Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

প্রবাসে উৎসবে রাঙাই জীবনের ক্যানভাস = আবু সাঈদ রতন

শনিবার, ০১ জুলাই ২০১৭

ঊৎসব মানেই আনন্দ। তবে স্থান কাল পাত্র ভেদে এর মাত্রা ভিন্নতা পায়। বিশেষ করে বাঙ্গালি সংস্কৃৃতিতে ঊৎসবের ধরনটা একটু বৈচিত্রময় হয়।
মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ। তাছাড়া বারো মাসে তেরো পার্বন তো লেগেই আছে।
প্রসঙ্গক্রমে প্রশ্ন আসে এই উৎসব প্রবাসে কেমন? এমন একটা কৌতুহল দেশের মানুষের হতেই পারে।
প্রবাস মানেই যে শুধু কাজ আর কাজ; তা কিন্তু নয়। বিশেষ করে এই আমেরিকাতে যেখানে বাঙ্গালি আছে সেখানেই যে উৎসব নিত্য সঙ্গী। সামার আসলেই শুরু হয় বিভিন্ন পথ মেলা। আর সেই মেলায় কি নেই? শাড়ি, গয়না, জামা কাপড়, শিশুদের খেলনা, চটপটি, ফুচকা, নাচ, গান সবই আছে। মেয়েরা দল বেঁধে বাহারী রঙের জামা কাপড় পড়ে মেলায় ঘুরতে আসে; আনন্দ করে। একে অপরের সাথে কুশল      বিনিময় করে। দেশ থেকে আসা শিল্পী এবং প্রবাসী শিল্পীদের গানে মাতোয়ারা হয় মেলায় আগত দর্শকরা।
আর পহেলা বৈশাখে প্রতিটি ঘরে ঘরে বিশেষ করে (বাঙ্গালি অধ্যুষিত ) যেন আমাদের দেশীয় খাবারের ধুম পড়ে যায়। যত রকমের ভর্তা আছে তার আয়োজন চলে। সাথে পান্তা-ইলিশ। ছেলেরা পায়জামা পাঞ্জাবি, মেয়েরা নানান রঙ্গের দেশীয় ষ্টাইলে শাড়ী পড়ে উৎসবে মাতোয়ারা হন। শুধু ঘরে ঘরে কেন; বাঙ্গালি প্রায় প্রতিটি রেষ্টুরেন্টে বিভিন্ন রকমের ভর্তা, ইলিশ এর আয়োজন থাকে। এমন কি মাটির হাড়ি-পাতিলেও খাবার খেতে দেখা যয়।

alt
আর ঈদ? এখানেও বা কম কি। ৩০ দিন রোজার পর ঈদকে বরণ করে নিতে অন্য রকম এক ঊৎসবে মেতে ওঠে মুসলমান বাঙ্গালি কমিউনিটি। ঈদের কেনা-কাটা চলে রাদ দিন যখনই সুযোগ পান। ঘরে ঘরে বিশেষ খাবারের আয়োজন চলে। বিভিন্ন বাঙলা পত্র পত্রিকায় ও টিভি চ্যানেলগুলোতে থাকে ঈদের বিশেষ আয়োজন।  
সবচেয়ে মুখোরিত ও আনন্দের সময় হলো ‘চান রাত’। বিশেষ করে বাঙ্গালি অধ্যুষিত এলাকা ‘জ্যাকসন হাইটস্’ এবং ‘জামাইকা’ এই দুটি এলাকায় চলে রাত জেগে মেহেদী উৎসব। হাতে মেহেদী লাগানোর জন্য মেয়েদের  ভীড় এসব এলাকায়। দেখে মনেই হবে না আমরা প্রবাসে আছি। এ এক অন্যরকম অনুভূতি। ঈদের দিন দল বেধে নামাজ পড়তে যাওয়া, যেন বাংলাদেশকেই মনে করিয়ে দেয়। এখানকার প্রশাসন এখন দুই ঈদে সরকারী ছুটি ঘোষণা করেছে বিধায় স্কুলের ছেলে মেয়েরা ঈদ ঊৎসব পালন করছে ভিন্ন মাত্রায়। অনেকগুলো ঈদের জামাত এখানে হচ্ছে। শুধু বাঙ্গালি নয় অন্যন্য দেশের মুসলমানরাও এসব জামাতে শরীক হচ্ছে। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে সচেষ্ট সকলেই।
তারপরও কোথায় যেন একটু বিষাদের ছোঁয়া স্পর্শ করে যায়; মনের অজান্তেই চোখের কোনে চিক চিক করে। এই লোনা পানিতে মিশে আছে দেশে রেখে আশা আপনজনদের ভালোবাসার কথা, বিরহের কথা, ভালোবাসার মানুষকে কাছে না পাওয়ার যন্ত্রণার কথা।
এখানে ঊৎসবে আনন্দে প্রাচুর্য আছে, সামর্থ আছে, ইচ্ছে আছে; নেই শুধু আপনজন। কারো বাবা, মা, ভাই, বোন, প্রিয়তমা, প্রিয়তম, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজন দেশে অবস্থান করার কারণে এসব আনন্দ উৎসবের অন্তরালে ফুটে ওঠে   করুণ চিত্র। কেউ কেউ ঈদের দিনও কাজ করছেন নিত্যদিনকার মত। নেই ছুটি; তার আবার কিসের উৎসব? কাজ করছে ঠিকই, মন পড়ে আছে দেশে-অথবা অন্য কোন খানে। মনে মনে কত রকমের কল্পনা করছে; নিজে নিজে হয়তো নিজেকেই ধিক্কার দিচ্ছে এ জীবনের জন্য। তারপরও তো অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার জন্য নীরবে চোঁখবুঝে সহ্য করে যায়। মা-বাবা ফোন করে খবর নিলে হয়তো বলে ভালই আছি, ভালো খাচ্ছি, ঈদের আনন্দ করছি।
অথচ তখনো সে জীবনের চাকা ঘুরানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এ এক বিচিত্র জীবন।
ঈদ আসে, আনন্দ আসে; আবার চলে যায়। এই প্রবাস জীবনের ক্যানভাসে উৎসব রঙ্গে রঙ্গীন হয় জীবন, থাক না দুঃখ কষ্ট, তবুও তো উৎসব। জীবন তো থেমে নেই।
চলুন না জীবনের ক্যানভাসটা রাঙিয়ে তুলি উৎসবে।
-লেখক, সম্পাদক ইউএস বাংলা নিউজ, নিউইয়র্ক।


আম-কাঁঠালের মধুমাসে তেঁতুল শুধু অম্বলেই কাজে লাগে? = শিতাংশু গুহ

রবিবার, ২৫ জুন ২০১৭

দেশের দুই দুই বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মনে করে ‘তারা নিজেরা’ ক্ষমতায় না থাকতে পারলে ‘তৃতীয় কেউ’ থাকুক। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ থেকে দেশে মোটামুটি একটি গণতান্ত্রিক ধারা চালু হয়েছিল। কিন্তু খালেদা জিয়ার ক্ষমতায় থাকার লোভ বা ক্ষমতা না ছাড়ার খায়েশ দেশকে আজকের পরিস্থিতিতে নিয়ে আসে। ১৯৯৬ ও ২০০৬-এ খালেদার ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার নাটক সবার মনে থাকার কথা। আবার ২০০১-এ নির্বাচনে জেতার পর বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী তৎপরতায় আওয়ামী লীগ প্রমাদ গোনে। এখনকার অবস্থা ঠিক একই, আওয়ামী লীগ জানে তারা হেরে গেলে এবং বিএনপি ক্ষমতায় এলে বারোটা বাজিয়ে দেবে! মন্ত্রীদের মুখে এমত আশঙ্কার কথা শোনাও যাচ্ছে। খালেদা জিয়া বিএনপির ইফতার অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের ছোট নেতাদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘যা কামিয়েছেন, তা নিয়ে কেটে পড়ুন; বড় নেতাদের পকেটে টিকিট কাটা আছে, ঠিক সময়ে আপনাদের ফেলে কেটে পড়বেন।’

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে আজো ‘শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর’ প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ ব্যাপারে কেউ আন্তরিক নন? দোষ শুধু বড় বড় দল, সরকারের নয়, এরা দোষী বটে, কিন্তু মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশন, তল্পিবাহক বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া বা জনগণ সবাই কমবেশি এজন্য দায়ী। কারণ কেউ সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেননি। রাজনৈতিক দল জোর করে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইলে নির্বাচন কমিশন ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ ভূমিকা পালন করেছে। দেশে আজ পর্যন্ত একটি নির্বাচন কমিশন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে চেষ্টা করেনি। দাঁড়ায়নি। শুধু শুধু সরকারের কাঁধে দোষ চাপিয়ে লাভ নেই, সবাইকে দায়িত্ব নিতে হয়। নির্বাচন কমিশন কখনো এর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি। প্রধান বিচারপতি যদি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার পারবেন না কেন? দেশকে কিছু দেয়ার দায়িত্ব কি তার নয়? আর যদি দিতে না-ই পারেন, তবে দায়িত্ব নেন কেন? আমাদের দেশের প্রতিটি সরকার নির্বাচন কমিশনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছেন, যা দুর্ভাগ্যজনক।

দেশের বড় দলগুলো বিরোধী শিবিরে থাকলে মিডিয়া, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন বা ইত্যাকার প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতার পক্ষে সরব থাকে, ক্ষমতায় গেলে উল্টে যায়। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা তখন পাল্টে ক্ষমতাসীনদের চিন্তানুযায়ী হয়ে যায়? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জেনারেল মঈন নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র হবে আমাদের স্টাইলে। আমরা আইয়ুব খান, জিয়া, এরশাদের মুখেও এমন কথা শুনেছিলাম। হয়তো ভবিষ্যতেও শুনব? সামরিক বা বেসামরিক স্বৈরাচার কেউই গণতন্ত্রকে প্রসারের সুযোগ দেননি। গণতন্ত্র তাই বাংলাদেশে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সামনে নির্বাচন। সময় যত ঘনিয়ে আসবে পরিস্থিতি তত জটিল হবে। মানুষের মনে ভয় বাড়বে। এক অনিশ্চিয়তার মধ্যে দেশ ও জনগণ দিন কাটাবে। বংলাদেশে নির্বাচন মানে কি বিভীষিকা? এবারকার নির্বাচনে ২০১৪-র মতো ওয়াকওভার পাওয়া যাবে না। বিশ্ব চাইবে একটি স্বচ্ছ নির্বাচন। ভারত এবার ‘কোমর পানিতে’ নেমে আসবে বলে মনে হয় না। সবগুলো বড় দল অংশ না নিলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না।

নিউইয়র্কে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক সুবল দেবনাথ সেদিন একটি গল্প বললো, এক গ্রাম্য মহিলা রান্না চড়িয়ে দেখে তেল নেই। হাতে একটি ‘সরা’ নিয়ে তিনি এলাকার দোকানে যান। দোকানে ‘সেল’ ছিল যে, কত টাকার তেল কিনলে কতটা ‘ফাউ’ পাওয়া যাবে। মহিলা নির্দিষ্ট টাকার তেল নেন। চলে আসবেন, তখন তার মনে হলো, ফাউ নেয়া হয়নি! তিনি দোকানিকে বললেন, ‘আমার ফাউ কোথায়’? দোকানি বললেন, ‘তোমার সরা তো পূর্ণ, ফাউ নেবা ক্যামনে’? মহিলা সরা উল্টে বললেন, ‘ফাউটা এখানে দেন’। দোকানি ফাউ দিয়ে বললেন, ‘ফাউ তো নিলা, তোমার আসল কই’? মহিলা আসল দেখতে গিয়ে ফাউ মাটিতে পড়ে গেল! দোকানি তখন বলেন, ‘ফাউ খেতে গিয়ে তো তোমার আসল-ফাউ দুটোই গেল’? গল্পটি আসলে সরকার-হেফাজতের দহররম-মহররম নিয়ে, সুবলের ভাষায় ‘ফাউ’ হচ্ছে, ‘হেফাজত’। কদিন আগে ঢাকার এক আওয়ামী লীগ নেতা আমায় বলেছেন, ‘এবার হেফাজতের সঙ্গে সমঝোতাটা ভালো হয়েছে, ওরা আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে’।

ভোট এবং সেটা হেফাজত দেবে আওয়ামী লীগকে? আম-কাঁঠালের মধুমাসে সরকার যতই তেঁতুলের কদর করুন না কেন, তেঁতুল শুধু অম্বলেই কাজে লাগে! ওপরে ওপরে যে যাই বলুন, আওয়ামী লীগের কোনো লেভেলের কর্মীই মনে করেন না যে, হেফাজত তাদের ভোট দেবে? তাহলে জননেত্রী হেফাজতকে এত খাতির করছেন কেন? একজন প্রবীণ সাংবাদিক আমাকে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা জানেন, হেফাজত তাকে ভোট দেবে না, তবু তিনি ওদের খাতির করছেন, কারণ ওরা যাতে আর তেমন কোনো বড় আন্দোলন গড়ে না তোলে’। এই তত্ত্বের যুক্তি আছে। বিএনপির আন্দোলন করার ক্ষমতা নেই, হেফাজতের আছে। ২০১৮ ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ হবে তা বলা বাহুল্য, সরকার এ সময়টায় হেফাজতকে পাশে চায়? মওদুদের বাড়ি উচ্ছেদ নিয়েও এমন একটি গল্প আছে যে, বিএনপি ভেঙে নতুন বিএনপি সৃষ্টিতে রাজি হননি বলেই এই নাটক? হতেও পারে, নির্বাচনী বছরে সবই সম্ভব? রটনা আছে, সরকারের সঙ্গে মওদুদের সম্পর্কটা এতকাল ভালোই ছিল? সেটা যাই হোক, মওদুদের উচিত ১৯৮১ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ওই বাড়ির ভাড়ার টাকা পরিশোধ করা।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানটি আওয়ামী লীগ করতে চায়। এ জন্য অন্তত আর একটি টার্ম ক্ষমতায় থাকাটা দরকার। এমনিতে উন্নয়নের ধাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং দেশকে ২০২১ সাল নাগাদ একটি ‘মধ্যবর্তী আয়ের দেশ’-এ পরিণত করতেও সেটা দরকার। প্রশ্ন হলো, জনগণ সেটা চায় কিনা? সমস্যা হচ্ছে, নির্বাচনটি ২০১৯-র প্রথম দিকের মধ্যেই করতে হবে। ক্ষমতায়ও থাকতে হবে? এ দুটো ইক্যুয়েশন কিভাবে একসঙ্গে সফল করা যায়? মাত্র সেদিন গোয়েন্দাদের গোপন রিপোর্ট নামে একটি ভুয়া সংবাদ বাজারে এসেছে। এতে সুষ্ঠু নির্বাচনে সরকারের ভরাডুবির কথা বলা হয়েছে। পরিস্থিতি এতটা খারাপ না হলেও তেমন সুবিধার নয়, সরকার তা জানেন। সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে হবে, অথচ বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার হাতছানি দেখতে পাচ্ছে। ম্যাডাম নড়েচড়ে বসছেন। এই দুই দলের ক্ষমতায় যাওয়ার টানাটানিতে জণগণ ‘উলুখাগড়ার’ মতো ভোগান্তির শিকার হবেন। দেশের শান্তি-সমৃদ্ধি বজায় রাখতে তৃতীয় শক্তি তখন বাধ্য হয়ে এগিয়ে আসবে।

জনগণ শান্তি চায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বারবার ব্যর্থ হচ্ছে দেশে একটি স্থায়ী, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থা দিতে। এতে ক্ষতিগ্রস্তও হচ্ছে তারাই। সামনে যেই দল ক্ষমতায় যাবে তারা যে ক্ষমতা ছাড়বে, এর কোনো গ্যারান্টি আছে? বিএনপির স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার ইতিহাস নেই। আওয়ামী লীগের ছিল, থাকা উচিত। ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত শুভ নয়! বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে যত ভালো কাজ হয়েছে, সবই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে হয়েছে। আওয়ামী লীগই পারে দেশে একটি স্থায়ী নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। আওয়ামী লীগই পারে নির্বাচন কমিশন, মিডিয়া, বিচার বিভাগকে চূড়ান্তভাবে স্বাধীন করে দিতে। এতে আখেরে সবার লাভ, দেশের লাভ। পরিস্থিতি ভালো নয়। খালেদা জিয়া প্রকারান্তরে ক্ষমতায় গেলে ‘দেখিয়ে দেয়ার’ হুমকি দিচ্ছেন। মানুষ প্রতিহিংসার রাজনীতি চায় না। বড় দুই দলের সংঘাতে ১/১১ এসেছিল, আবার এলে এর কারণও হবে একই।

আর একদল আছেন যারা ভাগাভাগির নির্বাচনের কথা ভাবছেন। আদৌ সেটা সম্ভব? দুই নেত্রী কি কেউ কাউকে সহ্য করেন? যদি করতেন, তাহলে তো একে অপরের ইফতার পার্টিতে যেতেন? সমস্যা আছে। সেটা গুরুতর সমস্যা। অনেকে বলছেন, পুলিশ, মিলিটারি থেকে শুরু করে সবাই তো সরকারের সঙ্গে, ঠিক ম্যানেজ হয়ে যাবে। তাছাড়া পদ্মা সেতু, দেশের ব্যাপক উন্নয়ন কোনো কিছুই কাজে লাগবে না? এই সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার থেকে এত ভালো ভালো কাজ করেছেন, তারপর তো সহজে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার কথা? কথা তো কথাই, কথা আর কাজে তো মিল থাকতে হবে? প্রবাদ আছে, আওয়ামী লীগ বন্ধুকে শত্রু করতে ওস্তাদ। ১৯৭১ সাল থেকে আজ অবধি, আওয়ামী লীগের একজন শত্রুও কি বন্ধু হয়েছে? একজন রাজাকার কি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে এসেছে? পক্ষান্তরে বহু বন্ধু শত্রু হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে রাজাকার! দুর্ভাগ্য হলো, এদের অনেককে বিরুদ্ধ শিবিরে ঠেলে দেয়া হয়েছে? হাইব্রিড বা কাউয়া শব্দগুলো এমনিতে আসেনি। সর্বত্র একই অবস্থা।

গত আট বছরে মহাজোট সরকারের আমলে দেশ যতটা সাম্প্রদায়িক হয়েছে সেটা কি কাম্য ছিল? হিসাব তো পরিষ্কার, দেশ সাম্প্রদায়িক হয়েছে। সদ্য ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট খেলা দিয়েই কি সেটা পরিষ্কার হয় না? কেউ হয়তো বলবেন, আওয়ামী লীগ কি আর আগের মতো অসাম্প্রদায়িক আছে? নাই, কিন্তু কাজীর গরুর মতো ধর্মনিরপেক্ষকতা এখনো কেতাবে তো আছে? আওয়ামী লীগ যেটা ভুলে গেছে, এই দলটিকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় টিকে থাকতে হবে বা ক্ষমতায় যেতে হবে। ধর্মান্ধ শক্তি কখনোই আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করে না এবং করবে না। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের দল। কিন্তু এই দলটি যেভাবে চেতনাকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তা না করে ‘অনুভূতি’-কে সুড়সুড়ি দিয়েছে। দেশের মানুষ এখন তাই অনুভূতি আতঙ্কে আতঙ্কগ্রস্ত। সদ্য হলিউডের এক নায়িকা বলেছেন, একদা বৈরুত ছিল মধ্যপ্রাচ্যের প্যারিস, আর এখন প্যারিস হয়েছে ইউরোপের ‘মধ্যপ্রাচ্য’। বাংলাদেশের মানুষ কিন্তু ঢাকাকে উপমহাদেশের ‘মধ্যপ্রাচ্য’ বানাতে চায় না। তাই বলছিলাম, উপায় নাই, গোলাম হোসেন!

