Slideshows

ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার
ব্যানার

পরিচালনা পরিষদ 

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

ওসমান গনি
 

প্রধান সম্পাদক

হাকিকুল ইসলাম খোকন
 

সম্পাদক

সুহাস বড়ুয়া হাসু
 

সহযোগী সম্পাদক

আয়েশা আকতার রুবী

লেখকদের কলাম

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মালয়েশিয়ার সঙ্গী হোন!

শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৬

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে : একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন যে এক কোটি বাংলাদেশি প্রতিবেশী ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারা গতকালের দৈনিক আমাদের অর্থনীতির শিরোনামে বিস্মিত হবেন বৈকি! তাতে উম্মুল ওয়ারা সুইটি রচিত সংবাদের শিরোনামটি হচ্ছেÑ ‘রোহিঙ্গাদের দুয়ার খুলে স্রোতের মতো আসতে দিতে পারি না : প্রধানমন্ত্রী’।

সেটি গত বুধবার বিকালে দশম জাতীয় সংসদ অধিবেশন চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রদত্ত বক্তব্য থেকে উদ্ধৃত। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থী যারা এসেছে তাদের যথাসাধ্য সহযোগিতা দিচ্ছি। আমাদের যতটুকু করার করছি। কিন্তু স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আমরা দুয়ার খুলে স্রোতের মতো আসতে দিতে পারি না। মিয়ানমার দূতাবাসের মাধ্যমে তাদের দেশের সরকারের কাছে বার্তা দিয়েছি, এমন কোনো অবস্থার সৃষ্টি করবেন না যেন ওখান থেকে শরণার্থী বাংলাদেশে আসে’। তাতে তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশে একটা ঘটনা ঘটেছে। যারা মিয়ানমারের ৯ জন বর্ডার পুলিশকে হত্যা করেছে, সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ করেছে, তাদের কারণে এটা হচ্ছে। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটালো তাদের কারণে হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশু কষ্ট পাচ্ছে। যারা ঘটনা ঘটিয়েছে তারা বাংলাদেশে আছে কি না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছি তাদের খুঁজে বের করতে। যখনই আমরা পাব মিয়ানমার পুলিশের হাতে দিয়ে দেব। বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে কেউ প্রতিবেশী রাষ্ট্রে সন্ত্রাসী কর্মকা- ঘটাবে আমরা সেটা করতে দেব না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিয়েছে। একদিকে মানবতার দিকটা দেখতে হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশে যেন কোনো অঘটন না হয় সেদিকটাও দেখতে হচ্ছে’।

Picture

আপাতদৃষ্টিতে প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে যা উদ্ভাসিত, সেক্ষেত্রে তিনি মানবতার পাশাপাশি ‘প্রতিবেশী দেশে যেন কোনো অঘটন না হয়’ সেটির প্রতিই অতিমাত্রায় উদ্বিগ্ন। প্রশ্ন উঠতে পারেÑ সেই প্রতিবেশী মিয়ানমার বাংলাদেশের কোনো অভ্যন্তরীণ অঘটন নিয়ে তাদের সংসদে তেমন উদ্বেগ কখনো কী প্রকাশ করেছে? যে ঐতিহাসিক দশ ট্রাক অস্ত্র উলফার সামরিক প্রধান স্বয়ং পরেশ বড়–য়া কর্ণফুলী পোতাশ্রয়ে খালাস করতে এসেছিলেন, সেই অস্ত্র তো মিয়ানমার উপকূল দিয়েই নৌকায় এসেছিল। এমনকী সেই পালিয়ে যাওয়া পরেশ বড়–য়া মিয়ানমার সীমান্ত দিয়েই পরবর্তীতে আবারও ভারতে অস্ত্রের চালান পাঠাতে সক্ষম হন। কিন্তু ভারত প্রতিনিয়ত বাংলাদেশকে দোষারোপ করেছে। কেননা পরেশ বড়–য়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী উলফার লোকজনেরা বাংলাদেশে বসবাস করেছে। সেই থেকে বাংলাদেশ অবনত মস্তকে বলতে বাধ্য হয়েছে, ‘বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে কেউ প্রতিবেশী রাষ্ট্রে সন্ত্রাসী কর্মকা- ঘটাবে আমরা সেটা করতে দেব না’। আমার ওই অবস্থানের প্রতি কোনো দ্বিমত নেই এবং কারোর থাকার কথা নয়। কিন্তু এখানে ‘মাইনক্যার চিপা’য় পড়ে থাকার মতো আমাদের অবস্থান, যেন দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘটিত সব অঘটনের দায় ও উদ্বেগ আমাদের! তাই প্রশ্নাতীতভাবে মিয়ানমারের ৯ জন বর্ডার পুলিশ হন্তারক খুঁজতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে নিজ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিতে হয়েছে এবং সেই হন্তারক ধরা পড়লে মিয়ানমার পুলিশের হাতে তুলে দিতে সংসদে তিনি নিজেই স্বেচ্ছায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অবশ্যই তাদের খুঁজে বের করুন ও তুলে দিন, তাতেও কারও আপত্তি নেই।

কিন্তু পুরো রোহিঙ্গা বিষয়ের ইতিবৃত্ত এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বহু বছর ধরেই তারা জাতিগত বিদ্বেষ ও সহিংসতায় বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছে এবং জাতিসংঘের অর্থনৈতিক সহায়তায় এশিয়ার উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ পর্যন্ত একমাত্র বাংলাদেশেই নিখোঁজ দেড় লাখসহ প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরে রয়েছে। এ জন্য এই রোহিঙ্গাদের আন্তর্জাতিক পরিচিতি ‘ভিটে, মাটি ও রাষ্ট্রহীন উদ্বাস্তু’ এবং ব্রিটিশ সরকার তদানীন্তন বার্মা ও আজকের মিয়ানমারকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণার সময় বলে গেছে তারা বাংলাদেশের উদ্বাস্তু, যার কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিবাদ কখনো পাকিস্তান বা বাংলাদেশ করেনি। অথচ রোহিঙ্গাদের বসবাস মিয়ানমারে সহস্র বছরের পুরনো। ফলে গত পঞ্চাশ বছরে দেশটির সামরিক জান্তারা চরম নৃশংসতায় রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্রহীন করেছে।

সেই নিষ্পেষিত ও নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের পরিণতি এতটাই দুর্ভাগ্যজনক যে, গত রোববার দিবাগত রাতে রাখাইনের মংডুর উত্তরাঞ্চলে নাফ নদীর তীরে যে শিশু জয়নালের লাশ পত্রিকার পাতায় প্রকাশ পেয়েছে, তাতে ‘রোহিঙ্গাদের দুয়ার খুলে স্রোতের মতো আসতে দিতে পারি না’ প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য কতটা মানবিকতার বহির্প্রকাশ? অথচ ২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর ভূমধ্যসাগরের তীরে মুখ থুবড়ে পড়া যে তিন বছরের শিশু আইলান কুর্দির লাশের ফলশ্রুতিতে সমগ্র ইউরোপে সিরীয় শরণার্থীদের জন্য আশ্রয়ের দ্বার খুলে যায়। স্বয়ং জার্মানির লৌহমানবী চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলও ১০ লাখ সিরীয়কে আশ্রয় দেন। জাতিসংঘের উদ্বাস্তু সংস্থা থেকে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বিতাড়নের ফলে প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে পালিয়েছে। কিন্তু ওই সংখ্যাটি সরেজমিনে যারা কক্সবাজার ও টেকনাফ থেকে বিজিবির নৌকা ফেরত রোহিঙ্গাদের রিপোর্ট করেছেন, সেটির সঙ্গে তুলনা করলে সবাই বাংলাদেশে এসেছে তেমন সদুত্তর মিলে না। তবে বিস্ময় জাগলেও মেনে নিতে হবে অধিকাংশ শরণার্থীই আমাদের অরক্ষিত জঙ্গলবর্তী সীমান্ত দিয়ে এসেছে এবং এদের অধিকাংশই ধর্ষিত আর্তির রোহিঙ্গা নারী।

সেই প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা গণহত্যায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের ভূমিকাটি বিশ্ব মিডিয়ায় শিরোনাম হয়েছে। কেননা তিনি নিজেই রাজধানী কুয়ালালামপুরের স্টেডিয়ামে আয়োজিত দুটি ‘মালয়েশিয়া-মিয়ানমার ফ্রেন্ডলি ফুটবল ম্যাচ’ বাতিল করে প্রতিবাদ সমাবেশের নেতৃত্ব দেন এবং বার্তা সংস্থা এপির প্রেরিত সেই রিপোর্টের শিরোনাম হয়: মালয়েশিয়ান পিএম লিডস প্রোটেস্ট অ্যাগেইনস্ট ‘জেনোসাইড’ অব রোহিঙ্গা। তাতে বলা হয়েছেÑ তিনি মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচিকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘এই গণহত্যা বন্ধ করুন’। পাশাপাশি বলেন, ‘জাতিসংঘ কিছু একটা করুন। বিশ্ব এই গণহত্যা নিশ্চুপ অবলোকন কিংবা নিজেদের সমস্যা নয় বলে অস্বীকৃতি জানাতে পারে না। আমি চোখ বন্ধ করে নিশ্চুপ থাকতে পারি না। কেবল (রোহিঙ্গারা) আমাদের ধর্মাবলম্বী বলে নয়, বরং তাদের সুরক্ষা করতে চাই, কারণ তারাও মানুষ’। এমনকী তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিষ্পেষণ ইসলামেরই অবমাননা। তাই তিনি ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জকো উইডডোকেও জাকার্তায় অনুরূপ সমাবেশের আহবান জানিয়েছেন। যদিও তার সেই ভূমিকা ‘আসিয়ান’ সদস্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিমালাকে ভঙ্গ করেছে, তথাপি তিনি দৃঢ়তায় কথাগুলো বলেছেন।

একইসঙ্গে এ বছর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মালয়েশিয়া ভোটারহীন সদস্য হিসেবে সভাপতিত্ব করায় ধারণা করা হচ্ছে সেখানে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দেশটির একটি প্রস্তাবনা উত্থাপনের জোর সম্ভাবনা রয়েছে। তাতে বাংলাদেশ কি নিজস্ব সার্বভৌমত্বের উদ্বেগ এবং রোহিঙ্গা গণহত্যা ও শরণার্থী অনুপ্রবেশসহ মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা যে বাংলাদেশের উদ্বাস্তু নয় সে বিষয়টির স্থায়ী সুরাহায় সোচ্চার হতে পারে না? প্রত্যাশা থাকবে, নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের সঙ্গে স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বলিষ্ঠ ও নেতৃত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।


“Russia-Bangladesh friendship began during 1971 war.”

বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৬

Sachin karmakar : When Pakistan Army began its military campaign against innocent people of Bangladesh on March 25, 1971, which later turned into a worst genocide of human history. Nearly ten million people were forced to flee India for safety and another fifteen million were internally displaced within the country. One third of entire population was displaced by the horror of Pakistan Army, three million were gun downed and quarter million women was sexually violated during this nine months occupation period.
USSR stood firm by its alley India during the war of 1971, India unconditionally provided shelter, training and weapon to the Bangladesh freedom fighters. We gratefully remember India-Soviet friendship treaty which was signed on August 1971 providing legal platform for Soviet Military assistance to India, if comes under attack from a third country. It’s also be mentioned hear that USSR deployed Soviet “RED” Army alongside Soviet-China border to prevent Chinese military adventure in Northern India bordering China. In the month of December 1971, USA dispatched its notorious 7 fleet to the Bay of Bengal for aiding Pakistan. USSR quickly responded by dispatching their famous 21 fleet to the Bay of Bengal from Black Sea naval base. USA-USSR first ever nuclear head on after Cuban missile crisis in 1962 was 1971. USSR vetoed USA led cease power proposal in the UNO to provide most valuable required time to the allied forces of Bangladesh & India to takeover Dhaka.
Soviet Union recognized independent Bangladesh on January 25, 1972 and dispatched floating dockyard to Chittagong and Mongla Port for clearing mine & ship wreckage. Bangladesh Air Force began its journey with 10 Soviet MIG Fighter plane donated by USSR as a goodwill gesture to Bangladesh. Bangabandhu visited Moscow in 1972 to express his gratitude and to thank Soviet people and government. USSR also gave Bangladesh couple of MI-17 Helicopter for civil and military use. With exception of Military ruler Zia & Ershad Russia is our best trusted friend and ally since liberation war, USSR is still providing high technological support to Bangladesh including RUP PUR nuclear Power Plant. Ghorashal Power plant provided the most needed electricity to the war divested country and was the first development project of USSR in Bangladesh.


মুখোমুখি আড্ডায় কবির সাথে আলাপচারিতা

বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৬

‘বাংলার মাটি, বাংলার জল আমাকে প্রতিনিয়ত প্রাণিত করে অবিরাম শব্দের ফুল ফোটাঁতে’ - জুলি রহমান

কবি জুলি রহমান সাহিত্যচর্চা করছেন তিন যুগের অধিককাল ধরে। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প - সাহিত্যের এসকল উল্লেখযোগ্য শাখাতেই রেখেছেন মুন্সিয়ানার স্বাক্ষর, পেয়েছেন পাঠকপ্রিয়তা। ২০১৭’র একুশে’র বইমেলায় প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তার রচনাকৃত পায় তিন’শ গানের বিশেষ সংকলন ‘জুলি গীত’। সম্প্রতি জুলি রহমান মুখোমুখি আড্ডায় বসেছিলেন সাংবাদিক, টিভি উপস্থাপক, অনুবাদক, আবৃত্তিকার দিমা নেফারতিতি’র সাথে। সেই আলাপচারিতা উদ্ধৃত হলো প্রিয় পাঠকদের উদ্দেশ্যে।

দিমা নেফারতিতি: প্রথমেই জানতে চাইব সদ্য প্রয়াত কবি শহীদ কাদরী সম্পর্কে কবি জুলি রহমানের মূল্যায়ন। কবি শহীদ কাদরীকে আপনি কোন দৃষ্টিতে, কোন ভঙ্গিতে দেখেন, কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
জুলি রহমান: কবি শহীদ কাদরীর কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে, তিনি একজন বিরল প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব। কবিতা যদি সর্বোচ্চাঙ্গের আর্ট হয়, তবে আমি মনে করি কবি শহীদ কাদরী সেই আর্টের তুলি এবং ক্যানভাস। কবিতায় ছন্দ এক কল্পনা রঙিন পরিবেশ তৈরী করে। শুধু তাই নয়, কাব্যের গভীরে থাকে বোধের অতলতা। একজন কবির বোধ, সাধারণের বোধের চেয়ে অনেক বেশি ঊর্ধ্বে বিরাজ করে। কবি শহীদ কাদরী সেই উচ্চবোধসম্পন্ন মানব। কবি শহীদ কাদরীর সাহিত্য আসর ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা’য় আমি বহুবার গেছি। ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা’র শুরুর দিনগুলি থেকেই আমি এর সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। সেসময় খুব কাছে থেকে কবি শহীদ কাদরীকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। সেই কাছে থেকে দেখা অভিজ্ঞতায় আমি জেনেছি, একজন কবিকে অবশ্যই রোমান্টিক হতে হয়। কবি শহীদ কাদরী ছিলেন রোমান্টিক কবি। রোমান্টিকতার দ্যোতনায় আচ্ছাদিত ছিল তার কাব্য মানস এবং তার কবিতা। কবি শহীদ কাদরীর বিউটি বোর্ডিং নিয়ে কাব্যালাপ থেকে, তার বিভিন্ন সময়ের স্মৃতিচারণ থেকে, তাকে নিয়ে তার বন্ধু-স্বজনদের আড্ডার স্মৃতিচারণ থেকে কবি শহীদ কাদরীর রোমান্টিক সত্তার স্পষ্টতা প্রতিভাত হয়।
দ্বিতীয়ত কবিকে হতে হয় একজন সাচ্চা মানুষ। কবি শহীদ কাদরীকে খুব কাছে থেকে দেখে, তার সান্নিধ্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে, এটাই উপলব্ধি করেছি বারবার, যে কবি শহীদ কাদরী একজন সাচ্চা মানুষ, সত্যিকার অর্থে একজন নিখাদ মানুষ। সেইসাথে আমি বলব কবি শহীদ কাদরী নি:সন্দেহে একজন বিরল প্রতিভার মানুষ। তুলনামূলকভাবে তার রচনার সংখ্যা নিতান্তই অল্প। হাতে গোনা। কিন্তু সেই অল্পসংখ্যক রচনা দিয়েই তিনি বাংলা সাহিত্যে শক্ত আসন করে নিয়েছেন। এই যে জায়গা করে নেওয়ার বিষয়, এক্ষেত্রে বিশ্ব বরেণ্য চিত্রশিল্পী পিকাসোর কথা মনে পড়ছে। পিকাসো যখন রংতুলি দিয়ে ছবি আঁকতেন, নিন্দুকেরা বলতেন - এসব কি হচ্ছে, নেহায়েত আঁকিবুকি, শুধু কাকের ঠ্যাং আর বকের ঠ্যাং। কিন্তু দেখুন কালের পরিক্রমায় পিকাসোর শিল্পকর্ম জগৎজোড়া খ্যাতি পেল। আমি মনে করি, লেখার এবং তাবড় সৃষ্টিকর্মের, শিল্পকর্মের বিস্তার নয় - স্বল্পতা নয় - সংখ্যা নয়, কেবল গুনগত মান শিল্পকে - সৃষ্টিকে - কবিতাকে টিকিয়ে রাখে। সেই গুনগত মানের বিবেচনায় কবি শহীদ কাদরী বিরল ক্ষমতাসম্পন্ন একজন কবি এবং বাংলা ভাষার অন্যতম মহান কবি, শ্রেষ্ঠ কবি।

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


দিমা নেফারতিতি: আপনি অনেকদিন যাবত প্রবাসে লেখালেখি করছেন। প্রবাসে বসে লেখালেখি করবার সুবিধা এবং অসুবিধা কি কি অনুভব করেছেন ?

জুলি রহমান: দেখুন আমাকে অনেকেই বলে যে প্রবাসী কবি, একথাটিতে আমার খুব আপত্তি। কারণ কবির কোন স্থান, কাল নেই। তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, সেখানেই তার লেখার পরিবেশ এবং আবহ  তৈরী হয়ে যায়। আমি যখন মধ্যপ্রাচ্যে ছিলাম তখন মধ্যপ্রাচ্যের সমাজ ব্যবস্থার আনুষঙ্গিকতা নিয়ে আমার লেখা তৈরী হত। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আছি, এখানকার আবহ, এখানকার সংস্কৃতি, এখানকার জীবন বাস্তবতা আমার লেখায় প্রতিবিম্বিত হয়। তাই প্রবাস/নিবাস বলে আমার কাছে কিছু নেই। কিন্তু তারপরেও যখন আমরা বইমেলায় যাই তখন দেখি দু’টা সারি, একটাতে প্রবাসী লেখকদের বই আরেকটাতে বাংলাদেশী লেখকদের বই। তখন আমি খুব পীড়িত হই, ভাবি কেন এই বিভেদ? মাঝখানে এই দেয়ালটা কেন থাকবে। তাছাড়া আমি বাংলাদেশে সাহিত্য চর্চা করেছি অনেকদিন। তারপর মধ্যপ্রাচ্যে চলে গেলাম। সেখান থেকে ফিরে বাংলাদেশে আবার চুটিয়ে সাহিত্য চর্চা করেছি। আল-মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুন্, কাজী জাকির,  জুবাইদা গুলশানআরা, রুবি রহমান, কাজী রোজি  এদের সাথে সাহিত্য চর্চায় দুর্দান্ত সময় কাটানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় সাহিত্য চর্চা করেছি। তখন আমি দেখেছি আমরা যারা প্রবাসে বসে সাহিত্য চর্চা করি, তাদের লেখাত, দেশে বসে যারা সাহিত্য চর্চা করে তাদের চেয়ে ফেলনা নয় - তাহলে এই বিভেদ টেনে দেওয়া কেন?
নানা কারণে আমরা দেশে থাকতে পারিনি। বাস্তবতার খাতিরে প্রবাসী হয়েছি। কিন্তু তাই বলে এই বিভেদ কেন? একবার কবি রবীন্দ্র গোপ আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনারটা প্রবাসে থাকেন, আপনাদের লেখায় কি দেশের সংঘাত, সংকট এসব ফুটে ওঠে?’ উত্তরে আমি বলেছিলাম, ‘তাহলে আমরা কি প্রবাসে বসে কেবল চাঁদ, ফুল, লতাপাতা নিয়েই লিখি? এরপরপরই দেশের রাজনৈতিক সংঘাত নিয়ে আমার একটি লেখা কবিতা আমি যখন কোন এক সাহিত্যের আসরে পড়েছিলাম, উনি প্রশংসাসূচক মন্তব্যে বলেছিলেন, জুলি আপনার কবিতা যেন কাঁচা লঙ্কা, ভীষণ ঝাঁঝ আছে ভিতরে।’
আসলে প্রবাসী হওয়ার বড় ব্যাথা হলো, যখন আমরা বই বের করতে যাই তখন ভীষণ বঞ্চনা এবং বৈষম্যের শিকার হই। আমি আজ দীর্ঘ ৩৬ বছর যাবৎ সাহিত্য চর্চা করছি।  আমি যদি দেশে থাকতাম তাহলে আমার গ্রন্থের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারত বলে আমি মনে করি। আজকে আমার অগণিত পান্ডুলিপি ঘরে পড়ে আছে। আমার উপন্যাস যুদ্ধ ও নারীসহ অজস্র পান্ডুলিপি ঘরে পরে আছে। সমস্যাটা হলো প্রকাশকদেও কাছ থেকে সহযোগিতার অভাব। তারা যখন শোনে প্রবাসী লেখক, তখন তারা হা করে থাকে পয়সার জন্য। আজ যদি আমি দেশে বসে সাহিত্য চর্চা করতাম তাহলে আমার গ্রন্থের সংখ্যা যেমন বেশি থাকত, তেমনি আমি রয়্যালটি পেতাম। আরেকটা জিনিস উল্লেখ করার মত, প্রবাসে মোটামুটি সবাই লেখে, সবাই কবি। কিন্তু লাইনের পর লাইন লিখলেই, কবি হওয়া যায়না। সত্যিকারের কবি স্বত্তার উম্মেষ যার ভিতরে নেই, তিনি হাজার লিখলেও কবি হতে পারবেন না। কালের বিচারে, যোগ্যতার মাপকাঠিতে, গুণগত প্রকাশের মানদন্ডে যার  সাহিত্য উত্তীর্ন হবে, তিনি সত্যিকারের কবি, সত্যিকারের গল্পকার। তা তিনি দেশি হন আর প্রবাসী হন। আজ আমরা কিটসের কবিতা পড়ি, শেক্সপিয়ারের কবিতা পড়ি, রবীন্দ্রনাথের, জীবনানন্দের কবিতা পড়ি। কেন পড়ি? সেসব কালের পরিক্রমায় উত্তীর্ন তাই। সুতরাং ভুঁইফোড়, সৌখিন কবিদের  ভিড়ে সত্যিকারের কবিরা হারিয়ে যাবে, এটা আমি বিশ্বাস করিনা।


------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

দিমা নেফারতিতি: আপনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার। আবার আপনি একজন গীতিকার। অজস্র গান লিখেছেন আপনি। এবিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই।

জুলি রহমান: সত্যিকার অর্থে গান  দিয়েই আমার লেখা শুরু। ৩৬ বছরের লেখালেখির জীবনে আমার গানের সংখ্যা ঠিক কত আমি জানিনা। আমার গান লেখার সবচেয়ে বড় ক্যানভাস প্রকৃতি । আমি গান লিখেছি আমার কৈশোর থেকে। আমার গ্রামের নাম চাপিল। সেই গ্রামের মাঠ, ঘাট, পথ, প্রান্তর, নদী এসবই আমার গান রচনার নেপথ্যে নাটাই ঘুড়িয়েছিল। বর্তমানে দীর্ঘদিনধরে বাস করছি যুক্তরাষ্ট্রে। এখানে আমি দুটো সময় ঘর থেকে বের হই। যখন পাতা ঝরে, যখন ফুলে কুড়ি আসে। এই দুটো সময় আমার হাজবেন্ডকে বলি আমাকে একটা আনলিমিটেড ট্রাভেল কার্ড দাও। তিনি দেন। তখন আমি ঘরে থাকতে পারিনা। এদেশে পাতা ঝরে অক্টোবর মাসে, আর ফুলে কুড়ি আসে এপ্রিল মাসে। এইদুটো মাস আমি ঘরে থাকতে পারিনা। তখন আপনমনে ঘুরি।  আমি যতটা চিনি এই নিউ ইয়র্ক শহরকে, আমার মনে হয় যারা গাড়ি চালান তারাও বোধহয় নিয়ে ইয়র্ককে এতটা চেনেন না। প্রকৃতিকে দেখার জন্য আমি কখনো বাসে চেপে, কখনো পায়ে হেঁটে এশহরে ঘুড়ি।  আমার সাথে তখন কেউ থাকেনা।  আমি রাখিনা সাথে। তখন আমি কথা বলি নিজের সাথে।  আমি গান করি, আমার গানে সুর করি ওই পথে পথেই। যেমন সেদিন ঝরা পাতার উপর যখন হাঁটছিলাম, পাতারা মচমচ করছিলো, মনে হচ্ছিলো যেন আমি পাতার কান্নার শব্দ শুনছি, কিংবা আমি বাঁশির শব্দ শুনছি। মনে হচ্ছিলো যেন ঝরে পড়া পাতারা আমার সাথে কথা বলছে। আমার সেই অনুভব নিয়ে সাথে সাথে আমি গান রচনা করলাম, তারপর ঘরে ফিরে তা লিখে ফেললাম। এই ৩৬ বছরের সাহিত্য চর্চার জীবনে এ পর্যন্ত অজস্র গান লিখেছি কিন্তু সবগুলো সংগ্রহ করা হয়নি। আজ সেজন্য ক্ষানিকটা অনুতাপ হচ্ছে। এই যেমন সেদিন আমার ঘরের কাছে ক্যাসল হিল পেরিয়ে আমি জেরিগাতে হাঁটছিলাম। সেখানে অপার্থিব নিস্তব্ধতার মধ্যে পথজুড়ে ঝরা পাতার স্তুপ দেখে আমার মনে হলো পাতারা কাঁদছে, এরপর লিখলাম - ‘ঝরাপাতা বলে কথা’ গানটি। এভাবে ঝরা পাতা, তুষারপাত, ঝলমলে রোদ্দুর, কিংবা মুষলধারায় বৃষ্টি - অর্থাৎ প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গের সাথে মিলে জন্ম নেয় আমার গান, আমার কবিতা। ওয়েচেস্টারে ওয়াটার এভিনিউতে একবার আমি গেলাম, তখন খুব বরফ পড়ছিলো, তখন জন্ম নিলো একটা কবিতা। সেটা আমার চার’শ কবিতা সম্বলিত ‘জুলি রহমানের কাব্যগ্রš’’তে আছে। সেই কবিতায় একটা লাইন ছিল এমন - 'পরিব্রাজক পাখিদের কথা।' এখানে অনেকে এটা পড়ে বললেন, শীতের মধ্যে জুলি এত পাখি পেলেন কোথায়? আসলে এটাত সিম্বলিক ওয়ার্ডে লেখা। সাহিত্যের ভাষায় যাকে রূপক বলা হয়। পরিব্রাজক পাখি বলতে এই কবিতায় আমি নানা দেশের মানুষদেও কথা বুঝিয়েছি। তাই সাহিত্য তখনি সত্যিকারের পূর্ণতা পাবে যখন তা সত্যিকারের সমঝদারের কাছে পৌঁছাবে।

দিমা নেফারতিতি: একটি সাংস্কৃতিক আবহমন্ডিত পরিবারে আপনার জন্ম। কবি জুলি রহমানের বেড়ে ওঠায় সেই পারিবারিক আবহ কতটা ভূমিকা রেখেছে?

জুলি রহমান: আমার মা ছিলেন চিত্রশিল্পে ভীষণ পারদর্শী। বাবা পুঁথিতে। একমাত্র মামা ছিলেন ইত্তেফাকের নিয়মিত কলামিস্ট। ফুপাত ভাই নিজাম উদ্দিন মুখে মুখে গীতিকবিতা রচনা করতেন। অনেক ছোটবেলা থেকে তার সেই সুর আমাকে সারাদিন আবিষ্ট করে রাখত। বড়ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারা সেই সাথে কবি।তার কবিতা চুপে চুপে পড়েছি। আমার মেঝু ভাই বাউল চিত্তের ছিলেন ।বই গান এ সবেই ডুবে থাকতেন উনি।বই কেনাই ছিলো তাঁর নেশা।বাড়িতে মা পারিবাড়িক গ্রন্থাগার।আমার ভাইদের কমর্।হরেক রকম বইয়ে সমৃদ্ধ তার লাইব্রেরি। ছোটবেলা থেকেই  ভাই এর বই এর বাগানের আমি ছিলাম নিয়মিত প্রজাপতি। মামাতো ভাই মাসুদ আহমেদ সতীনাথকে চিরতরে কণ্ঠে ধারণ করে নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি একুশে পদকপ্রাপ্ত  প্রথিতযশা গল্পকার। আমার মা মরহুম ফাতেমা খাতুন ছিলে একজন নিভৃত মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরে যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি রেঁধে খাওয়াতেন। তারপর রাতের আধাঁরে মুক্তিযোদ্ধারা চলে গেলে তাদের অস্ত্র হাতের ছবি এঁেক রাখতেন তার নিজের হাতের বানানো মাটির কলসের গায়ে। মা’র ছিল মাটির পটারি বানাবার ঝোঁক। আমাদের গ্রামে বিয়ে শাদীসহ যেকোন পরব - অনুষ্ঠানে আমার মা নানারকম পটারি বানিয়ে সেসবের গায়ে ছবি একেঁ দিতেন। আমার স্বামী ফজলুর রহমান নন্দী এমন একজনা মানুষ, বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত আমাকে নীরবে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে গেছেন। আমি ছোটবেলা থেকেই ভীষণ পড়তাম।  বিয়ের পর যখন শশুরবাড়িতে গেলাম সেখানে রানু নামে আমার এক ভাগ্নি আমাকে শেক্সপিয়ারের বই এনে দিত, বাংলা সাহিত্যের এবং বিশ্ব সাহিত্যের নানান বই এনে দিত। বিয়ের পর পর আমার শাশুড়ি খুব অবাক হয়েছিলেন যে, নতুন বৌ ঘরের দরজায় খিল এটেঁ কবিতা লেখে। তারপর উনি আমাকে অনেক বোঝাতেন, বলতেন, "দেখো তোমাকেত আমি এনেছি আমার ছেলের সংসার দেখবার জন্য। সংসারটা ঠিকমত সামলাও। কবিতা লিখে সময় নষ্ট করে কি হবে। কবিতা লিখেত আর পয়সা পাবেনা ।সেসময় আমি কবিতা লিখেছিলাম, ‘বৌ কেন কবি’ শিরোনামে। তারপর অনেক চেষ্টায় আমি ওনাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম যে, স্কুলের শিক্ষকতার পাশাপাশি সব কর্তব্য ঠিকঠাক পালন করেই আমি কবিতা লিখছি। তাই ওনার চিন্তিত হবার কারণ নেই। একসময় উনি নতি স্বীকার করলেন আমার কবিতারূপী প্রেমিকের কাছে। এরপর নিজেই আত্মীয়-পরিজনদের বলতেন, "আমার বৌমা একজন কবি।"

দিমা নেফারতিতি: আপনার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা কত? নতুন বই কবে প্রকাশিত হবে?

জুলি রহমান: আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৮০ সালে, উপন্যাস রক্তচোষা। এরপর ব্যবধান, বহে রক্তধারা, কাগজের বৌ, ফাতেমার জীবন, শেষের পান্ডুলিপি, ধান পাতা বাঁশি, একজন দলিলুর রহমান, ভূ -গোলক সহ বহু পান্ডুলিপি গ।ন ,প্রবন্ধ নিবন্ধ ,গীতি কাব্য সহ কিছু পুঁথি।এ গুলো সব প্রকাশিতব্য।র্রক্তচোষা করার বিশ বছর আবার করি কাব্য ময়ূরী সময়।বই বের না করলেও অনেক সাহিত্য পত্রের সম্পাদনা ও নিয়মিত লেখালেখি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছেলেখা প্রতিনিয়ত। জলপ্রপাত ,অনিবাস রৌদ্দুর রাইটাসর্ ,সত্যের আলো পত্রিকায় জুলি রহমানের পাতা।  সে সব এখন পীড়া দেয়।
মাঝের এই লেখালেখির সময়টা ছিলো আমার জীবনের চরম দুবর্োদ্ধ সময়।পড়াশোনা বিয়ে চাকুরী লেখালেখি ভীষণ একটা কঠিন সময়ের চড়াই উৎরাই আমার জীবনের।তারপর ও যে লেখাটাকে নিয়মিত পাশে রাখতে পারার আনন্দ ও অনেক নিরানন্দকে  মাটি চাপা দেয়।
১২টি বই প্রকাশিত হয়েছে। আরো অসংখ্য পান্ডুলিপি রয়েছে প্রকাশের অপেক্ষায়। আসছে একুশের বইমেলায় প্রকাশিত হতে যাচ্ছে প্রায় ৩০০ গান এর বিশেষ সংকলন ‘জুলি-গীত।’

দিমা নেফারতিতি: কবি জুলি রহমানের কাছে কবিতার সংজ্ঞা কি?

জুলি রহমান: আমি যখন জীবনের রুঢ়তায় বিধস্ত হই, কবিতা তখন রসের ফল্গুধারার মতই সকল শোকসন্তাপকে ধুয়ে মুছে সাফসুতরো করে দেয়। কবিতা যেমন দুর্বোধ্য আড়াল। জীবনের বাকঁ তেমনি কঠিন মোড়কে আবৃত। আবার জীবন সুখ ও শান্তিময়। নিরন্তর ভাবনার বিস্তার কবিতার শরীর। সৃষ্টির  নোদনায় নান্দনিক কবিতার অবয়ব।

দিমা নেফারতিতি: সবশেষে জানতে চাইব, এই দূর পরবাসে নেই বাংলার মাটি, বাংলার জল। কবি জুলি রহমান দেশকে কোথায় কিভাবে ধারণ করেন?

জুলি রহমান: স্থান কালের সীমারেখায় কবি আবদ্ধ নন। আমি যখন হাডসন নদীর তীর ধরে হাঁটি, তখন হাডসন নয়, আমি অবলোকন করি আমার গ্রামের, আমার শৈশবের চাপিল নদীকে। সেই চাপিল নদীর স্রোতের কলতান নিরন্তর বেজে চলে আমার চেতনার গহবরে। বাংলার মাটি, বাংলার জল আন্দোলিত হয় আমার হৃৎপিন্ডের স্পন্দনে। আমার চোখের তারায় অনুরণিত হয় বাংলার আকাশের নীল আর সবুজ প্রান্তরের সবুজাভ দ্যোতনা। নিভৃতে বাংলার মাটি, বাংলার জল আমাকে প্রতিনিয়ত প্রাণিত করে অবিরাম শব্দের ফুল ফোঁটাতে।


রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে মায়ানমার = ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম

বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৬

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের মায়ানমার সরকারের গণহত্যা, অত্যাচার-নির্যাতন ও বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করে দেশ থেকে বিতাড়িত করা বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য জাতিসংঘ ও ওআইসিসহ সব আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং শান্তিকামী বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র।   


মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর গুলীতে ৬৯ জন রোহিঙ্গা মুসলমান নিহত ও বহু লোক আহত হওয়ার নির্মম ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে  এক বিবৃতিতে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও রাজনীতিবিদ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র'র প্রতিষ্ঠিতা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম I

ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম বলেন, মায়ানমারে মুসলমানদেরকে হত্যা ও বহু লোককে আহত এবং শত শত ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে বসতবাড়ি থেকে বিতাড়িত করে মুসলমানদের হৃদয়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে যা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনেরও শামিল। মায়ানমার সরকারের পরিচালিত এ হত্যাকাণ্ড গণহত্যার শামিল।

ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম, মুসলমানরা যখন বাঁচার জন্য ঘুরে দাড়াতে চেষ্টা করে তখন তাদের সন্ত্রাসী বা জঙ্গি আখ্যায়িত করতে দ্বিধা করে না। কোথায় জাতিসংঘ ? কোথায় মানবাধিকার সংস্থা ? রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা কি তাদের বিবেককে তাড়িত করে না?

