Editors

Slideshows

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/605744Finding_Immigrant____SaKiL___0.jpg

কুইন্স ফ্যামিলি কোর্টে অভিবাসী

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ দ্যা ইন্টারফেইস সেন্টার অব নিউইয়র্ক ও আইনী সহায়তা সংগঠন নিউইয়র্ক এর উদ্যোগে গত ২৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ৯ See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/455188Hasina__Bangla_BimaN___SaKiL.jpg

দাবি পূরণের আশ্বাস প্রধানমন্ত্

বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ দাবি-দাওয়া বাস্তবায়নে আলোচনা না করে আন্দোলন করার জন্য পাইলটরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন। পাইলটদের আন্দোলনের কারণে ফ্লাইটসূচিতে জটিলতা দেখা দেয়ায় যাত্রীদের কাছে দুঃখ See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/701424image_Luseana___sakil___0.jpg

লুইজিয়ানায় আকাশলীনা‘র বাৎসরিক

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ লুইজিয়ানা থেকে ঃ গত ৩০শে অক্টোবর শনিবার সনধ্যায় লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির ইণ্টারন্যাশনাল কালচারাল সেণ্টারে উদযাপিত হলো আকাশলীনা-র বাৎসরিক বাংলা সাহিত্য ও See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/156699hansen_Clac__.jpg

ইতিহাসের নায়ক মিশিগান থেকে বিজ

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ ইতিহাস সৃষ্টিকারী নির্বাচনে ডেমক্র্যাটরা হাউজের আধিপত্য ধরে রাখতে সক্ষম হলো না। সিনেটে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুন্ন রাখতে সক্ষম হলেও আসন হারিয়েছে কয়েকটি। See details

http://bostonbanglanews.com/components/com_gk3_photoslide/thumbs_big/266829B_N_P___NY___SaKil.jpg

বিএনপি চেয়ারপারসনের অফিসে পুলি

হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপ্‌স নিউজ/প্রবাসী নিউজ ঃ বষ্টনবাংলা নিউজ ঃ নভেম্বর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটস্থ আলাউদ্দিন রেষ্টুরেন্টের সামনে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি তাৎক্ষণিক এক বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। এই See details

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

সার্বজনীন দুর্গাপূজার সেকাল ও একাল= শিতাংশু গুহ

শনিবার, ০৮ অক্টোবর ২০১৬

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দুর্গাপূজা শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসবই নয়, এটি আজ সার্বজনীন। বনধু প্রবীর শিকদার বলেছেন, শেখ হাসিনা ছাড়া আর কোন প্রধানমন্ত্রী এমন হৃদয় ছোঁয়া কথা বলতে পারেন না। উইমেন চ্যাপ্টারের শান্তা মারিয়া অবশ্য বলেছেন, তাহলে ছুটীর বেলায় এত সাম্প্রদায়িকতা কেন? তিনি একটি হিসাব দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশে বছরে ১১দিন সংবাদপত্র বন্ধ থাকে, তন্মধ্যে ৯দিন মুসলিম সম্প্রদায়ের উৎসবের জন্যে, বাকি দুইদিন পহেলা বৈশাখ ও মে-দিবস। মিডিয়ায় দেখলাম, বাংলাদেশে এবার প্রায় তিরিশ হাজার দুর্গাপূজা হচ্ছে। নিরাপত্তার কোন কমতি নেই। ডিএমপি বলেছে, পূজায় জঙ্গী হামলার কোন আশঙ্কা নেই। তবে ফেইসবুকে দেখলাম, দেশে পূঁজা বন্ধের দাবী আছে। মুর্ক্তিভাঙ্গা তো আছেই, এবং যথারীতি এরকোন বিচার কখনো ছিলোনা, এখনো নেই!  

এরমধ্যে মহাধুমধামে পুজো হচ্ছে। সার্বজনীন দুর্গাপূজার মূল থিমটাই হচ্ছে, অসুরের বিরুদ্ধে সুরের বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের বিজয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এবারকার থিম হতে পারে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শান্তির বিজয়। পূজার ধর্মীয় দিকটি হিন্দুর হলেও উৎসবটি আসলেই সবার। এজন্যে এটি সার্বজনীন। নিউইয়র্কের বাঙ্গালীর প্রাণকেন্দ্র জ্যাকসন হাইটসে এবার প্রথমবারের মত দুর্গাপূজা হচ্ছে, এদের শ্লোগান হচ্ছে, 'ধর্ম যার যার উৎসব সবার'। জ্যাকসন হাইটস পূজা ফাউন্ডেশন আয়োজিত এ দুর্গোৎসব মূলত: হিন্দু-মুসলমানের যৌথ উদ্যোগ। ১৯৯০ সালে যখন নিউইয়র্কে হিন্দুরা 'বাংলাদেশ পূজা সমিতির' ব্যানারে প্রথম পূজা করে, তখনও ব্যাপারটা তাই ছিলো। আড়াই দশকের ব্যবধানে নিউইয়র্কে এখন অনেকগুলো পূজা; পূজা বেড়েছে, সম্প্রীতি বাড়েনি।

পূজা উপলক্ষে আমাদের নিউইয়র্কের গোপাল স্যানাল হঠাৎ একদিন দেশে চলে গেলেন। আর কি শুধু দেশে যাওয়া, গিয়ে বিয়েও করে ফেললেন। ফেইসবুকের কল্যানে আমরা নব-দম্পতির ছবি দেখলাম। মন্তব্যে লিখলাম, 'গোপাল, এই ছিলো মনে'!.গোপাল উত্তর দিলো, দাদা, মানব-বন্ধনে আর একজন বাড়লো! গণজাগরণ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি, অর্থাৎ প্রগতিশীল আন্দোলনে নিউইয়র্কে গোপাল একজন অগ্রণী সৈনিক, প্রতিটি মানববন্ধনে তিনি সামনের সারিতে, বৌ-এলে হয়তো তাকেও পাওয়া যাবে? শুক্রবার ষষ্ঠীর দিন গোপাল পাবনার সব দোকানপাট বন্ধ দেখে রেগে পোস্টিং দিয়ে বলেছে, পূজার কেনাকাটা ছিলো, শুক্রবারের উছিলায় সব বন্ধ! সাথে যোগ করেছেন, 'এভাবে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নহে'।

তবে নারায়ণগঞ্জে দেখলাম দুই পূজা কমিটির সভাপতি মুসলমান। অনেকের মতে এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত। হয়তো তাই। নিতাইগঞ্জ প্রজন্ম প্রত্যাশা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি মাসুদুর রহমান মাসুদ বলেছেন, ছেলেবেলা থেকে আমরা বড় হয়েছি ঈদ ও পূজার আনন্দ ভাগাভাগি করে; আমাদের কাছে, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। আবার পুলিশ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, নামাজ ও আযানের সময় বাদ্যযন্ত্র বাঁজানো চলবেনা। এটি শুনতে বেখাপ্পা লাগছে। এমনিতে বাংলাদেশে হিন্দুরা আপনা থেকেই ওটি করে থাকে, তবে সেটা হয়তো ভয় থেকে, শ্রদ্ধার বিষয়টি সর্বদাই পারস্পরিক। বাংলাদেশে ৫৭ ধারা বা ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি কিন্তু এখন পর্যন্ত বড়ই একপেশে! মুর্ক্তি ভাঙ্গলে কারো অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে বলে আমরা এখনো শুনিনি!

ছাগশিশু ও বাঘের গল্পটা সবার মনে আছে নিশ্চয়! ছাগলের বাচ্চাটি যুক্তি দিয়ে প্রমান করেছিলো যে সে জলঘোলা করেনি। বাঘ কিন্তু সেই যুক্তি শুনেনি, বরং ঘাড় মটকাবার আগে বলেছিলো, 'তুই না করিস তোর বাপ্ করেছিলো'। ক'দিন আগে সিলেটে মসজিদ থেকে মাইকে আহবান জানিয়ে ইস্কন মন্দিরে হামলা করা হয়েছিলো। বলা হয়েছিল, আযানের সময় মন্দির থেকে মাইকে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ডিস্টার্ব করা হয়েছে! তদন্তে পরে দেখা যায়, ইস্কনে কোন মাইকই ছিলোনা। তবু হামলা হয়েছে। ফেইসবুকে ধর্ম অবমাননার অজুহাতে রামু, নন্দীরহাট, সাতক্ষীরা বা অন্যত্র হামলার অনেকগুলো ঘটনার কথা মানুষ জানে। হামলার জন্যে অজুহাত সৃষ্টিতে কি খুব বেশি সময়ের দরকার? জঙ্গলের রাজত্বে যুক্তি অচল, শক্তি সচল। সরকার সন্ত্রাস দমনে 'জিরো টলারেন্স' দেখালেও সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন।

পূজার আনন্দের মধ্যেও এবার মানুষের বারবার খাদিজার কথা মনে আসবে। তার বাবার আকুতির কথাও ভুলবার নয়। প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রশ্ন করেছেন, কেউ মেয়েটিকে বাঁচাতে এগিয়ে এলোনা? সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভার্সিটির এমএসএস ছাত্রী বীথি দেবনাথের ঘটনাটিও বেদনা দায়ক। বীথি তার থিসিস পেপারে, 'অল ক্রেডিট গোঁজ টু আল্লাহ' না লিখে লিখেছিলো 'অল ক্রেডিট গোঁজ টু গড'। এই অপরাধে বিথীকে কতই না যন্ত্রনা সইতে হলো? বীথি কি বিচার পেয়েছে? এ ধরণের ছোট ছোট ঘটনা পরে মহীরুহ হয়ে বিষবাষ্প ছড়ায় বটে! আবার ছাত্রলীগ নেতা সত্যজিৎ মুখার্জী জেলে কেন কেউ কি তা জানতে চেয়েছে? এরআগে তার মুক্তিযোদ্ধা বাবাও অযথা জেল খেটেছে। অন্যদিকে, অধ্যাপক-সাহিত্যিক রতনতনু ঘোষের মরদেহ বাংলা একাডেমীর নজরুল মঞ্চে তুলতে দেননি এক কর্মকর্তা। কারণ, তিনি বিশিষ্ট লেখক নন! আচ্ছা, বিশিষ্ট লেখকের সংজ্ঞা কি?

এবার দেশে টিভিগুলো বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে পূজার শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। বিশেষ প্রোগামও আছে। মিডিয়া এজন্যে ধন্যবাদ পেতেই পারেন। তবে দুর্গাপূজা উপলক্ষে তিনদিন ছুটির দাবিটি কিন্তু মিডিয়ায় তেমন আমল পায়নি। পূজা উপলক্ষে কতটি মুর্ক্তি ভাঙা হয়েছে তা কি কখনো আসে? ফেইসবুকে প্রশ্ন এসেছে, দেশে হিন্দুরা ভালো আছে, এটা প্রমানের জন্যেই কি এত আয়োজন? এমনিতে প্রিন্ট মিডিয়ায় সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রচুর খবর আসে, টিভি পিছিয়ে। শান্তিপূর্ণভাবে পূজা করতে পুলিশ প্রহরা লাগে কেন, এ প্রশ্ন কি কেউ তুলেছেন? বাংলাদেশের মিডিয়া এখনো যে পরিমান স্বাধীনতা ভোগ করছেন, তাতে তারা দেশকে একটি প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারেন। ধর্ম যারযার, উৎসব সবার, ঠিক তেমনি ধর্ম যারযার, রাষ্ট্র সবার। সবাইকে শারদ শুভেচ্ছা।

শিতাংশু গুহ, কলাম লেখক।
৭ অক্টবর ২০১৬। নিউইয়র্ক।


একইদেশে মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাপরাধী কিভাবে? = সিরাজী এম আর মোস্তাক

শনিবার, ০৮ অক্টোবর ২০১৬

তেলে-জলে মেশে না কোনো কালে,
আলো-আধাঁর সদা বিপরীতে চলে।
শত্রু-মিত্র রহে না একই আবাসে,
তবে মুক্তিযোদ্ধা-যুদ্ধাপরাধী কেমনে বাংলাদেশে?  
১৯৭১ সালে রক্তাক্ত যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। যুদ্ধকালে বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ লাখ লাখ বাঙ্গালি জিম্মি ও কারাবরণ করেছে। প্রায় এক কোটি বাঙ্গালি ভারতে শরণার্থী হয়ে মানবেতর দিন কাটিয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে লাখ লাখ বাঙ্গালি ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এছাড়া কোটি কোটি নাগরিক জীবন-ঝুঁকি নিয়ে দেশেই অবস্থান করেছে। তারা ছলে-বলে-কৌশলে পাকবাহিনীর সাথে থেকেছে আবার মুক্তির জন্য সর্বাত্মক সংগ্রামও করেছে। তারাই ত্রিশ লাখ শহীদ হয়েছে ও দ্ইু লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে। এভাবে দেশের প্রতিটি নাগরিক স্বাধীনতাযুদ্ধে সর্বাত্মক ভূমিকা পালন করেছে। তারা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। ঘাতক পাকবাহিনীই সকল হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। তারাই যুদ্ধাপরাধী। এদেশের যুদ্ধাক্রান্ত নাগরিক কেউ যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধী নয়। অতএব, বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাপরাধী উভয় নয়; শুধু মুক্তিযোদ্ধা প্রজম্ম বিদ্যমান।
আবু জাফর শামসুদ্দিনের ‘কলিমুদ্দি দফাদার’ গল্পটি একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। লেখক এতে যুদ্ধকালে কলিমুদ্দি দফাদারের কর্মকান্ড ফুটে তুলেছেন। কলিমুদ্দি দফাদার পাক হানাদার বাহিনীর সাথে থাকলেও তার ভূমিকা একজন খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে অনেক প্রাজ্জ্বল। কলিমুদ্দি দফাদারের মতো বাংলাদেশের কেউ যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধী নয়। মাননীয় দেশনেত্রী শেখ হাসিনা, তার স্বামী জনাব ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব এবং বঙ্গবন্ধুর স্বনামধন্য পিতা-মাতাও যুদ্ধকালে দেশেই ছিলেন। এজন্য তারা কখনো যুদ্ধাপরাধী নয়। কলিমুদ্দি দফাদারের মতো তারাও মুক্তিযোদ্ধা। এমনিভাবে বাংলাদেশের ষোল কোটি নাগরিক কেউ যুদ্ধাপরাধী নয়, সবাই মুক্তিযোদ্ধা প্রজম্ম।

alt
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু মাত্র ৬৭৬ জন যোদ্ধাকে বিশেষ খেতাব দেন। এছাড়া অবশিষ্ট সবাইকে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেন। তিনি নিজেও একজন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা বা বন্দী যোদ্ধা পরিচয় দেন। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানী ও জাতীয় চার নেতাও একইভাবে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দেন। এ মহান শিক্ষা অনুসারে, উক্ত ৬৭৬ জন খেতাবধারী যোদ্ধা ছাড়াও দেশের সবাই মুক্তিযোদ্ধা, কেউ যুদ্ধাপরাধী নয়। বড়জোর বিশ্বাসঘাতক বা নেমকহারাম মীরজাফরের প্রজম্ম হতে পারে। যারা স্বার্থের জন্য শত লান্থণা ও পরাধীনতাও মেনে নিতে পারে। বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর স্বার্থের জন্য নবাব সিরাজুদ্দৌলার বিরূদ্ধে ষঢ়যন্ত্র করেছিল এবং বাংলা-বিহার-উড়িশ্যার স্বাধীনতা ইংরেজদের হাতে তুলে দিয়েছিল। আজ শত বছর পরও পৃথিবীতে মীরজাফর একজন বিশ্বাসঘাতক বা নেমকহারাম হিসেবে ধিকৃত; তবে যুদ্ধাপরাধী নয়। এ হিসেবে বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাপরাধী নয় বরং মুক্তিযোদ্ধা ও বিশ্বাসঘাতক প্রজন্ম বিদ্যমান।
পৃথিবীর সর্বোচ্চ আদালত তথা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১৯৭১ এর যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে। তাতে পাকিস্তানীদের পরিবর্তে শুধু বাংলাদেশীরা যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত হয়েছে। বেশ কয়েকজনের ফাঁসি ও যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। এখন পৃথিবীর সবাই জানে, বাংলাদেশীরাই আসল যুদ্ধাপরাধী; পাকিস্তানিরা নয়। বাংলাদেশী যুদ্ধাপরাধীরাই সকল হত্যা ও নারী ধর্ষণ করেছে। অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধী দেলোওয়ার হোসেন সাঈদীরাই ত্রিশ লাখ হত্যা ও দুই লাখ নারী ধর্ষণ করেছে, পাকিস্তানিরা নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাই প্রমাণ হয়েছে। এতে বাংলাদেশের ষোল কোটি নাগরিক শুধু মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম নয়, যুদ্ধাপরাধী প্রজন্মও সাব্যস্ত হয়েছে। আর পাকিস্তানীরা নিরপরাধ ও বীর জাতি সাব্যস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রচলিত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ও কোটাতেও তাই প্রমাণ হয়েছে। এ তালিকায় বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানীসহ ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা নারীর নাম নেই। তারা কেউ মুক্তিযোদ্ধা নয়। শুধু তালিকাভুক্ত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধাই দেশ স্বাধীন করেছেন। রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধা শুধু তাদেরই জন্য। অন্য কেউ স্বাধীনতাযুদ্ধে অবদান রাখেননি। বঙ্গবন্ধুসহ তালিকা বহির্ভূত সবাই অমুক্তিযোদ্ধা বা যুদ্ধাপরাধী। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ও তাই। বাংলাদেশের ষোল কোটি নাগরিক থেকে মাত্র দুই লাখ পরিবার ছাড়া বাকী সবাই অমুক্তিযোদ্ধা বা যুদ্ধাপরাধী প্রজন্ম।
অতএব বাংলাদেশীরা মুক্তিযোদ্ধা-যুদ্ধাপরাধী উভয় প্রজম্ম কিনা, তা স্পষ্ট করা উচিত। বাংলাদেশীরা মুক্তিযোদ্ধা হলে, মাত্র দুই লাখ তালিকা বা কোটা কেন? বাংলাদেশীরা যুদ্ধাপরাধী হলে, পাকিস্তানীদের পরিচয় কি? আন্তর্জাতিক আদালতের রায় সঠিক না বেঠিক? এসব প্রশ্নের উত্তরও অন্য প্রশ্নে, তাহলো- একইদেশে মুক্তিযোদ্ধা  ও যুদ্ধাপরাধী কিভাবে?
এ্যাডভোকেট, ঢাকা।


নয়ন তারা ফুল

শনিবার, ০৮ অক্টোবর ২০১৬

লেখা ও ছবি: মোহাম্মদ নূর আলম গন্ধী : নয়ন তারা গুল্ম জাতীয় বহুবর্ষজীবি চীর সবুজ ফুল গাছ। পরিবার-Apocynaceae,উদ্ভিদতাত্বিক নাম-Vinca rosea| দেশের প্রায় সকল স্থানে এ ফুল গাছ চোখে পড়ে এবং সকল মানুষের কাছে জনপ্রিয় ফুল নয়ন তারা। গাছের পাতা উজ্জ্বল সুবজ, নরম, মধ্য শিরা স্পষ্ট, গাছের উচ্চতা গড়ে ২-৩ ফুট হয়ে থাকে। আমাদের দেশের কোন কোন অঞ্চলে নয়ন তারা ফুল পয়সা ফুল নামেও পরিচিত।

alt

বিভিন্ন রঙের ও প্রজাতির নয়ন তারা ফুল রয়েছে, যথা:-সাদা, লাল, গোলাপী, নীল, ও মিস্ত্র গোলাপী পাপড়ি যুক্ত।শাখা-প্রশাখার অগ্রভাগে অসংখ্য ফুল ফুটে। ফুল গন্ধহীন,পাপড়ি পাঁচটি,ফুলের পাপড়ির কেন্দ্রবিন্দুতে বৃত্তাকার রঙে বিস্তৃত থাকে।  প্রায় সারা বছর  ধরে ফুল ফুটতে দেখা যায়, তবে বসন্ত, গ্রীষ্ম ও শরৎ ঋতুতে গাছে বেশী পরিমণে ফুল ফুটে। সরাসরি মাটি ও টবে এ ফুল গাছ রোপণ করা যায়। পানি নিকাশের সুবিধাযুক্ত রৌদ্রউজ্জল উঁচু ভূমি ও দোআঁশ থেকে বেলে দোআঁশ মাটি নয়ন তারা ফুল উৎপাদনে সবচেয়ে উপযোগী।বাড়ীর বারান্দার সামনের অংশে,ছাদের বাগানে, পারিবারিক বাগান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাগানে এ ফুল গাছ উৎপাদন চোখে পড়ে । ফুল শেষে গাছে বীজ হয়, বীজ হতে বংশ বিস্তার করা যায়। বাগানের শোভা বর্ধনে নয়ন তারা ফুল অতুলনীয়।নয়ন তারার ভেষজ গুণাগুণ রয়েছে।


ছাত্রলীগের অস্বীকার প্রবণতা একটি রোগ, সমাধান নয় = প্রভাষ আমিন

বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০১৬

অনেকেই পুরো ভিডিওটি দেখতে পারেননি। এই নির্মমতা দেখার মত মানসিক শক্তি সবার থাকে না। পেশাগত কারণে আমাকে দেখতে হয়েছে, একবার নয় বারবার দেখতে হয়েছে। ভিডিওটি দেখতে দেখতে আমি একধরনের মানসিক বৈকল্যে আক্রান্ত হয়েছি। যত দেখি, বৈকল্য তত বাড়ে। সাথে যুক্ত হয় গ্লানি- পুরুষ হিসেবে শক্তি প্রদর্শনের গ্লানি, মানুষ হিসেবে অক্ষমতার গ্লানি। একটি মেয়েকে রাস্তায় ফেলে কোপানো হচ্ছে, এই দৃশ্যটি যতটা বেদনার; কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসছে না, এই দৃশ্যটি তারচেয়েও বেশি কষ্টের-গ্লানির।

যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে, তাতে আশপাশে অনেক মানুষের উপস্থিতি স্পষ্ট। কয়েকজনকে দেখা যায়, অনেকের চিৎকার শোনা যায়। কেউ কেউ ‘ও মাই গড, ও মাই গড’ চিৎকার করছিলেন। কিন্তু কেউ মেয়েটিকে বাঁচাতে এগিয়ে যায়নি। ঘটনাটি ঘটেছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে। দর্শকরা সবাই কলেজের শিক্ষার্থী। তারা যদি এগিয়ে না যায়, তবে কারা যাবে?

শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরাই আক্রমণকারী পশুটিকে ধরে গণধোলাই দিয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সিলেট মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজা আক্তিার নার্গিস এখন ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। জটিল অপারেশন শেষে নার্গিস এখন ৭২ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে। ডাক্তাররাই বলে দিয়েছেন, তার বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে অনেকে অনেক বিপ্লবী মন্তব্য করছেন। এই করা উচিত ছিল, সেই করা উচিত ছিল। হয়তো কাল যারা দর্শক ছিল, তারাও অনেক বড় বড় কথা বলছেন। এই ‘হেন করেঙ্গা, তেন করেঙ্গা’য় আমরা অনেক এক্সপার্ট। নিরাপদ দূরত্বে বসে, বাসার আয়েশে বসে ফেসবুকে বিপ্লব করতে অনেক পারি। কিন্তু ঘটনাস্থলে আমরা নিরাপদ দূরে থাকতেই ভালোবাসি।যারা ফেসবুকে বিপ্লব করছি, ঘটনাস্থলে থাকলে, তারা কী করতাম? আমার অনেক সন্দেহ আছে। কারণ একই রকমের ঘটনা আমরা অনেক দেখেছি। পুরান ঢাকায় ছাত্রলীগের হামলায় দর্জি কর্মী বিশ্বজিতের নির্মমহত্যার ঘটনা নিশ্চয়ই আপনারা কেউ ভুলে যাননি। সবাই দূর থেকে জুম করে ছবি তুলতে পারি।

পত্রিকায় পড়েছি, হামলাকারী বদরুল আলম আক্রান্ত খাদিজা বেগম নার্গিসের বাসায় লজিং থাকতো। তার সাথে নাকি ছয় বছরের প্রেমের সম্পর্কও ছিল। নার্গিস ইদানিং আর বদরুলকে পাত্তা দিচ্ছিল না। তাই ক্ষোভ থেকে বদরুল হামলা চালিয়েছে। আমার ভাবতে অবিশ্বাস্য মনে হয়, যাকে ভালোবাসা যায়, তাকে কিভাবে এমন নৃশংসভাবে হামলা করা যায়, মেরে ফেলার চেষ্টা করা যায়? এ কেমন ভালোবাসা? বদরুলের এত সাহস কোত্থেকে এলো, কোত্থেকে?