নিউইয়র্ক, ১৮ জুন ২০১৭

শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।


ঈদের দিন = সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী

শুক্রবার, ২৩ জুন ২০১৭

পথের পাশে একটি শিশু
আছে  যে বসে একা
ঈদের দিন নেইতো ভাগে
হয়না ঈদ দেখা।

হয়না ঈদ করা যে তার
যায় যে দিন দুখে
কষ্টে থাকে পথেই রোজ
নেইতো হাসি মুখে।

এদের পাশে রাখতে আজ
ঈদের দিনে চাই
সকল শিশু হাসবে ঈদে
ঈদর সুখে তাই।

ঈদের জামা ঈদের খানা
জুটবে ভাগে আগে
ঈদের ঝলোমলো দিন
কচি শিশুর ভাগে।


গল্প : মেক-আপ করা বৃষ্টি ......রুহুল আমীন রাজু

শুক্রবার, ২৩ জুন ২০১৭

মোহাম্মদ মতিউর রহমান। সবাই ডাকে মতি স্যার বলে। একটি বেসরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। মতি স্যারের নানাবিধ সমস্যা থাকলেও বর্তমানে দু’টি সমস্যা তাকে ভয়ানক কষ্ট দিচ্ছে। একটি হচ্ছে- সেদিন দশম শ্রেনীর ছাত্র/ছাত্রীদের নদী বিষয়ে রচনা লেখার অবΖা দেখে তিনি দারুন মর্মাহত। শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ’ই লিখেছে- ’বাংলাদেশ একটি নদী মার্তৃক দেশ। মাঝি নৌকায় পাল তোলে ভাটিয়ালি গান গেয়ে ছুটে চলে গ্রাম থেকে শহরে.....’
 মতি স্যার Ζানীয় আড়িয়ালখাঁ-ѓমপুত্রসহ তিন দিনের ছুটি নিয়ে আরো বেশ কয়েকটি নদী সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখেছেন, নৌকায় কোনো পাল নেই। সব নৌকা ইঞ্জিন চালিত। এমন বিকট ভট ভট শব্দের মাঝে মাঝির গান শুনলো শিক্ষার্থীরা কোথায় থেকে...? তাও আবার বর্ষাকালে এখন আর মাঝির ভাটিয়ালি গান নয়; নৌকার ভটভটি সঙ্গীত... এরপরতো শুধু’ই নদীগুলো ধূ ধু বালুচর। অথচ ওরা এসব কি কাল্পনিক কথা লিখেছে.. ?
মতি স্যার সকল শিক্ষাত্রীকে এই নদী রচনায় শূণ্য নম্বর দিয়েছেন। ঘটনাটি নিয়ে অভিভাবক মহল ও স্কুল ম্যানেজিং কমিটির মধ্যে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বর্তমান এমপি মোখলেস ভ’ইয়া খবরটি শুনে সাংঘাতিকভাবে ক্ষেপে গেছেন। তার ছোট ছেলেও এই শূণ্য প্রাপ্তির দলে। এমপি সাহেব শীঘ্রই বিষয়টি নিয়ে জরুরী বৈঠক করবেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়াও এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রয়েছে -  প্রাইভেট প্র্যাক্টিস, ছাত্র/ছাত্রীদের দিয়ে স্কুলের কাজ করানো... ইত্যাদি।
তবে শূণ্য নম্বর প্রাপ্তিতে শিক্ষার্থীদের  মাঝে কোনো ক্ষোভ নেই, দুঃখও নেই। ওরা সবাই শূণ্য পেয়েছে ফার্ষ্টবয়সহ- বিষয়টি নিয়ে এক প্রকার আনন্দ উল্লাস করছে তারা।
অপরদিকে মতি স্যারের দ্বিতীয় সমস্যাটা হচ্ছে, উনার ছোট ছেলেটা গরুর গোস্ত দিয়ে ভ’না খিচুরি খাওয়ার বায়না ধরেছে। পাশের বাড়িতে বৃষ্টি আসলেই খিচুরি খাওয়ার ধুম পড়ে। ওদের বাড়িতে বৃষ্টির দিন মানেই- খিচুরি খাওয়ার দিন। কিন্তুু মতি স্যার চার’শ আশি টাকায় এক কেজি গরুর গোস্ত ক্রয় করার মতো এতো টাকা যোগাড় করতে অপারগ। মাস আসতে আরো বেশ বাকী। স›ধ্যায় স্কুল ঘরে যে টিউশনি করেন, তাতে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট কোনো ফি নেন না। মাস শেষে  কেউ একটা লাউ মিষ্টি কুমড়া কচু আবার কেউ কেউ কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে থাকে। ইদানীং শূণ্য নম্বর দেওয়ার পর টাকা-পয়সাতো দূরের কথা, লাউ কুমড়া পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তুু মতি স্যার তাদের পড়ানো বন্ধ করেন নি। বরং মূল কøাস এবং প্রাইভেটে লেখাপড়া আরো জোড়দার করেছেন।
    ঘরে ফিরলেই ছেলেটির প্রশ্ন- খিচুরির কি খবর বাজান..? গোস্ত কই..? চাইল- ডাইল কই..? ছেলের এই প্রশ্ন এড়াতে বেশ রাত করে বাড়ি ফিরেন তিনি। ছেলেটি ঘুমিয়ে পড়ার পর এক পরাজিত সৈনিকের মতো ঘরে ঢুকেন তিনি। তার ċী রাবেয়া বেগমের মুখে শুনেন ছেলেটির খিচুরি খিচুরি করে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ার গল্প..।
একটা দীর্ঘ নিঃশ^াস ছেড়ে মতি স্যার বলেন, এইতো আর ক’টা দিন- বেতনটা পেলেই খিচুরির আয়োজন করা হবে। ঐদিন মেয়ে দুইটারেও জামাইসহ দাওয়াত দিও রতনের মা।
রাবেয়া বেগম চাপা কষ্ট কন্ঠে বলেন, হ আপনে যহন বেতন পাইবাইন তহন আর বর্ষা থাকতো না। আপনের পোলা বৃষ্টির মইধ্যে খিচুরি খাইবো- লইদের মইধ্যে না।
ঃ আরে বৃষ্টি নিয়া চিন্তা কইরো না রাবেয়া। আবহাওয়া এখন আর আগের মতো নাই। দেখবা বৃষ্টি ঠিকই থাকবো। শোনো- জলবায়ুর প্রভাবে বিশ^ এখন.....
ঃ রাহুইন আপনের কেলাস। মাষ্টরি করতে করতে অহন ঘরটারেও ইসকুল মনে করতাছুইন, খিচুরি লইয়া কেলাস শুরু অইছে। এই লইন কানের দোল , এইডা বেইচ্চা চাইল ডাইল গোস সব লইয়া আইয়্যুন।
ঃ এইডা তুমি কি কইলা ?
ঃ কেরে আমি কি হিন্দিতে কইছি ? জানুইন না কানের একটা দোল হেই কবেঅই হারাইয়া গেছে। এক কানো কেউ কি আর দোল পিন্দে ? নেইন এইডা বেইচ্চা পোলারে খিচুরি খাওয়াইন আর চালের দুইডা টিন বদলাইন। ট্যাহা কিছু বাড়লে আফনের লাইগগা একটা নীল পাঞ্জাবী কিনুইনযে।

Picture


মতি স্যার কাঁপা কাঁপা হাতে রাবেয়ার কানের দোলটা নিলেন। বিয়ের দোল। তার মায়ের দেওয়া দোল। একটা দোল সেই কবে হারিয়ে গিয়েছিলো। হুবহু আরেকটা দোল বানিয়ে দেওয়ার কথা দিয়েছিলেন । আজো পারেননি। কিন্তু মায়ের দেওয়া এই দোল কিভাবে হাত ছাড়া করবেন তিনি..? দোলটাতে যে অনেক স্মৃতি........
এমপি সাহেব স্কুলে আসছেন। পুলিশের গাড়ীর কু কু শব্দ শোনা যাচ্ছে। ম্যানেজিং কমিটির সদস্য অভিভাবক ও এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সবাই উপস্থিত হয়েছেন স্কুলের মাঠে। এমপি সাহেব পাঁচ মিনিট ধরে বসে আছেন। প্রধান শিক্ষক মতি স্যার এখনো বৈঠক স্হলে আসেননি। তিনি নদী রচনাটি কিভাবে বাস্তব ভিত্তিক লিখতে হবে, তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে কথা বলছেন। অপরদিকে ক্লাস ছেড়ে দিয়ে সকল শিক্ষক/শিক্ষিকারা এমপির সামনে গিয়ে হাজির। কচি ডাবের পানি লেবুর শরবত বেনসন সিগারেট দিয়ে এমপি সাহেব ও তার সফর সঙ্গীদের  আপ্যায়নে মহা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
মতি স্যার বৈঠকে উপস্থিত হওয়া মাত্র’ই ইউপি মেম্বার নিয়ামত আলী চড়া গলায় বললেন, কি মাষ্টর সাব এমপি ছ্যার হেই কোন সময় আইয়া বইয়া রইছে আর আপনে পলাইয়া আইছলাইন নাকি ?
মতি স্যার ধরাজ গলায় বললেন, সংযত ভাষায় কথা বলুন মেম্বার সাহেব। আমি পালাবো কেন ? আমি কøাস নিচ্ছিলাম।
মেম্বার এবার বেশ চেঁিচয়ে বললেন, এমপি ছ্যার বড় না কেলাস বড় ??
ঃ আমার কাছে কøাস বড়।
এমপি সাহেব বললেন, বেশ তাই যদি হয় – তাহলে নদী রচনায় সকল ছাত্র/ছাত্রীরা শূণ্য পেলো কেনো ?
ঃ স্যার,ওরা রচনাটি ভুল লিখেছে। তাই আমি শূণ্য দিতে বাধ্য হয়েছি।
ঃ ওরা কি বই থেকে লেখেনি ?
ঃ জি¦ স্যার বই থেকেই লিখেছে। বইয়ে রচনাটি সম্পূর্ণ ভুল।
ঃ দেশের বড় বড় পন্ডিত আর ডক্টর ডিগ্রিধারী ব্যক্তিগন এই বই লিখেছেন। আপনি বলছেন উনারা ভুল লিখেছেন !! আপনার কি মাথা নষ্ট হইয়া গেছে ?
ঃ মাফ করবেন, আমার মাথা ঠিক’ই আছে স্যার।
ঃ মাথা যদি ঠিক থাকে, তাহলেতো দেখছি আপনি রাষ্ট্রদ্রোহী। জানেন মতি সাহেব রাষ্ট্রদ্রোহীর শাস্তি কি ভয়াবহ ?
ঃ জানি স্যার। কিন্তুু আমি রাষ্ট্রদোহীতার মতো কোনো কাজ করিনি। রচনাটি ভুল ছিলো- আমি তা সংশোধনী করে দিয়েছি। এছাড়া নবম শ্রেনীর অংক বইয়েও একটা হাস্যকর ও নিন্দাজনক অংক ছিলো, যা উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে । তৈলাক্ত পিচ্ছিল বাঁেশ এক বানরের ওঠা নামা নিয়ে ... আমি এই বানরের লাফালাফি অংকটার স্থলে অন্য একটা কিছু সংযোজনের দাবি জানাচ্ছি। বাংলাদেশে খুব শীঘ্রই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ হচ্ছে... এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ঘটনাটি দিয়ে অংক করার জন্য আপনার কাছে জোড় দাবি জানাইতেছি। সামনের অধিবেশনে বিষয়গুলি জাতীয় সংসদে তুলবেন মাননীয় এমপি সাহেব।
ঃ বানরের লাফালাফি..না ? ষ্টপ ষ্টপ ইউর মাউথ । স্যাটেলাইট নিয়া অংক..? সরকারের শিক্ষানীতির উপর  বিরুদ্ধচারন... কত বড় সাহস, আমার সাথে বেয়াদবি ! কড়া একটা ধমক দিলেন এমপি সাহেব।
সাথে সাথে  চারদিক থেকে হৈচৈ শুরু হয়ে গেলো। বিশেষ করে এমপি সাহেবের  লোকজন মতি স্যারের বরখাস্ত চায়লো এবং এখনি করতে হবে। এই হট্্রগোলের মাঝে কে যেনো ছড়িয়ে দিলো- মতি স্যার সরকার বিরোধী শুধু না ; ইসলামও বিরোধী। মসজিদের মাইকে বিষয়টি ঘোষণা দেওয়া শুরু হয়ে গেছে। গ্রামের মানুষের কানে এই খবর পৌঁছার পর  স্কুল মাঠ এখন লোকে লোকারণ্য।  
মতি স্যারকে এমপি সাহেব দশবার কান ধরে উঠবোস করার জন্য নির্দেশ দিলেন। মতি স্যার অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বললেন, আমাকে গুলি করে মেরে ফেলুন। কিন্তুু কানে ধরে উঠবোস করবো না। আমি শিক্ষক, কানে ধরে উঠবোস আমি অন্যকে করাই।
এমপি সাহেব মতি স্যারের গালে মারলেন কষে এক থাপ্পর। মূহুর্তে’ই তার গালে পাঁচ আঙ্গুলের চিহ্ন এঁকে গেলো। মতি স্যার বরফ জমা পাথর হয়ে গেলেন। বাকরুদ্ধ.. যেনো রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে তার। ত্রিশ বছরের  আলোর বার্তিকা বাহক মতি স্যার আজ পাথর। হাজার পাওয়ারের চোখ দু’টো ঝাপসা হয়ে আসছে... তিনি অবাক হয়ে ভাবছেন, একজন আইন প্রণেতা সাংসদ সবার সামনে এমন নগ্ন ঘৃণ্য আচরণ কি ভাবে করতে পারলেন... ? এই নগ্নতার বিচার কি এই দেশে হবে...? এক খন্ড কাপড়ের অভাবে কোনো দরিদ্র নারী যখন অর্ধনগ্ন ভাবে রাস্তায় হাঁটে, তখন ইজ্জত যায় না। একজন ফ্যাশন সচেতন  নারী যদি রাস্তায় হাঁটে , তখন ইজ্জত যায়।  
মতি স্যারের মতো আকাশের һপও হঠাৎ পাল্টে গেলো। আকাশে কালো মেঘের ভেলা। টিপ টিপ বৃষ্টি ঝরতে শুরু করলো। মতি স্যার বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন। রাস্তার পাশে চোখ পড়লো কসাইখানার দিকে। গরুর রান ঝুলছে। এ দেখে মনে পড়ে গেলো তার ছেলেটার খিচুরি খাওয়ার কথা...।
  বাড়ি পৌঁছার পর ছেলেটি আজ খিচুরির বায়না করেনি। বাবার গালে হাত বুলিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো. বাজান তোমার গালো যেই ব্যাডা চড় মারছে আমি বড় অইয়া তার গালোও একটা চড় মারাম বলেই জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। পাশে দাঁড়ানো রাবেয়া বেগম মুখে শাড়ীর আঁচল গুজে নিঃশব্দে কাঁদছে। মতি স্যার বুঝতে পারছেন না এতো তাড়াতাড়ি এ খবর বাড়ী পৌঁছলো কি ভাবে ?
মোবাইল ফোনে দৃশ্যটি ধারণ করে কে যেনো ফেইসবুকে ছেড়ে দিয়েছে। সামাজিক এই মাধ্যমে ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ব্রেকিং নিউজ প্রচার হচ্ছে।
 পরের দিন সব পত্রিকার শিরোনাম- ’ এবার শিক্ষককে প্রকাশ্যে চড় মারলেন এমপি’। এ ঘটনায় বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকগণ বিচারের দাবিতে প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে। চলছে মানব বন্ধন ও বিক্ষোভ। শিক্ষার্থীরা রাজপথে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজের গালে চড় মেরে অভিনব এক প্রতিবাদ জানাচ্ছে।  
    মতি স্যার এখন কেবলি পাথর। পাথর মানুষ। শুয়ে আছেতো আছে’ই, বসে আছেতো আছে’ই। বাইরে অঝর ধারায় বৃষ্টি। বৃষ্টির শব্দগুলো তার কাছে একটি ধ্বনি’ই উচ্চারিত হচ্ছে- ’খিচুরি’। ছেলেটাকে কি ভাবে গরুর গোস্ত দিয়ে খিচুরি খাওয়ানো যায় ... কিন্ত, তার ছেলে পাঁচ বছর বয়সের রতন ভুলে গেছে খিচুরি বিষয়টি। ওর মাথায় এখন একটি বিষয়’ই বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে- কবে সে বড় হবে.. বাবার গালে যে চড় মেরেছে, তার গালেও একটা চড়  মারার...
মতি স্যারের বাড়িতে সহমর্মিতা জানাতে প্রতিদিন ছুটে আসছে শ’ শ’ শিক্ষার্থী। যারা শূণ্য পেয়েছিলো তারাও স্কুলে যাওয়ার পথে এবং ফেরার পথে দল বেঁধে তাকে দেখে শান্তনা দিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে জাতীয় সংসদ সদস্য মোখলেস ভ’ইয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ’ঘটনাটি সম্পূর্ন ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত। ঐদিন এ ধরনের কোনো ঘটনা’ই ঘটেনি। প্রতিপক্ষ রাজনৈতীক মহল আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বীত হয়ে ঘটনাটি সাজিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ পরিবেশন করেছে।’ এমপি সাহেবের এ বক্তব্যে দেশের মানুষ আরো প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠে।
মতি স্যারের সাবেক ছাত্র/ছাত্রীরা ফেইসবুকে সামনের শুক্রবারে ঐ স্কুল মাঠে এক প্রতিবাদ সমাবেশ করার ষ্ট্যাটাস দিয়েছে। এতে ব্যাপক সাড়া পড়েছে।
স্কুলের মাঠ কানায় কানায় পরিপূর্ন হয়ে গেছে। মতি স্যারকে মঞ্চে চেয়ারে বসিয়ে শুরু হলো জ¦ালাময়ী বক্তৃতা। তিনদিনের মধ্যে এমপি মোখলেস সাহেবকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে, নতুবা সংসদ ভবন ঘেরাও করার কর্মসূচী ঘোষণা করেছে তারা। এছাড়া ছাত্ররা সবাই মিলে সাহসী মতি স্যারকে এক ভরি ওজনের একটি সোনার মেডেল উপহার দিয়েছে। এর’ই মাঝে এক ছাত্র বর্তমানে সাংাবাদিকতায় নিয়োজিত ও গীতিকার  মতি স্যারকে নিয়ে একটি গান লিখেছে। গানটি গাওয়ার জন্য বাদ্যযণ¿ও আনা হয়েছে । গানটি সে নিজেই গাইছে -                                                                  
লেখা পড়া করে যদি ঘোড়া চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো ঘোড়া নাই
লেখা পড়া করে যদি গাড়ি চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো গািড় নাই ।।
কাঠ ফাটা রোদ্রে ছেঁড়া ছাতা মাথায়
মতি স্যার পায়ে হেঁটে স্কুলে যায়
লেখা পড়া করে যদি ঘোড়া চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো ঘোড়া নাই
লেখাপড়া করে যদি গাড়ি চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো গাড়ি নাই।।
উত্তর পাড়ার ঐ মোখলেস
লেখা পড়ার নেই কোনো লেশ
তবুও তার আছে ঘোড়া বিএম ডব্লিউ গাড়ি
টাকা আছে কাড়ি কাড়ি
নাই নাই কোনো অভাব যে নাই।।
লেখা পড়া করে যদি ঘোড়া চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো ঘোড়া নাই
লেখা পড়া করে যদি গাড়ি চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো পাড়ি নাই
কাঠ ফাটা রোদ্রে ছেঁড়া ছাতা মাথায়
মতি স্যার পায়ে হেঁটে স্কুলে যায়..।।
পায়ে হেঁটে মতি স্যার হাজার ফুল ফোটায়-
এই সূর্যের সম্মান ফেরৎ চাই ফেরৎ চাই
মোখলেস গাড়ি হেঁকে হুল ফোটায়-
এই বেয়াদপের বিচার চাই বিচার চাই... ।।