তিনি বলেন, গত তিন যুগ আগে মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিতাড়িত করে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করেছিল। তাদের আজ পর্যন্ত মায়ানমার সরকার দেশে ফিরিয়ে নেয়নি। সাম্প্রতিক মায়ানমার সেনাবাহিনীর হামলায় কমপক্ষে ৪ শত রোহিঙ্গা মুসলমান গৃহহীন হয়ে পড়েছে।

তিনি আরো বলেন, এ মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে মায়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। বিশ্ব মুসলিমকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাই।

এ হত্যাযজ্ঞ বন্ধে এগিয়ে আসার জন্য  বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র'র প্রতিষ্ঠিতা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম জাতিসংঘ ও আইসি এবং সকল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও শান্তিকামী বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানান।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর।
মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের জন্য বাংলাদেশ যেন নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে সেসম্পর্কে বলেছে সংস্থাটি।
এদিকে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমার সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে আজ আরো তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
ইউএনএইচসিআর এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। মিয়ানমারের সরকারকে সেখান মানুষদের নিয়ম অনুযায়ী রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সাথে সেখানকার সহিংস পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে যারা বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছে তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার যেন নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে সে বিষয়ে আহ্বান জানিয়েছে।
গত ৯ই অক্টোবর মিয়ানমারের রাখাইন সীমান্ত চৌকিতে এক হামলার জের ধরে অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। এর পর থেকেই সেখান থেকে নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশের টেকনাফে ঢোকার চেষ্টা করে অনেকে। মিয়ানমারের মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন প্রদেশের গ্রামগুলোতে ৯ই অক্টোবরের পর অন্তত ৬৯ জনকে হত্যা করার কথা স্বীকার করে দেশটি সেনাবাহিনী। রাখাইন প্রদেশে সম্প্রতি শুরু হওয়া বিদ্রোহ দমনের অংশ হিসেবে এই অভিযান চালানো হয়েছে বলে উল্লেখ করছে সেনাবাহিনী।

বিবৃতিতে ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম বলেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যুগ যুগ ধরে সে দেশের সরকার চরম জুলুম-নির্যাতন চালাচ্ছে। বার্মার  রোহিঙ্গা মুসলমানের কান্নায় পৃথিবীর আকাশ ভারী হয়ে উঠছে। মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুরা বাচাঁও বাচাঁও বলে আর্তচিৎকার করছে। মায়ানমারের বর্বর সরকার তাদের উপর নির্যাতনের স্টীম রোলার চালাচ্ছে। হত্যা করছে অসংখ্য নিষ্পাপ শিশু, যুবক, বৃদ্ধাদেরকে। ধর্ষণ করে কলঙ্কিত করছে অসংখ্য মা-বোনদের। বিধবা করছে হাজারো নারীদের। সন্তানহারা করছে অসংখ্য মাকে। স্বামীহারা করছে অসংখ্য স্ত্রীকে। ভাইহারা করছে অসংখ্য বোনকে। মজলুম রোহিঙ্গা মুসলমানদের আহাজারীতে পৃথিবীর আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠছে। কোথায় আজ বিশ্ব মুসলমানদের সহযোগীতা ও ভ্রাতৃত্বের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ও.আই.সি। নীরব কেন আজ মানবধিকার সংস্থা? নিশ্চুপ কেন জাতিসংঘ?।  গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এভাবে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। নিজ দেশে থাকতে না পেরে তারা বাঁচার আশায় থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় সমুদ্র পথে নৌযানে পাড়ি জমাচ্ছে। নৌযান ডুবে তারা সাগরের পানিতে ভাসছে ও ডুবে মরছে। সাগরে ভাসতে ভাসতে শুধু রোহিঙ্গা মুসলমান মরছে না, মানবতারও মৃত্যু হচ্ছে। তাদের বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসা সকলের মানবিক দায়িত্ব।

পৃথিবীতে দেড়শ কোটি মুসলমান থাকার পরও কেন দেশে-দেশে মুসলমানরা আজ নির্যাতিত? মুসলমানগণ কি আমাদের কেউ নয়? বর্তমানে রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার-নির্যাতন চালাচ্ছে মায়ানমার সরকার। মুসলিম জনগণের ওপর সামরিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, অমানবিক এবং অবৈধ, নৃশংস হত্যাকান্ডের মাধ্যমে মুসলমান শুন্য করার খেলায় মেতে উঠেছে। নিরীহ রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর এ নৃশংস বর্বরতার নিন্দা জানানোর ভাষা অভিধানে আজ পরাজিত! রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতন এটা পরিষ্কার করে দিয়েছে যে গোটা বিশ্বের অমুসলিম শক্তি আজ মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। আমরা এখনও নিশ্চুপ! রোহিঙ্গা মুসলমানদের কিই বা দোষ ছিল, যার কারণে তারা আজ নির্মম-জুলুম নির্যাতন ভোগ করতে হচ্ছে? কারণ একটাই ওরা যে মুসলমান। ধর্মীয় পার্থক্য ও বৈপরিত্যের কারণেই রোহিঙ্গাদের উপর মায়ানমারের সামরিক জান্তা, প্রশাসন ও বৌদ্ধ এবং সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠিরা তাদের উপর সীমাহীন জুলুম চালাচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে রোহিঙ্গারা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভাগ্যাহত জনগোষ্ঠি। শত শত বছর ধরে তারা নির্যাতিত ও নিপিড়ীত হচ্ছে। নির্যাতনের চিত্রগুলো বিশ্বমিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে। মজলুম রোহিঙ্গাদের বিভৎস চেহারাগুলো দেখে কার চোঁখ না অশ্রুসিক্ত হবে? আপনার সামনে আপনার ভাই-বোন, মা-বাপ, ছেলে-মেয়েদের যদি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে, শরীরের উপর কামান তুলে মাথার মগজ বের করে ফেলে, চোঁখের সামনে তাজাদেহ দ্বিখন্ডিত করে ফেলে তখন আপনার কেমন লাগবে? আহ! বার্মার মুসলমানদের সাথে তাই করা হচ্ছে! জাতিসঙ্ঘ রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে বিশ্বের সবচেয়ে বর্বর নির্যাতনের শিকার জনগোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করেছে। রোহিঙ্গা পরিচিতি? বর্তমান মিয়ানমারের রোহিং (আরাকানের পুরনো নাম) এলাকায় এ জনগোষ্ঠীর বসবাস। ওরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত। ইতিহাস ও ভূগোল বলছে, রাখাইন প্রদেশের উত্তর অংশে বাঙালি, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। রাখাইনে দুটি সম্প্রদায়ের বসবাস ‘মগ’ ও ‘রোহিঙ্গা’। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মগের মুল্লুক কথাটি বাংলাদেশে পরিচিত। দস্যুবৃত্তির কারণেই এমন নাম হযেছে ‘মগ’দের। এক সময় তাদের দৌরাত্ম্য ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। মোগলরা তাদের তাড়া করে জঙ্গলে ফেরত পাঠায়। রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে একটি প্রচলিত গল্প রয়েছে এভাবে যে সপ্তম শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওযা একটি জাহাজ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন উপকূলে আশ্রয় নিয়েবলেন, আল্লহর রহমে বেঁচে গেছি। এই রহম থেকেই এসেছে রোহিঙ্গা।তবে,ওখানকার রাজসভার বাংলা সাহিত্যের লেখকরা ঐ রাজ্যকে রোসাং বা রোসাঙ্গ রাজ্য হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানগণ বিশ্বের সবচেয়ে ভাগ্যাহত জনগোষ্ঠী। এককালে যাদের ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি এখন তারাই সন্ত্রাসী বৌদ্ধদের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার। মিয়ানমারের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বিড়ম্বনার ইতিহাস যে কাউকে তাড়িত করবে। এই উপমহাদেশ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে কয়টি এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে, আরাকান তার মধ্যে অন্যতম। রোহিঙ্গারা সেই আরাকানী মুসলমানের বংশধর। এক সময় আরাকানে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসন দুইশ বছরেরও অধিককাল স্থায়ী হয়। ১৬৩১ সাল থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ হয়। এরপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। ১৬৬০ সালে আরাকান রাজা থান্দথুধম্মা নিজ রাজ্যে আশ্রিত মোঘল সম্রাট শাহজাদা সুজাকে সপরিবারে হত্যা করে। এরপর শুরু হয় মুসলমানের উপর তার নিষ্ঠুর অমানবিক অত্যাচার নিপীড়ন। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর মুসলমানদের কাটাতে হয় এই দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে। ১৭৮০ সালে বর্মী রাজা বোধাপোয়া আরাকান দখল করে নেয়। সেও ছিল ঘোর মুসলিম বিদ্বেষী। বর্মী রাজা ঢালাওভাবে মুসলিম নিধন করতে থাকে। ১৮২৮ সালে বার্মা ইংরেজদের শাসনে চলে যায়। তবে ১৯৩৭ সালে বার্মা স্বায়ত্তশাসন লাভের পর বৌদ্ধদের পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক রূপ নেয় এবং তারা প্রায় ৩০ লাখ মুসলিম হত্যা করে। শত শত বছর ধরে তারা মিয়ানমারে বাস করে এলেও মিয়ানমার সরকার তাদেরকে সেদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। বলা হয় এরা বহিরাগত। ইতিহাস অনুসন্ধানে দেখা যায় এই উপমহাদেশ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সর্ব প্রথম গড়ে উঠা মুসলিম বসতি ওয়ালা প্রদেশের মধ্যে বর্তমানের আরাকান তথা রাখাইন প্রদেশ ছিল উল্লেখ যোগ্য। ১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আরাকানের স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র। ২০০ বছরের বেশি সময় সেটা ছিল স্থায়ী। ১৬৩১ থেকে ১৬৩৫ পর্যন্ত আরাকান রাজ্য এক কঠিন দূর্ভিক্ষ দেখা দেয়। আর এই দূর্ভিক্ষই আরাকান থেকে মুসলিম প্রশাসকের পতন ঘটে। ১৯৮১ সালে মিয়ানমারের সামরিক শাসনকর্তা আরাকান রাষ্ট্রের নাম পরিবর্তন করে রাখাইন প্রদেশ করে, এটা বুঝানো উদ্দেশ্য যে, এ রাজ্য বৌদ্ধ রাখাইন সম্প্রদায়ের, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নয়। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেয় এবং সরকারিভাবে তাদেরকে সেখানে ‘বসবাসকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাদের ভোটাধিকার নেই। নেই কোন সাংবিধানিক ও সামাজিক অধিকার। নিজ দেশে পরবাসী তারা। তারা মিয়ানমারের অন্য প্রদেশে অনুমতি ছাড়া যেতে পারে না। এক সময় যেখানে রোহিঙ্গারা ছিল সংখ্যাগুরু আজ সেখানে তারা সংখ্যালঘু। বড় আফসোস! আজও রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার। বার্মা বা মিয়ানমার দেশটির রাখাইন রাজ্যে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে এবং তাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে আসা বাঙালি অভিবাসী বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। রাখাইন রাজ্যে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করে। তাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকারকে অস্বীকার করছে মিয়ানমার সরকার। বর্তমানে লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু শিবিরে আটক অবস্থায় রয়েছে। মায়ানমারের সামরিক জান্তা তার অধিবাসী মুসলমানদের জন্য সে দেশকে জাহান্নামের অগ্নিকুন্ডে পরিণত করেছে। তাদের থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে উপার্জিত সব সম্পদের মালিকানা, নাগরিক অধিকার, মানবিক অধিকার, এমনকি বেঁচে থাকার অধিকারও। তাই তারা সমূহ বিপদের কথা জানার পরও মরিয়া হয়ে ছুটছে একটুখানি নিরাপদ ঠিকানার সন্ধানে।
আরাকানের বর্তমান অবস্থা
মিয়ানমারের পশ্চিমা প্রদেশ আরাকান (রাখাইন) আবার জ্বলছে। স্বাধীন আরাকান রাজ্যের পুরোনো রাজধানী ম্রাউক-উ-তে চলছে বৌদ্ধ রাখাইনদের মিছিল। মিছিল চলছে জীপগাড়ি, মোটরসাইকেল, রিক্সা, টুক-টুক কিংবা সাইকেলে চড়ে – কিন্তু সবচেয়ে বেশী লোক চলছে পায়ে হেঁটেই। তাদের সাথে আছে বর্শা, তরবারী, ধামা, বাঁশ, গুলতি, তীর-ধনুক এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে পেট্রোল বোমাও। তাদের লক্ষ্য – নিরস্ত্র রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী। ঐ মিছিলেই জনৈক বৌদ্ধ সন্ত্রাসীকে গলা-কাটার মতো ভয়াবহ ইশারা-ইঙ্গিত করতে দেখা যায় (যুক্তরাজ্যের দি ইকনমিস্ট; ৩-রা নভেম্বর, ২০১২)।
দুঃখের বিষয় এই যে ম্রাউক-উ’ই একমাত্র শহর নয় যেখানে রোহিঙ্গা মুসলিমরা পরিকল্পিত গণহত্যার মুখোমুখি। মিয়ানমারের ভেতর থেকে পাওয়া খবর থেকে জানা যাচ্ছে যে স্থানীয় সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার, পুলিশ ও নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনীর মদদে রাখাইন বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিত ভাবে প্রতিটি রোহিঙ্গাকে বার্মা (মিয়ানমার) থেকে বের করে দেয়ার অভিপ্রায়ে গণহত্যার উন্মাদনায় মেতে উঠেছে। এই নির্মূলাভিযান এমনই ভয়াবহ ও নৃশংস যে, পরিকল্পিত হিংস্রতা লুকিয়ে রাখার স্বগত প্রবণতা থাকা বর্মী রাষ্ট্রপতিও শুক্রবার, ২৬-শে অক্টোবর, স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ৮টি মসজিদ সহ ২০০০ রোহিঙ্গার ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে (সূত্র: বার্মিজ সরকারপন্থী পত্রিকা, the New Light of Myanmar)। এই সপ্তাহে তার মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন, “রাখাইন প্রদেশে পুরো গ্রাম কিংবা আংশিক নগর পুড়ে ভস্মীভুত হবার মতো ঘটনা ঘটেছে।” বলার অপেক্ষা রাখেনা যে আসল সংখ্যা ও বাস্তবতা আরো অনেক ভয়াবহ।

আশংকা করা হচ্ছে যে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ৫০০০ রোহিঙ্গার বসতি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) থেকে তোলা ছবিতে সমুদ্র উপকূলবর্তী শহর চিয়াউকফুর (Kyaukphyu) মুসলিম অধ্যুষিত অংশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ দেখা যায় (১, ২)। এই শহর থেকেই তেল ও গ্যাসের পাইপ-লাইন বার্মা থেকে চীনে যাবার কথা। সাম্প্রতিক এই গণহত্যার আগ্রাসনের সময় মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম ও শহরাংশে তাদের আঁটকে রেখে আগুনের গোলা ছোঁড়া হয়। মৃত্যু আতংকে পালাতে চেষ্টা করা মুসলিমদের উপর রাখাইন বৌদ্ধ সন্ত্রাসী ও সরকারের মধ্যে তাদের পৃষ্ঠপোষকরা চালায় নির্বিচার গুলিবর্ষণ। বর্ণবাদী রাখাইন রাজনীতিবিদ ও ভিক্ষুরা দিনে দিনে সেখানে গড়ে তুলছে বর্ণ ও ধর্মের ঘৃণার পরিবেশ, যাতে নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সব ধরণের সহিংসতাকে অনুমোদন দেয়া যায়। অনেক রোহিঙ্গা তাই প্রাণভয়ে পালাচ্ছে সাগরে কিংবা জঙ্গলে। কিন্তু হায়! সেখানেও রক্ষা নেই। গত সপ্তাহে শতাধিক রোহিঙ্গার সলিল সমাধি হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। অনেকে বাধ্য হয়ে পালিয়ে গেছেন বাংলাদেশে। ধরা পড়ে অনেককেই যেতে হচ্ছে সিত্তেওয়ের মানবতের জঘণ্য ক্যাম্পগুলোতে, যেখানে জুন মাস থেকেই আঁটকে আছে আরো অনেক রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী। ঐদিকে রাখাইন সন্ত্রাসীরা আবার ডজন ডজন রোহিঙ্গা মেয়েদের তুলে নিয়ে করছে ধর্ষণ – আর সেইসাথে চারিদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে যুদ্ধের বিভীষিকা I
এটা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করে দেয়ারই তৎপরতা। ২৫-শে অক্টবরের এক ইস্তেহারে মিয়ানমারে অবস্থিত জাতিসংঘের কর্মকর্তা অশোক নিগম বলেন, “জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের নির্বাসন ও ধংসযজ্ঞের ব্যাপারে শংকিত।” তিনি বলেন ক্ষতিগ্রস্ত সকল জনগোষ্ঠীর কাছে নিরাপদ প্রবেশাধিকার অপরিহার্য; এবং সে লক্ষ্যে তিনি সরকারের প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত সবার কাছে দ্রুত ও শর্তহীনভাবে পৌঁছবার মানবিক আবেদন জানান।

মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে করা জঘন্য অপরাধগুলো লুকিয়ে রাখতে চায়, সেজন্যে তারা আন্তর্জাতিক মিডিয়া, এনজিও, সাহায্য সংস্থা এমনকি জাতিসংঘকেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাতে প্রবেশাধিকার দেয়না – পাছে তারা বর্বরতার মাত্রা বুঝে ফেলে। আর যেহেতু রোহিঙ্গাদের সার্বিক নির্মূল রাষ্ট্রীয় নীতিরই অংশ, তাই মুসলিম ভুক্তভোগীদের জন্যে মিয়ানমারের সরকারী সংস্থাগুলো থেকে কোনো সাহায্যই পৌঁছেনা। আরো জঘন্য বিষয় হচ্ছে এই যে, ও.আই.সি কিংবা ইসলামিক রিলিফ থেকে পাঠানো ত্রাণসামগ্রীও প্রাপক রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছেনি। হিসেবে দেখা গেছে, পাঠানো ত্রাণসামগ্রীর ১০ শতাংশেরও কম ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছেছে। রাষ্ট্র-আয়োজিত অক্টোবরের রাখাইন সন্ত্রাসী ও ভিক্ষুদের প্রতিবাদ সভাকে ধন্যবাদ দিতেই হয়; কেননা, সেই অযুহাত দেখিয়েই মিয়ানমার সরকার ও.আই.সি-সহ অন্যান্য মুসলিম সাহায্য সংস্থাকে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে ত্রাণ কার্যালয় খুলতে দেয়নি।

মুসলিমদের ভয়াবহ হত্যার জন্যে একজন বৌদ্ধ সন্ত্রাসীকেও শাস্তি দেয়া হয়নি। থেইন সেইনের সরকার থেকে আমরা কেবল সহিংসতার হোতাদের চিহ্নিত করা ও তাদের বিচারের আওতায় আনার ফাঁকা বুলি শুনেছি। কিন্তু এসব প্রতিজ্ঞা কখনো ন্যায়বিচারে পর্যবসিত হয়না, যেমনটা আমরা দেখেছি ৩-রা জুনে ১০ বর্মী মুসলিমদের বিনা বিচারে মেরে ফেলার ঘটনায়। এই যখন বাস্তবতা – তখন সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের জান-মাল রক্ষার কথা না হয় বাদই দিলাম।
বুঝতে কষ্ট হয়না যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে থেইন সেইনের সরকার ইঁদুর-বিড়াল খেলা খেলছে; একদিকে যেমন উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি থেকে অপরাধগুলোকে আর লুকিয়ে রাখা যায়না তখন তারা সবাইকে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়া শান্ত করে – আর অন্যদিকে যখন বহির্শক্তির চাপ কিছুটা কমে আসে, সাথে সাথেই বেড়ে যায় জঘন্য অপরাধগুলোর মাত্রা। তাই ৩-রা জুনে শুরু হওয়া সংঘবদ্ধ হত্যা ও নির্যাতনের ফলে সৃষ্ট এক লক্ষ আভ্যন্তরীন শরণার্থীর সাথে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসের ফলে আরো কয়েক অযুত বাস্তুহারা শরণার্থী যোগ দিলে সার্বিক অবস্থার অবনতি ঘটে অনেকখানি। এক সময়ের সমৃদ্ধ মুসলিম জনপদ এখন যেন বোমার আঘাতে ধ্বংস হওয়া অঞ্চল! কোনো রোহিঙ্গাকেই তাদের এলাকাতে ফিরে গিয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি পূনর্গঠন করতে দেয়া হয়নি। নাৎসি কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পের আদলে গড়ে ওঠা ক্যাম্পে তাদের আঁটকে রাখা হয়েছে। ঐ বীভৎস ছাউনিগুলো থেকে বের হয়ে জীবিকা আহরণের চেষ্টা করলে রাখাইন বৌদ্ধ নিরাপত্তা রক্ষীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হবার সমূহ ঝুঁকি থাকে। ঐ ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গাদের রাখা হয়েছে যাতে তারা ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

নিরস্ত্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখা যেন রাখাইনদের জাতীয় চেতনাতে পরিণত হয়েছে। সীমান্তরক্ষীরা (NASAKA) বারংবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে আরাকান হচ্ছে রাখাইন রাজ্য – যেখানে রোহিঙ্গা মুসলিমদের কোনো স্থান নেই। রোহিঙ্গাদের বলা হয় তারা যেন আরাকান থেকে চলে যায়, না হলে তাদের মেরে ফেলা হবে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে নির্মূল করার তালিকায় একে একে যুক্ত হচ্ছে মুসলিম অধ্যুষিত জনপদগুলো। পাঁচের বেশী লোকের সমাবেশ ঘটানোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা ১৪৪ ধারা কেবল রোহিঙ্গাদের উপরই প্রয়োগ করা হয়। নিরাপত্তারক্ষীদের আশীর্বাদ পওয়া রাখাইন সন্ত্রাসীদের হাতে ঘর-বাড়ী, দোকান-পাট, মসজিদ, স্কুল কিংবা গ্রাম লুট হওয়া অগ্নিদগ্ধ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতেও বাইরে যেতে পারেনা রোহিঙ্গারা।

বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী রাখাইনরা সরকারের সহযোগিতা পায়। চিয়াউকফু শহরের ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে যে, বৌদ্ধ অগ্নি-নির্বাপক দল পানির বদলে আগুনের উপর জ্বালানী ছিটিয়েছে, যাতে ধ্বংসলীলা সম্পূর্ণ হয়! পিট প্যাটিসন নামের একজন স্থানীয় শিক্ষক, যিনি যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার জন্যেও কাজ করে থাকেন বলেন,
দমকলের বাহিনীর লোকজন আগুনের উপর আদতে ঢেলেছে পেট্রোল – কিন্তু ভান দেখাচ্ছে যেন তারা পানি ছিটাচ্ছে! কর্তৃপক্ষ আসলেই একপেশে। আমরা তাদের বিশ্বাস করতে পারিনা।

যদিও সাম্প্রতিক ঘটনাতেগুলোতে মুসলিমরা একতরফা ভুক্তভোগী – থেইন সেইন সরকার একে রাখাইন রাজ্যের আন্তঃগোত্রীয় দাঙ্গা বলে চিত্রায়িত করতে সচেষ্ট। সাদামাটা অর্থে যা হচ্ছে তা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ রাখাইনদের দ্বারা হত্যা-সহ ভয় ভীতির উদ্রেক করে মুসলিম রোহিঙ্গাদের বার্মার আরাকান অঞ্চল থেকে উৎখাতের উদ্দেশ্যমূলক সরকারী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুসারে এই কাজগুলোকেই বলে নৃতাত্ত্বিক বিনাশ (ethnic cleansing)। রক্তপিপাসু এই সরকার কিংবা ঘরে ও বাইরে সরকারের কোনো সমর্থকই ছল-চাতুরী করে এমন ভয়াবহ অপরাধ লুকিয়ে রাখতে পারবেনা।
 মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নৃতাত্ত্বিক বিনাশ (Ethnic Cleansing)
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক বিনাশ আসলে পূর্ব-পরিকল্পিত বিষয় (text book case)। বিষয়টি বর্মী ও রাখাইন বৌদ্ধদের আশীর্বাদে রাখাইন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বর্মী সরকারের হাতে গড়ে ওঠা জাতীয় পরিকল্পনার অংশ – যেখানে সরকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিয়ে থাকে। স্থানীয় রাখাইন রাজনীতিক থেকে শুরু করে বৌদ্ধ সাধু-সন্ত ও জনতা-সহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সবাই রোহিঙ্গা সমস্যার শেষ সমাধান দেয়ার এই পরিকল্পনার উৎসুক অংশীদার।
তাই থেইন সেইন সরকারের রোহিঙ্গা উৎখাতের পরিকল্পনাকে সমর্থন করা তরুন সাধু সঙ্ঘের (Young Monks Association) বিক্ষোভ সভাতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের দেখে অবাক হতে হয়না। সবচাইতে বড় এমনই এক বিক্ষোভ সভাতে সভাপতিত্ব করতে দেখা গেছে উইরাথু (৫) নামের পরম-পূজনীয় এক বৌদ্ধ শিক্ষককে। সে হচ্ছে সেই অপরাধী যে ২০০৩ সালে মুসলিমদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার প্ররোচনা দেবার জন্যে জেলে গিয়েছে। তাই অবাক হবার কিছু নেই যে আং সান সু চি আজ প্রতারণামূলক অঙ্গীকার করছেন – যেখানে তার দল NLD আসলে রোহিঙ্গা নির্মূলের রাষ্ট্রীয় অভিযানের অন্যতম সমর্থক। ‘গণতন্ত্র’র প্রতীক বলে পরিচিত এমন অনেক নেতাই আজ ফ্যাসিবাদের চাইতে কতটা ভালো তার প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন – সত্যি বলতে কি, তাদের কাজকর্ম আদতে কু ক্লাক্স ক্ল্যান (KKK) সদস্যদের চেয়েও জঘন্য বলেই প্রমাণিত হয়েছে।
এই নির্মূল অভিযানের সবচাইতে ভয়ানক অংশ হচ্ছে রাখাইন বৌদ্ধরা, যাদের পূর্বপুরুষেরা একাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আরাকানে বসতি স্থাপন করে। অবশ্য আরো শতাধিক বছর আগেই হিন্দু সাম্রাজ্য চন্দ্র’দের শাসনামলে অপেক্ষাকৃত শ্যামলা বর্ণের রোহিঙ্গাদের বংগ-ভারতীয় পূর্বপুরুষেরা আরাকানে ইতোমধ্যেই বসবাস শুরু করে দিয়েছে। চন্দ্র রাজাদের তৎকালীন বাংলার (বর্তমানের বাংলাদেশ) সাথে ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।
রাখাইন জাতির সেই তিব্বতীয়-বর্মী বৌদ্ধ পূর্বপুরুষদের অনধিকার ও সহিংস প্রবেশের ফলে আরাকানে বসবাসকারী হিন্দু ও মুসলিমরা কালক্রমে সংখ্যালঘু হয়ে যায়। কিন্তু ১৪৩০ সালে প্রায় ৫০,০০০ সদস্যের দু’টি সৈন্যদল পলায়নরত রাজা নারামেইখলা’কে যখন আরাকান রাজ্যে পুনঃঅধিষ্ঠিত করে তখন সেই সৈন্যদলের অনেককেই আরাকানে থেকে যেতে রাজা অনুরোধ করেন (৬); উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বর্মী আক্রমণ প্রতিহত করা। মুসলিম সেনাদলের অনেকেই নতুন রাজধানী ম্রোহাংগ (ম্রাউক-উ)-এ থেকে গেলে, সংখ্যালঘু মুসলিমদের সংখ্যা আরাকানে কিছুটা বাড়ে।
আরাকানের ম্রাউক-উ সাম্রাজ্য পার্শ্ববর্তী বাংলা/ভারত অঞ্চল থেকে অনেক আচার, কৃষ্টি গ্রহণ করে। তারা ইসলামী অভিলিখনে মুদ্রাও বাজারে ছাড়েন। তারা বাংলা সাহিত্যকে পৃষ্ঠপোষকতাও দেন। তারা মুসলিম নামও অধিগ্রহণ করেন, যে রীতি ষোড়শ শতাব্দীর প্রায় শেষভাগ পর্যন্ত চলে। বৈচিত্র্যপূর্ণ নৃ ও জাতিগোষ্ঠীর সমাহারে সাজানো এই সাম্রাজ্যে মুসলিমরা প্রশাসন, আদালত ও প্রতিরক্ষা বাহিনীতে বিশেষ অবদান রাখে। ১৭৮৪ সালের বর্মী রাজা বোদোপায়ার অধিগ্রহণের আগ পর্যন্ত প্রায় কয়েক শতাব্দী ধরেই এই বিচিত্র ও অনন্য রাজ্য ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন।
বোদোপায়া ছিলেন উগ্রপন্থী বৌদ্ধ, যিনি মুসলিম সম্পর্কিত সবকিছুই ধ্বংস করে ফেলতে চাইতেন। ধর্মীয় সৌহার্দপূর্ণ অঞ্চলে তিনি সংকীর্ণতাবাদী সাম্প্রদায়িকতার প্রচলন করেছিলেন। আরাকানের সৈকত জুড়ে থাকা মসজিদগুলোকে ধ্বংস করে তিনি সেখনে প্যাগোড়া ও বৌদ্ধ আশ্রম গড়ে তোলেন। আরাকান অধিগ্রহণের সময় তিনি কয়েক অযুত মুসলিমকে মারা ছাড়াও প্রায় ২০,০০০ মুসলিমকে বন্দী করে নিয়েছিলেন। তার নৃশংস রাজত্বকালে প্রায় দুই লক্ষ আরাকানবাসী পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় (আজকের বাংলাদেশ) পালিয়ে যায়। প্রায় ৪০-বছর বর্মী শাসনের পরে (১৯৮৪-১৮২৪) আরাকান ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অধীনে আসে। ইংরেজরা ৪-ঠা জানুয়ারী ১৯৪৮ সালের বার্মার স্বাধীনতা পর্যন্ত এই আরাকান অঞ্চল শাসন করে I

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের বার্মা অধিগ্রহণের প্রাক্কালে বৌদ্ধ যোদ্ধারা ফ্যাসিবাদী রাজকীয় জাপানী সেনাবাহিনীর পক্ষে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং ভারতীয় ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ী ও ব্যাবসাদির উপর হামলে পড়ে। এমনকি পশ্চিমাঞ্চলে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীও এই নির্মূলাভিযান থেকে রেহাই পায়নি। প্রায় এক লক্ষ রোহিঙ্গা ঐ বৌদ্ধ-জাপানী যৌথ অভিযানে প্রাণ হরান। রোহিঙ্গাদের তখন দক্ষিণ আরাকান থেকে বের করে দেয়া হয়। অনেকেই তখন ব্রিটিশ বাংলার প্রতিবেশী উত্তর আরাকান অঞ্চলে পালিয়ে বাঁচেন, কেননা সেখানে তখনো রোহিঙ্গাদের নিগূঢ় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। জীবন বাঁচাতে গিয়ে আরো প্রায় ৮০ হাজার তখন সীমান্ত পেরিয়ে স্থায়ীভাবে বাংলায় বসবাস শুরু করে দেয়। সে সময় ২৯৪টি রোহিঙ্গা গ্রাম পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় (৮, ৯)।
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বার্মা স্বাধীন হবার পরেও রোহিঙ্গা-সহ অন্যান্য মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত গণহত্যা ও নৃশংসতা চলতেই থাকে। নৃতাত্ত্বিক বিনাশের লক্ষ্যে আমার জানা মতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিদেনপক্ষে দুই ডজন অভিযান চালানো হয়, সেগুলো হচ্ছে:
১. সামরিক অভিযান (৫ম বর্মী রেজিমেন্ট) – নভেম্বর ১৯৪৮
২. বার্মা টেরিটোরিয়াল ফোর্স (BTF) এর অভিযান – ১৯৪৮-৫০
৩. সামরিক অভিযান (দ্বিতীয় জরুরী ছিন রেজিমেন্ট) – নভেম্বর ১৯৪৮
৪. মাউ অভিযান – অক্টোবর ১৯৫২-৫৩
৫. মনে-থোন অভিযান – অক্টোবর ১৯৫৪
৬. সমন্বিত অভিবাসন ও সামরিক যৌথ অভিযান – জানুয়ারী ১৯৫৫
৭. ইউনিয়ন মিলিটারি পুলিস (UMP) অভিযান – ১৯৫৫-৫৮
৮. ক্যাপ্টেন হটিন কিয়াও অভিযান – ১৯৫৯
৯. শোয়ে কি অভিযান – অক্টোবর ১৯৬৬
১০. কি গান অভিযান – অক্টোবর-ডিসেম্বর ১৯৬৬
১১. ঙ্গাজিঙ্কা অভিযান – ১৯৬৭-৬৯
১২. মিয়াট মোন অভিযান – ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯-৭১
১৩. মেজর অং থান অভিযান – ১৯৭৩
১৪. সাবি অভিযান – ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪-৭৮
১৫. নাগা মিন (ড্রাগন রাজা) অভিযান – ফেব্রুয়ারী ১৯৭৮-৭৯ (ফলাফল: ৩ লক্ষ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অভিনিষ্ক্রমণ (exodus); মৃত্যু চল্লিশ হাজার)
১৬. সোয়ে হিন্থা অভিযান – অগাস্ট ১৯৭৮-৮০
১৭. গেলোন অভিযান – ১৯৭৯
১৮. ১৯৮৪’র তাউঙ্গকের গণহত্যা
১৯. মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা – তাউঙ্গি (পশ্চিম বার্মা)। পিয়াই ও রেঙ্গুন সহ বার্মার অনেক অঞ্চলে এই দাঙ্গা ঘটে।
২০. পি থিয়া অভিযান – জুলাই ১৯৯১-৯২ (ফলাফল: দুই লক্ষ আটষট্টি হাজার রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অভিনিষ্ক্রমণ (exodus))
২১. না-সা-কা অভিযান – ১৯৯২ থেকে আজ পর্যন্ত
২২. মুসলিম বিরোধী সাস্প্রদায়িক দাঙ্গা – মার্চ ১৯৯৭ (মান্দালয়)
২৩. সিটীওয়ে’তে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা – ফেব্রুয়ারী ২০০১
২৪. মধ্য বার্মার মুসলিম বিরোধী সর্বাঙ্গীন দাঙ্গা – মে ২০০১
২৫. মধ্য বার্মার মুসলিম বিরোধী সর্বাঙ্গীন দাঙ্গা (বিশেষত পিয়াই/প্রোম, বাগো/পেগু শহরে) – ৯/১১ এর পরবর্তী থেকে অক্টোবর ২০০১
২৬. যৌথ নির্মূলাভিযান – জুন ২০১২ থেকে চলছে
জেনারেল নে উইন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সকল মিয়ানমার সরকারই মৌলিক মানবাধিকার বন্ধ রেখে রোহিঙ্গাদের সার্বিক নৃতাত্ত্বিক বিনাশে খেলায় মত্ত। রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রবিহীন ঘোষণা করতঃ – তাদের বিরুদ্ধে করা সব ধরণের অপরাধকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের কোনো অনুচ্ছেদই মানা হচ্ছেনা। এখানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘটা অপরাধগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকা দেয়া হলো:
নাগরিকত্ব অস্বীকার
সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত ভ্রমণ ও চলাচল
নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত শিক্ষা
সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত কাজের অধিকার
জবরদস্তিমূলক শ্রমনিয়োগ
ভূমি অধিগ্রহণ
জবরদস্তিমূলক উচ্ছেদ
ঘরবাড়ী, অফিস, স্কুল, মসজিদ ইত্যাদির ধ্বংস সাধন
ধর্মীয় যন্ত্রণা দান
জাতিগত বৈষম্যমূলক আচরণ
নিয়ন্ত্রিত বিয়ে
প্রজননে বাধাপ্রদান ও জোরপূর্বক গর্ভনাশ
স্বেচ্ছাচারী কর আরোপ ও বলপ্রয়োগে কর আদায়
গবাদি পশু-সহ পরিবারের সদস্যদের জবরদস্তিমূলক জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধকরণ
স্বৈরাচারী মনোভাবসূলভ গ্রেফতার, নিবর্তন ও আইন বহির্ভূতভাবে হত্যা
রোহিঙ্গা মহিলা ও বয়ষ্কদের অবমাননা ও অমর্যাদা
যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণের প্রয়োগ
রোহিঙ্গা সমৃদ্ধ লোকালয়ের প্রণালীবদ্ধ উচ্ছেদ
অভিবাসন ও নাগরিকত্ব কার্ড বাজেয়াপ্তকরণ
আভ্যন্তরীণ শরনার্থী ও রাষ্ট্রহীনতা
মুসলিম পরিচিতি মুছে ফেলার লক্ষ্যে মুসলিম ঐতিহ্য সমৃদ্ধ স্থান ও প্রতীকের ধ্বংস কিংবা পরিবর্তন
 
ড. শুয়ে লু মং ওরফে শাহনেওয়াজ খান তার লেখা The Price of Silence: Muslim-Buddhist War of Bangladesh and Myanmar – a Social Darwinist’s Analysis বইতে জানাচ্ছেন যে আরাকান রাজ্যের চারটি জেলাতে রোহিঙ্গা মুসলিম ও রাখাইন বৌদ্ধদের সংখ্যিক অনুপাত প্রায় সমানই ছিল – কিন্তু তেশরা জুন, ২০১২ থেকে শুরু হওয়া রাখাইন বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের নির্মূলাভিযানের কল্যাণে সেসব মুসলিম জনবসতি এখন প্রায় জনশূণ্য।
জাতিসংঘ সহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা রোহিঙ্গাদের ব্যপারে সঠিকই বলেছেন – রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচাইতে বড় নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। তাদের গোত্র ও ধর্মের জন্যে তারা মিয়ানমারের সংখ্যা গরিষ্ঠ বৌদ্ধ সম্প্রদায় দ্বারা গণহত্যার বলি হচ্ছেন।

জাতিসংঘ-সহ মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতামত অনুসারে রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে অসহায় ও নির্যাতিত জাতি।
রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থাকে ঠিকভাবে প্রকাশ করার জন্য গণহত্যা ছাড়া আর কোনো শব্দ আছে বলে মনে হয়না। এক্ষেত্রে গণহত্যা শব্দের ব্যবহারে কারো অবাক হবার কিছু নেই, কেননা মিরিয়াম ওয়েবস্টার অভিধানে গণহত্যাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, “ইচ্ছাপ্রনোদিত ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কোনো নৃ, জাতি কিংবা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর নির্মূল অভিযান [the deliberate and systematic destruction of a racial, political or cultural group]।" সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞরা বলছেন, হোক সার্বিক কিংবা আংশিক – নৃ, জাতি, ধর্ম কিংবা রাষ্ট্রিক গোষ্ঠীর নিয়মতান্ত্রিক নির্মূলাভিযান থাকলেই গণহত্যা’র সংজ্ঞা প্রাসঙ্গিকই থাকে। আর যেকোনো সংজ্ঞা অনুসারেই আরাকানের রোহিঙ্গারা নৃ, জাতি ও ধার্মিক আঙ্গিকে সংখ্যাগুরু রাখাইন বৌদ্ধ বর্মীদের চাইতে পুরোপুরি আলাদা।
ড. ড্যানিয়েল জোনাহ গোল্ডহ্যাগেন তার লেখা Worse than War বইতে পাঁচ ধরণের উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন, সেগুলো হচ্ছে –পরিবর্তন, নিবর্তন, বিতাড়ন, জন্মনিরোধ ও সর্বাংশে নির্মূল। এখানে পরিবর্তন বলতে বোঝানো হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি-সহ সকল মৌলিক পরিচিতিগুলোকে ধীরে ধীরে পাল্টে দেয়া। আগে আমি যেভাবে বললাম, যদিও আরাকানে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস স্মরণাতীত কালেই পৌঁছে – তবুও তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে আসা নব্য বসতকারী গোষ্ঠী হিসেবে নতুন মিথ্যে পরিচিতি দেয়া হচ্ছে।      
নিবর্তন হচ্ছে সেই পদ্ধতি যার মাধ্যমে ঘৃণিত, অননুমোদিত ও ভয়ঙ্কর মানুষদের নিজেদের কব্জায় রেখে তাদের উপর সহিংস দমননীতি চালানো যাতে সেই ভয়ানক জনগোষ্ঠী আসল কিংবা কল্পিত কোনও রকমের ক্ষতিই আর করতে না পারে। নিবর্তন মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের জীবনের প্রাত্যহিক বৈশিষ্ট্য।
বিতাড়ন কিংবা বিবাসন হচ্ছে তৃতীয় উচ্ছেদের উপায়। বিতাড়নের মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত জনগোষ্ঠীকে হয় দেশের সীমানার বাইরে কিংবা দেশের মধ্যেই এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে তাড়িয়ে দেয়া হয়। বিতাড়নের আরেকটি উপায় অবশ্য হচ্ছে জনগোষ্ঠীকে স্বদলবলে ক্যাম্পের জীবন বেছে নিতে বাধ্য করা। আর নে উইনের আমল থেকেই মিয়ানমার সরকার এই দোষে দোষী।    
উচ্ছেদের চতুর্থ উপায় হচ্ছে জন্ম নিরোধ যা মিয়ানমার সরকার অন্যান্য উপায়গুলোর সাথে ব্যবহার করে। এই পদ্ধতিতে রোহিঙ্গা মেয়েদের বিয়েতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ছাড়াও ব্যবহার করা হয় জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ, গর্ভপাত ও ধর্ষণ। হালে ঘটা নিবর্তনে মুসলিমদের ঘরবাড়ি, শহর ও লোকালয় আক্রমণের সময় অনেক মেয়েদের অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া বলতে গেলে নৈমিত্তিক ঘটনাতে পরিণত হয়েছে।    
সর্বাংশে নির্মূল হচ্ছে উচ্ছেদের পঞ্চম উপায় যেখানে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে মেরেই ফেলা হয়। সর্বাংশে নির্মূলের ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যে এমন কারণও দেয়া হয় যে উল্লেখ্য গোষ্ঠীর সামান্য উপস্থিতিই যেন অন্যদের জন্য ভয়ানক হুমকির ব্যপার। এই পদ্ধতিতে সাময়িক, খণ্ডকালীন কিংবা সম্ভাব্য সমাধানের বদলে দেয়া হয় “চিরস্থায়ী সমাধান।” বুঝতে কষ্ট হয়না যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কেন রাখাইন ব্যবসায়ীরা রোহিঙ্গাদের মেরে ফেলার জন্যে বিষাক্ত তেল ও খাদ্যাদি বিক্রী করেছে। বর্ণবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু, রাখাইন সন্ত্রাসী, রক্তপিপাসু রাজনীতিবিদ ও সরকারের সাম্প্রতিক কার্যকলাপে এটা পরিষ্কার যে সার্বিক মিয়ানমার সমাজে রোহিঙ্গারা নির্মূলাভিযানের শিকার।

