Editors

Slideshows

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/605744Finding_Immigrant____SaKiL___0.jpg

কুইন্স ফ্যামিলি কোর্টে অভিবাসী

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ দ্যা ইন্টারফেইস সেন্টার অব নিউইয়র্ক ও আইনী সহায়তা সংগঠন নিউইয়র্ক এর উদ্যোগে গত ২৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ৯ See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/455188Hasina__Bangla_BimaN___SaKiL.jpg

দাবি পূরণের আশ্বাস প্রধানমন্ত্

বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ দাবি-দাওয়া বাস্তবায়নে আলোচনা না করে আন্দোলন করার জন্য পাইলটরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন। পাইলটদের আন্দোলনের কারণে ফ্লাইটসূচিতে জটিলতা দেখা দেয়ায় যাত্রীদের কাছে দুঃখ See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/701424image_Luseana___sakil___0.jpg

লুইজিয়ানায় আকাশলীনা‘র বাৎসরিক

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ লুইজিয়ানা থেকে ঃ গত ৩০শে অক্টোবর শনিবার সনধ্যায় লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির ইণ্টারন্যাশনাল কালচারাল সেণ্টারে উদযাপিত হলো আকাশলীনা-র বাৎসরিক বাংলা সাহিত্য ও See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/156699hansen_Clac__.jpg

ইতিহাসের নায়ক মিশিগান থেকে বিজ

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ ইতিহাস সৃষ্টিকারী নির্বাচনে ডেমক্র্যাটরা হাউজের আধিপত্য ধরে রাখতে সক্ষম হলো না। সিনেটে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুন্ন রাখতে সক্ষম হলেও আসন হারিয়েছে কয়েকটি। See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/266829B_N_P___NY___SaKil.jpg

বিএনপি চেয়ারপারসনের অফিসে পুলি

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ নভেম্বর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটস্থ আলাউদ্দিন রেষ্টুরেন্টের সামনে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি তাৎক্ষণিক এক বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। এই See details

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

কিউবা ভ্রমণ = রোজানা নাসরীন

শনিবার, ১১ মার্চ ২০১৭

মেঘের উপরে সোনার বিকেল। উড়ে যাচ্ছি। অনুভবের গভীরে এক ধরনের ভাল লাগার চমক কিংকিণী বাজিয়ে চলেছে। একদিন মুক্ত মনে পাখিদের আকাশে ওড়ার আনন্দ দেখে মানুষের মনে সাধ জেগেছিল আকাশে ওড়ার। তারপর থেকে মানুষ গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছে নিশিদিন। মনে মনে রাইট ব্রাদার্সকে স্যালুট জানাচ্ছি। শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা ধারণ করেই যারা চোখ মুদে থাকেননি তারাই আকাশে ওড়ার গূঢ় রহস্যকে আবিষ্কার করেছেন। মানুষের সামনে নিয়ে এসেছেন আনন্দের ঝর্ণা ধারা। আকাশে মেঘের উপরে স্বর্ণালী সন্ধ্যা দেখতে দেখতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে মনে হচ্ছিল এই যে যন্ত্রের উড়োজাহাজে চড়ে আমরা গন্তব্যে যাচ্ছি তার চেয়ে প্রকৃতির অংশ হয়ে মেঘে ভিজে ভিজে, গায়ে সোনালী আলো মেখে মেখে যদি উড়ে যেতে পারতাম, যদি হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করতে পারতাম সোনার আলোকে তাহলে কতইনা ভাল লাগত। এভাবে একসময় পথ শেষ হয়ে গেল, পৌঁছে গেলাম কিউবার ভারাডেরো বিমান বন্দরে।

Rozana Nasrin 2 

আমরা ‘ সান উইং’ কম্পানির একটা বাসে উঠে পড়লাম যেটা আমাদের জন্য নির্ধারিত ছিল। কারণ ‘ সান উইং’ কম্পানির সাথেই আমাদের ভ্রমণ প্যাকেজের চুক্তি করা ছিল তাই এয়ার বাসটিও ছিল ‘ সান উইং’  কম্পানির। ছোট্ট শহর। নতুন দেখা বাতাবরণ আর পুরানো অভিজ্ঞতার সাথে নতুন সব অনুভবের অংশবিশেষ এবং অভিজ্ঞতা যুক্ত হচ্ছে। কিউবা রাষ্ট্রটি একটি  লম্বা দ্বীপ। চারিদিকে আটলান্টিক মহাসাগর।  কোন কোন রাস্তার পাশেই আছড়ে পড়ছে সাগরের ঢেউ। মন চঞ্চল হয়ে উঠছে , অনেকটা রোমাঞ্চকর লাগছে। সবুজ প্রকৃতিতে আছে অনেক অনেক নারিকেল গাছ, মাঝে মাঝে জায়ান্ট ক্যাকটাস আরও অনেক ধরনের গাছের পাতারা হাত নেড়ে নেড়ে যেন আমদেরকে স্বাগত জানাচ্ছে। তখন রাতের আলো আঁধারের খেলার  সাথে নতুন দেশকে যেন একসাথে জেনে নেওয়ার চঞ্চলতা একটি  কথাই কানে কানে বলে যায় সে হল, ‘ভাল লাগছে।‘  মোটামুটি পরিচ্ছন্ন রাস্তা-ঘাট, বাড়িঘর  অবলোকন করে চোখের স্বস্তি আর মনের আনন্দ মিলে  মিশে বিচিত্র এক সুখানুভুতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে একদল  লোককে  নামানো হল ‘টুক্সপান’ নামক একটি রিসোর্ট অ্যান্ড হোটেলে। সুন্দর রিসোর্ট, নয়ন অভিরাম করে  সাজানো, চারিদিকে ফুলের বাগান, চমৎকার ভাবে গুছানো। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার দেশ তাই সেখানে দেখতে পেলাম বাংলাদেশে ফেলে আশা তারা ফুল, রঙ্গন ফুল, যাদেরকে কতদিন দেখিনা। তখন মনে হল আমার দেশের সাথে যতটুকু মিল পেয়েছি তার মূল্য আমার কাছে অনেক। তারপর পৌঁছাল আর একটি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে যার নাম ‘ব্লাও ভারাডেরো’ মনে  হল এখানে আর্কিটেক্ট আর একটু বেশী  মনোযোগ দিয়েছিল। এভাবে একটার পর একটা রিসোর্টে বেড়াতে আশা লোকদেরকে ছুটির আনন্দিত সময় কাটানোর জন্য রেখে যাচ্ছে। পথে পথে গাড়ির মধ্যেই আনন্দ প্রকাশ করার জন্য ড্রাইভার সাহেব মজার মজার কথা বলছেন, অনেক তরুণ উৎসাহী তার সাথে গলা মিলাচ্ছে। একেবারে শেষে পৌঁছে গেলাম হোটেল গ্র্যান্ড মেমোরিতে। ড্রাইভার সাহেব চিৎকার করে বললেন, এবার আমরা পৌঁছে গেছি দা লাস্ট অ্যান্ড বেস্ট হোটেলে। যাত্রীরা হাতে তালি দিয়ে, কন্ঠে উল্ল­াস প্রকাশ করে  নামতে শুরু করল হোটেল চত্বরে। তাকিয়ে দেখলাম বড় বড় ইংলিশ অক্ষরে লেখা আছে ‘গ্র্যান্ড মেমরি অ্যান্ড স্পা’ মানে এটাই আমাদের গন্তব্য। হোটেলে চেক ইন করার পর আমাদের একটি জায়গায় অপেক্ষা করতে বলা হল। বেলবয় এসে ইঞ্জিন চালিত ছোট একটি গাড়িতে আমাদের তুলে নিল এবং পৌঁছে দিল আমদের নির্ধারিত বিল্ডিংএ এবং রুমে ঢুকে আমাদেরকে সকল সুযোগ সুবিধার কথা বুঝিয়ে দিল। এখানে আমরা সাত দিন থাকব, এজন্য কি ধরনের আয়োজন আছে সবকিছুই। কিউবার রাষ্ট্র ভাষা স্প্যানিশ। ট্যুরিস্টদের সাথে মানে আমাদের সাথে সবাই ইংলিশে কথা বলছে ঠিকই তবে বেশীরভাগ মানুষ ভেঙ্গে ভেঙ্গে স্প্যানিশ এক্সেন্টে ইংলিশ বলছে। তবে সবকিছুই স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। তখন মনে হল মানুষ যদি মানুষের মনের কাছাকাছি যেতে চায় তাহলে ভাষা কোন প্রতিবন্ধকই নয়। এখানে তিন ধরনের মানুষ দেখা যাচ্ছে, সাদা, কালো, এবং বাদামী গায়ের রঙয়ের মানুষ। সবাই কিউবান। সে রাতটি ছিল গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির রাত। ভিজে ভিজে খাবার সন্ধানে ঘুরছি আমরা তিনটে পরিবার। যাদের সাথে প্লে­নেই আলাপ হয়েছিল। হোটেলের ডাইনিং তখন বন্দ হয়ে গেছে কিন্তু স্নাকবার চব্বিশ ঘণ্টার জন্য খোলা আছে। বৃষ্টির পানিতে গা ভিজিয়ে, পা ভিজিয়ে, পুল ডিঙ্গিয়ে স্নাকবারে পৌঁছলাম। ওখানে কথা বলে জানলাম, ডাইনিং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খোলা থাকে। কিন্তু সব  বার গুলি (বিচের ধারের বার গুলি ছাড়া) চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকে এবং আমরা জানতাম সব রকম খাবারই ইনক্লুসিভ। অনেকটা স্বস্তি অনুভব করলাম। গভীর রাত পর্যন্ত আমদের গল্প হল, তারপর ঘুমের জন্য ফিরে গেলাম যে যার রুমে। সকালে টিপ টিপ বৃষ্টি উপেক্ষা করে  ডাইনিংএ গেলাম, নাস্তা সেরে দিনের আলোতে সবকিছু বুঝে নেওয়ার তাগিদে ঘুরতে বের হলাম। আবহাওয়ার কথা না বললেই নয়।  কানাডায় ফল সিজন চলছে, তাপমাত্রা পনেরো, সতেরো থেকে জিরো ডিগ্রি সেলসিয়াস এ অবস্থান  করছে, ঠিক সেই সময় ভারাডেরো তে তাপমাত্রা ছিল সাতাশ, আটাশ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ভারাডেরোতে তখন একটি ডিপ্রেশন চলছিল যা দুইদিন স্থায়ী হয়েছিল। অনুকুল তাপমাত্রার কারণে ডিপ্রেশনের আবহাওয়া তেমন কোন বিরক্তির কারণ হতে পারেনি। তৃতীয় দিন সকালে আলোর বন্যায় যেন হাসতে লাগল, ভাসতে লাগল সকলই।

 কিউবার সমুদ্র উপকূলে এক নৌবিহারে লেখিকা রোজানা নাসরীন ও তার স্বামী রাসেল সিদ্দিকী

কিউবার সমুদ্র উপকূলে এক নৌবিহারে লেখিকা রোজানা নাসরীন ও তার স্বামী রাসেল সিদ্দিকী

কিউবা সমাজতান্ত্রিক দেশ। কিউবার অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ জুড়ে আছে ট্যুরিজম। এখনে অনেক দেশ থেকেই ট্যুরিস্ট আসে বিশেষ করে শীতের দেশগুলি থেকে ট্যুরিস্ট এসে বেশি ভিড় করে। অনেকের সাথে কথা বলে জানলাম  ইউরোপ, কানাডা, বলিভিয়া, ব্রাজিল, এমনি  বিভিন্ন দেশ থেকে ভ্রমণ পাগল লোকেরা এখানে ছুটি কাটাতে এসেছে। কিউবার কারেন্সি স্ট্যান্ডার্ট হিশেবে ইউএস ডলার প্রচলিত। কানাডিয়ান ডলারের প্রচলন আছে তবে ইউএস ডলারই নির্ধারিত মূল্যমান। দেশটির সাথে কানাডার সম্পর্ক বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ তাই কানাডিয়ানদের মনে হয়েছিল একটু বেশী খাতির করে ওদেশের লোকেরা। হয়ত কানাডা বিশ্বের ধনী দেশগুলির একটি এবং সামাজিক নিরাপত্তার দিক থেকে প্রথমে অবস্থান করছে বলেই দেশটিকে গুরত্বের সংগে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিউবার কারেন্সিকে বলা হয় ‘পেসো’। ট্যুরিস্টদের জন্য সিইউসি নামে এক ধরনের কারেন্সি প্রচলিত আছে। একশত ইউএস ডলারে পাওয়া  যায় সত্তুর পেসো। ট্যুরিস্টদের জন্য সকল পণ্যের মূল্য সিইউসি তে নির্ধারিত থাকে। বৃষ্টির ঝামেলা উপেক্ষা করে ভারাডেরো ডাউন টাউনের দিকে পা বাড়ালাম। ডাবল ডেকার বাসে চড়তে আনন্দ অনুভব করলাম। আমরা একেবারে উপরে উঠে বসলাম তখন বৃষ্টি নেই। বাসের দোতলায় কোন ছাদ নেই, উন্মুক্ত স্থান থেকে সমস্ত শহর দেখা যাচ্ছে। আমার কাছে মনে হয়েছে শহরের মূল আকর্ষণই হল আটলান্টিক মহাসাগর। যার রূপ দেখে দেখে তৃপ্তি হয়না। পথিমধ্যে একটা জায়গা অপূর্ব লেগেছে, নদী এসে একটা বাঁক নিয়ে নির্দ্বিধায় যেন সাগরে মিশে গেছে। সত্যিই অতুলনীয় দৃশ্য। আকাশ আর সীমাহীন সাগরের মাঝখানে কিউবা যেন একটি অপরূপ ভূখন্ড হিসাবে জেগে আছে, একথা ভাবতে ভাবতে মন বলাকা পাখা মেলে দিল। রবীন্দ্রনাথের বলাকার মতই মন ছুটতে  লাগল, নিজেকে মনে হতে লাগল মুক্ত বিহঙ্গের মত। তিনি যেমন বলেছিলেন, ‘হেথা নয় হোথা নয়, আর কোথা অন্য কোনখানে’  ঠিক তেমন করে  কী যেন এক  বেগের  আবেগে মন ছুটছে , কোথাও কোন বন্ধন নেই। আজ মন যেখানে যেমন ইচ্ছা ঘুরতে যেতে পারে তাই সাগরের বুকে উড়ে যাচ্ছে মন বলাকা। কোন লক্ষ্য নেই। শুধু ছুটে চলাই একমাত্র উদ্দেশ্য, গতিই যেন জীবনের সবটুকু অনুভব জুড়ে সত্য হয়ে আছে আর কিছু নয়। সাগরের বিশালতা প্রত্যক্ষ করলে হয়ত মানুষের মন এমন  চঞ্চল হয়ে যায়। রাস্তার দুই পাশে  চমৎকার সবুজ প্রকৃতি দেখে ক্যমেরা ক্লিক ক্লিক করতে লাগল। প্রথমে একটা মার্কেটে পৌঁছলাম। মার্কেটটি সাজানো গোছানো। নাম লেখা আছে ‘প্ল­াজা আমেরিকা’। নাম দেখে ভাল লাগছিলনা। স্বাভাবিকভাবে একটি উপলব্ধি কাজ করছিল যে আমরা আমেরিকা অথবা কানাডার কোন কিছু

rozana-nasrin-2

বিখ্যাত হাভানা চুরুট মুখে লেখিকার সঙ্গে এক কিউবান রমনী

দেখতে এখানে আসিনি এসেছি কিউবান নিদর্শন দেখতে। অনিচ্ছা নিয়ে দুএকটা দোকানে ঘুরলাম। সব পণ্যের গায়ে লেখা আছে সিইউসির নাম।

