Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক নন, ঘোষণাপত্রের পাঠক মাত্র = রাজু আলাউদ্দিন

শনিবার, ২৫ মার্চ ২০১৭

কে স্বাধীনতার ঘোষক: বঙ্গবন্ধু না, মেজর জিয়া? এই বিতর্ক দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে যারা বেড়ে উঠেছেন তাদের কাছে অবশ্য এই বিতর্ক হাস্যকর ও অবান্তর। ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল যে কারো কাছেই এটি কোনো বিতর্কের বিষয়ই হতে পারে না। কারণ ইতিহাসে এর সাক্ষ্যপ্রমাণ এতই স্পষ্ট, অতীর্যক ও উচ্চকিত যে, এ নিয়ে বাহাস করা মূর্খতা মাত্র।

তাহলে ইতিহাসের বাসরঘরে কোন ছিদ্রপথে বিতর্কের এই বিষাক্ত কুটিল ভুজঙ্গ প্রবেশ করেছে? মূলত রাজনীতি, যার রক্তে রয়েছে প্রতারণার বিষ। যে রাজনীতি মহান কোনো আদর্শ থেকে উৎসারিত হয় না, তা আমাদের ইতিহাস ও ঘটনার বিকৃতির মাধ্যমে বিপথগামী করে তোলার জন্য সব আয়োজন নিয়ে হাজির হয়।

বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় এরকম কোনো দুরন্ত আয়োজনের কোনো দুঃসাহস দেখায়নি কেউই, এমনকি মেজর জিয়াও কখনও ঘোষণার বিষয়টিকে বিতর্কিত বলে মন্তব্যও করেননি, দাবী তো দূরের কথা। কিন্তু জিয়াউর রহমান জীবদ্দশায় একে বিতর্কিত মনে না করলেও তাঁরই ঔরসে জন্ম বিএনপি একে বিতর্কিত করেছে। এবং এই বিতর্কের পেছনেও রয়েছে ইতিহাসের পদাঘাতে বিক্ষিপ্ত ও ছিটকে পড়া সেই সব রাজনৈতিক দলের লোকদের ষড়যন্ত্র যারা আওয়ামীবিরোধী রাজনীতিতে নিঃস্ব ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিল, বিশেষ করে ন্যাপ, মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলাম।

আরও পরে চীনাপন্থীদের যারা একসময় বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন– যেমন মান্নান ভূইয়া, তরীকুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল নোমান– তারা শুধু রাজনৈতিক ঈর্ষা থেকেই নয়, বরং রাজনৈতিক পরাজয়ের প্রতিশোধ চরিত্রার্থ করার উপায় হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি নিঃস্ব করার ষড়যন্ত্রের সুযোগটির সদ্ব্যবহার করতে চেয়েছেন। তারা বঙ্গবন্ধুর ‘আইকনিক ইমেজ’ ভেঙে স্বাধীনতার ‘ঘোষক’ হিসেবে জিয়াউর রহমানকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান নিজে এরকম কোনো আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ না করলেও তার অনুসারী চাটুকাররা তা-ই চেয়েছিল। চাওয়ার কারণ ১৯৭৯ সালে বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধী পরাজিত দল ও ব্যক্তিদের প্রতিশোধস্পৃহাকে এই নতুন দলের ছত্রছায়ায় উজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

নতুন দল মানেই নতুন হিরো, নতুন কাল্ট তৈরি করা, নতুন মিথ তৈরি করা। মেজর জিয়ার মধ্যে এর সম্ভাবনা অল্প হলেও ছিল। তিনি মহান মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। উপরন্তু, তিনিই ছিলেন সামরিক বাহিনীর সেই লোক যিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার পক্ষে ঘোষণা ‘পাঠ’ করেছিলেন। ‘বাঙালি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনিই সবার আগে বিদ্রোহ করেন।’ (মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর, গোলাম মুরশিদ, প্রথমা প্রকাশন, জানুয়ারি ২০১০, পৃঃ ৯২)

এই কৃতিত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না, উচিতও নয়। কিন্তু স্বাধীনতার পক্ষে ‘ঘোষণা পাঠ’ করা আর ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ দেওয়া দুটো ভিন্ন বিষয়। দুধ অল্প পরিমানে থাকলে তাতে জল মিশিয়ে বাড়ানো সম্ভব। সুবিধাবাদী পরাজিত রাজনীতিবিদরা সেই পদ্ধতিই অবলম্বন করেছিল নির্লজ্জভাবে, তা না হলে কেন তারা স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্কটি বঙ্গবন্ধু, এমনকি জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায়ও তোলেননি? আজ তারা যে আস্থা ও উগ্রতার সঙ্গে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তারা এই দাবির কথা তখন কেন জানাননি?

বিএনপির এই দাবি প্রবল হয়ে দেখা দেয় ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর। ক্ষমতা এমন এক জিনিস যার বদৌলতে মিথ্যাকে সত্য ও সত্যকে মিথ্যায় পরিণত করা সম্ভব। আর যদি হয় অর্ধসত্য, তবে তাকে পূর্ণসত্যে পরিণত করা আরও সহজ হয়ে পড়ে।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে বহু রাজনৈতিক কীটপতঙ্গকে পুনর্বাসিত করার সুযোগ দেওয়ায় সেই কৃতজ্ঞতাবোধের প্রকাশ হিসেবে যেমন, তেমনি আওয়ামী লীগ ও তার প্রতিষ্ঠাতার ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন না করলে বিএনপিকে প্রসারিত ও প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না– এই ভাবনা থেকেও জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে দেখানোটা জরুরি হয়ে পড়ে আওয়ামীবিরোধীদের পক্ষে। প্রতিটি দলেরই দরকার হয় একজন আইকনিক ব্যক্তিত্ব, বা কাল্টফিগার। জিয়াউর রহমানের তিলোপম ব্যক্তিত্বকে তাই তাল বানানোর চেষ্টা করেছে তারা। কিন্তু তারা আন্দোলন ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতার অনিবার্য ফলাফল অস্বীকার করে স্বেচ্ছাচার দিয়ে ইতিহাস গড়তে চেয়েছে।

Ziaur Rahman - 888

ইতিহাসে স্বেচ্ছাচারের জায়গা অল্পকালের জন্য হলেও নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনায় এর কোন স্থায়ী জায়গা হয় না। ঘটনার যৌক্তিক পারম্পর্য ও শৃঙ্খলা ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে অনিবার্য এক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে কাজ করে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইতিহাসের দিকে পেছন ফিরলে দেখতে পাব ১৯৬৩ সাল থেকে শেখ মুজিব ধাপে ধাপে পূর্ব বাংলার স্বাধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে যদি এই কালক্রমিক আন্দোলন না থাকত তাহলে ২৬ মার্চে যে কেউ এসে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেই দেশ যে স্বাধীন হত না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি আন্দোলনের এই দীর্ঘ ইতিহাস না থাকলে স্বয়ং শেখ মুজিবও হঠাৎ করে ২৬ মার্চে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেও দেশ স্বাধীন হত কি না, সন্দেহ।

স্বাধীনতার পক্ষে দেশবাসীকে তিনি ধাপে ধাপে উদ্বুদ্ধ ও প্রস্তুত করে তুলেছিলেন বলেই সেটা সম্ভব হয়েছে। সুতরাং কেউ একজন এসে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন বলেই দেশ স্বাধীন হয়নি। ইতিহাসের ঘটনাস্রোত ও বঙ্গবন্ধু পরস্পর এমন অবিচ্ছিন্নভাবে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে গিয়েছেন যে সেখানে শেখ মুজিব ছাড়া আর কারও পক্ষে সেই স্বাধীনতা ঘোষণা করা সম্ভবই ছিল না। যদি তা-ই হত, তা হলে শেখ মুজিব ছাড়াও তো তখন অনেক নেতাই ছিলেন, তারা কি সেটা করতে পেরেছিলেন?

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই যে, রাজনৈতিক চর্চা ও আন্দোলন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তির পক্ষে তা ছিল আরও অসম্ভব। সুতরাং জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে দাবি করাটা স্রেফ গায়ের জোরে চাপিয়ে দেওয়া একটা ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়।

গবেষক গোলাম মুরশিদ জানাচ্ছেন যে, “বস্তুত, ফেব্রুয়ারি মাঝামাঝি তিনি (বঙ্গবন্ধু) তাজউদ্দীন ও কামাল হোসেনকে দিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার একটি খসড়া লিখিয়ে নেন।” (গোলাম মুরশিদ, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর’, প্রথমা, জানুয়ারি ২০১০, পৃ-৬৭)

সেই সময়ের আন্দোলনের ইতিহাসটি যারা জানেন তারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে, ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার পর “পূর্ব পাকিস্তান চলতে শুরু করে মুজিবের আদেশে। কেবল আওয়ামী লীগের নয়, তিনি সবার নেতায় পরিণত হন ততদিনে। তাঁর নেতৃত্বে দেশের জনগণ আন্দোলনে ফেটে পড়লেন।” (গোলাম মুরশিদ, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর’, প্রথমা, জানুয়ারি ২০১০, পৃ-৬৭)

বঙ্গবন্ধু তখন রাজনৈতকি ব্যক্তিত্ব হিসেবে এতই প্রবল ও পরাক্রমশালী হয়ে উঠেছিলেন যে, একটি রাষ্ট্র তখন চালিত হচ্ছে সশস্ত্র শাসকদের দ্বারা নয়, বরং নিরস্ত্র বিরোধী দলের একজন নেতার নির্দেশে। এমন ঘটনা ইতিহাসে খুবই বিরল। তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে তো তিনি স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, যাকে স্বাধীনতার ঘোষণা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না:

“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

“এর পর থেকে সরকারী অফিস-আদালত, ব্যাংক, সমুদ্রবন্দরের কাজ– সবই চলতে থাকে তাঁর হুকুম মতো।” (গোলাম মুরশিদ, মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর, প্রথমা, জানুয়ারি ২০১০, পৃ-৭২)

বঙ্গবন্ধুর সমকালে আরও অনেক নেতাই ছিলেন, ন্যাপ ও বাম দলগুলোর নেতারা ছিলেন, তাদেরও বঙ্গবন্ধুর হুকুমের বাইরে কিছুই করার ছিল না। এরকম অবস্থায়, যিনি জনপ্রতিনিধি নন, নিতান্তই একজন সামরিক কর্মকর্তা, তিনি এসে হুট করে স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন– এটা উদ্ভট কল্পনাশক্তি ছাড়া সম্ভব নয়।

রাজনীতির প্রবল ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধুর পরিবর্তে সেকালে জিয়াউর রহমানের মতো অজ্ঞাত ও অপরিচিত এক লোককে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগটা বিএনপি গ্রহণ করেছে মূলত চট্টগ্রামের ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে প্রচারিত ঘোষণাটিকে পুঁজি করে। কিভাবে সম্ভব হয়েছিল সেই ঘোষণাটি? কোনো সামরিক লোক নয়, বরং স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করার কথা বেতার কেন্দ্রের কর্মীরাই প্রথম ভেবেছিলেন জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে। ঘোষণা তো বঙ্গবন্ধু ২৭ মার্চের আগেই দিয়ে রেখেছেন তাঁর বক্তৃতায়, মুক্তিযোদ্ধা মঈদুল হাসান সে কথা স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন তার ‘মূলধারা ’৭১’ বইয়ে: “ঢাকার বাইরে এ কথা রাষ্ট্র হয়ে পড়ে যে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন এবং পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিরোধ সংগ্রামের নেতৃত্ব দান করে চলেছেন।” (মঈদুল হাসান, ‘মূলধারা ‘৭১’, ইউপিএল, জানুয়ারি ২০১৬ পৃ: ৪)।

কিন্তু বেতারের কর্মীরা বঙ্গন্ধুর ‘স্বাধীনতার ডাক’ জনসাধারণে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য জিয়াউর রহমানকে বেছে নিয়েছিলেন। শুধু এই কারণে বিএনপির উৎসাহী নেতা ও কর্মীরা জিয়াকেই স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে দেখাতে চান। জিয়াউর রহমান কি শেখ মুজিবের আগে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন? ২৭ মার্চের যে ঘোষণাটির কথা বলা হয় সেটাও তো নিজে স্বেচ্ছায় গিয়ে ঘোষণা করেননি জিয়াউর রহমান, যদিও জানি যে, “বাঙালি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনিই সবার আগে বিদ্রোহ করেন।” (মঈদুল হাসান, ‘মূলধারা ‘৭১’, ইউপিএল, জানুয়ারি ২০১৬, পৃ-৯২)

এবং এও সত্য যে, “মেজর জিয়ার ঘোষণা এবং বিদ্রোহী ইউনিউগুলোর মধ্যে বেতার যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হবার ফলে এই সব স্থানীয় ও খণ্ড বিদ্রোহ দ্রুত সংহত হতে শুরু করে।” (মঈদুল হাসান, ‘মূলধারা ‘৭১’, ইউপিএল, জানুয়ারি ২০১৬, পৃ-৭)

চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের তখনকার কর্মকর্তা বেলাল মোহাম্মদ জানিয়েছেন, জিয়াউর রহমানকে ডেকে নিয়ে এসে তাঁরা স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করান। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী কারোর লেখা স্মৃতিচারণেই এ কথা বলা হয়নি যে, তিনি নিজে যেচে গিয়ে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে ঘোষণাটি দিয়েছেন।

যেহেতু ২৫ মার্চের আক্রমণটি ছিল আকস্মিক যা আওয়ামী লীগের নেতারা কেউ কল্পনাও করেননি, ফলে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে পরিকল্পনার কোনো নিপুণতা ছিল না, ছিল না যথাযথ সমন্বয়ও। বেতার কেন্দ্রের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল। এমনকি যেসব ভাষ্য তখন পাঠ করা হত সেগুলোও খুব গোছানো ও সুশৃঙ্খল ছিল না। যে কারণে মেজর জিয়া তাঁর প্রথম বক্তৃতায় নিজেকে ‘রাষ্ট্রপ্রধান’ বলে ঘোষণা করে ফেলেছিলেন। বোঝাই যায়, এটি স্বেচ্ছাকৃত নয়, অনিচ্ছাকৃত ভুল।

মঈদুল হাসান তাঁর বইয়ে জিয়ার ঘোষণাটি সম্পর্কে বলেছেন, “স্বল্পকালের জন্য চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র যখন বিদ্রোহীদের দখলে আসে, তখন ২৬শে মার্চ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান এবং ২৭শে মার্চ সন্ধ্যায় ৮ ইবির বিদ্রোহী নেতা মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। মেজর জিয়া তাঁর প্রথম বেতার বক্তৃতায় নিজেকে ‘রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবে ঘোষণা করলেও, পরদিন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা প্রকাশ করেন।” (পৃ: ৫-৬)

মঈদুল ইসলামের এই বক্তব্যের সঙ্গে আমরা মিল খুঁজে পাব জিয়াউর রহমানের সেই ঘোষণাটির:

“On behalf of our great national leader, the supreme commander of Bangladesh Sheikh Mujibur Rahman do hereby proclaim the independence of Bangladesh. It is further proclaimed that Sheikh Mujibur Rahman is the solo leader of the elected representatives of 75 million people of Bangladesh. I therefore appeal on behalf of our great leader Sheikh Mujibur Rahman to the government of all the democratic countries of the world specially the big world part and neighboring countries to take effective steps to stop immediately the awful genocide that has been carried on by the army of occupation from Pakistan. The legally elected representatives of the majority of the people as repressionist. It is cruel joke and contradiction in terms which should be fool none. The guiding principle of a new step will be first neutrality, second peace and third friendship to all and anomity to none. May Allah help us. Joy Bangla.”