কী ভিক্ষু কী বৌদ্ধ জনতা – রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমি থেকে বের করে দিতে প্রায় সকল শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ আজ সংকল্পবদ্ধ।


আগে স্থানীয় সরকারের প্রকার, স্তরসংখ্যা ও গন্তব্য ঠিক করতে হবে; এবং ‘উপজেলা’ ও ‘গ্রাম সরকার’ সম্পর্কিত মিথগুলো বুঝতে হবে -------হাকিকুল ইসলাম খোকন

মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৬

আগে স্থানীয় সরকারের প্রকার, স্তরসংখ্যা ও শেষ গন্তব্য কেন ঠিক করতে হবে তা জানতে হলে, বুঝতে হলে বিদ্যমান স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও এর অতীত সম্পর্কে ভাল ধারণা থাকতে হবে; পাশাপাশি অতীতে স্থানীয় সরকার কেন্দ্রীক অবৈধ শাসকদের অসৎ উদ্দেশ্যমূলক কর্মকান্ড, তার ধারাবাহিকতা ও সাংঘাতিক কুফলগুলো কিভাবে জনগণ, রাজনৈতিক দল, সরকার, এনজিও, সুশীলসমাজসহ সমাজের অগ্রসরমান বলে পরিচিত গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে চলেছে তাও ভালভাবে জানতে হবে, বুঝতে হবে। এই লেখাটি অবয়বে ছোট্ট রাখতে কেবল বাংলাদেশ আমলের দুইজন অবৈধ শাসক এর অপকর্মের স্মারক ( উপজেলা ও গ্রাম সরকার) এবং এগুলোর কুপ্রভাব কীভাবে গোটা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে সাংঘাতিকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে, করছে তা জানার, বুঝার প্রয়াস নেয়া যেতে পারে। এই প্রয়াসের মধ্য দিয়ে আগে স্থানীয় সরকারের প্রকার, স্তরসংখ্যা ও গন্তব্য কেন ঠিক করতে হবে তা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যাবে বলে আমরা আশা করি। সেসঙ্গে এই নিবন্ধে সামগ্রিকভাবে স্থানীয় সরকার বিষয়ক আরও অনেক দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা ও এগুলোর উপযুক্ত সমাধান প্রাসঙ্গিকভাবে উপস্থাপিত ও আলোচিত হয়েছে। ফলে ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল নাগাদ পরিবর্তনশীল বিষয়গুলি (জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষিত) বিবেচনায় নিয়ে প্রণীত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ ও স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ (দেখুন-যা এই নিবন্ধের শেষে সংযুক্ত রয়েছে) এবং সমাধানমূলক অন্যান্য উপায়গুলো জানতে, বুঝতে সহজতর হবে বলে প্রতীয়মান হয়; এবং ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারিতে ঢাকায় উপস্থাপিত ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’টি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা, এর সুদূরপ্রসারী উপকারীতা ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে সহায়ক হবে। স্থানীয় সরকারের প্রকার ও শেষ গন্তব্য সঠিকভাবে বুঝা ও ঠিক হওয়া কেন জরুরি তাও স্পষ্টভাবে জানা ও বুঝা যাবে; পাশাপাশি, তা বুঝা ও ঠিক হওয়ার সঙ্গে কেন সঠিকভাবে স্থানীয় সরকারের স্তরগুলো নির্ধারিত হবার বিষয়টি যুক্ত রয়েছে তাও স্পষ্ট হবে; ১৯৯৭ সালে শুরুতে উপস্থাপিত এই রূপরেখায় নির্দিষ্ট সময় বিবেচনায় ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল নাগাদ স্থানীয় সরকারের শেষ গন্তব্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, স্থানীয় সরকারের প্রকারভেদকরণ ও স্তরবিন্যাসকরণ কি অবস্থায় গিয়ে পৌঁছাবে, বাংলাদেশ কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজ কোন স্তরীয় হবে, একসময় কারো কারো কাছে কাল্পনিক অবাস্তব বলে মনে হলেও এখনকার বাস্তবতায় সেসবের দৃশ্যমান অবস্থা কতটুকু বোধগম্য হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয় সেসব বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে, সুস্পষ্টভাবে জানা যাবে, বোঝা যাবে। এই নিবন্ধে একসময়ের কৃষিজ সমাজ, কৃষিপ্রধান দেশ তথা গ্রামীণ দেশ থেকে বর্তমানকার গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ তথা গ্রামীণ-নগরীয় দেশ এবং গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ থেকে পরিপূর্ণ নগরীয় সমাজ তথা পরিপূর্ণ নগরীয় দেশ তথা পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশমুখী পরিবর্তনসমূহ ও সময়ের সাথে সাথে রূপান্তর প্রক্রিয়াটির চলমান অবস্থা বোঝা যাবে, জানা যাবে; তা জানা, বোঝা ও নির্দিষ্ট সময় ভিত্তিক ভবিষ্যৎ অনুমানে ঘোষিত ফোরকাস্টের সঙ্গে স্থানীয় সরকারের জন্য প্রস্তাবিত প্রকারভেদকরণ ও স্তরবিন্যাসকরণ বিষয়দ্বয় ভালভাবে বুঝা ও জানার সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে কেন জড়িত রয়েছে তা পরিষ্কার হবে। স্থানীয় সরকারের একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ গ্রহণ ও তা একসঙ্গে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জোর না দিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে একেক সময় একেকটি ইউনিট (যেমন কখনও গ্রাম সরকার, কখনও উপজেলা) নিয়ে প্রবল টানাটানি ও হইচই করা হয়েছে, হচ্ছে; দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এই বিষয়টি বৈধ-অবৈধ সব শাসকদের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়; তারই ধারাবাহিতায় সাম্প্রতিক কালে অসফল অর্থমন্ত্রি মুহিত সাহেবও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কেবল জেলা ও জেলা বাজেট নিয়ে অনুরূপ হইচই, টানাটানি করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছেন জাতীয় বাজেট বক্তৃতায়, যেটি  মন্ত্রিসভা ও জাতীয় সংসদ বাকহীন থেকে অনুমোদন দিয়ে চলেছে; এখানে সেই বিষয়টি এবং বিশেষভাবে দুইজন অবৈধ শাসকের অপকর্মমূলক, অপরাধমূলক বিষয় (এরশাদের উপজেলা ও জিয়ার গ্রাম সরকার) আলোচনায় সমালোচনায় এনে তা গভীরভাবে জানার, বোঝার প্রয়াস নেয়া হল।
অবৈধ শাসক এরশাদ প্রবর্তিত উপজেলা হচ্ছে মূলত একটা মিথ, একটা মিথ্যা নোশান এবং এটি বেশ দায়দায়িত্বহীন, স্বশাসনহীন একটি মধ্যবর্তী প্রশাসনিক ইউনিট। উপজেলা নামকরণটিও সার্থক ও যথার্থ নয়; দেশের আইনকানুন ও বইপুস্তকে বর্ণিত এর সংজ্ঞাটিও বাস্তবতার নিরিখে সঠিক নয়। অথচ গোটা জাতি এই মিথ, এই দায়দায়িত্বহীন ইউনিট, এই স্বশাসনহীন মধ্যবর্তী ইউনিট, এই অসার্থক নামকরণ আর ভুল সংজ্ঞার বেড়াজালেই ঘুরপাক খেয়ে চলেছে। এই বিষয়গুলো বিশেষভাবে তলিয়ে দেখলে তা বুঝতে কারো অসুবিধা হবার কথা নয়; কিন্তু তা বুঝতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রীপরিষদ, নিকার, একনেক, পরিকল্পনা কমিশন ও জাতীয় সংসদ’র বেশ অসুবিধা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। অনুরূপভাবে আরেক অবৈধ শাসক জিয়া প্রবর্তিত ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ এবং পরবর্তীতে তা কেন্দ্রীক ‘পল্লী পরিষদ,’ ‘গ্রাম সভা,’ ‘গ্রাম পরিষদ,’ ‘গ্রাম সরকার’ ও ‘ওয়ার্ড সভা’ নিয়ে গোটাদেশ মিথ্যা নোশানের বেড়াজালে ঘুরপাক খেয়েছে, খাচ্ছে; ইউনিয়নের মধ্যে অবস্থিত প্রতিটি গ্রাম কেন্দ্রীক কিংবা প্রতিটি ওয়ার্ড কেন্দ্রীক এসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট নিয়ে এক সময় প্রচুর মাতামাতি, লাফালাফি হয়েছে, হচ্ছে; সবাই ভালভাবে জানে যে, তাতে কাজের কাজ কিছু-ই হয়নি, হচ্ছেনা। দেশের এই দু’জন অবৈধ শাসক (প্রেসিডেন্ট জিয়া ও প্রেসিডেন্ট এরশাদ) এর সাংঘাতিক অপকর্ম আর হিমালয়সম দুর্নীতির স্মারক হিসেবে এই গ্রাম সরকার ও উপজেলাকে নিয়ে গোটা জাতির প্রচুর মাতামাতি ও লাফালাফিটা ইতিহাসের পাতায় জাতিগতভাবে ও সমষ্টিগতভাবে ভুল করার, ভুলের মধ্যে ডুবে থাকার এক মহা জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে থাকবে। এবং এর মাধ্যমে জনগণও যে সমষ্টিগতভাবে ভুল করতে পারে, ভুলের মধ্যে ডুবে থাকতে পারে তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল; জনগণ ভুল করেনা, জনগণ ভুল করতে পারেনা-এই ধরনের আপ্ত বাক্য যাঁরা কথায় কথায় বলে থাকেন তাতে তাঁদেরও বোধদয় হবে বলে আশা করা যায়।
‘উপজেলা’ কেন একটা মিথ, কেন একটা মিথ্যা নোশান, কেন অন্যতম মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে এটি বেশ দায়দায়িত্বহীন তার কারণগুলি ভালভাবে জানা ও বোঝা খুবই দরকার; পাশাপাশি, আর বিলম্ব না ঘটিয়ে এই মিথ্যা নোশানের বেড়াজাল থেকে গোটাদেশ যেন বের হয়ে আসতে পারে তার জন্য সঠিক করণীয় ঠিক ও তা বাস্তবায়ন করাও খুবই জরুরী কর্তব্য। মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনিক ইউনিটগুলির মধ্যে উপজেলা হচ্ছে অন্যতম মধ্যবর্তী ইউনিট। এর উপরে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট যেমন জেলা ও বিভাগ, এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট যেমন ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড, এবং কোনো কোনো জেলায় এর পাশে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট যেমন “সিটি কর্পোরেশন”; এই অবস্থাটা হচ্ছে একটি চরম হ-য-ব-র-ল অবস্থা;  এসব স্থানীয় ইউনিটের মধ্যে উপজেলায় অর্পিত ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিলে অনুপোযুক্ত বলে প্রতীয়মান হয়; স্থানীয় ইউনিটগুলির, স্থানীয় সরকারগুলোর এমনতরো এলোমেলো, গোজামিল অবস্থা কারও কাছেই কোনোভাবেই কাম্য নয়; তাই আমরা সবসময় বলি যে, এই এলোমেলো গোজামিল অবস্থার নিরসনকল্পে স্থানীয় সরকারের একটি সঠিক ও সমন্বিত স্তরবিন্যাস তথা স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো আগে গ্রহণ করতে হবে; সেই গৃহীত প্রশাসনিক কাঠামোয় সর্বাদিক গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট (জেলা সরকার কিংবা বিভাগীয় সরকার) ও সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয়কে (একদিকে গ্রামীণ এলাকায় ‘ইউনিয়ন সরকার’ ও  অপরদিকে নগরীয় এলাকায় ‘নগর সরকার’) কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে হবে; তা না করে স্থানীয় ইউনিটগুলি ও স্তরগুলির এলোমেলো অবস্থা বজায় রেখে, স্থানীয় ইউনিটগুলির অসঠিক প্রকারভেদকরণ বজায় রেখে, স্থানীয় ইউনিটগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ইউনিট ও সর্বনি¤œ ইউনিটদ্বয় ঠিক না করে এবং তাতে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে কেবল একটি মধ্যবর্তী ইউনিট তথা ছাগলের তৃতীয় বাচ্চা তুল্য উপজেলাকে নিয়ে গোটাদেশ অতি উৎসাহ, অতি মনোযোগ, অতি তৎপরতা দেখিয়ে আসছে; ফলে এই উপজেলার জন্মলগ্ন থেকে প্রতিটি নির্বাচনে প্রতিটি উপজেলায় সংশ্লি¬ষ্ট পদপ্রার্থীদের সহিংস কর্মকান্ড অতি মাত্রায় চলে আসছে। পাশাপাশি, হীন রাজনৈতিক স্বাথর্, ব্যক্তি বিশেষের প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্নীতি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, নিকার ও একনেক’র অদূরদর্শি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে উপজেলার সংখ্যা কমে আসার পরিবর্তে এর সংখ্যা বেড়েই চলেছে, এবং আরও নতুন নতুন উপজেলা গঠনের প্রক্রিয়া, প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে; তাতে প্রশাসনিক সিস্টেম কস্ট বাড়ছে; উন্নয়ন ও সেবামূলক ব্যয়ে ঘাটতি থাকছে। অথচ বাংলাদেশে উপজেলার সংখ্যা বাড়ানোর অপ্রয়োজনীয়তা নিয়ে সিডিএলজি, বাপসনিউজ ও এমপো বাস্তবায়ন ফোরাম ছাড়া অন্য কারো বক্তব্য শোনা যায় না; এ এক আশ্চর্য ব্যাপার নয় কি?
বাস্তব ঘটনাগুলো হল, উপজেলায় তেমন কোনো কাজকর্ম নেই, দায়দায়িত্ব নেই, এতে পরিপূর্ণ স্থানীয় সরকার কাঠামো নেই, স্বশাসন নেই, এর নিজস্ব আয়ের তেমন কোনো উৎস নেই, নিজস্ব রাজস্ব আয়ের উৎস সৃষ্টির সুযোগও তেমন একটা নেই বললে চলে, এটির নিজস্ব রাজস্ব আয় সৃষ্টির কিছু সুযোগ তৈরী করতে গেলে তৃণমূলের ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের রাজস্ব আয়ের বেশ কিছু উৎস কর্তন করতে হবে, আর তা করতে গেলে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সঙ্গে বিরোধ অনিবার্য হয়ে পড়বে; উপজেলায় জনগণকে সেবামূলক সার্ভিস দেয়ার মত তেমন কোনো সুযোগ নেই বললে চলে, কিংবা এর মাধ্যমে যেসব সেবামূলক সার্ভিস দেয়ার কথা বলা হয় তা দেয়ার কোনো প্রয়োজনই নেই, কারণ সেসব সার্ভিস অনায়াসে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে দেয়া সম্ভব; অন্যসব স্থানীয় ইউনিটগুলি যেমন ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, জেলা, বিভাগ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এর সম্পর্ক কেমন হবে, কিভাবে কতটুকু থাকবে তা সুনির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট করা নেই; বিশেষত ইউনিয়ন ও পৌরসভার সঙ্গে উপজেলার এক ধরনের সাপে নেউলে সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে, এই সাপে নেউলে সম্পর্ক যে কোনো সময় সংঘাতরূপে প্রকাশ্যে আসতে পারে, যা কোনো অবস্থাতেই কারোরই কাম্য নয়, ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই ধরনের একটা নাজুক দৃশ্যমান চলমান অবস্থার মধ্যে অন্য ধরনের আরেকটা দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়, তা হল উপজেলার প্রতিনিধিগণের জন্য গাড়ী, ড্রাইবার, বাসা, বিশাল দাপ্তরিক ভবন, পিয়ন, সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে লোভনীয় পদবী, বেতন-ভাতা, সামাজিক মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, বিদেশ ভ্রমণ, অপক্ষমতা ও নানাবিধ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সুযোগসুবিধার দৃশ্য; এসব লোভনীয় বিলাসবহুল সুযোগসুবিধা থাকায় পদপ্রার্থী হবার জন্য, পদপ্রার্থীদের মধ্যে এক ধরনের প্রচন্ড মোহ, লোভ তৈরী হয়; পাশাপাশি, উপজেলা নির্বাচনে যারা চেয়ারপারসন ও ভাইস-চেয়ারপারসন পদপ্রার্থী হয়, হতে চায়, তাদের লক্ষ্য কিন্তু উপজেলায় দায়িত্ব পালন করা নয়, উপজেলা কেন্দ্রীক উন্নয়নমূলক, সেবামূলক কর্মকা- নিয়ে চিন্তাভাবনা করাও নয়, তাদের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারী সুযোগসুবিধা ও পদবী কাজে লাগিয়ে জাতীয় সংসদ এর সদস্য হবার পথে উপজেলাকে মই হিসেবে ব্যবহার করা, এবং অন্যসব উপায় অবলম্বনে কেবল নিজস্ব ভাগ্য উন্নয়নে প্রচেষ্টা চালানো; আর কাজকর্ম, দায়দায়িত্ব ছাড়া কেবলই ‘বাবুগিরি,’ ‘নেতাগিরি’ করার, কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে সদায় তৎপর থাকার, নিজেকে একজন বিকল্প ‘এমপি’ ভাবার যে সুযোগসুবিধা রয়েছে তা কার না ভাল লাগে; ফলে এই উপজেলা নির্বাচনে দলীয় ও নির্দলীয় প্রার্থীগণের বেশী বেশী আগ্রহ ও বেশী বেশী সহিংস আচরণ দেখা যায়।
এতে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, এই উপজেলার জন্মগত অসৎ উদ্দেশ্য ও জঘন্য কলংক এখনো বহাল রয়েছে; জেনারেল এরশাদ অবৈধ উপায়ে ক্ষমতায় এসে অবৈধ ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত ও পাকাপোক্ত করতে এবং স্থানীয় মধ্যবর্তী পর্যায়ে নিজস্ব অনুগত দলীয় মোড়ল তৈরী করতে উপজেলা সৃষ্টি করেন, এবং তিনি বিশেষ ব্যবস্থায় সমস্ত আইনকানুন লংঘন করে রাষ্ট্রীয় অর্থ ও ক্ষমতা বিলিয়ে দিয়ে উপজেলার প্রতি প্রবল মোহ ও একটি অনুগত মোড়লগোষ্ঠী তৈরী করতে সক্ষম হন। আর এই অনুগত মোড়লগোষ্ঠীই পরবর্তীতে জাতীয় পার্টির স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী মধ্যবর্তী খুঁটি হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়; একটু খোঁজ নিলে দেখা যাবে এঁরাই এখনকার জাতীয় পার্টির স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে মূল খুঁটি হিসেবে কাজ করছে। রাষ্ট্রীয় অর্থে ও সরকারী ক্ষমতাবলে নিজস্ব দলীয় খুঁটি, মোড়ল তৈরী করাটা হচ্ছে মহা অপরাধ, মহা দুর্নীতি; এই মহা অপরাধ, এই মহা দুর্নীতির কথা মনে রাখা, আমলে নেয়া উচিত নয় কি? অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় এসব অপরাধ, এসব দুর্নীতি যেন কিছু-ই না। এসব বিষয়ে দেশের অন্য সব রাজনৈতিক দলও নীরব; তাই তো দেখা যায়, অবৈধ শাসক এরশাদ, তাঁর দল জাতীয় পার্টি, তাঁর শাসনিক মিত্র জেএসডি, কিছুসংখ্যক অবুঝ ব্যক্তি ও চরম চাটুকারকে এখনও ‘উপজেলা’ তথা ‘উপজ্বালা’ নিয়ে গর্ব করতে, উদাহরণ দিতে শোনা যায়! এবং কথায় কথায় বলতে শোনা যায়, জেনারেল এরশাদ ও তাঁর দল না কি এই ‘উপজেলা’র জন্যই চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে! প্রশ্ন হল, যেখানে কোনও একদিন জনাব আবু তালেব প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ অথবা স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ অনুযায়ী “উপজেলা” নামটিই থাকবেনা, সেখানে এরশাদ ও তাঁর দল চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে কীভাবে? অনুরূপভাবে, জনাব আবু তালেব প্রস্তাবিত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয় অনুযায়ী উপনিবেশিক শাসক বৃটিশ প্রবর্তিত ও আয়ুবীয় গন্ধযুক্ত “ইউনিয়ন” নামটিও কোনও না কোনও একদিন থাকবেনা, এবং যার মাধ্যমে এই নামটিকে ঘিরে আবর্তিত বৃটিশ উত্তরাধিকার ও আয়ুবীয় গন্ধও মুছে যাবে। আরও বলা প্রয়োজন যে, এই রূপরেখা অনুযায়ী “বিভাগ” স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হলে মধ্যবর্তী ইউনিট হিসাবে “জেলা” নামটিও এক পর্যায়ে মুছে যাবে, আর জেলাকে স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট করা হলে বিভাগকে একইসঙ্গে মুছে দিতে হবে। এটি ভালভাবে অনুধাবন করতে এই নিবন্ধের শেষে সংযুক্ত প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ ও স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ মনোযোগ দিয়ে ভালভাবে লক্ষ্য করার জন্য, বুঝার জন্য পাঠক-পাঠিকাকে বিনীত অনুরোধ করছি।
সে যাই হোক, এই ধরনের একটি শাসনিক অবস্থার মধ্যেই আরও অনেকে ক্ষমতা, সুবিধা ও অর্থ লোভের পাশাপাশি বুঝে, না বুঝে উপজেলার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যান। বেশ কিছু এনজিও দাতা সংস্থার টাকায় দেশীয় শাসকের চাহিদায় আয়োজিত সভা-সমাবেশে এই উপজেলাকে নিয়ে বেশ মাতামাতি, লাফালাফি করে; আবার কিছু কিছু এনজিও কর্মকর্তার মধ্যে নিজস্ব ব্যক্তিগত স্বার্থে এনজিও কমসূচী, অর্থ, জনবল ইত্যাদি কাজে লাগিয়ে নিজস্ব উপজেলায় চেয়ারপার্সন, ভাইস-চেয়ারপার্সন হবার খায়েশ ও লোভ প্রচন্ডভাবে ক্রিয়াশীল থাকায় উপজেলা কেন্দ্রিক অতি তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায়। এদের সঙ্গে যুক্ত হয় জাতীয়ভাবে পরিচিত কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তি, যাঁরা প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বোঝে না, মওকা বুঝে কথায় কথায় গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে অথচ গণতন্ত্রায়ন বোঝে না, গণতন্ত্রায়ন শব্দটি উচ্চারণ করতে চায়না, গণতন্ত্রায়ন কর্মসূচী সম্পর্কে ধারণা নেই; বিশেষত এঁরা সুবিধাবাদী অবস্থান থেকে সুবিধাজনক শব্দ “সং¯কার” শব্দটি নিয়ে সব ধরনের শাসনিক আমলে পাগলপ্রায় থাকে, থেকে কেবল সুযোগসুবিধা হাতিয়ে নেয়; এঁরা মূলত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ, প্রকারভেদকরণ, সার্থক নামকরণ, সঠিক সংজ্ঞায়িতকরণ, অর্থায়ন, দায়িত্ব বণ্টন, পারস্পরিক সম্পর্ককরণ, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, নির্বাহিক ও বিধানিক পরিষদের পার্থক্য সম্পর্কে জানেনা বুঝেনা, বুঝতে চায়ওনা; এঁরাই স্থানীয় সরকার আর কেন্দ্রীয় সরকারের কাঠামোতে নারীর শতভাগ (১০০%) প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিগতভাবে (চমক, দয়া, করুণা নয়) নিশ্চিত করতে এমপো ও ১১ দফার প্রয়োগ চায়না, ইত্যাদি ইত্যাদি; অথচ তাঁরা নিজেদেরকে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে সবসময় পরিচয় দিয়ে থাকে এবং এনজিও আয়োজিত সভা, সেমিনার, মানববন্ধন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার টকশোতে কখনও অতিথি বক্তা, কখনও অযাচিত বক্তা হয়ে বিশেষত উপজেলা কেন্দ্রিক অসার কথামালা জোর গলায় ব্যক্ত করেন। এঁদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মিডিয়ার বেশকিছু সাংবাদিক, সম্পাদক, উপস্থাপক কর্মকর্তা, যাঁরা আর্থিক সুযোগসুবিধার বিনিময়ে উপজেলা বিষয়ক সংবাদ প্রকাশে প্রচারে সহযোগিতা দিয়ে থাকেন; এই সম্পর্কিত বিভিন্ন সভায় সঞ্চালক  হয়ে সভা সঞ্চালনায় বিশেষ কৃতিত্ব নিয়ে থাকেন; এবং এঁদেরই কেউ কেউ মাঝেমধ্যে স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত অসার প্রতিবেদন প্রচার প্রকাশের মাধ্যমে ‘স্থানীয় সরকার বিষয়ক সাংবাদিক/প্রতিবেদক’ এর পরিচয় দাঁড় করিয়ে বিশেষ সুবিধা-সুনাম আদায়ে সচেষ্ট থাকেন। এ কি হল স্থানীয় সরকার বিষয়ক সাবাদিকতা?

