সমবেত সকলকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও তাঁর নির্দেশ অনুসরন করে স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার শপৎবাক্য পাঠ করান। সভায় চার খলিফা ও লক্ষ ছাত্রজনতার উপস্থিতিতে ডাকসূ ভি পি আ স ম আবদুর রব পতাকা উত্তোলন করলে সমুদ্রের গর্জনের মতো শ্লোগানে শ্লোগানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা প্রকম্পিত হতে থাকে।পরবর্তি দিন ৩'রা মার্চ পল্টন ময়দানে জনসভার ঘোষনা দেয়া হয়।
২'রা মার্চ,আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের ফলে বাঙালী জাতি কেবলমাত্র স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া ব্যতিত পেছন ফেরার সব পথ রূদ্ধ হয়ে যায়।তাই এই দিনের বিশেষ মাহাত্ম্য ঐতিহাসিক কারনে আগামী জমানার ইতিহাসবিদদের কাছে অবশ্যই বিশেষ গুরুত্ববহ হয়ে উঠবে।কারন স্বাধীনতার লক্ষ্যে পরিচালিত সংগ্রামের ঐতিহাসিক জনঅনুমোদন সেদিন উপস্থিত ছাত্রজনতার মধ্য দিয়েই সুস্পষ্টভাবেই ধ্বনিত হয়েছিলো।

৩'রা মার্চে ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে "স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ"আয়োজিত বিশাল জনসভায় অনির্ধারিতভাবে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি ও আন্দোলনের ঘোষনা প্রদান এককথায় ঈঙ্গিতবহ ও অবিস্মরনীয়।এদিন ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক শাজাহান সিরাজ মন্চে বঙ্গবন্ধুর আগমনের পূর্বে ও বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে দূ'বার স্বাধীনতার ইশতেহার বা প্রক্লেমেশন বা ঘোষনাপত্র পাঠ করেন।মুহুর্মুহু করতালি আর গগনবিধারী শ্লোগানের মধ্য দিয়ে তা জনঅনুমোদন লাভ করে।সর্বসম্মতিক্রমে বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার স্থপতি ঘোষনা,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তোলিত জাতীয় পতাকা নির্ধারন ও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের "আমার সোনার বাংলা" গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে নির্বাচন সহ বিস্তারিত কর্মপন্থা ঘোষিত হয়।প্রকাশ্য জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে জনঅনুমোদন প্রাপ্ত ইশতেহার বা প্রক্লেমেশন বা ঘোষনার বিষয়টি জানার পরও ঘোষনা নিয়ে অহেতুক বিতর্কের বা বিকৃত ইতিহাস তৈরীর আদৌ কোন অবকাশ আছে কি?

৩'রা মার্চের পরপরই বিএলএফের চার যুব নেতা সিরাজুল আলম খান,শেখ ফজলুল হক মনি,আবদুর রাজ্জাক,তোফায়েল আহমদ ও বেগম মুজিবের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড গঠনের আশ্বাস প্রদান করেন।৭'ই মার্চের আগের দিন রাতে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডীর ৩২ নম্বর বাসভবনে চার যুবনেতা,চার খলিফাখ্যাত স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও বেগম মুজিবের সাথে গভীর আলোচনা এবং অবশেষে আওয়ামী হাইকমান্ডের সাথে ঐক্যমত্যের বিষয়টি বঙ্গবন্ধু জানিয়ে দেন।সকলের সাথে ব্যাপক পরামর্শের ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু পরবর্তি দিনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন।তোফায়েল আহমদসহ চারখলিফার নেতৃত্বে শত শত ভলান্টিয়ার মন্চ সহ উত্তাল জনসমুদ্র নিয়ন্ত্রনের দায়িত্ব পালন স্মরন করার মতো।ছাত্র নেতা,যুবনেতা,আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড পরিবেষ্টিত হয়ে মন্চে আরোহন করার সাথে সাথেই উত্তাল জনসমুদ্র মুহুর্মুহু গগনবিধারী শ্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তোলে।পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ভাষনদানকালে স্মরন করিয়ে দিলেন "যার যা আছে-তাই নিয়ে প্রস্তুত থেকো"।"ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল"।সবশেষে "এবারের সংগ্রাম-আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।এবারের সংগ্রাম-স্বাধীনতার সংগ্রাম"।"জয় বাংলা"।তারপর আর কিছু কি বাকী থাকতে পারে?