বঙ্গবন্ধুর পক্ষে জিয়াউর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণার পাঠ শোনার জন্য উপরের লিংকে ক্লিক করুন।

জিয়া ও বিএনপির উগ্র, অন্ধ সমর্থকরা, এমনকি দলীয় ইতিহাস লেখকরাও নির্বোধের মতো জিয়াকে স্বাধীনতার ‘ঘোষক’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে’ কথাটি পুরোপুরি বর্জন করে। অথচ এই ঘোষণাতেই জিয়া স্পষ্ট করে বলেছেন:

“মহান জাতীয় নেতা, বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।”

এমনকি এই ঘোষণার তৃতীয় বাক্যটিতেও জিয়াউর রহমান আবারও ড়হ নবযধষভ ব্যবহার করে বলেন:

“অতএব আমাদের মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে…”

জিয়াউর রহমান কর্তৃক এই ঘোষণা পাঠে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের কৃতিত্বই একমেবাদ্বিতীয়তম। জিয়াউর রহমান এখানে শেখ মুজিব কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের পাঠক মাত্র। টেলিভিশনে সংবাদ পাঠক (News caster) যেমন পাঠের সূত্রে সংবাদের নায়ক হতে পারেন না, বরং নিছকই পাঠক, তেমনি জিয়াউর রহমান ঘটনাক্রমে এর পাঠক মাত্র। এমনকি তিনি এর প্রথম পাঠকও নন, কারণ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান তার আগেই স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন। ফলে পাঠক হিসেবেও তিনি প্রথম নন। আর ঘোষক হিসেবে তিনি প্রথম বা দ্বিতীয়– কোনোটাই নন।

কবিতার আবৃত্তিকার যেমন আবৃত্তির সূত্রে কবিতাটির রচয়িতা বলে নিজেকে দাবি করতে পারেন না, ঠিক একইভাবে জিয়াউর রহমানকে কোনোভাবেই স্বাধীনতার ঘোষক বলা যায় না।


‘সমুদ্রস্তন দ্বীপের মতো সে আছে ঘুমিয়ে’ : ডেরেক ওয়ালকটের প্রস্থান

শনিবার, ২৫ মার্চ ২০১৭

Walcott১.
শীতল কাচ ছায়াময় হয়ে ওঠে। এলিজাবেথ একবার লিখেছিল—
আমরা কাচকে আমাদের ব্যথার চিত্রকল্প বানিয়ে ফেলি।

২.
কাছে এসো ফিরে
আমার ভাষা।

ওয়ালকট, তাঁর নিজের ভাষায়, প্রথমত এক ক্যারিবীয় লেখক যিনি মানবগোষ্ঠীর একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে সবকিছু দেখেছেন আর বলেছেন, পরিপক্বতা হলো প্রত্যেক পূর্বসূরির বৈশিষ্ট্যের সাঙ্গীকরণ। তাঁর একীকরণের বিষয় ছিল ল্যাঙ্গুয়েজ কনটিনাম আর কালচারাল স্ট্রেটাম। ১৯৯২ সালে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত, সেন্ট লুসিয়ার ক্যাস্টিসে ১৯৩০-এর ২৩ জানুয়ারি জন্মগ্রহণকারী ডেরেক ওয়ালকট মনে করতেন যে, অধিকাংশ কৃষ্ণাঙ্গ লেখকই তাঁদের আত্মবিচ্ছিন্নতা দ্বারা নিজেদের পঙ্গু করে ফেলেন, কবি হিসেবে মানবতার বিভাজনে বিশ্বাস অনুচিত। তাঁর স্টার-আপেল কিংডম কাব্যের ‘দ্য স্কুনার ফ্লাইট’ কবিতায় এই চেতনার স্যাবাইন বলছে এমন কথা যা থেকে তাঁর প্রাতিস্বিকতার পরিচয় ধরা পড়ে:
আমি হলাম সোজাসাপটা একজন লাল নিগার যে সমুদ্রপ্রেমিক,
আমার রয়েছে ঠিকঠাক ঔপনিবেশিক শিক্ষা,
আমি একাধারে ডাচ, কৃষ্ণাঙ্গ এবং ইংরেজ
আর হয় আমি কেউ নই নতুবা
আমি এক জাতি।

তাঁর ভেতর ইউরোপীয় ইতিহাস, শিল্পসাহিত্য আর সেন্ট লুসিয়ার আফ্রিকানির্ভর সংস্কৃতির সার্থক মিলন ঘটেছে। তিনি ছিলেন না ইউরোপীয় গোছের, আবার সেন্ট লুসিয়ার কৃষ্ণাঙ্গদের মতো কালোও ছিলেন না, ছিলেন কিছুটা সাদাটে। ফলে বিভিন্ন ঐতিহ্য থেকে গ্রহণের ক্ষমতা তাঁকে দিয়েছে সময়ের এক অতলান্ত কৌলিনত্ব। তিনি বলেছিলেন: ‘আামি এক বিচ্ছিন্ন লেখক: আমার মধ্যে রয়েছে এমন-এক ঐতিহ্য যা একদিকে গ্রহণ করে যায়, আর আছে অন্য এক ঐতিহ্য যা অন্যদিকে বিস্তারিত হয়। একদিকে অনুকরণশীল, বর্ণনাত্মক ও নৃতাত্ত্বিক উপাদান অন্যদিকে তা আবার সাহিত্য ও ধ্রুপদি ঐতিহ্যে শক্তিশালী।’

কবি হিসেবে সততই তিনি নিজেকে পুনরাবিষ্কার করে গেছেন। ১৯ বছর বয়সে প্রকাশিত প্রথম কাব্য ২৫টি কবিতা এবং যুবকের জন্য এপিটাফ থেকে ওমেরস পর্যন্ত, এবং তিরিশটির মতো নাটকে, বিশাল বিস্তার ও গভীরতা তাঁকে করে তুলেছে মহান লেখক। প্রথম দিকের কবিতায় এলিঅট, পাউন্ড, ডিলান টমাস, অডেনদের তুমুল ছায়াসম্পাত সত্ত্বেও পরবর্তীসময়ে এই প্রভাবকে আত্মস্থ করে তিনি স্বকীয় হয়ে ওঠেন। ‘মিউজ অব হিস্টি’তে তিনি বলেছেন: ‘অনুকরণের ভয় গৌণ কবিদের অবশ করে রাখে। বড়ো কবিরা যা পাঠ করে তাকে আত্মস্থ করেই নিজ মৌলিকত্বকে প্রতিষ্ঠা করে যায়।’ এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেছেন: ‘কোনোদিন আমি স্পেন্ডারের মতো লিখি, কোনোদিন লিখি ডিলান টমাসের মতো, আর যখন বুঝি যে পছন্দের অনেক কবিতা লেখা হয়ে গেছে, কেবল তখনই তা ছাপতে দিই।’
১৯৯০ সালে প্রকাশিত ওমেরস এক মহাকাব্য, কবিতায় লিখিত এক আধুনিক উপন্যাসও বলা যায় তাকে। তিনশ পৃষ্ঠায় ব্যাপ্ত তিনচরণবিশিষ্ট স্তবকবিন্যস্ত তেরসারিমা ছন্দে এক আশ্চর্য বুনুনশৈলীর উদ্ভাাসন, যাকে সমালোচকেরা বলেছেন–প্লট, ইমেজ আর ভাষাতাত্ত্বিক নাটকীয়তার এক দীর্ঘ ও জটিল ইন্দ্রজাল। এতে রয়েছে ৬৪টি অধ্যায় যা আাবার ৭টি পুস্তকে বিন্যস্ত। প্রতিটি অধ্যায়ে ৩টি ভাগ। প্রথম পুস্তকে ১৩টি, দ্বিতীয়টিতে ১১টি, তৃতীয়টিতে ৮টি, চতুর্থ পুস্তকে ৪টি, পঞ্চমে ৭টি, ষষ্ঠে ১২টি আর সপ্তম পুস্তকে ৯টি অধ্যায় রয়েছে। ওমেরস-এ প্লটের তিনটি প্রধান গ্রন্থি রয়েছে: প্রথমটি, হেক্টর আর অ্যাকিলিস সেন্ট লুসিয়ার মাঝি হেলেনের অনুগ্রহের জন্য প্রতিযোগিতারত; দ্বিতীয়টি, মেজর ডেনিস প্লাংকেট আর তার স্ত্রী মড আয়ারল্যান্ড থেকে সেন্ট লুসিয়ায় এসে দ্বীপের ইতিহাসবিষয়ে অনুসন্ধান চালায়, হেলেন, যে তাদের জন্য কাজ করবে, সেও এই কাহিনিতে গুরুত্বপূর্ণ; তৃতীয়টি, লেখক গল্পের বাতাবরণে আশ্চর্যান্বিত হন, অন্ধ দ্রষ্টা সাতসমুদ্রের সহযোগী হন।
ওয়ালকটের অ্যানাদার লাইফ আত্মজীবনীমূলক দীর্ঘ কবিতা। ২৩টি অধ্যায়ের এই গ্রন্থ চারটি প্রধান অংশে বিভক্ত যার প্রতিটিই একটি এপিটাফ দিয়ে শুরু হয়। জীবন ও শিল্পের সহসম্পর্ক সার হয়ে দেখা দেয় এই গ্রন্থে:
না কোনো রূপক, না রূপান্তর,
যেন কয়লার চুলা তার ধোঁয়ার দরজায় পরিণত।
তিনটি জীবন কল্পনায় অপসৃত,
তিনটি ভালোবাসা: শিল্প, প্রেম আর মৃত্যু,
নিশ্বাসে মেঘাবৃত দর্শন থেকে মুছে যায়,
কোনোটাই বাস্তব নয়,তারা বাঁচতেও পারে না মরতেও পারে না,
তারা সব অস্তিত্বময়,

ওয়ালকটের লেখায় দেখা মেলে ভাষার দার্ঢ্য ব্যঞ্জনা, প্রসারিত আর জাগতিক রূপকের কানামাছি খেলা। ক্যারিবীয় সাহিত্যের তিনি এক বিনির্মাণকারী। একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন: ‘প্রতিটি সূর্যাস্ত তোমার জীবনের রক্ত থেকে তুলে নেয় আঠালো তরল।’ তাঁর মৃত্যু ক্যারিবীয় তথা বিশ্বসাহিত্যের অপূরণীয় এক স্তব্ধতা।

ওয়ারকটের তিনটি কবিতা

নতুন বিশ্বের মানচিত্র
১. দ্বীপপুঞ্জ

এই বাক্যের শেষে, নামবে বৃষ্টি,
বৃষ্টির প্রান্তে, একটি পাল।

ধীরে পাল হারিয়ে বসে দ্বীপের দৃশ্যাবলি;
পোতাশ্রয়ে কুয়াশামগ্ন হয়ে পড়ে সমগ্র জাতির বিশ্বাস।

দশ বছরের যুদ্ধ শেষ।
হেলেনের চুল, ধূসর মেঘমালা।
ট্রয়, সমুদ্রের ধারে
এক সাদা অগ্নিকুণ্ড।

বীণার তারের মতো ঋজু সব ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি।
মেঘময় চোখের একজন তুলে নেয় তা
আর রচনা করে ওদিসির প্রথম পঙ্ক্তিটি।

সমাপ্তি

জলের ওপর বাস,
একা। নেই স্ত্রী বা সন্তানাদি।
সব সম্ভাবনাকে নিয়েই
এখানে আসা:
ধূসর জলের ধারে নীচু ঘরখানা,
জীর্ণ সমুদ্রের দিকে জানালাটি খোলা।
এসব পছন্দের নয় আমাদের,

কিন্তু আমরা হলাম আমাদেরই নির্মাণ।
কষ্ট পাই, সময় যায় চলে, আমরা ছেড়েছি
পথ পারাপার, কিন্তু তা নয়
নির্ভারের প্রয়োজনে।
ভালোবাসা হলো পাথর
ধূসর জলের তলে সমুদ্রবিছানায় রয়েছে যে স্থিত।
এখন, কবিতা থেকে কিছুই নেই পাওয়ার শুধু
সত্যবোধ ছাড়া,
না করুণা, না খ্যাতি, না উপশম। নিশ্চুপ স্ত্রী,
ধূসর জল দেখতে এসো বসি,

ক্লিশে আর তুচ্ছতায় প্লাবিত জীবন
পাথরের মতোই করে বাস।
অনুভবকে ভুলে যাব আমি,
ভুলে যাব আর সব চাওয়াপাওয়ার চাল।
জীবনের অপসৃয়মাণতার চেয়ে এসব
কঠিন আর সত্যিই বিশাল।

সমুদ্রগুল্ম

অর্ধেক বন্ধুরাই চলে গেছে মৃতদের দেশে।
পৃথিবী দিতে চাইল নতুন বন্ধু আমাকে।
চিৎকার করে বললাম,তা-না করে তুমি ফিরিয়ে দাও তাদের, মৃত বন্ধুদের,
যেমনটি তারা ছিল ভালোমন্দ মিলিয়ে একদা।

আজ রাতে গুল্মবনের ভেতর
মিইয়ে যাওয়া সমুদ্রের একটানা গর্জনে
শোনা যাচ্ছে মৃত বন্ধুদের কথাবার্তা।
কিন্তু আমি হাঁটতে পারি না সমুদ্রে বিছানো জোছনায়

পরিষ্কার পথ ধরে নির্জনে একা
অথবা জগতের থেকে মুক্ত হয়ে
উড়তে পারি না লক্ষ্মী পেঁচার মতো।
হে আমার ব্রহ্মাণ্ড, প্রেমের জন্যে যারা গেছে
তার চেয়ে বেশি রয়েছে অনেকে জীবনে।

সবুজ ও রূপালি সমুদ্রের উজ্জ্বলতা,
গুল্মবন, বন্ধুর পথ,
আমার বিশ্বাসের ফেরেশতার বর্শা ছিল তারা
কিন্তু যারা গেছে হারিয়ে তাদের চেয়ে উত্তম কেউ জন্মাক তো।

যৌক্তিক উজ্জ্বল পাথর, সহনীয় জোছনা তার গায়
পেরিয়ে নিরাশা, বাতাসের তোড়
ফালা ফালা করা গুল্মবন
মৃত বন্ধুদের নিয়ে আসবে
তাদের ভালোমন্দসহ।

উৎস: ডেরেক ওয়ালকট: কালেক্টেড পোয়েমস, ১৯৪৮-১৯৮৪, ফেবার অ্যান্ড ফেবার।


"ইতিহাসের অমোঘ সত্যের লালন,বিকাশ,রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি:প্রয়োজনীয়তা: করনীয়।"---সিকদার গিয়াসউদ্দিন

রবিবার, ১৯ মার্চ ২০১৭

১৯৭১' সাল।১'লা মার্চ,২'রা মার্চ,৩'রা মার্চ।তারই ধারাবাহিকতায় ৭'ই মার্চ।বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষন।অত:পর ২৩'শে মার্চ পাকিস্তান দিবসের পরিবর্তে প্রতিরোধ দিবস।তথাকথিত পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে ২৫'শে মার্চ বঙ্গবন্ধুকে আটক ও গনহত্যা।তারপর বঙ্গবন্ধুর নামে ২৬'শে মার্চ জনযুদ্ধে রূপান্তর।অগ্নিঝরা মার্চের এসব দিনগুলো পূর্বানী হোটেল ভায়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,পল্টন ময়দান হয়ে রেসকোর্স ময়দান।আবারো পল্টন ময়দানের সেই দিনগুলো সমগ্র দেশের সর্বস্তরের জনগনকে জনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে যেভাবে উদ্ভুদ্ধ করেছিলো-ইতিহাসে তা খূবই বিরল।কোন একটি দিনকে অন্যদিন থেকে আলাদা করার উপায় নেই।বঙ্গবন্ধুর নামে আমাদের মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে গোপন সংগঠন নিউক্লিয়াসের মাধ্যমে ছাত্র-যুব সমাজের গোপন ও প্রকাশ্য পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক ব্যাপক কর্মকান্ড দলমত নির্বিশেষে সমগ্র দেশের ছাত্র-শ্রমিক ও সর্বস্তরের জনগনকে একই সূঁতোয় বেঁধে জনযুদ্ধে রূপান্তরের প্রক্রিয়া দস্তুরমতো এখন ইতিহাসের আকর।এসব দিনগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোন উপায় নেই।ধারাবাহিকতায় দিনগুলো অবশ্যই পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ইতিহাসের অমোঘ সত্যের লালন ও বিকাশে এসব দিনগুলোর মহিমামন্ডিত ইতিহাসকে ঐতিহাসিক কারনে জাতীয় স্বার্থে ক্ষুদ্র দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির উর্ধ্বে স্থান দিয়ে দীর্ঘ কয়েক যুগের ব্যবধানে দেরী হয়ে গেলেও জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা গ্রহন সময়ের দাবী বলে পত্র-পত্রিকা,তথ্য মাধ্যম,গনমাধ্যমে,সোশ্যাল মিডিয়া সহ নবীন প্রবীন বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞজনদের বলতে দেখা যায়।শুধু তাই নয়-চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে ৬ দফা ঘোষনার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর সাথে এম এ আজিজ সহ জনযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নামে মুজিবনগর সরকারের অবদান,মওলানা ভাসানী,অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ,কমরেড মনি সিং,মনোরঞ্জন ধর সহ ছাত্র ইউনিয়নের কর্মকান্ড বেশ প্রনিধানযোগ্য।ছাত্র ইউনিয়নের কাজী জাফর,রাশেদ খান মেনন,মতিয়া চৌধূরী,হায়দার আকবর খান রনো,আতিকুর রহমান শালু ইউছুফজাই সহ অনেকের কর্মকান্ডও আলোচ্য।