alt
পাশাপাশি, খুবই দুঃখজনক হলেও শতভাগ সত্যি যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠায় ও তার ক্রমাগত উন্নয়নে আকাংখা, পরিকল্পনা, কর্মসূচী ও প্রস্তুতি রয়েছে এমনতরো একটি রাজনৈতিক দলও খুঁজে পাওয়া যায় না, যায়নি; অথচ রাজনৈতিক দলগুলি গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন প্রসঙ্গে সবসময় লিপ সার্ভিস দিয়ে থাকে; এই লিপ সার্ভিস আর অন্তর্গত বিশ্বাস কখনো এক ছিলনা, এখনো নেই বলে প্রতীয়মান হয়; অপ্রিয় হলেও সত্য কথা হল, বাংলাদেশে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনই হয়নি, হচ্ছেনা; বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে মিশ্রিত লক্ষ্য প্রসূত রাস্তার, মাঠের আন্দোলন হয়েছে, হয়; আপাত দৃষ্টিতে ওইসব আন্দোলনে সফলতা দেখা গেলেও সেই সফলতা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও তার উন্নয়নে কাজে লাগেনি; কারণ সমাজ, দল ও দেশের সার্বিক অর্থে গণতন্ত্রায়ন সম্পন্ন করার শিক্ষাগত ও মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ প্রক্রিয়া এসব আন্দোলনে, সংগ্রামে একেবারেই ছিলোনা বললে অত্যুক্তি হবেনা। সে যাই হোক, বড় দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে সময়ে সময়ে বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনে বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্য সাধন করতে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিগণকে, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হতে আগ্রহী দলীয় ব্যক্তিবর্গকে ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ব্যবহার করতে দেখা যায়; এবং জাতীয় নির্বাচনে দলীয় ইশতেহারে গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকার উন্নয়ন প্রসঙ্গ বেশ জোরালোভাবে উপস্থাপিত করা হয়। তা করতে গিয়ে এসব দলের কিছু সুচতুর নকলবাজ ব্যক্তি প্রতিটি জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনের পূর্বলগ্নে দলীয় ইশতেহার প্রণয়ন কালে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্র বিষয়ে নকল করার মহড়ায় নেমে থাকে। এসব নকলবাজ ব্যক্তিরা অন্য কারো আইডিয়া, স্লোগান, গবেষণা কর্ম, প্রণীত বিষয়, প্রস্তাবিত বিষয় ও কর্মসূচী জাতীয় স্বার্থে অনুসরণের জন্য, গ্রহণের জন্য নিয়মনীতি মেনে দলীয় ইশতেহারে কিংবা দলীয় কর্মসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করেন না, করতে চান না; তাঁরা দেশের ব্যক্তি বিশেষের নিজস্ব স্ট্যাডি, গবেষণা, কর্মসূচী, শ্লোগান, ক্যাম্পেইন, অবদানকে অস্বীকার করার, চুরি করার বাতিকগ্রস্ততা থেকে কেবল নগ্নভাবে চুরিতে, নকলেই সিদ্ধহস্ত; এঁরা মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক চোর এবং জনগণের অর্থ ও সম্পদ চোর তো বটেই। অথচ এঁরা স্ব স্ব দলের কাছে সম্মানীয় বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, নির্বাচনী ইশতেহার প্রণেতা, দলীয় কর্মসূচী প্রণেতা, ইত্যাদি ইত্যাদি! এ এক মহা আজব কারবার নয় কি! তাই তো দেখা যায়, এসব দলের উপজেলা সম্পর্কীয় ইশতেহারগত অংগীকার শুধু কথার ফুলঝুরি আর অন্তঃসার শূন্য কথামালায় ভরপুর; কারণ স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে উপজেলার অবস্থান, গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, ক্ষমতা, দায়দায়িত্ব, স্বশাসন, অর্থায়ন, কাঠামো ইত্যাদি সম্পর্কে এসব দলের জেনে বুঝে কোনও সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট অবস্থান নেই; এ হচ্ছে একজন অবৈধ শাসকের চরম অপকর্মের কুফলে প্রভাবিত হয়ে উত্তরাধিকার বহনে রাজনৈতিক দলগুলোর অশুভ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকা অন্য কিছু নয়; এ যেন এক চরম হ-য-ব-র-ল অবস্থার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর দিকহারা হয়ে ছোটাছুটিতে লিপ্ত থাকা। পাশাপাশি দেখা যায় যে, জনগণেরও একটা বিরাট অংশ উপজেলা নির্বাচন কালীন সময়ে নগদে পাওয়া আদর আপ্যায়ন আর কদরেই তুষ্ট থাকে। নির্বাচনে ও তার পরে কি হল তা তাঁদের নজরদারি ও তদারকির বিষয় হিসেবে থাকে না। ভোটারগণ মূলত জানেওনা উপজেলায় কি কি দায়িত্ব সম্পন্ন করানোর জন্য উপজেলা চেয়ারপারসন-ভাইস চেয়ারপারসনদ্বয় নির্বাচিত করেছে, করছে; ঠিক যেমন পদপ্রার্থীগণ ভালভাবে জানেনা কি কি দায়িত্ব পালন করার জন্য নির্বাচিত হতে চায়, হয়েছে। অতএব, সার্বিক অর্থেই বলা যায়, উপজেলা হচ্ছে একটা মিথ, একটা অলীক স্বপ্ন, একটা মিথ্যা নোশান, একটা দায়দায়িত্বহীন, স্বশাসনহীন মধ্যবর্তী ইউনিট। গোটাদেশ এই মিথ্যার বেড়াজালে ঘুরপাক খাওয়াটা, সরব থাকাটা হচ্ছে এক মহা আশ্চর্যজনক ব্যাপার!
অনুরূপভাবে, গোটা জাতি আরেকটা মিথ, আরেকটা মিথ্যা নোশানের বেড়াজালে ঘুরপাক খেয়ে আসছে; সেই মিথ আর মিথ্যা নোশানটা হল, অবৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রবর্তিত তথাকথিত ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’। এই মিথ তথা অপকর্মের কুফলে প্রভাবিত হয়ে এবং একে ঘিরেই পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসক দ্বারা সৃষ্ট পল্ল¬¬ী পরিষদ, গ্রাম সভা, গ্রাম পরিষদ, গ্রাম সরকার ও ওয়ার্ড সভা নামের অপ্রয়োজনীয় ইউনিটগুলি নিয়ে গোটা জাতি মিথ্যার বেড়াজালে জড়িয়ে থাকে; ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিটি গ্রাম কিংবা প্রতিটি ওয়ার্ডে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অবৈধ ও বৈধ শাসকগণ দ্বারা এসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠিত হয় কিংবা গঠন করার অপচেষ্টা চলে; এসব ইউনিট কেন অপ্রয়োজনীয়, কেন মিথ, কেন মিথ্যা নোশান, কেন অপচয়মূলক আর অসৎ উদ্দেশ্যমূলক তার স্বরূপ বুঝাটাও খুবই জরুরী। এর স্বরূপ বুঝার মাধ্যমে এও বুঝা যাবে যে, কেন স্থানীয় সরকারের স্তরসংখ্যা, প্রকার ও শেষ গন্তব্য আগে ঠিক করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
মূলত, ইউনিয়ন-ই হওয়া উচিত গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের মৌলিক গ্রামীণ প্রশাসনিক ইউনিট; সাধারণত ১০ থেকে ১৫টি গ্রাম নিয়ে একেকটি ইউনিয়ন গঠিত হয়ে থাকে; এই ইউনিয়নের মধ্যে অবস্থিত হাট-বাজার-ঘাট-গঞ্জগুলিও কোনো না কোনও গ্রামের মধ্যেই অবস্থিত। সেজন্য দেশের মানুষের কাছে ইউনিয়ন মানে গ্রাম আর গ্রাম মানেই ইউনিয়ন; গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী নগরীয় স্থানীয় সরকারের নগরীয় প্রশাসনিক ইউনিট (পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড) এর সংখ্যা ও আয়তন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ ইউনিট হিসেবে ইউনিয়নের মোট সংখ্যা ও আয়তন কমে আসার কথা; কিন্তু প্রশাসনিক দুর্নীতি আর অশুভ রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ইউনিয়নের সংখ্যাও বেড়েই চলেছে, এবং আরও কিছু নতুন নতুন ইউনিয়ন গঠনের প্রচেষ্টা চালু রয়েছে; তাতে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক সিস্টেম কস্ট অনেক অনেক গুণ বেড়ে গেছে, এবং তা আরও বাড়তে থাকবে; অথচ ইউনিয়নের সংখ্যা যথা সম্ভব কমিয়ে এনে প্রশাসনিক সিস্টেম কস্ট যথা সম্ভব সীমিত রেখে তাতে উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক ব্যয় বাড়ানো খুবই জরুরি প্রয়োজন বলে প্রতীয়মান হয়।
গ্রামীণ এলাকায় প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে ইউনিয়ন কেন্দ্রীক সার্বিক উন্নয়ন মানেই ১০-১৫টি গ্রামের উন্নয়ন, গ্রামীণ মানুষের উন্নয়ন; অথচ, প্রকৃত ঘটনা হল, এই ইউনিয়ন ভিত্তিক গণতন্ত্রায়ন ও তার  সার্বিক উন্নয়ন সাধনে আজ অবধি কোনো বিশেষ উদ্যোগ, বিশেষ আয়োজন গৃহীত ও দৃশ্যমান হয়নি, হচ্ছেনা। বরং এই ইউনিয়নকে পাশ কাটিয়ে এর নীচে যেমন গ্রাম সরকার ও এর ওপরে যেমন উপজেলা নামক অপ্রয়োজনীয় ইউনিটগুলো গঠনের নামে নানান সময়ে নানান রকমের অপতৎপরতা চালানো হয়েছে, হচ্ছে; ওই সব অপতৎপরতার সঙ্গে দেশের অনেক নামকরা, নামী দামী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জড়িত। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অবৈধ উপায়ে ক্ষমতায় এসে ও থেকে, রাষ্ট্রীয় অর্থে ও সরকারী ক্ষমতায় নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন ও গ্রামীণ তৃণমূলে অনুগত, চাটুকার দলীয় কর্মী-সমর্থক তৈরীর লক্ষ্যে ইউনিয়নের মধ্যে ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ গঠন করার উদ্যোগ নেন; এবং এই ইউনিট কেন্দ্রীক বেশী বেশী দলীয় কর্মী-সমর্থক তৈরী করার লক্ষ্যে নতুন নতুন গ্রাম সৃষ্টিতে প্রবল উৎসাহ যোগায়; তাতে গ্রামের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে ৬৮ হাজার থেকে ৮৭ হাজারের বেশী সংখ্যক গ্রামে উন্নীত হয়ে যায়; কারণ যত বেশী বেশী গ্রাম, তত বেশী বেশী গ্রাম সরকার, আর তত বেশী বেশী অনুগত, চাটুকার, টাউট, সুবিধাবাদী, নীতিহীন, আদর্শহীন দলীয় সদস্য; এতে দীর্ঘকালের প্রতিটি গ্রামভিত্তিক দৃঢ় সামাজিক বন্ধন ও একতা ভেঙ্গে তছনছ, চুরমার হয়ে যায়; জাতীয় অর্থ, শ্রম ও সময়ের বিপুল অপচয় ঘটে; ইউনিয়ন পরিষদ হয়ে পড়ে চরম উপেক্ষিত, এবং গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক গ্রামীণ ইউনিটের পরিবর্তে ইউনিয়ন হয়ে পড়ে গুরুত্বহীন এক মধ্যবর্তী ইউনিট। বহুল পরিচিত প্রচারিত শ্লোগান “৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে, বাংলাদেশ বাঁচবে” শ্লোগানটি হয়ে পড়ে প্রকৃত তথ্যভিত্তিক ঘটনায় অসঙ্গতিপূর্ণ; বিদ্যমান বাস্তবতায় এই শ্লোগানে গ্রামের সংখ্যাগত ভুল তো রয়েছেই; পাশাপাশি প্রশ্ন এসে যায় এই শ্লোগানে নগর, নগরীয় এলাকা আর নগরীয় মানুষ কোথায়? তা তো এই কবিতে কবিতায় অনুপস্থিত রয়েছে; কবিকে কবিতা লেখায়ও যে তথ্যগতভাবে আপডেট থাকতে হবে তা ভুললে চলবে কী? প্রকৃত ঘটনা হল, বাংলাদেশ এখন গ্রামীণ-নগরীয় দেশ; তাই গ্রাম আর নগরকে নিয়েই বাংলাদেশকে বাঁচতে হবে; তাই কবিতায়, গানে, শ্লোগানে, ভাবনায়, পরিকল্পনায়, কর্মপ্রচেষ্টায় গ্রাম আর নগর একসঙ্গে থাকতে হবে; এটি একসঙ্গে ততদিন পর্যন্ত বজায় রাখতে হবে, যতদিন পর্যন্ত গ্রাম বজায় থাকবে। সে যাই হোক, অবৈধ শাসক জিয়া কর্তৃক রাষ্ট্রীয় অর্থে, দাপটে কেবল-ই ব্যক্তিগত ও নতুন রাজনৈতিক দলীয় কর্মী-সমর্থক তৈরীর স্বার্থে পরিচালিত এই সরকারী উদ্যোগ ছিলো এক মহা দুর্নীতি, এক মহা অপরাধ; এ হল অবৈধ শাসকের অবৈধ ক্ষমতায় সৃষ্ট এক মারাত্বক বিষফোঁড়া, যার যন্ত্রণায় গোটা জাতি এখনো খেসারত দিয়ে চলেছে। অবৈধ শাসক জিয়ার এই মহা অপরাধ, এই মহা দুর্নীতি আর এই সাংঘাতিক বিষফোঁড়ার বিষয় হালকাভাবে নেয়া একদম উচিত নয়। এই মহা অপরাধ, এই মহা দুর্নীতির কথা অবৈধ ক্ষমতাবলে সৃষ্ট সংশ্লিষ্ট দলটি (বিএনপি) স্বার্থগত কারণেই হালকাভাবে নিয়ে থাকে, চাপিয়ে যায়; কারণ একটু অতীতে গেলে, একটু অতীত স্মরণ করতে চেষ্টা করলেই মনে পড়ে যাবে যে, জিয়াউর রহমান তখনকার গ্রাম সরকারের মাধ্যমেই তৃণমূলে সুবিধাবাদী, নীতিহীন, আদর্শহীন, টাউট ও বাটপার জাতীয় লোকদের নিয়ে বিএনপি’র সমর্থক গোষ্ঠী তৈরী করে ছিলেন; পরবর্তী কালে এঁরাই গ্রামে বিএনপি’র শক্ত খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়; তৃণমূলের মত জাতীয় পর্যায়েও অনুরূপ চরিত্রের লোকজন নিয়েই জিয়াউর রহমান বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তৈরী করেছিলেন; তখন একটি কথা বেশ চালু ছিল তা হল, ‘দিনে বায়তুল মোকাররম, রাতে বঙ্গভবন’; পল্টন ময়দানে সভা সমাবেশ করা বন্ধ রেখে ক্ষুদ্রাকায় বায়তুল মোকাররমে সভা সমাবেশ করতে বাধ্য করা হয়। মূলত, ওই সময় থেকেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতাকর্মি বেচাকেনা শুরু হয়, সেজন্য ওই কথা মনুষ্য মুখে মুখে এমনিতেই দেশময় চালু হয়ে যায়। অবৈধ শাসক জিয়ার এসব অপকর্ম স্বার্থগত, জন্মগত কারণেই বিএনপিকে ভুলে থাকতে হয়, চাপিয়ে যেতে হয়। কিন্তু অন্যসব রাজনৈতিক দল ও গোটা জাতি কেন তা ভুলতে বসেছে? তা কি ভুলে যাওয়া উচিত? এই প্রশ্ন থাকল সকল মানুষের প্রতি। একই ধারায় পরবর্তীতে বিএনপি ক্ষমতায় এসে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বাধীন স্থানীয় সরকার বিষয়ক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রি ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের নেতৃত্বে একবার ‘গ্রাম সভা’ গঠন করার অপচেষ্টা চালায় এবং আরেকবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূঁঞার নেতৃত্বে প্যাডসর্বস্ব ‘গ্রাম সরকার’ গঠন করতে গিয়ে দেশের প্রচুর অর্থ, শ্রম ও সময় নষ্ট করা হয়, এবং এই প্যাডসর্বস্ব গ্রাম সরকারের জন্য রাষ্ট্রীয় শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে করাপশনকে গ্রামীণ তৃণমূলে বিস্তৃত করা হয়। উভয় বার ক্ষমতায় থাকা কালে বিএনপির যেসব নেতা স্থানীয় সরকার বিষয়ক দায়িত্বে পরামর্শে ছিলেন, তাদের দ্বারা স্থানীয় সরকারের কেবল ক্ষতিই সাধিত হয়েছে; তারাসহ এই দলের গোটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার স্থাপন ও তার উন্নয়নমুখী কোনো চিন্তাভাবনা করেছে কিংবা করতে চেয়েছে এমনতরো নজির একদম খুঁজে পাওয়া যায়না, যদিও ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ বিএনপির নীতিনির্ধারকগণের কাছেও বার বার তুলে ধরা হয়েছিল; তা তারা সবাই এক কান দিয়ে শুনেছে, আরেক কান দিয়ে তা বের করে দিয়েছে; তারা দেশ, দল ও সমাজের সার্বিক গণতন্ত্রায়ণ ও গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত হিসেবে স্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আমলে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা কখনও উপলব্ধি করেনি, করতে চায়নি, আর এখনও এই দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এসব বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে বলে, করতে চায় বলে একদম প্রতীয়মান হয়না; আর এই দলের জন্মগত কলংকিত চরিত্র একটুও পরিবর্তনমুখী হয়েছে বা হতে চেয়েছে বলে কোনও নজির কি দলে কিংবা রাষ্ট্রে রয়েছে? তারপরও কি বিএনপি’র স্থানীয় সরকার, গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক অবস্থান, আকাংখা বুঝতে আর কিছু বাকি থাকে? সেসঙ্গে অবৈধ শাসক জিয়ার ওই অপকর্মের প্রভাব কিভাবে অন্যসব রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রভাবিত করেছে তাও গভীরভাবে জানার, বুঝার প্রয়োজন রয়েছে। এই প্রসঙ্গে ধরা যাক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর কথা; এই দল ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে গ্রামীণ তৃণমূলে দলীয় ভিত্তি আরও মজবুত করার এক অলীক স্বপ্নে তাড়িত হয়ে এ্যাডভোকেট রহমত আলীর নেতৃত্বাধীন স্থানীয় সরকার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান (পরে তিনি মাননীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন) এর নেতৃত্বে জাতীয় সংসদে তেমন কোনো আলাপ আলোচনা ছাড়াই অত্যন্ত তাড়াহুড়ার সহিত স্বল্প সময়ে ইউনিয়নের মধ্যে প্রতি ওয়ার্ড কেন্দ্রিক ‘গ্রাম পরিষদ’ গঠন করার বিল পাস করা হয় ও তা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক স্বাক্ষরিত হয়ে আইনে পরিণত হয়, এবং তাঁরই নেতৃত্বে তা বাস্তবায়নের জন্য অপচেষ্টা চলে; বিন্তু সেই অপচেষ্টা কেবল জনাব আবু তালেব এর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবল বাধার মুখে বন্ধ হয়ে যায়; প্রসঙ্গক্রমেই বলা প্রয়োজন যে, এ্যাডভোকেট রহমত আলী কমিশনের ওয়ার্ড ভিত্তিক তথাকথিত ‘গ্রাম পরিষদ’ গঠনের সুপারিশটি ও অন্যসব সুপারিশগুলো একদম অপরিপক্ক, ভঙ্গুর, খন্ডিত আর গোজামিলে ভরপুর; এক কথায় বলা যায় যে, রহমত আলী কমিশনের গোটা প্রতিবেদনটি সার্বিক বিবেচনায় বাস্তবায়নের অযোগ্য একটি প্রতিবেদন। তা সত্ত্বেও, বাস্তব অবস্থা দেখে মনে হয়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকগণ এ্যাডভোকেট রহমত আলী কমিশনের ওই গারবেজ তুল্য প্রতিবেদনটি নিয়ে এখনও সন্তুষ্ট কিংবা দ্বিধাগ্রস্ত রয়েছেন; পাশাপাশি আওয়ামী লীগের প্রায় সকল কেন্দ্রীয় নেতাগণ ও রহমত আলী কমিশনের সকল সদস্যগণ ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ সম্পর্কে বার বার অবগত হয়েছেন, এবং এর সবিস্তার ব্যাখ্যা শুনেছেন, জেনেছেন; তার পরও এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে, উপলব্ধিতে নিতে, বাস্তবায়নে যেতে এতবেশী সময় লাগার কারণ একদমই বোধগম্য নয়। সে যাই হোক, এখন তো বিএনপিকে ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার,’ ‘গ্রামসভা’ ও ‘গ্রাম সরকার’ নিয়ে কথা বলতে দেখা যায় না, শোনা যায় না। জাতীয় পার্টিকে ‘পল্ল¬ী পরিষদ’ নিয়ে কথা বলতে শোনা যায় না, দেখা যায় না; অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, অবৈধ শাসক এরশাদকে “পল্লী” শব্দ কেন্দ্রীক, “পল্লী পরিষদ” কেন্দ্রীক ও “পল্লীনিবাস” কেন্দ্রীক ‘পল্লীবন্ধু’ বানানোর খায়েশও এই দলের ফুরিয়ে গেছে বলে মনে হয়! আর আওয়ামী লীগকে ইউনিয়নে ওয়ার্ড ভিত্তিক তথাকথিত ‘গ্রাম পরিষদ’ নিয়ে কোনও বক্তব্য দিতে, টুঁ শব্দ করতে দেখা যায় না, শোনা যায় না। তবে প্রতি গ্রামে কিংবা ইউনিয়নের প্রতি ওয়ার্ডে ওইসব তথাকথিত ইউনিট গঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে যেসব ব্যক্তি নানাবিধ ফায়দা লুঠেছে, অপ্রয়োজনীয় বই-টই লিখে প্রচুর টাকাপয়সা কামিয়েছে, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ পরিচিতি মিডিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছে, দাতা গোষ্ঠীর টাকায় সভা-সেমিনার করেছে, নতুন নতুন এনজিও যেমন ‘স্থানীয় সরকার সহায়ক কমিটি’ গঠন করেছে, তারা এখনো মাঝেমধ্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠনের পক্ষে আড়ালে-আবড়ালে, চুপিসারে সাফাই গাইতে দেখা যায়। এসব অপকর্মকান্ডের বিরুদ্ধে, ইউনিয়নের মধ্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠনের বিরুদ্ধে সিডিএলজি’র লাগাতার ক্যাম্পেইন ও তীব্র প্রতিবাদ এর কারণে এক দিকে ওইসব ব্যক্তির জোরগলা বেশ ক্ষীণ ও দুর্বল হয়েছে; অপর দিকে ওইসব রাজনৈতিক দল বুঝতে পেরেছে যে, ইউনিয়নের মধ্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় ইউনিট গঠন করার নামে আবার লাফালাফি, মাতামাতি করলে হালে আর পানি পাওয়া যাবে না; তাই তারাও চুপসে গেছে বা চুপসে যেতে বাধ্য হয়েছে বলে বোঝা যায়। শেষ তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গঠিত একটি স্থানীয় সরকার বিষয়ক কমিটিও ইউনিয়নের মধ্যে প্রতি ওয়ার্ডে ‘ওয়ার্ড সভা’ ও নগরীয় ওয়ার্ডে ‘ওয়ার্ড কমিটি’ গঠনের সুপারিশ করে; এই কমিটির জন্য অন্যসব খরচ ছাড়া শুধু ওই তথাকথিত সুপারিশ প্রকাশের জন্য ঢাকায় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত এক সভার জন্য ব্যয় করা হয়েছে প্রায় সোয়াশ কোটি টাকা, এর মাধ্যমে জাতীয় অর্থের অপচয় কারে কয়, তা ওই কমিটি ও স্থানীয় সরকার বিভাগ ভালভাবে দেখিয়েছে! ওই কমিটির প্রধান ড. শওকত আলী পুরস্কার স্বরূপ শেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাও হয়েছেন; তথাকথিত ওয়ার্ড সভা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠনের সুপারিশসহ ওই কমিটির অন্য সুপারিশগুলিও বড্ড সেকেলে, খন্ডিত ও বাস্তবায়নের একদম অযোগ্য; প্রথম দিকে মিডিয়াসহ অনেকেই না জেনে, না বুঝে ওই কমিটির প্রতিবেদনটির প্রতি সমর্থন জানায়, আবার জেনেবুঝেই কেবল স্বার্থগত কারণে তার পক্ষে শেষ তত্বাবধায়ক সরকারের গর্ভে সৃষ্ট ‘গভার্নেন্স কোয়ালিশন’ নামের একটি এনজিও গ্রুপ দাতা সংস্থার টাকায়, শেষ তত্বাবধায়ক সরকারের সেবাদাস হিসেবে সভা-সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে বেশ হইচই করে থাকে, ‘হাঙ্গার প্রজেক্ট’ নামের আরেকটি এনজিও’র বাংলাদেশস্থ কর্ণদার (ড. বদিউল আলম মজুমদার) এর বিশেষ ব্যক্তিগত স্বার্থে ওই এনজিওটিও অনুরূপ কাজে লিপ্ত থাকে, আর এই হাঙ্গার প্রজেক্ট এরই পকেট সংগঠন ‘সুজন’ও ওই প্রতিবেদন নিয়ে মাঠ গরম করার অপচেষ্টা চালায়, ‘ডেমক্রেসিওয়ার্চ’ নামের আরেকটি সুবিধাভোগী এনজিও ওই প্রতিবেদনের পক্ষে প্রচার প্রচারণায় সচেষ্ট থাকে, এবং এই এনজিও ইউনিয়ন পরিষদের তথাকথিত ‘স্থায়ী কমিটি শক্তিশালীকরণ’র নামে দাতা সংস্থার লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতে লোক দেখানো সভা সেমিনারও আয়োজন করত; অথচ ওই এনজিও বিধানিক পরিষদীয় বা সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কি, তা-ই বুঝত না, বুঝে না; মিসেস তালেয়া রেহমান কর্তৃক পরিচালত এই এনজিওটি গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার চায়, বুঝে তার কোনও লক্ষণ এর কর্মকা-ে কখনও প্রতিফলিত হয়নি, হয়না। ওই অসার প্রতিবেদনটির পক্ষে বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রও নিজস্ব স্বার্থগত কারণে প্রবল প্রচার প্রচারণায় যুক্ত হয়ে পড়ে; ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ নামক একটি এনজিও অনুরূপ কর্মকা-ে লিপ্ত থাকে, যদিও এই এনজিওতেও স্থানীয় সরকার বুঝে, জানে এমন কোনো কর্মকর্তা দেখা যায়নি; তখন এই এজিও’র এক বিশেষ সুবিধাভোগী কর্মকর্তা স্থানীয় সরকার বিষয়ক গার্বেজ তুল্য একাধিক নিবন্ধ ডেইলি স্টার নামক একটি ইংরেজী পত্রিকায় প্রকাশ করায় এবং ইউরোপের একটি দেশ থেকে একটি স্কলারশিপ বাগিয়ে নেয়। অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ‘সিপিডি’ও ওই অসার প্রতিবেদনের পক্ষে জোর অবস্থান নেয়, যদিও এই প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার, গণতন্ত্রায়ন বুঝে, জানে এমন কোনও গবেষক, কর্মকর্তা আছে বলে আমাদের অন্তত জানা নেই; কিন্তু সিডিএলজির বুদ্ধিবৃত্তিক তীব্র আন্দোলনের ফলে ওই প্রতিবেদনের সুপারিশগুলির অসারতা, দুর্বলতা খোলাসা হতে থাকায় তার প্রতি অনেকের সমর্থন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে, এবং ওই কমিটির সদস্যদের উচ্চকণ্ঠ আস্তে আস্তে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতম হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়; ওই কমিটির সুপারিশগুলি (মূলত একেও নকলবাজদের নকল বলাই শ্রেয়) এবং ওইগুলির ভিত্তিতে প্রণীত আইনকানুন বিধিবিধান যত দ্রুত সম্ভব বাতিল হয়ে যাওয়া উচিত। এই শেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদ্যোগেই তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি স্থানীয় সরকার কমিশনও গঠিত হয়; এ কমিটির সদস্যরা কেবল বেতন, ভাতা, অফিস, গাড়ী, বাড়ি, পদমর্যাদা ও নানা রকমের সুযোগসুবিধা নিয়েই ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে; এঁদের একজনেরও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার, বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও এর অভ্যন্তরীণ স্ট্যাটাসগত ও গুণগত পরিবর্তন সম্পর্কে তত্ত্বগত ও বাস্তব ধারণা ছিলোনা; এঁদেরই একজন (ড. তোফায়েল আহমেদ) এখনও বিলুপ্ত কমিশনের পদবী ব্যবহার করে মিডিয়াসহ অন্যসব জায়গায় নানা রকমের সুযোগসুবিধা নিয়ে থাকেন, এবং তিনি তার অসার গার্বেজ তুল্য বক্তব্য কথায় লেখায় সবসময় তুলে ধরেন। তাজ্জব ব্যাপার হল, এই তিনি, যিনি আর্থ-সামাজিক স্তরীয় অবস্থা বুঝে স্থানীয় সরকারের প্রকার ঠিকভাবে করতে পারেন না, সর্বনি¤œ ইউনিট কতটি তা বুঝতে পারেন না, সর্বোচ্চ ইউনিট বিভাগ না জেলা তা ঠিক করার ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ করার প্রয়োজনীয়তা বুঝেন না, নির্বাহিক ও বিধানিক পরিষদের পার্থক্য বুঝেন না, সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ ও তার গুরুত্ব বুঝেন না, সার্থক নামকরণ ও যথার্থ সংজ্ঞায়িতকরণের গুরুত্ব অনুধাবন করেন না, ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন না, নারীর গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়নে ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি তথা এমপোতে বিশ্বাস করেন না, গ্রামীণ তথা কৃষিপ্রধান থেকে গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশের রূপান্তরিত উপস্থিতি এখনও টের-ই পাননা, বিদ্যমান গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ থেকে একটি পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এ উন্নীত হবার চলমান প্রক্রিয়া উপলব্ধিতে নিতে চাননা, স্থানীয় সরকারের শেষ গন্তব্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা জানেন না, বোঝেন না, ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ মিডিয়া কর্মিরা তাঁকে (এবং ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ড. আকবর আলি খান, ড. শওকত আলী সহ আরও কয়েক জনকে) স্থানীয় সরকার “বিশেষজ্ঞ” হিসেবে প্রচার প্রকাশ করেই চলেছে; প্রশ্ন হল, এসব ব্যক্তিসহ আরও কিছু ব্যক্তি (কারা তা বুঝে নিলে খুশী হব) ও কিছু এনজিও সম্পর্কে মিডিয়া কর্মিরা কবে সচেতন হবে? কবে শেষ হবে স্থানীয় সরকার নিয়ে সব ধরনের অপতৎপরতা, অপপ্রচার? আর কবে শেষ হবে অসার, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রচার প্রকাশের লাগাতার মহড়া?
প্রকৃতপক্ষে, স্থানীয় সরকার বিষয়ক যত রকমের মিথ আর অপতৎপরতা রয়েছে, তার বিরুদ্ধে সর্বাত্বক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে সূচিত হয় ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী থেকে। ওই দিন ঢাকায় জাতীয় জাদুঘরে এক জাতীয় সেমিনারে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ উপস্থাপিত করেন স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক গবেষক আবু তালেব, এবং সেই ১৩ জানুয়ারী ১৯৯৭ সাল থেকেই তাঁর উদ্যোগে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ও ২০২০ সালের মধ্যে একটি উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তথা “গণস্বপ্ন ২০২০” প্রতিষ্ঠার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন সূচিত হয়, প্রকৃত অর্থে স্বপ্ন (ভিশন) ভিত্তিক আন্দোলন সংগ্রাম সূচিত হয়; আর এই আন্দোলনই স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত যত রকমের মিথ, মিথ্যা নোশান, আনফাউন্ডেড নোশান, অপচেষ্টা, অপতৎপরতা রয়েছে তা আস্তে আস্তে দূরীভূত করে আসছে; শুরুতে অনেকেই এই আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য বুঝতে পারেননি; ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিটি গ্রাম কিংবা ওয়ার্ড ভিত্তিক স্থানীয় সরকারের ইউনিট স্থাপনের কোনো প্রয়োজন নেই, জনাব আবু তালেবের এই দৃঢ় বক্তব্যের, অবস্থানের সারবত্তাও অনেকে একেবারেই বুঝতে পারেননি, এবং অনেকেই তাঁর এই দৃঢ় বক্তব্যকে, অবস্থানকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি বলে তাঁকে অনেকেই ভুল বুঝেছেন, ক্ষুরধার সমালোচনা করেছেন। অনুরূপ কঠোর সমালোচনায় পড়তে হয়েছিল “গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা” নামকরণে “গণতান্ত্রিক” শব্দটি লাগানোর জন্যও। তাতে কিন্তু তিনি একটুও দমে যাননি; তিনি তাঁর সুদৃঢ় বক্তব্য নিরলসভাবে গোটা জাতিকে সাধ্যমত লাগাতার জানিয়ে বুঝিয়ে চলেছেন। এটা তো ঠিক যে, সমষ্টিগত কিংবা জাতিগত ভুল ভাঙ্গানো সহজ কাজ নয় এবং এও ঠিক যে, যে কোনো সত্য বিষয় সহজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়না, যায়নি। এসব বিষয় মাথায় রেখেই সিডিএলজি লাগাতার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার স্থাপন, কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক না হওয়া পর্যšত সিডিএলজি’র এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন, সংগ্রাম অবশ্যই চলতে থাকবে। ফলে, আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, স্বনির্ভর গ্রাম সরকার, পল্ল¬ী পরিষদ, গ্রাম সভা, গ্রাম পরিষদ, গ্রাম সরকার ও ওয়ার্ড সভার মত উপজেলাও একটা মিথ ও অপ্রয়োজনীয় ইউনিট হিসেবে একদিন না একদিন অবশ্যই প্রমাণিত হবে; এবং তথাকথিত ‘গ্রাম সরকার’র মত উপজেলার প্রতিও দেশবাসী ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের প্রবল মোহ ভঙ্গ হবে; আর সেজন্য, ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী থেকে পরিচালিত দেশের সার্বিক গণতন্ত্রায়নের ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার বিরতিহীন বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও তার অপরিসীম গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে, এই ১৩ জানুয়ারীকেই “স্থানীয় সরকার দিবস” হিসেবে ঘোষণা ও পালন করার জন্য সিডিএলজি, এমপো বাস্তবায়ন ফোরাম ও বাপসনিউজ জোর দাবী জানিয়ে আসছে। আমরা আশা করি সরকার তা বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে তার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
প্রাসঙ্গিকভাবে দুইটি বিষয় পাঠক-পাঠিকা সমাজের অবগতির জন্য স্পষ্ট করা দরকার বলে মনে হয়; তার একটি হল, “সিটি কর্পোরেশন” শব্দবন্ধটি নিয়ে; অনেকে ভুলবশত “সিটি” শব্দটির বাংলা “মহানগর” বলে থাকেন, লিখে থাকেন যেমন ঢাকা মহানগর, চট্রগ্রাম মহানগর, রাজশাহী মহানগর ইত্যাদি; গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দলগুলো, আইনপ্রণেতাগণ ও নীতিপ্রণেতাগণও তাই বলে-কয়ে চলেছেন। মূলত “নগর” শব্দটির ইংরেজী অনুবাদ হবে “সিটি” কিংবা “সিটি” শব্দটির  বাংলা অনুবাদ হবে “নগর”; “মহানগর” হল কীভাবে? তা তো মাথায় আসেনা। এবং সবাই জানে যে, “কর্পোরেশন” শব্দটি সাধারণত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ব্যবহার হয়ে থাকে, এবং এই “কর্পোরেশন” শব্দটি বললে বা শুনলে মানুষের মানসপটে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কথাই ভেসে ওঠে, এবং মুনাফা, লাভালাভ কেন্দ্রিক কর্মকান্ডের কথা চলে আসে; প্রশ্ন হল, স্থানীয় সরকার কি মুনাফামুখী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান? তা তো নয়; তাইলে “কর্পোরেশন” শব্দটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নাম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে কেন? এ কি “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি” তুল্য নাম? এই দুইটি বিষয় বিবেচনায় এনে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় জনাব আবু তালেব কেবল “নগর” আর “নগর সরকার” শব্দবন্ধদ্বয় ব্যবহার করেছেন। তাই তো আমরা সবসময় বলে আসছি যে, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা অনুযায়ী কল্যাণমূলক, সেবামূলক ও উন্নয়নমূলক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে ভুল নামকরণ “মহানগর” নামটি থেকে আর মুনাফার গন্ধ যুক্ত নামকরণ “কর্পোরেশন” নামটি থেকে অবিলম্বে মুক্ত করতে হবে; আমরা আশা করি এই ধরনের বড় ভুল আর গোজামিল থেকে সরকারসহ সবাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দায় স্বীকার করেই বের হয়ে আসবেন। অপরটি হল, সরকারসহ অনেকেই ভুল ধারণা বশত শুধু সিটি কর্পোরেশনগুলোকে আরবান ইউনিট মনে করে থাকে; এই ভুল ধারণাটি ভাঙ্গতে ও প্রকৃত বিষয় তুলে ধরতে এই প্রতিবেদনে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ অনুযায়ী নগর, নগরীয় ইউনিট ও নগরীয় এলাকা বলতে সিটি কর্পোরেশনগুলোর পাশাপাশি দেশের সকল পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকেও বুঝানো হয়েছে। প্র্রকৃত অর্থে, নগর ও নগরায়ন বোঝেনা, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বোঝেনা এমন সব ব্যক্তি ও সরকারী কর্মকর্তাগণ (বিশেষত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, একনেক, নিকার, মন্ত্রিপরিষদ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, সংসদ, বিচার ও রাষ্ট্রপতির সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনের সচিবালয়ের কর্মকর্তাগণ) এর কারণে নগরীয় এলাকায় অবস্থিত স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিটগুলোকে বিভিন্ন নীতি, আইন ও বিধিতে বিভিন্ন নাম দিয়ে একটা বিভ্রান্তিকর অবস্থায় রাখা হয়েছে; একই আইনে গ্রামীণ এলাকার স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিট “ইউনিয়ন” নামকরণের মত একই আইনে নগরীয় এলাকার স্থানীয় ইউনিটগুলিও শুধু “নগর” নামে পরিচিত হতে পারতো, হতে পারে, এবং ইউনিয়ন ও নগরে যথাক্রমে ইউনিয়ন সরকার ও নগর সরকার গঠিত হতে পারত, হতে পারে। ইউনিয়নগুলির মধ্যে আয়তন, জন সংখ্যা, রাজস্ব আয়-ব্যয় ও গুরুত্বে যেমন পার্থক্য রয়েছে, ঠিক তেমনি নগরগুলোর মধ্যেও আয়তন, জনসংখ্যা, রাজস্ব আয়-ব্যয় ও গুরুত্বে পার্থক্য রয়েছে; যদি গ্রামীণ এলাকায় “ইউনিয়ন” নামকরণে অসুবিধা না থাকে, নগরীয় এলাকায় এক ধরনের নাম “নগর” হতে অসুবিধা কোথায়? সেই বিষয়টি একেবারেই বোধগম্য নয়। আবার, ইউনিয়নের জন্য ‘ইউনিয়ন সরকার’ গঠন করার বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে ইউনিয়নের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ‘ওয়ার্ড সভা’ গঠনের আইন রয়েছে, এবং নগরগুলির জন্য ‘নগর সরকার’ গঠন করার বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে প্রতিটি নগরীয় ওয়ার্ডে অপ্রয়োজনীয় ‘ওয়ার্ড কমিটি’ গঠন করার আইনও রয়েছে; এও এক ধরনের পাগলামি ছাড়া অন্য কিছু নয়। সে যাই হোক, বাংলাদেশ এখন আর শুধু গ্রামীণ দেশ নয়, কেবল কৃষিজ সমাজ নয়; বিদ্যমান বাস্তবতায় এখনকার বাংলাদেশ হচ্ছে গ্রামীণ-নগরীয় দেশ, গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ, অর্থাৎ একটি মিশ্র সমাজ; গ্রামীণ বাংলাদেশ আর গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এক বিষয় নয়; এই দু’টোর সম্ভাবনা, সমস্যা, উন্নয়ন পরিকল্পনা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক ধরনের নয়; কৃষিজ সমাজ আর গ্রামীণ-নগরীয় সমাজের ধ্যান-ধারণা ও জীবনাচরণ এক নয়; তাই এই দু’টোর প্রশাসনিক কাঠামো ও তার কার্যাবলীও এক ধরনের হওয়া উচিত নয়; দুঃখজনক বিষয় হল, অন্যান্য পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনার মত ৭ম পঞ্চ বার্ষিক (২০১৬-২০২০) পরিকল্পনার চূড়ান্ত খসড়ায়ও তার ইঙ্গিত, স্বীকৃতি ও প্রস্তুতিমূলক বিষয় একদম নেই বললে চলে। রাজনৈতিক দলসহ মিডিয়াও এই বিষয়টি বুঝতে পারছেনা বলে প্রতীয়মান হয়। জনাব আবু তালেব বাংলাদেশের স্টাটাসগত ও গুণগত এই বিরাট পরিবর্তনের কথা সর্বপ্রথম ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী ঢাকায় আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে তুলে ধরেন; সেই থেকে অনেক সময় পার হয়েছে; নতুন কোনও কিছু বুঝে ওঠতে সময় লাগতেই পারে; কিন্তু এত বেশী সময় লাগাটা একদম মেনে নেয়া যায়না। এই বিষয়টি যত দ্রুত সম্ভব মিডিয়া, নীতিপ্রণেতাগণ, আইনপ্রণেতাগণ ও গোটা সমাজকে বুঝতে হবে, এবং সরকার কর্তৃক বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রামীণ-নগরীয় দেশ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে; গ্রামীণ সমাজ তথা কৃষিজ সমাজ থেকে গ্রামীণ-নগরীয় সমাজের ধ্যান-ধারণায় ও জীবনাচরণে অভিযোজন প্রক্রিয়া সচেতনভাবে সম্পন্ন করতে হবে, তার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রণীত, গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে হবে, এবং তারই ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো, ক্ষমতা ও কার্যাবলী ঠিকঠাক করতে হবে। এই তো গেল একটা দিক; অন্য দিক হল দ্রুত নগরায়নের ফলে বিদ্যমান গ্রামীণ-নগরীয় দেশ থেকে বাংলাদেশ একটি পরিপূর্ণ নগরীয় দেশ হবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে; একটি গ্রামীণ দেশ, কৃষজ সমাজ থেকে একটি পরিপূর্ণ নগরীয় দেশ, নগরীয় সমাজ হবার পথে গ্রামীণ-নগরীয় দেশ, গ্রামীণ-নগরীয় সমাজ হচ্ছে একটা মধ্যবর্তী পর্যায়; তবে এর স্থায়িত্ব কালও কম সময় নয়; তা মাথায় রেখেই পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এর সমস্যা ও তার সম্ভাব্য সমাধানসূত্র বাস্তবায়নের জন্য সামগ্রিকভাবে মানসিক ও শিক্ষাগত প্রস্তুতিও এখন থেকে নিতে হবে। এক হিসাব অনুযায়ী দ্রুত নগরায়নের ফলে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ৫০% এলাকা হয়ে যাবে নগরীয় এলাকা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১০০% এলাকা হয়ে যাবে নগরীয় এলাকা; অন্যভাবে বলা যায়, গ্রামীণ ইউনিটগুলি যেমন ইউনিয়নগুলি বিলুপ্ত হয়ে যাবে; তাতে কি হবে? তাতে গোটাদেশ নগরীয় ইউনিটে বিভক্ত হয়ে পড়বে। ফলে আজকের যে গ্রাম কিংবা আগের যে সনাতন গ্রাম তা মূলত জাদুঘরে ও বই-পুস্তকে ঠাঁই পাবে; বাস্তবে সেই গ্রামের চিহ্ন কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা। এই বিষয়টি আরেকভাবে অনুধাবন করা যেতে পারে, বর্তমানে প্রায় ৩৫% জনগোষ্ঠী নগরীয় এলাকায় বসবাস করে, ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০% জনগোষ্ঠী নগরীয় এলাকায় বসবাস করবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১০০% জনগোষ্ঠী নগরবাসী হয়ে যাবে। চলমান এই নগরায়ন প্রক্রিয়ায় একদিকে গ্রামীণ কৃষি পেশাতে কর্মসংস্থান বিপুলভাবে কমছে, কমতে থাকবে, এবং অন্যদিকে অন্যসব নতুন নতুন অকৃষি পেশাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, হতে থাকবে। তার আলামত প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে, বুঝা যাচ্ছে। সুতরাং, দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায় যে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ মানে পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ; তাই গ্রামীণ বাংলাদেশ থেকে বিদ্যমান গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশও চিরকাল গ্রামীণ-নগরীয় দেশ থাকবেনা; এটি একটি মধ্যবর্তী পর্যায়; এই মধ্যবর্তী পর্যায় থেকে দ্রুত নগরায়নের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ, নগরীয় সমাজ, নগরীয় সভ্যতা; বাংলাদেশ খুব দ্রুত তালে সেদিকেই এগিয়ে চলেছে। এই বিষয়টি বিশ্বাসে রেখে, তারই ভিত্তিতে একটি পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগরীয় বাংলাদেশ, নগরীয় প্রশাসনিক ইউনিট ও তার জন্য গতিশীল ‘নগর সরকারের রূপরেখা’ ও তা স্থাপন সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট সুস্পষ্ট প্রস্তাব সর্বপ্রথম ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারীতে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’য় উপস্থাপিত করা হয়েছে; এটি একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বিধায় তখন অনেকেই তা বুঝে উঠতে পারেনি, দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও এখনও অনেকে তা বুঝে উঠতে পারছেনা বলে প্রতীয়মান হয়; বিশেষত দুঃখজনক বিষয় হল, ১৯৯৭ সাল থেকে সিডিএলজি’র এই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যাম্পেইন চলমান ও দৃশ্যমান থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, কৃষি মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ, একনেক, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রীপরিষদ ও জাতীয় সংসদ তা পুরোপুরি বুঝতে অপারগ কিংবা বুঝতে চায়না বলে প্রতীয়মান হয়; এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাগণের সেকেলে চিন্তাভাবনা ও কর্মকা- জাতিকে অনেক অনেক পেছনে ফেলে রেখেছে; বাংলদেশকে পিছনে ফেলে রাখার সেই অদূরদর্শি ধারা পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক প্রণীত ৭ম পঞ্চ বার্ষিক (২০১৬-২০২০) পরিকল্পনার চূড়ান্ত খসড়ায়ও রয়েছে; আর যারা নগরীয় ইউনিটে মেয়র ও কাউন্সিলর হয়েছে কিংবা হতে চায় তারাও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগর, নগরায়ন, নগরবাদ, নগরীয় কৃষি, নগরীয় সভ্যতা, নগরীয় কালচার, নগরীয় জীবনধারা ও নগর সরকারের রূপরেখা নিয়ে তেমন একটা চিন্তাভাবনা করে বলে প্রতীয়মান হয়না; ২০২০ ও ২০৫০ সালদ্বয়কে সামনে রেখে প্রতিটি নগর ভিত্তিক উন্নয়ন ও সেবামূলক সার্ভিস পরিচালিত করার লক্ষ্যে নগরীয় প্রশাসনিক ইউনিটগুলো সাজানো ও তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা ও কর্মসূচী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই, তা স্পষ্টভাবে বুঝা যায়; এ এক মহা হতাশাজনক চিত্র; এর অবসান হওয়া খুবই জরুরি বৈকি। সেক্ষেত্রে আশার আলো হল, এটি নিয়ে সিডিএলজি, বাপসনিউজ, এমপো বাস্তবায়ন ফোরামসহ আরও অনেকে লাগাতার ক্যাম্পেইন চালিয়ে আসছে; ফলে একদিন না একদিন এই হতাশাজনক চিত্র একটি আলোকিত চিত্রে পরিণত হবে, হতে বাধ্য।