প্রথমত সে একজন পুরুষ। সব পুরুষই নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে। কোনো নারী তাকে উপেক্ষা করবে, এটা কোনো পুরুষই মানতে পারে না। তবে বদরুলের সাহসের মূল উৎস ছাত্রলীগ। বদরুল সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক। আমার ধারণা এই দাপটই তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে এমন নির্মমতায় উদ্বুদ্ধ করেছে।

 

নার্গিসকে দেখতে স্কয়ার হাসপাতালে ছুটে গেছেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইন। দেখে আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম। যাক ছাত্রলীগ নেতারা আহত এক ছাত্রীর পাশে দাঁড়াতে ছুটে গেছে। কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি সাংবাদিকদের কাছে যে দাবি করেন, তা আমাদের সকল আশায় জল ঢেলে দেয়। না, ছাত্রলীগ বদলায়নি।

জাকির হোসাইন জানিয়ে দেন, বদরুল ছাত্রলীগের কেউ নয়। তার যুক্তি হলো, বদরুল সুনামগঞ্জের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করে। আর ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিয়মিত ছাত্ররাই কেবল ছাত্রলীগ করতে পারে। কেউ কোনো পেশায় জড়ালে তাৎক্ষণিকভাবে তার পদ চলে যায়। কিন্তু ছাত্রলীগ সাধারন সম্পাদকের এই দাবি ধোপে টেকে না।

কারণ বদরুল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের নিয়মিত ছাত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক। এই পশুটি যেই কমিটির সহ-সম্পাদক, সেই কমিটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অনুমোদন করেছে গত ৮ মে। মাত্র পাঁচ মাস আগে করা কমিটির একজন  সহ-সম্পাদক এরই মধ্যে শিক্ষকতা করে সংগঠনের পদ হারালেন! এই দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয়।

বদরুলের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি বদরুল তার এলাকার একটি স্কুলে পার্টটাইম শিক্ষকতা করতো এবং সেটা ২০১৪ সাল থেকেই। তার মানে শিক্ষকতা শুরুর দুই বছর পর তাকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক করা হয়েছে। তাহলে এতদিন সেটা নেতাদের নজরে পড়েনি কেন? নার্গিসের ওপর হামলার আগে তো তাকে বহিস্কারও করা হয়নি। তাই ঘটনা ঘটার পর এখন বদরুলকে অস্বীকার করলেও সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না।

আর এই বদরুল গত ঈদুল আযহায়ও নিজেকে ছাত্রলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। তার ঈদ শুভেচ্ছায় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারন সম্পাকের ছবিও আছে। সেই কার্ডে সে নিজেকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ‘সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি’ বলে দাবি করেছে। এই দাবিকে ভিত্তিহীন দাবি করে ছাত্রলীগ নেতা কর্মীরা বলছেন, এই নামে ছাত্রলীগে কোনো পদ নেই। তাই সে ছাত্রলীগের কেউ নয়।

কমিটিতে মুহাম্মদ বদরুল আলমের পদের নাম ‘সহ-সম্পাদক’। আর সহ-সম্পাদকদের তালিকায় তার নাম এক নম্বরে। তাই সে নিজের পদকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে ‘সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি’। এটা তার অজ্ঞতা হতে পারে। কিন্তু এই অজুহাতে, সে ছাত্রলীগ নয়, এই দাবি করে পার পাওয়া যাবে না। তারপরও আমি যদি ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদকের দাবি মেনে নেই, তাহলেও সে সদ্য সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। তার মানে এখনও সে ছাত্রলীগের আদর্শ ধারণ করে। তাই তার অপরাধের দায় অস্বীকার করার সুযোগ ছাত্রলীগের নেই।

অস্বীকার প্রবণতা অবশ্য ছাত্রলীগের অনেক পুরোনো রোগ। যখনই কোনো কিছু ঘটে, প্রথম কাজ হলো অস্বীকার করা। তাও না পারলে নামকাওয়াস্তে বহিস্কার করা। কিন্তু অতীতে দেখা গেছে, কাগজে-কলমে বহিস্কার করা হলেও অপরাধীরা ছাত্রলীগের ছায়াতলেই থাকে। এটা ঠিক, বদরুল যা করেছে, তার সাথে সাংগঠনিকভাবে ছাত্রলীগের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা একান্তই তার ব্যক্তিগত সমস্যা।

সারাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর নাম আছে। তাদের সবাইকে মনিটর করা ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষে সম্ভব নয়, সেটা আশা করাটাও ভুল। তাই সারা দেশের সব নেতা-কর্মীর অপকর্মের দায় ছাত্রলীগকেই নিতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। তবে অস্বীকার করে পার পাওয়া যাবে না। সাহসের সাথে দায় স্বীকার করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে ছাত্রলীগের নেতৃত্বকে আরেকটা বিষয় গভীরভাবে ভাবতে হবে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নিজেদের এমন সর্ব ক্ষমতাময় মনে করে কেন? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে সেটা সমাধান করলেই, সমস্যা মিটবে। নইলে কদিন পরপরই ছাত্রলীগ নেতৃত্বকে এমন অস্বীকার করতে হবে। কিন্তু ছাত্রলীগ নেতাদের এই অস্বীকার রোগ মানুষের মধ্যে কোনো সহানুভূতি জাগায় না, বরং তাদের হাস্যকর করে তোলে।

ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা যেন নিজেদের দেশের মালিক মনে না করে, সেটা আগে নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মনোজগতে পরিবর্তন আনতে হবে। অনেকে বলছেন, বদরুলকে আটক করে যারা গণধোলাই দিয়েছে, তারাও এমসি কলেজের ছাত্রলীগের কর্মী। বিলম্বে হলেও যারা বদরুলকে আটক করেছে সেই ছাত্রলীগ কর্মীদের জন্য অভিনন্দন। আর ছাত্রলীগ নেতা বদরুলের জন্য ঘৃণা। তার কঠিন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এখন গণদাবি।

কয়েকদিন আগে খোদ রাজধানীতে এক বখাটের হামলায় প্রাণ গেছে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ছাত্রী রাইসার। রাইসা বা নার্গিসের মত অমন নির্মমতার শিকার হয়তো সবাই হন না, তবে বাংলাদেশে নারীরা মোটেই নিরাপদ নয়। পদে পদে, পথে পথে প্রতিদিন তাদের নানা নির্মমতার শিকার হতে হয়, হেনস্থার শিকার হতে হয়। কাউকে হয়তো শিষ শুনতে হয়, কাউকে অশ্লীল বাক্য শুনতে হয়, কারো ওড়না ধরে টান দেয় কোনো বখাটে, বাসে ফিরতে নারীরা প্রতিদিন কত অশ্লীলতার শিকার হয়, তার খবর আমরা ক’জন রাখি। কখনো দৃষ্টিতে অশ্লীলতা, কখনো শারীরিক আক্রমন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা নিরবে সয়ে যান। বাসায় ফিরে মুখ লুকিয়ে কাঁদেন। দিন এসেছে প্রতিবাদ জানানোর, রুখে দাড়ানোর।

নার্গিসের মাথার একটি ছবি আমি দেখেছি। সেই ছবিটি কোনোদিন কাউকে দেখাতে পারবো না। দেখেই বোঝা যায়, মেয়েটির বাঁচার সম্ভাবনা সত্যি ক্ষীণ। তবুও তো বিশ্বে অনেক মিরাকল ঘটে। গোটা জাতির প্রার্থনায় আবার ফুটুক আমাদের প্রিয় বোন নার্গিস।

০৫ অক্টোর, ২০১৬

প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
এই ইমেইল ঠিকানা স্পামবট থেকে রক্ষা করা হচ্ছে।এটি দেখতে হলে আপনাকে JavaScript সক্রিয় করতে হবে।  


দ্বিতীয় বিতর্কের আগে হিলারির কোর্টে বল ও আলেপ্পো মোমেন্ট = আব্দুল মালেক

মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০১৬

মার্কিন নির্বাচনী প্রথম দফা তর্কযুদ্ধ সমাপনীর পর ময়দানে এখন রণংদেহী মূর্তিমান প্রার্থী দুজন পুনঃ পুনঃ হুঙ্কার ছাড়ছেন দ্বিতীয় বিতর্ককে সামনে রেখে। সেই সঙ্গে আবার চলছে নানা রকম ‘ইট পাটকেল’ ছোড়াছুড়ির পালা। ট্রাম্প বলা শুরু করেছেন হিলারি তার স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত নন। আর হিলারি বলছেন, মহিলা ও ল্যাটিনোদের প্রতি ডোনাল্ডের অশ্রদ্ধাটি প্রকট হয় যখন প্রাক্তন মিস ইউনিভার্সকে অভিহিত করেন ‘মিস পিগি’ ‘মিস হাউস কিপিং’ হিসেবে। প্রথম বিতর্ক ডোনাল্ড এবং হিলারি উভয়েই লড়বেন সমান তালে। শুরুর প্রাক্কালে এমন ধারণা কারও কারও ছিল বৈকি! কিন্তু সেই সময়টিতে হাস্য মুখ পরিহাস তরল হিলারির বিপরীতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাম্পের গোমড়া মুখের উপমা যেন ছিল সুকুমার রায়ের ‘বোম্বাদড়ের রাজা’র!
গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া ও ডেমোক্র্যাট দল থেকে বলা হয়েছে, ক্লিনটনই বিতর্কে বিজয়ী আর ট্রাম্প তো মুখবাজিতে কখনও হারবার পাত্রই নন! তার দাবি বিতর্কের মডারেটর লেস্টার হল্ট তাকে ঘায়েল করার জন্য ডোনাল্ডের ট্যাক্স রিটার্ন, ওবামার জন্মস্থানের মতো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন রেখেছেন অথচ পররাষ্ট্র মন্ত্রিত্বকালে হিলারি পার্সোনাল সার্ভার সেটআপ করে কেন ৩৩ হাজার ই-মেইল মুছে দিলেন সে বিষয়ে ছিলেন নীরব। তাছাড়া কেনইবা তাকে এক ত্রুটিযুক্ত মাইক্রোফোন দেয়া হয়েছিল?
হিলারির বিতর্ক জয়ের পর ডেমোক্র্যাটদের ধারণা হয়েছিল আনডিসাইডেড ভোটারদের একটা বড় অংশ দাঁড়িয়েছে তার পক্ষে। কিন্তু বিতর্ক সমাপনের পর পাওয়া প্রথম সমীক্ষাগুলোর ফলে তাদের সে প্রত্যাশা ততটা পূরণ হয়নি। গত পয়লা অক্টোবর প্রকাশিত ফক্স নিউজের সমীক্ষায় হিলারি ৪৩% ও ট্রাম্প ৪০%। এলএ টাইমস/ইউএস ট্রাকিং ট্রাম্প ৪৭% ও ক্লিনটন ৪২% পয়েন্টস। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হবে সাধারণত সিদ্ধান্তহীন ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভোটারগণ এ ব্যাপারে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ান। এবার মনে হচ্ছে বিজয়ী বা পরাভূত কোন প্রার্থীই এদের মন বদলাতে তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। কারণ বেকারত্বের হার হ্রাসে, কর্মসংস্থান ও সন্ত্রাসবাদ দমনের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন পরিকল্পনা দিতে পারেননি উভয়েই।
বিতর্কে জয়ী হয়েছেন বলে ডোনাল্ড যতই বাগাড়ম্বর করুন না কেন তিনি যে সেখানে পরাজয় বরণ করেছেন সে কথা বিলক্ষণ জানেন নিজেও। এবার তাই তার শিবিরে চলছে বিতর্কপূর্ব সাজ সাজ রব। এ জন্য অনেক আগে থেকেই হিলারির অনুকরণে হোম ওয়ার্ক শুরু করেছেন তিনি। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রেসিডেন্ট ওবামাও গত ’১২ সালে প্রথম নির্বাচনী ডিবেটে রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় ও তৃতীয়টিতে তিনি হয়েছিলেন বিজয়ী। তার পরেও যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়া হিলারির মতো অভিজ্ঞ প্রতিপক্ষকে স্টেজে মেরে দিয়ে বাজিমাত করা সম্ভব নয় এটাই প্রথম বিতর্ক থেকে ডোনাল্ডের শিক্ষা। নিউ জার্সির গবর্নর ক্রিস কৃষ্টি যিনি এবারের রিপাবলিকান দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন তার কাছ থেকেই শুরু করলেন ছবক নেয়া।
সেন্ট লুইসে অবস্থিত ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে ৯ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আমেরিকার প্রাক-প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দ্বিতীয় বিতর্ক অনুষ্ঠান। টাউন হল স্টাইলের এই ডিবেটে উপস্থিত থাকবেন গ্যালোপ অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে নির্বাচিত কোন দলের কাছে দায়বদ্ধ নয় এমন একটি ভোটার দল। সেখানে প্রার্থীদের অর্ধেক প্রশ্ন করবেন মডারেটর ও বাকি অর্ধেক প্রশ্ন থাকবে উপস্থিত ও অনলাইনের ভোটারগণ। এবারের মডারেটর হিসেবে থাকছেন এবিসি নিউজের সিনিয়র সাংবাদিক মার্থা রডরিগেজ।
প্রেসিডেন্ট ওবামা ও ফার্স্ট লেডি মিশেল, ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সসহ সম্পূর্ণ ডেমোক্র্যাটিক স্টাবি শমেন্ট হিলারির পক্ষে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা চষে বেড়াচ্ছেন রাজ্যে রাজ্যে। পক্ষান্তরে প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ডের পাশে নেই রিপাবলিকান পার্টির বড় অংশটি। এমনকি সাবেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জে. কলিন পাওল ও মিট রমনীর মতো দলের শীর্ষ স্থানীয়রা প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন তারা তাদের দলীয় প্রার্থীকে ভোট দেবেন না।
এবারের নির্বাচনে ডোনাল্ডের ট্যাক্স রিটার্ন প্রকাশ না করার মতো স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে হিলারি বারবার উচ্চকিত হয়েছেন। হিলারির স্বপক্ষে দ্বিতীয় বিতর্কের আগেভাগে নিউইয়র্ক টাইমস ফাটিয়ে দিল যেন একটি বম্বশেল- বিলিওনিয়র ট্রাম্প সাহেব ১৯৯৫ সালে ৯১৬ মিলিয়ন ডলার লোকসান দেখিয়ে আইনগতভাবে ফেডারেল ট্যাক্স অব্যাহতি নিয়েছেন। যেটি চলতে পারে ১৮ বছর পর্যন্ত। তাহলে কি বলতে হবে বিতর্কের বল এখন হিলারির কোর্টেই?
অবশ্য এ প্রসঙ্গে ট্রাম্পের অন্যতম উপদেষ্টা নিউইয়র্কের সাবেক মেয়র জুলিয়ানি মিডিয়াকে বলেছেন তার এই কর্মকা- একজন জিনিয়াস স্মার্ট বিজনেসম্যানের মতোই। কারণ আইনগত প্রয়োজনের অতিরিক্ত কর পরিশোধ না করে তিনি তার ব্যবসা, পরিবার ও কর্মচারীদের প্রতিপালন করেছেন বিশেষ দায়িত্বে। এ ব্যাপারে নিউইয়র্ক টাইমসকে ট্রাম্প শিবির অভিহিত করেছে হিলারি, ডেমোক্র্যাটিক দল ও তাদের বিশেষ স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে। কিন্তু এমন সাফাই মানুষের কাছে গ্রহণীয় হবে বলে মনে হয় না। কারণ আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে গ্রহণ করা এমন সুবিধা ওয়ার্কিং ক্লাসের মানুষ প্রতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই দেখবে।
থার্ড পার্টি সংবাদ ও আলেপ্পো মোমেন্ট
কমিশন অন প্রেসিডেনসিয়াল ডিবেট (সিপিডি) কোন তৃতীয় পক্ষীয় প্রার্থীকে বিতর্ক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায়নি। এবারে দুজন থার্ড পার্টি ক্যান্ডিডেটের উভয়েই পড়ে গিয়েছিলেন এমন অনাহূত ক্যাটাগরিতে। এ বিষয়ে একটি বিবৃতিতে কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল লিবারটারিয়ান নমিনি গ্যারি জনসন এবং গ্রীন পার্টির নমিনি জিল স্টেইন দুজনেই পোল রেজাল্টে রয়েছেন হতশ্রী চেহারা নিয়ে। ডিবেটে যাওয়ার জন্য যেখানে প্রয়োজন ১৫% সেখানে তাদের অবস্থান হলো জনসন ৮.৪% এবং স্টেইন ৩.২%। কিন্তু বিতর্কে ডাক না পেয়ে মিডিয়ায় এ নিয়ে ক্ষোভের অন্ত নেই দুই প্রতিযোগীর। তারা প্রতিবাদী হয়ে বলে চলছেন সিপিডি হলো ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান পার্টির আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান।
সে যাই হোক সংবাদ মাধ্যমে এখন ভেসে বেড়াচ্ছে একজন থার্ড পার্টি প্রার্থী যিনি দু’দুবারের প্রাক্তন নিউ মেক্সিকো স্টেটের গবর্নর ও বর্তমানে গাঁজা কোম্পানির সিইও সেই গ্যারি জনসনকে নিয়ে ভাসছে ‘গ্যারি জনসন’স ‘আলেপ্পো মোমেন্টস’ রঙ্গরস। ‘সেই মোমেন্টসটা এসেছিল যখন কিছুদিন পূর্বে এমএসএনবিসির ‘মর্নিং জো’র প্যানেলিস্ট মাইক বার্নিকল কর্তৃক যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ান নগর আলেপ্পো সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করা হলো ‘প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে আলেপ্পো নিয়ে তার কী ভাবনা?’ ইন্টারেস্টিংভাবে হতবাক হতে দেখা গিয়েছিল রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী গ্যারিকে। কারণ জীবনে আলেপ্পো নগরের নামটি পর্যন্ত শোনেননি তিনি!
এরপর পুনরায় এমএসএনবিসি টাউন হলের সাম্প্রতিক আর এক অনুষ্ঠানে হোস্ট ক্রিস ম্যাথুস গ্যারির কাছে জানতে চাইলেন ‘এই বিশ্বের বর্তমান নেতাদের মধ্যে তার কাছে পছন্দনীয় ব্যক্তি কে? তখন ঘটল আরও মজার ব্যাপার। এর জবাবটিও দিতে না পেরে বিব্রত প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী আমতা আমতা করে বলে উঠলেন ‘আই গেজ আই এ্যাম হ্যাভিং এ আলেপ্পো মোমেন্ট!’
লেখক : আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।


তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা: ইতিহাসের পুনর্পাঠ = সাঈদ ইফতেখার আহমেদ

মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০১৬

প্রাকৃতজন অধ্যয়ন শাস্ত্রের (Subaltern Studies) জনক রণজিৎ গুহ ঔপনিবেশিক সূত্রে প্রাপ্ত এলিটবাদের প্রভাব মুক্ত হয়ে নিম্নবর্গের অবস্থান হতে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস পুনর্পাঠের চেষ্টা করেছেন। রণজিৎ গুহের ইতিহাসের পুনঃঅনুসন্ধান ইতিহাসের কোনো নির্মোহ পাঠ নয়, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ, বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রেক্ষাপট হতে ঐতিহাসিক ঘটনাবলি বোঝার প্রচেষ্টা। ফলে, এলিট-কেন্দ্রিক ভারতীয় ইতিহাসের যে ব্যাখ্যা তাঁর থেকে প্রাকৃতজন অধ্যয়ন শাস্ত্রের অনুসারী ইতিহাসবিদদের ঐতিহাসিক ঘটনাবলির ব্যাখ্য়ায় রয়েছে বড় দাগে প্রভেদ।

শারমিন আহমেদ তাঁর ‘তাজউদ্দীন আহমেদ নেতা ও পিতা’ গ্রন্থে রণজিৎ গুহ বা প্রাকৃতজন অধ্যয়ন শাস্ত্রের অনুসারী ইতিহাসবিদদের মতো নিম্নবর্গের অবস্থান হতে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ না করলেও, পূর্বোক্ত ইতিহাসবিদদের মতোই ইতিহাসের ভিন্ন ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করেছেন। শারমিন প্রতিষ্ঠিত, প্রচলিত ইতিহাসের পুনঃঅধ্যায়ন করলেও তিনি নির্মোহ হতে পারেননি এক জায়গায়; সেটা হল, তাঁর বাবা তাজউদ্দীন আহমেদের ক্ষেত্রে। সেটার প্রয়োজনও নেই অবশ্য, কারণ ইতিহাসের পাঠ কখনোই সম্পূর্ণ নির্মোহভাবে সম্ভব নয়।

Bangabandhu+Tajuddin আমরা সবাই কোনো না কোনো প্রিজম বা বীক্ষণ-যন্ত্রের সাহায্যে ইতিহাস পাঠ করি। শারমিন বাংলাদেশের অভ্যুয়কালীন এবং অভ্যুদয়-পরবর্তী একটি কালপর্বকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাঁর পিতা তাজউদ্দীন আহমেদ যে বীক্ষণ-যন্ত্রের আলোকে সে সময়কার ইতিহাস দেখেছেন, সেই আলোকে। কৈশোরের চপলতার সাথে প্রাপ্তবয়সের প্রাজ্ঞতার অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়ে তুলে নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়।

লেখক হিসেবে শারমিনের কৃতিত্ব এখানেই যে, তিনি শুধু ওখানেই আবদ্ধ না থেকে তৎকালীন ইতিহাস বোঝার চেষ্টা করেছেন ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেও। আর এ ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ হতে তিনি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই ব্যক্তিত্বের আন্তঃসম্পর্ক; দেশ, জাতি, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাঁদের ভাবনা-চিন্তা এবং তাঁদের বৈপরীত্য। এটা করতে গিয়ে তিনি ইতিহাসের কিছু রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করিয়েছেন; এ বাস্তবতার পুনর্মূল্যায়ণ, পুনঃঅধ্যয়ন জাতি হিসেবে আমাদের সমৃদ্ধ করবে বলেই আমার মনে হয়েছে। যে দুজন ব্যক্তিত্বের আন্তঃসম্পর্ক শারমিনের গ্রন্থের মূল উপজীব্য তাঁর একজন হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আরেকজন তাজউদ্দীন আহমদ।

বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদের মধ্যে সম্পর্ক আধুনিক মানব ইতিহাসের দুজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের জনক কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের মতো হতে পারত। এঙ্গেলস নিজে একজন বড় মাপের চিন্তাবিদ হওয়া সত্ত্বেও সমস্ত ব্যাপারেই মার্ক্সকে গুরু মেনেছেন, ফলে মার্ক্সের কোনো চিন্তাধারার সাথেই তিনি দ্বিমত করেননি এবং তাঁদের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কে কখনোই চিড় ধরেনি।

এঙ্গেলসের মতো তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুকে সব ব্যাপারে নেতা মানলেও এবং মুসলিম লীগের রাজনীতি দিয়ে দুজনের রাজনৈতিক জীবন শুরু হলেও রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে এ দুজন ব্যক্তিত্ব প্রভাবিত হয়েছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী রাজনৈতিক চিন্তাধারা দ্বারা। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রভাবে বঙ্গবন্ধু শুরু থেকেই ছিলেন পাশ্চাত্যের উদারনৈতিক গণতন্ত্র এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতির সমর্থক। অন্যদিকে, তাজউদ্দীন আহমেদ প্রভাবিত হয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক চিন্তা চেতনার দ্বারা।

অবশ্য মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারাতে পরিবর্তন ঘটে এবং তাজউদ্দীনের মতো তিনিও পুঁজিবাদী অর্থনীতির পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক ধারায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করেন।

শুরু থেকে এ বিপরীতমুখী চিন্তাধারাই খুব সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধ সংগঠন এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দেশ ও জাতি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁদের চিন্তা ও কর্ম পদ্ধতির মধ্যে ফারাক তৈরি করে। তবে এ ফারাক কখনোই দুজন ব্যক্তিত্বের মাঝে দ্বন্দ্ব তৈরি করেনি। মুজিব এবং তাজউদ্দীনের সম্পর্ককে অনেকটা মহাত্মা গান্ধী এবং জওহরলাল নেহেরুর মাঝে যে সম্পর্ক ছিল, সে রকম বলা যায়।

নেহেরু গান্ধীকে সবসময় তাঁর নেতা এবং গুরু মনে করলেও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং স্বাধীনতা-উত্তর ভারত গড়ে তোলা নিয়ে গান্ধী এবং নেহেরুর চিন্তাধারা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী। এ বৈপরীত্য সত্ত্বেও নেহেরু যেমন গান্ধীর কোনো সিন্ধান্ত চ্যালেঞ্জ না করে বিনাবাক্যে মেনে নিয়েছেন, তাজউদ্দীনও তেমনি বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলেও মেনে নিয়েছেন এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি সবসময় অনুগত থেকেছেন।

bangabandhu111
নিজের জীবন বিপন্ন হতে পারে জেনেও আত্মগোপনে না গিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা করা জাতির নেতা হিসেবে শ্রেয় মনে করেছেন। বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে দুর্বল বা ভীরু হিসেবে প্রমাণ করতে চাননি

দুজনের চিন্তাধারার বৈপরীত্যের বড় আকারে প্রথম প্রকাশ দেখা যায় স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দানের বিষয়টি নিয়ে। শারমিন দাবি করেছেন, তাজউদ্দীন মুজিবের সাথে আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেবেন– এ ব্যাপারে কথা বলেছিলেন এবং মুজিব এতে রাজি হয়েছিলেন। তিনি মুক্তিসংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের উদাহারণ টেনে বঙ্গবন্ধুকে আত্মগোপনে গিয়ে নেতৃত্ব দিতে বলেছিলেন। বস্তুত এ জায়গাটিতে বঙ্গবন্ধুর সাথে তাজউদ্দিনের চিন্তাধারার মৌলিক তফাত ধরা পড়ে।

বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিত্বের কারণে বাম রাজনীতিকদের মতো আত্মগোপনে যাওয়ার রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। আত্মগোপন বা আন্ডারগ্রাউন্ডে যাওয়ার বিষয়টিকে তিনি কাপুরুষোচিত বিষয় মনে করতেন। ফলে, পাকিস্তান আমলে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে তিনি কখনও আত্মগোপনে না গিয়ে বরং জেলে গিয়েছেন, আদালতের মুখোমুখি হয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বিদেশে থেকেও আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। অপরদিকে, বাম চিন্তাধারায় প্রভাবিত তাজউদ্দীন আহমেদ মনে করেছেন, বঙ্গবন্ধুর উচিত লেনিন, মাও বা ফিদেল কাস্ত্রোর মতো আত্মগোপন বা ভিন্ন দেশে গিয়ে মুক্তিসংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া।

১৯৭১ সালে মুজিব পরিণত হয়েছিলেন বাঙালির জাতিসত্তার প্রতীক হিসেবে। জাতি হিসেবে বাঙালির মান, সম্মান, সাহসিকতা সবকিছুর মূর্ত প্রতীক তখন বঙ্গবন্ধু। তাই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ প্রবল পরাক্রমশালী পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন নিরস্ত্র, ঘুমন্ত বাঙালির ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে মুহূর্তে তিনি নিজের জীবন বিপন্ন হতে পারে জেনেও আত্মগোপনে না গিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা করা জাতির নেতা হিসেবে শ্রেয় মনে করেছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সামনে তিনি বাঙালি জাতিকে দুর্বল বা ভীরু হিসেবে প্রমাণ করতে চাননি। তিনি ভেবেছিলেন ওই মুহূর্তে আত্মগোপনের সিদ্ধান্ত পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কাছে বাঙালি জাতির ভীরুতার প্রতীক হিসেবে প্রতীয়মান হবে। তাই তিনি সারা জীবন যে কাজটি করেননি অর্থাৎ, আত্মগোপনে না যাওয়া– সে সিদ্ধান্তেই অটল থাকেন।

তবে বঙ্গবন্ধুর আত্মগোপনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক বলে প্রতীয়মান হয় না। তিনি যে অনেক ভেবেচিন্তে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন– সেটি বোঝা যায় শহীদ প্রকৌশলী এ. কে. এম. নুরুল হককে ২৫ মার্চের আগে ট্রান্সমিটার জোগাড় করতে বলা, যে ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা প্রেরণ করেন। অর্থাৎ, জাতি যে সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের দিকে এগোচ্ছে– এ বিষয়ে তিনি পুরোপুরি সচেতন ছিলেন। এবং এ মুক্তিসংগ্রামে তিনি কী ভূমিকা পালন করবেন– সে ব্যাপারেও মনঃস্থির করে রেখেছিলেন।