তথাকথিত পাকিস্তানের সামরিক বেসামরিক সকল গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টকে মিথ্যা প্রমানিত করে ১৯৭০'সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে।নির্বাচনের পরপরই ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা শাসকগোষ্টির তালবাহানা ও ষডযন্ত্র লক্ষনীয়।দীর্ঘ ২৪ বছরের শাসন-শোষন,অবিচার,অনাচারের কথা বাদ দিলেও নির্বাচনের আগে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্নিঝড়ে লক্ষ লক্ষ লোকের প্রানহানির পর পশ্চিমা শাসকদের উপেক্ষা সারাবিশ্বকে স্তম্ভিত করে।বাঙালী জাতির প্রতি এতোবড়ো উপেক্ষা নির্বাচনে বিরাট প্রভাব রাখে এবং পূরো জাতিকে একই সূঁতোয় গেঁথে ফেলে।যাহোক-১৯৭১'সালের ১'লা মার্চ সামরিক স্বৈরশাসক আচানক রেডিওতে ৩'রা মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষনা করলে ঢাকাসহ সারাদেশ আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে উঠে।ঢাকা ষ্টেডিয়ামে তখন ক্রিকেট খেলা চলছিলো।ইয়াহিয়ার ভাষনের পরপরই তা পন্ড হয়ে যায়।অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে ঢাকা শহরের বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতা "বীর বাঙালী অস্ত্র ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর","ছয় দফা না এক দফা-এক দফা এক দফা",পিন্ডি না ঢাকা-ঢাকা ঢাকা","তোমার নেতা আমার নেতা-শেখ মুজিব শেখ মুজিব" ইত্যাদি গগনবিধারী শ্লোগান সহকারে হোটেল পূর্বানীর চতুর্পাশ্বে জড়ো হতে থাকে।দ্রুততম সময়ের ব্যবধানে ততক্ষনে হোটেল পূর্বানীর চতুর্দিকে লোকে লোকারণ্য।বঙ্গবন্ধু তখন আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারী অধিবেশন ও দেশীবিদেশী সাংবাদিকদের নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন।ইয়াহিয়ার ভাষনের পরপরই হোটেল পূর্বানীর ভেতরের অবস্থা থমথমে।বাইরে বিক্ষুব্ধ জনতার গগনবিধারী শ্লোগানের গর্জনের একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু হোটেল পূর্বানীর ব্যালকনীতে দাঁড়িয়ে সবাইকে আন্দোলন অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।ছাত্রজনতা বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত ভাষনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যেতে থাকে।বিক্ষুব্ধ ছাত্র জনতা চার খলিফা খ্যাত ছাত্রনেতাদের সমন্বয়ে "স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ"ঘোষনার জন্য প্রচন্ড চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।এক পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় ডাকসূ ভিপি আ স ম আবদুর রব,ডাকসূ সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন,বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী,বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ চতুষ্টয়ের সমন্বয়ে "স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ"য়ের ঘোষনা দেয়া হলে উপস্থিত ছাত্রজনতা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে শ্লোগানের পর শ্লোগান সহকারে চতুর্দিক প্রকম্পিত করে তোলে।স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পরবর্তি দিন ২'রা মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠানের ঘোষনা দিলে ছাত্র জনতা সেদিনের মতো শ্লোগান দিতে দিতে যার যার গন্তব্যে গমন করে।ততক্ষনে সমাবেশের কথা ঢাকা নারায়নগন্জ সহ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।উল্লেখ্য ১৯৭০'সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উপরোল্লিখিত চার ছাত্রনেতা উল্কার বেগে সারাদেশ চষে বেড়ায়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জয়যুক্ত করার লক্ষ্যে।এক পর্যায়ে জনগন তাঁদেরকে চার খলিফা বলে সম্বোধনের বিষয়টি আলোড়ন সৃষ্টিকারী।

এলো ২'রা মার্চ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গন।স্মরণকালের বৃহত্তম ছাত্রজনসভায় তিলধরনের ঠাঁই ছিলোনা।এই সভায় চার খলিফার কন্ঠে বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষনা করা হয়।উল্লেখ্য শ্লোগানে মূখরিত উত্তেজিত ছাত্রজনতাকে ১০:৪৫ মিনিটে ডাকসূ ভি পি আ স ম আবদুর রব মাইক হাতে নিয়ে সভায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী সমবেত সকলকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও তাঁর নির্দেশ অনুসরন করে স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার শপৎবাক্য পাঠ করান। সভায় চার খলিফা ও লক্ষ ছাত্রজনতার উপস্থিতিতে ডাকসূ ভি পি আ স ম আবদুর রব পতাকা উত্তোলন করলে সমুদ্রের গর্জনের মতো শ্লোগানে শ্লোগানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা প্রকম্পিত হতে থাকে।পরবর্তি দিন ৩'রা মার্চ পল্টন ময়দানে জনসভার ঘোষনা দেয়া হয়।
২'রা মার্চ,আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের ফলে বাঙালী জাতি কেবলমাত্র স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া ব্যতিত পেছন ফেরার সব পথ রূদ্ধ হয়ে যায়।তাই এই দিনের বিশেষ মাহাত্ম্য ঐতিহাসিক কারনে আগামী জমানার ইতিহাসবিদদের কাছে অবশ্যই বিশেষ গুরুত্ববহ হয়ে উঠবে।কারন স্বাধীনতার লক্ষ্যে পরিচালিত সংগ্রামের ঐতিহাসিক জনঅনুমোদন সেদিন উপস্থিত ছাত্রজনতার মধ্য দিয়েই সুস্পষ্টভাবেই ধ্বনিত হয়েছিলো।

৩'রা মার্চে ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে "স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ"আয়োজিত বিশাল জনসভায় অনির্ধারিতভাবে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি ও আন্দোলনের ঘোষনা প্রদান এককথায় ঈঙ্গিতবহ ও অবিস্মরনীয়।এদিন ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক শাজাহান সিরাজ মন্চে বঙ্গবন্ধুর আগমনের পূর্বে ও বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে দূ'বার স্বাধীনতার ইশতেহার বা প্রক্লেমেশন বা ঘোষনাপত্র পাঠ করেন।মুহুর্মুহু করতালি আর গগনবিধারী শ্লোগানের মধ্য দিয়ে তা জনঅনুমোদন লাভ করে।সর্বসম্মতিক্রমে বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার স্থপতি ঘোষনা,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তোলিত জাতীয় পতাকা নির্ধারন ও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের "আমার সোনার বাংলা" গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে নির্বাচন সহ বিস্তারিত কর্মপন্থা ঘোষিত হয়।প্রকাশ্য জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে জনঅনুমোদন প্রাপ্ত ইশতেহার বা প্রক্লেমেশন বা ঘোষনার বিষয়টি জানার পরও ঘোষনা নিয়ে অহেতুক বিতর্কের বা বিকৃত ইতিহাস তৈরীর আদৌ কোন অবকাশ আছে কি?

৩'রা মার্চের পরপরই বিএলএফের চার যুব নেতা সিরাজুল আলম খান,শেখ ফজলুল হক মনি,আবদুর রাজ্জাক,তোফায়েল আহমদ ও বেগম মুজিবের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড গঠনের আশ্বাস প্রদান করেন।৭'ই মার্চের আগের দিন রাতে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডীর ৩২ নম্বর বাসভবনে চার যুবনেতা,চার খলিফাখ্যাত স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও বেগম মুজিবের সাথে গভীর আলোচনা এবং অবশেষে আওয়ামী হাইকমান্ডের সাথে ঐক্যমত্যের বিষয়টি বঙ্গবন্ধু জানিয়ে দেন।সকলের সাথে ব্যাপক পরামর্শের ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু পরবর্তি দিনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন।তোফায়েল আহমদসহ চারখলিফার নেতৃত্বে শত শত ভলান্টিয়ার মন্চ সহ উত্তাল জনসমুদ্র নিয়ন্ত্রনের দায়িত্ব পালন স্মরন করার মতো।ছাত্র নেতা,যুবনেতা,আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড পরিবেষ্টিত হয়ে মন্চে আরোহন করার সাথে সাথেই উত্তাল জনসমুদ্র মুহুর্মুহু গগনবিধারী শ্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তোলে।পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ভাষনদানকালে স্মরন করিয়ে দিলেন "যার যা আছে-তাই নিয়ে প্রস্তুত থেকো"।"ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল"।সবশেষে "এবারের সংগ্রাম-আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।এবারের সংগ্রাম-স্বাধীনতার সংগ্রাম"।"জয় বাংলা"।তারপর আর কিছু কি বাকী থাকতে পারে?
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে।আওয়ামী লীগ,যুব ও ছাত্র নেতৃত্বের মাধ্যমে সমগ্র দেশ বঙ্গবন্ধুর নামে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হতে থাকে।পশ্চিমা শাসকগোষ্টী নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলে।এভাবে এলো ঐতিহাসিক ২৩'শে মার্চ।এদিনের গুরুত্বও অপরিসীম।পাকিস্তান দিবসের পরিবর্তে প্রতিরোধ দিবস।এদিন সারাদেশে পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে প্রতিটি ঘরে ঘরে এমনকি হাইকোর্ট,সকল কূঠনৈতিক মিশন সহ সর্বত্র (কেবলমাত্র আজকের বঙ্গভবন ও ক্যান্টনম্যান্ট ব্যতিত)বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেয়া হয়।ঢাকার পল্টন ময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে এদিন স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দেয়া হয়।আমেরিকার এবিসি টেলিভিশন নেটওয়ার্কের বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিক টেড কপেলের ধারাবর্ণনা ইউটিউবে এখন দেখতে পাওয়া যায়।এদিন 'জয় বাংলা বাহিনী'ও 'মহিলা জয় বাংলা বাহিনী' লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে "স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ"য়ের 'চার খলিফা' যথাক্রমে আ স ম আবদুর রব,আবদুল কুদ্দুস মাখন,নূরে আলম সিদ্দিকী ও শাজাহান সিরাজকে "গার্ড অব অনার"প্রদান করেন।পতাকা উত্তোলন করেন হাসানুল হক ইনু আর 'জয় বাংলা বাহিনী'র উপপ্রধান কামরুল আলম খান খসরু গান ফায়ার করে মুক্তিযুদ্ধের সূচনার ঈঙ্গিত প্রদান করেন।দেশীয়,আন্তর্জাতিক ও কূঠনৈতিক জটিলতা নিরসনে বঙ্গবন্ধু অনুপস্থিত থাকলেও গোপন সংগঠন নিউক্লিয়াসের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর অনুমোদনের বিষয়টি অনেকেরই জানার কথা।কারন ঐদিন জনসমাবেশ শেষে 'জয় বাংলা বাহিনী'র প্রধান ও ডাকসূ ভি পি আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে বিরাট মিছিল ধানমন্ডীর ৩২ নম্বর বাসভবনে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর হাতে স্বাধীন বাংলার পতাকা প্রদান করলে তা তিনি উড়িয়ে দেন।২৪'শে মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধু শেষবারের মতো ইয়াহিয়া কর্তৃক তালবাহানার আলোচনায় যোগ দিতে যাওয়ার সময় ডাকসূ ভি পি আ স ম আবদুর রব বঙ্গবন্ধুর গাড়ীতে স্বাধীন বাংলার পতাকা লাগিয়ে দিলে সেই পতাকাবাহিত গাড়ী নিয়ে বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়ার সাথে শেষ সাক্ষাৎ করেন।
এলো ২৫'শে মার্চের ভয়াল রাত। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। একই সাথে "অপারেশন সার্চ লাইট"য়ের নামে বর্বর পাক হায়েনা বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল সহ ঢাকা শহর ও দেশের সর্বত্র একযোগে ইতিহাসের জঘন্যতম গনহত্যা শুরু করে।চতুর্দিকে অগ্নিসংযোগ,নারীদের উপর পাশবিক নির্যাতন,শিশু,কিশোর,তরুন,যুবা-বৃদ্ধ কেউ এদের বর্বরতা থেকে রেহাই পাইনি।শুরু হয়ে গেলো জনযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে মুক্তির জন্য যুদ্ধ।ঐ রাতে তথা ২৬'শে মার্চ ভোরের সূর্য্য উঠার আগেই বিবিসি ও আমেরিকা সহ বিশ্বের সকল গন ও প্রচার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষনার বিষয়টি প্রচারিত হতে থাকে।যা তখনকার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিকের লেখায় স্পষ্টাক্ষরে লিখিত হয়েছে।আমেরিকা সহ বিভিন্ন দেশের আর্কাইভে এসব এখন প্রতিনিয়ত মেলে।ইন্টারনেটের বদৌলতে তা এখন আরও সহজলভ্য।অবশ্য কালুর ঘাট 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র'থেকে জহুর আহমদ চৌধূরী কর্তৃক প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে আওয়ামী লীগের নেতা এম এ হান্নান,মেঝর জিয়াউর রহমান সহ অনেককে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠ করার কথা দেশবাসী অবগত।
এমতাবস্থায় এসব কিছু বিবেচনায় নিয়ে এভারেষ্ট শৃঙ্গকে সমুন্নত রাখার জন্য হিমালয় পর্বত গুলোকেও সূশোভিত করে তুলতেই হবে।শুধু তাই নয়-শহর বন্দর ও গ্রামান্চলের পাহাড়গুলোকেও সাজিয়ে তুলতে হবে।অন্য কোন বিকল্প নেই।আমাদের মনে রাখতে হবে-হিমালয়ের পর্বতরাজিকে বাদ দিয়ে এভারেষ্ট শৃঙ্গ আদৌ কল্পনা করা যায় কি?ইতিহাসের এসব কঠিন সত্যকে স্বীকার করে নিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ব্যবস্থা গ্রহনের,জাতীয় পতাকা,জাতীয় সঙ্গীত ও স্বাধীনতার মহান স্থপতির সর্ব্বোচ্চ মর্য্যাদার নিশ্চিতকরনে ও সার্বজনীনতার প্রেক্ষাপঠ বিবেচনা করে দীর্ঘ কয়েক যুগের ব্যবধানে দেরীতে হলেও ব্যবস্থা গ্রহনের এখনই সময়।দলীয় ও রাজনৈতিক কারনে কিছু সময়ের জন্য সত্যকে আড়াল করা গেলেও ইতিহাসের কঠিন সত্যের লালন ও বিকাশকে কখনো রূদ্ধ করা যায়না।তাছাড়াও আর যেনো কেউ আমাদের বহু কষ্ট ও রক্তার্জিত ইতিহাসকে ম্যানিপুলেশন বা বিকৃত করতে না পারে-তাই যতশীঘ্র সম্ভব  সমাধান সুনিশ্চিৎ করা দরকার।কেউ যেনো বলতে না পারে আমাদের মহান স্বাধীনতা আন্দোলন আর বিজয় কেবলমাত্র ১৯৭১'সালের ২৬'শে মার্চ থেকে ১৬'ই ডিসেম্বর পর্য্যন্ত।অবশ্য তারও আগে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও নামে অনেক ঐতিহাসিক গোপন ও প্রকাশ্য ঘটনা সমূহ আর ধারাবাহিক আন্দোলনের প্রক্রিয়ার দিনগুলো সমুদ্র মন্থন করে আগামী জমানার সন্তানেরা বের করে আনবেই।আমাদের স্মরন রাখা দরকার যে-আমাদের ভূলের জন্য,আমাদের মধ্যেকার দন্ধের জন্য,দলীয় রাজনৈতিক কারনে আগামী জমানার সন্তানেরা বা ইতিহাসের ছাত্ররা যেনো আমাদের দায়ী করতে না পারে।ইতিহাসের শিক্ষা এই যে,আমরা জেনেও ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহন করিনা।
১৬'ই মার্চ,২০১৭ সাল।
লাস ভেগাস,নেভাদা,যুক্তরাষ্ট্র।
কমিটি ফর ডেমোক্রেসী ইন বাংলাদেশ,যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাদক।
সাবেক সদস্য সচিব:মুক্তিযুদ্ধ চেতনা পরিষদ।যুক্তরাষ্ট্র।
সাবেক প্রতিষ্ঠাতা আহ্ববায়ক:কর্ণেল তাহের স্মৃতি সংসদ,যুক্তরাষ্ট্র।


বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন এবং জাতীয় শিশু দিবস - কামাল উদ্দিন আহাম্মেদ

রবিবার, ১৯ মার্চ ২০১৭

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশে জন্মেছেন, এ দেশের মানুষকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এটা আমাদের সৌভাগ্যের কথা। তিনি এ দেশে জন্মেছিলেন বলেই আমরা পেয়েছি বাংলাদেশ নামের মানচিত্রটা, পেয়েছি সবুজের মাঝে লাল বৃত্ত আঁকা বাংলাদেশের পতাকাটিও। আর একটি শিশু পেয়েছে স্বাধীনভাবে জন্মলাভ করে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার জন্য স্বাধীন বাংলাদেশ। আজ ১৭ মার্চ, সেই মহান নেতার জন্মদিন এবং জাতীয় শিশু দিবস। আমরা পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এই মহান নেতাকে। জন্মদিনে জানাই তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা।

আমি নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করি যে, আমি নিজের চোখে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ নামক মানচিত্রটা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। খুব কম লোকেরই ভাগ্য হয় ইতিহাস সৃষ্টি হতে দেখা। আমি ইতিহাস সৃষ্টি হতে দেখেছি। আমি বিজয় দেখেছি। স্বাধিকার আন্দোলনকে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপান্তরিত হতে দেখেছি। এসব ঐতিহাসিক ঘটনার মূল নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক অসম্ভবকে সম্ভব করতে দেখেছি। আমি দেখেছি- এদেশের মানুষকে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের হাত থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু নিরলস পরিশ্রম করে, চারণের মতো সারাদেশ ঘুরে মুক্তির মহামন্ত্রে জাতিকে জাগিয়েছেন। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি সবসময় ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ, কখনো কোনো কিছুর বিনিময় কিংবা প্রলোভনে বিন্দুমাত্র নতিস্বীকার করেননি।
একজন বিশ্ববরেণ্য নেতার ব্যক্তিচরিত্রে যেসব মানবিক গুণাবলি থাকার কথা তার সব কিছু নিয়েই যেন জন্মগ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ জন্যই আরব্য সাহিত্যের কবি আবদুল হাফিজ লিখেছেন, ‘আমি তার মধ্যে তিনটি মহৎ গুণ পেয়েছি-সেগুলো হলো দয়া, ক্ষমা ও দানশীলতা।’ ছোট থেকেই তিনি ছিলেন ভারি দয়ালু।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফুর রহমান এবং সায়রা বেগমের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। বড় দুই বোনের পর তিনি ছিলেন বাবা-মার প্রথম ছেলে। পরে অবশ্য তাঁর আরো দুই বোন আর এক ভাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বড় বোন ফাতেমা বেগম, মেজ বোন আছিয়া বেগম, সেজ বোন হেলেন ও ছোট বোন লাইলী, ছোট ভাইয়ের নাম শেখ আবু নাসের। শেখ মুজিবুর রহমানের ডাক নাম ছিল খোকা, তার নামটি রাখেন নানা আবদুল মজিদ। ভাইবোন আর গ্রামে তিনি মিয়াভাই নামেই পরিচিত ছিলেন। ১৯৩৮ সালে আঠারো বছর বয়সে তার সঙ্গে ফজিলাতুন্নেছার বিয়ে হয়। এই দম্পতির ঘরে দুই কন্যা এবং তিন পুত্রের জন্ম হয়। কন্যারা হলেন শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা। আর পুত্রদের নাম শেখ কামাল, শেখ জামাল এবং শেখ রাসেল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে আততায়ীর হাতে সপরিবারে তিনি নিহত হন।