বিচারের ধ্বনিতে কম্পমান বাংলাদেশ। বহু টিভি চ্যানেল এই অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করেছে।  
এতো কিছুর পরও মোখলেস সাহেব গাড়ি হাঁকিয়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। মাননীয় শিক্ষামণ¿ী একটি তদন্ত কমিটি করে দিয়ে কি সুন্দর বগল বাজাচ্ছেন। আর যে আমলা কর্মকর্তাকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে, তিনি কেমন প্রতিবেন তৈরী করবেন- তা বোঝার কারো বাকী নেই । বিচারের বাণী নিভৃতে আর কতকাল কাঁদবে..?
  মতি স্যারের হাতে এখন এক ভরি স্বর্ন। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় চল্লিশ হাজার টাকা। বৃষ্টির জন্য প্রতিদিন অপেক্ষা করছেন তিনি। কিন্তুু বৃষ্টির খবর নেই। এখন কাঠ ফাটা রোদ্র । ছেলেটি বৃষ্টির মাঝে খিচুরি খেতে চেয়েছিলো... খিচুরি আয়োজন করার মতো পর্যাপ্ত টাকা আছে- বৃষ্টি নেই। তিনি মনে মনে চিন্তা করলেন- কৃত্রিম বৃষ্টি তৈরী করবেন।
একদিন সোনার মেডেলটি দূরের এক বাজারে বিক্রি করে দিলেন। গরুর গোস্ত চাল ডাল কিনলেন। তার সহধর্মিনীর জন্য হুবহু আরেকটি কানের দোল বানালেন । দুইটা টিনও কিনলেন। আর কিনলেন কিছু পলিথিন।
খিচুরি রান্নার আয়োজন শুরু হলো। মতি স্যারের দুই মেয়ে মেয়ের জামাই ও নাতী/নাতনীরা বেড়াতে এলো। কিন্তু রাবেয়া বেগমের আপত্তি- রতন বৃিষ্ট ছাড়া খিচুরি খাইতো না। মতি স্যার বললেন, তোমার রান্ধা তুমি রান্ধো- একটু অপেক্ষা করো দেখবা কেমনে বৃষ্টি আনি...
মতি স্যার দশ/বারোটা পলিথিনে পানি ভরে টিনের চালে উঠলেন। চালের উপর বড়ই গাছের ডালে পানি ভর্তি পলিথিন গুলো বিভিন্ন জায়গায় বাঁধলেন। অদ্ভ’ত এক ছেলে মানুষী খেলা শুরু  করেছেন তিনি।
   বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে রতন সবার আগে খেতে বসে। আজও তাই করলো। মতি স্যার পানি ভর্তি পলিথিন গুলোকে ফুটো করে দিলেন। রিম ঝিম শব্দে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করলো... রতন মাটিতে শীতল পাটিতে বসে কি আনন্দ করে খিচুরি খাচ্ছে। মতি স্যার চালের এক ফুটোতে দেখছেন সে দৃশ্য... ঠিক তার বাবার মতো আসন পেতে বসে কত মজা করে রতন খিচুরি খাচ্ছে। আনন্দে মতি স্যারের দু’চোখে ঝরছে বৃষ্টি। কিন্তু মেকআপ করা বৃষ্টির তোড়ে তার চোখের জল ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। চোখের জল কেউ না দেখাটাই ভালো । এটা মানুষের একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়।
 হঠাৎ পা পিচলে চাল থেকে পড়ে যায় মতি স্যার। ঘরের পেছনে বিকট এক শব্দে সবাই ছুটে গিয়ে দেখে, মতি স্যার নিঃশব্দে কাঁতরাচ্ছেন । মাথায় ও বুকে প্রচন্ড আঘাতের কারনে কথা বলতে পারছেন না।
   ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে তাকে। চিকিৎসকদের ভাষ্য- মাথায় প্রচন্ড আঘাতের কারনে মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণ ঘটেছে। বাঁচার আশা ক্ষীণ। এতোক্ষন আইসিইউতে কড়াকড়ি থাকলেও এখন শিথিল করা হয়েছে । তার একমাত্র ছেলে রতনকে রোগী দেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে । রতন মতি স্যারের মাথায় ও গালে হাত বুলাচ্ছে। সন্তানের ষ্পর্শে মতি স্যারের চেতনা কিছুটা ফিরেছে। কিন্তু তা চারদিকে তাক করা কোনো মেশিনে ধরা পড়েনি। তিনি তার ছেলের হাতের ছোঁয়ায় খিচুরির গন্ধ অনূভব করতে পেরেছেন। ছেলেটি হাত ধোয়ার সময় পায়নি। কাজেই ওর হাতে খিচুরির গন্ধটা এখনো লেগে আছে। রতন বার বার  তার পিতার ডান পাশের গালে আলতো করে আঙ্গুল ছোঁয়াচ্ছে আর মৃদু সুরে ডাকছে- বাজান বাজান ও বাজান...মতি স্যার তার মায়াভরা ডাক স্পষ্ট শুনতে পারছেন এবং দেখতেও পারছেন তাকে। কিন্তু উত্তর দিতে পারছেন না। অনেক চেষ্টা করছেন কিছু বলার- পারছেন না। বুকে মনে হচ্ছে, বিশাল এক পাথর চাপা দিয়ে রয়েছে। পাথরটা কেউ সরিয়ে দিলেই তিনি কথা বলতে পারতেন। মতি স্যারের বলতে ব্যাকুল ইচ্ছে হচ্ছে- ’ বাবা রতন খুব মন দিয়ে শোনো, আমার গালে যে চড় মেরেছে সে নির্বোধ, বোকা। দেখো, তার এই বোকামীর প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে বাংলাদেশ। এখনো নির্বোধটা আমার কাছে ক্ষমা চায়নি। যাক, আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। বাবা রতন, তুমি মনে মনে যে প্রতিশোধ নেওয়ার পণ করেছো - তা ভুলে যেও।  
     ছেলেটির মায়াভরা ছল ছল চোখে তিনি আর তাকাতে পারছেন না। চোখের কর্ণিয়া একটু অন্য দিকে ঘুরালেন। চোখে পড়লো- ডেক্ট্রোজ স্যালাইনের দিকে। উনার কেবলি মনে হচ্ছে- নলের ভিতর দিয়ে কৃত্রিম বৃষ্টি বর্ষণ হচ্ছে সরাসরি তার দেহে। তিনি কয়েক ঘন্টা আগে ছেলের বৃষ্টিতে খিচুরি খাওয়ার বায়না মেটাতে পলিথিন দিয়ে এমন বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছিলেন তার ভাঙ্গা চালার ঘরে। ছেলের মতো তারও বায়না ধরতে ইচ্ছে হচ্ছে- ডিম ভাজি দিয়ে খিচুরি খেতে। সাথে থাকবে শুকনা মরিচ ভাজি। সবই আনা হয়েছে। শুকনা মরিচ ভাজির সুন্দর ঘ্রাণ নাকে ভেসে আসছে।
হঠাৎ তিনি আর এখন কিছুই দেখতে পারছেন না- শুকনা মরিচের ঘ্রাণ পাচ্ছেন না। ডেক্সট্রোজ স্যালাইনের  ফোটাও থেমে গেছে। চারদিক ঢেকে গেছে অন্ধকারে, এক ভয়াবহ অন্ধকার...  

রুহুল আমীন রাজু
কটিয়াদী , কিশোরগঞ্জ , বাংলাদেশ ।


বিশ্ব বাবা দিবস ও আমার বাবা আলহাজ্জ্ব কে.এম আবদুল করিম (রাহিমাহুল্লাহ) - ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম

সোমবার, ১৯ জুন ২০১৭

রোববার বিশ্ব বাবা দিবস। এনসাইক্লোপেডিয়া থেকে জানা গেছে, জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বের প্রায় ৭৪টি দেশে বাবা দিবস পালিত হয়।বাবার প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা, জানানোর জন্যই এই দিবস। তবে বাবা কি শুধুই একটি বিশেষ দিনের জন্য! বাবা আর সন্তানের সম্পর্ককে কোনো দিবস দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না।

মানুষকে মহান আল্লাহ অফুরন্ত নিয়ামত দান করেছেন। সেই অসাধারণ সুন্দর নিয়ামতের একটি সন্তানের জন্য তার মা-বাবা। বাবা, সন্তানের মাথার ওপর যার স্নেহচ্ছায়া বটবৃক্ষের মতো, সন্তানের ভালোর জন্য জীবনের প্রায় সবকিছুই নির্দ্বিধায় ত্যাগ করতে হয় তাকে, আদর-শাসন আর বিশ্বস্ততার জায়গা হলো বাবা। বাবার তুলনা বাবাই। যার কল্যাণে এই পৃথিবীর রূপ, রঙ ও আলোর দর্শন। বাবা শাশ্বত, চির আপন, চিরন্তন।বাবাকেই আদর্শ মনে করে সন্তানরা। বাবা সন্তানকে শেখান, কীভাবে মাথা উঁচু করে পৃথিবীতে টিকে থাকতে হয়।আজ বাবা আমাদের মাঝে নেই, তিনি ১১ নভেম্বর ২০১৬, শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টায় ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি আর কখনও আমাদের মাঝে আসবেন না, চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
‘আমার বাবা’—এই দুটি শব্দের মধ্যে নিহিত আছে বাবার জন্য আমার বলা না-বলা যত আবেগ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, গর্ব; তাঁকে হারানোর কষ্ট আর অশ্রু।

জীবন প্রবহমান এক গতিধারা। কখনো তরঙ্গময়, কখনো নিস্তরঙ্গ। ক্ষণিকের যাত্রা হয়তো। আর কিছু না। বেঁচে থাকাই যেন বিস্ময়, তবে ভালো কাজের মাধ্যমে জীবনকে উপভোগ করাটাই মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। যাতে মৃত্যুর পরও মানুষ বেঁচে থাকার সময়ে যে কাজ করা হয় তা নিয়ে আলোচনায় মেতে থাকে। জীবন যাতে মানবকল্যাণে, দেশের কল্যাণে নিবেদিত থাকে।

আব্বা আমাদের কাউকে কিছু না বলে, কাউকে কিছু করার কোন সুযোগ না দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। আর কখনও আব্বার সাথে দেখা হবে না, কথা হবে না এটি আমার কাছে দুঃস্বপ্নের মত মনে হয়। খবরটা শোনার পরও বিশ্বাস করিনি, ভেবেছি কোথাও কোন ভুল হচ্ছে।

জীবন বহমান। সকল হারানো কিংবা শোক-তাপের ঊর্ধেও জীবন স্বীয় গতিতে চলবে। এটাই চিরন্তন সত্য। স্মৃতি শুধুই স্মৃতি। কিছু স্মৃতি বড়ই বেদনাদায়ক। কিন্তু স্মৃতিকে যেমন ভূলে থাকা যায় না তেমনি অস্বীকারও করা যায় না।

বাবাকে আমি ‘আব্বা’ ডাকতাম, আমার কাছে মনে হতো এই সম্বোধনটাই বেশি কোমল এবং বেশি কাছের। প্রতিটি সন্তানের বুক জুড়ে থাকে বাবার প্রতি চির অম্লান শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। এই ভালোবাসা জগতের সকল কিছুর তুলনার ঊর্ধে। আর সেই ভালোবাসা যদি সঠিক সময়ে সঠিক প্রয়োগ না হয়, তাহলে জীবনের প্রতিটি পদে, প্রতিটি পদক্ষেপে নিজেকে নিজের কাছে-ই অপরাধী করে তুলতে পারে। আমি জানি, আমি আমার বাবাকে কতোটা ভালোবাসি। কিন্তু আজ আমার সেই ভালোবাসা আমি কাকে প্রর্দশন করবো? কাকে আমি সেই প্রিয় ‘আব্বা’ বলে ডাকবো? আমার ভাগ্যবিড়ম্বিত এই আক্ষেপ অন্তরের। এই জ্বালা কি কোনদিন নিভবে?

বাবার কথা মনে পড়ে কেন? আজ বাবা নেই। তুমি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে আমাদের ছেড়ে তুমি চলে গেছে দূরে , বহু দূরে। আমাদের শোক সাগরে ভাসিয়ে তুমি চলে গেছো না ফেরার দেশে। পৃথিবীর কোন শক্তি তোমাকে আর আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দিতে পারবে না জানি।

কোথায় যেন কী নেই। আকাশের দিকে তাকালে আকাশে সুুরুজ নেই। রাতের সিতারা নেই। চাঁদ নেই। জোছনা নেই। দিকে দিকে খাঁ খাঁ শূন্যতা ভর করেছে। বাবার সাহচার্য-সহযোগিতার কাঙাল হয়ে উঠছি দিন দিন।

আহ! আজ দিন চলে গেছে। আমি বাবাহীন অসহায়। আমার পথের চার দিক তিমিরে ঘেরা। আমাকে আপন করে আর কেউ ভালোবাসে না। বাবার মতো মমত্ব নিয়ে কেউ তো আর এলো না এ জীবনে। কেউ আর বাবার মতো নিঃস্বার্থ ভালোবাসে না। সবার ভালোবাসার ভণিতার মাঝে স্বার্থ কাজ করে। সবাই ভালোবাসার অভিনয় করে বিনিময়ে কিছু নিতে চায়। কিন্তু বাবা তোমরা তো কিছু নিতে চাও না, শুধু দিতে চাও।বাবা আমার খুব আবেগি ছিলেন। আমাকে খুব শাসন করতেন। খুব আদর করতেন।

বাবা নেই! বাবা! না, এ হতে পারে না! সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ এভাবে মারা যেতে পারে না। কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। এই মাত্র আমাদের সাথে কথা বললেন। আমাদের সাথে খাবার খেলেন। তিনি কিভাবে চলে যাবেন?