ইতিহাস প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধুর এ ভূমিকা সঠিক ছিল; বাংলার মুক্তিসংগ্রামীদের কাছে তখন ‘বাঙলা মা’ এবং বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করা সমার্থক হয়ে উঠেছিল। আর এ মুক্ত করার লড়াই যাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল, তিনি হলেন তাজউদ্দীন।

জাতির সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন এবং এ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসের যুগ-সন্ধিক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তাজউদ্দীন। বস্তুত, ২৫ মার্চ পরবর্তী সময়ে জাতীয়, আন্তর্জাতিক নানা ষড়যন্ত্র, সংকট মোকাবিলা করে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করা এবং সফলভাবে এর নেতৃত্ব দেওয়ার দুরূহ কাজটি অত্যন্ত সফলতার সাথে তাজউদ্দীন পরিচালনা করতে পেরেছিলেন বলেই বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করতে পেরেছিল।

শারমিন আহমদ অবশ্য শুধুমাত্র তাজউদ্দীন আহমদের এ গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকেই মুক্তিযুদ্ধের মূল নিয়ামক হিসাবে দেখতে চান। অপরদিকে, বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী হওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর কাছে ‘চরম নেতিবাচক’ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দী হওয়ার সিদ্ধান্ত এবং একইসাথে শেখ মণি, সিরাজুল আলম খান প্রমুখের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’ (বিএলএফ) গঠন করা, যেটি সাধারণের মাঝে ‘মুজিব বাহিনী’ নামে পরিচিত ছিল, দুটোকে একসাথে মিলিয়ে ব্যরিস্টার আমিরুল ইসলামকে উদ্ধৃত (পৃষ্ঠা ১৪৯ এবং ১৫১) করে শারমিন বঙ্গবন্ধু ‘স্বাধীনতার জন্য নেগশিয়েটেড সেটেলমেন্ট’ চেয়েছিলেন– এ রকম একটা অণুসিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। এটা আমার কাছে মুজিব সম্পর্কে অতীব সরলীকৃত বিশ্লেষণ মনে হয়েছে।

শারমিন আহমদের লেখা থেকেই জানা যায়, মুজিব ষাটের দশকের শুরু থেকেই কীভাবে দেশকে স্বাধীন করা যায়– এ নিয়ে চিন্তাভাবনা এবং কাজ শুরু করেছিলেন। ফলে তিনি ‘নেগশিয়েটেড সেটেলমেন্ট’এ যাবেন– এটা একধরনের স্ববিরোধী যুক্তি হয়ে যায়। আর বঙ্গবন্ধু যখন তাঁর কোনো সহচরকে এ ব্যাপারে কিছু বলেননি বা ইঙ্গিত করেননি, বরং উল্টো নূরুল হকের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন, সেখানে শুধুমাত্র ধারণার (Speculation) উপর ভিত্তি করে মুজিব সম্পর্কে এ ধরনের সিদ্ধান্ত জামায়াত, মুসলিম লীগসহ যে সমস্ত দল স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, মুজিবকে তাঁরা যেভাবে মূল্যায়ন করে, সে মূল্যায়নকেই শক্তিশালী করবে।

১৯৭১ সালে যারা বিএলএফ গঠন করেছিলেন তাঁদের কেউ কেউ যেমন সিরাজুল আলম খান স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরোধিতায় নেমেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হঠাৎ করে কেন বিএলএফ গঠন করা হল, তার লক্ষ্য, উদেশ্য কী ছিল– ইতিহাসের এ বিষয়টা এখন পর্যন্ত ততটা পরিষ্কার নয় নির্ভরযোগ্য গবেষণার অভাবে। তবে উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন শুধু বিএলএফই নয়, ভারত এবং বাংলাদেশে মুজিবনগর সরকারের বাইরে আরও অনেক বাহিনী গঠিত হয়েছিল, যাদের কেউ কেউ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করলেও তারা একইসাথে মুজিবনগর সরকারের অধীন মুক্তিবাহীনির সাথেও লড়াই করেছিল। বিশেষত, সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন সর্বহারা এবং ‘চীনপন্থী’ বিভিন্ন বাম দল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ গ্রুপগুলো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত প্রথম সরকার অস্থিতিশীল করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে দেশ এবং জাতি গঠন বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে তাজউদ্দীনের চিন্তাধারার তফাৎ আরও প্রকটভাবে ধরা পড়ে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ তাজউদ্দীন দেশ প্রশ্নে এগোতে চাইলেন ‘প্র্যাগমেটিক অ্যাপ্রোচ’ থেকে।

অপরদিকে বঙ্গবন্ধুর কাছে বাঙালি মানে তখন ক্ষুদিরাম, সূর্যসেনদের মতো নিবেদিত প্রাণ বাঙালি; কিন্তু এ বাঙালি যে একইসাথে আবার মীর জাফর, গোলাম আজম– এ বিষয়টাকে তিনি আমলে নিলেন না। ফলে, খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে তাঁর দলের দক্ষিণপন্থী যে অংশটি যারা ১৯৭১ সালে গোপনে পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন করতে চেয়েছিল এবং যুদ্ধকালীন নানাভাবে তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধাচারণ করে আসছিল তাঁদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে বুঝতে পারলেন না। আর এ বুঝতে না পারা ফল হচ্ছে তাজউদ্দিনসহ বাংলাদেশ প্রশ্নে নিবেদিত প্রাণ কিছু ব্যক্তিকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়া।

আওয়ামী লীগের দক্ষিণপন্থী অংশটিসহ স্বাধীনতাবিরোধী দল ও ব্যক্তিসমূহের কাছে উদারনৈতিক চরিত্রের অধিকারী বঙ্গবন্ধুর চেয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া, প্রাগম্যাটিক অ্যাপ্রোচের তাজউদ্দীন অনেক ভীতির কারণ ছিলেন, যিনি শুরু থেকেই পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীসহ সকল যুদ্ধপরাধীর বিচার প্রশ্নে ছিলেন অনমনীয়। বস্তুত, যুদ্ধপরাধীদের বিচার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর সাথে তাজউদ্দীনের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

শারমিন আহমদ উল্লেখ করেছেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে জাতীয়ভাবে ও সংসদীয় সিদ্ধান্তের মধ্যে না গিয়ে একক সিদ্ধান্তে ও আকস্মিকভাবে যুদ্ধপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত রাজাকার, আল বদরদের ক্ষমা করে দেন। এর ফলে ১৯৭২ সালের দালাল আদেশে অভিযুক্ত ২৬ হাজার আসামি মুক্তিলাভ করে।

Taj-2
বাম চিন্তাধারায় প্রভাবিত তাজউদ্দীন আহমেদ মনে করেছেন, বঙ্গবন্ধুর উচিত লেনিন, মাও বা ফিদেল কাস্ত্রোর মতো আত্মগোপন বা ভিন্ন দেশে গিয়ে মুক্তিসংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া

শারমিন লিখেছেন–

“সুনির্দিষ্ট বড় অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সাধারণ ক্ষমা প্রদান করা হয়নি বলা হলেও দেখা যায় যে অনেক বড় অপরাধী ও খুনি এই সাধারণ ক্ষমার বদৌলতে মুক্তি লাভ করে।” (পৃষ্ঠা ১৭৬)

উদাহারণ হিসেবে তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবি-সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সারের অপহরণকারী ও তাঁর হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত দশ বছর সাজাপ্রাপ্ত, আল বদরের সদস্য খালেক মজুমদার এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী ও চিকিৎসক ডা. আলীম চৌধুরীর হত্যার সাথে জড়িত মওলানা আব্দুল মান্নানের কথা উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া আরও উল্লেখযোগ্য যারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হন তারা হলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ক্যাবিনেটের প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান, গভর্নর মালিক এবং তার ক্যাবিনেটের মন্ত্রী মওলানা মোহাম্মদ ইসহাক প্রমুখ।

অপরদিকে শারমিন আহমদের মতে, তাজউদ্দীন দালাল আদেশে আটক সকলের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরেই যাদের বিরুদ্ধে বড় অপরাধ প্রমাণিত হয়নি তাঁদের বিবেচনা সাপেক্ষে ক্ষমা করার পক্ষপাতী ছিলেন। বিচার-বিহীন ক্ষমা করার ফলে কারা সত্যিকার অপরাধী আর কারা নির্দোষ– এ বিষয়টি বোঝার অবকাশ রইল না বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

বাঙালি যুদ্ধপরাধীদের পাশাপাশি ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য প্রণীত হয়েছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট’। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, যাদের সংখ্যা নানা আন্তর্জাতিক চাপের কারণে ১৫০০ হতে কমিয়ে ১৯৫ জনে স্থির করা হয়েছিল, এদের বিচারের প্রশ্নে তাজউদ্দীন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই অনমনীয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন এই ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীকে ভারত থেকে ঢাকায় ফিরিয়ে এনে বিচার করা হবে বলে ঘোষণা দেন।

৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দীর বিচার যুদ্ধবিধস্ত বাংলাদেশে করা সম্ভব না হলেও, ওই ১৯৫ জনকেও বিচার না করে বঙ্গবন্ধু তাদের ক্ষমা করে দেন বলে শারমিন উল্লেখ করেছেন। জে. এন. দীক্ষিতের ‘Liberation and Beyond: Indo-Bangladesh Relations’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছেন–

“এমনকি এই স্বল্পসংখ্যক যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সরকার সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ কিংবা মামলার নথিপত্র প্রস্তুতির ব্যাপারে তেমন তৎপর ছিল না।” (পৃষ্ঠা ১৭৯)

শারমিন আহমদ বাংলাদেশের ইতিহাসে দালালদের এবং পাকিস্তানের ১৯৫ জন সেনাসদস্যের বিচার করতে না পারার ব্যর্থতা মারাত্মক ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর আরেকটি বড় রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত ছিল ‘বাকশাল’ গঠনের মাধ্যমে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম। শুধুমাত্র দলের সাথে যুক্ত থাকার জন্য বাকশালের সাধারণ সদস্য হলেও, বাকশাল প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর সাথে তাজউদ্দীন শুধু পুরোপুরি দ্বিমত পোষণই করেননি, বরং অত্যন্ত কঠিন ভাষায় এর সমালোচনা করেছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেন–

“যে গণতন্ত্রের গুণগান করেছি আমরা সবসময়, আজকে আপনি একটি কলমের খোঁচায় সেই গণতন্ত্রকে শেষ করে দিয়ে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা করতে যাছেন।…বাই টেকিং দিস স্টেপ ইউ আর ক্লোজিং অল দ্য ডোরস টু রিমুভ ইউ পিসফুলি ফ্রম ইউর পজিশন।” (পৃষ্ঠা ১৯২)

দল হিসেবে আজকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা হল, গণতন্ত্রের জন্য আজীবন লড়াইকারী বঙ্গবন্ধু কেন বাকশাল গঠনের সিধান্ত নিলেন– সে প্রশ্নের মুখোমুখি না হওয়া। ভারত কখনোই বাকশাল গঠন ভালো চোখে দেখেনি। একদলীয় শাসন কায়েমের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে কোনো চাপ ছিল– এ ধরনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। আর বঙ্গবন্ধু সারা জীবন বহু আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করেই রাজনীতি করেছেন। ন্যাপ এবং সিপিবির মতো দুর্বল দলের কাঁধে বাকশাল গঠনের সিধান্তের দায় চাপিয়ে এর সঠিক কারণ জানা যাবে না।

বঙ্গবন্ধু হয়তো মহৎ উদ্দেশ্য এবং অনেক বড় স্বপ্ন নিয়ে বাকশাল গঠন করেছিলেন, কিন্তু ঔপনিবেশিকত্তোর দেশসমূহের জাতি গঠনের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি যে, এ ধরনের উদ্যোগ আখেরে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারেনি।

শারমিন আহমদ যথার্থই বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে ট্রাজিক অধ্যায় হচ্ছে বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীনের মধ্যে বিচ্ছেদ। বস্তুত এ বিচ্ছেদের ফল হচ্ছে ১৯৭৫ পরবর্তী সময় থেকে দীর্ঘ ২১ বছর বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের ভাবধারা থেকে দেশকে বিচ্ছিন্ন করে পাকিস্তানি ভাবধারায় দেশকে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা।

মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত স্বাধীন হলেও, আজকের যে ভারত, সেখানে গান্ধীর স্বপ্নের কোনো প্রতিফলন নেই, বরং এটি গড়ে উঠেছে নেহেরুর স্বপ্ন কেন্দ্র করে। আজকের যে আধুনিক চীন, সেটি কিন্তু মাওয়ের চীন নয়, এটি হল দেং শিয়াও পিংয়ের চীন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ‘the irony of history’ হল, আজকের বাংলাদেশ কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ নয়। এটি তাজউদ্দীন আহমেদ বাংলাদেশকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সে স্বপ্নেরই প্রতিফলন হল আজকের বাংলাদেশ।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনার বিচার নিয়ে চিন্তাভাবনা, বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবার সার্ক সম্মেলনে পাকিস্তান না যাওয়ার সিদ্ধান্ত, এবং এর পাশাপাশি বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চার মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টা– এসব পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে শেখ হাসিনা এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগ মূলত তাজউদ্দীনের চিন্তাধারার আলোকেই বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।


অদ্ভুত জঙ্গি আতঙ্কে বাংলাদেশ = সিরাজী এম আর মোস্তাক

সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০১৬

জঙ্গি কি অদ্ভুত হয়? বাংলাদেশে তাই হয়েছে। দেশের সর্বত্র জঙ্গি বিরোধী কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। যেন জঙ্গি এক মহামারি। ভারত উপ-মহাদেশের কয়েকটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর কোথাও জঙ্গি নেই। সবাই চেনে টেরোরিষ্ট, তালেবান, আলকায়েদা, আই এস, মিলিট্যান্ট ইত্যাদি। ‘জঙ্গি’ ফারসি শব্দ। মানে যোদ্ধা। যিনি জঙ্গে লড়াই করেন, তিনি জঙ্গি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে এদেশ ছিল জঙ্গ বা যুদ্ধক্ষেত্র। পাক হানাদার বাহিনী এদেশের সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালিকে জঙ্গি নাম দিয়েছিল। তারা সবাইকে জঙ্গি হিসেবে সন্দেহ করতো। তা থেকে কৃষক, শ্রমিক এমনকি নারীদেরও রেহাই ছিলনা। হানাদাররা নির্মমভাবে ত্রিশ লাখ জঙ্গি হত্যা ও দুই লাখ নারীর সম্ভ্রম কেড়েছিল। বর্তমানে প্রচলিত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ও কোটায় উক্ত ত্রিশ লাখ জঙ্গি শহীদেরা নেই। তারা মুক্তিযোদ্ধা নয়। তারা ছিল অদ্ভুত জঙ্গি। স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশত বছর পর বাংলাদেশে আবারো জঙ্গি হত্যা শুরু হয়েছে। এরা কেমন অদ্ভুত জঙ্গি, আসুন দেখা যাক।
এটি লেখার সময় ঘটল অদ্ভুত জঙ্গি ঘটনা। দৈনিক যুগান্তর ই-পত্রিকার উদ্ধৃতি দ্রষ্টব্য- “সাভার মডেল থানার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মাহাবুবুর রহমান বলেন, শুক্রবার গভীর রাতে যুবদল নেতা শাহা আলম নয়নকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নিজ বাসা থেকে আটক করে সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এস, আই) তম্ময় ও আহসান। পরে শনিবার ভোর রাতে সাভারের বিরুলিয়ায় কৃষিবিদ নার্সারির পাশে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে আহত হন তিনি। পরে পুলিশ তাকে আশংকাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করলে কর্তব্যরত পুলিশ তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে একটি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।” (দৈনিক যুগান্তর ই-পত্রিকা. তারিখ-০১/১০/২০১৬ইং)।
উল্লেখিত ঘটনায় স্পষ্ট হয় যে, পুলিশ আটক শাহা আলম নয়নকে নিয়ে অভিযানে গিয়ে একটি বন্দুকযুদ্ধ মোকাবেলা করেন। যাদের সাথে পুলিশের গোলাগুলি হয়, তাদের কেউই আহত, নিহত বা আটক হয়নি। উল্টো পুলিশের নিরাপত্তায় থাকা ব্যক্তিটি প্রাণ হারিয়েছে। এতে প্রমাণ হয় যে, দেশে অনেক শক্তিশালী জঙ্গি আছে। তারা পুলিশকে হটিয়ে নিরাপত্তায় থাকা ব্যক্তিকে হত্যা করতে পারে। মাদারিপুরে নিহত জঙ্গি ফাহিম ঠিক এভাবেই রিমান্ডে ও হাতকড়া পরা অবস্থায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারায়। পুলিশ বাহিনী প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী জঙ্গিগোষ্ঠির সাথে বন্দুকযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন আর একে একে অসংখ্য অসহায় বন্দি নাগরিকের প্রাণ হারাচ্ছেন। যেমন, দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় “আইন ও সালিশ কেন্দ্রের” প্রতিবেদনে উল্লেখ হয়েছে যে, মাত্র নয় মাসে হেফাজতে ও ক্রসফায়ারে নিহত ১৫০ জন। (দৈনিক প্রথম আলো, তারিখ-০১/১০/২০১৬ ইং, পৃষ্ঠা-৪)। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে অবশ্যই এর দায় বহন করতে হবে।

alt

গত ১ জুলাই, ২০১৬ তারিখে গুলশান হলি আর্টিজান রেস্তোরায় একইরকম জঙ্গি হামলা হয়েছিল। তাতে দুজন পুলিশ কর্মকর্তাসহ আটাশজন নিহত ও অর্ধশত আহত হয়েছিল। নিহতদের বেশিরভাগ ছিল বিদেশি নাগরিক। তাই বিষয়টি বিশ্বব্যাপী প্রচার হয়েছিল। মাত্র ৬/৮ জঙ্গির কাছে দেশের লক্ষাধিক প্রশাসন লান্থিত হয়েছিল। ঘটনা ছিল এরকম- জঙ্গিরা আক্রমণের পরপরই পুলিশ পাল্টা অভিযান চালায়। জঙ্গিদের আক্রমণে পুলিশবাহিনী হতাহতের শিকার হয় ও পিছু হটে। পরে পুলিশ ও বিজিবি সমন্বয়ে শক্ত পাহাড়া গড়ে তোলে। তারা মিডিয়া কর্মীদেরকে তথ্য সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা দেয়। তারপর সম্মিলিত সামরিক অভিযানের লক্ষ্যে সকাল পর্যন্ত বিরতি ঘোষণা করে। এসময় হোটেলের ভেতরে জঙ্গিরাও অদ্ভুত নিরবতা দেখায়। তারা নিরবে বিশজনকে কুপিয়ে হত্যা করে। অবশেষে জঙ্গিরা রক্তসিক্ত মারণাস্ত্র হাতে হোটেলের রক্তাক্ত মেঝেতে লাশের বিদঘুটে গন্ধেই নিস্তব্ধ রাত কাটায়। পরদিন সকাল ৭.৪০-এ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ড’ শুরু হলে, আবারো প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ব্যাপক গোলাগুলি শেষে তারা সেনাবাহিনীর হাতে প্রাণ হারায়। সফল অপারেশন শেষে সেনাবাহিনী ছাব্বিশটি লাশ উদ্ধার করে। প্রশ্ন হচ্ছে, কথিত সম্ভ্রান্ত ঘরের জঙ্গিরা দীর্ঘ আটঘন্টা মারণাস্ত্র নিয়ে বিদঘুটে পরিবেশে চুপটি মেরে থাকলো কি করে? জঙ্গিদের এমন অদ্ভুত আচরন কিভাবে সম্ভব?
পরদিন জঙ্গিদের ছবি প্রকাশ হয়। উল্লেখ হয় যে, তারা মাদ্রাসা-মক্তব বা ইসলাম পড়–য়া নয়। তারা ইংরেজি মিডিয়াতে পড়–য়া, সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান। তারা বহু আগেই পরিবার থেকে নির্খোজ ছিল। অর্থাৎ তারা কি নিহত শাহা আলম নয়নের মতো আগেই আটক হয়েছিল? উক্ত ঘটনার পর দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। সবাই জঙ্গি বিরোধী সমাবেশে যোগ দেয়। এমনকি বিএনপি-জামাতও জঙ্গিবিরোধী বুলি আওড়ায়। ফলাফল শুন্যই থেকে যায়। এখনও দেশের কেউ নিরাপদ নয়। আসলে এগুলো জঙ্গিবাদ নয়, অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি করাই এর লক্ষ্য। এজন্য দরকার-
৭১ এর লাখো শহীদের পরিবার,
গর্জে ওঠো আরেক বার।
এদেশ নয় কারো পিতার,
ষোল কোটি বাংলাদেশী সবার।
তবেই ভয়-আতঙ্ক জঙ্গিবাদ,
হবেই হবে নিপাত।
এ্যাডভোকেট, ঢাকা।


অযান্ত্রিক গ্রাম: অ্যামিশ ভিলেজ

রবিবার, ০২ অক্টোবর ২০১৬

আশরাফুন নাহার লিউজা, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক থেকে : রাস্তার পাশে একটা গির্জা। দৃষ্টিনন্দন। সামনের মাঠে ছোট্ট একটা গ্রাম্য মেলা বসেছে। এ ধরণের মেলাকে এখানে বলা হয় ‘ইয়ার্ড সেল’।মাঠের এক পাশে সাবেকি ধরণের কয়েকটি ঘোড়ার গাড়ি রাখা। পাশেই বেধে রাখা বেশ কয়েকটি তাগড়া বলশালি ঘোড়া। দেখে, অপর্ণা প্রায় চিৎকার করে উঠলো, ‘মা মা ঘোড়া’।

গাড়ির গতি কমে গেল। এক পর্যায়ে গাড়িটা থামিয়েই ফেললেন শরীফ ভাই। এরপর মাঠের দিকে গাড়ির মাথাটা ঢুকিয়ে দিলেন। সুবিধাজনক জায়গায় পার্কও করা হলো। বললেন, ‘নেমে পড়ো, চলো ঘোড়া দেখি’। খুশিতে হাতে তালি দিয়ে উঠলো অপর্ণা। মাঠে নানা ধরণের কুটির শিল্প ও হস্তশিল্পের পসরা সাজিয়ে বসেছে এক দল মানুষ। কেউ কেউ নিয়ে এসেছেন, নিজের ক্ষেতে ফলানো সবজি ও ফলমূল। তাদের পোশাক দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে, অ্যামিশ ভিলেজে ঢুকে পড়েছি আমরা। সেখান থেকে অপর্ণা হাতে তৈরি সুন্দর একটি খেলনা কিনে নিল। এরপর আবারো আমাদের যাত্রা, গ্রামের ভেতরের দিকে।

alt 

চারিদিকে যেন সুন্দরের মেলা বসেছে। সবুজ আর সবুজ। ছেলেবেলায় বিটিভির সাদাকালো যুগে দেখা কোন হলিউড মুভির দৃশ্য যেন। কেবল তাতে রঙ লেগেছে, এই যা। পিচঢালা মসৃণ রাস্তা। আর তার দু’পাশে মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ন ফসলের ক্ষেত। ভুট্টা, আলু আরও কত কি! চোখে পড়ছে দিগন্তবিস্তৃত গরুর খামার।

কোথাও কোথাও চোখে পড়ছে, ঘোড়া দিয়ে চাষের ক্ষেত তৈরি করা হচ্ছে। ঘোড়াচালিত গাড়ি বা ওয়াগন চলে যাচ্ছে। দেখে মন জুড়িয়ে গেল। কোথাও কোন প্রযুক্তির ব্যবহার নেই। অথচ এটি পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দেশ যুক্তরাষ্ট্রের একটি গ্রাম। অ্যামিশ ভিলেজ।

alt

যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগে থেকেই মনের ভেতরে গভীর আগ্রহ নিয়ে, অপেক্ষায় ছিলাম, অ্যামিশ ভিলেজে যাবো। আমার মনের ভেতরে যেমন পৃথিবী লালন করি, মনে হতো এই গ্রাম যেন তেমনি। এবার সত্যি হলো, বহুদিনের স্বপ্ন। সঙ্গে স্বামী সাংবাদিক শামীম আল আমিন, মেয়ে অপর্ণা আর শরীফ ভাই।

গাড়ি এগিয়ে চলেছে, গ্রামের ভেতরের দিকে। এই পথে গাড়িটাকেই বড্ড বেমানান লাগছে। কিছুই করার নেই, যেতে হবে, তাই যাওয়া। চলেছি আমরা যন্ত্রচালিত যানে, যন্ত্রহীন গ্রামে।

দুই.

আমরা যেখানে পৌঁছলাম, সেখানে কয়েকটি দিকে সাদা জমিনে কালোতে লেখা রয়েছে, ‘দ্য আমিশ ভিলেজ’। এখানে একটি বড় বাড়িতে, অ্যামিশদের জীবনযাত্রা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা রয়েছে। টিকেট কেটে ভেতরে ঢুকতে হয়। একজন গাইড ভেতরে নিয়ে গিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখায়। সেই সাথে অ্যামিশদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়।। আমরা টিকেট কেটে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। বিশ বাইশ বছরের এক সুন্দরী তরুণী আমাদের গাইড। সে আমাদেরকে জানাচ্ছে অ্যামিশদের সম্পর্কে। 

অ্যামিশরা মোটর যানের বদলে, ঘোড়ার গাড়িতে চলাচল করে। বিদ্যুৎ ব্যবহার করেনা। নিজেদের কাপড় নিজেরাই তৈরি করে। অ্যামিশ মেয়েরা এক রঙা পোশাক পরে। পোশাকেও ঐতিহ্যবাহী স্বকীয় ভাব বজায় রাখা হয়। পা পর্যন্ত ঝুলের ম্যাক্সি ধরণের লম্বা হাতার জামা, তার ওপর অ্যাপ্রোন দেওয়া। ছেলেদের পোশাকে সাদা, কালো, ব্রাউন এই তিনটি মাত্র রং থাকে।

আমরা ঘুরে ঘুরে দেখছি। প্রথমে দেখানো হলো অ্যামিশদের বাড়ির ভেতরটা কেমন হয়। আমাদের গাইড ঘুরে ঘুরে অ্যামিশদের সম্পর্কে নানা তথ্য জানাচ্ছে। তারা রাতে এখনও সেই মোমের বা তেলের বাতি জ্বালায়। শীতের সময় কেবল কাঠের চুল্লি দিয়ে ঘর গরম করে।

নিজেদের মধ্যে বিশেষ মৌসুমে বিয়ে করে অ্যামিশরা। সেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা নিজেদের ঐতিহ্য মেনে দীর্ঘসময় ধরে চলে। বিবাহিত পুরুষ বোঝানোর জন্যে বিয়ের পর দাড়ি রাখে তারা। এখনকার যুগেও প্রতি ঘরে অনেক বেশি সংখ্যক সন্তান। সন্তানের জন্মও হয় বাড়িতে।

বাড়ির ভেতরটা দেখা শেষ হতেই চলে এলাম বাইরে। সেখানে অ্যামিশদের জীবনযাত্রার নানা উপকরণ থরে থরে সাজানো রয়েছে। সেখানে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। ঘোড়ার গাড়ি, ঘোড়া, আস্তাবল, হাঁস, মুরগীর খামার, ফসলি জমি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। অ্যামিশদের হাতে তৈরি হস্তশিল্প, জ্যাম, জেলি, পাইয়ের দোকান রয়েছে ভেতরে।

দেখলাম, কিনলাম অনেক কিছু। সাধারণ অর্থে প্রতিটি জিনিসের দাম অনেক বেশি। তবে তৈরি প্রক্রিয়ার কথা ভাবলে বেশি দাম গায়েই লাগবে না। 

অ্যামিশদের সন্তানরা স্কুলে যায়। তবে সেই স্কুলের পাঠ খুব বেশি দূর এগোয় না। একটি মাত্র কক্ষে সেই স্কুলে পড়ানো হয় এইট পর্যন্ত। তারা বিশ্বাস করে জীবন ধারণের জন্যে এটুকু শিক্ষাই যথেষ্ঠ।

alt

যতই দেখছি, অ্যামিশদের জীবন সম্পর্কে আরও জানার তৃষ্ণা বেড়ে যাচ্ছে। এই ইন্টারনেটের যুগে কিভাবে তারা এখনও নিজেদের সেই জীবনধারা ধরে রেখেছে, ভেবে ভেবে অবাকই হলাম। 

তিন.