কোনটি ৫০, কোনটি ৩০  কোনটি ২০ সিইউসি এমনি নানা রকম পণ্য এবং নানা ধরনের মূল্যমান। তখন মনে হল এখানে সব পণ্যেরই মূল্য কিছুটা বেশী। খানিকটা অস্বস্তি লাগছে  ট্যুরিস্টদের জন্য সকল পণ্যের একটু বেশী মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে। যারা  ট্যুরে আসে তারা শপিং এর চেয়ে বেশী ব্যস্ত থাকে দর্শনের আকর্ষণে। তারা বেশী শপিং করেনা বলে আমার ধারনা।  তাছাড়া একই মানের পণ্য আমেরিকা-কানাডায় আরো খানিকটা কম মূল্যে পাওয়া যায়। উল্লে­খ করার মত  তেমন কিছু কেনা হলনা কিন্তু অভিজ্ঞতা হল  দেশের অর্থনৈতিক মানসের একটি পার্ট সম্পর্কে। তখন আমার মনে হতে লাগল যদি পণ্যের মূল্য আরো কম করে নির্ধারণ করা হত তাহলে হয়ত ট্যুরিস্টরা কিছু বেশী পন্য ক্রয় করত। ওখান থেকে ফিরে আমরা গেলাম  একেবারে ভারাডেরো ডাউন টাউনের ফ্লি মার্কেটে। মার্কেটটি বাইরে থেকে দেখে মনে হল কতগুলি টেন্ট লাগানো একটা অস্থায়ী ব্যবস্থা। ভিতরে ঢুকে দেখলাম ওখানে কিউবান সুবিনিয়ারে ঠাঁসা। কাঠের তৈরি পণ্য, সমুদ্রের ঝিনুক দ্বারা তৈরি বিভিন্ন ধরনের পণ্য, সত্যিকারের স্টোন এবং পার্লের গয়না দিয়ে সাজানো রয়েছে। আবার যে গয়নাটি যে স্টোন দিয়ে তৈরি তার একটুকরা নমুনা পাশে রাখা আছে। মুক্তার গয়নার পাশে মুক্তাওয়ালা ঝিনুক রাখা আছে। কোন পণ্যের দামই নির্দিষ্ট করা নেই। তবে মনে হচ্ছিল টুরিস্টদের কাছে সব পন্যের দামই একটু বাড়িয়ে চাচ্ছে। অর্থাৎ যার কাছ থেকে যতটুকু বেশি মূল্য রাখা যায়  ততটুকুই যেন তাদের লাভের অংশ হিসাবে গণ্য হবে। এটা এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক দীনতা। প্রথমে তারা  জিজ্ঞেস করছে  কানাডা থেকে এসেছি কিনা। আমি দোকানে কানাডার নাম  বলার পর কিছুতেই কোন পণ্যের দাম এতটুকু কমাতে রাজি হয়নি তাই বেশি দামেই কিছু কিনে নিতে হল। ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলাম  আর ভবতে থাকলাম, অনাকাঙ্ক্ষিত মূল্যে বেশী কিছু কেনা যাবেনা অথচ অনেক  কিছুই কিনতে ইচ্ছে করছে।  হঠাৎ করে দেখতে পেলাম দুজন কেনেডিয়ান মহিলা বলল তারা ইন্ডিয়া থেকে এসেছে। তাদের গায়ের রঙ ছিল বাদামী, হয়ত তারা ছিল ইন্ডিয়া থেকে আগত ইমিগ্রান্ট। ইন্ডিয়া শুনে অনেকেই দামের ব্যাপারে তাদের সাথে কিছুটা  নমনীয় ভূমিকা পালন করল যা পরিষ্কার বুঝতে  পারলাম। ঘুরতে যেমন ভাললাগল তেমনি  তাদের মানসিক প্রবণতা প্রকাশ পেল এবং মনে হল এ যেন এক চেনা মার্কেটের চরিত্র, যাকে অনেক পিছনে ফেলে এসেছি । তৃতীয়  বিশ্বের মার্কেট গুলোর সাথে কিছুটা চারিত্রিক মিল পেলাম। চোখের  সামনে ভেসে উঠল ইন্ডিয়া-বাংলাদেশের মার্কেটের চরিত্র। তবে ক্রেতাদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে উল্লি­খিত দেশ দুটির চেয়ে এদেশের মার্কেট ও পণ্যের মান অনেক উন্নত মান সম্পন্ন যা ইউরোপ এবং আমেরিকা, কানাডার সম পর্যায়ের । ফেরার সময় প্রচন্ড বৃষ্টির কবলে পড়ে ফ্লি মার্কেটে ঘোরার আনন্দ অনেকটা হ্রাস পেল। আর ছাদে বসা হলনা এবার জানালা দিয়ে শহর দেখছি।  শহরের বাড়িগুলি দেখছি আর ভাবছি সব দেশের মানুষেরই হয়ত মনের অনুভূতি একই রকম। হয়ত সব দেশের নাগরিক গণ বিশ্বাস করে  আমাদেরই মত “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবেনাক তুমি/ সকল দেশের রানী সেজে আমার জন্মভূমি।“

rozana-nasrin-4

লেখিকা রোজানা নাসরীন ও তার স্বামী রাসেল সিদ্দিকী

বিকেলে হোটেলের স্যুইমিং পুল যেন আমদেরকে অনেকটা টেনে নিয়ে গেল। তখন আর বৃষ্টি নেই, চমৎকার মিউজিক বেজে চলেছে। ‘সালসা’ ওদের প্রিয় মিউজিক। পুলের সঙ্গেই মিনি বার সেখানে সব ধরনের পানীয় পাওয়া যায়। একদিকে স্নাকবার আছে ইচ্ছে করলে সেখানে কিছু খেয়ে আবার পুলে ফিরে আসা যায়। ও দেশে আইনের প্রয়োগ খুব কঠিন। ওখানে কোন অপরাধ সংগঠিত হয়না। অপরাধ কাকে বলে সাধারণ কিউবানরা হয়ত এর রূপ ভুলে গেছে। সরকার আইনের মাধ্যমে যা নিষিদ্ধ করেছে তা ভঙ্গ করার ক্ষমতা কারো নেই। সব রকম পানীয় অবাধে মানুষ খেতে পারে। যে যত ইচ্ছা ড্রিঙ্ক করতে পারবে  কিন্তু ড্রাংক অবস্থায় সব ধরনের অপরাধ নিষিদ্ধ। তাই তারা ক্রাইম থেকে মুক্ত। একটি দেশে সাধারণ মানুষের সমাজে কোন ক্রাইম সংগঠিত না হলে সামাজিক ও মানসিক ভাবে নাগরিকগন সর্বাধিক নিরাপদে বসবাস করতে পারে। একটা আর্থিক দীনতা কিউবা বাসীর অন্তরে অন্তরে ক্ষীণ ধারায় বইছে  যা আমি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছি। তখন আমাকে একটা চিন্তা অসম্ভব ভাবিয়ে তুলেছে; আমরা একটা সংস্কার নিয়ে বড় হয়েছি যে, অভাবে স্বভাব নষ্ট ;অর্থাৎ দারিদ্রতার কারণে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। কিউবাকে দেখে আমার সেই আজন্ম বয়ে আনা ধারনা সমূলে উৎপাটিত হয়ে গেল। বোধটা আরও সুস্পষ্ট হল যে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে অপরাধ প্রবণতা কালচারের ঘারে চড়ে আসে, কখনো দারিদ্রতার ঘারে চড়ে আসেনা। মানুষ স্বভাবতই অপরাধ প্রবণ কিন্তু আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারাটাই কালচারের অঙ্গ। কিউবান সরকার সেটুকু পেরেছেন। সামাজিক জীবনের চারিদিক কণ্টক মুক্ত করতে পারা এবং সমাজের আর্থিক উন্নতিকে গতিমান করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কেবল দেশের মানুষ ধনী হলেই সব  কিছুর সমাধান হয়ে যায়না; আর্থিক উন্নতির পাশাপাশি প্রয়োজন নৈতিক জীবন বোধ এবং সকল মানুষের অবাধে সমাজে বিচরণ করার নিশ্চয়তা। ধর্ম, গোত্র, সেক্স নির্বিশেষে রাষ্ট্রীয় আইন মেনে সকলের  জীবনকে বন্ধনহীন করে তোলাই সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিউবাতে কিছুটা আর্থিক দীনতা থাকলেও তারা মানুষের যাপিত জীবনে এবং সংস্কারে অনেকখানি অপরাধ মুক্ত। এখানে নারী ও পুরুষের মধ্যে বাহ্যিক কোন প্রভেদ নেই। যদিও অন্তরে কি আছে আমরা বাইরে থেকে তার খোঁজ রাখিনা। সকলেই এখানে মানুষ হিসাবে গন্য হয় এবং সবক্ষেত্রেই তাদের অধিকার সমান। নারী পুরুষের মধ্যে সামাজিক বিভেদ বলতে দৃশ্যমান কিছু চোখে পড়েনি। যা  মানুষ হিসাবে আমাকে আকর্ষণ করেছে। আমি যে সামাজিক নিয়মগুলি দেখে বেড়ে উঠেছি, যাকে কোনভাবে সমর্থন করতে পারিনি কোনদিন, সেই নিয়মগুলি কোনখানে নেই , যা অনেকখানি মানসিক স্বস্তি নিয়েই অনুভব করেছি। ওখানে সেক্সের  শাসন  মানুষকে  প্রথার দড়ি দিয়ে টেনে পেছনে নিয়ে যাচ্ছেনা। এক শ্রেণীর মানুষের অবমাননায় আর এক শ্রেণী ধন্য হয়না, কারণ সেখানে আইন ভঙ্গকারী আইন ভাঙ্গাকে বীরত্ব মনে করেনা। প্রথাদৈত্যই একমাত্র জীবনসঙ্গী হয়ে ওঠেনি, জীবনের সবটুকু পরিসর জুড়ে নির্ভীক প্রথার অভয় দৌড় নেই ওখানে যেটা এশিয়ানদেশগুলিতে চরম ভাবে প্রতিয়মান। (চলবে)

যেসব পণ্য তারা উৎপাদন করছে তার মধ্যে চিনি শিল্প আর সিগারেট শিল্প দেশটিকে সমৃদ্ধ করেছে। এক সময়য়ের বিশ্ব নন্দিত হাভানা চুরুটের কথা সর্বজন বিদিত। আখের চাষ করার জন্য আফ্রিকা থেকে এবং চায়না থেকে সেøভ ধরে এনেছিল প্রথম দিকের স্প্যানিশ রাজাগণ। কার্লোস নামে একজন স্বাধীন চেতনায় সমৃদ্ধ মানুষ যিনি ছিলেন একজন আখ চাষি তিনিই প্রথম সেøভদেরকে মুক্ত করার কথা ভাবেন এবং একসময় স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তার মুক্ত মানবিক চিন্তাই মানুষের বন্ধন থেকে মানুষকে মুক্ত করেছে। চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছে সেø­ভিয়ান প্রথা।

কেটে গেল আরও একটি রাত। সময়ের ঘোড়া দ্রুত গতিতে ছুটতে লাগল।পরের দিন সকালে ঝলমলে রোদের মধ্যে মন ছুটাছুটি করতে শুরু করল। মনে হচ্ছিল মানুষ কেবল শুভ বোধের দ্বারাই সুখকর ও কল্যাণকর বোধ খুঁজে পেতে পারে। মনে হবে আলোর সাথে এসব মনে হওয়ার সম্পর্ক কি? আসলে  বাঁধন হারা সময় টুকুই এসব ভাবনার কারণ হয়ে উঠেছে হয়তবা। যখন আমরা ছুটি কাটাতে গিয়ে বাঁধন হারা সুখ অনুভব  করছি ঠিক সেই মুহূর্তে পৃথিবীর অনেক নিরীহ মানুষ প্রথার বন্ধনে নির্যাতিত হয়ে সন্ত্রাসে মারা যাচ্ছে। পৃথিবী জুড়ে এভাবেই  সুখে অসুখে মিলেমিশে মানব জাতি ছুটে যাচ্ছে কোন এক লক্ষের দিকে।