আসলে কেউ জানে না কার ডাক কখন আসে। একটু আগের হাসিখুশি মানুষটি হঠাৎ মহান রবের ডাকে অনন্ত জীবনের পথে যাত্রা করলেন। আমরাও যেকোনো একদিন এভাবেই রবের ডাকে সারা দেবো। চলে যাবো চিরতরে।

 

পৃথিবীতে এমন কোনো ভাষা নেই, এমন কোনো সাহিত্য নেই যা দিয়ে আমার মনের এ ক্ষতকে প্রকাশ করতে পারব। এমন কোনো সান্ত্বনার বাণী নেই, যা শুনিয়ে আমার বুকের মাঝে পাথরচাপা কষ্টগুলোকে কমানো যাবে। আমার বাবা নেই। আমার বটবৃক্ষ নেই। যে আমার জন্ম থেকে তার শীতল ছাড়া দিয়ে বড় করেছে। আমি সে মহীরুহ ছাড়া শূন্য হলাম। এখন গ্রীষ্মের তাপদাহে আমার গা পুড়ে ছারখার হবে। কেউ আর বটবৃক্ষের ছায়া নিয়ে আমার পাশে দাঁড়াবে না। কেউ না। আমি সূর্যের তেজে মোমের মতো গলে গলে নিঃশেষ হয়ে যাবো ধীরে ধীরে।

ফুফু সান্ত্বনা দিলেন : বাবা কারো চিরদিন বেঁচে থাকে না। আমরাও একদিন চলে যাবো। আমি বুঝিনি তার এহেন প্রস্থান আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আঘাত। সবচেয়ে বড় বেদনা। বড় ক্ষত। বড় কষ্ট।

আসলে যার বাবা আছে সে বোঝে না বাবা কী! যার নেই সেই বোঝে! কিন্তু সময়মতো না বুঝলে সারা জীবন কাঁদতে হয়। কেউ কাছে এসে বাবার মতো সোহাগ দেখায় না। কেউ আগলে রাখে না। কেউ ভাবে না বাবার মতো। বাবা তো বাবাই। পৃথিবীর কিছু দিয়ে কি তার তুলনা চলে? সন্তানের বড় হওয়ায় যাবতীয় আয়োজন। মানুষ হওয়ার যাবতীয় প্রোগ্রাম সব তো বাবাই করেন। বাবা আর ফিরবে না। আজকে যারা বেঁচে আছি একদিন সবাই চলে যাবো, কেউ ফিরব না। তবে যত দিন আছি, এ ধরাধামে তত দিন তো বাবা হারানোর ব্যথা বয়ে বেড়াতে হবে।

আপনাদের মধ্যে যাদের বাবা এ পৃথিবী থেকে বিদয় নিয়েছেন তারা কি কেউ পিতৃহীনতার ব্যথা থেকে মুক্তিলাভ করতে পেরেছন? কখনো কি পারবেন? কারও বাবা-মা চিরজীবন বেঁচে থাকেন না। মানুষের জন্মই হয় একদিন মৃত্যুর স্বাদ লাভ করার জন্য। সবাই মরণশীল। তবুও এত কষ্ট হয় কেন চলে যাওয়ায়? সবার বাবা সবার কাছেই অতি প্রিয় ও মূল্যবান। আমরা সবাই কিন্তু দাঁত থাকতে দাঁতের মূল্যায়ন করি না, ঠিক তেমনি বাবা জীবিত থাকতে বুঝতে পারি না যে কী ছায়ার নিচে নিজেদেরকে রাখছি। বটগাছের ছায়া, রোদ-বৃষ্টিতে আশ্রয়ের স্থান। বিপদ-আপদে, রোগ-শোকে, দুশ্চিন্তা-কান্নায় যার কাছে নির্দ্বিধায় যাওয়া যায়। যে স্বার্থহীনভাবে বুকে আগলে ধরে তার যতটুকু জ্ঞান, প্রজ্ঞা আছে তা দিয়ে রক্ষাকবচ হিসেবে, ঢাল হয়ে রক্ষা করে, সে হলো বাবা।

তুমি আমাদের সকলকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গছেো, তুমি বেঁচে থাকতে তোমার গুরুত্ত আমরা বুঝি নাই, আজ আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি তোমার অনুস্থতি, তোমার চলে যাওয়া আমাদের জীবনে বিশেষ করে আমার জীবনে অপুরনীয় ক্ষতি।

আমার বাবা একজন ভালো ও নীতি আদর্শবান ছিলেন। তিনি ছিলেন বললে ভুল হবে, তিনি এখনো আমাদের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে থাকেন, এটা আমার অনুভব, আমার বিশ্বাস। আমার জন্ম ও শিক্ষাজীবনের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত আমার চাকরী অঙ্গনে প্রবেশের প্রথম দিন থেকে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার ছত্রছায়ায় ছিলাম। চলার পথে, কি পারিবারিক জীবন ক্ষেত্রে, কি পেশা/চাকরী জীবন ক্ষেত্রে, কি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক ঝড়ঝাপটার সম্মুখীন হয়েছি। বাবা আমার, তার মেধা, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাকে তার প্রশস্তবুকে আগলে রেখেছিলেন। এখন কোনো বিপদে দিশাহারা হয়ে পড়ি। অভিভাবকহীনতার কষ্টে ভুগি। কারও পরামর্শ চাইলে শুনতে হয়- ‘দেখ, তুমি অনেক দায়িত্বশীল পর্যায়ে আছ, আমাদের চেয়ে ভালো বুঝ- যা ভালো মনে কর, তাই কর।’ এখন কেউ বলার নেই- থাম, আমি দেখছি, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ, সব ঠিক হয়ে যাবে, নিজে ভালো তো জগৎ ভালো- নিজে ভালো থাকলে, ঠিক থাকলে, সবই ভালো থাকে বা হয়। মাথায় স্নেহের হাত বুলানোর কেউ নেই। বাবা থাকতে মনে হতো না আমি বড় হয়েছি, মনে হতো এখনো ছোট আছি। এখন মনে হয় বয়স হয়েছে, নিজেরই বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাবা হারানোর ব্যথা বা বাবাহীন জীবনের কষ্ট ভয়ানক। যে বাবা হারায়নি সে এই ব্যথা বুঝবে না।

আদর্শবান বাবা হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালনে একটুও শিথিলতা প্রদর্শন করেননি। পাঁচ বছর বয়স থেকে আমাকে নামাজে অভ্যস- করেন। এর পর থেকে কোনো দিন নামাজ ছাড়া তো দূরের কথা, জামাতে নামাজ না পড়লে আব্বার কঠোর বকুনি শুনতে হতো।

মানুষ হিসেবে যেসব মৌলিক গুণ থাকা উচিত, তার সব কিছুই আব্বার কাছ থেকে শিখেছি। সর্বক্ষেত্রে মিথ্যা কথা থেকে বিরত থাকা, ওয়াদা রক্ষা করা, সময় অনুযায়ী চলা, সময়ের অপচয় না করা, মানুষের সাথে সব সময় ভালো আচরণ করা ইত্যাদি অনেক বিষয়ে প্রায়ই তিনি আমাদের কুরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বোঝাতেন। এগুলোর কোনো কিছুতে ভুল হলে খুবই রাগ করতেন।

আমার বাবা একদম সাদামাটা ছিলেন তার আধুনিকতা সম্বন্ধে ধারণা কম ছিল। বাবার জন্য নতুন কিছু কিনে আনলে প্রথমেই বলতেন ‘অনেক আছেতো আবার কেন? কেন পয়সা নষ্ট করলে, শুধু শুধু খরচ করলে, তারপরেই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত থাকতাম, কত নিয়েছে এত টাকা দাম না, আমি চালাকি করে আগে থেকেই দাম লেখা কাগজটা খুলে ফেলতাম। দামের কথা এড়িয়ে যেতাম। আমার বাবা কখনোই দামি কোন কিছু পরতেন না।

আমার বাবা অনেক সময় আমাকে বলতেন তুমি খুব আবেগপ্রবণ, হুজুকে চল, বাস্তববাদী না, ঠিক সময় ঠিক কাজ করতে পারি না, যার কারণে অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়। তাই মাঝে মাঝে বকা শুনতে হতো। আবার আমার অনেক ক্ষেত্রে অবশ্য প্রশংসা করতেন। তবে আমি যা কিছু করতাম আব্বাকে না জানিয়ে করতাম না। আমার কাছে তিনি অনেক কথা বলতেন, পুরনো দিনের স্মৃতিচারণা করতেন, মানুষকে খুব ভালোবাসতেন। রাজনীতির কথা গল্প করতেন। কারও বিরুদ্ধে কিছু বলা একদমই পছন্দ করতেন না। তিনি ছোট বড় সবাইকে সম্মান করতেন, সদা হাস্যজ্বল মানুষের বিপদে আপাদে তাদের আন্তরিকভাবে পাশে থাকতেন এবং কীভাবে মানুষকে আপন করে নিতে হয় তা তিনি জানতেন। প্রিয় মানুষ বা কাছের মানুষ পেলে বুকে জড়িয়ে ধরা, হাতটা ধরে নিয়ে নিজের হাতের মুঠোয় রাখা, আদর করা তার স্ব-ভাব সুলভ একটি আচরন।কারও কোনো ভালো খবর জানতে পেলে খুশি হয়ে তা আমাদেরও জানাতেন। পরিচিত কারও মৃত্যুর সংবাদ পেলে যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, শরীর সুস্থ না থাকলেও জানাজায় শরিক হতেন।

আমার বাবা আলহাজ্জ্ব কে.এম আবদুল করিম ( রাহিমাহুল্লাহ ) ছিলেন ঝালকাঠী জেলার রাজাপুরস্থ সাতুরিয়া হামিদিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। আমার বই পড়ার অভ্যেস বাবাকে দেখেই। প্রচুর ইংরেজি শব্দ জানতেন, ছোটোবেলায় আমাদের শেখাতেন। তার শিক্ষকতার আদর্শই তার সমগ্র জীবনাচরণের অঙ্কুর ও শেকড়কে ধারণ করেছিল। এদিকে তার সকল মানবিক গুণাবলি, কর্তব্য-পরায়ণতা, দৃষ্টিভঙ্গির উদারতা, সাহসিকতা ও ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানোর সমুদয় সত্যনিষ্ঠায় যর্থাথই হয়ে উঠেছিল তার পরিচয় I বাবা যা সঠিক মনে করেছেন, তা দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করেছেন। কখনো তিনি আশা ছাড়েননি। তিনি বিশ্বাস করেছেন, আমাদের মধ্যে যে অপূর্ণতা, অসত্য ও অমানবিকতা রয়েছে, তা পেরিয়ে আমরা একদিন সত্যিই সুন্দর ও সত্যের ভোর দেখব।

alt

আমার বাবা আলহাজ্জ্ব কে.এম আবদুল করিম ( রাহিমাহুল্লাহ ) এলাকায় গড়ে তুলেছেন বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে সাতুরিয়া ইঞ্জিনিয়ার এ,কে,এম রেজাউল করিম কারিগরি স্কুল এন্ড কলেজ, আমড়াঝুড়ি জামিয়া ইসলামীয়া বহুমুখী দাখিল মাদ্রাসা, কে,এম, আ: করিম জামিয়া ইসলামীয়া এতিমখানা অন্যতম।

এছাড়াও শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, মাওলানা আ: রহীম, (র:) স্মৃতি পাঠাগার, মোস্তফা হায়দার একাডেমী, পূর্ব আমড়াঝুড়ি বায়তুল মামুর জামে মসজিদ, সাতুরিয়া খানবাড়ী জামে মসজিদ, উত্তর তারাবুনিয়া মোল্লাবাড়ী জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি দরিদ্র জনগোষ্ঠির মানোন্নয়নে ভূমীকা রেখেছেন। সম্প্রতি কাউখালি শহরে দৃষ্টি নন্দন ফোয়ারা ও বিশ্রামাগার স্থাপিত হয়েছে মোসলেম আলী খান ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহযোগিতায়। ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলায় তিনি বাংলা অনুবাদ কোরআন শরীফ বিতরন করেন।

সেবামূলক কাজ পরিচালনার জন্য মোসলেম আলী খান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময়ে গরীব ছাত্র-ছাত্রী ও মসজিদের ইমামদের মধ্যে আর্থিক সহয়তা প্রদান করেছেন। রাজাপুর শহরে আর্সেনিক মুক্ত বিশুদ্ধ পানির জন্য তিনি সম্প্রতি ইসরাব নামক একটি এনজিওকে ঋন দিয়েছেন।

বাবা কতো লোকের উপকার করেছেন, কতো স্টুডেন্টকে ফ্রিতে পড়িয়েছেন, পার্থিব সম্পদের চাইতে মনের ঐশ্বর্য বাড়াতে চেষ্টা করেছেন; কিন্তু কখনোই বিন্দুমাত্রও অহংকার দেখাতে দেখিনি। কিন্তু নির্দ্বিধায় বলা যায় আমার বাবা একজন আজন্ম সংগ্রামী মানুষ ছিলেন। সভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তিনি ধর্মভীরু ছিলেন, কিন্তু ধর্মান্ধ ছিলেন না। কখনোই তার মধ্যে কোন গোঁড়ামি দেখিনি।

ভয়াবহ ঘুর্নঝড় সিডরের পরে মোসলেম আলী খান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের ত্রান তৎপরতা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। এ সময় তার প্রতিষ্ঠিত মোসলেম আলী খান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কাউখালি, ভান্ডারিয়া, ঝালকাঠি সদর, রাজাপুর, কাঠালিয়া, পিরোজপুর, পটুয়াখালির কলাপড়া, বরগুনার পাথরঘাটা এবং বাকেরগঞ্জ থানায় ৩ হাজার ৬শ ৭০ জন দূর্গত মানুষের মধ্যে শাড়ি-লুঙ্গি, শীতের কাপড়, শুকনো খাবার, হাড়ি-পাতিল,থালাবাসন, খাবার স্যালাইন, ঔষধ ও নগদ অর্থ বিতরন করেন। কুরবানীতে তিনি কাউখালি ও ভান্ডারিয়ার প্রতিটি ইউনিয়নে এবং রাজাপুর ও ঝালকাঠিতে পশু কোরবানী দিয়ে সিডর আক্রান্ত ২ হাজার দুস্থ মানুষের মধ্যে গোশত বিতরন করেছেন। সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি আর্থিক সাহায্য করেছেন। যার মধ্যে কাউখালির কেউন্দা স্কুল ও সাতুরিয়া রহমIতয়া দাখিল মাদ্রাসা অন্যতম। এসব এলাকায় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কিছু মসজিদেও তিনি আর্থিক সহয়তা প্রদান করেন।

আমার জীবনে সবচেয়ে বড় পাওয়া আমার বাবা। আমার বাবা সারাজীবন মানুষের উপকার করেছেন। তিনি নিজেকে নিয়ে যতটুকু ভাবতেন তার চেয়ে বেশি ভাবতেন দেশ এবং সমাজকে নিয়ে। তার জীবনের আদর্শ ছিলো মানুষের উপকার করা। সাধারণভাবে চলাফেরা করা তার পছন্দ ছিলো। তিনি সারাজীবন সৎভাবে জীবনযাপন করেছেন, মানুষের উপকার করার চেষ্টা করেছেন, কারো কোনো ক্ষতি করেননি। “কারো উপকার করতে না পারো, কখনোই কারো ক্ষতি কোরো না।” ছোটোবেলা থেকেই এটা সবসময়ই বাবার মুখে শুনে এসেছি।বাবা তাঁর বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনসহ সব বয়সী মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ভালোবাসতেন। বাড়িতে কেউ এলে কখনোই তাঁকে কিছু না খাইয়ে বাবা বিদায় দিতেন না। আপ্যায়ন করতে তিনি ভালোবাসতেন।

ছোট বেলায় বাবা যেমন আদর করতেন, তেমনি শাসনও করতেন। অন্যায়কে পশ্রয় দিতেন না তিনি কখনও। সব সময় শিখিয়েছেন- চরিত্রবান হতে হবে, সৎপথে চলতে হবে। লেখাপড়া শিখে মানুষের মত মানুষ হতে হবে। তাঁর স্বপ্ন ছিল আমরা যেন পড়ালেখা শেষ করে ‘মানুষের মত মানুষ’ হতে পারি। পড়ালেখা করেছি, ‘মানুষ’ হতে পারব কিনা জানিনা। শুধু বলতে পারি তার প্রত্যাশা পূরণে আমি আজও নিরন্তর সাধনায়।

বাবা আমাদের জন্য তার আদর্শ রেখে গেছেন। না, আদর্শ মানে গালভরা কিছু নয়। সামান্য নিয়েও সততার শক্তিতে আর ভালোবাসায় কিভাবে সবকিছু কানায় কানায় ভরিয়ে রাখা যায়, এ শিক্ষা তো দিয়ে গেছেন। ছোট্ট একটা জীবন আনন্দময় করার জন্য সততার চেয়ে বড় আদর্শ আর কী হতে পারে।

প্রতিটি সন্তানের কাছে এক শ্বাশত, মহান ও গভীর অনুভূতিপূর্ণ শব্দ হলো বাবা। সন্তান, কিংবা পরিবার, সবার কাছেই বাবা আশ্রয়ের নাম, নির্ভরতার প্রতীক। বাবার অবদান, ত্যাগ, স্নেহ, ভালোবাসা সকল তুলনার ঊর্ধে। পিতার সাথে সন্তানের সম্পর্ক কখনো শ্রদ্ধার, কখনো ভয়ের আবার কখনো বা বন্ধুত্বের। পৃথিবীর সব সন্তানের কাছেই তার মা-বাবাই শ্রেষ্ঠ। আমার কাছেও তাই। পৃথিবীতে অন্য আট-দশ জন বাবা থেকে আমার বাবা একটু আলাদা। কারণ বাবার চিন্তা-চেতনা, মন-মানসিকতা সবকিছু ভিন্ন রকম। পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষকে দেখেছি নিজের স্বার্থের জন্য মানুষের উপকার করে। কিন্তু সবসময় আমার বাবাকে দেখতাম নিঃস্বার্থভাবে মানুষের উপকার করতে। প্রয়োজনে নিজের ক্ষতি করে হলেও মানুষকে সাহায্য ও সহযোগিতা করত। তার সঞ্চয় ছিল শুধু মানুষের ভালোবাসা। আজন্ম লোভ ও লালসার ঊর্ধ্বেব থেকে গণমানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। সেবার দ্বারা ও মহৎ কর্মের মাধ্যমে আলোর প্রদীপ হাতে নিয়ে মানুষটি অবদান রেখেছিলেন, সে মানুষটি আজ তার নিজ গ্রামে চিরনিদ্রায় শায়িত। বাবার মৃত্যুর পর অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। বাসায় তাঁরা এসেছেন। দেশের নানা প্রান্ত ও দেশের বাইরে থেকে ফোন করেছেন। বাবার প্রতি তাঁদের যে গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার অভিব্যক্তি দেখেছি, তা অতুলনীয় ও হৃদয়স্পর্শী। ভালোবাসার সম্ভবত একটি তরঙ্গ আছে। বাবা যেমন মানুষকে ভালোবাসতেন, তারাও তেমনি ভালোবাসতেন বাবাকে। ভালোবাসার সেই অদৃশ্য তরঙ্গ সবাইকে স্পর্শ করত।
বাবা সব সময় এত অকৃত্রিম, অনাড়ম্বর ও সহজভাবে থাকতেন যে তাঁর হৃদয়ের বিশালতা, গভীরতা ও প্রজ্ঞাসহ বহুকিছুই আমরা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারিনি।মানুষকে ভালোবাসলে, তাদের জন্য কাজ করলে ও জীবন উৎসর্গ করলে মানুষ ভালবাসায় তার প্রতিদান দেয়। হয়ত আব্বার অনেক ভুলত্রুটি ছিল, ভুলত্রুটি ছাড়া তো কোন মানুষ নেই। আব্বার জানাজায় অনেক মানুষ এসেছিলেন । সবাই আব্বার জন্য আল্লার কাছে দোয়া করেছেন, একজন ভাল মানুষ হিসেবে তাঁর হয়ে মাফ চেয়েছেন।