১৯২৭ সালে সাত বছর বয়সে বঙ্গবন্ধু পার্শ্ববর্তী গিমাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। স্কুলটি ছিল প্রায় সোয়া এক কিলোমিটার দূরে। বর্ষাকালে একদিন নৌকা উল্টে গেলে ঐ স্কুল থেকে ছাড়িয়ে তাঁকে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয় গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে। এর দুবছর পর আবার ভর্তি হলেন মাদারীপুর ইসলামিয়া হাইস্কুলে। ১৯৩৪ সালে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হলে তাঁর একটি চোখ কলকাতায় অপারেশন করা হয় এবং চক্ষু রোগের কারণে তাঁর লেখাপড়ায় সাময়িক বিরতি ঘটে। দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ১৯৩৭ সালে ভর্তি হলেন গোপালগঞ্জ মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন স্কুলে। মিশন স্কুলে পড়ার সময় স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সে সময়ে স্কুলের মেরামত কাজ ও ছাদ সংস্কার এবং খেলার মাঠ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জরুরিভাবে অর্থ বরাদ্দ দেয়ার দাবি করেন শেখ মুজিবুর রহমান।
গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালে তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদান করায় তিনি জীবনে প্রথম গ্রেফতার হন। ১৯৪২ সালে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে কলকাতায় গিয়ে বিখ্যাত ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৬ সালে তিনি বিএ পাস করেন। শেখ মুজিবুর রহমান এই সময়ে ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ তৎকালীন প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে রাজনীতির সূচনা করেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং ৪ জানুয়ারি মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনিই ছিলেন এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে ধর্মঘট ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানান। কর্মচারীদের এ আন্দোলনে উস্কানি দেয়ার অভিযোগে ২৯ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অযৌক্তিকভাবে তাকে জরিমানা করে। তিনি এ অন্যায় নির্দেশ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয় এবং জেলে থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু এ দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ তিনি গোপালগঞ্জের আসনে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা ওয়াহিদুজ্জামানকে ১৩ হাজার ভোটে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৫ মে বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক সরকারের কৃষি ও বনমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। ৩০ মে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল করে দেয়। ১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ প্রত্যাহার করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু পুনরায দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রিসভায় শিল্প ও বাণিজ্য ন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৬৩ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৬ সালে ১ মার্চ সভাপতি নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানের সুদীর্ঘ ২৩ বছরে ১৪ বার গ্রেফতার, রাজনৈতিক কারণে প্রায় ১৩ বছর কারাবরণ ও দুবার ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে এসেছেন। ৪৭-এর দেশ ভাগ, ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ প্রধান হিসেবে ’৬৬-এর ঐতিহাসিক ৬ দফা, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারারুদ্ধ হন বঙ্গবন্ধু। ’৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের ছাত্র-জনতা তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টি আসনের মধ্যে ৩০৫টি আসন লাভ করে। নির্বাচনের পর থেকেই আমরা বিপুল আশা-উদ্দীপনার মধ্যে ছিলাম। বাংলাদেশ যে সৃষ্টি হতে যাচ্ছে তা নিয়ে আমাদের মনে আর কোনো সন্দেহ ছিল না। তখন একমাত্র প্রশ্ন ছিল আমরা কি শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনার মাধ্যমে এই স্বাধীন দেশ সৃষ্টি করতে পারব নাকি আমাদের একটা বিরাট রক্তাক্ত সংঘাতের পথে যেতে হবে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মুজিবের স্বায়ত্তশাসনের নীতির পুরোপুরি বিপক্ষে ছিল। আওয়ামী লীগের সরকার গঠন ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সংসদের অধিবেশন ডাকা নিয়ে টালবাহানা শুরু করেন। শেখ মুজিব তখনই বুঝে যান যে, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের দুঃশাসনের অবসান ঘটাতে লড়াইয়ের কোনো বিকল্প নেই।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ মুজিব রেসকোর্স ময়দানে দশ লাখ লোকের বিশাল জমায়েতে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন যা বাঙালি জাতির ইতিহাসে যুগ সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। মুজিব তাঁর ভাষণে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে ব্যর্থ সামরিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ আনেন। বক্তৃতার শেষে মুজিব ঘোষণা করেন: ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ভাষণে সাড়া দিয়ে সেদিন গোটা বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর শকুনের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা; শুরু করে অপারেশন সার্চলাইট নামে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড। বৃদ্ধ থেকে কোলের শিশু- কেউ রক্ষা পায় না পাক হায়েনাদের নারকীয়তা থেকে। মুজিবকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বীর বাঙালি ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে নেয়। জন্ম হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। ৭২-এর ১০ জানুয়ারি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের চাপে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। দেশে ফিরেই তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করেন। শূন্য থেকে শুরু করে তাঁর সরকারকে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের অগণিত সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ সকল ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এবং জাতিগঠন কার্যক্রম শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃনির্মাণ, মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের জনরোষ থেকে রক্ষা করা এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো লাখ লাখ ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করা এবং আরো অনেক সমস্যার সমাধান তাঁর সরকারের সামনে সুবিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সমস্ত দেশ যখন ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই আসে আরেকটি আঘাত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা হত্যা করে শেখ মুজিব এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের। কেবল তাঁর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেই সময় দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান।

বঙ্গবন্ধু শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেন। বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটাতে পছন্দ করতেন। শিশুদের সবকিছুকে সহজে বুঝতে পারতেন। আর এজন্যই তাঁরই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯৯৭ সালের ১৭ মার্চ দিবসটি পালন শুরু হয়। কিন্তু ২০০১ সালে তৎকালীন সরকার জাতীয় শিশু দিবস পালনের রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ করে দেয়। ২০০৯ সালে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় আসলে রাষ্ট্রীয়ভাবে আবার পালিত হচ্ছে জাতীয় শিশু দিবস। কিন্তু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কি এতই ফেলনা যে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ছুড়ে ফেলতে হবে? সরকারিভাবে তাঁর জন্মদিন পালন বন্ধ হয়ে যাবে? তিনি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি এবং জাতির পিতা। অথচ ভিন্ন আদর্শের অন্য সরকার ক্ষমতায় এলে তাঁর জন্মদিন রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন হবে না, তা কি ভাবা যায়? বঙ্গবন্ধুকে অসম্মান মানে বাঙালির জাতির সত্তাকে অস্বীকার করা।
লেখক: ভাইস-চ্যান্সেলর
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
এই ইমেইল ঠিকানা স্পামবট থেকে রক্ষা করা হচ্ছে।এটি দেখতে হলে আপনাকে JavaScript সক্রিয় করতে হবে।


জন্ম‌দি‌নে ফুটুক / খালেদ সরফুদ্দীন

শনিবার, ১৮ মার্চ ২০১৭

ওরা ছিল ছদ্ধব‌ে‌শি
ওরা আজো আছে ,
হাইব্রী‌ডের আভর‌ণে
তারা এখন না‌চে !

জনক তু‌মি শুন‌তে কি পাও
মূলধারা‌তে কান্না !
হাইব্রীডরা সবই কর‌ে
তৃণমু‌লে যান না ।

একা‌ডে‌মিক চ‌‌িন্তাগু‌লো
‌জন্ম‌দি‌নে ফুটুক ,
জয়বাংলার জয়ধ্ব‌নি
‌ভে‌সেভেস‌ে উটুক ।

'''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''
১৬ মার্চ ২০১৭
ম্যানহাটন , নিউইয়র্ক ।


বঙ্গবন্ধুর জন্ম দিনের কবিতা

শনিবার, ১৮ মার্চ ২০১৭

আমি আগাগোড়া বাঙালি

বঙ্গে আমার জন্ম,
বাংলায় আমার মৃত’্য
অমি শেখ মুজিব
বাংলার স্বাধীনতা আনিয়াছি।

অষ্ট্রিক-দ্রাবিড়-আর্য-মঙ্গল-সেমীয়-মুসলিম
রক্ত ধারার সংমিশ্রণে বিচিত্র এই বাঙালি জাতি
আমার পূর্ব পুরুষ দরবেশ শেখ আউয়াল সেমীয়-মুসলিম
হজরত বায়জিদ বোস্তামির (রাঃ) অনুগামী হয়ে
১৪৬৩ সালে বাংলায় রুকনুদ্দিন বারবাক শাহ্’র রাজত্বকালে
বঙ্গদেশে আগমন করেন।

ইসলাম প্রচারের অগ্রদূত দরবেশ শেখ আউয়াল
বাংলায় খুজে পান তাঁর আপন স্থায়ী নিবাস
ফরিদপুর-গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায়
মধুমতি নদীর শাখা প্রশাখায় পরিবেষ্টিত
বাইগার নদী বিধৌত অঞ্চল টুঙ্গিপাড়া গ্রাম
যেন এক ফুটন্ত পদ্মফুল।

দরবেশ শেখ আউয়ালের অষ্টম অধস্তন পুরুষ
আমি শেখ মুজিবুর রহমান; জন্ম ১৭ মার্চ ১৯২০ সাল
পিতা শেখ লুৎফর রহমান; মাতা সায়রা বেগম
বংশ পরস্পরায় বাংলার আকাশ, বাংলার বাতাস, বাংলার মাটি
আমায় করেছে খাটি বাঙালি
বাংলার সূখ, বাংলার দূখ, বাংলার কান্না, বাংলার হাসি
আমায় করেছে আলোড়িত।

টুঙ্গিপাড়া গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে
আমার বাল্যশিক্ষার হাতেখড়ি
অতপর গোপালগঞ্জ সীতানাথ একাডেমি
অতপর মাদারিপুর ইসলামিয়া হাইস্কুল
অতপর ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হই গোপালগঞ্জ মিশন হাই স্কুলে
এখান থেকেই আমার রাজনৈতিক জীবনের শুরু

আমার শিক্ষাগুরু হামিদ মাষ্টার; ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়
জেল খেটেছেন বহু বছর
তাঁর জীবন-দর্শন আমার কিশোর মনে জাগায় শিহরণ
প্রতিবাদী হতে যোগায় শক্তি-সাহস।

মিশন হাইস্কুলে অলিখিত এক অবমাননাকর নিয়ম
মুসলিম ছাত্র-অতএব বসতে হবে পিছনে
আমি প্রতিবাদী হই,
ভেঙ্গে ফেলি এই অচ্ছ্যুৎ নিয়ম
বসতে শুরু করি;প্রথম বেঞ্চির প্রথম কোনেতে;
স্কুল-জীবনের শুরুতেই
আমার দেখাদেখি
অন্য মুসলিম ছাত্ররাও ক্রমান্বয়ে হয়ে ওঠে সাহসী
বসতে শুরু করে সমতার ভিত্তিতে।

ইংরেজ মহকুমা হাকিম, পথ চলেন দম্ভভরে, গাড়িতে চড়ে
তাঁর গাড়ি দেখামাত্র রাস্তায় চলমান মানুষ
পড়িমরি করে রাস্তা ছেড়ে নেমে পড়বেন পার্শ্ববর্তী খাদে
এটাও এক অলিখিত নিয়ম
ভেঙ্গে ফেলি আমি সেই নিয়মের অনিয়ম
ওাস্তার পাশে দাড়িয়ে থাকি মাথা উঁচু করে
হাকিম চলেন তাঁর পথে, আমি চলি আমার পথে
কেন তাকে রাস্তা ছেড়ে দিতে হবে? পড়িমরি করে খাদে নেমে!
এ যে মানবতার অপমান।

আমি তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক আমাদের স্কুল পরিদর্শনে আসবেন
তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে কি হবে না, উচিৎ কি অনুচিৎ
এই নিয়ে দলাদলি কংগ্রেস সমর্থক ও অসমর্থকদের মাঝে
যোগ্য নেতাকে যথাযোগ্য সম্মান দেয়া হবে- এটাই তো নিয়ম
এই নিয়ে দলাদলি, হিংসা-বিদ্বেষ, জাত-বেজাত
সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্ন উঠবে কেন?
আমি প্রতিবাদী হয়ে উঠি
শেরে বাংলাকে যথাযথ সম্মান দেখাতেই হবে
আমার দৃঢতায়, প্রচেষ্টায় ঘটা করে আয়োজিত হল সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।

এই ঘটনার সাথেই আমি পড়ে যাই রাজনীতির ঘুর্ণিপাকে
ক্রোধান্বিত প্রতিপক্ষ ষড়যন্ত্রের জাল পেতে
এই কিশোর বয়সে সাত দিনের কারাবাসের
কালিমা লাগায় আমার ললাটে।

এর বছরখানেক পরের কথা
শেরে বাংলা তখন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী
আমাদের মিশন স্কুল পরিদর্শণে এসেছেন
তাঁর সহকর্মী মন্ত্রী হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দিকে সাথে নিয়ে
টান টান উত্তেজনা, নেতৃদ্বয়কে অভ্যর্থনা জানাতে হবে মহা সমারোহে
হেড স্যার, পরিচালনা কমিটির সদস্যরা
অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন পুষ্পমাল্য নিয়ে।

অতিথিদ্বয় ধীর লয়ে এগিয়ে আসছেন;
তোরণ পার হয়েছেন সবেমাত্র
অমনি আমি লম্ফ দিয়ে, সবাইকে পিছনে ফেলে, সামনে এগিয়ে গেলাম
পথ আটকে দাঁড়ালাম এবং বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলাম
আপনারা স্কুলে যেতে পারবেন না
আমি শরীর স্বাস্থ্যে লিকলিকে
কিন্তু আমার কণ্ঠখানি মা’শাআল্লা বেশ স্বাস্থ্যবান।

গেল গেল সব গেল
হেড স্যার পড়িমরি করে দৌড়ে আসেন
আমাকে মহামান্য অতিথিদের সামনে থেকে হটাবেন
এটাই যেন এখন তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য
মুজিব, কর কী? কর কী?
আমাকে টেনে হিঁচড়ে সরাতে উদ্যত, হেড স্যার ও অন্যান্য স্যারেরা।

অতিথিদ্বয় স্বহৃদয় সমঝদার বিজ্ঞজন; হস্ত উত্তোলন করিলেন
থেমে গেল স্যারদের শক্তি প্রদর্শন
ওকে কথা বলার সুযোগ দেয়া হোক;
মন্ত্রীদ্বয়ের মন্ত্রীকিয় আদেশ
আমি আরো প্রত্যয়ী হই, দৃপ্ত পদে এগিয়ে যাই
মুখোমুখি হই প্রধানমন্ত্রী মহোদয়ের
বলো, কি বলার আছে তোমার?
মন্ত্রীদ্বয় আমার বক্তব্য জানিতে চান।

স্যার, আমাদের স্কুল বোর্ডিংটির হাল অতিশয় করুণ
মেরামত একান্ত জরুরি, বৃষ্টির পানিতে যখন তখন হয় সয়লাব
তথাস্তু, তোমার দাবি পুরণ করা হবে
সোহরাওয়ার্দি সাহেব আশ্বাস দিলেন।

সভাশেষে সোহরাওয়ার্দি সাহেব একান্তে আমায় কাছে ডাকিলেন;
সস্নেহে পিঠে হাত রাখিলেন, নাম কী তোমার: বালক?
শেখ মুজিবুর রহমান: বাবা মা ডাকেন খোকা।
ডাক বাংলায় আমার সাথে দেখা করো
শহিদ সাহেব আদরমাখা ফরমায়েশ দিলেন

নির্ধারিত সময়ে হাজির হলাম
বিখ্যাত সোহরাওয়ার্দি পরিবারের সন্তান হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দি
একান্তে দীর্ঘক্ষণ কথা বললেন
ইংরেজ-ভারত-হিন্দু-মুসলিম নানান জটিল বিষয়
সহজ সরল ভাষায় বিস্তারিত বর্ণনা করিলেন।

আমি প্রভাবিত হলাম; প্রানিত হলাম,
মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম
আমি দেশের জন্য, দশের জন্য নিজকে করবো উৎসর্গ
প্রত্যক্ষ রাজনীতির পাঠ আমার শুরু হলো
হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দির হাত ধরে ।

১৯৪০ সালে আমি নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সদস্য হই
একই বছর আমি গোপালগঞ্জ মহকুমা মুসলিম লীগের
ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি নির্বাচিত হই
আমার আনুষ্ঠানিক রাজনীতির সূচনা হলো
এবার রাজনৈতিক জ্ঞান আহরণের পালা
ধীরে ধীরে জ্ঞাত হই বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস
বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিবৃত্ত।

১২০৩ সালে তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি
১৮ জন ঘোড় সওয়ার সৈন্য নিয়ে বঙ্গ বিজয়ে সফলকাম হন
এখান থেকেই শুরু হয় আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস
বকতিয়ারের সুশাসন ও ইসলামিক জীবনধারা
বাংলার সাধারণ জনগণের মাঝে জাগায় এক অপূর্ব শিহরণ
জাতপাতের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত বাংলার মানুষ
খুঁজে পায় মুক্তির অনাস্বাদিত স্বাদ।

ইসলামি শাসনের সুবাদে বাংলা হয়ে ওঠে মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠের দেশ
মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠের কারণেই
আমার হাত ধরে সৃষ্টি হলো আজকের বাংলাদেশ
তা না হলে আমরাও হতাম পশ্চিম বাংলার মতো
বৃহত্তর ভারতেরই একটি প্রদেশ।


ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া শীতল চন্দন বৃক্ষে আগুন- শরীফা খন্দকার

বৃহস্পতিবার, ১৬ মার্চ ২০১৭

‘আমি যেন সোনার খাঁচায় ॥ একখানি পোষমানা প্রাণ... ‘এতদিন মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকে দেখে অতলান্তিক দেশের ফেমিনিস্টদের নাকি এমনটি মনে হয়েছে! সত্যি কথা বলতে কি, এ বিষয়ে মিছামিছি ওদের দোষ দেয়া যাবে না। সাবেক যুগোসøাভিয়ার সেøাভেনিয়ায় জন্মগ্রহণকারী প্রাক্তন মডেল কন্যাটির পদযাত্রায় মানুষ বরাবর দেখেছে একটা সারল্য, যা চোস্ত মার্কিন যুবতীর সঙ্গে মেলে না। যে কোন সাধারণ মার্কিন মেয়ের কাছেও সিম্পল বা সরল শব্দটা কোন প্রশংসাসূচক নয়, একেবারেই অপমানসূচক। আমেরিকার এই বর্তমান প্রেসিডেন্ট পরবর্তী  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশী বংশোদ্ভূত দ্বিতীয় ফার্স্ট লেডি। মার্কিন দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট জন এ্যাডামসের পত্নী  লুইসা বিদেশে জন্মগ্রহণকারী প্রথম ফার্স্ট লেডি। লুইসা এ্যাডামসের পিতা এক সময় লন্ডনে বসবাস করতেন একজন মার্কিন ব্যবসায়ী হিসেবে। পরবর্তীতে তিনি যখন লন্ডনের মার্কিন কন্স্যুলেটে কনসাল পদে চাকরিরত তখন সেখানেই লুইসার জন্ম। তবে নেটিভ বর্ন না হলেও লুইসা ছিলেন ইংলিশ স্পিকিং। কিন্তু একজন ফরেন বর্ন হিসেবে শ্লথ-নরম উচ্চারণে বর্তমান প্রেসিডেন্ট পত্নী কথা বলেন। যদিও মেলানিয়া সম্পর্কে কারও কারও মন্তব্য ‘সি ক্যান বেয়ারলি স্পিক ইংলিশ।’ তবে জানা যায় তিনি ইংরেজী ছাড়াও ফরাসী, ইতালিয়ান, জার্মান, সার্বো-ক্রোয়েশিয়ান এবং তার নেটিভ স্লোভেনিয়ান এই পাঁচটি ভাষায় কথা বলতে পারেন। মেলানিয়া জন্মগ্রহণ করেছিলেন সাউথইস্ট নভো মেস্টো নগরে। পিতা ছিলেন রাষ্ট্রীয় সংস্থার মোটরগাড়ি ও মোটরসাইকেল ডিলার আর মা ছিলেন বাচ্চাদের কাপড় তৈরির কারখানার প্যাটার্ন মেকার। সংসারে সচ্ছলতার মধ্যে ব্যবসায়ী পিতার ছিল এক পুরনো ক্যাডিলাক গাড়ি এবং সেটি নিয়ে তারা সপরিবারে ভ্যাকেশন কাটাতে যেতেন প্যারিস ও ইউরোপের অন্যান্য দেশে। পাঁচ বছর বয়স থেকে মেলানিয়ার মডেলিং জীবনের শুরু। নিউইয়র্কে থিতু হওয়ার আগে তিনি নিজ দেশের লিউবিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর লেখাপড়া করে মিলান ও প্যারিসে মডেলিং শুরু করেন। তবে মিডিয়ার নাকউঁচু মহল বলেন, তিনি এসেছেন কমিউনিস্ট দেশ থেকে। দু’দুবার বিয়েবিচ্ছেদ ঘটা ভবিষ্যত স্বামী দ্বিগুণ বয়সী বিলিয়নিয়ার ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মডেল মেলানিয়ার চার চক্ষুর মিলন হয়েছিল ১৯৯৮ সালে, যখন সেøাভেনিয়ান তরুণীটি এই নিউইয়র্ক শহরে সদ্য বসবাস শুরু করেছে। সিটির ফ্যাশন সপ্তাহ উপলক্ষ করে সেদিন ছিল একটি পার্টি। বিলিয়নিয়ার তখন দ্বিতীয় স্ত্রী মারলা মেপলের সঙ্গে বিয়েবিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় ১৯৯৭ সাল থেকে আলাদা থাকেন। সে মামলাটির চূড়ান্ত হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। যাই হোক, প্রথম দেখার পর পরই একাকী জীবন কাটানো ডোনাল্ড মেলানিয়ার কাছে ফোন নম্বর চেয়ে পাঠান । প্রাথমিকভাবে তরুণীটি সেটি দিতে অস্বীকার করলেন বটে, কিন্তু তিনি নিজেই স্বনামখ্যাত ব্যক্তির ফোন নম্বর চেয়ে নিলেন। এরপর কয় মাসের মধ্যেই বদলে যায় চিত্রপট। মেলানিয়াকে নিয়ে রিয়্যালিটি টিভি স্টার ডোনাল্ডের ব্যবসাভিত্তিক রিয়্যালিটি শো ‘এ্যাপ্রেন্টিস’ অতিরিক্ত প্রচার লাভ করে। এরপর ২০০৪ সাল থেকে দু’জনের দীর্ঘ পূর্বরাগ বিষয়টি পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে আসে। ইতোমধ্যে তাদের যে কোর্টশিপ হয়েছিল সে সম্পর্কে তদানীন্তন একটি ইন্টারভিউ দিতে ট্রাম্প সাহেব বললেন ‘আক্ষরিক অর্থেই আমাদের দুজনের মধ্যে কোন তর্কবিতর্ক নেই। আর ঝগড়াবিবাদ তো অসম্ভব ব্যাপার । সেটা আমার অতীতের একটা ভুলে যাওয়া শব্দ !’ ডোনাল্ড এবং মেলানিয়া এনগেজড হন ২০০৪ সালে ও ফ্লোরিডার পাম বিচে তাদের বিয়ে হয় এবং রিসেপশন


আমাদের জাতির পিতা --- সৈয়দ হাসমত আলী

বুধবার, ১৫ মার্চ ২০১৭

শেখ মুজিব ক্ষন জন্মা
জন্মেছে এই দেশে।
জাতির জন্য দুঃখ কষ্ট
মেনে নিয়েছে হেঁসে।
জেল জুলুমের ভয় ছিল না
ন্যায়ের পথে চলে।
সোজা সাপটা দিতেন তিনি
সত্য কথা বলে।
মৃত্যু করে তুচ্ছ জ্ঞান
ভেবে বাঙ্গালীর কথা।
মরেও তিনি অমর হয়েছেন
আমাদের জাতির পিতা
নিউইয়র্ক প্রবাসী
ফোন ঃ ৯২৯-৩৯৫-৩৭৬৯

 তোমারে দিলেনা ভুলিতে
--- সৈয়দ হাসমত আলী  

   
তোমার গুন-কীর্তন থাকবে রহমান।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান
যত দিন লাল-সবুজ পতাকা উড়বে
বাঙ্গালী বাংলায় কথা বলবে।
তুমি থাকবে কৃষকের নবান্ন উৎসবে
ক্লান্ত শ্রমিক যতবার শ্রান্তে ঘুমাবে।
তুমি অমর হবে মেঠোসূরা গানে
প্রসাব ক্লান্ত মায়ের শিশু দর্শনে।
বারংবার বরন পাবে বাংলার ঘরে ঘরে
হাতে তালি দিয়ে জয় জয়াকারে।
তুমি মঙ্গল প্রদিপের অগ্নি শিখা
তোমার আলোয় বিশ্ববাসীর বাঙ্গালী দেখা।
ওরাও তোমাকে স্বরণে রাখবে।
যতদিন বাংলা-বাঙ্গালী দেখবে।
তাই তো তুমি অমর অক্ষয় চিরজীবি
নজরুল গানে তানে তোমাকে ভাবি।
নশ্বর দেহ রেখে চলে গেলে স্বর্গভূমিতে
তবু তোমারে দিলেনা ভুলিতে ।

স্বাধীনতা
  ---সৈয়দ হাসমত আলী

 
স্বাধীনতা এক মহান অনুভূতি
যা অর্জনে অগনিত আত্মহুতি।
শুধু তাই নয়, আধাপুড়া পুড়া অনেক মন
জীবন জীবিকায় উলট-পালটে হারানো স্বজন।
এ অর্জন এখন বিদ্ধস্থ এক নারীর মতন
অজ্ঞতায় অচেনা অজানা মানিক রতন।
স্বাধীনতা রম-রমায় ভরপুর উশৃঙ্খলতায়
স্বেচ্ছাচারিতা ও অবাধে চলছে বলা যায়।
অথচ আমরা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বিবেকি মানুষ
এখনও নেশায় ি  ¬¬¬বভোর, নাই জ্ঞান হুশ।
স্বাধীনতা এবং পরাধীনতা বিছরায় দেখিনা
বুঝি না বা বুঝার চেষ্টাও করিনা।
স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়
স্বাধীনতা মানে উশৃঙ্খলতায় নয়।
নিজ বিবেকের অধীনে নিজেকে পরিচালনা
এর নাম স্বাধীনতা, এ কথাটি ভুলে যেওনা।

রেলওয়ে
  --- সৈয়দ হাসমত আলী


অনিচ্ছায় রেলগাড়ী চাকা গড়ায়
আস্তে থেকে জোরে খুব জোরে।
এক সময় উল্কার মত ছুটে চলে
সব বাধা ভেদে দূরে বহুদূরে।
ভুলে যায় রেখে আসা এষ্টেশন
হাক-ডাক জনতার ভীড়।
আচমকা গতি রোধে দাড়ায়
বারং ছাড়তে হয় ক্ষনিকের নীড়।
পরিশ্রান্ত ক্লান্তির সব উপশম
জীবনের কুটিল অলসতা ছেদ।
একই সূর তালে হয় নিয়ন্ত্রন
রাখে না কোন ভেদা-ভেদ।¬¬¬
অথচ বোকা রেলগাড়ী চিল্লায়
উশৃঙ্খল স্বাধীনতার জন্য।
বোঝে না ণিয়ন্ত্রকের নিয়ন্ত্রন
আছে বলেই তারা হয় ধন্য।। 


"ভোটের আগে গ্যাস চাই-নইলে এবার ভোট নাই"

বুধবার, ১৫ মার্চ ২০১৭

আহমেদ ইকবাল চৌধুরী:-প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভুমি আমাদের সিলেট, আর এ সিলেটকে নিয়ে সিলেট বাসীর স্বপ্নের অন্ত নেই । আমি ও তার ব্যতিক্রম নই। আল্লাহ তায়লার অশেষ মহিমায় মহিমান্বিত এই সিলেটে কি নেই। তেল, গ্যাস, চা, বৈদেশিক মুদ্রা, পর্যটন শিল্প, নান্দনিক শপিংমল, বড় বড় অট্রালিকা ইত্যাদি সবই আছে এই সিলেটে। নেই শুধু সুষ্ট পরিকল্পনা এবং নিজেদের আধিকার আদায়ে গনসচেতনতা। সিলেটিরা বিভাগ পেয়েছিল অনেক আন্দোলন করে। নব্বই এর দশেকে সিলেট বিভাগ আন্দোলনে সিলেট গণদাবি পরিষদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে সিলেটবাসী তাদের নায্য দাবী আদায় করে নিয়েছিল। তার পরে বাংলাদেশে আরও অনেক বিভাগ হয়েছে, কিন্তু তাদের এত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি। সিলেটিরা দিতে সবার আগে - কিছু পেতে সবার পিছে।

সিলেটিরা নানা সমস্যায় জর্জরিত। গ্যাস, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ব্যবস্তা সর্ব ক্ষেত্রে সিলেটিরা পিছিয়ে। সিলেটের গ্যাস নিয়ে বাংলাদেশের অন্যান্য অন্চলে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে অথচ সিলেটবাসী সেই আদিম পদ্বতিতে রান্নার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ২৫ বৎসর আগে কৈলাশটিলা গ্যাসক্ষেত্র থেকে যখন বড় বড় পাইপ দিয়ে সিলেটের গ্যাস অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তখন সিলেটিদের বলা হয়েছিল যে পর্যায়ক্রমে সিলেটের সর্বত্র গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে। এক এলাকার সম্পদ অন্য এলাকার উন্নয়নে ব্যবহৃত হবে এতে কারও আপত্তি নাই, কিন্তুু যে মানুষটি তার একমাত্র অবলম্বন একখন্ড জমি তা দিয়ে দিল দেশের জন্য, যার বাড়ীর মধ্যখান দিয়ে বড় গর্ত করে, ফসল নষ্ট করে গ্যাস নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অথচ তাকে একবেলা রান্না করার জন্য টোকাই এর মত লাকড়ী কুড়াতে হচ্ছে-  তার জন্য কি একটু করুনা হয়না ? গ্যাস সংযোগ পাওয়া এখন আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কি। বাংলাদেশ সরকার বাসা বাড়ীতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। কোন দেশে যখন জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত থাকে , জনগণের ভোটে যখন সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, সেই সরকার কেবলই যে কোন সিদ্বান্ত নেবার আগে দেশের জনগণের অধিকার ও সুযোগ সুবিধাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ সরকারের এ সিদ্ধান্তে কত % লোক উপকৃত হবে তার সঠিক পরিসংখ্যান আমার জানা নেই, তবে এতটুকু বলতে পারি যে, গুটি কয়েক শিল্পদ্যোক্তার জন্য বৃহৎ জনগোষ্টীকে সুবিধা বন্চিত করা কতটা যুক্তিযুক্ত তা বিচারের ভার জনগণের উপর ছেড়ে দিলাম। বিদ্যু প্রতিমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন যে যাদের গ্যাস সংযোগ রয়েছে তাদের গ্যাস সংযোগ ও বন্ধ করে দেওয়া হবে। বাংগালীরা ইংরেজ ও পাকিস্তানীদের পরাজিত করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়ে আসলে ও নিজ দেশীয় নব্য রাজাদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করতে পারেনি। কল-কারখানায় নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ প্রত্যেক বাংলাদেশীর প্রাণের আকুতি কারন বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্প বর্তমানে আমাদের অর্থনীতির মুল চালিকাশক্তি। কিন্ত সাধারন জনগনকে বন্চিত করে একটি গোষ্টীর স্বার্থ রক্ষা কোন জনকল্যাণকর সরকারের কাজ নয় এবং সেই সরকারকে জনগনের সরকার বলা যায় না।

সরকার চাইলে শিল্পের জন্য আলাদা গ্যাস আমদানী করে প্রয়োজনে ভুর্তুকী দিয়ে রুগ্ন শিল্প কারখানা বাচিয়ে রাখতে পারে। আর আমাদের দেশে অনেক শিল্পপতি রয়েছেন যারা নিজ উদ্দোগে গ্যাস আমদানী বা গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনার ক্ষমতা রাখেন। সরকার শুধু আমলাতানত্রিক জঠিলতা দুর করে ব্যবসায়ীদেরকে আস্থার ও ব্যবসা বান্দব পরিবেশ সৃষ্টি করলে শিল্পের জন্য গ্যাস আমদানীতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার  অভাব হবে না। কারন পুরো বিনিয়োগটাই ব্যাবসায়ীরা তাদের client দের থেকে পুষিয়ে নিতে পারেন, কিন্ত একজন সাধারন মানুষ কে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে যে জটিলতা, হয়রানি, মজুতদারী ও লাগামহীন মুল্য  বৃদ্ধি করে সংকট সৃষ্টি সহ নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়, তার প্রতিকার পাওয়ার বা ক্ষতি পুষিয়ে নেবার কোন জায়গা নেই। পুঁজিবাদী ব্যবস্তা আমাদের সমাজে রন্দ্রে  রন্দ্রে প্রবেশ করেছে। আসলে সব কিছুর মুলে রয়েছে উচ্ছবিত্তের স্বার্থ সংরক্ষন।

গ্যাস আমাদের জাতীয় সম্পদ, আর এ সম্পদ রক্ষনাবেক্ষনের জন্য সরকারের যেমন দায়িত্ব রয়েছে তেমনি সাধারন জনগনের ও অনেক দয়িত্ব রয়েছে। গ্যাস ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে হবে। গ্যাসের মুল্য মিটার দিয়ে নির্ধারণ করা হয় না বিধায় ২৪ ঘন্টা চুলায় আগুন জ্বালানো থাকবে, একটি প্রবাদ আছে "সরকারী মাল, দরিয়া ম্যায় ঢাল" এ ধরনের মনোবৃত্তি আমাদের সমাজে কাজ করে, তা পরিহার করে সরকার ও জনগনকে একসাথে কাজ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে:-
যে জন দিবসে মনের হরষে
জ্বালায় মোমের বাতি
আশুগৃহে তার, দেখিবেনা আর
  নিশীতে প্রদীপ বাতি।

সরকার প্রয়োজনে বিদুৎ এর মত মিটার লাগিয়ে গ্যাসের সদ্ব্বব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। কিন্ত কোন অবস্থাতেই গ্যাসের সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়।