আটলান্টিক মহাসাগরের উদার আহ্বান আমাকে চুম্বকের মত টানছে। আমরা আটলান্টিকের বিচে গিয়ে পৌঁছলাম। বিচের চেয়ারগুলিতে কেউ শুয়ে শুয়ে বই পড়ছে, কেউ গায়ে সোনার রোদ মাখার জন্য শুয়ে চোখ বন্ধ করে আছে, কেউ বেলা ভূমিতে ঝিনুক কুড়াচ্ছে, কেউবা সমুদ্রের জলে ঝাপ দিয়ে ধেয়ে আসা ঢেউ গুলির সাথে খেলা করছে। সবার চোখে মুখেই একটা আনন্দের ঝলকানি সুস্পষ্ট। আমি অপেক্ষা করতে পারলামনা ঝাপ দিলাম অতল সীমাহীন সাগরের বুকে। ছোটবেলায় আমি এই বক্তব্যের  ভাব সম্প্রসারণ করেছিলাম, ‘সমুদ্রের বুকে ঝাপ দাও, তরঙ্গকে আঁকড়ে ধরো ওখানেই আছে অনন্তজীবন।‘ কথাটা তখনকার চেয়ে আজ যেন বেশী বেশী অনুভব করছি। যে কথাগুলি আমাকে সারা জীবন ধরে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে , এবং সেই আত্মসঙ্গী হয়ে যাওয়া কথাগুলি যে একটা চিত্রকল্প বহন করে বেড়াচ্ছে সে যেন বাস্তব রূপ ধারণ করে আমার সামনে উপস্থিত হল । যদিও এর অর্থগত দিকটা অনেক ব্যাপক কিন্তু আজকের সমুদ্রের বিশালতার কাছে, ব্যাপকতার কাছে যার সমস্ত বিস্তৃতি হারিয়ে কেবল জেগে আছে ঢেউয়ের সাথে খেলা করার আবেদনটুকু। তাই সমুদ্রের জোয়ারের সাথে একাকার হয়ে  গেলাম শুধু।

এবার হাভানা যাওয়ার আয়োজন চলছে। হাভানা কিউবার রাজধানী। শহরটি বিশাল নয় তবে তাদের জাতীয় জীবনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। চারশ’ বছর ধরে স্পেন কিউবার শাসন ক্ষমতায় থাকার পর  আমেরিকার সাথে স্পেন এর যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় কিউবার মালিকানা নিয়ে। ১৮৯৮ সালে যুদ্ধ শেষ হয় এবং  আমেরিকা যুদ্ধে জয় লাভ করে এবং রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে। এরপর ক্রমাগত ইতিহাসের পট পরিবর্তনের  মধ্য দিয়ে একসময় কিউবা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়।  এসব উত্থান পতনের  নিদর্শন তাদের  স্থাপত্য শিল্পে বহন করে চলছে। শহরটিতে আমেরিকা এবং স্পেনের শাসন কালের নিদর্শন এখনও জীবন্ত। কিউবার ডিক্টেটর নামে পরিচিত ফিদেল ক্যাস্ট্রো দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। ফিদেল ক্যাস্ট্রোর বাবা স্পেন থেকে আগত একজন ইমিগ্রান্ট ছিলেন। ফিদেল ক্যাস্ট্রো দেশের সংবিধান সহ অনেক পরিবর্তন সাধন করেন। পরবর্তীতে তিনি শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার ভাই রাউল ক্যাস্ট্রোর কাছে ক্ষমতা হস্তার করেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান এর পদ থেকেও তিনি অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু পরোক্ষভাবে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় তার দর্শনকে চলমান রেখেছিলেন। বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন দেশের শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতাসীন হওয়ার ফলে দেশের সামাজিক এবং  ধর্মীয় সংস্কার বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটা নিজস্ব রূপ ধারন করেছে। যদিও ধর্মের শাসন নিয়ে কোনরকম বাড়াবাড়ি নেই, তবু সাধারন জনগণের মধ্যে একটি অস্পষ্ট ধর্মীয় অনুভূতি কাজ করছে সেটি হল ক্যাথলিক খ্রীস্ট ধর্ম। হাভানা ক্যাথলিক চার্চ তার দৃষ্টান্ত  বহন করছে। চার্চের  পাশেই রয়েছে ধর্ম শিক্ষার স্কুল। ইচ্ছে করলে দেশের যে কোন নাগরিক সেখানে ধর্ম শিক্ষা পেতে পারে। পোপ হলেন সেই স্কুলের প্রধান ব্যক্তি।

হাভানা যাওয়ার পথে একটি জায়গায় আমরা থেমেছিলাম কিছু খাওয়া দাওয়া আর ফ্রেশ হওয়ার জন্য। সেখানে একটা রেস্টুরেন্টে আমরা যে যার মত বিভিন্ন প্রকার স্নাক খেলাম ফ্রেশ হলাম আবার চললাম গন্তব্যের দিকে। ভ্রমণের ফর্মুলা অনুযায়ী মিউজিয়াম, প্রধান চার্চ, দুর্গ, রেভুলেশন স্কয়ার, মহানায়কদের শ্বেত পাথরের মূর্তি, ঐতিহাসিক নিদর্শন বর্ণনা এবং ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দ মিলে কখন সময় ফুরিয়ে গেল টের পাইনি। ভ্রমণে যাওয়া বেশ কয়েকজন টরন্টোবাসীর সংগে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল এরা কেউ ইমিগ্রান্ট, কেউ টরন্টোরিয়ান, সবাই মিলে আমরা এক দেশের অস্তিত্ব বহন করছি বলে সবাইকে একই সংস্কৃতির মানুষ মনে হচ্ছিল। আমরা কানাডিয়ানরা সবাই মিলে লাঞ্চের জন্য রেস্টুরেন্টে একটি টেবিলে বসেছি , গল্পের ছলে যে যার অভিজ্ঞতার কথা বলে চলল। কেউ নেতিবাচক ভঙ্গী প্রকাশ করল কেউ আবার অনেকটা ইতিবাচক মত প্রকাশ করল, তবে নেতিবাচক কথার দিকেই সকলের ঝোঁকটা একটু বেশী ছিল। আসলে কেউ ঠিকঠাক করে বলতে পারেনা যে টেবিল টক কোন দিকে ঝুঁকে পড়বে, আমদের বেলায়ও তাই হল। ফেরার পথে আমরা একটা অতি পুরাতন দুর্গ দেখার জন্য থেমেছিলাম সেখানে ছোট একটি মার্কেট আছে যেখানে সব কিউবান সুবিনিয়ার কেনার জন্য একটা বিশেষ জায়গা, ছোট ছোট একচালা ছাউনির মধ্যে দোকানের জৌলুস মন্দ নয়। কিছু কেনাকাটা সেরে ফিরতে বেশ অন্ধকার হয়ে গেল, তখন জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ কবিতার মত করে মনে হতে লাগল সব পাখী ঘরে ফেরার লগ্ন এলো এবার।

আমরা কোন ট্যুরে কিভাবে কখন যাবো তার একটা নির্দেশনা পেয়ে গিয়েছিলাম আগেই, কারণ প্রথমে রেজিস্ট্রি করতে হয়েছিল এবং টাকা জমা দিতে হয়েছিল আমাদের হোটেলেই। সমস্ত দিনের  ভ্রমণের আনন্দের রেশ পরের দিনেও যেন সতেজ হয়ে আছে। পরের দিন প্রভাত আলোয় শরীর ভিজিয়ে আমরা কোন এক আনন্দের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। এবার সমুদ্রে যাবো, অনুভূতিটা এরকম যেন অনেক আগেই মনটা সমুদ্র যাত্রায় নেমে পড়েছে তাই সে সাগরের বিশালতায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। নতুন নতুন দৃশ্যাবলী পেছনে রেখে আমরা ছুটছি , ক্রমাগত চলে যাচ্ছি কোন এক আনন্দের সাজানো ঘরে। আমাদেরকে বহনকারী বাস এসে পৌঁছল একটা টার্মিনালে যেখান থেকে দেখতে পেলাম সাগরের বুকে ভেসে যাচ্ছে  শত শত প্রমোদ তরী। এর মধ্যে একটা এসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, নাম তার ‘কাটামারাং।‘ লাইন ধরে একে একে উঠে  পড়লাম যার সাহায্যের প্রয়োজন ছিল তাকে হাত ধরে সাহায্য করল ভ্রমণ আয়োজকরা । এভাবে  সবাই  উঠে গেলাম সমুদ্রের বুকে ভেসে যাওয়া একটি বোটে। হৃদয় তখন কি এক ভাললাগার আনন্দে বিভোর।  বোটের আকৃতি জাহাজের মত নয় অনেকটা বন্ধনহীন ভেসে বেড়ানোর উপযোগী করেই তৈরি। বোটের মধ্যে যেন আনন্দের ঝর্ণাধারা বইছেতো  বইছেই। নাচে গানে মাতোয়ারা সকলে। যেন পৃথিবীর সব আনন্দ এখানে এসে জমা হয়েছে। সকলেই সুইমিং কস্টিউম পরে আছে, আমি এমন একটি দেশে জন্মেছি এবং বেড়ে উঠেছি যে দেশের মানুষ মনে করে মেয়ে মানুষের অঙ্গ দেখলে পুরুষ মানুষ হামলে পড়বে তাঁর উপর, তাই আমার হৃদয়ে চলছে অনুসন্ধানের যজ্ঞ। আমার চোখ সকলের মুখ অনুসন্ধানে  তৎপর হয়ে উঠল, বুঝতে  চেষ্টা করছি কারো মুখে ভেসে উঠছে নাকি ধর্ষণের আগ্রহ। কোন মানুষের চোখে মুখে  মেয়ে মানুষের অঙ্গ দেখে তাঁকে ধর্ষণের অভিলাষ জেগে উঠতে দেখিনি। কোন পুরুষকেই পাপী মনে হচ্ছেনা যে তাকে দেখে মেয়েরা অঙ্গ ঢাকতে তৎপর হয়ে উঠবে। কোন পুরুষ মানুষকে দেখে  মনে হচ্ছেনা নারীকে সুইমিং কস্টিউম পরা দেখে লালসার যাতনায় মরে যাচ্ছে। এখানে আনন্দটা নির্মল। এটাকেই বলে স্বাধীনতা, যা বাংলাদেশে প্রথার মধ্যে হারিয়ে গেছে।  যেখানে প্রথার আগ্রাসনেই  রচিত হয় নারী ও পুরুষের বিভেদের ফারাক। নারীর অঙ্গ দেখলে পুরুষের আগ্রাসী চিন্তা বেড়ে যায় কেবল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে; যারা নারীর দিকে শুধুমাত্র যৌনতার দৃষ্টিতেই তাকায়। মনে হয় আজন্ম লালিত কী যেন এক আক্রোশ বহন করে চলছে নারীদের প্রতি পুরুষ চরিত্রগুলো। তাই তাকে ধর্ষণের পর মেরে ফেললে জীবনের প্রতি কোন অন্যায় করা হয়না যেন। তাদের বেঁচে থাকা এবং মৃত্যু বরণ করা দুটোই যেন  পুরুষের অভিলাষ। নারী একজন মানুষ একথা কোনভাবেই  যেন  ভাবতে পারেনা তারা। কিন্তু ঐ ভাবনার বৃত্তের বাইরে যারা অবস্থান করেন তাদের মাথায় ধর্ষণের চিন্তা বা মতলব কোনটাই আসেনা। এর মনস্তাত্ত্বিক  কারণ হল যখন এসব সামাজিক প্রথাগুলি তৈরি  হয়েছে তখন মানুষের জীবনে যৌনতার আনন্দ ছাড়া আর কোন আনন্দের ব্যবস্থা ছিলনা। মানুষের মনে কখনও আসেনি যে যৌনতাকে অতিক্রম করেও সকল মানুষ মিলে নির্মল আনন্দের ব্যবস্থা করা যায়। আজকের সভ্য জগতে যৌনতার আনন্দ কেবল নিতান্তই ব্যাক্তিগত; মানে সেটা কেবল দুটি মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং নিয়মতান্ত্রিক । কিন্তু নৈর্ব্যক্তিক আনন্দের ব্যবস্থা করতে হলে ঐ সীমাবদ্ধ ভাবনার বাইরে গিয়ে  সকলের আনন্দের উৎসকে খুঁজে বের করতে হয়। যে আনন্দের নেপথ্যে থাকবেনা কোন ভীতির  কুহেলিকা। মানুষের আনন্দ লোভী মন সভ্য মানুষকে তাগিদ দেয় যে অনেকে মিলে যতটুকু আনন্দে ভেসে যাওয়া যায় সেটুকুই জীবনকে সহজ ও স্বাভাবিক করে রাখে। কুসংস্কার মুক্ত করে এবং মানুষকে উদার হওয়ার মন্ত্র শিখায়। মানুষের অন্তরে অন্তরে সর্বদা দুটি মন্ত্র সক্রিয়, একটি হল মানুষে মানুষে আনন্দের মাধ্যমে সৌন্দর্য মণ্ডিত মানব সভ্যতা গড়ে তোলা, অন্যটি হল কোন প্রথা ও  কোন সংস্কারের কারণে মানুষে মানুষে  শত্রু  ভাবাপন্ন সম্পর্ক তৈরি করা, এবং প্রথাবদ্ধতাকে  অন্তরে ধারণ করে মানুষের  ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য সকল সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করা।  এই দুটি সত্যের মধ্যে মানব জাতি কোনটিকে গ্রহণ করবে তা নির্ভর করে  তাদের মানসিক প্রবণতার উপর। এভাবেই জাতিগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়।