বাবা আর ফিরবে না। আমিও চলে যাবো। ফিরব না। আজকে যারা বেঁচে আছি একদিন সবাই চলে যাবো, কেউ ফিরব না। তবে যত দিন আছি, এ ধরাধামে তত দিন তো বাবা হারানোর ব্যথা বয়ে বেড়াতে হবে।
তবুও সব ব্যথা, সব যন্ত্রণা ছাপিয়ে যদি বাবার মতো হতে পারতাম। বাবার মতো উদার মনের মানুষ। মহৎ হৃদয়ের অধিকারী। যদি তার স্বপ্নের সমান বড় হতে পারতাম।আব্বা নেই! তার অনুপুস্থিতি আমাদের মাঝে বিরাট শুন্যতা তৈরি করেছে। আল্লাহ যেন তার অসম্পূর্ণ কাজ গুলি আমাদের দ্বারা পূর্ণতা দান করেন।

আজ থেকে সাত মাস আগে আমার আব্বা আলহাজ্জ্ব কে.এম আবদুল করিম
(রাহিমাহুল্লাহ) দুনিয়া থেকে চির বিদায় নিলেন। হে আল্লাহ! তোমার বান্দাহ কে তুমি এই রহমত,নাযাত,মাগফিরাতের মাসের উছিলায় ক্ষমা করে দিও, (রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বা ইয়ানি ছাগিরা।)
ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে মানুষের মনে তার জন্য যে ভালোবাসা পয়দা করে দিয়েছো, সেই তাকে মাটির কবরে তোমার কুদরতি ভালোবাসায় সিক্ত করো । যে সম্মান দুনিয়ায় তুমি তাকে দান করেছো, শেষ বিচারের দিনে মেহেরবানী করে তার সম্মান আরো বাড়িয়ে দিও । নশ্বর এ পৃথিবীতে তুমি তাকে দয়াকরে যে সুখ, শান্তি, আরাম দিয়েছো, চীরস্থায়ী জান্নাতে মায়াকরে তাকে তা দান করো । জান্নাতে তোমার পাশে একটি ঘর দিও । আমিন।

এখনও মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের মধ্যেই আছেন। তুমি আজ বেচে আছ মানুষের ভালোবাসায়, বিশ্বাসে। সর্বোপরি একজন ভালো মানুষ হিসেবে বেচে থাকবে আমাদের মাঝে আজীবন। কেমন আছেন আমাদের বাবা তা হয়তো আমরা দেখতে পাইনা , তবে অনুভব করি তিনি সব সময় আমাদের পাশেই আছেন এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কৃপায় অনকে ভাল থেকে আমাদের অনুপ্ররেণা দিয়ে যাচ্ছেন। আমাদরে প্রিয় “বাবা”র জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন। আল্লাহ রব্বুল আল-আমীন যেন তাকে জান্নাত বাসী করেন।

বাবা আজ তুমি নেই , আজ তুমি ছাড়া আমরা যে কি অসহায় তা বুঝতে ভুল হয়না একটি বার। তুমি ছিলে আমাদের প্রান আর আমরা ও ছিলাম তোমার প্রান। আল্লাহ আমার বাবার সকল পাপ মাফ করো, কবরের আযাব মাফ করো, তার রূহের শান্তি দাও, তাকে জান্নাত দাও ।

রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি ছগীরা ।

রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি ছগীরা ।

‘‘হে আমার রব! তাঁদের প্রতি দয়া কর যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাদের প্রতিপালন করেছিলেন।’’

(সূরা বনি ইসরাঈল- ২৪)

লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, কলামিষ্ট, সমাজ সেবক ও রাজনীতিবিদ ।


পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যস্থতায় চীনের আগ্রহ ।আবু জাফর মাহমুদ

বুধবার, ১৪ জুন ২০১৭

পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার বিষয়ে এই প্রথম আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির দফতর থেকে দেয়া বিবৃতিতে একথা জানানো হয়েছে। প্রতিবেশী পাকিস্তানের সাথে আফগানিস্তানের সুসম্পর্ক থাকা উভয় দেশের নাগরিকদের জন্যে যেমন খুবই জরুরী,তেমনি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যেও অপরিহার্য্য।

তাছাড়া আঞ্চলিক শক্তি পাকিস্তানের সাথে এই  সুসম্পর্কে চীনের সহায়তা বৃদ্ধির পথকেও উম্মুক্ত করে দেবে বলে ধারণা করা যায়।ভূরাজনৈতিক কারণে রাশিয়া আমেরিকা সহ অন্যেরা আফগানিস্তানের সাথে পাকিস্তানের বিরোধ গড়ে আসছে এতোদিন।প্রতিবেশী ভারত তার শত্রুদেশ পাকিস্তানকে চাপে রাখার উদ্দেশ্যে আফগানিস্তানকে ব্যবহার করে চলেছে। আফগানিস্তান–পাকিস্তান সীমান্তও নানা জটিলতায় ঝুঁকিতে থাকে। চীনের এই আগ্রহ প্রকাশের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তনের সূচনার আভাস মিলে।

বিবৃতিতে  আশরাফ গনির বরাত দিয়ে আরো বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের শান্তি প্রক্রিয়ায় এই প্রথম চীন মধ্যস্থতা করতে চাইছে। শিগগিরই চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই কাবুল সফর করবেন বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। বিবৃতিতে  আশরাফ গনির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি দাবি জানিয়ে আসছে আফগানিস্তান। তবে সরকারের সঙ্গে সরকারের ভিত্তিতে বিরাজমান সমস্যার নিষ্পত্তি করতে হবে বলেও এতে বলা হয়েছে।কাবুলে আত্মঘাতী ট্রাক বোমা হামলায় দেড়শ’র বেশি মানুষ নিহত হওয়ার মাত্র দু’ সপ্তাহের মধ্যে চীনের বরাত দিয়ে বক্তব্য প্রকাশিত হলো।

 এ ছাড়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, আমেরিকা এবং চীনকে গঠিত চতুর্পক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আফগানিস্তান সফরের সময় এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।তালেবান এবং আফগান সরকারের মধ্যে সরাসরি শান্তি আলোচনার জন্য ২০১৬ সালের  জানুয়ারি মাসে চতুর্পক্ষীয় গোষ্ঠী গঠন করা হয়েছিল।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি টানাপড়েন বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি একবার দু’দেশের মধ্যে সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছিল পাকিস্তান। এ ছাড়া, গত মাসে আফগান সেনাবাহিনীর গুলিতে নয় পাকিস্তান নিহত হয়েছিল। নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং বেসামরিক ব্যক্তিরাও ছিলেন। এদিকে পাল্টা হামলায় আফগান ৫০ সেনা নিহত হওয়ার দাবি করেছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী।  

 আফগানিস্তানের তালেবানের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন আলোচক সম্প্রতি চীন সফর করেছেন। চীনের সরকারি আমন্ত্রণে এ সফর করেন তারা। তালেবানের দুই কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।তালেবানকে শান্তি প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে চীন।তারই অংশ হিসেবে আফগান প্রতিনিধি দল চীন সফর করেন। মস্কোয় পাকিস্তান, চীন এবং রাশিয়ার শীর্ষ স্থানীয় কূটনৈতিকদের বৈঠকের কয়েক দিন পরই এ সফর করা হয়।

তালেবানের কাতার দফতরের প্রধান শের আব্বাস স্টানিকজাদেহ্‌র নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তালেবান প্রতিনিধি চীন সফর করেন। এ দলে মৌলভি শাহাবুদ্দিন দিলওয়ার, জান মোহাম্মদ মাদানি, সালাম হানাফি এবং ডা সালেহ ছিলেন বলে তালেবান সূত্রের বরাত দিয়ে পাকিস্তানের একটি দৈনিক জানিয়েছে। এ ছাড়া, তালেবান দফতরের তৎপরতা সম্পর্কে অবহিত একটি সূত্রও এটি নিশ্চিত করেছে।

 অবশ্য, তালেবান একটি সূত্রকে গত মাসের এ সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ইউরোপীয় দেশ নরওয়ে, জার্মানি, ফ্রান্স ব্রিটেনসহ প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক দেশ সফরের অংশ হিসেব এটি করা হয়। কাতারের রাজনৈতিক দফতর তৎপরতা এর সঙ্গে জড়িত বলেও জানান তিনি।

আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং আফগান সংকট আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার জন্য কাতারের তালেবান দফতর তৎপর বলেও অবহিত করেন তিনি।অবশ্য তালেবানের আরেক সূত্র বলেছে,  গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে চীন আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা পালন করতে চায়। সে কারণেই তালেবানকে আমন্ত্রণ জানান হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

 তালেবানের সফরের পরই আফগান বিষয়ক চীনের বিশেষ দূত দেং শিজুন কাবুল সফর করেন। এ সময়ে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনিসহ শীর্ষস্থানীয় আফগান নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। তার সঙ্গে বৈঠকের পর দেয়া বিবৃতিতে গনির দফতর থেকে বলা হয়েছিল, তালেবানকে শান্তি প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে উৎসাহিত করছে চীন। চীনের সঙ্গে বৈঠকের সময়ে তাদের উৎসাহিত করা হয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছিল।

আফগানিস্তানের তালেবানের একটি প্রতিনিধি দল  গত বছরের  মাঝামাঝি চীন সফর করেছে। তালেবান সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এ খবরে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে দখলদারিত্ব নিয়ে আলোচনার জন্য প্রতিনিধি দলটি চীন সফর করে। মার্কিন মদদপুষ্ট কাবুল সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার একই সময়ে চীন সফর করল আফগান তালেবান।এক প্রবীণ তালেবান নেতা এ সম্পর্কে বলেছেন, তাদের কাতারের রাজনৈতিক দফতরের প্রধান আব্বাস স্তানাকজাই’র নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি  বেইজিং সফর করে। চীন সরকারের আমন্ত্রণে গত ১৯ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত এ সফর অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তালেবান নেতা বলেন, বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গেই তালেবানের সুসম্পর্ক রয়েছে।  এ সব দেশের মধ্যে চীনও রয়েছে।সফরে বিদেশি বাহিনীর দখলদারিত্ব এবং আফগান জনগণকে হত্যার বিষয়টি চীনা কর্মকর্তাদের কাছে তুলে ধরা হয় বলেও জানান তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তালেবানের অন্যান্য প্রবীণ নেতাও এ সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।তালেবানের কাতার দফতরের পক্ষ থেকে কথা বলার অনুমতি নেই বলে নাম প্রকাশ করতে চান নি তারা।অবশ্য চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

 কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী উপদেষ্টা মুতলাক আল-কাহতানি বলেছেন, মার্কিন অনুরোধেই দেশটিতে আফগানিস্তানের তালেবানের দফতর খুলতে দেয়া হয়েছিল। আমেরিকাসহ কয়েকটি আরবদেশ যখন দোহার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দেয়ার কথিত অভিযোগ করছে তখন এ বক্তব্য দেয়া হলো।


উত্তর আমেরিকায় রমজান ও ইসলামী জীবনযাত্রা

মঙ্গলবার, ১৩ জুন ২০১৭

গোলাম সাদত জুয়েল:: আমেরিকায় প্রবাসীরা কেমন করে রোজা রমজান পালন করেন ? এ নিয়ে বাংলাদেশে সহ বিশ্বের অনেক দেশের প্রবাসীদের কৌতুহলের শেষ নেই । আমার ১৬ বছরের আমেরিকার প্রবাস জীবনে আমার মনে হয়েছে আমেরিকায় সবচেয়ে ভাল ভাবেই প্রবাসীরা রোজা পালন করেন । আমেরিকার বাহিরে থেকে অনেকে মনে করতে পারেন আমেরিকায় হয়ত বাংলাদেশ বা আরব দেশের মত রোজা রমজান পালন সহজ নয় ।

আসলে কথাটা ভিন্ন । মসজিদের শহর আমেরিকা । দুই হাজার পাঁচ শত মসজিদ আমেরিকায়। মাদ্রাসার সংখ্যা কয়েক শত । ইসলাম ধম পালনের সবচেয়ে সহজ জায়গা আমেরিকা । ৫০ টি ষ্টেটের মধ্যে ২৫ /৩০ ষ্টেটে মুসলিম সম্প্রদায় বাস করেন। কয়েক শত ছোট বড় শহরের মুসলিম সম্প্রদায় আছে্ন ভাল ভাবে । হালাল খাবার ও মসজিদ আজ আমেরিকায় মোড়ে মোড়ে । প্রতি বছর কয়েক শত কোরআনে হাফেজ বেড় হছেছ , তারা নানা শহরে রমজানের তারাবীহ নামাজ পড়ানোর জন ছুটছে । রমজানের প্রস্তুতি প্রবাসীরা সবচেয়ে ভালভাবেই গ্রহন করেন । মসজিদে টেন্ট বসিয়ে রোজাদারদের ইফতার খাওয়ানো্ হয় । ২০০ থেকে ৫০০ জন রোজাদার মসজিদে মসজিদে ইফতার করেন , ৩০ দিনে মসজিদে ইফতার দেবার জন্য প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে যায় । আমেরিকার ২৫০০ মসজিদে একই চিত্র । তবে বাংলাদেশী অধ্যূষিত মসজিদ গুলোতে তা বেশী দেখা যায় । ১৫ ঘন্টার রোজা আমেরিকায় , প্রতি মসজিদে খতমে তারাবী নামাজ পড়ানো হয় । রাত ১০ টায় শুরু হয়ে রাত সাড়ে এগারটায় শেষ হয় । ইয়াং হাফিজরা এক ষ্টেট থেকে অন্য ষ্টেটে যান নামাজ পড়াতে ,অনেক সময় লন্ডন থেকেও নতুন প্রজন্মের কোরআনে হাফিজদের আনা হয় ।

Picture

পুরো আমেরিকা জুড়ে রমজান মাসে অন্য রকম আবহ তৈরী হয়ে যায় । নামাজিদের সংখা বেড়ে যায় । মুসলিম প্রধান এলাকায় হালাল গ্রোসারী গুলোতে চলে নানান পণ্যের সেল । আরবী,পাকিস্তানী, বাংলাদেশী প্রবাসীরা রমজানে কাজ কমিয়ে এবাদতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন । রমজানের শেষ দশ দিনে মসজিদে এতেকাফে প্রবাসীদের ভীড় দেখা যায় । ও মসজিদের ইফতার দেবার ও রোজাদার দের খেদমতে অনেকে ভলান্টিয়ারী করেন । নিউইয়র্ক , মিশিগান, ফ্লোরিডা, আটলান্টা, নিউজাসি , বাফেলো, টেক্সাস সহ বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকার মসজিদ গুলোতে বাংলাদেশী প্রবাসী দের ভীড় দেখা যায় রমজানে । প্রবাসী বা্ংলাদেশীদের অনেক নতুন প্রজন্ম ইসলামি স্কুল ও মাদ্রাসায় পড়ে তাদের বেশীর ভাগের স্কুল ও মাদ্রাসা রমজানে বন্ধ থাকে তাই তাদের রোজা রাখতৈ অসুবিধা হয় না । এবার রমজান কিছুটা সামার এ হবার কারনে অনেক প্রবাসী ছেলেমেয়েরা রোজা রাখতে পারবে । নি্উ ইয়ক , নিউ জাসি ও মিশিগানে অনেক নতুন প্রজন্ম মাদ্রাসা শিক্ষার শেষ ধাপে হাফিজী শেষ করে তারা আলিমি পড়াশুনা করছে তাদের বেশীর ভাগ বিভিন্ন ষ্টেটে তারাবীহ নামাজের জন্য ব্যস্ত সময় কাটাচেছ ।unnamed (9)

সব সম্ভবের দেশ আমেরিকা এখানে সব সম্ভব , যে ডাক্তার হতে চায় সে চেষ্টা করে ডাক্তার হবার । যে প্রকৌশলী হতে চায় সে চেষ্টা করে প্রকৌশলী হতে পারে । যে আইনজীবী হতে চায় সে আইনজীবী হতে পারে । যে দ্বীনের রাস্তায় যেতে চায় সে ইসলামী ধারা লেখা পড়ার শেষ ধাপে যেতে পারে । হাফিজী শেষ করতে পারে , তারপর আলিমী পড়াশুনা করতে পারে । আবার উচ্চতর ডিগ্রীর জন্য সাউথ আফ্রিকায় বা ইংলান্ডে যায় । তারপর সে আমেরিকার স্বাভাবিকি লেখা পড়া করে তার ক্যারিয়ারও গড়ে । আমার ভাগ্নে ১৪ বছর বয়সে হাফিজী শেষ করেছিল। অসম্ভব মেধাবী শাহির রহমান তারপর ল ডিগ্রী শেষ করে এখন ওয়াশিংটনে বারে কাজ করছে । সে ২০০৮ সালের ওবামার নিবাচনের ওরলান্ডো ফ্লোরিডার ক্যাম্পেইন ম্যানেজার ছিল। সে গত বছরের হিলারীর নিবাচনে হিলারী জন্য ও্য়াশিংটিনে কাজ করছে ।