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে।আওয়ামী লীগ,যুব ও ছাত্র নেতৃত্বের মাধ্যমে সমগ্র দেশ বঙ্গবন্ধুর নামে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হতে থাকে।পশ্চিমা শাসকগোষ্টী নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলে।এভাবে এলো ঐতিহাসিক ২৩'শে মার্চ।এদিনের গুরুত্বও অপরিসীম।পাকিস্তান দিবসের পরিবর্তে প্রতিরোধ দিবস।এদিন সারাদেশে পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে প্রতিটি ঘরে ঘরে এমনকি হাইকোর্ট,সকল কূঠনৈতিক মিশন সহ সর্বত্র (কেবলমাত্র আজকের বঙ্গভবন ও ক্যান্টনম্যান্ট ব্যতিত)বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেয়া হয়।ঢাকার পল্টন ময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে এদিন স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দেয়া হয়।আমেরিকার এবিসি টেলিভিশন নেটওয়ার্কের বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিক টেড কপেলের ধারাবর্ণনা ইউটিউবে এখন দেখতে পাওয়া যায়।এদিন 'জয় বাংলা বাহিনী'ও 'মহিলা জয় বাংলা বাহিনী' লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে "স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ"য়ের 'চার খলিফা' যথাক্রমে আ স ম আবদুর রব,আবদুল কুদ্দুস মাখন,নূরে আলম সিদ্দিকী ও শাজাহান সিরাজকে "গার্ড অব অনার"প্রদান করেন।পতাকা উত্তোলন করেন হাসানুল হক ইনু আর 'জয় বাংলা বাহিনী'র উপপ্রধান কামরুল আলম খান খসরু গান ফায়ার করে মুক্তিযুদ্ধের সূচনার ঈঙ্গিত প্রদান করেন।দেশীয়,আন্তর্জাতিক ও কূঠনৈতিক জটিলতা নিরসনে বঙ্গবন্ধু অনুপস্থিত থাকলেও গোপন সংগঠন নিউক্লিয়াসের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর অনুমোদনের বিষয়টি অনেকেরই জানার কথা।কারন ঐদিন জনসমাবেশ শেষে 'জয় বাংলা বাহিনী'র প্রধান ও ডাকসূ ভি পি আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে বিরাট মিছিল ধানমন্ডীর ৩২ নম্বর বাসভবনে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর হাতে স্বাধীন বাংলার পতাকা প্রদান করলে তা তিনি উড়িয়ে দেন।২৪'শে মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধু শেষবারের মতো ইয়াহিয়া কর্তৃক তালবাহানার আলোচনায় যোগ দিতে যাওয়ার সময় ডাকসূ ভি পি আ স ম আবদুর রব বঙ্গবন্ধুর গাড়ীতে স্বাধীন বাংলার পতাকা লাগিয়ে দিলে সেই পতাকাবাহিত গাড়ী নিয়ে বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়ার সাথে শেষ সাক্ষাৎ করেন।
এলো ২৫'শে মার্চের ভয়াল রাত। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। একই সাথে "অপারেশন সার্চ লাইট"য়ের নামে বর্বর পাক হায়েনা বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল সহ ঢাকা শহর ও দেশের সর্বত্র একযোগে ইতিহাসের জঘন্যতম গনহত্যা শুরু করে।চতুর্দিকে অগ্নিসংযোগ,নারীদের উপর পাশবিক নির্যাতন,শিশু,কিশোর,তরুন,যুবা-বৃদ্ধ কেউ এদের বর্বরতা থেকে রেহাই পাইনি।