বিলেতে বিশিষ্ট সাংবাদিক ইশহাক কাজলের একটি TV interview দেখেছিলাম , তখন থেকে লিখব লিখব ভেবে আর লিখা হয়নি। জনাব কাজলের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে মত পার্থক্য থাকলেও তার সিলেটী জাতীয়তাবাদ এবং সিলেটকে নিয়ে তার ভাবনা দেখে সত্যিই অভিভুত হলাম। তিনি সিলেটবাসীকে নিজেদের দাবী দাওয়ার ব্যাপারে সচেতন, ও সোচ্চার হওয়ার আকুতি জানিয়েছিলেন এবং এ আন্দোলনে সকল প্রবাসীদের অগ্রনায়কের ভুমিকা পালন করার আহবান জানিয়েছিলেন। প্রবাসীরা তাদের সারা জীবনের কষ্ঠার্জিত সণ্চিত অর্থ দিয়ে তৈরী স্বপ্নের বাড়ী আজ দুংস্বপ্নের কারন হয়ে দাডি্য়েছে। দল মত নির্বিশেষে সিলেটবাসীকে নিজেদের অধিকার আদায়ে ঝাপিয়ে  পড়তে হবে। সরকার পরিচালনায় সিলেটী নেতা- নেত্রীর অংশীদারিত্তের কখনও অভাব ছিল না, এখনও নেই। সিলেটের জন্য আরও একজন সাইফুর রাহমানের বড় প্রয়োজন, যিনি সিলেটবাসীর মনের ভাষা বুঝতে পারেন, যার স্পর্শে ঐতিহ্যবাহি সিলেট হবে আলোকিত।

সিলেটবাসী আধুনিক সিলেটর রুপকার, বিশ্ব নন্দিত সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম জনাব সাইফুর রাহমান, সাবেক স্পিকার মরহুম জনাব


বাংলার প্রসারেও ভূমিকা রাখছে মালয়েশিয়া প্রবাসীরা - রফিক আহমদ খান

শনিবার, ১১ মার্চ ২০১৭

আসসালামুলাইকুম।
ওয়ালাইকুমআসসালাম।
-ইন্তা বাঙালি?
-ইয়েস।
-কেমন আছো?
- ভাল।
-ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী?
-চট্টগ্রাম।
-ভেরি গুড।
-আই লাইক বাঙালি, বাঙালি ভেরি গুড।

হ্যাঁ, এভাবেই প্রাথমিক আলাপ হয় বহু আরবিয়ান কাস্টমারের সাথে। বিশেষ করে সৌদিআরব, আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান, কাতার, কুয়েত থেকে মালয়েশিয়ায় বেড়াতে আসা কাস্টমাররা। পৃথিবীর খুব কম দেশ-ই আছে মনে হয়, যে দেশের পর্যটকদের আমরা যারা কুয়ালালামপুরের চায়নাটাউনে থাকি তারা কাস্টমার হিসেবে পাইনি। সে হিসেবে বলতে পারি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি কেনাকাটা করে মনে হয় আরব দেশের মানুষেরা।

এই আরব দেশের অধিকাংশ মানুষ ইংরেজিতে তেমন পারদর্শী নয়। অনেক সময় আরবি-ইংরেজি মিশেলেই কথা বলতে হয় ওদের সাথে। ভালো লাগে যখন দেখি ইংরেজি একেবারে যে বুঝে না সেও টুকটাক বাংলা বলতে পারে। হোক না খুবই অল্প। তারপরও তো বলতে পারি বাংলায় তার আগ্রহ আছে। সে তো ইয়েস, নো, গুড, নো গুড ছাড়া আর কোনো ইংরেজি জানে না। বাংলা তো বিশ-পঞ্চাশটা শব্দ হলেও জানে।

Picture


এক সময় আমি কুয়ালালামপুরের অদূরে তামিং জায়া নামক একটা জায়গায় থাকতাম। সেখানে অনেক গুলো কলকারখানা আছে। বাংলাদেশিসহ নেপালি, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানি লোকে ভরপুর এই এলাকা। এখানে সপ্তাহে তিন দিন রাতের বাজার (পাচার মালাম) বসে। কুয়ালালামপুরে অনেক জায়গায় ছিলাম, এটার মত বড় পাচার মালাম (বাজার) আর দেখি নাই। অনেক বড় বাজার। মাছ, মাংস, তরকারি, কাপড়চোপড় সবকিছু কেনাকাটা হয় এ পাচার মালামে (বাজার)।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে এই বাজারে বাংলাদেশ থেকে সদ্য নতুন আসা কোনো বাঙালির বাজার করতে ভাষাগত কোনো সমস্যা হবে না।এখানকার সব বিক্রেতা-ই বাংলা জানেন। মাছ, মাংস, তরকারি বেচা-বিক্রি করার মত বাংলা ভাষা সবাই জানেন। বিক্রেতা যে জাতির-ই হোক বা যে দেশের-ই হোক। মালয়েশিয়ান তরকারি বিক্রেতা-ই আপনাকে ডাকবেন, ভাই আসেন, দুলাভাই আসেন, মামু আসেন! ফুলকপি আছে, বাঁধাকপি আছে, বেগুন আছে, টমেটো আছে, কাঁচামরিচ আছে, মুলা আছে, সস্তা-সস্তা-সস্তা।

দর-দাম কতটাকা, কত পয়সা সব বাংলাতেই বলতে জানেন তারা। তামিং জায়া বাজারে নয় কুয়ালালামপুর বা এর আশেপাশে যত বাজারে গেছি সবখানেই মালয়েশিয়ান বিক্রেতারা টুকটাক বাংলা বলতে দেখেছি। শুধু বাজারের বিক্রেতা নয়, ফ্যাক্টরি, কন্সট্রাকশন বা সার্ভিস সেক্টরে কাজ করেন এমন বহু মালয়েশিয়ান নাগরিক টুকটাক বাংলা বলতে পারেন, বাংলা বোঝেন।

আসলে সমগ্র মালয়েশিয়ায় ছড়িয়ে-ছিড়িয়ে আছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তারাই ছড়িয়ে দিচ্ছেন বাংলা ভাষাকে সমগ্র মালয়েশিয়ায়। আবরদের মাঝেও বাংলা ভাষা ছড়িয়ে দিচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি প্রবাসীরা। বাংলাভাষার প্রতি আরবদেরও আগ্রহ আছে হয়ত। তাই-তো আরবিয়ানরা মালয়েশিয়ায় বেড়াতে এসে তারা যেটুকু বাংলা জানেন তা চর্চা করে যান। এভাবে পৃথিবীর দেশে-দেশে বাংলা ভাষাকে বহু জাতির মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিচ্ছেন প্রবাসীরা। প্রবাসীর প্রচেষ্টাতেই একুশে ফেব্রুআরি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রবাসীদের মাধ্যমেই বাংলা ভাষা বিশ্বভাষায় রূপ নেবে এক সময়। বিশ্বজুড়ে বৃদ্ধি পাক বাংলা ভাষা চর্চা। বায়ান্নর ভাষা শহীদদের প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম।

লেখক: মালয়েশিয়াপ্রবাসী সাংবাদিক।


কিউবা ভ্রমণ = রোজানা নাসরীন

শনিবার, ১১ মার্চ ২০১৭

মেঘের উপরে সোনার বিকেল। উড়ে যাচ্ছি। অনুভবের গভীরে এক ধরনের ভাল লাগার চমক কিংকিণী বাজিয়ে চলেছে। একদিন মুক্ত মনে পাখিদের আকাশে ওড়ার আনন্দ দেখে মানুষের মনে সাধ জেগেছিল আকাশে ওড়ার। তারপর থেকে মানুষ গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছে নিশিদিন। মনে মনে রাইট ব্রাদার্সকে স্যালুট জানাচ্ছি। শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা ধারণ করেই যারা চোখ মুদে থাকেননি তারাই আকাশে ওড়ার গূঢ় রহস্যকে আবিষ্কার করেছেন। মানুষের সামনে নিয়ে এসেছেন আনন্দের ঝর্ণা ধারা। আকাশে মেঘের উপরে স্বর্ণালী সন্ধ্যা দেখতে দেখতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে মনে হচ্ছিল এই যে যন্ত্রের উড়োজাহাজে চড়ে আমরা গন্তব্যে যাচ্ছি তার চেয়ে প্রকৃতির অংশ হয়ে মেঘে ভিজে ভিজে, গায়ে সোনালী আলো মেখে মেখে যদি উড়ে যেতে পারতাম, যদি হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করতে পারতাম সোনার আলোকে তাহলে কতইনা ভাল লাগত। এভাবে একসময় পথ শেষ হয়ে গেল, পৌঁছে গেলাম কিউবার ভারাডেরো বিমান বন্দরে।

Rozana Nasrin 2 

আমরা ‘ সান উইং’ কম্পানির একটা বাসে উঠে পড়লাম যেটা আমাদের জন্য নির্ধারিত ছিল। কারণ ‘ সান উইং’ কম্পানির সাথেই আমাদের ভ্রমণ প্যাকেজের চুক্তি করা ছিল তাই এয়ার বাসটিও ছিল ‘ সান উইং’  কম্পানির। ছোট্ট শহর। নতুন দেখা বাতাবরণ আর পুরানো অভিজ্ঞতার সাথে নতুন সব অনুভবের অংশবিশেষ এবং অভিজ্ঞতা যুক্ত হচ্ছে। কিউবা রাষ্ট্রটি একটি  লম্বা দ্বীপ। চারিদিকে আটলান্টিক মহাসাগর।  কোন কোন রাস্তার পাশেই আছড়ে পড়ছে সাগরের ঢেউ। মন চঞ্চল হয়ে উঠছে , অনেকটা রোমাঞ্চকর লাগছে। সবুজ প্রকৃতিতে আছে অনেক অনেক নারিকেল গাছ, মাঝে মাঝে জায়ান্ট ক্যাকটাস আরও অনেক ধরনের গাছের পাতারা হাত নেড়ে নেড়ে যেন আমদেরকে স্বাগত জানাচ্ছে। তখন রাতের আলো আঁধারের খেলার  সাথে নতুন দেশকে যেন একসাথে জেনে নেওয়ার চঞ্চলতা একটি  কথাই কানে কানে বলে যায় সে হল, ‘ভাল লাগছে।‘  মোটামুটি পরিচ্ছন্ন রাস্তা-ঘাট, বাড়িঘর  অবলোকন করে চোখের স্বস্তি আর মনের আনন্দ মিলে  মিশে বিচিত্র এক সুখানুভুতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে একদল  লোককে  নামানো হল ‘টুক্সপান’ নামক একটি রিসোর্ট অ্যান্ড হোটেলে। সুন্দর রিসোর্ট, নয়ন অভিরাম করে  সাজানো, চারিদিকে ফুলের বাগান, চমৎকার ভাবে গুছানো। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার দেশ তাই সেখানে দেখতে পেলাম বাংলাদেশে ফেলে আশা তারা ফুল, রঙ্গন ফুল, যাদেরকে কতদিন দেখিনা। তখন মনে হল আমার দেশের সাথে যতটুকু মিল পেয়েছি তার মূল্য আমার কাছে অনেক। তারপর পৌঁছাল আর একটি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে যার নাম ‘ব্লাও ভারাডেরো’ মনে  হল এখানে আর্কিটেক্ট আর একটু বেশী  মনোযোগ দিয়েছিল। এভাবে একটার পর একটা রিসোর্টে বেড়াতে আশা লোকদেরকে ছুটির আনন্দিত সময় কাটানোর জন্য রেখে যাচ্ছে। পথে পথে গাড়ির মধ্যেই আনন্দ প্রকাশ করার জন্য ড্রাইভার সাহেব মজার মজার কথা বলছেন, অনেক তরুণ উৎসাহী তার সাথে গলা মিলাচ্ছে। একেবারে শেষে পৌঁছে গেলাম হোটেল গ্র্যান্ড মেমোরিতে। ড্রাইভার সাহেব চিৎকার করে বললেন, এবার আমরা পৌঁছে গেছি দা লাস্ট অ্যান্ড বেস্ট হোটেলে। যাত্রীরা হাতে তালি দিয়ে, কন্ঠে উল্ল­াস প্রকাশ করে  নামতে শুরু করল হোটেল চত্বরে। তাকিয়ে দেখলাম বড় বড় ইংলিশ অক্ষরে লেখা আছে ‘গ্র্যান্ড মেমরি অ্যান্ড স্পা’ মানে এটাই আমাদের গন্তব্য। হোটেলে চেক ইন করার পর আমাদের একটি জায়গায় অপেক্ষা করতে বলা হল। বেলবয় এসে ইঞ্জিন চালিত ছোট একটি গাড়িতে আমাদের তুলে নিল এবং পৌঁছে দিল আমদের নির্ধারিত বিল্ডিংএ এবং রুমে ঢুকে আমাদেরকে সকল সুযোগ সুবিধার কথা বুঝিয়ে দিল। এখানে আমরা সাত দিন থাকব, এজন্য কি ধরনের আয়োজন আছে সবকিছুই। কিউবার রাষ্ট্র ভাষা স্প্যানিশ। ট্যুরিস্টদের সাথে মানে আমাদের সাথে সবাই ইংলিশে কথা বলছে ঠিকই তবে বেশীরভাগ মানুষ ভেঙ্গে ভেঙ্গে স্প্যানিশ এক্সেন্টে ইংলিশ বলছে। তবে সবকিছুই স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। তখন মনে হল মানুষ যদি মানুষের মনের কাছাকাছি যেতে চায় তাহলে ভাষা কোন প্রতিবন্ধকই নয়। এখানে তিন ধরনের মানুষ দেখা যাচ্ছে, সাদা, কালো, এবং বাদামী গায়ের রঙয়ের মানুষ। সবাই কিউবান। সে রাতটি ছিল গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির রাত। ভিজে ভিজে খাবার সন্ধানে ঘুরছি আমরা তিনটে পরিবার। যাদের সাথে প্লে­নেই আলাপ হয়েছিল। হোটেলের ডাইনিং তখন বন্দ হয়ে গেছে কিন্তু স্নাকবার চব্বিশ ঘণ্টার জন্য খোলা আছে। বৃষ্টির পানিতে গা ভিজিয়ে, পা ভিজিয়ে, পুল ডিঙ্গিয়ে স্নাকবারে পৌঁছলাম। ওখানে কথা বলে জানলাম, ডাইনিং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খোলা থাকে। কিন্তু সব  বার গুলি (বিচের ধারের বার গুলি ছাড়া) চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকে এবং আমরা জানতাম সব রকম খাবারই ইনক্লুসিভ। অনেকটা স্বস্তি অনুভব করলাম। গভীর রাত পর্যন্ত আমদের গল্প হল, তারপর ঘুমের জন্য ফিরে গেলাম যে যার রুমে। সকালে টিপ টিপ বৃষ্টি উপেক্ষা করে  ডাইনিংএ গেলাম, নাস্তা সেরে দিনের আলোতে সবকিছু বুঝে নেওয়ার তাগিদে ঘুরতে বের হলাম। আবহাওয়ার কথা না বললেই নয়।  কানাডায় ফল সিজন চলছে, তাপমাত্রা পনেরো, সতেরো থেকে জিরো ডিগ্রি সেলসিয়াস এ অবস্থান  করছে, ঠিক সেই সময় ভারাডেরো তে তাপমাত্রা ছিল সাতাশ, আটাশ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ভারাডেরোতে তখন একটি ডিপ্রেশন চলছিল যা দুইদিন স্থায়ী হয়েছিল। অনুকুল তাপমাত্রার কারণে ডিপ্রেশনের আবহাওয়া তেমন কোন বিরক্তির কারণ হতে পারেনি। তৃতীয় দিন সকালে আলোর বন্যায় যেন হাসতে লাগল, ভাসতে লাগল সকলই।

 কিউবার সমুদ্র উপকূলে এক নৌবিহারে লেখিকা রোজানা নাসরীন ও তার স্বামী রাসেল সিদ্দিকী

কিউবার সমুদ্র উপকূলে এক নৌবিহারে লেখিকা রোজানা নাসরীন ও তার স্বামী রাসেল সিদ্দিকী