শাহির রহমান ছাড়াও আমার আরও দুটি ভাগ্নে মাহফুজুর রহমান ও মাসুদুর রহমান ও কোরআনে হাফিজী সম্পন্ন করে সাধারন ক্যারিয়ার গড়েছে । তারা সবাই বিভিন্ন মসজিদে বছরের পর বছর তারাবীহ নামাজ পড়িয়েছে । আমেরিকার ‍ইয়াং হাফিজদের পরিসংখানে দেখা যায় এর সংখ্য কয়েক হাজার । কয়েক শত মাদ্রাসা ও ইসলামী স্কুল থেকে কোরআনে হাফিজ বের হচেছ প্রতি বছর । আমেকিকায় ইসলামী জীবন যাত্রা দুদশক আগে যেমন কঠিন ছিল তা আজ আর সেরকম নেই । ৫০ / ৬০ টি পরিবার মুসলিম পরিবার এক হলেই মসজিদ গড়ে উঠে বছর খানেক পর তা কয়েকশত চলে যায় । কে যদি চায় তার জীবন ইসলামী কালচারে চালাবে সে চালাতে পারে । সেটা নিভর করে তার ইচছার উপর । তাবলিগ সারা আমেরিকায় সরব গতিতে চলমান । বছর ব্যাপী চলে তাদের ‍ইসতিমা । মহিলারা আমেরিকায় যতটুকু পরদা মেনে চলেন তা বাংলাদেশে তা কেউ মানছেন না । রাস্তায় বের হলে খুব কম মুসলিম মহিলা পাওয়া যাবে যারা হিজাব দেন না ।

আমেররিকায় বাংলাদেশীদের দ্বীতিয় প্রজন্ম চলছে তাই দেশে বেড়ে উঠা পিতা মাতারা খুব সজাগ তাদের ছেলেমেয়েদের জীবন যাত্রা নিয়ে । অবাধ স্বাধীনতার আমেরিকায় পিতা মাতারা একটু অসাবধান হলেই সন্তানরা বিপদে চলে যাবে । যারা এটা বিশ্বাস করেন তারা অনেক সচেতন । অনেকে আবার সন্তান সন্তানাধি হারিয়ে অকুল সাগরে ভাসছেন । সময় মত সন্তানদের দেখাশুনা না করায় তারা তাদের সন্তানদের হারিয়ে ফেলেছেন । তাই অনেক পিতা মাতা মসজিদের আশে পাশে থাকারে চেষ্টা করছেন । আমেরিকায় যদি পিতা মাতারা তাদের সন্তানদের ছোটবেলা থেকে ঠিক মত শাসন করতে না পারেন তাহলে তাদের অনেক মুল্য দিতে হয় । অনেকে প্রতি বছর দেশে নিয়ে যান বাচছাদের দেশী য় কালচারে শেখানোর জন্য ।

মুক্ত স্বাধীনতার দেশ আমেরিকায় এখানে যেমন ইয়াং হাফিজ বাড়ছে আবার সে অনুপাতে অনেক ইয়াং পিতা মাতা ছেড়ে মেয়ে বনধু নিয়ৈ উধাও হয়ে যাচেছ ,পিতামাতারা চোখের পানি ফেলছেন । রমাজানের সংযমের উপলব্দী বুঝে যারা প্রবাসে রোজা রাখে তারা জানে এটার গুরুত্ব অনেকে তা বুঝে না । মনে করে আমেরিকায় ডলার কামানোর জায়গা,সুখের জায়গা, ভোগের জায়গা । তারা বুঝতে চায় না জীবন ক্ষনিকের । আল্লাহ যে কোন সময় যে কাউকে নিয়ে যাবেন । রমজানে আত্মসুধ্বি লাভের সুযোগ তা কাজে লাগাতে হবে । তাহলেই জীবনে সফলতা আসবে । ।

লেখক:: সাংবাদিক,কলামিষ্ট ( ফ্লোরিডা )


পতাকা দিবস প্রসঙ্গ: -- সিকদার গিয়াসউদ্দিন

মঙ্গলবার, ১৩ জুন ২০১৭

১৪'ই জুন।আমেরিকার মহান পতাকা দিবস।আমেরিকায় প্রতি বছর অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে দিনটি উদযাপিত হয়।বিশ্বের সকল দেশেরই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি সহকারে পতাকা দিবস আছে এবং তা যথানিয়মে প্রতিপালিত হয়ে থাকে।ফ্ল্যাগ ডে-উইকিপিডিয়া বা গুগল সার্চ করে পৃথিবীর প্রত্যেক দেশের পতাকা দিবস সম্পর্কে জানা এখন খূবই সহজ ব্যাপার বটে।
প্রতি বছর মে'মাসের নয় তারিখ ইউরোপীয় ইউনিয়ন দিবস এবং অক্টোবর মাসের ২৪'তারিখ জাতিসংঘ দিবস পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে স্মরন করা হয়।সেমিনার কিংবা নানা আয়োজনের বিষয়টি বাদই দিলাম।কানাডা,অষ্ট্রেলিয়া সহ ইউরোপ ও এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের সকল দেশের পতাকা দিবসের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পালনের বিষয়টি জানার পরেও দীর্ঘ ছেচল্লিশ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের পতাকার কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আছে কি?এ ব্যাপারে স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইতিহাসের ছাত্রদের সঠিক ইতিহাসকে ধারন করার ব্যাপারে কোন ধরনের ব্যবস্থা আদৌ আছে কি?আম জনতার জানার বিষয়টি সেতো আরো অনেক দূরের ব্যাপার।অথচ বাংলাদেশের পতাকা নির্ধারন,পতাকা বানানো ও পতাকা উত্তোলনের বিষয়টি গোপন ও প্রকাশ্য মিলিয়ে কন্ঠকাকীর্ণ পথ বেয়ে এতোই বিপদসঙ্কুল,ঝুঁকিপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর যে-পৃথিবীর ইতিহাসে তা অত্যন্ত বিরল।
ঐতিহাসিক ও গবেষকদের দেয়া তথ্য ও গবেষনা থেকে যতটুকু জানা যায়-বিশ্বের সকল স্বাধীনতা আন্দোলন কিংবা জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন শেষে আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত গোষ্টী,দল বা আন্দোলনের নায়কদের মধ্যে আদর্শগত ও নানা কারনে মতভেদ দেখা দিয়েছে কিংবা বিভক্তি এসেছে।আবর্তন বিবর্তনে আবহমানকাল থেকে তাই চলে আসছে।তবে বিশ্বের সকল দেশেই যত বিভক্তি বা মতভেদ থাকুকনা কেনো-বিশেষ করে স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত গোপন বা প্রকাশ্য ঘটনা ও সাধারন ব্যক্তির কর্মকান্ডকেও অনেক গুরুত্ব সহকারে ইতিহাসে ধারন করা হয়।ইতিহাসের নায়কদের মাঝে যত মতভেদ,জেলাসী থাকুকনা কেনো-ক্ষমতা ও রাজনৈতিক কারনে ইতিহাসের নায়কদের অবমূল্যায়ন করা রীতিমতো অপরাধ হিসাবে গন্য করা হয়।জীবিতদের রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানতো আছেই-মৃত্যুর পরে তাঁদেরকে নিয়ে ইতিহাসে গর্ব প্রকাশের বিষয়টি ইতিহাস ও রাজনীতির ছাত্রদের জানার কথা।তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিষয়টি সম্পূর্ন ভিন্ন।১৯৭১'সালের ১০'ই জানুয়ারীর পর থেকে যখন যারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলো এবং আছে তারা তাদের মতো করে ইতিহাস তৈরী ও সাজানোর বিষয়টি বিভিন্ন লেখা,প্রতিবেদন ও পত্রপত্রিকায় দেখা যায়।১৯৭৫'সালের ১৫'ই আগষ্টে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ইতিহাসকে যেভাবে বিকৃত করা হয়েছে তাতে করে বর্তমান প্রজন্ম ও ১৯৭১'সাল পরবর্তি প্রজন্মের মধ্যে কনফিউজড ইতিহাস ধারনের মধ্য দিয়ে দেশপ্রেম গড়ে না উঠার কারনে আদর্শিক অধ:পতন,নৈতিকতা বিবর্জিত ক্ষমতা কিংবা অর্থের পেছনে দৌড়ানো,রাতারাতি বিত্তবান হওয়ার প্রতিযোগিতায় হাইব্রীডদের দৌরাত্বে দূর্ণীতি ও অমানবিক কর্মকান্ডের প্রতি আকর্ষণের হেতু নিয়ে গবেষক ও ঐতিহাসিকরা এখনো তেমন একটা নজর দিয়েছে বলে মনে হয়না।ইতিহাসের সত্যঘটনাগুলো নিয়ে যদি বারবার টানাহেঁচড়া চলে-তাতে করে দেশপ্রেমিক প্রজন্ম গড়ে উঠার সম্ভাবনা আদৌ আছে কি?দেশপ্রেমতো ছোটবেলা থেকেই প্রশিক্ষনের একটা বিষয়।ইতিহাসের সত্যকথন বিবর্জিত দেশপ্রেমিক প্রজন্মের আমরা আদৌ কি আশা করতে পারি?আমাদের দায়বদ্ধতা কতটুকু?'বঙ্গবন্ধু'ও 'বাংলাদেশ' আমাদের জাতীয় সম্পদ।দল ও পরিবারিক গন্ডী থেকে আমরা আদৌ কি বঙ্গবন্ধুকে উদ্ধার করতে পেরেছি?কাগজে কলমে কত কিছুইতো থাকে!এভারেষ্ট শৃঙ্গকে সমুন্নত রাখতে হলে হিমালয়ের চতুর্পাশ্বের পর্বতরাজিকে আমরা আদৌ সুশোভিত করতে পেরেছি কি?শহর,বন্দর ও গ্রামান্চলের রাস্তা ও পাহাড়গুলো সাজানোর বিষয়টি সেতো আরও অনেক দূরুহ ও দূরের ব্যাপার নয় কি?
১৯৭০'সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে।পাকিস্তান সামরিক সরকারের তালবাহানা চলতে থাকে।এক পর্যায়ে সামরিক শাসক প্রধান জল্লাদ ইয়াহিয়া জাতীয় সংসদের অধিবেশন বাতিল করলে সারাদেশ আগ্নেয়গিরির দাবানলের মতো জ্বলে উঠে।বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসূ'র নেতৃত্বে চার খলিফা খ্যাত ছাত্রনেতাদের নিয়ে ১'লা মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং ২'রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলায় জনসমাবেশ আহ্ববান করতে বাধ্য হয়।পরবর্তি দিন ২'রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের স্মরণকালের বৃহত্তম ছাত্রজনসভায় তিল ধরণের ঠাঁই ছিলোনা।এতো বেশী জনসমাগম হয়েছিলো এবং বাঁধভাঙা জনস্রোতের শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হচ্ছিলো।শ্লোগানে শ্লোগানে মূখরিত ও উত্তেজিত ছাত্রজনতার উদ্দ্যেশ্যে মাইক হাতে নিয়ে ১০:৪৫ মিনিটে ডাকসূ সহ-সভাপতি সভায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।এই সভায় চার খলিফার কন্ঠে বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার কথা ও প্রত্যয় ঘোষনা করা হয়।ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী সমবেত সকলকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও তাঁর নির্দ্দেশ অনুসরন করে স্বাধীকার প্রতিষ্টার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার শপথবাক্য পাঠ করান।এলো ঐতিহাসিক মুহুর্ত।সভায় চার খলিফা ও লক্ষ ছাত্র জনতার উপস্থিতিতে ডাকসূ সহ সভাপতি ও স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতা আ স ম আবদুর রব পতাকা উত্তোলন করলে লক্ষ ছাত্রজনতা করতালি ও মুহুর্মুহু শ্লোগানে দিকবিদিক না ভেবে উল্লাসে ফেটে পড়ে।এভাবে সেদিন স্বাধীন বাংলার পতাকা ছাত্র জনতা কর্তৃক অনুমোদিত হয়।পরে যুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকার এই পতাকাতলেই জনযুদ্ধের সকল কর্ম সম্পাদন করে।সেদিন ২'রা মার্চ আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালী জাতি কেবলমাত্র স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া ব্যতিত পেছন ফেরার সব পথ কি রুদ্ধ হয়ে যায়নি?এটা বুঝতে কি বড় কোন ডিগ্রীর প্রয়োজন দরকার? পরবর্তি দিন ৩'রা মার্চ ইশতেহার বা প্রক্লেমেশন বা ঘোষনা দিবস,ঐতিহাসিক ৭'ই মার্চ,২৩'শে মার্চ পাকিস্তান দিবসের পরিবর্তে প্রতিরোধ দিবস অত:পর পঁচিশে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানী হায়েনা বর্বর সামরিক বাহিনীর স্মরনকালের বর্বরোচিত গনহত্যার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন জনযুদ্ধে রূপান্তর হয়নি?আমরা যদি গভীরভাবে তলিয়ে দেখি-যদি বাংলাদেশ স্বাধীন না হতো তবে চার খলিফা খ্যাত যথাক্রমে আস ম আবদুর রব,শাজাহান সিরাজ,নূরে আলম সিদ্দিকী ও আব্দুল কুদ্দুস মাখনের অবস্থা কি হতো?বিশেষ করে আ স ম আবদুর রবের হাড্ডিমাংস কি খুঁজে পাওয়া যেতো?জানি স্বাধীনতা আন্দোলনের আগে ও পরে এঁদের ভেতর বিরোধ ছিলো-সে প্রশ্নে না গিয়ে সেই বিপদসঙ্কুল সংঘাতময় দিনগুলোতে তাঁদের বীরত্বের দিকগুলোর ও দিনগুলোর স্বীকৃতি জাতি এখনো দিয়েছে কি?আমার বিশ্বাস যাঁরা বেঁচে আছেন-জীবিতাবস্থায় না পেলেও শত বছর পরে হলেও আগামী জমানার সন্তান ও ঐতিহাসিকদের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পতাকা দিবসের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আসবেই।আমাদের স্মরন রাখতে হবে যে-ইতিহাসের চাকা আপন গতিতেই ঘূরে।পতাকা তৈরী ও নির্ধারনের ইতিহাসের ম্যানিপুলেশন লক্ষনীয়।তাই পতাকা নির্ধারন,বানানোর রোমহর্ষক সত্য ইতিহাসগুলোরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিকল্প নেই।কারন ইতিহাস কঠিন সত্যকে একদিন খুঁজে বের করবে ও ধারন করবেই।
তথ্যসূত্র:
www national day calendar.com
www us flag.org
United Nations>events>unday
flag day-Wikipedia
বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা,টক'শো,সোশ্যাল মিডিয়া।
সিকদার গিয়াসউদ্দিন
সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাদক,কমিটি ফর ডেমোক্রেসী ইন বাংলাদেশ,নিউইয়র্ক,যুক্তরাষ্ট্র।
সাবেক সদস্য সচিব,মুক্তিযুদ্ধ চেতনা পরিষদ,নিউইয়র্ক,যুক্তরাষ্ট্র।
সাবেক প্রতিষ্ঠাতা আহ্ববায়ক,কর্ণেল তাহের স্মৃতি সংসদ,যুক্তরাষ্ট্র।


কাতার সংকট নিয়ে কথা।আবু জাফর মাহমুদ

সোমবার, ১২ জুন ২০১৭

জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিগমার গ্যাব্রিয়েল হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, কাতার ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি আরব দেশের মধ্যকার বর্তমান অচলাবস্থা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।তবে ১১ইজুন শেষ খবরের আভাষে অনুমান করা যাচ্ছে,খুব শীঘ্রই সমস্যাটার একটা সমাধান হয়ে যচ্ছে।এটা ঠিক অপেক্ষা আমাদেরকে করতেই হবে।

 গত ২০-২১ মে অর্থাৎ গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিয়াদ সফরের সময় 'গ্লোবাল সেন্টার ফর কম্বেটিং এক্সট্রিমিস্ট আইডোলজি' শীর্ষক যে জোটের উদ্বোধন করা হয় তা নিয়ে মুসলমান বিশ্বের মানুষের শিক্ষা নতুন পর্যায়ে এসেছে।, সেই সফরে রিয়াদের সঙ্গে ১১ হাজার কোটি ডলার অর্থমূল্যের অস্ত্র চুক্তি করেছেন ট্রাম্প।  

যাহোক, কুয়েতের আমির আল জাবের আল সাবাহ সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও কাতারের মধ্যেকার সাম্প্রতিক বিরোধকে সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন।কাতারের আমির আরব আমিরাত অথবা কুয়েতে যেখানে তার পছন্দ তিনি আসবেন।ওখানে সৌদির সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজনও আসবেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।এজন্যে দুটি বিশেষ প্লেন তৈরী রয়েছে তাদের জন্যে।

কাতারের মুসলিম ব্রাদারহুডের ৬০জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে কাতার থেকে সরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে ঐক্যমত দেখা যাচ্ছে।তাদেরকে কাতার বহিস্কার করতে রাজী হয়ে যেতে পারে বলে জোর বিশ্বাস।ঐ ৬০জন খুব সম্ভবতঃ তুরস্কে আশ্রয় পাচ্ছে ও তাদের সদর দপ্তর খুলবার ব্যবস্থা পাকাপাকি হয়ে গেছে।ইতিমধ্যে কুয়েত বলেছিলো কাতার আরব গালফের দেশগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে আগ্রহী,ভাইদের মধ্যে যুদ্ধ করে আত্নহত্যা না করে।

বিদেশমন্ত্রী শেখ সাবাহ আল খালিদ আলা সাবাহর বরাত দিয়ে কুয়েতের বার্তা সংস্থা কুনা জানিয়েছে, ব্রাদারহুডের ভাইরা কাতারি ভাইদের উপর চাপের বাস্তবতা বুঝতে সক্ষম,তারা কাতার ছেড়ে যেতে রাজী।আমেরিকার অভিযোগের সম্পর্কে কাতার অবগত আছে।কাতারে আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘঁটি আছে এবং একইভাবে আরব রক্ষার যোদ্ধাদের অবস্থান এই দেশে থাকার পর্যায়ক্রমিক নয়া বাস্তবতায় আমেরিকা-ইসরাইলের প্রধানমিত্র সৌদি আরব এবং মিত্রদের যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার উদ্যোগের মধ্যে আরব মুসলমানরা অবস্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হবার মদ্য দিয়ে যুদ্ধের উত্তাপ থামছে। কাতারের দাবি কাতার হচ্ছে আঞ্চলিক শান্তির কেন্দ্রস্থল।শান্তির জন্যে যেকোন যুক্তি শোনতে কাতার আগ্রহী।

 ৫জুন কাতারের সাথে একতরফা সম্পর্ক ছেদ করেছিলো সৌদি আরব এবং আরব আমিরাত।সন্ত্রাসের অজুহাত খাড়া করে তারা কাতারের বিমান চলাচল তাদের আকাশ সীমাপথে বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। প্রকৃতপক্ষে বেগতিক চাপটা শুরু হয় ইরানের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্কের তিক্ততা সুরাহা করার ব্যাপারে কাতার নিউজ এজেন্সির খবর বের হবার প্রতিক্রিয়ায়।অবশ্য সংবাদ প্রকাশিত হবার পর কাতারের আমিরের পক্ষ থেকে এই সংবাদকে ভিত্তিহীন দাবি করা হয়েছে।ততক্ষণে কাতারের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেবার ব্যবস্থা জারি হয়ে যায়।

বিশ্লেষকদের দাবি,আমেরিকার কর্তৃত্বের অধীনে থাকা এই দেশগুলোর কারো মুরোদ নেই একা কিছু করা অথবা অঞ্চলের সবাই মিলেও কিছু করা।বাস্তবতার রূপ হলো এরকম।আমেরিকার এতোগুলো যুদ্ধজাহাজ এবং আমেরিকার সহায়তার জালে আবদ্ধ এই দেশগুলো এখনো রাষ্ট্রচালনা শিখেছে কিনা,তা নিয়েও বহু বিতর্ক আছে।তাই বিশ্বের অন্যতম সেরা বিজনেস টাইকুন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবার পর তার দেশের প্রধান প্রধান অস্ত্র কোম্পানী তেল কোম্পানীসহ বিশাল কর্পোরেটদের জন্যে কাতারের রিজার্ভের প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে আনার জন্যে অনুগত সেবাদাস সৌদি রাজ পরিবারকে চাপ দিলে কিইবা করার আছে।কাতেরের না বলার কোন সুযোগ আছে?