সীমাহীন সমুদ্রের মাঝে একটি নির্দিষ্ট স্থানে এসে আমাদের বোটটি থামল। সাগরের বুকে একটি  সুবিধা জনক জায়গা পছন্দ করে বিশেষ ব্যাবস্থায় স্টেশন করা আছে। একইভাবে দুটি স্টেশন তৈরি করা আছে। একটা বড় এরিয়া জুড়ে কোন কিছু আটকে রাখার মত করে  গোলাকৃতি আয়োজন রয়েছে। যখন সেই স্টেশনে আমরা নেমে পড়লাম আনন্দে মনটা যেন চঞ্চল হয়ে উঠল। চারিদিকে অন্তহীন সাগর  মাঝখানে  মানব সৃষ্ট একটি ঘাটি , ডলফিনদের আবদ্ধ রাখার জন্য এ ব্যবস্থা। তবে  ডলফিনদের অবরুদ্ধ রাখার প্রক্রিয়াটি দেখে মনে হল সাগরের বিশালতাকে ব্যাহত করা হয়নি এতটুকু। ডলফিনরা সেখানে বসবাস করলেও তাদের অবরোধ করে রাখা হয়েছে সে রকম মনে হচ্ছেনা। দেখে মনে হচ্ছে এ এক অদৃশ্য অবরোধ। কারণ এই গোলাকৃতি জায়গাটির মেকানিজম চমৎকার। যেহেতু ডলফিন বড় আকৃতির মাছ তাই তার শারীরিক আকৃতির তুলনায় খানিকটা ছোট ছোট ফাকা দিয়েই রচিত বন্ধন।। তাঁরা ছুটে যেতে পারছেনা তবে তাদের অবরোধের কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছেনা । একে একে সকলে নেমে গেল ডলফিনের সাথে খেলা করতে। ডলফিনের পছন্দের খাবার হিসাবে এক ধরণের মাছ তাদেরকে খেতে দেওয়ার কারণে যেন উৎফুল্ল হয়ে শিখানো খেলা দেখাতে লাগল পরম উৎসাহে।  যখন ডলফিনের পিঠে চড়ে সাগরের জলে ঘুরছি তখন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল , মনে হচ্ছিল সমস্ত বাস্তবতা স্বপ্নের জগতে হারিয়ে গেছে। রিসোর্টের পক্ষ থেকে ক্যামেরা ম্যান ছিল, প্রায় সবাই ডলফিনের সঙ্গে চমৎকার যত ছবি  উঠাল। ডলফিন  মাছ হয়ে মানুষের গালে চুম্বন করছে ফটো স্যুটের জন্য। দৃশ্যটি দেখে আমার মনে আনন্দের ঝর্ণা বয়ে গেল।

এবার একটা মজার ইভেন্ট আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে যার নাম ‘স্নোর কেলিং।‘ মহাসাগরের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে মানুষেরা জলের তলদেশে গিয়ে কতকি রহস্য উদ্ধার করেছে, ঠিক তাদের মতই যেন আমরা সকলে খেলায় মেতেছি। দেখে মনে হচ্ছে সবাই সাগর মন্থনে নেমেছে। কিছু ভীতু মানুষেরা জিজ্ঞেস করে যখন জানতে পারল পানির গভীরতা এখানে একেবারেই নেই তখন তাদেরকে এক একজনকে সম্রাটের মত মনে হল, তাদের চোখ মুখ ঝলকানি দিয়ে উঠল। কেউ মাছদের খাবার দিয়ে  জড়ো করেছে , কেউ সাঁতার কাটছে । এভাবে প্রকৃতির সাথে মানুষের মেলেমেশাটাকে অবাঁধ না হলে মানুষ এক বিপুল  আনন্দ থেকে বঞ্চিত  হয়। ওখানে পানির সচ্ছতা দেখে মন যেমন মুগ্ধ হয়েছে তেমনি নিজেকে অনেক বেশী মুক্ত মানুষ ভাবতে ইচ্ছে করেছে , যে মুক্তি আমার নেপথ্যে ফেলে আশা সংস্কৃতির মধ্যে কিঞ্চিৎ  ম্রিয়মান ছিল। এভাবে ত্রিশ মিনিট কি ভাবে কেটে গেল টের পেলামনা। কারণ আমাদের ত্রিশ মিনিটই বরাদ্দ ছিল। সকল বয়সের মানুষেরা আবার একে একে উঠে এল বোটের মধ্যে। আমাদের কাপড়  আমাদের শরীরেই শুকাল। ক্রমাগত আনন্দ ধারা সামনে নিয়ে চলল আমাদেরকে, আমরা ছুটতে ছুটতে একটা ছোট্ট দ্বীপে পৌঁছে গেলাম। দ্বীপটির  শুভ্র সৈকত এখনও মনের নির্জনে জেগে আছে। সেই সৈকতের রূপ যুগান্তরের মুগ্ধতাকে অতিক্রম করে গেছে । প্রকৃতি সম্পর্কে মানব গোষ্ঠী এবং তাদের পূর্ব পুরুষেরা যতটুকু ভাবতে পেরেছে তার চেয়েও যেন  সুন্দর  কোন দৃশ্য এখানে, অন্তত আমার মনে তেমনই একটা অনুভূতি এসে জুটেছে। রবি ঠাকুরের সেই গানটি আমার হৃদয়কে চঞ্চল করে তুলছে , ‘ওরে ওরে ওরে আমার মন মেতেছে/ তারে আজ থামায় কেরে।‘ এখানে এসে মনে  হল মন যেন মুক্ত ও সাবলীল। দিগন্তব্যাপী শুভ্রতার মধ্যে একটি দ্বীপ জেগে আছে যেন পরম তৃপ্তি নিয়ে। যে দ্বীপটি মানব সভ্যতার পদচারনায় অনেক বেশী মুখর ,  অনেক বেশী পরিপাটি । এখানে  প্রয়োজনীয়  সব ব্যবস্থাই রয়েছে। লাঞ্চ সেরে সমুদ্র সৈকতে নেমে পড়ল সবাই। যতদূর দৃষ্টি যায় শুভ্র রঙের বালুচর আর সঙ্গে সমুদ্রের সচ্ছ পানি। শুভ্র সমুদ্র সৈকতে যেন কী আনন্দে সকলে লুটোপুটি করছে আর সাথে সাথে ক্যমেরা ক্লিক ক্লিক করে চলেছে। কেউ সেলফি তুলছে , কেউ অন্যের সাহায্য নিচ্ছে , এভাবে আলোর গল্প , আনন্দের গল্প , মুক্তির গল্প , প্রকৃতির কাছে ছুটে যাওয়ার গল্প দিয়ে ভরে উঠল আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি। সমুদ্র থেকে যেন কুড়িয়ে আনা অজস্র স্ফূর্তির ঝিনুক মালা গেঁথে যাচ্ছে হৃদয়ের অন্তরালে বসে কে যেন , যাকে শুধু অনুভব করা যায় দেখা যায়না কখনও ।


নিউইয়র্কে এসে জানলাম, পুরুষরা নারীদের দিকে তাকায় না, নারীরাও পুরুষদের দিকে তাকায় না

বৃহস্পতিবার, ০৯ মার্চ ২০১৭

মনিজা রহমান : জানেন, ফেসবুকে কেউ যখন আমার ছবি দেখে ‘নাইস’ ‘সুন্দর লাগছে’ ‘দারুণ লাগছে’ লেখেন, আমার না খুব ভালো লাগে। আমি যেন আমার হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরে পাই। হাসবেন না প্লিজ। এটা একদম সত্যি। বাংলাদেশে থাকার সময় এসব নিয়ে মাথা ঘামাতাম না। কিন্তু নিউ ইয়র্কে আসার পরে প্রথম প্রথম মনে হতো আমার মতো কুৎসিত প্রাণী মনে হয় প্রথিবীতে নেই।
কারণটা কি? কেউ আমার দিকে তাকায় না। চোখে চোখ পড়ে না কারো। কেউ অপাঙ্গে দেখে নেয় না শরীরের মাপ। পাশ দিয়ে যাবার সময় মন্তব্য ছুঁড়ে দেয় না। কেমন যেন খালি খালি লাগতো। ভেবে উঠতে পারতাম না, কীভাবে আমি রাতারাতি এমন বিশ্রী হয়ে গেলাম। সেজে বের হই কিংবা না সেজে প্রতিক্রিয়া দেখি একইরকম। আয়নার সামনে অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে নিজেকে দেখতাম। উত্তর পেতাম না। হঠাৎ করে আমার চেহারায় এমন কি অধপতন হলো যে কেউ একবার ফিরে তাকানোর সময় পায় না।
শৈশব থেকে দেখে এসেছি, অতি স্বাভাবিক বলে জেনে এসেছি, পথেঘাটে বের হলে পুরুষ মানুষ তাকিয়ে থাকে মেয়েদের দিকে। সেই মেয়ে সুন্দর হোক আর অসুন্দর হোক! কেউ এক কাঠি সরস হয়ে মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়। কেউ কেউ তো আবার ভিড়ের মধ্যে অন্যরকম সুযোগ খোঁজে।  
বাসা থেকে বের হবো তো, প্রথমে দারোয়ান-ড্রাইভার দিয়ে শুরু হয়। তারপর একে একে রাস্তার মোড়ের পান-বিড়ি বিক্রেতা, সবজিওয়ালা, মাছওয়ালা, মুরগি বিক্রেতা, দোকানের কর্মচারী, মুচি, মেথর, রাস্তার ভিখিরি, সুটেড বুটেড ভদ্রলোক, কম বয়সী-বেশি বয়সী সবাই এক পলকের জন্য হলেও তাকাবেই তাকাবে। আমিও সেটা জানতাম। জানতাম বলেই অকারণে চোখ-মুখ শক্ত করে পথ চলতাম। এভাবে চোখ-মুখ শক্ত করে চলতে চলতে চেহারায় বলিরেখা পড়ে যায়। তবু তাদের দৃষ্টির লেহন থেকে মুক্তি নেই !

Picture
নিউ ইয়র্কে এসে জানলাম, পুরুষরা নারীদের দিকে তাকায় না। নারীরাও পুরুষদের দিকে তাকায় না। আসলে কেউ কারো দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করে না। সবাই সবাইকে নিয়ে ব্যস্ত। এমন ভাবার কারণ নেই, নিউ ইয়র্কে আমি যেখানে বাস করি,  সেখানে সবাই খুব উচ্চশিক্ষিত, অভিজাত সমপ্রদায়ের। আমাদের আশেপাশের প্রতিবেশীদের মধ্যে সাদা-কালো-এশিয়ান-স্প্যানিশ সবাই আছে।
এখানে স্প্যানিশ মানে স্পেনের নাগরিক নয়, মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের মানুষ, যারা স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে তাদেরকে বোঝায়। এরা প্রায় সবাই শ্রমিকশ্রেণির। শিক্ষাদীক্ষায় আমাদের চেয়ে পিছিয়ে। তবে নারীদের সম্মান করতে জানে। ভুলেও ফিরে তাকাবে না আপনার দিকে। আবার কোনো সাহায্য চাইলে নিজের কাজ বাদ দিয়ে  ছুটে আসবে।
এখানে যে কেউ কারো দিকে তাকায় না, সেটা বুঝতে আমার কেটে গেছে কয়েক মাস। মনে পড়েছে শৈশবে পড়া সেইসব কাহিনী। অনেক আগে যখন সেবা প্রকাশনীর ওয়েস্টার্ন বই পড়তাম, খুব অবাক হতাম। পাহাড়-বনভূমির মাঝখানে নির্জন প্রান্তরে এক বাড়িতে একা থাকছে একটা মেয়ে। সম্পূর্ণ একা। আউটল’রা হয়ত ওর বাবা কিংবা স্বামী অথবা ভাইকে হত্যা করেছে। কিন্তু ওর চুল পর্যন্ত স্পর্শ করেনি। আসলে নারীদের অপমান করা কিংবা গায়ে হাত তোলাকে তখন থেকেই মনে করা হতো চরম কাপুরুষোচিত কাজ। যেটা খুব খারাপ মানুষটিও করতো  না। ওই মূল্যবোধ এখনও রয়ে গেছে।
আপনি ভাবছেন পোশাকের কথা! আমার বাড়ির ডান দিকে রুজভেল্ট এভিনিউয়ের রাস্তায় সামারের সময় প্রায় অর্ধ উলঙ্গ নারীদের হাঁটতে দেখি। কেউ তাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। মাঝে মাঝে এমন সুন্দরীদের দেখি যে, তারা মিস ওয়ার্ল্ড কম্পিটিশনে অংশ নেবার মতো, তারা অনায়াসে টেক্কা দিতে পারে যে কোনো হলিউডের নায়িকাকে, তারাও দেখি উপেক্ষিত। কারো মাথাব্যথা নেই কে বিকিনি পরল আর কে বোরকা পরল সেই ভাবনায়।
আমি নিজেও কি অনায়াসে ট্রেনে উঠে দুইজন অপরিচিত পুরুষের মাঝখানের সিটে গিয়ে বসি। এমনকি মাঝে মাঝে ট্রেনের দুলুনিতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েও যাই। আমার পাশে কে বসেছে তার চেহারাটা দেখার প্রয়োজন বোধ করি না। অনেক রাতে নাটক দেখে একা বাড়ি ফিরি। নির্জন ফুটপাথ ধরে হাঁটি। একবিন্দু ভয় করে না।
জ্যাকসন হাইটসে অনেক বাঙালি মহিলা হিজাব করেন। সকালে এলাকার ফিটনেস সেন্টার গমগম করতে থাকে তাদের উপস্থিতিতে। ভিন্ন দেশের ভিন্ন সংস্কৃতির পুরুষদের পাশে তারা ট্রেডমিলে দৌড়ান। শরীরের ঘাম ঝরান। এক মুহূর্তের জন্য তাদের বিব্রত মনে হয় না। অথচ বাংলাদেশে থাকলে কি তারা পারতো এভাবে দেশি ভাইদের সঙ্গে একসঙ্গে জিম করতে !
কীভাবে পারবেন? সোহাগী জাহান তনুকে যারা ধর্ষণ করেছে, যারা তাকে হত্যা করেছে, তারা তো এদের  মধ্যেই আছে।  গিরগিটি যেভাবে ক্যামোফ্লেজ করে, সেভাবে কিছু অমানুষ রঙ পাল্টে মানুষ সেজে ঘুরে বেড়ায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি লালন-পালন করে তাদের। এই সব অমানুষ আর তাদের পৃষ্ঠপোষকতাদানকারীদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্টতম গালিটাও খুব সামান্য মনে হয়।
সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা।