কিউবা সমাজতান্ত্রিক দেশ। কিউবার অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ জুড়ে আছে ট্যুরিজম। এখনে অনেক দেশ থেকেই ট্যুরিস্ট আসে বিশেষ করে শীতের দেশগুলি থেকে ট্যুরিস্ট এসে বেশি ভিড় করে। অনেকের সাথে কথা বলে জানলাম  ইউরোপ, কানাডা, বলিভিয়া, ব্রাজিল, এমনি  বিভিন্ন দেশ থেকে ভ্রমণ পাগল লোকেরা এখানে ছুটি কাটাতে এসেছে। কিউবার কারেন্সি স্ট্যান্ডার্ট হিশেবে ইউএস ডলার প্রচলিত। কানাডিয়ান ডলারের প্রচলন আছে তবে ইউএস ডলারই নির্ধারিত মূল্যমান। দেশটির সাথে কানাডার সম্পর্ক বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ তাই কানাডিয়ানদের মনে হয়েছিল একটু বেশী খাতির করে ওদেশের লোকেরা। হয়ত কানাডা বিশ্বের ধনী দেশগুলির একটি এবং সামাজিক নিরাপত্তার দিক থেকে প্রথমে অবস্থান করছে বলেই দেশটিকে গুরত্বের সংগে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিউবার কারেন্সিকে বলা হয় ‘পেসো’। ট্যুরিস্টদের জন্য সিইউসি নামে এক ধরনের কারেন্সি প্রচলিত আছে। একশত ইউএস ডলারে পাওয়া  যায় সত্তুর পেসো। ট্যুরিস্টদের জন্য সকল পণ্যের মূল্য সিইউসি তে নির্ধারিত থাকে। বৃষ্টির ঝামেলা উপেক্ষা করে ভারাডেরো ডাউন টাউনের দিকে পা বাড়ালাম। ডাবল ডেকার বাসে চড়তে আনন্দ অনুভব করলাম। আমরা একেবারে উপরে উঠে বসলাম তখন বৃষ্টি নেই। বাসের দোতলায় কোন ছাদ নেই, উন্মুক্ত স্থান থেকে সমস্ত শহর দেখা যাচ্ছে। আমার কাছে মনে হয়েছে শহরের মূল আকর্ষণই হল আটলান্টিক মহাসাগর। যার রূপ দেখে দেখে তৃপ্তি হয়না। পথিমধ্যে একটা জায়গা অপূর্ব লেগেছে, নদী এসে একটা বাঁক নিয়ে নির্দ্বিধায় যেন সাগরে মিশে গেছে। সত্যিই অতুলনীয় দৃশ্য। আকাশ আর সীমাহীন সাগরের মাঝখানে কিউবা যেন একটি অপরূপ ভূখন্ড হিসাবে জেগে আছে, একথা ভাবতে ভাবতে মন বলাকা পাখা মেলে দিল। রবীন্দ্রনাথের বলাকার মতই মন ছুটতে  লাগল, নিজেকে মনে হতে লাগল মুক্ত বিহঙ্গের মত। তিনি যেমন বলেছিলেন, ‘হেথা নয় হোথা নয়, আর কোথা অন্য কোনখানে’  ঠিক তেমন করে  কী যেন এক  বেগের  আবেগে মন ছুটছে , কোথাও কোন বন্ধন নেই। আজ মন যেখানে যেমন ইচ্ছা ঘুরতে যেতে পারে তাই সাগরের বুকে উড়ে যাচ্ছে মন বলাকা। কোন লক্ষ্য নেই। শুধু ছুটে চলাই একমাত্র উদ্দেশ্য, গতিই যেন জীবনের সবটুকু অনুভব জুড়ে সত্য হয়ে আছে আর কিছু নয়। সাগরের বিশালতা প্রত্যক্ষ করলে হয়ত মানুষের মন এমন  চঞ্চল হয়ে যায়। রাস্তার দুই পাশে  চমৎকার সবুজ প্রকৃতি দেখে ক্যমেরা ক্লিক ক্লিক করতে লাগল। প্রথমে একটা মার্কেটে পৌঁছলাম। মার্কেটটি সাজানো গোছানো। নাম লেখা আছে ‘প্ল­াজা আমেরিকা’। নাম দেখে ভাল লাগছিলনা। স্বাভাবিকভাবে একটি উপলব্ধি কাজ করছিল যে আমরা আমেরিকা অথবা কানাডার কোন কিছু

rozana-nasrin-2

বিখ্যাত হাভানা চুরুট মুখে লেখিকার সঙ্গে এক কিউবান রমনী

দেখতে এখানে আসিনি এসেছি কিউবান নিদর্শন দেখতে। অনিচ্ছা নিয়ে দুএকটা দোকানে ঘুরলাম। সব পণ্যের গায়ে লেখা আছে সিইউসির নাম।

কোনটি ৫০, কোনটি ৩০  কোনটি ২০ সিইউসি এমনি নানা রকম পণ্য এবং নানা ধরনের মূল্যমান। তখন মনে হল এখানে সব পণ্যেরই মূল্য কিছুটা বেশী। খানিকটা অস্বস্তি লাগছে  ট্যুরিস্টদের জন্য সকল পণ্যের একটু বেশী মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে। যারা  ট্যুরে আসে তারা শপিং এর চেয়ে বেশী ব্যস্ত থাকে দর্শনের আকর্ষণে। তারা বেশী শপিং করেনা বলে আমার ধারনা।  তাছাড়া একই মানের পণ্য আমেরিকা-কানাডায় আরো খানিকটা কম মূল্যে পাওয়া যায়। উল্লে­খ করার মত  তেমন কিছু কেনা হলনা কিন্তু অভিজ্ঞতা হল  দেশের অর্থনৈতিক মানসের একটি পার্ট সম্পর্কে। তখন আমার মনে হতে লাগল যদি পণ্যের মূল্য আরো কম করে নির্ধারণ করা হত তাহলে হয়ত ট্যুরিস্টরা কিছু বেশী পন্য ক্রয় করত। ওখান থেকে ফিরে আমরা গেলাম  একেবারে ভারাডেরো ডাউন টাউনের ফ্লি মার্কেটে। মার্কেটটি বাইরে থেকে দেখে মনে হল কতগুলি টেন্ট লাগানো একটা অস্থায়ী ব্যবস্থা। ভিতরে ঢুকে দেখলাম ওখানে কিউবান সুবিনিয়ারে ঠাঁসা। কাঠের তৈরি পণ্য, সমুদ্রের ঝিনুক দ্বারা তৈরি বিভিন্ন ধরনের পণ্য, সত্যিকারের স্টোন এবং পার্লের গয়না দিয়ে সাজানো রয়েছে। আবার যে গয়নাটি যে স্টোন দিয়ে তৈরি তার একটুকরা নমুনা পাশে রাখা আছে। মুক্তার গয়নার পাশে মুক্তাওয়ালা ঝিনুক রাখা আছে। কোন পণ্যের দামই নির্দিষ্ট করা নেই। তবে মনে হচ্ছিল টুরিস্টদের কাছে সব পন্যের দামই একটু বাড়িয়ে চাচ্ছে। অর্থাৎ যার কাছ থেকে যতটুকু বেশি মূল্য রাখা যায়  ততটুকুই যেন তাদের লাভের অংশ হিসাবে গণ্য হবে। এটা এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক দীনতা। প্রথমে তারা  জিজ্ঞেস করছে  কানাডা থেকে এসেছি কিনা। আমি দোকানে কানাডার নাম  বলার পর কিছুতেই কোন পণ্যের দাম এতটুকু কমাতে রাজি হয়নি তাই বেশি দামেই কিছু কিনে নিতে হল। ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলাম  আর ভবতে থাকলাম, অনাকাঙ্ক্ষিত মূল্যে বেশী কিছু কেনা যাবেনা অথচ অনেক  কিছুই কিনতে ইচ্ছে করছে।  হঠাৎ করে দেখতে পেলাম দুজন কেনেডিয়ান মহিলা বলল তারা ইন্ডিয়া থেকে এসেছে। তাদের গায়ের রঙ ছিল বাদামী, হয়ত তারা ছিল ইন্ডিয়া থেকে আগত ইমিগ্রান্ট। ইন্ডিয়া শুনে অনেকেই দামের ব্যাপারে তাদের সাথে কিছুটা  নমনীয় ভূমিকা পালন করল যা পরিষ্কার বুঝতে  পারলাম। ঘুরতে যেমন ভাললাগল তেমনি  তাদের মানসিক প্রবণতা প্রকাশ পেল এবং মনে হল এ যেন এক চেনা মার্কেটের চরিত্র, যাকে অনেক পিছনে ফেলে এসেছি । তৃতীয়  বিশ্বের মার্কেট গুলোর সাথে কিছুটা চারিত্রিক মিল পেলাম। চোখের  সামনে ভেসে উঠল ইন্ডিয়া-বাংলাদেশের মার্কেটের চরিত্র। তবে ক্রেতাদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে উল্লি­খিত দেশ দুটির চেয়ে এদেশের মার্কেট ও পণ্যের মান অনেক উন্নত মান সম্পন্ন যা ইউরোপ এবং আমেরিকা, কানাডার সম পর্যায়ের । ফেরার সময় প্রচন্ড বৃষ্টির কবলে পড়ে ফ্লি মার্কেটে ঘোরার আনন্দ অনেকটা হ্রাস পেল। আর ছাদে বসা হলনা এবার জানালা দিয়ে শহর দেখছি।  শহরের বাড়িগুলি দেখছি আর ভাবছি সব দেশের মানুষেরই হয়ত মনের অনুভূতি একই রকম। হয়ত সব দেশের নাগরিক গণ বিশ্বাস করে  আমাদেরই মত “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবেনাক তুমি/ সকল দেশের রানী সেজে আমার জন্মভূমি।“

rozana-nasrin-4

লেখিকা রোজানা নাসরীন ও তার স্বামী রাসেল সিদ্দিকী

বিকেলে হোটেলের স্যুইমিং পুল যেন আমদেরকে অনেকটা টেনে নিয়ে গেল। তখন আর বৃষ্টি নেই, চমৎকার মিউজিক বেজে চলেছে। ‘সালসা’ ওদের প্রিয় মিউজিক। পুলের সঙ্গেই মিনি বার সেখানে সব ধরনের পানীয় পাওয়া যায়। একদিকে স্নাকবার আছে ইচ্ছে করলে সেখানে কিছু খেয়ে আবার পুলে ফিরে আসা যায়। ও দেশে আইনের প্রয়োগ খুব কঠিন। ওখানে কোন অপরাধ সংগঠিত হয়না। অপরাধ কাকে বলে সাধারণ কিউবানরা হয়ত এর রূপ ভুলে গেছে। সরকার আইনের মাধ্যমে যা নিষিদ্ধ করেছে তা ভঙ্গ করার ক্ষমতা কারো নেই। সব রকম পানীয় অবাধে মানুষ খেতে পারে। যে যত ইচ্ছা ড্রিঙ্ক করতে পারবে  কিন্তু ড্রাংক অবস্থায় সব ধরনের অপরাধ নিষিদ্ধ। তাই তারা ক্রাইম থেকে মুক্ত। একটি দেশে সাধারণ মানুষের সমাজে কোন ক্রাইম সংগঠিত না হলে সামাজিক ও মানসিক ভাবে নাগরিকগন সর্বাধিক নিরাপদে বসবাস করতে পারে। একটা আর্থিক দীনতা কিউবা বাসীর অন্তরে অন্তরে ক্ষীণ ধারায় বইছে  যা আমি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছি। তখন আমাকে একটা চিন্তা অসম্ভব ভাবিয়ে তুলেছে; আমরা একটা সংস্কার নিয়ে বড় হয়েছি যে, অভাবে স্বভাব নষ্ট ;অর্থাৎ দারিদ্রতার কারণে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। কিউবাকে দেখে আমার সেই আজন্ম বয়ে আনা ধারনা সমূলে উৎপাটিত হয়ে গেল। বোধটা আরও সুস্পষ্ট হল যে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে অপরাধ প্রবণতা কালচারের ঘারে চড়ে আসে, কখনো দারিদ্রতার ঘারে চড়ে আসেনা। মানুষ স্বভাবতই অপরাধ প্রবণ কিন্তু আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারাটাই কালচারের অঙ্গ। কিউবান সরকার সেটুকু পেরেছেন। সামাজিক জীবনের চারিদিক কণ্টক মুক্ত করতে পারা এবং সমাজের আর্থিক উন্নতিকে গতিমান করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কেবল দেশের মানুষ ধনী হলেই সব  কিছুর সমাধান হয়ে যায়না; আর্থিক উন্নতির পাশাপাশি প্রয়োজন নৈতিক জীবন বোধ এবং সকল মানুষের অবাধে সমাজে বিচরণ করার নিশ্চয়তা। ধর্ম, গোত্র, সেক্স নির্বিশেষে রাষ্ট্রীয় আইন মেনে সকলের  জীবনকে বন্ধনহীন করে তোলাই সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিউবাতে কিছুটা আর্থিক দীনতা থাকলেও তারা মানুষের যাপিত জীবনে এবং সংস্কারে অনেকখানি অপরাধ মুক্ত। এখানে নারী ও পুরুষের মধ্যে বাহ্যিক কোন প্রভেদ নেই। যদিও অন্তরে কি আছে আমরা বাইরে থেকে তার খোঁজ রাখিনা। সকলেই এখানে মানুষ হিসাবে গন্য হয় এবং সবক্ষেত্রেই তাদের অধিকার সমান। নারী পুরুষের মধ্যে সামাজিক বিভেদ বলতে দৃশ্যমান কিছু চোখে পড়েনি। যা  মানুষ হিসাবে আমাকে আকর্ষণ করেছে। আমি যে সামাজিক নিয়মগুলি দেখে বেড়ে উঠেছি, যাকে কোনভাবে সমর্থন করতে পারিনি কোনদিন, সেই নিয়মগুলি কোনখানে নেই , যা অনেকখানি মানসিক স্বস্তি নিয়েই অনুভব করেছি। ওখানে সেক্সের  শাসন  মানুষকে  প্রথার দড়ি দিয়ে টেনে পেছনে নিয়ে যাচ্ছেনা। এক শ্রেণীর মানুষের অবমাননায় আর এক শ্রেণী ধন্য হয়না, কারণ সেখানে আইন ভঙ্গকারী আইন ভাঙ্গাকে বীরত্ব মনে করেনা। প্রথাদৈত্যই একমাত্র জীবনসঙ্গী হয়ে ওঠেনি, জীবনের সবটুকু পরিসর জুড়ে নির্ভীক প্রথার অভয় দৌড় নেই ওখানে যেটা এশিয়ানদেশগুলিতে চরম ভাবে প্রতিয়মান। (চলবে)

যেসব পণ্য তারা উৎপাদন করছে তার মধ্যে চিনি শিল্প আর সিগারেট শিল্প দেশটিকে সমৃদ্ধ করেছে। এক সময়য়ের বিশ্ব নন্দিত হাভানা চুরুটের কথা সর্বজন বিদিত। আখের চাষ করার জন্য আফ্রিকা থেকে এবং চায়না থেকে সেøভ ধরে এনেছিল প্রথম দিকের স্প্যানিশ রাজাগণ। কার্লোস নামে একজন স্বাধীন চেতনায় সমৃদ্ধ মানুষ যিনি ছিলেন একজন আখ চাষি তিনিই প্রথম সেøভদেরকে মুক্ত করার কথা ভাবেন এবং একসময় স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তার মুক্ত মানবিক চিন্তাই মানুষের বন্ধন থেকে মানুষকে মুক্ত করেছে। চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছে সেø­ভিয়ান প্রথা।

কেটে গেল আরও একটি রাত। সময়ের ঘোড়া দ্রুত গতিতে ছুটতে লাগল।পরের দিন সকালে ঝলমলে রোদের মধ্যে মন ছুটাছুটি করতে শুরু করল। মনে হচ্ছিল মানুষ কেবল শুভ বোধের দ্বারাই সুখকর ও কল্যাণকর বোধ খুঁজে পেতে পারে। মনে হবে আলোর সাথে এসব মনে হওয়ার সম্পর্ক কি? আসলে  বাঁধন হারা সময় টুকুই এসব ভাবনার কারণ হয়ে উঠেছে হয়তবা। যখন আমরা ছুটি কাটাতে গিয়ে বাঁধন হারা সুখ অনুভব  করছি ঠিক সেই মুহূর্তে পৃথিবীর অনেক নিরীহ মানুষ প্রথার বন্ধনে নির্যাতিত হয়ে সন্ত্রাসে মারা যাচ্ছে। পৃথিবী জুড়ে এভাবেই  সুখে অসুখে মিলেমিশে মানব জাতি ছুটে যাচ্ছে কোন এক লক্ষের দিকে।

আটলান্টিক মহাসাগরের উদার আহ্বান আমাকে চুম্বকের মত টানছে। আমরা আটলান্টিকের বিচে গিয়ে পৌঁছলাম। বিচের চেয়ারগুলিতে কেউ শুয়ে শুয়ে বই পড়ছে, কেউ গায়ে সোনার রোদ মাখার জন্য শুয়ে চোখ বন্ধ করে আছে, কেউ বেলা ভূমিতে ঝিনুক কুড়াচ্ছে, কেউবা সমুদ্রের জলে ঝাপ দিয়ে ধেয়ে আসা ঢেউ গুলির সাথে খেলা করছে। সবার চোখে মুখেই একটা আনন্দের ঝলকানি সুস্পষ্ট। আমি অপেক্ষা করতে পারলামনা ঝাপ দিলাম অতল সীমাহীন সাগরের বুকে। ছোটবেলায় আমি এই বক্তব্যের  ভাব সম্প্রসারণ করেছিলাম, ‘সমুদ্রের বুকে ঝাপ দাও, তরঙ্গকে আঁকড়ে ধরো ওখানেই আছে অনন্তজীবন।‘ কথাটা তখনকার চেয়ে আজ যেন বেশী বেশী অনুভব করছি। যে কথাগুলি আমাকে সারা জীবন ধরে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে , এবং সেই আত্মসঙ্গী হয়ে যাওয়া কথাগুলি যে একটা চিত্রকল্প বহন করে বেড়াচ্ছে সে যেন বাস্তব রূপ ধারণ করে আমার সামনে উপস্থিত হল । যদিও এর অর্থগত দিকটা অনেক ব্যাপক কিন্তু আজকের সমুদ্রের বিশালতার কাছে, ব্যাপকতার কাছে যার সমস্ত বিস্তৃতি হারিয়ে কেবল জেগে আছে ঢেউয়ের সাথে খেলা করার আবেদনটুকু। তাই সমুদ্রের জোয়ারের সাথে একাকার হয়ে  গেলাম শুধু।