সে যাই হোক, সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের প্রয়োজন হচ্ছে একটি দুই স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার পদ্ধতি; আর কেন্দ্রীয় সরকারসহ বাংলাদেশের প্রয়োজন হচ্ছে একটি তিন স্তরবিশিষ্ট সরকার পদ্ধতি। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে একটি দুই স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার কাঠামো স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করার দিকে যেতে হবে; দুইয়ের চেয়ে বেশী স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার কাঠামো থাকলে তাতে মধ্যবর্তী ইউনিট থাকবে, এখন যেমন উপজেলা রয়েছে; এই অপ্রয়োজনীয়, দায়দায়িত্বহীন, স্বশাসনহীন মধ্যবর্তী ইউনিটের অস্তিত্ব বজায় রাখাটা হচ্ছে, হবে কেবলই অপচয়মূলক ও উদ্দেশ্যমূলক; এই মধ্যবর্তী ইউনিট নিয়ে ইতোমধ্যে অনেক সময় ও অর্থ নষ্ট করা হয়েছে; আশাকরি, আর কাল বিলম্ব না ঘটিয়ে এই বিষয়টি নীতিপ্রণেতা ও আইনপ্রণেতাগণ যত দ্রুত সম্ভব বুঝার চেষ্টা করবেন এবং তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। ভুল ধারণা বশত বাংলাদেশকে এখনও একটি গ্রামীণ দেশ (রুরাল কান্ট্রি) মনে করা হয়; কিন্তু বাংলাদেশ এখন আর শুধু গ্রামীণ দেশ নেই; এই ভুল ধারণার পরিবর্তে বিদ্যমান বাস্তবতায় বাংলাদেশকে একটি গ্রামীণ-নগরীয় (রুরাল-আরবান) দেশ হিসেবে ধরে নিয়ে এবং ২০২০ ও ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ ও বিশ্বময় পরিবর্তনশীল বিষয়গুলি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৯৬ সালে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ণ বিষয়ক গবেষক আবু তালেব স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ ও স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ প্রণয়ন করেন, এবং তিনি তা ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী ঢাকায় জতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক জাতীয় সেমিনারের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের বিবেচনার্থে উপস্থাপিত করেন; এটি গ্রামীণ বাংলাদেশ এর পরিবর্তে গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য গণতান্ত্রিক স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রথম উদ্যোগ, প্রথম প্রচেষ্টা; দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সেবামূলক কর্মকা- ধাপে ধাপে (কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত) ধারাবাহিকতায় স্থিতিশীল গতিশীল প্রক্রিয়ায় পরিচালিত করার জন্য স্থানীয় সরকারের একটি স্তরবিন্যাসকরণ দেশের সূচনা লগ্ন থেকে ঠিক করার প্রয়োজন থাকলেও আজ অবধি এই কাজটি সচেতনভাবে সঠিকভাবে করার কোনো উদ্যোগ গৃহীত হয়নি, হচ্ছেনা; তা অবশ্যই খুবই দুঃখজনক ঘটনা; সে যাই হোক, তিনি উক্ত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয়ে মধ্যবর্তী ইউনিটগুলি, যেমন উপজেলা, ও অন্যান্য গ্রামীণ ইউনিটগুলি, যেমন ইউনিয়ন, কীভাবে আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাবে তা রেখাচিত্রের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন; এবং, ওই প্রস্তাবিত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয়ে গোটা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কীভাবে একটি দুই স্তরবিশিষ্ট কাঠামো হয়ে ওঠবে তাও গ্রাফে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন; তাতে তিনি সরকারের আকার আয়তন আস্তে আস্তে ছোট করার ব্যবস্থা করেছেন, ফলে কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সিস্টেম কস্ট কমে গিয়ে উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। উভয় কাঠামোতে ২০৫০ সালে কিংবা তার আগেই একটি পরিপূর্ণ ‘নগরীয় (আরবান) বাংলাদেশ’ গঠনের স্বপ্ন ও তার বাস্তবরূপ তুলে ধরা হয়েছে। বিদ্যমান ‘গ্রামীণ-নগরীয় (রুরাল-আরবান) বাংলাদেশ’ কি প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আস্তে আস্তে পরিপূর্ণ ‘নগরীয় (আরবান) বাংলাদেশ’ হয়ে ওঠবে এবং পরিপূর্ণ ‘নগরীয় বাংলাদেশ’ এ কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে স্থানীয় সরকার তথা শুধু নগরীয় স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ কি রূপ নিবে, নিতে পারে, তা ওই কাঠামোগত রেখাচিত্রে সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ও বোধগম্য করা হয়েছে; এ এক মহা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কাজ; এ এক মহা বিস্ময়কর ব্যাপার, বিষয়। যে কেউ এই কাজের গভীরতা ও তাৎপর্য বুঝতে পারলে শ্রদ্ধায় ভালবাসায় নত হয়ে যাবারই কথা; আমাদের প্রবল বিশ্বাস হচ্ছে, জনাব আবু তালেব ২০৫০ সালের মধ্যে “নগরীয় বাংলাদেশ” এর স্বপ্নদ্রষ্টা ও ক্যাম্পেইনার হিসেবে, আগে পরিবেশ এই বিষয়টি মাথায় রেখে “পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগর ও নগরায়ন” শব্দবন্ধের ইনকুবেটার ও ক্যম্পেইনার হিসেবে, ২০২০ সালের মধ্যে একটি ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ নির্মাণের স্বপ্নদ্রষ্টা ও তার বাস্তবায়নমূলক পরিকল্পনার প্রণেতা ও ক্যাম্পেইনার হিসেবে, দেশের সকল ক্ষেত্রে সকল উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০২০ ও ২০৫০ সাল কেন্দ্রিক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া মান্য করানোর প্রবক্তা ও ক্যাম্পেইনার হিসেবে, নারীর ৫০% প্রতিনিধিত্বের প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ ধারণার পরিবর্তে নারীপুরুষের জন্য এমপো তথা একশো একশো (১০০-১০০) প্রতিনিধিত্ব ফর্মুলা ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রণীত ১১ দফার ইনকুবেটার ও ক্যাম্পেইনার হিসেবে, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’র প্রণেতা হিসেবে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের রূপরেখার প্রণেতা হিসেবে, গণতান্ত্রিক আইনসভার রূপরেখার প্রণেতা হিসেবে, গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক অনেকগুলি শ্লোগানের রচয়িতা হিসাবে, গ্রামীণ বাংলাদেশ এর পরিবর্তে বর্তমান বাস্তবতায় একটি “গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ” এর ধারণা তুলে ধরার জন্য ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এখানে আরও জানিয়ে রাখা উচিত হবে যে, তার এই প্রশাসনিক কাঠামোগত রূপরেখা হচ্ছে ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রথম প্রস্তাবিত পরিকল্পনা, প্রথম দৃষ্টান্ত; যেটি দেশের অন্যসব ক্ষেত্রের জন্য ২০২০ সাল ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সবাইকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে আসছে। প্রসঙ্গত বলা দরকার যে, তিনি এই রূপরেখায় ২০২০ সালের মধ্যে একটি ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ (যেটি ‘গণস্বপ্ন ২০২০’ নামে বহুল পরিচিত) নির্মাণ করার যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন ও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার পরিকল্পনা হাজির করেছেন তা অনেকে পরিপূর্ণভাবে না বুঝে কিংবা বুঝে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ‘ ও ‘উন্নত বাংলাদেশ’ এর মধ্যেকার বিশাল তফাতকে গুলিয়ে ফেলে বক্তব্য হাজির করার অপচেষ্টা করছেন বলে প্রতীয়মান হয়; ঠিক যেমন অনেকে না বুঝে এক সময় ‘জাতীয় সরকার/কেন্দ্রীয় সরকার’ আর ‘জাতীয় একতা সরকার’ বিষয়দ্বয়ের মধ্যেকার তফাত গুলিয়ে ফেলতেন; ওই তফাতের বিষয়টি গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় সর্বপ্রথম সুস্পষ্টভাবে হাজির করার পর তা গুলিয়ে ফেলার বিষয়টি প্রায় বন্ধ হয়েছে বলে মনে হয়। এখন একইভাবে ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ আর ‘উন্নত বাংলাদেশ’ এর মধ্যেকার ফারাক গুলিয়ে ফেলার বিষয়টি বন্ধ হলে ভাল হয়; এটি যাঁদের উদ্দেশ্যে বলা হল, আশা করি, তাঁরা তা বুঝবেন এবং নিজেদেরকে সংশোধন করবেন। সে যাই হোক, বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ অনেকেই ২০২০ সালের কথা বলছে, ২০২১ সালের কথা বলছে, ২০৩০ সালের কথা বলছে, ২০৪০ সালের কথা বলছে, ২০৪১ সালের কথা বলছে, ২০৫০ সালের কথা একটু আধটু উচ্চারণ করছে, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা বলছে এবং সর্বোপরি এডহক ভিত্তিক পরিচালিত কর্মকা-ের পরিবর্তে স্বপ্ন (ভিশন) ভিত্তিক কর্মকা- পরিচালনার কথা বলছে; মনে রাখা দরকার যে, তার উৎস, অনুপ্রেরণা, পথপ্রদর্শক, অনুঘটক হচ্ছে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা, ওই রূপরেখায় উপস্থাপিত স্তরবিন্যাসকরণদ্বয় অর্থাৎ জনাব আবু তালেব, যার লাগাতার ক্যাম্পেইন তিনি নিউ ইয়র্ক থেকে সূচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সফলভাবে পরিচালিত করেন। তবে জনাব আবু তালেব এর আহবান ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৯৭ সাল থেকে যদি ২০২০ ও ২০৫০ সাল ভিত্তিক দেশের সকল স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন, গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হত, যদি ‘গণস্বপ্ন ২০২০’ ভিত্তিক ২৫টি ক্ষেত্রে ২৫টি গণতস্ত্রায়ন কর্মসূচী নিয়ে ‘উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ নির্মাণ প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন শুরু হত, যদি ‘গ্রামীণ বাংলাদেশ’ এর পরিবর্তে ‘গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ’ এর ধারণা সবাই বুঝত ও গ্রহণ করত, যদি ‘গণস্বপ্ন ২০৫০’ ভিত্তিক পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত ‘নগরীয় (আরবান) বাংলাদেশ’ মুখী নির্মাণ প্রক্রিয়া প্রচেষ্টা সচেতনভাবে শুরু হত, যদি ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি তথা ‘ এমপো’ ও ১১ দফা অনুযায়ী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে শুরু হত, যদি স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ অথবা স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ অনুযায়ী স্থানীয় সরকার কাঠামো বাস্তবায়ন শুরু হত, তাহলে আজ বাংলাদেশ আরো অনেক অনেক দূর সকল ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকতে পারতো; কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল তথা ইউনিয়ন ও নগর পর্যন্ত ধাপে ধাপে ক্ষমতাশীল দায়িত্বশীল দায়বদ্ধ গতিশীল সরকার কাঠামো দাঁড়িয়ে যেতে পারতো; সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে উঠতে পারতো। তবে বিলম্বিত হলেও স্বপ্ন ভিত্তিক কর্মকান্ডের প্রয়োজনীয়তা বোঝা ও কোনো কোনো বিষয়ে স্বপ্ন ভিত্তিক কর্মকান্ড শুরু হওয়াটা অবশ্যই প্রশংসনীয়; এতে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা রয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; তা সত্ত্বেও একে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাই। সে যাই হোক, বরাবরের মত এখনো জাতীয় নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমাদের সবিনয় অনুরোধ হল, প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ ও স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ আরো ভালভাবে জানুন এবং তা আরো গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করুন। আমরা তো সবসময় বলে আসছি যে, আগে স্থানীয় সরকারের একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ গ্রহণ করতে হবে, এবং সে অনুযায়ী সর্বোচ্চ ইউনিট (বিভাগীয় সরকার কিংবা জেলা সরকার) ও সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয় (ইউনিয়ন সরকার ও  নগর সরকার) কার্যকর করতে হবে। স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট বিভাগ, না জেলা তা আজ অবধি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত করা হয়নি; ক্ষমতা ও দায়িত্ব বিভিন্ন স্তরে যথাযথভাবে বণ্টনের স্বার্থে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি কেন ঠিক করা হয়নি সে প্রশ্ন রেখেই বলব সর্বোচ্চ ইউনিট কোন্টি তা অবশ্যই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঠিক করতে হবে। তবে বর্তমানে বিভাগ হচ্ছে মাঠ পর্যায়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ইউনিট; এই বিভাগ স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হলে উপজেলার পাশাপাশি জেলাও হয়ে যাবে মধ্যবর্তী ইউনিট এবং জেলার ক্ষমতা ও দায়িত্বও মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে নির্ধারিত করতে হবে; বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিভাগ বজায় থাকায় উপজেলার মত জেলাও মধ্যবর্তী প্রশাসনিক ইউনিট; ফলে জেলার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে কতটুকু থাকবে তা বুঝতে হবে; বিদ্যমান ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপজেলার মতই হবে, হতে বাধ্য; মনে রাখা দরকার যে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী ইউনিট থাকলে তা সাধারণত বেশ গুরুত্বহীন থাকে। এই বিষয়টি সেকেলে মনভাবগত কারণে অনেকে বুঝতে পারছেন না বলে প্রতীয়মান হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, বর্তমানে পার্বত্য ৩ জেলা ছাড়া বাকি ৬১টি জেলায় ৬১ জন নিযুক্ত ‘নিধিরাম’ জেলা পরিষদ প্রশাসক রয়েছেন, যাদের সঙ্গে দায়দায়িত্ব পালনের কোনো সম্পর্ক নেই, যাদের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই, যাদের উপস্থিতি, কর্মতৎপরতা টেরযোগ্য নয়; এর বড় কারণ হচ্ছে উপজেলার মত জেলাও বিদ্যমান ব্যবস্থায় গুরুত্বহীন, কামকাজহীন মধ্যবর্তী ইউনিট; কিন্তু এই ৬১ জন প্রশাসকের জন্য আরাম আয়েস ও সুযোগসুবিধার কোনো কমতি নেই; এটি হচ্ছে স্থানীয় সরকারের নামে সংকীর্ণ স্বার্থে সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার ও উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রয়োগ; ঠিক যেমন স্থানীয় সরকারের নামে কেবল ব্যক্তিগত ও দলগত স্বার্থে অবৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট জিয়া ও অবৈধ শাসক প্রেসিডেন্ট এরশাদ যথাক্রমে গ্রাম সরকার ও উপজেলাকে নিয়ে করেছেন। তাতে তখনকার সময় ও পরিস্থিতিতে উভয় অবৈধ প্রেসিডেন্টদ্বয় ব্যক্তিগতভাবে ও দলগতভাবে লাভবান হয়েছেন; কিছু সুবিধাবাদী ক্ষমতালোভী নীতিহীন টাউট লোককে নতুন দল দু’টির জন্য হাতিয়ার হিসেবে পেয়েছেন, এবং ওইসব সুবিধাবাদী মানুষগুলোই ওই দু’টো দলের বর্তমানকার আসল কান্ডারি হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ৬১টি জেলায় ৬১ জন প্রশাসক দ্বারা এই সরকার ও এই দল (আওয়ামী লীগ) এখন লাভবান হবার কোনও সম্ভাবনা নেই; কারণ এই দু’টো কাজের সময় ও পরিস্থিতি একদম এক রকম নয়। তা বর্তমান সরকারকে, আওয়ামী লীগকে অবশ্যই বুঝতে হবে; আশাকরি, বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সরকার ও আওয়ামী লীগ চিন্তাভাবনা করবে, এবং সেজন্য প্রয়োজনীয় উপযুক্ত পদক্ষেপ নেবে। পাশাপাশি, প্রাসঙ্গিকভাবে জেলা সংক্রান্ত আরেকটি বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলা উচিত হবে, তা হল সার্বিক বিবেচনায় একজন অসফল অর্থমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত জনাব মুহিত কর্তৃক উপস্থাপিত জাতীয় বাজেটে বার বার কেন্দ্রীয় সরকারের তথাকথিত ‘জেলা বাজেট’ প্রসঙ্গ উত্থাপন; জেলা বাজেট হবার কথা জেলা সরকারের, কেন্দ্রীয় সরকারের নয়; প্রশ্ন হল, জেলা সরকার কোথায়? স্বাভাবিকভাবে মনে এই প্রশ্নও এসে যায় যে, কেন্দ্রীয় সরকার কি তাইলে বিভাগীয় বাজেট, উপজেলা বাজেট, নগরীয় বাজেট, ইউনিয়ন বাজেটও করবে? জেলা বাজেট বিষয়টি জাতীয় বাজেট বক্তৃতায়, দলিলে বার বার আসাটা শুধু অর্থমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রণালয় নয়, মন্ত্রিপরিষদ ও জাতীয় সংসদের অপরিপক্কতারই পরিচয় বহর করে; সিপিডিসহ কয়েকটি এনজিও এবং কিছু ব্যক্তি স্বার্থগত কারণে এই বাজে বিষয়টিকে সমর্থন দিয়ে থাকে; প্রকৃত অর্থে স্থানীয় সরকার না বুঝলে, ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন সম্পর্কিত বিষয় জানা না থাকলে এমনটি-ই হয়! হবার কথা! জনাব আবু তালেব ১৯৯৬ সালে সর্বপ্রথম ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ প্রণয়ন করেন এবং সেসঙ্গে একটি শ্লোগানও প্রণয়ন করেছিলেন; শ্লোগানটি হল, ‘জেলায় জেলায় গণতন্ত্রায়ন, জেলার জনগণের ক্ষমতায়ন’; জনাব মুহিত জনাব আবু তালেবের সঙ্গে এক ফোনালাপে ‘জেলা সরকার’ নামকরণ ও ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ বিষয়ক প্রস্তাবনার প্রতি প্রবল আপত্তি জানিয়ে ছিলেন; অথচ এই মুহিত সাহেব পরবর্তীতে ‘জেলায় জেলায় গণতন্ত্রায়ন’ শ্লোগানের আদলে ‘জেলায় জেলায় সরকার’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন; তাতে তিনি জনাব তালেব ও তার জেলা সরকারের রূপরেখা প্রসঙ্গ একটুও উল্লেখ করেননি; এই হল জনাব মুহিত কর্তৃক বুদ্ধিবৃত্তিক চুরির, ডাকাতির, অসততার একটি নজির মাত্র। আমরা দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলতে চাই যে, কোনো না কোনো একদিন অর্থমন্ত্রীর এই তথাকথিত ‘জেলা বাজেট’ বিষয় হারিয়ে যাবে; এই ভুলের জন্য অর্থমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও জাতীয় সংসদকে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে; সিপিডি’রও তোষামোদী মুখোশ উন্মোচিত হবে; আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, জনাব আবু তালেব কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘জেলা সরকার’ ও ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ একদিন না একদিন বাস্তব প্রয়োজনে সামনে চলে আসবে; তাতে শয়তানিপনা না থাকলে জাতি বিশেষভাবে উপকৃত হবে; তবে, সিডিএলজির সমালোচনার মুখে কেন্দ্রীয় বাজেট ২০১৬-১৭ তে তথাকথিত ‘জেলা বাজেট’ বিষয় উবে গেলেও এই বাজেটে জেলা নিয়ে অন্য শয়তানিপনা প্রকাশ পেয়েছে; জনাব মুহিতের সেই শয়তানিপনা কি মন্ত্রীগণ ও সাংসদগণ বুঝতে পেরেছেন? তা তো বাজেট আলোচনায়-সমালোচনায় একদম বোঝা যায়নি। অনুরূপ আরেকটি চুরি-ডাকাতি কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার ঘটনা ‘বিভাগীয় সরকার’ ও বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা’ নিয়ে ঘটিয়েছেন ‘কবিতা চোর’, ‘বৌ চোর’ ও ক্ষমতা দখলদার হিসেবে খ্যাত জেনারেল এরশাদ, তাঁর দল জাতীয় পার্টি ও তাঁর রাজনৈতিক ও শাসনিক সহযোগী জেএসডি; ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারী ঢাকায় এক জাতীয় সেমিনারে জনাব আবু তালেব গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় বিভাগ এর বিলুপ্তি কিংবা বিভাগের গণতন্ত্রায়ন এই নীতিগত অবস্থান তুলে ধরেন, এবং বিভাগ থাকলে বিভাগগুলির গণতন্ত্রায়নের লক্ষ্যে ‘বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা’ উপস্থাপিত করেন; তখন রাষ্ট্রপতি এরশাদ কারাগারে ছিলেন এবং তাঁর দল ও তাঁর শাসনিক মিত্র জেএসডির বিভাগ নিয়ে কিংবা বিভাগীয় সরকার নিয়ে কোনো ধরনের বক্তব্য, কর্মসূচি ছিলনা; জনাব আবু তালেব এর প্রস্তাব অনুযায়ী বিভাগের বিলুপ্তি কিংবা বিভাগীয় সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যখন বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছিল, ঠিক তখনই, এরশাদ সাহেব কারাগার থেকে বের হবার কয়েক বছর পর বিভাগকে ‘প্রদেশ’ নামকরণ ও তাতে বিভাগীয় সরকারের রূপরেখার আদলে অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ‘প্রাদেশিক সরকার’ করার দাবী করেন; এর কিছুদিন পর এরশাদের অনুসরণে জনাব আ.স.ম. আবদুর রব, জনাব সিরাজুল আলম খান ও জেএসডি অনুরূপ বক্তব্য, দাবী উপস্থাপিত করেন, অথচ উভয় দল কোথাও কখনও জনাব আবু তালেব কিংবা গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখার কথা বলেননি, বলেননা; একে এক কথায় বলা যায় চরম রাজনৈতিক অসততা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চুরি কিংবা ডাকাতি। এইসঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবে আরও একটি বিষয় তুলে ধরা দরকার তা হল, ১৯৯৭ সালে ১৩ জানুয়ারীতে এই রূপরেখায় পার্বত্য চট্রগ্রাম সমস্যার রজনৈতিক সমাধানের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ‘পার্বত্য বিভাগ’ নামে একটি নতুন বিভাগ গঠন করার প্রস্তাব করা হয়, এবং তাতে দেশের অন্যান্য বিভাগের মত, যেমন বরিশাল বিভাগে ‘বরিশাল বিভাগীয় সরকার’, পার্বত্য বিভাগে ‘পার্বত্য বিভাগীয় সরকার’ প্রতিষ্ঠার আহবান জানানো হয়, কারণ পার্বত্য চট্রগ্রামের বিষয়টিও অনেকাংশে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ক, স্থানীয় শাসনিক বিষয়ক একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ১৯৯৭ সালেই শেষ মাসে তথা ডিসেম্বরই সম্পাদিত পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে ‘আঞ্চলিক পরিষদ’ গঠন মূলত ‘বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা’র আদলে কিছুটা বিকৃত রূপে করা হয়; কিন্তু এই চুক্তি প্রণয়নে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার জন্য ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’, বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা তথা জনাব আবু তালেব এর অবদানের কথা, প্রস্তাবের কথা কোথাও বলা হয়নি, হয়না; অথচ, জনাব আবু তালেব তাঁর প্রণীত গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখার কপি নিজ হাতে নিউ ইয়র্কে সরকার কর্তৃক গঠিত পার্বত্য চট্র্রগ্রাম বিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক জনাব আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহকে প্রদান করেছেন এবং তাঁর প্রস্তাবিত পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক সমাধানমূলক প্রস্তাবনা বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন; সেই সময় এই প্রতিবেদকসহ যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও দপ্তর সম্পাদক যথাক্রমে জনাব আব্দুস ছালাম ও আতাউর রহমান শামীম উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে এই দলেরই বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদগুলির মধ্যে একজন সাংগঠনিক সম্পাদক এই পার্বত্য এলাকার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়; তার মাধ্যমে ‘পার্বত্য বিভাগ’ গঠনের নীতিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেছে, কবুল করেছে, অথচ এই বিষয়টিও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোথাও স্বীকার করেননি, করেননা; এও একটি চরম বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা নয় কি? অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও; ৮ জন বুদ্ধিবৃত্তিক ডাকাতের ডাকাতির ফসল হচ্ছে বর্তমানকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর; এই অপকর্ম সম্পর্কে দেশের কয়েকশত বিশিষ্ট ব্যক্তি জানেন; তিনি সরকারীভাবে মুক্তিসংগ্রামের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে সোহরাওয়ার্দি উদ্যান কেন্দ্রিক আরও একটি যুগান্তকারী প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন; দেখা যাক এ নিয়ে কি ঘটে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কি ঘটান! এসব কারণে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা যে একটা বড় ধরনের অপরাধ, বড় ধরনের রোগ তা বাংলাদেশে মানুষকে বুঝানোর জন্য, জানানোর জন্য এবং তা বন্ধ করানোর জন্য একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবল আন্দোলন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বলে প্রতীয়মান হয়; প্রাসঙ্গিকভাবে আরো উল্লেখ করা সমীচীন হবে যে, জনাব আবু তালেব প্রতিটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে অন্যান্য বিষয়ক সম্পাদক পদ যেমন রয়েছে, ঠিক তেমন ‘স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক’ পদ সৃষ্টি করতে আহবান জানিয়ে আসছেন; যাতে স্থানীয় সরকার বিষয়টি দলীয় কমিটিতে, দলীয় ভাবনায়, দলীয় কাজে বিশেষ গুরুত্ববহ হয়; প্রায় সব রাজনৈতিক দলেই শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, ক্রীড়া, সমাজকল্যাণ, সাংগঠনিক, দপ্তর, প্রচার, প্রকাশনা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ত্রাণ, শ্রম, জনশক্তি, বন, সমবায়, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক, মহিলা ইত্যাদি বিষয়ক সম্পাদকীয় পদ রয়েছে, অথচ স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদকীয় পদ নেই; কেন? এতে এটা কি বোঝা যায়না, রাাজনৈতিক দলীয় কাঠামোতে স্থানীয় সরকার ও তার ভাবনাচিন্তা চরমভাবে গুরুত্বহীন রয়েছে। স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক পদ সৃষ্টিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও আজ অবধি সাড়া দেয়নি; আমরা আশা করেছিলাম, জনাব আবু তালেবের আহ্বান অনুয়ায়ী, এই বছর ২০১৬ সালে ঢাকায় ২২ ও ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলনে ৬ হাজার ৭০ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ‘স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক’ এর পদ সৃষ্টি করবেন, সেজন্য ড. আব্দুর রাজ্জাক নেতৃত্বাধীন গঠনতন্ত্র উপকমিটি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, তার জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনাব আবু তালেব এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে উদার হবেন, এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার দায় থেকে নিজ দলকে মুক্ত রাখতে প্রয়াস নেবেন; কিন্তু ৬ হাজার ৭০ সদস্যবিশিষ্ট একটি মহাঢাউস কাউন্সিলে কয়েকজন চাটুকারের অপ্রাসঙ্গিক চাটুকারিতা ছাড়া দলীয় ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র নিয়ে আালোচনায়-সমালোচনায় অংশ নেয়া কি সম্ভব ছিল? গঠনতন্ত্র উপকমিটি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটি কি স্থানীয় সরকার উন্নয়ন বিষয়ে আপডেট ও আন্তরিক ছিল? আমরা হ্যাঁ সূচক লক্ষণ তো একটুও দেখিনা। সে যাই হোক, জেলা স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হলে বিভাগ অবশ্যই বিলুপ্ত হতে হবে; সেক্ষেত্রে উপজেলা শুধু মধ্যবর্তী ইউনিট হিসেবে থাকবে, এবং তা আস্তে আস্তে কিংবা দ্রুততার সঙ্গে বিলুপ্ত হতে থাকবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট ও সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয় নির্ধারিত না হলে স্থানীয় সরকারের প্রতিটি ধাপে ক্ষমতা ও দায়িত্ব যথাযথভাবে ঠিকঠাক হবে-ই বা কেমন করে? সর্বোচ্চ ইউনিট এবং সর্বনিম্ন ইউনিটদ্বয়ে ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রদান করার পর মধ্যবর্তী ইউনিট যেমন উপজেলায় ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেয়ার মত কিছু থাকলেই তো তা দেয়া যাবে। স্থানীয় সরকারের এসব জটিল ও কঠিন বিষয়গুলির একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বিত সমাধান ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’য় রয়েছে। এতে সর্বপ্রথম বিভাগীয় সরকারের রূপরেখা, জেলা সরকারের রূপরেখা, উপজেলা সরকারের রূপরেখা, ইউনিয়ন সরকারের রূপরেখা ও নগর সরকারের রূপরেখা একসঙ্গে উপস্থাপিত করা হয়েছে; যাতে একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ (প্রশাসনিক কাঠামো) গৃহীত হলে তার প্রতিটি টায়ার এ প্রয়োজন মত সুনির্দিষ্ট সরকার কাঠামো বসানোর কাজটি সহজে করা সম্ভব হয়। এই রূপরেখায় ইউনিয়ন ও নগর এর মধ্যে অন্য কোনো ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তা, প্রচেষ্টা একদম সমর্থন করা হয়নি, তার পরিবর্তে সর্বনি¤œ ইউনিট হিসেবে সমস্ত মনোযোগ, কর্মপ্রচেষ্টা এক দিকে গ্রামীণ এলাকায় ইউনিয়ন কেন্দ্রীক ও অপর দিকে নগরীয় এলাকায় নগর কেন্দ্রিক করার সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে; এবং এর মাধ্যমে শুধু গ্রামীণ এলাকা কেন্দ্রীক স্থানীয় সরকারের সর্বনি¤œ ইউনিট বিষয়ক দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা ধরিয়ে দিয়ে গ্রাম ও নগর কেন্দ্রীক একই স্তরে সর্বনি¤œ ইউনিটদ্বয় (ইউনিয়ন ও নগর এবং ইউনিয়ন সরকার ও নগর সরকার ) কেন্দ্রীক ধারণা উপস্থাপিত করা হয়। সম্প্রতি সরকার জেলায় ‘জেলা সরকারের রূপরেখা’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ না নিয়ে অত্যন্ত তড়িগড়ি করে অত্যন্ত ভঙ্গুর, সেকেলে জেলা পরিষদ অধ্যাদেশ জারী করেছে এবং তা অল্প কয়েকদিনের মাথায় মন্ত্রিপরিষদ সংশোধনও করেছে; তাতে স্থানীয় সরকার বিষয়ে ভাল মানসিক, শিক্ষাগত ও আইনগত প্রস্তুতি যে এই মন্ত্রিসভার নেই তা ভালভাবে ফুটে উঠেছে; এবং সব জেলায় গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার তেমন কোনো প্রস্তুতি যে আওয়ামী লীগেরও নেই তা জোর দিয়েই বলা যায়; দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলিরও একই অবস্থা। আরও দুঃখজনক ঘটনা হল এই যে, এই সংক্রান্ত বিলও কোনো ধরনের আলোচনা-সমালোচনা ছাড়া স্বল্প সময়ে জাতীয় সংসদে পাস হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হল যে সংসদ সদস্যগণেরও স্থানীয় সরকার বিষয়ে কোনো আইনগত, গবেষণামূলক ও শিক্ষামূলক প্রস্তুতি নেই; এতে আরও প্রমাণিত হল যে, শুধু হাত তোলা আর নামানোর মধ্য দিয়ে জাতীয় সাংসদগণ নিজ নিজ বিধানিক দায়িত্ব পালন করছেন! জাতীয় সংসদে পাসকৃত এই বিলটি অসম্পূর্ণ, ভঙ্গুর, সেকেলে ও গারবেজতুল্য; তাছাড়া, এই বিলটি হচ্ছে প্রত্যাখাত আয়ুবীয় মৌলিক গণতন্ত্র বাংলাদেশে র্চ্চা করতে নগ্ন প্রয়াস। এই ধরনের একটি কঠিন অথচ চরম খারাপ পরিস্থিতিতে আমরা জোর দাবী করছি যে, জনাব আবু তালেব প্রণীত জেলা সরকারের রূপরেখাটি গভীরভাবে বিবেচনায় নিয়ে পার্বত্য তিন জেলাসহ সকল জেলায় একরূপ জেলা সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হোক; জেলা স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট না মধ্যবর্তী ইউনিট তা ঠিক করা হোক; জেলা কি গ্রামীণ স্থানীয় সরকার, না গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় সরকার তা ঠিক করা হোক; তাতে ক্ষমতার পৃথকীকরণ করা হোক; এতে নারীর ১০০% প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এমপো’র প্রয়োগ করা হোক; জেলা সরকারের বিধানিক পরিষদ হিসেবে “জেলা সংসদ” গঠন করা হোক; প্রতি জেলায় জেলা সাংসদ কতজন থাকবে তা সংশ্লিষ্ট জেলায় কত জনসংখ্যা রয়েছে তা বিবেচনায় নিয়ে জেলা নির্বাচনী ওয়ার্ড/এলাকা নির্ধারিত করা হোক; প্রতিটি জেলা নির্বাচনী ওয়ার্ডে/এলাকায় এমপো অনুযায়ী ১জন মহিলা জেলা সাংসদ ও ১জন পুরুষ জেলা সাংসদ প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত করা হোক; মহিলা মানুষ বিষয়ক অবমাননায়িত ‘সংরক্ষিত’ শব্দটি নির্বাসিত করা হোক; জেলা সরকারের প্রধান হিসেবে জেলা চেয়ারপারসন ও দুই জন ভাইস-চেয়ারপারসন (১ জন নারী ও ১ জন পুরুষ) এর পদ সৃষ্টি করা হোক এবং ওসব পদ প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত করা হোক ( এমপো অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে প্রণীত ১১ দফায় ৯ম দফা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক প্রণীত খসড়া জেলা পরিষদ অধ্যাদেশে ১জন মহিলা ভাইস-চেয়ারপারসন ও ১জন পুরুষ ভাইস চেয়ারপারসন নির্বাচিত করতে একটি বিধান ছিল, তা কেন সংসদে পাসকৃত জেলা পরিষদ আইনে যুক্ত হলো না? এই প্রশ্ন থাকল); জেলা ন্যায়পালের পদ সৃষ্টি করা হোক; জেলার সঙ্গে সিটি কর্পোরেশন ও অন্যান্য স্থানীয় ইউনিটের সম্পর্ক কিরূপ হবে তা ঠিক করা হোক; জেলা নির্বাচনী বোর্ড গঠিত হোক; তথাকথিত আয়ুবীয় কায়দায় পরিচালিত চলতি নির্বাচনী প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করা হোক, ইত্যাদি ইত্যাদি; এক কথায় বলব যে, জনাব আবু তালেব প্রণীত, প্রস্তাবিত গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় উপস্থাপিত জেলা সরকারের রূপরেখাটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হোক, এবং “জেলায় জেলায় গণতন্ত্রায়ন, জেলার জনগণের ক্ষমতায়ন” এই শ্লোগানে প্রতিটি জেলাকে মুখরিত করা হোক, আন্দোলিত করা হোক।
এই গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় গ্রামীণ বাংলাদেশ তথা শুধু কৃষি ভিত্তিক সমাজ, দেশ এর চিরায়ত ধারণার পরিবর্তে বিদ্যমান বাস্তবতার নিরিখে গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ তথা কৃষি ও অকৃষি পেশা ভিত্তিক সমাজ, দেশ এর ধারণা তুলে ধরা হয়েছে, যার মাধ্যমে এই প্রথম বাংলাদেশের স্ট্যাটাসগত ও গুণগত পরিবর্তন জনিত নতুন পরিচিতি উপস্থাপিত করা হয় এবং তা আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারীভাবে গ্রহণ করার দাবী জানানো হয়, তবে এই বিষয়টি তখন ও এখন অনেকেই বিশেষত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, একনেক, অর্থ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ, জাতীয় সংসদ, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলগুলো বুঝতে পারছেনা বলে প্রতীয়মান হয়; প্রসঙ্গত এই বিষয়ে আরও জানানো উচিত হবে যে, গ্রামীণ বাংলাদেশ আর গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এক বিষয় নয়, এক রূপ নয়, এক অবস্থা নয়; এ দু’টোর সমস্যা, সমাধান প্রক্রিয়া, গুরুত্ব ও তাৎপর্য এক রকম নয়; তাই, এই দু’টোর প্রশাসনিক কাঠামো, ক্ষমতা ও দায়িত্বও একরূপ হতে পারেনা; এই দু’টোতে মানুষের মনোগত, ভাবনাগত পার্থক্য থাকে, থাকবে। তাই এখন থেকে, গ্রামীণ বাংলাদেশ ভিত্তিক নয়, গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ ভিত্তিক সকল উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণীত, গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে হবে; এটি যত দ্রুত সম্ভব দেশের নীতিপ্রণেতাগণ, আইনপ্রণেতাগণ, বিধি-প্রবিধি প্রণেতাগণ ও মিডিয়াকে বুঝতে হবে এবং তার স্বীকৃতি ও পরিচিতি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান দিতে হবে যে, বাংলাদেশ এখন হচ্ছে একটি গ্রামীণ-নগরীয় দেশ; বাংলাদেশ একদা গ্রামীণ তথা কৃষিজ দেশ ছিলো, এখন আর তা নেই, এবং একে অবশ্যই একটি গুণগত পরিবর্তন হিসেবে নিতে হবে; সেইসাথে এও মনে রাখতে হবে যে, এই স্ট্যাটাসগত ও গুণগত পরিবর্তন কয়েক দশক স্থায়ী থাকবে; তা রাতারাতি উবে যাবেনা; আবার এও মনে রাখতে হবে যে, এই সময়টাতেই একটি পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য গোটা জাতিকে মানসিক ও শিক্ষাগত প্রস্তুতি যথা সম্ভব সম্পন্ন করতে হবে, এবং এই সময়ের মধ্যেই একটি নগরীয় বাংলাদেশের মানে, গুরুত্ব ও তাৎপর্য যথা সম্ভব অনুধাবন করতে সচেষ্ট থাকতে হবে। সেসঙ্গে যাঁরা অকৃষি পেশায় যুক্ত রয়েছেন, সন্তানগণকে অকৃষি পেশায় নিযুক্ত করছেন, নগরীয় সুযোগ-সুবিধা বেশ উপভোগ করছেন, অথচ অন্যদেরকে কেবল কৃষি পেশায় রাখতে, গ্রামীণ সমাজ হিসেবে রাখতে ওকালতি করছেন, কান্নাকাটি করছেন, কুমতলব আঁটছেন, গলাবাজি, লেখাবাজি করছেন, তাঁদেরকে অবশ্যই চোখে চোখে রাখতে হবে, নজরদারিতে রাখতে হবে; এটি যেন আমরা ভুলে না যাই।
গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের এই রূপরেখায় কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারের জন্য প্রস্তাবিত সংসদগুলো গঠনের ক্ষেত্রে এমপো ও ১১ দফা’র প্রয়োগ করা হয়েছে; এমপো ও ১১ দফা এই নিবন্ধের শেষে সংযুক্ত করা হয়েছে, তা বিশেষভাবে দেখুন ও জানুন; এমপো তথা নারীপুরুষের জন্য একশো একশো প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি অনুযায়ী, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউনিয়ন সংসদ ও নগর সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ১ জন নারী সদস্য ও ১ জন পুরুষ সদস্য প্রতিনিধিত্ব করবে, জেলা সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলা সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা/ওয়ার্ড হতে একজন নারী সাংসদ ও একজন পুরুষ সাংসদ জেলা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবে এবং জাতীয় সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা থেকে ১ জন নারী সাংসদ ও ১ জন পুরুষ সাংসদ প্রতিনিধিত্ব করবেন; যদি তা হয়, তার মাধ্যমে বিধানিক সংসদ গঠনের ক্ষেত্রে নারীর জন্য অবমাননাকর “সংরক্ষিত আসন” শব্দবন্ধটি আর থাকবে না এবং তা এক কলংকিত অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে। প্রসঙ্গক্রমে মনে রাখতে বলব যে, এমপো শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা দুনিয়ার প্রতিটি দেশের প্রতিটি ধাপের/স্তরীয় সরকারের প্রতিটি বিধানিক সংসদ/পরিষদ গঠন করার জন্য বাস্তবায়নযোগ্য এক নতুন গণপ্রতিনিধিত্ব ফর্মুলা হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়েছে; এর মাধ্যমে নারীর জন্য অবমাননাকর সংরক্ষিত পদ্ধতি, ৩৩% পদ্ধতি, ৫০% পদ্ধতি, প্রতি তিন ওয়ার্ডে একজন সংরক্ষিত নারী সদস্য পদ্ধতি, সংরক্ষিত ঘূর্ণায়মান নারী সদস্য পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাগুলো, দুর্বলতাগুলো সংশোধিত হয়ে যাবে; নারী ও পুরুষ উভয় একই সাধারণ পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন; নারী যে পদ্ধিতে নির্বাচিত হবেন সেই একই পদ্ধতিতে পুরুষও নির্বাচিত হবেন বলে নারীর জন্য প্রয়োগকৃত “সংরক্ষিত” শব্দটি ইতিহাসে স্থান পাবে; চমক সৃষ্টি করতে দু’একজন নারীকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় বসিয়ে দিয়ে বাহবামূলক কাজের পরিবর্তে নারীর জন্য পদ্ধতিগত ক্ষমতায়নের ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। তার জন্য বিশ্বজুড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যাম্পেইন চলছে; এই এমপো তথা একশো একশো প্রতিনিধিত্ব ফর্মুলার সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব ও তাৎপর্য হচ্ছে এক বিস্ময়কর ব্যাপার। নারী ও পুরুষ উভয়ের যে কেহ এই ফর্মুলার সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বুঝতে পারলে, অনুধাবন করতে পারলে নিজ থেকে নিজ নিজ শক্তিতে বলিয়ান হয়ে আন্দোলন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে; তাই দেশের প্রতিটি মানুষের প্রতি আমাদের বিশেষ অনুরোধ হল, একশো একশো প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি তথা এমপো গভীরভাবে জানার বুঝার চেষ্টা করুন; নিজেকে একুশ শতকের এই মহান আন্দোলনের সঙ্গে, সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করুন; তাতে আপনার ও গোটা মানব জাতির জন্য যারপর নাই এক মঙ্গলময় পরিবেশ বয়ে আনবে। (প্রিয় রিডার এই বিষয়টি আরও ভালভাবে জানতে চাইলে, বুঝতে চাইলে এই নিবন্ধের শেষে সংযুক্ত এমপো ও ১১ দফা বিশেষ মনোযোগ দিয়ে পড়–ন, দেখুন ও বিবেচনা করুন।)
সে যাই হোক, সুচতুর দলীয় ও নির্দলীয় নকলবাজগণ এই গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখার কিছু কিছু জনপ্রিয়, পছন্দনীয় বিষয় বারবার কাটাছেঁড়া ও বিকৃত করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে, এবং এর কিছু কিছু বিষয় নকলবাজরা নিজেদের নামে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে; কিন্তু নকলবাজগণ, বুদ্ধিবৃত্তিক চোর-ডাকাতগণ এই রূপরেখার সমন্বিত রূপের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব একটুও খাটো করতে সক্ষম হননি, হবেনও না; বরং এই রূপরেখার কালজয়ী উপযোগিতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাই, সরকারের প্রতি আমাদের বিনীত অনুরোধ হল, যদি গ্রামীণ বাংলাদেশ এর পরিবর্তে বিদ্যমান বাস্তবতায় গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত হিসেবে গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চান, যদি গ্রামীণ-নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য তিন প্রকারের স্থানীয় সরকার তথা গ্রামীণ স্থানীয় সরকার, নগরীয় স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় সরকার স্থাপিত হোক চান, যদি স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা ও দায়িত্ব ধাপে ধাপে পাশাপাশি অর্পিত ও পালিত হোক চান, যদি স্থানীয় সরকারের একটি সমন্বিত স্তরবিন্যাসকরণ (প্রশাসনিক কাঠামো) প্রতিষ্ঠিত ও কার্যকরী হোক চান, যদি দ্বি-স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা স্থায়ী রূপ নিক চান, যদি স্থানীয় সরকারের প্রতিটি ধাপে নারীর শতভাগ (১০০%) প্রতিনিধিত্ব তথা এমপোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে চান, যদি স্থানীয় সরকারের প্রত্যেক ধাপে ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি কার্যকর হোক চান, যদি স্থানীয় সরকারে বিধানিক পরিষদ (যেমন ইউনিয়ন সংসদ, নগর সংসদ) স্থাপিত হোক চান, যদি প্রতিটি স্থানীয় ইউনিটে ন্যায়পাল এর পদ চালু হোক চান, যদি ২০২০ সালের মধ্যে ২৫টি ক্ষেত্রে ২৫টি গণতন্ত্রায়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ তথা “গণস্বপ্ন ২০২০” বাস্তবায়িত হোক চান, যদি কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরীয় গণতন্ত্রায়ন দ্বারা জনগণের সর্বস্তরীয় ক্ষমতায়ন হোক চান, যদি ২০৫০ সাল কিংবা তার আগে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত “নগরীয় বাংলাদেশ” তথা “গণস্বপ্ন ২০৫০” বাস্তবায়িত হোক চান, যদি পরিপূর্ণ নগরীয় বাংলাদেশ এর জন্য প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১ অথবা স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২  বাস্তবরূপ নিক চান, যদি খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে “নগরীয় কৃষি” ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক চান, যদি “নগর মানে কৃষি নয়” এর পরিবর্তে “কৃষিকে নিয়েই নগর” বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হোক চান, যদি দক্ষ সরকার গড়তে সরকারের আকার আয়তন আস্তে আস্তে ছোট হোক চান, তাইলে আর কালবিলম্ব না করে ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’র প্রতিটি বিষয় স্থাপন ও কার্যকর করার প্রকৃত উদ্যোগ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করুন; প্রসঙ্গত এও বলব যে, তা যেন নকলবাজী না হয়, তা যেন বুদ্ধিবৃত্তিক চুরি, ডাকাতি না হয়, তা যেন জনাব আবু তালেব এর অবদান অস্বীকার করার অভিপ্রায়, প্রয়াস না হয়। যিঁনি স্বপ্ন দেখেন, যিঁনি স্বপ্ন দেখান, যিঁনি স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপায় বাতলান, যিঁনি স্বপ্ন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করেন, যিঁনি স্বপ্নের বিষয়ে মানুষকে অনুপ্রাণিত করেন, সর্বোপরি যিঁনি স্বপ্ন বিষয়ে লাগাতার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন পরিচালিত করেন, তাঁকে অস্বীকারের সামান্যতম প্রয়াসও মহা অপরাধ, মহা অন্যায়, মহা কলংক হয়ে থাকবে; ঠিক যেমন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ৮ (আট) জন অসৎ লোক তা করেছে এবং তার জন্য এদেরকে মহা অপরাধের দায়ে মহা কলংক বহে বেড়াতে হচ্ছে, হবে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় এই মহা কলংকজনক বিষয়টি সম্পর্কে জনাব সৈয়দ হাসান ইমাম, জনাব নাসির উদ্দিন ইউসুফ, জনাব ড. মুনতাসির মামুন, জনাব ডা. মুসতাক হোসেন, জনাব শাহরিয়ার কবির সহ দেশ ও বিদেশের কয়েক শত বিশিষ্ট ব্যক্তি বিশেষভাবে অবগত রয়েছেন; নিউ ইয়র্ক থেকে পরিচালিত মুক্তিসংগ্রাম বিষয়ক গবেষণা ও স্মৃতি সংরক্ষণ করতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরসহ মোট ৫টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ও ক্যাম্পেইন বিষয়ে প্রয়াত কবি সুফিয়া কামাল, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, ভাষা সৈনিক এডভোকেট গাজিউল হক, অধ্যাপক কবির চৌধুরী, কবি শামসুর রাহমান, সাহিত্যিক শওকত ওসমান, কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদসহ আরও অনেকে ভালভাবে জানতেন। তথাপি এই কয়জন লোক তাদের অসৎ কর্ম থেকে শুদ্ধতায় যায়নি, যাচ্ছেনা; এঁরা যেন দুই কান কাটা মানুষের মত রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলার আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাই তো বলি, অনুরূপ ঘটনা যেন স্থানীয় সরকার স্থাপনের ক্ষেত্রে না ঘটে সেটি সরকারসহ সবাই মনে রাখবেন বলে আশা করি। আরও মনে রাখা দরকার যে, জনাব আবু তালেব তদবির চালিয়ে নভেল প্রাইজ নেয়ার লোক নয়, প্রতিবাদ আর দাবিতে স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পুরস্কার  আদায় করার লোকও নয়; তিনি নিজস্ব মিডিয়ায় কিংবা তোয়াজী কায়দায় মিডিয়ায় আতœ-প্রচারণায় বিশ্বাসী মানুষও নন।
প্রতিবেদনটি পাঠক সমাজের ভালভাবে বোঝার সুবিধার্থে স্থানীয় সরকার ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক গবেষক এবং সিডিএলজি’র নির্বাহী পরিচালক জনাব আবু তালেব প্রণীত ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ থেকে প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-১, স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাসকরণ-২ এবং মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো) ও তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রণীত ১১ দফার কপি নিচে সংযুক্ত করা হয়েছে। আমরা আশা করি, পাঠকগণ, গবেষকগণ, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিগণ, নীতিপ্রণেতাগণ, আইনপ্রণেতাগণ, বিধিপ্রণেতাগণ, মন্ত্রীগণ, সরকারী কর্মকর্তাগণ, সাংবাদিকগণ, আইনজীবীগণ, প্রকৌশলীগণ ও দেশের সকল পর্যায়ের সকল জায়গার নীতিনির্ধারকগণ বিশেষভাবে উপকৃত হবেন। যে কোনো ধরনের প্রশ্ন থাকলে, তথ্যমূলক প্রশ্ন থাকলে, কোনো কিছু অস্পষ্ট বলে মনে হলে তার জন্য সঠিক উত্তর যোগাতে আমরা যথাসাধ্য সচেষ্ট থাকব বলে অঙ্গীকার থাকল। পাঠক-পাঠিকার বোঝার সুবিধার্থে আরও একটি বিষয় বলতে চাই, তা হল জনাব আবু তালেব এর গবেষণামূলক প্রস্তাবনাগুলোর উপস্থাপন পদ্ধতি হচ্ছে একজন দক্ষ চিত্রকরের মত; দক্ষ চিত্রকরের চিত্র দেখে তাঁর বিষয়, তাৎপর্য ও গভীরতা যেমন বুঝে নিতে হয়, ঠিক তেমনি তাঁর উপস্থাপিত রেখাচিত্র দেখে ও স্বল্প কথা পড়ে এর বিষয়গত সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য ও গভীরতা পাঠকপাঠিকাকে গভীর মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হবে, অনুধাবন করতে হবে। তবে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রায় দুই দশক সময় লেগে যাচ্ছে দেখে খুবই দুঃখ লাগে বইকি?

মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো)

alt
একশো একশো প্রতিনিধিত্ব; একশো একশো ক্যাম্পেইন
alt
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এমপো অনুযায়ী প্রণীত ১১ দফা
(১) জাতীয় সংসদের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা হতে একজন মহিলা জাতীয় সংসদ সদস্য ও একজন পুরুষ জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে হবে; (২) জাতীয় সংসদে একজন মহিলা ডেপুটি স্পীকার ও একজন পুরুষ ডেপুটি স্পীকার নির্বাচিত করতে হবে; (৩) ইউনিয়নের প্রতি ওয়ার্ডে একজন মহিলা মেম্বার ও একজন পুরুষ মেম্বার নির্বাচিত করতে হবে; (৪) ইউনিয়নে একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন ও একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারপার্সন নির্বাচিত করতে হবে; (৫) পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের প্রতি ওয়ার্ডে একজন মহিলা কাউন্সিলর ও একজন পুরুষ কাউন্সিলর নির্বাচিত করতে হবে; (৬) পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনে একজন মহিলা ডেপুটি মেয়র ও একজন পুরুষ ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত করতে হবে; (৭) উপজেলায় ‘মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো)’ অনুযায়ী নির্বাচিত একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন ও একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারপার্সন এর ক্ষমতা ও দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে; (৮) উপজেলা সংসদ, জেলা সংসদ ও বিভাগীয় সংসদ এর প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা হতে একজন মহিলা সদস্য ও একজন পুরুষ সদস্য নির্বাচিত করতে হবে; (৯) জেলা ও বিভাগে একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপার্সন ও একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারপার্সন নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে; (১০) জাতীয় সভা (জাতীয় আইনসভার উচ্চকক্ষ হিসেবে যদি কখনও এটি গঠিত হয়) গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলাকে একেকটি নির্বাচনী এলাকা ধরে নিয়ে প্রত্যেক জেলা হতে একজন মহিলা জাতীয় সভাসদ ও একজন পুরুষ জাতীয় সভাসদ প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত করতে হবে; (১১) ‘মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো)’ এর আলোকে অন্যান্য ক্ষেত্রেও ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্বে নরনারীর ক্ষমতায়ন যথাসম্ভব সুনিশ্চিত করতে হবে। (১১তম দফা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়দ্বয়ে একজন মহিলা উপ-উপাচার্য ও একজন পুরুষ উপ-উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছেন; এই প্রদ্ধতি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর করা যেতে পারে। এই এমপো অনুযায়ী উপজেলায় একজন মহিলা ভাইস চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়েছেন, ৭তম দফা অনুযায়ী তাঁর ক্ষমতা ও দায়িত্ব যথাসম্ভব সুনির্দিষ্ট করতে হবে। ১১ দফার ২য় দফা অনুয়াযী জাতীয় সংসদে সরকার একজন মহিলা ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করতে পারতেন। তাতে না গিয়ে কেবল চমক সৃষ্টি করতে, কেবল বাহবা পেতে একজন অনভিজ্ঞ ব্যক্তিকে স্পিকার করেছেন, এবং তাতে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি বিধানিক প্রধান পদে দায়িত্ব পালনে বঞ্চিত হয়েছেন। আমরা নারীর ক্ষমতায়নের নামে চমক, করুণা আর দয়া চাইনা, চাই এমপো অনুযায়ী, ১১ দফা অনুযায়ী নারীর পদ্ধতিগত গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন হোক; যেখানে অভিজ্ঞতায় ঘাটতি দিয়ে নির্বাহিক, বিধানিক ও বিচারিক কাজে দেশের কোনও ক্ষতি সাধিত হবে না, ক্ষতি সাধনে সম্ভাবনা থাকবে না; তাই আমরা সবাইকে এমপো ও ১১ দফা গভীরভাবে অনুধাবনে সচেষ্ট হতে অনুরোধ করব; এবং নারী মানুষের ক্ষমতায়ন পদ্ধতি বিষয়ক স্থানীয়, জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি, কর্মসূচী বুঝতে, জানতে বলব। তা হলে এমপোর সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে কিছুটা সহজ হবে বলে প্রতীয়মান হয়।)
লেখক হাকিকুল ইসলাম খোকন:
লেখক,সাংবাদিক,রাজনীতিক,সদস্য ও মুখপাএ সিঊিএলজি :ইঊএসএ
এঊিটর- বাপসনিউজ এবং সভাপতি,আমরিকান প্রেসক্লাবের অব বাংলাদেশ অরিজিন ।


মুখোমুখি আড্ডায় কবির সাথে আলাপচারিতা

মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৬

‘বাংলার মাটি, বাংলার জল আমাকে প্রতিনিয়ত প্রাণিত করে অবিরাম শব্দের ফুল ফোটাঁতে’ - জুলি রহমান

কবি জুলি রহমান সাহিত্যচর্চা করছেন তিন যুগের অধিককাল ধরে। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প - সাহিত্যের এসকল উল্লেখযোগ্য শাখাতেই রেখেছেন মুন্সিয়ানার স্বাক্ষর, পেয়েছেন পাঠকপ্রিয়তা। ২০১৭’র একুশে’র বইমেলায় প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তার রচনাকৃত পায় তিন’শ গানের বিশেষ সংকলন ‘জুলি গীত’। সম্প্রতি জুলি রহমান মুখোমুখি আড্ডায় বসেছিলেন সাংবাদিক, টিভি উপস্থাপক, অনুবাদক, আবৃত্তিকার দিমা নেফারতিতি’র সাথে। সেই আলাপচারিতা উদ্ধৃত হলো প্রিয় পাঠকদের উদ্দেশ্যে।

দিমা নেফারতিতি: প্রথমেই জানতে চাইব সদ্য প্রয়াত কবি শহীদ কাদরী সম্পর্কে কবি জুলি রহমানের মূল্যায়ন। কবি শহীদ কাদরীকে আপনি কোন দৃষ্টিতে, কোন ভঙ্গিতে দেখেন, কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

জুলি রহমান: কবি শহীদ কাদরীর কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে, তিনি একজন বিরল প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব। কবিতা যদি সর্বোচ্চাঙ্গের আর্ট হয়, তবে আমি মনে করি কবি শহীদ কাদরী সেই আর্টের তুলি এবং ক্যানভাস। কবিতায় ছন্দ এক কল্পনা রঙিন পরিবেশ তৈরী করে। শুধু তাই নয়, কাব্যের গভীরে থাকে বোধের অতলতা। একজন কবির বোধ, সাধারণের বোধের চেয়ে অনেক বেশি ঊর্ধ্বে বিরাজ করে। কবি শহীদ কাদরী সেই উচ্চবোধসম্পন্ন মানব। কবি শহীদ কাদরীর সাহিত্য আসর ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা’য় আমি বহুবার গেছি। ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা’র শুরুর দিনগুলি থেকেই আমি এর সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। সেসময় খুব কাছে থেকে কবি শহীদ কাদরীকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। সেই কাছে থেকে দেখা অভিজ্ঞতায় আমি জেনেছি, একজন কবিকে অবশ্যই রোমান্টিক হতে হয়। কবি শহীদ কাদরী ছিলেন রোমান্টিক কবি। রোমান্টিকতার দ্যোতনায় আচ্ছাদিত ছিল তার কাব্য মানস এবং তার কবিতা। কবি শহীদ কাদরীর বিউটি বোর্ডিং নিয়ে কাব্যালাপ থেকে, তার বিভিন্ন সময়ের স্মৃতিচারণ থেকে, তাকে নিয়ে তার বন্ধু-স্বজনদের আড্ডার স্মৃতিচারণ থেকে কবি শহীদ কাদরীর রোমান্টিক সত্তার স্পষ্টতা প্রতিভাত হয়।
দ্বিতীয়ত কবিকে হতে হয় একজন সাচ্চা মানুষ। কবি শহীদ কাদরীকে খুব কাছে থেকে দেখে, তার সান্নিধ্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে, এটাই উপলব্ধি করেছি বারবার, যে কবি শহীদ কাদরী একজন সাচ্চা মানুষ, সত্যিকার অর্থে একজন নিখাদ মানুষ। সেইসাথে আমি বলব কবি শহীদ কাদরী নি:সন্দেহে একজন বিরল প্রতিভার মানুষ। তুলনামূলকভাবে তার রচনার সংখ্যা নিতান্তই অল্প। হাতে গোনা। কিন্তু সেই অল্পসংখ্যক রচনা দিয়েই তিনি বাংলা সাহিত্যে শক্ত আসন করে নিয়েছেন। এই যে জায়গা করে নেওয়ার বিষয়, এক্ষেত্রে বিশ্ব বরেণ্য চিত্রশিল্পী পিকাসোর কথা মনে পড়ছে। পিকাসো যখন রংতুলি দিয়ে ছবি আঁকতেন, নিন্দুকেরা বলতেন - এসব কি হচ্ছে, নেহায়েত আঁকিবুকি, শুধু কাকের ঠ্যাং আর বকের ঠ্যাং। কিন্তু দেখুন কালের পরিক্রমায় পিকাসোর শিল্পকর্ম জগৎজোড়া খ্যাতি পেল। আমি মনে করি, লেখার এবং তাবড় সৃষ্টিকর্মের, শিল্পকর্মের বিস্তার নয় - স্বল্পতা নয় - সংখ্যা নয়, কেবল গুনগত মান শিল্পকে - সৃষ্টিকে - কবিতাকে টিকিয়ে রাখে। সেই গুনগত মানের বিবেচনায় কবি শহীদ কাদরী বিরল ক্ষমতাসম্পন্ন একজন কবি এবং বাংলা ভাষার অন্যতম মহান কবি, শ্রেষ্ঠ কবি।


দিমা নেফারতিতি: আপনি অনেকদিন যাবত প্রবাসে লেখালেখি করছেন। প্রবাসে বসে লেখালেখি করবার সুবিধা এবং অসুবিধা কি কি অনুভব করেছেন ?

জুলি রহমান: দেখুন আমাকে অনেকেই বলে যে প্রবাসী কবি, একথাটিতে আমার খুব আপত্তি। কারণ কবির কোন স্থান, কাল নেই। তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, সেখানেই তার লেখার পরিবেশ এবং আবহ  তৈরী হয়ে যায়। আমি যখন মধ্যপ্রাচ্যে ছিলাম তখন মধ্যপ্রাচ্যের সমাজ ব্যবস্থার আনুষঙ্গিকতা নিয়ে আমার লেখা তৈরী হত। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আছি, এখানকার আবহ, এখানকার সংস্কৃতি, এখানকার জীবন বাস্তবতা আমার লেখায় প্রতিবিম্বিত হয়। তাই প্রবাস/নিবাস বলে আমার কাছে কিছু নেই। কিন্তু তারপরেও যখন আমরা বইমেলায় যাই তখন দেখি দু’টা সারি, একটাতে প্রবাসী লেখকদের বই আরেকটাতে বাংলাদেশী লেখকদের বই। তখন আমি খুব পীড়িত হই, ভাবি কেন এই বিভেদ? মাঝখানে এই দেয়ালটা কেন থাকবে। তাছাড়া আমি বাংলাদেশে সাহিত্য চর্চা করেছি অনেকদিন। তারপর মধ্যপ্রাচ্যে চলে গেলাম। সেখান থেকে ফিরে বাংলাদেশে আবার চুটিয়ে সাহিত্য চর্চা করেছি। আল-মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুন্, কাজী জাকির,  জুবাইদা গুলশানআরা, রুবি রহমান, কাজী রোজি  এদের সাথে সাহিত্য চর্চায় দুর্দান্ত সময় কাটানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় সাহিত্য চর্চা করেছি। তখন আমি দেখেছি আমরা যারা প্রবাসে বসে সাহিত্য চর্চা করি, তাদের লেখাত, দেশে বসে যারা সাহিত্য চর্চা করে তাদের চেয়ে ফেলনা নয় - তাহলে এই বিভেদ টেনে দেওয়া কেন?
নানা কারণে আমরা দেশে থাকতে পারিনি। বাস্তবতার খাতিরে প্রবাসী হয়েছি। কিন্তু তাই বলে এই বিভেদ কেন? একবার কবি রবীন্দ্র গোপ আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনারটা প্রবাসে থাকেন, আপনাদের লেখায় কি দেশের সংঘাত, সংকট এসব ফুটে ওঠে?’ উত্তরে আমি বলেছিলাম, ‘তাহলে আমরা কি প্রবাসে বসে কেবল চাঁদ, ফুল, লতাপাতা নিয়েই লিখি? এরপরপরই দেশের রাজনৈতিক সংঘাত নিয়ে আমার একটি লেখা কবিতা আমি যখন কোন এক সাহিত্যের আসরে পড়েছিলাম, উনি প্রশংসাসূচক মন্তব্যে বলেছিলেন, জুলি আপনার কবিতা যেন কাঁচা লঙ্কা, ভীষণ ঝাঁঝ আছে ভিতরে।’
আসলে প্রবাসী হওয়ার বড় ব্যাথা হলো, যখন আমরা বই বের করতে যাই তখন ভীষণ বঞ্চনা এবং বৈষম্যের শিকার হই। আমি আজ দীর্ঘ ৩৬ বছর যাবৎ সাহিত্য চর্চা করছি।  আমি যদি দেশে থাকতাম তাহলে আমার গ্রন্থের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারত বলে আমি মনে করি। আজকে আমার অগণিত পান্ডুলিপি ঘরে পড়ে আছে। আমার উপন্যাস যুদ্ধ ও নারীসহ অজস্র পান্ডুলিপি ঘরে পরে আছে। সমস্যাটা হলো প্রকাশকদেও কাছ থেকে সহযোগিতার অভাব। তারা যখন শোনে প্রবাসী লেখক, তখন তারা হা করে থাকে পয়সার জন্য। আজ যদি আমি দেশে বসে সাহিত্য চর্চা করতাম তাহলে আমার গ্রন্থের সংখ্যা যেমন বেশি থাকত, তেমনি আমি রয়্যালটি পেতাম। আরেকটা জিনিস উল্লেখ করার মত, প্রবাসে মোটামুটি সবাই লেখে, সবাই কবি। কিন্তু লাইনের পর লাইন লিখলেই, কবি হওয়া যায়না। সত্যিকারের কবি স্বত্তার উম্মেষ যার ভিতরে নেই, তিনি হাজার লিখলেও কবি হতে পারবেন না। কালের বিচারে, যোগ্যতার মাপকাঠিতে, গুণগত প্রকাশের মানদন্ডে যার  সাহিত্য উত্তীর্ন হবে, তিনি সত্যিকারের কবি, সত্যিকারের গল্পকার। তা তিনি দেশি হন আর প্রবাসী হন। আজ আমরা কিটসের কবিতা পড়ি, শেক্সপিয়ারের কবিতা পড়ি, রবীন্দ্রনাথের, জীবনানন্দের কবিতা পড়ি। কেন পড়ি? সেসব কালের পরিক্রমায় উত্তীর্ন তাই। সুতরাং ভুঁইফোড়, সৌখিন কবিদের  ভিড়ে সত্যিকারের কবিরা হারিয়ে যাবে, এটা আমি বিশ্বাস করিনা।


------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

দিমা নেফারতিতি: আপনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার। আবার আপনি একজন গীতিকার। অজস্র গান লিখেছেন আপনি। এবিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই।

জুলি রহমান: সত্যিকার অর্থে গান  দিয়েই আমার লেখা শুরু। ৩৬ বছরের লেখালেখির জীবনে আমার গানের সংখ্যা ঠিক কত আমি জানিনা। আমার গান লেখার সবচেয়ে বড় ক্যানভাস প্রকৃতি । আমি গান লিখেছি আমার কৈশোর থেকে। আমার গ্রামের নাম চাপিল। সেই গ্রামের মাঠ, ঘাট, পথ, প্রান্তর, নদী এসবই আমার গান রচনার নেপথ্যে নাটাই ঘুড়িয়েছিল। বর্তমানে দীর্ঘদিনধরে বাস করছি যুক্তরাষ্ট্রে। এখানে আমি দুটো সময় ঘর থেকে বের হই। যখন পাতা ঝরে, যখন ফুলে কুড়ি আসে। এই দুটো সময় আমার হাজবেন্ডকে বলি আমাকে একটা আনলিমিটেড ট্রাভেল কার্ড দাও। তিনি দেন। তখন আমি ঘরে থাকতে পারিনা। এদেশে পাতা ঝরে অক্টোবর মাসে, আর ফুলে কুড়ি আসে এপ্রিল মাসে। এইদুটো মাস আমি ঘরে থাকতে পারিনা। তখন আপনমনে ঘুরি।  আমি যতটা চিনি এই নিউ ইয়র্ক শহরকে, আমার মনে হয় যারা গাড়ি চালান তারাও বোধহয় নিয়ে ইয়র্ককে এতটা চেনেন না। প্রকৃতিকে দেখার জন্য আমি কখনো বাসে চেপে, কখনো পায়ে হেঁটে এশহরে ঘুড়ি।  আমার সাথে তখন কেউ থাকেনা।  আমি রাখিনা সাথে। তখন আমি কথা বলি নিজের সাথে।  আমি গান করি, আমার গানে সুর করি ওই পথে পথেই। যেমন সেদিন ঝরা পাতার উপর যখন হাঁটছিলাম, পাতারা মচমচ করছিলো, মনে হচ্ছিলো যেন আমি পাতার কান্নার শব্দ শুনছি, কিংবা আমি বাঁশির শব্দ শুনছি। মনে হচ্ছিলো যেন ঝরে পড়া পাতারা আমার সাথে কথা বলছে। আমার সেই অনুভব নিয়ে সাথে সাথে আমি গান রচনা করলাম, তারপর ঘরে ফিরে তা লিখে ফেললাম। এই ৩৬ বছরের সাহিত্য চর্চার জীবনে এ পর্যন্ত অজস্র গান লিখেছি কিন্তু সবগুলো সংগ্রহ করা হয়নি। আজ সেজন্য ক্ষানিকটা অনুতাপ হচ্ছে। এই যেমন সেদিন আমার ঘরের কাছে ক্যাসল হিল পেরিয়ে আমি জেরিগাতে হাঁটছিলাম। সেখানে অপার্থিব নিস্তব্ধতার মধ্যে পথজুড়ে ঝরা পাতার স্তুপ দেখে আমার মনে হলো পাতারা কাঁদছে, এরপর লিখলাম - ‘ঝরাপাতা বলে কথা’ গানটি। এভাবে ঝরা পাতা, তুষারপাত, ঝলমলে রোদ্দুর, কিংবা মুষলধারায় বৃষ্টি - অর্থাৎ প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গের সাথে মিলে জন্ম নেয় আমার গান, আমার কবিতা। ওয়েচেস্টারে ওয়াটার এভিনিউতে একবার আমি গেলাম, তখন খুব বরফ পড়ছিলো, তখন জন্ম নিলো একটা কবিতা। সেটা আমার চার’শ কবিতা সম্বলিত ‘জুলি রহমানের কাব্যগ্রš’’তে আছে। সেই কবিতায় একটা লাইন ছিল এমন - 'পরিব্রাজক পাখিদের কথা।' এখানে অনেকে এটা পড়ে বললেন, শীতের মধ্যে জুলি এত পাখি পেলেন কোথায়? আসলে এটাত সিম্বলিক ওয়ার্ডে লেখা। সাহিত্যের ভাষায় যাকে রূপক বলা হয়। পরিব্রাজক পাখি বলতে এই কবিতায় আমি নানা দেশের মানুষদেও কথা বুঝিয়েছি। তাই সাহিত্য তখনি সত্যিকারের পূর্ণতা পাবে যখন তা সত্যিকারের সমঝদারের কাছে পৌঁছাবে।

দিমা নেফারতিতি: একটি সাংস্কৃতিক আবহমন্ডিত পরিবারে আপনার জন্ম। কবি জুলি রহমানের বেড়ে ওঠায় সেই পারিবারিক আবহ কতটা ভূমিকা রেখেছে?

জুলি রহমান: আমার মা ছিলেন চিত্রশিল্পে ভীষণ পারদর্শী। বাবা পুঁথিতে। একমাত্র মামা ছিলেন ইত্তেফাকের নিয়মিত কলামিস্ট। ফুপাত ভাই নিজাম উদ্দিন মুখে মুখে গীতিকবিতা রচনা করতেন। অনেক ছোটবেলা থেকে তার সেই সুর আমাকে সারাদিন আবিষ্ট করে রাখত। বড়ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারা সেই সাথে কবি।তার কবিতা চুপে চুপে পড়েছি। আমার মেঝু ভাই বাউল চিত্তের ছিলেন ।বই গান এ সবেই ডুবে থাকতেন উনি।বই কেনাই ছিলো তাঁর নেশা।বাড়িতে মা পারিবাড়িক গ্রন্থাগার।আমার ভাইদের কমর্।হরেক রকম বইয়ে সমৃদ্ধ তার লাইব্রেরি। ছোটবেলা থেকেই  ভাই এর বই এর বাগানের আমি ছিলাম নিয়মিত প্রজাপতি। মামাতো ভাই মাসুদ আহমেদ সতীনাথকে চিরতরে কণ্ঠে ধারণ করে নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি একুশে পদকপ্রাপ্ত  প্রথিতযশা গল্পকার। আমার মা মরহুম ফাতেমা খাতুন ছিলে একজন নিভৃত মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরে যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি রেঁধে খাওয়াতেন। তারপর রাতের আধাঁরে মুক্তিযোদ্ধারা চলে গেলে তাদের অস্ত্র হাতের ছবি এঁেক রাখতেন তার নিজের হাতের বানানো মাটির কলসের গায়ে। মা’র ছিল মাটির পটারি বানাবার ঝোঁক। আমাদের গ্রামে বিয়ে শাদীসহ যেকোন পরব - অনুষ্ঠানে আমার মা নানারকম পটারি বানিয়ে সেসবের গায়ে ছবি একেঁ দিতেন। আমার স্বামী ফজলুর রহমান নন্দী এমন একজনা মানুষ, বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত আমাকে নীরবে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে গেছেন। আমি ছোটবেলা থেকেই ভীষণ পড়তাম।  বিয়ের পর যখন শশুরবাড়িতে গেলাম সেখানে রানু নামে আমার এক ভাগ্নি আমাকে শেক্সপিয়ারের বই এনে দিত, বাংলা সাহিত্যের এবং বিশ্ব সাহিত্যের নানান বই এনে দিত। বিয়ের পর পর আমার শাশুড়ি খুব অবাক হয়েছিলেন যে, নতুন বৌ ঘরের দরজায় খিল এটেঁ কবিতা লেখে। তারপর উনি আমাকে অনেক বোঝাতেন, বলতেন, "দেখো তোমাকেত আমি এনেছি আমার ছেলের সংসার দেখবার জন্য। সংসারটা ঠিকমত সামলাও। কবিতা লিখে সময় নষ্ট করে কি হবে। কবিতা লিখেত আর পয়সা পাবেনা ।সেসময় আমি কবিতা লিখেছিলাম, ‘বৌ কেন কবি’ শিরোনামে। তারপর অনেক চেষ্টায় আমি ওনাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম যে, স্কুলের শিক্ষকতার পাশাপাশি সব কর্তব্য ঠিকঠাক পালন করেই আমি কবিতা লিখছি। তাই ওনার চিন্তিত হবার কারণ নেই। একসময় উনি নতি স্বীকার করলেন আমার কবিতারূপী প্রেমিকের কাছে। এরপর নিজেই আত্মীয়-পরিজনদের বলতেন, "আমার বৌমা একজন কবি।"

দিমা নেফারতিতি: আপনার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা কত? নতুন বই কবে প্রকাশিত হবে?

জুলি রহমান: আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৮০ সালে, উপন্যাস রক্তচোষা। এরপর ব্যবধান, বহে রক্তধারা, কাগজের বৌ, ফাতেমার জীবন, শেষের পান্ডুলিপি, ধান পাতা বাঁশি, একজন দলিলুর রহমান, ভূ -গোলক সহ বহু পান্ডুলিপি গ।ন ,প্রবন্ধ নিবন্ধ ,গীতি কাব্য সহ কিছু পুঁথি।এ গুলো সব প্রকাশিতব্য।র্রক্তচোষা করার বিশ বছর আবার করি কাব্য ময়ূরী সময়।বই বের না করলেও অনেক সাহিত্য পত্রের সম্পাদনা ও নিয়মিত লেখালেখি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছেলেখা প্রতিনিয়ত। জলপ্রপাত ,অনিবাস রৌদ্দুর রাইটাসর্ ,সত্যের আলো পত্রিকায় জুলি রহমানের পাতা।  সে সব এখন পীড়া দেয়।
মাঝের এই লেখালেখির সময়টা ছিলো আমার জীবনের চরম দুবর্োদ্ধ সময়।পড়াশোনা বিয়ে চাকুরী লেখালেখি ভীষণ একটা কঠিন সময়ের চড়াই উৎরাই আমার জীবনের।তারপর ও যে লেখাটাকে নিয়মিত পাশে রাখতে পারার আনন্দ ও অনেক নিরানন্দকে  মাটি চাপা দেয়।
১২টি বই প্রকাশিত হয়েছে। আরো অসংখ্য পান্ডুলিপি রয়েছে প্রকাশের অপেক্ষায়। আসছে একুশের বইমেলায় প্রকাশিত হতে যাচ্ছে প্রায় ৩০০ গান এর বিশেষ সংকলন ‘জুলি-গীত।’

দিমা নেফারতিতি: কবি জুলি রহমানের কাছে কবিতার সংজ্ঞা কি?

জুলি রহমান: আমি যখন জীবনের রুঢ়তায় বিধস্ত হই, কবিতা তখন রসের ফল্গুধারার মতই সকল শোকসন্তাপকে ধুয়ে মুছে সাফসুতরো করে দেয়। কবিতা যেমন দুর্বোধ্য আড়াল। জীবনের বাকঁ তেমনি কঠিন মোড়কে আবৃত। আবার জীবন সুখ ও শান্তিময়। নিরন্তর ভাবনার বিস্তার কবিতার শরীর। সৃষ্টির  নোদনায় নান্দনিক কবিতার অবয়ব।

দিমা নেফারতিতি: সবশেষে জানতে চাইব, এই দূর পরবাসে নেই বাংলার মাটি, বাংলার জল। কবি জুলি রহমান দেশকে কোথায় কিভাবে ধারণ করেন?

জুলি রহমান: স্থান কালের সীমারেখায় কবি আবদ্ধ নন। আমি যখন হাডসন নদীর তীর ধরে হাঁটি, তখন হাডসন নয়, আমি অবলোকন করি আমার গ্রামের, আমার শৈশবের চাপিল নদীকে। সেই চাপিল নদীর স্রোতের কলতান নিরন্তর বেজে চলে আমার চেতনার গহবরে। বাংলার মাটি, বাংলার জল আন্দোলিত হয় আমার হৃৎপিন্ডের স্পন্দনে। আমার চোখের তারায় অনুরণিত হয় বাংলার আকাশের নীল আর সবুজ প্রান্তরের সবুজাভ দ্যোতনা। নিভৃতে বাংলার মাটি, বাংলার জল আমাকে প্রতিনিয়ত প্রাণিত করে অবিরাম শব্দের ফুল ফোঁটাতে।


অতলান্তিকের দেশ থেকে ॥ আমেরিকার উৎসব কেনাকাটার কালো-সবুজ রং

মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৬

শরীফা খন্দকার : গাছের সবুজ পাতা যখন শীতের বাতাসে ঝরে পড়েছে তখন চলতি সপ্তাহ শুরুর দিনটি অভিহিত হয়েছে গ্রীন মানডে নামে। লাল নীল সোনালি নানা রঙের কত দিন আছে দুনিয়াময়। দুঃখ বা দুর্দশার সঙ্গে জড়ানো কোন কোন দিনকে লোকে কালো বলেছে। কিন্তু ক্রিসমাস পরবের বিশাল শপিংয়ের জাদুর কাঠি আছে যে শুক্রবারের হাতে তার ভাগ্যে কেন জুটল ব্ল্যাক ফ্রাইডে নাম? হলিডে সিজনে একটি অনলাইন বিক্রির দিন সম্প্রতি যোগ হয়েছে সাইবার মানডে নামে। এর গায়ে কোন রং ছিটানো হয়নি যদিও তবু কেনাকাটার বাজারে তার ঝলক কম নয়। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সবুজ সোমবার দর্শন দিচ্ছে একই পথ ধরে। সবুজকে জীবনের রং, প্রকৃতির রং বলা হলেও গ্রীন মানডে ধরিত্রীর নয়, পরিবেশেরও নয়, পথ ভোলা পথিকের মতো অন্য কারও। হলিডে সিজনে ২০০৯ সাল থেকেই ই   বে নামে খ্যাত মার্কিন মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশন এ্যান্ড ই-কমার্স কোম্পানি গ্রীন মানডেকে বেছে নিয়েছে বছরে তাদের বেচা বিক্রির সেরা দিন হিসেবে। আমেরিকান ইলেকট্রনিক কমার্স এবং ক্লাউড কম্পিউটিং কোম্পানি আমাজানও শামিল হয়েছে।

অর্থশাস্ত্র থেকে আমরা সাধারণ মানুষ টাকার বর্ণ ধলা বা কালা শুনলেও অর্থনীতিতে ঐতিহ্যগতভাবেই ফিন্যান্স, ব্যাংকিং, টাকা এসবের রং হলো সবুজ। আর আমেরিকাসহ অনেক দেশে কাগজের টাকার রংটি সবুজই বটে। ব্ল্যাক ফ্রাইডে ও সাইবার মানডের ব্যবসার পর টার্গেট, ওয়ালমার্ট, বেস্ট বাই ও জেসিপেনির মতো স্বনামখ্যাত চেন স্টোরগুলো পুনরায় বড় আকারের মূল্য হ্রাসে পণ্য বিক্রির দিন হিসেবে নিয়েছে সবুজ সোমবারকে। ব্যবসা সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কম স্কোর’ জানিয়েছে শুরুর দু’বছরের মাথায় বড় দিনের অনলাইন বিক্রি ছিল ১ হাজার ১৩৩ বিলিয়ন ডলার। বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে কেনাকাটার জন্য এ বছরের ব্ল্যাক ফ্রাইডে এবং সাইবার মানডের দিন যারা হারিয়ে ফেলেছেন তাদের জন্য গ্রীন মানডেতে শপিং হতে যাচ্ছে যাকে ফরাসী ভাষায় বলে ‘দে জাঁ বুঁ!’