প্রীতি ঘটে সন্নিকটে দুরেও বটে = মুক্তিযোদ্ধা কবি নিখিল কুমার রায়

বুধবার, ০৮ মার্চ ২০১৭

প্রেমে জাগে অভিলাষ প্রাপ্তি বসন্তে আভাস
স্থায়ী হয় আজীবন,
অন্তর দুয়ার খোলে, সুজনে পরাণ ভোলে
কাছে কিম্বা দুরে মন।
স্বীয় স্বার্থে প্রেমে খেলা, প্রীতি নিঃস্বার্থে উজালা।
দ্বিত্ব প্রাণ নিরন্তরে
স্বচ্ছ প্রেম ঘটে যদি, স্মরণীয় নিরবধী
ব্যাঘাতে বিবাগি করে।
নিত্য প্রেম সন্নিকটে, পরমাদ তবু ঘটে।
কিয়ৎ আপন হয়
যোজন দুরের প্রীতি, মুখচ্ছবি ভাসে নিতি
প্রকৃষ্ট প্রেমের জয়।
নিস্কামে মমত্ব বাড়ে, তনুর নোংরামী ছাড়ে
জাগ্রত প্রীতির দ্যুতি,
ত্যাগ ভোগ অকাতরে, দ্বৈত প্রাণ সমাদরে
জাগরণ অনুভূতি।
প্রীতি হিত কামনায়, যুগল জীবন চায়
অনন্ত কালের তরে
মরেও অমর হয়, চিরকালের সঞ্চয়
স্থায়ী হয় চরাচরে।
প্রতীতি বিরাজ করে, দীপ্যমান সরোবরে
কাঙ্খিত প্রীতির কর্ম
দুটি প্রাণে ভালোবাসা, চিরস্থায়ী করো খাসা
মানবতা হবে বর্ম।
ত্যাগী প্রেমিক অভাব, স্বচ্ছ প্রেমে সিদ্ধি লাভ
ইহকাল পরকালে
জাগতিক উত্তেজনা, অগ্রে যৌবন যোজনা
নব প্রজন্ম অকালে।
মতিতে রতির খেলা, তারুন্যে বেজায় ঠেলা
জীবন ভাটির টানে
কালের সাম্পান বাও, পদচিহ্ন রেখে যাও
প্রীতি লও প্রতিদানে।

কবি নিখিল কুমার রায়
সভাপতি, গাঙচিল সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ
৩৪-৩৫ ৭৪ ষ্ট্রিট, রুম# ৫-বি,
জ্যাকসন হাইটস, নিউইয়র্ক-১১৩৭২
ফোনঃ ৬৩১-২৯০-১০৪৫


মনোজগতে উপনিবেশ = মশিউর রহমান দিপু

বুধবার, ০১ মার্চ ২০১৭
বৃটিশ শাসনামলের মধ্যদিয়েই এই উপমহাদেশে ঔপনিবেশিকতার গোড়াপত্তন ঘটে। নানা প্রাকৃতিক ও ভূ–তাত্তিক সম্পদের কারণে এই উপমহাদেশ ব্যবসা–বাণিজ্যের অনুকূল ছিলো। আর তাই, ব্যবসা–বাণিজ্যের বিস্তার এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের লক্ষ্যে বৃটিশরা ভারতবর্ষে একটি ভিন্ন রাষ্ট্রীয় এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার প্রচলণ করে। ঔপনিবেশিক এই শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্যেশ্য ছিলো, এই দেশের ভেতরেই এমন এক শ্রেণি তৈরী করা যারা চেহারা, রক্তে ও বর্ণে  হবে খাঁটি ভারতীয় কিন্তু চিন্তা, মেধা এবং জ্ঞানে হবে বৃটিশদের দালাল। চাকুরে মানসিকতার শিক্ষিত হওয়া এই শ্রেণীটির একমাত্র কাজই হবে বৃটিশদের চাকর হওয়া। শিক্ষিত চাকর।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার রুপরেখাটি ছিলো বৃটিশদের শোষণের অন্যতম হাতিয়ার। এই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বৃটিশরা হন শাসনকর্তা এবং গোটা ভারতবর্ষ তাদের অধীনস্থ প্রজাশ্রেণি। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার ভেতর দিয়ে বের হয়ে আসা শিক্ষিত চাকুরে শ্রেণিটি বৃটিশরাজের বহুমুখি দাপ্তরিক কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।

তৎকালীন নানা আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে বৃটিশ রাজত্বের অবসান ঘটে। ভারত ভাগের মধ্য দিয়ে বাংলা নামের এই জনপদটি পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়, নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান। সেই একই ঔপনিবেশিক আইন, রাষ্ট্রীয় ও শিক্ষা ব্যবস্থা বলবত রেখে পাকিস্তানীরাও বৃটিশদের মতই শাসন শোষণ নীপিড়ন করতে থাকে। অবশেষে ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে।

একটি জাতি–রাষ্ট্রের জন্ম হল, নাম হলো মানচিত্র হলো, হলো না শুধু সেই বৃটিশদের রেখে যাওয়া আইন কানুন, রাষ্ট্রীয় ও শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন। আমরা স্বাধীন দেশ পেলাম কিন্তু স্বাধীন দেশউপযোগী, রাষ্ট্রীয় ও শিক্ষাব্যবস্থা পেলাম না। আর তাই একদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে সাধারণ জনগণের সম্পর্ক সেই বৃটিশ পাকিস্তানী শাসনামলের মতই রয়ে গেছে, অন্যদিকে সুদীর্ঘ সময় ধরে বয়ে চলা ঔপনিবেশকতার জীবানু সমাজের শিরা উপশিরা হয়ে প্রবেশ করেছে মনোজগতে।

মনোজগতে উপনিবেশ মানে হলো মনের জগত বা চিন্তার জগত দখল হয়ে যাওয়া। একটা জাতির চিন্তার জগত বেদখল হয়ে যাওয়ার পরিনাম ভয়াবহ। সম্মিলিত এই ঔপনিবেশিক মানসিকতা নিজস্ব ভাষা–সংস্কৃতির জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাড়ায়।

কিছুদিন আগে, ভারতীয় কোন এক টিভি সাংবাদিক বাংলাদেশের নামকরা কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাঙালী ছাত্র–ছাত্রীদের কিছু প্রশ্ন করেছিলেন যার জবাব তারা হিন্দীতে দিয়েছিলো। এমনকি আমাদের একজন মন্ত্রীকেও বেশ সাবলীল হিন্দীতে সাক্ষাতকার দিতে দেখা যায়। বিষয়টি হাস্যকর কিন্তু ভয়ংকর। ছোট–ছোট ছেলেমেয়েরা খেলাচ্ছলে হিন্দী বলছে, মা বাবা খুশি হচ্ছে। বাচ্চার এই অসাধারণ প্রতিভা বাসায় মেহমান এলে  তাদের দেখানো হচ্ছে, হাততালি দেয়া হচ্ছে। বাঙালীর উৎসবকে এখন উৎসব বলা হয় না, এর নাম এখন ফেস্ট। লোকসংগীত উৎসব–ফোক ফেস্ট, সাংস্কতিক উৎসব–কালচারাল ফেস্ট এমনকি সাহিত্য উৎসব হয়ে গেছে লিট ফেস্ট।

সবস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের দাবী থেকেই ২১ শে ফেব্রুয়ারীর জন্ম। এই দিনটি পৃথিবীময় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিনম্র শ্রদ্ধায় পালিত হচ্ছে প্রতিবছর। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাংলাভাষা এবং সংস্কৃতিকে প্রতিনিয়ত বিকৃত করা হচ্ছে। সেটা অন্য কেউ করছে না, করছি আমরাই। মনোজগতে ঔপনিবেশিকতার দরুন সেই বিকৃতি আমাদের চোখে পড়ছে না, আমাদের চিন্তার জগত দখল হয়ে গেছে।

বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের সম্পদ, আমাদের পরিচয়। যে ভাষা–সংস্কৃতির দাবিতে রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলো এদেশের জনগণ, আমাদের বুকে তাদের রক্তই বইছে। সুতরাং, একে রক্ষা করা, যত্ন করা আর বিকশিত করার দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে। নিজস্ব ভাষা–সংস্কৃতি সমুন্নত রাখতে, মনোজগত উপনিবেশবাদ মুক্ত করতে এবং স্বাধীন দেশোপযোগী রাষ্ট্রীয় ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে প্রত্যেক শ্রেণি–পেশার মানুষের সম্মিলিত মেধাবৃত্তিক চর্চা এবং ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আন্দোলন একান্ত প্রয়োজন।

লেখক : সংবাদকর্মী


অন্যায়, অযৌক্তিক

সোমবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

বিশ্ববাজারে তেলের দাম নামতে নামে তলানীতে ঠেকলেও বাংলাদেশের মানুষ সেই স্বাদ পায়নি। কম দামের কথা কেবল টেলিভিশনে দেখেছে বা খবরের কাগজে পড়েছে। সরকার জনগণের পকেট থেকে চড়া দাম আদায় করেছে এই তেলের। যুক্তি ছিল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বেড়েছে, তাই এ টাকা জনগণকেই দিতে হবে। এবার আবারও গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ, খনিজ ও জ্বালানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বারবার একটি কথাই বলার চেষ্টা করেন ভর্তুকি কমাতে তেলের দাম কমানো যাচ্ছে না, আর গ্যাসের দাম বাড়াতে হচ্ছে। এ আঘাত সইতে না সইতে জানতে হলো বিদ্যুতের দামও বাড়বে। জনগণকে পাত্তা না দিলে, সাধারণ মানুষকে কতটা অবজ্ঞা করলে, কতটা হেয় জ্ঞান করলে, সরকারের দিকে থেকে এমন ঘোষণা আসতে পারে!

গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুই চুলার জন্য মাসিক বিল ৮০০ টাকা (জুন থেকে ৯৫০ টাকা) এবং এক চুলার জন্য ৭৫০ টাকা (জুন থেকে ৯০০ টাকা) করা হয়েছে। এ ছাড়া সিএনজির দাম প্রতি ঘনমিটার ৩৫ থেকে বাড়িয়ে ৩৮ টাকা (জুনে ৪০) করা হয়েছে। এর আগে আবাসিকসহ কয়েকটি শ্রেণির গ্রাহকের গ্যাসের দুই চুলার বিল ৪৫০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫০ টাকা এবং এক চুলার বিল ৪০০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি বলে একটি সংস্থা আছে। এ সংস্থা কাগজে কলমে একটি স্বাধীন সংস্থা। কার্যত এ কমিশন গণশুনানির মাধ্যমে জনগণ ও অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে সুপারিশ করবে জ্বালানির মূল্য। কিন্তু শুনানি যা-ই হোক, বিইআরসি কাজ করে সরকারের আজ্ঞাবহ হয়েই, জনস্বার্থের সামান্য ভাবনাও থাকে না এর কোনো সিদ্ধান্তে। বিইআরসি আইন, ২০০৩ অনুযায়ী কোনো সংস্থা এক বছরের মধ্যে দু’বার দাম বাড়ানোর আবেদন করতে পারে না। গ্যাসের দামতো বাড়ানোই হলো, সেইসাথে কমিশন ও প্রতিমন্ত্রীর গলা থেকে উচ্চারিত হচ্ছে অদ্ভুত সব যুক্তি যা মানুষকে আরো জ্বালা দিচ্ছে।

অন্যায়, অযৌক্তিক

ভর্তুকির কথা বলে দাম বাড়ানোর সোজা পথে হাঁটছে সরকার। সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বানিয়ে, এদের লাভ হাজারগুণ বাড়িয়েও জনগণের পকেটের দিকে হাত বাড়ালো সরকার। দুর্মূল্যের এ বাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ কীভাবে চলবে তার সামান্য ভাবনাও নেই নীতি নির্ধারকদের।

ভর্তুকি কমানোর নামে সরকার দাম বাড়ায় আর এনার্জি কমিশন তাতে উচ্চ গলায় সায় দেয়। কমিশন যদি স্বাধীনভাবে কোনো সিদ্ধান্তের কথা ভাবনার মধ্যে আনতে না পারে তাহলে প্রয়োজন কী এর? সরাসরি মন্ত্রণালয়ই সবকিছু করুক। দুর্নীতি ও অদক্ষতা কমিয়ে, সিস্টেম লস দূর করে সরকারের আয় বাড়ানোর সুযোগ আছে। কিন্তু সে কথা ভাবা হচ্ছে না।