শুরু হয়ে গেলো জনযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে মুক্তির জন্য যুদ্ধ।ঐ রাতে তথা ২৬'শে মার্চ ভোরের সূর্য্য উঠার আগেই বিবিসি ও আমেরিকা সহ বিশ্বের সকল গন ও প্রচার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষনার বিষয়টি প্রচারিত হতে থাকে।যা তখনকার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিকের লেখায় স্পষ্টাক্ষরে লিখিত হয়েছে।আমেরিকা সহ বিভিন্ন দেশের আর্কাইভে এসব এখন প্রতিনিয়ত মেলে।ইন্টারনেটের বদৌলতে তা এখন আরও সহজলভ্য।অবশ্য কালুর ঘাট 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র'থেকে জহুর আহমদ চৌধূরী কর্তৃক প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে আওয়ামী লীগের নেতা এম এ হান্নান,মেঝর জিয়াউর রহমান সহ অনেককে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠ করার কথা দেশবাসী অবগত।
এমতাবস্থায় এসব কিছু বিবেচনায় নিয়ে এভারেষ্ট শৃঙ্গকে সমুন্নত রাখার জন্য হিমালয় পর্বত গুলোকেও সূশোভিত করে তুলতেই হবে।শুধু তাই নয়-শহর বন্দর ও গ্রামান্চলের পাহাড়গুলোকেও সাজিয়ে তুলতে হবে।অন্য কোন বিকল্প নেই।আমাদের মনে রাখতে হবে-হিমালয়ের পর্বতরাজিকে বাদ দিয়ে এভারেষ্ট শৃঙ্গ আদৌ কল্পনা করা যায় কি?ইতিহাসের এসব কঠিন সত্যকে স্বীকার করে নিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ব্যবস্থা গ্রহনের,জাতীয় পতাকা,জাতীয় সঙ্গীত ও স্বাধীনতার মহান স্থপতির সর্ব্বোচ্চ মর্য্যাদার নিশ্চিতকরনে ও সার্বজনীনতার প্রেক্ষাপঠ বিবেচনা করে দীর্ঘ কয়েক যুগের ব্যবধানে দেরীতে হলেও ব্যবস্থা গ্রহনের এখনই সময়।দলীয় ও রাজনৈতিক কারনে কিছু সময়ের জন্য সত্যকে আড়াল করা গেলেও ইতিহাসের কঠিন সত্যের লালন ও বিকাশকে কখনো রূদ্ধ করা যায়না।তাছাড়াও আর যেনো কেউ আমাদের বহু কষ্ট ও রক্তার্জিত ইতিহাসকে ম্যানিপুলেশন বা বিকৃত করতে না পারে-তাই যতশীঘ্র সম্ভব  সমাধান সুনিশ্চিৎ করা দরকার।কেউ যেনো বলতে না পারে আমাদের মহান স্বাধীনতা আন্দোলন আর বিজয় কেবলমাত্র ১৯৭১'সালের ২৬'শে মার্চ থেকে ১৬'ই ডিসেম্বর পর্য্যন্ত।অবশ্য তারও আগে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও নামে অনেক ঐতিহাসিক গোপন ও প্রকাশ্য ঘটনা সমূহ আর ধারাবাহিক আন্দোলনের প্রক্রিয়ার দিনগুলো সমুদ্র মন্থন করে আগামী জমানার সন্তানেরা বের করে আনবেই।আমাদের স্মরন রাখা দরকার যে-আমাদের ভূলের জন্য,আমাদের মধ্যেকার দন্ধের জন্য,দলীয় রাজনৈতিক কারনে আগামী জমানার সন্তানেরা বা ইতিহাসের ছাত্ররা যেনো আমাদের দায়ী করতে না পারে।ইতিহাসের শিক্ষা এই যে,আমরা জেনেও ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহন করিনা।
১৬'ই মার্চ,২০১৭ সাল।
লাস ভেগাস,নেভাদা,যুক্তরাষ্ট্র।
কমিটি ফর ডেমোক্রেসী ইন বাংলাদেশ,যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাদক।
সাবেক সদস্য সচিব:মুক্তিযুদ্ধ চেতনা পরিষদ।যুক্তরাষ্ট্র।
সাবেক প্রতিষ্ঠাতা আহ্ববায়ক:কর্ণেল তাহের স্মৃতি সংসদ,যুক্তরাষ্ট্র।