এখানে যুদ্ধ কোন বিষয় নয়,টার্গেট হচ্ছে কাতারের রাষ্ট্রীয় রিজার্ভের উজ্জ্বল তহবিলের বান্ডিল।ছোট এই দেশের আমির শেখরা তেলব্যবসা করে এতো ধনের মালিক হয়ে গেছে,তা যুদ্ধ না করে চড় থাপ্পড় না দিয়ে কূটনৈতিক কথায় কেড়ে নেয়া।সোউদি আরব কাতার থেকে একাজটাই এখন সম্পাদন করছে বলে গোপন সূত্র জানাচ্ছে।

 মানুষ কিভাবে বিশ্বাস করে কাতারে আমেরিকার সবচেয়ে বড় ঘাঁটি।এই ঘাঁটির দেশে আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী ও যুদ্ধের কোম্পানীগুলোর অনুগত সেবাদাস সৌদি দাসরা বোমা বর্ষণ করছে?তাই সহজেই বুঝা গেছে লেনদেন সন্তোষজনক হয়ে গেলে কোলাকুলি চালু হয়ে যাবে দাসের সাথে দাসে। শান্তির হাওয়া আবার আগের মতো আগের স্রোতে বইতে থাকবে।

 এদিকে কাতার-সৌদির নয়া সমস্যার উত্থানের সাথে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে পাকিস্তানী জেনারেল রাহুলের সর্বাধিনায়কত্ব নিয়ে পাকিস্তানে রাজনীতির বিতর্ক উঠেছে তুঙ্গে।জাতীয় সংসদ বিল এনে এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়।যাতে প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানী জাতীয় স্বার্থ রক্ষা প্রশ্নে কাতার ও সৌদির সাথে সমানতালে দোতিয়ালি করতে পেছনের সমর্থন পায়।পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হচ্ছে পাকিস্তান মুসলমান দেশগুলোর একতায় বিশ্বাস করায় অবিচল নীতিতে থাকবে।কারো পক্ষ হয়ে কারো বিপক্ষে পাকিস্তান জড়াবেনা।

এই নীতির প্রেক্ষিতেই নেওয়াজ শরীফ কাতার এবং গালফ দেশগুলোর সফরে বের হচ্ছেন।পাকিস্তানের বৈদেশিক রেমিটেন্সের অন্যতম প্রধান বাজার অচ্ছে এই দেশগুলো।কোনক্রমে কাতেরের সাথে সৌদির সামরিক সংঘাতের পরিস্থিতি এলে পাকিস্তান কঠিন সমস্যার মুখে পড়বে।তাদের বৈদেশিক নীতির নয়া চ্যালেঞ্জ আসবে।তাই পাকিস্তান চাইছে যেকোনভাবেই হোক মিল হয়ে যাক্‌।

 কাতারে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বের হওয়া খবর নাকচ করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নাফিস জাকারিয়া রোববার বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ রিপোর্টকে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।রাষ্ট্র পরিচালিত টার্কিশ রেডিও অ্যান্ড টেলিভিশন কর্পোরেশন বা টিআরটি’র উর্দু বিভাগ এক প্রতিবেদনে বলেছে, পাকিস্তান কাতারে ২০ হাজার সেনা মোতায়েনের জন্য জাতীয় সংসদে একটি বিল এনেছে এবং পরে তা পাস হয়েছে।এ রিপোর্টকে নাফিস জাকারিয়া বানোয়াট মন্তব্য করে বলেন, বিদেশি এসব গণমাধ্যম পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা চালাচ্ছে।       

 কাতার এবং প্রতিবেশী সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মধ্যকার চলমান এই সংকটের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আমি চলতি সপ্তাহে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছি এবং ইরান ও কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। আমি জানি বিষয়টি কতটা মারাত্মক পর্যায়ে রয়েছে।তবে পরিস্থিতির উন্নতির জন্য একটা সম্ভাবনাও রয়েছে।”

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান কাতারের পক্ষে প্রকাশ্যে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কাতার এবং অন্য কয়েকটি আরব দেশের মধ্যকার দ্বন্দ্বে তার দেশ দোহাকে সমর্থন দেয়া অব্যাহত রাখবে।এরদোগান ১০ইজুন শুক্রবার তুর্কি সংসদে বলেছেন, “আমরা আমাদের কাতারি ভাইদেরকে ত্যাগ করব না।” এরদোগানের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এ খবর দিয়েছে। এছাড়া, সৌদি আরব গতকাল কাতারের যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার জন্য কালো তালিকাভুক্ত করেছে তাও প্রত্যাখ্যান করেছে তুরস্ক।

এরদোগান বলেছেন, “এ ধরনের কোনো কিছু নেই; আমি এসব প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিভাবে চিনি।” তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, কাতারকে সব ধরনের সমর্থন দেয়া অব্যাহত রাখবে তুরস্ক।গত সোমবার কাতারের সঙ্গে সৌদি আরব ও আরো কয়েকটি আরব দেশ সম্পর্ক ছিন্ন করলে তুরস্ক কিছুটা নিরপেক্ষ অবস্থান নেয় তবে দ্রুত সে অবস্থান পরিবর্তন করেছেন এরদোগান। তিনি এখন প্রকাশ্যে কাতারের পক্ষ নিয়েছেন।

 ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করার জন্য কাতারকে প্রস্তাব দিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। পারস্য উপসাগরীয় এ দেশটির সঙ্গে সৌদি আরব ও তার কয়েকটি আরব মিত্র সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করে একঘরে করার পর দোহার আমদানি কার্যক্রম ঠিক রাখার জন্য ইরান এ প্রস্তাব দিল।

ইরানের এ প্রস্তাবের কথা জানিয়েছেন কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মুহাম্মাদ বিন আবদুর রহমান আলে সানি। তার বরাত দিয়ে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস এক খবরে বলেছে, ইরান তার তিনটি বন্দর ব্যবহারের জন্য কাতারকে প্রস্তাব দিয়েছে। ইরানের এসব বন্দর ব্যবহার করলে কাতার সব ধরনের পণ্য আমদানি করতে সক্ষম হবে।

কাতারের বিরুদ্ধে কার্যত অবরোধ আরোপ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে আবদুর রহমান আলে সানি বলেন- সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিশর সম্মিলিতভাবে দোহাকে শাস্তির মুখে ফেলেছে। তিনি বলেন, “সফল ও প্রগতিশীল বলে আজ আমরা মূলত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি।তবে আমরা সন্ত্রাসবাদী নই বরং শান্তির প্লাটফরম।

সৌদি আরবসহ প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের সঙ্গে চলমান টানাপড়েনের মধ্যে রাশিয়া সফরে গেছেন কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মুহাম্মাদ বিন আবদুর রহমান আলে সানি।মস্কো পৌঁছে তিনি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে বৈঠকে করেছেন।বৈঠকে ল্যাভরভ বলেছেন, সংলাপের মাধ্যমে কাতার ও আরব দেশগুলোর চলমান অচলাবস্থা ও মতপার্থক্যের অবসান ঘটাতে হবে। তিনি আরো বলেন, “পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে আলোচনার টেবিলে বসে সমস্ত দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য আমরা সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।”

 কাতারের সঙ্গে সৌদি আরব ও তার মিত্র কয়েকটি আরব দেশের সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘটনায় ল্যাভরভ দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যকার ঐক্য রাশিয়ার স্বার্থই রক্ষা করে। আমরা আমাদের নীতি অনুসারে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হম্তক্ষেপ করি না কিন্তু বন্ধুদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আমাদেরকে খুশি করে না।”

 বৈঠকে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তার দেশও সংলাপে বসতে আগ্রহী এবং পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ হতে পার তার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। সৌদি আরব ও তার কয়েকটি আরব মিত্রদেশ সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণে একঘরে হয়ে পড়া কাতারে খাদ্য সরবরাহ শুরু করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। গতকাল ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, খাদ্যপণ্যবাহী একটি কার্গো বিমান ইরান থেকে কাতারে গেছে।

খাদ্যবাহী বোয়িং ৭৪৭ কার্গো বিমানটি শিরাজ নগরী থেকে কাতারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। শিরাজ নগরী থেকে বিমানে করে কাতারে যেতে একে ঘণ্টারও কম সময় লাগে।গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বুধবার বিমানটি কাতারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। ইরান থেকে বোয়িংয়ের যে কার্গো বিমানটি কাতারে গেছে তাতে ১০০ টন পণ্য বহন করা যায়।এর আগে, চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ইরানের কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক সংগঠনের সভাপতি রেজা নওরানির বরাত দিয়ে ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছিল, আগামী সপ্তাহ থেকে কাতারে খাদ্য সরবরাহের বিষয়ে আলোচনা চলছে।এজন্য ইরানের বন্দর আব্বাস, বুশেহর ও লেঙ্গেহ বন্দরকে সমানতালে প্রস্তুত করা হচ্ছে।

তিনি জানান, ইরান এখনই প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টি কন্টেইনার পণ্য কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠায়। একই পরিমাণ পণ্য কাতারে পাঠানো হবে। নওরানি জানান, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর হতে পণ্যবাহী জাহাজ আট থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে কাতারে পৌঁছাতে পারে।

  দোহার এক কর্মকর্তা বলেছেন, খাদ্য এবং পানি সংগ্রহের জন্য ইরান ও তুরস্কের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে কাতার। দেশটির আঞ্চলিক বৃহৎ সরবরাহকারী দেশ সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত দোহার সঙ্গে কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পরই এ পদক্ষেপ নেয়া হলো।

স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় নাম প্রকাশ না করে কাতারের এ কর্মকর্তা জানান, ইরান, তুরস্কসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে দোহা। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কাতার এয়ারওয়েজের মাধ্যমে আনা হবে বলে জানান তিনি।তিনি আরো বলেন, চার সপ্তাহ চালানোর মতো পর্যাপ্ত খাদ্যশষ্য কাতারে মজুদ আছে। পাশাপাশি সরকারের কাছে জরুরি অবস্থা সামাল দেয়ার মতো কৌশলগত খাদ্যও মজুদ আছে বলে জানান তিনি।

এর আগের খবরে বলা হয়েছে, দোহার বিপণন কেন্দ্রগুলোর তাক থেকে খাদ্যপণ্য ধীরে ধীরে উধাও হতে শুরু করেছে। সৌদি আরব দেশটির সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়ার পর থেকেই এমন দৃশ্যের অবতারণা ঘটছে। কাতারের খাদ্যপণ্যের ৯০ শতাংশই সরবরাহ করতো সৌদি আরব।এদিকে ইরানের একজন শীর্ষস্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা এর আগে বলেছেন, কাতারে খাদ্যপণ্য জাহাজযোগে পাঠাতে পারে ইরান।

কাতারের সামরিক ঘাঁটিতে সেনা মোতায়েনের জন্য একটি আইন অনুমোদন করেছে তুরস্কের সংসদ।গত মে মাসে এ আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছিল।বিলটির পক্ষে ২৪০টি ভোট পড়েছে।তুরস্কের ক্ষমতাসীন একে পার্টি এবং জাতীয়তাবাদী বিরোধীদল এমএইচপি ব্যাপকভাবে বিলের প্রতি সমর্থন দিয়েছে।

 যখন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে কাতারের তীব্র টানাপড়েন চলছে তখন দোহার প্রতি সমর্থন জানানোর জন্য  বুধবার  বিল অনুমোদন করা হয়।তুরস্কের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত কাতার।দেশটিতে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করছে আঙ্কারা।এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে বড় বিমান ঘাঁটিও রয়েছে কাতারে।

 উগ্রবাদীদের অর্থ যোগানোর কথিত অভিযোগ কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মিশর। এসব দেশ কাতারের সঙ্গে অভিন্ন সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে এবং বিমান চলাচলের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।সন্ত্রাসবাদের প্রতি সমর্থনের অভিযোগ পরিষ্কার ভাষায় অস্বীকার করে আসছে কাতার।গালফ দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ মিত্র মরক্কো বলছে তারা সৌদি-কাতার সম্পর্কের বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে।

 ফিলিস্তিনের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস তাদের সংগঠনের ব্যাপারে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রশংসা করেছে।ফিলিস্তিনের তথ্যকেন্দ্র জানিয়েছে, হামাস মুখপাত্র ফুয়াদ বারহুম এক বিবৃতিতে বলেছেন, কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান আলে সানির বক্তব্য থেকে ফিলিস্তিনীদের ব্যাপারে দোহার ইতিবাচক মনোভাবের বিষয়টি ফুটে উঠেছে।

 কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিছুদিন আগে বলেছিলেন, হামাস একটি প্রতিরোধকামী সংগঠন এবং আরব দেশগুলোর কাছে তাদের বৈধতা রয়েছে।কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেছেন, তার দেশ ফিলিস্তিন জাতি, তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার  এবং ফাতাহ ও হামাসের মধ্যকার শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন জানায়। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আজ যুবায়ের গত মঙ্গলবার বলেছেন, আরব অঞ্চলের বিভিন্ন সংকট সমাধানের জন্য কাতার এগিয়ে এলেও তাদের উচিত হামাসের প্রতি সমর্থন বন্ধ করা।

গত সোমবার ৫ই জুন সৌদি আরব, বাহরাইন, আমিরাত ও মিশর হামাসের প্রতি সমর্থন বন্ধের আহবান জানিয়ে কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।বৈশ্বিক সুপার পাওয়ারগুলোর প্রধান ধারা আরব দেশগুলোর সম্পদ লুটে নেয়ার এতোদিনের পর্যায়গুলোকে অতিক্রম করে আরো সরাসরি ধাপে অবস্থান স্পষ্ট করছে।

এই ধাপে আরবের অনুগত অহংকারি ও কোরানের শিক্ষার বিপরীতে থাকা মুসলমান শাসকরা তাদের প্রকৃত শত্রুদের বন্ধু করে তাদের নির্দ্দেশে শক্তিক্ষয় করছে বেপরোয়াভাবে।কোরআনের শান্তির পথ-নির্দ্দেশিকার চেয়ে গ্রহন করছে কোরআনে নিষিদ্ধ পথগুলো। মানুষের কল্যাণের চেয়ে শাসকরা মনোযোগী হয়েছেন মানুষের জন্যে স্রষ্টার দেয়া সম্পদ্ গুলো আত্নসাৎ কার্যক্রমে।সেসব আত্নসাৎকারি শাসকদের কাছ থেকে প্রকৃতির নিয়মেই তা আরো বিশাল আত্নসাৎকারিদের কাছে হাত বদল হচ্ছে।  

 (লেখক আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান)।


বাজেটে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত = সিরাজী এম আর মোস্তাক