এ দাম বাড়ার কারণে বরাবরের মতো এবারও গণপরিবহনে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। যতটুকু দাম বেড়েছে তার কয়েকগুণ বেশি পরিবহন ভাড়া বাড়বে। অনেক হাকডাক দিবেন সেতুমন্ত্রী। কিন্তু শেষ পর্যন্তু কিছুই তিনি করতে পারবেন না। সবই জনগণকে সইতে হবে।

গ্যাসের দাম বাড়ায় শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। ফলে একদিকে লোকসানের মুখে পড়া শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ায় সামগ্রিকভাবে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বে দেশের স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিলগুলো। উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম দামে সুতা ও কাপড় বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় বস্ত্র খাত নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন অনেকে।

রাজধানী ঢাকাসহ অনেক জায়গায় বাসাবাড়িতে নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না সরকার। দিনের পর দিন গ্যাস না পেয়ে কষ্টে দিন কাটা্ছে বহু পরিবার। এখন গ্যাস না পেয়েও বাড়তি দম দিতে এসব মানুষকে।

সরকার বলছে এলএনজির দামের সঙ্গে সমন্বয় করতেই মূলত গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে। তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু হবে ২০১৮ সালে। তার মানে কমপক্ষে আড়াই বছর পর জাতীয় গ্রিডে উচ্চমূল্যের এ গ্যাস যুক্ত হবে। তার অর্থ হলো যে গ্যাস ২০১৮ সালে আসবে, মানুষকে বাধ্য করা হচ্ছে আড়াই বছর আগে থেকেই তার দাম দিতে।

সাধারণ মানুষ চাইবে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমুক, নতুন নতুন চাকরির ক্ষেত্র তৈরি হোক, আয়করের পরিমাণ কমুক। শিল্পমহল চাইবে, করের হার যেন না বাড়ানো হয়, বিনিয়োগ যেন বাধাগ্রস্ত না হয়। কিন্তু সব চাওয়াকে অগ্রাহ্য করে নসরুল হামিদরা শুধু জানেন কীভাবে মানুষের পকেট থেকে টাকা বের করে নিতে হয়। জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার এতটুকু ভাবনা কোথাও নেই।

গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা এখন ছিল না। নসরুল হামিদ ভর্তুকি কমাতে দাম বাড়ানোর কথা বলেছেন। অথচ গ্যাসের ক্ষেত্রে সরকার কোনো ভর্তুকিই দেয় না। প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন, সঞ্চালন ও বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর কোনোটাই লোকসান গুণছে না, বরং তাদের কাছে মোট প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা রয়েছে, যা এ খাতের উন্নয়নে কাজে লাগানো হচ্ছে না। সরকার যদি সত্যি জনগণের কথা সামান্যটুকু ভাবতো তাহলে সব ধরনের জ্বালানির দাম সমন্বয় করার কথা চিন্তা করতো। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম কমানো বা বাড়ানো হলে আজ তেলের দাম কম থাকতো, তখন গ্যাসের দাম বাড়ানো কিছুটা হলেও যৌক্তিকতা পেতো।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা- পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি


অন্ধকারে জোনাকী নিউ ইয়র্কের অদ্ভুত ভিক্ষুক

সোমবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৭
মনিজা রহমান : নিউইয়র্ক থেকে : নিউ ইয়র্কের এই ভিক্ষুকদের মতো এমন সুখী সুখী চেহারার ভিক্ষুক মনে হয় পৃথিবীতে কোথাও মিলবে না। তদুপরি এমন সুন্দর চেহারাও। ভিক্ষুকদের চেহারায় যেমন একটা আরোপিত দুঃখী ভাব থাকে, তাদের অবয়বে তার সামান্যতম লেশ নেই। চেহারার মধ্যে কেমন বেপরোয়া, নির্লজ্জ ভাব। কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জন্য মনে হবে চাঁদা চাইতে নেমেছে তারা।

জ্যাকসন হাইটসের সেভেন্টি ফোর স্ট্রিটে কিছুকাল ধরে এই ধরনের ভিক্ষুকদের উৎপাত বেড়েছে। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গেলে তারা একটা কাগজের ঠোঙ্গা জাতীয় জিনিস সামনে এনে ধরে। মানে ডলার দাও। কেউ কেউ শিশুদের নিয়ে এসে তাদের দেখিয়ে ভিক্ষা চায়। ভিক্ষায় প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খায়। চিপস খায়। বেশ একটা পিকনিক ভাব!
সেদিন জ্যাকসন হাইটসের সেভেন্টি ফাইভ স্ট্রিটে এক রেস্টুরেন্টে বসে স্যুপ খাচ্ছি, দেখি একদল ভিক্ষুক এসে হাজির। তারা টেবিলে টেবিলে গিয়ে ভিক্ষা চাইছে।
নিউ ইয়র্কের সাধারণ ভিক্ষুকরা কিন্তু এমন না! ট্রেনে এসে কেউ কেউ বেশ তেজদ্বীপ্ত বক্তৃতা দেয়। তারপর ভিক্ষা চায়। বেশির ভাগ রাস্তায় ‘হোমলেস’ ‘হাংরি’ এসব লিখে উদাস-নির্লিপ্ত চেহারা নিয়ে বসে থাকে। এই ভিক্ষুকদের শিকড় কোথায় এই নিয়ে নানাজনে নানা কথা বলে! কেউ বলে, ওরা নিউজার্সি থেকে দামি গাড়ি হাঁকিয়ে আসে। মিশরীয় এসব পরিবারের একটা ব্যবসা হলো ভিক্ষা করা। অনেকে বলে, সিরিয়ান উদ্বাস্তু। একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, বাড়ি কোথায়? ও বলল, ‘বুলগেরিয়া’।

Picture
বসনিয়া, সারাইয়েভা, কসোবা, আলবেনিয়ানদের ভিক্ষাবৃত্তি নিয়ে বললো, সেদিন আমার এক পরিচিত জ্ঞানী মানুষ খাইরুল আনাম। তিনি জানালেন, নারী-পুরুষ ভেদে ওই অঞ্চলের সব মানুষ দেখতে খুব সুন্দর হয়। আমেরিকার মিডওয়েস্টে প্রায় সব মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় কিছু ভিক্ষুকদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কয়েক বছর আগে এক মিটিং শেষ করে বের হয়ে দেখি এক সুন্দরী তরুণী ভিক্ষা চাইছে। আমাদের মধ্যে একজন ওকে বাসায় কাজের প্রস্তাব দিল। কিন্তু মেয়েটি ওর কথায় কানই দিল না। কয়েক পা সরে গিয়ে আবার সে ভিক্ষা চাইতে লাগলো। এই ভিক্ষুকদের দেখে মনে হবে না এদের ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়েছে।’ আসলে এদের স্বভাবটাই এরকম। হতে পারে ওরা যেসব এলাকা থেকে এসেছে, তারা শিক্ষাদীক্ষায় পিছিয়ে, বিশেষ করে নারীশিক্ষার কোন প্রসার নেই, স্বামীরা হয়তো যুদ্ধে মারা গেছে, সেটা দেশকে ভালোবেসে হোক কিংবা গাদ্দারি করেই হোক, তারপর থেকে ওরা হয়তো উদ্বাস্তু, একটা মেয়াদ পার হওয়ার পরে ওরা হয়তো আর কোনো সাহায্য পাচ্ছে না। তাই তারা হয়তো ভিক্ষা করে। চাকরি করে না, কারণ সেটা করার যোগ্যতা কিংবা মনোবৃত্তি ওদের নেই।
ওরা ভিক্ষা করাটাকে একটা চাকরি মনে করে।
পরিচয় যা-ই হোক, ওদের ভিক্ষা করার ধরণটা খুব বিরক্তিকর। যে দেশে কাজের কোনো অভাব নেই, সেখানে এমন সুখী সুখী, স্বাস্থ্যবান মানুষদের ভিক্ষা করতে দেখলে মেজাজ তো খারাপ হবেই।
আমি যখন খুব ভোরে ছোট ছেলেকে স্কুল বাসে দিতে বাড়ির নিচে নামি, একটা চীনা বয়স্ক মহিলাকে প্রায় প্রতিদিন রাস্তায় দেখি। সে ফুটপাতে রাখা ময়লার ব্যাগ থেকে পানির বোতল টোকায়। তারপর সেই বোতলে গ্লু দিয়ে স্টিকার লাগায়। কি পরম ধৈর্যের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কাজটা করে যায় ওই বৃদ্ধা, দেখে খুব অবাক লাগে। জানি না, ওই পুরনো বোতল বিক্রি করে সে কয় সেন্ট আয় করে!
কাজটা খুব নোংরা, নিম্ন প্রকৃতির… তবু কাজ তো কাজই! ভিক্ষা তো সে করে না।


আবদুল্লাহ জাহিদের “নির্বাসিত ভালবাসা” একুশের বইমেলায় পাওয়া যাচ্ছে

সোমবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

বাপ্ নিউজ : আবদুল্লাহ জাহিদের “নির্বাসিত ভালবাসা” একুশের বইমেলায় পাওয়া যাচ্ছে। আবদুল্লাহ জাহিদের জন্ম ময়মনসিংহে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহ থেকে ফিসাারজ এ অনার্স। সিটি ইউনিভারসিটি অফ নিউ ইয়র্ক থেকে লাইবব্রেরি এন্ড ইনফমেশন সায়েন্সে মাসটার্স। বর্তমানে নিউ ইয়র্কের কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরিতে ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত। দেশে এবং প্রবাসের পত্রপত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন। সাপ্তাহিক যায়যায়দিন এর নিয়মতি কলামিষ্ট ছিলেন। ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবের আজীবন সদস্য।

আবদুল্লাহ জাহিদের “নির্বাসিত ভালবাসা” একুশের বইমেলায় পাওয়া যাচ্ছে  

গল্পগুলিতে প্রবাসী জীবনের নানা চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রবাসীরা যত দূরেই থাকুক তাদের মন পরে রয় দেশে বেড়ে উঠা সেই নদীর তীরে— যার আলো বাতাস গায়ে মেখে সে বড় হয়েছে। এই বইয়ে সংকলিত ছোট গল্পগুলির বেশির ভাগই প্রবাসীদের দু:খ সুখের নানা ঘটনা নিয়ে লেখা। গল্পগুলির সব চরিত্রই কাল্পনিক। প্রকাশক: ভাষাচিত্র। বইটি মেলায় স্টল নং ৬১০ এবং ৬১১ তে পাওয়া যাচ্ছে।


একুশের সেক্স অ্যাপিল ও দুটি অশ্লীল সত্য ঘটনা

বুধবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

কদিন আগেই চোখে পড়লো এক অতি মজার জিনিস। আমাদের সময় নামক এক দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়েছে "একুশের রান্না"! আমি অনেকক্ষণ ব্যাপারটির দিকে তাকিয়ে রইলাম, বুঝতে চেষ্টা করলাম যে রন্ধনশিল্পী মূলত একুশের খাবার-দাবার নাম দিয়ে কী পরিবেশন করতে চাইছেন। ভদ্রমহিলার নাম আমি আগে কখনো শুনিনি, সেদিনই প্রথম। এবং বলাই বাহুল্য যে প্রথম অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর ছিল না! যাই হোক, খাবারের আয়োজনে কী কী ছিল বলি-

 একটা কেক, যাতে কিনা সাদা ক্রিমের ওপরে স্থানে স্থানে রক্তের ছোপ ছোপ দেয়া। দুটি চোখ আছে, সেগুলো দিয়ে রক্ত বিন্দু ঝরছে! সব মিলিয়ে অতি ভয়াবহ অবস্থা। রক্তের ছোপ ছোপ দেয়া কিংবা কান্নারত দুটি চোখের ছবি দেয়া কেক মানুষ কীভাবে কেটে খাবে বা কীভাবে রুচিতে কুলাবে, সেটা আমার কাছে বিরাট প্রশ্ন হয়ে রইলো। আয়োজনে আরও ছিল ভুনা খিচুড়ি, ইলিশের একটা রান্না এবং সুইস রোল। কেক এবং সুইস রোল যে বাঙালি খাবার, সেটাও আমি ওই পত্রিকা থেকেই প্রথম জানতে পারলাম! আমি বিগত কয়েকমাসে এই খাবারগুলোর চাইতে রুচিহীন আর কিছু দেখেছি বলে মনে পড়ছে না!
অবশ্য, এদেরকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আজকাল আমাদের দেশে সবকিছুই উৎসব। বলা ভালো যে ডেটিং করার বা সেলফি দেয়ার, বিভিন্ন স্থানে চেক ইন দেয়ার একটা বাহানা কেবল! এমনকি, লোকজন নাকি আজকাল বই মেলাতেও যায় চেকিং আর সেলফি দিতে, বই কেনে না কিছুই। এদের অত্যাচারে বরং আসল পাঠকেরাই অস্থির! এই চেক ইন আর সেলফি তোলা জাতির জন্য একুশে ফেব্রুয়ারিও যে একটা উৎসব বিশেষ, সেটা মোটেও বলার অপেক্ষা রাখে না। বেশ কয়েক বছর ধরেই একুশের সাজ নামে কিছু জিনিস পত্রিকায় ফ্যাশন পাতাগুলোয় দেখতে পাওয়া যায়।বিগত বছরগুলোতে দেখা যেতো বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজের বর্ণমালা লেখা শাড়ি-জামা কিংবা বাচ্চাদের জন্য পোশাক। বেশ রুচিশীল ভাবে পরা, বেশ রুচিশীল ভাবে লেখাও। যদিও একুশে ফেব্রুয়ারি যে নতুন পোশাক পরে আনন্দ করার দিন না, দিনটি আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস হলেও ইতিহাসের কারণেই যে বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে পালন করা উচিত- সেটা এই দেশের বেশীরভাগ মানুষের মাথায় কখনোই ঢোকেনি। অন্যান্য সকল দিবসের মত এটাও খুব আনন্দের একটা দিবস এই দেশে। রাঁধুনিরা রান্নার রেসিপি দেয়, ফ্যাশন হাউজগুলো নতুন কালেকশন আনে, ফোন আর ইন্টারনেট কোম্পানি নতুন অফার আনে, মানুষজন সেজেগুজে বেড়াতে যায় আর সেলফি তোলে, পত্রিকায় ছাপা হয় একুশের সাজসজ্জা বিষয়ক পরামর্শ...
 