কালো শুক্রবার আসে যেন রাধিকার কানের শ্রীকৃষ্ণের ঘর ছাড়ানোর বাঁশি হয়ে। তবে ছোটবেলায় শুনেছিলাম গ্রাম দেশের কোন কোন মানুষকে নিশিতে পাওয়ার গল্প। ক্রিসমাসের আলোকজ্জ্বল শহর নগরে সেই গল্প মানুষের জীবনে সত্যি হয়, সে বড় আশ্চর্য কথা। এদেশে বসবাস করতে গিয়ে স্বচক্ষে দেখলাম নিশির ডাকের চাইতে কালো শুক্রবারের ডাক আরও সর্বগ্রাসী। ভোরের সূর্যোদয় অপেক্ষার সময় ক্ষয় করার অবকাশ নেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভূতগ্রস্তদের। বৃহস্পতিবারের টার্কি ডিনারের ভোজ দুপুরেই নম নম সেরে অন্ধকার ঘনাবার আগেই গৃহের বাইরে বেরিয়ে পড়ে লাখো মানুষ। শীতের তীব্রতা, তুষারে আচ্ছন্ন পথ সব তুচ্ছ করে তারা যেন ছুটে যাচ্ছে দিগি¦দিক ভুলে। সে এমন এক এলাহী কা- চোখে দেখলেই কেবল বিশ্বাস যোগ্য। কেউ কেউ আবার নাকি ব্ল্যাক ফ্রাইডের কুহকসম আহ্বানে সাড়া দেয় ক’দিন আগে থাকতেই। গত বছরই তো নাকি তার আগের বছর টিভির খবরে দেখাল- মানুষ সেখানে তাঁবু খাটিয়ে ঘরছাড়া রাতযাপন করেছে প্রায় তেরাত্তির ধরে। সম্ভবত সেবার কিছু টিভি ২৯ ডলারে বিক্রি হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য ছাড়া কোথাও ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে সরকারী মার্কিন ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃত নয়। তা নাইবা থাকল, সওদা পাগলেরা অনেক আগে থেকে কালো দিনের ছুটি নিয়ে রাখে। থ্যাঙ্কস গিভিং ও উইকেন্ডের নিয়মিত ছুটির সঙ্গে পাওনা ছুটি হিসেবে নিয়ে নেয়। বছর দুয়েক আগে চিপেস্ট রিটেলার বলে খ্যাত ওয়ালমার্ট নামের দোকানের দরজা যখন খুলল তখন উন্মাদ ছুটন্ত মানুষের পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন একজন নিরাপত্তা কর্মী। মিডিয়ার খবরে জানা গেলো, হিংসাত্মক ঘটনায় গত ১০ বছরের মধ্যে কেবল প্রাণহানির ঘটনার রিপোর্ট হয়েছে ৭ এবং আহত হওয়ার সংবাদ মিলেছে ৯৮ জনের। কয়েক বছর যাবত ঘটা সহিংসতা এড়াতে এ বছর স্টোরের ভেতর ক্রেতাদের ঢোকানো হয়েছে মাথা গুনে গুনে আর লাইনের ব্যবস্থাটা অনেক দূরে ছিল বলে প্রায় নির্বিঘœ হয়েছে দিনটি।n

ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে বহু বছর ধরে রিটেলাররা ভোর ৬টায় স্টোর খোলার কথা ঘোষণা করতেন। কিন্তু দু’হাজার সাল থেকে কেউ কেউ সকাল ৫ এমনকি ৪ টাতেও খুলে দিতে লাগলেন তাদের দুয়ার। ২০১১ সাল থেকে যখন বিভিন্ন বিক্রেতা কোলস, মেসিজ, বেস্ট বাই ইত্যাদি বিপণন কেন্দ্র মধ্যরাতে খোলা রাখা শুরু করল। কিন্তু শ্রমিকদের ধর্মঘট আহ্বানের কারণে ওয়ালমার্ট ও অন্যান্য কিছু রিটেলার আবার সকাল ৬টায় দরজা খোলা শুরু করল। বড়দিনের মৌসুম উপলক্ষে বেসরকারীভাবে আনুষ্ঠানিক কেনাকাটা শুরুর সূচনা দিন হিসেবে থাঙ্কস গিভিংয়ের পরের শুক্রবারকে ব্ল্যাক ফ্রাইডে হিসেবে নির্ধারণ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তখন দু’হাজার ডলারের টিভি ৫০০তেও পাওয়া বিচিত্র নয়, আবার ৪০০০ ডলারের রেফ্রিজারেটর মিলতে পারে দু’হাজারেও। কয়েক বছর হলো আরও দেখা যাচ্ছে কালো দিনের বিক্রিবাট্টা দখল করে নিয়েছে বৃহস্পতিবার থাঙ্কস গিভিং ডে’র দুপুরটিও। গিন্নিমারা দুপুরে চার ঘণ্টার জন্য ওভেনে মেহমানদারির টার্কি বসিয়ে কাছাকাছি শপিং মলে ছুটছেন । অনলাইন জীবনকে যতই ঘিরে রাখুক আমেরিকার শপিং জাদুতে দোকানে দোকানে ঘুরে আজও কালো শুক্রবার হয়ে আছে অদ্বিতীয়। কারণ, এখনও বহু মানুষ চাক্ষুষভাবে দেখেশুনে কিনতে ভালবাসেন। পরবর্তী সময়ে ফেরত দেয়ার ঝামেলাও থাকে না। ইদানীং আবার দেখা যাচ্ছে আর এক নতুন উপদ্রব। অনলাইনে কেনা দ্রব্যাদি যখন ইউপিএস দিয়ে যাচ্ছে দুয়ারের সামনে আর তখন লোকজন গৃহে উপস্থিত না থাকলে চোরের দল সে সব গাড়ি ভরে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।

বড়দিনের মৌসুম উপলক্ষে আনুষ্ঠানিক কেনাকাটার বেসরকারী সূচনা হিসেবে আসে এই কালো শুক্রবার। কিন্তু ক্রিসমাস উৎসবের তখনও তো মাসখানেক বাকি- তবে কেন এমন উন্মাদ দশা! এর কারণ হচ্ছে কেবল সকালে বিক্রির জন্য কিছু আইটেম অবিশ্বাস্য রকম স্বল্পমূল্যে সেদিন বিক্রি করা হয়। জনপ্রিয় খেলনা ও ইলেকট্রনিক্স দ্রব্যাদিসহ নানান প্রস্তুতকারক দেন অবিশ্বাস্য রকম মূল্য ছাড়। কোথাও ৭০ কিংবা ৮০% তার সঙ্গে রয়েছে কুপন ও গিফট কার্ড, সব মিলিয়ে কখনও কখনও জলের দাম। আমাদের দেশে পরব এলে ধনী, গরিব নির্বিশেষে সামর্থ্য অনুযায়ী কেনে জামা কাপড় ও খাবারদাবার। কিন্তু এদেশে সামর্থ্যবানরা কেনে মোটরগাড়ি, কম্পিউটার, আসবাবপত্র, বিছানা, বালিশ, খেলনা, রান্নার হাঁড়িপাতিল, লেপ-তোষক, রেফ্রিজারেটর, ইলেক্ট্রনিক্স ইত্যাদি! দেশে শুনতাম, মাগনা পেলে মানুষ নাকি আলকাতরাও খায়। এদেশে অভিজ্ঞতা হলো সেলে পেলে কিছু মানুষ আলকাতরা অর্থাৎ খামোখা জিনিসও কেনে। ক্রিসমাসের লাল সবুজ বর্ণকে উপেক্ষা করে আলো ঝলমলে এমন বর্ণাঢ্য দিনটির নাম কেন দেয়া হলো ব্ল্যাক ফ্রাইডে সে প্রশ্ন কেউ তুলতেই পারেন। অভিবাসী জীবন শুরুতে সেটা আমরাও ভেবেছিলামÑ সবচেয়ে বড় পরবের এমন দিনের রং কালো বলে খ্যাত হলো কেন। প্রবাসী জীবনের অনেকটা বছর পার করে শুক্রবার দিনের কালো রংয়ের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছিল আর সঙ্কুচিত হয়েছিলাম নিজের জ্ঞানভা-ারের তুচ্ছতায়। প্রখ্যাত বাংলা সাহিত্যিক অসুস্থ হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যর আগে নিউইয়র্ক থেকে দেশের পত্রিকান্তরে পাঠানো একটি লেখায় পড়েছিলাম : এদেশে শনিবার ইহুদীর, রবিবার খ্রীস্টানের এবং শুক্রবারটি মুসলমানদের হওয়ার কারণে শুক্রবারের রং দেয়া হয়েছে কালো। বিদেশ বিভুঁইয়েও এখন প্রচুর পরিমাণে ধর্মান্ধ স্বদেশী মুসলিমের বাস এবং নিশ্চিতভাবে তারাই তাকে এমন তথ্যটি দিয়েছিল। আসলে ব্যবসা বা টাকার কোন ধর্ম থাকে না সেটি চলে মুনাফার আলাদা ধর্ম মতে। পুরনো ব্যবসাদার মানুষ জানেন, তাদের হিসাবের খাতায় মুনাফার অঙ্ক আদিকাল থেকে কালো কালি দিয়ে লেখা হয়েছে লাভের অঙ্ক এবং লাল কালি দিয়ে লেখা অঙ্কগুলো ক্ষতি হিসেবে। প্রকৃতঅর্থে ১৮১৯ সালে ওয়ালস্ট্রিটের স্বর্ণ বাজারকে দু’জন ফাটকাবাজ কর্তৃক ধ্বংস করার একটি বৃহৎ চক্রান্ত ব্যর্থ করে বিপর্যয়ের হাত থেকে উর্ধমুখী করা হয়েছিল নবেম্বরের এই শুক্রবারে। তারপর থেকেই হলিডে বাজারে এমন দিনকে ব্ল্যাক ফ্রাইডে নামে স্মরণীয় করে রাখা হয়।

আমাদের অভিবাসী জীবনের মাস দুয়েকের মাথায় আমেরিকায় এসেছিল উৎসবের মরশুম। তীব্র শীতের অনুভবে এক বন্ধুজনের বাড়িতে টার্কি পাখির রোস্ট ভোজনের মধ্য দিয়ে পেয়েছিলাম এক অজানা-অচেনা থ্যাঙ্কস গিভিং ডে। ইতিহাস অনুসারে, ১৬২০ সালে মে ফ্লাওয়ার নামে এক জাহাজে ইংল্যান্ড থেকে টেমস নদী পাড়ি দিয়ে আগত ইমিগ্র্যান্টরা আটলান্টিকের কূলে পৌঁছে ধন্যবাদ দিয়েছিল পরমেশ্বরকে। কিন্তু এরপর স্থানীয়দের সঙ্গে বছরভর বিবাদবিসংবাদ ও যুদ্ধের কারণে তাদের জীবনে এসেছিল অনাহার মৃত্যু। ফলে বাধ্য হয়ে তারা একটি চুক্তিতে পৌঁছে আদিবাসীদের কাছ থেকে শিখে নিল কী করে ফসল ফলাতে হয়, শীতকালের জন্য সেগুলো সংরক্ষণ করতে হয়। পরবর্তী বছর শস্যের প্রচুর উৎপাদনের পর তারা রেড ইন্ডিয়ান নেতাদের জন্য আয়োজন করল একটি ধন্যবাদ বিনিময় ভোজ এবং যার মূল খাদ্য ছিল টার্কি নামক জঙ্গলের সহজলভ্য পাখির সঙ্গে উৎপাদিত শস্যের আহার। বাংলাদেশে বনবাদাড়ে যখন প্রচুর পাখি বাস করত তখন এই টার্কি পাখিটিকে বাঙালীরা চিনত তিতির কিংবা বন মোরগ নামে। আমেরিকার স্বাধীনতার পর ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেয়ার জন্য সেই দিনটিকে থাঙ্কস গিভিং ডের ফেডারেল হলিডে হিসেবে বেছে নেয়া হলো। প্রতিবছর নবেম্বর মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার থাঙ্কস গিভিং ডের টার্কি বার্ড ভোজের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয় ক্রিসমাসের আলোর দিনে।

আমার জেনারেশনের মার্কিন বাঙালীদের উৎসবের ভোজ্যদ্রব্য সাধারণত পোলাও-কোর্মা, বিরিয়ানি, কাবাব ইত্যাদি। থ্যাঙ্কস গিভিং ডে উপলক্ষে সঙ্গে টার্কি রোস্ট অবশ্যই হয়। কিন্তু ধন্যবাদ দিনের ডিনারে অন্য আমেরিকানরা কী খান কারও জানবার সাধ হতেই পারে। টার্কি পাখির রোস্ট তো রইলই কিন্তু সঙ্গে আর কী কী? আমার নতুন প্রবাসী জীবন থেকে এক সহকর্মীর উচ্ছ্বসিত বৃত্তান্তটি শোনাই। থ্যাঙ্কস গিভিংয়ের পরদিন অফিসে বসে তার আন্টের বাড়ির ডিনারের বয়ান করছিল সে। আর আমি কান পেতে অতি আগ্রহে সেটি শুনছিলাম। -‘দে হ্যাড এভরিথিং, এভরিথিং ...! মাই আন্ট কুকড দ্য টার্কি রোস্ট, উই কুকড ম্যাকারনি এ্যান্ড চিজ- অন্যরা কেউ এনেছিল মেশ পটেটো এ্যান্ড গ্রেভি, কেউ এনেছিল সেদ্ধ ভুট্টা, মিষ্টি আলু, সুইট পটেটো পাই ...।’

সেদিন মুজতবা আলীর দেশে বিদেশের এক গল্প মনে পড়েছিল। লন্ডনে বাড়িওয়ালীর কন্যা ও জামাতা আসছে। দেশের কোন এক পিসির জামাই আপ্যায়নের স্মৃতি নিয়ে তিনি ভাল-মন্দ খাবার আশায় ঘুর ঘুর করছিলেন রান্নাঘরে- কী রাঁধছ আজ জামাইয়ের জন্য?

শাশুড়ির উত্তর ছিল মজাদার- নতুন কি আর, প্রতিদিন যা রাঁধি। শুধু বেশি করে কিছু আলু সেদ্ধ দিলাম। বেটা আবার আলুটা খুব ভালবাসে তো! দেখ খাবার সময় তোমাকে খুব সতর্ক থাকতে হবে নইলে তোমার ভাগেরটাও ও কিন্তু মেরে দিতে পারে!

রসিকতা করে এই গল্পটা বললাম ঠিকই আসলে ওগুলোই ঐতিহ্য অনুসারে ধন্যবাদ দিনের খাবার!

লেখক : নিউইয়র্ক প্রবাসী


মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিতর্ক = সিরাজী এম আর মোস্তাক

সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০১৬

কে মুক্তিযোদ্ধা, কে অমুক্তিযোদ্ধা চলছে মহাবিতর্ক
কেহবা পাচ্ছে মহামূল্য স্বার্থ।
যুদ্ধকালে দেশে ছিল সাড়ে সাত কোটি নাগরিক
শুধু দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা, অন্যরা বিপরীত।
ত্রিশ লাখ শহীদ, দুই লাখ নারী পায়নি মুক্তিযোদ্ধা কোটা
তালিকায় নেই বঙ্গবন্ধু, ওসমানী ও চার নেতা।
মুুক্তিযোদ্ধা তালিকাটি ত্রিশ লাখ এক থেকে সূচণা
দুই লাখ মা-বোন পেয়েছে বঞ্চণা।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোটা, বৈষম্য আর বিভাজন
সকল বিতর্কের কারণ।
পাকিস্তানী সেনারা খুনি যুদ্ধাপরাধী নয়, বাংলাদেশীরাই তা
আন্তর্জাতিক আদালতে পেয়েছে সাজা।
যুদ্ধাপরাধী প্রজন্ম এখন বাংলাদেশের ষোল কোটি নাগরিক
হয়তো যুদ্ধাপরাধী ছিল ত্রিশ লাখ শহীদ।
বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিতর্ক চরমে উঠেছে। তার প্রভাব পড়েছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়,  মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় এবং দেশের সকল চাকুরি ক্ষেত্রে। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনি এবং অমুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্ততির মাঝে চলছে লড়াই। অমুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরা যথেষ্ট মেধা ও যোগ্যতা সত্ত্বেও কোটাভোগী মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের কাছে হার মানছে। অমুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম পরীক্ষায় শতকরা পচাত্তুর বা আশি পেয়েও বঞ্চিত হচ্ছে আর কোটাধারীরা মাত্র চল্লিশ পেয়েই মহামুল্য স্বার্থ হাসিল করছে। বাংলাদেশে মাত্র দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার শতকরা ত্রিশ ভাগ কোটাসুবিধা পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, আজ পর্যন্ত ত্রিশভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পালনে যত বাদ পড়েছে, তাও পুরণ করা হচ্ছে। যেমন ধরুন, একটি প্রতিষ্ঠানে এযাবৎ একশত লোক নিয়োগ হয়েছে। তাতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় কমপক্ষে ত্রিশজন নিয়োগের কথা ছিল। হয়তো কারণবশত: দশজন নিয়োগ পেয়েছে। অর্থাৎ বিশজন বাদ পড়েছে। উক্ত প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে পচিশটি পদ খালি হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রথমে বিগত ঘাটতি পুরণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটাতেই নিয়োগ হচ্ছে। একইভাবে চলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি এবং সকল চাকুরির নিয়োগ প্রক্রিয়া। ফলে কোটি কোটি অমুক্তিযোদ্ধা সন্তান এখন অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা টের পাচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিতর্ক কাকে বলে!
এবছর (২০১৬) মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা প্রকাশ হয়েছে। বলা হয়েছে, ১৯৭১ এর ২৬ মার্চে যাদের বয়স ন্যুনতম তের বছর ছিল তারা মুক্তিযোদ্ধা। তবে সবাই নয়। যারা বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, দেশ ছেড়েছিল এবং ভারতের লাল বইতে নাম তুলেছিল তারা মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে গিয়েছিল প্রায় এক কোটি শরণার্থী, তবে তারা মুক্তিযোদ্ধা নয়। যুদ্ধকালে সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালির যারা দেশে ছিল, তারাও মুক্তিযোদ্ধা নয়। তারা ত্রিশ লাখ শহীদ, দুই লাখ সম্ভ্রমহারা নারী, অমুক্তিযোদ্ধা. রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ইত্যাদি। তেমনি দেশে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী, বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, আদরের কন্যা দেশনেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার স্বামী প্রয়াত ড. ওয়াজেদ মিয়াও মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত নন। তারা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারভুক্তও নন। কারণ স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর নামও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নেই। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে বন্দি ছিলেন। তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের স্থপতি ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, তবে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা নন। বঙ্গবন্ধুর মতো জাতীয় চার নেতা ও সেনাপ্রধান এম.এ.জি ওসমানীও মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত নন। তাদের পরিবারও মুক্তিযোদ্ধা কোটাভুক্ত নয়। এভাবে অসংখ্য লড়াকু মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-সন্ততি স্বীকৃতি বঞ্চিত। মুক্তিযোদ্ধাদের অনেককে স্বীকৃতি বা তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছিল। তারা বলেছিল, জীবনপণ লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছি; এখন মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির জন্য আবেদন করবো কেন? আমরা কি অমুক্তিযোদ্ধা? আজও তার সদুত্তর মেলেনি।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু এদেশের সকল নাগরিককে স্পষ্টভাবে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেন। (১০ জানুয়ারী, ১৯৭২ তারিখে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য দ্রষ্টব্য)। যুদ্ধরীতি অনুসারে মাত্র ৬৭৬ জন যোদ্ধাকে তিনি বিশেষ খেতাব দেন ও বীর ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু নিজেও বন্দী হিসেবে একজন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দেন। এভাবে জাতীয় চার নেতা, এম.এ.জি ওসমানী এবং অগণিত লড়াকু যোদ্ধাগণ খেতাবের তোয়াক্কা না করে তারাও সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দেন। ফলে বঙ্গবন্ধুর সময়ে দেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজন ছিলনা। ছিলনা কোটাসুবিধাও। বঙ্গবন্ধু সবাইকে সমান বিবেচনা করে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করেছেন।
বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সে আদর্শ আর নেই। মুক্তিযোদ্ধা-শহীদ পার্থক্য শুধু নয়; মুক্তিযোদ্ধা, অমুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ জনতা, রাজাকার, আলবদর, আল-শামস্, যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতা বিরোধীশক্তি প্রভূতি বহু বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতে পাকিস্তানি খুনী ও ঘাতকদের পরিবর্তে শুধু বাংলাদেশীরা যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছে। ফাঁসি এবং যাবজ্জীবন সাজাও হয়েছে। এতে প্রমাণ হয়েছে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানবাহিনী হত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাট করেনি, বাংলাদেশীরাই তা করেছে। আর শুধু দুই লাখ তালিকাভুক্ত বা কোটাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাগণই দেশ স্বাধীন করেছেন। ত্রিশ লাখ শহীদেরও কোনো ভূমিকা নেই। শহীদের সংখ্যাটি প্রচারের জন্য মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ত্রিশ লাখ এক থেকে শুরু হয়েছে। শহীদদের পরিচয়, তালিকা, পরিবার-পরিজন এবং মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি কিছুই নেই। মুক্তিযোদ্ধা তালিকা দু’লাখই চুড়ান্ত। যদিও তাতে বঙ্গবন্ধু, চার নেতা, এম.এ.জি ওসমানী এবং অগণিত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম নেই। তবে কি তারা অমুক্তিযোদ্ধা?
বলা হয়, শুধুমাত্র নি¤œ শ্রেণীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা বা কোটা-সুবিধা দেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু, চার নেতা, এম.এ.জি ওসমানী, লাখো শহীদ, সম্ভ্রমহারা নারী এবং স্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা বা কোটার প্রয়োজন নেই। তারা উচু স্তরের মুক্তিযোদ্ধা। এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের উচু স্তর ও নি¤œ স্তরে ভাগ করা হয়েছে। উচু স্তরের মুক্তিযোদ্ধাগণ শুধু মুখে মুখেই। তাদের সন্তান-সন্ততিও জানে না, তারা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারভুক্ত কিনা। শুধুমাত্র নি¤œস্তরের মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তান-সন্ততি এককভাবে ভোগ করছে মুক্তিযোদ্ধা কোটা। পাচ্ছে চাকুরি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও সকল সুযোগ-সুবিধা। আর উচুস্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্ততি বিবেচিত হয়েছে অমুক্তিযোদ্ধা। এতে বিঘিœত হয়েছে স্বাধীনতা চেতনা। তাই কোনো পরাশক্তির বিরূদ্ধে আবার যুদ্ধ বাধলে হয়তো দেশের কেউ প্রাণ দিতে এগিয়ে যাবেনা। তারা শিক্ষা নেবে ৭১-এর লাখো শহীদ, আত্মত্যাগী নারী ও অগণিত মুক্তিযোদ্ধাদের বঞ্চণা থেকে। যে দেশে সর্বাত্মক যুদ্ধের পরও মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজন হয়, সে দেশে ঐক্যবদ্ধ জাতি সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিতর্ক একটি জাতীয় বিষয়। এ বিতর্ক দূর করতে প্রয়োজন সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও ত্যাগ। গ্রহন করতে হবে একটি সমন্বিত ভিত্তি। তা হতে পারে এমন ঃ
১.  বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙ্গালি জাতির জনক এবং স্বাধীনতার স্থপতি মনে করে। অর্থাৎ দেশের সবাই তার সন্তান-সন্ততি বা তার আদর্শের ধারক-বাহক। বঙ্গবন্ধুর চেয়ে বড় মুক্তিযোদ্ধা কে আছে? তবুও বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় বঙ্গবন্ধুর নাম নেই। সুতরাং তার সন্তানদের মাঝেও মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজন কাম্য নয়। অর্থাৎ দেশের সবাই মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম, কেউ অমুক্তিযোদ্ধা নয়।
২.  একথা সুবিদিত যে, ১৯৭১ সালে ত্রিশ লাখ প্রাণ হারিয়েছে। তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা ধরে বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা তালিকাটি ত্রিশ লাখ এক থেকে শুরু হয়েছে। এরপরও মাত্র দুই লাখ পরিবার মুক্তিযোদ্ধা কোটা পাচ্ছে। অর্থাৎ শহীদগণ মুক্তিযোদ্ধা নয়। তারা মুক্তিযোদ্ধা হলে, ষোল কোটি নাগরিকের কে শহীদ পরিবারের সদস্য নয়; তা নির্ণয় করা কঠিন। তাই শহীদদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিতর্ক বন্ধ করা উচিত।
৩.  আমরা জানি, ১৯৭১ সালে দুই লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে। তাদের আত্মত্যাগ অপরিসীম। অথচ তারা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ কোনো তালিকাতেই নেই। তবে কি স্বাধীনতাযুদ্ধে তাদের অবদান নেই? বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্যে সম্ভ্রমহারা নারীর সংখ্যা দুই লাখ সুনির্দিষ্ট করেছেন এবং তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়েছেন। ৭১-এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালির মধ্যে দুই লাখ সংখ্যাটি কম নয়। সে হিসেবে বর্তমান ষোল কোটি নাগরিকের কেউ তাদের পরিবারের বাইরে নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিতর্ক ও বিভাজন সমীচীন নয়।
শিক্ষানবিস, ঢাকা।
সৎসড়ংঃধশ৭৮৬@মসধরষ.পড়স.
 


রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে মায়ানমার = ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম

সোমবার, ২১ নভেম্বর ২০১৬

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের মায়ানমার সরকারের গণহত্যা, অত্যাচার-নির্যাতন ও বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করে দেশ থেকে বিতাড়িত করা বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য জাতিসংঘ ও ওআইসিসহ সব আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং শান্তিকামী বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র।   

মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর গুলীতে ৬৯ জন রোহিঙ্গা মুসলমান নিহত ও বহু লোক আহত হওয়ার নির্মম ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে  এক বিবৃতিতে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও রাজনীতিবিদ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র'র প্রতিষ্ঠিতা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম I

ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম বলেন, মায়ানমারে মুসলমানদেরকে হত্যা ও বহু লোককে আহত এবং শত শত ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে বসতবাড়ি থেকে বিতাড়িত করে মুসলমানদের হৃদয়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে যা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনেরও শামিল। মায়ানমার সরকারের পরিচালিত এ হত্যাকাণ্ড গণহত্যার শামিল।

ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম, মুসলমানরা যখন বাঁচার জন্য ঘুরে দাড়াতে চেষ্টা করে তখন তাদের সন্ত্রাসী বা জঙ্গি আখ্যায়িত করতে দ্বিধা করে না। কোথায় জাতিসংঘ ? কোথায় মানবাধিকার সংস্থা ? রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা কি তাদের বিবেককে তাড়িত করে না?

তিনি বলেন, গত তিন যুগ আগে মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিতাড়িত করে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করেছিল। তাদের আজ পর্যন্ত মায়ানমার সরকার দেশে ফিরিয়ে নেয়নি। সাম্প্রতিক মায়ানমার সেনাবাহিনীর হামলায় কমপক্ষে ৪ শত রোহিঙ্গা মুসলমান গৃহহীন হয়ে পড়েছে।

তিনি আরো বলেন, এ মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে মায়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। বিশ্ব মুসলিমকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাই।

এ হত্যাযজ্ঞ বন্ধে এগিয়ে আসার জন্য  বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র'র প্রতিষ্ঠিতা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম জাতিসংঘ ও আইসি এবং সকল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও শান্তিকামী বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানান।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর।
মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের জন্য বাংলাদেশ যেন নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে সেসম্পর্কে বলেছে সংস্থাটি।
এদিকে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমার সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে আজ আরো তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
ইউএনএইচসিআর এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। মিয়ানমারের সরকারকে সেখান মানুষদের নিয়ম অনুযায়ী রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সাথে সেখানকার সহিংস পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে যারা বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছে তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার যেন নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে সে বিষয়ে আহ্বান জানিয়েছে।
গত ৯ই অক্টোবর মিয়ানমারের রাখাইন সীমান্ত চৌকিতে এক হামলার জের ধরে অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। এর পর থেকেই সেখান থেকে নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশের টেকনাফে ঢোকার চেষ্টা করে অনেকে। মিয়ানমারের মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন প্রদেশের গ্রামগুলোতে ৯ই অক্টোবরের পর অন্তত ৬৯ জনকে হত্যা করার কথা স্বীকার করে দেশটি সেনাবাহিনী। রাখাইন প্রদেশে সম্প্রতি শুরু হওয়া বিদ্রোহ দমনের অংশ হিসেবে এই অভিযান চালানো হয়েছে বলে উল্লেখ করছে সেনাবাহিনী।

মিয়ানমারে ৯ রোহিঙ্গাকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা


বিবৃতিতে ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম বলেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যুগ যুগ ধরে সে দেশের সরকার চরম জুলুম-নির্যাতন চালাচ্ছে। বার্মার  রোহিঙ্গা মুসলমানের কান্নায় পৃথিবীর আকাশ ভারী হয়ে উঠছে। মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুরা বাচাঁও বাচাঁও বলে আর্তচিৎকার করছে। মায়ানমারের বর্বর সরকার তাদের উপর নির্যাতনের স্টীম রোলার চালাচ্ছে। হত্যা করছে অসংখ্য নিষ্পাপ শিশু, যুবক, বৃদ্ধাদেরকে। ধর্ষণ করে কলঙ্কিত করছে অসংখ্য মা-বোনদের। বিধবা করছে হাজারো নারীদের। সন্তানহারা করছে অসংখ্য মাকে। স্বামীহারা করছে অসংখ্য স্ত্রীকে। ভাইহারা করছে অসংখ্য বোনকে। মজলুম রোহিঙ্গা মুসলমানদের আহাজারীতে পৃথিবীর আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠছে। কোথায় আজ বিশ্ব মুসলমানদের সহযোগীতা ও ভ্রাতৃত্বের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ও.আই.সি। নীরব কেন আজ মানবধিকার সংস্থা? নিশ্চুপ কেন জাতিসংঘ?।  গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এভাবে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। নিজ দেশে থাকতে না পেরে তারা বাঁচার আশায় থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় সমুদ্র পথে নৌযানে পাড়ি জমাচ্ছে। নৌযান ডুবে তারা সাগরের পানিতে ভাসছে ও ডুবে মরছে। সাগরে ভাসতে ভাসতে শুধু রোহিঙ্গা মুসলমান মরছে না, মানবতারও মৃত্যু হচ্ছে। তাদের বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসা সকলের মানবিক দায়িত্ব।

পৃথিবীতে দেড়শ কোটি মুসলমান থাকার পরও কেন দেশে-দেশে মুসলমানরা আজ নির্যাতিত? মুসলমানগণ কি আমাদের কেউ নয়? বর্তমানে রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার-নির্যাতন চালাচ্ছে মায়ানমার সরকার। মুসলিম জনগণের ওপর সামরিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, অমানবিক এবং অবৈধ, নৃশংস হত্যাকান্ডের মাধ্যমে মুসলমান শুন্য করার খেলায় মেতে উঠেছে। নিরীহ রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর এ নৃশংস বর্বরতার নিন্দা জানানোর ভাষা অভিধানে আজ পরাজিত! রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতন এটা পরিষ্কার করে দিয়েছে যে গোটা বিশ্বের অমুসলিম শক্তি আজ মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। আমরা এখনও নিশ্চুপ! রোহিঙ্গা মুসলমানদের কিই বা দোষ ছিল, যার কারণে তারা আজ নির্মম-জুলুম নির্যাতন ভোগ করতে হচ্ছে? কারণ একটাই ওরা যে মুসলমান। ধর্মীয় পার্থক্য ও বৈপরিত্যের কারণেই রোহিঙ্গাদের উপর মায়ানমারের সামরিক জান্তা, প্রশাসন ও বৌদ্ধ এবং সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠিরা তাদের উপর সীমাহীন জুলুম চালাচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে রোহিঙ্গারা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভাগ্যাহত জনগোষ্ঠি। শত শত বছর ধরে তারা নির্যাতিত ও নিপিড়ীত হচ্ছে। নির্যাতনের চিত্রগুলো বিশ্বমিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে। মজলুম রোহিঙ্গাদের বিভৎস চেহারাগুলো দেখে কার চোঁখ না অশ্রুসিক্ত হবে? আপনার সামনে আপনার ভাই-বোন, মা-বাপ, ছেলে-মেয়েদের যদি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে, শরীরের উপর কামান তুলে মাথার মগজ বের করে ফেলে, চোঁখের সামনে তাজাদেহ দ্বিখন্ডিত করে ফেলে তখন আপনার কেমন লাগবে? আহ! বার্মার মুসলমানদের সাথে তাই করা হচ্ছে! জাতিসঙ্ঘ রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে বিশ্বের সবচেয়ে বর্বর নির্যাতনের শিকার জনগোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করেছে। রোহিঙ্গা পরিচিতি? বর্তমান মিয়ানমারের রোহিং (আরাকানের পুরনো নাম) এলাকায় এ জনগোষ্ঠীর বসবাস। ওরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত। ইতিহাস ও ভূগোল বলছে, রাখাইন প্রদেশের উত্তর অংশে বাঙালি, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। রাখাইনে দুটি সম্প্রদায়ের বসবাস ‘মগ’ ও ‘রোহিঙ্গা’। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মগের মুল্লুক কথাটি বাংলাদেশে পরিচিত। দস্যুবৃত্তির কারণেই এমন নাম হযেছে ‘মগ’দের। এক সময় তাদের দৌরাত্ম্য ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। মোগলরা তাদের তাড়া করে জঙ্গলে ফেরত পাঠায়। রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে একটি প্রচলিত গল্প রয়েছে এভাবে যে সপ্তম শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওযা একটি জাহাজ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন উপকূলে আশ্রয় নিয়েবলেন, আল্লহর রহমে বেঁচে গেছি। এই রহম থেকেই এসেছে রোহিঙ্গা।তবে,ওখানকার রাজসভার বাংলা সাহিত্যের লেখকরা ঐ রাজ্যকে রোসাং বা রোসাঙ্গ রাজ্য হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানগণ বিশ্বের সবচেয়ে ভাগ্যাহত জনগোষ্ঠী। এককালে যাদের ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি এখন তারাই সন্ত্রাসী বৌদ্ধদের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার। মিয়ানমারের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বিড়ম্বনার ইতিহাস যে কাউকে তাড়িত করবে। এই উপমহাদেশ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে কয়টি এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে, আরাকান তার মধ্যে অন্যতম। রোহিঙ্গারা সেই আরাকানী মুসলমানের বংশধর। এক সময় আরাকানে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসন দুইশ বছরেরও অধিককাল স্থায়ী হয়। ১৬৩১ সাল থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ হয়। এরপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। ১৬৬০ সালে আরাকান রাজা থান্দথুধম্মা নিজ রাজ্যে আশ্রিত মোঘল সম্রাট শাহজাদা সুজাকে সপরিবারে হত্যা করে। এরপর শুরু হয় মুসলমানের উপর তার নিষ্ঠুর অমানবিক অত্যাচার নিপীড়ন। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর মুসলমানদের কাটাতে হয় এই দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে। ১৭৮০ সালে বর্মী রাজা বোধাপোয়া আরাকান দখল করে নেয়। সেও ছিল ঘোর মুসলিম বিদ্বেষী। বর্মী রাজা ঢালাওভাবে মুসলিম নিধন করতে থাকে। ১৮২৮ সালে বার্মা ইংরেজদের শাসনে চলে যায়। তবে ১৯৩৭ সালে বার্মা স্বায়ত্তশাসন লাভের পর বৌদ্ধদের পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক রূপ নেয় এবং তারা প্রায় ৩০ লাখ মুসলিম হত্যা করে। শত শত বছর ধরে তারা মিয়ানমারে বাস করে এলেও মিয়ানমার সরকার তাদেরকে সেদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। বলা হয় এরা বহিরাগত। ইতিহাস অনুসন্ধানে দেখা যায় এই উপমহাদেশ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সর্ব প্রথম গড়ে উঠা মুসলিম বসতি ওয়ালা প্রদেশের মধ্যে বর্তমানের আরাকান তথা রাখাইন প্রদেশ ছিল উল্লেখ যোগ্য। ১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আরাকানের স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র। ২০০ বছরের বেশি সময় সেটা ছিল স্থায়ী। ১৬৩১ থেকে ১৬৩৫ পর্যন্ত আরাকান রাজ্য এক কঠিন দূর্ভিক্ষ দেখা দেয়। আর এই দূর্ভিক্ষই আরাকান থেকে মুসলিম প্রশাসকের পতন ঘটে। ১৯৮১ সালে মিয়ানমারের সামরিক শাসনকর্তা আরাকান রাষ্ট্রের নাম পরিবর্তন করে রাখাইন প্রদেশ করে, এটা বুঝানো উদ্দেশ্য যে, এ রাজ্য বৌদ্ধ রাখাইন সম্প্রদায়ের, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নয়। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেয় এবং সরকারিভাবে তাদেরকে সেখানে ‘বসবাসকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাদের ভোটাধিকার নেই। নেই কোন সাংবিধানিক ও সামাজিক অধিকার। নিজ দেশে পরবাসী তারা। তারা মিয়ানমারের অন্য প্রদেশে অনুমতি ছাড়া যেতে পারে না। এক সময় যেখানে রোহিঙ্গারা ছিল সংখ্যাগুরু আজ সেখানে তারা সংখ্যালঘু। বড় আফসোস! আজও রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার। বার্মা বা মিয়ানমার দেশটির রাখাইন রাজ্যে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে এবং তাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে আসা বাঙালি অভিবাসী বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। রাখাইন রাজ্যে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করে। তাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকারকে অস্বীকার করছে মিয়ানমার সরকার। বর্তমানে লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু শিবিরে আটক অবস্থায় রয়েছে। মায়ানমারের সামরিক জান্তা তার অধিবাসী মুসলমানদের জন্য সে দেশকে জাহান্নামের অগ্নিকুন্ডে পরিণত করেছে। তাদের থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে উপার্জিত সব সম্পদের মালিকানা, নাগরিক অধিকার, মানবিক অধিকার, এমনকি বেঁচে থাকার অধিকারও। তাই তারা সমূহ বিপদের কথা জানার পরও মরিয়া হয়ে ছুটছে একটুখানি নিরাপদ ঠিকানার সন্ধানে।
আরাকানের বর্তমান অবস্থা
মিয়ানমারের পশ্চিমা প্রদেশ আরাকান (রাখাইন) আবার জ্বলছে। স্বাধীন আরাকান রাজ্যের পুরোনো রাজধানী ম্রাউক-উ-তে চলছে বৌদ্ধ রাখাইনদের মিছিল। মিছিল চলছে জীপগাড়ি, মোটরসাইকেল, রিক্সা, টুক-টুক কিংবা সাইকেলে চড়ে – কিন্তু সবচেয়ে বেশী লোক চলছে পায়ে হেঁটেই। তাদের সাথে আছে বর্শা, তরবারী, ধামা, বাঁশ, গুলতি, তীর-ধনুক এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে পেট্রোল বোমাও। তাদের লক্ষ্য – নিরস্ত্র রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী। ঐ মিছিলেই জনৈক বৌদ্ধ সন্ত্রাসীকে গলা-কাটার মতো ভয়াবহ ইশারা-ইঙ্গিত করতে দেখা যায় (যুক্তরাজ্যের দি ইকনমিস্ট; ৩-রা নভেম্বর, ২০১২)।
দুঃখের বিষয় এই যে ম্রাউক-উ’ই একমাত্র শহর নয় যেখানে রোহিঙ্গা মুসলিমরা পরিকল্পিত গণহত্যার মুখোমুখি। মিয়ানমারের ভেতর থেকে পাওয়া খবর থেকে জানা যাচ্ছে যে স্থানীয় সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার, পুলিশ ও নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনীর মদদে রাখাইন বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিত ভাবে প্রতিটি রোহিঙ্গাকে বার্মা (মিয়ানমার) থেকে বের করে দেয়ার অভিপ্রায়ে গণহত্যার উন্মাদনায় মেতে উঠেছে। এই নির্মূলাভিযান এমনই ভয়াবহ ও নৃশংস যে, পরিকল্পিত হিংস্রতা লুকিয়ে রাখার স্বগত প্রবণতা থাকা বর্মী রাষ্ট্রপতিও শুক্রবার, ২৬-শে অক্টোবর, স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ৮টি মসজিদ সহ ২০০০ রোহিঙ্গার ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে (সূত্র: বার্মিজ সরকারপন্থী পত্রিকা, the New Light of Myanmar)। এই সপ্তাহে তার মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন, “রাখাইন প্রদেশে পুরো গ্রাম কিংবা আংশিক নগর পুড়ে ভস্মীভুত হবার মতো ঘটনা ঘটেছে।” বলার অপেক্ষা রাখেনা যে আসল সংখ্যা ও বাস্তবতা আরো অনেক ভয়াবহ।