রবিবার, ১১ জুন ২০১৭

২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বাজেট-নীতি হচ্ছে, “নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, ইতিহাস-ঐতিহ্য গোল্লায় যাক”। সরকারি দল ও গৃহপালিত বিরোধীদলের সংসদ-সদস্যগণের নীতি হচ্ছে, “সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল, তাতে কার কি বাল”। এভাবেই ৪ লক্ষ ২৬৬ কোটি টাকার বিশাল বাজেট থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ৩৯৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। তাদের যুক্তি হল- বেশ কয়েকবছর যাবৎ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ হচ্ছে, তাতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত না হলে; এবারের নির্বাচনী বাজেটে না হয় একটু বেশি বরাদ্দ হয়েছে, তাতে ইতিহাস বিকৃত হবার নয়। শুধুমাত্র স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে স্বার্থ হাসিলে বাধা দিচ্ছে।
স্বাধীনতার স্থপতি বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাজেটে ‘মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ নামে বরাদ্দ ছিলনা। বর্তমানে এখাতে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর বাজেটের (৭৮০ কোটি টাকা) পাঁচগুণ বরাদ্দ হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সময়ে দেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা-শহীদ বিভাজন ছিলনা। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও কোটাসুবিধা ছিলনা। দেশের সবাই মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য বিবেচিত ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা প্রায় দুই লাখ। তাদের দেয়া হচ্ছে, বড় অংকের ভাতা ও বিবিধ সুবিধা। বলা হয়েছে, এ মুক্তিযোদ্ধাগণই দেশ স্বাধীন করেছেন। তারা লড়াই না করলে দেশ স্বাধীন হতোনা। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এ বরাদ্দ অতি সামান্য। তাদের সন্তান-সন্ততি ও নাতি-নাতনিদেরও এতে অধিকার রয়েছে। তাদেরকে সকল চাকুরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে ৩০ভাগ কোটাসুবিধা দেয়া হয়েছে। ১৯৭৫ সাল থেকে এযাবতকালে ত্রিশভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পালনে যেটুকু ঘাটতি হয়েছিল, ইতোমধ্যে তা কড়ায়-গন্ডায় পূরণ করা হয়েছে। কয়েকবছর যাবৎ বিসিএস, ব্যাংক-বীমা, সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটা পরিপালন হয়েছে। ফলে, দেশে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহির্ভূত ২৬ লাখ উচ্চশিক্ষিত বেকার হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত দু’লাখ পরিবারে এসেছে পৌষমাস, বাকি জনতার বঞ্চণা ও সর্বনাশ। দেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর চেতনা বিবর্জিত হয়েছে। এটা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির জ্বলন্ত প্রমাণ।
দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধার জন্য বাজেট-বরাদ্দের ফলে ত্রিশ লাখ বীর শহীদের ব্যাপারে সন্দেহ জেগেছে। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ত্রিশ লাখ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নাকি রাজাকার ছিলেন, তাতে প্রশ্ন উঠেছে। শহীদগণ মুক্তিযোদ্ধা হলে, প্রচলিত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা অবশ্যই অবৈধ। কারণ, ত্রিশ লাখ শহীদের বিপরীতে শুধু দুই লাখ যোদ্ধা পৃথিবীর কোথাও নেই। শহীদগণ যোদ্ধা তালিকার বাইরে নয়। বঙ্গবন্ধু শহীদদের যোদ্ধা থেকে আলাদা দেননি। তিনি ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করেছেন। সাতজন শহীদকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাব দিয়ে ৬৭৬ মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করেছেন। এতে জাতিকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, ৬৭৬ যোদ্ধার মধ্যে যেমন মাত্র সাতজন শহীদ রয়েছেন; তেমনি ত্রিশ লাখ শহীদের তুলনায় আরো অনেক বেশি মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। সাতজন শহীদ যেমন বীরশ্রেষ্ঠ, তেমনি ত্রিশ লাখ শহীদ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। এদের বাদ দিয়ে দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করা ও তাদের জন্য বাজেট-বরাদ্দ দেয়া অবৈধ। এতে শহীদদের প্রতি অবমাননা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হয়।
বাজেটে সুবিধাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা, লাখো বীর শহীদ, আত্মত্যাগী, বন্দী, শরণার্থী ও অগণিত সাধারণ যোদ্ধার নাম নেই। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু ও তালিকা বহির্ভূত বীরগণ মুক্তিযোদ্ধা নন। মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান নেই। তাদের সন্তানেরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নয়। তাই বাংলাদেশে ত্রিশ লাখ শহীদের বংশ ও পরিবারের অস্তিত্ব নেই। শুধু দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তান-সন্ততি রয়েছেন। এতে বঙ্গবন্ধু ও প্রকৃত যোদ্ধাগণ মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি বঞ্চিত হয়েছেন। রক্রের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা কতিপয় ব্যক্তির স্বার্থের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হয়েছে।
অতএব বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধে আমাদের উচিত, প্রচলিত দুই লাখ তালিকা বাতিল করে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাসহ সকল বীর বাঙ্গালিকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি প্রদান করা। বাংলাদেশের ১৬কোটি নাগরিককে তাদের প্রজন্ম ঘোষণা করা। বাজেটের অর্থ সমগ্র্র মুক্তিযোদ্ধা প্রজম্মের মাঝে সমবন্টন করা।
শিক্ষানবিশ আইনজীবী, ঢাকা।


কাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর ধূমকেতু = এবিএম সালেহ উদ্দীন

মঙ্গলবার, ৩০ মে ২০১৭

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম। ঐতিহ্যে ও গৌরবে তিনি বাংলা সাহিত্যাকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র। শিল্প-সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রেই যিনি অপ্রতিহত প্রভাবের অধিকারী। তিনি মানবতার কবি এবং মানবতাবাদী আন্দোলনের অগ্রনায়ক। তাঁকে বিশ্বের শোষিত ও ভাগ্যবঞ্চিত মানুষের মুক্তির দিশারীও বলা হয়ে থাকে। সাম্রাজ্যবাদী যুগে পরাধীন ভারতবর্ষের লাঞ্ছিত,নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের স্বাধীকার ও মুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত ছিলেন তিনি। ক্ষুরধার লেখনী ও শক্তিশালী কলামের মাধ্যমে,প্রেরণাবাহী কবিতা,দেশাত্ববোধক ও বিপ্লবী গান রচনা করে তিনি গণ মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিলেন।
এ ছাড়া বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের কঠোর বিধি-নিষেধের যুগে সাংবাদিকতায় কাজী নজরুল ইসলাম যে, দু:সাহসী ভুমিকা নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন তার তুলনা বিরল। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নজরুলের মতো এমন তেজস্বী আদর্শ পুরুষ দ্বিতীয়জন পাওয়া ছিল মুশকিল। তিনি অন্যায়Ñঅবিচার প্রতিরোধে আপোষহীন ছিলেন এবং তাঁর সমকক্ষ আর কেউ ছিল না।
গণ মানুষের স্বার্থে সাম্রাজ্যবাদের শোষণ ও নির্যাতনের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করবার লক্ষ্যে কাজী নজরুল ইসলাম সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর কলম এতই শক্তিশালী ও ক্ষীপ্র ছিল যে, ভারতবর্ষের বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের তখততাউস তখন কেঁপে উঠেছিল। অন্যায়,অবিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে দু:সাহসী লেখনীর মাধ্যমে তিনি ভারতবর্ষের মুক্তিকামী মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা শাখায় এবং রাজনীতিতে তিনি উর্ধ্বমুখী সৃষ্টিচেতনার মাধ্যমে অধিকারহারা ভাগ্যবঞ্ছিত মানুষকে উজ্জীবিত করে তুলেছিলেন।
তখনকার রাজনৈতিক ,সাংস্কৃতিক ও অবক্ষয়ী সমাজের বৃত্তবলয় থেকে মানুষকে উদ্ধার করার লক্ষ্যে নজরুল ইসলাম সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার । বিশেষ করে বাঙালি পল্টনের সামরিক ব্যারাক থেকে ১৯২০ সালে কলকাতায় ফিরে তিনি দুই হাতে লিখতে শুরু করেন। সংবাদপত্রের সাথে যুক্ত হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখালেখির হাত বাড়িয়ে দেন। এ সময় তিনি অনেক পত্রিকায় কাজ করেছেন। কিন্তু সংবাদপত্রের মালিকদের সঙ্গে নীতিগত অনেক সময় বেমিল অথবা নিজের সত্যবোধকে প্রতিষ্ঠার ব্রত হিসাবে প্রতিবাদী চেতনার দু;সাহসী ভূমিকা তৎকালীন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কয়েক’টি পত্রিকার সঙ্গে স্বাধীনভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। তিনি যে কোন অন্যায় ও অসংগতির বিপক্ষে ছিলেন আপোষহীন। কখনো কোন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নি।
পেশাগতভাবে বেশ কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদনাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এ সব পত্রিকার মধ্যে বিজলী পত্রিকার সাথে নজরুলের বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল।  বিজলী পত্রিকাতে ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি সংখ্যায় তাঁর বিখ্যাত বিদ্রোহী কবিতাটি প্রকাশ পায়। এই দীর্ঘ কবিতাটি লিখেছিলেন কোন এক ঝড়ের রাতে। বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবিতা’র মতো অমর সৃষ্টি আর দ্বিতীয়টি নেই।  
কিন্তু পরবর্তীতে আরও বেশি জোরালো কন্ঠে সময়-কাল ও যুগ জিজ্ঞাসার তাগিদে তিনি ভাবলেন যে, কারো অধীনে থেকে স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করা কঠিণ। সব সময়েই অদূরপণীয় আপোষকামীতা এবং একটা চাপের মধ্যে থাকতে হয়। তাই এক সময় তিনি নিজেই পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। এক বিশাল মন ও মানসিকতার বশবর্তী হয়ে নিরেট গণ মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের স্বার্থেই তিনি পত্রিকা বের করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেই পত্রিকার নাম ছিল ‘ধূমকেতু’ ।
তৎকালীন অবক্ষয়ী সমাজের কুসংস্কার এবং বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য ‘ধূমকেতু’ পত্রিকাটি ছিল প্রতিবাদমুখর বিদ্রোহী ধারার প্রতিনিধি। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ধুমকেতু’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তিনি সাফল্যের সাথে শক্ত হাতেই উক্ত পত্রিকার হাল ধরেছিলেন।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের আগে আমরা  আটরো শতকের ইয়ং বেঙ্গলের নেতা হেনরী লুই ভিবিয়ানের ইতিহাস জানি। যিনি ভারতবর্ষের মানবতা বিরোধী কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। ধর্মের নামে সতীদাহ প্রথার মাধ্যমে নৃশংসভাবে জীবন্ত বিধবা নারীকে হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন এবং কট্টর হিন্দুদের বিরাগ ভাজন হয়েছিলেন। মাত্র ২৪ বছর বেচেঁছিলেন তিনি। ধুমকেতু’র মতো ডিরোজিও’র মানবতাবাদী আন্দোলনের সাথে তাঁর অনেক ছাত্র-শিক্ষকসহ যুব সম্প্রদায় সংগঠিত হয়েছিলেন। অনেক ত্যাগ ও জেল-জুলুমের পর শেষ পর্যন্ত সতীদাহ বন্ধ হয়েছিল।
 তেমনই ১৯১০ সালে ভারতের নিপীড়িত ও অবহেলিত মানুষের মুক্তির প্রত্যাশায় হ্যালির ‘ধুমকেতু’র আবির্ভাব ঘটেছিল।  এরপর বারো বছরের মাথায় বাংলা সাহিত্যের আকাশে আবারো দেখা গেল এক জলন্ত ‘ধুমকেতু’। যার জৌলুশ ছড়িয়ে পড়লো সমগ্র ভারতবর্ষে। যার প্রেরণাবাহী চালিকা শক্তি ছিলেন জাতীয় চেতনার কবি, মানবতার কান্ডারী ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
১৯২২ সালের ১২ই আগষ্ট ‘ধুমকেতু’ প্রথম আত্মপ্রকাশ করলো। গণ মানুষের মুক্তি ও অধিকার আদায়ের প্রত্যয়ে ‘ধুমকেতু’ হয়ে উঠলো সর্বস্তরের মানুষের পত্রিকা। অত:পর ১৯২২ সালের ১৩ অক্টোবর ‘ধুমকেতু’ ঘোষণা করলো ভারতবর্ষের স্বাধীনতা। এক জ্বালাময়ী সম্পাদকীয়তে কাজী নজরুল ইসলাম সর্বপ্রথম ঘোষণা করলেন ‘ধুমকেতু’ ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। তিনি আরও লিখলেন-‘ ‘স্বাধীনতার জন্য আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে সকল কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন-শৃঙ্খল মানা নিষেধের বিরুদ্ধে’। তাই দৃঢ়তার সাথে বলা যায় যে, কাজী নজরূল ইসলামই ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণাকারী।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশির্বাদ বাণী নিয়ে বের হয়েছিল ‘ধুমকেতু’। আনন্দবাজার এবং অমৃতবাজারসহ তখনকার স্বনামধন্য বাংলা সংবাদপত্রগুলো নজরুলের ‘ধুমকেতু’কে স্বাগত জানিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ‘ধুমকেতু’ কে স্বাগত জানিয়েছিলেন এভাবেÑ‘
 ‘কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু,

  ‘আয় চলে আয়.,রে ধুমকেতু’
আঁধারে বাঁধ্ অগ্নিসেতু,
দুর্দ্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন:
অলক্ষণের তিলক রেখা
রাতের ভালে হোক না লেখা
জাগিয়ে দেরে চমক মেরে’
আছে যারা অর্দ্ধচেতন!।
(স্বাক্ষর)
শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’।
প্রথম থেকেই ‘ধুমকেতু’-র কন্ঠ ছিল চড়া ও বেশ জোরালো। রাষ্ট্র ও সমাজের কুসংস্কার কুপমন্ডুকতার বিরুদ্ধে কঠোর বাণী উচ্চারণ করা ছিল‘ধুমকেতু’র প্রধান বৈশিষ্ট্য’।
 ১৬ অক্টোবর ১৯২২ সালের সংখ্যায় ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী  প্রতিবেদনে বলা হয়Ñ‘ধর্ম, সমাজ,দেবতা কাউকে মেনো না। নিজের মনের শাসন মেনে চলো’। ‘ধুমকেতু’র পাতায় পাতায় কৃষক,শ্রমিক-মজুর তথা খেটে খাওয়া শোষিত মানুষের কল্যাণের বহু বিচিত্র লেখায় ভরপুর থাকতো। ‘ধুমকেতু’র আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, পত্রিকাটি বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চল্লিশ- পঞ্চাশ হাজার কপি বিক্রি হয়ে যেতো। সমগ্র ভারতবর্ষে ‘ধুমকেতু’ যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
 ‘ধুমকেতু’র অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল অত্যাচার- নির্যাতন আর স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপোষহীনভাবে কলম চালানো। শোষক শ্রেণী ও সর্বপ্রকার দু:শাসনমূলক রাষ্ট্রপুঞ্জের বিরোধিতা। যেমন নজরুলের কবিতাবলীর মধ্যে-‘দু:শাসনের রক্ত চাই’ ও ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ এমন আরও কবিতা রূপকার্থক,কিন্তু রাষ্ট্রদ্রোহের জোরালো কন্ঠ ছিল খুবই স্পষ্ট। ‘ধুমকেতু’র ২৬ সেপ্টেম্বর,১৯২২ সংখ্যায় প্রকাশিত- ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি তৎকালীন বৃটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়। উক্ত কবিতা প্রকাশের পর আটই নভেম্বর  কলকাতার প্রতাপ চ্যাটার্জি লেনের ‘ধুমকেতু’র অফিসে হানা দিয়ে সম্পাদক কাজী নজরুল ইসলামকে না পেয়ে পত্রিকার প্রকাশক আফজল হক-কে পুলিশ গ্রেপ্তার করে । নজরুলের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়।
অত:পর ২৩ নভেম্বর কাজী নজরুল ইসলাম কে কুমিল্লায় গ্রেপ্তার করা হয়। ১৬ জানুয়ারি ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ অভিযোগ এনে তৎকালীন আদালত অন্যায়ভাবে  কাজী নজরুল ইসলামকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে।
এই ঘটনার পর বুদ্ধিজীবী, ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সমগ্র ভারতের কৃষক-শ্রমিক, খেত-মজুরসহ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। নজরুলকে গ্রেপ্তারে প্রতিবাদে নানা জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল হয়।
নজরুলের গ্রেপ্তারের পর ‘ধুমকেতু’ বন্ধ হয় নি। বরং পুরোদমে আরও ক্ষীপ্রতার সাথে পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যাহত থাকে। ২৭ জানুয়ারি ১৯২৩ সংখ্যায় নজরুল ইসলামের ছবিসহ তাঁর রচিত কবিতা ‘জবানবন্দী’ প্রকাশিত হয়েছিল।  একই সংখ্যায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ও বিশিষ্টজনের অভিনন্দনবার্তাও ছাপা হয়েছিল।
এভাবেই ‘ধুমকেতু’ পত্রিকাটি ভারতবর্ষের অবহেলিত ও শোষিত মানুষের মুখপাত্র হিসাবে পরিগনিত হয়ে উঠলো। একই সাথে ‘ধুমকেতু’ হয়ে উঠলো স্বাধীনতাকামীদের জন্য একটি জোরালো কন্ঠের মুখপাত্র। পত্রিকাটির যে সংখ্যায় ‘ আনন্দময়ীর আগমনে’ বের হয়েছিল একই সংখ্যায় স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রাণ উৎসর্গকারী ক্ষুদিরাম, কানাইলাল এবং বাঘা যতীনের ছবিও ছাপা হয়েছিল।
নজরুল সম্পাদিত ‘ধুমকেতু’ পত্রিকায় তখনকার দিনের বিখ্যাত লেখক, কবি-সাহিত্যিক ছাড়াও প্রগতিশীল আন্দোলনের রাজনীতিবিদগণও কলাম লিখতেন। রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও  মুজাফ্ফর আহমেদ, শরৎচন্দ্র, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, নৃপেন্দ্র কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, ও হেমন্ত কুমারের মতো বিখ্যাত লেখকগণ ’ ধুমকেতু’ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। ১৯২২ সালের শেষ দিকে তুরস্ক বিপ্লবের নায়ক  কামাল পাশাকে নিয়ে লেখা নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ছাপা হয় । ২৬ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় নজরুল কামাল পাশাকে সমর্থন করার জন্য সোভিয়েত রাশিয়াকে অভিনন্দন জানান।
একই বছরের অক্টোবরে ‘গান্ধী চরিত’ একটি দীর্ঘ রচনা কয়েক সংখ্যা ধরে প্রকশিত হয়। এ ছাড়াও ছদ্মনামে থাকতো সমাজ ও রাষ্ট্রের অসংগতির বিরুদ্ধে নানা বিষয়ের শক্তিশালী কলাম। নজরুলের সাথে সাহিত্যিক ও রাজনীতিচিন্তক শিবরাম চক্রবর্তীর বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। শিবরাম চক্রবর্তীর মতে ‘ধুমকেতু’ ছিল রাষ্ট্র, সমাজ ও শ্রেণী বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি জোরালো মুখপাত্র। যার ফলে ‘ধুমকেতু’ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বিেিশষ করে যুব সমাজের নিকট ‘ধুমকেতু’র চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘ধুমকেতু’ জাগ্রত ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রতান্ত্রিক অনাচার,শোষণ,বঞ্চনাত্মক ধর্মীয় কুসংস্কার ও অবক্ষয়ী সমাজের বিধি-নিষেধের বিরুদ্ধে। ‘ধুমকেতু’ ছিল একটি আপোষহীন পত্রিকা; যে কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে নি।

কাজী নজরুল ইসলাম যেমন একটি ইতিহাসের নাম। তেমনই তার প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি পত্রিকার মধ্যে ‘ধুমকেতু’ যে ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিল; তা কখনও ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না। প্রতিবাদী চেতনার মুখপাত্র জিসাবে ‘ধুমকেতু’র বিস্মিৃত হওয়ার নয়। যতদিন পৃথিবী থাকবে বাংলাভাষা ও সাহিত্য থাকবে, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও থাকবেন অবিস্মরণীয় হয়ে।
 লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
(প্রবন্ধটি নজরুল জয়ন্তী উপলক্ষ্যে রচিত)।