অবশ্য আজকাল যা দেখতে পাই সেগুলোকে সাজ বলার চাইতে বরং একুশের যৌন আবেদন বলাই ভালো। ২/১ বছর আগেই একটি পত্রিকা "একুশের সাজ" নামে একটি আয়োজন করে বেশ বিতর্কিত হয়েছিল (ছবিটি প্রচ্ছদের দেখতে পাবেন)। তবে পরিস্থিতির যে পরিবর্তন হয়েছে, সেটা কিন্তু নয়। কালই দেখলাম অত্যন্ত স্বনামধন্য এক নায়িকা "একুশের পোশাক" পরিধান করে মারাত্মক যৌন উত্তেজক ভঙ্গিতে পোজ দিয়েছেন। একুশের পোশাক ও ভাবগাম্ভীর্য কেমন হওয়া উচিত সেটার একটা জ্বলন্ত উদাহরণই বটে! অবশ্য আমরা সেই জাতি, যাদেরকে বারবার অনুরোধ করতে হয় জুতো পায়ে শহীদ মিনারে না ওঠার জন্য। আমাদের কাছ থেকে তো যৌন উত্তেজক ভঙ্গিতে একুশের সাজ, অশ্রুঝরা চোখের ছবি দেয়া কেক, শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে সেলফি ইত্যাদির বাইরে আর বেশি কিছু আশা করা যায় না। তাই না?

Picture

 
এবং দুটি অশ্লীল সত্য ঘটনা-
আজ আমার আম্মুর জন্মদিন (যদিও একুশে ফেব্রুয়ারিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সেটা আমরা আগামীকাল পালন করবো)। মায়ের জন্য শুভেচ্ছা উপহার কিছু কেনা যায় কিনা ভেবে একটি নামকরা ফ্যাশন হাউজে ঢুকেছি। বলাই বাহুল্য যে সেখানে অনেক রকমের "নতুন কালেকশন" আছে! দুটি মেয়ে শপিং করছেন। মেয়ে মানে কিশোরী নন, ২৭/২৮ বছরের তরুণী। গলায় অফিসের আইডি কার্ড ঝোলানো। তাঁদের কথোপকথন যেটুকু শুনতে পেয়েছি, তুলে দিলাম এখানে। বাকিটা পাঠকের বিবেচনা-
 
-"ওই শাড়িটা পরবি না কেন, সমস্যা কী? ব্লাউজ বানায় ফেলসিস না?"
-"শাড়িটা বেশি ভারী। অনেক মোটা। ছবিতে আমাকে মোটা মনে হবে।"
-"এখন তো নতুন ব্লাউজ বানানোর টাইম নাই!"
-"নতুন বানাবো না, ওই ব্লাউজের সাথে ম্যাচিং করে একটা শাড়ি নিয়ে নিব। কালকে ওর সাথে আমার প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারি। আই হ্যাভ টু লুক হট!'
এই পর্যায়ে আমি একটু ভিরমি খেলাম।প্রেমিক বা স্বামীর সাথে প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারি ভালো কথা, কিন্তু হট দেখাতে হবে কেন???
-"তাহলে অন্য রঙের শাড়ি নিতি। কালো আর সাদাতে বুড়ি বুড়ি লাগে।"
-"ধুর, সাদা-কালোই একুশে ফেব্রুয়ারির ট্রেন্ড, সবাই পরবে। তুই আমাকে ভালো দেখে একটা শাড়ি বেছে দে। পাতলা দেখে। সি থ্রু শাড়িতে আমাকে স্লিম লাগে।"
-"এদের কাছে মনে হয় পাতলা শাড়ি নাই, অন্য কোথাও যাবি?"
-"চল। নেইল পলিশও কেনা হয় নাই। একটা ক্রিমসন রেড কালারের লিপস্টিক লাগবে, ওর সব ফ্রেন্ডরা কালকে দেখবে আমাকে...পারফেক্ট লুক না হলে ও খুব মাইন্ড করবে।প্রেস্টিজ ইস্যু!"
 
জানিনা কেন, দোকানের মাঝে দাঁড়িয়েই আমার কেমন বমি বমি পাচ্ছিল! আমাদের মেয়েরা কি আজীবনই এমন নির্বোধ ছিল, নাকি এরা নতুন সংস্করণ? সে সাহসী, দুর্বিনীত, শিক্ষিত, রুচিশীল বাঙালি নারীরা কোথায়? আমাদের মা, খালা, বড় বোনদের যেমন দেখেছি... সেই দারুণ বাঙালি মেয়েরা কোথায়? আজকালকার বাঙালি নারীরা কেন সানি লিওন সাজতে না পেরে বিমর্ষ হয়, একুশে ফেব্রুয়ারির ভাবগাম্ভীর্যের নামে যৌন উত্তেজক পোজ দেয় আর পত্রিকার পাতায় একুশের রেসিপি ছাপে? কেন?!!!
 
উত্তর মিলল না, কিন্তু রাতের বেলা দেখলাম আরও একটি আঘাত লাগার মত বিষয়। ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গিয়েছে একটি ভিডিও, সেটি। ভদ্রমহিলাকে আজ পর্যন্ত আমি খুবই পছন্দ করতাম, সঙ্গত কারণেই নামটি বলছি না। একজন নামকরা অভিনেত্রী, ক্যামেরার সামনে শহীদ মিনারে জুতো নিয়ে ওঠা বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। পারিবারিক শিক্ষা নেই বলেই এমন হচ্ছে মন্তব্য তাঁর। খানিক বাদেই দেখা গেলো তিনি নিজেই জুতো পায়ে শীদ মিনারে হাঁটাহাঁটি করছেন! জানি না কেন, আমি ভীষণ অপমানিত বোধ করতে শুরু করলাম। অপমানে, লজ্জায় নীল হয়ে যেতে থাকলাম।
 
কোন একটা অজ্ঞাত কারণে, একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে যত নির্বুদ্ধিতা ও কুৎসিত ব্যাপার চোখে পড়েছে, সবগুলোর সাথেই নারীরা জড়িত। আঁচল একদিকে সরিয়ে যৌন উত্তেজক পোজ হোক, রেসিপি দেয়া হোক বা ক্যামেরার সামনে জ্ঞানের কথা বলে নিজেই সেই অসভ্য আচরণ করা... যা চোখে পড়েছে সবই নারীকেন্দ্রিক। এই লেখাটি লিখতে লিখতে আমি নিউজফিডে আমজনতার সেলফি দেখছি। চড়া মেকআপ নিয়ে প্রেমিক প্রেমিকার হাত ধরে বেড়াতে যাওয়ার সেলফি তো আছেই, শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে ফুল হাতে ধরা সেলফিও দেখলাম এক ছেলে ও তার প্রেমিকার। সাথে লেখা- "গাইজ, আমরা চলে এসেছি। একটু পরই ফুল দিতে যাচ্ছি। রেসপেক্ট!" প্রেমিকার হাতে ফুল, প্রেমিক ভি সাইন দেখাচ্ছে।
 
বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসাবে আমি কুৎসিত রকমের লজ্জিত বোধ করছি। আমাদের রাষ্ট্রভাষাটি মনে হয় উর্দু হওয়াই উচিত ছিল। তাহলে হয়তো এত খারাপ লাগতো না...
 
পরিশিষ্ট-
লেখার শেষে একটু আত্মবিজ্ঞাপন করি। একুশে গ্রন্থমেলায় এই অধমের তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে এবার।
 
অবলৌকিক- বিদ্যা প্রকাশ (স্টল নং ৩৭০-৩৭১-৩৭২)
প্রিয় সম্পর্ক- জাগৃতি প্রকাশনী (স্টল নং ১৫৮-১৫৯-১৬০)
পুনঃশায়াতিন- জাগৃতি প্রকাশনী (স্টল নং ১৫৮-১৫৯-১৬০)
এছাড়া বাসায় বসে বই হোম ডেলিভারি পেতে চাইলে কল করতে পারেন রকমারি ডট কমে। নম্বর- 16297
 
এবং একটি বিনীত অনুরোধ-
কেবল সেলফি তোলার জন্য বইমেলায় যাবেন না, প্লিজ। এতে পাঠক ও লেখক হিসাবে আমরা অপমানিত বোধ করি। কেবল বইয়ের সাথে সেলফি তুললেই জ্ঞানী হওয়া যায় না, জ্ঞানী হবার জন্য বই পড়তে হয়!
 
২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭
 

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।


ভোটের রাজনীতি সম্পর্কে কিছু কথা - আবুল কাসেম ফজলুল হক

সোমবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

যখন যুক্তরাষ্ট্রে রোনাল্ড রিগ্যান রাষ্ট্রপতি এবং যুক্তরাজ্যে মার্গারেট থ্যাচার প্রধানমন্ত্রী তখন তাঁদের উদ্যোগে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার পুনর্গঠনের কিছু আয়োজন দেখা যায়। তাঁরা বিশ্বপরিসরে মুক্তবাজার অর্থনীতি, অবাধ প্রতিযোগিতাবাদ, ‘উদার’ গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ (pluralism), এককেন্দ্রিকতাবাদ (unipolerism), নারীবাদ, মৌলবাদ-বিরোধিতা, এনজিও, সিএসও (Civil Society organization) ইত্যাদির ঘোষণা দেন এবং বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, জাতিসংঘ ইত্যাদির মাধ্যমে এগুলোর বাস্তবায়ন আরম্ভ করেন। সেটি আশির দশকের ঘটনা। তথ্য-প্রযুক্তি ও জীবপ্রযুক্তির বিপ্লব তখন আরম্ভ হয়েছে মাত্র। পশ্চিমা অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ তখন নতুন প্রযুক্তির বিস্তার দেখে বিশ্বায়ন (Globalization) কথাটি ব্যবহার করতে আরম্ভ করেছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলোপ যে আসন্ন, এটা তখন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য বুঝে ফেলেছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। এর আগে ও পরে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে এবং সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা পুনর্গঠিত হয়ে চলে।

আমাদের দেশের রাজনীতিতে তখন মৌলিক পরিবর্তন ঘটে যেতে থাকে। যাঁরা মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থী বলে পরিচিত ছিলেন, কার্যত তাঁরা কোনো ঘোষণা না দিয়ে ওয়াশিংটনপন্থী হয়ে যান। মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন, নারীবাদী আন্দোলন, পরিবেশবাদী আন্দোলন ইত্যাদিতে তাঁরা মেতে ওঠেন এবং এনজিও, সিএসও ইত্যাদিতে নিজেদের সমর্পণ করেন। সাম্রাজ্যবাদের অনুসারী হয়ে কার্যত তাঁরা না সমাজতন্ত্রী, না গণতন্ত্রী হয়ে যান। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তখন তাদের দলীয় ঘোষণাপত্র পরিবর্তন করে মুক্তবাজার অর্থনীতি ইত্যাদি ঘোষণাপত্রে গ্রহণ করে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের অন্ধ অনুসারী হয়ে যায়। দুটি দলই তখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেদের এতটাই সমর্পণ করে যে ক্ষমতার স্বার্থে তারা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের স্থানীয় দূতাবাসগুলোতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্কে ক্রমাগত ধরনা দিতে থাকে। বামপন্থীরা তখন এ নিয়ে টুঁ শব্দটিও করেননি। এর মধ্যে এনজিও এবং সিএসও মহলের অঘোষিত প্ররোচনায় পরিচালিত হয়ে জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনকালীন অরাজনৈতিক, নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন করা হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে এবং ভারতকে ডেকে আনা হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এই রাজনীতি কি গণতান্ত্রিক? সমাজতান্ত্রিক? দুই দলের নেতারাই জনসমক্ষে সব সময় উদার গণতন্ত্র কথাটা আওড়িয়ে থাকেন। সেই ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি কি গণতন্ত্রের দিকে এগিয়েছে? সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা অবলম্বন করে চলছে? বাংলাদেশের রাজনীতি ও শিক্ষানীতি কি সংবিধান নির্দেশিত পথে চলছে? বাংলাদেশের রাজনীতিতে একমাত্র যে নীতি কার্যকর আছে, তা কি নিছক সুবিধাবাদী নয়? ইসলামপন্থী দলগুলো কি ইসলাম অবলম্বন করে চলছে?