আশংকা করা হচ্ছে যে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ৫০০০ রোহিঙ্গার বসতি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) থেকে তোলা ছবিতে সমুদ্র উপকূলবর্তী শহর চিয়াউকফুর (Kyaukphyu) মুসলিম অধ্যুষিত অংশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ দেখা যায় (১, ২)। এই শহর থেকেই তেল ও গ্যাসের পাইপ-লাইন বার্মা থেকে চীনে যাবার কথা। সাম্প্রতিক এই গণহত্যার আগ্রাসনের সময় মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম ও শহরাংশে তাদের আঁটকে রেখে আগুনের গোলা ছোঁড়া হয়। মৃত্যু আতংকে পালাতে চেষ্টা করা মুসলিমদের উপর রাখাইন বৌদ্ধ সন্ত্রাসী ও সরকারের মধ্যে তাদের পৃষ্ঠপোষকরা চালায় নির্বিচার গুলিবর্ষণ। বর্ণবাদী রাখাইন রাজনীতিবিদ ও ভিক্ষুরা দিনে দিনে সেখানে গড়ে তুলছে বর্ণ ও ধর্মের ঘৃণার পরিবেশ, যাতে নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সব ধরণের সহিংসতাকে অনুমোদন দেয়া যায়। অনেক রোহিঙ্গা তাই প্রাণভয়ে পালাচ্ছে সাগরে কিংবা জঙ্গলে। কিন্তু হায়! সেখানেও রক্ষা নেই। গত সপ্তাহে শতাধিক রোহিঙ্গার সলিল সমাধি হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। অনেকে বাধ্য হয়ে পালিয়ে গেছেন বাংলাদেশে। ধরা পড়ে অনেককেই যেতে হচ্ছে সিত্তেওয়ের মানবতের জঘণ্য ক্যাম্পগুলোতে, যেখানে জুন মাস থেকেই আঁটকে আছে আরো অনেক রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী। ঐদিকে রাখাইন সন্ত্রাসীরা আবার ডজন ডজন রোহিঙ্গা মেয়েদের তুলে নিয়ে করছে ধর্ষণ – আর সেইসাথে চারিদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে যুদ্ধের বিভীষিকা I
এটা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করে দেয়ারই তৎপরতা। ২৫-শে অক্টবরের এক ইস্তেহারে মিয়ানমারে অবস্থিত জাতিসংঘের কর্মকর্তা অশোক নিগম বলেন, “জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের নির্বাসন ও ধংসযজ্ঞের ব্যাপারে শংকিত।” তিনি বলেন ক্ষতিগ্রস্ত সকল জনগোষ্ঠীর কাছে নিরাপদ প্রবেশাধিকার অপরিহার্য; এবং সে লক্ষ্যে তিনি সরকারের প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত সবার কাছে দ্রুত ও শর্তহীনভাবে পৌঁছবার মানবিক আবেদন জানান।

মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে করা জঘন্য অপরাধগুলো লুকিয়ে রাখতে চায়, সেজন্যে তারা আন্তর্জাতিক মিডিয়া, এনজিও, সাহায্য সংস্থা এমনকি জাতিসংঘকেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাতে প্রবেশাধিকার দেয়না – পাছে তারা বর্বরতার মাত্রা বুঝে ফেলে। আর যেহেতু রোহিঙ্গাদের সার্বিক নির্মূল রাষ্ট্রীয় নীতিরই অংশ, তাই মুসলিম ভুক্তভোগীদের জন্যে মিয়ানমারের সরকারী সংস্থাগুলো থেকে কোনো সাহায্যই পৌঁছেনা। আরো জঘন্য বিষয় হচ্ছে এই যে, ও.আই.সি কিংবা ইসলামিক রিলিফ থেকে পাঠানো ত্রাণসামগ্রীও প্রাপক রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছেনি। হিসেবে দেখা গেছে, পাঠানো ত্রাণসামগ্রীর ১০ শতাংশেরও কম ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছেছে। রাষ্ট্র-আয়োজিত অক্টোবরের রাখাইন সন্ত্রাসী ও ভিক্ষুদের প্রতিবাদ সভাকে ধন্যবাদ দিতেই হয়; কেননা, সেই অযুহাত দেখিয়েই মিয়ানমার সরকার ও.আই.সি-সহ অন্যান্য মুসলিম সাহায্য সংস্থাকে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে ত্রাণ কার্যালয় খুলতে দেয়নি।

মুসলিমদের ভয়াবহ হত্যার জন্যে একজন বৌদ্ধ সন্ত্রাসীকেও শাস্তি দেয়া হয়নি। থেইন সেইনের সরকার থেকে আমরা কেবল সহিংসতার হোতাদের চিহ্নিত করা ও তাদের বিচারের আওতায় আনার ফাঁকা বুলি শুনেছি। কিন্তু এসব প্রতিজ্ঞা কখনো ন্যায়বিচারে পর্যবসিত হয়না, যেমনটা আমরা দেখেছি ৩-রা জুনে ১০ বর্মী মুসলিমদের বিনা বিচারে মেরে ফেলার ঘটনায়। এই যখন বাস্তবতা – তখন সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের জান-মাল রক্ষার কথা না হয় বাদই দিলাম।
বুঝতে কষ্ট হয়না যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে থেইন সেইনের সরকার ইঁদুর-বিড়াল খেলা খেলছে; একদিকে যেমন উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি থেকে অপরাধগুলোকে আর লুকিয়ে রাখা যায়না তখন তারা সবাইকে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়া শান্ত করে – আর অন্যদিকে যখন বহির্শক্তির চাপ কিছুটা কমে আসে, সাথে সাথেই বেড়ে যায় জঘন্য অপরাধগুলোর মাত্রা। তাই ৩-রা জুনে শুরু হওয়া সংঘবদ্ধ হত্যা ও নির্যাতনের ফলে সৃষ্ট এক লক্ষ আভ্যন্তরীন শরণার্থীর সাথে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসের ফলে আরো কয়েক অযুত বাস্তুহারা শরণার্থী যোগ দিলে সার্বিক অবস্থার অবনতি ঘটে অনেকখানি। এক সময়ের সমৃদ্ধ মুসলিম জনপদ এখন যেন বোমার আঘাতে ধ্বংস হওয়া অঞ্চল! কোনো রোহিঙ্গাকেই তাদের এলাকাতে ফিরে গিয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি পূনর্গঠন করতে দেয়া হয়নি। নাৎসি কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পের আদলে গড়ে ওঠা ক্যাম্পে তাদের আঁটকে রাখা হয়েছে। ঐ বীভৎস ছাউনিগুলো থেকে বের হয়ে জীবিকা আহরণের চেষ্টা করলে রাখাইন বৌদ্ধ নিরাপত্তা রক্ষীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হবার সমূহ ঝুঁকি থাকে। ঐ ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গাদের রাখা হয়েছে যাতে তারা ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

নিরস্ত্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখা যেন রাখাইনদের জাতীয় চেতনাতে পরিণত হয়েছে। সীমান্তরক্ষীরা (NASAKA) বারংবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে আরাকান হচ্ছে রাখাইন রাজ্য – যেখানে রোহিঙ্গা মুসলিমদের কোনো স্থান নেই। রোহিঙ্গাদের বলা হয় তারা যেন আরাকান থেকে চলে যায়, না হলে তাদের মেরে ফেলা হবে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে নির্মূল করার তালিকায় একে একে যুক্ত হচ্ছে মুসলিম অধ্যুষিত জনপদগুলো। পাঁচের বেশী লোকের সমাবেশ ঘটানোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা ১৪৪ ধারা কেবল রোহিঙ্গাদের উপরই প্রয়োগ করা হয়। নিরাপত্তারক্ষীদের আশীর্বাদ পওয়া রাখাইন সন্ত্রাসীদের হাতে ঘর-বাড়ী, দোকান-পাট, মসজিদ, স্কুল কিংবা গ্রাম লুট হওয়া অগ্নিদগ্ধ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতেও বাইরে যেতে পারেনা রোহিঙ্গারা।

বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী রাখাইনরা সরকারের সহযোগিতা পায়। চিয়াউকফু শহরের ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে যে, বৌদ্ধ অগ্নি-নির্বাপক দল পানির বদলে আগুনের উপর জ্বালানী ছিটিয়েছে, যাতে ধ্বংসলীলা সম্পূর্ণ হয়! পিট প্যাটিসন নামের একজন স্থানীয় শিক্ষক, যিনি যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার জন্যেও কাজ করে থাকেন বলেন,
দমকলের বাহিনীর লোকজন আগুনের উপর আদতে ঢেলেছে পেট্রোল – কিন্তু ভান দেখাচ্ছে যেন তারা পানি ছিটাচ্ছে! কর্তৃপক্ষ আসলেই একপেশে। আমরা তাদের বিশ্বাস করতে পারিনা।

যদিও সাম্প্রতিক ঘটনাতেগুলোতে মুসলিমরা একতরফা ভুক্তভোগী – থেইন সেইন সরকার একে রাখাইন রাজ্যের আন্তঃগোত্রীয় দাঙ্গা বলে চিত্রায়িত করতে সচেষ্ট। সাদামাটা অর্থে যা হচ্ছে তা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ রাখাইনদের দ্বারা হত্যা-সহ ভয় ভীতির উদ্রেক করে মুসলিম রোহিঙ্গাদের বার্মার আরাকান অঞ্চল থেকে উৎখাতের উদ্দেশ্যমূলক সরকারী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুসারে এই কাজগুলোকেই বলে নৃতাত্ত্বিক বিনাশ (ethnic cleansing)। রক্তপিপাসু এই সরকার কিংবা ঘরে ও বাইরে সরকারের কোনো সমর্থকই ছল-চাতুরী করে এমন ভয়াবহ অপরাধ লুকিয়ে রাখতে পারবেনা।
 মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নৃতাত্ত্বিক বিনাশ (Ethnic Cleansing)
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক বিনাশ আসলে পূর্ব-পরিকল্পিত বিষয় (text book case)। বিষয়টি বর্মী ও রাখাইন বৌদ্ধদের আশীর্বাদে রাখাইন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বর্মী সরকারের হাতে গড়ে ওঠা জাতীয় পরিকল্পনার অংশ – যেখানে সরকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিয়ে থাকে। স্থানীয় রাখাইন রাজনীতিক থেকে শুরু করে বৌদ্ধ সাধু-সন্ত ও জনতা-সহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সবাই রোহিঙ্গা সমস্যার শেষ সমাধান দেয়ার এই পরিকল্পনার উৎসুক অংশীদার।
তাই থেইন সেইন সরকারের রোহিঙ্গা উৎখাতের পরিকল্পনাকে সমর্থন করা তরুন সাধু সঙ্ঘের (Young Monks Association) বিক্ষোভ সভাতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের দেখে অবাক হতে হয়না। সবচাইতে বড় এমনই এক বিক্ষোভ সভাতে সভাপতিত্ব করতে দেখা গেছে উইরাথু (৫) নামের পরম-পূজনীয় এক বৌদ্ধ শিক্ষককে। সে হচ্ছে সেই অপরাধী যে ২০০৩ সালে মুসলিমদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার প্ররোচনা দেবার জন্যে জেলে গিয়েছে। তাই অবাক হবার কিছু নেই যে আং সান সু চি আজ প্রতারণামূলক অঙ্গীকার করছেন – যেখানে তার দল NLD আসলে রোহিঙ্গা নির্মূলের রাষ্ট্রীয় অভিযানের অন্যতম সমর্থক। ‘গণতন্ত্র’র প্রতীক বলে পরিচিত এমন অনেক নেতাই আজ ফ্যাসিবাদের চাইতে কতটা ভালো তার প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন – সত্যি বলতে কি, তাদের কাজকর্ম আদতে কু ক্লাক্স ক্ল্যান (KKK) সদস্যদের চেয়েও জঘন্য বলেই প্রমাণিত হয়েছে।
এই নির্মূল অভিযানের সবচাইতে ভয়ানক অংশ হচ্ছে রাখাইন বৌদ্ধরা, যাদের পূর্বপুরুষেরা একাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আরাকানে বসতি স্থাপন করে। অবশ্য আরো শতাধিক বছর আগেই হিন্দু সাম্রাজ্য চন্দ্র’দের শাসনামলে অপেক্ষাকৃত শ্যামলা বর্ণের রোহিঙ্গাদের বংগ-ভারতীয় পূর্বপুরুষেরা আরাকানে ইতোমধ্যেই বসবাস শুরু করে দিয়েছে। চন্দ্র রাজাদের তৎকালীন বাংলার (বর্তমানের বাংলাদেশ) সাথে ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।
রাখাইন জাতির সেই তিব্বতীয়-বর্মী বৌদ্ধ পূর্বপুরুষদের অনধিকার ও সহিংস প্রবেশের ফলে আরাকানে বসবাসকারী হিন্দু ও মুসলিমরা কালক্রমে সংখ্যালঘু হয়ে যায়। কিন্তু ১৪৩০ সালে প্রায় ৫০,০০০ সদস্যের দু’টি সৈন্যদল পলায়নরত রাজা নারামেইখলা’কে যখন আরাকান রাজ্যে পুনঃঅধিষ্ঠিত করে তখন সেই সৈন্যদলের অনেককেই আরাকানে থেকে যেতে রাজা অনুরোধ করেন (৬); উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বর্মী আক্রমণ প্রতিহত করা। মুসলিম সেনাদলের অনেকেই নতুন রাজধানী ম্রোহাংগ (ম্রাউক-উ)-এ থেকে গেলে, সংখ্যালঘু মুসলিমদের সংখ্যা আরাকানে কিছুটা বাড়ে।
আরাকানের ম্রাউক-উ সাম্রাজ্য পার্শ্ববর্তী বাংলা/ভারত অঞ্চল থেকে অনেক আচার, কৃষ্টি গ্রহণ করে। তারা ইসলামী অভিলিখনে মুদ্রাও বাজারে ছাড়েন। তারা বাংলা সাহিত্যকে পৃষ্ঠপোষকতাও দেন। তারা মুসলিম নামও অধিগ্রহণ করেন, যে রীতি ষোড়শ শতাব্দীর প্রায় শেষভাগ পর্যন্ত চলে। বৈচিত্র্যপূর্ণ নৃ ও জাতিগোষ্ঠীর সমাহারে সাজানো এই সাম্রাজ্যে মুসলিমরা প্রশাসন, আদালত ও প্রতিরক্ষা বাহিনীতে বিশেষ অবদান রাখে। ১৭৮৪ সালের বর্মী রাজা বোদোপায়ার অধিগ্রহণের আগ পর্যন্ত প্রায় কয়েক শতাব্দী ধরেই এই বিচিত্র ও অনন্য রাজ্য ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন।
বোদোপায়া ছিলেন উগ্রপন্থী বৌদ্ধ, যিনি মুসলিম সম্পর্কিত সবকিছুই ধ্বংস করে ফেলতে চাইতেন। ধর্মীয় সৌহার্দপূর্ণ অঞ্চলে তিনি সংকীর্ণতাবাদী সাম্প্রদায়িকতার প্রচলন করেছিলেন। আরাকানের সৈকত জুড়ে থাকা মসজিদগুলোকে ধ্বংস করে তিনি সেখনে প্যাগোড়া ও বৌদ্ধ আশ্রম গড়ে তোলেন। আরাকান অধিগ্রহণের সময় তিনি কয়েক অযুত মুসলিমকে মারা ছাড়াও প্রায় ২০,০০০ মুসলিমকে বন্দী করে নিয়েছিলেন। তার নৃশংস রাজত্বকালে প্রায় দুই লক্ষ আরাকানবাসী পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় (আজকের বাংলাদেশ) পালিয়ে যায়। প্রায় ৪০-বছর বর্মী শাসনের পরে (১৯৮৪-১৮২৪) আরাকান ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অধীনে আসে। ইংরেজরা ৪-ঠা জানুয়ারী ১৯৪৮ সালের বার্মার স্বাধীনতা পর্যন্ত এই আরাকান অঞ্চল শাসন করে I

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের বার্মা অধিগ্রহণের প্রাক্কালে বৌদ্ধ যোদ্ধারা ফ্যাসিবাদী রাজকীয় জাপানী সেনাবাহিনীর পক্ষে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং ভারতীয় ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ী ও ব্যাবসাদির উপর হামলে পড়ে। এমনকি পশ্চিমাঞ্চলে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীও এই নির্মূলাভিযান থেকে রেহাই পায়নি। প্রায় এক লক্ষ রোহিঙ্গা ঐ বৌদ্ধ-জাপানী যৌথ অভিযানে প্রাণ হরান। রোহিঙ্গাদের তখন দক্ষিণ আরাকান থেকে বের করে দেয়া হয়। অনেকেই তখন ব্রিটিশ বাংলার প্রতিবেশী উত্তর আরাকান অঞ্চলে পালিয়ে বাঁচেন, কেননা সেখানে তখনো রোহিঙ্গাদের নিগূঢ় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। জীবন বাঁচাতে গিয়ে আরো প্রায় ৮০ হাজার তখন সীমান্ত পেরিয়ে স্থায়ীভাবে বাংলায় বসবাস শুরু করে দেয়। সে সময় ২৯৪টি রোহিঙ্গা গ্রাম পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় (৮, ৯)।
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বার্মা স্বাধীন হবার পরেও রোহিঙ্গা-সহ অন্যান্য মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত গণহত্যা ও নৃশংসতা চলতেই থাকে। নৃতাত্ত্বিক বিনাশের লক্ষ্যে আমার জানা মতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিদেনপক্ষে দুই ডজন অভিযান চালানো হয়, সেগুলো হচ্ছে:
১. সামরিক অভিযান (৫ম বর্মী রেজিমেন্ট) – নভেম্বর ১৯৪৮
২. বার্মা টেরিটোরিয়াল ফোর্স (BTF) এর অভিযান – ১৯৪৮-৫০
৩. সামরিক অভিযান (দ্বিতীয় জরুরী ছিন রেজিমেন্ট) – নভেম্বর ১৯৪৮
৪. মাউ অভিযান – অক্টোবর ১৯৫২-৫৩
৫. মনে-থোন অভিযান – অক্টোবর ১৯৫৪
৬. সমন্বিত অভিবাসন ও সামরিক যৌথ অভিযান – জানুয়ারী ১৯৫৫
৭. ইউনিয়ন মিলিটারি পুলিস (UMP) অভিযান – ১৯৫৫-৫৮
৮. ক্যাপ্টেন হটিন কিয়াও অভিযান – ১৯৫৯
৯. শোয়ে কি অভিযান – অক্টোবর ১৯৬৬
১০. কি গান অভিযান – অক্টোবর-ডিসেম্বর ১৯৬৬
১১. ঙ্গাজিঙ্কা অভিযান – ১৯৬৭-৬৯
১২. মিয়াট মোন অভিযান – ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯-৭১
১৩. মেজর অং থান অভিযান – ১৯৭৩
১৪. সাবি অভিযান – ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪-৭৮
১৫. নাগা মিন (ড্রাগন রাজা) অভিযান – ফেব্রুয়ারী ১৯৭৮-৭৯ (ফলাফল: ৩ লক্ষ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অভিনিষ্ক্রমণ (exodus); মৃত্যু চল্লিশ হাজার)
১৬. সোয়ে হিন্থা অভিযান – অগাস্ট ১৯৭৮-৮০
১৭. গেলোন অভিযান – ১৯৭৯
১৮. ১৯৮৪’র তাউঙ্গকের গণহত্যা
১৯. মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা – তাউঙ্গি (পশ্চিম বার্মা)। পিয়াই ও রেঙ্গুন সহ বার্মার অনেক অঞ্চলে এই দাঙ্গা ঘটে।
২০. পি থিয়া অভিযান – জুলাই ১৯৯১-৯২ (ফলাফল: দুই লক্ষ আটষট্টি হাজার রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অভিনিষ্ক্রমণ (exodus))
২১. না-সা-কা অভিযান – ১৯৯২ থেকে আজ পর্যন্ত
২২. মুসলিম বিরোধী সাস্প্রদায়িক দাঙ্গা – মার্চ ১৯৯৭ (মান্দালয়)
২৩. সিটীওয়ে’তে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা – ফেব্রুয়ারী ২০০১
২৪. মধ্য বার্মার মুসলিম বিরোধী সর্বাঙ্গীন দাঙ্গা – মে ২০০১
২৫. মধ্য বার্মার মুসলিম বিরোধী সর্বাঙ্গীন দাঙ্গা (বিশেষত পিয়াই/প্রোম, বাগো/পেগু শহরে) – ৯/১১ এর পরবর্তী থেকে অক্টোবর ২০০১
২৬. যৌথ নির্মূলাভিযান – জুন ২০১২ থেকে চলছে
জেনারেল নে উইন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সকল মিয়ানমার সরকারই মৌলিক মানবাধিকার বন্ধ রেখে রোহিঙ্গাদের সার্বিক নৃতাত্ত্বিক বিনাশে খেলায় মত্ত। রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রবিহীন ঘোষণা করতঃ – তাদের বিরুদ্ধে করা সব ধরণের অপরাধকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের কোনো অনুচ্ছেদই মানা হচ্ছেনা। এখানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘটা অপরাধগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকা দেয়া হলো:
নাগরিকত্ব অস্বীকার
সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত ভ্রমণ ও চলাচল
নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত শিক্ষা
সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত কাজের অধিকার
জবরদস্তিমূলক শ্রমনিয়োগ
ভূমি অধিগ্রহণ
জবরদস্তিমূলক উচ্ছেদ
ঘরবাড়ী, অফিস, স্কুল, মসজিদ ইত্যাদির ধ্বংস সাধন
ধর্মীয় যন্ত্রণা দান
জাতিগত বৈষম্যমূলক আচরণ
নিয়ন্ত্রিত বিয়ে
প্রজননে বাধাপ্রদান ও জোরপূর্বক গর্ভনাশ
স্বেচ্ছাচারী কর আরোপ ও বলপ্রয়োগে কর আদায়
গবাদি পশু-সহ পরিবারের সদস্যদের জবরদস্তিমূলক জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধকরণ
স্বৈরাচারী মনোভাবসূলভ গ্রেফতার, নিবর্তন ও আইন বহির্ভূতভাবে হত্যা
রোহিঙ্গা মহিলা ও বয়ষ্কদের অবমাননা ও অমর্যাদা
যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণের প্রয়োগ
রোহিঙ্গা সমৃদ্ধ লোকালয়ের প্রণালীবদ্ধ উচ্ছেদ
অভিবাসন ও নাগরিকত্ব কার্ড বাজেয়াপ্তকরণ
আভ্যন্তরীণ শরনার্থী ও রাষ্ট্রহীনতা
মুসলিম পরিচিতি মুছে ফেলার লক্ষ্যে মুসলিম ঐতিহ্য সমৃদ্ধ স্থান ও প্রতীকের ধ্বংস কিংবা পরিবর্তন
 
ড. শুয়ে লু মং ওরফে শাহনেওয়াজ খান তার লেখা The Price of Silence: Muslim-Buddhist War of Bangladesh and Myanmar – a Social Darwinist’s Analysis বইতে জানাচ্ছেন যে আরাকান রাজ্যের চারটি জেলাতে রোহিঙ্গা মুসলিম ও রাখাইন বৌদ্ধদের সংখ্যিক অনুপাত প্রায় সমানই ছিল – কিন্তু তেশরা জুন, ২০১২ থেকে শুরু হওয়া রাখাইন বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের নির্মূলাভিযানের কল্যাণে সেসব মুসলিম জনবসতি এখন প্রায় জনশূণ্য।
জাতিসংঘ সহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা রোহিঙ্গাদের ব্যপারে সঠিকই বলেছেন – রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচাইতে বড় নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। তাদের গোত্র ও ধর্মের জন্যে তারা মিয়ানমারের সংখ্যা গরিষ্ঠ বৌদ্ধ সম্প্রদায় দ্বারা গণহত্যার বলি হচ্ছেন।

জাতিসংঘ-সহ মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতামত অনুসারে রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে অসহায় ও নির্যাতিত জাতি।
রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থাকে ঠিকভাবে প্রকাশ করার জন্য গণহত্যা ছাড়া আর কোনো শব্দ আছে বলে মনে হয়না। এক্ষেত্রে গণহত্যা শব্দের ব্যবহারে কারো অবাক হবার কিছু নেই, কেননা মিরিয়াম ওয়েবস্টার অভিধানে গণহত্যাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, “ইচ্ছাপ্রনোদিত ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কোনো নৃ, জাতি কিংবা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর নির্মূল অভিযান [the deliberate and systematic destruction of a racial, political or cultural group]।" সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞরা বলছেন, হোক সার্বিক কিংবা আংশিক – নৃ, জাতি, ধর্ম কিংবা রাষ্ট্রিক গোষ্ঠীর নিয়মতান্ত্রিক নির্মূলাভিযান থাকলেই গণহত্যা’র সংজ্ঞা প্রাসঙ্গিকই থাকে। আর যেকোনো সংজ্ঞা অনুসারেই আরাকানের রোহিঙ্গারা নৃ, জাতি ও ধার্মিক আঙ্গিকে সংখ্যাগুরু রাখাইন বৌদ্ধ বর্মীদের চাইতে পুরোপুরি আলাদা।
ড. ড্যানিয়েল জোনাহ গোল্ডহ্যাগেন তার লেখা Worse than War বইতে পাঁচ ধরণের উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন, সেগুলো হচ্ছে –পরিবর্তন, নিবর্তন, বিতাড়ন, জন্মনিরোধ ও সর্বাংশে নির্মূল। এখানে পরিবর্তন বলতে বোঝানো হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি-সহ সকল মৌলিক পরিচিতিগুলোকে ধীরে ধীরে পাল্টে দেয়া। আগে আমি যেভাবে বললাম, যদিও আরাকানে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস স্মরণাতীত কালেই পৌঁছে – তবুও তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে আসা নব্য বসতকারী গোষ্ঠী হিসেবে নতুন মিথ্যে পরিচিতি দেয়া হচ্ছে।      
নিবর্তন হচ্ছে সেই পদ্ধতি যার মাধ্যমে ঘৃণিত, অননুমোদিত ও ভয়ঙ্কর মানুষদের নিজেদের কব্জায় রেখে তাদের উপর সহিংস দমননীতি চালানো যাতে সেই ভয়ানক জনগোষ্ঠী আসল কিংবা কল্পিত কোনও রকমের ক্ষতিই আর করতে না পারে। নিবর্তন মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের জীবনের প্রাত্যহিক বৈশিষ্ট্য।
বিতাড়ন কিংবা বিবাসন হচ্ছে তৃতীয় উচ্ছেদের উপায়। বিতাড়নের মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত জনগোষ্ঠীকে হয় দেশের সীমানার বাইরে কিংবা দেশের মধ্যেই এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে তাড়িয়ে দেয়া হয়। বিতাড়নের আরেকটি উপায় অবশ্য হচ্ছে জনগোষ্ঠীকে স্বদলবলে ক্যাম্পের জীবন বেছে নিতে বাধ্য করা। আর নে উইনের আমল থেকেই মিয়ানমার সরকার এই দোষে দোষী।    
উচ্ছেদের চতুর্থ উপায় হচ্ছে জন্ম নিরোধ যা মিয়ানমার সরকার অন্যান্য উপায়গুলোর সাথে ব্যবহার করে। এই পদ্ধতিতে রোহিঙ্গা মেয়েদের বিয়েতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ছাড়াও ব্যবহার করা হয় জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ, গর্ভপাত ও ধর্ষণ। হালে ঘটা নিবর্তনে মুসলিমদের ঘরবাড়ি, শহর ও লোকালয় আক্রমণের সময় অনেক মেয়েদের অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া বলতে গেলে নৈমিত্তিক ঘটনাতে পরিণত হয়েছে।    
সর্বাংশে নির্মূল হচ্ছে উচ্ছেদের পঞ্চম উপায় যেখানে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে মেরেই ফেলা হয়। সর্বাংশে নির্মূলের ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যে এমন কারণও দেয়া হয় যে উল্লেখ্য গোষ্ঠীর সামান্য উপস্থিতিই যেন অন্যদের জন্য ভয়ানক হুমকির ব্যপার। এই পদ্ধতিতে সাময়িক, খণ্ডকালীন কিংবা সম্ভাব্য সমাধানের বদলে দেয়া হয় “চিরস্থায়ী সমাধান।” বুঝতে কষ্ট হয়না যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কেন রাখাইন ব্যবসায়ীরা রোহিঙ্গাদের মেরে ফেলার জন্যে বিষাক্ত তেল ও খাদ্যাদি বিক্রী করেছে। বর্ণবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু, রাখাইন সন্ত্রাসী, রক্তপিপাসু রাজনীতিবিদ ও সরকারের সাম্প্রতিক কার্যকলাপে এটা পরিষ্কার যে সার্বিক মিয়ানমার সমাজে রোহিঙ্গারা নির্মূলাভিযানের শিকার।

কী ভিক্ষু কী বৌদ্ধ জনতা – রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমি থেকে বের করে দিতে প্রায় সকল শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ আজ সংকল্পবদ্ধ।
উপরে দেয়া মিয়ানমার সরকারের অপরাধ তালিকা থেকে এটা পরিষ্কার যে রোহিঙ্গারা উল্লেখিত পাঁচ ধরণের উচ্ছেদেরই শিকার। এটা আদতে রোহিঙ্গা নির্মূলের একটি সার্বিক পরিকল্পনা।
গণহত্যার জন্য প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। এটা শুরু হয় মানুষের মন থেকে, আর এজন্যে দরকার ব্যপক প্রচারাভিযান যাতে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ কাজগুলো করা যায়। এক্ষেত্রে অপরাধ কিংবা হত্যাকারীদের নিঃশঙ্ক তো হতেই হবে, বরং তার উপরে বিশ্রী অপরাধগুলো চালিয়ে যাবার জন্য হতে হবে স্ব-প্রণোদিত অন্ধ সমর্থক। অনেক ক্ষেত্রেই, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আবহ তৈরীর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া হয় অন্ধ বর্ণবাদী বুদ্ধিজীবীদের উপর, যারা আম-জনতাকে অসহিষ্ণুতার বিষাক্ত বড়ি বিক্রী করেন। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের বিদ্বেষী মানসিকতাসম্পন্ন হওয়া কঠিন। তবে, উৎসাহী ও উদ্যমী শব্দমালা দিয়ে একবার চালু করে দেয়া গেলে, উচ্ছেদকারী সরকারের অভিঘাতী সৈন্যদল ও সমাজের সাধারণ জনগণ সার্বাঙ্গীন উন্মাদনা নিয়ে দায়িত্ব পালনে দেহ প্রাণ সঁপে দেয়। তারা স্বপ্রনোদিত হয়েই তা করে। আর আজকে মিয়ানমারে, বিশেষত আরাকানে তা-ই আমরা দেখছি।
গণহত্যা আর যেসব জায়গাতে ঘটেছে সেখান থেকে দীক্ষা নিয়ে আজকের সবচেয়ে বড় অপরাধের হোতারা – অর্থাৎ, মিয়ানমার সরকার, স্থানীয় রাখাইন রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সাধারণ জনতার মস্তক ধোলাইকল্পে রোহিঙ্গা-সহ অ-বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে অহর্নিশি বিকৃত ইতিহাস দিয়ে চালাচ্ছে প্রোপাগাণ্ডা ও প্রাতারণা – উদ্দেশ্য হচ্ছে মিয়ানমার ও আরাকানের মাটিকে ‘অন্য’ লোকদের থেকে দখলমুক্ত করে ‘পবিত্র’ করা। আয়ে চ্যান, (বিগত) আয়ে কিয়াও, খিন মং স ও অন্যান্য উৎকট স্বদেশপ্রেমী রাখাইন লেখকদের বিষাক্ত লেখাগুলোকে ধন্যবাদ জানাতেই হয় – কেননা তাদের লেখার কল্যানেই আজ মুসলিম জনগোষ্ঠী – বিশেষত রোহিঙ্গাদেরকে, বানানো হয়েছে ‘বহিরাগত ভাইরাস,’ যা বৌদ্ধ স্বকীয়তার প্রতি হুমকিস্বরূপ। তাই আজকাল মিডিয়ার বদৌলতে – ‘রাখাইন লোকজনদের পক্ষে আর রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে বসবাস করা সম্ভব নয়’ – এমনতরো শ্লোগান প্রায়শই শোনা যাচ্ছে। আর ব্যপক এই হত্যাযজ্ঞের একমাত্র বলি যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী – এই সমস্ত একপেশে রিপোর্টে তা পুরোপুরি চেপে যাওয়া হয়েছে। আদতে উল্টো রোহিঙ্গারাই কিন্তু বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবে দিশেহারা।

ব্যাপক হারে হত্যাযজ্ঞের কারণ খুঁজে পাওয়া যায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার নীতিমালায়। সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক গঠনই হচ্ছে সেই বিভাজনকারী রেখা – যেখান থেকে সাধারণত এসব উচ্ছেদ প্রকল্প শুরু হয়। অন্য জায়গাতে আমি যেভাবে বলেছি, মিয়ানমার সরকার নব্য মিয়ানমারবাদকে সমর্থন জানায় – যেখানে বর্ণবাদ ও


গাঁদা ফুল = মোহাম্মদ নূর আলম গন্ধী

মঙ্গলবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৬

লেখা ও ছবিঃ মোহাম্মদ নূর আলম গন্ধী : মৌসুমি ফুলের মাঝে গাঁদা আমাদের দেশে অতিপরিচিত এক ফুল।বাগানের সৌন্ধর্য বৃদ্ধি সহ বিভিন্ন রকমের অনুষ্ঠান ও গৃহ সজ্জায় রয়েছে গাঁদা ফুলের ব্যাপক চাহিদা ও কদর।এর আদিনিবাস মেক্সিকো।ইংরেজী নামঃMari Gold পরিবারঃ Compositae,উদ্ভিদ তাত্বিক নামঃঞধমবঃবং বৎবপঃৎধ ষরহহ।বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে বিভিন্ন রঙ,আকার-আকৃতি ও প্রজাতির গাঁদা ফুলের উৎপাদন চোখে পড়ার মতো এবং এ ফুলের চাহিদা বেশী বিদায় বাণিজ্যিক চাষাবাদেও রয়েছে ব্যাপক বিস্তৃতি।এ সকল জাত গুলোর মাঝে আফ্রিকান প্রজাতির গাঁদা আকারে বড়,রঙ সোনালী থেকে হলুদ,মেক্সিকো,ফরাসি ও দেশীয় প্রজাতির গাঁদা আকারে ছোট এবং রয়েছে বাহারী রঙ রূপের।গাঁদা মূলত শীত কালের ফুল হলেও হেমন্তে ফুল ফোটা শুরু হয় এবং এর ব্যাপ্তিকাল শীত কালের পুরু সময় অবধী। গাছ ঝোপালো শাখা-প্রশাখা অনেক,উচ্চতা নির্ভর করে জাতের বৈশিষ্টের উপর তবে দেশীয় জাতের গাছের উচ্চতা গড়ে প্রায় ৩ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে এবং অন্যান্য জাতের বেলায় গড় উচ্চতা সাধারণত ১ থেকে ২ ফুট হয়ে থাকে।

alt

গাছের পাতার রঙ সবুজ,কিনারা খাজ কাটা, ছোট,উগ্র গন্ধযুক্ত। সু-নিস্কাসিত দো-আঁশ থেকে বেলে দো-আঁশ মাটি ও রৌদ্রউজ্জল পরিবেশ গাঁদা ফুল উৎপাদনের জন্য উত্তম। গাছে বা বাগানে প্রয়োজনে সেচ দিতে হবে এবং পানি নিকাশের উত্তম ব্যবস্থা থাকতে হবে। ফুলে সুগন্ধ রয়েছে,গাছের প্রতি শাখা-প্রশাখায় ফুল ধরে,ফুলের পাপড়ি কোমল নরম,অনেক পরিমান পাপড়ির সমন্বয়ে সৃষ্ট গাঁদা ফুলের।ফোটন্ত ফুল উর্দ্বমূখী এবং গাছে ধরা ফুল দীর্ঘ্যদিন টিকে থাকে।আর তাছাড়া বাগান থেকে ফুল সংগ্রহ করার পরও বেশ কয়েক দিন সংরক্ষণ করে রাখা যায়।বীজ ও ডাল কাটিং এর মাধ্যমে বংশ বিস্তার করা যায়।বীজ থেকে তৈরি চারা দেশীয় প্রজাতির বেলায় গাছে ফুল ধরতে সাধারণত গড়ে সময় লাগে ৭৫ থেকে ৮০ দিন এবং আফ্রিকান গাঁদা,মেক্স্রিকো গাঁদা ও ফরাসি গাঁদার ক্ষেত্রে গড়ে সময় লাগে ৬০ থেকে ৬৫ দিন।


চাকা = জুলি রহমান

মঙ্গলবার, ০৮ নভেম্বর ২০১৬

রসিয়ার নাই রসের ভান্ডার চাপিল নগরীতে
খইলের পানি পড়ে না গরুর চারিতে।
সোয়ারী নাই নিতে নাইওরী।
বধূর মনে নাইরে মধু কথার বাঁশুরী।

মইষাল ভাইয়ের মহিষ নিয়া চলে না চাকা।
ডিজিটালে পথের ধূলা পড়েছে ঢাকা।
গো-ধূলি লগন কলমাই তীরে কেউ দেখেনা।
বিশ্ব এখন হাতের মুঠোফোনে কিছু নেই অজানা--

জুলেখা জয়নব নসিমন আর কলিমনেরা।
নাম ভাঙিয়ে চলে যেমন জগৎ অধরা!
সূযর্্য ডুবে সূযর্্য ওঠে ছোঁয় না বাঁশের পাতা।
এতো সুখেও জীবন পিস্ট যেনো এক যা-তা।

দূরে বসে আঁকে কে যে সেই গ্রামের ছবি?
ভাবনাতে যে ডুবে থাকে শাম মতির সবি।
নিকশ কালো আঁধার মেজে দাঁড়ায় নিয়নের বাতি।
ছপুরা সুজন ধনে মানে গড়েছে ব্যাসাতি।

ঠিকই আছে জীবন মান আধুনিকতায় মোড়া।
তবুও কেনো কান্দে পরাণ বদলে গেলি তোরা?
মনের কোনে নাইরে মায়া অহমের ছড়াছড়ি।
ইচ্ছে করে সরল সুখে আবার হাতটি ধরি।

আমিও এখন দূরের রাজে্য করি বসবাস।
সাত সমুদ্র তের নদীর ওপার থেকে ছাড়ি শ্বাস।
বিশ্বাসেরা বন্দী এখন টাকা পাউন্ড ডলারে।
যে দিন গ্যাছে তাই কী রে আর ফিরে?

Picture


মেঠু পথের ধূলি উড়ে চাকায় চলে গাড়ি।
বাঁশের আড়ে কলাপাতায় বধূর পাতা আড়ি।
বাউল বাজায় একতারা রাখালিয়ার সুর।
নিজামুদ্দীনের পুঁথি পাঠে মন বড়ো বিধূর।

পল্লী বালার মধুর হাসি প্রেমের হাসুলী
নোলক নাড়ে বধূ কেনো ঘোরায় বিচুলি?
কলসী কাঁখে নূপূর ঝংকার নদীর কলতান।
ডুবিয়ে জলে পা দুটোরে চিন্তা করি অবসান।

ধূত্তরী ছাই বসা আমি আধুনিক সু্যইমিং পুলে।
কলমাই নদীর স্রোত বয় আমার চোখের কোলে।
ট্রেনের চাকা সমান্তরাল গরুর গাড়ি নয়।
ক্যাচ ক্যাচ সেই সুর পরাণ জুড়ে রয়।