সবুজ ফসলের ক্ষেতে তখন বিকেল নেমে এসেছে। নরম হতে শুরু করেছে সূর্যের আলো। আমরা গাড়ি নিয়ে দেখতে বের হয়েছি অ্যামিশদের জীবনযাত্রা। দেখলাম অ্যামিশ নারী পুরুষদের অনেকে ফসলের ক্ষেতে কাজ করছেন। অনেকে বের হয়েছে ঘোড়ার গাড়িতে বেড়াতে। চারিদিকে নিস্তব্ধ নিরবতা। হঠাৎ মোটরের শব্দ তুলে গাড়ির চলাচল নিরবতা ভাঙে। তখন সচকিত হয়ে, কিছুটা হয়তো বিরক্ত হয় গ্রামের মানুষ। কিন্তু সেটাও তারা প্রকাশ করে না। তারা অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় এবং ধার্মিক। যতই দেখছি, মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি।

অ্যামিশদের প্রধান পেশা কৃষিকাজ। মাঠে ফসল ফলিয়ে নিজেদের প্রয়োজন মেটায় তারা। অতিরিক্ত ফসল বিক্রি করে সুপার মার্কেটে। অনেক জমিজমা থাকায় বেশিরভাগ অ্যামিশ পরিবার মোটামুটি ধনী বলা চলে। কৃষির পাশাপাশি অনেকের পেশা কাঠমিস্ত্রি। কেউ কামার, কেউ কুমার।

কিন্তু এই অ্যামিশদের পেছনের গল্পটাই বা কি? খুব কৌতুহল হলো জানতে। ইন্টারনেট ঘেটে জানার চেষ্টা করলাম। সবচেয়ে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী জানতে পারলাম, সুইজারল্যান্ডের অ্যানব্যাপটিস্ট গির্জা থেকে অ্যামিশদের আবির্ভাব। তাও সেই অনেক অনেক আগে। ১৬০০ সালের দিকে।

জ্যাকব আম্মান নামে একজন অ্যানব্যাপটিস্ট ছিলেন। তাকে অনেকেই অনুসরণ করতেন। সেই অনুসারীদের নিয়ে তিনি তার গোত্র থেকে আলাদাভাবে থাকতে শুরু করলেন। তারাই অ্যামিশ গোত্র নামে পরিচিতি পায়।

alt

এখন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার বিভিন্ন জায়গায় অ্যামিশদের বসতি রয়েছে। তবে তাদের সবচেয়ে বেশি বসবাস যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ার ল্যাংকেস্টার কাউন্টিতে। এই জায়গাটিই ‘অ্যামিশ ভিলজ’ নামে পরিচিত। বলা হয়ে থাকে, তাদের প্রথম দলটি ল্যাংকেস্টার কাউন্টিতে ১৭৩০ সালের দিকে আসে। পেনসিলভানিয়া ছাড়াও ওহাইও, আইওয়া, ইন্ডিয়ানাতে তাদের বসতি রয়েছে। নিউ ইয়র্কের আপস্টেটের দিকেও তাদের দেখা যায়। তাদের বসবাস রয়েছে কানাডার অন্টারিওতেও।

আধুনিক সভ্যতা টানে না অ্যামিশদের। গোত্রের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে ভালোবাসে তারা। অপরাধ প্রবণতা নেই বললেই চলে। গির্জা ও পারিবারিক সম্পর্ক তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ-বিগ্রহ খুব অপছন্দ। শান্ত প্রকৃতির মাঝে চলে তাদের যাপিত জীবন। প্রতিদিন হাজারো মানুষ আগ্রহ নিয়ে অ্যামিশদের জীবনযাত্রা দেখার জন্যে আসে। তাতে হয়তো অ্যামিশদের স্বাভাবিক নিভৃতচারী জীবনে ছন্দপতন হয়, কিন্তু তাতেও বোধ করি কোন দু:খবোধ নেই তাদের। কোন অভিযোগ নেই। নিজেদের মতো করেই চলছে তাদের জীবন।

লেখক: ইয়োগা আর্টিস্ট, লেখক ও উপস্থাপক।

ছবি কৃতজ্ঞতা: শামীম আল আমিন


আগে স্থানীয় সরকারের প্রকার, স্তর ও গন্তব্য ঠিক করতে হবে; জিয়া’র ‘গ্রাম সরকার’ আর এরশাদ’র ‘উপজেলা’ হচ্ছে মিথ

শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০১৬

বাপসনিউজ (হাকিকুল ইসলাম খোকন): প্রথমে স্থানীয় সরকারের প্রকার, স্তর ও গন্তব্য কেন ঠিক করতে হবে তা জানতে হলে, বুঝতে হলে বিদ্যমান স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও এর অতীত সম্পর্কে ভাল ধারণা থাকতে হবে; অতীতে স্থানীয় সরকার কেন্দ্রীক অবৈধ শাসকদের অসৎ উদ্দেশ্যমূলক গৃহীত কর্মকান্ড, তার ধারাবাহিকতা ও সাংঘাতিক কুফলগুলো কিভাবে রাজনৈতিক দলগুলো, জনগণ, সরকার, এনজিওসহ সমাজের অগ্রসরমান বলে পরিচিত গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে চলেছে তাও ভালভাবে জানতে হবে, বুঝতে হবে। এই লেখাটি ছোট্ট রাখার স্বার্থে কেবল বাংলাদেশ আমলের দুইজন অবৈধ শাসক এর অপকর্মের স্মারক (উপজেলা ও গ্রাম সরকার) এবং এগুলোর কুপ্রভাব কিভাবে গোটা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে সাংঘাতিকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে, করছে তা জানার, বুঝার প্রয়াস নেয়া যেতে পারে। এই প্রয়াসের মধ্য দিয়ে প্রথমে কেন স্থানীয় সরকারের প্রকার, স্তর ও গন্তব্য ঠিক করতে হবে তাও স্পষ্ট হয়ে যাবে বলে আমরা আশা করি। সেই সঙ্গে সামগ্রিকভাবে স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত আরও অনেক অনেক দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা ও এগুলোর উপযুক্ত সমাধান প্রাসঙ্গিকভাবে এই নিবন্ধে উপস্থাপিত, আলোচিত হবার কারণে ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল নাগাদ পরিবর্তনশীল সূচকগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রণীত সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয় (যা এই নিবন্ধের শেষে সংযুক্ত করা হয়েছে) ও সমাধানমূলক অন্যান্য উপায়গুলি জানতে, বুঝতে সহজতর হবে বলে প্রতীয়মান হয়; সেসঙ্গে ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারিতে উপস্থাপিত ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’টির বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা ও এর সুদূরপ্রসারী উপকারীতা অনুধাবন করতে সহায়ক হবে। স্থানীয় সরকারের প্রকার ও এর শেষ গন্তব্য সঠিকভাবে ঠিক হওয়া কেন জরুরী তাও স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে, কেননা তা ঠিক হওয়ার সঙ্গে সঠিকভাবে স্থানীয় সরকারের স্তরগুলো নির্ধারিত হবার বিষয়টি যুক্ত রয়েছে, এবং ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল নাগাদ স্থানীয় সরকারের গন্তব্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, স্থানীয় সরকারের প্রকারভেদকরণ ও স্তরবিন্যাসকরণ কি অবস্থায় গিয়ে পৌঁছাবে সেসব বিষয় পরিষ্কারভাবে জানা যাবে, বোঝা যাবে। এই নিবন্ধে এক সময়ের কৃষিজ সমাজ তথা গ্রামীণ দেশ থেকে বর্তমানকার গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ তথা গ্রামীণ-নগরীয় দেশ এবং গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ থেকে পরিপূর্ণ নগরীয় সমাজ তথা পরিপূর্ণ নগরীয় দেশ তথা পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ মুখী পরিবর্তনসমূহ ও সময়ের সাথে সাথে রূপান্তর প্রক্রিয়াটির চলমান অবস্থা বোঝা যাবে, জানা যাবে; তা জানা-বোঝার সঙ্গে স্থানীয় সরকারের জন্য প্রস্তাবিত প্রকারভেদকরণ ও স্তরন্যিাসকরণ বিষয়দ্বয় ভালভাবে বুঝার-জানার সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে কেন জড়িত রয়েছে তা পরিষ্কার হবে। স্থানীয় সরকারের একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জোর না দিয়ে একেক সময় একেকটি ইউনিট নিয়ে টানাটানি, হইচই করাটা হচ্ছে মূলত অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত কর্মকান্ড; বাজেট বক্তৃতায় অসফল অর্থমন্ত্রি মুহিত সাহেবও তা করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছেন; এই বিষয়টি বৈধ-অবৈধ সব শাসকদের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য; এখানে সেই বিষয়টি তথা দুইজন অবৈধ শাসকের অপকর্মমূলক ঘটনা আলোচনায় এনে তা গভীরভাবে জানার, বোঝার প্রয়াস নেয়া হল।
অবৈধ শাসক এরশাদ প্রবর্তিত উপজেলা হচ্ছে মূলত একটা মিথ, একটা মিথ্যা নোশান এবং এটি বেশ দায়দায়িত্বহীন, স্বশাসনহীন একটি মধ্যবর্তী প্রশাসনিক ইউনিট। উপজেলা নামকরণটিও সার্থক ও যথার্থ নয়; দেশের আইনকানুন ও বইপুস্তকে বর্ণিত এর সংজ্ঞাটিও বাস্তবতার নিরিখে সঠিক নয়। অথচ গোটা জাতি এই মিথ, এই দায়দায়িত্বহীন ইউনিট, এই স্বশাসনহীন মধ্যবর্তী ইউনিট, এই অসার্থক নামকরণ আর ভুল সংজ্ঞার বেড়াজালেই ঘুরপাক খেয়ে চলেছে। এই বিষয়গুলো বিশেষভাবে তলিয়ে দেখলে তা বুঝতে কারো অসুবিধা হবার কথা নয়; কিন্তু তা বুঝতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রীপরিষদ, নিকার, একনেক, পরিকল্পনা কমিশন ও জাতীয় সংসদ’র বেশ অসুবিধা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। অনুরূপভাবে আরেক অবৈধ শাসক জিয়া প্রবর্তিত ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ এবং পরবর্তীতে তা কেন্দ্রীক ‘পল্লী পরিষদ,’ ‘গ্রাম সভা,’ ‘গ্রাম পরিষদ,’  ‘গ্রাম সরকার’ ও ‘ওয়ার্ড সভা’ নিয়ে গোটাদেশ মিথ্যা নোশানের বেড়াজালে ঘুরপাক খেয়েছে, খাচ্ছে; ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রাম কেন্দ্রীক কিংবা প্রতিটি ওয়ার্ড কেন্দ্রীক এসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট নিয়ে এক সময় প্রচুর মাতামাতি, লাফালাফি হয়েছে, হচ্ছে; সবাই ভালভাবে জানে যে, তাতে কাজের কাজ কিছু-ই হয়নি, হচ্ছেনা। দেশের এই দু’জন অবৈধ শাসক (প্রেসিডেন্ট জিয়া ও প্রেসিডেন্ট এরশাদ) এর সাংঘাতিক অপকর্ম আর হিমালয়সম দুর্নীতির স্মারক হিসেবে এই গ্রাম সরকার ও উপজেলাকে নিয়ে গোটা জাতির প্রচুর মাতামাতি ও লাফালাফিটা ইতিহাসের পাতায় জাতিগতভাবে ও সমষ্টিগতভাবে ভুল করার, ভুলের মধ্যে ডুবে থাকার এক মহা জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে থাকবে। এবং এর মাধ্যমে জনগণও যে সমষ্টিগতভাবে ভুল করতে পারে, ভুলের মধ্যে ডুবে থাকতে পারে তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল; জনগণ ভুল করেনা, জনগণ ভুল করতে পারেনা-এই ধরনের আপ্ত বাক্য যারা কথায় কথায় বলে থাকেন তাতে তাদেরও বোধদয় হবে বলে আশা করা যায়।
‘উপজেলা’ কেন একটা মিথ, কেন একটা মিথ্যা নোশান, কেন অন্যতম মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে এটি বেশ দায়দায়িত্বহীন তার কারণগুলি ভালভাবে জানা ও বোঝা খুবই দরকার; পাশাপাশি, আর বিলম্ব না ঘটিয়ে এই মিথ্যা নোশানের বেড়াজাল থেকে গোটাদেশ যেন বের হয়ে আসতে পারে তার জন্য সঠিক করণীয় ঠিক ও তা বাস্তবায়ন করাও খুবই জরুরী কর্তব্য। মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনিক ইউনিটগুলির মধ্যে উপজেলা হচ্ছে অন্যতম মধ্যবর্তী ইউনিট। এর উপরে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট যেমন জেলা ও বিভাগ, এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট যেমন ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড, এবং কোনো কোনো জেলায় এর পাশে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট যেমন “সিটি কর্পোরেশন”। প্রাসঙ্গিকভাবেই “সিটি কর্পোরেশন” শব্দবন্ধটি নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার; অনেকে ভুলবশত “সিটি” শব্দটির বাংলা “মহানগর” বলে থাকেন, লিখে থাকেন; মিডিয়া, রাজনৈতিক দলগুলো, আইনপ্রণেতাগণ ও নীতিপ্রণেতাগণও তাই করেন; মূলত “সিটি” শব্দটির বাংলা হবে “নগর”; আর সবাই  জানে যে, “কর্পোরেশন” শব্দটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ব্যবহার হয়ে থাকে, তাই কর্পোরেশন শব্দটি বললে বা শুনলে মানুষের মনে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কথাই ভেসে ওঠে; মুনাফা, লাভালাভ কেন্দ্রিক কর্মকান্ডের কথা মানসপটে চলে আসে; প্রশ্ন হল স্থানীয় সরকার কি মুনাফামুখী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান? গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় জনাব আবু তালেব কেবল “নগর” আর “নগর সরকার” শব্দবন্ধদ্বয় ব্যবহার করেছেন; সুতরাং, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা অনুযায়ী কল্যাণমূলক, সেবামূলক ও উন্নয়নমূলক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে ভুল নামকরণ আর মুনাফার গন্ধ যুক্ত নামকরণ থেকে অবিলম্বে মুক্ত করতে হবে; আমরা আশা করি এই ধরনের বড় ভুল থেকে সবাই দায় স্বীকার করেই বের হয়ে আসবেন। সে যাই হোক, স্থানীয় ইউনিটগুলির, স্থানীয় সরকারগুলোর এমনতরো এলোমেলো, গোজামিল অবস্থা কোনোভাবেই কাম্য নয়; এই এলোমেলো গোজামিল অবস্থার নিরসনকল্পে স্থানীয় সরকারের একটি সঠিক ও সমন্বিত স্তরবিন্যাস তথা স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো আগে গ্রহণ করতে হবে; সেই গৃহীত প্রশাসনিক কাঠামোয় সর্বাদিক গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট (জেলা সরকার কিংবা বিভাগীয় সরকার) ও সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয়কে (একদিকে গ্রামীণ এলাকায় ‘ইউনিয়ন সরকার’ ও  অপরদিকে নগরীয় এলাকায় ‘নগর সরকার’) কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে হবে; তা না করে স্থানীয় ইউনিটগুলি ও স্তরগুলির এলোমেলো অবস্থা বজায় রেখে, স্থানীয় ইউনিটগুলির অসঠিক প্রকারভেদকরণ বজায় রেখে, স্থানীয় ইউনিটগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ইউনিট ও সর্বনি¤œ ইউনিটদ্বয় ঠিক না করে এবং তাতে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে কেবল একটি মধ্যবর্তী ইউনিট তথা উপজেলাকে নিয়ে গোটাদেশ অতি উৎসাহ, অতি মনোযোগ, অতি তৎপরতা দেখিয়ে আসছে; ফলে এই উপজেলার জন্মলগ্ন থেকে প্রতিটি নির্বাচনে প্রতিটি উপজেলায় সংশ্লি¬ষ্ট পদপ্রার্থীদের সহিংস কর্মকান্ড অতি মাত্রায় চলে আসছে। পাশাপাশি, হীন রাজনৈতিক স্বাথর্, ব্যক্তি বিশেষের প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্নীতি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, নিকার ও একনেক’র অদূরদর্শি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে উপজেলার সংখ্যা কমে আসার পরিবর্তে এর সংখ্যা বেড়েই চলেছে, এবং আরও নতুন নতুন উপজেলা গঠনের প্রক্রিয়া, প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে; তাতে প্রশাসনিক সিস্টেম কস্ট বাড়ছে; উন্নয়ন ও সেবামূলক ব্যয়ে ঘাটতি থাকছে। অথচ বাংলাদেশে উপজেলার সংখ্যা বাড়ানোর অপ্রয়োজনীয়তা নিয়ে সিডিএলজি, বাপসনিউজ ও এমপো বাস্তবায়ন ফোরাম ছাড়া অন্য কারো বক্তব্য শোনা যায় না; এ এক আশ্চর্য ব্যাপার নয় কি?
বাস্তব ঘটনাগুলো হল, উপজেলায় তেমন কোনো কাজকর্ম নেই, দায়দায়িত্ব নেই, এতে পরিপূর্ণ স্থানীয় সরকার কাঠামো নেই, স্বশাসন নেই, এর নিজস্ব আয়ের তেমন কোনো উৎস নেই, নিজস্ব রাজস্ব আয়ের উৎস সৃষ্টির সুযোগও তেমন একটা নেই বললে চলে, এটির নিজস্ব রাজস্ব আয় সৃষ্টির কিছু সুযোগ তৈরী করতে গেলে তৃণমূলের ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের রাজস্ব আয়ের বেশ কিছু উৎস কর্তন করতে হবে, আর তা করতে গেলে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সঙ্গে বিরোধ অনিবার্য হয়ে পড়বে; উপজেলায় জনগণকে সেবামূলক সার্ভিস দেয়ার মত তেমন কোনো সুযোগ নেই বললে চলে, কিংবা এর মাধ্যমে যেসব সেবামূলক সার্ভিস দেয়ার কথা বলা হয় তা দেয়ার কোনো প্রয়োজনই নেই, কারণ সেসব সার্ভিস অনায়াসে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে দেয়া সম্ভব; অন্যসব স্থানীয় ইউনিটগুলি যেমন ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, জেলা, বিভাগ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এর সম্পর্ক কেমন হবে, কিভাবে কতটুকু থাকবে তা সুনির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট করা নেই; বিশেষত ইউনিয়ন ও পৌরসভার সঙ্গে উপজেলার এক ধরনের সাপে নেউলে সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে, এই সাপে নেউলে সম্পর্ক যে কোনো সময় সংঘাতরূপে প্রকাশ্যে আসতে পারে, যা কোনো অবস্থাতেই কারোরই কাম্য নয়, ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই ধরনের একটা নাজুক দৃশ্যমান অবস্থার মধ্যে অন্য ধরনের আরেকটা দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়, তা হল উপজেলার প্রতিনিধিগণের জন্য গাড়ী, ড্রাইবার, বাসা, বিশাল দাপ্তরিক ভবন, পিয়ন, সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে লোভনীয় পদবী, বেতন-ভাতা, সামাজিক মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, বিদেশ ভ্রমণ, অপক্ষমতা ও নানাবিধ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সুযোগসুবিধার দৃশ্য; এসব লোভনীয় বিলাসবহুল সুযোগসুবিধা থাকায় পদপ্রার্থী হবার জন্য পদপ্রার্থীদের মধ্যে এক ধরনের প্রচন্ড মোহ, লোভ তৈরী হয়; পাশাপাশি, উপজেলা নির্বাচনে যারা চেয়ারপারসন ও ভাইস-চেয়ারপারসন পদপ্রার্থী হয়, হতে চায়, তাদের লক্ষ্য কিন্তু উপজেলায় দায়িত্ব পালন করা নয়, উপজেলা কেন্দ্রীক উন্নয়নমূলক, সেবামূলক কর্মকা- নিয়ে চিন্তাভাবনা করাও নয়, তাদের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারী সুযোগসুবিধা ও পদবী কাজে লাগিয়ে জাতীয় সংসদ এর সদস্য হবার পথে উপজেলাকে মই হিসেবে ব্যবহার করা, এবং অন্যসব উপায় অবলম্বনে কেবল নিজস্ব ভাগ্য উন্নয়নে প্রচেষ্টা চালানো; আর কাজকর্ম, দায়দায়িত্ব ছাড়া কেবলই ‘বাবুগিরি,’ ‘নেতাগিরি’ করার, কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে সদায় তৎপর থাকার, নিজেকে একজন বিকল্প ‘এমপি’ ভাবার যে সুযোগসুবিধা রয়েছে তা কার না ভাল লাগে; ফলে এই উপজেলা নির্বাচনে দলীয় ও নির্দলীয় প্রার্থীগণের বেশী বেশী আগ্রহ ও বেশী বেশী সহিংস আচরণ দেখা যায়।
এতে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, এই উপজেলার জন্মগত অসৎ উদ্দেশ্য ও জঘন্য কলংক এখনো বহাল রয়েছে; জেনারেল এরশাদ অবৈধ উপায়ে ক্ষমতায় এসে অবৈধ ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত ও পাকাপোক্ত করতে এবং স্থানীয় মধ্যবর্তী পর্যায়ে নিজস্ব অনুগত দলীয় মোড়ল তৈরী করতে উপজেলা সৃষ্টি করেন, এবং তিনি বিশেষ ব্যবস্থায় সমস্ত আইনকানুন লংঘন করে রাষ্ট্রীয় অর্থ ও ক্ষমতা বিলিয়ে দিয়ে উপজেলার প্রতি প্রবল মোহ ও একটি অনুগত মোড়লগোষ্ঠী তৈরী করতে সক্ষম হন। আর এই অনুগত মোড়লগোষ্ঠীই পরবর্তীতে জাতীয় পার্টির স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী মধ্যবর্তী খুঁটি হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়; একটু খোঁজ নিলে দেখা যাবে এঁরাই এখনকার জাতীয় পার্টির স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে মূল খুঁটি হিসেবে কাজ করছে। রাষ্ট্রীয় অর্থে ও সরকারী ক্ষমতাবলে নিজস্ব দলীয় খুঁটি, মোড়ল তৈরী করাটা হচ্ছে মহা অপরাধ, মহা দুর্নীতি; এই মহা অপরাধ, এই মহা দুর্নীতির কথা মনে রাখা, আমলে নেয়া উচিত নয় কি? অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় এসব অপরাধ, এসব দুর্নীতি যেন কিছু-ই না। এসব বিষয়ে দেশের অন্য সব রাজনৈতিক দলও নীরব; তাই তো দেখা যায়, অবৈধ শাসক এরশাদ, তাঁর দল জাতীয় পার্টি, তাঁর শাসনিক মিত্র জেএসডি ও কিছুসংখ্যক চাটুকারকে এখনও ‘উপজেলা’ তথা ‘উপজ্বালা’ নিয়ে গর্ব করতে শোনা যায়! এবং কথায় কথায় বলতে শোনা যায়, জেনারেল এরশাদ ও তাঁর দল না কি এই ‘উপজেলা’র জন্যই চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে! প্রশ্ন হল, যেখানে কোনো একদিন জনাব আবু তালেব প্রস্তাবিত স্তরবিন্যাসকরণ অনুযায়ী “উপজেলা” নামটিই থাকবেনা, সেখানে এরশাদ ও তাঁর দল চিরকাল স্মরণীয় হবে কিভাবে? অনুরূপভাবে, জনাব আবু তালেব প্রস্তাবিত স্তরবিন্যাকরণ অনুযায়ী উপনিবেশিক শাসক বৃটিশ প্রবর্তিত ও আয়ুবীয় গন্ধযুক্ত “ইউনিয়ন” নামটিও কোনো একদিন থাকবেনা, যার মাধ্যমে এই নামটিকে ঘিরে আবর্তিত বৃটিশ উত্তরাধিকার ও আয়ুবীয় গন্ধও মুছে যাবে। এই রূপরেখা অনুযায়ী “বিভাগ” স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হলে মধ্যবর্তী ইউনিট হিসাবে “জেলা” নামটিও মুছে যাবে, আর “জেলা” স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হলে “বিভাগ” নামটি মুছে দিতে হবে। এই নিবন্ধের শেষে সংযুক্ত স্তরবিন্যাসকরণ ১ ও ২ ভালভাবে লক্ষ করলে এই বিষয়গুলি বুঝতে কারো অসুবিধা হবেনা বলে মনে হয়।
 সে যাই হোক, এই ধরনের একটা অবৈধ অপরাধমূলক শাসনিক অবস্থার মধ্যেই আরও অনেকে ক্ষমতা, সুবিধা ও অর্থ লোভের পাশাপাশি বুঝে, না বুঝে উপজেলার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যান। বেশ কিছু এনজিও দাতা সংস্থার টাকায় দেশীয় শাসকের চাহিদায় আয়োজিত সভা-সমাবেশে এই উপজেলাকে নিয়ে বেশ মাতামাতি, লাফালাফি করে; আবার কিছু কিছু এনজিও কর্মকর্তার মধ্যে নিজস্ব ব্যক্তিগত স্বার্থে এনজিও কমসূচী, অর্থ, জনবল ইত্যাদি কাজে লাগিয়ে নিজস্ব উপজেলায় চেয়ারপার্সন, ভাইস-চেয়ারপার্সন হবার খায়েশ ও লোভ প্রচন্ডভাবে ক্রিয়াশীল থাকায় উপজেলা কেন্দ্রিক অতি তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায়। এদের সঙ্গে যুক্ত হয় জাতীয়ভাবে পরিচিত কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তি, যাঁরা প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বোঝে না, মওকা বুঝে কথায় কথায় গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে অথচ গণতন্ত্রায়ন বোঝে না, গণতন্ত্রায়ন শব্দটি উচ্চারণ করতে চায়না, গণতন্ত্রায়ন কর্মসূচী সম্পর্কে ধারণা নেই; বিশেষত এঁরা সুবিধাবাদী অবস্থান থেকে সুবিধাজনক শব্দ “সং¯কার” শব্দটি নিয়ে সব ধরনের শাসনিক আমলে পাগলপ্রায় থাকে, থেকে কেবল সুযোগসুবিধা হাতিয়ে নেয়; এঁরা মূলত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ, প্রকারভেদকরণ, সার্থক নামকরণ, সঠিক সংজ্ঞায়িতকরণ, অর্থায়ন, দায়িত্ব বণ্টন, পারস্পরিক সম্পর্ক, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, নির্বাহিক ও বিধানিক পরিষদের পার্থক্য সম্পর্কে জানেনা বুঝেনা, বুঝতে চায়ওনা; এঁরাই স্থানীয় সরকার আর কেন্দ্রীয় সরকারের কাঠামোতে নারীর শতভাগ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এমপো’র প্রয়োগ চায়না, ইত্যাদি ইত্যাদি; অথচ তাঁরা নিজেদেরকে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে সবসময় পরিচয় দিয়ে থাকে এবং এনজিও আয়োজিত সভা, সেমিনার, মানববন্ধন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার টকশোতে কখনও অতিথি বক্তা, কখনও অযাচিত বক্তা হয়ে বিশেষত উপজেলা কেন্দ্রিক অসার কথামালা জোর গলায় ব্যক্ত করেন; এঁদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মিডিয়ার বেশকিছু সাংবাদিক ও উপস্থাপক কর্মকর্তা, যাঁরা আর্থিক সুযোগসুবিধার বিনিময়ে উপজেলা বিষয়ক সংবাদ প্রকাশে প্রচারে সহযোগিতা দিয়ে থাকেন; এবং এদেরই কেউ কেউ মাঝেমধ্যে স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত অসার প্রতিবেদন প্রচার প্রকাশের মাধ্যমে ‘স্থানীয় সরকার বিষয়ক সাংবাদিক/প্রতিবেদক’ এর পরিচয় দাঁড় করিয়ে বিশেষ সুবিধা আদায়ে সচেষ্ট থাকেন।
পাশাপাশি, খুবই দুঃখজনক হলেও শতভাগ সত্যি যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠায় ও তার ক্রমাগত উন্নয়নে আকাংখা, পরিকল্পনা, কর্মসূচী ও প্রস্তুতি রয়েছে এমনতরো একটি রাজনৈতিক দলও খুঁজে পাওয়া যায় না, যায়নি; অথচ রাজনৈতিক দলগুলি গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন প্রসঙ্গে সবসময় লিপ সার্ভিস দিয়ে থাকে; এই লিপ সার্ভিস আর অন্তর্গত বিশ্বাস কখনো এক ছিলনা, এখনো নেই বলে প্রতীয়মান হয়; অপ্রিয় হলেও সত্য কথা হল, বাংলাদেশে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনই হয়নি; বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে মিশ্রিত লক্ষ্য প্রসূত রাস্তার, মাঠের আন্দোলন হয়েছে, হয়; আপাত দৃষ্টিতে ওইসব আন্দোলনে সফলতা দেখা গেলেও সেই সফলতা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও তার উন্নয়নে কাজে লাগেনি; কারণ সমাজ, দল ও দেশের সার্বিক অর্থে গণতন্ত্রায়ন সম্পন্ন করার শিক্ষাগত ও মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ প্রক্রিয়া এই সব আন্দোলনে, সংগ্রামে একেবারেই ছিলনা বললে অত্যুক্তি হবেনা। সে যাই হোক, বড় দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে সময়ে সময়ে বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনে বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্য সাধন করতে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিগণকে, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হতে আগ্রহী দলীয় ব্যক্তিবর্গকে ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ব্যবহার করতে দেখা যায়; এবং জাতীয় নির্বাচনে দলীয় ইশতেহারে গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকার উন্নয়ন প্রসঙ্গ বেশ জোরালোভাবে উপস্থাপিত করা হয়। তা করতে গিয়ে এসব দলের কিছু সুচতুর নকলবাজ ব্যক্তি প্রতিটি জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনের পূর্বলগ্নে দলীয় ইশতেহার প্রণয়ন কালে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্র বিষয়ে নকল করার মহড়ায় নেমে থাকে। এসব নকলবাজ ব্যক্তিরা অন্য কারো আইডিয়া, স্লোগান, গবেষণা, অন্য কারো প্রণীত, প্রস্তাবিত বিষয় ও কর্মসূচী জাতীয় স্বার্থে অনুসরণের জন্য, গ্রহণের জন্য নিয়মনীতি মেনে দলীয় ইশতেহারে কিংবা দলীয় কর্মসূচীতে তা অন্তর্ভুক্ত করেন না, করতে চান না; তাঁরা দেশের ব্যক্তি বিশেষের নিজস্ব স্ট্যাডি, গবেষণা, কর্মসূচী, শ্লোগান, ক্যাম্পেইন, অবদানকে অস্বীকার করার, চুরি করার বাতিকগ্রস্ততা থেকে কেবল নগ্নভাবে নকলেই সিদ্ধহস্ত; এঁরা মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক চোর এবং জনগণের অর্থ ও সম্পদ চোর তো বটেই। অথচ এঁরা স্ব স্ব দলের কাছে সম্মানীয় বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, নির্বাচনী ইশতেহার প্রণেতা, দলীয় কর্মসূচী প্রণেতা, ইত্যাদি ইত্যাদি! এ এক মহা আজব কারবার নয়কি! তাই তো দেখা যায়, এসব দলের উপজেলা সম্পর্কীয় ইশতেহারগত অংগীকার শুধু কথার ফুলঝুরি আর অন্তঃসার শূন্য কথামালায় ভরপুর; কারণ স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে উপজেলার অবস্থান, গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, ক্ষমতা, দায়দায়িত্ব, স্বশাসন, অর্থায়ন, কাঠামো ইত্যাদি সম্পর্কে এসব দলের জেনে বুঝে কোনও সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট অবস্থান নেই; এ হচ্ছে একজন অবৈধ শাসকের চরম অপকর্মের কুফলে প্রভাবিত হয়ে উত্তরাধিকার বহনে রাজনৈতিক দলগুলোর অশুভ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকা; এ যেন এক চরম হ-য-ব-র-ল অবস্থার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর দিকহারা হয়ে ছোঁটাছুটিতে লিপ্ত থাকা। পাশাপাশি, জনগণেরও একটা বিরাট অংশ উপজেলা নির্বাচন কালীন সময়ে নগদে পাওয়া আদর আপ্যায়ন আর কদরেই তুষ্ট থাকে। নির্বাচনে ও তার পরে কি হল তা তাঁদের নজরদারি ও তদারকির বিষয় হিসেবে থাকে না। ভোটারগণ মূলত জানেওনা উপজেলা কেন্দ্রিক কি কি দায়িত্ব সম্পন্ন করানোর জন্য উপজেলা চেয়ারম্যান-ভাইসচেয়ারপারসনদ্বয় নির্বাচিত করেছে, করছে; ঠিক যেমন পদপ্রার্থীগণ ভালভাবে জানেনা কি কি দায়িত্ব পালন করার জন্য নির্বাচিত হতে চায়, হয়েছে। অতএব, সার্বিক অর্থেই বলা যায়, উপজেলা হচ্ছে একটা মিথ, একটা অলীক স্বপ্ন, একটা মিথ্যা নোশান, একটা দায়দায়িত্বহীন, স্বশাসনহীন মধ্যবর্তী ইউনিট। গোটাদেশ এই মিথ্যার বেড়াজালে ঘুরপাক খাওয়াটা, সরব থাকাটা হচ্ছে এক মহা আশ্চর্যজনক ব্যাপার!
    অনুরূপভাবে, গোটা জাতি আরেকটা মিথ, আরেকটা মিথ্যা নোশানের বেড়াজালে ঘুরপাক খেয়ে আসছে; সেই মিথ আর মিথ্যা নোশানটা হল, অবৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রবর্তিত তথাকথিত ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’। এই মিথ তথা অপকর্মের কুফলে প্রভাবিত হয়ে এবং একে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসক দ্বারা সৃষ্ট পল্ল¬¬ী পরিষদ, গ্রাম সভা, গ্রাম পরিষদ, গ্রাম সরকার ও ওয়ার্ড সভা নামের অপ্রয়োজনীয় ইউনিটগুলি নিয়ে গোটা জাতি মিথ্যার বেড়াজালে জড়িয়ে থাকে; ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিটি গ্রাম কিংবা প্রতিটি ওয়ার্ডে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অবৈধ ও বৈধ শাসকগণ দ্বারা এসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠিত হয় কিংবা গঠন করার অপচেষ্টা চলে; এসব ইউনিট কেন অপ্রয়োজনীয়, কেন মিথ, কেন মিথ্যা নোশান, কেন অপচয়মূলক আর অসৎ উদ্দেশ্যমূলক তার স্বরূপ বুঝাটাও খুবই জরুরী। এর স্বরূপ বুঝার মাধ্যমে এও বুঝা যাবে যে, কেন স্থানীয় সরকারের স্তর, প্রকার ও গন্তব্য আগে ঠিক করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
মূলত, ইউনিয়ন-ই হওয়া উচিত গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের মৌলিক গ্রামীণ প্রশাসনিক ইউনিট; সাধারণত ১০ থেকে ১৫টি গ্রাম নিয়ে একেকটি ইউনিয়ন গঠিত হয়ে থাকে; এই ইউনিয়নের মধ্যে অবস্থিত হাট-বাজার-ঘাট-গঞ্জগুলিও কোনো না কোনও গ্রামের মধ্যেই অবস্থিত। সেজন্য দেশের মানুষের কাছে ইউনিয়ন মানে গ্রাম আর গ্রাম মানেই ইউনিয়ন; গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী নগরীয় স্থানীয় সরকারের নগরীয় প্রশাসনিক ইউনিট (পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড) এর সংখ্যা ও আয়তন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ ইউনিট হিসেবে ইউনিয়নের মোট সংখ্যা ও আয়তন কমে আসার কথা; কিন্তু প্রশাসনিক দুর্নীতি আর অশুভ রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ইউনিয়নের সংখ্যাও বেড়েই চলেছে, এবং আরও কিছু নতুন নতুন ইউনিয়ন গঠনের প্রচেষ্টা চালু রয়েছে; তাতে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক সিস্টেম কস্ট অনেক অনেক গুণ বেড়ে গেছে, এবং তা আরও বাড়তে থাকবে; অথচ ইউনিয়নের সংখ্যা যথা সম্ভব কমিয়ে এনে প্রশাসনিক সিস্টেম কস্ট যথা সম্ভব সীমিত রেখে তাতে উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক ব্যয় বাড়ানো খুবই জরুরী প্রয়োজন বলে প্রতীয়মান হয়।