এখন বাংলাদেশে ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কিছু কথাবার্তা চলছে। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে নানা আয়োজন দেখা গেছে। নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। তা নিয়েও দুই পক্ষে দুই মত দেখা যাচ্ছে। আসলে এসব আলোচনায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা আগ্রহী। এনজিও এবং সিএসও আগ্রহী। প্রচারমাধ্যম আগ্রহী। জনসাধারণ যে এগুলোতে আগ্রহী, তা আমার মনে হয় না। জনগণ রাজনীতি ও রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা হারিয়ে ফেলেছে। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে প্রকৃতপক্ষে রাজনীতি নেই। কেবল দলাদলি আছে। বৃহৎ শক্তিবর্গের বিরাজনৈতিকীকরণের নীতি বাংলাদেশে খুব কার্যকর হয়েছে। জনগণের কথাবার্তায়—গ্রামে ও শহরে—শোনা যায়, ‘দেশে শেখ হাসিনা ছাড়া আর কোনো নেতা নেই আর আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দল নেই। …’ জনগণের কথাবার্তা শুনলে মনে হয়, জাতীয় সংসদের আগামী নির্বাচনে অবশ্যই আওয়ামী লীগ বিরাট সংখ্যাধিক্য নিয়ে জয়ী হবে। এই অবস্থায় নির্বাচনকে খুব বেশি জাঁকজমকপূর্ণ ও ব্যয়বহুল না করাই বাঞ্ছনীয়।

alt  

নির্বাচন যেভাবে হয়ে আসছে, তাতে নির্বাচন নিয়ে জনগণের উন্মত্ত হয়ে ওঠার কোনো কারণ নেই। নির্বাচন দিয়ে কি সব সময় গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়? নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রবিরোধী, গণবিরোধী শক্তি ক্ষমতায় আসে—এমন দৃষ্টান্তও অনেক আছে। হিটলার অসাধারণ জনপ্রিয় ও নির্বাচিত ছিলেন। মুসোলিনি অসাধারণ জনপ্রিয় ও নির্বাচিত ছিলেন। সালাজার, ফ্রাংকে—এমন আরো অনেক বিখ্যাত শাসকের নির্বাচিত হওয়ার কথা বলা যায়। নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র হয় না, নির্বাচিত হলেই কোনো ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক হয় না। নির্বাচন আর গণতন্ত্র এক না।

বাংলাদেশে ভুল ধারণা প্রচলিত হয়েছে যে নির্বাচনই গণতন্ত্র। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব আছে, পরিবারতান্ত্রিক শাসনপদ্ধতি আছে, নির্বাচনের নামে আজব সব কর্মকাণ্ড আছে। সর্বত্র দুর্নীতি আছে। বাংলাদেশের চলমান ঐতিহাসিক প্রবণতা গণতন্ত্রের দিকে নয়। গণতন্ত্রের জন্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল অপরিহার্য।

নারীর ক্ষমতায়ন বাংলাদেশে চলছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধী দলের নেতা, রাজনৈতিক দলের প্রধান, প্রশাসনব্যবস্থার উচ্চপর্যায়, হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইত্যাদি অবস্থানে নারীরা আছেন। নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে। কিন্তু সমাজের স্তরে স্তরে নারী নির্যাতন বাড়ছে। নারী হত্যা বেড়ে চলছে। স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক ও পরিবার শিথিল হচ্ছে। নারী ও পুরুষ উভয়েরই অশান্তি বাড়ছে। শিশুহত্যা বেড়ে চলছে। মানুষের নৈতিক পতন বাড়ছে। সমাজে স্তরে স্তরে কিছু লোক সীমাহীন জুলুম-জবরদস্তি চালাচ্ছে। জুলুম-জবরদস্তি বাড়ছে। ২০১৯ সালে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর জুলুম-জবরদস্তির গতি আরো বাড়তে পারে। সরকারি অফিসে দুর্নীতি বাড়ছে। সাধারণ মানুষ মনোবলহারা—অসহায়। কোনো কিছু নিয়েই তাদের কোনো অভিযোগ নেই। রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-বাদলকে যেমন লোকে মেনে নেয়, তেমনি জুলুম-জবরদস্তিকেও লোকে মেনে নিচ্ছে। কোনো রাষ্ট্রের জনজীবনে এই মনোবলহারা অবস্থাই সেই রাষ্ট্রের দুর্গতির চরম পর্যায়। কিন্তু এ সম্পর্কে রাজনৈতিক মহলে কোনো সচেতনতা খুঁজে পাওয়া যায় না। সরকার মনে করছে, সরকার সব কিছু ঠিক করছে—সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বুদ্ধিজীবীদের প্রধান অংশ এনজিও এবং সিএসওতে ব্যস্ত। কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে গভীরতর কোনো জীবনবোধের পরিচয় নেই। এর সঙ্গে সুস্থ, স্বাভাবিক, গভীর চিন্তা কিছু আছে। কিন্তু সেগুলো প্রচারমাধ্যমে গুরুত্ব পায় না, শিক্ষিত সমাজও সেগুলোর প্রতি আকর্ষণ বোধ করে না। অন্ধকারকে অন্ধকার মনে না করে সবাই নিশ্চিন্ত আছে।

সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নিয়ে চলছে সবাই। ক্লিনটন-হিলারি-ওবামার নীতির প্রতি যাঁদের অন্ধ আস্থা ছিল, তাঁরা ট্রাম্পের উত্থানে বিচলিত হয়েছেন। ট্রাম্প কী করবেন, করতে পারবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ভালো কিছু হবে, তা মনে হয় না। ট্রাম্প বলছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উন্নতির জন্য কাজ করবেন, অনুন্নত রাষ্ট্রের উন্নয়নের দায়িত্ব তিনি নেবেন না। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি নারীবাদে আস্থাশীল নন, তিনি হিউম্যানিজমে বিশ্বাস করেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ করে দেবেন। তিনি Armed Islamic Fundamentalist-দের বিরুদ্ধে কঠোরতর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এমনই আরো নানা কথা। এসবের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিক্রিয়া চলছে।

বাংলাদেশে আমাদের বুঝতে হবে যে আমাদের চলতে হবে আত্মনির্ভর (Self-relient) হয়ে। উন্নত বিশ্ব থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি আমাদের গ্রহণ করতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকার একটা প্রগতিশীল দিক আছে—যার পরিচয় রয়েছে তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি আদর্শে। এদিকটাকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। এর দ্বারা আমরা প্রগতির পথ পাব। কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকার আরেকটা দিক হলো, তাদের অপক্রিয়ার দিক। এতে রয়েছে তাদের উপনিবেশবাদ, ক্রুসেড, ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদের দিক। এদিকটায় রয়েছে আগ্রাসী যুদ্ধ। এটা বর্জনীয়। পাশ্চাত্য প্রগতিশীল বিষয়গুলোকে আমরা আমাদের মতো করে যত গ্রহণ করতে পারব ততই আমাদের মঙ্গল।

যে দুর্গত অবস্থা বাংলাদেশে চলছে, তাতেও যাঁরা সুস্থ-স্বাভাবিক ও প্রগতিশীল মনোভাব এবং চিন্তা ও কর্ম নিয়ে আছেন, তাঁদের এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। জাতীয় অবস্থার সঙ্গে বৈশ্বিক অবস্থাকেও পূর্ণ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় গ্রহণ করতে হবে। দুনিয়াজুড়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে।

লেখক :আবুল কাসেম ফজলুল হক,অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


তপন দেবনাথ এর গল্পগ্রন্থ ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম’ একুশের গ্রন্থমেলায় বের হয়েছে

শনিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

বাপ্ নিউজ : লস এঞ্জেলেস প্রবাসী তপন দেবনাথ এর ২৩তম গ্্রন্থ ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম’ অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বের হয়েছে। ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশের পক্ষে বইটি প্রকাশ করেছেন জহিরুল আবেদীন জুয়েল। প্রচ্ছদ করেছেন আদিত্য অন্তর। অবসেট পেপারে ৮৮ পৃষ্ঠার বইটির মুল্য রাখো হয়েছে ১৫০ টাকা। বইতে মোট ৮টি গল্প রয়েছে।

alt 

গল্পগুলো হলো ঈর্ষা, দেশি ভাই, চোখের আলোয় দেখেছিলেম, কী লজ্জা! আত্মজা, প্রাক-প্রতিরোধ, যুদ্ধ ও ক্ষুধা এবং মিথ্যাচারের বিশ্বায়ন। ৮টি গল্পের মধ্যে ৪টি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গল্প। সবগুলো গল্পই ইতোপূর্বে সাপ্তাহিক ঠিকানা ও বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। বর্তমান বইটি নিয়ে তপন দেবনাথ এর প্রকাশিত বই এর সংখ্যা ২৩ এ দাঁড়াল। জীবন ও সমাজকে অত্যন্ত কাছের থেকে পর্যবেক্ষণ করে বাস্তব ও কল্পনার মিশেলে লেখা গল্পগুলো সব বয়সী পাঠকের ভালো লাগবে বলে আশা করা যায়। ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশের ২৯১-২৯৪ নং স্টলে মেলার প্রথম দিন থেকেই বইটি পাওয়া যাচ্ছে।


ভ্যালেন্টাইন ডে এই রবিবার উতোল বাসন্তী হাওয়ায় প্রাণে লাগে সুখের দোলা

বুধবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

হাকিকুল ইসলাম খোকন:মনের উঠোনে আজ বসন্তের উতল হাওয়া। প্রাণে প্রাণে লাগবে সুখের দোলা, মুখ রেখে দখিনা বাতাসে চুপি চুপি বলার দিন ‘সখী, ভালোবাসি তারে।’ এই রবিবার ভালোবাসা দিবস। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে। রোমান বিশ্বাসে-বসন্তের আবিরে স্নানশুচি হয়ে রবিবার কিউপিড ‘প্রেমশর’ বাগিয়ে ঘুরে ফিরবে হূদয় থেকে হূদয়ে। অনুরাগ তাড়িত পরান এফোঁড়-ওফোঁড় হবে দেবতার বাঁকা ইশারায়। রবিবার হূদয় গহনে তারাপুঞ্জের মত ফুটবে চন্ডীদাসের সেই অনাদিকালের সুর:“দুঁহু তরে দুঁহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া/ অর্ধতিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া/সখি কেমনে বাঁধিব হিয়া...। আকুতি ঝরবে— ‘তুমি কি দেবে না সাড়া প্রিয়া বলে যদি ডাকি, হেসে কি কবে না কথা, হাত যদি হাতে রাখি।’

i105
পৃথিবীর সব সাহিত্য ডুবে অছে ভালোবাসা নিয়ে কাব্য-মহাকাব্য, গল্প, কবিতা, গান, উপন্যাসের অতলান্তে। অতলান্তকে তল পাওয়া গেছে, তারপরও  ’ভালোবাসা কী?’ এই প্রশ্নে খেই হারিয়েছেন। কবিগুরুর ভাষায়, ’তোমরা যে বলো দিবস রজনী ‘ভালোবাসা’ ‘ভালোবাসা’সখী ভালোবাসা কারে কয়! সে কি কেবলই যাতনাময়। সে কি কেবলই চোখের জল? সে কি কেবলই দুঃখের শ্বাস? জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ভাষায় : ‘আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়, মনে পড়ে মোরে প্রিয়, চাঁদ হয়ে রব আকাশের গায়, বাতায়ন খুলে দিও।’ আধুনিক কবির কণ্ঠে প্রেয়সীকে বলা : ‘পৃথিবীর কাছে তুমি হয়তো কিছুই নও, কিন্তু কারও কাছে তুমিই তার পৃথিবী।’ অথবা ‘সুখী হবার জন্য তোমার চারপাশে অসংখ্য মানুষের দরকার নেই, শুধু সেই সত্যিকারের কয়েকজনই যথেষ্ট যারা, তুমি যা তার জন্যই তোমাকে ভালোবাসবে।’ একালের কবির অনুভব ‘তোমার সাথে প্রতিটি কথাই কবিতা, প্রতিটি মুহূর্তেই উত্সব—তুমি যখন চলে যাও, সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সব আলো নিবে যায়...।’

alt

ভালোবাসার কথা প্রকাশের জন্য সুদৃশ্য মলাটে মোড়া বইয়ের আটপৌরে দিন ফুরিয়েছে। আঙুল কেটে রক্তে রক্ত মিলিয়ে দেয়া, চিঠির ভাঁজে গোলাপের পাপড়ি গুঁজে দেয়া, দি¯াÍয় দিস্তায় কাগজ নষ্ট করে কাব্য চর্চা এখন ম্রিয়মাণ।া
বাঙালির বসন্ত বরণের দিন। একদিকে ঋতুরাজ বসšেতর আগমন অপরদিকে আজ রবিবার এসেছে ভালোবাসা দিবসের ছোঁয়া। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের গবেষকদের অনেকে বলে থাকেন, ফেব্রুয়ারির এই সময়ে পাখিরা তাদের জুটি খুঁজে বাসা বাঁধে। নিরাভরণ বৃক্ষে কচি কিশলয় জেগে ওঠে। তীব্র সৌরভ ছড়িয়ে ফুল সৌন্দর্যবিভায় লাজুক আর ঢলঢলে হতে থাকে। অনেক দিবসের ভিড়ে ভালোবাসা দিবস আলাদা মাত্রায় উত্কীর্ণ। এর সাথে প্রেম এবং অনুরাগের অমনিবাস। এই দিবসটির সূচনা সেই প্রাচীন দুটি রোমান প্রথা থেকেই। এক পাদ্রি ও চিকিত্সক ফাদার সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামানুসারে দিনটির নামকরণ হয়েছে ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’।

খ্রিস্টীয় এই দিবসের রেশ ধরে আমাদের দেশে ও বিদেশে এদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি কেবল প্রেমবিনিময় নয়, তরুণ-তরুণীদের মাঝে গোপনে বিয়ের বাতিক দেখা যায়। রাজধানীর উদ্যানমালা, বইমেলা, ক্যাম্পাস, কফিশপ, ফাস্টফুড শপ, লং ড্রাইভ, নিভৃতে কাটান প্রণয়কাতর তরুণ-তরুণীরা। ফুল দোকানে থরে থরে সাজানো মল্লিকা, জুঁই, গাঁদা উঠে আসবে ললনাদের খোঁপায়।

 লেখক,সাংবাদিক,রাজনীতিক,সদস্য ও মুখপাএ সিঊিএলজি,ইঊএসএ, সভাপতি,আমরিকান প্রেসক্লাব অব বাংলাদেশ অরিজিন,এডিটর-বাপসনিঊজ