এবার হাভানা যাওয়ার আয়োজন চলছে। হাভানা কিউবার রাজধানী। শহরটি বিশাল নয় তবে তাদের জাতীয় জীবনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। চারশ’ বছর ধরে স্পেন কিউবার শাসন ক্ষমতায় থাকার পর  আমেরিকার সাথে স্পেন এর যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় কিউবার মালিকানা নিয়ে। ১৮৯৮ সালে যুদ্ধ শেষ হয় এবং  আমেরিকা যুদ্ধে জয় লাভ করে এবং রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে। এরপর ক্রমাগত ইতিহাসের পট পরিবর্তনের  মধ্য দিয়ে একসময় কিউবা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়।  এসব উত্থান পতনের  নিদর্শন তাদের  স্থাপত্য শিল্পে বহন করে চলছে। শহরটিতে আমেরিকা এবং স্পেনের শাসন কালের নিদর্শন এখনও জীবন্ত। কিউবার ডিক্টেটর নামে পরিচিত ফিদেল ক্যাস্ট্রো দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। ফিদেল ক্যাস্ট্রোর বাবা স্পেন থেকে আগত একজন ইমিগ্রান্ট ছিলেন। ফিদেল ক্যাস্ট্রো দেশের সংবিধান সহ অনেক পরিবর্তন সাধন করেন। পরবর্তীতে তিনি শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার ভাই রাউল ক্যাস্ট্রোর কাছে ক্ষমতা হস্তার করেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান এর পদ থেকেও তিনি অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু পরোক্ষভাবে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় তার দর্শনকে চলমান রেখেছিলেন। বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন দেশের শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতাসীন হওয়ার ফলে দেশের সামাজিক এবং  ধর্মীয় সংস্কার বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটা নিজস্ব রূপ ধারন করেছে। যদিও ধর্মের শাসন নিয়ে কোনরকম বাড়াবাড়ি নেই, তবু সাধারন জনগণের মধ্যে একটি অস্পষ্ট ধর্মীয় অনুভূতি কাজ করছে সেটি হল ক্যাথলিক খ্রীস্ট ধর্ম। হাভানা ক্যাথলিক চার্চ তার দৃষ্টান্ত  বহন করছে। চার্চের  পাশেই রয়েছে ধর্ম শিক্ষার স্কুল। ইচ্ছে করলে দেশের যে কোন নাগরিক সেখানে ধর্ম শিক্ষা পেতে পারে। পোপ হলেন সেই স্কুলের প্রধান ব্যক্তি।

হাভানা যাওয়ার পথে একটি জায়গায় আমরা থেমেছিলাম কিছু খাওয়া দাওয়া আর ফ্রেশ হওয়ার জন্য। সেখানে একটা রেস্টুরেন্টে আমরা যে যার মত বিভিন্ন প্রকার স্নাক খেলাম ফ্রেশ হলাম আবার চললাম গন্তব্যের দিকে। ভ্রমণের ফর্মুলা অনুযায়ী মিউজিয়াম, প্রধান চার্চ, দুর্গ, রেভুলেশন স্কয়ার, মহানায়কদের শ্বেত পাথরের মূর্তি, ঐতিহাসিক নিদর্শন বর্ণনা এবং ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দ মিলে কখন সময় ফুরিয়ে গেল টের পাইনি। ভ্রমণে যাওয়া বেশ কয়েকজন টরন্টোবাসীর সংগে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল এরা কেউ ইমিগ্রান্ট, কেউ টরন্টোরিয়ান, সবাই মিলে আমরা এক দেশের অস্তিত্ব বহন করছি বলে সবাইকে একই সংস্কৃতির মানুষ মনে হচ্ছিল। আমরা কানাডিয়ানরা সবাই মিলে লাঞ্চের জন্য রেস্টুরেন্টে একটি টেবিলে বসেছি , গল্পের ছলে যে যার অভিজ্ঞতার কথা বলে চলল। কেউ নেতিবাচক ভঙ্গী প্রকাশ করল কেউ আবার অনেকটা ইতিবাচক মত প্রকাশ করল, তবে নেতিবাচক কথার দিকেই সকলের ঝোঁকটা একটু বেশী ছিল। আসলে কেউ ঠিকঠাক করে বলতে পারেনা যে টেবিল টক কোন দিকে ঝুঁকে পড়বে, আমদের বেলায়ও তাই হল। ফেরার পথে আমরা একটা অতি পুরাতন দুর্গ দেখার জন্য থেমেছিলাম সেখানে ছোট একটি মার্কেট আছে যেখানে সব কিউবান সুবিনিয়ার কেনার জন্য একটা বিশেষ জায়গা, ছোট ছোট একচালা ছাউনির মধ্যে দোকানের জৌলুস মন্দ নয়। কিছু কেনাকাটা সেরে ফিরতে বেশ অন্ধকার হয়ে গেল, তখন জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ কবিতার মত করে মনে হতে লাগল সব পাখী ঘরে ফেরার লগ্ন এলো এবার।

আমরা কোন ট্যুরে কিভাবে কখন যাবো তার একটা নির্দেশনা পেয়ে গিয়েছিলাম আগেই, কারণ প্রথমে রেজিস্ট্রি করতে হয়েছিল এবং টাকা জমা দিতে হয়েছিল আমাদের হোটেলেই। সমস্ত দিনের  ভ্রমণের আনন্দের রেশ পরের দিনেও যেন সতেজ হয়ে আছে। পরের দিন প্রভাত আলোয় শরীর ভিজিয়ে আমরা কোন এক আনন্দের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। এবার সমুদ্রে যাবো, অনুভূতিটা এরকম যেন অনেক আগেই মনটা সমুদ্র যাত্রায় নেমে পড়েছে তাই সে সাগরের বিশালতায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। নতুন নতুন দৃশ্যাবলী পেছনে রেখে আমরা ছুটছি , ক্রমাগত চলে যাচ্ছি কোন এক আনন্দের সাজানো ঘরে। আমাদেরকে বহনকারী বাস এসে পৌঁছল একটা টার্মিনালে যেখান থেকে দেখতে পেলাম সাগরের বুকে ভেসে যাচ্ছে  শত শত প্রমোদ তরী। এর মধ্যে একটা এসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, নাম তার ‘কাটামারাং।‘ লাইন ধরে একে একে উঠে  পড়লাম যার সাহায্যের প্রয়োজন ছিল তাকে হাত ধরে সাহায্য করল ভ্রমণ আয়োজকরা । এভাবে  সবাই  উঠে গেলাম সমুদ্রের বুকে ভেসে যাওয়া একটি বোটে। হৃদয় তখন কি এক ভাললাগার আনন্দে বিভোর।  বোটের আকৃতি জাহাজের মত নয় অনেকটা বন্ধনহীন ভেসে বেড়ানোর উপযোগী করেই তৈরি। বোটের মধ্যে যেন আনন্দের ঝর্ণাধারা বইছেতো  বইছেই। নাচে গানে মাতোয়ারা সকলে। যেন পৃথিবীর সব আনন্দ এখানে এসে জমা হয়েছে। সকলেই সুইমিং কস্টিউম পরে আছে, আমি এমন একটি দেশে জন্মেছি এবং বেড়ে উঠেছি যে দেশের মানুষ মনে করে মেয়ে মানুষের অঙ্গ দেখলে পুরুষ মানুষ হামলে পড়বে তাঁর উপর, তাই আমার হৃদয়ে চলছে অনুসন্ধানের যজ্ঞ। আমার চোখ সকলের মুখ অনুসন্ধানে  তৎপর হয়ে উঠল, বুঝতে  চেষ্টা করছি কারো মুখে ভেসে উঠছে নাকি ধর্ষণের আগ্রহ। কোন মানুষের চোখে মুখে  মেয়ে মানুষের অঙ্গ দেখে তাঁকে ধর্ষণের অভিলাষ জেগে উঠতে দেখিনি। কোন পুরুষকেই পাপী মনে হচ্ছেনা যে তাকে দেখে মেয়েরা অঙ্গ ঢাকতে তৎপর হয়ে উঠবে। কোন পুরুষ মানুষকে দেখে  মনে হচ্ছেনা নারীকে সুইমিং কস্টিউম পরা দেখে লালসার যাতনায় মরে যাচ্ছে। এখানে আনন্দটা নির্মল। এটাকেই বলে স্বাধীনতা, যা বাংলাদেশে প্রথার মধ্যে হারিয়ে গেছে।  যেখানে প্রথার আগ্রাসনেই  রচিত হয় নারী ও পুরুষের বিভেদের ফারাক। নারীর অঙ্গ দেখলে পুরুষের আগ্রাসী চিন্তা বেড়ে যায় কেবল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে; যারা নারীর দিকে শুধুমাত্র যৌনতার দৃষ্টিতেই তাকায়। মনে হয় আজন্ম লালিত কী যেন এক আক্রোশ বহন করে চলছে নারীদের প্রতি পুরুষ চরিত্রগুলো। তাই তাকে ধর্ষণের পর মেরে ফেললে জীবনের প্রতি কোন অন্যায় করা হয়না যেন। তাদের বেঁচে থাকা এবং মৃত্যু বরণ করা দুটোই যেন  পুরুষের অভিলাষ। নারী একজন মানুষ একথা কোনভাবেই  যেন  ভাবতে পারেনা তারা। কিন্তু ঐ ভাবনার বৃত্তের বাইরে যারা অবস্থান করেন তাদের মাথায় ধর্ষণের চিন্তা বা মতলব কোনটাই আসেনা। এর মনস্তাত্ত্বিক  কারণ হল যখন এসব সামাজিক প্রথাগুলি তৈরি  হয়েছে তখন মানুষের জীবনে যৌনতার আনন্দ ছাড়া আর কোন আনন্দের ব্যবস্থা ছিলনা। মানুষের মনে কখনও আসেনি যে যৌনতাকে অতিক্রম করেও সকল মানুষ মিলে নির্মল আনন্দের ব্যবস্থা করা যায়। আজকের সভ্য জগতে যৌনতার আনন্দ কেবল নিতান্তই ব্যাক্তিগত; মানে সেটা কেবল দুটি মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং নিয়মতান্ত্রিক । কিন্তু নৈর্ব্যক্তিক আনন্দের ব্যবস্থা করতে হলে ঐ সীমাবদ্ধ ভাবনার বাইরে গিয়ে  সকলের আনন্দের উৎসকে খুঁজে বের করতে হয়। যে আনন্দের নেপথ্যে থাকবেনা কোন ভীতির  কুহেলিকা। মানুষের আনন্দ লোভী মন সভ্য মানুষকে তাগিদ দেয় যে অনেকে মিলে যতটুকু আনন্দে ভেসে যাওয়া যায় সেটুকুই জীবনকে সহজ ও স্বাভাবিক করে রাখে। কুসংস্কার মুক্ত করে এবং মানুষকে উদার হওয়ার মন্ত্র শিখায়। মানুষের অন্তরে অন্তরে সর্বদা দুটি মন্ত্র সক্রিয়, একটি হল মানুষে মানুষে আনন্দের মাধ্যমে সৌন্দর্য মণ্ডিত মানব সভ্যতা গড়ে তোলা, অন্যটি হল কোন প্রথা ও  কোন সংস্কারের কারণে মানুষে মানুষে  শত্রু  ভাবাপন্ন সম্পর্ক তৈরি করা, এবং প্রথাবদ্ধতাকে  অন্তরে ধারণ করে মানুষের  ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য সকল সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করা।  এই দুটি সত্যের মধ্যে মানব জাতি কোনটিকে গ্রহণ করবে তা নির্ভর করে  তাদের মানসিক প্রবণতার উপর। এভাবেই জাতিগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়।

সীমাহীন সমুদ্রের মাঝে একটি নির্দিষ্ট স্থানে এসে আমাদের বোটটি থামল। সাগরের বুকে একটি  সুবিধা জনক জায়গা পছন্দ করে বিশেষ ব্যাবস্থায় স্টেশন করা আছে। একইভাবে দুটি স্টেশন তৈরি করা আছে। একটা বড় এরিয়া জুড়ে কোন কিছু আটকে রাখার মত করে  গোলাকৃতি আয়োজন রয়েছে। যখন সেই স্টেশনে আমরা নেমে পড়লাম আনন্দে মনটা যেন চঞ্চল হয়ে উঠল। চারিদিকে অন্তহীন সাগর  মাঝখানে  মানব সৃষ্ট একটি ঘাটি , ডলফিনদের আবদ্ধ রাখার জন্য এ ব্যবস্থা। তবে  ডলফিনদের অবরুদ্ধ রাখার প্রক্রিয়াটি দেখে মনে হল সাগরের বিশালতাকে ব্যাহত করা হয়নি এতটুকু। ডলফিনরা সেখানে বসবাস করলেও তাদের অবরোধ করে রাখা হয়েছে সে রকম মনে হচ্ছেনা। দেখে মনে হচ্ছে এ এক অদৃশ্য অবরোধ। কারণ এই গোলাকৃতি জায়গাটির মেকানিজম চমৎকার। যেহেতু ডলফিন বড় আকৃতির মাছ তাই তার শারীরিক আকৃতির তুলনায় খানিকটা ছোট ছোট ফাকা দিয়েই রচিত বন্ধন।। তাঁরা ছুটে যেতে পারছেনা তবে তাদের অবরোধের কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছেনা । একে একে সকলে নেমে গেল ডলফিনের সাথে খেলা করতে। ডলফিনের পছন্দের খাবার হিসাবে এক ধরণের মাছ তাদেরকে খেতে দেওয়ার কারণে যেন উৎফুল্ল হয়ে শিখানো খেলা দেখাতে লাগল পরম উৎসাহে।  যখন ডলফিনের পিঠে চড়ে সাগরের জলে ঘুরছি তখন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল , মনে হচ্ছিল সমস্ত বাস্তবতা স্বপ্নের জগতে হারিয়ে গেছে। রিসোর্টের পক্ষ থেকে ক্যামেরা ম্যান ছিল, প্রায় সবাই ডলফিনের সঙ্গে চমৎকার যত ছবি  উঠাল। ডলফিন  মাছ হয়ে মানুষের গালে চুম্বন করছে ফটো স্যুটের জন্য। দৃশ্যটি দেখে আমার মনে আনন্দের ঝর্ণা বয়ে গেল।

এবার একটা মজার ইভেন্ট আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে যার নাম ‘স্নোর কেলিং।‘ মহাসাগরের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে মানুষেরা জলের তলদেশে গিয়ে কতকি রহস্য উদ্ধার করেছে, ঠিক তাদের মতই যেন আমরা সকলে খেলায় মেতেছি। দেখে মনে হচ্ছে সবাই সাগর মন্থনে নেমেছে। কিছু ভীতু মানুষেরা জিজ্ঞেস করে যখন জানতে পারল পানির গভীরতা এখানে একেবারেই নেই তখন তাদেরকে এক একজনকে সম্রাটের মত মনে হল, তাদের চোখ মুখ ঝলকানি দিয়ে উঠল। কেউ মাছদের খাবার দিয়ে  জড়ো করেছে , কেউ সাঁতার কাটছে । এভাবে প্রকৃতির সাথে মানুষের মেলেমেশাটাকে অবাঁধ না হলে মানুষ এক বিপুল  আনন্দ থেকে বঞ্চিত  হয়। ওখানে পানির সচ্ছতা দেখে মন যেমন মুগ্ধ হয়েছে তেমনি নিজেকে অনেক বেশী মুক্ত মানুষ ভাবতে ইচ্ছে করেছে , যে মুক্তি আমার নেপথ্যে ফেলে আশা সংস্কৃতির মধ্যে কিঞ্চিৎ  ম্রিয়মান ছিল। এভাবে ত্রিশ মিনিট কি ভাবে কেটে গেল টের পেলামনা। কারণ আমাদের ত্রিশ মিনিটই বরাদ্দ ছিল। সকল বয়সের মানুষেরা আবার একে একে উঠে এল বোটের মধ্যে। আমাদের কাপড়  আমাদের শরীরেই শুকাল। ক্রমাগত আনন্দ ধারা সামনে নিয়ে চলল আমাদেরকে, আমরা ছুটতে ছুটতে একটা ছোট্ট দ্বীপে পৌঁছে গেলাম। দ্বীপটির  শুভ্র সৈকত এখনও মনের নির্জনে জেগে আছে। সেই সৈকতের রূপ যুগান্তরের মুগ্ধতাকে অতিক্রম করে গেছে । প্রকৃতি সম্পর্কে মানব গোষ্ঠী এবং তাদের পূর্ব পুরুষেরা যতটুকু ভাবতে পেরেছে তার চেয়েও যেন  সুন্দর  কোন দৃশ্য এখানে, অন্তত আমার মনে তেমনই একটা অনুভূতি এসে জুটেছে। রবি ঠাকুরের সেই গানটি আমার হৃদয়কে চঞ্চল করে তুলছে , ‘ওরে ওরে ওরে আমার মন মেতেছে/ তারে আজ থামায় কেরে।‘ এখানে এসে মনে  হল মন যেন মুক্ত ও সাবলীল। দিগন্তব্যাপী শুভ্রতার মধ্যে একটি দ্বীপ জেগে আছে যেন পরম তৃপ্তি নিয়ে। যে দ্বীপটি মানব সভ্যতার পদচারনায় অনেক বেশী মুখর ,  অনেক বেশী পরিপাটি । এখানে  প্রয়োজনীয়  সব ব্যবস্থাই রয়েছে। লাঞ্চ সেরে সমুদ্র সৈকতে নেমে পড়ল সবাই। যতদূর দৃষ্টি যায় শুভ্র রঙের বালুচর আর সঙ্গে সমুদ্রের সচ্ছ পানি। শুভ্র সমুদ্র সৈকতে যেন কী আনন্দে সকলে লুটোপুটি করছে আর সাথে সাথে ক্যমেরা ক্লিক ক্লিক করে চলেছে। কেউ সেলফি তুলছে , কেউ অন্যের সাহায্য নিচ্ছে , এভাবে আলোর গল্প , আনন্দের গল্প , মুক্তির গল্প , প্রকৃতির কাছে ছুটে যাওয়ার গল্প দিয়ে ভরে উঠল আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি। সমুদ্র থেকে যেন কুড়িয়ে আনা অজস্র স্ফূর্তির ঝিনুক মালা গেঁথে যাচ্ছে হৃদয়ের অন্তরালে বসে কে যেন , যাকে শুধু অনুভব করা যায় দেখা যায়না কখনও ।