গ্রামীণ এলাকায় প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে ইউনিয়ন কেন্দ্রীক সার্বিক উন্নয়ন মানেই ১০-১৫টি গ্রামের উন্নয়ন, গ্রামীণ মানুষের উন্নয়ন; অথচ, প্রকৃত ঘটনা হল, এই ইউনিয়ন ভিত্তিক গণতন্ত্রায়ন ও তার  সার্বিক উন্নয়ন সাধনে আজ অবধি কোনো বিশেষ উদ্যোগ, বিশেষ আয়োজন গৃহীত ও দৃশ্যমান হয়নি, হচ্ছেনা। বরং এই ইউনিয়নকে পাশ কাটিয়ে এর নীচে যেমন গ্রাম সরকার ও এর ওপরে যেমন উপজেলা নামক অপ্রয়োজনীয় ইউনিটগুলো গঠনের নামে নানান সময়ে নানান রকমের অপতৎপরতা চালানো হয়েছে, হচ্ছে; ওই সব অপতৎপরতার সঙ্গে দেশের অনেক নামকরা, নামী দামী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জড়িত। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অবৈধ উপায়ে ক্ষমতায় এসে ও থেকে, রাষ্ট্রীয় অর্থে ও সরকারী ক্ষমতায় নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন ও গ্রামীণ তৃণমূলে অনুগত, চাটুকার দলীয় কর্মী-সমর্থক তৈরীর লক্ষ্যে ইউনিয়নের মধ্যে ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ গঠন করার উদ্যোগ নেন; এবং এই ইউনিট কেন্দ্রীক বেশী বেশী দলীয় কর্মী-সমর্থক তৈরী করার লক্ষ্যে নতুন নতুন গ্রাম সৃষ্টিতে প্রবল উৎসাহ যোগায়; তাতে গ্রামের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে ৬৮ হাজার থেকে ৮৭ হাজারের বেশী সংখ্যক গ্রামে উন্নীত হয়ে যায়; কারণ যত বেশী বেশী গ্রাম, তত বেশী বেশী গ্রাম সরকার, আর তত বেশী বেশী অনুগত, চাটুকার, টাউট, সুবিধাবাদী দলীয় সদস্য; এতে দীর্ঘকালের প্রতিটি গ্রামভিত্তিক দৃঢ় সামাজিক বন্ধন ও একতা ভেঙ্গে তছনছ, চুরমার হয়ে যায়; জাতীয় অর্থ, শ্রম ও সময়ের বিপুল অপচয় ঘটে; ইউনিয়ন পরিষদ হয়ে পড়ে চরম উপেক্ষিত, এবং গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক গ্রামীণ ইউনিটের পরিবর্তে ইউনিয়ন হয়ে পড়ে গুরুত্বহীন এক মধ্যবর্তী ইউনিট। রাষ্ট্রীয় অর্থে, দাপটে কেবল-ই ব্যক্তিগত ও নতুন রাজনৈতিক দলীয় কর্মী-সমর্থক তৈরীর স্বার্থে পরিচালিত এই সরকারী উদ্যোগ ছিলো এক মহা দুর্নীতি, এক মহা অপরাধ; এ হল অবৈধ শাসকের অবৈধ ক্ষমতায় সৃষ্ট এক মারাত্বক বিষফোঁড়া, যার যন্ত্রণায় গোটা জাতি এখনো খেসারত দিয়ে চলেছে। অবৈধ শাসক জিয়ার এই মহা অপরাধ, এই মহা দুর্নীতি আর এই সাংঘাতিক বিষফোঁড়ার বিষয় হালকাভাবে নেয়া একদম উচিত নয়। এই মহা অপরাধ, এই মহা দুর্নীতির কথা অবৈধ ক্ষমতাবলে সৃষ্ট সংশ্লিষ্ট দলটি স্বার্থগত কারণেই হালকাভাবে নিয়ে  থাকে, থাকতে পারে; কারণ একটু অতীতে গেলে, একটু অতীত স্মরণ করতে চেষ্টা করলেই মনে পড়ে যাবে যে, জিয়াউর রহমান তখনকার গ্রাম সরকারের মাধ্যমেই তৃণমূলে সুবিধাবাদী, নীতিহীন, টাউট ও বাটপার জাতীয় লোকদের নিয়ে বিএনপি’র সমর্থক গোষ্ঠী তৈরী করে ছিলেন; পরবর্তী কালে এঁরাই গ্রামে বিএনপি’র শক্ত খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়; তৃণমূলের মত  জাতীয় পর্যায়েও অনুরূপ চরিত্রের লোকজন নিয়েই জিয়াউর রহমান বিএনপি’র জাতীয় নেতৃত্ব তৈরী করেছিলেন; এই বিএনপি স্বার্থগত কারণেই এসব বিষয় ভুলে থাকে, থাকতে হয়। কিন্তু অন্যসব রাজনৈতিক দল ও  গোটা জাতি কেন তা ভুলতে বসেছে? তা কি ভুলে যাওয়া উচিত? এই প্রশ্ন থাকল সকল মানুষের প্রতি। একই ধারায় পরবর্তীতে বিএনপি ক্ষমতায় এসে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বাধীন স্থানীয় সরকার বিষয়ক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রি ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের নেতৃত্বে একবার ‘গ্রাম সভা’ গঠন করার অপচেষ্টা চালায় এবং আরেকবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূঁঞার নেতৃত্বে প্যাডসর্বস্ব ‘গ্রাম সরকার’ গঠন করতে গিয়ে দেশের প্রচুর অর্থ, শ্রম ও সময় নষ্ট করা হয়, এবং এই প্যাডসর্বস্ব গ্রাম সরকারের জন্য রাষ্ট্রীয় শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে করাপশনকে গ্রামীণ তৃণমূলে বিস্তৃত করা হয়। উভয় বার ক্ষমতায় থাকা কালে বিএনপির যেসব নেতা স্থানীয় সরকার বিষয়ক দায়িত্বে ছিল, তাদের দ্বারা স্থানীয় সরকারের কেবল ক্ষতিই সাধিত হয়েছে; তারাসহ এই দলের গোটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার স্থাপন ও তার উন্নয়নমুখী কোনো চিন্তাভাবনা করেছে কিংবা করতে চেয়েছে এমনতরো নজির একদম খুঁজে পাওয়া যায়না, যদিও ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ বিএনপির নীতিনির্ধারকগণের কাছেও বার বার তুলে ধরা হয়েছিল; তা তারা সবাই এক কান দিয়ে শুনেছে, আরেক কান দিয়ে তা বের করে দিয়েছে; তারা দেশ, দল ও সমাজের সার্বিক গণতন্ত্রায়ণ ও গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত হিসেবে স্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আমলে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা কখনও উপলব্ধি করেনি, করতে চায়নি, আর এখনও এই দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এসব বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে বলে, করতে চায় বলে একদম প্রতীয়মান হয়না; আর এই দলের জন্মগত কলংকিত চরিত্র একটুও পরিবর্তমুখী হয়েছে বা হতে চেয়েছে বলে কোনও নজির কি দলে কিংবা রাষ্ট্রে রয়েছে? তারপরও কি বিএনপি’র স্থানীয় সরকার, গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক অবস্থান, আকাংখা বুঝতে আর কিছু বাকি থাকে? সেসঙ্গে জিয়ার ওই অপকর্মের প্রভাব কিভাবে অন্যসব রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রভাবিত করেছে তাও জানার, বুঝার প্রয়োজন রয়েছে। ধরা যাক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর কথা; এই দল ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে গ্রামীণ তৃণমূলে দলীয় ভিত্তি আরও মজবুত করার এক অলীক স্বপ্নে তাড়িত হয়ে এ্যাডভোকেট রহমত আলীর নেতৃত্বাধীন স্থানীয় সরকার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান (পরে তিনি মাননীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন) এর নেতৃত্বে জাতীয় সংসদে তেমন কোনো আলাপ আলোচনা ছাড়াই অত্যন্ত তাড়াহুড়ার সহিত ইউনিয়নের মধ্যে প্রতি ওয়ার্ড কেন্দ্রিক ‘গ্রাম পরিষদ’ গঠন করার আইন প্রণীত হয়, এবং তাঁরই নেতৃত্বে তা বাস্তবায়নের জন্য অপচেষ্টা চলে; বিন্তু সেই অপচেষ্টা কেবল জনাব আবু তালেব এর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবল বাধার মুখে বন্ধ হয়ে যায়; প্রসঙ্গক্রমেই বলা প্রয়োজন যে, এ্যাডভোকেট রহমত আলী কমিশনের ওয়ার্ড ভিত্তিক তথাকথিত ‘গ্রাম পরিষদ’ গঠনের সুপারিশটি ও অন্যসব সুপারিশগুলো একদম অপরিপক্ক, ভঙ্গুর, খন্ডিত আর গোজামিলে ভরপুর; এক কথায় বলা যায় যে, রহমত আলী কমিশনের গোটা প্রতিবেদনটি সার্বিক বিবেচনায় বাস্তবায়নের অযোগ্য একটি প্রতিবেদন। তা সত্ত্বেও, বাস্তব অবস্থা দেখে মনে হয়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকগণ এ্যাডভোকেট রহমত আলী কমিশনের ওই গারবেজ তুল্য প্রতিবেদনটি নিয়ে এখনও সন্তুষ্ট কিংবা দ্বিধাগ্রস্ত রয়েছেন; পাশাপাশি আওয়ামী লীগের প্রায় সকল কেন্দ্রীয় নেতাগণ ও রহমত আলী কমিশনের সকল সদস্যগণ ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ সম্পর্কে বার বার অবগত হয়েছেন, এবং এর সবিস্তার ব্যাখ্যা শুনেছেন, জেনেছেন; তার পরও এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে, উপলব্ধিতে নিতে, বাস্তবায়নে যেতে এতবেশী সময় লাগার কারণ একদমই বোধগম্য নয়। সে যাই হোক, এখন তো বিএনপিকে ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার,’ ‘গ্রামসভা’ ও ‘গ্রাম সরকার’ নিয়ে কথা বলতে দেখা যায় না, শোনা যায় না। জাতীয় পার্টিকে ‘পল্ল¬ী পরিষদ’ নিয়ে কথা বলতে শোনা যায় না, দেখা যায় না; অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, অবৈধ শাসক এরশাদকে “পল্লী” শব্দ কেন্দ্রীক ও “পল্লী পরিষদ” কেন্দ্রীক ‘পল্লীবন্ধু’ বানানোর খায়েশও এই দলের ফুরিয়ে গেছে! আর আওয়ামী লীগকে ইউনিয়নে ওয়ার্ড ভিত্তিক তথাকথিত ‘গ্রাম পরিষদ’ নিয়ে কোনও বক্তব্য দিতে, শব্দ করতে দেখা যায় না, শোনা যায় না। তবে প্রতি গ্রামে কিংবা ইউনিয়নের প্রতি ওয়ার্ডে ওইসব তথাকথিত ইউনিট গঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে যেসব ব্যক্তি নানাবিধ ফায়দা লুঠেছে, অপ্রয়োজনীয় বই-টই লিখে প্রচুর টাকাপয়সা কামিয়েছে, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ পরিচিতি মিডিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছে, দাতা গোষ্ঠীর টাকায় সভা-সেমিনার করেছে, নতুন নতুন এনজিও যেমন ‘স্থানীয় সরকার সহায়ক কমিটি’ গঠন করেছে, তারা এখনো মাঝেমধ্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠনের পক্ষে আড়ালে-আবড়ালে, চুপিসারে সাফাই গাইতে দেখা যায়। এসব অপকর্মকান্ডের বিরুদ্ধে, ইউনিয়নের মধ্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠনের বিরুদ্ধে সিডিএলজি’র লাগাতার ক্যাম্পেইন ও তীব্র প্রতিবাদ এর কারণে এক দিকে ওইসব ব্যক্তির জোরগলা বেশ ক্ষীণ ও দুর্বল হয়েছে; অপর দিকে ওইসব রাজনৈতিক দল বুঝতে পেরেছে যে, ইউনিয়নের মধ্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠন করার নামে আবার লাফালাফি, মাতামাতি করলে হালে আর পানি পাওয়া যাবে না; তাই তারাও চুপসে গেছে বা চুপসে যেতে বাধ্য হয়েছে বলে বোঝা যায়। শেষ তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গঠিত একটি স্থানীয় সরকার বিষয়ক কমিটিও ইউনিয়নের মধ্যে প্রতি ওয়ার্ডে ‘ওয়ার্ড সভা’ ও নগরীয় ওয়ার্ডে ‘ওয়ার্ড কমিটি’ গঠনের সুপারিশ করে; এই কমিটির জন্য অন্যসব খরচ ছাড়া শুধু ওই তথাকথিত সুপারিশ প্রকাশের জন্য ঢাকায় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত এক সভার জন্য ব্যয় করা হয়েছে প্রায় সোয়াশ কোটি টাকা, এর মাধ্যমে জাতীয় অর্থের অপচয় কারে কয়, তা ওই কমিটি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ভালভাবে দেখিয়েছে! ওই কমিটির প্রধান ড. শওকত আলী পুরস্কার স্বরূপ শেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাও হয়েছেন; তথাকথিত ওয়ার্ড সভা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠনের সুপারিশসহ ওই কমিটির অন্য সুপারিশগুলিও বড্ড সেকেলে, খন্ডিত ও বাস্তবায়নের একদম অযোগ্য; প্রথম দিকে মিডিয়াসহ অনেকেই না বুঝে, না জেনে ওই কমিটির প্রতিবেদনটির প্রতি সমর্থন জানায়, আবার জেনেবুঝেই কেবল স্বার্থগত কারণে তার পক্ষে শেষ তত্বাবধায়ক সরকারের গর্ভে সৃষ্ট ‘গভার্নেন্স কোয়ালিশন’ নামের একটি এনজিও গ্রুপ দাতা সংস্থার টাকায়, শেষ তত্বাবধায়ক সরকারের সেবাদাস হিসেবে সভা-সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে বেশ হইচই করে থাকে, ‘হাঙ্গার প্রজেক্ট’ নামের আরেকটি এনজিও’র বাংলাদেশস্থ কর্ণদার (ড. বদিউল আলম মজুমদার) এর বিশেষ ব্যক্তিগত স্বার্থে ওই এনজিওটিও অনুরূপ কাজে লিপ্ত থাকে, আর এই হাঙ্গার প্রজেক্ট এরই পকেট সংগঠন ‘সুজন’ও ওই প্রতিবেদন নিয়ে মাঠ গরম করার অপচেষ্টা চালায়, ‘ডেমক্রেসিওয়ার্চ’ নামের আরেকটি সুবিধাভোগী এনজিও ওই প্রতিবেদনের পক্ষে প্রচার প্রচারণায় সচেষ্ট থাকে, এবং এই এনজিও ইউনিয়ন পরিষদের তথাকথিত ‘স্থায়ী কমিটি’ শক্তিশালীকরণের নামে দাতা সংস্থার লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতে লোক দেখানো সভা সেমিনারও আয়োজন করত; অথচ ওই এনজিও বিধানিক পরিষদীয় বা সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কি, তা-ই বুঝত না, বুঝে না; এনজিওটি গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার চায়, বুঝে তার কোনও লক্ষণ এর কর্মকা-ে কখনও প্রতিফলিত হয়নি, হয়না। ওই অসার প্রতিবেদনটির পক্ষে বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রও নিজস্ব স্বার্থগত কারণে প্রবল প্রচার প্রচারণায় যুক্ত হয়ে পড়ে; ‘মানুষের জন্য’ নামক একটি এনজিও অনুরূপ কর্মকা-ে লিপ্ত থাকে, যদিও এই এনজিওতেও স্থানীয় সরকার বুঝে, জানে এমন কোনো কর্মকর্তা দেখা যায়নি; তখন এই এজিও’র এক বিশেষ সুবিধাভোগী কর্মকর্তা স্থানীয় সরকার বিষয়ক গার্বেজ তুল্য একাধিক নিবন্ধ ডেইলি স্টার নামক একটি পত্রিকায় প্রকাশ করায় এবং ইউরোপের একটি দেশ থেকে একটি স্কলারশিপ বাগিয়ে নেয়। অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলে পরিচিত ‘সিপিডি’ও ওই অসার প্রতিবেদনের পক্ষে অবস্থান নেয়, যদিও এই প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার, গণতন্ত্রায়ন বুঝে, জানে এমন কোনও গবেষক, কর্মকর্তা আছে বলে আমাদের অন্তত জানা নেই; কিন্তু সিডিএলজির বুদ্ধিবৃত্তিক তীব্র আন্দোলনের ফলে ওই প্রতিবেদনের সুপারিশগুলির অসারতা, দুর্বলতা খোলাসা হতে থাকায় তার প্রতি অনেকের সমর্থন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে, এবং ওই কমিটির সদস্যদের উচ্চকণ্ঠ আস্তে আস্তে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতম হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়; ওই কমিটির সুপারিশগুলি (মূলত একেও নকলবাজদের নকল বলাই শ্রেয়) এবং ওইগুলির ভিত্তিতে প্রণীত আইনকানুন বিধিবিধান যত দ্রুত সম্ভব বাতিল হয়ে যাওয়া উচিত। এই শেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদ্যোগে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি স্থানীয় সরকার কমিশনও গঠিত হয়; এ কমিটির সদস্যরা কেবল বেতন, ভাতা, অফিস, গাড়ী, বাড়ি, পদমর্যাদা ও নানা রকমের সুযোগসুবিধা নিয়েই ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে; এদের একজনেরও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার, বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও এর অভ্যন্তরীণ স্ট্যাটাসগত ও গুণগত পরিবর্তন সম্পর্কে তত্ত্বগত ও বাস্তব ধারণা ছিলনা; এদেরই একজন (ড. তোফায়েল আহমেদ) এখনও বিলুপ্ত কমিশনের পদবী ব্যবহার করে মিডিয়াসহ অন্যসব জায়গায় নানা রকমের সুযোগসুবিধা নিয়ে থাকেন, এবং তিনি তার অসার গার্বেজ তুল্য বক্তব্য কথায় লেখায় সবসময় তুলে ধরেন। তাজ্জব ব্যাপার হল, এই তিনি, যিনি স্থানীয় সরকারের প্রকার ঠিকভাবে করতে পারেন না, সর্বনি¤œ ইউনিট কোনটি তা বুঝতে পারেন না, সর্বোচ্চ ইউনিট ঠিক করার ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ করার প্রয়োজনীয়তা বুঝেন না, নির্বাহিক ও বিধানিক পরিষদের পার্থক্য বুঝেন না, স্তরবিন্যাসকরণ ও তার গুরুত্ব বুঝেন না, সার্থক নামকরণ ও যথার্থ সংজ্ঞায়িতকরণের গুরুত্ব অনুধাবন করেন না, ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন না, নারীর ১০০-১০০  প্রতিনিধিত্ব তথা এমপোতে বিশ্বাস করেন না, গ্রামীণ থেকে গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশের রূপান্তরিত উপস্থিতি এখনও টেরই পাননা, বিদ্যমান গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ থেকে একটি পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এ উন্নীত হবার চলমান প্রক্রিয়া উপলব্ধিতে নিতে চাননা, স্থানীয় সরকারের শেষ গন্তব্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা জানেন না, বোঝেন না, ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ মিডিয়া কর্মিরা তাঁকে (এবং ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ড. আকবর আলি খান, ড. শওকত আলী সহ আরও কয়েক জনকে) স্থানীয় সরকার “বিশেষজ্ঞ” হিসেবে প্রচার প্রকাশ করেই চলেছে; প্রশ্ন হল, এসব ব্যক্তিসহ আরও কিছু ব্যক্তি (কারা তা বুঝে নিলে খুশী হব) ও কিছু এনজিও সম্পর্কে মিডিয়া কর্মিরা কবে সচেতন হবে? কবে শেষ হবে স্থানীয় সরকার নিয়ে সব ধরনের অপতৎপরতা, অপপ্রচার? আর কবে শেষ হবে অসার, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রচার প্রকাশের লাগাতার মহড়া?
প্রকৃতপক্ষে, স্থানীয় সরকার বিষয়ক যত রকমের মিথ আর অপতৎপরতা রয়েছে, তার বিরুদ্ধে সর্বাত্বক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে সূচিত হয় ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী থেকে। ওই দিন ঢাকায় জাতীয় জাদুঘরে এক জাতীয় সেমিনারে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ উপস্থাপিত করেন স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক গবেষক আবু তালেব, এবং সেই ১৩ জানুয়ারী থেকেই তাঁর উদ্যোগে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ও ২০২০ সালের মধ্যে একটি উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তথা গণস্বপ্ন ২০২০ প্রতিষ্ঠার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন সূচিত হয়; আর এই আন্দোলনই স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত যত রকমের মিথ, মিথ্যা নোশান, আনফাউন্ডেড নোশান, অপচেষ্টা, অপতৎপরতা রয়েছে তা আস্তে আস্তে দূরীভূত করে আসছে; শুরুতে অনেকেই এই আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য বুঝতে পারেননি; ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিটি গ্রাম কিংবা ওয়ার্ড ভিত্তিক স্থানীয় সরকারের ইউনিট স্থাপনের কোনো প্রয়োজন নেই, জনাব আবু তালেবের এই দৃঢ় বক্তব্যের, অবস্থানের সারবত্তাও অনেকে একেবারেই বুঝতে পারেননি, এবং অনেকেই তাঁর এই দৃঢ় বক্তব্যকে, অবস্থানকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি বলে তাঁকে অনেকেই ভুলও বুঝেছেন। তাতে কিন্তু তিনি একটুও দমে যাননি; তিনি তাঁর সুদৃঢ় বক্তব্য নিরলসভাবে গোটা জাতিকে সাধ্যমত লাগাতার জানিয়ে বুঝিয়ে চলেছেন। এটা তো ঠিক যে, সমষ্টিগত কিংবা জাতিগত ভুল ভাঙ্গানো সহজ কাজ নয় এবং এও ঠিক যে, যে কোনো সত্য বিষয় সহজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়না, যায়নি। এসব বিষয় মাথায় রেখেই সিডিএলজি লাগাতার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার স্থাপন, কার্যকর ও স্থায়ী না হওয়া পর্যšত সিডিএলজি’র এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন, সংগ্রাম অবশ্যই চলতে থাকবে। ফলে, আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, স্বনির্ভর গ্রাম সরকার, পল্ল¬ী পরিষদ, গ্রাম সভা, গ্রাম পরিষদ, গ্রাম সরকার ও ওয়ার্ড সভার মত উপজেলাও একটা মিথ ও অপ্রয়োজনীয় ইউনিট হিসেবে একদিন না একদিন অবশ্যই প্রমাণিত হবে; এবং তথাকথিত ‘গ্রাম সরকার’র মত উপজেলার প্রতিও দেশবাসী ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের প্রবল মোহ ভঙ্গ হবে; আর সেজন্য, ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী থেকে পরিচালিত দেশের সার্বিক গণতন্ত্রায়নের ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার বিরতিহীন বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও তার অপরিসীম গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে, এই ১৩ জানুয়ারীকেই “স্থানীয় সরকার দিবস” হিসেবে ঘোষণা ও পালন করার জন্য সিডিএলজি, এমপো বাস্তবায়ন ফোরাম ও বাপসনিউজ জোর দাবী জানিয়ে আসছে। আমরা আশাকরি সরকার তা বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে তার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
প্রাসঙ্গিকভাবে আরেকটি বিষয় পাঠক সমাজের অবগতির জন্য স্পষ্ট করা দরকার বলে মনে হয়; তা হল, সরকারসহ অনেকেই ভুল ধারণা বশত শুধু সিটি কর্পোরেশনগুলোকে “নগর” মনে করে থাকে; এই ভুল ধারণাটি ভাঙ্গতে ও প্রকৃত বিষয় তুলে ধরতে এই প্রতিবেদনে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ অনুযায়ী নগর, নগরীয় ইউনিট ও নগরীয় এলাকা বলতে সিটি কর্পোরেশনগুলোর পাশাপাশি দেশের সকল পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকেও বুঝানো হয়েছে। প্র্রকৃত অর্থে, নগর ও নগরায়ন বোঝেনা, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বোঝেনা এমন সব ব্যক্তি ও সরকারী কর্মকর্তাগণ (বিশেষত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, একনেক, নিকার, মন্ত্রিপরিষদ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, সংসদ, বিচার ও রাষ্ট্রপতির সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনের সচিবালয়ের কর্মকর্তাগণ) এর কারণে নগরীয় এলাকায় অবস্থিত স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিটগুলোকে বিভিন্ন আইন ও বিধিতে বিভিন্ন নাম দিয়ে একটা বিভ্রান্তিকর অবস্থায় রাখা হয়েছে; একই আইনে গ্রামীণ এলাকার স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট “ইউনিয়ন” নামকরণের মত একই আইনে নগরীয় এলাকার স্থানীয় ইউনিটগুলিও শুধু “নগর” নামে পরিচিত হতে পারতো, হতে পারে, এবং ইউনিয়ন ও নগরে যথাক্রমে ইউনিয়ন সরকার ও নগর সরকার গঠিত হতে পারত, হতে পারে।  ইউনিয়নগুলির মধ্যে আয়তন, জন সংখ্যা, রাজস্ব আয়-ব্যয় ও গুরুত্বে যেমন পার্থক্য রয়েছে, ঠিক তেমনি নগরগুলোর মধ্যেও আয়তন, জনসংখ্যা, রাজস্ব আয়-ব্যয় ও গুরুত্বে পার্থক্য রয়েছে; যদি গ্রামীণ এলাকায় “ইউনিয়ন” নামকরণে অসুবিধা না থাকে, নগরীয় এলাকায় এক ধরনের নাম “নগর” হতে অসুবিধা কোথায়? সেই বিষয়টি একেবারেই বোধগম্য নয়। আবার, ইউনিয়নের জন্য ‘ইউনিয়ন সরকার’ গঠন করার বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে ইউনিয়নের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ‘ওয়ার্ড সভা’ গঠনের আইন রয়েছে, এবং নগরগুলির জন্য ‘নগর সরকার’ গঠন করার বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে প্রতিটি নগরীয় ওয়ার্ডে অপ্রয়োজনীয় ‘ওয়ার্ড কমিটি’ গঠন করার আইনও রয়েছে; এও এক ধরনের পাগলামি ছাড়া অন্য কিছু নয়। সে যাই হোক, বাংলাদেশ এখন আর শুধু গ্রামীণ দেশ নয়, কেবল কৃষিজ সমাজ নয়; বিদ্যমান বাস্তবতায় এখনকার বাংলাদেশ হচ্ছে গ্রামীণ-নগরীয় দেশ, গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ, অর্থাৎ একটি মিশ্র সমাজ; গ্রামীণ বাংলাদেশ আর গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এক বিষয় নয়; এই দু’টোর সম্ভাবনা, সমস্যা, উন্নয়ন পরিকল্পনা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক ধরনের নয়; কৃষিজ সমাজ আর গ্রামীণ-নগরীয় সমাজের ধ্যান-ধারণা ও জীবনাচরণ এক নয়; তাই এই দু’টোর প্রশাসনিক কাঠামো ও তার কার্যাবলীও এক ধরনের হওয়া উচিত নয়; দুঃখজনক বিষয় হল, অন্যান্য পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনার মত ৭ম পঞ্চ বার্ষিক (২০১৬-২০২০) পরিকল্পনার চূড়ান্ত খসড়ায়ও তার ইঙ্গিত, স্বীকৃতি ও প্রস্তুতিমূলক বিষয় একদম নেই বললে চলে। রাজনৈতিক দলসহ মিডিয়াও এই বিষয়টি বুঝতে পারছেনা বলে প্রতীয়মান হয়। জনাব আবু তালেব বাংলাদেশের স্টাটাসগত ও গুণগত এই বিরাট পরিবর্তনের কথা সর্বপ্রথম ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী ঢাকায় আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে তুলে ধরেন; সেই থেকে অনেক সময় পার হয়েছে; নতুন কোনও কিছু বুঝে ওঠতে সময় লাগতেই পারে; কিন্তু এত বেশী সময় লাগাটা একদম মেনে নেয়া যায়না। এই বিষয়টি যত দ্রুত সম্ভব মিডিয়া, নীতিপ্রণেতাগণ, আইনপ্রণেতাগণ ও গোটা সমাজকে বুঝতে হবে, এবং সরকার কর্তৃক বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রামীণ-নগরীয় দেশ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে, গ্রামীণ সমাজ তথা কৃষিজ সমাজ থেকে গ্রামীণ-নগরীয় সমাজের ধ্যান-ধারণায় ও জীবনাচরণে অভিযোজন প্রক্রিয়া সচেতনভাবে সম্পন্ন করতে হবে, তার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রণীত, গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে হবে, এবং তারই ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো, ক্ষমতা ও কার্যাবলী ঠিকঠাক করতে হবে। এই তো গেল একটা দিক; অন্য দিক হল দ্রুত নগরায়নের ফলে বিদ্যমান গ্রামীণ-নগরীয় দেশ থেকে বাংলাদেশ একটি পরিপূর্ণ নগরীয় দেশ হবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে; একটি গ্রামীণ দেশ, কৃষজ সমাজ থেকে একটি পরিপূর্ণ নগরীয় দেশ, নগরীয় সমাজ হবার পথে গ্রামীণ-নগরীয় দেশ, গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ হচ্ছে একটা মধ্যবর্তী পর্যায়; তবে এর স্থায়িত্ব কালও কম সময় নয়; তা মাথায় রেখেই পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এর সমস্যা ও তার সম্ভাব্য সমাধানসূত্র বাস্তবায়নের জন্য সামগ্রিকভাবে মানসিক ও শিক্ষাগত প্রস্তুতিও এখন থেকে নিতে হবে। এক হিসাব অনুযায়ী দ্রুত নগরায়নের ফলে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ৫০% এলাকা হয়ে যাবে নগরীয় এলাকা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১০০% এলাকা হয়ে যাবে নগরীয় এলাকা; অন্যভাবে বলা যায়, গ্রামীণ ইউনিটগুলি যেমন ইউনিয়নগুলি বিলুপ্ত হয়ে যাবে; তাতে কি হবে? তাতে গোটাদেশ নগরীয় ইউনিটে বিভক্ত হয়ে পড়বে। ফলে আজকের যে গ্রাম কিংবা আগের যে সনাতন গ্রাম তা মূলত জাদুঘরে ও বই-পুস্তকে ঠাঁই পাবে; বাস্তবে সেই গ্রামের চিহ্ন কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা। এই বিষয়টি আরেকভাবে অনুধাবন করা যেতে পারে, বর্তমানে প্রায় ৩৫% জনগোষ্ঠী নগরীয় এলাকায় বসবাস করে, ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০% জনগোষ্ঠী নগরীয় এলাকায় বসবাস করবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১০০% জনগোষ্ঠী নগরবাসী হয়ে যাবে। চলমান এই নগরায়ন প্রক্রিয়ায় একদিকে গ্রামীণ কৃষি পেশাতে কর্মসংস্থান বিপুলভাবে কমছে, কমতে থাকবে, এবং অন্যদিকে অন্যসব নতুন নতুন অকৃষি পেশাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, হতে থাকবে। তার আলামত প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে, বুঝা যাচ্ছে। সুতরাং দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায় যে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ মানে নগরীয় বাংলাদেশ; এখন আর বাংলাদেশ কেবল গ্রামীণ দেশ নয়; অবার বিদ্যমান গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশও চিরকাল গ্রামীণ-নগরীয় দেশ থাকবেনা; এটি একটি মধ্যবর্তী পর্যায়; এই মধ্যবর্তী পর্যায় থেকে দ্রুত নগরায়নের মধ্যদিয়ে চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ, নগরীয় সমাজ, নগরীয় সভ্যতা; বাংলাদেশ খুব দ্রুত তালে সেদিকেই এগিয়ে চলেছে। এই বিষয়টি বিশ্বাসে রেখে, তারই ভিত্তিতে একটি পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগরীয় বাংলাদেশ, নগরীয় প্রশাসনিক ইউনিট ও তার জন্য গতিশীল ‘নগর সরকারের রূপরেখা’ ও তা স্থাপন সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট সুস্পষ্ট প্রস্তাব সর্বপ্রথম ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারীতে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’য় উপস্থাপিত করা হয়েছে; এটি একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বিধায় তখন অনেকেই তা বুঝে উঠতে পারেনি, দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও এখনও অনেকে তা বুঝে উঠতে পারছেনা বলে প্রতীয়মান হয়; তবে আশার আলো হল, এটি নিয়ে সিডিএলজি, বাপসনিউজ, এমপো বাস্তবায়ন ফোরামসহ আরও অনেকে লাগাতার ক্যাম্পেইন চালিয়ে আসছে; আর দুঃখজনক বিষয় হল, ১৯৯৭ সাল থেকে সিডিএলজি’র এই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যাম্পেইন চলমান ও দৃশ্যমান থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, কৃষি মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ, একনেক, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রীপরিষদ ও জাতীয় সংসদ তা পুরোপুরি বুঝতে অপারগ কিংবা বুঝতে চায়না বলে প্রতীয়মান হয়; এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাগণের সেকেলে চিন্তাভাবনা ও কর্মকা- জাতিকে অনেক অনেক পেছনে ফেলে রেখেছে; বাংলদেশকে পিছনে ফেলে রাখার সেই অদূরদর্শি ধারা পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক প্রণীত ৭ম পঞ্চ বার্ষিক (২০১৬-২০২০) পরিকল্পনার চূড়ান্ত খসড়ায়ও রয়েছে; আর যারা নগরীয় ইউনিটে মেয়র ও কাউন্সিলর হয়েছে কিংবা হতে চায় তারাও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগর, নগরায়ন, নগরবাদ, নগরীয় কৃষি, নগরীয় সভ্যতা, নগরীয় কালচার, নগরীয় জীবনধারা ও নগর সরকারের রূপরেখা নিয়ে তেমন একটা চিন্তাভাবনা করে বলে প্রতীয়মান হয়না; ২০২০ ও ২০৫০ সালদ্বয়কে সামনে রেখে প্রতিটি নগর ভিত্তিক উন্নয়ন ও সেবামূলক সার্ভিস পরিচালিত করার লক্ষ্যে নগরীয় প্রশাসনিক ইউনিটগুলো সাজানো ও তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা ও কর্মসূচী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই, তা স্পষ্টভাবে বুঝা যায়; এ এক মহা হতাশাজনক চিত্র; এর অবসান হওয়া খুবই জরুরী বৈকি।
    সে যাই হোক, সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের প্রয়োজন হচ্ছে একটি দুই স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার পদ্ধতি; আর কেন্দ্রীয় সরকারসহ বাংলাদেশের প্রয়োজন হচ্ছে একটি তিন স্তরবিশিষ্ট সরকার পদ্ধতি। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে একটি দুই স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার কাঠামো স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করার দিকে যেতে হবে; দুইয়ের চেয়ে বেশী স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার কাঠামো থাকলে তাতে মধ্যবর্তী ইউনিট থাকবে, এখন যেমন উপজেলা রয়েছে; এই অপ্রয়োজনীয়, দায়দায়িত্বহীন, স্বশাসনহীন মধ্যবর্তী ইউনিটের অস্তিত্ব বজায় রাখাটা হচ্ছে, হবে কেবলই অপচয়মূলক ও উদ্দেশ্যমূলক; এই মধ্যবর্তী ইউনিট নিয়ে ইতোমধ্যে অনেক সময় ও অর্থ নষ্ট করা হয়েছে; আশাকরি, আর কাল বিলম্ব না ঘটিয়ে এই বিষয়টি নীতিপ্রণেতা ও আইনপ্রণেতাগণ যত দ্রুত সম্ভব বুঝার চেষ্টা করবেন এবং তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। ভুল ধারণা বশত বাংলাদেশকে এখনও একটি গ্রামীণ (রুরাল) দেশ মনে করা হয়; কিন্তু বাংলাদেশ এখন আর শুধু গ্রামীণ দেশ নেই; এই ভুল ধারণার পরিবর্তে বিদ্যমান বাস্তবতায় বাংলাদেশকে একটি গ্রামীণ-নগরীয় (রুরাল-আরবান) দেশ হিসেবে ধরে নিয়ে এবং ২০২০ ও ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ ও বিশ্বময় পরিবর্তনশীল বিষয়গুলি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৯৬ সালে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ণ বিষয়ক গবেষক আবু তালেব স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ (১) ও স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ (২) প্রণয়ন করেন, এবং তিনি তা ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী ঢাকায় জতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক জাতীয় সেমিনারের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের বিবেচনার্থে উপস্থাপিত করেন; এটি গ্রামীণ বাংলাদেশ এর পরিবর্তে গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য গণতান্ত্রিক স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রথম উদ্যোগ, প্রথম প্রচেষ্টা; দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সেবামূলক কর্মকা- ধাপে ধাপে (কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত) ধারাবাহিকতায় স্থিতিশীল গতিশীল প্রক্রিয়ায় পরিচালিত করার জন্য স্থানীয় সরকারের একটি স্তরবিন্যাসকরণ দেশের সূচনা লগ্ন থেকে ঠিক করার প্রয়োজন থাকলেও আজ অবধি এই কাজটি সচেতনভাবে সঠিকভাবে করার কোনো উদ্যোগ গৃহীত হয়নি, হচ্ছেনা; তা অবশ্যই খুবই দুঃখজনক ঘটনা; সে যাই হোক, তিনি উক্ত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয়ে মধ্যবর্তী ইউনিটগুলি, যেমন উপজেলা, ও অন্যান্য গ্রামীণ ইউনিটগুলি, যেমন ইউনিয়ন, কীভাবে আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাবে তা রেখাচিত্রের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন; এবং, ওই প্রস্তাবিত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয়ে গোটা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কীভাবে একটি দুই স্তরবিশিষ্ট কাঠামো হয়ে ওঠবে তাও গ্রাফে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন; তাতে তিনি সরকারের আকার আয়তন আস্তে আস্তে ছোট করার ব্যবস্থা করেছেন, ফলে কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সিস্টেম কস্ট কমে গিয়ে উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। উভয় কাঠামোতে ২০৫০ সালে কিংবা তার আগেই একটি পরিপূর্ণ ‘নগরীয় (আরবান) বাংলাদেশ’ গঠনের স্বপ্ন ও তার বাস্তবরূপ তুলে ধরা হয়েছে। বিদ্যমান ‘গ্রামীণ-নগরীয় (রুরাল-আরবান) বাংলাদেশ’ কি প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আস্তে আস্তে পরিপূর্ণ ‘নগরীয় (আরবান) বাংলাদেশ’ হয়ে ওঠবে এবং পরিপূর্ণ ‘নগরীয় বাংলাদেশ’ এ কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে স্থানীয় সরকার তথা শুধু নগরীয় স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ কি রূপ নিবে, নিতে পারে, তা ওই কাঠামোগত রেখাচিত্রে সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ও বোধগম্য করা হয়েছে; এ এক মহা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কাজ; এ এক মহা বিস্ময়কর ব্যাপার, বিষয়। যে কেউ এই কাজের গভীরতা ও তাৎপর্য বুঝতে পারলে শ্রদ্ধায় ভালবাসায় নত হয়ে যাবারই কথা; আমাদের প্রবল বিশ্বাস হচ্ছে, জনাব আবু তালেব ২০৫০ সালের মধ্যে “নগরীয় বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে, আগে পরিবেশ এই বিষয়টি মাথায় বেখে “পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগরায়ন” শব্দবন্ধের ইনকুবেটার ও ক্যম্পেইনার হিসেবে, ২০২০ সালের মধ্যে একটি ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ নির্মাণের স্বপ্নদ্রষ্টা ও তার বাস্তবায়নমূলক পরিকল্পনার প্রণেতা ও ক্যাম্পেইনার হিসেবে, নারীপুরুষের ৫০/৫০ প্রতিনিধিত্বের প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ ধারণার পরিবর্তে নারীপুরুষের জন্য এমপো তথা একশো একশো (১০০-১০০) প্রতিনিধিত্ব ফর্মুলা ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রণীত ১১ দফার ইনকুবেটার ও ক্যাম্পেইনার হিসেবে, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’র প্রণেতা হিসেবে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের রূপরেখার প্রণেতা হিসেবে, গণতান্ত্রিক আইনসভার রূপরেখার প্রণেতা হিসেবে, গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক অনেকগুলি শ্লোগানের রচয়িতা হিসাবে, গ্রামীণ বাংলাদেশ এর পরিবর্তে বর্তমান বাস্তবতায় একটি “গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ” এর ধারণা তুলে ধরার জন্য ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এখানে আরও জানিয়ে রাখা উচিত হবে যে, তার এই প্রশাসনিক কাঠামোগত রূপরেখা হচ্ছে ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রথম প্রস্তাবিত পরিকল্পনা, প্রথম দৃষ্টান্ত; যেটি দেশের অন্যসব ক্ষেত্রের জন্য ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সবাইকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে আসছে। প্রসঙ্গত বলা দরকার যে, তিনি এই রূপরেখায় ২০২০ সালের মধ্যে একটি ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ (যেটি ‘গণস্বপ্ন ২০২০’ নামে বহুল পরিচিত) নির্মাণ করার যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন ও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার পরিকল্পনা হাজির করেছেন তা অনেকে পরিপূর্ণভাবে না বুঝে কিংবা বুঝে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ‘ ও ‘উন্নত বাংলাদেশ’ এর মধ্যেকার বিশাল তফাতকে গুলিয়ে ফেলে বক্তব্য হাজির করার অপচেষ্টা করছেন বলে প্রতীয়মান হয়; ঠিক যেমন অনেকে না বুঝে এক সময় ‘জাতীয় সরকার/কেন্দ্রীয় সরকার’ আর ‘জাতীয় একতা সরকার’ বিষয়দ্বয়ের মধ্যেকার তফাত গুলিয়ে ফেলতেন; ওই তফাতের বিষয়টি গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় সর্বপ্রথম সুস্পষ্টভাবে হাজির করার পর তা গুলিয়ে ফেলার বিষয়টি প্রায় বন্ধ হয়েছে বলে মনে হয়। এখন একইভাবে ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ আর ‘উন্নত বাংলাদেশ’ এর মধ্যেকার ফারাক গুলিয়ে ফেলার বিষয়টি বন্ধ হলে ভাল হয়; এটি যাদের উদ্দেশ্যে বলা হল, আশা করি, তারা তা বুঝবেন এবং নিজেদেরকে সংশোধন করবেন। সে যাই হোক, বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ অন্য যারা ২০২০ সালের কথা বলছে, ২০২১ সালের কথা বলছে, ২০৩০ সালের কথা বলছে, ২০৪০ সালের কথা বলছে, ২০৪১ সালের কথা বলছে, ২০৫০ সালের কথা একটু আধটু উচ্চারণ করছে, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা বলছে এবং সর্বোপরি এডহক ভিত্তিক পরিচালিত কর্মকা-ের পরিবর্তে স্বপ্ন (ভিশন) ভিত্তিক কর্মকা- পরিচালনার কথা বলছে, তার উৎস, অনুপ্রেরণা, পথপ্রদর্শক, অনুঘটক হচ্ছে ওই রূপরেখা, ওই স্তরবিন্যাসকরণদ্বয় অর্থাৎ জনাব আবু তালেব, যার লাগাতার ক্যাম্পেইন তিনি নিউ ইয়র্ক থেকে সূচনার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে সফলভাবে পরিচালিত করেন। তবে জনাব আবু তালেব এর আহবান ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৯৭ সাল থেকে যদি ২০২০ ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক দেশের সকল স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন, গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হত, যদি ‘গণস্বপ্ন ২০২০’ ভিত্তিক ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ নির্মাণ প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন শুরু হত, যদি ‘গ্রামীণ বাংলাদেশ’ এর পরিবর্তে ‘গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ’ এর ধারণা সবাই বুঝত ও গ্রহণ করত, যদি ‘গণস্বপ্ন ২০৫০’ ভিত্তিক পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত ‘নগরীয় (আরবান) বাংলাদেশ’ মুখী নির্মাণ প্রক্রিয়া প্রচেষ্টা সচেতনভাবে শুরু হত, যদি ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্ব তথা এমপো’র বাস্তবায়ন ১১ দফা অনুযায়ী ধাপে ধাপে শুরু হত, যদি স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ (১) অথবা স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ (২) অনুযায়ী স্থানীয় সরকার কাঠামো বাস্তবায়ন শুরু হত, তাহলে আজ বাংলাদেশ আরো অনেক অনেক দূর সকল ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকতে পারতো; কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল তথা ইউনিয়ন ও নগর পর্যন্ত ধাপে ধাপে ক্ষমতাশীল দায়িত্বশীল দায়বদ্ধ গতিশীল সরকার কাঠামো দাঁড়িয়ে যেতে পারতো; সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে উঠতে পারতো। তবে বিলম্বিত হলেও স্বপ্ন ভিত্তিক কর্মকান্ডের প্রয়োজনীয়তা বোঝা ও কোনো কোনো বিষয়ে স্বপ্ন ভিত্তিক কর্মকান্ড শুরু হওয়াটা অবশ্যই প্রশংসনীয়; এতে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা রয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; তা সত্ত্বেও একে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাই। সে যাই হোক, বরাবরের মত এখনো জাতীয় নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমাদের সবিনয় অনুরোধ হল, প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ (১) ও স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ (২) আরো ভালভাবে জানুন এবং তা আরো গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করুন। আমরা তো সবসময় বলে আসছি যে, আগে স্থানীয় সরকারের একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ গ্রহণ করতে হবে, এবং সে অনুযায়ী সর্বোচ্চ ইউনিট (বিভাগীয় সরকার কিংবা জেলা সরকার) ও সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয় (ইউনিয়ন সরকার ও  নগর সরকার) কার্যকর করতে হবে। স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট বিভাগ, না জেলা তা আজ অবধি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত করা হয়নি; ক্ষমতা ও দায়িত্ব বিভিন্ন স্তরে যথাযথভাবে বণ্টনের স্বার্থে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি কেন ঠিক করা হয়নি সে প্রশ্ন রেখেই বলব সর্বোচ্চ ইউনিট কোন্টি তা অবশ্যই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঠিক করতে হবে। তবে বর্তমানে বিভাগ হচ্ছে মাঠ পর্যায়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ইউনিট; এই বিভাগ স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হলে উপজেলার পাশাপাশি জেলাও হয়ে যাবে মধ্যবর্তী ইউনিট এবং জেলার ক্ষমতা ও দায়িত্বও মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে নির্ধারিত করতে হবে; বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিভাগ বজায় থাকায় উপজেলার মত জেলাও মধ্যবর্তী প্রশাসনিক ইউনিট; ফলে জেলার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে কতটুকু থাকবে তা বুঝতে হবে; বিদ্যমান ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপজেলার মতই হবে, হতে বাধ্য; মনে রাখা দরকার যে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী ইউনিট থাকলে তা সাধারণত বেশ গুরুত্বহীন থাকে। এই বিষয়টি সেকেলে মনভাবগত কারণে অনেকে বুঝতে পারছেন না বলে প্রতীয়মান হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, বর্তমানে ৬৪টি জেলায় ৬৪ জন নিযুক্ত ‘নিধিরাম’ জেলা পরিষদ প্রশাসক রয়েছে, যাদের সঙ্গে দায়দায়িত্ব পালনের কোনো সম্পর্ক নেই, যাদের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই, যাদের উপস্থিতি, কর্মতৎপরতা টেরযোগ্য নয়; এর বড় কারণ হচ্ছে উপজেলার মত জেলাও বিদ্যমান ব্যবস্থায় গুরুত্বহীন, কামকাজহীন মধ্যবর্তী ইউনিট; কিন্তু এই ৬৪ জন প্রশাসকের জন্য আরাম আয়েস ও সুযোগসুবিধার কোনো কমতি নেই; এটি হচ্ছে স্থানীয় সরকারের নামে সংকীর্ণ স্বার্থে সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার ও উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রয়োগ; ঠিক যেমন স্থানীয় সরকারের নামে কেবল ব্যক্তিগত ও দলগত স্বার্থে অবৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট জিয়া ও অবৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট এরশাদ যথাক্রমে গ্রাম সরকার ও উপজেলাকে নিয়ে করেছেন। তাতে তখনকার সময় ও পরিস্থিতিতে উভয় অবৈধ প্রেসিডেন্টদ্বয় ব্যক্তিগতভাবে ও দলগতভাবে লাভবান হয়েছেন; কিছু সুবিধাবাদী ক্ষমতালোভী নীতিহীন টাউট লোককে নতুন দল দু’টির জন্য হাতিয়ার হিসেবে পেয়েছেন, এবং ওইসব সুবিধাবাদী মানুষগুলোই ওই দু’টো দলের বর্তমানকার আসল কান্ডারি হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ৬৪টি জেলায় ৬৪ জন প্রশাসক দ্বারা এই সরকার ও এই দল (আওয়ামী লীগ) এখন লাভবান হবার কোনও সম্ভাবনা নেই; কারণ এই দু’টো কাজের সময় ও পরিস্থিতি একদম এক রকম নয়। তা বর্তমান সরকারকে, আওয়ামী লীগকে অবশ্যই বুঝতে হবে; আশাকরি, বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সরকার ও আওয়ামী লীগ চিন্তাভাবনা করবে, এবং সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। পাশাপাশি, প্রাসঙ্গিকভাবে জেলা সংক্রান্ত আরেকটি বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলা উচিত হবে, তা হল সার্বিক বিবেচনায় একজন অসফল অর্থমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত জনাব মুহিত কর্তৃক উপস্থাপিত জাতীয় বাজেটে কেন্দ্রীয় সরকারের তথাকথিত ‘জেলা বাজেট’ প্রসঙ্গ; জেলা বাজেট হবার কথা জেলা সরকারের, কেন্দ্রীয় সরকারের নয়; প্রশ্ন হল, জেলা সরকার কোথায়? স্বাভাবিকভাবে মনে এই প্রশ্নও এসে যায় যে, কেন্দ্রীয় সরকার কি তাইলে বিভাগীয় বাজেট, উপজেলা বাজেট, নগরীয় বাজেট, ইউনিয়ন বাজেটও করবে? জেলা বাজেট বিষয়টি জাতীয় বাজেট বক্তৃতায়, দলিলে বার বার আসাটা শুধু অর্থমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রণালয় নয়, মন্ত্রিপরিষদ ও জাতীয় সংসদের অপরিপক্কতারই পরিচয় বহর করে; সিপিডিসহ কয়েকটি এনজিও এবং কিছু ব্যক্তি স্বার্থগত কারণে এই বাজে বিষয়টিকে সমর্থন দিয়ে থাকে; প্রকৃত অর্থে স্থানীয় সরকার না বুঝলে, ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন সম্পর্কিত বিষয় জানা না থাকলে এমনটি-ই হয়! হবার কথা! জনাব আবু তালেব ১৯৯৬ সালে সর্বপ্রথম ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ প্রণয়ন করেন এবং সেসঙ্গে একটি শ্লোগানও প্রণয়ন করেছিলেন; শ্লোগানটি হল, ‘জেলায় জেলায় গণতন্ত্রায়ন, জেলার জনগণের ক্ষমতায়ন’; জনাব মুহিত জনাব আবু তালেবের সঙ্গে এক ফোনালাপে ‘জেলা সরকার’ নামকরণ ও ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ বিষয়ক প্রস্তাবনার প্রতি প্রবল অপত্তি জানিয়ে ছিলেন; অথচ এই মুহিত সাহেব পরবর্তীতে ‘জেলায় জেলায় গণতন্ত্রায়ন’ শ্লোগানের আদলে ‘জেলায় জেলায় সরকার’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন; তাতে তিনি জনাব তালেব ও তার জেলা সরকারের রূপরেখা প্রসঙ্গ একটুও উল্লেখ করেননি; এই হল জনাব মুহিত কর্তৃক বুদ্ধিবৃত্তিক চুরির, ডাকাতির, অসততার একটি নজির মাত্র। আমরা দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলতে চাই যে, কোনো না কোনো একদিন অর্থমন্ত্রীর এই তথাকথিত ‘জেলা বাজেট’ হারিয়ে যাবে; এই ভুলের জন্য অর্থমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও জাতীয় সংসদ দুঃখ প্রকাশ করবে; জনাব আবু তালেব কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘জেলা সরকার’ ও ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ একদিন না একদিন বাস্তব প্রয়োজনে সামনে চলে আসবে; তাতে শয়তানিপনা না থাকলে জাতি বিশেষভাবে উপকৃত হবে; তবে, সিডিএলজির সমালোচনার মুখে এবার কেন্দ্রীয় বাজেট ২০১৬-’১৭ তে তথাকথিত ‘জেলা বাজেট’ বিষয় উবে গেলেও জেলা নিয়ে অন্য শয়তানিপনা প্রকাশ পেয়েছে; জনাব মুহিতের সেই শয়তানি কি সাংসদগণ বুঝতে পেরেছেন? তা তো বাজেট আলোচনায় একদম বোঝা যায়নি। অনুরূপ আরেকটি চুরি-ডাকাতি কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার ঘটনা ‘বিভাগীয় সরকার’ ও বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা’ নিয়ে ঘটিয়েছেন ‘কবিতা চোর’ ও ক্ষমতা দখলদার হিসেবে খ্যাত জেনারেল এরশাদ, তার দল জাতীয় পার্টি ও তার রাজনৈতিক ও শাসনিক সহযোগী জেএসডি; ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী ঢাকায় এক জাতীয় সেমিনারে জনাব আবু তালেব গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় বিভাগ এর বিলুপ্তি কিংবা বিভাগের গণতন্ত্রায়ন এই নীতিগত অবস্থান তুলে করেন, এবং বিভাগ থাকলে বিভাগগুলির গণতন্ত্রায়নের লক্ষে ‘বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা’ উপস্থাপিত করেন; তখন রাষ্ট্রপতি এরশাদ কারাগারে ছিলেন এবং তাঁর দল ও তাঁর শাসনিক মিত্র জেএসডির বিভাগ নিয়ে কিংবা বিভাগীয় সরকার নিয়ে কোনো ধরনের বক্তব্য, কর্মসূচি ছিলনা; জনাব আবু তালেব এর প্রস্তাব অনুযায়ী বিভাগের বিলুপ্তি কিংবা বিভাগীয় সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যখন বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছিল, ঠিক তখনই, এরশাদ সাহেব কারাগার থেকে বের হবার কয়েক বছর পর বিভাগকে ‘প্রদেশ’ নামকরণ ও তাতে বিভাগীয় সরকারের রূপরেখার আদলে অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে ‘প্রাদেশিক সরকার’ করার দাবী করেন; এর কিছুদিন পর এরশাদের অনুসরণে জনাব আ.স.ম. রব, জনাব সিরাজুল আলম খান ও জেএসডি অনুরূপ বক্তব্য, দাবী উপস্থাপিত করেন, অথচ উভয় দল কোথাও কখনও জনাব আবু তালেব কিংবা গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখার কথা বলেননি, বলেননা; একে এক কথায় বলা যায় চরম রাজনৈতিক অসততা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চুরি কিংবা ডাকাতি। এইসঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবে আরও একটি বিষয় তুলে ধরা দরকার তা হল, ১৯৯৭ সালেই এই রূপরেখায় পার্বত্য চট্রগ্রাম সমস্যার রজনৈতিক সমাধানের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ‘পার্বত্য বিভাগ’ নামে একটি নতুন বিভাগ গঠন করার প্রস্তাব করা হয়, এবং তাতে দেশের অন্যান্য বিভাগের মত, যেমন বরিশাল বিভাগে ‘বরিশাল বিভাগীয় সরকার’, পার্বত্য বিভাগে ‘পার্বত্য বিভাগীয় সরকার’ প্রতিষ্ঠার আহবান জানানো হয়, কারণ পার্বত্য চট্রগ্রামের বিষয়টিও অনেকাংশে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ক, স্থানীয় শাসনিক বিষয়ক একটি বিষয়, সমস্যা। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ১৯৯৭ সালের শেষ প্রান্তে সম্পাদিত পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে ‘আঞ্চলিক পরিষদ’ গঠন মূলত ‘বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা’র আদলে বিকৃত রূপে করা হলেও এই চুক্তির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার জন্য ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’, বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা তথা জনাব আবু তালেব এর অবদানের কথা, প্রস্তাবের কথা কোথাও বলা হয়নি, হয়না; পরবর্তীতে এই দলেরই বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদগুলির মধ্যে একজন সাংগঠনিক সম্পাদক এই পার্বত্য এলাকার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়; তার মাধ্যমে ‘পার্বত্য বিভাগ’ গঠনের নীতিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেছে, কবুল করেছে, অথচ এই বিষয়টিও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোথাও স্বীকার করেননি, করেননা; এও একটি চরম বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা নয়কি? অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও; ৮ জন বুদ্ধিবৃত্তিক ডাকাতের ডাকাতির ফসল হচ্ছে বর্তমানকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর; এই অপকর্ম সম্পর্কে দেশের কয়েকশত বিশিষ্ট ব্যক্তি জানেন; এসব কারণে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা যে একটা বড় ধরনের অপরাধ, বড় ধরনের রোগ তা বাংলাদেশে মানুষকে বুঝানোর জন্য, জানানোর জন্য এবং তা বন্ধ করানোর জন্য একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবল আন্দোলন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। সে যাই হোক, জেলা স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হলে বিভাগ অবশ্যই বিলুপ্ত হতে হবে; সেক্ষেত্রে উপজেলা শুধু মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে থাকবে, এবং তা আস্তে আস্তে কিংবা দ্রুততার সঙ্গে বিলুপ্ত হতে থাকবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট ও সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয় নির্ধারিত না হলে স্থানীয় সরকারের প্রতিটি ধাপে ক্ষমতা ও দায়িত্ব যথাযথভাবে ঠিকঠাক হবে-ই বা কেমন করে? সর্বোচ্চ ইউনিট এবং সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয়ে ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রদান করার পর মধ্যবর্তী ইউনিট তথা উপজেলায় ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেয়ার মত কিছু থাকলেই তো তা দেয়া যাবে। স্থানীয় সরকারের এসব জটিল ও কঠিন বিষয়গুলির একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বিত সমাধান ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’য় রয়েছে। এতে সর্বপ্রথম বিভাগীয় সরকার, জেলা সরকার, উপজেলা সরকার, ইউনিয়ন সরকার ও নগর সরকারের রূপরেখা একসঙ্গে উপস্থাপিত করা হয়েছে; যাতে একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ (প্রশাসনিক কাঠামো) গৃহীত হলে তার প্রতিটি টায়ার এ প্রয়োজন মত সুনির্দিষ্ট সরকার কাঠামো বসানোর কাজটি সহজে করা সম্ভব হয়। এই রূপরেখায় ইউনিয়ন ও নগর এর মধ্যে অন্য কোনো ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তা, প্রচেষ্টা একদম সমর্থন করা হয়নি, তার পরিবর্তে সর্বনি¤œ ইউনিট হিসেবে সমস্ত মনোযোগ, কর্মপ্রচেষ্টা এক দিকে গ্রামীণ এলাকায় ইউনিয়ন কেন্দ্রীক ও অপর দিকে নগরীয় এলাকায় নগর কেন্দ্রিক করার সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে; এবং এর মাধ্যমে শুধু গ্রামীণ এলাকা কেন্দ্রীক স্থানীয় সরকারের সর্বনি¤œ ইউনিট বিষয়ক দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা ধরিয়ে দিয়ে গ্রাম ও নগর কেন্দ্রীক একই স্তরে সর্বনি¤œ ইউনিটদ্বয় (ইউনিয়ন ও নগর এবং ইউনিয়ন সরকার ও নগর সরকার ) কেন্দ্রীক ধারণা উপস্থাপিত করা হয়।
 এবং এই গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় গ্রামীণ বাংলাদেশ তথা শুধু কৃষি ভিত্তিক সমাজ, দেশ এর চিরায়ত ধারণার পরিবর্তে বিদ্যমান বাস্তবতার নিরিখে গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ তথা কৃষি ও অকৃষি পেশা ভিত্তিক সমাজ, দেশ এর ধারণা তুলে ধরা হয়েছে, যার মাধ্যমে এই প্রথম বাংলাদেশের স্ট্যাটাসগত ও গুণগত পরিবর্তনের পরিচিতি উপস্থাপিত করা হয় এবং তা আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারীভাবে গ্রহণ করার দাবী জানানো হয়, তবে এই বিষয়টি  তখন ও এখন অনেকেই বিশেষত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, একনেক, অর্থ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ, জাতীয় সংসদ, মিডিয়া ও রাজনৈতিক দলগুলো বুঝতে পারছেনা বলে প্রতীয়মান হয়; প্রসঙ্গত এই বিষয়ে জানানো উচিত হবে যে, গ্রামীণ বাংলাদেশ আর গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এক বিষয় নয়, এক রূপ নয়, এক অবস্থা নয়; এ দু’টোর সমস্যা, সমাধান প্রক্রিয়া, গুরুত্ব ও তাৎপর্য এক রকম নয়; এই দু’টোর প্রশাসনিক কাঠামো, ক্ষমতা ও দায়িত্বও একরূপ হতে পারেনা; এই দু’টোতে মানুষের ভাবনাগত পার্থক্য থাকে, থাকবে। তাই এখন থেকে, গ্রামীণ বাংলাদেশ ভিত্তিক নয়, গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ ভিত্তিক সকল উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণীত, গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে হবে; এটি যত দ্রুত সম্ভব দেশের নীতিপ্রণেতাগণ, আইনপ্রণেতাগণ, বিধি-প্রবিধি প্রণেতাগণ ও মিডিয়াকে বুঝতে হবে এবং তার স্বীকৃতি ও পরিচিতি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান দিতে হবে যে, বাংলাদেশ এখন হচ্ছে একটি গ্রামীণ-নগরীয় দেশ; বাংলাদেশ একদা গ্রামীণ তথা কৃষিজ দেশ ছিলো, এখন আর তা নেই, এবং একে অবশ্যই একটি গুণগত পরিবর্তন হিসেবে নিতে হবে; সেইসাথে এও মনে রাখতে হবে যে, এই স্ট্যাটাসগত ও গুণগত পরিবর্তন কয়েক দশক স্থায়ী থাকবে; মনে রাখতে হবে যে, তা রাতারাতি উবে যাবেনা; এই সময়টায় একটি পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য মানসিক ও শিক্ষাগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।
এই রূপরেখায় কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারের জন্য প্রস্তাবিত সংসদগুলো গঠনের ক্ষেত্রে এমপো’র প্রয়োগ প্রস্তাব করা হয়েছে; এমপো তথা নারীপুরুষের একশো একশো প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি অনুযায়ী, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউনিয়ন সংসদ ও নগর সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ১ জন নারী সদস্য ও ১ জন পুরুষ সদস্য প্রতিনিধিত্ব করবে, জেলা সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলা সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা হতে একজন নারী সাংসদ ও একজন পুরুষ সাংসদ জেলা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবে এবং জাতীয় সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা থেকে ১ জন নারী সাংসদ ও ১ জন পুরুষ সাংসদ প্রতিনিধিত্ব করবেন; তার মাধ্যমে বিধানিক সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে নারীর জন্য অবমাননাকর “সংরক্ষিত আসন” শব্দবন্ধটি ইতিহাসে স্থান পাবে। এমপো শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা দুনিয়ার প্রতিটি দেশের প্রতিটি ধাপের সরকারের প্রতিটি বিধানিক সংসদ/পরিষদ গঠন করার জন্য বাস্তবায়নযোগ্য এক নতুন গণপ্রতিনিধিত্ব ফর্মুলা হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়েছে; এর মাধ্যমে নারীর জন্য অবমাননাকর সংরক্ষিত পদ্ধতি, ৩৩% পদ্ধতি, প্রতি তিন ওয়ার্ডে একজন সংরক্ষিত নারী সদস্য পদ্ধতি, সংরক্ষিত ঘূর্ণায়মান নারী সদস্য পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাগুলো, দুর্বলতাগুলো সংশোধিত হয়ে যাবে; নারী ও পুরুষ উভয় একই সাধারণ পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন;  তার জন্য বিশ্বজুড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যাম্পেইনও চলে আসছে; এই এমপো তথা একশো একশো প্রতিনিধিত্ব ফর্মুলার সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব ও তাৎপর্য হচ্ছে এক বিস্ময়কর ব্যাপার।  নারী ও পুরুষ উভয়ের যে কেহ এই ফর্মুলার সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বুঝতে পারলে, অনুধাবন করতে পারলে নিজ থেকে নিজ নিজ শক্তিতে বলিয়ান হয়ে আন্দোলন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে; তাই দেশের প্রতিটি মানুষের প্রতি আমাদের বিশেষ অনুরোধ হল, একশো একশো প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি তথা এমপো গভীরভাবে জানার বুঝার চেষ্টা করুন; নিজেকে একুশ শতকের এই মহান আন্দোলনের সঙ্গে, সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করুন; তাতে আপনার ও গোটা মানব জাতির জন্য যারপর নাই এক মঙ্গলময় পরিবেশ বয়ে আনবে।
সে যাই হোক, সুচতুর দলীয় ও নির্দলীয় নকলবাজগণ এই গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখার কিছু কিছু জনপ্রিয়, পছন্দনীয় বিষয় বারবার কাটাছেঁড়া ও বিকৃত করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে, এবং এর কিছু কিছু বিষয় নকলবাজরা নিজেদের নামে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে; কিন্তু নকলবাজগণ, বুদ্ধিবৃত্তিক চোর-ডাকাতগণ এই রূপরেখার সমন্বিত রূপের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব একটুও খাটো করতে সক্ষম হননি, হবেনও না; বরং এই রূপরেখার কালজয়ী উপযোগিতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাই, সরকারের প্রতি আমাদের বিনীত অনুরোধ হল, যদি গ্রামীণ বাংলাদেশ এর পরিবর্তে বিদ্যমান বাস্তবতায় গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত হিসেবে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চান, যদি গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য তিন প্রকারের স্থানীয় সরকার তথা গ্রামীণ স্থানীয় সরকার, নগরীয় স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় সরকার স্থাপিত হোক চান, যদি স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা ও দায়িত্ব ধাপে ধাপে অর্পিত ও পালিত হোক চান, যদি স্থানীয় সরকারের একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ (প্রশাসনিক কাঠামো) প্রতিষ্ঠিত ও কার্যকরী হোক চান, যদি দ্বি-স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা স্থায়ী রূপ নিক চান, যদি স্থানীয় সরকারের প্রতিটি ধাপে নারীর শতভাগ প্রতিনিধিত্ব তথা এমপোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে চান, যদি স্থানীয় সরকারের প্রত্যেক ধাপে ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি কার্যকর হোক চান, যদি স্থানীয় সরকারে বিধানিক পরিষদ (যেমন ইউনিয়ন সংসদ, নগর সংসদ) স্থাপিত হোক চান, যদি প্রতিটি স্থানীয় ইউনিটে ন্যায়পাল এর পদ চালু হোক চান, যদি ২০২০ সালের মধ্যে ২৫টি গণতন্ত্রায়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ তথা “গণস্বপ্ন ২০২০” বাস্তবায়িত হোক চান, যদি সর্বস্তরীয় গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতায়ন হোক চান, যদি ২০৫০ সাল কিংবা তার আগে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত “নগরীয় বাংলাদেশ” তথা “গণস্বপ্ন ২০৫০” বাস্তবায়িত হোক চান, যদি পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ (প্রশাসনিক কাঠামো) এক অথবা দুই বাস্তবরূপ নিক চান, যদি খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে “নগরীয় কৃষি” ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক চান, যদি “নগর মানে কৃষি নয়” এর পরিবর্তে “কৃষিকে নিয়েই নগর” বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হোক চান, যদি দক্ষ সরকার গড়তে সরকারের আকার আয়তন আস্তে আস্তে ছোট হোক চান, তাইলে আর কালবিলম্ব না করে এই রূপরেখার প্রতিটি বিষয় স্থাপন ও কার্যকর করার প্রকৃত উদ্যোগ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করুন; প্রসঙ্গত এও বলব যে, তা যেন নকলবাজী না হয়, তা যেন বুদ্ধিবৃত্তিক চুরি, ডাকাতি না হয়, তা যেন জনাব আবু তালেব এর অবদান অস্বীকার করার অভিপ্রায়, প্রয়াস না হয়। যিঁনি স্বপ্ন দেখেন, যিঁনি স্বপ্ন দেখান, যিঁনি স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপায় বাতলান, যিঁনি স্বপ্ন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করেন, যিঁনি স্বপ্নের বিষয়ে মানুষকে অনুপ্রাণিত করেন, সর্বোপরি যিঁনি স্বপ্ন বিষয়ে লাগাতার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন পরিচালিত করেন, তাঁকে অস্বীকারের সামান্যতম প্রয়াসও মহা অপরাধ, মহা অন্যায়, মহা কলংক হয়ে থাকবে; ঠিক যেমন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ৮ (আট) জন অসৎ লোক তা করেছে এবং তার জন্য এদেরকে মহা অপরাধের দায়ে মহা কলংক বহে বেড়াতে হচ্ছে, হবে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় এই মহা কলংকজনক বিষয়টি সম্পর্কে জনাব সৈয়দ হাসান ইমাম, জনাব নাসির উদ্দিন ইউসুফ, জনাব ড. মুনতাসির মামুন, জনাব ডা. মুসতাক হোসেন, জনাব শাহরিয়ার কবির সহ দেশ ও বিদেশের কয়েক শত বিশিষ্ট ব্যক্তি বিশেষভাবে অবগত রয়েছেন; তথাপি এই কয়জন লোক তাদের অসৎ কর্ম থেকে শুদ্ধতায় যায়নি, যাচ্ছেনা; এরা যেন দুই কান কাটা মানুষের মত রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলার আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাই তো বলি, তা যেন স্থানীয় সরকার স্থাপনের ক্ষেত্রে না ঘটে সেটি সবাই মনে রাখবেন বলে আশা করি।
    প্রতিবেদনটি পাঠক সমাজের ভালভাবে বোঝার সুবিধার্থে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক গবেষক এবং সিডিএলজি’র নির্বাহী পরিচালক জনাব আবু তালেব প্রণীত ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ থেকে প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১, স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ এবং মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো) ও তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে প্রণীত ১১ দফার কপি নিচে সংযুক্ত করা হল। আমরা আশা করি, পাঠকগণ, গবেষকগণ, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিগণ, নীতিপ্রণেতাগণ, আইনপ্রণেতাগণ, মন্ত্রীগণ, সরকারী কর্মকর্তাগণ, বিধি-প্রবিধি প্রণেতাগণ, সাংবাদিকগণ, আইনজীবীগণ, প্রকৌশলীগণ ও দেশের সকল পর্যায়ের সকল জায়গার নীতিনির্ধারকগণ বিশেষভাবে উপকৃত হবেন। যে কোনো ধরনের প্রশ্ন থাকলে, তথ্যমূলক প্রশ্ন থাকলে, কোনো কিছু অস্পষ্ট বলে মনে হলে তার জন্য সঠিক উত্তর যোগাতে আমরা যথাসাধ্য সচেষ্ট থাকব বলে অঙ্গীকার থাকল। পাঠকপাঠিকার বোঝার সুবিধার্থে আরও একটি বিষয় বলতে চাই, তা হল জনাব আবু তালেব এর গবেষণামূলক প্রস্তাবনাগুলোর উপস্থাপন পদ্ধতি হচ্ছে একজন দক্ষ চিত্রকরের মত; দক্ষ চিত্রকরের চিত্র দেখে তাঁর বিষয়, তাৎপর্য ও গভীরতা যেমন বুঝে নিতে হয়, ঠিক তেমনি তাঁর উপস্থাপিত রেখাচিত্র দেখে ও স্বল্প কথা পড়ে এর বিষয়গত সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য ও গভীরতা পাঠকপাঠিকাকে গভীর মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হবে, অনুধাবন করতে হবে। তবে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রায় দুই দশক সময় লেগে যাচ্ছে দেখে খুবই দুঃখ লাগে বইকি?
 
মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো)
একশো একশো প্রতিনিধিত্ব; একশো একশো ক্যাম্পেইন

 বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এমপো অনুযায়ী প্রণীত ১১ দফা
(১) জাতীয় সংসদের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা হতে একজন মহিলা জাতীয় সংসদ সদস্য ও একজন পুরুষ জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে হবে; (২) জাতীয় সংসদে একজন মহিলা ডেপুটি স্পীকার ও একজন পুরুষ ডেপুটি স্পীকার নির্বাচিত করতে হবে; (৩) ইউনিয়নের প্রতি ওয়ার্ডে একজন মহিলা মেম্বার ও একজন পুরুষ মেম্বার নির্বাচিত করতে হবে; (৪) ইউনিয়নে একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন ও একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারপার্সন নির্বাচিত করতে হবে; (৫) পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের প্রতি ওয়ার্ডে একজন মহিলা কাউন্সিলর ও একজন পুরুষ কাউন্সিলর নির্বাচিত করতে হবে; (৬) পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনে একজন মহিলা ডেপুটি মেয়র ও একজন পুরুষ ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত করতে হবে; (৭) উপজেলায় ‘মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো)’ অনুযায়ী নির্বাচিত একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন ও একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারপার্সন এর ক্ষমতা ও দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে; (৮) উপজেলা সংসদ, জেলা সংসদ ও বিভাগীয় সংসদ এর প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা হতে একজন মহিলা সদস্য ও একজন পুরুষ সদস্য নির্বাচিত করতে হবে; (৯) জেলা ও বিভাগে একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন ও একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারপার্সন নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে; (১০) জাতীয় সভা (জাতীয় আইনসভার উচ্চকক্ষ হিসেবে যদি কখনও এটি গঠিত হয়) গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলাকে একেকটি নির্বাচনী এলাকা ধরে নিয়ে প্রত্যেক জেলা হতে একজন মহিলা জাতীয় সভাসদ ও একজন পুরুষ জাতীয় সভাসদ প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত করতে হবে; (১১) ‘মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো)’ এর আলোকে অন্যান্য ক্ষেত্রেও ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্বে নরনারীর ক্ষমতায়ন যথাসম্ভব সুনিশ্চিত করতে হবে। (এই ১১তম দফা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়দ্বয়ে একজন মহিলা উপ-উপাচার্য ও একজন পুরুষ উপ-উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে। এই প্রক্রিয়া অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর করা যেতে পারে।)


আমাদের প্রবাসজীবন

শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০১৬

আমাদের প্রবাসজীবন

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) :: আমরা জীবন-জীবিকার তাগিদেই দূর প্রবাসে আছি। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন প্রায় কোটি কোটি বাংলাদেশি। এর মধ্যে বিরাট অংশ মধ্যপ্রাচ্যে। ইউরোপ, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর বহু দেশে বাংলাদেশিরা প্রবাসী হিসেবে আছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক জায়গায় ও এক মঞ্চে আনার উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছে ইউরোপের বাংলাদেশিদের সংগঠন অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন (আয়েবা)।
আগামী ১৯-২০ নভেম্বর মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিতব্য প্রথম বাংলাদেশ গ্লোবাল সামিটের প্রস্তুতি হিসেবে আয়েবার নেতারা স্বাগতিক দেশ মালয়েশিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশ কমিউনিটির বিভিন্ন নেতাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা করেন গত ২৫ সেপ্টেম্বর।

মতবিনিময় সভায় আয়েবার সাধারণ সম্পাদক, সহসভাপতিসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন, সিঙ্গাপুরপ্রবাসী বাংলাদেশ কমিউনিটির নেতারা ও মালয়েশিয়াপ্রবাসী ব্যবসায়ী, কমিউনিটির নেতা, অধ্যাপক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াসহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা বক্তব্য দেন। সভায় ইউরোপপ্রবাসী আয়েবার নেতাদের বক্তব্য থেকে প্রবাসজীবন বা প্রবাসী নিয়ে নতুন এক বিষয় উঠে এসেছে। বিষয়টা অবশ্যই নতুন নয়, পুরাতনই। এটা আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে অনেক দিন।
বিষয়টা হচ্ছে, প্রবাসজীবনের পার্থক্য। সব দেশ বা সব মহাদেশে প্রবাসজীবন এক নয়। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসজীবন আর মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে প্রবাসজীবন এক নয়, বিরাট পার্থক্য রয়েছে। পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের মিল শুধু এক জায়গায়, তা হলো দেশপ্রেম। প্রবাসে থাকলে দেশপ্রেম বাড়ে। সেটা হোক ইউরোপ, আমেরিকা বা মালয়েশিয়ায়। সবারই মনটা পড়ে থাকে মাতৃভূমিতে। ধূলিমাখা বাংলার মেঠো পথে।
প্রবাসে যাপিত জীবনে একজন মানুষ হিসেবে প্রাপ্য মানবাধিকার, সম্মান, চাওয়া-পাওয়া সব দেশে এক নয়। ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ায় একজন প্রবাসী যে মানবাধিকার ভোগ করেন তা মালয়েশিয়ার মতো দেশে কল্পনাও করা যায় না। সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, মালয়েশিয়ার মতো দেশে একজন প্রবাসী বিশ বছর থেকে জীবন–যৌবন সব সে দেশে কাটিয়েও তাঁর ভিসা-পাসপোর্টের টেনশনের শেষ হয় না। মালয়েশিয়ার মতো দেশে টানা আট-দশ বছর কষ্টার্জিত পয়সায় ভিসা লাগিয়ে হঠাৎ ভিসা নবায়ন হয় না। কারও কারও দুই-তিন বছর পর ভিসা নবায়ন হয় না। প্রবাসে এসে প্রবাসীরা ঋণ শোধ করে পারিবারিক আর্থিক সচ্ছলতা আনার পর্যায়ে বেশির ভাগ ভিসা জটিলতায় পড়েন। তখন শুরু হয় অনিচ্ছাকৃত অবৈধ প্রবাসজীবন। মালয়েশিয়ায় অনেক ইন্দোনেশিয়ান প্রবাসীরা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও টাকা বাঁচানোর জন্য পারমিট করেন না। মানে বৈধ কাগজপত্র করেন না। অথচ কোনো বাংলাদেশিই অবৈধ থাকতে চান না। সুযোগের অভাবে বাংলাদেশিরা অবৈধ হন। বিদেশি শ্রমিক আইনের কারণে তাঁরা অবৈধ হন। প্রবাসীদের মাঝে একটা কথা প্রচলিত আছে, মালয়েশিয়ার সরকারের নিয়মের শেষ নেই। তা শুধু প্রবাসীদের জন্য। অর্থাৎ প্রবাসীদের জন্য আজ এক আইন হলে কাল অন্য আইন হয়। এর বড় উদাহরণ গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আনার চুক্তি করে পরদিন উল্টে যাওয়া।
কথাগুলো বলছি আয়েবার মতবিনিময় সভায় আয়েবার সাধারণ সম্পাদক কাজী এনায়েত উল্লাহ, আরেক বক্তা জ্বালানি বিশেষজ্ঞ খন্দকার সালেক সুফি ও ফখরুল আকম সেলিমসহ ইউরোপ থেকে আসা কয়েকজনের বক্তব্যের সূত্র ধরে। অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সপ্রবাসী এ বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্দেশে কথা বলতে গিয়ে বারবার মালয়েশিয়াকে আপনাদের দেশ, আপনাদের দেশে (মানে মালয়েশিয়া মালয়েশিয়াপ্রবাসীদের দেশ) উল্লেখ করেছেন অভ্যাসবশত। কারণ তাঁরা এ সামিটের জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ কমিউনিটির সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। ওখানে সব দেশেই সংশ্লিষ্ট দেশকে তাঁদের দেশ বলেছেন।
যদিও তাঁরা সবাই বাংলাদেশকেই নিজের দেশ মনে করেন। কাজ করছেন বাংলাদেশের জন্য, বাংলাদেশের মানুষের জন্য। যে দেশে প্রবাসী হিসেবে থাকেন সে দেশও তাদের নাগরিকত্ব ও মর্যাদা দিয়েছে। তাই সে দেশকেও তাঁরা তাঁদের দেশ বলতে পারেন। কিন্তু মালয়েশিয়া নয়। এই দেশে মানুষ এই আছে তো এই নাই। আছে আছে, নাই নাই করেও কাটিয়ে দেন ১০-১৫ বছর বা ২০ বছর। এক যুগ কাটিয়েও এখানে ভিসা-পাসপোর্টের চিন্তা মুক্ত হওয়া যায় না। তাই মালয়েশিয়ায় প্রবাসজীবন আর ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসজীবন কখনো এক নয়।
মালয়েশিয়ার মতো দেশে অস্থিরতা কাটিয়ে স্থায়ী স্বস্তির নিশ্বাস নেওয়া যায় না। ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ায় যেটা হয়। স্থায়ী হওয়ার উদ্দেশ্যে আমার এক আত্মীয় ২০০৮ সালে টুরিস্ট ভিসায় ফ্রান্সে যান। পাঁচ-ছয় বছর থেকেও ফ্রান্সে তাঁর থাকার বৈধ কাগজপত্র করতে পারছেন না দেখে তিনি ফ্রান্স থেকে পর্তুগাল চলে যান। পর্তুগালে তিনি মাত্র বছর দেড়েকের মাথায় বৈধ কাগজপত্র পেয়ে যান। অবশেষে অস্থিরতা কাটিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে তিনি দেশে গিয়ে বিয়ে করেন। যত দিন তিনি ইউরোপে থাকবেন কাগজপত্রের কঠিন ঝামেলা হয়তো আর আসবে না। ফ্রান্সে থাকার সময় তাঁর কাগজপত্র না হলেও তাঁকে কখনো পুলিশে ধরেছে বলে শুনিনি। মালয়েশিয়ায় হলে তা কেমন হতো এটা না-ই বা বললাম আর।
মালয়েশিয়ার মতো দেশে যত দিন, যত বছর থাকবেন তত দিন কাগজপত্রের ঝামেলা কাঁধে নিয়েই থাকতে হবে।

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন
মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্রেষ্ঠ অবদান= ড. মীজানুর রহমান

শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০১৬

রাজনৈতিক পরিবারে রাজনৈতিক আবর্তের মধ্যেই জন্ম শেখ হাসিনার। সে অর্থে জন্ম থেকেই রাজনীতিতে জড়িত তিনি। পরবর্তীকালে ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী, ছাত্রনেত্রী, সব বাদ দিয়ে ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ধরলেও বাংলাদেশের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কা-ারির পদে আছেন ৩৫ বছর। আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-নিপীড়ন, হত্যাপ্রচেষ্টাসহ বহু বাধা-বিঘœ পেরিয়ে তিনবার এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় এনেছেন তার দলকে। নিজেও তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী। কেউ যদি শেখ হাসিনার অর্জনগুলো মূল্যায়ন করতে চানÑ এর একটি দীর্ঘ তালিকা প্রণয়ন করা যাবে। সেই দীর্ঘ তালিকার কয়েকটি হলোÑ দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা, বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, ছিটমহল বিনিময় ও স্থলসীমা নির্ধারণ, দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় অভূতপূর্ব সাফল্য, নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণসহ অনেকগুলো মেগা প্রকল্প গ্রহণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে ফিরিয়ে আনা, জঙ্গিবাদ দমন ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ প্রভৃতি। তবে আমার মতে, গত ৩৫ বছরের শীর্ষপদে রাজনৈতিক অবস্থান থেকে শেখ হাসিনার দেশের জন্য শ্রেষ্ঠ অবদান হচ্ছেÑ ‘রাজনীতির বেসামরিকীকরণ’। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কেবল জাতির জনককে হত্যা করা হয়নি, গণতন্ত্রকেও বন্দি করা হয় সেনানিবাসে। সেই সময় থেকে পুরো পাকিস্তানি ভাবধারায় দেশকে পরিচালিত করা হয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সামরিক বাহিনীর অনধিক একশ অফিসার অংশগ্রহণ করেছিল। ১৯৭৩-এর শেষে পাকিস্তান থেকে আগত অফিসারের সংখ্যা ছিল প্রায় এগারশ এবং সাধারণ সৈনিকের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ হাজার। মুষ্টিমেয় কয়েকজনকে ছাড়া প্রায় সবাইকেই সামরিক বাহিনীতে আত্তীকরণ করা হয় (পঁচাত্তরের রক্তক্ষরণ; মেজর রফিকুল ইসলাম, ২০১১, পৃ. ১১)। শুধু তাই নয়, জনাদশকের মতো বাঙালি অফিসার পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১-এ মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। তাদের সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে না নিলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানীর সুপারিশে পুলিশ বাহিনীতে আত্তীকরণ করা হয়। এদের সতীর্থ একজন মির্জা রকিবুল হুদা চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার থাকাকালে ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামের জনসভামুখী মিছিলে গুলি করে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হিসেবে আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিল। যেখানে ২৬-২৭ জন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মী নিহত হন। স্মরণ করা যেতে পারে, এই মির্জা রকিবুল হুদা জামায়াত-বিএনপি জোট ক্ষমতাসীন হলে পুলিশের উচ্চ পদে আসীন হয়। উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর বেসামরিক প্রশাসনে বঙ্গবন্ধু দেশের বৃহত্তম স্বার্থে সবাইকে কাজে লাগানোর নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে যেসব সিএসপি ও ইপিসিএস কর্মকর্তা শেষদিন পর্যন্ত পাকিস্তানের পক্ষে চাকরি অব্যাহত রেখেছিল, তাদেরও ক্ষমা করে দেশসেবার সুযোগ দেন। সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন এরা এখন বাংলাদেশের পক্ষেই কাজ করবেন। বঙ্গবন্ধুর সরল বিশ্বাস এখানে কাজ করেনি। সেনানিবাস ও সচিবালয় উভয় পাড়াতেই পাকিস্তানপন্থিরা সক্রিয় হয়ে শক্তি সঞ্চয় করে চরম আঘাত হানার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকে। মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া সর্বশেষ প্রাক্তন সিএসপিটি অবসরে যাওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত বাংলাদেশবিরোধী যড়ষন্ত্র অব্যাহত রাখে। বাংলাদেশের প্রথম ত্রিশ বছরে উন্নয়নের ধীরগতির জন্য অনেকেই আমলাদের পাকিস্তানি মানসিকতাকেই দায়ী করেন। আমাদের মাথাপিছু আয় ৫৪০ ডলার পর্যন্ত আসতে সময় লেগেছিল প্রায় ত্রিশ বছর। ৫৪০ থেকে প্রায় ১৫০০ ডলার তথা তিনগুণ হতে সময় লেগেছে মাত্র দশ বছর। অর্থাৎ সেই সিএসপিরা বলতেন তাদের ছাড়া দেশ চলবে না। অথচ তাদের সবার অবসর গ্রহণের পরই কেবল বাংলাদেশের উন্নয়ন ঘটেছে।

দেশি-বিদেশি যৌথ ষড়যন্ত্রে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকেই জেঁকে বসে পাকিস্তানি প্রতিনিধি সামরিক চক্র। উল্টোপথে যাত্রা শুরু করল বাংলাদেশ। স্বৈরশাসকরা দেশে গণতন্ত্র চর্চার সব সম্ভাবনাকেই বন্দি করল সেনানিবাসে নিয়ে। অথচ কুমিল্লা সেনানিবাসে সামরিক একাডেমির প্রথম ব্যাচের সমাপনী অনুষ্ঠানে নতুন অফিসারদের উদ্দেশে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যেন পাকিস্তানি মনোভাব না আসে।... তোমরা হবে আমাদের জনগণের বাহিনী... তোমরা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে।’ বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় এটা কখনোই আসেনি এই ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ ফরমেট এমনভাবে সাজানো ছিল যার মধ্যে ‘নামাজ-রোজা-ইসলাম-উর্দু-পাকিস্তানকে’ একাকার করে ভারতবিদ্বেষী একটি পাকিস্তানি ভাবাদর্শের অনুকরণীয় সেনাবাহিনীর বীজ প্রশিক্ষণের সময়ই ক্যাডেটরা পেয়ে গিয়েছিল তাদের অজান্তেই। সেনাবাহিনীর তখনকার প্রশিক্ষণ মডিউলগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ‘আমাদের বাহিনী’ হওয়ার উপকরণ খুব কমই ছিল। এখন সেনা প্রশিক্ষণের মডিউলে অনেক পরিবর্তন এসেছে, তার পরও আরও অনেক কিছু করণীয় আছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া ও প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ায় বিশুদ্ধতা সন্দেহের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে হবে। সন্দেহ করা হচ্ছে এ জন্য যে, যুদ্ধাপরাধের শিরোমণি গোলাম আযমের ছেলেরও এ দেশের সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদের কাছাকাছি আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি। আরও কত রাজাকারের সন্তান একই মানসিকতা নিয়ে এখনো বহাল তবিয়তে গুরুত্বপূর্ণ পদে আছে তা জরুরি ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা উচিত। বিডিআর বিদ্রোহের পর সেনানিবাসে প্রধানমন্ত্রীর সামনে রাখা কিছু অফিসারের মন্তব্যে এর প্রমাণ আছে। অনেক সময় রাজনৈতিক দর্শনের বিপরীতমুখী কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত না করে কম গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় প্রশিক্ষণ একাডেমির দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়। অন্তত সিভিল প্রশাসনে এটা প্রায়ই দেখা যায়। একই কাজ যদি সেনাবাহিনীতে হয় তাহলে সর্বনাশের আর কিছু বাকি থাকে না।

প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের পুনঃপাঠ কিছুটা হলেও শুরু হয় নব্বইয়ের দশকে জিয়ার উত্তরসূরি এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে। এর আগ পর্যন্ত প্রত্যেকটি সরকারেই সামরিক শক্তির কর্তৃত্বাধীন ছিল। মন্ত্রিপরিষদের ৪০ শতাংশের ঊর্ধ্বে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি ছিল। বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে এ দেশের মানুষ দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর গণতন্ত্রের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ ‘স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার’ প্রয়োগ করতে পারল। কিন্তু শহীদ নূর হোসেনের বুকের লেখা গণতন্ত্র পুরোপুরি মুক্তি পেল না। আংশিকভাবে থেকে গেল সেনানিবাসেই। সেনানিবাসেই থেকে গেলেন গণতান্ত্রিক দেশের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সামরিক গোয়েন্দাদের খবরদারির পুরোটাই থেকে গেল সরকার ব্যবস্থায়। পরবর্তী সময়ে আরও দুটি নির্বাচনে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ও পরে ২০০১-এ বিএনপি ক্ষমতায় এলেও (বিরোধী দলের নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী সেনানিবাসেই থেকে গেলেন) পাকিস্তানি কায়দায় সামরিক গোয়েন্দারা যে সবকিছুতেই নাক গলাচ্ছিল তার প্রমাণ মেলে ১/১১-এর ষড়যন্ত্রের সময়। প্রকাশ পেতে থাকে আমিন-বারী নামধারী ব্রিগেডিয়ারদের হাতেই বন্দি ছিল এ দেশের গণতন্ত্র। এসব ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সেনানিবাসে জন্মগ্রহণ ও বসবাসকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততা সুস্পষ্ট।

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একটি টার্নিং পয়েন্ট হচ্ছে ২০০৯-পরবর্তী সময়ে দেশের বৃহত্তম একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বকে দেশে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে আইনসিদ্ধভাবে সেনানিবাসের বাইরে নিয়ে আসা। এখানেই আমি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি স্থায়ী ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি। এখন সংসদে, রাজপথে বা মিডিয়ায় যেভাবে গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে তা নিয়ে অনেক সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু আজ থেকে ৭-৮ বছর আগেও রাজনৈতিক অঙ্গনে কোনো অস্থিরতা বা উত্তপ্ত অবস্থার সৃষ্টি হলেই যেমনটি শোনা যেত উত্তরপাড়ার (সেনানিবাসে) খবর কী? এখন আর তেমনটি শোনা যায় না। এক সময় একজন পান বিক্রেতা বা রিকশাঅলাও সেনাবাহিনীর প্রধান, তার পরবর্তী, এর পরবর্তী প্রধানেরও নাম জানত। এমনকি সাভার সেনানিবাসের জিওসি কে? ট্যাংক রেজিমেন্টের দায়িত্বে কে? ইত্যাদি খবরও সাধারণ মানুষের মুখে মুখে থাকত। এখন সেদিন আর নেই। আর সেটা সম্ভব হয়েছে সেনানিবাসে অবস্থানকারী একটি দল ও তার নেত্রীকে বের করে নিয়ে আসার কারণেই। অবশ্য সেনানিবাসের স্থায়ী বাসিন্দাদের মনোভাবের পরিবর্তনও এটাকে সম্ভব করেছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে গড়ে ওঠা সেনাবাহিনী সত্যিই এখন আমাদের বাহিনী। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মতো বারবার নিজের দেশ দখল (ক্ষমতা) করার মানসিকতা আমাদের সেনাবাহিনীতে এখন আর কেউ ভাবে না। আমাদের সেনাবাহিনী এখন সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ একটি দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী।

গণতন্ত্র চর্চায় আমাদের অনেক সমস্যা আছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব, গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, দলের মধ্যে গণতন্ত্রচর্চার অভাব, নির্বাচিত পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ ইত্যাদি অনেক সমস্যা আমাদের গণতন্ত্রের আছে। জনসাধারণের মধ্যেও গণতন্ত্রের বিভ্রান্তি রয়েছে। আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছি, যুদ্ধাপরাধী দলের বিচার চাচ্ছি। কিন্তু প্রায় সব শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের তথাকথিত জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। এদের অনেকেই অর্থ, পেশিশক্তি, ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়েছে এবং প্রশাসনিক সহায়তা পেয়েছে এটা যেমন সত্য, তেমনি এসব অভিযোগ তুলে যেসব জনগণ ‘নিজামী-মুজাহিদ-সাকা চৌধুরীকে’ ভোট দিয়েছিল তাদের কী দায়মুক্তি দেওয়া যাবে? এগুলো আমাদের গণতান্ত্রিকভাবে সমাধান করতে হবে। মতপার্থক্য ও সীমাবদ্ধতাগুলো আমাদের গণতান্ত্রিকভাবেই মোকাবিলা করে এগিয়ে নিতে হবে গণতন্ত্রকে। গণতন্ত্রের সঙ্গে উত্তরপাড়ার জড়াজড়ি বা রেষারেষি কোনোটাই কাম্য নয়।

লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়